বিহার নির্বাচনের প্রেক্ষিতে দলগুলির অবস্থান ও পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
দেশ রামরাজ্য হোক বা না হোক, দেশজ অর্থনীতি সীতাকে অনুসরণ করে পাতাল প্রবেশ করা শুরু করেছে সাফল্যের সহিত। তার অন্যতম কারণ হিসাবে যে ঢালের আড়ালে ব্যর্থ কেন্দ্রীয় সরকার নিজেকে লুকাবার দাম্ভিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, সেই ‘লকডাউনের’ ভয়াবহ পরিস্থিতি পেরিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিচয়বাহক ‘ভোট’ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বিহারে।
কোন বিহার? যে বিহারের জনগণ রাজ্যের আয়তনের অনুপাতে সবচেয়ে বেশি জন মানুষ ভিনরাজ্যে কাজে যায়, দেশের মোট পরিযায়ী শ্রমিকের মধ্যে অবস্থিত- উত্তরপ্রদেশের ৩১% এর ঠিক পরেই বিহারের ১৬%।
আমাদের পশ্চিমবঙ্গ এই তালিকার প্রথম সাতে নেই, কিংবা থাকলেও নথি নেই। সেখানে উপরোক্ত দুটো রাজ্যের পরেই রয়েছে- রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, ছত্রিশগড়। বিহারে ৪০টা লোকসভা আসন, উত্তরপ্রদেশে ঠিক তার দ্বিগুণ- ৮০টা, এই হিসাবেও বিহারই আনুপাতিক হারে বেশি পরিযায়ী শ্রমিকের যোগান দেয় এই দেশে।
কেন্দ্র সরকারের অপরিকল্পিত লকডাউন ও তাকে কেন্দ্র করে ঘটানো রাষ্ট্রীয় সার্কাসের পরে যে সকল পরিযায়ীদের আর পুরাতন কাজটি ফেরেনি, তাদের মোট পরিমাণটা scroll মিডিয়ার এক সমীক্ষার মতে প্রায় ১২৪ মিলিয়ন, মানে কোটির হিসাবে সাড়ে বারো কোটির একটু কম। এটা প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক, যা খুঁজে পাওয়া গেছে, এর বাইরে থাকা হিমশৈলের পরিমাণ কেউই জানে না। যিনি দিতে পারতেন তথ্য- তথা যার রাখার কথা, তিনি ময়ূরকে দানা খাইয়ে দাড়ি বাড়িয়েছেন, মার্গদর্শকমন্ডলীর চেয়ারম্যানের হাতে জন্মদিনের ক্ষীর খাওয়ার আগেই দায় ঝেড়ে বলে দিয়েছেন- “মিত্রো, ডেটা নেহি হ্যাঁয়- due to act of God”.
তো যাই হোক, ভোটের দামামা বাজল, ভোটও হলো। বুথ জ্যাম, ছাপ্পা, বোমাবাজি তথা রক্তপাতহীন ভোট দেখে ‘সঙ্গে সুমনকে’ রাখা আম বাঙালির চোখ তো বটেই, বাকি আর অনেক কিছুই যা অঙ্কদেশের জিনিসপত্র, তা দিব্যি মাথায় উঠে গেছিল। এমন শান্ত ভোটও সম্ভব, তাও বিহারে! বিহার আর যাই হোক পশ্চিমবঙ্গ যে নয় সেটা তারা প্রমাণ করে দিতে পেরেছে, তাতে তাদের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশই হোক বা তেজস্বী- তাদের এই পরিবর্তনটার জন্য বিজ্ঞাপন দিতে হয়নি, মানুষ বুঝে গেছে।
মার্কিন মুলুকে ডোনাল ট্রাম্প হারতেই করোনা ‘আল-গায়েব’ হয়ে যাওবার উপক্রম হয়েছে, ভ্যাকসিন কোম্পানিগুলো টাকা কামাবার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাবার জন্য করোনা রয়ে গেছে কেবল পরিসংখ্যানে, তাই বাকি লেজুড়টা যেতে কিছুদিন সময় লাগবে। তেমনই অর্নব জেলে যেতেই গোদি মিডিয়ার যাবতীয় এক্সিট পোলের হিসাব গোলমাল হয়ে গিয়ে, প্রায় সকল মিডিয়া মিলেই ক্লোজ কনটেস্টে তেজস্বীর মহাগঠবন্ধনকে জিতিয়ে দিয়েছিল।
২০২৮ সালে ইভাঙ্কা ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হবে কিনা, নাকি তার আগে কমলা হ্যারিসিই প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপতি হবে তা সময়ই বলবে। কিন্তু এদেশে সংঘ পরিবারই যে রাজত্ব করবে তা বলাই বাহুল্য, যদি না ৫৬ ইঞ্চির নের্তৃত্বে চীনের সামনে হাঁটু গেঁড়ে, মুঘল পূর্ববর্তী ভারতবর্ষের মানচিত্র ফিরিয়ে আনে। নেতৃত্বে মোদী, যোগী বা তৃতীয় কোনো উন্মাদ আসবে কিনা তা সময়ের গর্ভে, তবে কংগ্রেস বা অন্য তথাকথিত কোনো সেকুলার দলের একার পক্ষে ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা শূন্য।
বিহার নির্বাচনে সংঘীরা জিতে গেল কেবলমাত্র অঙ্কের খেলায়। শাম, দাম, দন্ড, ভেদ; বিজেপি দ্রুত বুঝে গেছিল পালের হাওয়া কোনদিকে বইছে। বিজেপি ঘুণাক্ষরেও কখনও উন্নয়নের কথা বলেনি বিহারে, রামমন্দির, বিনামূল্যে ভ্যাকসিন আর জাতপাতের গল্পের বাইরে এতটুকুও বের হয়নি। মাল্লাদের সাহানিকে ১১টা আসন দিয়েই ম্যানেজ করতে পেরেছিল অমিত শাহ্, যা রাহুল পারেনি সমপরিমাণ আসন দিয়ে।
চিরাগ পাশোয়ানকে দিয়ে নীতিশ কুমারের ‘উত্তর’ প্রজন্মহীন দলকে খেয়ে ফেলার মাস্টার প্ল্যানও ছিল, তবে চিরাগ আর যাইহোক রামবিলাশ নয় এটা প্রমাণিত। তাই সে মোদী ভজনা করে রাজ্যসভায় একটা আসন হাসিল করতে পারলেই সুখী, বিজেপিরও তেমন কোনও মুখ নেই বিহারে, আগামীতে চিরাগই বিজেপির চিরাগ হয়ে বিহার জুড়ে ‘বিহার’ করলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।
জিতিনরাম মাঝিকেও ম্যানেজ করতে পারেনি মহাগঠবন্ধন, এই পরিস্থিতিতে যেটা হওয়ার সেটাই হয়েছে, তেজস্বীর মুখ্যমন্ত্রীর স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেছে। গণতন্ত্রে বিরোধী দল যদি প্রান্তিক ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে আনতে না পারে, তাদের ক্ষমতায় ফেরার অধিকার থাকে না, স্বভাবতই মাত্র ৫০% এর বেশি ভোট টার্নআউটের বিহারে তেজস্বীর ক্ষমতায় না আসাটাই ইতিহাসের শিক্ষা।
প্রান্তিক মানুষগুলোই ১৫ বছরের নীতিশ শাসনের ও কেন্দ্রের মারণ নীতির শিকার। জাতপাত ভোট ব্যাংকের রাজনীতির মাস্টাররা তাদের পকেট ভোটকে বুথে আনতে সক্ষম হয়েছে, কিন্তু বিক্ষুব্ধ ভোটকে ভোট বাক্সে এনে ফেলতে পারেনি মহাগঠবন্ধন।
-ক্রমশ
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন