শনিবার, ২২ এপ্রিল, ২০১৭

।। সাধর্ম্যনীক ।।

কপাটরুদ্ধ দ্বিপ্রহর, সোঁ-সোঁ ধ্বনিতে ম্লেচ্ছ বাতাস দিশাহীনভাবে দুয়ারে কষাঘাত করিয়া চলিতেছে। আশেপাশে দর্শককুল কমবেশি উৎকণ্ঠাতে, কি হয় কি হয়, ভাবিতে ভাবিতে ঘামিতেছেন, ঘামিতে ঘামিতে ভাবিয়া ক্লান্ত হইতেছেন পুনরায়। কণ্ঠনালী শুকাইয়া জৈষ্ঠমধুর ন্যায় কাষ্ঠল, সামান্য রসের সঞ্চার হইলেই মিষ্টতার আগমন ঘটে।
   বৈশাখস্য শুক্লাভূ তীযাযাঅক্ষত্তীষাব্রত
      তস্য শুক্লা দ্বাদশী পিপীতকী 
        তচতুর্দশী নৃসিংহচতুর্দশী
      তস্য কৃষ্ণাষ্টমী ত্রিলোচনাষ্টমী
       তস্য রূষ্ণচতুর্দশী সাবিত্রী

অনুচ্চারিত বৈদিক মন্ত্রে পবনে পবনে অজানা শিহরন। এই ভাবেই উতকন্ঠার সহিত কয়েকটি প্রহর অপগত হইবার পর অবশেষে সেই মহেন্দ্রক্ষন। ক্রমে ক্রমে কৃষ্ণবর্নের গগনপটে কালিমার পর্দা উন্মোচন করিয়া, শুক্লা দ্বাদশীর চন্দ্র পসৃত হইল। অতৃপ্ত আত্মাদলেরা, নক্তচরের ন্যায় যারপরনাই বিচলিত হইয়া উঠিল সহসা। সূক্ষাদর্শী বিবাচকগন আপন আপন জ্ঞান করণ্ড অসম্বাধ করিয়া চকিতেই নিলাম কক্ষে রুপান্তর করিয়া দিল সমগ্র "অক্রূর" মলয় কাননটিকে। সে এক সুপ্ত ও বিলুপ্তপ্রায় নির্মাণশক্তিসম্পন্ন প্রজ্ঞা।
সে এক অসম যুদ্ধ। যথারীতি দূঢ়হ কর্মটি সাধিত হইল ক্ষনিমতি বান্ধব দ্বারা। আরক্ষাবাহিনীর উপজীব্যে উচ্চপদে আসীন ব্যাক্তিদ্বারাই প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত বিপরিতবুদ্ধিগামী চক্ষুতারার সহিত বিবাদে জড়াইয়া স্ফুলিঙ্গের পত্তনটি সুচারু রূপে করিলেন। অবশেষে অনধিকারচর্চার বিষয়টি অনুধাবিত হইবার পর তৎক্ষণাৎ পৃষ্ঠদর্শন। দিবি্‌যাদ্ধিপতি যথারীতি তূনিরের সম্মুখে হাস্যমান।
বিভীষণ একটি চিরকালীন চরিত্র, যুগের চাহিদা মানিয়া কেমলমাত্র নামগুলি বদলাইয়া যায়। এক্ষেত্রেও তাহার কোন অন্যথা ঘটিলনা। অন্যতম অধীক্ষকই ধার্মিক বলীবর্দের ভুমিকায় সিং বাগাইয়া বাকি অন্যদের পশ্চাদদেশে দাম্ভের প্রকাশ ঘটাইতে থাকিলেন, সম্পূর্ন অযোউক্তিক ও অকারনেই। বৃহন্নলার রমনসুখ সম্ভবর এই পথেই সাধিত হয়।
সৃষ্টির অপার মহিমা, সাধুপ্রান হউক কিম্বা তস্কর, স্যাঙাৎ জুটিতে বেশি সময় ব্যায় হয়না। সেই অমোঘ নিয়মের পৃষ্ঠে সাওয়ার হইয়া, সর্বজ্ঞ মহিয়সী- কুচক্রে বৈদগ্ধ্যতা প্রাপ্ত ও সবলা 'দু:খাপনোদন দেবী', তাহার চূর্ণকুন্তল প্রত্যায়িত করিয়া বায়ুমন্ডল মৃত্যুয কনাদ্বারা পরিপূর্ণ করিলেন।
আপাত দৃষ্টিতে আনুরক্তি সর্বশ্ব মাতৃরূপেন সংস্থিতা, তিনিও ভক্তকুলের প্রহ্লাদ সাজিয়া কীর্তনিয়া দলে আপন খোরাকের নিমিত্তে প্রত্যহ খঞ্জনি বাজাইতেন। পরিচিত আস্তাকুরের পরিবেশে অন্তরের যাবতীয় কালিমার পূনর্জাগরন ঘটায়। অতএব তিনি কাব্যসংহারক হইয়া প্রানত্যাগের মত কঠিন ব্রতের নিদান দিয়া উপস্থিত সকলজনকে বিস্ময়াভিভূত করিয়া তুলিলেন।
যুদ্ধ বিদ্যার সর্বোতকৃষ্ট রীতি হইল, সম্মুখসমর। শক্তি ও প্রত্যুৎপন্নমতিতার সহিত বুহ্য রচনা, পরিশেষে গুপ্তচরবৃতির মোক্ষম বানে একে একে সকল বীর ও বীরাঙ্গানা পলায়নে ব্রতী হইলেন। উলুধ্বনি সহযোগে পূর্বক্তো সেই মাতৃরূপেন নব কলেবরে মেনকা- রম্ভা সদৃশ্য উল্লম্ফন করিবার নিমিত্ত দেহ ধারন করিয়া লুব্ধকের ন্যায় পরিখার চারিপাশে নাসিকা দ্বারা খোসবু আরোহণে ব্যাস্ত।
পারাঙ্গানা না জানি কোহার সমিপে তাহার জ্ঞানশলাকা প্রজ্বলিত করিতেছেন। নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সাধুতা সম্বলিত আরক্ষা উবজীব্য পরিজনের স্ব-চিত্র সম্বলিত প্রজ্ঞাপন নাজানি কাহার দুয়ারে নিষ্ফল ক্রন্দনে রত।
মহেঞ্জোদড়ো সভ্যতার সেই অন্তিম বীর, যার পূর্বে তাহার ন্যায় না কেও জনমিয়া ছিলেন, না আর কেহ জন্মাইবেন। আপন উপকন্ঠে বিষাগ্নি বরষিয়া আজি ক্ষান্ত দিয়াছেন, সুহৃদের অনুকম্পা ধীরে ধীরে মৃয়মান।
আজি আর্ধপাক্ষিক কাল অতিক্রান্ত, সময়ের রতিক্রিয়াতে নব নব শুভার্থীর আগমন ঘটাইয়াছে। অজেয় আত্মা বিজয়ী হইয়া আপন গুহ্যদ্বারে স্বমেহনে তৃপ্ত।
উল্লাস, সম্মুখে কৃষ্ণপক্ষ। কালের গহ্বরে কালিমা বিসর্জিত হইয়া নবচন্দ্রের উদযাপনে শোনিত তরল পান করিয়া আগামির দিশারী হইতে হাতছানি দিতেছে। অগ্নিক্রীড়াতে ত্রসন রহিয়াছে বলিয়াই না উহা বলীদের জন্য সংরক্ষিত।
উপেক্ষা করিবার সাধ্য কাহার আছে?


শুক্রবার, ২১ এপ্রিল, ২০১৭

নামহীন

দ্বন্দ্বের শুরুটা খুব ছোট্ট করে শুরু হয়, যখন প্রত্যাশার পারদ আকাশ ছোঁয়।

সোমবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১৭

। উন্মাদীয় প্রলাপ ~ ৩০ ।।

চাকুর ধার সুযোগ পেলেই কাটবে, সে জাত চেনেনা। ফুলও গন্ধ ছারে আপন খেয়ালে, সেও মানুষের দ্বন্দ্ব বোঝেনা। শিশু নিজমনেই অনবিল হেসে উঠে অকারনেই, কেঁদেও উঠে কারন সে শিশু। কুকুরও কোথাও থেকে পাছাতে লাথ থেকে, ন্যাজ গুটিয়ে নিজের পাড়াতে গিয়ে বেশ খানিক্ষন চিল্লিয়ে পাড়া মাথায় তোলে।
আদতে বুদ্ধিমান নামের বস্তুটা পাতি মানুষের মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়না। পারিবারিক সম্পর্কের মাঝের বিবাদটা সর্বজনবিদিত, উচ্ছিষ্টভোগিরা ভদ্রবেশে সাথে বসলেই চারিত্রিক উন্নতি ঘটে না। বংশ পরিচয় অবশ্যই একটা পরিচয় বহন করে, কিন্তু সবটা নয়। নিন্মরুচির কাক, যতই ময়ুরের পালক পরে নাচাগানা করুক, আস্তাকুর দেখলেই ঘৃন্য চরিত্র প্রকট হয়ে যায়। অযোগ্য অক্ষমের একটাই হাতিয়ার, নিপীড়িতের অভিনয়, আর শীৎকার।
নিজের সাবজেক্টের উপরে দখল কমবেশি সকলেরই থাকে, নাহলে ডানহাত বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সেটা বুদ্ধিমত্তা নয়। কথিত আছে স্বস্তা মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা আশা করা অন্যায়। মুশকিল হল, এই বুদ্ধিভ্রমের জন্য শক্ত খোলস দেখে ঘরে তুলে দেখা যায়, ভিতরটা জাষ্ট ভটভটে পচা।
আত্মবিশ্বাস আর আত্মঅহংকার, মাঝের ফারাকটা খুব কম। অহংবোধ না থাকা মানুষ জড়বৎ, আবার অতি অহং দ্রুত বিচ্ছেদ ঘটায়।
আবেগ দিয়ে পেট ভরেনা, মন ভরে তাও সর্বক্ষেত্রে নয়। মূল বিষয় বেগ। এটাই দরকার। চলন্ত গাড়িতে সাওয়ারি করলে এগোনো ছাড়া উপাই নেই।


সোমবার, ৩ এপ্রিল, ২০১৭

।। লোকাল ট্রেন ।।

একটি অভিজ্ঞতার ধারাবাহিক
-------------------------------

হাঁফাতে হাঁফাতে হাওড়া ষ্টেশনে ঢুকতেই বর্ধমান লোকালটা বেরিয়ে গেল। ঘড়িতে চোখ রাখতেই দেখি ঘড়ির কাঁটা আটটা দশ ছাড়িয়েছে। অতএব ছটা আটান্নর বর্ধমান লোকালের আর কি দোষ! অগত্যা এই সাতসকালে বিফল মনোরথে কী আর করি, পাঁচ নং প্ল্যাটফর্মের সোজাসুজি ওয়েটিং প্লেসের সামনে উত্তর দিকের হুইলার বুক স্টলের দিকে হাঁটা জুড়লাম। হৃদয়ে মস্তিষ্কে এখন শুধুই সেই পত্রিকা, নিরুপায় হয়ে দিবারাত্র স্বপনে জাগরনে পত্রিকা খাই, ওতেই শুই সব কিছুই জুড়েই, মানে পুরো একটা কেলেঙ্কারিয়াস পুদিচেরি আর কি! সাথে খালি বোতলটাও ব্যাগে গোঁজাই ছিল, সামনেই অ্যাকোয়া গার্ড ওয়াটার ফিল্টার দেখে ঠান্ডা জল নেওয়ার কথাটা বেমালুম মনে এসে গেল।
আচ্ছা করে সাতসকালে পেট ও মন দুটোই ভরে জল খেয়ে হুইলারের সামনে গিয়ে দেখি তখনও সেটা বন্ধ। পাশেই সার দিয়ে দোকান। গোরক্ষপুর প্রেসের স্টলের পাশের দোকানটাতে চা চাইতেই ওই টি-ব্যাগ ওয়ালা চা হাতে ধরিয়ে দিল। "ছ্যাঃ ছ্যাঃ এই চা আবার মাইনসে খায়!!" জানিনা বাপু কার কেমন লাগে, আমার আবার ফুটে ফুটে গজ না হলে চা এ টেষ্টই খোলে না। অগত্যা নাতজামাই ভাতার, ওই ই খেলাম নাকমুখ ভেংচে। দেরী যখন হয়েইছে, তাহলে কিছু কাজ করে নিই। রোব্বারের সকাল, অতএব ষ্টেশনে অন্যদিনের মত তেমন তারা নেই। ধীরে সুস্থে হেঁটে গিয়ে গজচালে বড়ঘড়ির নীচে গিয়ে বসে মোবাইলের দোকানটা খুলে বসলাম। সাথে গোটা চারেক এন্ড্রোয়েড ফোন।
ডিজিটাল দেশের রিংটাল আতাক্যালানে পাব্লিক আমি। এক এক করে সবকটাতে ফ্রির হাইস্পিড ওয়াইফাই করার জন্য গুগুল ষ্টেশনে গিয়ে মোবাইল নম্বর ভেরিফিকেশন করে কানেকশন জুড়ে ফোন কটার সাবতীয় সকল অ্যাপসের আপডেটেশন স্টার্ট করে দিলাম। ফ্রির এই ইন্টারনেট কার কী কাজে লাগে জানিনা, প্রেমিকদের চ্যাট আর পানু বিলাসীদের ডাউনলোডের স্বর্গোদ্যান এই সব স্থান। যদিও পাটনা এদের মধ্যে পানু ডাউনলোডে অগ্রগন্য- দেশের মধ্যে। মোটামুটি চারটে মোবাইলের সফটওয়্যারের যাবতীয় আপডেটেসনের চক্করে কখন যে সময় ফক্কা হয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি, সাথে একটা ফোনে অকপট তো আছেই। সাধারনত এতো সকালে কোনোদিনই অনলাইনে আসিনা, আজ এসে মজা নিতে গিয়ে সুকন্ঠী ঘোষিকার আটটা পাঁচের লোকালও যায় যায়। পড়িমড়ি করে কোনোমতে ৪ নং প্ল্যাটফর্ম থেকে লেডিসের আগের কামরাতে চড়তেই মোটরম্যানের হুইসেল কানে এলো।
ভিতরপানে ঢুকতেই একটা মাতাল দায়িত্ব নিয়ে বেশ বমি করে একটা এদিক ওদিক গ্যাপের চার প্লাস চারটে সিটের স্থান ফাঁকাই রেখে দিয়েছে আমার জন্য। বমিটা এক্কেবারে সামনে, তাই চাপ না নিয়ে ওটাকে দেখে, ডিঙিয়ে জানালার ধারটা দখল করে বসলাম। হালকা গন্ধ যে ছারছেনা তা নয়, কিন্তু সেটাকে বাকি ভিড়ের তুলনাতে উপেক্ষা করাই যায়। কারণ এই মালটাই লোকটার পেটে থাকলে কী আর তার পাশে বসতাম না ! বোম তো আর নয় যে ফেটে যাব।
...ক্রমশঃ


শুক্রবার, ৩১ মার্চ, ২০১৭

।। স্যার গীতি ।।

প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে
মোরে আরো আরো আরো দাও "স্যার"।
তব রুমে উপরের রুমে
মোরে আরো আরো হাওয়া দাও "স্যার" ॥
আরো মশা শত মশা
এই রুমেতে, স্যার, তারাও।
ঘরে ঘরে ধুনিচি নিয়ে
তুমি আরো আরো আরো ধুনো দাও ॥
আরো বেদনা আরো খোঁজ নেওয়া,
স্যার, লাও মোর কত ঠিকানা।
বাইক ছুটায়ে দ্বার টুটায়ে
মোরে করো ত্রাণ মোরে করো ত্রাণ।
আরো প্রেমে আরো প্রেমে
আমি চুবে থাকি ফ্রিজে নেমে।
সুধাধারে আপনারে
মোরে আরো আরো আরো দাও স্যার ॥

বৃহস্পতিবার, ২৩ মার্চ, ২০১৭

।। আঘাত ।।



ওরে ধর্মোন্মাদের দল!
অনুভূতি তোদের কোথায় থাকে বল
যার আহত হওয়া দোষ!
সেটা কী মায়ের ভরা গর্ভ, নাকি বাপের অন্ডকোষ?
যেখানে ধাক্কা লাগতে মানা-
ধর্ম মানে ধারণ করা, নেই বুঝি তা জানা!
আমরা জানি অনুভূতিদের মনের গভীরে বাস,
ষড়রিপু ঘেরা আবেগ চেতনা, মানবীয় গুণ খাস।
আছে তোদের ওসব কিছু? ওরে তোরা জীবন্ত লাশ!
ধর্মের বিষ বিকিকিনি করে জোটাস মুখের গ্রাস।
ধর্ম শেখায় সেবাযত্ন, ধর্ম মানবিকতা,
তোদের ধর্ম হিংসা বিভেদ এক্কেবারে যা তা!
আমার ধর্ম মানব ধর্ম, তোদের সবটা ভুল
পরিচয় যার টিকি আর দাড়ি, সেই ধর্মই চুল।
লোমের ধর্মে নিমজ্জিত, তোরা বেল্লিক বজ্জাত
লোম চুল জানি অনুভূতিহীন, কিভাবে তাতে আঘাত?
ধর্ম তোদের হানাহানিতে, গরু শুয়োরের মাংস
আসলে তোরা সমাজের কীট, আহাম্মকের বংশ।

মঙ্গলবার, ২১ মার্চ, ২০১৭

।। দোষ।।



সমাজের বুকে লক্ষ সমাজ, অন্ধআবেগ চাষ
স্বার্থবিকারে বিবেক বন্ধ্যা, লাশেদের ভীড়ে বাস।

হে কবি!
কাব্যে কি শুধুই প্রেম প্রকৃতি! তার উল্টো পিঠে যে ঘৃণা!
কিভাবে কাব্য জীবন হবে! সমাজদর্শন বিনা?
তাই বারংবারে ঝলসিয়ে উঠে তোমার কলম অসি
চেতনা এখানে পচাগলা লাশ,
সুতরাং তুমিই আসল দোষী।

কেন খোঁজো দাগ আলখাল্লায়, কেন ত্রিশূলের খন্দ
কেন তুমি নও আমাদের মত, চেতনার ঘরে অন্ধ?

হে কবি!
তুমি রাজরোষে ডোবো আঁধার কাব্যে, লিখে নৈতিক হাহাকার
কেন তুমি শুধু সত্য দেখাবে, তোমার সাকিন কারাগার!
তুমি শুধু লেখো সাজানো কথা, রূপকথা রাশি রাশি
কেন তুমি লেখো বিবেকের কথা!
সুতরাং তুমিই আসল দোষী।

তোমার ভাবনার ঘরে দৈনন্দিন, এমনই মূর্তি গড়ো
লাঞ্ছিত বোবা জাতির মুখে বারুদের ভাষা ভরো।

জীবিত মননে ছবি আঁকো কবি, যার নেই কোন প্রতিকল্প
তফাৎ গড়েছো শিরদাঁড়াতে, যেথা চাটুকারিতাই শিল্প।
কানা বিশ্বাস প্রসবিত করে, শুধু মৌলবাদ আর রোষ
কবি, তুমি উপশম দাও কলম পথ্যে,
নতুবা তোমারই সব দোষ।

বুধবার, ১৫ মার্চ, ২০১৭

মন ও বিশ্বাস


 

মানুষ।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব ও বুদ্ধিমান। প্রতিটি মানুষের নিজের মত করে একটা জীবন সৌন্দর্য থাকে, যেটা মূলত চেতনা, বিবেক, সংবেদনশীলতা, আর আবেগ দিয়ে পুষ্ট। জীবন শুরু হয় অতি অরক্ষিত ও অসহায় অবস্থার মধ্যদিয়ে। সেই পরিস্থিতি থেকে প্রতিনিয়ত জৈবিক বৃদ্ধির সাথে সাথে জ্ঞানার্জনও চলতে থাকে সমান গতিতে। ধীরে ধীরে যার মধ্যে মানবিক ও পাশবিক দুটো ধারাই বিকাশ লাভ করে। যাদের মধ্যে মানবিক গুনের মাত্রা সর্বচ্চো ও সর্বোৎকৃষ্ট মানের থাকে তিনি উচ্চ সামাজিক মর্যাদার অধিকারী হয়ে উঠেন, দ্বিতীয়টা ঘটলে সেক্ষেত্রে তিনি ঘৃণিত ব্যাক্তি হিসাবে স্বিকৃত হন। যেকোন কিছু অর্জন করার জন্য একটি ভিত্তির প্রয়োজন , আর সেই ভিত্তিটির নাম হল বিশ্বাস।

সন্ত ব্যাতিত সকল মানবের জীবন ষড় রিপু দিয়েই ঘেরা। আর এই রিপুর ক্ষুন্নিবৃত্তি শুরুই হয় একটা আশাকে কেন্দ্র করে। প্রশ্ন উঠবে এই আশার উৎস কি? উৎস হল বিশ্বাস। বিশ্বাস হল একটা ভাবনাগত অবস্থান। যেটা সম্পূর্ন মস্তিষ্ক দ্বারা পরিচালিত ও হৃদয় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত মানসিক স্থিতির দুর্দম ও আচ্ছন্নকারি দশা। যেখানে সেই মানসিক দশা, যাবতীয় পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলী তথা সময় ও জীবনের সমান্তরাল গতি সমূহের সত্য বা মিথ্যাকে প্রতিনিয়ত বিচার বিশ্লেষণ করতে দেয়না, তাকেই বিশ্বাস বলে। মানুষ তার অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের উপর দাঁড়িয়ে যে মানসিক সংগঠন তৈরি করে, সেখানে বিভিন্ন ব্যাক্তিত্ব বর্গ, পুঁথিগত জ্ঞান, পরিক্ষালব্ধ জ্ঞান, ব্যাবহারিক জ্ঞান, গবেষণা অর্জিত জ্ঞান, অপরের প্রতি সামাজিক শ্রদ্ধাবোধ, পরিস্থিতি ভেদে তাৎক্ষণিক আচরনের বহিঃপ্রকাশের উপরে ভিত্তি করে নিজেকে তৈরি করে। যেটা একটা পৃথক মৌলিক স্বত্তা। এই মৌলিক স্বত্তাকে যাহা সন্তুষ্টি প্রদান করে তাকেও বিশ্বাস বলে।

বিশ্বাসের আবাসস্থল মানুষের মন, তাহলে একবার দেখে নেওয়া যাক মনের কার্যপদ্ধতি।   মানুষের মনের দুটো দশা, একটা সচেতন দশা আর দ্বিতীয়টা অবচেতন দশা। আমরা যাকিছু দেখি বা শুনি সেগুলো সচেতন মনে, আর সেগুলো আমাদের মস্তিষ্কের ধূসর স্মৃতিপাত্রে সঞ্চিত ও সংরক্ষিত হতে থাকে। সেই স্মৃতিপাত্রের ক্ষমতা থাকেনা সেগুলির সত্যমিথ্যা যাচায়ের। যে অভ্যাসের স্মৃতিগুলো বারংবার করে সঞ্চিত হতে থাকে, আমাদের অবচেতন মনে সেগুলোর একটা স্থায়ী কাঠামো তৈরি হয়। তখন কোন দ্বিতীয় ভাবনাকে সচেতন মন উপস্থাপন করলেও , অবচেতন মন তাকে প্রত্যাখ্যান করে সযত্নে। কারন বারংবার পুনরাবৃত্তি হয়ে চলা ঘটনাকেই আমাদের অবচেতন মন সত্য বলে ধরে নেয়, এবং তার ভিত্তিতেই একটা আদর্শ তৈরি করে। মানব চরিত্রের যাবতীয় অভ্যাসগুলো আসলে পরিচালিত হয় অবচেতন মনের নেতৃত্বে।  যেমন যেকোন নেশা, যথা তামাকসেবন বা মদ্যপান বারংবার করে অভ্যাসিত হয়ে চললে আমাদের অবচেতন মনে তার একটি প্রতিভূ তৈরি হয়, এবং সেটাকেই সত্য বলে মেনে নেয়। এমতাবস্থাতে ওই সত্যকে, সচেতন মনের অর্জিত নতুন কোন সত্য, বা সেই পূর্ব সত্যের মিথ্যাচার সম্বন্ধীয় যাবতীয় সতর্কবার্তাকে ফুৎকারে উড়িয়ে দেয়। এটাই আসলে বিশ্বাস। অতএব আমাদের চরিত্রের অভ্যাস নির্মিত হয় আমাদের অবচেতন মনের নিয়ন্ত্রণে। অনুশীলন তথা পুনরাবৃত্তিই আমাদের চরিত্র গঠন করে।     

বিশ্বাসের জন্মদাতা সচেতন মন, কিন্তু বাসস্থান অবচেতন মনে। বিচিত্র কল্পনা, দর্শন আর দীর্ঘসময় যাবৎ সেই বিশ্বাসকে অবচেতন মনের জমিতে কর্ষন করে লালন পালন করতে করতে একসময় সেই জন্মদাতা সচেতন স্বত্তাকেও গ্রাস করে, এবং সম্পূর্ন জীবনের দখল নিয়ে নেয় সেই বিশ্বাস। আত্মহত্যা আসলেই এই ঘটনারই কার্যকরী রূপ। কোন একটি পরিস্থিতিকে আমরা যখন আমাদের অর্জিত জ্ঞান ও মেধার পরিস্ফুটন দ্বারা বিশ্লেষনে অক্ষম হই বা বিশ্লেষনে মানসিক ভাবে কোন শক্তি দ্বারা বাঁধা প্রাপ্ত হই তাকেও বিশ্বাস বলে। ঈশ্বরবাদের ধারনার শুরুও সম্ভবত এই পরিসর থেকেই। মানুষ শিশুকাল থেকে সে সমাজে বড় হয়, যেখানে জ্ঞানলাভ করে, যাকিছু চোখে দেখে, কানে শোনে, সেটাই মননে প্রতিফলিত হয়ে একটা ভাবমূলক বিমূর্ত ধারনার জন্ম দেয়, তাকেও বিশ্বাস বলে। এই বিশ্বাস গড়ে উঠতে অনেকটা সময় নেয়, কিন্তু এক লপ্তেই সেটা অবলুপ্ত হওয়ার ক্ষমতা রাখে।

আমরা মানুষ স্বনির্ভর নই। দুএকটি ক্ষেত্র ব্যাতিত প্রায় সকল ক্ষেত্রেই আমরা কারো না কারোর উপরে নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতা থেকেই আমাদের মধ্যে বাকিদের সাথে একটা আদানপ্রদানের সম্পর্কসুত্র তৈরি হয়। দীর্ঘস্থায়ী এই লেনদেন একটা ভরষার স্থান তৈরি করে। মানুষের চাহিদা আর তার বাস্তবায়ন যদি সেই ভরষাস্থলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে তখন সেই ব্যাক্তি, বস্তু, বা আদর্শকে মানুষ ধ্রুবক হিসাবে মেনে নেয়। তখন সেই ধ্রুবককে ঘিরে স্বতঃস্ফুর্ততাকে মানুষের বিশ্বাস বলে অবহিত করি। সচেতন মনন যে কোন পরিস্থিতিকে সকল সময় পুঙ্খানুপুঙ্খ যুক্তি দিয়ে বিচার করে, ব্যাক্তি, বস্তু বা আদর্শকে। এখানকার লেনদেনে অর্ধাঅর্ধি লাভক্ষতির সম্ভাবনা সেটা সকলেই মানি ও জানি। কিন্তু অবচেতন মনের কোটরে লালিত বিশ্বাস যদি কোথাও সামান্যতমও পরাভুত বা আঘাতপ্রাপ্ত হয়, সেখান থেকেই হতাশার সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে প্রথম ফাটলটা দেখা যায় আত্মবিশ্বাসে।

যেকোন বিশ্বাসের মূলটা শুরু হয় সৃজনশীল ও কল্যাণমূলক উদ্দেশ্যে, নিজস্বার্থে ও পরার্থে। মানুষ তার নিজস্ব বিশ্বাসকে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সুদৃঢ়ভাবে মূল্যবোধ রূপে উপস্থিত করে থাকে। মূল্যবোধ এমনই একটি গুন, যার দ্বারা সমাজের বুকে ব্যাক্তি তার স্বকিয়তার ছাপ রেখে যেতে সক্ষম। নিজের অতুল্য বৈশিষ্ঠকে প্রতিষ্ঠা দান ও বাকিদের থেকে স্বতন্ত্রতা রক্ষিত করে এই মূল্যবোধ। এই মূল্যবোধের কাঠামোটাই তৈরিহয় ব্যাক্তির দর্শনের উপরে ভিত্তি করে, আর দর্শনের ভিত্তি সেই বিশ্বাস ও তার সার্থক বাস্তব প্রতিফলন। প্রতিটি মানুষ তার বিশ্বাসকে অন্যের মধ্যে সঞ্চারিত করতে ভালবাসে, বা সেই বিশ্বাস দ্বারা অন্যকে প্রভাবিত করে থাকে। সেই বিশ্বাসবাদের সার্থক প্রতিফলনে যদি বৃহত্তর সমাজের প্রতিচ্ছবি প্রতিভাত না হয়, তখন সেই বিশ্বাসের উপরে অভিঘাত এসে পরে। অবচেতন মন সত্যমিথ্যার পার্থক্য নিরূপণ করতে অক্ষম। যার জন্য জীবনের কোন একটি সময়কালে গৃহীত বিশ্বাস , একটি নির্দিষ্ট সময়ের পথ অতিক্রান্তে সেটাকে বড্ড জোলো মনে হলেও অবচেতন মন সেটাকে অগ্রাহ্য করে পূর্বতন ধারনাকেই মান্যতা দিয়ে থাকে, এই ধরনের বিশ্বাসকেই বলা হয় খেয়ালি বা উদ্ভট কল্পনা।

মহামানবেরা তাদের জীবন দর্শন দিয়ে সমাজের বুকে নানান ধরনের পৃথক পৃথক বিশ্বাসের জন্ম দিয়ে গেছেন। যেগুলোকে কেন্দ্র করে ধর্ম, বিজ্ঞান, রাষ্ট্র, পরিবার ইত্যাদি ছোট থেকে বড় নানান ধরনের গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছে। এই বিশ্বাস ঘরানা গুলোর নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান ঘিরেও চলে নিরন্তর প্রতিযোগিতা। ভবিষ্যতের উন্নতির জন্য মানবের নিজের ক্ষমতা, জ্ঞান, প্রভাব ও বিচক্ষনতার উপরে বিশ্বাস রাখতে হয়, এই বিশ্বাসকে আত্মবিশ্বাস বলা হয়। আবার এই আত্মবিশ্বাস যখন সচেতন মনের অনুভুতিকে উপেক্ষা করে, নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যত হয়, সেটাকেই অহংকার বলে ধরা হয়। এ ক্ষেত্রে শেষমেশ নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী রূপে প্রকট হতে হয়। তিনিই সমাজের প্রভাবশালী ব্যাক্তি, যিনি নিজের মধ্যে থাকা বিশ্বাসকে জনসমাজে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।  

বিশ্বাস আঘাতপ্রাপ্ত, আজকের সমাজে এটা একটা বহুলপ্রচলিত শব্দ। দেখা যাক এটি কিভাবে সম্পাদিত হয়। অবচেতন মন প্রায় সর্বদা ব্যাক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই অবচেতন মনের শক্তির কেন্দ্রস্থল হচ্ছে আমাদের মস্তিষ্কের স্মরণ কোষিকাগুচ্ছ। এরা সেই স্মৃতিশক্তি, যারা শুধুই সংরক্ষিত হয়, যাদের কোন অতীত নেই, বর্তমান নেই, ভবিষ্যতও নেই। শুধু ফিকে হয়ে যাবার ক্ষমতা রয়েছে। আর বিশ্বাসের ও দর্শনের বাস ওই স্মৃতিকোষের আস্তরনে ও পরতে পরতে।  আমরা যা কিছু দেখছি যা কিছু শুনছি, সচেতন মনের আরশিতে সকল কিছুই সেটা প্রতিফলিত হয়ে চলে। সচেতন মন সময়ের সারণির সাওয়ারি। যার জন্য প্রতিমূহুর্তেই দৃশ্য, পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট বদলে চলে, এখানে বিরাম বলে কিছু নেই। কিন্তু অবচেতন মনের কোন কাল জ্ঞান নেই, আর রয়েছে ভাবনার জন্য অফুরন্ত সময়। সকালের কোন ঘটনা তাৎক্ষণিক ভুলে গেলেও, দেখা যায় রাত্রিতে শুয়ে মনে মনে সেটারই বিচার বিশ্লেষণ করে চলেছি। আমাদের অন্তরের বিশ্বাসের ছাকনিতে যাকে চুলচেরা বিচার করে থাকি। যেখানে একটা মানসিক টানাপোড়েনের পরিস্থতির উদ্ভব হয়, যাকে মানসিক পীড়ন বা টেনসন বলে। এই পীড়ন যখন সহ্যের সীমা অতিক্রম করে যায়, তখন সেই নব্য চিন্তাধারাকে মেনে নিতে না পারার দরুন ও নিজেকে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ না খাওয়াতে পেরে, অন্যের কাছে বা নিজের কাছেই পরাজিত বোধ হয়। এটাকেই বিশ্বাসের ঘরে আঘাত বলে ধরা হয়। হিংসা, ক্রোধ, বৈরিতা ও সংহার প্রবৃত্তির বোধ মননে জাগ্রত হয় ও চরিত্রে ফুটে উঠে।

বিশ্বাস বদল হয়। কারন ওই আগেই বলা হয়েছে, অবচেতন মনের গহিনে কোন কালজ্ঞান নেই। অবচেতন মনের কোন ক্ষমতা নেই কোন প্রকারের প্রভাবকে শনাক্ত করা। যে ঘটনাটা এই মুহুর্তে আপনার মনের ভিতরে আপনাকে ব্যাস্ত রেখেছে, সেটাই আপনার অবচেতন মনের কাছে একমাত্র বাস্তব। সচেতন মনের দৃষ্টিতে আজকে কোন একটা দর্শন, আপনার জ্ঞানের ঘরে বাতি প্রজ্বলিত করে দিল, দেখা গেল তার সাথে অনেক পুরাতন ঘটনা স্মৃতিপটে নতুন করে ভেষে উঠল। যেমন শৈশবের অশরীরি অস্বিত্ব যতটা ভয় প্রদান করত, মধ্য বয়েসের কোন বিশেষ ঘটনাতে তার স্বরূপ উন্মোচন করলে সেই পুরাতন শিশুশুলভ বিশ্বাসের কথা স্মৃতিতে জেগে উঠে, ও স্বনিয়মেই বিশ্বাসের পরিমার্জন ও পরিবর্ধন ঘটে যায়। মানুষ ঘুমের মধ্যে যে স্বপ্ন দেখে সেটাও এই অবচেতন মনেরই কারসাজি। যে বিশ্বাসের প্রকোপে ব্যাক্তি বিভোর বা আতঙ্কগ্রস্থ, সাধারনত সেই ধরনের স্বপ্নই মানুষ দেখে থাকে। মজার বিষয় হল , যে বিশ্বাসের দরুন স্বপ্ন দেখা, সেই স্বপ্নকেই আবার বিশ্বাস করতে শুরু করে দেয়। যার জন্য  বিশ্বাসের কোন অন্ত নেই। সচেতন মন যুক্তি নির্ভর, হ্যাঁ বা না এ উত্তর দিয়ে দেয়, এবং ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা আছে। কিন্তু অবচেতন মনে সঞ্চিত বিশ্বাসের সাথে যুক্তির সমানে দ্বন্দ্ব চলে কারন তার ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা নেই। বলাই বাহুল্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিশ্বাস বিজয়ী হয় মনের ঘরে। 

আবার ফেরা যাক সেই রিপুতে। বিচার ক্ষমতার গুণে সচেতন মন জানে নিজের এক্তিয়ার কতটা আর কতটা তার প্রাপ্য। কিন্তু অবচেতন মনের লালিত বিশ্বাস সেটাকে স্বিকার করতেই চাইনা। একটা সংঘাতের স্থান তৈরি হয়। আর যারা এই সংঘাত এড়াতে চান, তারা ওই বিশ্বাসকে একটা নতুন মোড়কে নিজের কাছে পরিবেশন করেন, যাকে অন্ধবিশ্বাস বলা হয়। যে বিশ্বাস কোন তথ্য মানেনা, যুক্তির আশপাশ দিয়ে হাটেনা, বিশ্লেষণ থেকে শতহস্ত দূরে অবস্থান করে, সেই বিশ্বাসই নিশ্চিত রূপে অন্ধবিশ্বাস। আর অন্ধবিশ্বাসে ভর করে সে সংস্কার ও সংস্কৃতি জন্মলাভ করে, তাদের যথাক্রমে কুসংস্কার ও অপসংস্কৃতি নামেই আমরা চিনি। আমাদের সমাজে বহু কিছুর অভাব থাকতেই পারে, কারন এটা সত্য। তবে যেটার অভাব নেই সেটার নাম হল অন্ধবিশ্বাস। কিছু বিশ্বাস যতই ঠুনকো হোকনা কেন, যদি তাতে স্বার্থের আতর মেসানো থাকে, সেখানে তাঁকে নিদেনপক্ষে ঐতিহ্যের নাম দিয়েও বিশ্বাসকে জীবন্ত করে রাখা হয়।

যৌনতা, সংখ্যাগুরু ও লঘু, নাগরিকত্বের বৈধ ও অবৈধতা, কর্ম ও বয়েসের কল্পিত সীমারেখা, সামাজিক প্রভেদ সহ নারী পুরুষের অধিকারের চিরাচরিত ধারনা প্রভুত বিষয়ে আমাদের যুক্তির থেকে আবহমান কাল ধরে চলে আসা বিশ্বাসই প্রাধান্য পেয়ে থাকে। তবেই না অধিকার নিয়ে এতো আন্দোলন। তাহলে এই সমস্যার মূলেও সেই বিশ্বাস।  জীবন যৌবন, দেশ কাল, জাতি ধর্ম, শিল্প কৃষ্টি, সহ প্রতিটি মুহুর্তেই অধিবিশ্বাসে বা অন্ধবিশ্বাসের বাড়বাড়ন্ত। একমাত্র উন্মাদ ব্যাতিত সকল সুস্থ মানুষই সচেতন মনের অধিকারী। সচেতন মন থাকা মানেই দেখা, শোনা, পড়া। যথারীতি এগুলো মস্তিষ্কে সংরক্ষিত হতেই থাকে ক্রমান্বয়ে। অনুশীলিত কর্মকান্ডগুলোর প্রভাবে নতুন নতুন বিশ্বাস জন্মনেয়, পুরাতন কিছু বিশ্বাস খন্ডিত হয় যুক্তির কাছে। কিছু মানুষ বলে থাকেন, তিনি কোন কিছুই বিশ্বাস করেননা। এটাও আসলে সত্যের অপলাপ। হতেই পারে কেও ঝাড়ফুঁক , তাবিক, কবজ, রত্নপাথর, মন্ত্রপূত সুতো বা জল তেলে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু তাতে তার কাঙ্খিত স্বার্থ চরতার্থ না ঘটতেই তিনি নাস্তিক হয়ে গেলেন। আসলে কিন্তু তার ঈশ্বর বিশ্বাসের মৃত্যু ঘটে ঈশ্বর নেই বিশ্বাসের সূচনা হল। আগে সকল কিছুতেই তিনি ঈশ্বর দেখতেন, এখন প্রমান করতে ব্যাস্ত যে কোথাও ঈশ্বর নেই। বস্তত বিশ্বাসের কোন পরিবর্তন ঘটলনা, শুধু বিশ্বাসের দিক পরিবর্তন ঘটল মাত্র। সমাজসংস্কারক গন যুগে যুগে আবির্ভুত হন দশক দশক ধরে চলে আসা ক্ষয়িষ্ণু মুল্যোবোধ যুক্ত বিশ্বাসগুলোকে পূনর্মুল্যায়ন করতে। আধুনিক সমাজের উন্মেষের যুক্তিতে আলোকিত করে সমাজের বুকে চেপে বসা জগদ্দল পাথর সরিয়ে, মুক্ত বাতাস আনয়ন করেন। যেখানে বিষ-শ্বাসের অবলুপ্তি ঘটিয়ে বিশ্বাসের পরিমার্জন ঘটে।     

সোমবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

।। উন্মাদনামা ~ ২৯ ।।

ভালবাসার মানুষটিকে প্রেম দেখানোর অধিকারটা স্বিকৃত, সম্পর্ক নাকি ওটিতেই টেকে। অতএব ভাল থাকতে গেলে শুধুই প্রেমটা থাকলেই হয়। বাকিগুলো ভুলতে হয়, ভুলেও ভুলতে ভুললে হবেনা।
অন্যান্য যাবতীয় মানবিক অনুভুতি গুলো শুধুই ব্যাক্তির নিজশ্ব, তাতে অন্য কারো ভাগ নেই। মনের মানুষটিও সেই দায় নেয়না। তা সে রাগ হোক বা ঘৃনা বা বা লোভ মোহ বা কামনা ও একটু বেশি চাহিদা। তবেই না প্রাক্তন হয়.....
সাথে সাথে যদি মুহুর্তটা মিলে যায় তাহলে সেই মুহুর্তের জন্য অবশ্য ওগুলো সিদ্ধ। "তুমিই আমার সব" কথাটি বলার পরে, সেটাকে সিংহাসনস্থ করে তাকে ঘিরে যাবতীয় ঘটনাক্রম গুলো ঘটে চলে অবশিষ্ট জীবনভর। প্রতি পদক্ষেপে না মানাটা যেন সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার অন্যতম দাবি হয়ে ওঠে।
যন্ত্রনা সওয়ার নাম ভালবাসা হলে, যন্ত্রনার উৎপত্তিস্থল খোঁজার দায় কি এড়ানো যায়? উহ্য করে থাকলে থাকাই যায়, কিন্তু যখন অস্তিত্বের সঙ্কট তৈরি হবে তখন সেই পাকদণ্ডী কে অগ্রাহ্য করে পিছিয়ে আসার পথ থাকে না। তাই সইলে সওয়া যায়, তা বলে তাতে অভ্যস্ত হলে হবেনা, প্রতিকার খোজা দরকার।
কষ্টতে অন্যের প্রবেশে মানা থাকে, কষ্ট প্রকাশ করতে নেই, অনুভুতিকে প্রকাশ্যে এনেছো কি তুমি অশ্লীলতার দায়ে দায়ী। অতএব প্রেম করার আগে একটা ভাল ম্যানেজমেন্ট কোর্স করতে হয় - আবেগকে কিভাবে নিয়ন্ত্রন করবে। অবশ্য সম্পর্ক ভাঙতে ভাঙতে মানুষ এগুলো শিখে যায় থুরি জেনে যায়, কিন্তু শেখে না। কারন শর্ত দিয়ে আর যাই হোক মনের ব্যাবসাতে প্রতিষ্ঠা পাওয়া যায়না, আর গেলেও সেই নিয়ন্ত্রিত- নিয়ন্ত্রন থাকলে সেটা বেশ্যাবৃত্তির থেকে কম কিছু হয়না~ নারী পুরুষ নির্বিশেষে।
প্রেম মানে কি দায়িত্ব পালন?
দায়িত্ব তো চাকুরি করতে হলেও পালন করা আবশ্যিক, নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে একটা ছকে বাঁধা জীবন। প্রেমে মানুষ কি বন্দি হতে চাই? না কি জীবনের সুপ্ত ইচ্ছা ও লুপ্ত আবেগগুলোকে খোলা আকাশে উড়িয়ে দিতে চাই সকলে? ছন্নছাড়া বলেই না প্রেমটা শুরু হয়, তবে আবেগের জয় হয়না।
দায় দায়িত্ব, সমাজ , অক্ষমতা, অভাব, লজ্জা সহ নানা প্রতিবন্ধকতার ভীরে একটু খোলামেলা পরিসর যেটুকু থাকে সেটা তো ভালবাসার মানুষটির কাছেই। তাকে প্রেম করি বলে যদি সকলসময় অধিকার বোধের দাঁড়িপাল্লা হাতে ইঞ্চি মেপে মেপে এগোতে হয় সেই সম্পর্ক আর যাই হোক অনবিল ভালবাসা নয়।
প্রেমে অনিশ্চয়তা থাকবে, পাশাপাশি একটা হিংসাও থাকা দরকার, যে ও আবার আমার থেকে বেশি আমাকে ভালবাসেনা তো? একটা সন্দেহ... যে আমি বোধহয় কম ভালবাসছি ইত্যাদি। কেও আমার মনের মানুষের দিকে আমার দৃষ্টিতে চাইলে ক্ষোভ হওয়াটা সম্ভবত সুস্বাস্থ্যের লক্ষন। শুধুমাত্র কিছু ভাল ভাল পিরিতের কথা বলার জন্য পতিতা পল্লিতে অনেক মহিলা বা পুরুষ থাকেন, যারা বিনিময়ে প্রেম বিলায়। ঝগড়া না হলে ভালবাসাটা সিদ্ধ হয় কি? ভালবাসার মানুষটির জন্য যদি নিজেকে বা তাকে অসুরক্ষিত মনে না হয় কোন একটি মুহুর্তের জন্যও তাহলে সেটা বিনিময় ভালবাসা অথবা সময় নিস্কাষনের মাধ্যম বলেই বিবেচিত হয়।

ভালবাসা......
ভালটাও বাসা, মন্দটাও বাসা, সবটা নিতে পারলে তবেই পরিপূর্ণতা আর সাফল্য।

শুক্রবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

।। সময়ের ভালবাসা ।।


সময়ের ভালোবাসা
***************
প্রতি রাতেই অত্যাচারের মাত্রাটা বাড়ছিল, একটু একটু করে। রাতে নেশা করে এসে শিপ্রা কে ধরে অত্যাচার করাটা অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছে হীরক। মাঝরাত না হলে ঘরে ফেরার নাম নেই, ঘুম চোখে দরজা খুলতে সামান্য দেরি হলেই আর রক্ষে নেই। ফেরার পরেও সেই ল্যাপটপ বা মোবাইলের পিছনে। বাড়িতে শিপ্রার উপস্থিতিটাকে সে যেন মানতেই চাইনা। কোন রকম ছুতোনাতাতে একটা সামান্যতম খুঁত পেলেই, চালু বাক্যবাণ এবং পরিশেষে শারীরিক অত্যাচার। তবুও শিপ্রা চুপ করে শুধু সহ্য করে যায়। আজপর্যন্ত কাওকে স্বামীর বিরুদ্ধে নুন্যতম কোনো অভিযোগ টুকু করেনি, বরং প্রতিবেশিরা হীরকের নামে কিছু বললে শিপ্রা তাদের এড়িয়ে চলে, ঝগড়া করেনা, কারন ওটা ওর চরিত্রে নেই।

অন্য যে কেউ হলে এই পরিস্থিতিতে স্বামীর ভাত খাওয়াতো দূরঅস্ত, উপরন্তু স্বামীকেই জেলের ভাত খাওয়াতো। কিন্তু ওর নাম যে শিপ্রা, হীরকের সামান্যটুকু কষ্ট হবে ওর জন্য, এমন কাজ সে করতেই পারবেনা , কারণ সে হীরককে ভালবাসে নিজের থেকেও বেশি। চার বছরের প্রেমের পর এই বিয়ে, তাদের দুজনের ভালবাসার পরিণতি। আর সেই ভালবাসার নিশানা স্বরূপ ওরা পৃথীবিতে এনেছে জয়ন্তকে, ওদের একমাত্র সন্তান, ক্লাস ফাইভে উঠেছে এবছর। রোজকার এই অশান্তি ছোট্ট জয়ন্তের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করলেও, সন্তানের ভবিষ্যৎ এর কথা চিন্তা করে হীরকের শোধরানোর কোন লক্ষনই নেই।

গার্লস স্কুলের কৃতী ছাত্রী শিপ্রা আদক, চারদেওয়ালের কড়া শাষন আর অভিভাবকদের ঘেরাটোপে থাকা হৃদয়ের আসনে কাওকেই প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি এযাবৎ। গুটি পোকা পাখা মেললো কলেজে ভর্তি হয়ে, ক্লাসেরই সবচেয়ে বিচ্ছু ছেলেটির প্রেমে পরে গেল সে। হীরক মিত্র, সে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র, শিপ্রা ইতিহাস অনার্স, কিন্তু কম্পালসারি বাংলা আর ইংরাজি ক্লাস দুটো একসাথে হতো। প্রেম জমার জন্য অবশ্য সেটুকুই যথেষ্ট ছিল, কিম্বা হয়তো নিয়তির বিধান। হীরক কলেজের অন্যতম হ্যান্ডসাম ছেলে, মেয়েরা ওর সাথে ঢলাঢলি করত, মুখে না বললেও শিপ্রা অন্তরে এগুলো দেখে খুব কষ্ট পেত। সে জানতনা হীরক যাই করুকনা, সেও এই শান্তশিষ্ট সুন্দরীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। এভাবেই একটি বছরের মধ্যে একে অন্যকে চোখে হারাতো। শিপ্রা আজ ভাবে, সেই দিনের হীরক আর আজকের হীরকের মধ্যে যেত কত লক্ষ আলোকবর্ষের ফারাক, মেলাতেই পারেনা মানুষটাকে। তবুও শিপ্রা জানে আর মানে সে এই মানুষটাকেই ভালবেসেছি, আজও বাসে, আগামিতেও তাকেই ভালবেসে যাবে।

মারাকাটারি সুন্দরী বলে যে ব্যাপারটা আছে সেটা শিপ্রার মাঝে কখনই ছিলনা। গমরঙা মেদহীন শরীরে একটা সপ্রতিভ মুখ, উজ্জ্বল দুটো চোখ, টিকালো না হলেও নাকটা খুব কিউট, পাতলা গোলাপি ঠোঁট, হাসলে দাঁতের মাড়ি দেখা যায়, অপূর্ব সেই হাসি। চোখের ভ্রু দুটো একে অন্যের সাথে মিশেছে কপালের মধ্যস্থলে, আর মন্ডপের প্রতিমার মত একমাথা কালো কোঁচকানো চুল। যেকোন পোষাকেই শিপ্রাকে এতো মানায় যে ছেলেরা ওর ওই ক্যারি করার ক্ষমতাতেই প্রেমে পরে যায়। খুব কম কথা বলাটা ওর চারিত্রিক গুন। হীরকও সম্ভবত এই আকর্ষনেই শিপ্রার কাছাকাছি এসেছিল। সেই সময়ে হীরকই ছিল একমাত্র বক্তা আর শিপ্রা শ্রোতা।

এই প্রেমের কথা বাড়িতে বলার হিম্মত শিপ্রার কখনই ছিলনা। অথচ গ্রাজুয়েসনের ফাইনাল ইয়ার শেষ হওয়া ইস্তক যেই না ওর বিয়ের জন্য বাড়ি থেকে সম্বন্ধ খুজতে শুরু করল, এই মুখচোরা মেয়েটাই ভিতরে ভিতরে না বলতে পারার যন্ত্রনাতে পুড়তে লাগলো। আর সেই আগুন থেকেই শক্তি অর্জন করে ফেললো। কিন্তু সবার আগে জানা দরকার হীরক কতটা প্রস্তুত!

- হীরক , আমার বাড়ি থেকে বিয়ের জন্যে সম্বন্ধ দেখছে। এক জায়গায় প্রায় ঠিক হব হব, পাত্র কোনো একটা ব্যাঙ্কের ম্যানেজার। কি করি বলোতো? তোমাকে ছাড়া আমি অন্য কারোর হবনা, এটা আমার পন, এখন আমি কি করব হীরক!! আমাকে উপাই বলো, তোমাকে বাদ দিয়ে আমি থাকতে পারব না...
- অনেক বড় সিদ্ধান্ত নেবার সময় এটা শিপ্রা। তুমি আমাকে কতটুকু ভালবাসো? কতটা কি করতে পারবে তোমার হীরকের জন্য!!
- কেন! কোন অবিশ্বাস আছে কি? তাকাও আমার চোখের দিকে, মুখে কি না বললেই নয়? তুমি কি জানো না যে, তোমার শিপ্রা তোমাকে তার নিজের জীবনের থেকে বেশ চায়। তুমি একবার বলো, আমি সব ... সব কিছু করতে পারি তোমার জন্য, শুধু বলো কি করতে হবে। তোমাকে আপন করে রাখার জন্য আমি সব কিছু করতে রাজি, সব কিছু।
- তাহলে আমার সাথে এই মুহুর্তেই চলে চলো, পালিয়ে যায়। নাহলে বেকার একটা কলেজ ছাত্রের সাথে তোমার পরিবার বিয়ে দেবে কেন বলো!
- পালিয়ে বিয়ে?
- সেটা ছাড়া কোনো উপায় আছে কি? থাকলে সেটা বলো, আমিও তোমার জন্য সেটা করতে প্রস্তুত...
তারপর আর ভাবাভাবির অবকাশ ছিলনা, সেই রাত্রেই সংসারের সকল সম্পর্ককে অগ্রাহ্য করে, শিপ্রা হীরকের হাতে ভরষার হাত রেখে নতুন জীবনে খোঁজে পাড়ি লাগায়।
কয়েক বছর চরম আর্থিক টানাটানির পর হীরক একটা সরকারি চাকরিও জুটিয়েছে, শিপ্রাও একটি নামি ইংরাজি স্কুলের দিদিমনি, আর্থিক অবস্থা যথেষ্ট মজবুতই। নির্ঝঞ্ঝাট জীবন চলছিল, দুশ্চিন্তার কোন বলিরেখাটুকুও ছিলনা। ঠিক তিন বছরের মাথায় মা হবার খবরটি, শিপ্রা হীরককে দিতেই সে আন্দন্দে পাগল হয়ে গেল। কত স্বপ্ন দেখা ওই ভবিষ্যতের অতিথিকে ঘিরে। এরপর একদিন শিপ্রার এই খবর তার মায়ের কাছে পৌছালে মান অভিমান রাগ প্রদর্শনের পর্ব মিটিয়ে, সেই ক্রিটিক্যাল মুহুর্তে তাঁরা শিপ্রাকে বাড়ি নিয়ে গেল। যদিও হিরকের পরিবার বিয়েটা মেনে নেয়নি। তারপর থেকে হীরক যেন কেমন একটু একটু করে বদলে যেতে লাগলো, শিপ্রার অজান্তেই।

সন্তান জন্মের সেই সুখমুহুর্তেও হীরক যেন কেমন উদাসীন। সারাক্ষণ যেন কিছু একটা ভেবেই চলেছে, সদাহাস্য হীরক যেন রাগের সমার্থক হয়ে যাচ্ছে, এটা শিপ্রার চোখে এড়ায় না। জগতের নিয়মেই শিপ্রা ছোট বাচ্চার যত্ন নেওয়াতে ব্যাস্ত থাকতো, হীরক কখনও সেই সুখানুভূতির অংশীদারি হতে পারেনি। শিপ্রা বুঝে উঠেনা, তার ভুলটা ঠিক কোথায়! সে সংসার স্বামী পুত্রকে আরো বেশি সময় দেওয়ার জন্য ওই সুন্দর চাকুরিটাও স্বেচ্ছায় জলাঞ্জলি দিয়ে দিল।

শিপ্রা স্বামীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে অনেক বার বিফল আত্নহত্যার চেষ্টাও করেছে। কিন্তু নিঃপাপ শিশুটির মুখের দিকে তাকিয়ে আর এগোতে পারেনি সে। ছেলে নিয়ে যে নিজের বাবার বাড়িতে যাবে সেই উপায়ও নেই, কারন সে সকলের মতকে অগ্রাহ্য করেই হীরককে বেছেছিল। আজ সেই সুখের কুঠিতে শনির দৃষ্টি পরেছে। তাছারা হীরককে সে কার কাছে রেখে যাবে!


শিপ্রা ভাবে, প্রেমেরও কি কোন এক্সপেয়ারি ডেট হয়? শিপ্রার বাবা-মা এর সাথে নতুন করে আসাযাওয়াই কি হিরকের এই রাগের কারন! সে কি শিপ্রার সাথে এই পারিবারিক মিলনকে মেনে নিতে পারছেনা! হীরক কি কোন অন্য মেয়ের প্রেমে পরেছে! শিপ্রা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, যদি হীরকের ক্ষেত্রে সেটাই ঘটে থাকে সেটা মেনে নেওয়ার জন্য সে সম্পূর্ন তৈরি। সেভাবেই নিজেকে বুঝিয়ে নিয়েছে। কারন সে হীরকের স্বত্তার সাথে প্রেম করে, হীরকের ভালটাকে সে এতোদিন মেনে নিতে পারলে আজ যখন কিছুট খারাপ হচ্ছে সেটা কেন সে মেনে নেবেনা? সে তো হীরকের সুখ চায়, হীরকের শান্তি চায়। এই উন্মাদ হীরককে কি সে চেয়েছিল? কোন পিতা কি সন্তান কে নিজের প্রতিদ্বন্দী ভাবতে পারে? যে তার জন্যই আজ শিপ্রা হীরকের জীবন থেকে দূরে সরে গেছে। না না শিপ্রা এ কথা আর বেশি দূর ভাবতে পারেনা, এক তীব্র পাপবোধ তাকে পিষে দেয়, সন্তানটা ওদের দুজনের। সে মা হলে হীরক পিতা, নিশ্চই সেও ততটাই মমত্ব দিয়ে অপত্যকে স্নেহ করে ভালবাসে যতটা শিপ্রা।

সে এই হীরকের জন্যই পৃথিবীর সকলকে অস্বিকার করেছিল, হীরকও তাই। কিন্তু আজ শিপ্রা অসহায়, সব মেনে নিতে রাজি, পুনরায় মা বাবার সাথে সম্পর্ক চ্ছেদ করতে রাজি, এমনকি হীরকের জীবনে চলে আসা দ্বিতীয়- তৃতীয় চতুর্থ সব নারীকেও নির্ধ্বিধায় মেনে নিতে রাজি, শুধু সে নিরুপায় জয়ন্তের ক্ষেত্রে। তাকে সে ছারতে পারবে না। কোন শর্তেই সে জয়ন্তকে কাছছারা করতে পারবেনা। এর পরেই মনে আসে ওর নিজের বাবা মায়ের কথা, সেও তো তাদের সন্তান, তাহলে তাদের অগ্রাহ্য করে এতদিন থাকাটা তাদেরকেও ঠিক ততটাই কষ্ট দিয়েছে, যতটা সে জয়ন্তকে ছারতে হবে ভাবতেই যন্ত্রনা পায়। কিন্তু সে হীরককেও ছারতে পারবেন।

এ এক অদ্ভুত টানাপোরেন, শিপ্রা কোনো মুক্তির সন্ধান খুঁজে পায়না সামনে। তার প্রেম মোটেই কমেনি, বরং বেড়েছে। আগে সে শুধুই হীরককে চাইত, আজ হীরকের সন্তানকে ভালবাসে, হীরকের যদি অন্যকোন প্রেম থাকে , মনেমনে তাকেও নিজের মনে করতে শুরু করেছে, এমনকি হীরকের এই অত্যাচারকেও বড় ভালবেসে ভেলেছে।

এটা আমাদের সমাজের অনেক মেয়ের জীবনের ঘটনা, যাদের নাম শিপ্রা না হয়ে হয়ত মালা, লীলা, রেখা বা শ্রেয়সী। হীরকের দল বোঝেনা, হিরকদের শিপ্রারা বড্ড ভালবাসে, যেটা তাদের ধারনারও বাইরে নিজের থেকেও বেশি।

শিপ্রাদের জন্য থাকে অনন্ত অপেক্ষা, আর চোখের জল, একরাশ হারিয়ে ফেলার ভয়ের আতঙ্কে ভালথাকার অভিনয়, সম্বল বলতে একটা দুমরে মুচরে যাওয়া প্রেমে পরিপূর্ন একটা হৃদয়। অমুল্য হৃদয়।

উন্মাদ হার্মাদ

বুধবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

ছড়া কাব্য - ফুলটাইম স্ট্রাগলার


  

প্ল্যানহীন এই জন্মকথা, অভাগার আখ্যান;

পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্র, আকাঙ্ক্ষার মাচান

ডাক্তার উকিল না হলে যে জীবন ছাখার;

তাই- পার্টটাইমে মানুষ হলাম, ফুলটাইম স্ট্রাগলার


প্রাইমারিতে ভর্তি হলেম, দারুণ মজার থান;

অ আ ক খ, নামতার সাথে জুটল হিন্দি গান

পড়াশোনায় অশ্বডিম্ব, জুটতো উদোম মার,

পার্টটাইমের সাক্ষরতায়, ফুলটাইম স্ট্রাগলার


হাই স্কুলে প্রেমও এলো, গোঁফ গজানোর সাথে;

উত্তেজনার স্বপ্ন যাপন, নিশুত রঙিন রাতে

জুটলো না কেউ চেষ্টা করেও, একতরফাই সার;

পার্টটাইমে প্রেমিক হলাম, ফুলটাইম স্ট্রাগলার


চাষ গুটালো পড়াশোনার, ভাবলাম গেল দায়;

সর্বক্ষণ আড্ডা খেলা, আমাকে কে পায়!

ঘাড় ধরে বাপ দিল বিয়ে, রাজ্য পগারপার;

পার্টটাইমে টোপর পড়ে, ফুলটাইম স্ট্রাগলার


বছর যেতেই মেয়ের বাবা, শ্রীময়ী গার্জেন;

রৌদ্ররসের তানপুরাতে বিষাদী তানসেন

পাঁচবছরে তিনটি জাতক, ভরপুর সংসার;

পার্টটাইমের বাবা হলাম, ফুল টাইম স্ট্রাগলার


ব্যবসা পেলা উত্তরাধিকার, রমরমে ব্যাপার;

কাজের চেয়ে কাব্য আসে, ভীষণ চমৎকার

হিসাব খাতার পাতা জুড়ে রূপকথা বাহার;

পার্টটাইমের বণিক সেজে, ফুলটাইম স্ট্রাগলার


প্রেমও এলো অসময়ে, পরকীয়ার বেশে;

ভাসিয়ে নিল আবেগ বিবেক, নিষিদ্ধতার দেশে

মাঝ নদীতে হাবুডুবু দুই দিকে দুই পাড়-

পার্টটাইমের ডুয়েল জিতে, ফুলটাইম স্ট্রাগলার


রাত্রি জেগে কলম ভাঙি, নতুনত্বের খোঁজে;

ভাবনারা সব জট পাকালো, নেই বিদ্যার গোঁজে

ছন্দ মিলে গদ্য লিখি, পদ্যে হাহাকার-

পার্টটাইমের কবিও হলাম, ফুলটাইম স্ট্রাগলার


না পারলাম মানুষ হতে, না হলেম যে ব্যবসায়ী;

না পারলাম কবি হতে, স্বত্তা ধরাশায়ী

পার্টটাইমের চক্করেতে মুশকিলের কাহার;

অনটনের উদ্যোগপতি, ফুলটাইম স্ট্রাগলার

 


তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...