বুধবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২০

 


বিনায়ক দামোদর সাভারকারের ‘হিন্দুত্ব’ তত্ত্বের উপর গড়ে উঠেছে আজকের RSS-বিজেপির জঙ্গি সাম্প্রদায়িকতা, বিদ্বেষ ও ঘৃণার রাজনীতি। গোহত্যা, জাতিভেদ, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি বিষয়ে ‘সাভারকারের মতাদর্শ’ থেকে বর্তমান মৌলবাদী হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শাসকশক্তি আজ অনেকটাই সরে এসেছে। বিজেপি তথা নরেন্দ্র মোদীর হিন্দুত্ব আসলে একদিকে সাভারকার আর অন্যদিকে হেডগেওয়ার আর গোলওয়াকারের ধর্মভাবনার এক খিচুড়ি তত্ত্ব।
প্রকৃত হিন্দু কে? এই প্রশ্নের উত্তরে বর্তমান ভারতবর্ষে বেশিরভাগ হিন্দু এই ধারণা পোষণ করেন যে হিন্দু হবার আবশ্যিক শর্ত হলো গোমাতাকে নিজের মাতার স্থান দেওয়া এবং গো-পূজন করা। ১৯২৩ সালে বিনায়ক দামোদর সাভারকারই ভারতবর্ষে হিন্দু জাতীয়তাবাদের সূচনা করে। যে গ্রন্থটি হিন্দুত্বের আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয় সেই ‘হিন্দুত্ব’ নামক বইয়ের রচয়িতা সাভারকার, সেই বিজ্ঞাননিষ্ঠ নিবন্ধ সংকলন- “গোপালান হেভে, গোপুজান নাভেহে” শিরোনামে বারবার বলেছেন, “গরু যদি কারো মাতা হয়ে থাকে তবে তা বলদের”।
সাভারকরই লিখে গেছে- “মানুষের গো-পূজনের কোন কারণ নেই, কারণ মানুষ তারই পূজা করে যে তার থেকে শ্রেয়তর এবং যার মধ্যে সুপারহিউম্যান কোয়ালিটি রয়েছে এবং গরুর মত মনুষ্যেতর প্রাণী কখনোই মানুষের আরাধ্য হতে পারেনা”। বিজ্ঞান বিষয়ক অন্য একটি প্রবন্ধে সাভারকার লিখেছিলেনঃ “ভারতের মতো দেশে গরুকে মাতৃজ্ঞানে বিশ্বাস করা স্বাভাবিক। মানুষ গরুর কাছ থেকে দুধ এবং অনেক কিছু পান যা আমাদের প্রয়োজন। অনেক পরিবারের জন্য গাভী পরিবারের অংশ হয়ে যায়। সুতরাং এটি আমাদের জন্য দরকারী। আমাদের কৃতজ্ঞতাই গরুকে ঈশ্বরপ্রতিম করেছে। তবে যদি আপনি মানুষকে গরুর ঈশ্বরত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন তবে মানুষ কেবল তার কার্যকারিতাই বলতে পারে। গরু এমন একটি প্রাণী, যার বুদ্ধি সবচেয়ে বোকা লোকের চেয়েও কম। আমরা যদি গরুকে ঈশ্বর হিসাবে বিবেচনা করি তবে তা মানুষের জন্য অপমান হবে। নিতান্ত অশিক্ষিত মূর্খ ছাড়া গরুকে কেউ মা বলতে পারে- এটা আমার বিশ্বাস হয়না”।
সাভারকার গরুর পূজা না করে বরং গরুর যত্নের জন্য অনুরোধ করতেন। তিনি গোমূত্র ও গোবর খাওয়ার বিরুদ্ধেও তার বিরোধিতা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি গোমাংস ভক্ষণ আসক্ত ছিলেন এ বিষয়ে তেমন জোরালো প্রমাণ না থাকলেও, তিনি যে গো-ভক্ষণ বিরোধী ছিলেন না তার অসংখ্য উক্তি রয়েছে। তার লেখায় রয়েছে- “গরু একপাশে খায় এবং অন্যদিকে তার নিজস্ব প্রস্রাব এবং গোবর থাকে। লেজটা মুড়িয়ে সে নোংরা করে নিজের সমস্ত শরীর। এমন একটি প্রাণী যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বোঝে না, কীভাবে সে ঈশ্বর হিসাবে বিবেচিত হতে পারে”?
আজকের ভক্তরা গরুর প্রস্রাব এবং গোবরকে পবিত্র বিবেচনা করে, যেখানে নিচু জাতের হিন্দু আম্বেদকারের মতো মানুষের ছায়াকেও অপবিত্র বলে মনে করা হয়। এটাই সাভারকরের কৃতিত্ব, তিনি নিজে যা ভেবেছেন বা করেছেন- RSS তার সবগুলোকে নেয়নি মুসললাম বিরোধিতা ছাড়া, RSS এর পরবর্তী প্রজন্ম সাভারকরের নামে ভারতীয় হিন্দু সমাজকে দূষিত করেছে গোবর খাইয়ে। সাভারকরের যুক্তি ছিল- “গরুকে খাদ্য হিসেবেও পরিবেশন করবেন কি করবেননা সেটা আপনা রুচি। লড়াইয়ের সময় বা দুর্ভিক্ষের দিনগুলিতে কিম্বা দারিদ্রতার কারনে গোপালন যখন বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, তখন গোহত্যা করার ভুড়িভুড়ি প্রমাণ আছে শাস্ত্রে”। সাভারকরের কোনো বইতে কোথাও লেখা নেই- গোহত্যা করা যাবেনা, বরং কোন কোন ক্ষেত্রে গোহত্যা করতে হবে তার বিশদ ব্যাখ্যা রয়েছে।
হিন্দুত্ববাদী দর্শনের জন্য পরিচিত সাভারকারের বিখ্যাত উক্তি আছে- “আমাদের গরুর যত্ন করা উচিত, পূজা করা নয়। গোমূত্র সেবন এবং গোবর ভক্ষণকে ঘৃণা করুন, প্রাচীন ভারতে পাপীদের শাস্তি বিধানের জন্যই গোবর ভক্ষণ করানো হতো”। আজকের ভক্তপিতারা এই লাইনকে বেমালুম উড়িয়ে দিয়ে সব ভক্তের পেটে ও মগজে গোবর ভরে দিয়েছে, নতুবা গোহত্যার দায়ে কীভাবে মুসলমানেদের নির্বিচার হত্য, তাদের সম্পত্তি লুঠপাঠ সহ সকল ধরনের অত্যাচার করানো যাবে!
আগেই বলা হয়েছে গরু ছিল সাভারকারের কাছে ব্যবহার্য জন্তু, এবং তার পুজো তিনি অর্থহীন মনে করতেন। সুপারহিউম্যান কোয়ালিটির মানুষ গরুকে পূজা করতে পারে এই ধরনের হাস্যকর প্রক্রিয়া তার মতে বুদ্ধিহত্যা করে থাকে। তার এই অত্যুগ্র অবস্থানের জন্যই সাভারকার দীর্ঘকাল হিন্দুত্ববাদীদের কাছে প্রত্যাখ্যাত ছিল।
দ্বিতীয়ত যে কারণে সাভারকার সাধারণভাবে প্রত্যাখ্যাত ছিল তা হলো আন্দামান সেলুলার জেলে থাকাকালীন সময়ে তার একের পর এক ক্লিমেন্সি পিটিশান বা ক্ষমাভিক্ষা পত্র প্রদান। বলা হয়ে থাকে, যে হিন্দুত্ব বা হিন্দু জাতীয়তাবাদের পথে দেশকে পুনর্নির্মাণের ইচ্ছায় চালিত হয়েই সাভারকার বৃটিশ কারাগার থেকে মুক্তি আদায়ের জন্য ক্ষমাভিক্ষা ও শেষ পর্যন্ত মুক্তি আদায় করেছিলেন। সাভারকার অনুভব করেছিলেন যে উত্তর-দক্ষিন পূর্ব-পশ্চিমে হিন্দুরা ঐক্যবদ্ধ নয়, এমনকি তিনি আন্দামানে আর্য সমাজের ধারণাকে ধাক্কা দেওয়ার সাথে সাথে মানুষকে পুনরায় হিন্দু সমাজের অন্তর্ভুক্ত করতে প্রস্তুত ছিলেন।
হিন্দুত্ববাদীরা এই প্রধান পার্থক্যকে বর্ণনা করেন এইভাবে যে, সাভারকার তার হিন্দু পুনরুত্থানের ধারণাকে রাজনৈতিক দিক থেকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন, ধর্মীয় কারণে নয়। তিনি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হিন্দুত্বের ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। তার মতে এটি ছিল হিন্দু সভ্যতা এবং হিন্দু জীবনযাপন। সাভারকার ভয়ঙ্কর রকমের মুসলিম, খৃষ্টান ও আদিবাসী বিদ্বেষী ছিলেন। কিন্তু সবার আগে তিনি নিজে ছিলেন আদ্যোপান্ত নাস্তিক এবং বর্ণভেদ বিরোধী।
‘স্বঘোষীত’ বীর সাভারকার হিন্দুত্ববাদীদের একমাত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের মুখ, যিনি মার্সাই-এ ব্রিটিশ বন্দিত্ব থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন এবং যার ফলশ্রুতিতে ১০ বছর আন্দামান সেলুলার জেলে বন্দী জীবন কাটান। বৃটিশের কাছে তিনি একাধিক ক্ষমাভিক্ষা পত্র পাঠান, যাতে তিনি জানিয়েছিলেন যে এরপর থেকে তিনি ব্রিটিশ উচ্ছেদ নয়, স্বাধীনতা আন্দোলন নয় বরং সাংস্কৃতিক হিন্দুত্ববাদ নিয়ে তার প্রচার ও প্রসারকল্পে জীবন অতিবাহিত করবেন, যা আরো কয়েক শতক দীর্ঘ ব্রিটিশ শাসনের জন্য কার্যকরী হবে।
তৃতীয়ত তিনি ছিলেন হিন্দুধর্মের অন্তর্লীন অস্পৃশ্যতা ও বর্ণভেদ বিরোধী। অস্পৃশ্যতাবিষয়ে তিনি বলেছিলেন, “আমাদের দেশ ও সমাজের কপালে একটি কলঙ্ক রয়েছে – অস্পৃশ্যতা। কোটি কোটি হিন্দুর ধর্ম এবং রাষ্ট্র এই কলঙ্কে অভিশপ্ত। আমাদের এভাবেই তৈরি করা হয় আর আমাদের শত্রুরা একদলকে অন্যদলের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দিয়ে, আমাদের মধ্যে বিভাজন এনে সফল হতে থাকে। আমাদের অবশ্যই এই মারাত্মক অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে হবে। এই বর্ণ-অহংকারটি ব্রাহ্মণ থেকে চন্ডাল পর্যন্ত সমস্ত হিন্দু সমাজের হাড় চুষছে, এবং বর্ণ-অহংকারের ঘৃণার কারণে গোটা হিন্দু সমাজ বর্ণ-বিভেদ-আধিপত্যে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে”।
কথিত আছে সাভারকার গরুর মাংস বিশেষভাবে পছন্দ করতেন। গরুর মাংসের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলে হিন্দু চরমপন্থীদের অনুভূতি আহত হয় এবং এ তারা ক্ষুব্ধ হয়। তারা গরুর উপাসনা করে কিন্তু গরুর মাংস রফতানিতে নীরব থাকে। এমনকি যখন কেন্দ্রে একটি আপাতদৃষ্টিতে হিন্দুত্ববাদী সরকার রয়েছে, তখনও গরুর মাংস রাজনীতিবিদদের পক্ষে একটি ভোট ব্যাংক এবং স্ব-ঘোষিত ‘গো-রক্ষক’ এবং ঈশ্বরের রক্ষাকারীদের আয়ের উৎস। গরু দীর্ঘকাল ধরে ভারতে হিন্দু ধর্মের প্রতীক এবং তাই পবিত্রতার প্রতীক হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে। হিন্দুদের মধ্যে সাধারণ ধারণা হ’ল ভারতে মুসলিম বিজয়ের মাধ্যমে খাদ্যের জন্য গোহত্যার সূচনা হয়েছিল। অথচ হিন্দুশাস্ত্রে এমনকি মনুস্মৃতিও গরুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করে না। চরক সংহিতায় গরুর মাংসকে বিভিন্ন রোগের ওষুধ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
কিন্তু দিনের শেষে সেই সাভারকর কেন আজকের হিন্দুত্ববাদীদের নায়ক?
কারন তিনি তার আত্মজীবনীতে লিখে গেছেন- মাত্র ১২ বছর বয়সে একটা গ্রামীণ অশান্তির সময় দাদা গণেশের নেতৃত্বে বেশ কিছু সহপাঠী জুটিয়ে গ্রামের মসজিদ ভেঙেছিলেন খেলার ছলে, যার ফলে সেখানে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। এখানে তার বিখ্যাত লাইন হচ্ছে, “আমরা মসজিদটিকে আমাদের মনের সুখ মেটাতে ভাংচুর করেছিলাম”।
সুতরাং এহেন ব্যাক্তি যে মোদী-অমিতশাহদের গুরু হবে তাতে আর আশ্চর্য কি!
এই কারনেই এতদিন পর একজন, আদ্যোপান্ত নাস্তিক, পরধর্ম বিরোধী এবং একই সঙ্গে ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী মানুষের ইতিহাসের পাতা থেকে পুনরুত্থান ঘটিয়েছে RSS-BJP। নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ বা নাগপুর ব্র্যাণ্ড হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীরা সাভারকারকে স্বীকৃতি দিতে মরিয়া- ওই ১২ বছরে মসজিদ ভাঙ্গার গুনগত কারনেই। সাভারকারের নাম গান্ধীহত্যার সঙ্গে জড়িয়ে গেলেও, গান্ধীর উত্তরাধিকার গুজরাটি শক্তিধর বেনিয়ারা প্রাণপণ চেষ্টা করছে- কারন সাভারকরই এদের মধ্যে প্রথম মসজিদ ভাঙার কৃতিত্ব অর্জন করতে পেরেছিল- যা বাবরি মসজিদ ভাঙা পরবর্তী বিজেপিকে একটা রোল মডেল দিয়েছিল।

মূল লেখাঃ পার্থ প্রতিম মৈত্র।
সম্পাদনা ও সংযোজনাঃ হককথন

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...