সোমবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২০

বিহার নির্বাচনঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ২



দ্বিতীয় পর্ব

আশ্চর্যজনক ভাবে অমিত শাহ্ কোনো সভা করেননি এই বিহার নির্বাচনে, মোদীজি প্রতিটি দফায় মাত্র ৪টে করে র্যালি করেছিলেন। যোগীর মতো স্টার ক্যাম্পেনারও ৩ দিনে ১৮টা র্যালি করেছিলেন। বিজেপি ও নীতিশ কুমারের প্রতিটি সভায় উপস্থিত মানুষের চেয়ে গ্রামের বাজারে মাদারির খেলা দেখতে বেশি মানুষ হয় এটার সাক্ষী গোটা পৃথিবী ছিল; কিন্তু তেজস্বীর সভায় যে ভিড় হয়েছিল সেটা শুধুমাত্র হেলিকপ্টার যে দেখতেই সেটাও প্রমাণিত গত ১০ই নভেম্বরের ফলাফলে।

সারা পৃথিবীতেই জাতপাতের নিরিখে ভোট হচ্ছে, তা আমেরিকা হোক বা বিহার; কালো-সাদা দ্বন্দ্ব RSS এর হিন্দু মুসলমানের চেয়ে কম কিছু নয়। সুতরাং উন্নয়নের গল্প শুনিয়ে ভোট চাওয়ার কোনো কারণ আগামী দিনে থাকবে বলে মনে হয় না। অবশ্য গণতন্ত্রই কদ্দিন থাকবে সেটাও গবেষণার বিষয়, চীন তো ছিলই এখন রাশিয়া, ইজরায়েল সহ বহু দেশই একনায়কতন্ত্রের দিকে যাচ্ছে। RSS তথা বিজেপিও অখন্ড ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে। এই সংক্রান্ত বিষয়ে যোগী আদিত্যনাথ দারুণ সৎ, কোনো ভণিতা রাখে না ভোটপ্রার্থীর হয়ে প্রচারে, যা মনে সেটাই মুখে বলে দেয়। যোগীর হিসাবে- গণতন্ত্র তো থাকবেই, কিন্তু ভোট আমার বাইরে কাউকে দিলে তাকে ঘৃণায় মেরে সরকার আমরাই গড়ব, শাহ্‌নামায় অবশ্য একটা বিকিকিনি অধ্যয় রয়েছে। আধুনিক ভারতীয় গণতন্ত্রের এটাই সংজ্ঞা। প্রাচীন গণতন্ত্রের যারা জনক ছিল তাদের ভাবনাতেও ছিল না এমনটা কখনও ঘটতে পারে, থাকলে এগুলোকে রোখার জন্য নিশ্চই কোন মৌলিক আইন থাকতো।

আগামী ২০২১ এ আমরা আমাদের বাংলাতে এক অভূতপূর্ব নির্বাচন দেখতে যাচ্ছি। আমাদের অতীতের যে সকল ধ্যান-ধারণা ছিল তার অধিকাংশই গুলিয়ে যাবে নিশ্চিত। চলুন সে বিষয়ে কিছুটা আলাপ করার প্রচেষ্টা করি ইতিহাস, মিম, বিহার ও বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশের নিরিখে।

এ দেশে পঞ্চাশে দশকের শুরুতে জনসঙ্ঘ সেই যে সন্ত্রাসবাদী রাজনীতি শুরু করেছিল তা নানান উত্থান-পতনের সাথে তালমিলিয়ে শেষমেশ ১৯৮০ সালে বিজেপি নামে পরিণতি পায়। ইন্দিরা গান্ধী যে শুধু পাকিস্তানকেই ভেঙে দু’টুকরো করেছিল তা নয় RSS কেও ঘোল খাইয়ে দিয়েছিল। ‘এমার্জেন্সি’ হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসী জনসঙ্ঘকে- জনতা পার্টিতে মিশিয়ে দিয়েছিল, এবং এমার্জেন্সি উত্তর নির্বাচনের পরপরই ইন্দিরা কূটনীতি জনতা পার্টিও ভেঙে দেয়। জনতা পার্টি থেকে বিচ্ছিন্ন বাজপেয়ী-আদবানী জুটি মিলে ‘রাম’ কেন্দ্রিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির জন্ম দিয়েছিল ‘হে রাম’ গান্ধীর দেশে, যেখানে জনসঙ্ঘের পূর্বতন সন্ত্রাসী কার্যকলাপ সম্পুর্ণ অক্ষুণ্ণ ছিল।

গান্ধীবাদী সেকুলার অহিংস নীতির উল্টোপিঠে জন্ম নেওয়া ‘জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমের’ ভেকধারী ‘সন্ত্রাসী’ দলটি ২০১৪ সালে এসে ভারতের জনগণকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে সাড়ে ১৯ কোটির মুসলমানের জন্যই ৯৭ কোটি ‘হিন্দু’ বিপদে আছে। আসলে এই সন্ধিক্ষণেই আগামীর ভারতবর্ষের রূপরেখা আঁকা হয়ে গিয়েছিল, যার পরিণতি আজকের বিহার ভোট ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়। সুতরাং আগামীর বাংলা, আসাম ও উত্তরপ্রদেশের ভোট সহ প্রতিটা নির্বাচনই যে তীব্র সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের মধ্যেই সম্পন্ন হবে তার জন্য জোত্যিষ চর্চার প্রয়জনীয়তা নেই।

স্বাধীনতা উত্তর দীর্ঘ কংগ্রেসী শাসনামলে তারা নিজেরা নরম হিন্দুত্বের পথেই ছিল, এদের পাশাপাশি যেমন হিন্দুত্ববাদী জনসঙ্ঘ ছিল তেমন কয়েকটি র্যাডিকাল ইসলামী রাজনৈতিক দলও ছিল, মুসলিম লিগ, জমিয়ত উলামা, মুসলিম মজলিশ, মুসলিম ফোরাম, উলামা কাউন্সিল, মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন ইত্যাদি। এদের প্রত্যেকের নামের সামনে একটা ‘অল ইন্ডিয়া’ ট্যাগ লাগানো ছিল, যতই এদের অনেকের অস্তিত্ব একটা মাত্র কমিউনিটি ব্লক বা তার একটু বেশি- সর্বোচ্চ একটা বিধানসভা কেন্দ্রের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। এই হিসাবে আজকের তৃনমূল দাবী করতেই পারে যে, আমাদের সামনে অল ইন্ডিয়া লাগালে কেন মিম (meme) করা হয়।

হ্যাঁ, মিম তবে তা AIMIM। এটাই আসলে আলোচনার মূল বিষয় বস্তু, উপরের গোটা আলাপটা এটারই ভণিতা ছিল। বিহারে জিতেছে বিজেপি, হেরেছে নীতিশ, দাম-দর করার মতো স্থানে ভিআইপি আর হাম, স্বপ্ন ভেঙেছে তেজস্বীর আর মন্দিরের সামনে শুয়ে থাকা হাত-পা হীন অন্ধ বধির ভিখারির মতো রয়েছে কংগ্রেস। কংগ্রেসের অবস্থা হচ্ছে রাজনৈতিক রমনে সে চড়ার স্থানে তো নেই মোটেই, উল্টে কতজনের সাথে, তাদের নিচে শুতে হবে সেটা তাদের কাছে ভাবনার।

কোথায় তেজস্বী কীভাবে ‘তড়িপার শাহ্’ এর ‘গণতান্ত্রিক’ সূত্র মেনে কীভাবে মুখ্যমন্ত্রী হতে পারে সেই আলোচনা করবে, কেন জিতিনরাম মাঝি স্বরাষ্ট্র দপ্তর চেয়েছে বিজেপির কাছে, কেন বিজেপি এতগুলো আসন পেয়ে নীতিশকে মুখ্যমন্ত্রীত্ব দিল, কেন দুজন উপমুখ্যমন্ত্রী গুঁজে দিয়েছে অমিত শাহ্‌, কোন দামে মাঝী-মাল্লাদের নেতা মুকেশ সাহানি তেজস্বীর কাছে বিক্রি হবে আগামীতে- সে সব নিয়ে তেমন আলাপই নেই সর্বভারতীয় মিডিয়াতে; এরা কেউই আলোচনায় নেই জনগণের, রাষ্ট্রীয়ভাবে। আলোচনার একটাই লক্ষ্য, আর তা হলো মিম।

...ক্রমশ 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...