চতুর্থ পর্ব
হায়দ্রাবাদে মক্কা মসজিদ বিস্ফোরণ, মহারাষ্ট্রের মালেগাঁওতে বিস্ফোরণের সাথে মোদী মিডিয়ার লাগাতার মিথ্যা ঘৃণা সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন, মব লিঞ্চিং, বিজেপি-RSS নেতাদের বিষাক্ত ভাষণ সহ নানা কারণের ফলে মুসলমান সমাজ ক্রমেই একঘরে হয়ে গেছিল। আন্তর্জাতিক ভাবে সারাক্ষণ ইসলামোফোভিয়ার চাষে প্রতিটি ভারতীয় মুসলমান নিজ ভূমেই যখন অবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল – মিডিয়া জুড়ে ভিক্টিম হয়ে উঠেছিল, স্বাভাবিকভাবেই তাদের কাছে একটা ত্রাতার প্রয়োজন হয়ে উঠেছিল।
এমনিতে ইসলামে কাস্ট সিস্টেম না থাকলেও, সিয়া সুন্নি, ওয়াহাবি, সহ বেশ কিছু বিভেদ তো আছেই, একে কীভাবে কেউ অস্বীকার করবে! এছাড়া হরেক পীরপন্থীদের আলাদা আলাদা মাজহাব বা উপদল, সেখানে ‘নরেন্দ্র মোদীর’ মতো হিন্দু হৃদয় সম্রাট হয়ে কোনো মুসলমানের মুসলমান হৃদয় সম্রাট হয়ে উঠে আসা অসম্ভব ছিল।
কংগ্রেসের বিশ্বাসযোগ্যতা নেই, সেখানেই RSS সুকৌশলে মিমকে ঢুকিয়ে দিয়েছিল ‘কংগ্রেস মুক্ত’ ভারতের লক্ষ্যে, আসামেও এটাই করেছিল বদরুদ্দিন আজমলকে দিয়ে। আগামীতে বাংলাতে ফুরফুরার পীরবেশী দালালগুলোকে দিয়েও এই খেলা খেললে আশ্চর্যের কিছু নেই, কারণ তারা অনেকেই মুকুল রায় ঘনিষ্ঠ।
২০১৪ পরবর্তী সময়টা একটা লাইনে বললে দাঁড়ায়- দেশজ রাজনীতিতে বিজেপির নেতা মন্ত্রীদের ক্রমাগত মুসলমান বিদ্বেষী মন্তব্য, মব লিঞ্চিং, গোমাংস অজুহাতে হত্যা। পাশাপাশি একটা রাষ্ট্রযন্ত্রে ‘মেজোরিটি র্যাডিক্যাল পলিটিক্যাল পার্টি’ থাকলে বিজ্ঞানের নিয়মেই ‘মাইনরিটি র্যাডিক্যাল পলিটিক্যাল অর্গানাইজেশনের’ উৎপত্তি ঘটবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে ভারতীয় রাজনীতিতে যেখানে বহু ভাষাভাষী বহুদলীয় রাজনীতি মূলত জাতপাতের উপরে নির্ভর করেই কেন্দ্রীভূত হয়, সেহেতু এখানে সংখ্যালঘুদের পক্ষে দানা বাঁধাটা অত্যন্ত দুরুহ একটা কাজ ছিল।
বাঙালী মুসলমানের সাথে হিন্দিভাষী মুসলমান বা কেরালার মুসলমানের ততটাই ফারাক, যতটা উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের। এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে RSS নিজেই অতি উৎসাহী হয়ে ‘রাতারাতি এখনই আমার সকল ক্ষমতা চাই’ এর মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে মিমকে লাগিয়ে দিত মুসলমান ভোটকে পোলারাইজড করে উল্টো দিকের হিন্দু ভোটকে একটা বাক্সে জমা করার প্রয়াসে। আগামীতে মিম থাকবে কি যাবে তা জানিনা, কিন্তু উগ্র ইসলামিক রাজনৈতিক দল গুলোই যে এই সম্প্রদায়কে নিয়ন্ত্রণ করবে তা বলাই যায়।
সুতরাং- RSS দু'ক্ষেত্রেই সফল। ক্রমাগত মুসলমানফোবিয়া আর পাকিস্তান ভিতি দিয়ে হিন্দু জাতীয়তাবাদকে একটা অশিক্ষিত সোস্যাল মিডিয়া প্রজন্মের জিনের মাঝে সেঁধিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি, এটাই তাদের সাফল্য।
RSS দীর্ঘদিন মাটির সাথে লেগে থেকে সংগঠন বাড়ানোর সুফল আজকের নরেন্দ্র মোদী বা যোগি আদিত্যনাথ। ১৯% সংখ্যালঘু মুসলমানেদের মাঝে সারাক্ষণ- ‘এই বোধহয় আমাকেও জঙ্গি বলে দাগিয়ে দেবে’ বা ‘দেশদ্রোহী বলে দাগিয়ে দিল’ ভয়ে থাকা সম্প্রদায়ের মাঝে নেতার জন্ম হতে পারে না তাৎক্ষণিকভাবে, জন্ম হয়ও নি।
RSS ই মিমকে প্রমোট করেছিল প্রকাশ্যে, নতুবা মসলমান অধ্যুষিত নাগপুর সেন্ট্রাল সিটে কংগ্রেসের ‘বান্টি বাবা সেলকে’কে ৪০০০ ভোটে হারাতে পারত না বিজেপির বিকাশ কুম্ভারে। প্রসঙ্গত এখানে মিম প্রার্থী ভোট পেয়েছিল সাড়ে আট হাজারের একটু বেশি। এ যাবৎ যাবতীয় ইতিহাসে, মিম যত না বিজেপির পক্ষে ছিল তার চেয়েও কংগ্রেসী ভোটকে ভাগ করতে RSS এর একটা সফল রাজনৈতিক চাল ছিল।
এই পথ বেয়েই RSS ঘনিষ্ঠ প্রণব মুখার্জী ‘ওয়েইসি’কে ২০১৪ সালে সংসদ রত্নের পুরষ্কারে ভূষিত করে তার পেডিগ্রী বাড়িয়ে দিয়েছিল জাতীয় রাজনীতির স্তরে। এ যাবৎ জাতীয় স্তরে মিমের রাজনীতি নির্ভর পরিচিতি যে অতি ক্ষুদ্র প্রান্তিক উপস্থিতির বাইরে কোনো অস্তিত্ব ছিল না তা উপরে জেনেছেন।
মোদীর এই নতুন সাম্প্রদায়িক ঘৃণার যে চাষ, তার পিতামাতা RSS-BJP হলে- শিক্ষক হিসাবে যার নাম না নিলে ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান ডেমোক্রেটিক সার্কাস’ অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে, সেই রিংমাস্টারের নাম হলো ‘প্রশান্ত কিশোর’। মোদী-২০১৪, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, তেলেঙ্গনা, অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহারের পর আধুনা তৃণমূলের হয়ে খেপ খাটতে এসেছেন বাংলাতে। বিজেপির এখন আর কোনো হাইপ্রোফাইল প্রশান্ত কিশোরকে দরকার নেই, তারা এর অনেক ঊর্ধ্বে উঠে গেছে মিথ্যার চাষে।
সরাসরি ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপকেই নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আম্বানিকে লেলিয়ে দিয়ে সেটিং করে নিয়েছে। খাতায় কলমে প্রশান্ত কিশোরের স্থলাভিষিক্ত করেছে অমিত মালব্য, যার কাজই হলো লাগাতার মিথ্যা সম্প্রচার করে মগজে দাঙ্গার চাষ করা। আগামীতে বাংলা নির্বাচনে বিজেপির এই মিথ্যাচারের সাথে মূল লড়াই তৃণমূলের মিথ্যাচারের, এই ডুয়েলে বামেরা কতটা লড়াই দিতে পারবে বা আদৌ দিতে পারবে কিনা সেটাই কোটি টাকার প্রশ্ন।
মোদীফায়েড মিডিয়ার দ্বারা ক্রমাগত সমাজের মাঝে প্রতিটি বিষয়ে মুসলমানেদের দোষী সাব্যস্ত করে দাগিয়ে দেওয়া, কথায় কথায় পাকিস্তান পাঠাবার ধমকি, NRC এর নামে মুসলমানেদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া বা D-voter করে দেওয়ার ঢক্কানিনাদের মাঝে চলে আসে লকডাউনের মার ও তৎপরবর্তী বিহার নির্বাচন।
...ক্রমশ
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন