সোমবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২০

বিহার নির্বাচনঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ২



দ্বিতীয় পর্ব

আশ্চর্যজনক ভাবে অমিত শাহ্ কোনো সভা করেননি এই বিহার নির্বাচনে, মোদীজি প্রতিটি দফায় মাত্র ৪টে করে র্যালি করেছিলেন। যোগীর মতো স্টার ক্যাম্পেনারও ৩ দিনে ১৮টা র্যালি করেছিলেন। বিজেপি ও নীতিশ কুমারের প্রতিটি সভায় উপস্থিত মানুষের চেয়ে গ্রামের বাজারে মাদারির খেলা দেখতে বেশি মানুষ হয় এটার সাক্ষী গোটা পৃথিবী ছিল; কিন্তু তেজস্বীর সভায় যে ভিড় হয়েছিল সেটা শুধুমাত্র হেলিকপ্টার যে দেখতেই সেটাও প্রমাণিত গত ১০ই নভেম্বরের ফলাফলে।

সারা পৃথিবীতেই জাতপাতের নিরিখে ভোট হচ্ছে, তা আমেরিকা হোক বা বিহার; কালো-সাদা দ্বন্দ্ব RSS এর হিন্দু মুসলমানের চেয়ে কম কিছু নয়। সুতরাং উন্নয়নের গল্প শুনিয়ে ভোট চাওয়ার কোনো কারণ আগামী দিনে থাকবে বলে মনে হয় না। অবশ্য গণতন্ত্রই কদ্দিন থাকবে সেটাও গবেষণার বিষয়, চীন তো ছিলই এখন রাশিয়া, ইজরায়েল সহ বহু দেশই একনায়কতন্ত্রের দিকে যাচ্ছে। RSS তথা বিজেপিও অখন্ড ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে। এই সংক্রান্ত বিষয়ে যোগী আদিত্যনাথ দারুণ সৎ, কোনো ভণিতা রাখে না ভোটপ্রার্থীর হয়ে প্রচারে, যা মনে সেটাই মুখে বলে দেয়। যোগীর হিসাবে- গণতন্ত্র তো থাকবেই, কিন্তু ভোট আমার বাইরে কাউকে দিলে তাকে ঘৃণায় মেরে সরকার আমরাই গড়ব, শাহ্‌নামায় অবশ্য একটা বিকিকিনি অধ্যয় রয়েছে। আধুনিক ভারতীয় গণতন্ত্রের এটাই সংজ্ঞা। প্রাচীন গণতন্ত্রের যারা জনক ছিল তাদের ভাবনাতেও ছিল না এমনটা কখনও ঘটতে পারে, থাকলে এগুলোকে রোখার জন্য নিশ্চই কোন মৌলিক আইন থাকতো।

আগামী ২০২১ এ আমরা আমাদের বাংলাতে এক অভূতপূর্ব নির্বাচন দেখতে যাচ্ছি। আমাদের অতীতের যে সকল ধ্যান-ধারণা ছিল তার অধিকাংশই গুলিয়ে যাবে নিশ্চিত। চলুন সে বিষয়ে কিছুটা আলাপ করার প্রচেষ্টা করি ইতিহাস, মিম, বিহার ও বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশের নিরিখে।

এ দেশে পঞ্চাশে দশকের শুরুতে জনসঙ্ঘ সেই যে সন্ত্রাসবাদী রাজনীতি শুরু করেছিল তা নানান উত্থান-পতনের সাথে তালমিলিয়ে শেষমেশ ১৯৮০ সালে বিজেপি নামে পরিণতি পায়। ইন্দিরা গান্ধী যে শুধু পাকিস্তানকেই ভেঙে দু’টুকরো করেছিল তা নয় RSS কেও ঘোল খাইয়ে দিয়েছিল। ‘এমার্জেন্সি’ হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসী জনসঙ্ঘকে- জনতা পার্টিতে মিশিয়ে দিয়েছিল, এবং এমার্জেন্সি উত্তর নির্বাচনের পরপরই ইন্দিরা কূটনীতি জনতা পার্টিও ভেঙে দেয়। জনতা পার্টি থেকে বিচ্ছিন্ন বাজপেয়ী-আদবানী জুটি মিলে ‘রাম’ কেন্দ্রিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির জন্ম দিয়েছিল ‘হে রাম’ গান্ধীর দেশে, যেখানে জনসঙ্ঘের পূর্বতন সন্ত্রাসী কার্যকলাপ সম্পুর্ণ অক্ষুণ্ণ ছিল।

গান্ধীবাদী সেকুলার অহিংস নীতির উল্টোপিঠে জন্ম নেওয়া ‘জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমের’ ভেকধারী ‘সন্ত্রাসী’ দলটি ২০১৪ সালে এসে ভারতের জনগণকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে সাড়ে ১৯ কোটির মুসলমানের জন্যই ৯৭ কোটি ‘হিন্দু’ বিপদে আছে। আসলে এই সন্ধিক্ষণেই আগামীর ভারতবর্ষের রূপরেখা আঁকা হয়ে গিয়েছিল, যার পরিণতি আজকের বিহার ভোট ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়। সুতরাং আগামীর বাংলা, আসাম ও উত্তরপ্রদেশের ভোট সহ প্রতিটা নির্বাচনই যে তীব্র সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের মধ্যেই সম্পন্ন হবে তার জন্য জোত্যিষ চর্চার প্রয়জনীয়তা নেই।

স্বাধীনতা উত্তর দীর্ঘ কংগ্রেসী শাসনামলে তারা নিজেরা নরম হিন্দুত্বের পথেই ছিল, এদের পাশাপাশি যেমন হিন্দুত্ববাদী জনসঙ্ঘ ছিল তেমন কয়েকটি র্যাডিকাল ইসলামী রাজনৈতিক দলও ছিল, মুসলিম লিগ, জমিয়ত উলামা, মুসলিম মজলিশ, মুসলিম ফোরাম, উলামা কাউন্সিল, মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন ইত্যাদি। এদের প্রত্যেকের নামের সামনে একটা ‘অল ইন্ডিয়া’ ট্যাগ লাগানো ছিল, যতই এদের অনেকের অস্তিত্ব একটা মাত্র কমিউনিটি ব্লক বা তার একটু বেশি- সর্বোচ্চ একটা বিধানসভা কেন্দ্রের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। এই হিসাবে আজকের তৃনমূল দাবী করতেই পারে যে, আমাদের সামনে অল ইন্ডিয়া লাগালে কেন মিম (meme) করা হয়।

হ্যাঁ, মিম তবে তা AIMIM। এটাই আসলে আলোচনার মূল বিষয় বস্তু, উপরের গোটা আলাপটা এটারই ভণিতা ছিল। বিহারে জিতেছে বিজেপি, হেরেছে নীতিশ, দাম-দর করার মতো স্থানে ভিআইপি আর হাম, স্বপ্ন ভেঙেছে তেজস্বীর আর মন্দিরের সামনে শুয়ে থাকা হাত-পা হীন অন্ধ বধির ভিখারির মতো রয়েছে কংগ্রেস। কংগ্রেসের অবস্থা হচ্ছে রাজনৈতিক রমনে সে চড়ার স্থানে তো নেই মোটেই, উল্টে কতজনের সাথে, তাদের নিচে শুতে হবে সেটা তাদের কাছে ভাবনার।

কোথায় তেজস্বী কীভাবে ‘তড়িপার শাহ্’ এর ‘গণতান্ত্রিক’ সূত্র মেনে কীভাবে মুখ্যমন্ত্রী হতে পারে সেই আলোচনা করবে, কেন জিতিনরাম মাঝি স্বরাষ্ট্র দপ্তর চেয়েছে বিজেপির কাছে, কেন বিজেপি এতগুলো আসন পেয়ে নীতিশকে মুখ্যমন্ত্রীত্ব দিল, কেন দুজন উপমুখ্যমন্ত্রী গুঁজে দিয়েছে অমিত শাহ্‌, কোন দামে মাঝী-মাল্লাদের নেতা মুকেশ সাহানি তেজস্বীর কাছে বিক্রি হবে আগামীতে- সে সব নিয়ে তেমন আলাপই নেই সর্বভারতীয় মিডিয়াতে; এরা কেউই আলোচনায় নেই জনগণের, রাষ্ট্রীয়ভাবে। আলোচনার একটাই লক্ষ্য, আর তা হলো মিম।

...ক্রমশ 

রবিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২০

বিহার নির্বাচনঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ১

 


বিহার নির্বাচনের প্রেক্ষিতে দলগুলির অবস্থান ও পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

দেশ রামরাজ্য হোক বা না হোক, দেশজ অর্থনীতি সীতাকে অনুসরণ করে পাতাল প্রবেশ করা শুরু করেছে সাফল্যের সহিত। তার অন্যতম কারণ হিসাবে যে ঢালের আড়ালে ব্যর্থ কেন্দ্রীয় সরকার নিজেকে লুকাবার দাম্ভিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, সেই ‘লকডাউনের’ ভয়াবহ পরিস্থিতি পেরিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিচয়বাহক ‘ভোট’ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বিহারে।

কোন বিহার? যে বিহারের জনগণ রাজ্যের আয়তনের অনুপাতে সবচেয়ে বেশি জন মানুষ ভিনরাজ্যে কাজে যায়, দেশের মোট পরিযায়ী শ্রমিকের মধ্যে অবস্থিত- উত্তরপ্রদেশের ৩১% এর ঠিক পরেই বিহারের ১৬%।

আমাদের পশ্চিমবঙ্গ এই তালিকার প্রথম সাতে নেই, কিংবা থাকলেও নথি নেই। সেখানে উপরোক্ত দুটো রাজ্যের পরেই রয়েছে- রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, ছত্রিশগড়। বিহারে ৪০টা লোকসভা আসন, উত্তরপ্রদেশে ঠিক তার দ্বিগুণ- ৮০টা, এই হিসাবেও বিহারই আনুপাতিক হারে বেশি পরিযায়ী শ্রমিকের যোগান দেয় এই দেশে।

কেন্দ্র সরকারের অপরিকল্পিত লকডাউন ও তাকে কেন্দ্র করে ঘটানো রাষ্ট্রীয় সার্কাসের পরে যে সকল পরিযায়ীদের আর পুরাতন কাজটি ফেরেনি, তাদের মোট পরিমাণটা scroll মিডিয়ার এক সমীক্ষার মতে প্রায় ১২৪ মিলিয়ন, মানে কোটির হিসাবে সাড়ে বারো কোটির একটু কম। এটা প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক, যা খুঁজে পাওয়া গেছে, এর বাইরে থাকা হিমশৈলের পরিমাণ কেউই জানে না। যিনি দিতে পারতেন তথ্য- তথা যার রাখার কথা, তিনি ময়ূরকে দানা খাইয়ে দাড়ি বাড়িয়েছেন, মার্গদর্শকমন্ডলীর চেয়ারম্যানের হাতে জন্মদিনের ক্ষীর খাওয়ার আগেই দায় ঝেড়ে বলে দিয়েছেন- “মিত্রো, ডেটা নেহি হ্যাঁয়- due to act of God”.

তো যাই হোক, ভোটের দামামা বাজল, ভোটও হলো। বুথ জ্যাম, ছাপ্পা, বোমাবাজি তথা রক্তপাতহীন ভোট দেখে ‘সঙ্গে সুমনকে’ রাখা আম বাঙালির চোখ তো বটেই, বাকি আর অনেক কিছুই যা অঙ্কদেশের জিনিসপত্র, তা দিব্যি মাথায় উঠে গেছিল। এমন শান্ত ভোটও সম্ভব, তাও বিহারে! বিহার আর যাই হোক পশ্চিমবঙ্গ যে নয় সেটা তারা প্রমাণ করে দিতে পেরেছে, তাতে তাদের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশই হোক বা তেজস্বী- তাদের এই পরিবর্তনটার জন্য বিজ্ঞাপন দিতে হয়নি, মানুষ বুঝে গেছে।

মার্কিন মুলুকে ডোনাল ট্রাম্প হারতেই করোনা ‘আল-গায়েব’ হয়ে যাওবার উপক্রম হয়েছে, ভ্যাকসিন কোম্পানিগুলো টাকা কামাবার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাবার জন্য করোনা রয়ে গেছে কেবল পরিসংখ্যানে, তাই বাকি লেজুড়টা যেতে কিছুদিন সময় লাগবে। তেমনই অর্নব জেলে যেতেই গোদি মিডিয়ার যাবতীয় এক্সিট পোলের হিসাব গোলমাল হয়ে গিয়ে, প্রায় সকল মিডিয়া মিলেই ক্লোজ কনটেস্টে তেজস্বীর মহাগঠবন্ধনকে জিতিয়ে দিয়েছিল।

২০২৮ সালে ইভাঙ্কা ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হবে কিনা, নাকি তার আগে কমলা হ্যারিসিই প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপতি হবে তা সময়ই বলবে। কিন্তু এদেশে সংঘ পরিবারই যে রাজত্ব করবে তা বলাই বাহুল্য, যদি না ৫৬ ইঞ্চির নের্তৃত্বে চীনের সামনে হাঁটু গেঁড়ে, মুঘল পূর্ববর্তী ভারতবর্ষের মানচিত্র ফিরিয়ে আনে। নেতৃত্বে মোদী, যোগী বা তৃতীয় কোনো উন্মাদ আসবে কিনা তা সময়ের গর্ভে, তবে কংগ্রেস বা অন্য তথাকথিত কোনো সেকুলার দলের একার পক্ষে ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা শূন্য।

বিহার নির্বাচনে সংঘীরা জিতে গেল কেবলমাত্র অঙ্কের খেলায়। শাম, দাম, দন্ড, ভেদ; বিজেপি দ্রুত বুঝে গেছিল পালের হাওয়া কোনদিকে বইছে। বিজেপি ঘুণাক্ষরেও কখনও উন্নয়নের কথা বলেনি বিহারে, রামমন্দির, বিনামূল্যে ভ্যাকসিন আর জাতপাতের গল্পের বাইরে এতটুকুও বের হয়নি। মাল্লাদের সাহানিকে ১১টা আসন দিয়েই ম্যানেজ করতে পেরেছিল অমিত শাহ্, যা রাহুল পারেনি সমপরিমাণ আসন দিয়ে।

চিরাগ পাশোয়ানকে দিয়ে নীতিশ কুমারের ‘উত্তর’ প্রজন্মহীন দলকে খেয়ে ফেলার মাস্টার প্ল্যানও ছিল, তবে চিরাগ আর যাইহোক রামবিলাশ নয় এটা প্রমাণিত। তাই সে মোদী ভজনা করে রাজ্যসভায় একটা আসন হাসিল করতে পারলেই সুখী, বিজেপিরও তেমন কোনও মুখ নেই বিহারে, আগামীতে চিরাগই বিজেপির চিরাগ হয়ে বিহার জুড়ে ‘বিহার’ করলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।

জিতিনরাম মাঝিকেও ম্যানেজ করতে পারেনি মহাগঠবন্ধন, এই পরিস্থিতিতে যেটা হওয়ার সেটাই হয়েছে, তেজস্বীর মুখ্যমন্ত্রীর স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেছে। গণতন্ত্রে বিরোধী দল যদি প্রান্তিক ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে আনতে না পারে, তাদের ক্ষমতায় ফেরার অধিকার থাকে না, স্বভাবতই মাত্র ৫০% এর বেশি ভোট টার্নআউটের বিহারে তেজস্বীর ক্ষমতায় না আসাটাই ইতিহাসের শিক্ষা।

প্রান্তিক মানুষগুলোই ১৫ বছরের নীতিশ শাসনের ও কেন্দ্রের মারণ নীতির শিকার। জাতপাত ভোট ব্যাংকের রাজনীতির মাস্টাররা তাদের পকেট ভোটকে বুথে আনতে সক্ষম হয়েছে, কিন্তু বিক্ষুব্ধ ভোটকে ভোট বাক্সে এনে ফেলতে পারেনি মহাগঠবন্ধন।

-ক্রমশ

বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০

ফ্রি অ্যাপসের ফাঁদঃ ঠিক কতটা বিপদের মাঝে রয়েছি আমরা?

 


কাশেম সুলাইমানির কথা স্মরণে আছে?

আমেরিকা ২০২০ এর শুরুটা করেছিল ইরানের এই কমান্ডারকে হত্যা করে। ১৭টি একই রঙের গাড়ির কনভয়ের মাঝে স্পেশ্যাল একটিকেই নিশানা বানিয়ে তাকে ছোট্ট একটা ড্রোন মিসাইল দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিল বাকিগুলোকে কোনো ক্ষতি না পৌঁছে, এতই নিখুঁত ছিল এই অপারেশন।

ইরান সেনাবাহিনী মার্কিনিদের গুগল ম্যাপ বা ওই জাতীয় কোনো পরিষেবা পায় না মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের দরুন, তারা নিজেরাও মার্কিনি পণ্য ব্যবহারে উৎসাহী নয় ততটা। তার পরেও কীভাবে এত নিখুঁত ভাবে একজন ব্যক্তিতে নির্দিষ্টভাবে টার্গেট করতে সক্ষম হয়েছিল মার্কিন সেনাবাহিনী! সেদিন উত্তর না মিললেও ২০২০ ই জবাব দিয়ে গেল শেষের বেলায়।

গত ২০১৭ এর ফেব্রুয়ারিতে আফ্রিকান দেশ ‘কেনিয়ার’নির্বাচনে এমনই এক চরম নিকৃষ্ট কাজ করেছিল ফ্রান্সের সরকারি একটি প্রতিষ্ঠান, যেটা ধরা পড়ে এই ২০১৯ এর শেষে। ফ্রান্সের সেই কোম্পানি যারা বিনামূল্যে EVM সরবরাহ করেছিল অবাধ গণতন্ত্রের নামে, ওই EVM এর সুইচে বায়োমেট্রিক সেন্সার লাগিয়ে সকল ভোটদানকারীর আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করেছিল। কিন্তু তারা সফলভাবে সেই ডেটার সবটা নিজেদের দেশে পাচার করার আগেই ধরা পড়ে যায়। এই বিপুল ডেটার সবটা পাচার হয়ে গেলে ৭৭% কেনিয়ান ভোটারের আইডি, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, জন্ম শংসাপত্র, জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কার্ড, জাতীয় হাসপাতাল বীমা তহবিল কার্ড, কেনিয়া রাজস্ব কর্তৃপক্ষের ট্যাক্স পিন সবই হস্তগত করে ফেলত ফ্রান্স সরকার। শোষণের এ এক নতুন প্রক্রিয়া, আসলে আমরা নিজেরাও জানি না এই হাই-টেক দুনিয়াতে কখন কীভাবে কার দ্বারা প্রতারিত হয়ে যাচ্ছি।

ধোঁকাবাজেরা ক্রমাগত প্রযুক্তির সুফলকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে সর্বশ্রান্ত করার ফন্দি এঁটেই যাচ্ছে, তাদের নতুন হাতিয়ার হচ্ছে ফ্রি অ্যাপসের ফাঁদ।

আমরা আমাদের ফোনে অনেকেই হরেক অ্যাপস ডাউনলোড করে ফেলি, যাদের অধিকাংশই ফোটো কেন্দ্রিক, গান ও ভিডিও সম্বন্ধীয়, গেমস এর অ্যাপস ইত্যাদি। মুসলমানেদের মধ্যে অনেকেই হাদিস, কোরান ও নামাজের সময় জানতে বহু অ্যাপস ডাউনলোড করে নির্দ্বিধায়। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের ৯৯.৯৯% মানুষের মোবাইলে ১০০% ফ্রি অ্যাপস বোঝাই রয়েছে, কারণ আমরা ফ্রি কিছু পেলে আর কিচ্ছুটি চাই না।

অ্যাপস মূলত তিন ধরনের হয়,
১) ‘পেইড অ্যাপস’, এইগুলো ডাউনলোড করতে গেলেই নির্দিষ্ট পরিমাণে মূল্য দিতে হয় ও বাৎসরিক ভাবে রিনিউ করতে হয় নিরবচ্ছিন্ন পরিষেবা পেতে।
২) ‘ইন অ্যাপ পার্চেস’, এই অ্যাপগুলো বিনামূল্যে ডাউনলোড করা গেলেও বেশি কিছু পরিষেবা পেতে দাম দিতে হয়।
৩) ‘ফ্রি অ্যাপস’, এগুলোতে সকল ধরনের বা অধিকাংশ পরিষেবাই সম্পূর্ণ ফ্রি।

আচ্ছা কখনও মনে হয়েছে, এরা এত খেটেখুটে অ্যাপস বানিয়ে নিয়মিত পরিষেবা কেন দেয় আপনাকে? কী লাভ সেই সংস্থার! তারা কি জনসেবা করে এগুলো দ্বারা! উত্তর হলো- ‘না’। তারা মোটেও জনসেবা করে না বরং আপনাকে বিনামূল্যে দেওয়ার নামে ডাউনলোড করিয়ে দিতে পারলেই তাদের রোজগার। এবারে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তারা বিজ্ঞাপনদাতাদের থেকে রোজগার করতে শুরু করে। ফ্রি ও সেমি-ফ্রি অ্যাপসগুলোতে মোটামুটি চার প্রকারের বিজ্ঞাপন/অ্যাড দেখতে পাওয়া যায় বর্তমানে। যথাক্রমে, (i) ইন্টারস্টিসিয়াল অ্যাডস, (ii) ব্যানার বা ডিসপ্লে অ্যাড, (iii) ইন-অ্যাপ অ্যাড এবং (iv) ন্যাটিভ অ্যাড। এই সকল অ্যাড নিয়ে পরে কোনো প্রবন্ধে আলাপ করা যাবে। কিন্তু রোজগার এখানেই শেষ হয়ে যায় না, বরং এর পরেই অনৈতিক কাজকর্ম শুরু হয় যা আমাদের সকলের অগোচরে।

আজকের এই বাইনারি মাধ্যম সর্বস্ব 5G গতির দুনিয়াতে সম্পদের মানে বদলে গেছে, যার কাছে যত তথ্য আছে সে বা তারাই সবচেয়ে ক্ষমতাধর, আর ক্ষমতাধরের কাছে অর্থ তো পায়ের ধুলো। তথ্য অর্থাৎ ‘ডেটা’, যাকে বলা হচ্ছে ‘Data is new oil’ অর্থাৎ তথ্যই হচ্ছে বর্তমানে খনিজ তেল। আর এই তেল উত্তোলন যে যত হারে করতে পারছে, সে তত কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছে। ঘটনা হচ্ছে কী করে বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এই ডেটা ভান্ডার কীভাবে গড়ে তুলেছে, পায় কোথা থেকে? আমরা তো কাউকে কোনোদিন কোনো তথ্য দিইনি। আসলে ‘ফ্রি’ মাধ্যমের মাঝেই লুকিয়ে আছে প্রতিটি বিনামূল্যে পরিষেবা প্রদান করা কোম্পানিগুলোর মুনাফা। সেই কোম্পানিটি গুগল, ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদি যে কেউ হোক।

আমরা এই সকল অ্যাপসের থেকে পরিষেবা নিই আমাদের হরেক ব্যক্তিগত তথ্যের বিনিময়ে, আমরা প্রতিটি ব্যক্তিই আসলে ‘পণ্য’ এই অ্যাপস কোম্পানিগুলোর কাছে। আমাদের সেই পছন্দপঞ্জী তথ্য বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি করে ফ্রি এ্যপস কোম্পানি গুলো। ধরুন আপনি অনলাইনে জামা কেনার জন্য সার্চ দিলেন, দেখবেন সারাদিন আপনি অন্যান্য যেসব ব্রাউজিং করছেন, সেই সকল ক্ষেত্রেই হরেক জামার বিজ্ঞাপন দেখছেন। এখন জামার পরিবর্তে টিভি, ফোন, ট্যুর ডেস্টিনেশন ইত্যাদি যা খুশি পণ্য আপনি একটিবার সার্চ করুন সারাদিন ওটাই দেখবেন সর্বত্র। যদি কৌতূহল মেটাবার জন্য কালাজাদুর বিষয়ে সার্চ করেন, তাতেও দেখবেন সর্বত্র ওই বিষয়েই নানান বিজ্ঞাপন আসছে বিবিধ বিকল্পের সাথে।

এই সকল অ্যাপসগুলোতে এক বিশেষ ধরনের কম্পিউটার প্রযুক্তি নক্সা ব্যবহার করা হয়, যাকে এককথায় ‘অ্যালগরিদম’ বলা হয়। এই অ্যালগরিদমই অ্যাপস বা ওয়েবসাইটটির মূল সার্ভারে তথ্য পাঠিয়ে দেয় যে- আপনি কী খুঁজছেন। ল্যাপটপের কোনো ব্রাউজারে এমন কিছু করতে গেলে সেখানে ‘accept cookies’ বলে একটা অপশন আসে, এই কুকিস মানে বিস্কুট নয়, এই কুকিস হলো টিকটিকি বা গোয়েন্দা। এক বিশেষ ধরনের গোয়েন্দা সফটওয়্যার, যারা আপনার পছন্দ-অপছন্দ ও ব্রাউজিং জগতের যাবতীয় খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহ করে তাদের জন্য, যে ওয়েবসাইট তাকে বসিয়ে রেখেছে আপনার কম্পিউটারে, নিরবচ্ছিন্ন ভাবে তথ্য পাচার করার জন্য।

সুখের বিষয় হলো ব্রাউজারে আপনি কুকিস ‘কন্ট্রোল’ করতে পারেন, মোবাইল অ্যাপসের ক্ষেত্রে তেমনটার অপশন থাকে না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। মোবাইল ব্রাউজারের সেটিংসে গিয়ে আপনি কুকিস ব্লক করে আমাদের আনন্দবাজারের ওয়েবসাইট খুলতে যান, দেখলেই তারা কুকিস অ্যাল্যাও না করলে অ্যাক্সেসই করতে দেবে না, অর্থাৎ সিম্পলি গিভ এন্ড টেক পলিসি।

প্রায় প্রতিটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারীই প্রতিটি অ্যাপসকে মোবাইলের লোকেশনের তথ্য থেকে শুরু করে ফোনের কললিস্ট, ফোনের ফোটো গ্যালারি ও ভিডিও ফাইল, ফোনের যেকোনো ধরনের মিডিয়া ফাইল সহ কী কী ধরনের তথ্যের অ্যাকসেস দিয়ে দিই তা আমরা নিজেরাই জানি না। আমরা কেউ কখনও কি পড়ে দেখি, লম্বা ওই ‘টার্মস এন্ড কণ্ডিশন’ লিস্টে কী কী লেখা আছে, আমরা জাস্ট OK বটন ক্লিক করে দিই। কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা-ফেসবুকের ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর কিছু মানুষ বুঝতে পেরেছে যে, ফ্রি পরিষেবা দেওয়া কোম্পানিগুলো আমাদের তথ্য অবৈধ বিক্রয় করেও অনেক টাকা কামাই করছে। প্রতিটি অ্যাপসে লগ ইন করতে ফোন নম্বর বা ইমেল আইডি দিতে হয়, স্বভাবতই যে কোম্পানি যত বড় তার কাছে তত বড় তথ্য ভান্ডার রয়েছে আমাদের সম্পর্কে। এটি যেমন নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে, সেভাবেই ভয়ঙ্কর ধরনের উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

প্রায় প্রতিটি দেশেই যেকোনো ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা অবৈধ। কিন্তু এটা নেহাতই কথার কথা, আজকের দিনে অবাধে চুরি হচ্ছে আমাদের অজ্ঞতার সুযোগে। এমন ক্ষেত্রে কিছু দালাল কোম্পানির জন্ম হয়েছে যারা বিভিন্ন অ্যাপস কোম্পানি থেকে মোটা অর্থের বিনিময়ে ডেটাগুলো কিনে নেয় ও বড় বড় বিজ্ঞাপনদাতা বা গবেষণাকারীদের কাছে একাধিকবার বিক্রি করে মোটা টাকা রোজগার করে। একটা তথ্য থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালে ইউরোপের একটা দেশের নির্বাচনে বিরোধী রাজনৈতিক দল ফেসবুকের থেকে এমনই তথ্য কিনেছিল, ঠিক কী কি বিষয়ে জনগণ সোশ্যাল মিডিয়াতে আলাপ আলোচনা করছে নির্দিষ্ট শহর গ্রাম বা বিধানসভা কেন্দ্রের। সেখানে প্রতিটি ব্যক্তির শেষ ৩ মাসের তথ্যের দাম ছিল ১৭১১টাকা, ভাবুন আমাদের বিপুল জনসংখ্যার দেশে কোনো রাজনৈতিক দল এমনটা করলে, তা থেকে কী বিপুল পরিমাণ টাকা রোজগার করতে পারে বড় বড় সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট গুলো।

কিছুদিন আগে পর্যন্ত এমনটাই ছিল, যেখানে শুধুমাত্র অ্যাপস কোম্পানিগুলোই ডেটা বেচে আয় করত অনৈতিকভাবে, কিন্তু এখন শুধুমাত্র ডেটা কালেকশন করার জন্য হরেক মনোরঞ্জনকারী অ্যাপস ও সাইটের জন্ম দিয়েছে বহু গোয়েন্দা সংস্থা- তাদের এক ও অদ্বিতীয় লক্ষ্য হচ্ছে ডেটা মাইনিং করা। ফেসবুক, টুইটারে হরেক মজাদার এমন লিঙ্ক আসে টাইমলাইন সার্ফিং করার সময়, যেখানে আমরা ক্লিক করি কিছু না ভেবেই। মজাদার সব সাইট সেগুলো, পূর্বজন্মে কী ছিলেন, আপনার লাভমেট কী, কবে আপনার বিয়ে হবে, আপনার বর্তমান বয়সের ছবির বিকৃতি ইত্যাদি হরেক মজাদার সাইট, এরা আসলে প্রত্যেকটি ডেটা মাইনিং সংস্থা। সেখানে ঢুকতে গেলে বেশ কতগুলো পার্মিশন চাওয়া হয় তাদের তরফে, সেগুলোকে ok করলে তবে ওই সকল মজাদার পরিষেবা পেতে পারবেন। এমনই একটি ফ্রি এ্যপস হচ্ছে ‘Muslim Pro’।

‘Muslim Pro’ হচ্ছে অ্যান্ড্রয়েড প্ল্যাটফর্মে সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড করা ইসলামিক অ্যাপস, গোটা বিশ্বজুড়ে ৩০ কোটিরও বেশি মানুষ এটার ব্যবহার করত এই শুরুর নভেম্বরেও। এরাই X-mode নামের এক দালাল ডেটা মাইনিং কোম্পানিকে তাদের যাবতীয় ডেটার অবৈধ বিক্রি করত সেই ২০১৮ সাল থেকে, খবরটি সম্প্রতি ফাঁস হয়ে গেছে হরেক মিডিয়াতে। এই X-Mode কে কাজে লাগিয়েছিল US militery।

মার্কিন মিলিটারি এমন অসংখ্য ছোট ছোট কোম্পানিকে দিয়ে অজস্র ফ্রি অ্যাপস বানিয়ে ছেড়ে দেয় সেই সকল নির্দিষ্ট অঞ্চলে, যেখানে তাদের নজরদারি চালাতে নিখুঁত তথ্য দরকার। সাধে কি আর চীন কোনো ধরনের মার্কিন-ইউরোপীয় ইন্টারনেট মাধ্যমের প্রযুক্তি কোম্পানিকে দেশে ঢোকার পার্মিশন দেয়নি, একই কারণেই শত শত চাইনিজ অ্যাপস ব্যান হয়েছে আমাদের দেশেও।

নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির উপরে, কোনো গোষ্ঠীর উপরে, কোনো বিশেষ ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চলে নজরদারি চালাবার জন্য এমন অ্যাপস হাতিয়ার ব্যবহার করছে কিছু দেশ। আমাদের মতো অতি সাধারণ ব্যবহারকারীরাও জানি যে গুগল, ফেসবুক দ্বারা আমাদের সহজে ট্র্যাক করা যেতে পারে, তেমনই মার্কিন সেনাবাহিনী, CIA, মোসাদ, MI-6, ISI এর মতো ধুরন্ধর বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও জানে এ কথা। সুতরাং সেয়ানাদের ধরতে গুগল-ফেসবুকের মতো চিহ্নিত মাধ্যম ব্যবহার করে ট্র্যাক করতে পারবে না। তাই সেয়ানাদের জন্য এমন অসংখ্য মনোরঞ্জন ও প্রয়োজনীয় অ্যাপস বাজারে ছেড়ে রেখে তারা লক্ষ্যে পৌঁছে যাচ্ছে; ব্যাপারটা এমনই ভয়াবহ দিকে চলে যাচ্ছে যে- আমি আপনি যে কেউ তাদের জন্য ঘরের পোষা মুরগির মতো সহজলভ্য নিশানা হয়ে যাচ্ছি।

মার্কিন সেনাবাহিনী ও তাদের গোয়েন্দা সংস্থার তৈরি এমন হরেক অ্যাপস বাজারে সরাসরি আছে ছদ্মবেশে। এই ২০২০ সালের এপ্রিলে মার্কিন কংগ্রেস ‘বাবেল স্ট্রিট’ নামের একটা প্রযুক্তি সংস্থাকে ৮৯ লক্ষ ডলার পেমেন্ট করেছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ অনুমোদনে। এদের কর্ণধার টিম হকিন্স’ সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিল, “মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ছোট ছোট জনজাতি, মিলিট্যান্ট-মিলিশিয়া গ্রুপদের লোকেশন ট্র্যাক করতে পারা জরুরী জঙ্গীবাদ নিকেশ করতে, সেই প্রযুক্তির উদ্ভাবনের জন্যই এই বিনিয়োগ”। এই ‘বাবেল স্ট্রিট’ কোম্পানির একটি প্রোডাক্ট বা সফটয়্যার আছে ‘LOCATE X’ নামে, এর দ্বারা আপনার ফোনের লোকেশন বন্ধ থাকলেও ‘বাবেল স্ট্রিটের’ সার্ভার নিখুঁত অবস্থান পেয়ে যাবে যে ডিভাইসে এটা ইনস্টল আছে, এমনভাবেই এগুলো তৈরি।

এই ভয়াবহ প্রযুক্তিগত ফাঁদগুলো এই ‘Muslim Pro’ স্ক্যামের উন্মোচনের পরেই ঘুম ছুটিয়ে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি মুসলমান দেশগুলোর। আগামীতে এটা খোদ আমেরিকারই উপরেই যে অন্য কেউ প্রয়োগ করবে না তা কে বলতে পারবে! ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের গল্প তো আমরা অনেকেই জানি। তবে তারা ক্ষমতাধর- প্রযুক্তি, অর্থ সকল দিক দিয়ে। ওরা নিজেরা নিজেদের সুরক্ষিত করে নেবে; কিন্তু আমাদের মতো ছাপোষা মানুষের তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর কী হবে!

উপরে কেনিয়ার ঘটনা সে জন্যই বলেছি শুরুতে। জটিল অ্যালগরিদমের মাধ্যমে আমাদের প্রতিটি গতিবিধি সমন্ধীয় পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য কোন দপ্তরে পৌঁছে যাচ্ছে আমাদের অজান্তে তার খোঁজ কেউ জানি না।

মুসলমানেদের জন্য যেমন ‘Muslim Pro’ সেজে এসেছিল মার্কিন সেনা, তেমনই হিন্দুদের, খ্রিস্টানদের, বৌদ্ধদের জন্য কিছু এমন অ্যাপস আছে কিনা আমরা কেউ জানি কি? এর সাথে যদি সেই অ্যাপস দর্শনধারী হওয়ার সাথে বেশ খানিকটা প্রয়োজনও মিটিয়ে দেয়, সেক্ষেত্রে আমরা নিজেরাই শত শত বন্ধুদের কাছে সংশ্লিষ্ট অ্যাপসের প্রচার করে দিয়ে থাকি, এটাই আমাদের স্বাভাবিক চরিত্র।

অনেকে ভাববেন আরে অমুক অ্যাপস তো আমাদের সাচ্চা ভারতীয়র তৈরি, কিংবা তার মালিক হিন্দু বলে হিন্দুদের ক্ষতি হবে না নিশ্চিত ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের জন্য একটা তথ্য দিই, Muslim Pro অ্যাপসের মালিকও আরবের মুসলমানই ছিল, যদিও তাদের ফান্ডিং করেছিল এক মার্কিন কোম্পানি। আমাদের দেশের দিকেই দেখুন, গরু রাজনীতি এখন ভীষণ জনপ্রিয়। তথাপি গোমাংস রপ্তানি বন্ধ তো হয়নি, উল্টে প্রতি বছর তা বেড়ে চলেছে। প্রথম ১০টি ভারতীয় গোমাংস রপ্তানিকারক কোম্পানির ৭টিই অমুসলিমদের, যদিও প্রতিটি নামই আরবি শব্দ দ্বারা তৈরি। এদের মাঝে কয়েকজন আবার জৈন ধর্মেরও আছে, যারা আজন্ম নিরামিষাশী। আরও বড় তথ্য হচ্ছে ওই ৭টি বড় কোম্পানির মধ্যে অন্তত ১৯ জন এমন পার্টনার আছে যারা বিজেপির বড় বড় নেতা। সঙ্গীত সোম বা অনিল ভিজদের মতো প্রথম সারির গোহত্যা বন্ধ বিষয়ে রাজনীতি করেই তাদের পরিচিতি পাওয়া ব্যক্তিরা ওই ১৯ জনের তালিকাতে রয়েছে। সুতরাং হিন্দু বলেই হিন্দুরা সেফ, বা মুসলমানের কাছে মুসলমানেরা সেফ, বিষয়টা এতটাও অতি সরল নয়। নতুবা প্রতি বছর এদেশে ধরা পড়া ISI এর চরেদের ৯৫% অমুসলিম হতো না।

‘PINGDOM’ নামের ওয়েবসাইটে গিয়ে আপনি নিজেই দেখে নিতে পারবেন আমাদের বহু চেনা ও অচেনা অ্যাপস বা ওয়েবসাইটগুলো কীভাবে কোন কোন তথ্য চুরি করতে কীভাবে আমাদের ফোনকে ব্যবহার করে। সুতরাং এখন বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, কীভাবে কাসেম সুলাইমানিকে এক্কেবারে পিন পয়েন্টে টার্গেট করে খুন করা সম্ভব হয়েছিল।

এমনিতেই আমরা হরেক চাইনিজ কোম্পানিদের ফোন, টিভি, অ্যাপস, ফান্ডিং দ্বারা নাগপাশে বন্দী। আগামীকাল তাদের সাথে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে, তারা আমাদের দেশে ওই কায়দাতেই ক্ষতি করেবে কিনা কে তার গ্যারান্টি দেবে! আমাদের দেশের শিল্পপতিরা, বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও আগামীকাল এমন কিছুর শিকার হতেই পারেন, যদি না আজই এগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে বিকল্প সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে রাখে রাষ্ট্র। জনপ্রিয় অ্যাপসগুলোর আদলে সরকারই এমন পরিষেবা দিলে রাষ্ট্রের জনগণের তথ্য বিদেশী শত্রুদের হাতে যাওয়া থেকে অবশ্য রক্ষা পায়, কিন্তু সেটা করবেটা কে! সামান্য আরোগ্যসেতু এ্যপসের বিষয়েই কোনও তথ্য নেই সরকারের কাছে।

বহিঃশত্রু ভুলে যান, তারা আমাদের নাগালের বাইরে। ফেসবুক, গুগলের মতো কোম্পানিগুলোও আমরা ধরাছোঁয়ার বাইরে, তারা অধিকাংশ দেশের সরকারের চেয়েও বেশি ধনী ও ক্ষমতাবান। বিভিন্ন সরকারই এদের সাথে হরেক ডিল করে। যাতে কেউ বিদ্রোহ ঘোষণা করলে সেই বিদ্রোহীদের গতিবিধির সবটাই ট্র্যাক করতে পারে সরকার। রাজনৈতিক দলগুলোর এই তরজাকে কাজে লাগিয়ে ফ্রি পরিষেবা দিয়ে রাজনৈতিক ডেটা মাইনিং করতেই বা কতক্ষণ এদের!

যেকোনো স্বৈরাচারী শাসক চাইলেই প্রতিটি সরকার বিরোধী বিদ্রোহকে অঙ্কুরেই ‘খতম’ করে দিতে পারে। গণতন্ত্রের সংজ্ঞাই বদলে যেতে পারে এর বিকল্প না এলে। এমন কোনো অ্যাপসের দ্বারা খুব সহজে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পথচলতি অবস্থায় ট্র্যাক করে খতম করে দেবে বা পুলিশ দিয়ে তুলে নেবে, অথচ আপনার লোকেশন সার্ভিস বন্ধই ছিল ফোনে। এছাড়া প্রোপাগান্ডা ছড়াবার জন্য ফেসবুক, ওয়াটস অ্যাপ, টুইটার কীভাবে ব্যবহার করেছে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতাসীন দল তা আমাদের চেয়ে ভাল কে জানে। তাই গুগল বা ফেসবুককে কোনো সরকারই ঘাঁটায় না, বরং ব্যবহার করে বিপুল অর্থের বিনিময়ে।

আমাদের দেশেরই কোনো ডাকাতগোষ্ঠী, পাচারকারী বা সমাজবিরোধীরা এমন প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করলে সাধারণ জনগণের অবস্থা কী হবে বুঝতে পারছেন? আমরা এই ভারত উপমহাদেশের প্রায় প্রতিটি জনগণই ফ্রি পেলে আলকাতরাও খেয়ে নিই পেট ভরে, সেটা কি কারো অজানা রয়েছে! সুতরাং আমাদের এখনই সাবধান হওয়ার সময় চলে এসেছে, নতুবা আগামীতে আপনাকে এক্কেবারে সেখানেই পাকড়াও করবে এরা, যেখানে পেতে চায় তাদের ফাঁদ।

কিন্তু এর মানে কি আমরা ইন্টারনেট বা স্মার্টফোন ব্যবহার করা ছেড়ে দেব! মোটেই তা নয়, নিশ্চয়ই এ বিষয়ে কোনো সমাধান নেবে সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞেরা ও রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট দপ্তর। তবে আমরা নিজেরাও এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি অনেকটাই।

আমাদের প্রত্যেকের ফোনেই কমবেশি ৮০-১০০ বা তারও বেশি নানান অ্যাপস থাকে। যেগুলোর মধ্যে ৫-১০%ই আমরা ব্যবহার করি নিয়মিত। বাকিগুলো দৈনিক ব্যবহার না করলেও সেগুলো ফোনে রয়েই যায়, যেগুলো ব্যাকগ্রাউন্ডে সচল থাকে, ইন্টারনেট কানেকশন পেলেই তারা ডেটা মাইনিং শুরু করে নিজেদের সার্ভারে তথ্য পাচার করতে থাকে।
মোবাইলে নেট চালু করলেও সংশ্লিষ্ট অ্যাপসগুলোতে যদি নেট পরিষেবা বন্ধ করে রাখতে পারেন সেক্ষেত্রে আমার ছোট বুদ্ধিতে মনে হয় অনেকটাই এই অবৈধ ডেটা মাইনিং বন্ধ করে রাখা যাবে। এখানে ইন্টারনেটই এই পাচারের একমাত্র মাধ্যম। কিছু থার্ড পার্টি অ্যাপসের সন্ধান দিলাম নিচে, যেগুলো অ্যান্ড্রয়েড, আইফোন সহ প্রতিটি বড় বড় অপারেটিং সিস্টেমে উপলব্ধ। ‘কোন অ্যাপস নেট কানেকশন পাবে আর কোনটা পাবে না’ এই ধরনের অ্যাপসগুলোর যেকোনো একটি দ্বারা আপনি নিজে সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। যখন যে অ্যাপসে নেট প্রয়োজন সেটা অন করে নিলেন, কাজ মিটে গেলেই আবার বন্ধ।

এভাবে আপনি আপনার মোবাইলের অপ্রয়োজনীয় নেট খরচাতেও রাশ টানতে পারবেন। অবশ্যই এই ফায়ারওয়েলের নেটটিও বন্ধ রাখতে ভুলবেন না।

I. NoRoot Firewall
II. NoRoot Data Firewall
III. LostNet NoRoot Firewall
IV. NetGuard
V. DroidWall

সুতরাং আমরা সকলেই পকেটে গোয়েন্দা নিয়ে ঘুরছি অদৃশ্য মাইন বেছানো যুদ্ধক্ষেত্রে। ‘আস্তিনে সাপ পুষে বাঁচা’ প্রবাদের জীবন্ত স্বরূপ প্রজন্মের আমরা। কীভাবে এই বিপদ থেকে রক্ষা পাবো কেউ জানি না এই মুহুর্তে, তবে শুরুটা করতেই পারি। আমারটা আমি জানালাম, আপনার কাছে কোনো আইডিয়া বা প্রযুক্তি থাকলে কমেন্টে শেয়ার করতেই পারেন।

শুক্রবার, ২০ নভেম্বর, ২০২০

অপদার্থ মোদী ও তার বিদেশনীতি

 


বেনিয়া মোদী সরকার রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি আম্বানি-আদানির কাছে বেচতেই পারদর্শী, দেশজ অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে বৃহন্নলা।

আমরা সাধারণভাবে জানি যে আমাদের দেশ বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অস্ত্র আমদানিকারক হিসাবে শুধুই অস্ত্র আমদানি করে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইজরায়েল ও ইউরোপের হরেক দেশ থেকে। কিন্তু আমরা অস্ত্র রপ্তানি তথা এক্সপোর্টও করি বিশ্বব্যাপী। মূলত কমদামী প্রযুক্তিগত অস্ত্র, গোলাবারুদ, ছোট আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক, প্যারাসুট, চামড়া জাত সামগ্রী, সামরিক পোশাক ইত্যাদি ৪২টিরও বেশি দেশে নিয়মিত সাপ্লাই করে আমাদের অর্ডিনান্স ফ্যাক্টরি ও DRDO। এছাড়া হ্যাল, ভারত ইলেকট্রনিক্স, কোচিন শিপইয়ার্ড এর মতো এমন ডজন খানেক সংস্থা রয়েছে, যারা ২০১৪-১৫ অর্থবর্ষে ২ হাজার কোটি টাকার মতো মুনাফা করেছিল অস্ত্র সামগ্রী রপ্তানি করে।

এই অস্ত্র রপ্তানি বলার মতো করে শুরুটা হয়েছিল ২০০৭ সালে। মনমোহন মন্ত্রীসভার দুটো অধ্যায় জুড়েই প্রতিরক্ষা মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব সামলেছিলেন ‘এ কে অ্যান্টনি’। আমাদের দেশজ অস্ত্রভান্ডারকে তিনি আধুনিক করতে পারেননি নতুন সমরাস্ত্রে- এই গুরুতর অভিযোগ থাকলেও, অস্ত্র রপ্তানি থেকেও রাজস্ব আমদানি সম্ভব সেটার শুরুটা করতে পেরেছিলেন। কারণ আমাদের দেশে উন্নত প্রযুক্তিবিদের অভাব কখনই ছিল না, সেটাকেই অ্যাসেম্বল করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি।

এ যাবত এ সকল কিছু কেউই সেভাবে ঢাকঢোল বাজিয়ে প্রচার-প্রকাশ করেনি। এর পর মোদীজি এলেন দেশের শীর্ষপদে, যিনি নেহেরুকেই ঢাকের মতো পেটাতে থাকেন সকাল-বিকেল, সেখানে নিজের ঢাক যে উন্মাদের মতো পেটাবেন তাতে আর আশ্চর্য কি!

কর্ণাটকে কুমারাস্বামী সরকারকে ফেলে দেওয়ার জন্য যখন মার্চে লকডাউন পিছিয়ে রেখে সংসদ খুলে রাখা হয়েছিল, সেই সময় রাজ্যসভাতে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রোজেক্টের সফলতা তুলে ধরতে কিছু তথ্য দেন মোদীজি। সেখানে দাবী করা হয়েছিল গত ২ বছরে ৭০০% অস্ত্র রপ্তানি বেড়েছে, আগামী ৫ বছরে অস্ত্র রপ্তানি থেকে ১ লক্ষ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে তাঁর মন্ত্রিসভা। বিদেশী মিডিয়া সহ sipri.org মোটেই পাত্তা দেয়নি মোদীজির এই গুলগল্পকে, কিন্তু গোদী মিডিয়ার উল্লাসের খামতি ছিল না এটার ঢালাও প্রচারে।

এবারে সটান চলে আসুন নভেম্বর ২৪, ২০২০ তারিখে। ভারতের সাথে অস্ত্র খরিদের চুক্তি বাতিল করলো ৩২টি দেশ। দেশের কোনো সংবাদ মাধ্যমে আর এই খবরটা বেঁচে নেই, যেখানে আছে সেই লিঙ্কগুলোও বন্ধ করে দিয়েছে কী-ওয়ার্ড সহ। এই অর্ডারগুলোর মধ্যে ছিল- অস্ট্রেলিয়ার কার্তুজ সাপ্লাই, আজারবাইজানের হেডগার এবং হার্ড আর্মার প্লেট সাপ্লাই, জার্মানিতে হেলমেট সাপ্লাই, বোমা দমন কম্বল এবং নরম বর্ম প্যানেল সাপ্লাই, গিনির স্লিপিং ব্যাগ, মর্টার শেল কভার সাপ্লাই। ইসরায়েল, নেদারল্যান্ডস এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হার্ড আর্মার প্লেট, সিঙ্গাপুরে আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র সহ রাডার পার্টস, বুলেট প্রুফ ওয়েস্টস এবং হেলমেট সাপ্লাই, দক্ষিণ আফ্রিকাতে ডিটোনেটর এবং থাইল্যান্ডের নাইট ভিশন বাইনোকুলার সাপ্লাই ইত্যাদি দেশের সব অর্ডার বাতিল হয়ে গেছে, যা কয়েক লক্ষ কোটি টাকারও বেশি অর্থমূল্যের।

বলাই বাহুল্য এই সব অস্ত্র বানানো ফ্যাক্টরিগুলো যে ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়েছে তাদের টাকা শোধ দিতে পারবে না সহজে, হয়ত কেউ কেউ দেউলিয়া হবে। কিন্তু এরা কোন কোম্পানি? না, হ্যাল, অর্ডিনান্স ফ্যাক্টরি, DRDO বা এমন কোনো সরকারি কোম্পানি এই অর্ডারগুলোর সিংহভাগ পায়নি। পেয়েছিল রাতারাতি গজিয়ে ওঠা অনিল আম্বানির ‘রাফাল মেন্টেনেন্স’ কোম্পানির মতো ‘গুজরাটি’ সংস্থা। সেগুলোর নাম লিখে প্রোফাইল খোয়ানোর শখ নেই আমার, নেটে সার্চ দিলেই সব তথ্য পেয়ে যাবেন- যদি জানার ইন্টারেস্ট থাকে। বলে দেওয়ার দরকার নেই- কারা লাভের গুড় খেতো এই কোম্পানিগুলোর বকলমে। ফলস্বরূপ অস্ত্রের কোয়ালিটিতে কোম্পানিকে এডজাস্ট করতে হয়েছিল ‘মুনাফা’ বজায় রাখতে। আর এখানেই ফস্কে গেছে হাতের মোয়া-

কিন্তু ধরা পরল কীভাবে, যাতে এতগুলো দেশ একসাথে এমন সমবেতভাবে সিদ্ধান্ত নিল?

নাগোর্নো-কারাবাখ যুদ্ধে আর্মেনিয়ার ব্যাপক ক্ষতি হয়। দেশটি প্রায় ১৮৫টি ট্যাঙ্ক, ৯০টি সাঁজোয়া যুদ্ধযান, ১৮২টি কামান, ৭৩টি মাল্টিপল রকেট লঞ্চার, ২৬টি সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল সিস্টেম, ১৪টি রাডার ও জ্যামার, একটি এসইউ-২৫ যুদ্ধবিমান, শ’খানেক ড্রোন ও ৪৫১টি সামরিক যান হারিয়েছে বলে মিলিটারি এফেয়ার্স ব্লগ-অরিক্সের বিশ্লেষক ‘তিজিন মিৎজার’ জানিয়েছেন। এই যুদ্ধে আজারবাইজানের অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র সহ ড্রোনগুলো ব্যাপক পারদর্শিতা দেখায় এবং আর্মেনিয়ার প্রত্যেকটি প্রতিরক্ষা ব্যুহকে গুড়িয়ে দিয়েছে কার্যত।

আসলে আর্মেনিয়া সেনাবাহিনীর অধিকাংশ অস্ত্র, গোলাবারুদ সাপ্লাই করেছিল মোদীর ভারতের ‘বেনিয়া’রা। এমনকি DRDO এর বানানো ‘স্বাথী রাডার’ও নাকি সেখানে বিলকুল ফেল মেরেছে তুরস্কের বানানো সমরাস্ত্রের কাছে। আর্মেনিয়া সরকার অফিশিয়ালি তথ্য চেপে রাখলেও, আর্মেনিয়া সেনার ব্লগে ভারতীয় অস্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধং দেহী মনোভাবে প্রবন্ধ লেখা হয়েছে। প্রসঙ্গত, চলতি বছরের মার্চে ভারতের সঙ্গে অস্ত্রচুক্তি করেছিল আর্মেনিয়া। আর কি, মোদীজী তাঁর রেকর্ড অক্ষুণ্ণ রেখে দিলেন এক্ষেত্রেও। তিনি যেখানেই হাত দিয়েছেন, ঘটা করে যার প্রচার করেছেন- তাকে কবরের অতলে না পাঠানো পর্যন্ত ক্ষান্ত দেননি। এখানেও সেটাই ঘটেছে।

কড়িনিন্দা সিং এর তরফে কোনো প্রতিক্রিয়া না পাওয়া গেলেও প্রতিরক্ষা রাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রীপাদ নায়েক জানিয়েছে- আমরা দেখছি। বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্করও ক্ষত মেরামতে সচেষ্ট হয়েছেন, কিন্তু কতটা লাভের হবে তাতে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয়, যতটা না আমাদের দেশীয় অস্ত্রের ব্যর্থতা- তার চেয়েও বেশি মোদীর কূটনৈতিক ব্যর্থতা। ট্রাম্প ক্ষমতাচ্যুত হতেই মোদীর আন্তর্জাতিক গ্রহনযোগ্যতা তলানিতে পৌঁছেছে, এর প্রভাবেই এইভাবে একঘরে হয়ে যাওয়া হলেও আশ্চর্যের কি!

তথ্যসূত্রঃ

১) https://www.livemint.com/.../india-now-exports-defence...
২) https://theprint.in/.../modi-govt-made-defence.../383476/
৩) https://eurasiantimes.com/armenia-blames-poor-indian.../
৪) https://idrw.org/armenia-to-get-swathi-weapon-locating.../
৫) https://www.sipri.org/.../usa-and-france-dramatically.../
৬) https://www.ddpmod.gov.in/.../files/New%20SOP0001_2.pdf
৭) https://sidm.in/.../1582713845_Enhancing_Indias_export.pdf
৮) https://www.oryxspioenkop.com/
৯) https://www.rand.org/topics/military-affairs.html 

শুক্রবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২০

বিহার নির্বাচনঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ১১


একাদশ পর্ব


ভারতীয় সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষ, সেখানে স্পষ্ট করে লেখা আছে প্রতিটি ভারতবাসী নিজ ধর্ম ও তার রীতিনীতি বিনা বাঁধায় পালন ও অনুসরণ করতে পারবে। এদেশে সংখ্যালঘু বলতে শুধু মুসলমান নয়, শিখ, জৈন, পার্শি, বৈষ্ণব, খ্রিষ্টান প্রমুখ ধর্মানুশরনকারীদেরও বোঝায়। তা সত্বেও একক সংখ্যার দিক থেকে ভারতবাসীর মধ্যে তথাকথিত জাত ও শ্রেনীতে বিভক্ত হিন্দুর পরেই মুসলমানের স্থান এটা আমরা পরিসংখ্যনে দেখেছি। ভারতে বসবাসকারি অগ্রসর শ্রেণী যেমন ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্যরা কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, কোহিমা থেকে কচ্ছ অবধি বিস্তৃত, তেমনই ভারতের প্রতিটি রাজ্যেই কংগ্রেসী ভোটারের মত মুসলমানেরও দেখা মেলে কম হোক বা বেশি। এরই সাথে সংগতকারনেই ধর্মের কিছুটা নির্দিষ্ট বাঁধাবন্ধকতা থাকার জন্য মুসলমান সহজেই চিহ্নিত হয়ে যায়। সংখ্যাগুরু ভারতবাসীদের মধ্যে তথাকথিত হিন্দু ধর্মাবলম্বনকারী, অগ্রজ বা পশ্চাদপদ যে কোনো ভারতবাসীর ন্যায় সঙ্গত উপায়ে সংবিধান মেনে চলার অধিকার প্রাপ্ত, শিক্ষাদীক্ষা ও রুচি অনুসারে যেকোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী থেকে কর্মকর্তা বা মতাদর্শকারী হতে কোনও বাঁধা নেই।

যদিও সংবিধানে স্পষ্ট করে লেখা আছে ধর্ম কখনও রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা তবুও দিনের আলোতে ভারতীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ এখন RSS তথা বজরং দল, দূর্গা বাহিনী, বিশ্বহিন্দু পরিষদ ও সমাদর্শগত আঞ্চলিক দল বা এই দলগুলোর আড়ালে ও পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা দলগুলো। এবার নিশ্চিত ভাবে আলোচনা করা যেতেই পারে ভারতীয় সংবিধান ও নির্বাচন কমিশন এই দলগুলিকে ‘ছদ্মবেশে’ গণতান্ত্রিক মতামত দেওয়ার বা নেওয়ার অধিকার দিয়েছে কেন? বজরঙ দলের বিনয় কাটিয়ার, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রবীণ তোগাড়িয়া, উমা ভারতী, স্বাধ্বী রীতম্ভরা, মালেগাও বিস্ফোরনে অভিযুক্ত স্বাধ্বী প্রজ্ঞা, মিমের ওয়াইসি, বরাকের বদরুদ্দিন আজমল, জমিয়তের সিদ্দিকুল্লা, পীর পন্থীদের দালাল ‘করে খাও’ গোষ্ঠী, শিখদের আকালী, মারাঠি শিবসেনা- নবনির্মানসেনার মত উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো কীভাবে মূলধারার ভারতীয় রাজনীতিতে দেশপ্রেমিক হিসাবে বিরাজমান হতে পারে সংবিধানের মূল ধর্ম নিরপেক্ষ অনুচ্ছেদকে কাঁচকলা দেখিয়ে

তাহলে একজন স্বল্প শিক্ষিত, জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে পরাজিত, ক্ষুদ্র গণ্ডিতে বেঁচে থাকার লড়াই করা ইসলাম ধর্ম অনুশরনকারী ব্যাক্তিটি উপরে বর্নিত ব্যাক্তিগুলো মত একই ভাবে নির্বাচন কমিশন স্বীকৃত কোনো তথাকথিত ‘মুসলিম প্রাধান্য’ রাজনৈতিক দলের সভ্য, সমর্থক বা প্রকাশ্য অনুশরনকারী হয়ে গেলে তাকে প্রতি পদে পদে দেশপ্রেমের আলাদা করে প্রমাণ দিতে হয় কেন?

ভারতে বাসকরা একজন সংখ্যালঘু মুসলমানের সাথে জাত বা ধর্মের মিল থাকা বাংলাদেশী সাকিব আল হাসান বা পাকিস্তানী ইমরান খান - ওয়াসিম আক্রমকে পছন্দ হওয়া অপরাধ হলে; শ্রীলঙ্কান জয়সুর্য বা মালিঙ্গা, লাতিন আমেরিকান মারাদোনা, পেলে, মেসি, ইউরোপিয়ান রোনাল্ডো, বা মার্কিনি ট্রাম্পকে এক্কেবারে অন্তর দিয়ে ভালবাসলে সেখানে তার দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন উঠা কি উচিৎ নয়?
আসলে যেখানে যা ই হোক, একজন মুসলমান দিনের শেষে সেই মুসলমানই রয়ে যায় রাষ্ট্রের চোখে, তথাপি একজন তথাকথিত হিন্দুও কিন্তু দিনের শেষে মুক্তমনা হয়ে থাকেনা, উল্টে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরশ্রীকাতর এবং পরনিন্দা পরচর্চায় নিজেকে ডুবিয়ে রাখে ছিদ্রান্বেষণ করতে ব্যস্ত থাকে।

বিগত ৭৪ বছর ধরে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানেরা সেকুলার রাজনীতিই করে এসেছে, কিন্তু তার পর! RSS রোজই চেপে ধরছে একটু একটু করে। সকল হিন্দুই হয়ত RSS নয়, কিন্তু যারা নয় তারা মুসলমানকে ঘৃণা প্রদর্শন না করলেও RSS এর বিরোধিতা করেনা। বামপন্থীরা আর লালুপ্রসাদ ছাড়া কেউ ঘোষিত RSS বিরোধী নেই এ দেশে। সুতরাং দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়ে পিছিয়ে যাবার স্থান না রইলে কিন্তু সংখ্যাগুরু মনুবাদীদের দেখানো রাজনীতির পথেই চলে যাবে- উগ্র ধর্মান্ধতাকেন্দ্রিক। এই মিমের উত্থানে সেই ভয়ঙ্কর সময়ের পদধ্বনিই শোনা যাচ্ছে।

এই সব প্রশ্নের উত্তর কেবলমাত্র আগামীই দিতে পারে, আমরা যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী তারা প্রতিটি ভোটের ফলাফল দেখা আর মানুষের শুভবুদ্ধি উদয় হবে এই প্রতীক্ষা ছাড়া উপায় নেই। তবে আসন্ন সময়ে সবচেয়ে বেশি মিমকে নিয়ে যারা ভীত ও অপপ্রচার করবে সে যে মমতাপন্থী তৃণমূলই হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না, তাতে সে যে মুখোশ পরেই থাকুক না কেন। তারাই আপনাকে নানা ভাবে সন্ত্রস্ত করবে মিমের নামে।

পুনশ্চঃ- সিতাই, নাটাবাড়ি, তুফানগঞ্জ, ইসলামপুর, চোপরা, গোয়ালপোখর, চাকুলিয়া, কুমারগঞ্জ, হরিরামপুর, রতুয়া, মাণিকচক, মালদহ, বৈষ্ণবনগর, চাচল, হরিশ্চন্দ্রপুর, মালতিপুর, মোথাবাড়ি, সুজাপুর, ভরতপুর, নওদা, ফারাক্কা, জঙ্গিপুর, সুতি, সামসেরগঞ্জ, রঘুনাথগঞ্জ, লালগোলা, ভগবানগোলা, রানীনগর, রেজিনগর, বেলডাঙ্গা, হরিহরপাড়া, ডোমকল, জলঙ্গী, পলাশিপাড়া, নাকাশিপাড়া, কালীগঞ্জ, চাপরা, মগরাহাট পশ্চিম, ডায়মন্ড হারবার, মহেশতলা, বজবজ, ভবানীপুর, রাজাবাজার, এন্টালি, চৌরঙ্গী, বাদুড়িয়া, আমডাঙা, দেগঙ্গা, হাড়োয়া, বসিরহাট উত্তর, ক্যানিং পূর্ব, মগরাহাট পূর্ব, ভাঙড়, সোনারপুর উত্তর, কসবা, মেটিয়াব্রুজ, কোলকাতা পোর্ট, হাওড়া মধ্য, উলুবেড়িয়া পূর্ব, উলুবেড়িয়া দক্ষিণ, বাগনান, আমতা, জগতবল্লবপুর, ডোমজুড়, পাঁচলা, শ্রীরামপুর, চন্দননগর, চাপদানি, চণ্ডীতলা, জাঙ্গিপাড়া, তারকেশ্বর, আরামবাগ, খানাকুল, পুরসুড়া, পাণ্ডুয়া, তমলুক, ময়না, নন্দকুমার, মহিষাদল, নন্দীগ্রাম, ভগবানপুর, খেজুরি, খড়গপুর সদর, সবং, পিংলা, খড়গপুর গ্রামীণ, ডেবরা, মেদিনীপুর, গড়বেতা, পাঁশকুড়া, খণ্ডঘোষ, বর্ধমান দক্ষিণ, রায়না, জামালপুর, মন্তেশ্বর, কালনা, মেমারি, ভাতার, পূর্বস্থলী উত্তর, পূর্বস্থলী দক্ষিণ, কাটোয়া, কেতুগ্রাম, মঙ্গলকোট, আউসগ্রাম, জামুরিয়া, আসানসোল উত্তর, সিউড়ি, বোলপুর, নানুর, লাবপুর, রামপুরহাট, হাসান, নলহাটি ও মুরারই- এই বিধানসভা কেন্দ্রগুলোর উপরে নজর থাকুক বিশেষভাবে।

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...