এক দেশ, কিন্তু আইন সকলের জন্য এক নয়। দেশে অমৃতকাল চলছে, তাই রাজনৈতিক রঙ অনুযায়ী আইনের প্রয়োগ আলাদা আলাদা।
অর্ণব গোস্বামীর জন্য ছুটির দিনেও স্পেশ্যাল কোর্ট বসে। গ্রেপ্তার হওয়ার
পরদিনই সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি মামলা শোনে, ২৭ জন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও ২৪৬ জন বিজেপির বিভিন্ন স্তরের উঁচু নেতা টুইটে
প্রতিবাদ জানান। বিজেপির মুখপাত্র দিল্লির হেড অফিসে বসে অর্ণবের পক্ষে সাংবাদিক
সম্মেলন করে ইত্যাদি। এগুলো কোনোটাই ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়।
পয়সা মেরে দেওয়া চিটিংবাজ অর্ণবকে সাংবাদিক সাজিয়ে গণতন্ত্র বিপন্ন বলে
প্রচারের ত্রুটি রাখছে না বিজেপির আঁটি সেল আর রিপাবলিক মিডিয়া। কিন্তু আশ্চর্য
ভাবে সমগ্র গোদী মিডিয়া যেন অকাল বিধবার মতো
মৌনতা অবলম্বন করেছে। পাবলিক কী
জানে অর্ণব আসলে কে? যারা বিচারপতি
তারাও কী জানেন ‘অর্ণব
কী ও কেন’?
যে মামলায় অর্ণব গ্রেফতার হয়েছে সেটা সাংবাদিকতার কারণে নয়, সিম্পলি গায়ের জোরে টাকা না দেওয়ার মামলা। তৎকালীন বিজেপির ফড়নবিস সরকারকে দিয়ে মামলা দ্রুত ধামাচাপা দিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু পাপ যে বাপকে ছাড়বে না, কর্মফল পেতেই হবে। অবশ্য তাতে কি, বিজেপি থুড়ি RSS শাসিত সুপ্রিম কোর্ট আছে যাদের, তাদের কোনো চিন্তা নেই। সুপ্রিম ভাঁড়ামোর বিরুদ্ধে বেশী কিছু বললে আবার আমাকে ডিফেমেশনের দায়ে জেলে ভরে দেবে।
বিগত কয়েকটা বছর ধরে অর্ণব সাংবাদিক সেজে প্রতিটি দিন সমাজের বুকে ঘৃণার
চাষ করে গেছে। রোহিত ভেমুলা হোক বা নাজিব, গৌরী লঙ্কেশ, দাভালকর, কাফিল খান বা হালের রিয়া চক্রবর্তী- প্রত্যেককে
দেশদ্রোহী সাব্যস্ত করেছে মিডিয়া ট্রায়ালে- নিজেকে বিচারকের আসনে বসিয়ে। দিল্লি দাঙ্গায়
অভিযুক্ত অনুরাগ ঠাকুর, রামভক্ত গোপাল, কপিল মিশ্রদের মহান সাজিয়ে, মিথ্যা মামলাতে
গ্রেপ্তার হওয়া উমর খালিদ, গুলফিজাদের দেশদ্রোহী বানিয়ে রোজ খাপ পঞ্চায়েত বসিয়েছে।
প্রতিদিন কাউকে না কাউকে সে ভিক্টিম বানিয়েছে
যারা সরকারের সমালোচনা করেছে, বিজেপির
সমালোচনা করেছে।
বিজেপি বিরোধী যেকোনো নেতা বা সমাজকর্মীকে নাম ধরে ডাকা, তাচ্ছিল্য, তুই-তোকারি, ছাল ছাড়াব, মামার জন্ম, থেকে এমন কোনো ইতরামি নেই যা লাইভ টিভিতে অর্ণব গোস্বামী করেনি। সারাক্ষণ
সে RSS
এর প্রোপাগান্ডার পক্ষে সমাজের বুকে মুসলমান ও
মসজিদকে নিয়ে ঘৃণার বর্বরতা ছড়িয়েছে। দলিতদের অপমান করেছে, বিরোধীদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বদলে শত্রু হিসাবে
সম্প্রচার করেছে টিভিতে। মিথ্যা TRP দেখিয়ে বিজ্ঞাপন
আদায় করে তা দিয়ে সমাজে বিভাজন তৈরি করেছে বিজেপির ভোট ব্যাঙ্কের স্বার্থে।
অর্ণবকে ধ্রুবক মেনে আমিশ দেবগন, দীপক চৌরাসিয়া, সুধীর চৌধুরী, রজত শর্মা, অঞ্জনা কাশ্যপ, নবীকা কুমার, রুবিকা লিয়াকত সহ না-জানে এমন কত শত হাজার অসভ্য
সাংবাদিকতার নামে সমাজের বুকে বিষ ঢেলে যাচ্ছে রোজ। আজ এদের চোখে মুখে স্পষ্ট
আতঙ্ক,
প্রেসবক্সে শ্মশানের নিরবতা। আগামীদিনে একমাত্র দিল্লি ছাড়া গোদি মিডিয়া
আর কোথাও অফিস খুলবেনা, যেখানে শুধুমাত্র অমিত শাহের পুলিশ থাকবে। দিনের পর দিন এরা গুণিতক হারে নির্লজ্জতা ও বর্বরতা
প্রচার প্রকাশ করে যাচ্ছিল। ৪টে দিনের জন্য হলেও এতে কিছুটা বাঁধ পরেছে।
প্রকৃতি নিজেই সাম্য এনে দেয় প্রতিটি ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে দেশজ মিডিয়ার এই পতিতাবৃত্তিতে পুনরায়নীভবন ঘটানোর জন্য মহারাষ্ট্র সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা বিতর্কহীন ভাবে সাধুবাদযোগ্য। ক্ষমতাবান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যার নামে বিচারক খুনের অভিযোগ, তার জামানায় অর্ণবকে জেলে ভরা বাপের ব্যাটার কাজ, বুকের পাটা লাগে। অবশ্য সোহরাউদ্দিন হত্যা মামলার বিচারপতি মাননীয় লোয়া’ই শুধু খুন হননি, সোহরাবুদ্দিনের স্ত্রী কাউসার বানু, সেই মামলার উকিল প্রকাশ শ্রীকান্ত ও মামলার সাক্ষী তুলসিরাম- সকলকেই মার্ডার করিয়েছে তড়িপাড়। খোদ বিজেপির হারিন পান্ডিয়া, প্রমোদ মহাজন, গোপিনাথ মুন্ডে এদের এক্সিডেন্টের কোনো বিচার হয়েছে মোদী-শাহ এর আমলে? মনোহর পারিক্করের রহস্য মৃত্যুর কারন কেউ জানিনা।
অর্ণবকে গ্রেফতার করে সমাজে বার্তাটা দেওয়া জরুরি ছিল এবং সেটা পৌঁছেছে। সব বিচারক যে এখনও রঞ্জন গগৈ হয়নি তা আজকের দিনটা প্রমাণ করে। ‘সংবিধানের ধর্ষকের’ যদি মুখ থাকতো সেটা রঞ্জন গগৈ অবশ্যই। যদিও জাস্টিস বোবদে তুলনামূলক নিরপেক্ষ, কিন্তু আগামীর জাস্টিস চন্দ্রচূড়, জাস্টিস খান্না, জাস্টিস রামান্না ও জাস্টিস গাভাই কে নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে, এনাদের অতীতের কাজকর্ম যথেষ্ট সন্দেহজনক যা সঙ্ঘপন্থী। এনারাই আগামী পাঁচ বছর ধরে বিচারব্যবস্থার শীর্ষ পদে আসীন হবেন। ভারতীয় বিচারব্যবস্থাকে আজও সাধারণ মানুষ তাদের ভরষার শেষ জাইগা বলে বিশ্বাস করে নির্দ্বিধায়। সুতরানং গণতন্ত্র বেঁচে থাকবে কিনা, কিম্বা থাকলেও কীরূপে থাকবে তা আগামীর এই বিচারপতিদের উপরে নির্ভর করবে অনেকটাই।
অর্ণব গোস্বামী নিশ্চয়ই কয়েকদিনের মাঝে জামিন পাবে। বিজেপি সর্বস্ব শক্তি
দিয়ে তাদের মাউথপিসের মুক্তি ঘটাবে। প্রকাশ্যে তার বিষদাঁত না ভাঙলেও বাকিদের অল্পবিস্তর ভয় ধরবে। কারন বাকিরা যদি জেলে
যায়,
তাদের হয়ে হরিশ সালভের মত উকিলকে নিয়োগ করাবে কে? ছুটির দিনে সারাদিন কোর্টে শুনানি কে করাবে? কে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে মামলা পৌঁছাবে ২৪ ঘন্টার
মধ্যে?
সুতরাং, একটা অর্ণবের মাথা ধরতেই দেশজ
মিডিয়ার গোটা দেহটাতে বার্তা পৌঁছে গেছে শিরায় শিরায়। নতুবা সুধীর চৌধুরী প্রাইম
টাইমে 'ক্যায়া পত্রকারিতা ছোড়নেকা সময় আ গ্যায়া' বলে অনুষ্ঠান করত না। কোথাও কোনো চ্যানেলে অর্ণবকে নিয়ে কোনো খবর নেই, এক রিপাবলিকেই অর্ণব ছাড়া অন্য খবর নেই। বিজেপির OPindia বা নাগপুরের মুখপত্র ছাড়া প্রত্যেকেই খুশি প্রকাশ্যে বা
গোপনে। জেলে যাওয়ার পর অর্ণবের প্যান্টটুকুই অবশিষ্ট থাকবে, কারণ যে জেলে গেছে তারা জানে সেখানে কি কি ঘটে এমন
পয়সাওয়ালা 'হেটমঙ্গার' দের সাথে। এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম ঘটবে না বলেই আমার
বিশ্বাস।
দ্যা’ওয়্যার রিপোর্ট করেছে ৫০০ সাংবাদিকদের বিষয়ে, যারা লিখেছে- 'আমি নিজে সাংবাদিক, তাই অর্ণবের
বিরুদ্ধে,
কারণ সে সাংবাদিকের পোষাক পরে হিংস্র
অসভ্যতামি করে'। ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করি, নাগপুরের একটা অংশের অদৃশ্য
সায় আছে এই গাম্বাটটাকে সায়েস্তা করার। কারণ চৌকিদারের ‘মালিক’ আম্বানির রিলায়েন্সের News18 মিডিয়া গ্রুপ বাজারে নেমেছে অনেকগুলো শীর্ষস্থানীয় প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও টিভি মিডিয়া কিনে। আদানিও কিছু ‘রেডি চ্যানেল’ কেনার দোর প্রান্তে। সুতরাং
অর্ণবদের বলিপ্রদত্ত হওয়ার সময় এসে না গেলেও, গুরুত্ব কিছুটা কমাতেই হবে, তাই বিজেপি টুইট করেই দায় সেরেছে।
১৩% এর ভোটব্যাঙ্ক ওয়ালা বিজেপি
৩৩% হয়েছে, ভোট প্রক্রিয়াতে দুর্নীতি আর এই নিউজ মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়ার ঘৃণার চাষের দৌলতে। তাই বিজেপি আজ ন্যাংটা হয়ে বিক্ষোভ করছে নিচু স্তরে, কিন্তু উপরের নেতারা আম্বানী পিতার নির্দেশে চোখে পট্টি
বেঁধে নিয়েছে। ব্যাস, খেল খতম-
যদিও বাজার গরম রাখার চেষ্টায় ঘাটতি নেই ‘পমেরিয়ান’
মিডিয়া ও আঁটি সেলের, তারা টুইটার মাতিয়ে রেখেছে। কিন্তু টুইট করে তো আর জামিন হয় না। বেচারা
হরিশ সালভে- নতুন বিয়ে করা বৌয়ের সাথে মধুচন্দ্রিমাটুকু স্বচ্ছন্দে সারতে পারলেন
না। প্রসঙ্গত সালভে বাবু আধুনা খ্রীস্টান হয়েছেন ও বর্তমানে ইংল্যান্ডের নাগরিক।
দেশের বিচারকেরাও এই আবহাওয়াতেই শ্বাস নেন যেখানে আমি আপনি নিই, তারাও কি অর্ণবের এই বর্বরতার পক্ষে? পক্ষে হলে আজ অর্ণব মুক্ত হতো, সকলেই কি আর রঞ্জন গগৈ? তারপরেও বিশ্বাস নেই, আজ হয়নি ঠিকিই,
কাল হবেনা কে জানে! সুপ্রিম কোর্টের উপরে ভরষা নেই। তবে, বিজেপির পূর্ণ ক্ষমতায় যদি অর্ণবের এই দশা হয়, কাল বিজেপি যখন কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকবেনা তখন আজকের এই
ঘৃণাচাষিরা কোথায় থাকবে? যারা মাপার তারা
জল মাপছে ঠিকই।
মোদিজী নিজেই স্বাধীন মিডিয়াতে বিশ্বাস রাখেননা, নতুবা তিনি সাংবাদিক সম্মেলন করতেন। তার পরেও যারা বিশ্বাস রাখে সংবাদমাধ্যমে, তাদের জন্য গোদী মিডিয়াকে তিনি স্বযত্নে লালন করে- পুঁই এর লতার মত কলেবড়ে বাড়িয়ে তুলেছেন। অতি বাড়ও বাড়তে নেই, ঝড়ে ভেঙে যাবে। গোদী মিডিয়া সেটা একদিন প্রমাণ করবেই করবে ইতিহাসের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে। অর্নব যদি সুপ্রিম কোর্ট থেকে বাইচান্স অনৈতিকভাবে জামিন পেয়ে যায়, তাহলে রবিশ কুমারদের মত সাংবাদিকদের কিন্তু চাকরি নিয়ে টানপারাপারি পরে যাবে আগামীতে। এর সাথে আরো অনেকেই চাকরি খোয়াবে, কারন তখন বিষয়টা গদি মিডিয়ার মাস্টারদের মনোপলি হয়ে যাবে। যা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর হবে গণতন্ত্রের জন্য।
বোম্বে হাইকোর্টে সাওয়াল জবাবের সময় বিজেপি পক্ষের আইনজীবি- সালভে, পন্ডা ও আগরওয়াল প্রচুর সাওয়াল জবাব করেও জামিন হাসিল করতে পারেনি- টাকা মেরে দেওয়া ও খুনের প্ররোচনা দেওয়া বিজেপির মুখপাত্র অর্ণব গোস্বামীর। হয়ত জামিন পেয়েও যেত, মনে হচ্ছিল এক সময়, কিন্তু হরিশ সালভে- অর্ণবকে সাংবাদিক বলতেই সব কেঁচে যায়।
মহারাষ্ট্র সরকার ও নিহতের মেয়ের আইনজীবি বললেন- সেই ১৬ জন সাংবাদিকদের কথা, যাদের সাথে দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশের কোর্ট সহ সুপ্রিম কোর্টের যেমন মনোভাব দেখিয়েছে- সেটাই কেন
অর্ণব গোস্বামীর ক্ষেত্রেও লাগু হবে না? কেন্দ্র সরকারই তো এই মামলা গুলোর
বেশিরভাগটা চালাচ্ছে। আজ দেড় মাসের অধিক সময় জেলবন্দি উমর খালিদ সহ আরো ৭-৮ জন, এদের
ট্রায়াল কবে শুরু হবে কেউ জানেনা। মোদী সরকারের ইচ্ছানুযায়ী আইন চললে- আগামী ৫-৭ বছরেও
এরা কেউ জামিন পাবেনা, পাশাপাশি কপিল মিশ্রেরা আগামীতে মন্ত্রী হবে।
তবে ঠিক এই মুহুর্তে
যা ঘটছে তা চরম বিনুদুন। অন্যকে নিয়ে খাপ বসিয়ে তামাশাকারী
আজ নিজেই তামাশার পাত্র। তবে এতে হবে না, পাতি ক্যালানি দরকার। সিম্পলি কম্বল ধোলাই, সব রোগ সেরে যাবে। একটা ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে- অর্ণব মসজিদের
বাইরের ভিড় নিয়ে মুসলমানদের টার্গেট করেছে, অথচ তার আগে নমস্তে ট্রাম্প নিয়ে মুখে কুলুপ ছিল। নমস্তে ট্রাম্পই দেশে
করোনার বিস্তার ঘটিয়েছে, সেখানে উপস্থিত
৬৮% মানুষ করোনা আক্রান্ত ও ১৭% মানুষ মৃত। তথ্যই যথেষ্ট।
আরেক ভিডিওতে একজন মুসলমানকে বলছে- আজ তুই আমার পেঁয়াজ, তোর ছাল ছাড়াব। কর্মফল, অর্ণব আজ জেলে- রিয়া চক্রবর্তীর জন্য ৩০৬ চেয়ে চেয়ে আজ নিজেই সেই জালে
বন্দি। এই
কারণেই আলিবাগ আদালত অর্ণবকে জেল কাস্টডিতে পাঠালেও পুলিশ তাকে কোয়ারেন্টিনের
দোহাই দিয়ে রায়গড়ের একটা প্রাথমিক স্কুলের ঘরে রেখে দিয়েছে। উদ্দেশ্য পরিষ্কার, মনের সুখে ক্যালাবে গোটা দীপাবলি জুড়ে যদিনা জামিন পায়।
ইয়েস, এটাই তো প্রকৃতির ন্যায়। আমরা কেউ
এর বাইরে নই।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন