বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২০

ভুলের নাম যখন মানচিত্র



আকার প্রকারে বৃহৎ মানেই কি- শক্তি ও ক্ষমতা প্রদর্শন করে?
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে মানচিত্র একটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম, ছোট বড় যেকোনো ভ্রমণে আমাদের যাত্রাপথ পরিচালিত হয় এই মানচিত্র দ্বারা। বিভিন্ন ভূ-রাজনীতি এবং পরিবেশ সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে একটা দ্বিমাত্রিক রূপ প্রদান করে এই মানচিত্র। মানচিত্র দেখা আসলে একটা নেশাও বটে, এটা মাননীয় সুব্রত মণ্ডল দাদার সুত্রে আমার পাওয়া, সেই মত সময় সুযোগ পেলে ম্যাপে ঘাঁটাঘাঁটি করতে ভালই লাগে। ছোটবেলায় এ্যাটলাসের মানচিত্র বই দেখতাম, পরে বাঁধানো দামি ডায়েরী গুলোর ভিতরে সুদৃশ্য রঙিন মানচিত্র আঁকা থাকত, ‘পলিটিক্যাল ম্যাপ’ ইত্যাদি যেগুলো ভীষণ কৌতূহল সৃষ্টি করত। নতুন শতকে পদার্পন করার কিছুদিনের মধ্যেই মোবাইলে মানচিত্র এসে যাওয়াতে ভীষণ সুবিধা হয়ে গিয়েছিল- পৃথিবীকে বুঝতে।
ঠিকিই চলছিল, কিন্তু গোল বাঁধল অন্যত্র। ভাইরাস ও ‘আর্টিক্টের বরফ’ শীর্ষক একটা প্রবন্ধ পড়তে গিয়ে গ্রীনল্যান্ডের আয়তন দেখছিলাম, দেখি সাড়ে একুশ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার তার আয়তন, ভারতের আয়তন সম্বন্ধে কোথাও একটা পড়েছিলাম বলে সেটাও মগজে ছিল- পৌনে ৩৩ লক্ষ বর্গকিমি। এই গণিতের হিসাবে দেড়খানা গ্রিনল্যান্ড ভারতে অনায়াসে ঢুকে যাবে, কিন্তু মানচিত্রে দেখে থ হয়ে গেলাম- দেখি ৮-১০ খানা ভারত গ্রিনল্যান্ডের মাঝে অনায়াসে ঢুকে যাবে। ঘ্যাঁটে ঘ…
তারমানে আমাদের মানচিত্র ত্রুটিপূর্ণ? আজ্ঞে হ্যাঁ- বিশ্বের সর্বাধিক স্বীকৃত যে মানচিত্র ‘মার্কেটর ম্যাপ’, আমরাও যেটা অনুসরণ করি, তাতে চিত্রিত অধিকাংশ দেশেরই আকার-আয়তণ মোটেই ততটা নয় যতটা আমাদের দেখায়, বিশেষ করে উত্তর গোলার্ধের উপরের দিকের দেশ সমূহ। এটা নিশ্চিত হাস্যকর রকমের ভুল, কিন্তু আজকেও এটাকেই বয়ে নিয়ে চলেছে সমস্ত ডিজিটাল মানচিত্র কোম্পানিগুলো।
আচ্ছা খুলেই ফেলুন গুগুল মানচিত্র, দেখুনতো গ্রিনল্যান্ডকে কত্তবড় দেখাচ্ছে। এবারে তার পা বরাবর নিচে গিয়ে দেখুন, বেচারা লাতিন আমেরিকা কেমন ছোটখাটো দেহ নিয়ে সেখানে পড়ে রয়েছে। কিন্তু তথ্য কি বলছে? গ্রিনল্যান্ডের আয়তন সাড়ে একুশ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার আগেই বলেছি, সেখানে দক্ষিণ আমেরিকা ১ কোটি ৯২ লক্ষ বর্গ কিমি- মানে প্রায় ১০টা গ্রীনল্যান্ডের সমান। শুধু তাই ই নয়, রাশিয়া, ইউরোপ, কানাডা, আমেরিকা সব’ই অনেক ছোট ম্যাপে যেমনটা দেখায় তার চেয়ে। বরং আফ্রিকা বা আমাদের ভারত অনেক বড় মানচিত্রে, তাদের তুলনায়।
কানাডার পূর্ব দিকের আলাস্কা প্রদেশ, যা আমেরিকার অংশ; ম্যাপে তার যা আকার, তাতে করে আমেরিকার নিচের দিকের দেশ মেক্সিকোর মত পাঁচ-ছটা দেশ ঢুকে যাবে। এখানেও গণিত বলছে আলাস্কার আয়তন ১৭ লক্ষ বর্গকিমির সামান্য বেশি, সেখানে মেক্সিকো অন্তত আরো আড়াই লক্ষ বর্গ কিমি বেশি।
ইংল্যান্ডের ম্যাপের দিকে তাকান, দেখে মনে হবে খান চার- পাঁচেক ওই মাপের দেশ হলেই তা ভারতের সমান আয়তন হয়ে যাবে- কিন্তু অঙ্কের হিসাবে ইংল্যান্ডের চেয়ে আমাদের ভারত ২৫ গুনের চেয়েও বেশি বড় আকারে। প্রকৃতপক্ষে, ‘গ্রেট ব্রিটেন’- জাপান, ফিলিপিন্স, মাদাগাস্কার এবং নিউজিল্যান্ড সহ বেশ কয়েকটি দেশের চেয়ে ছোট। কানাডার আকার নিয়ে আর নাইবা বললাম, যাচ্ছেতাই মাত্রার বুজরুকি সেখানে।
বস্তুত এই মানচিত্র অঙ্কনের পদ্ধতি তাকে ‘প্রজেকশন’ বা প্রক্ষেপন বলা হয়, মানে ধরে নেওয়াই হয় যে এতে ত্রুটি থাকলেও থাকতে পারে। এই মানচিত্রাঙ্কন বিদ্যাকে ইংরাজিতে বলা হয় কার্টোগ্রাফি। ‘মানচিত্র সমীক্ষা ও আন্তঃসরকারী কমিটি’ অনুসারে, মানচিত্র পাঁচ প্রকারের হয়। যথাক্রমে- জেনারাল রেফারেন্স, টপোগ্রাফিকাল, থিম্যাটিক, নেভিগেশন চার্ট এবং ‘ক্যাডাস্ট্রাল মানচিত্র ও তার রূপায়ন’।
• যে মানচিত্র গুলো আমরা নিয়মিত দেখি, পথের দুরত্ব নিরুপন করি, সেগুলো এই ‘জেনারাল রেফারেন্স’ মানচিত্র। একমাত্র এই মানচিত্র পর্বেক্ষন করে বোঝার জন্য বিশেষ নির্দিষ্ট শিক্ষার প্রয়োজন নেই, কিন্তু পরবর্তী মানচিত্রগুলো থেকে তথ্য অনুসন্ধান করতে বিশেষ জ্ঞানের প্রয়োজন হয়।
• অর্ডিন্যান্স সার্ভের ক্ষেত্রে জমির উচ্চতা গভীরতা ইত্যাদি নিরুপনে টপোগ্রাফিকাল মানচিত্র ব্যবহার করা হয়।
• তথ্যগত বিষয়ভিত্তিক টিকা সম্বলিত, যেমন জনঘনত্ব, ভূতত্ত্ব, আবহওয়া ইত্যাদি বিষয়ক মানচিত্রকে থিম্যাটিক মানচিত্র বলা হয়ে থাকে।
• জলপথে একস্থান থেকে অন্য স্থানের দুরত্ব, পথের দুপাশের ভূপ্রকৃতি, বিশেষ বিশেষ স্থানের পরিচিতি, নিমজ্জিত শিলাখন্ড ইত্যাদি বিষয়গুলোর উপরে ভিত্তি করে যে মানচিত্র, তাকে নেভিগেশন চার্ট বলা হয়। যদিও এর সাথে থিম্যাটিক মানচিত্রও জুড়ে তবেই তা নৌ পথের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠে।
• ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জমির মালিকানা সত্ত্ব সম্বলিত চৌহদ্দির বর্ননা যে মানচিত্রে প্রত্যায়িত থাকে তাকে ক্যাডাস্টাল মানচিত্র বলে। আমাদের প্রত্যেকের বাড়ির জমির যে নক্সা, তথা আমিনেরা যে মানচিত্রের সহায়তায় জরিপ করে থাকেন সেটাই এই ক্যাডেস্টাল মানচিত্র। সমস্ত ধরনের মানচিত্রের এটাই বিশদ সংস্করণ যেখানে সুক্ষাতিসুক্ষ বিবরণগুলো লিপিবদ্ধ থকে।
এবারে বিভিন্ন মহাদেশ গুলোর আকার গুলোর দিকে আমরা একটু চোখ বোলায়-
• এশিয়া- ৪ কোটি ৪৬ লাখ বর্গ কিমি
• আফ্রিকা- ৩ কোটি বর্গ কিলোমিটারের সামান্য বেশি
• উত্তর আমেরিকা- ২ কোটি ৪৭ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার
• লাতিন আমেরিকা- ১ কোটি ৯২ লাখ বর্গ কিলোমিটার
• ইউরোপ- ১ কোটি বর্গ কিমির সামান্য বেশি
• অস্ট্রেলিয়া- ৭৬ লক্ষ ৯২ হাজার বর্গ কিলোমিটার
এবারে অনান্য কিছু বড় দেশের আকার আয়তন দেখা যায়-
• রাশিয়া- ১ কোটি ৭১ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার
• কানাডা- প্রায় ১ কোটি বর্গ কিলোমিটার
• চীন- ৯৬ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার
• আমেরিকা- ৯৮ লক্ষ ৩৪ হাজার বর্গ কিলোমিটার
• ব্রাজিল- ৮৫.১১ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার
তাহলে হিসাব গুলো কেমন দাঁড়াচ্ছে! আলাস্কা ছাড়া বাকি আমেরিকা ব্রাজিলের চেয়ে ছোট, চীনের চেয়েও ছোট। অস্ট্রেলিয়া এদের থেকে সামান্যই ছোট, যদিও মাপে তেমনটা নেই। এশিয়া সবচেয়ে বড় মহাদেশ, আর রাশিয়া সবচেয়ে বড় দেশ। ম্যাপের বিশাল অংশ জুড়ে রাশিয়ার অবস্থান, যদিও সেটাও মস্ত ভুল, মানচিত্র দেখলে মনে হবে চীন বাদে ৮-৯টা ‘অবশিষ্ট এশিয়াকে’ রাশিয়ার মাঝে ভরে দেওয়া যাবে। বরং এশিয়া থেকে রাশিয়া আর চীনের আয়তন বাদ দিলে যেটা অবশিষ্ট থাকে সেটা রাশিয়ার সমতুল্য।
সবচেয়ে দৃষ্টিকটু হচ্ছে ইউরোপের অংশে, মানচিত্র দেখলে মনে হবে ইউরোপ আফ্রিকার অর্ধেক। আসলে ইউরোপ আফ্রিকার একতৃতীয়াংশের চেয়েও ছোট। বহু দেশই ‘ম্যাপের প্রজেকশনে’র তুল্যমুল্য আয়তনের চেয়ে অনেকটা ছোট, যথা- আইসল্যন্ড পাঁচ গুণ, ব্রিটেন ৩ গুণ, নরওয়ে ১০ গুণ, সুইডেন ৩ গুণ, ফিনল্যান্ড ৪ গুণ ছোট। বেলারুশ-পোল্যান্ড-কাজাকিস্থান-জার্মানি-ফ্রান্স দেশ গুলো দ্বিগুণ বড় করে দেখানো আছে। এছাড়া ইউরোপের বাকি প্রত্যেকটি দেশ সহ তুরস্ক ও ইরাণও তাদের আসল আয়তনের তুলনাতে একটু বেশি স্থান দখল করে আছে মানচিত্রে।
শুধু কি তাই? আমরা যেটাকে পৃথিবীর উপরের দিক ভাবি, সেই উত্তর দিক আসলে পায়ের দিক। নাসার মহাকাশান এ্যাপেলো-১৭ এর মহাকাশ অভিযাত্রীরা যে ছবি পাঠিয়েছিল তা আমাদের এই সনাতন মানচিত্রটিকে উল্টো করে ধরলে যেমন দেখায় ঠিক তেমন দেখতে। এছাড়া আন্টাকার্টিকা প্রদেশের ম্যাপে কোনো ভূমিরেখর নির্দেশনা নেই, সবটাই বরফাচ্ছাদিত।
প্রতিটি দেশের মানচিত্র, যেগুলো উত্তরমেরুর দিকে রয়েছে আশ্চর্যজনক ভাবে প্রতিটি দেশের আকার, মিছিমিছিই(!) উত্তরোত্তর বৃদ্ধি প্রাপ্ত আয়তনের দিক থেকে। কারন এই মানচিত্র যবে প্রথম চিত্রিত হয়েছিল, সেই ষোড়শ শতকে এই বিপুলা গোলাকার পৃথিবীর বৃহৎ ক্ষেত্রফলের দ্বিমাত্রিক মানচিত্র অঙ্কন করাটাই ছিল একটা চরমতম সাহসী ও বৈপ্লবিক গবেষনাকৃত সম্পাদনা। এই ভুলটা হয়ত তৎকালীন ততটা ত্রুটিজনক না হলেও আজকের দিনে শুধু দৃষ্টিকটু নয়, বরং এটা অপরাধ; যেখানে দুটো পরমাণুর মাঝের সঠিক দুরত্বর নিখুঁত পরিমাপ করা যায়, সেখানে ওই ত্রুটিযুক্ত মানচিত্র কেন থাকবে!
কেন এমন ত্রুটিযুক্ত মানচিত্র অঙ্কিত হয়েছিল?
এই ‘কেন’টা জানতে গেলে আমাদের চলে যেতে হবে পাঁচশ বছর অতীতে, ষোড়শ শতকে। খুব একটা বিদেশ ভ্রমণ না করেও, শুধুমাত্র বিভিন্ন পুস্তক, হরেক ভ্রমণকারী, বনিকদল, রাষ্ট্রকর্তা প্রমুখদের সাথে চিঠি চালাচালি করে, সেই সকল টুকরো টুকরো তথ্যগুলিকে নিয়ে দীর্ঘ গবেষণালব্ধ প্রচেষ্টার দরুন ১৫৬৯ খ্রীষ্টাব্দে তিনি আজকের এই মানচিত্রটির রূপদান করেন জেরার্ডাস মার্কেটর। তৎকালীন ইউরোপের নেদারল্যান্ড রাজ্যের অন্তর্গত ফ্ল্যান্ডার্স কাউন্টিতে জন্ম নেন তিনি; একধারে প্রখ্যাত ভুগোলবিদ তথা ভূ-বিবরণবিদ ও মানচিত্র-অঙ্কন বিশারদ ছিলেন; পাশাপাশি মহাকাশ গবেষণা, জামিতিতেও তিনি ভীষণ পারদর্শী ছিলেন। বর্তমান দিনে এই ফ্লান্ডার্স কাউন্টিটি বেলজিয়ামে অবস্থিত। তিনিই প্রথম দেওয়ালে ঝোলানো বিশ্ব মানচিত্র ও গ্লোব ম্যাপের আবিষ্কার করেন।
ভূগোল, দর্শন, কালানুক্রম এবং ধর্মতত্ত্ব বিষয় নিয়ে মার্কেটর বিস্তর গবেষণা করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৫৯৫ খ্রীষ্টাব্দে তিনি ১২০ পৃষ্ঠার ‘অ্যাটলাস’ নামের সচিত্র মানচিত্র প্রকাশ করেন; এখানে মহাবিশ্বের সৃষ্টির বিবরণ এবং চিত্রিত সমস্ত দেশের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করেন। খ্রিষ্টীয় ধর্মগ্রন্থ, যথা- গসপেল ও ওল্ড টেস্টামেন্ট আধারে মানচিত্র অঙ্কন করেছিলেন। এর পাশাপাশি তিনি একজন দক্ষ কালিগ্রাফার ও ভাস্কর ছিলেন, তৎকালীন প্রতিটি গ্লোব ম্যাপের সকল কিছুই নিজে হাতে বানাতেন ও অঙ্কন করতে।
পঞ্চদশ শতকের মধ্যভাগ থেকেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে কিছু সাহসী মানুষ জলপথে যাত্রা শুরু করেছিলেন নিত্যনতুন দেশ আবিষ্কার করে ভাগ্যান্বষনের জন্য, কেউ রাজার ইচ্ছায় কেউবা বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজে। মজার বিষয় হল, সে সময় খোদ ইংল্যান্ডের নিজেরই তেমন গ্রহণযোগ্য মানচিত্র ছিলনা। এমতাবস্থায় অস্ট্রিয়ার রোমান শাসক তথা স্পেনের রাজা তথা নেদারল্যান্ডের ডিউক ‘পঞ্চম চার্লসের’ একান্ত ব্যাক্তিগত পরামর্শদাতা জিন কার্ন্দোলেত এর কানে আসে এই ভূগোলবিদ জেরার্ডাস মার্কেটর এর কথা। সামুদ্রিক নৌচালন বিদ্যায় পথ নিরুপন করা ও দূরত্বের পরিমাপ করার জন্য তখন কোনো একক মানচিত্র ছিলনা ইউরোপীয় শাসকদের কাছে, যা সর্বজনগ্রাহ্য। এরই সমাধানের জন্য জিন কান্দোর্লেত পৃষ্ঠপোষকতা করলেন মার্কেটরকে, কিন্তু তার চাহিদা ছিল অতি সামান্য- দুটো মাত্র গ্লোব। এই আত্মবিশ্বাসই মার্কেটরকে পরবর্তীতে খ্যাতিমান হতে সাহায্য করেছিল।
পরবর্তীতে জার্মানির জালিচ প্রদেশের শাসক, তার পুত্রের রাজ্যাভিষেক এর প্রাক্কাল্লে একসেট নতুন ও নিখুঁত মানচিত্র তৈরির বরাত দেয় মার্কেটরের কাছে। সেই দুর্মুল্য সংগ্রহটি বর্তমানে ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে সংরক্ষণ করা রয়েছে ‘আটলাস’ নামে। এটার নিরিখেই পরবর্তী বিশ্বের মানচিত্র অঙ্কিত হয়েছিল, যা আজও গোটা পৃথিবীতে ধ্রুবক হিসাবে ববহৃত হয়ে আসছে।
লুথেরিয়ানদের ধর্ম বিশ্বাস মতে উত্তর দিক হল পবিত্র, প্রসঙ্গত মার্কেটর নিজেও একজন লুথেরিয়ান ধর্ম বিশ্বাসী ছিলেন। এজন্যই মানচিত্রে উত্তরদিন উপরের দিকে করেছিলেন তিনি জেনেবুঝেই।
মারকেটরের জীবনীকার, ‘ঘিচ’ এর ভাষ্য অনুসারে, তৎকালীন সকল ইউরোপিয়ান শাসকই চাইত- তাদের দেশগুলো যেন আকৃতিতে বড় করে দেখানো হয়, এতে করে নিজেদের ‘সুপ্রিমেসি’ বা অধিপত্যের দম্ভ দেখানো যেত। সমসাময়িক কালে মারকেটরের কোনো প্রতিদ্বন্দী ছিলনা, স্বভাবতই অধিকাংশ বরাতই তার কাছে আসত; এবং অতিরিক্ত অর্থ সমাগমের অভিপ্রায়ে মারকেটর প্রত্যেকেরটাই এমন করে ‘গোপনে’ বাড়িয়ে দিয়েছিল বলে অনুমান করেন। এছাড়া এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ছোট করে দেখিয়ে দিলে, ইউরোপিয়ানদের নিজেদের দখলীকৃত অংশগুলো আকারে অনেকটা বড় লাগত পরিমাপের এককে, ৫% অধিগ্রহণ করে- দেশে এসে জানাতো ২৫% দখল করেছি, তাতে গৌরব বাড়ত। তৎকালীন সময়ে ইউরোপের বাইরে কোন দেশেই যেহেতু মারকেটর নিজে যাননি, তাই আয়তনটা কিছুটা তারই মস্তিষ্কপ্রসুতও ছিল। এছাড়া কাগজকে শঙ্কু আকৃতির বানিয়ে, তা থেকে গোলাকার পৃথিবী বিষয়ে ধারণা করেছিলেন মারকেটর, সেখান থেকেও এমন ভুল হবার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও এগুলো সবই সম্ভাবনা মাত্র, আসলে বিষয়টা কী ছিল তা একমাত্র মারকেটরের বাইরে কেউই জানতেননা, বাকিটা পাঠকের ভাবনার উপরে ছাড়া হল।
কিন্তু এই ভুলটা জানা গেল কীভাবে!
১৮৮৫ সালে জেমস গল এবং আরনো পিটার্স নামের দুই ভূগোলবিদ সর্বপ্রথম আয়তাকার মানচিত্র ‘প্রজেকশন’ করেন, যাকে গল-পিটার্স প্রজেকশন বলা হয়ে থাকে। এটা বিষয়ে ১৮৮৬ সালে ফলাও করে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রবন্ধাকারে ছাপানোও হয়েছিল, এর পরে গোটা বিশ্বজুড়ে একটা রাজনৈতিক শোরগোল পরে যায়, ফলস্বরূপ বিশ্বমোড়লেরা বিষয়টিকে ধামাচাপা দিয়ে দেয়। এরপর হঠাৎ করেই ২০১৬ সালের একটা সম্মেলনে পুনরায় এই নিয়ে প্রস্তাব উঠলে, মার্কেটরকে বাতিল করে ‘গল-পিটার’ এর মানচিত্রকেই ইউনেস্কো মান্যতা দেয়; সেই মত আমেরিকা ও ইউরোপের অধিকাংশ দেশে এই প্রোজেকশনকেই সরকারী ভাবে ব্যবহার শুরু করে এই সেদিন, ২০১৭ সাল থেকে।
তাহলে ১৮৮৫ সালের আগে কি কোনো বিশুদ্ধ ম্যাপ ছিলনা পৃথিবীতে? অবশ্যই ছিল, কিন্তু ইউরোপিয়ানদের কাছে ছিলনা। মার্কেটরেরও প্রায় ৫০ বছর আগে ‘পিরি রেইস’ নামের একজন তুরস্কের অটোমান সাম্রাজের সেনাধ্যক্ষ ছিলেন, হরিণের চামড়ার উপরে তিনিই পৃথিবীর পূর্ণাঙ্গ ম্যাপের চিত্রাঙ্কন করেছিলেন, বর্তমানে যেটা অনেকটা বিনষ্ট হয়ে গেছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এখানে আন্টার্ক্টিকারও পূর্ণ ও রেখচিত্র নির্দেশিত রয়েছে যার দ্বারা টপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্র চিত্রণ করা সম্ভব।
পিরি রেইসের পুরো নাম ছিল আহমেদ মহিউদ্দিন পিরি। নৌ-যাত্রার উপরে তার লেখা বই ‘কিতাব-ই-বাহারাইয়ি’ গোটা বিশ্বের কাছেই এক অমুল্য নথি। ঝড়ের প্রকারভেদ সম্পর্কে তার গবেষণালব্ধ তথ্য, নৌ-কম্পাস ব্যবহার করার হরেক কৌশল; বিভিন্ন বন্দর এবং উপকূলরেখার বিষয়ে বিশদ তথ্য সহ তার তালিকা, আকাশে নক্ষত্রগুলি ব্যবহার করে দিকনির্দেশের পদ্ধতি, বিভিন্ন সাগর-মহাসাগর এবং তাদের চারপাশের জমিগুলির বৈশিষ্ট্য সমূহ একত্রিত করে সে এক দুর্মুল্য পুস্তক রচনা করেছিলেন। এই বই এর প্রথম সংস্করণ ইস্তানবুলের পাশাপাশি, ব্রিটিশ লাইব্রেরি, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি, প্যারিস, ভিয়েনা, বাল্টিমোরের মত বড় বড় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত রয়েছে।
গ্রেট আলেকজেন্ডার থেকে কলম্বাস হয়ে ভাস্কো-দা-গামা, এমন অনেকের নথি নিয়েই পিরি রেইস কাজ করেছিলেন, যা তার বইতে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর বানানো ১৫১৩ খ্রীষ্টাব্দের মানচিত্রের প্রথম টুকরো ১৯২৯ ক্রীষ্টাব্দে তুরস্কের ইস্তানমুলের এক গুদাম থেকে উদ্ধার হয়। যে মানচিত্র, আজকের দিনেও প্রায় নিখুঁত। মানচিত্রের দ্বিতীয় অংশটি ১৫২৮ খ্রীষ্টাবে অঙ্কিত, যেটি মিশরের কায়রো থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। প্রসঙ্গত, কর্মে গাফিলতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে এই কায়রো শহরেই পিরি রেইসকে মৃত্যুদণ্ডে দন্ডিত করা হয়েছিল। আজকের তুরস্ক নৌবাহিনীতে বহু জাহাজ ও নৌ-বহর পিরি রেইসের নামে রয়েছে।
তবে সভ্যতার ইতিহাসে সর্বপ্রথম চিত্রাঙ্কিত কোনো বৈশ্বিক ম্যাপের উল্লেখ পাওয়া যায় খ্রীষ্টপূর্ব ১০০ সনের কাছাকাছি সময়ে। প্রখ্যাত গ্রীক গণিতজ্ঞ, জোর্তিবিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদ ক্লৌদিয়াস ‘টলেমি’ তাঁর ‘জিওগ্রাফিয়া’ গ্রন্থে বিশ্বের মানচিত্র সম্বন্ধে একটা গ্রহণযোগ্য ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
তাহলে, এই হল মানচিত্র, তার ত্রুটি ও তার বিবর্তন সংক্রান্ত একটা ছোট প্রবন্ধ।
আপনারা এই ওয়েবসাইটে গিয়ে দেশগুলির আকার আয়তন নিয়ে একটু মজার খেলা খেলতেই পারেন-
https://thetruesize. com/
প্রাথমিক তথ্যসুত্রঃ The Daily Mail, UK. 17 Aug, 2016

বুধবার, ২৭ মে, ২০২০

Solar Minimum

 


সূর্য হল এই পৃথিবীর জীবনী শক্তির অন্যতম একক, সৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় উত্তাপ বা শক্তি আমরা সূর্য থেকেই পেয়ে থাকি। সুর্যকে কেন্দ্র করেই আমাদের পৃথিবী আবর্তিত হয়, ঋতুর পরিবর্তন ঘটে। ঝকঝকে মেঘমুক্ত আকাশের দিকে ভন্যি দুপুরে যদি চেয়ে দেখলে, দেখা যাবে দিগন্ত বিস্তৃত নীলিমার মধ্যে চিরায়ত ভাবে সূর্য আমাদের সমান ভাবে- সমান তেজে সম্বৎসর আলো প্রদান করে চলে।

আমাদের মত যারা সাধারণ মানুষ তাদের কাছে এটা সত্য হলেও, যারা কিনা জ্যোর্তিবিজ্ঞানী তাদের কাছে এ কথাটা সত্য নয় মোটেও; বরং চন্দ্রকলার মত সুর্যেরও হরেক কলা রয়েছে। সুর্যের বাইরের যে উতপ্ত পৃষ্ঠতল- তাকে বলা হয় করোনা, এই বাইরের স্তর তথা সৌর শরীর করনাতে ‘করোনাল হোল’ নামে একধরনের ক্ষত সৃষ্টি হয়; যা নাসার বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন ‘সোলার ডায়নামিক্স অবজারভেটরি’ নামের উপগ্রহের পাঠানো তথ্য মোতাবেক।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, সুর্যের পৃষ্ঠতলের উজ্জ্বল অংশগুলি মূলত উচ্চচাপে জমে থাকা ঘন গ্যাসীয় মেঘ, যেখানে উতপ্ত বিস্ফোরণ অতি সাধারণ ঘটনা, সুর্যের কেন্দ্রস্থল থেকে নির্গত হয়ে আসে ফুটন্ত লাভা, যা ক্রমাগত তাপ বিকিরন করতে থাকে। এই বিকিরনের মাঝে রঞ্জন রশ্মি থেকে অতিবেগুনী রশ্মি সবই রয়েছে। এই অঞ্চলগুলো একসময় অন্য অংশের তুলনাতে ঠান্ডা হয়ে যায় সুর্যের আপন নিয়মে, ইনফ্রারেড ক্যামেরাতে ওই অঞ্চলও গুলোকে তখন কালো ক্ষতের মত দেখায়, একেই ‘করোনাল হোল’ বা সৌর কলঙ্ক বলে। এই সৌর কলঙ্কগুলো সুর্যের বাকি অংশের তুলনায় ভিন্ন বৈশিষ্টের হয়ে থাকে, উত্তাপের তারতম্যের কারনে সৌর ঝড়ের সৃষ্টি হয়। কিন্তু সৌর কলঙ্ক অঞ্চলে তড়িৎ চুম্বকীয় প্রভাব ভীষণ ভাবে কমে যায়, যার প্রভাবে একলপ্তে বিপুল পরিমাণ- বিভিন্ন মাত্রার তরঙ্গকণা মহাকাশের বুকে ছড়িয়ে পরে ওই অঞ্চল থেকে।

এখন পৃথিবী মুখের সৌর পৃষ্ঠতলে এমন সৌর কলঙ্কের সৃষ্টি হলে সেগুলো থেকে নির্গত হওয়া তরঙ্গ কণাগুলো অনেকসময় তা পৃথিবীপানে ধাবিত হয়; এটাই জীব জগতের ক্ষেত্রে যথেষ্ট হুঁশিয়ারি স্বরূপ- যদি সেই সৌর তরঙ্গের পরিমাণ অত্যাধিক বেশি হয়। সম্প্রতিকালে জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের সৌর গবেষকেরা দাবি করেছেন, ‘দিনে দিনে শেষ দশকে সূর্যের তেজ ও উজ্জ্বলতা কমতে শুরু করেছে’। এর ফলে সূর্যের ক্রিয়াকলাপও দিনে দিনে হ্রাস পেতে শুরু করেছে, যা সাধারণ মানুষের দৃশ্যমানতার মাঝে না থাকলেও বিজ্ঞানীরা ঠিক ফারাক নিরুপন করে ফেলেছেন।

একেই বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন সোলার মিনিমাম বা ‘নূন্যতম সৌরীয়’ দশা। এটি সৌর চক্রের একটি নিয়মিত দশা, যার উল্টো দশার নাম হচ্ছে ‘পরম সৌরীয় দশা’ বা সোলার ম্যাক্সিমা। জাতিসংঘের বিশ্ব জলবায়ু শীর্ষক আলোচনায় এই বিষয়টি একটি গুরুত্বপুর্ন অংশ হিসাবে বিবেচিত হওয়া শুরু হতেই- এটি জনসমাজে যথেষ্ট কৌতুহলের সৃষ্টি করেছে, এবং সেই সুত্র ধরেই এই প্রতিবেদন সঙ্কলন।

সৌর ন্যূনতম হ’ল ‘সূর্যের হিসাবে’ ১১ বছরের ‘সৌর চক্রের’ সর্বনিম্ন সৌর ক্রিয়াকলাপ। ১৯৭৬ সাল থেকেই বিজ্ঞানীরা সুর্যের এই কার্যকলাপ নিয়ে গবেষণা করছেন, ও নানান জটিল গণনার মাধ্যম দিয়ে বিগত ৫০০০ বছরের একটা গানিতিক চিত্র তুলে ধরেছেন- সুর্য কখন কেমন ছিল। সেই মোতাবেক দেখা গেছে- পৃথিবীর হিসাবে ৪০০ বছর অন্তর অন্তর বড় ধরনের সৌর কলঙ্কের সৃষ্টি হয়। বর্তমান সৌরচক্রের আগেরটি শুরু হইয়েছিল ১৯৯৬ সালের এপ্রিল মাসে, এটি ক্রমে তার সর্বচ্চ সীমায় পৌঁছে ছিল ২০০০-২০০১ সাল নাগাদ, আগেই উল্লেখ করেছি একে পরম সৌরীয় দশা বলায় হয়। এক্ষেত্রে পরম দশা ও নূন্যতম দশা দুই ক্ষেত্রেই তেমন বড় আকারের কিছু পরিবর্তন ঘটেনি সূর্যের পৃষ্ঠতলে।

বর্তমান দশাটি শুরু হয়েছে ২০০৯ সাল নাগাদ, বিজ্ঞানীরা যার নাম দিয়েছে সৌরচক্র-২৪। যার পরম দশা অতিক্রম করে এসে এই ২০২০ সালে নূন্যতম দশা শুরু হয়েছে, যা সর্বচ্চো সীমায় পৌঁছাবে ২০২৫ সাল নাগাদ। এটি কমপক্ষে ১৩ বছর যাবৎ স্থায়ী বলে বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন। দুরবীক্ষন যন্ত্রের দ্বারা প্রাপ্ত চিত্র বিশ্লেষণ করে, এই ২৪ তম সৌরীয় দশাটিকেই ওই ৪০০ বছরের অন্তরের ‘মহা নিম্ন দশা’ হিসাবে অনুমান করছেন বিশ্বের সংখ্যাগুরু জ্যোর্তিবিজ্ঞানী।

নূন্যতম সৌরীয়’ দশার অর্থ এই নয় যে সূর্য তার শক্তি খোয়াচ্ছে, বরং এটা সূর্যের একটা আভ্যন্তরীণ বিন্যাস পদ্ধতি, আমাদের পৃথিবীর ঋতুর মতই যা পরিবর্তনশীল নিয়মিত অন্তরে। ২০২০ সালে যে সৌর কলঙ্ক গুলি দৃশ্যমান হয়েছে ও যার জন্য বিষয়টা চর্চায় এসেছে তার কারন এই কলঙ্কের চিত্রের আয়তনটা যথেষ্ট বড় মাপের। এক্ষেত্রে কোটি কোটি টন বিদ্যুতায়িত গ্যাসীয়-চৌম্বকীয় আণবিক তরঙ্গ তথা সৌরীয় কণা এক লহমায়, বেশ কিছু দিন ধরে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়বে। প্রসঙ্গত, সুর্যের হিসাবে ওই বেশ কিছু দিন আমাদের পৃথিবীর হিসাবে বেশ কিছু বছরের সমষ্টি, আর এখানেই ভয়ের পোকা বাসা বেঁধেছে কিছু বিজ্ঞানীদের মনে।

নুন্যতম সৌর দশাতে শুধু যে সুর্যের বিকিরনের ভয়ই একমাত্র তা কিন্তু নয়, বরং সুর্যের রাশ সাময়িক হালকা হলে সেই ফাঁকে অন্যান্য ‘কসমিক রে’ বা মহাকাশীয় রশ্মিও পৃথিবীতে হানা দিতে পারে, যার চরিত্র সম্বন্ধে বিজ্ঞানীরা তেমন ওয়াকিবহাল নয়। এটা ঠিক কত বড় বিপদের কারন হতে পারে বা অদৌ এমন কিছু হবেনা- ‘গোটাটাই হয়ত কষ্ট কল্পনা’, তার কোনো নিশ্চয়তা কোন বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রই দিতে পারেনি।

আধুনিক সমকালীন বিশ্বে সৌর বিকিরনের কোনও প্রভাব ঘটেনি, মার্কিন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র নাসার তথ্য মতে- বিগত ২০০ বছরের ইতিহাসে এই ‘সৌর চক্র-২৪’ নূন্যতম দশা সবচেয়ে দুর্বল দশা।

সত্যিই যদি এই ‘নূন্যতম সৌরীয় দশা’র প্রভাবে ক্ষতিকর সৌর তরঙ্গ হোক বা অজানা কোনো মহাকাশীয় তরঙ্গ, স্বাভাবিকের চেয়ে যদি অধিক পরিমাণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে আঘাত হানে, সেক্ষেত্রে গোটা বিশ্বের অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে- যেমন আসবে বাস্তুতন্ত্রে। যার সাথে সরাসরি যুক্ত বর্তমান সভ্যতার অর্থনৈতিক সুরক্ষা, খাদ্য উত্পাদন সুরক্ষা এবং অন্যান্য বিবিধ মাত্রার বিষয়, যা এক অদ্ভুত ব্যাতিক্রমী সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, নিশ্চই এটা আগামীর পৃথিবীর জন্য যথেষ্ট উদ্বেগজনক।

করোনাল গর্ত’ থেকে প্রবাহিত অতিরিক্ত সৌর তরঙ্গ প্রবাহগুলি পৃথিবীর চৌম্বকীয় অঞ্চলে আঘাত করলে, পৃথিবীর আবহাওয়ার ভীষণ কুপ্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। যার মধ্যে পৃথিবীর চৌম্বকীয় অস্থায়ী অস্থিরতা অর্থাৎ ট্যেকটনিক প্লেটের অনিয়ন্ত্রিত চলনের ফলে ভয়ানক ভূমিকম্প বা অগ্নুৎপাত হতে পারে ঘনঘন, যা সুনামির কারন হতে পারে। ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের দরুন ঋতুর বিন্যাস বদলে যেতে পারে সাময়িক, ক্ষতিকর মেরুপ্রভার দরুন মেরুপ্রদেশের বরফ গলে যেতে পারে, কিছু উষ্ণ অঞ্চলে আবার হিমযুগ ফিরে আসতে পারে ছোট সময়ের জন্য। পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নেভিগেশন সিস্টেমে গণ্ডগোল হবার মাত্রা বহুলাংশে বেড়ে যেতে পারে। বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রেও ক্ষতির সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিচ্ছেননা বিজ্ঞানীরা, যেমন টেলিযোগাযোগ বা জিপিএস সিস্টেমে চরম ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।

কেন করছেন?

আমাদের পৃথিবীর উপরের যে বায়ুমণ্ডল তা সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মির বিকিরণ দ্বারা উত্তপ্ত হয়ে যায়, যেখানে উপগ্রহেরা আবর্তন করে পৃথিবীর চতুর্দিকে। নিচের বায়ুমণ্ডলের কক্ষপথ তুলনামুলক ভারী, যার সাথে উপরের ওই বায়ুমণ্ডলের অবিরাম ঘর্ষন হয়ে চলে। এই ঘর্ষণের ফলে- সময়ের সাথে গতি হারানো উপগ্রহগুলিকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনে অভিকর্ষ বলের দরুন। সৌর ন্যূনতমের সময়, পৃথিবীর উপরের বায়ুমন্ডল প্রাকৃতিক ভাবে গরম হবার প্রক্রিয়াটি ব্যহত হয়, ফলত বায়ুমণ্ডল শীতল হয়ে যায় এবং যার দরুন উপগ্রহ গুলি তার স্বাভাবিক পরিবেশ হারিয়ে- মহাকাশীয় আবর্জনা হয়ে মহাশূন্যে হারিয়ে যেতে পারে সময়ের অনেক আগেই, কিম্বা অকাল পতন ঘটতে পারে।

সৌর ন্যূনতম’ সময়ে পৃথিবীর উপরের বায়ুমণ্ডলে গ্যালাকটিক মহাজাগতিক রশ্মির সংখ্যা বেড়ে যায়। গ্যালাকটিক মহাজাগতিক রশ্মি হ’ল উচ্চ শক্তির কণা যা সৌরজগতের দূরবর্তী দিকের সুপারনোভা বিস্ফোরণ এবং গ্যালাক্সির অন্যান্য তীব্র ঘটনাগুলির দ্বারা ত্বরান্বিত হয়। এটি মহাকাশচারী নভোশ্চরদের জন্য ভয়ানক ক্ষতির কারন হয়ে দেখা দিতে পারে, যার ফলে স্পেশস্টেশন সহ মহাকাশ গবেষণার যে পরিকাঠামো- সেটাই বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে বর্তমান সময়ের মতই সৌরকলঙ্ক তৈরি হয়েছিল সূর্যের পৃষ্ঠতলে, তখনও পৃথীবিতে ভয়ঙ্কর রকমের জলবায়ু সংক্রান্ত পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়েছিল; যা প্রায় ৩০ বছর মত স্থায়ী হয়েছিল। খৃষ্টপূর্ব ৩০০ সালেও এমনই হঠাৎ করেই আবহাওয়া পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল, বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে সেটাও এমন সৌরীয় নূন্যতম দশার কারনেই ঘটেছিল।

১৮১৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার মাউন্ট তম্বোরার আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটেছিল, যার ফলে উদ্ভূত সুনামিতে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এই ১৮১৫ সালেই সংগঠিত হয়েছিল নেপোলিয়োন ও ব্রিটিশদের মাঝে ওয়াটারলুর যুদ্ধ। এই বছরের শেষে ইউরোপের ভুখন্ডে গ্রীষ্ম বা বসন্ত কোনও ঋতুই আসেনি শীত ছাড়া। মার্কিন এক গির্জার পাদ্রির লেখা ডায়রি থেকে জানা যায়, মধ্য ১৮১৫ সালে ভয়ানক তুষারপাত হয়েছিল, যার উদাহরন সমসাময়িক কালে ছিলনা। এমনকি সমস্ত জলাশয়ের জলকে জমাট বরফে পরিণত করে দিয়েছিল কয়েক বছরের জন্য।

সে সময় যে ফসলগুলি জমিতে বোনা হয়েছিল সেগুলো সবই হিমায়নের প্রভাবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, খুব স্বল্প সংখ্যক জমির ফসলই কাটা গিয়েছিল, ফলস্বরুপ খাদ্য ও শস্যের দাম আকাশ ছোঁয়া হয়ে যায় ১৮১৫ সালের পারিপার্শ্বিক সময়কালে। আয়ারল্যান্ডের ইতিহাস মোতাবেক তাদের মুখ্য ফসল আলু মাটিতেই পচে যায় সমসাময়িক কালে, যার ফলে ব্যাপক হারে অনাহারে মৃত্যু হয়েছিল। ইংল্যান্ডে, ফ্রান্স এবং জার্মানি ইত্যাদি দেশেও পর্যাপ্ত গমের ফলন না হওয়ার দরুন রুটির ঘাটতি দেখা দেয়; খাদ্যের জন্য দাঙ্গা হাঙ্গামা এবং লুটপাট ছিল অতি স্বাভাবিক ঘটনা। এশিয়ার দিকে নজর দিলে দেখা যায়, উত্তর চীনে লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারে মারা গিয়েছিল। সে বছরই দক্ষিণ এশিয়ায়, মুষলধারে বৃষ্টিপাতের কারণে কলেরা মহামারী সৃষ্টি হয়েছিল যা আরও অনেকের প্রাণহানি ঘটিয়েছিল।

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত কমিটির কিছু বিজ্ঞানীদের মতেও, বর্তমান সৌর ক্রিয়াকলাপটি পৃথিবীর জলবায়ুতে খুবই ছোট ভূমিকা পালন করবে, বরং এর চেয়ে মানব-উত্পাদিত গ্রিনহাউস গ্যাস অনেক বেশি ক্ষতিকর আগামীর জন্য। অনিয়ন্ত্রিত কার্বন নিঃসরণের ফলে নির্গত গ্রিন হাউজ গ্যাসের প্রভাবে গত ১৫০ বছরে পৃথীবির গড় উষ্ণতা ২ ডিগ্রী বৃদ্ধি পেয়েছে বলে গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে, এটা সৌরীয় বিকিরনের চেয়ে ৫০ গুণ বেশি ক্ষতিকর।

ক্ষয়ক্ষতি বিষয়ে নাসা একদল বিজ্ঞানী জানাচ্ছেন, এই নূন্যতম সৌরদশা মোটেই ততটা ভয়ঙ্কর নয় যতটা ১৭৯০-১৮৩০ পর্যন্ত চলা নূন্যতম সৌরীয় দশাতে ছিল। সে সময় নৃশংস শীত, ব্যাপকহারে ফসলের ক্ষতির দরুন হওয়া দুর্ভিক্ষ, তাকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শক্তিশালী আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের মত ঘটনা ঘটেছিল, এবারে তেমন কোনও সম্ভাবনা নেই এখনও পর্যন্ত তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী।

তাই, অহেতুক ভয় না পেয়ে বিজ্ঞানীদের পরামর্শের উপরে ভরষা রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ, আর বিশ্বাসীদের জন্য তো ‘all-mighty’ রইলেনই- যিনি সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা ও নিয়ন্ত্রক।

সুত্রঃ

https://www.spaceweatherlive. com/

https://science.nasa. gov/

https://www.sciencedirect. com/

https://electroverse. net/


বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২০

Cyclon Amphan: save Bengal



উম্পুনে গোটা দক্ষিণবঙ্গের উপর দিয়ে স্টিম রোলার চলে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নেই, খোদ কোলকাতাও চুড়ান্তভাবে আক্রান্ত। অন্তত ১০ বছর পিছিয়ে গেলাম আমরা। প্রকৃতির রোষের কাছে আজও সভ্যতা অসহায়।

জাতীয় মিডিয়াগুলো চোখে নিরোধ লাগিয়ে বসে অন্য তর্জা করছে যারা মেটিয়াব্রুজের কোন দর্জির ছেলে খোলা ড্রেনে পায়খানা করলে বলে করোনা ছড়াচ্ছে, দাঙ্গার খবর গুলো দ্রুত কী সুন্দর চারদিকে ছড়িয়ে দিয়ে TRP কুড়ায়। আজ তাদের সামান্যতম কভারেজ নেই বাংলা নিয়ে। এরা নাকি আবার জাতীয় মিডিয়া! বাঙালি কি জাতির বাইরে?
কেন্দ্রীয় সরকারও হাতের কর গুনতে ব্যাস্ত, যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব। বাংলার প্রতি বিজেপি পরিচালিত সরকার এমনিতেই বাম হাতে কোনো মতে পূজোর ফুলটা ছুড়ে দেয়, এক্ষেত্রেও বৈমাত্রেয় মানসিকতা সেই একই।
এরা মানে মোদী-শাহ সত্যিই যে তৃতীয় কোনো শক্তি দ্বারা পরিচালিত হয় তা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে সাধারন মানুষের কাছে। খোজা সরকার যেন কোনো প্রভুর নির্দেশের প্রতীক্ষাতে রয়েছে। যেমন ঔপনিবেশিক কালে ব্রিটিশ প্রভুদের গোলাম হয়ে চলত এদেশের তাবড়-তাবড় রাজা মাহারাজারা।
এ কোন গণতন্ত্র? এ এক অদ্ভুত আঁধার। একদিকে মানুষ সর্বশ্রান্ত অন্যদিকে রাষ্ট্র মৌন বুদ্ধের মত কি আশ্চর্য নির্বিকার নিরুত্তাপ নির্লিপ্ত। এরাই ২ দিন পর কাঁদুনে মুখ নিয়ে সেই অদৃশ্য প্রভুর নির্দেশে মড়াকান্না কাঁদতে আসবে।
ছিঃ
করোনা ন্যাংটা করে দিয়েছিল সরকারকে, পরিযায়ী শ্রমিকেরা তাদের হিংস্রতাকে নগ্ন করে দিয়েছিল, উম্পুন সাইক্লোন সরকারের নির্বীজতা দেখিয়ে দিল। এরা যারা ক্ষমতায় আছে, তারা ভাড়াটে পোশাক পরা যাত্রাশিল্পী, যারা নাম ভুমিকায় অভিনয় করছে।
কুশিলব যে ই হোক-
দাবি উঠুক, অবিলম্বে "জাতীয় বিপর্যয়ের" আওতায় দ্রুত বিশেষ আর্থিক বরাদ্দ দরকার, জনজীবনকে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনতে। রাজনৈতিক পরিচয়ের উর্ধ্বে উঠে মানুষের কাছে পৌছাক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস। কেন্দ্রের কাছে দরবার করুক রাজ্য প্রশাসন ও মানুষের ভোটে জেতা জনপ্রতিনিধিরা।
বিজেপিগসের ১৮টা নমুনার কাজ কি?
করোনার ক্রান্তিকালে তাদের একপিসকেও দেখেছেন মানুষের জন্য মানুষের পাশে দাঁড়াতে?
দাঙ্গা সংগঠিত করার বাইরে তারা কি করেছে?
এর সাথে আছে একটা কাঠিবাজ রাজ্যপাল, ঝালেঝোলে অম্বলে সবেতে থেকে শিরোনামে থাকাই যার মুখ্য উদ্দেশ্য। এনার পদের মুরোদটা এবার দেখার রয়েছে, 'নূন্যতম' কি করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীর নিরবতায় তিনি কিন্তু এখনও পর্যন্ত অপমানিত বোধ করেননি।

জাতীয় চ্যানেল বলে কিছু হয়না


দিল্লির হিন্দি বা ইংরিজি মিডিয়াকে অনুগ্রহ করে 'জাতীয় চ্যানেল' বলবেননা। ওরা নিজেরাই নিজেদের নাম দিয়েছে জাতীয়, কিন্তু আসলে তো হিন্দুস্তানি চ্যানেল। দিল্লির হাওয়া খারাপ হলে ওরা 'জাতীয়' খবর করে দেয়, দিল্লিতে একটা অপরাধ হলে সেটা 'জাতীয়' বিপর্যয়। কিন্তু আপনার ভিটেমাটি উচ্ছেদ হবার উপক্রম হলে, সেটা 'জাতীয়' খবর নয়। আপনার ঝড়-ঝঞ্ঝা-বজ্রপাত-খুন-খারাপি সবই আপনার 'আঞ্চলিক'। জাতীয় ফাতিয় নয়।

এর দোষ ওদের নয়। হিন্দুস্তানি চ্যানেল হিন্দুস্তানি 'জাতীয়' খবর করবে, এতে আশ্চর্য কী। দোষ আপনার আমার। আমরা দিল্লির চ্যানেলকে নিজেরাই 'জাতীয়' আখ্যা দিয়েছি। আমরা বলিউডকে 'সর্বভারতীয়' সিনেমা বলে একবাক্যে মেনে নিয়ে শাহরুক খানের জন্মদিনে পুজো দিয়েছি। আমরা নেটফ্লিক্সে বা অ্যামাজনে হিন্দুস্তানি ওয়েব-সিরিজ দেখে আপন করে নিয়েছি। আমরা টিকিট কেটেছি, টাকা দিয়েছি, টি-আর-পি দিয়েছি, সবকিছুকেই 'জাতীয়' বলে মেনে নিয়েছি, তার জন্যই ওদের এই রমরমা। আমাদের ট্যাঁকের টাকা কেটে এসবের বাজার তৈরি, আমাদের করের টাকা অন্য রাজ্যে, অন্য ভাষায় পাচার করে তৈরি হয় এসবের পিছনের বিপুল বিনিয়োগ, এই প্রাথমিক অর্থনীতিটুকুও আমরা ভুলে মেরে দিয়েছি।

আমাদের কলাকুশলীরা বেশি প্রচার, বেশি সুযোগ, বেশি টাকার জন্য পাচার হয়ে গেছে অন্যত্র, 'জাতীয়' কোনো কিছুতে মুখ দেখানোর জন্য লাইন লাগিয়েছে, কারণ ওখানে বেশি সুযোগ, বেশি প্রচার। আমরা আক্ষেপ করেছি, বাংলায় কেন এরকম হয়না। কিন্তু সোজা বাংলাটা বুঝিনি, যে, সুযোগ, প্রচার, আকাশ থেকে পড়েনা। বিনিয়োগ লাগে। ভারতের ব্যাংক বিনিয়োগকারীদের টাকা দেয়। ভারত সরকার হিন্দুস্তানের বাজার তৈরি করে দেয়। হিন্দুস্তানি ছাপা ও দৃশ্যশ্রাব্য মাধ্যমের বিপুল বিস্তার প্রবল সরকারি উদ্যম এবং বিনিয়োগ ছাড়া হয়নি। এই বিনিয়োগের টাকা আপনার ট্যাঁক থেকে এসেছে।
এও একরকমের চুরি। আপনি সেটা দেখতে পাননি, কারণ, আপনি হিন্দুস্তানি মিডিয়াকে, বলিউডকে 'জাতীয়' মিডিয়া ভেবেছেন। আপনাকে ভাবানো হয়েছে। আদতে যা তৈরি হয়েছে, তা হল হিন্দুস্তানি সাম্রাজ্য এবং আপনি সেখানে টাকা সরবরাহের উপায় মাত্র। বাড়ির চাকর যতই জমিদারের ছেলেকে 'ভাই-ভাই' বলে আদিখ্যেতা করুক, সে জমিদারের কেউ নয়। ফলে আপনার খবর ওরা দেখাবেনা। আপনার সংস্কৃতি ওরা প্রচার তো করবেই না, বরং মুছে দিতে চাইবে। আপনি যতক্ষণ দিল্লির খবর দেখে কলকাতায় মিছিল বার করছেন, যতক্ষণ দিল্লির ভাষায় হল্লাবোল বলে স্লোগান দিচ্ছেন, যতক্ষণ বলিউডের খিচুড়ি সিনেমাকেই একমাত্র বিনোদন বলে মেনে নিচ্ছেন, যতক্ষণ দিল্লিই ভারত এবং ভারতই দিল্লি বলে মেনে নিচ্ছেন, ততক্ষণ কোনো সমস্যা নেই। তবে এর বাইরে আর কিছু আপনি পাবেননা। কারণ আপনি চাকর বাকর শ্রেণীর। আপনার ভাষা ভাষা নয়, আপনার খবর খবর নয়, জমিদারেরটাই খবর। ব্যস।
এই বাস্তবতা চিরকালই ছিল। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ছিল, সংস্কৃতিতে ছিল। মহুয়া মৈত্র লোকসভায় এই জন্যই ইংরিজিতে ভাষণ দেন, অধীর চৌধুরি দেন হিন্দিতে। কারণ, হিন্দুস্তানই হল 'জাতীয়'। এই বিপর্যয় এসে সেই ঢপের 'জাতীয়' বাস্তবতার মুখোশ খুলে দিয়েছে। যাঁরা এই ঝড়কে 'জাতীয় বিপর্যয়' বলে ঘোষণা করতে হবে, কেন্দ্রকে পয়সা দিতে হবে বলে দাবী করছেন, তাঁদের সততা এবং আবেগ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁরা এটা ভুলে যাচ্ছেন, যে, বহুকাল ধরেই 'জাতীয়' মানে হিন্দুস্তানি। এবং এই বিপর্যয় 'হিন্দুস্তানি বিপর্যয়' নয়। এটা বাঙালির জাতীয় বিপর্যয়। হিন্দুস্তানিরা সেটা ঘোষণা করার কেউ নয়ও। বাঙালির জাতীয় বিপর্যয় বাঙালি ঘোষণা করুক। এবং কেন্দ্রের থেকে টাকা চাওয়া মানে সাহায্য চাওয়া নয়। ওটা হকের টাকা। বাঙালির নিজের পকেটের টাকা। শুধু আজ নয়, নিয়মিত ভাবে সেটা চাই।
সোজা কথায় যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করুন। জাতি এবং রাষ্ট্রকে আলাদা করুন। নইলে এন-আর-সি থেকে শুরু করে আমপান হয়ে আরও বহুকিছু আসতেই থাকবে। এবং আমরা হাত জোড় করে কেঁদে ককিয়েই মরব। আর হ্যাঁ, আমাদের সাংসদরা দিল্লির লোকসভায় গিয়ে দয়া করে বাংলায় ভাষণ দিন, যেমন হিন্দুস্তানিরা দেয় নিজের ভাষায়। আমাদের রাজনৈতিক ভরকেন্দ্র বাংলায়, দিল্লিতে নয়, সকলেরই এটা বুঝে নেবার সময় হয়েছে।

বুধবার, ২০ মে, ২০২০

বিজেপির আয় বৃদ্ধি


আত্মনির্ভরতা কাকে বলে বিজেপিকে দেখে শিখুন।

লিঙ্কে রইল সাইফনিং এর ফলাফল, যা নিয়ে প্রায় রোজই লেখালেখি করি আমি।
আমার মতে এটা যা দেখছি সেটা হিমশৈলের চূড়া মাত্র। প্রতিটি সরকারী টেন্ডার থেকেই কাটমানি খায় এই দলটি।
নোটবন্দি থেকে রাফাল হয়ে আধুনা কিট কেলেঙ্কারি, এর মাঝে স্ট্যাচু কেলেঙ্কারির মত কত শত লাখ ছোট মেজ কেলেঙ্কারি রয়ে গেছে। আর রয়ে গেছে জাষ্টিস লোয়ার রহস্য মৃত্যু ও জাস্টিস গগৈ এর রাতারাতি সংসদ হওয়া অবসরের পরই। এখানেই বোধহয় গণতন্ত্রের আধুনিক সংজ্ঞা দেওয়া রয়েছে।
নতুবা বিশ্বজোড়া এই তীব্র অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মাঝেও এদের আনুষ্ঠানিক শ্রীবৃদ্ধিতে কোনো খামতি নেই।
আত্মনির্ভরতার বিষয়ে যেটা জানা গেল, "মেক ইন ইন্ডিয়া" ঢক্কানিনাদের লোগোটিও বিদেশী কোম্পানীর তৈরি করা। মধ্যপ্রদেশের সমাজকর্মী তথা আইনজীবী চন্দ্রশেখর গৌড়ের এক RTI এর প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তর জানিয়েছে- "ওয়াইডেন-কেনেডি" নামের এক মার্কিন কোম্পানীকে মেক ইন ইন্ডিয়ার ঢাক পেটাবার জন্য ১১ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। তারাই এই লোগো বানিয়ে দেয়। বন্ধু কুশল ভট্টাচার্যের একটা TOI লিঙ্ক থেকে বিষয়টা গোচরে আছে।
কিন্তু আপনি তো ভক্ত, আপনার কিইবা যায় আসে! মোদীজি যখন করেছেন- নিশ্চই ভালর জন্যই করেছেন।
ছিল গণতন্ত্র, এলো ভক্তিতন্ত্র....
মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়

সোমবার, ১৮ মে, ২০২০

করোনাকালের যাকাতঃ কমিউনিটি কিচেন ও পরিযায়ী শ্রমিক



ইসলামিক নিয়ম ঘ্যেটে দেখা গেলো, যাকাতের প্রকৃত পাওনাদারের মধ্যে অনাথ, সম্বলহীন, ভিক্ষুক, অসহায় ও পথিকশ্রনীর মানুষ শীর্ষস্থানীয়। অন্যান্য বছরগুলোতে যাকাতের বেশিরভাগ অংশটি হয়ত মাদ্রাসাতে থাকা ছাত্রদের জন্যই ব্যায় করতেন আপনি, কারন মাদ্রাসাতে মূলত যারা পড়ে তাদের সিংহভাগই উপরোক্ত শ্রেনীর, যেগুলো আমার-আপনার কাছ থেকে কিছু বেকার ছেলে সংগ্রহ করে নিয়ে আসত গোটা পৃথিবী জুড়ে, যাদের যাকাত আদায়কারী বলায় হয়।
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব মাদ্রাসাই বন্ধ লকডাউনে, বাচ্চারা যে যার যার বাড়িতে অর্থাৎ মাদ্রাসাতে এই মুহুর্তে খরচা প্রায় নেই বললেই চলে, তদুপরি আদায়কারিরাও আপনার কাছে যেতে পারেনি পরিবহন ব্যবস্থার কারনে। এমনকি এবছর লকডাউনের প্রকোপে গরীবরাও অনেকে যেতে পারবেনা আপনার দুয়ারে। এদিকে সঠিক স্থানে যাকাত পৌঁছে দিতে আপনি বাধ্য; তাহলে আপনি যাকাত কাকে বা কোথায় দেবেন?
নিশ্চই আপনি আপনার প্রতিবেশী গরীবদের মাঝে দিন, আপনার দানে তাদের হক সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এবারে আরো অন্তত ৩টে প্রজাতি রাষ্ট্রের কল্যাণে আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে, যাদের অন্য অনেক সময় একত্রে এভাবে পাওয়া যায়না। “মুসাফির, সহায় সম্বলহীন ও অভাবগ্রস্থ”, এই তিনটে শব্দকে একটা বন্ধনীতে জুড়লে যে প্রতিশব্দটা দাঁড়ায় তার নাম হল “পরিযায়ি শ্রমিক”।
মাত্র ৪ ঘন্টার নোটিশে জারি হওয়া অপরিকল্পিত লকডাউনের অভিশাপে, বিদেশ বিভূঁইতে থাকা শ্রমিকশ্রেণীর মানুষগুলোর বর্তমানে রোজগার নেই- মানে তারা ‘অভাবগ্রস্থ’; রাষ্ট্র বা কর্পরেটের কেউ তাদের দেখার নেই- মানে ‘সহায়সম্বলহীন’, বালবাচ্চা নিয়ে পথে পথে হেঁটে চলছে হাজার হাজার কিমি- মানে তারা ‘মুসাফির’। দান বিষয়ে ইসলামের এমন ‘কপিবুক’ স্টাইলের সুযোগ কিন্তু বারে বারে আসবেনা আপনার কাছে। অতএব অনুরোধ, যদি পারেন নিজে ওই শ্রমিকদের হাতে পৌঁছে দিন আপনার দান। যদি সেই ক্ষমতা না থাকে তাহলে যারা বিভিন্ন স্থানে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে ‘কমিউনিটি’ সাহায্য বিলোচ্ছেন, সেই মানুষগুলোর মাধ্যমে আপনার দান পৌঁছে দিন। ইসলাম ধর্মমতে আপনার আল্লাহকে সন্তুষ্ট করাবার বা তাঁকে উত্তম ঋণ দিয়ে (কোরানের ভাষ্যে) পুণ্যি কামবার এমন সুযোগ কিন্তু বারে বারে আসেনা।
তাই আমার তরফে অনুরোধ, আপনার যাকাতের একটা অংশ এই কমিউনিটি কিচেন গুলোর জন্য বরাদ্দ করুন। আপনার ধর্মে কোথাও বলা নেই, স্বধর্মের গরীব, মিসকিন বেছে বেছে দান করুন, তাই জাত ধর্ম না দেখে অভাবী মানুষকে দিন, যার খিদে আছে পেটে। আপনি নেকি বা পূন্যি অর্জন করুন, আর অসহায় গুলো আপনার ধর্ম বিশ্বাসের সুফল ভগ করুক সরাসরি, এর চেয়ে ভাল আর কি হতে পারে?
আপনার প্রতীক্ষাতে রইল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো, যারা পরিযায়ী শ্রমিক বা কমিউনিটি কিচেনের সাথে যুক্ত।

শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০

লকডাউন ও কৃষির দুরবস্থা

 


প্রকৃতির আপন নিয়মে বৈশাখ শেষে জ্যৈষ্ঠ এসে গেছে, এই নিয়মে বর্ষা’ও আসবে অচিরেই। আষাঢ়ের কালো মেঘ বয়ে আনে ফসলের ঠিকানা লেখা চিঠি, শ্রাবনে অবিরামধারা মাটির রন্ধ্রে প্রেথিত করে দেয় আগামীর রসদ, যে রসদে বলীয়ান হয়ে ফুলে ফলে শস্য শ্যমলা হয়ে উঠে সভ্যতা। চাষীর ঘরে খুশির বান ডাকে, কচি ধানের সুগন্ধমাখা ঘ্রাণে আগামীর নবান্নের প্রতীক্ষায় আঙিনাতে সান্ধ্য আলপনার সাথে মঙ্গলশঙ্খের সুরে মেশে আজানের ধ্বনি, ডুরেকাটা শাড়িতে চাষীর বৌ’এর হেঁশেল থেকে আসে পায়েসের সুঘ্রাণ- উৎসবের দিনের প্রতীক্ষাতে দিন গোনা শুরু হয়।

কিন্তু হায়, গোটা সভ্যতাই আজ এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবানুর আক্রমণে অবরুদ্ধ বা গৃহবন্দী। কর্ম নেই, তাই রোজগারও নেই, দিনে দিনে কমেই চলছে ক্রয়ক্ষমতা। গোটা বিশ্বের পাশাপাশি আমাদের দেশও লকডাউনের ফাঁসে দমবন্ধ প্রায়, রাস্তার ধারের লাইন হোটেল বন্ধ, ট্রাকচালকেরা খাবার পাচ্ছেনা- স্বভাবতই পরিবহন ব্যবস্থা মারাত্বক রকমের ক্ষতিগ্রস্থ। চাষীর ফসল হয় মাঠেই শুকাচ্ছে বা পচছে, কিম্বা জলের দরে বেচে দিতে বাধ্য হচ্ছে ‘যা পাওয়া যায়’ তার আশায়সরকারের তরফে কোনো বিকল্প পরিকল্পনা নেই কীভাবে চাষি ও তার ফসলকে বাঁচানো যায়।

হাজার আলাপ-আলোচনার মাঝে যাদের বিষয়টা এখনও সেভাবে উঠে আসেনি- তারা হল কৃষক। বৃহৎ পুঁজির সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্রপিতারা রয়েছে, ক্ষুদ্র পুঁজির সংগঠন রয়েছে, সরকারী চাকুরীজীবীর বেতনের সুরক্ষা রয়েছে, শ্রমিকেরা ভোটব্যাঙ্ক- তাদের কষ্ট দৃশ্যত অবর্ননীয় তবুও তাদের শ্রমের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে রয়েছে। এনাদের কথা সর্বত্র আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু যাদের ছাড়া সভ্যতার রথের চাকা ‘খিদের মহা সমুদ্রে’ ডুবে মরবে- তারাই আজ চরম উপেক্ষিত। ক্রমাগত অন্তর্মূখী রক্তক্ষরণে গোটা কৃষি সিস্টেমটা ক্রমশ অতলে তলিয়ে যাবার প্রতীক্ষাতে

অর্থশাস্ত্র বলে- দ্রব্যমুল্য ‘বাড়লে চাহিদা কমে, আর কমলে চাহিদা বাড়ে’। কিন্তু শহরে আর গ্রামে ফসল-আনাজের উৎপাদন আর চাহিদার সাথে অসামঞ্জস্য দ্রব্যমূল্যের অসাম্যটা বর্তমানে গর্হিত অপরাধের পর্যায়ে নিয়ে চলে গেছে অদক্ষ প্রশাসন ব্যবস্থা। একটা লকডাউন মুর্খদের দ্বারা পরিচালিত স্থানীয় রাজনীতির কুম্ভিপাকে জর্জরিত কঙ্কালসার আমলাতন্ত্রটাকে ন্যাংটা করে দিয়েছে। একদিকে মুল্যবৃদ্ধির চোটে শহুরে মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস, অন্যদিকে ফসলের জলের দড়ের জন্য নতুন করে চাষে অনিহা- এক অদ্ভুত চরমাবস্থার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে

এই হারে উৎপাদন কমলে, অচিরেই খাদ্যপণ্যের দাম ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে দেশের অধিকাংশ মানুষের। এমনিতেই গাঁয়ে গাঁয়ে শ্রমিকেরা ফিরে এসেছে, তাদের পাঠানো অর্থের যোগান বন্ধ, বন্ধ্যা গেয়ে গেছে গ্রামীণ অর্থনীতি। চাষীর রোজগারে ভাটা পরা মানে দেশে বেকারত্বের হার যে চূড়ান্ত আকার ধারন করবে তা বলাই বাহুল্য। দ্রুত পরিস্থিতির সংশোধন না হলে, এক ভয়ঙ্কর অরাজক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে চলেছি আমরা, যেখানে একটা রুটির জন্য খুন জখম অতি সাধারণ ঘটনা হয়ে যাবে, বিংশ শতকের শুরুর দিকের মত আবার না ভাতের ফ্যান চেয়ে একদল ‘মানুষ’কে পাড়ায় পাড়ায় বের হতে দেখি!

আজকের দিনে প্রতিটি ছোটবড় শহরে, মফঃস্বলে সব্জির দাম আকাশছোঁয়া, যারা আমরা শহরের বাসিন্দা তারা সকলেই ভুক্তভোগী। ঠাকুর্দার অন্ত্যেষ্টিতে গ্রামে গিয়ে চোখে দেখে ও চাষীর নিজ মুখে তাদের দুরবস্থার কথা শোনার পর থেকে আমি আতঙ্কের মাঝে রয়েছি। অধিকাংশ গ্রামেই সব্জির কোনও দাম নেই, ৫-১০ টাকা কেজি বিকোচ্ছে অধিকাংশ আনাজ। গায়ে-গতরে শ্রমের মূল্য তো অনেক দূর, চাষের সার-নাঙলের খরচা টুকুও উঠছেনা, ঋণের বোঝা বেড়ে চলেছে। চাহিদা ও যোগানের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য।

অর্থনৈতিক অবরোধের কারনে এমনিতেই মানুষ নুন্যতম কেনাকাটা করছে, তার উপরে পরিবহণ সমস্যা- ফসলের দামটা পাবে কোত্থেকে? অথচ সরকার চাইলেই ফসলের পরিবহণে একটা এ্যাকশন প্ল্যান নিতে পারত, তাতে কৃষকের পাশাপাশি মধ্যবিত্তও অর্থনৈতিক লাভ পেত। এখনই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথোচিত পরিকল্পনা মাফিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ধনীকেও একবেলা খেয়ে বাঁচতে হবে, কারন কয়েন বা কাগজের নোট চিবিয়ে খেলে পেট ভরেনা

আসলে কৃষিতে কোন সরাসরি কর ব্যবস্থা নেই মদের মত, তাই মদ নিয়ে সরকার যতটা আগ্রহী, কৃষি নিয়ে তার ছিটেফোঁটাও নেই। কয়েকটি হাতে গোনা শস্যে সরকারী নুন্যতম সহায়ক মূল্যের সুবিধা থাকলেও সেখানেও ক্ষমতার পোষা দালালদের, অসীম লোভমাখা সর্বগ্রাসী হিংস্র লোলুপতার কাছে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হচ্ছে দুর্বল কৃষক। তাই এবারের আসন্ন আষাঢ় চাষীর জন্য কোনো সুখের বার্তা নিয়ে আসছেনা, নিয়ে আসছে এক আকাশ স্যাঁতস্যাঁতে গাঢ় অন্ধকার

পর্যাপ্ত উৎপাদন নিশ্চিত করতেই হবে রাষ্ট্রকে, কেননা বাজার অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে প্রতিটা জীবন। বিশ্বায়নের ফলে আজ ৭০০ কোটি জনসংখ্যাই আমরা পড়শী, একজনের ঘরে আগুন জ্বললে সে আগুন রাষ্ট্র হতে সময় লাগবেনা। প্রতিটা নিত্য প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য জরুরি, তাই শিল্পে জোর থাকুক, কিন্তু আমাদের শিকড় সেই মাটিতে- যেখানে চাষীর বাস। মাটি না পেলে শিকড় শুকাতে সময় লাগবেনা; গ্রাম, গ্রাম্য সভ্যতা, কৃষিপ্রধান জীবিকা না বাঁচলে শহরের অট্টালিকায় শ্মশানের নীরবতা বিরাজ করতে সময় লাগবেনা। “কৃষি আমাদের ভিত্তি” এটা কোনো রাজনৈতিক শ্লোগান নয়, এটা আমাদের অস্তিত্ব- এই বুঝটা আসা জরুরী প্রশাসনের শীর্ষমহলে

ধান কাটা হয়ে খামারে গুটিয়েছে, এবারে বর্ষার চাষ শুরু হবে। মুসুরি, ছোলা বা মুগডাল চাষ, সূর্যমুখী, সরষে, পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা, টম্যাটো, শশা সব চাষই শুয়ে পরেছে। পাটের কি হবে কেউ জানেনা, তিল ও ভুষিমালের অবস্থাও তথৈবচ। মাচার সব্জি অর্থাৎ ঝিঙে, চিচিঙ্গে, বরবটি, করলা, লাউ, কুমড়ো, মাচাতেই ঝুলছে। এই রোহিণী জাতীয় উদ্ভিদ গুলোই মুলত আমাদের দৈনন্দিন সব্জির চাহিদা মেটায়। বীজ তো নিচের মাটিতেই রোপিত হয়, বড় হতে শুরু করলে- লাঠি বা বাঁশের টুকরোর অবলম্বনে কচি-নরম শাখা প্রশাখা গুলোকে মাচায় উঠিয়ে দেয় চাষী; পরম মমত্ব আর অসীম ধৈর্য দিয়ে আগলিয়ে লালন করার জন্য দেওয়া হয় রৌদ্রের খোরাক, ওষুধের পরিচর্যা, আর তৃণভোজী প্রাণীদের বিনষ্ট থেকে সুরক্ষা। এর পরে তবে না ফুলে ফলে ভরে উঠে মাঠকে মাঠ। অবলম্বন বিনা দুর্বল কেউ কীভাবে দাঁড়াতে পারে! চাষী নামের দুর্বল প্রাণীগুলোকে ফুলে ফলে ভরিয়ে দেওয়ার জন্য সরকার নামের পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকা মোটেই একজন দায়িত্বশীল চাষীর মত নয়, বরং তা ন্যাক্করজনক ও ক্রোধের উন্মেষ ঘটায়।

প্রানিসম্পদ ও মৎস চাষীদেরও অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। দারিদ্রতার গাঢ় কুয়াশার মাঝে স্বর্বস্বহারা হওয়া এখন শুধুই সময়ের অপেক্ষা, কারনে তাদের সঞ্চয় বলে কিছু হয়না- দিনআনি দিনখাই পরিস্থিতিতে শরীরটা ছাড়া বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষাটাই তাদের একমাত্র সম্বল। আসলে তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রব্যবস্থা কখনই চায়নি দেশের কৃষক শিক্ষিত হোক; তাই প্রথাগত শিক্ষার অভাবে, মাঝখান থেকে মুনাফার সবটাই লোপাট করে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী মহাজনেরা

আমাদের দেশে চাষী শুধুই ভোট ব্যাঙ্ক, তাই তারা হিন্দু-মুসলমানের বেশি কিছু হতে পারেনা। চাষী কখনও আইন সভায় যায়না তাই তারা যে তিমিরে সেই তিমিরেই পরে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম, ব্যাতিক্রম বাদে। এদেশে কৃষক দুর্বল নয়, দুর্বল আমাদের সংবিধান ব্যবস্থার প্রয়োগে- যা সেই উপনিবেশিক ধারাকে বয়ে নিয়ে চলেছে আজও

বর্ষা সম্মুখে, চাষী কদর্পশূন্য। শাসকে দলের নেতারা রেশনের চাল চুরি করছে, এমনটাই অভিযোগ বিরোধীদের; আবালবৃদ্ধবনিতা সকলেই এই পালা গানে মত্ত, কেউ ভাবছেনা- যদি পরের মরশুমে চাষই না হয়, চালটা আসবে কোত্থেকে, চুরিটাই বা কি করবে, আর এই অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের রাজনীতিই বা আসবে কোত্থেকে? রাজ্য হোক বা কেন্দ্র, কঠিন নীরবতা পালন করছে সকলে; বুদ্ধিজীবীরাও মৌনব্রত পালনে ব্যস্ত। শিল্পপতিরা ব্যাস্ত নিজেদের আখের গোছাতে, মধ্যবিত্ত ব্যাস্ত সোশ্যাল মিডিয়াতে, টেলিভিশনের দৈনন্দিন তরজাতে, শ্রমিকেরা রাস্তায় হাঁটতে ব্যাস্ত

শাসকের দল রোজই ঘটা করে প্রেস কনফারেন্স এর নামে বিশাল বিশাল প্রতিশ্রুতি আর ‘দেখ আমি কত মহান’ সাজার প্রচেষ্টা করতে ব্যাস্ত, মূল সমস্যা যে তিমিরে সেই তিমিরেই। এদের চাষ কেবল বেঁচে আছে মিথ্যায়-ঘৃণাতে, তথ্য গোপনের নির্লজ্জতায়। আমলাদের হাতের পুতুল বানিয়ে তাদের দিয়ে মিথ্যের বীজ বপন করছে রোজ, সমাজের জমিতে; আর এই মিথ্যাই দাঙ্গা নামের ফল দিচ্ছে নির্দিষ্ট সময়ের অন্তর

ত্রাণ নয়, ভিক্ষা বা অনুদানও নয়- তাদেরকে সুবিধা পৌঁছে দিন; যা তাদের ন্যায্য অধিকার। তাদের স্বার্থে না হোক, দেশের স্বার্থে, নিজের স্বার্থে। যে অবলম্বন ধরে জীবন বাঁচে, তেমন একটা লাঠি চাই, যাকে আঁকড়ে ধরে চললে মাথা তুলতে পারে কৃষকেরা।

বিনামুল্যে উন্নত মিনিকিট বীজের যোগান, করমুক্ত রাসায়নিক-জৈব সারের সরবরাহ করন, বিনা সুদে অগ্রিম ঋণ প্রদান, আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা পৌঁছে দেওয়া, উৎপাদিত পণ্যের সুলভে বাজারজাত করার সুবিধা, সহায়ক মুল্য পাইয়ে দেবার নামে চাষীর থেকে ফসলের তোলা আদায় বন্ধ করা, রাষ্ট্রীয় জুলুম অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি সহ- মধ্যসত্ত্বভোগী লুঠেরা মহাজনেদের দমন করে চাষীর ঘরে যদি না সুফল পৌঁছে দেওয়া যায়- আগামীতে সবচেয়ে বিপদে পড়বে মধ্যবিত্ত।

ধনী কিনে খাবে, চাষী নিজেরটা উৎপাদন করে নেবে যেভাবে হোক। যাদের না আছে বেশি দামে কিনে খাবার পয়সা না আছে ঘাম ঝড়ানোর দম- সেই মধ্যবিত্তের পেটে লাথি পবেই। ভাবনাটা বর্তমানের নয়, বরং ভবিষ্যতের। অতীত সাক্ষী, যারা শিক্ষা নেয়না তাদের ধ্বংস অনিবার্য

 

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...