দেহতত্ত্ব, আত্মতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব, দয়ালতত্ত্ব, ভাবতত্ত্ব- নিদেন পক্ষে বাউল, মুর্শিদি, মারফতিও হতে পারিনি। আমার মত অনোভিযোজিত অনুন্নত জীবের জন্য বিচ্ছিন্ন কোনো প্রান্তরই আদর্শ। মন গেলে খাবো, যা জুটবে। মাঝরাত্রে গান গাইব গলা ছেড়ে, খালি গায়ে ঘাসের বিছানাতে শুয়ে আকাশগঙ্গায় পবিত্রতা খুঁজব। মাটিতে আঁক কষব দায় আর দায়িত্বের জটিল গনিতের, ‘নেই সম্পর্কের’ রসায়নের ইতিহাস গুলোকে শরীরের ভূগোল থেকে মিথ্যা বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টাতে- সময়কে ব্যবচ্ছেদ করব জৈবিক চাহিদার যুপকাষ্ঠে। আর সেই অলীক বলির অস্তিত্বহীন রক্তে এসবই দুকলম ‘অজ্ঞাত কুলশীল’ লিখে ফেলব নড়বড়ে অনভ্যস্ত হাতে, যেগুলো কেউ কখনও পড়বেনা কোনোদিনও।
সেই ছোটবেলায় জন্ম হবার দরুন বুদ্ধিটা যেটুকুই পেকেছে, তা এই বড় বয়েসে এসে। রোমহর্ষহীন একটা বৃত্ত, যা শুরু হতেই অন্তে পৌঁছে গিয়েছে, তাই বৃত্তান্ত হয়ে উঠতে পারেনি কখনই। স্বভাবতই, কাল থাকতে পড়াশোনা করিনি মোটেই। তার উপর আমার গায়িত্রী মন্ত্র-
“পড়াশোনা করিবি, মরিবি দুঃখে
মৎস ধরিবি খাইবি সুখে”।
সুতরাং, বাল্যকাল থেকে জপা এই ইষ্টমন্ত্রই জীবনে একমাত্র জেঁকে বসে আছে নাছোরবান্দার
মত। যা খুশি করি, পড়াশোনা ‘নৈব নৈব চ’।
সামনে একটা বাচরা খেলার মাঠ, তারপর ঢোলকলমি আর নিশিন্দার বেড়া দেওয়া একটা এঁদো ডোবা, এখানে মশার চাষ হয় প্রকৃতির তদারকিতে। দোতলাতে শিক্ষক আবাস, একলা দোকলা, কাচ্চাবাচ্চা নিয়ে চার বা পাঁচকলা পরিবারও থাকে ওখানে। হয়ত তাদের আসা যাওয়া লেগে থাকে ওখানে। ইস্কুলের বাচ্চাদের বড় ভালো লাগে, মানুষের বাচ্চারা ঠিক মানুষ নয়, তারা যেহেতু মানবিক ক্লেদ, গ্লানি, লালসা আর রিপুর উর্ধ্বে- তাই তারা নিজেরা একটা আলাদা প্রজাতি- ছত্রাকের মত ক্ষনস্থায়ী ও পবিত্র।
রসিক বিলের মাছ পাহারায় স্বনিয়োজিত রক্ষী আমি। এখন পচা ভাদর, ত্রয়োদশী চাঁদ হোক বা কন্যা, ভাদরের আদর নিতে মেঘের আড়াল থেকে সমানে উঁকিঝুঁকি দিয়ে যায় সামান্য ফুরসৎ পেলেই। মাঠের পাট, বিলের চারি পাড় বরাবর পচাতে দেয় এই সময়, উপরে কলা গাছের লাশ, বিলের কালো পাঁক আর ছটের দড়ির আষ্টেপৃষ্টে সোহাগের জড়াজড়িতে এক আশ্চর্য সহাবস্থান। একঘেয়ে মাছের আঁশটে গন্ধ, দুরের বাঁশবাগানে চ্যাংড়া ছোঁড়াদের গাঁজার উৎকট গন্ধে দুষিত বাতাস আর ইস্কুলের ছেলেদের হিসুর রাসায়নিক গন্ধের ভিড়ে, পচা পাটের গন্ধ- জীবনে একটু ভিন্নতা আনে প্রতি বছর এই সময়টা।
পচা পাট মানেই চটুই পাখির সাইজের ডেঁয়ো মশা। জানিনা এগুলো
মদ্দা না মেদ্দি। তবে কামরানোর আগে একটা বিনাকা গীতমালা শুনিয়ে বেশ সুড়সুড়ি দিয়ে
তবেই প্যাঁক করে হুল ফোটায়, যতক্ষণ জেগে থাকি। এটাই সেই ‘বেশ ভাল আছি’ জীবন। অকৃতদার জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস
খেলা প্রো-নিয়ানডারথাল প্রাইমেট আমি। এই পাণ্ডববর্জিত স্থান, তার উপর রাত্রের দিঘীর পাড়, জটপাকানো শালুকের ডাঁটির ফাঁকে ফাঁকে
ছোট ছোট শুভ্র সাদা রঙের চাঁদমালা ফুলে মৃদু হাওয়ার ঢেউ লেগে একটা ছন্দ খেলা করিয়ে
যায়। ব্যাঙাচির দলেরা হইহই করে গোল্লাছুট খেলে কলমি লতা আর হেলেঞ্চার বনে।
কিছু রাতচড়া পাখির দল ভয় দেখানো গান গেয়ে যায়, মেঠো ইঁদুরের দলের এটা অফিস টাইম, চুড়ান্ত কর্মব্যস্ততা। অন্ধ ফড়িং এর দল ব্যাঙের খাদ্য হতে চেয়ে তিরতির করে উড়ে উড়ে যায় নক্ষত্রের কানা আলোর পথ বেয়ে। ভেজা মাটিতে সাপের খসখসানি শব্দ না উঠলেও নেউলের দৌরাত্ব টের পাওয়া যায়। জোনাকির পিছনের আলো দেখে ঝিঁঝিঁর দলের একটানা সমস্বরে মড়া কান্নার ফাঁকে- বাঁদুরের ডানা ঝাঁপটানোর আওয়াজে সম্বিৎ ফিরলে, দূর মাঠের মাঝে ক্ষুধার্ত শেয়ালের দলের বিলাপ শুনলে মনটা সেই কৈশরের ভাবনাহীন রাতগুলোতে ফিরে যায়। আবেগ আর অনুভবের বায়বীয় খাদ্যশৃঙ্খল যখন ‘আমিকে’ খেয়ে ফেলেনি, সেই মিষ্টি কৈশরের গন্ধ মাখা এই অন্ধ ভাদর আজও অপলক করে দেয়। গন্ধ শুঁকে শুঁকে চলে আসা একটা খোঁড়া নেড়ি এসে জলন্ত চোখ দেখিয়ে নিরবে বলে যায়- অন্ধকারের অধিরাজ্যে জেগে উঠা পৃথিবীতে ‘মানুষ’ বড়ই অনাহূত।
মশা’য় কাটা, আমারই রক্ত খাওয়ার দাগ গুলো ছাড়া, আমার সারা শরীর বা জীবনে কোথাও
বিন্দুমাত্র রঙ নেই। প্রেম আমার সধবার একাদশী, মৌনতা দিয়ে যৌনতার মন্থন নির্নয় করি দুর্বিপাকের পরিধি
বরাবর। স্বমেহনে গৌন থাকা বিষয়সূচি কর্বুরিত সঙ্গমের লাবন্যে ঋদ্ধ হয় উদ্দীপিত
রেতঃক্ষেপে। রাত্রে মাঝে মাঝে ছিপ নৌকা নিয়ে বের হই অন্বেষণে, টহল দিই দিঘীর চারি বেড়া। জিয়লের
বনের ধারে মেছো ভুত, মামদো ভুতের উপদ্রব খুব বেশি, জেলেদের উপকথায় শুনেছি। তেনাদের আবছায়া শরীরের শীতলতা অনুভূত হয়, চোখ বন্ধ করলেই। বেম্মোদত্যি আছে
কিনা জানিনা, অবিশ্যি
তারা সাত্তিক ব্রাহ্মন, মাছ ছুঁয়ে দেখেননা, তবে গন্ধ নেন হয়ত।
আমি মনের সুখে পরিক্রমা করি, গুনগুন করে এক আধটা জারিগান, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া গানের কলিও ভাঁজি। শ্রমভার নেই, তাই লাঘবতা হীন চিত্তবিনোদনের জন্য এ বড় সরল সঙ্গীতের
আয়োজন। আলকাপ, গম্ভীরা, ঝুমুর বা খাম্বাজ- আঁধারের পথে এই
বড়লোকি মানায়না। নদীবিধৌত অরণ্যাকীর্ণ এই প্রান্তভূমে কাক চিল পানকৌড়ি মাছরাঙা
ছাড়া কারো উপদ্রব নেই, যেহেতু এখানকার কোনো মালিকপক্ষ নেই তাই পাহারাও নেই আমি ছাড়া।
উদিত
সূর্যের সাথে আমার আজন্ম বিবাদ, সারারাত টো-টো করে ঘুরে বেড়াই হেঁটে বা ছিপ নিয়ে, তাই দিনে ঘুমাই। সকল শখ এখন ছিলিমে
বন্দি করে অধ্যাত্মপিপাসা নিবৃত্ত করি।
জীবন হল একটি ত্রুটিপূর্ণ শক্তি, একটা শিল্প। শিল্পীর একমাত্র কর্তব্য
সম্ভাব্য তাৎপর্যগুলির অনুসন্ধান চালানো, সুশৃঙ্খল প্রণালীতে যার কোন বৈধত্ব নেই। অননুকরণীয়ভাবে
নিশ্চয়াত্মক প্রতিকল্প স্থাপন করতে কর্তৃত্ব লাগে, যা আজকের শিক্ষককুলের নেই। তারা নিজেদের ত্রুটিমুক্ত ও
সম্পূর্ণ ভাবেন। নান্দনিকতার মাত্রায় সময়কে মাপা যায়না, এর জন্য বোধ দরকার, শৈল্পিক সুক্ষ বোধ। আমরা সকলেই
শিল্পী, যখন আমরা অনুসন্ধান
করতে শিখি, প্রশ্ন করতে
শিখি, বিশ্লেষণের
প্রচেষ্টা করি। আমরা ভুলে যায়- একজনের ন্যায়পরায়ণতার চোখে অন্যকে বিচার করা
বিভ্রান্তিজনক, কারন
প্রত্যেকের প্রেক্ষিত আলাদা। অথচ আমরা এটাকেই সামাজিকতার নাম দিয়ে সভ্যতা
বানিয়েছি। তাই শিক্ষক শিল্পী হতে পারেননি কখনও। পুলিশের মত একটা আলাদা বর্গ বা
প্রজাতি হয়ে গেছে সমাজে। সে যাই হোক-
এমনই এক সন্ধ্যায় সামনের শিক্ষকাবাসে হঠাৎই নতুন কেও এলেন
বুঝি! একজন একলা মানুষ, একটি একলা দেহ। শিক্ষক সম্প্রদায়ের কি? হবেও বা। আমার ঘর নেই, শনের চালের নিচে বাঁশের মাচা, জানালা দরজার আড়ম্বর নেই। কিন্তু সেই একলা মানুষটির ঘর আছে, রমণীয় ভাদরে সেই ঘরের জানালা খোলা।
সম্ভবত ছোট শহর থেকে আগত, তাই চিৎকার নেই। বিদ্যুতশক্তি বিহীন এই পাড়াগাঁ, কালিঝুলি মাখা টিমিটিমে লণ্ঠনের মায়াবি আলোতে একটা অবয়ব ধরা
দেয়, কাঁধের নিচ পর্যন্ত
ঝুলে থাকা খোলা চুল। বৈরাগী মন দ্রুত এবং সবলীল পদচারনার দৌর্মনস্য তন্ত্রে
চর্মচক্ষুকে একক বানিয়ে, বিনুনির খোঁজে বাঁধা পরে যায় আবার। খুঁজে নিই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তুচ্ছ বিষয়-
হাতে একটাই চুড়ি, বেশ মোটা, অবিবাহিত
ধরে নেওয়ার মাঝেই ফলাগমের শক্যতা।
“তোমার এবং পৃথিবীর মধ্যে দ্বন্দ্বে পৃথিবী দ্বিতীয়”, মানে তুমি প্রথম আর আমি সর্বদা তৃতীয়।
আমার অনুসন্ধায়ী ক্ষুধার্ত নাগরবাউল চিত্ত, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিষয়ের উপরে পর্যবেক্ষণ শুরু করে দিলো। ফি’সন্ধ্যায় নিপুনতার সাথে পরিপাটী করে চুলের পরিচর্যা তিনি করেন, অনুমান করি- পোষাক পরিবর্তনও করেন জানালা খোলা রেখে নিভু নিভু আলোতে। উন্নত বক্ষদেশ, আহা। সুতনুকা কটিদেশ, লন্ঠনের মায়াবী আলোতে নেশা ধরিয়ে দেয়। এর পরেরটা বড় বেদনাদায়ক। উপুড় হয়ে শুয়ে হাতের ভরে শরীরটাকে কেমন উপর নিচে করতে থাকেন আধা ঘন্টা প্রায়। ব্যাপারটা পুরোটা বুঝিনা, প্রেম না থাকলে কৌতুহল মেটাতে জানালার ফাঁকে উঁকি দিতাম নিশ্চই, কিন্তু ভালবাসাকে ফাঁকি দিতে নারাজ; ফলত আমি ঝুঁকি নিতে পারলাম না। বরং সেই কষ্টে ঠোঁটে উঠে কাল্পনিক মোহন বাঁশি। ছিপের ধরাটির উপরে এলিয়ে দিই শরীরকে। কোনো সুর জানিনা, তবুও বাঁশি বাজে আপনসৃষ্ট সুরে। ওতে বিষাদ থাকে, তাই ওটা বিষাদসিন্ধুই হবে।
কন্যা-ভগিনী-জননীরূপে পরিবারে নারীর অবস্থান সত্য, কিন্তু যাকে কেন্দ্র করে সংসার-সাগরে ভাবরাশি উত্থিত হয়- তা প্রণয়িনী রূপেই। যথাক্রমে, এর পর তিনি গৃহকর্ম সারেন একে একে, আমার অপলক দৃষ্টি তার প্রতি থাকে, অন্তরে বাজতেই থাকে বিষাদসিন্ধুর সুর। রাত বাড়ে, ক্রমশ ঘরের আলো নিভুনিভু হয়ে আসে, এরপর কেন জানিনা চঞ্চল পায়ে পদসঞ্চালনা করেন রোজ। কল্পনার কোন সীমা থাকেনা শুনেছি। আমার কল্পনাও তেমনি ডানা মেলে উড়ে চলে উর্ধ্বপানে।
জ্যোৎস্না রাতের মায়াবী চাঁদও কম্পিত হয় লাজে, ‘তুম্বা আর ডান্ডির’ প্রতিটা তারে পিছলে যায় গতস্পৃহ সুর, সেই লাজে মেঘের ঘোমটা টেনে নেয় শুকতারা, মিটিমিটি চায় আমার ঘুমঘুম চোখের দিকে। চমকে উঠি, হৃদয়ে তোলপাড়, শিহরিত হই মুহুর্মুহ। নবীন যৌবনের উন্মত্ত ঝঙ্কার, সেতারের তীক্ষ্ণ সুর ধৈর্যের প্রতীক হয়ে লুটোপুটি খায় বিলের জলে। অনবিল আনন্দেরা সৃষ্টি সুখের উল্লাসে বাজিয়ে চলে সুরের মুর্চ্ছনা। মধুর দমবন্ধ পরিস্থিতি যা একই সাথে পরমসুখ ও যন্ত্রনার, ক্রমে চেপে বসে বুকের উপরে। নিঃশ্বাসের জন্য হাহাকার করা সমস্ত চেতনা একাকার হয়ে যায় প্রকৃতি, আমি ও সেই কুহকিনীর সাথে।
অসমস্তরের প্রেমে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে সামন্তপতি, তার প্রতিনিধি, বিত্তশালী, ক্ষমতাধর, রূপতৃষ্ণা, প্রণয়বাসনা, কামপ্রবৃত্তি ইত্যাদি অনুগামী হয়ে চলে আসে। অত্যাচার, শোষণ, নির্যাতন, প্রতিহিংসাপরায়ণতা, কৌলীন্য, রক্ষণশীলতা, আভিজাত্যের অহঙ্কার, ইন্দ্রিয়াসক্তি, সম্ভোগপ্রিয়তা, বহুগামিতা এমন শব্দের দল ক্ষতবিক্ষত করে তোলে আত্মাকে। যেন একমাত্র মহাজাগতিক অস্তিত্ব আমি, বাকি সব ভ্রম। এই দ্বন্দ্বে নির্ভার প্রেমের তন্ত্রী ছিঁড়ে যায় উপচানো মায়া বিছানো উঠোনে, অন্তরঙ্গ মুহুর্তেরা হাহাকার করে উঠে।
কোন এক বিখ্যাত জনের বানী শুনেছিলাম, আরেক জ্ঞানগম্যিওয়ালা মানুষের কাছে, সেটা এ রকমঃ-
“ক্ষুধা ও সৌন্দর্যবোধের মধ্যে গভীর সম্পর্ক
রয়েছে। যে-সব দেশে অধিকাংশ মানুষ অনাহারী, সেখানে মাংসল হওয়া রূপসীর লক্ষণ; যে-সব দেশে প্রচুর খাদ্য আছে, সেখানে মেদহীনতাই সৌন্দর্য্য”।
সেহেতু ওই অপরিচিত সান্ধ্যকালীন আবছায়াটা ঈষৎ চর্বিযুক্ত
হলেও, আমার পিরিতসুখের
অনাহারী দৈন্য দশাবস্থাতে, যে শুধু মাত্র মশার সাথে সহবাস করে করে, এই মাংসল ছায়াচিত্র আমার মন জগৎকে যথেষ্ট প্রেমাশিক্ত করত।
এমনিই চলে কয়েক পক্ষকাল জুড়ে।
- আমি মাথা নাড়লাম। না চিনিনা।
- আরে ইনি আমাদের ইস্কুলের নতুন শরীরশিক্ষার মাষ্টার মশাই। এই
তো মাস খানেক আগে এসেছেন। মেদিনীপুর থেকে, খুব ভাল মানুষ।
আমি খেয়াল করলাম, কি শক্তপোক্ত চেহারা, বুকের দিকটা চওড়া, কোমর সরু, পাক্কা পালোয়ান মার্কা। গালে হালকা দাড়ি, পুরু ঝাঁটার মত গোঁফ। আর দেখলাম প্রসারিত রোমশ হাতে একটা
পাঞ্জাবী স্টাইলের স্টিলের বালা, আর দুই বাহুজুড়ে কত কি সব ভয়ঙ্কর উল্কি আঁকা। দেখাই কেমন সম্ভ্রম জাগে মনে।
- তুমিই কী সন্ধ্যাবেলা গান গাও বিলের ধারের মাচাতে?
- আজ্ঞে হ্যাঁ, তা গাই বৈকি।
- কি নাম আপনার?
- আজ্ঞে মশা, ইয়ে মানে … আমাকে গানওয়ালা বলেই নাহয় ডাকবেন।
- তা বেশ তা বেশ, আমি আপনার ওই মাচা ঘরের কোনাকুনি ইস্কুলবাড়ির আবাসনে থাকি।
প্রাণ খুলে গলা সাধেন কিন্তু, খুব ভাল লাগে। আমি ডন বৈঠক দেওয়া থেকে, খেয়ে দেয়ে পায়চারি করার সময় অবধি সময় রোজ শুনি। খুব খুব
সুন্দর।
বলতে বলতে, একটা মুচকি হেঁসে উনি সেক্রেটারি বাবুর সাথেই চলে গেলেন। আর আমি খেয়াল করলাম, ওই পালোয়ানের মাথায় বেশ লম্বা চুল, ঘাড়ের নিচ পর্যন্ত ঝুলেছে। তাতে আবার
ছোট ছোট বিনুনি বাঁধা।
বাকিটা আর নিজেকেও কখনো শুধাইনি।
বিলাসিতা হচ্ছে, আমাদের অন্তর যা পছন্দ করছে নিষ্কলুষ ভাবে, কাউকে আঘাত না করে, কাউকে ক্ষতি না করার মাঝে বিলাসিতার আসল বাস। হয়ত বোকাবোকা, কিন্তু বিলাসিতা মানে যে নিজেকে সম্মানিত করা। বিলাসিতা হচ্ছে পরিবারের সঙ্গে থাকা। বিলাসিতা হচ্ছে সন্তানদের সাথে কাটানো সময়গুচ্ছ। কী কে চি বলার মাঝে, ককোলির মত অর্থহীন শব্দে, না কে লা উচ্চারনে কিম্বা মিঠি শব্দের ওমে- এগুলো আমার একান্ত নিজশ্ব বিলাসিতা। যা মূল্য দিয়ে খরিদ করা যায় না।
দামি ঘড়ি, মোবাইল বা অলঙ্কারে বিলাসিতা খোঁজা অর্থহীন। অর্থ কিম্বা নৌকার পালে বিলাসিতা
নেই। বিলাসিতা হল প্রাণ খুলে হাসতে পারার কারনে, সুখী হওয়ার নির্দিষ্ট উপাদান না থাকার মাঝে। বিলাসিতা থাকে
বন্ধুত্বে। বিলাসিতা মুখের পেশিতে খেলে যাওয়া মিষ্টি হাসির ঝিলিকে। আশ্লেষ আলিঙ্গন
এবং বুকভরা শ্বাসে নেওয়া দীর্ঘ চুম্বনে। দোকানে বিলাসিতা কেনা যায়না, উপহারের মাঝেও বিলাসিতা নেই। অন্যের
ক্ষতি না করে অন্তরে যা কিছু সুখানুভব পৌঁছে দেয়, সেটাই বিলাসিতা। জাঁকজমক আসরে বিলাসিতা খুঁজে ফেরা আপনি যদি
একবার একাকীত্বের মাঝে নিজেকে খুঁজে পেয়ে যান, দেখবেন সেই যাপনের মাঝে কি ধরণের স্বর্গীয় বিলাসিতাটাই না
রয়েছে।
আবার ফিরে আসি বাস্তবে, কোলাহল কল্লোলিনীর কোলে। দায়ে পরে, পালিয়ে যাওয়ার অনুষঙ্গ পেতে, একা হয়ে যাওয়ার অজুহাত খুঁজতে।
সকলে পারেনা মুক্তি পেতে, আমিও সেই দলেই। তাই মনোজগতে বিচরণ করি স্বপ্নবিলাসী হয়ে।
চুম্বনহীন প্রেম গণিকার জীবিকা, এতে ভালবাসা থাকেনা। ভালবাসা বিলাসিতা নয়, এটা আবশ্যিক। এটা সমাপ্তিবিহীন, কেবলমাত্র একটি তাৎপর্য মূলক পদ্ধতি, যার কোন সীমাবদ্ধতা নেই। রসিক বিল, বাঁশের মাচা, চাঁদমালা ফুল, মেছো ভুত আর নরম আলোয় দেখা আবছা
মুর্তিতে খুঁজে ফিরি বিলাসিতা, হোকনা স্বপ্ন- তবুও বিলাসী হওয়ার মাঝেই তো সুখ, কল্পনার ইতি বৃত্তান্ত। এটাই জীবনের কবিতা।

