ষষ্ঠ পর্ব
উপরোক্ত সকল তথ্যমতে কোন উদগাণ্ডু বিশ্লেষক মিমকে বিজেপির দালাল বলে দাবী করতে পারে অন্তত এই বিহার পর্যায়ে? আসলে কংগ্রেস জাতীয় ক্ষেত্রে মিমের উপরে দায় চাপিয়ে নিজেদের সংগঠন না থাকার ব্যর্থতা ও হারের দায় চাপিয়ে খালাস হয়েছে। বিজেপিও মিমকে ‘ভোট কাটুয়া’ হিসাবে প্রচার করে প্রমাণ করতে চাইছে যে মুসলমানেরা সর্বত্র একজোট হয়েছে, অতএব ‘হিন্দু খতরেমে হ্যাঁয়’। এতে করে অন্য যেসকল রাজ্যে আসন্ন ভোট আছে, সেই সকল রাজ্যের মুসলমানেরা বিভ্রান্তিতে পড়ে যাচ্ছে যে, “সত্যিই যদি গোটা ভারত মিমের পক্ষে যায়, আমরা কি দলছুট হয়ে যাচ্ছি”! এ এক চরম মানসিক কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থার মাঝে ফেলে দিয়েছে মুসলমানেদের। আর এই কাজে কিছু নামধারী মুসলমানই বিজেপির কাজকে সোজা করে দিচ্ছে মিম বিরোধী প্রচার করে।
জাতপাতের নিরিখে হওয়া ভোটের প্রসঙ্গে বিহারের জাতপাতের তথ্যে নজর রাখলে দেখা যাবে-
যাদব OBC- ১২%,
কুর্মি OBC - ৪%,
কুশাওহা, কৈরি, কাছি, মুরাও OBC - ৮%
তেলি OBC - ৩%
৭১টি ক্ষুদ্র EBC/ OBC জাতি- ২৫%
মহাদলিত দুষাদ- ৫%
মহাদলিত চামার- ৫%
মহাদলিত মুশাহার- ৩%
অন্যান্য মহাদলিত- ২%
ব্রাহ্মণ (উচ্চবর্ণ)- ৪%
ভূমিহার (উচ্চবর্ণ)- ৬%
ক্ষত্রিয় (উচ্চবর্ণ)- ১%
রাজপুত (উচ্চবর্ণ)- ৩%
কায়স্ত (উচ্চবর্ণ)- ১%
আদিবাসী- ১.৩%
খ্রিস্টান, জৈন, বৌদ্ধ অন্যান্য সংখ্যালঘু- ০.৪%
মুসলমান হচ্ছে ১৭%
সুতরাং বহুভাগে বিভক্ত মনুবাদী হিন্দু সমাজের মাঝে সবচেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ কিন্তু মুসলমানেরাই। ৪% ব্রাহ্মণ ও বাকি ১১% উচ্চবর্ণের হিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব করা RSS যদি হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি করতে পারে, অবশ্যই ওয়াইসি-আজমলদের মুসলমানবাদী রাজনীতি করার অধিকার আছে। RSS নিজের সুবিধার্থে AIMIM বা AIUDF দের বাজারে নামিয়ে লেজ কাটা শেয়ালের মতো জাতপাতভিত্তিক রাজনীতির চর্চাকে গতি দিয়েছে।
মোদীজির সৌজন্যে আজকের অখন্ড মানচিত্র যদি না বদলে যায়, তাহলে আগামী দিনে লেবাননের মতো ধর্মকেন্দ্রিক প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না।
RSS নিজে যুক্তিহীন উগ্র ধর্মান্ধ রাজনীতি করে ভোটের মেরুকরণ করে, এদের মুখ্য রাজনৈতিক দল বিজেপি। কিন্তু প্রতিটি রাজ্যে এদের একটা করে ‘নরম হিন্দুত্ববাদী’ দল আছে। যে সকল জনগণের প্রকাশ্যে উগ্র ধর্মীয় রাজনীতি করতে চক্ষুলজ্জা লাগে RSS এর এই B-Team গুলো তাদের জন্য উগ্র হিন্দুত্ববাদীতার প্রাথমিক ইস্কুল। তৃণমূল কংগ্রেস এদেরই একজন, নতুবা সদ্য দল গঠন করা তৃণমূল ১৯৯৯ সালের লোকসভা ভোটে যাওয়ার সাহস ও অর্থের উৎস কী ছিল! বিজেপিতে যাওয়ার দুটোই রাস্তা, সরাসরি RSS থেকে অথবা ভায়া তৃণমূল। দু’একটা বাম বা কংগ্রেসী যে বিজেপিতে যাচ্ছে না এ রাজ্যে তা নয়, কিন্তু তা নিতান্তই ব্যতিক্রম। বিজেপির নিজস্ব রাজনৈতিক ভাবাদর্শ আছে তা আপনি পছন্দ করুন বা বিপক্ষে থাকুন, বামেদেরও তা আছে, কিন্তু তৃণমূলের এ সকল বালাই নেই। তাদের জন্মটাই কংগ্রেস থেকে সুবিধাবাদী হিসাবে, এই জন্যই এদের বিজেপিতে যাওয়াটা কোনো সমস্যা হয় না।
তৃনমূলের ২১ বছর অতিক্রান্ত তার মধ্যে ১০ বছর ক্ষমতায়। তৃণমুল কংগ্রেসের হাত ধরে বাংলার বুকে ছাপ ফেলা বিজেপির আর দরকার নেই তাকে, সে নিজেই ক্ষমতায় ফিরতে চায় একা। বস্তুত গোটা ভারত জুড়েই এই মধ্যস্বত্তাভোগী দালাল B-Team দলগুলোকে আর দরকার নেই RSS এর, টিভি মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে নব্য ভোটারদের নিয়ন্ত্রণ করা এখন অনেক সোজা। এর বাইরে অঙ্ক কষে কীভাবে ভোটের ভাগাভাগি করে জিততে হয়, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ বিহার নির্বাচন, উন্নয়নের দিক থেকে শুরু করে প্রশাসনের সর্বক্ষেত্রে চূড়ান্ত ব্যর্থ হওয়ার পরেও তারা জিতেছে। তাই RSS এবারে অলআউটে খেলতে নেমেছে। উত্তরপ্রদেশের পর বিহারেও মুসলমান বিহীন মন্ত্রিসভা গঠন করে বাংলা ও আসামের সুর বেঁধে দিয়েছে।
এই মতো রাজনৈতিক চিত্রনাট্যে ২০২১ এর ভোট যে কারোর জন্যই ‘সুবিধার’ হবে না তা বলাই বাহুল্য। এই সকল হরেক ফ্যাক্টরের মাঝে মিম এসে জুটলে পরিস্থিতি কী হতে পারে! তার আগে দেখে নেওয়া যাক সাম্প্রতিক অতীতের পরিসংখ্যান- ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল পেয়েছিল ৪৩.৬৯%, বিজেপি ৪০.৬৪%, বামফ্রন্ট- ৬.৩৪% ও কংগ্রেস ৫.৬৭%। কিন্তু ২০১৬ সালের শেষ বিধানসভা নির্বাচনে এই অঙ্কটা ছিল- তৃণমূল ৪৪.৯১%, বামফ্রন্ট- ২৫.৬৯%, কংগ্রেস ১২.২৫%, বিজেপি ১০.১৬%। পঞ্চায়েত, পুরসভা বা উপনির্বাচনের ভোট করতেই দেয়নি তৃণমূলের উন্নয়ন বাহিনী, তাই এই সকল ভোটের হিসাবের কোনো দাম নেই।
‘চাণক্য’ নামের একটি সমীক্ষা সংস্থা দেখিয়েছিল যে পশ্চিমবাংলার প্রতিটি ভোটের ‘টার্ণ আউটের’ (প্রদত্ত ভোট) হিসাবে মুসলমান ভোট অন্তত ৩৯.৭৭%, যেখানে মুসলমান জনসংখ্যা ২৭.২%। হিসাব পরিষ্কার, হিন্দু সম্প্রদায়ের চেয়ে মুসলমানেদের মাঝে ভোট দানের প্রবণতা অনেকটাই বেশি। এদের সাথে প্রতি বছর বিপুল হারে নতুন যুবসমাজ যুক্ত হচ্ছে ভোটার তালিকাতে, এরা কোন পক্ষ কেউ জানে না। মাত্র ১% ভোটের সুইং ফলাফল উল্টে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
সুতরাং তৃণমূলকে ভোট না দিলেই বিজেপি এসে যাবে এটা একটা নিখাদ মিথ্যা অপপ্রচার।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন