বেনিয়া মোদী সরকার রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি আম্বানি-আদানির কাছে বেচতেই পারদর্শী, দেশজ অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে বৃহন্নলা।
আমরা সাধারণভাবে জানি যে আমাদের দেশ বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অস্ত্র আমদানিকারক হিসাবে শুধুই অস্ত্র আমদানি করে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইজরায়েল ও ইউরোপের হরেক দেশ থেকে। কিন্তু আমরা অস্ত্র রপ্তানি তথা এক্সপোর্টও করি বিশ্বব্যাপী। মূলত কমদামী প্রযুক্তিগত অস্ত্র, গোলাবারুদ, ছোট আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক, প্যারাসুট, চামড়া জাত সামগ্রী, সামরিক পোশাক ইত্যাদি ৪২টিরও বেশি দেশে নিয়মিত সাপ্লাই করে আমাদের অর্ডিনান্স ফ্যাক্টরি ও DRDO। এছাড়া হ্যাল, ভারত ইলেকট্রনিক্স, কোচিন শিপইয়ার্ড এর মতো এমন ডজন খানেক সংস্থা রয়েছে, যারা ২০১৪-১৫ অর্থবর্ষে ২ হাজার কোটি টাকার মতো মুনাফা করেছিল অস্ত্র সামগ্রী রপ্তানি করে।
এই অস্ত্র রপ্তানি বলার মতো করে শুরুটা হয়েছিল ২০০৭ সালে। মনমোহন মন্ত্রীসভার দুটো অধ্যায় জুড়েই প্রতিরক্ষা মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব সামলেছিলেন ‘এ কে অ্যান্টনি’। আমাদের দেশজ অস্ত্রভান্ডারকে তিনি আধুনিক করতে পারেননি নতুন সমরাস্ত্রে- এই গুরুতর অভিযোগ থাকলেও, অস্ত্র রপ্তানি থেকেও রাজস্ব আমদানি সম্ভব সেটার শুরুটা করতে পেরেছিলেন। কারণ আমাদের দেশে উন্নত প্রযুক্তিবিদের অভাব কখনই ছিল না, সেটাকেই অ্যাসেম্বল করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি।
এ যাবত এ সকল কিছু কেউই সেভাবে ঢাকঢোল বাজিয়ে প্রচার-প্রকাশ করেনি। এর পর মোদীজি এলেন দেশের শীর্ষপদে, যিনি নেহেরুকেই ঢাকের মতো পেটাতে থাকেন সকাল-বিকেল, সেখানে নিজের ঢাক যে উন্মাদের মতো পেটাবেন তাতে আর আশ্চর্য কি!
কর্ণাটকে কুমারাস্বামী সরকারকে ফেলে দেওয়ার জন্য যখন মার্চে লকডাউন পিছিয়ে রেখে সংসদ খুলে রাখা হয়েছিল, সেই সময় রাজ্যসভাতে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রোজেক্টের সফলতা তুলে ধরতে কিছু তথ্য দেন মোদীজি। সেখানে দাবী করা হয়েছিল গত ২ বছরে ৭০০% অস্ত্র রপ্তানি বেড়েছে, আগামী ৫ বছরে অস্ত্র রপ্তানি থেকে ১ লক্ষ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে তাঁর মন্ত্রিসভা। বিদেশী মিডিয়া সহ sipri.org মোটেই পাত্তা দেয়নি মোদীজির এই গুলগল্পকে, কিন্তু গোদী মিডিয়ার উল্লাসের খামতি ছিল না এটার ঢালাও প্রচারে।
এবারে সটান চলে আসুন নভেম্বর ২৪, ২০২০ তারিখে। ভারতের সাথে অস্ত্র খরিদের চুক্তি বাতিল করলো ৩২টি দেশ। দেশের কোনো সংবাদ মাধ্যমে আর এই খবরটা বেঁচে নেই, যেখানে আছে সেই লিঙ্কগুলোও বন্ধ করে দিয়েছে কী-ওয়ার্ড সহ। এই অর্ডারগুলোর মধ্যে ছিল- অস্ট্রেলিয়ার কার্তুজ সাপ্লাই, আজারবাইজানের হেডগার এবং হার্ড আর্মার প্লেট সাপ্লাই, জার্মানিতে হেলমেট সাপ্লাই, বোমা দমন কম্বল এবং নরম বর্ম প্যানেল সাপ্লাই, গিনির স্লিপিং ব্যাগ, মর্টার শেল কভার সাপ্লাই। ইসরায়েল, নেদারল্যান্ডস এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হার্ড আর্মার প্লেট, সিঙ্গাপুরে আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র সহ রাডার পার্টস, বুলেট প্রুফ ওয়েস্টস এবং হেলমেট সাপ্লাই, দক্ষিণ আফ্রিকাতে ডিটোনেটর এবং থাইল্যান্ডের নাইট ভিশন বাইনোকুলার সাপ্লাই ইত্যাদি দেশের সব অর্ডার বাতিল হয়ে গেছে, যা কয়েক লক্ষ কোটি টাকারও বেশি অর্থমূল্যের।
বলাই বাহুল্য এই সব অস্ত্র বানানো ফ্যাক্টরিগুলো যে ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়েছে তাদের টাকা শোধ দিতে পারবে না সহজে, হয়ত কেউ কেউ দেউলিয়া হবে। কিন্তু এরা কোন কোম্পানি? না, হ্যাল, অর্ডিনান্স ফ্যাক্টরি, DRDO বা এমন কোনো সরকারি কোম্পানি এই অর্ডারগুলোর সিংহভাগ পায়নি। পেয়েছিল রাতারাতি গজিয়ে ওঠা অনিল আম্বানির ‘রাফাল মেন্টেনেন্স’ কোম্পানির মতো ‘গুজরাটি’ সংস্থা। সেগুলোর নাম লিখে প্রোফাইল খোয়ানোর শখ নেই আমার, নেটে সার্চ দিলেই সব তথ্য পেয়ে যাবেন- যদি জানার ইন্টারেস্ট থাকে। বলে দেওয়ার দরকার নেই- কারা লাভের গুড় খেতো এই কোম্পানিগুলোর বকলমে। ফলস্বরূপ অস্ত্রের কোয়ালিটিতে কোম্পানিকে এডজাস্ট করতে হয়েছিল ‘মুনাফা’ বজায় রাখতে। আর এখানেই ফস্কে গেছে হাতের মোয়া-
কিন্তু ধরা পরল কীভাবে, যাতে এতগুলো দেশ একসাথে এমন সমবেতভাবে সিদ্ধান্ত নিল?
নাগোর্নো-কারাবাখ যুদ্ধে আর্মেনিয়ার ব্যাপক ক্ষতি হয়। দেশটি প্রায় ১৮৫টি ট্যাঙ্ক, ৯০টি সাঁজোয়া যুদ্ধযান, ১৮২টি কামান, ৭৩টি মাল্টিপল রকেট লঞ্চার, ২৬টি সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল সিস্টেম, ১৪টি রাডার ও জ্যামার, একটি এসইউ-২৫ যুদ্ধবিমান, শ’খানেক ড্রোন ও ৪৫১টি সামরিক যান হারিয়েছে বলে মিলিটারি এফেয়ার্স ব্লগ-অরিক্সের বিশ্লেষক ‘তিজিন মিৎজার’ জানিয়েছেন। এই যুদ্ধে আজারবাইজানের অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র সহ ড্রোনগুলো ব্যাপক পারদর্শিতা দেখায় এবং আর্মেনিয়ার প্রত্যেকটি প্রতিরক্ষা ব্যুহকে গুড়িয়ে দিয়েছে কার্যত।
আসলে আর্মেনিয়া সেনাবাহিনীর অধিকাংশ অস্ত্র, গোলাবারুদ সাপ্লাই করেছিল মোদীর ভারতের ‘বেনিয়া’রা। এমনকি DRDO এর বানানো ‘স্বাথী রাডার’ও নাকি সেখানে বিলকুল ফেল মেরেছে তুরস্কের বানানো সমরাস্ত্রের কাছে। আর্মেনিয়া সরকার অফিশিয়ালি তথ্য চেপে রাখলেও, আর্মেনিয়া সেনার ব্লগে ভারতীয় অস্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধং দেহী মনোভাবে প্রবন্ধ লেখা হয়েছে। প্রসঙ্গত, চলতি বছরের মার্চে ভারতের সঙ্গে অস্ত্রচুক্তি করেছিল আর্মেনিয়া। আর কি, মোদীজী তাঁর রেকর্ড অক্ষুণ্ণ রেখে দিলেন এক্ষেত্রেও। তিনি যেখানেই হাত দিয়েছেন, ঘটা করে যার প্রচার করেছেন- তাকে কবরের অতলে না পাঠানো পর্যন্ত ক্ষান্ত দেননি। এখানেও সেটাই ঘটেছে।
কড়িনিন্দা সিং এর তরফে কোনো প্রতিক্রিয়া না পাওয়া গেলেও প্রতিরক্ষা রাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রীপাদ নায়েক জানিয়েছে- আমরা দেখছি। বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্করও ক্ষত মেরামতে সচেষ্ট হয়েছেন, কিন্তু কতটা লাভের হবে তাতে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয়, যতটা না আমাদের দেশীয় অস্ত্রের ব্যর্থতা- তার চেয়েও বেশি মোদীর কূটনৈতিক ব্যর্থতা। ট্রাম্প ক্ষমতাচ্যুত হতেই মোদীর আন্তর্জাতিক গ্রহনযোগ্যতা তলানিতে পৌঁছেছে, এর প্রভাবেই এইভাবে একঘরে হয়ে যাওয়া হলেও আশ্চর্যের কি!
তথ্যসূত্রঃ
১) https://www.livemint.com/.../india-now-exports-defence...
২) https://theprint.in/.../modi-govt-made-defence.../383476/
৩) https://eurasiantimes.com/armenia-blames-poor-indian.../
৪) https://idrw.org/armenia-to-get-swathi-weapon-locating.../
৫) https://www.sipri.org/.../usa-and-france-dramatically.../
৬) https://www.ddpmod.gov.in/.../files/New%20SOP0001_2.pdf
৭) https://sidm.in/.../1582713845_Enhancing_Indias_export.pdf
৮) https://www.oryxspioenkop.com/
৯) https://www.rand.org/topics/military-affairs.html
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন