বৃহস্পতিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২০

বিহার নির্বাচনঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ৯


নবম পর্ব

সাম্প্রতিক ইতিহাস বলছে RSS ব্যাকগ্রাউন্ড না থাকলে বিজেপি করে তেমন কিছু পাওয়া চরম কঠিন। সেই নিয়ম মেনে মুকুল রায়ের কপালে একটা রাজ্যসভার পদও জটেনি, তার ছেলে তো রাজনীতিই ছেড়ে দেওয়ার গল্প শুনিয়েছে। দিলীপ ঘোষ আর জগদীশ ধনখোর দুজনই- নিজেরাও জানে তাদের কেন আনা হয়েছিল বিজেপির নের্তৃত্বস্থানীয় পদে। এদের সকলের উদ্দেশ্য একজনই- কবি, দার্শনিক, চিত্রশিল্পী, বাণীশিল্পী, চলচ্চিত্র বিশারদ, সর্প বিশারদ, মাওবাদী বিশারদ, ঘেউঘেউ, ফেউফেউ, ফটাফট ইত্যাদি মাল্টি প্রতিভার অধিকারিণী।


যিনি রোজ নিউজের শিরোনামে থাকতেন অপ্রয়োজনীয় উদ্ভট আলফাল মন্তব্য করে। তাঁর শিরোনামে থাকাটাকে নিয়ন্ত্রণ করতেই বিজেপির ওই দুই ভাঁড়ের আগমন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দী তথাগত রায়, দিলীপ-ধনখোরের জুটির ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে, নিয়মিত অসভ্য আলপটকা মন্তব্য করে। ‘অপমানদা’, ‘বাঘের বাচ্চা’, ‘সোনা আবিষ্কার’ শব্দ গুলো বললেই আপনি বুঝে যাবেন কার কথা হচ্ছে, এভাবেই রোজ লাগাতার হরেক তামাশা করে মমতা ব্যানার্জীর জনপ্রিয়তাতে মারাত্বক ভাগ বসিয়েছে এনারা ‘সাফল্যের সাথে’। কোনো শিক্ষিত রুচিশীল মানুষের পক্ষেই এই ধরনের আধা উন্মাদ কাজকর্ম শোভনীয় নয়, কিন্তু লড়াই আর ভালোবাসায় সব কিছুই যে শোভন।

লকেট, অগ্নিমিত্রা, বেগুনী বর্ণের রঞ্জিত ‘কারিয়াকর্তা’ সহ বাকি ১৭টা নমুনা থুড়ি সাংসদকে দিয়ে যে বিধানসভা ভোট হবে না- সেটা মোক্ষম জানে RSS; আর জানে বলেই শুভেন্দুদের দরকার তাদের, ভুলে গেলে হবেনা যে RSS/বিজেপি মনিরুলকেও দলে নিয়েছিল ভোটের রাজনীতির তাগিদে। তবে বিজেপি'র মার্কেটিং স্ট্রাটেজির সামনে বাকিরা অনেক পিছিয়ে। ওদের হোমওয়ার্ক RSS সম্বৎসর করে চলে আন্ডার কারেন্ট। সাথে সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট স্পনসর্ড বৈধানিক সংস্থা গুলো, বিপুল অর্থ আর লজিস্টিক সাপোর্ট দেয় বড় আর মাঝারী ব্যবসায়িক ঘরানা।

RSS-BJP এটাও জানে ১৮টা আসন যত না বিজেপির পক্ষে ছিল তার চেয়েও আপাদমস্তক (৭০-৩০ ভাগে) চোরেদের দলটিকে হারাবার প্রয়াস ছিল মানুষের। বামেরা নিজেরাই নিজেদের উপরে ভরষা করে উঠতে পারেনি, কংগ্রেস তো রবি ঠাকুরের- ‘তুমি কি কেবলই ছবি…’ কবিতার বস্তুরুপ। এখানেই মিমের শুভ গৃহপ্রবেশ- বঙ্গীয় রাজনীতিতে।

মিমের ভোট মূলত মুসলমানেরা, জেলা ভিত্তিক যদি দেখা যায়, ২০২০ এর নিরিখে সেই হিসাবটা দাঁড়ায় -

মুর্শিদাবাদ জেলা- ৭১%
উত্তর দিনাজপুর জেলা- ৫৪%
মালদহ জেলা- ৫১%
বীরভূম জেলা- ৩৯%
উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলা- ৩৬%
নদিয়া জেলা- ২৯%
কোচবিহার জেলা- ২৮%
হাওড়া জেলা- ২৮%
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা- ২৭%
দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলা- ২৬%
কোলকাতা জেলা- ২২%
বর্ধমান জেলা- ২১%
হুগলী জেলা- ১৯ %
পূর্ব মেদিনীপুর জেলা- ১৫%
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা- ১২%
পুরুলিয়া জেলা- ৮%
বাঁকুড়া জেলা- ৮%
দার্জিলিং জেলা- ৬%
জলপাইগুড়ি জেলা- ২%

২৯৪টি আসন বিশিষ্ট পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায়, কমপক্ষে ১১৫টা এমন কেন্দ্র আছে যেগুলো মুসলমান অধ্যুষিত, ১৫টি জেলা জুড়ে। এগুলোকে পাখীর চোখ করে মিম যদি ঝাঁপায়, সেক্ষেত্রে কার কপাল পুড়বে, কে লাভবান হবে! প্রসঙ্গত এখানে বলে রাখা দরকার যে, বিজেপির ভোটার ও মিমের ভোটার সম্পূর্ণ আলাদা, দুটো বিপরীতধর্মী সাম্প্রদায়িক রাজনীতি আড়াআড়ি ভাগ করে দেবে হিন্দু-মুসলমানে। অতএব বেঁচে থাকে জাতীয় কংগ্রেস, তৃনমূল ও বামেরা। কংগ্রেস ও বামেরা গত লোকসভাতেই দেওয়ালে সেঁটে গেছে, তাহলে বাকি রইল কে?

মমতা ব্যানার্জী সাচার কমিশনের রিপোর্ট দেখিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, তারপর রাজ্যের মুসলমানেদের অবস্থা আরো খারাপ থেকে খারাপতর হয়েছে দিনকে দিন। কিন্তু এমন কোনও সরকারি পরিসংখ্যানও নেই যে আপনি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবেন। তা সত্বেও শুধুমাত্র সরকারি চাকরির দিকেই যদি নজর দিন, দেখবেন তৃণমূল জামানায় মুসলমানেরা কতজন চাকরি পেয়েছে! সেভাবে কোনো চাকরিই দেয়নি মমতা সরকার, সুতরাং কেউ না পেলে মুসলমানেরাই বা কোত্থেকে পাবে! মিথ্যা ঢপের বাইরে আর কিছুই দেয়নি, দুধেল গরু বলে অপমান ছাড়া। বলার মতো একটা মুসলমান নেতা পর্যন্ত রাখেনি তাদের দলে, যারা আছে সবই তল্পিবাহক ও কোটার উমেদার, বাকিরা জেলাস্তরে সীমিত।

পাশাপাশি থাকা দুটো মুসলমান ও অমুসলমান গাঁয়ে গিয়ে দেখুন, উন্নয়ন বুঝে যাবেন। আজও ভোটের ময়দানে মরে মুসলমান, মারেও মুসলমান। মুসলমানকে ভোটের স্বার্থে ব্যবহারের ট্রাডিশন প্রতিষ্ঠানিকতা পেয়েছে তৃনমূল জামানায়। মমতা ব্যানার্জী তার রাজত্বকালে মুসলমানেদের মতো প্রবঞ্চনা আর কারো সাথে করেনি, যেটা অনেকটাই বিশ্বাসঘাতকতার সামিল। পঞ্চায়েত স্তরে যে সকল মুসলমান নেতারা আছে তারাও ঠুঁটো জগন্নাথ, গোটা রাজ্য প্রশাসন চলছে BDO দের দিয়ে। তৃনমূল দলটা চালাচ্ছে থানার বড়বাবু, মেজবাবুরা, কারন এদেরকে সরাসরি নবান্ন থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এই বিডিও ও থানার কর্তাবাবুদের মাঝে কতজন মুসলমানকে উচ্চপদে পদে বসিয়েছে মুসলমান দরদী ‘হিজাবে’ সাজা মমতার সরকার?

সীমাহীন তোলাবাজি, তার জন্য এলাকার দখলদারি, প্রচারসর্বস্ব মিথ্যাচার ও অশ্লীল দলবাজি করতে গিয়ে গোটা ‘পঞ্চায়েতী সরকার’ ব্যবস্থা ভেঙে পরেছে নিকৃষ্ট প্রশাসনিক ব্যর্থতায়, আর বাজারি পত্রিকায় এটারই বিজ্ঞাপন দিচ্ছে রোজ ‘মরার আগে হরিনাম’ করার মতো। মমতা ব্যানার্জী জানে সরকারি সুফল তৃনমূলের ক্যাডারগুলোর বাইরে কারো ঘরে পৌঁছায়নি, পিকেকে এনেছিল যাতে শেষ মুহুর্তে কিছুটা শোধরানো যায় তৃনমূলের তস্করসমাজকে, কিন্তু তারা হাতের বাইরে এটা আজ গভীর ভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে নেত্রী। তাই পাতাজোড়া বাজারি বিজ্ঞাপন দিয়ে মরিয়া চেষ্টা চালাতে হচ্ছে ‘দুয়ারে সরকার’। পঞ্চায়েত ভোট করতে না দিয়ে গায়েরজোরে ‘পুলিস আর গুণ্ডা’ দিয়ে ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা দখল করেছিল তার উন্নয়ন বাহিনী। স্বভাবতই গোটা পঞ্চায়েত ব্যবস্থাটাই সরকারি প্রকল্পের টাকা চুরির আখারার বাইরে আর কিছুই নয় আজকের দিনে।

মমতা ব্যানার্জী তার জীবনের সর্বোচ্চ ক্ষমতা পেয়ে গেছে, দুর্নীতিতে ডুবে থাকা বৃদ্ধা বয়সে আর কিই বা আশা করেন তিনি! ভাইপো বিদেশী বউ নিয়ে থাইল্যান্ড চলে যাবে, বাকি নেতারা বিজেপিতে। কিন্তু মুসলমানেরা বিজেপির সাথে লড়বে NRC মাথায় করে, যা মমতা ব্যানার্জীরই আমদানি। এর পরেও মুসলমান সামান্য বেচাল করলেই NIA কে দিয়ে জঙ্গি সন্দেহে জেলে ভরে দেবে, বিনা বিচারে জীবন শেষ। অন্ধ মমতা প্রেমী মুসলমানগুলো যখন বুঝবে মমতার এই ষড়যন্ত্র, দেখবে পায়ের নিচে আর জমি নেই।

.....ক্রমশ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...