অষ্টম পর্ব
শ্রমজীবী ক্যান্টিন বা সুলভ মূল্যের সবজি বাজারের মতো মহতি কাজ দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার একটা অংশে কিছু প্রচারণা করে নিজেদেরকে আশ্বস্ত করা যায় যে- ‘হ্যাঁ আমরা আছি বাজারে’; কিন্তু ক্ষমতায়নের জন্য ভোটের রাজনীতিতে তা যথেষ্ট নয়। মিছিলের ভিড় জেতার জন্য যথেষ্ট নয়, তাহলে বিহারে তেজস্বী জিতত আর নীতিশ কুমার হারত। শুধুমাত্র সৎ বলে, বৃদ্ধ নেতাদের চেয়ারে রেখে বিপ্লবও হয় না। তাঁরা নমস্য, ওঁনাদের নিয়ে স্মৃতি রোমন্থন করতে ভাল লাগে, লড়াই এর সেনাপতি হিসাবে তাঁরা যে অচল এটা না বুঝলে ভোটের বাক্সে কোনো সুফল অন্তত পাবে না এই নভেম্বর, ২০২০ এর পরিস্থিতিতে।
লেনিন, স্ত্যালিন, মাও, চে, ফিদেল, হো-চি-মিন প্রমুখ এনারা কেউ বৃদ্ধতন্ত্রের প্রতীক ছিলেন না। এবারে দেশের দিকে একটু নজর দিন- ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ ৪৮ বছর বয়সে দেশের প্রথম বামপন্থী মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। জ্যোতি বসু ৫৩ বছর বয়সে রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ৩৩ বছর বয়সে রাজ্যের পুর্ণ মন্ত্রী হয়েছিলেন। সূর্যকান্ত মিশ্র ২৮ বছর বয়সে অবিভক্ত মেদনীপুর জেলার সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েছিলেন। অনিল বিশ্বাস ২১ বছর বয়সে পার্টি মেম্বার হয়েছিল, ৫৪ বছর বয়সে রাজ্য সম্পাদক। বিমান বসু ৩১ বছর বয়সে রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হয়েছিলেন। হরেকৃষ্ণ কোনার ২৩ বছর বয়েসে পার্টি মেম্বার হয়েছিলেন, ৫৪ বছর বয়েসে রাজ্যের মন্ত্রী। মহঃ সেলিম ৩৩ বছর বয়সে রাজ্যসভার মেম্বার হয়েছিলেন, সৈফুদ্দিন চৌধুরী ৩২ বছর বয়সে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হয়েছিলেন। ভি এস অচ্যুতানন্দ ১৭ বছর বয়সে পার্টি মেম্বার হয়েছিলেন। আর কত উদাহরণ চাই!
এই তাজা রক্ত ছিল বলে বামেরা দেশে একটা শক্তি হিসাবে উঠে এসে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল, এখনকার পার্টি নেতৃত্বে আছে এমন তাজা রক্ত? ভক্ত কমরেডরা বলবেন- সায়নদীপ, ময়ূখ, মীনাক্ষী, সৃজন বা প্রতিকুর কি নেই রাজ্য কমিটিতে! সত্য হলো এরা কেউ রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নয় যাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। নতুনদের সুযোগ না দিলে তাদের থেকে কীভাবে আরেকটা অনিল বিশ্বাস, জ্যোতি বসু, সৈফুদ্দিন চৌধুরিরা জন্মাবে! হাস্যকর হলো এই তালিকাতে ফুয়াদ হালিমই নেই, অথচ দেশে বামপন্থী মুসলমান মুখের মধ্যে তিনি সুপরিচিত। তাই আগে ঘরে বিপ্লব করে নের্তৃত্বে বিপুল তাজা রক্ত আনতে হবে বঙ্গ বামেদের, তার পরে না হয় সাম্প্রদায়িক ও ফ্যাসিস্টদের সাথে লড়াই করবে।
কারা বিজেপিতে বা অন্য দলে যাচ্ছে ও কেন যাচ্ছে, সেই খবরের আগাম সন্ধান লাগিয়ে যাবার আগেই বহিষ্কার করার সংগঠনটুকু নেই বামেদের। কোথাও একটা পার্টি অফিস দখল করার সংবাদে আনন্দ থাকুক, প্রত্যয় থাকুক, আত্মবিশ্বাস বাড়ুক, কিন্তু সেটাকে পাবার যোগ্যতা কতটা নিজেদের শক্তিবলে আর কতটা চালচোরেদের গোষ্ঠী কোন্দলের ফলে ‘পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা’ সেটুকু বোঝার ক্ষমতা ফিরলে তবে সেই আনন্দের সার্থকতা।
তৃণমূল কংগ্রেস পরিস্থিতি আবার ভিন্ন ধরনের, মমতা ব্যানার্জী নিজেও জানেন না কে আমার দলে আর কে বিজেপিতে গেছে। ভোটের দিন ঘোষণার পর যদি বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থীর নাম মমতা ব্যানার্জী হয় তাতেও কিছু আশ্চর্যের নয়। গোটা তৃণমূল দলটাই ১০ বছর ধরে লাগামহীন দুর্নীতিতে ডুবে ছিল। তাদের কুচো, মেজো, বড় সব নেতাগুলো CBI, ED, IT দপ্তরের হাতে বন্দী হওয়ার ভয়ে বিজেপির ঘরে রোজ হাজিরা দিয়ে আসে। কিছুজন আবার লেজেন্ড, যেমন শুভেন্দু, রাজীব ব্যানার্জীরা; ‘ঠিকঠাক দর পেলেই যাইব’ মোডে আছে। অবশিষ্টগুলো আম্বানি আদানির থেকে কামানো বিজেপির টাকার থলির দিকে চেয়ে দিন গুণছে- “মেরা নাম্বার কাব আয়েগা!”
প্রশান্ত কিশোর- চোরেদের মাঝে ‘কম্বলের লোম বাছার’ কাজ ছিল তার। সে ভাবছে আমার ৫০০ কোটির শেষ কিস্তি পাই না পাই, তার আগেরটা পেয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরতে পারলেই জান বাঁচে, মান হারালেও সেটা অন্যত্র ম্যানেজ করে নেবে আগামীতে। তবে তারাও মিডিয়া সেল তৈরি করেছে, বিজেপিকে টক্কর দেবে। এ দিক থেকেও বামেরা ১০ বছর পিছিয়ে, ভারতবর্ষের অন্যতম ধনী রাজনৈতিক ক্যাডারভিত্তিক দল হয়েও পেশাদার IT Cell নেই। অতি উৎসাহী কিছু বাম সমর্থক নিজেরা ঘরের খেয়ে সমানে বিজেপি আর তৃণমূলের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে লড়ে যায়। ফেসবুক-টুইটারের মতো প্রো-বিজেপি সংস্থার বিরুদ্ধেই এদের লড়তে বাম-কংগ্রেসী সমর্থকদের, নিত্যদিন ব্লক ও ‘প্রোফাইল উড়িয়ে দেওয়া’র মতো এক অসম লড়াই। তবু তারা লড়ছে বলেই সোশ্যাল মিডিয়াতে বামেদের অস্তিত্ব টুকু আছে।
বাম বা কংগ্রেসের IT সেলের নামে যারা আছে এক আধাজন, তারা প্যারালাল ঘোঁট পাকাতে ব্যস্ত। দুদিন কয়েকটা বড় নেতার সাথে ছবি তোলা হলেই নিজেদের কক্সিসে এক্সট্রা লেজের উপস্থিতি টের পেয়ে যায়। ব্যাস, তখন তাদের জ্ঞানের নমুনা, ঔদ্ধত্য ও আঁতলামো দেখলে মনে হবে তারাই প্রশান্ত কিশোর বা অমিত মালব্যের শিক্ষাগুরু। আগেই বলেছি, বামেদের দ্বাপরযুগের নের্তৃত্ব আজও পুষ্পকরথে বিশ্বাসী, সুপারসনিক জেট প্লেনে তাদের কি যায় আসে! চেয়ারে বসে থাকার জন্য কি আর রথ লাগে না জেট প্লেন লাগে! প্রয়াত সোমেন মিত্র বা প্রদীপ ভট্টাচার্যরা অদৌ জানেন যে IT cell খায় না মাথায় মাখে!
বিজেপি অমিত মালব্য সহ বাকি প্রোপ্যাগান্ডা টিমকে কোলকাতায় পাঠিয়ে দিয়েছে। আশার কথা হলো প্রশান্ত কিশোর ফেল মেরেছে বাংলাতে, তার কোনও প্রজেক্টই চলেনি। মালব্যদের গুরুর এই হাল হলে মালব্য-আঁখিদাস কতটা সফল হবে তা যথেষ্ট সন্দেহের।
.....ক্রমশ
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন