তৃতীয় পর্ব
১৯২৭ সালে তৎকালীন হায়দ্রাবাদের নিজামের পরামর্শ ও পৌরোহিত্যে জন্ম নেওয়া ‘All India Majlis-e-Ittehadul Muslimeen’ সংক্ষেপে AIMIM, ডাকনামে মিম’ও অনেক ওই সকল একটা বিধানসভার মাঝে থাকা দলগুলোর তালিকার মাঝেই ছিলো ২০০৯ সাল পর্যন্ত। বর্তমান এই মিম দলের বর্তমান সর্বেসর্বা ‘আসাউদ্দিন ওয়াইসির’ দাদু ‘আব্দুল ওয়াহিদ ওয়াইসি’ ছিলেন মিমের তৃতীয় সভাপতি কাসেম রিজভির আইনজীবী।
স্বাধীন হায়দ্রাবাদের দাবীর পক্ষে থাকা রিজভিকে জেলে পাঠায় নেহেরু সরকার, হায়দ্রাবাদ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। জেলবন্দি কাসেম রিজভিকে সদ্য স্বাধীন ভারত, পাকিস্তানে চলে যাওয়ার শর্তে মুক্তি দেওয়ার সময় ‘মিম’ দলটি রিজভি তার আওইনজীবী ‘আব্দুল ওয়াহিদ ওয়াইসি’কে সোপর্দ করে যান। সেই থেকেই মিম দলটি ওয়াইসি পরিবারের হাতে।
আব্দুল ওয়াহিদের নেতৃত্বেই ১৯৬০ সালে হায়দ্রাবাদ পুরসভায় সর্বপ্রথম ভোটে অংশগ্রহণ করে ২৪টি কেন্দ্রে বিজয় হাসিল করেছিল। ১৯৭৫ সালে আব্দুল ওয়াহিদের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সালাউদ্দিন ওয়াইসির রাজনৈতিক উচ্চাশাও তৎকালীন অন্ধ্রপ্রদেশের হায়দ্রাবাদ পুরসভাটুকুর মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল।
সালাউদ্দিন ওয়াইসি তাঁর আমলে নিজেদের নির্বাচনী এলাকাতে বেশ কিছু উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের অংশ হিসাবে। সংখ্যালঘুদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিক্ষাগত অগ্রগতির জন্য বিপুল কাজ করে গেছেন; ইঞ্জিয়ারিং কলেজ, মেডিকেল কলেজ, ফার্মাসি স্কুল, ৯টি ডিগ্রি কলেজ, হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট কলেজ, এমবিএ কলেজ, এমসিএ কলেজ এবং ৫ নার্সিং ট্রেনিং সেন্টার, একটি সমবায় ব্যাংক, একটি শিল্প প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং দুটি বড় হাসপাতাল, ১৭টি ছোট মাপের হাসপাতাল ও অসংখ্য চিকিৎসাকেন্দ্র খোলার পাশাপাশি নিজস্ব উর্দু সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করার সাথে; উর্দু ভাষা, ভারতীয় ইসলামী সাহিত্য, সংস্কৃতি প্রচার ও সুরক্ষার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠার দরুন সালাউদ্দিন ওয়াইসি জীবনে কখনও নির্বাচনে হারেননি সেই ১৯৬০ সালের পর থেকে। অন্ধ্র বিধানসভার ৫ বারের বিধায়কের সাথে সাথে ১৯৮৪ সাল থেকে ২০০৪ পর্যন্ত হায়দ্রাবাদ লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ ছিলেন।
এরপর ২০০৪ সালে পিতার স্থলাভিষিক্ত হোন সালাউদ্দিন ওয়াইসির বড় ছেলে আসাউদ্দিন ওয়াইসি। যথারীতি তিনিও লোকসভায় যান ভোটে জিতে। হায়দ্রাবাদের ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হয়েছিলেন, সেই সময় রাজ্য ক্রিকেট দলে ফার্স্ট বোলার হিসাবে কয়েকটি ম্যাচে ডাকও পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে লন্ডনের লিঙ্কনস ল’কলেজ থেকে আইনের উপরে ব্যারিস্টারি ডিগ্রী দখল করেন। এই পর্যন্তও হায়দ্রাবাদ পুরসভায় সর্বোচ্চ ৪৩টা আসনে জেতাই ছিল মিমের সবচেয়ে বড় সাফল্য, আর এই আসন কটাকে কেন্দ্র করে ৭টা বিধান সভা ও ১টি লোকসভা আসনের বাইরে যাওয়ার খুব একটা ইচ্ছাও ছিল না পরিবারকেন্দ্রিক এই দলটির। এই গোটা সময়টা জুড়ে হায়দ্রাবাদের বাইরের সকল অংশে তারা কংগ্রেসকে সমর্থন করতো।
এভাবেই চলছিল, সর্বপ্রথম তারা নজরে আসে তখন, যখন ২০০৯ সালে হায়দ্রাবাদ পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হয় মিম দলের, কংগ্রেসের সাথে জোট করে। কেন্দ্রে তখন UPA-2 সরকার, যারা একের পর এক দুর্নীতিতে ডুবে যাচ্ছে রোজ। ২০০৮ সালে বামেরা তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করলেও মিম ১টা আসন নিয়েও তাদের সমর্থন জারি রেখেছিল UPA সরকারের উপর। এদিকে নিয়তি সেই সুযোগটাকে বিজেপির পক্ষে দেওয়ার অপেক্ষায় দিন গুণছে আদবানি-বাজপেয়ী জুটিকে সরিয়ে গুজরাতি মোদী-শাহ জুটিকে সামনে রেখে।
এই ২০০৯ সালে বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিল মহারাষ্ট্রের নিতীন গড়করি, মহারাষ্ট্রে দ্বিতীয় দফার লাগাতার কংগ্রেস সরকার ক্ষমতাসীন তখন, এই সময় নাগপুর মাস্টারস্ট্রোকটা দিল গড়করিকে দিয়ে। গড়করি আসাউদ্দিনকে লেলিয়ে দিল ২০১৪ মহারাষ্ট্র বিধানসভা ভোটে, যে রাজ্যের ৭০% মুসলিম ভোটারই দারিদ্রসীমার নিচে অবস্থান করে। এরই সাথে হিন্দুত্ববাদী ভোটকে যাতে কনসেনট্রেড করা যায় তার জন্য রাজ ঠাকরের দলকে উগ্র মারাঠি ভোটের ভাগ বসাতে নামিয়ে দিল আরও উচ্চাঙ্গের স্বর বেঁধে মূলত NCP এর ভোটে চিড় ধরাতে।
অঙ্কের হিসাবে মিম সেভাবে হয়ত প্রভাব ফেলতে পারেনি সেদিনের মহারাষ্ট্র বিধানসভা ভোটে, ২৩টা আসনে লড়ে মাত্র ২টি বিধানসভা আসনে জিততে পারলেও সাড়ে চার লাখের সামান্য বেশি ভোট পেয়েছিল সর্বমোট, যা মোট প্রদত্ত ভোটের মাত্র ০.৮৯% ছিল। এটাই কিন্তু ভবিষ্যৎ ভারতীয় রাজনীতির জন্য নতুন ট্রেন্ড সেটের ধাত্রীভূমি ছিল। রাজ ঠাকরে সাময়িক ভাবে ফিনিশ হয়ে গেলেও মিম কিন্তু বিজেপির হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক লক্ষ্যমাত্রার লক্ষ্য পূরণের সৌজন্যে একটা প্রশস্ত মঞ্চ পেয়ে গেল কিছুটা অযাচিত ভাবে।
বিজেপি হিন্দুত্ববাদী সেজে যে অংশের মানুষকে বিভ্রান্ত করে তাদের দিকে নিতে পেরেছে তা ৩০ শতাংশের আশাপাশে, এর পরেও ৭০% জনগণ রয়ে যায়। ওই ৭০% কেও খন্ডে খন্ডে বিভক্ত না করতে পারলে যে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টেকা যাবে না। শুরু হলো বিভাজনের রাজনীতির নতুন খেলা, একদিকে উগ্র হিন্দুত্ববাদী আর তাদের বিরুদ্ধে উগ্র ইসলামিক র্যাডিকালিস্টিক গণতান্ত্রিক দল। এ যেন সোনার পাথরবাটি, অবশ্যই ভারত জুড়ে মিমের বংশবিস্তারের জন্য প্রত্যক্ষভাবে RSS ই একমাত্র দায়ী, মিম নয়।
...ক্রমশ
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন