শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬

সোনার দাম কেন বাড়ছে?


 সোনার দাম কেন বাড়ছে?


🔰 সোনার দাম কেন বাড়ছে? 🔰


এর কারণ পুরোটাই অর্থনৈতিক এবং আমেরিকান ডলারকেন্দ্রিক। কোনো জিনিসের দাম নির্ভর করে ‘ডিমান্ড আর সাপ্লাই’ এর সামঞ্জস্যতার উপরে। চলুন সংক্ষেপে একটু ব্যাখ্যা করা যাক।


বিজ্ঞানীদের ভাষ্যমতে, সমগ্র পৃথিবীর সোনা এক জায়গায় করলে সেটা ২৩ ঘনমিটার জায়গার মধ্যে সবটুকু চলে আসবে। মানে একটা মাঝারি সাইজের আলুর কোল্ডস্টোরের মধ্যে পৃথিবীর সমস্ত সোনা, হ্যাঁ সমস্ত সোনা ঢুকে যাবে। সোনা যেহেতু গাছে ফলে না বা ফ্যাক্টরিতে প্রোডাকশন করা যায় না, তাই সোনার সাপ্লাই বা পরিমাণ নির্দিষ্ট বা ধ্রুবক। গোল্ডমাইন থেকেও উৎপাদন অতি নগণ্য এবং ভীষণ ব্যয় বহুল; বাকিটা কেবল হাতফেরৎ হয়। সুতরাং, সভ্যতার শুরু থেকে আজ অবধি সোনার পরিমাণ খুব বেশি বাড়েনি, আগামীতেও বাড়বে সেই সম্ভাবনাও ক্ষীণ বা নেই। তাহলে এই মূল্যবৃদ্ধির একমাত্র কারণ- ডিমান্ড বৃদ্ধি।

 

এখানেই প্রশ্ন, রাতারাতি কে এই ডিমান্ড বাড়ালো? আমি আপনি কি বিপুল সোনা কিনেছি? উত্তরটা হলো- না। তাছাড়া আমরা যদি কিনতামও, সেই দু-দশ ভরি কেনাকাটায় দামে অতি সামান্য হেরফের হতো, যেমনটা গত শতাব্দীতে হতো। স্বাভাবিক বাজারে কেউ যেমন কিনছে, তেমন আরেক জন আবার বিক্রিও করছে, এই ভাবেই বাজারের স্থিতাবস্থা বজায় থাকে। কিন্তু বর্তমানে একটা শ্রেণি রয়েছে যারা সোনাটা কিনে মজুদ করে ফেলছে, সেটা পুনরায় আর বাজারে ফেরৎ আসছে না, ফলতো অবশিষ্ট সোনাটুকুর জন্য অন্যজন অনেক বেশি দাম অফার করছে; এভাবেই দাম বাড়ছে।

 

তাহলে কারা সোনাটা কিনে মজুদ করছে? এটা জানতে গেলে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘ব্রেটন উডস’ সিস্টেমের নামে শয়তানি করে বিশ্বের প্রায় ৭৩% সোনা আমেরিকা তাদের দেশে নিয়ে চলে যায় নানান ছলচাতুরি করে, পরবর্তীতে যা তারা আত্মসাৎ করে দেয়। কীভাবে নিয়ে গিয়েছিল তা লিখতে বসলে টন টন কাগজ লাগবে, এত বড় সেই শঠতার ইতিহাস। আগামীতে কখনও সে নিয়ে লেখা যেতেই পারে, শুধু এটুকু জেনে রাখুন সেই সোনার পরিমাণ প্রায় সাড়ে আট হাজার টন, কল্পনাতীত। পরবর্তীতে বাকি দেশগুলো যখন তাদের সোনা ফেরৎ চায়, তাদের রাষ্ট্রপ্রধানদের বন্দুকের ডগায় রেখে, সেই সোনার বিনিময়ে কাগুজে বন্ড ইস্যু করে আমেরিকা- বিনিময়ের ‘ইনস্ট্রুমেন্ট’ হিসাবে’, একেই আমরা ডলার বলে চিনি।


আমাদের দেশের টাকাতেও লেখা থাকে- "চাহিবা মাত্র ইহার বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবে"। অর্থাৎ টাকা একটা সরকারি হাতচিঠি বৈ কিছু নয়। নোটের নিজস্ব কোনো মূল্য নেই, রাষ্ট্র নিজে জামিনদার থেকে ওই ‘টাকা’ নামের কাগজটাকে আসল সম্পদের প্রতিরূপ হিসাবে হিসাবে মূল্যবান করে তোলে। এই হিসাবে দেশে যত টাকা আছে, তত পরিমাণ সম্পদ তথা সোনা/রূপা থাকা উচিৎ। কিন্তু তা নেই, কারণ সোনা আছে আমেরিকার কাছে, তার পরিবর্তে আমেরিকা ডলার দিয়ে রেখেছে, ডলারই আমাদের সহ গোটা বিশ্বের প্রতিটা দেশের সঞ্চিত সম্পদ। কারণ ডলার ছাড়া কোনো দেশ জ্বালানি তেল কিনতে পারবে না কোথাও থেকে, এই জন্যই ডলারের অপর নাম পেট্রোডলার।


পেট্রোডলার কীভাবে শুরু হয়েছিল? ১৯৭৩-১৯৭৪ সৌদির মোল্লাদের সাথে আমেরিকা একটা চুক্তি করে। সৌদি আরব তার দেশের 'পেট্রোল/ডিজেল' শুধুমাত্র আমেরিকান ডলারের মাধ্যমে বিক্রি করবে, অন্য কোন কিছু বিনিময় মূল্য হিসাবে দিলে, সৌদি সরকার তাকে তেল দেবে না। এর বিনিময়ে আমেরিকা সৌদি আরবকে অস্ত্রশস্ত্র, প্রযুক্তি ইত্যাদি দিয়ে সামরিক ও সামাজিক নিরাপত্তা দেবে। যে কারণে গত ৫০/৬০ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের সর্বত্র অশান্তির আগুন জ্বললেও সৌদিতে নূন্যতম কোনো অশান্তি হয়নি। কারণ অশান্তি যে পাকায়, সেই আমেরিকাই সৌদির পাহারাদার, অশান্তি করবে টা কে!


অন্যান্য পেট্রোলিয়াম সমৃদ্ধ দেশ যারা এই ডলার ভিন্ন অন্য মুদ্রা কিম্বা সোনার বিনিময়ে তেল বিক্রি করতে গিয়েছিল, তাদের সকলকে আমেরিকা শেষ করে দিয়েছে নানা বাহানাতে। সেটা লিবিয়ার গাদ্দাফি হতে পারে, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন হতে পারে কিংবা বর্তমানে ভেনেজুয়েলার মাদুরো; চোখের সামনে এইসব জ্যান্ত উদাহরণ রয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধেও এতো ক্ষোভের মূল কারণ এটাই, তারা ডলার ছাড়া তেল বেচছে ইন্ডিয়ান রুপি, রাশিয়ান র‍ুবেল ও চীনা ইউয়ানে।


আজকের দুনিয়ায় জ্বালানি তেল ছাড়া গোটা সভ্যতা অচল, সুতরাং প্রতিটা দেশকে তেল কেনার জন্য ‘ডলার’ কিনতেই হতো আমেরিকার কাছ থেকে, পাশাপাশি মজুদও রাখতে হতো। যেহেতু বিশ্বের সকলের কোষাগারে ডলার মজুদ আছে ‘তেলের’ ক্রেতা-বিক্রেতা নির্বিশেষে, অচিরেই বিশ্বের যেকোনো দুটো দেশের নিজেদের মাঝের ব্যবসা-বাণিজ্যও ডলারের মাধ্যমেই হতে শুরু করে দিয়েছিল। এভাবেই ডলার বৈশ্বিক মুদ্রা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে রেখেছিল, যুদ্ধ বোমা বন্দুকের ভয় দেখিয়ে পেট্রোডলারের মাধ্যমে। এতে করে বিশ্বের যে কেউ যে কোনো আন্তর্জাতিক ব্যবসা করুক, আমেরিকা সেখান থেকেই একটা কাটমানি খেতো।


গত পাঁচটা দশক ধরে আপনার কাছে যে ধরনের মুদ্রায় থাক কিংবা সোনাদানা মোহর হিরে জহরত, কোনো কিছু দিয়ে আপনি তেল কিনতে পারেননি কিংবা বিনা ডলারে একটিও বৈদেশিক বাণিজ্য করতে পারেননি। এই সবকিছু সোনাদানা হিরে জহরতের বিনিময়ে আপনাকে আমেরিকার কাছ থেকে ডলার কিনতে হতো। আমাদের সরকার আমেরিকাকে সোনা দিত আর আমেরিকা সেই সোনার বিনিময়ে ডলারের নামে কাগজ ছাপিয়ে দিত। ফলত এতদিন সোনার থেকেও ডলার বেশি মূল্যবান ছিল।


মজার কথা হলো, ২০২৪ জুনের ৯ তারিখ সৌদির সাথে করা সেই পেট্রোডলার চুক্তি শেষ হয়ে গিয়েছিল, সেটাকে টেনে দেড় বছর আনঅফিসিয়ালি চালাচ্ছিলো। কিন্তু এই জানুয়ারির ৯ তারিখ সৌদি আরব এই চুক্তিকে নবায়ন করতে মানা করে দিয়েছে, সরকারিভাবে। এতেই আমেরিকা পড়েছে তাদের সাম্রাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে গভীর অস্তিত্ব সংকটে, ওয়াশিংটন/নিউইয়র্কে হাহাকার পড়ে গেছে, তারা মরিয়া ক্ষ্যাপা কুকুর হয়ে উঠেছে ইরাণে যুদ্ধ লাগাবার জন্য, ভেনেজুয়েলা বা গ্রীনল্যান্ড দখলের জন্য। কে বলতে পারে, ইরানের নামে বোমাবারুদ জড়ো করে আসলে যুদ্ধটা সৌদিতেই না লাগিয়ে বসে উন্মত্ত আমেরিকা।


ঠিক আজকের দিনে গোটা বিশ্বের অর্ধকের বেশি পেট্রোলিয়াম বাণিজ্য তথা জ্বালানি তেল বিক্রি হচ্ছে স্থানীয় মুদ্রায় বা পণ্য বিনিময় প্রথার মাধ্যমে। ধরা যাক ভারত, আমরা তেলের দাম সৌদি আরবকে রুপিতে পেমেন্ট করছি অথবা চাল, আনাজ, শস্য কিংবা কয়লা দিচ্ছি। পাশাপাশি শ্রীলংকা সিংহলি মুদ্রার বিনিময়ে তেল কিনছে, চীন তাদের মুদ্রা ইউয়ানে কিনছে। কারো কাছে ডলারে কেনাটা আজ আর বাধ্যতামূলক নয়, ফলত ডলার রোজ একটু একটু করে গুরুত্বহীন হয়ে যাচ্ছে মূল্য হারিয়ে।


যেমন আমাদের দেশে ৫০০/১০০০ টাকার নোট দেশের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বাতিল করে দিতেই সেগুলো বাজে কাগজে পরিণত হয়েছিল, রাশিয়ার ক্ষেত্রেও এমনটা হয়েছে। আমেরিকা রাশিয়া দ্বন্দ্বের কারণে, রাশিয়ার সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কে সঞ্চিত ডলার ছিল, সেগুলোকে আমেরিকা রাতারাতি বাতিল করে দিয়েছে, যেমনটা গত সপ্তাহে ইরানের সাথেও করেছে। আমেরিকার এই গুন্ডামি দেখে বিশ্বের বাকি দেশগুলোর কপালে ভাঁজ পড়েছে। আমাদের যেমন রিজার্ভ ব্যাঙ্কে ডলার মজুদ আছে, প্রতিটা দেশের রিজার্ভ ব্যাঙ্কেও তাই আছে, কিন্তু আমেরিকার এই দাদাগিরির ভয়ে আজকের দিনে প্রতিটা দেশ শঙ্কিত, এমনকি তাদের মিত্র ইউরোপও ব্যতিক্রম নয়।


তাই পেট্রোডলার চুক্তি শেষ হবার কিছু আগে থেকেই ডলার ছেড়ে দেওয়া বা নতুন করে ডলার না কেনার ধুম পরে গিয়েছিল বিশ্বজুড়ে, ২০২৪শে চুক্তি শেষ হতে সেটা মহামারীর আকার ধারণ করেছে। নতুন করে কেউ আর ডলার কিনছে না, বরং যেগুলো আছে সেগুলোও ছেড়ে দিচ্ছে। এদিকে ডলারের বিপরীতে বিকল্প কোনো মুদ্রা বৈশ্বিক ভরষা যোগাড় করে উঠতে পারেনি, ব্রিকসও নতুন মুদ্রা বাজারে আনতে পারেনি। ফলত প্রতিটা দেশ ডলারের বদলে, আসল সম্পদ ‘সোনা’ মজুদ করছে, তাদের দেশজ সঞ্চয় ভান্ডারের জন্য।


সুতরাং, গোটা বিশ্বজুড়ে প্রতিটা দেশ সোনা মজুদের দিকে নজর দিতেই বাজার থেকে সোনা কমতে শুরু করেছে এবং পরিমাণ যত কমতে থাকছে, অবশিষ্ট সোনার দাম তত চড়তে থাকছে। পৃথিবীর প্রতিটা দেশের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক, নিজেদের সামর্থ্য মত টন টন সোনা কিনে মজুদ করছে। যেমন আমাদের ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কে ৮৮০ টন সোনা মজুদ রয়েছে, যা দৈনিক আরও বাড়াচ্ছে আমাদের সরকার। ডলারের এই পরিস্থিতিতে শেয়ার মার্কেটও টালমাটাল, আমেরিকা যখন তখন যার তার উপরে স্যাংশন/ট্যারিফ লাগিয়ে দিচ্ছে, সর্বক্ষণ যুদ্ধ পরিস্থিতি। তাই বড় শিল্পপতি, পুঁজিপতিরাও সেফ ইনভেস্ট হিসাবে সোনাতে লগ্নি করছে। কারণ সোনার দামের উপরে আমেরিকা বা অন্য কোনো দেশের নিয়ন্ত্রণ নেই, সোনা প্রতিটা দেশে প্রতিটা যুগে প্রতিটা সাম্রাজ্যে প্রতিটা ব্যক্তির কাছে সম্পদ হিসাবে মুল্যবান।


পদার্থ বিজ্ঞান বলছে- পতনশীল বস্তুর গতি সময়ের সাথে সমানুপাতিক হারে বৃদ্ধি পায়, মার্কিন ডলারের পতনও রোজ বাড়বে। ডলারের এই পতনের সাথে সোনার মূল্য বৃদ্ধিও সমানুপাতিক; উল্টোটাও সঠিক- সোনার মূল্য বৃদ্ধির সাথেও ডলারের পতন সমানুপাতিক। এই যে ডি-ডলারাইজেশন পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে বিশ্ব ব্যবস্থা যাচ্ছে, এটা আমেরিকাকে ভেতর থেকে ফোকলা করে দিচ্ছে প্রতি মুহূর্তে, যে কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প মাতালের মতো আচরণ শুরু করেছে।


সোনার এই মূল্যবৃদ্ধি আসলে পাঁচ লাখে থামবে না দশ বিশ লাখে লাফ দেবে, সেটা আজকের দিনে বলা অত্যন্ত মুশকিল। আমেরিকা তার সঞ্চিত সোনা বাজারে না ছাড়া অবধি সোনার দাম রোজ লাফ দিয়ে বাড়তেই থাকবে। তবে, আমেরিকাও যখন নিজেদের সোনা বিক্রি করতে লাগবে, তখন সে উচ্চ মূল্যেই বিক্রি করবে, আর এটা তাকে করতেই হবে। যে হারে গোটা বিশ্ব ডলারকে পরিত্যাগ করছে, সেই হার চলতে থাকলে দু'এক মাসের মধ্যে আমেরিকাকে তাদের রিজার্ভে থাকা ওই সাড়ে আট হাাজার টন সোনা ধীরে ধীরে বাজারে ছাড়তে হবে। এছাড়া আমেরিকার বিন্দুমাত্র বিশ্বাসযোগ্যতা নেই বাজারে, তাই ডলার নামের অস্ত্র দিয়ে বিশ্বকে লুট করার দিন তার আর ফিরবে না।


আমেরিকা ৫০ টা ভাগে ভাগ হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা, যে কোনোদিন ভোর বেলায় উঠে শুনবেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আর নেই। অস্ত্র ছাড়া আমেরিকার নিজস্ব কোনো উৎপাদন নেই, তারা বিশ্বের নানা দেশ থেকে মালপত্র নিয়ে এসে বড়জোর এ্যাসেম্বল করে কিম্বা অন্যের পণ্য মার্কেটিং করে নিজেদের লোগো লাগিয়ে। আমেরিকার রিজার্ভ সোনা বাজারে আসতে শুরু করলেই তাদের ‘ফোলানো ফাঁপানো’ কোম্পানিগুলো মুখ থুবড়ে পড়বে, শেয়ার বাজার রাতারাতি ক্রাশ করে যাবে।


আমেরিকাতে গৃহযুদ্ধ লেগে যাওয়া সময়ের দাবী। তবে সেটা আটঁকাতে হলে আমেরিকাকে রাতারাতি অন্যত্র যুদ্ধ লাগাতেই হবে, যাতে অস্ত্র বিক্রি করতে পারে। নতুন একাধিক দেশ খুঁজতে হবে যেখান থেকে সম্পদ লুঠ করতে পারে, এবং ডলারকে পুনরায় বিশ্ব বানিজ্যের মুখ্য ও একমাত্র বিনিময় মুদ্রা রেখে দেওয়ার বিনিময়ে কাটমানি খেতে পারে। আর এগুলোর তিনটেই একসাথে করতে হবে, একটাতেও ব্যর্থ হলেই খেল খতম। কিন্তু আজকের বৈশ্বিক রাজনীতিতে চীন ও রাশিয়া~ আমেরিকার বিরুদ্ধে থাকা সমশক্তির পরাশক্তি, তাই গেলাম আর জয় করলাম- এমন একতরফা হওয়ার নয়। অতি শীঘ্র অতীতের স্প্যানিশ সাম্রাজ্য, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, উসমানীয় সাম্রাজ্যের মতো ইতিহাসের এক কোণে আস্তাকুঁড়ে ঠাই পাবে ‘প্রতারক ও লুঠেরা’ মার্কিন পশ্চিমা সভ্যতা।


আপনার বাজারে সোনার দাম বাড়ার এর সাথে আমেরিকার পতন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত বা বলা ভালো দুটোই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তবে সোনার দাম আগামী ৫/৭ বছর আর কমছে না, বাড়তেই থাকবে, বাড়তেই থাকবে, যতক্ষণ না সম্পদ জনগণের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়।


সেলিম হুমায়ূন বৈঠকঃ অপারেশন কাটমানি

 


অপারেশন কাটমানি।

 

অপারেশন বর্গা যেমন হয়েছিল, তেমনই ‘অপারেশন কাটমানি’ করতে হবে সেলিম সাহেব। “লুঠের টাকা কেড়ে নিয়ে এসে, বিলিয়ে দেওয়া হবে মুটে মজদুর চাষীদের মাঝে”- এটা স্পষ্ট করে বলুন, রোজ বলুন, বারেবারে বলুন, দলের সবাইকে দিয়ে বলান। আর এগুলো করতে গেলে ঝান্ডা ধরার ডান্ডা দিয়ে তোলামুলের লুঠেরা বাহিনীকে পালটা ক্যালানি দিতে হবে, নতুবা লুঠের মাল উদ্ধার হবে না। এই ক্যালান দিতে গিয়ে যার সাহায্য লাগবে, অর্থাৎ যারা তোলামুলকে কেলিয়ে লাট বানিয়ে দেবে তাদের সাথে যদি কিছু রফা করতে হয়, ১০০ বার করুন, হাজার বার করুন। রাজনীতি যুদ্ধের ময়দান, বাবু বিবিদের পোঁদ নাচিয়ে রিল বানানো নয়।

হুমায়ূন পচা সন্দেহ নেই। পাশাপাশি একটা এমন ভোটার দেখান যে গত ৩টে নির্বাচনে হুমায়ুনের ‘আদর্শে দীক্ষিত হয়ে’ ভোট দিয়েছিল। হুমায়ুনের সাপোর্ট করার প্রশ্নই নেই, কিন্তু তীব্র সাম্প্রদায়িক যে খুনে বক্তৃতা হুমায়ূন দিয়েছিল, সেটা সালারের যোগীর ভাষণের একটা পালটা এফেক্ট ছিল। আজ যারা হুমায়ুনের বিরুদ্ধে লিখছে, সেই চটিচাঁটা মিডিয়া ও ভাতাজীবী সারমেয়কুল এর আগে হুমায়ুনের জাত নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি, যখন সে তোলামুল আর বিজেপিতে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করছিল।

হুমায়ূন বা নৌশাদের সাথে রয়েছে তারা, তারা কারা? এরাই তো ২০০৬ সালে সিপিএমের ভোটার ছিল, ২০১৬ সালে তোলামুলের ভোটার, ২০২৬ শে হুমায়ূন বা নৌসাদের কুলে ভিড়েছে। ফেসবুকের সোফা বিপ্লবীরা জোরে পাদতে গেলে হেগে ফেলে, তারা সামান্য বুথ এজেন্ট হবার নাম শুনলে মুতে ফেলে, এরা পাল্টা ক্যালানি দিতে পারবে তোলামুলের লুটেরা বাহিনীকে? দল সিপিএম সেই ক্যালানি দেওয়ার লোকটা কোথা থেকে পাবে রাতারাতি? আর ক্যালানি না দিতে পারলে ব্যান্ডেজ বাঁধা কালসিটের ছবি দিয়ে সহানুভূতি ভিক্ষা করা আর শূন্যের মহিমা কীর্তনই করতে হবে আগামী ১ দশক।

বিজেপি যাদের প্রার্থী করেছে, তৃণমূল তাদের মন্ত্রী করেছে- এমন ডজন খানেক উদাহরণ রয়েছে। অথচ, সিপিএম শুধু একটু কথা বলেছে মাত্র, তাতেই সিপিএমের সতীত্ব রক্ষার্থে তৃণমূল, বিজেপি বুদ্ধিজীবী সমালোচক, তাবড় মিডিয়া, সব একাকার হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি হাহাকার একশ্রেনীর বাম্বাচ্চাদের, এরা চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় তুলছে। উদগান্ডুরা বোঝেই না- রণনীতিতে সংগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ, সতীত্ব নয়; দিনের শেষে টিকে থাকতে হবে তো

সেলিম সাহেব ধন্যবাদ, আপনি একটা পরিণত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যার দরুন অন্তত ৩ দিন প্রচারের আলোর সবটা আপনার দিকে ছিল। হুমায়ুনের সাথে আলাপ করতে যাওয়াটা কোন গভীর অন্তরালের বিষয় ছিল না, রীতিমতো ফাঁদ পেতে স্বীকৃত মিডিয়া হাউসগুলোকে বাধ্য করেছেন- তুমি আমার কাছে এসো, আমার বক্তব্য শোনো, আর এইগুলোর মাধ্যমে পার্টিকে প্রাসঙ্গিক করে তোলো। নতুবা এই মিডিয়াই ইনসাফ যাত্রা, বাংলা বাঁচাও যাত্রা সহ এমন শয়ে শয়ে সিপিএমের কর্মসূচীকে ১ পয়সার গুরুত্ব দেয়নি; অথচ হুমায়ূন হিট। মিডিয়ার তৈরি তৃনমূল-বিজেপি এই বাইনারিকে কাটানো, বিষয়টা মোটেই সহজ ছিল না।

কোলকাতার কোনো অন্ধ গলিতে মাঝরাত্রে কিংবা মুর্শিদাবাদের যেকোনো বাড়িতে, কালো কাঁচে ঢাকা গাড়িতে নিজেদের লুকিয়ে দিব্যি কথা বলা যেত হুমায়ুনের সাথে। যেহেতু আসল উদ্দেশ্যটা হুমায়ুন নয়, আসল উদ্দেশ্য নিজেদের পালে প্রচারের আলো কেড়ে নেওয়া, আসল উদ্দেশ্য দশ দিক খুলে বার্তা দেওয়া। রাজ্যের মানুষ কী বলতে চাইছে, কী তাদের চাহিদা, সেইটা খানিকটা পরখ করার তাগিদে- তাদের বক্তব্য রাখার রাজনীতির ময়দানকে আরেকটু বড় করে দেওয়া। দেখুন কী কী আউট হয়েছে- মমতার সিঙ্গুর ফ্লপ ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে, সিদ্দিকুল্লার রাজভবন অভিযান অন্ধকারে তলিয়ে গেছে, নিতীন নবীন মহাশয়- রবীন্দ্রনাথকে শান্তিতে নোবেল পাইয়ে না দিলে বাংলাতে তার উপস্থিতির কথাও মানুষ জানতে পারত না। কারণ  মিডিয়ার সমস্ত আলোর কেন্দ্রে একটাই মানুষ – মহঃ সেলিম।

সংসারটা যাকে চালাতে হয়, সে বোঝে ঝক্কি কাকে বলে। যে রান্না করে সে জানে কখন কতটা নুন দিতে হবে, কোথায় চিনি দিতে হবে, কোথায় তেল লাগাতে হবে। বড় বাবুর্চিরও ভুল হয় বৈকি। টানাটানির সংসারে অল্প অল্প করে কিছুটা টাকা বাঁচিয়ে দুর্গাপুজো/ঈদে যিনি সকলকে কাপড় কিনে দেন, নুন আনতে পান্তা ফুরায় যে হেঁশেলে সেখানে রোববার অন্তত একপিস চিকেন আর অনেকটা ঝোল যিনি জোটাবার বন্দোবস্ত করেন, ভুল হলে গালিগালাজ তিনিই খান। দিনের শেষে সংসার চালাবার দায় ও গালি খাবার দায় যখন কারো একার ঘাড়ে- সুতরাং সিদ্ধান্তের বড় অংশটা যে তিনিই নেবেন, স্ট্যান্ড তিনিই নেবেন এটাই কি স্বাভাবিক নয়?

সিঙ্গুরের বুকে মমতা ব্যানার্জী, নির্বাচন কমিশনকে শিখন্ডী বানিয়ে SIR কে আক্রমণ করে মুসলমান প্রীতি দেখানোর মিথ্যা প্রয়াস বাস্তবে মাঠে মারা গেছে। RSS থেকে পরিষ্কার করে বার্তা গেছে কমিশনে, মুসলমানকে ডিফিউজ করার মতো সব রকম প্রচেষ্টা চালু হয়েছে কমিশন ও RSS এর দুই রাজনৈতিক শাখা তৃণমূল ও বিজেপি উভয়ের তরফেই।

একটু পিছনে ফিরুন, ২০২৪ লোকসভা। একটা বিজেপি জোট আরেকটা কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইন্ডি জোট। পশ্চিমবঙ্গের ভোটার পরিষ্কারভাবে বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল, বিজেপিকে ১৮ থেকে ১২ তে নামিয়ে এনেছিল। অধীর ও সেলিম দুজনেই হেরেছিলেন, এটা কোনো কাকতালীয় বিষয় ছিল না, এটা ইন্ডি জোটের কংগ্রেস ও তোলামুলের মাঝে বোঝাপড়ার ফল ছিল- মমতা ও রাহুল গান্ধীর মাঝের আঁতাত। ২০২৪ সাল থেকে কংগ্রেস ও তোলামুলের অফিসিয়াল অলিখিত জোট চলছে, শুভঙ্কর তো একটা পাতি বোড়ে মাত্র।

খুব খেয়াল করে দেখুন, ২০২৪ নির্বাচনী প্রচারে রাহুল গান্ধী বা তার মা সহ, কংগ্রেসের কোনো শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্ব কিন্তু বাংলাতে প্রচারে আসেনি। ইন্ডি জোটে সিপিএম যেমন রয়েছে, তোলামুলও রয়েছে। রাহুল গান্ধীর বার্তা স্পষ্ট ছিল ও আজও সেটাই আছে- বাংলাতে ইন্ডি জোটের প্রধান শরিক তোলামুল। পাশাপাশি অধীর চৌধুরী ছিল লোকসভার বিরোধী দলনেতা, সে জিতে গেলে তাকে রাতারাতি সরিয়ে দেওয়াটাও দৃষ্টিকটূ ছিল, সুতরাং রাহুল গান্ধী বাংলাতে না এসে শুধু তোলামুলকে সাপোর্ট করেছে এমনটা নয়, অধীরকে হারিয়ে দিয়ে লোকসভার বিরোধী দলনেতার পদটাকেও কুক্ষিগত করতে পেরেছে প্রশ্নাতীত ভাবে। কংগ্রেসের চেয়ে হারামি আর কেউ নেই, না তাদের নীতি আছে, না তাদের ভোট। এদের সাথে জোট মানে গাধার পিঠে চড়ার বদলে গাধাকেই কাঁধে চড়িয়ে নিয়ে যাওয়া।

রাজ্যজুড়ে ৮৮ হাজার বুথে ২জন করে কমপক্ষে দেড় লাখ চোর রয়েচছে। এচছাড়া MAL, MP, তাদের স্যাঙাৎ, চাঁটাপার্টি সব মিলিয়ে কমবেশী ৩ লক্ষ স্বীকৃত চোর রয়েছে এই মুহুর্তে। হারাম খেয়ে খেয়ে চর্বি জমে গেছে এদের, মানসিকভাবে কুঁড়ে হয়ে গেছে। ভোট চুরির জন্য তো দৌড়ঝাঁপ করতে হয়, নিজেরা সেসব ভুলে গেছে, ভাড়াটে গুন্ডা দিয়ে আর কতটা কী করা সম্ভব! পাশাপাশি সম্পদ মানুষকে ভীত করে তোলে, হারাবার ভীতি এসে যায়। এদের ছেলেপুলেরা বড় ব্যবসা ফেঁদে বসেছে রাজ্যের সর্বত্র। ফলে, তোলামুলের প্রতিটা চোর এখন ভীত, এরা এবারে আপসে আসতে রাজি হবে। এদের ক্যালাতে হলে ফেসবুকের বিপ্লবীরা কি যাবে দ্বান্দিক তত্ত্ব আবৃত্তি করতে করতে? নাকি বাঁশ নিয়ে যারা ক্যালাতে পারে তারা যাবে? আর বাঁশ নিয়ে ক্যালাবার লোক বামেদের দলে মাঠে ময়দানে ঠিক কতজন আছে আজকের দিনে এই মুহূর্তে?

যারা হুমায়ূন বা সিদ্দিকির দলে রয়েছে, তাদের অধিকাংশই তো সর্বহারাদের প্রতিনিধি। শ্রমিক, কৃষক, প্রান্তিক শ্রমজীবী। এটা ঠিক, ১০১% ক্ষেত্রে এদের সাথে বামেদের আদর্শ খাপ খায় না, তাই জোট করার প্রশ্নই ওঠে না, কিন্তু গণতন্ত্রে যখন সংখ্যা কথা বলে, সেখানে পরিস্থিতির সাপেক্ষে রফা হলে সমস্যাটা কোথায়! বেগ এলে নাকে রুমাল চাপা দিয়েও তো আমরা হাইজিন ভুলে বাসস্ট্যান্ডের পাবলিক টয়লেটে ঢুকে পড়ি। শৌচের জন্য রোজ বাঁ হাতে করে হলেও গু ঘাঁটি তো আমরা প্রত্যেকে, তাহলে তোলামুল নামের রাজনৈতিক গু সাফাই করতে হলে হুমায়ূন নামের গু ঘাঁটলে অমনি অপবিত্র অশুচি হয়ে যাবো?

টাকা কারো বাপের নয়, আমার ট্যাক্সের টাকা চুরি হয়েছে, অথবা রাষ্ট্রীয় জনগণের সম্পদ চুরি হয়েছে। চোর তোলামুল এই চুরি করেছে। তাই যেকোনো মুল্যে এদের বিসর্জন দিতে হবে ভোটের মাধ্যমেই। দুর্নীতির পাহাড় ভাঙতে গেলে কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবি বা ন্যাকড়া জড়ানো দাস ক্যাপিটেলের সামনে হাত জড়ো করে পূজারী শ্রেণির তাত্ত্বিক কমিউনিস্ট দিয়ে হবে না, ওই জাতেরই গাঁইতি কুড়ুল নেওয়া লোক দরকার, জেসিবি দরকার। যারা তোলামুলকে ক্যালাবে। সর্বহারা শ্রমজীবী ‘শ্রেনি’ ডাইলেক্ট এর কচকচি বোঝে?

দিনের শেষে সংসারটা যাদের চালাতে হয়, দল ক্ষমতায় এলে নেতা মন্ত্রী হলে যেমন তারা হবেন, খারাপ হলে মা মাসি তুলে গণ খিস্তিখেউরটাও তারাই শোনে। তাই, বাকি সেটাই হোক যেমনটা পার্টি শীর্ষ নেতারা পরিস্থিতিকে বুঝবে বিশ্লেষণের মাধ্যমে। আমি বুঝি, যে উদমা ক্যালান দিতে পারবে, তার সাথে ভোটের বাজারে সমঝোতা বা রফা করো; ব্যাস এটুকুই, যাতে অপারেশন কাটমানি প্রোজেক্ট সফল হয়।

শ্রমিকের যেমন শৃঙ্খলা ছাড়া হারাবার কিছু নেই, বামেদেরও তেমন শূন্য ছাড়া হারাবার কিছু নেই, পাওয়ার জন্য গোটা বাংলা রয়েছে প্রতীক্ষাতে।

বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬

বামপন্থা কি!

 

বিচিতে লাথি পরলে কেউ বউকে স্মরণ করেনা। নাঙ, ব্যাং, নেতা, দিদি, পিসি, দাদা, জ্যেঠু, মেসো, গার্লফ্রেন্ড , শ্বশুর, শালী, বৌদি, ভগবান প্রমুখ কাউকে ডাকেনা।

বাবাগো/মা'গো, গেলাম গেলাম- এটা বলেই চেল্লায়। এটাই শাশ্বত।

কৃষক শ্রমিকের পেটে লাথি পরলে যে কথা গুলো বের হয়, মার্ক্স সেই কথা গুলোই সংকলন করে লিখে গেছেন, তার বাইরে আজও নতুন কিচ্ছু বলার নেই, আগামীতেও থাকবেনা। কারন এগুলোও শাশ্বত। এই কারনেই যুগ যুগান্তরে দেশ কালের গন্ডী পেরিয়ে প্রতিটা রক্তচোষাদের স্থায়ী শত্রুর নাম মহামতি মার্ক্স ও তাঁর দর্শন।

স্বভাবতই, তোলামুল বা চাড্ডিরাও যখন শ্রমিক কৃষকের হয়ে কথা বলে সেটা বামেদের মতই শোনায়। মার্ক্সের অনুগামী মনে হয়।

সুতরাং, এলিতেলি যাকে তাকে বাম ভাবার ভুলটা বড্ড করে ফেলি আমরা। বামপন্থা কোনো কবিতা বা কয়েকটা ইষ্টমন্ত্র জপার নাম নয়। এটা একটা জীবনধারা, যেটা সারাজীবন ধরে অনুশীলন করে যেতে হয়। তাই ধান্দাবাজ, সেয়ানা, চালচোর, ধর্মীয় উন্মাদ, ভাতাজীবি কিম্বা নেকু সুশীল যে কেউ যখন অন্ন বস্ত্র বাসস্থান ও মৌলিক অধিকারের দাবীতে কথা বলে আমরা তাৎক্ষণিক ভাবে ধোঁকা খেয়ে যায়।

আমাদের আরো বেশী সতর্ক হতে হবে এই ক্রান্তিকালে।

বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬

WOW! Momo

 


#boycottwowmomo


কলকাতা শহরের বুকে এত বড় অগ্নিকাণ্ড, অথচ চারিদিকে কেমন যেন একটা অদ্ভুত নীরবতা, বরং বইমেলা নিয়ে অনেক বেশি মাতামাতি শহুরে শিক্ষিত মহলে। সোশ্যাল মিডিয়াতে হুজুকে পাব্লিকের মাথা ব্যথা অরিজিৎ সিংহের ফিল্মি গান না গাওয়ার খবর নিয়ে। বিধানসভা নির্বাচন মাত্র দু’মাস বাকি আছে, সেই নিয়ে তর্জার খামতি নেই, SIR নিয়েও চায়ের কাপে তুফান উঠছে। এদিকে তোলামূলের নেত্রী Mamata Banerjee ও তাদের যুবরাজ Abhishek Banerjee এই দুটো পেজে, আজকে বেলা ১২টা অবধি কোনো পোস্ট নেই এই ভয়াবহ অগ্নিকান্ড বিষয়ে সহমর্মিতা বিষয়ে। অথচ অন্যান্য পোলিও বা হুপিং কাশিতে কিম্বা পেঁচো মদ খেয়ে ড্রেনে ডুবে মৃত্যু হলেও পিসি ভাইপো মিলে SIR এ মৃত্যু বলে নৃত্যনাট্য শুরু করে দিয়েছেন গত ২ মাস ধরে। 

ওদিকে তোলামূল যত লাফায়, বিজেপি ততটাই লাফায় মেপে মেপে। ওয়াও মোমোর মালিক যেহেতু মারোয়াড়ি, স্বাভাবিকভাবেই বিজেপির অফিসিয়াল পেজে BJP West Bengal বেলা ১২টা অবধি অগ্নিকান্ড নিয়ে কোনো পোস্ট নেই। মজা হলো ছাগলের তিন নাম্বার ছানা বামেদের নিয়ে, তারা এমনই সরলমতি নির্বোধ- CPIM West Bengal পেজের সর্বজ্ঞ রিংটাল এডমিনেরা নিজেরা জানে না কোনটার প্রতিবাদ কখন করতে হয়, আর কোনটা করতে নেই। যেহেতু তোলামূল বা বিজেপির পক্ষে কেউ কিছু বলেনি, তাদের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলেও অফিসিয়ালি কোনো বিবৃতি জাতীয় কিচ্ছু নেই আজ বেলা ১২টা অবধি, অথচ অগ্নিকান্ডের সময় পেরিয়ে প্রায় দেড় দিন অতিক্রান্ত। একদল চোর বাটপার সরকারে রয়েছে, বাকি দুটোর একটা ধর্মীয় উন্মাদ আর একটা নির্বোধ সর্বজ্ঞ ক্ষমতায় আসতে চায়। এই হলো বাংলার রাজনৈতিক নির্যাস।

আশঙ্কা করা হচ্ছে নিখোঁজ এবং খুঁজে পাওয়া মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ৫০ জন বা তার বেশি হতে পারে, যারা সকলেই গরিব শ্রমজীবী মানুষ। আজ অবশ্য আরেক ভাইপো অজিত পাওয়ার নিয়ে সকলে ব্যস্ত। সঞ্জয় গান্ধী, রাজেশ পাইলট, বিজয় রূপানি, খান্ডু, YSR রেড্ডি, মাধব রাও সিন্ধিয়া- এই তালিকাতে আরেকটা নাম ৭০ হাজার কোটি চুরি করা ডাকাত অজিত পাওয়ার। প্রমোদ মহাজন, গোপীনাথ মুণ্ডে, বিপিন রাওয়াত, মনোহর পারিকর, এমন অনেক নামের ভিড়ে আরেকটা নাম অজিত পাওয়ারেরও রইল, শাহী জামানাতে যার মৃত্যুর কোনও তদন্ত হবেনা। সে যাই হোক, আনন্দপুরে ফিরি । তবে পিসি সহজে আনন্দপুরে ফিরতে পারছেন না, শরদ পাওয়ারের ভাইপোর এক্সিডেন্ট তার শরীর রক্তশূন্য করে দিয়েছে। হাজার হোক ভাইপো তারও একটা আছে। কে জানে তার কী পরিণতি ঘটাবে! 

বাংলার পক্ষী Garga Chatterjee চৌদারও কিন্তু কোনো দেখা নেই, কোনো আওয়াজ নেই। মেড়োদের টাকায় খেয়েপড়ে সংগঠন চালায়, বলবেটা কীভাবে! দুটো শ্রমজীবী বিহারি মেরে এদের যত বিপ্লব। প্রতিটা শহুরে বুদ্ধিবিচিদের মুখে মাড়োয়ারির বীর্যে ভেজানো বার্গার ঠাসা রয়েছে, চোখে মাসিকের ন্যাকড়া, তাই এরা শুনতে পেলেও- না কিছু দেখতে পাচ্ছে না কিছু বলতে পারছে। সকলের জ্ঞানগরিমা নিজেদের ইজেরে সঞ্চিত রয়েছে, বেশি লাফাঝাঁপা করলে কালীঘাটের মাসোহারা বন্ধ হয়ে যাবে। তাই এরা সকলে বইমেলা নিয়ে ব্যস্ত, কতগুলো ছোটলোক আগুনে পুড়ে মরল না বাঁচল তা দেখার ফুরসত কোথায়!

আনন্দপুরের জতুগৃহে মৃতদের বেশিরভাগের বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুর জেলা। পুলিশ অবশ্য প্যান্ডেল ব্যবসায়ী খেজুরির গঙ্গাধর দাসকে বলির পাঁঠা বানাতে উঠেপড়ে লেগেছে, কারণ মাড়োয়াড়ির টিকি ছুঁলে ঝটকা লাগবে। পুলিশ যেটা ভালো পারে সেটাই করছে, অধিকাংশ বডি হাফিস করে দিয়েছে। তারপরেও ১৬টা লাশ বাইরে চলে এসেছে। ২০ জনের নামে নিখোঁজ ডায়েরি হয়েছে, বারুইপুর পুলিশ জেলার সুপার জানিয়েছেন, বিষয়টা তদন্ত করে দেখছেন।

সোনারপুর উত্তর বিধানসভা এবং নরেন্দ্রপুর থানার অন্তর্গত ওই এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে পৌঁছেছিলেন বিধায়ক ফিরদৌসী বেগম, দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু দাঁড়িয়ে থেকে তথ্য লোপাটে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছেন। স্থানীয় স্তরে কমরেডেরা আজ হয়তো কোনো প্রতিবাদ মিছিল করবেন, কিন্তু কোলকাতার রাস্তা স্তব্ধ করে দেওয়ার দিন সেই বাম আমলেই ফুরিয়ে গিয়েছে। অবাঙালি মাড়োয়াড়ির নাম উচ্চারণ করে সাধ্যি কি!

উন্নয়নের জোয়ারে আসা কয়েকটি অগ্নিকান্ডের ছোট্ট ঘটনা –

  • ১) ৯ ডিসেম্বর ২০১১, AMRI Hospital অগ্নিকাণ্ড (ঢাকুরিয়া, কলকাতা)। মৃত্যু সংখ্যা প্রায় ৮৯ জন।
  • ২) ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, কলকাতা মার্কেট অগ্নিকাণ্ড (Surya Sen Street Market)। পাঁচ তলা মার্কেটের আগুনে শ্রমিক ও ব্যবসায়ী ছিলেন কাজ শেষে/ঘুমানো অবস্থায়। মৃত্যু সংখ্যা কমপক্ষে ১৯ জন।
  • ৩) ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বাগরি মার্কেট (Bagri Market) আগুন দীর্ঘদিন ধরে জ্বলে প্রায় ১,০০০+ দোকান ও সামগ্রী ধ্বংস করেছিল। মৃত্যু সংখ্যা সবটাই ধামাচাপা দিতে সক্ষম হয়েছিল। 
  • ৫) ২৭ আগস্ট ২০২৩, দত্তপুকুর ফায়ারওয়ার্কস ব্লাস্ট (Duttapukur blast)। অবৈধ বাজি কারখানায় বিস্ফোরণ ও আগুন। মৃত্যু সংখ্যা কমপক্ষে ৯ জন।
  • ৬) ৩০ এপ্রিল ২০২৫, Rituraj Hotel অগ্নিকাণ্ড (বড়বাজার, কলকাতা)। মৃত্যু সংখ্যা ১৪ জন।

এছাড়া পূর্ব মেদিনীপুর জেলার এগরার একটি বেআইনি বাজি কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটেছিল ১৬-১৭ মে ২০২৩-তে। প্রথম খবর অনুযায়ী ঘটনাস্থলে ২০ জন ঝলসে যায়, তারপর তোলামূল প্রশাসন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সব ধামাচাপা দিয়ে দেয়। গত ১৫ বছর ধরে রাজ্যের প্রতিটা অংশে কত বিয়ে বাড়ি, বাজি কারখানার নামে বোমা ব্লাস্ট করিয়ে কত মানুষ পুড়িয়ে খুন করে কাঠ কয়লা বানিয়ে দিয়েছে, তার কোন লেখাজোখা নেই।

চারিদিকে মিথ্যা প্রশ্নের ভিড় জড়ো করে মাড়োয়াড়িকে বাঁচাবার চেষ্টাতে কোনো খামতি নেই তোলামূল প্রশাসন ও বিজেপির। জলাজমি কবে ভরাট হয়েছে? দমকলের পারমিশন ছাড়া গোডাউন কেন চলছিল? মৃতদের পরিবারের জন্য সরকারের কী বার্তা দিয়েছে, এই সব আবাল প্রশ্নে ছেয়ে রয়েছে বঙ্গ মিডিয়া। 

৫০টা শ্রমজীবী পরিবারকে ক্ষতিপূরণ কীভাবে দেবে আর কে দেবে ও কবে? কেন ২৪ ঘন্টা কেটে গেলেও WOW মোমোর কেউ গ্রেফতার হয়নি ও কেন! কেন বিরোধীরা এমন গান্ধীজির বাঁদর সেজে বসে রয়েছে?

আম বাঙালিকে শুধাচ্ছি- আপনারা পারেন না আজ থেকে WOW মোমোকে সমুচিত জবাব দিতে, দিন না এই কোম্পানিটাকে বয়কট করে। আপনাদের অন্তরে তো এই খুনিদের প্রতি তীব্র ঘৃণা রয়েছে। সরকার ভাড় মে যাক, নিদেনপক্ষে আপনি তো মৃতদের প্রতি সহমর্মিতা দেখাতেই পারেন- এই মেড়ো কোম্পানিটাকে কালো তালিকাভুক্ত করে।

মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬

নির্লজ্জ আলিমুদ্দিন


 

আপনাদের কি কোনো লজ্জা শরম অবশিষ্ট আছে? না এমনটা বলছিনা যে আগেও আপনাদের হায়া শরম ছিল, না আপনারা কখনও দাবী করেছিলেন যে আপনাদের লজ্জা বা ইজ্জত রয়েছে।

লর্ড শুভঙ্কর প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি হবার পর থেকে টানা বলে চলেছে আমরা ২৯৪ টা আসনে নিজেরাই লড়ব, নিজেরাই লড়ব। রাহুল গান্ধীর অনুমতি না থাকলে গত পাঁচ ছয় মাস ধরে এই কথা সে বলতে পারত! প্রত্যেকটা সংবাদ মাধ্যমে এ খবর বারেবারে বেরিয়েছে, ২৩ টা জেলার প্রতিটা জেলা সভাপতিরা জানিয়ে দিয়েছে- তারা সিপিএমের সাথে জোট চায় না। তবুও লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে কংগ্রেসের সাথে জোট করার জন্য পেছনে পেছনে ঘোরার দরকারটা কোথায়?

৩৪ বছর রাজত্ব করার পর সংগঠন কি এতটাই ধজভঙ্গ হয়ে গেছে যে- জেলা থেকে আলিমুদ্দিন অবধি খবর আসাও বন্ধ হয়ে গেছে? কংগ্রেস বহু জেলায় যতটা পেরেছে প্রার্থী বাছাই করে ফেলেছে। যেটুকু বাকি রয়েছে সেটা- তোলামূলের যে চোরটা টিকিট পাবে না, সেই মালগুলোকে ধরে এনে টিকিট দিয়ে কিছু হারামের টাকা কামাবার অভিপ্রায়ে।

মালদা, মুর্শিদাবাদ কিংবা উত্তর দিনাজপুরে বামেরা যদি আসন জেতে, তবে সেটা তাদের নিজ ক্ষমতাতেই পারবে, না পারলে কংগ্রেসের ভোটেও পারবে না। কিন্তু বাকি ২০টা জেলায়, বামেদের ভোট ছাড়া একটা আসনেও কংগ্রেস জামানত টুকু বাঁচাতে পারবে? দুই বর্ধমান ও মেদিনীপুর, ২৪ পরগণা, হুগলি, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, নদীয়া, বাঁকুড়া, ও পুরুলিয়াতে একটা এমন আসনের নাম বলুন, যেখানে কংগ্রেস তার নিজস্ব ভোট বামেদের ঘরে ট্রান্সফার করিয়ে বাম প্রার্থীকে জেতাবার মতো ক্ষমতা রাখে? এমন ১টা আসনের নাম বলতে পারলে আমি কান কেটে কুত্তার গলায় ঝুলিয়ে দেবো।

হ্যাঁ, সত্যিই যদি অধীর চৌধুরীর সঙ্গে মুর্শিদাবাদে কোনো আন্ডারস্ট্যান্ডিং করতেই হয়, সেটা স্থানীয় স্তরে বোঝাপড়া করে নিন, মিটে গেল! তার জন্য এত ঘটা করে কংগ্রেসের পোঁদে হত্যে দিয়ে পড়ে দরকারটা কী আছে? এতটাই কি আপনারা মানসিক ভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছেন? নাকি রাজনৈতিক বোধবুদ্ধিহীন উন্মাদ হয়ে গেছেন!

দুই ২৪ পরগণায় ISF অন্তত কংগ্রেসের থেকে জোট সঙ্গে হিসেবে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য আর মাঠে ময়দানে মাঠে লড়াই দিতে পারবে। পাতি বাংলায় তোলামূলের শওকত শাহজাহানের ঠ্যাঙারে বাহিনীর মোকাবিলাতে পালটা ক্যালানি দিতে গেলে বহু জায়গায় ISF কে দরকার, এটাও বাস্তবতা। তাছাড়া ISF জোট করতে চেয়ে সম্মানের সঙ্গে চিঠিও দিয়েছে অলরেডি।

বলিহারি আপনারা নেতা সেজেছেন এই  আকালের কালে, মহামতি মার্ক্স বেঁচে থাকলে আপনাদের কোর্ট মার্শাল করাবার নিদান দিতেন নির্ঘাৎ। আপনাদের পালে হাওয়া দিচ্ছে আপনাদের অনুগত কিছু সর্বজ্ঞ স্বঘোষিত বিজ্ঞবিচি ফেসবুকের বাম্বাচ্চা বিপ্লবী সমর্থক! আর তো দু’মাসও বাকি নেই ভোটের নির্ঘন্ট প্রকাশ হতে, এই অন্তিম লগ্নে দাঁড়িয়েও সোজা কথাটা সোজাভাবে বলতে পারছেন না কেন! মেরুদণ্ডে জোর না থাকলে হালকা করে মরে গিয়ে জায়গা ফাঁকা করে দিন, যত্তসব ভীতু মালে জায়গা জড়ো ফালতু।


শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬

SIR- হেয়ারিং এর আতঙ্ক



(১)

 

জাতীয় ডিম্ভাত দিবস ১৯৯৩ সালের ২১শে জুলাই এর জমায়েত কী উদ্দেশ্যে হয়েছিলো জানেন? তোলামূলের রাজ্যে না জানাটাই আপনার অধিকার। ভোটার তালিকা সংশোধন ও ভোটার কার্ডকে ভোটিং এর জন্য একমাত্র পরিচয়পত্র করতে হবে- এই দাবিতে কোলকাতার রাজপথে মান্নীয়ার নেতৃত্বে সেই গুন্ডামি মারদাঙ্গা হয়েছিল। যা আজকের ভাষায় SIR এর পূর্বপুরুষ, ২১শে জুলাই সেই দাবিতেই হয়েছিলো। সেখানে ১৩ জনের লাশ পাওয়া গিয়েছিলো লাভ হিসাবে, যা তোলামূল সুপ্রিমোর রাজনীতির জমি তৈরি করেছিলো। শহীদ দিবসের চাহিদা ছিলো এই SIR.।

২০০৫ সালে সংসদে উনি বলেছিলেন- “বাংলায় অনুপ্রবেশ এখন এক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে, আমার কাছে বাংলাদেশি এবং ভারতীয় উভয়ের ভোটার তালিকা আছে। এটি খুবই গুরুতর বিষয়। আমি জানতে চাই কখন সংসদে এটি নিয়ে আলোচনা হবে?” স্পিকার সোমনাথ চ্যাটার্জি যখন প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন, তখন তৎকালীন অগ্নিকন্যা- পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে, ডেপুটি স্পিকার চরণজিৎ সিং আটওয়ালের দিকে কাগজপত্রের একটি গুচ্ছ ছুঁড়ে মারেন এবং তার আসন থেকে পদত্যাগ করার চেষ্টা করেন। দেশে SIR বা NRC এর লাগু পক্ষে সংসদে বিদ্রোহ করা ব্যাক্তিটির নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

ইতিহাস শেষ।


এবার আজকের বাস্তবে ফিরি চলুন। SIR নিয়ে বাজারে একটাই দাবী- AI দিয়ে নাকি নির্যাতন কমিশন শয়তানিটা করছে। চলুন দুটো দ্রুত দুটো ইতিহাস দেখে নিয়ে আলোচনাটা শুরু করি।

হক কথা সন্দেহ নেই, অবশ্যই নির্যাতন কমিশন হারামি; কিন্তু সেই বৃহত্তর হারামির ছায়াতলে খুচরো হারামি গুলো, যারা গোপনাঙ্গের লোমফোঁড়ার মত আমাদের জীবন অতিষ্ট করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত, তাদেরকে কেন অদেখা বা উপেক্ষা করে যাচ্ছেন! নির্যাতন কমিশন দিল্লিতে বসে চারটে অবাঙালি গুজ্জু অফিসার দিয়ে কলকাঠি নেড়ে আমার বা আমার বাপের নামের বানান ভুল করেনি, না আমার বা আমার বাপের ৬টা সন্তান তারা বানিয়ে দিয়েছে! তাহলে এগুলো কে বা কারা করেছে নির্যাতন কমিশনের পক্ষে?

সোজা উত্তর, সাদা খাতা জমা দেওয়া ৩২ হাাজার সেই প্রাইমারি শিক্ষক রূপী তোলামূলের ক্যাডার বাহিনী- যারা BLO ছিলো, এদের যোগ্য সঙ্গত দিয়েছে ডেটা এন্ট্রি অপারেটরেরা, যারা সারা বছর তোলামূল সরকারের পে-রোলে পঞ্চায়েত লেভেলে নানা সরকারী কাজের সাথে যুক্ত। সমস্যা হলো, এই অবধি শোনার পরেই আমার মা মাসি তুলে খিস্তি করবেন আপনি, ছুপা চাড্ডি স্পটেড কিম্বা রামরেড বলাটাই দস্তুর; কারন আপনাকে যে ন্যারেটিভ জানানো হয়েছিলো, কিম্বা সোশ্যাল মিডিয়া সহ নানান সংবাদমাধ্যম দেখে যে ন্যারেটিভ আপনার ভাবনাতে তৈরি হয়ে রয়েছে, তার সাথে খাপ খাচ্ছেনা আমার ভাবনা। তা সে আপনি আপনি গালি খিস্তি করতেই পারেন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বাধীন নাগরিক হিসাবে, তাতে আপনিও যে বিশ্লেষণের বাইরে গিয়ে একজন উৎকৃষ্ট ভক্ত, সেটাও প্রমাণ হয়ে যায়। চলুন দেখে নিন, এই আতঙ্ক কেন ও কারা কীভাবে তৈরি করেছে!

রাজ্যের পশুপালন মন্ত্রী ‘যাত্রাপালা’ দেবনাথ মহাশয় SIR সহায়তা কেন্দ্রের সামনে নিজের বীরত্ব দেখাতে গিয়ে একটা বাচ্চা ছেলের হাত থেকে মাইক কেড়ে নিয়েছেন খবরে প্রকাশ। জেল ফেরত আসামী ‘গরুচোর’ অনুব্রতকে চোর বলাতে দৌড়ে গিয়ে মাইক কেড়ে নিয়েছে, যেটা আসলে ওনার ব্যক্তিগত হতাশার বহিঃপ্রকাশ। যেই মাত্র শুনেছেন ২০২৬ সালে ভাইপো তাকে টিকিট দেবেনা, সেই মুহুর্তে এমন কিছু একটা করতে চেয়েছেন, যাতে তিনি খবরের শিরোনামে ফিরে আসেন। এভাবেই এরা খবরে থাকে, আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করে।

যে সুস্থ আছে তাকে ভয় দেখাও, যে ভয়ে আছে তাকে আতঙ্কিত করো, যে আতঙ্কে আছে তাকে চরম পথ বেছে নেওয়ার জন্য উত্তেজিত করো। লাশের রাজনীতি করা শকুনের দল অধীর আগ্রহে ‘একটি লাশের জন্য’ হা-পিত্যেস করে বসে রয়েছে। ২১শে জুলাই গুলি খাওয়া লাশের রাশি, রিজওয়ানুরের লাশ থেকে তাপসী মালিকের লাশ হয়ে, নন্দীগ্রামের অগণিত লাশ- মান্নিয়ার ক্ষমতা দখলের সিঁড়িই হলো লাশ। দুর্গন্ধ বাজার, হাগো বাংলা, মর্তমান কিম্বা সংবাদ অতিদীন খুললেই এখন SIR এর কারনে আতঙ্কে মৃত্যুর কলামে গোটা কাগজ ভর্তি, তা অনলাইন হোক বা অফলাইন। প্রতিটা ঘটনার নেপথ্যে একটা মোটিভ থাকে, আর এটা যখন রাজনীতির ময়দান, সেখানে লাভ ক্ষতির হিসাব থাকবেই। সুতরাং, এখানে আপনি আমি ভয় পেলে লাভ কার?

আমাকে নিজেকেও ডাকা হয়েছিলো কমিশনের তরফে, আধার কার্ডের সাথে ভোটার কার্ডে থাকা নামে মিস ম্যাচ। পাশাপাশি আমার বাবার নাকি আমি বাদেও একাধিক পুত্র সন্তান রয়েছে। দুটো অপশন ছিলো, আমি মুসলমান বলেই দিল্লির বিজেপি সরকার আর নির্যাতন কমিশন মিলে আমার বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্র করেছে; সুতরাং সবার আগে সোস্যাল মিডিয়া গরম করে তবে হেয়ারিং এর লাইনে দাঁড়ানো, দ্বিতীয়ত চুপচাপ লাইনে দাঁড়ানো ও সমস্যার শিকড় খোঁজা। আমি দ্বিতীয়টা করেছিলাম, কারন আমি জানি আমাদের এই বুথ লেভেলের নাম তোলার কাজটা দিল্লি থেকে এসে কেউ করেনি, বিজেপির পার্টি অফিস থেকেও কেউ করেনি; এটা আমার BLO কিম্বা ডেটা এন্ট্রি যারা করেছে- তাদের কারো কীর্তি। সুতরাং এই পরিস্থিতিতে ‘ইশ বিষ ধানের শিষ’ পদ্ধতিতে আমার পিতার ৬ সন্তানের যে কাউকে বাদ দিতে গেলে, আমার বাদ চলে যাওয়ার সম্ভাবনাও ছিলো। আবার মোটেই কাউকে বাদ না দিলে, বা আমি রয়ে গেলাম পরিচিত মুখ হওয়ার কারনে, পাশাপাশি অন্য ভুয়ো ৫ জনের ১ জনেরও নাম যদি রয়ে যায়, পরের মাসেই আমার বাড়ি সম্পত্তির দখল নিতে চলে আসবে সে। উভয় সঙ্কটের কারনে আমি গিয়ে যা বুঝলাম, মূলত বানান ভুল এবং ইচ্ছাকৃত ভাবে আমার বাবার সাথে অন্য কোনো অসাধু ব্যাক্তি প্রজনি ম্যাপিং করার কারনে মানুষের এই হয়রানি।

এই নামের ভুলটা কে করেছে? AI? AI নিজে থেকে নাম গুলো তুলেছিলো? নাকি BLO/ডেটা এন্ট্রি অপারেটরেরা নাম তুলেছিলো? AI ভুল ধরছে, সেটা মানুষের করা ভুল। যখন বাড়ি বাড়ি গিয়ে SIR এর প্রাথমিক প্রক্রিয়া চলছিলো, তখন BLO রা অসুস্থ হয়ে পরছিলো, তাদের উপরে অমানুষিক চাপ ইত্যাদি বলে একটা ভয়ানক প্রোপ্যাগান্ডা চালিয়ে- শুধু মাত্র মৃত আর স্থায়ী ভাবে স্থানান্তারিত বাদে প্রতিটা নাম ড্রাফট লিষ্টে তুলে দেওয়া হয়েছিলো। সেখানে, যে যার সাথে খুশি প্রজনি ম্যাপিং করেছিলো, খুব অল্প সংখ্যক আবার ম্যাপিং অংশটা ‘ব্ল্যাঙ্ক’ রেখেই নাম তুলে দিয়েছিলো। বামেরা সহ কোনো রাজনৈতিক দল চায়নি- এ রাজ্যে কোনো অবৈধ ‘হিন্দু’ নাম বাদ যাক। এটা ছিলো একটা অলিখিত মেমোরান্ডাম যা প্রতিটা রাজনৈতিক দলের মধ্যে কাজ করেছে। ফলে শুরুতেই যে স্ক্রুটিনি হওয়ার ছিলো, সেটা হয়নি। তার জন্য আজকে এসে এই হয়রানি।

পশ্চিমবাংলা ছাড়া আরো ১১টা রাজ্যে একই SIR প্রক্রিয়া চলছে, উত্তরপ্রদেশে সবচেয়ে বেশী নাম বাদ গেছে- কারন অবৈধ নেপালি ও দ্বিতীয়ত পরিযায়ী শ্রমিক। সেখানে এত গেল গেল রব নেই, তামিলনাড়ু, গুজরাত, রাজস্থান সর্বত্র বাংলার চেয়ে বেশী হারে নাম বাদ গেছে একদম প্রাথমিক পর্যায়েই। অথচ পশ্চিমবাংলাতে বাংলাদেশী, নেপালি, ভুটানি, কামতাপুরি, রাজবংশী অনুপ্রবেশ সমস্যা রয়েছে। এছাড়াও কলকাতা ভারতের রাজধানী থাকার সুবাদে, এক সময় উন্নত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সুবিধা নেওয়ার জন্য- আসাম, উড়িষ্যা, আজকের ঝাড়খন্ড, বিহার, পূর্ব উত্তর প্রদেশ সমেত স্বাধীন ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের লোক এসে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অংশে ঘাঁটি গেড়েছিলো, যাদের পিতৃপুরুষের গ্রামের সাথে সংযোগটা একেবারে ছিন্ন হয়ে যায়নিতবুও বাকি সকল রাজ্যের নিরিখে শতাংশের বিচারে প্রথমিক পর্যায়ে সবচেয়ে কম নাম বাদ গেছে। এ রাজ্যের প্রতিটা রাজনৈতিক দল মিলে ভোটের রাজনীতির দিকে তাকিয়ে একটা নামও বাদ দিতে নারাজ, কারন যেন-তেন ভাবে তার পরিবারের ভোটটা যেন আমরা পায়- এই দেউলিয়া রাজনীতি চলছে।

ভয়টা কে দেখাচ্ছে? দেখাচ্ছে তোলামুল কংগ্রেস। শুরু থেকেই তারা এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটাকে রাজনৈতিক এ্যাজেন্ডা বানিয়ে নিয়েছে। তলে তলে SIR করার জন্য লোক লস্কর ও বাজেট বরাদ্দ রেখে, জনগণ ক্ষ্যাপাবার জন্য SIR হতে দেবোনা বলে প্রোপ্যাগান্ডা করে গেছে। যখন পাড়ায় পাড়ায় এই BLO গুলো যাওয়া শুরু করেছিলো, তখনও চুড়ান্ত অসহযোগিতা শুরু করেছিলো এই তোলামুলের লোকজনেরাই। তার পর পর্যায়ক্রমে নানান অশান্তির পর ‘কোনো নাম’ বাদ দিতে দেবোনা- গোঁ ধরে বসে ছিলো, এর পর শুরু করেছিলো BLO রা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে, ইত্যাদি। ক্রণোলজি মেনে একটার পর একটা রিল মঞ্চস্থ হয়ে চলেছে। কিন্তু কেন?

হেয়ারিং শুরু হবার আগে খসড়া তালিকার ৫৮ লাখ বাতিল ভোটের বিশ্লেষণ করে আইপ্যাক দেখতে পেয়ে গেছে, গতবারের জেতা ৭০ টি আসনের জয়ের ব্যবধানের থেকে কাটা যাওয়া ভোটের সংখ্যা বেশি। হেয়ারিংয়ের পর কত সংখ্যক ভোট আরো কাটা যাবে সেই ব্যাপারে কোন স্থির সিদ্ধান্তে আসা যাচ্ছে না। অর্থাৎ রাজ্যের ২৫-৩০ হাজার ভোটে জেতা প্রায় সব বিধানসভা আসন। এখন হয় ক্লোজ কন্টেস্ট হবে অথবা ফলাফল যা খুশি হয়ে যেতে পারে। এতেই তোলামূলের মাথা ঘুরে গেছে। দুরবীন দিয়েও বিজেপিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা R Bangla এর বাইরে, মতুয়া অঞ্চলে বিজেপি যে গাড্ডায় পড়েছে তথাপি SIR নিয়ে তাদের নাচন কোদন যে বাঙাল অঞ্চলে ব্যাকফায়ার করেছে, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু বিজেপি জুজু না থাকলে তোলামুলের ঝাঁপ বন্ধ, তাই তারা নির্যাতন কমিশন মানেই বিজেপি- এই লাইনে ব্যাটিং করছে।

মুসলমানদের ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে ‘ইজতেমা’ কেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রোপ্যাগান্ডা থেকে তোলামুলের কোনও রাজনৈতিক লাভ হয়নি। মন্ত্রী, সান্ত্রী, আমলা, গামলার এক বিপুল বাহিনী নামিয়েও পুরো ফ্লপ শো হয়েছে তোলামুলের তরফে। ইজতেমায় আসা কোটি কোটি মানুষ- সকলে কার পাড়ায় কোন ওয়াকফ সম্পত্তি তুলতে পারেনি, হুমায়ূনের বাবরি মসজিদ, আর RSS এর দুর্গার ‘দুর্গা অঙ্গন’ ও মহাকাল মন্দির সংক্রান্ত আলোচনাতেই সময় কাটিয়েছে ধর্মীয় অংশের বাইরে। উন্নয়ণের কাণ্ডারি যিনি মুসলমানদের মসিহা, তিনিই যদি ‘হিন্দু তোষণে’ এতো মন্দির বানান সরকারি কোষাগার থেকে, RSS এর কি বিজেপিকে খুব দরকার! ধর্মীয় অংশের বাইরে এই ছিলো ইজতেমার মূল সাংসারিক আলাপ চারিতা। এরপর নীপা ভাইরাসকে বাজারজাত করার কম চেষ্টা হয়নি মিডিয়া মেশিনারি দিয়ে; কিন্তু সে গুড়ে বালি নয়, পিঠে পড়েছে। মানুষ গুছিয়ে নলেণ গুড় খেয়েছে বাঁদুরের আতঙ্ক উড়িয়ে।

 

(২)


সিদ্দিকুল্লাহ নাকি মঙ্গলবার রাজভবন অভিযান করবে! রাজভবনে কোন নির্বাচন কমিশনার বসেন? কোন সমাধানের জন্য রাস্তায় নেমে এই উৎপাত? আসল উদ্দেশ্য জমিয়তের নামে ফের মুসলমানকে ভয় দেখানো, মুসলমান আতঙ্কে না থাকলে তোলামুল ফিনিশ, তাই হাতের সব তাস খুলে ফেলেছেন ঘুগনিকন্যা।

আতঙ্কের ফেরিওয়ালারা সমস্বরে মৃত্যুর বিজ্ঞাপন করে যাচ্ছে। তেলাপিয়া নন্দী থেকে ডেটওভার ঘোষালদের মত গৃহপালিত পোষ্যদের নামিয়ে দিয়েছে কালীঘাট, এরই পরম্পরায় ‘শুক্রবারে বেলডাঙায় ২৪ ঘন্টা আক্রান্ত’ হালে পানি পায়নি। নন্দীগ্রাম কান্ডের সময় থেকে বাজারে নেমে পড়া ছুপা রুস্তম নকশাল, অতিবাম, তোলামূলী বুদ্ধিজীবী, কিছু লাথখোর ব্যক্তি, সাংবাদিকের নামে ইউটিউবে হাত পেতে খাওয়ার জন্য তোলামূলের চটি চাঁটা সারমেয়র দল- এরা এই প্রোপাগান্ডাটা শুধু হাতে ফ্রিতে করছে, এটা কোন মতেই সম্ভব নয়; এদের কারো কোনো নীতি ও আদর্শ রয়েছে বলেও কেউ বদনাম দিতে পারবেনা। সবটাই তোলা আদায়ের অর্থের বিনিময়ে চলছে। এরাই জিম নাওয়াজের মত দালালটাকে নামিয়ে দিয়েছে। এর মাঝখান থেকে গর্গের ‘পক্ষী’ ময়দান থেকে আউট হয়ে গেছে, যখন ইউসুফ পাঠান, শত্রুঘ্ন সিনহা আর কীর্তি আজাদ বাংলা থেকে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছে। বাকি রইল আনন্দ বাজারের মেয়াদ উত্তীর্ণ কয়েক পিস ফসিল সাংবাদিক আর একদল সর্বজ্ঞ জ্ঞান চূড়ামণি বামেদের ছানা, যাদের যাবতীয় বিপ্লব সোস্যাল মিডিয়াতেই সীমাবদ্ধ।

মুসলমান ভয় পাচ্ছেনা, এটাই তোলামুলের আতঙ্কের কারন। শান্তিনিকেতনের শান্তি বিঘ্নিত হচ্ছে এসকেলাটরে চড়ে। প্রাক্তন ‘সততার প্রোকিত’ আতঙ্কে আছে বলেই আবার নতুন করে মুসলমানকে আতঙ্কিত করার চেষ্টা করছে, যাতে ‘তোলামুল গেলে বিজেপি চলে আসবে’ সেই আতঙ্কে বেঁধে রাখা যায় মুসলমানকে। অগ্নিকন্যার আগুন নিভে এখন পাঁশুটে ধোঁয়া আর লাশ পোড়া দুর্গন্ধ চতুর্দিকে। তিনি আর ভোটে লড়ার মত মানসিক অবস্থাতেও নেই, আগুন জ্বলার মত তেল শেষ। রাজনৈতিক শহীদ হওয়ার মত ইমেজও আর অবশিষ্ট নেই, আমার হিসাব অনুযায়ী ২০২৬ নির্বাচনে তিনি নিজে লড়বেননা।

রাজ্যে থাকা ৮৮ হাজার BLO এর মধ্যে ৩২ হাজার সাদা খাতা আর কয়েকলক্ষ টাকা দিয়ে যারা চাকরিটা করছে, তারা নিজের নামটুকুও সই করতে গেলে কলম ভেঙে যায়। ডিসেম্বরে এই BLO গুলোই মূলত অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিলো, এর পর যখন ডেটা এন্ট্রির সময় এসেছে, এই মালগুলোই তো আমার আপনার নাম তুলেছে অনলাইনে। সেখানে ভুল হবেনা কি তারা সেক্সপিয়ার বা স্বরচিত রবীন্দ্র রচনাবলী লিখবে? প্রসঙ্গত না বিজেপি না আলিমুদ্দিন, কেউ এই বিষয়ে একবারও কোনো বিবৃতি দেয়নি, যে- ভুলের বড় অংশটা তো বুথ লেভেলেই হয়ে রয়েছে বলে AI সেই ভুলটা ধরছে, AI তো যন্ত্র, সে তো বিজেপির হিন্দুত্ব আর তোলামুলের হিন্দুত্বের ফারাক করতে পারেনা। তাহলে কেন ও কোন উদ্দেশ্যে বুথ লেভেলের এন্ট্রি পয়েন্টে এই ভুলগুলো হলো, কেউ প্রশ্ন তুলেছে কি?

নির্যাতন কমিশন হারামি সন্দেহ নেই, বিজেপি আরো বড় বিপদ এটাও প্রমানিত সত্য। আপনার বাবার নামে ৬/৭টা সন্তান অতিরিক্ত মিথ্যা তথ্য থাকলে সেই ভুলের দায় কার? মানে কমিশনের পক্ষে সেই কাজটা কে করেছে? আধার কার্ডের সাথে ভোটার কার্ডে নিজের বা বাবার নামে নামে ভুল অধিকাংশের আছে, এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই। তাহলে AI যদি সেই ভুল গুলো শোধরাতে যায়, আমাকে আপনাকে ডাকবেনা কী আমেরিকা আফ্রিকা থেকে কাউকে ডাকবে? নতুবা যে ভুল রয়েছে তা রয়েই যাবে, আর টস করে নাম বাদ দিলে যার খুশি নাম বাদ যেতেই পারে।

SIR প্রক্রিয়া মাঝামাঝি সময় থেকেই তোলামুল তথা আইপ্যাক খুব কৌশলে উন্নয়নের পাঁচালির প্রচারের বাহানাতে, ৬/৭টা বুথ মিলিয়ে, একটা করে টোটো সারাদিন ধরে পাড়ায় পাড়ায় ঘোরাচ্ছে গোটা বাংলা জুড়ে। সেই হিসাবে ৮৮ হাজার বুথে অন্তত ১০ হাজার টোটো সক্রিয় আছে গত এক মাস ধরে, সকাল সন্ধ্যা অন্তত ২ বার করে তারা একটা পাড়াতে ঢুকছে। এই গাড়িতে অন্তত ২ জন তোলামুলের ক্যাডার রয়েছে, যাদের কাজই হচ্ছে মূলত অশিক্ষিত, অল্পশিক্ষিত, শ্রমিক, কৃষক তথা শ্রমজীবী শ্রেনীকে ভয় দেখানো। মতুয়া পাড়ায় তাদের মত করে ভয় দেখাচ্ছে, মুসলমান পাড়ায় তাদের ভাষায়, মানে যেখানে যে ভয়টা খাবে সেখানে সেই টেমপ্লেট কাজে লাগাচ্ছে, তার সাথে আছে ফেসবুক ইউটিউবে পেইড প্রোপ্যাগান্ডা। আর স্বঘোষিত বাম্বাচ্চার দল লেজ তুলে এঁড়ে না বকন- বাছবিচার না করেই, সেই সব কিছু হুলিয়ে শেয়ার করে বিপ্লবের মাকে গর্ভবতী করে দিচ্ছে, ভাবছে বিজেপি ও নির্যাতন কমিশনকে আচ্ছা করে দিলাম- ফুল অর্গাজম।

নাহলে বালীর ‘PhD ধরের’ মত শিক্ষিত বাম নেত্রী কীভাবে হাস্যকর পোষ্ট করতে পারে হেয়ারিং এ ডাক পাওয়াকে কে কেন্দ্র করে! সে কী একবারও তার স্থানীয় BLO বা ডেটা এন্ট্রি অপারেটরের নামে কিছু বলেছে? শুভেন্দু খারাপ সন্দেহ নেই, কিন্তু শুভেন্দু নিজে বা তার কোনো লোক এসে কী নেত্রীর বাবার নামের ভুলটা করে দিয়ে গিয়েছিলো? নাকি AI নিজে, অথবা দিল্লির কোনো অফিসার ইচ্ছাকৃত এই অপকর্মটি করেছিলো উনি সিপিএম করেন বলে? যেটা পূর্বস্থলীর কৌশিক প্রকাশ্যে বলতে পারছে, সেটা বামেদের মধ্যে মীনাক্ষী আর শতরূপের মত হাতে গোনা একআধা জন ছাড়া বাকিরা বলতে পারছেনা কেন?

SIR কে কেন্দ্র করে শীর্ষ স্থানীয় বাম নেতৃত্বেরা তোলামূলের বিরুদ্ধে বলতে ভয় পাচ্ছে কেন? কেন আলিমুদ্দিন কোনো স্পষ্ট বিবৃতি দিচ্ছেনা সাংবাদিক সম্মেলন করে? “একটাও বৈধ ভোটার যেন বাদ না যায়” জাতীয় গোঁজামিল একটা লাইন আউড়ে যাচ্ছে। আরে, সমস্যাটা কে বা কারা তৈরি করেছে, কারা এই মিথ্যা হয়রানিটা করাচ্ছে, সেটা মানুষের কাছে বামেরা তুলে ধরবে, এটাই তো শিক্ষিত মানুষ আশা করে, তারাই যদি গোলগোল জবাব দেয়, মানুষ আতঙ্কিত হবেই। বরং সারাদিন সর্বত্র বিজেপির ভুত দেখে এরাই বিজেপিকে বাঁচিয়ে রেখেছে সংবাদে।

শুভেন্দুর ২ কোটি রোহিঙ্গার ত্বত্ত প্রকাশের দিনেই সে মহা মুর্খ হিসাবে হল অফ ফেমে জাইগা করে নিয়েছিল। গোটা বিশ্বে রোহিঙ্গার সংখ্যা মাত্র ১৫ লাখ, তারমধ্যে মুসলমানের সংখ্যা বেশী, তবে বৌদ্ধ খ্রিষ্টান রোহিঙ্গাও রয়েছে, এমনকি কিছু হিন্দু রোহিঙ্গারও খোঁজ পাওয়া গিয়েছে। তাই সব রোহিঙ্গাই যদি বাংলাতে ঢুকে রয়েছে ধরে নিই তর্কের খাতিরে, তাহলেও তা ১৫ লাখের বেশী হবেনা। সুতরাং মিথ্যাবাদী শুভেন্দুর কথা যে- চোঁয়া বদ ঢেকুরের মতই অপ্রয়োজনীয় অস্বস্তিকর সেটা বিজেপিও জানে। কিন্তু বাম শিবিরে এতো যে নিম্নমেধার ছাগলেরা ঢুকে রয়েছে, তা হজম করা কষ্টকর। এই সোশ্যাল বাম্বাচ্চা গুলো সারাদিন ধরে এই ২ কোটি রোহিঙ্গার দোহা দিয়ে চোলাই শুভেন্দুর কথাকে মাপকাঠি ধরে- ট্রোল করে যাচ্ছে।  আসলে রাই শুভেন্দু ও বিজেপির নেগেটিভ প্রচারটা করে যাচ্ছে।

যে ৩ লাখ নন ম্যাপিং ভোটার শুনানিতেই আসেনি, অথচ ড্রাফট লিষ্টে নাম ছিলো, বামেরা সেই তালিকা প্রকাশ করে সেই BLO/BLA দের নাম ও তালিকা কী প্রকাশ করতে পারবে? সেই সৎ সাহস বা মুরোদ কী রয়েছে আলিমুদ্দিনের বাঙাল নেতৃত্বের? নাকি সেখানকার বাম BLA গুলোও এই জালিয়াতিতে যুক্ত? আর সেই পাপকে ধামাচাপা দিতে আলফাল ট্রোল করে যাচ্ছে। তবে যা খুশি করুক, এরা তোলামুলকে কিছু বলতে নারাজ, অনন্ত ভয়ের সমুদ্রে শয্যা পেতে এরা নাকি বিপ্লবী কমিউনিস্ট দল করে!! ডুবে মরুন আপনারা ঘটির জলে।

এবার আসি পাব্লিকের কথায়। গত ২৩ বছর ধরে নির্বাচন কমিশন আপনাকে লাইনে দাঁড় করায়নি, আপনি প্রশ্ন তোলেননি – যে ভোটের দ্বারা স্থানীয় পঞ্চায়েত থেকে দিল্লির সরকার নির্বাচিত হয়, যেখানে কেন প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সংশোধন হবেনা! এত কোটি কোটি ভুলে ভরা ভোটার লিষ্ট দ্বারা নির্বাচিত সরকার কোন আইনের বলে ক্ষমতায় থাকে? কেন সংবিধান সংশোধিত হবেনা?

RSS এর সরকার যে কোনো ছুতোতে ত ১২ বছর ধরে পাব্লিককে লাইনে দাঁড় করানোটাই গুড গভর্নেন্স এর অঙ্গ বানিয়ে দিয়েছেতাই হেয়ারিং এ কোন ডকুমেন্টস নিচ্ছে আর কী নিচ্ছেনা- সেগুলো বাস্তবিকই একটা পর্যায়ের পর মূল্যহীন হয়ে যাচ্ছে। লাইনে দাড়ানোটা অবশ্যই নির্যাতন, কিন্তু গড্ডালিকা প্রবাহে গা না ভাসিয়ে তলিয়ে দেখুন, এই হয়রানির পিছনের আসল কুশিলব কারা? তোলামুল এই আতঙ্ক তৈরি করতে চাইছে। মুসলমান যদি তোলামুলকে ভোট না দেয়, সরকারের হাতে হ্যারিকেন, তাই নির্যাতন কমিশনের নামে বিজেপির জুজুটাকে বড় বড় করে চোখের সামনে বারেবারে দেখাচ্ছে।

তোলামুল যেহেতু ন্যারেটিভ সেট করেছে যে মানুষ কেন হয়রান হচ্ছে লাইনে দাঁড়িয়ে, পাবলিক তাই লাইনে দাঁড়ানোকেই সবচেয়ে বড় সমস্যা মনে করছে। আমি লাইনে দাঁড়ানো বিষয়টাকে জাস্টিফাই করছিনা, কিন্তু আমাদের জীবনই কেটে যায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। আরে জন্ম থেকে মৃত্য অবধি আজীবন কাল আপনি লাইনেই দাড়িয়ে চলেছেন, অতীতে দাঁড়িয়ে ছিলেন, আজও দাঁড়াচ্ছেন, আগামীতেও দাঁড়াবেন। রেশনের দোকানে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন, ট্রেন বাস ফ্লাইট ধরতে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন, পার্কে প্রেমিক/প্রেমিকার জন্য দাঁড়িয়ে অপেক্ষা, ইস্কুলে বাচ্চাকে আনতে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন, মন্দিরে মসজিদে গির্জাতে লাইন দিচ্ছেন, রাত ২টোর সময় প্যান্ডেলের বাইরে লাইন দিচ্ছেন, আইফোন কিনতে লাইন দিচ্ছেন। মদের দোকান থেকে শ্রীলেদার্স- কোথায় আপনি স্বেচ্ছায় লাইনে দাঁড়াচ্ছেন না? একবার সরকারী ব্যাঙ্ক বা যেকোনো সরকারী অফিসে গেলে লাইন থেকে কখন বের হবেন কেউ জানেনা। জন্মের সার্টিফিকেট থেকে শ্মশান- সর্বত্র লাইন আর লাইন। অথচ ২৩ বছর পর দেশের সরকার নির্ধারনের প্রক্রিয়াতে অংশ গ্রহন করার লাইনে দাঁড়াতে গিয়ে সকলের সে কী বিপ্লব!

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেখানে প্রতিটা ভোটের মূল্য সমান, যেখানে একজন আব্দুল শেখ কিম্বা ছিদাম বাগদির সাথে অমর্ত্য সেন কিংবা শঙ্খ ঘোষের ফারাক কোনখানে? যার ভুল হবে তাকেই ডাকবে, এটাই তো রাষ্ট্রের আইন। বুদ্ধিজীবী এলিট কোটায় কি কোনো সাত খুন মাপের আইন রয়েছে দেশে? তাদের ভুল থাকলে ডাকা যাবেনা, ডাকলেই তারা অবৈধ বিদেশী? তাঁরা বিশিষ্টজন বলে আইনের উর্ধ্বে- এই এলিটিজম আমাদের সংস্কৃতিতে কবে থেকে ঢুকেছে? শুধু নোবেল লরিয়েট নয়, এলিতেলি টিভির দেড় পয়সা সিরিয়ালের অভিনেত্রী বলছে আমাকে স্পেশাল ব্যবস্থা করে দিতে হবে, ভাবুন অবস্থা

আসলে এই প্রতিবাদের কতটা স্বতঃস্ফুর্ত আর কতটা ব্রেন হ্যাকিং বা জ্যাম করে করা! আবারও বলছি, SIR এর প্রথম ধাপে মুসলমানকে ভয় দেখাতে পারেনি তোলামূল, তাই এই পর্যায়ে এসে তুমুল একটা ভীতিজনক পরিস্থিতিতে ফেলতে চাইছে তাদের প্রচার যন্ত্রের মাধ্যমে। উন্নয়নের পাঁচালির টোটো থেকে ছড়ানো ভয় তো রয়েছেই, তার পাশাপাশি ইচ্ছাকৃত মারদাঙ্গা সৃষ্টি করে জনগণের মধ্যে গেল গেল রব তুলেছে। রাজ্যের বিভিন্ন অংশে তোলামূলের দুষ্কৃতীরা বিডিও অফিস থেকে এসডি অফিস আক্রমণ করছে পুরো প্রক্রিয়াকে ভন্ডুল করে দেওয়ার জন্য। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তোলামূলের এমএলএ ডকুমেন্ট লুটপাট করে নিয়ে চলে যাচ্ছে, অথচ তার বিরুদ্ধে একটা এফআইআর পর্যন্ত করার ক্ষমতা নেই মেরুদণ্ডহীন পুলিশ প্রশাসনের।

অবোধ বাম্বাচ্চাগুলো যদি, তোলামুলের এই প্রপাগান্ডার ফাঁদে পরে ফেসবুক আর ইউটিউবে প্রচারের কাজটা না করত, সমাজের মধ্যবিত্ত অংশে এই আতঙ্ক অনেকাংশেই কম হতো নিশ্চিত ভাবে বলা যায়। একজন এমন মানুষের ঠিকানা দিন যাকে হেয়ারিং এ ডাকা হয়েছে, অথচ তার কোন অংশে কোন ভুল ছিল না- আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, আমি নিজের খরচে কমিশনের নামে হয়রানির জন্য ক্ষতিপূরণের মামলা করব ও লড়ব শেষ অবধি।

BLO যখন বাড়ি বাড়ি গিয়েছিলো, তখন ভাবখানা এমন ছিলো যে- হেয়ারিং এ গিয়ে দেখে নেব। এখন সেই দেখে নেওয়ার সময়ে এসে চেঁচিয়ে গাঁ মাথায় করে আসলে কাকে ডিভিডেন্ট দিচ্ছেন আপনি? এই ভুলের দায় হিসাবে BLA হিসাবে কাজ করা কংগ্রেস, বিজেপি এমনকি বামেদের পক্ষে থেকে যুক্ত থাকা BLA রাও কি নিজেদের সাধু দাবী করতে পারেন?

একটা প্রসেস যখন শুরু হয়েছে সেটাকে শেষ করতে হবে। কিন্তু তোলামূল ও তাদের সবরকম বাহিনীর একটাই লক্ষ্য- ঘেঁটে দাও, যাতে মুসলমান ভয় পায়, আতঙ্কে থাকে আর তাদের দুধেল গাই ভোট ব্যাঙ্ক অটুট থাকে। নতুবা RSS এর গাইডলাইন মেনে তোলামুল সরকার সেই সব কটা নির্দেশ ফলো করেছে, যেগুলো অন্য ১১টা SIR হওয়া রাজ্যও করেছে তোলামুলের উদ্দেশ্য সমাধান করা নয়, মানুষকে সহযোগিতা করাও নয়, তাদের উদ্দেশ্য আতঙ্কিত করা।

পাশাপাশি মিডিয়া জুড়ে বাইনারিটা যেন তৃণমূল আর বিজেপির মাঝেই থাকে, অর্থাৎ RSS এর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে বিষয়টা। মুসলমান জানে সবই, কিন্তু বামেদের শীর্ষ নেতৃত্বের অপদার্থতার কারনে তাদের বিকল্প হিসাবে গ্রহণ করেনা। তাই মুসলমান জেনে বুঝে তোলামুল নামের বিষ খাচ্ছে। বস্তুত দুটো দলেরই বাপ এক- নাগপুরের গোয়ালঘর, একই প্রোডাক্ট দুটো আলাদা আলাদা দোকান। যতদিন বাংলার মুসলমান এটা না অন্তর থেকে মানবে, তাদের এই নিত্য আতঙ্ক থেকে মুক্তি নেই

 

আপনার শুভ বুদ্ধি কী বলে?


তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...