শুক্রবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২০

বিহার নির্বাচনঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ১০

দশম পর্ব

তৃণমূল আজ বিজেপি জুজুর ভয় দেখাচ্ছে ক্ষমতায় থাকতেই, কিন্তু বিজেপি কতটা নিকৃষ্ট তৃণমূলের চেয়ে? পরিসংখ্যান বলছে তৃণমূলের ২১১টা MLA এর মাঝে ৩২ জন মুসলমান, যেখানে জনসংখ্যার জনপ্রতিনিধি হিসাবে ৫৭ জন মুসলমানের প্রতিনিধিত্ব করা উচিত ছিল, সেখানে প্রায় অর্ধেক জনকে সুযোগ দিয়েছে তৃনমূল। অথচ ৪% ব্রাহ্মণ, কিন্তু ৪৭% জনপ্রতিনিধি তারাই। মন্ত্রীসভায় পূর্ণমন্ত্রী ২৮ জন, মুসলমান মাত্র ৩ জন মাত্র, মাত্র ১০%। তাও তাদের একজন রেজ্জাক মোল্লা, মন্ত্রীত্বের টোপেই তাকে দল ভাঙালো হয়েছিল, অন্যজন ফিরহাদ হাকিম যে দক্ষিন কোলকাতা ও তল্পিবাহক কোটায়। প্রসঙ্গত দক্ষিণ কোলকাতা লোকসভা কেন্দ্রের প্রতিটা বিধায়কই পূর্ন মন্ত্রী। কিন্তু মন্ত্রী সভাতে ব্রাহ্মণ মন্ত্রী ১২ জন, ৪৩%!


খান চারেককে রাষ্ট্রমন্ত্রীর ললিপপ দিয়ে রেখেছে জেলা কোটায়, ব্যাস। সবচেয়ে প্রহসনের হচ্ছে সংখ্যালঘু মন্ত্রীও খোদ মমতা ব্যানার্জী। তৃণমূল পূজা কার্নিভাল ১টা করেছে, বিজেপি এলে ২০টা করবে। ওয়াকফের ইমামভাতার পিঠে সরকারি করের টাকায় পুরোহিত ভাতা দিয়েছে। পীর নামের মিসকিন গুলোকে কিছু ফকিরি অর্থ দেওয়ার পাশে- ইস্কন, রামকৃষ্ণ মঠ, মতুয়াদের শয়ে শয়ে কোটি টাকা ও জমি বিলিয়েছে। তৃনমূল ক্লাবের নামে টাকা বিলিয়েছে, বিজেপি গরুর নামে টাকা বিলোবে।

জেলখানাগুলোতে রাজনৈতিক বন্দির ৭৩%ই মুসলমান, বিজেপি শাসিত রাজ্যের চেয়েও বেশি। সুতরাং মুসলমান কী হারাবে যা তৃনমূল দিয়ে রেখেছিল? বিজেপি শাসিত রাজ্যে কি মুসলমানেরা হলোকাষ্টে নেই হয়ে গেছে? এখানে তৃণমূল বিপদে আছে মুসলমান নয়, আর হিন্দুও বিপদে নেই- বিজেপির ক্ষমতা লিপ্সা আছে।

এমতাবস্থায় বিজেপির মেরুকরণ রাজনীতির এজেন্ডার দৌলতে মিমকে তারা অর্থ ও অন্যান্য সুরক্ষা দিয়ে প্রতিষ্ঠা করে দিলে মুসলমানেদের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যে ভাল বই খারাপ কিছু নেই। হায়দ্রাবাদের পুর নির্বাচনই দেখুন, আদ্যোপান্ত সাম্প্রদায়িক এজেন্ডা সম্বলিত ভাষনের উপরে ভর দিয়ে ভোটপর্ব শেষ হলো। মিডিয়া থেকে জনগণ সকলেই এটাকে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছে, আমাদের পশ্চিমবঙ্গের মানুষও আগামী ৪-৫ মাসে অভ্যস্ত হয়ে যাবে সাম্প্রদায়িক কথাবার্তায়। হায়দ্রাবাদের সামান্য পুর নির্বাচনে বিজেপি তার পূর্ণ শক্তি নামিয়ে দিয়েছিল, অমিত শাহ থেকে জেপি নাড্ডা আদিত্যনাথ থেকে কে ছিলনা যে যায়নি! কিন্তু সেটা তেমন কোনও বড় ঘটনা নয়, ঘটনা হচ্ছে নিজেদের জন্মস্থলেই ১৫০ আসনের মধ্যে মাত্র ৫১টা কেন্দ্রে প্রতিযোগিতা করেছে মিম; কারন সেখানে বিজেপির থেকে কোনও সহযোগিতা পায়নি তারা।

হায়দ্রাবাদ পুরসভার ফলাফল বলছে সেখানে মিম কনটেষ্ট করা ৫১টার মধ্যে ৪৪টা জিতেছে, কিন্তু বিজেপি ৪৮টা আসনে জিতেছে চন্দ্রশেখর রাও এর TRS কে ধরাশায়ী করে। মিম ও কংগ্রেস যে যেখানে ছিল সেখানেই আছে TRS এর ৪৪টা এবার বিজেপির ঝুলতে চলে গেছে। অঙ্কটা সোজা, এই চন্দ্রশেখর রাও, চন্দ্রবাবু নাইডু, প্রফুল্ল মোহান্ত, সুখবীর সিং বাদল, মেহবুবা মুফতি, নবীন পট্টনায়ক, জয়ললিতা, নীতিশ কুমার, মমতা ব্যানার্জী, এরা সবকটা সংখ্যালঘু মুসলমান প্রেমীর ভেকধরা RSS এর দালাল, যারা বিজেপির ভূমি তৈরি করেছিল নিজ নিজ রাজ্যে সঙ্ঘের সংগঠন ব্যবহার করে।

কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে থাকতে ভুলেই গেছিল যে RSS এর নিজস্ব রাজনৈতিক দলের নাম BJP, সুতরাং জো ধরা জমিতে দালালদের কাজ কি, তাই হায়দ্রাবাদ পুরসভায় দালাল TRS কে খেয়ে নিয়েছে সঙ্ঘ, ফুটেছে পদ্ম। কাল তৃণমূলেরও এই দশাই হবে এটাকে আগাম অনুধাবন করে মমতা ব্যানার্জী কিছু তৃণমূলপন্থী মুসলমান ভক্তকে বাজারে ছেড়ে রেখে ‘BJP খারাপ তৃনমূল ভালো’র সাথে ‘মিম সাম্প্রদায়িক’ বলে উদোম চেঁচাচ্ছে। মিম নিশ্চিত সাম্প্রদায়িক এতে কারো সন্দেহ নেই, কিন্তু তৃণমূল যে ২১ বছর ধরে বিজেপিকে লালন করে গেল কখনও মন্ত্রীসভায় থেকে কখনও RSS এর দালাল হিসাবে, সে কি তাহলে? আসলে পাব্লিক জেনে গেছে ‘বিজেমূল’ জুটি আসলে RSS এর গোয়ালে এক গোঁজেই বাঁধা। মিম অন্তত RSS এর দালাল গুলোর মতো মেকি সেকুলার পোশাক পরে নেই; স্বভাবতই, মিম এরাজ্যে জন্মাবার আগেই তৃণমুলীদের রাত্রের ঘুম হারাম করে রেখেছে TRS এর দশা হবার ভয়।

পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে বড় প্রশ্ন, বিজেপি কি পারবে ২০১৯ সালে পাওয়া ৪০% ভোট ধরে রাখতে? ভুলে গেলে চলবেনা বৈষ্ণবনগরের মতো ৭৩% মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলে বিজেপি জিতেছিল। কীভাবে জিতেছিল! আসলে মমতা ব্যানার্জী আগুন নিয়ে খেলেছিল, নিজেদের পকেট ভোট বিজেপিতে ট্র্যান্সফার করে ‘সওদা’ করেছিল কোনো ফায়দার। এমন আসনের সংখ্যা নেহাত কম কিছু ছিলনা বাংলায়, যেখানে বিজেপির হয়ে তৃনমূল সরাসরি ভোট করেছিল, তাই বিজেপির চ্যালেঞ্জটাও সবচেয়ে বেশি। অধিকাংশ ভক্ত অঙ্ক না কষেই ‘ঘোষ মন্ত্রীসভা’ বানিয়ে ফেলেছে, আসলে তারা তো ভক্ত- নির্বুদ্ধিতা ভক্তের অলঙ্কার; এদেরই কেউ কেউ ভোট পরবর্তী সময়ে আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে পারে।

গণতন্ত্র মানেই বহুমত, কিন্তু মুসলমান ও দলিত সমাজের মতকে কে কবে মান্যতা দিয়েছে! নিজেদের রাজনৈতিক সাফল্যের সিঁড়ি বানিয়েছে এই দুই সম্প্রদায়কে। দলিতেরা পড়ে মার খেলেও তাদের চোখ খুলবেনা, তারা দিনের শেষে সেই মনুবাদকেই সত্য ধরে নিয়তি মেনে নেবে। কিন্তু মুসলমানেরা কেন আজও ভিক্ষা চাইবে? সমস্যা শুধু মুসলমানে নয়, বরং গরীব মুসলমানে। ধনী তবুও নিজেকে কিছুটা সুরক্ষিত করতে পারে অর্থের ক্ষমতায়, গরীবের শুধু উপরওয়ালা ভরষা।

জন্মভূমি ভালবেসে বাপের ভিটেতে রয়ে যাওয়া মুসলমানেরা “আমরা বঞ্চিত, আমরা অত্যাচারিত” এই চিৎকারই করে গেছে গত ৭০ বছর ধরে, কি লাভ হয়েছে? কেন সুফল মেলেনি নিজেদের জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করেনি। বরং সহানুভূতি আদায়ের জন্য উচ্চবর্ণের মনুবাদী শাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে নিজেদের শান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কখনও নিজেরা জোটবদ্ধ হবার প্রয়োজন বা সাহস করে উঠতে পারেনি, আত্মসমালোচনা করে এই অবস্থা থেকে বেরোনোর রাস্তা খোঁজার চেষ্টা করেনি। বরঞ্চ সিদ্দিকুল্লার মতো কিছু নেতা(!) সুলভে বিক্রি হয়ে গেছে নিজের বালবাচ্চার স্বার্থ সুরক্ষিত করতে।

মুসলমান ও দলিতদের উপরে আমহারে অত্যাচার করা যেত একটাই কারনে, সেটা হল তারা ছিল অশিক্ষিত ও গরীব। বিভিন্ন বেসরকারী মিশনের কল্যাণে এখন মুসলমান লেখাপড়া শিখছে, জ্ঞান বাড়ছে, বুঝতে শিখছে। মুসলমানদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন হয়েছে। চাইলেই আর মুসলমানকে দলদাস বানিয়ে রাখা যাচ্ছেনা। অনেক মুসলমানই তাদের সাংবিধানিক অধিকার বুঝে নেওয়ার জন্য আওয়াজ তুলছে। মনুবাদীরা এটাকে জিহাদী সাম্প্রদায়িকতার উন্মেষ বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় ত্রুটি না রাখলেও আসলে এতে লাভ কিছু হবেনা। গেরুয়া সন্ত্রাসের উল্টোপিঠে জিহাদেরই জন্ম হয়, দুটোই গুয়েই এপিঠ ওপিঠ। আরএসএস গোটা সমাজকে আড়াআড়ি বিভাজন করে সাম্প্রদায়িকতার উন্মেষ ঘটিয়েই রেখেছে, সুতরাং তাদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হবে তাদেরই দেখানো পথে। মিম তো একটা উপলক্ষ্য মাত্র।

গঠনমূলক ভাবনা ছাড়া সমানে সমানে লড়াই দেওয়া যায়না। ধর্মান্ধতাকে সেকুলারিজম দিয়ে রোখার চেষ্টা শেষ ৪০ বছর ধরেই চলছে, সুতরাং তা দিয়ে যে ধর্মীয় উন্মাদদের মোকাবেলা করা যায় না- এই বোধটা আর কবে আসবে! এবারে অন্য পথ অনুসরণ করবেই অত্যাচারিত দলিত-মুসলমান, যে পথে বিজেপি-RSS সমাজের বুকে ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। তাতে সমাজ আরো বেশি অশান্ত হবে আগামীতে, সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আবার নতুন মানচিত্র লেখা হতে পারে ৪৭ এর মত।

দেশের সামাজিক সম্প্রীতি ও অখন্ডতা রক্ষার দায় কি শুধুই সংখ্যালঘু মুসলমানদের?

....ক্রমশ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...