সোমবার, ১৮ মে, ২০২০

করোনাকালের যাকাতঃ কমিউনিটি কিচেন ও পরিযায়ী শ্রমিক



ইসলামিক নিয়ম ঘ্যেটে দেখা গেলো, যাকাতের প্রকৃত পাওনাদারের মধ্যে অনাথ, সম্বলহীন, ভিক্ষুক, অসহায় ও পথিকশ্রনীর মানুষ শীর্ষস্থানীয়। অন্যান্য বছরগুলোতে যাকাতের বেশিরভাগ অংশটি হয়ত মাদ্রাসাতে থাকা ছাত্রদের জন্যই ব্যায় করতেন আপনি, কারন মাদ্রাসাতে মূলত যারা পড়ে তাদের সিংহভাগই উপরোক্ত শ্রেনীর, যেগুলো আমার-আপনার কাছ থেকে কিছু বেকার ছেলে সংগ্রহ করে নিয়ে আসত গোটা পৃথিবী জুড়ে, যাদের যাকাত আদায়কারী বলায় হয়।
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব মাদ্রাসাই বন্ধ লকডাউনে, বাচ্চারা যে যার যার বাড়িতে অর্থাৎ মাদ্রাসাতে এই মুহুর্তে খরচা প্রায় নেই বললেই চলে, তদুপরি আদায়কারিরাও আপনার কাছে যেতে পারেনি পরিবহন ব্যবস্থার কারনে। এমনকি এবছর লকডাউনের প্রকোপে গরীবরাও অনেকে যেতে পারবেনা আপনার দুয়ারে। এদিকে সঠিক স্থানে যাকাত পৌঁছে দিতে আপনি বাধ্য; তাহলে আপনি যাকাত কাকে বা কোথায় দেবেন?
নিশ্চই আপনি আপনার প্রতিবেশী গরীবদের মাঝে দিন, আপনার দানে তাদের হক সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এবারে আরো অন্তত ৩টে প্রজাতি রাষ্ট্রের কল্যাণে আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে, যাদের অন্য অনেক সময় একত্রে এভাবে পাওয়া যায়না। “মুসাফির, সহায় সম্বলহীন ও অভাবগ্রস্থ”, এই তিনটে শব্দকে একটা বন্ধনীতে জুড়লে যে প্রতিশব্দটা দাঁড়ায় তার নাম হল “পরিযায়ি শ্রমিক”।
মাত্র ৪ ঘন্টার নোটিশে জারি হওয়া অপরিকল্পিত লকডাউনের অভিশাপে, বিদেশ বিভূঁইতে থাকা শ্রমিকশ্রেণীর মানুষগুলোর বর্তমানে রোজগার নেই- মানে তারা ‘অভাবগ্রস্থ’; রাষ্ট্র বা কর্পরেটের কেউ তাদের দেখার নেই- মানে ‘সহায়সম্বলহীন’, বালবাচ্চা নিয়ে পথে পথে হেঁটে চলছে হাজার হাজার কিমি- মানে তারা ‘মুসাফির’। দান বিষয়ে ইসলামের এমন ‘কপিবুক’ স্টাইলের সুযোগ কিন্তু বারে বারে আসবেনা আপনার কাছে। অতএব অনুরোধ, যদি পারেন নিজে ওই শ্রমিকদের হাতে পৌঁছে দিন আপনার দান। যদি সেই ক্ষমতা না থাকে তাহলে যারা বিভিন্ন স্থানে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে ‘কমিউনিটি’ সাহায্য বিলোচ্ছেন, সেই মানুষগুলোর মাধ্যমে আপনার দান পৌঁছে দিন। ইসলাম ধর্মমতে আপনার আল্লাহকে সন্তুষ্ট করাবার বা তাঁকে উত্তম ঋণ দিয়ে (কোরানের ভাষ্যে) পুণ্যি কামবার এমন সুযোগ কিন্তু বারে বারে আসেনা।
তাই আমার তরফে অনুরোধ, আপনার যাকাতের একটা অংশ এই কমিউনিটি কিচেন গুলোর জন্য বরাদ্দ করুন। আপনার ধর্মে কোথাও বলা নেই, স্বধর্মের গরীব, মিসকিন বেছে বেছে দান করুন, তাই জাত ধর্ম না দেখে অভাবী মানুষকে দিন, যার খিদে আছে পেটে। আপনি নেকি বা পূন্যি অর্জন করুন, আর অসহায় গুলো আপনার ধর্ম বিশ্বাসের সুফল ভগ করুক সরাসরি, এর চেয়ে ভাল আর কি হতে পারে?
আপনার প্রতীক্ষাতে রইল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো, যারা পরিযায়ী শ্রমিক বা কমিউনিটি কিচেনের সাথে যুক্ত।

শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০

লকডাউন ও কৃষির দুরবস্থা

 


প্রকৃতির আপন নিয়মে বৈশাখ শেষে জ্যৈষ্ঠ এসে গেছে, এই নিয়মে বর্ষা’ও আসবে অচিরেই। আষাঢ়ের কালো মেঘ বয়ে আনে ফসলের ঠিকানা লেখা চিঠি, শ্রাবনে অবিরামধারা মাটির রন্ধ্রে প্রেথিত করে দেয় আগামীর রসদ, যে রসদে বলীয়ান হয়ে ফুলে ফলে শস্য শ্যমলা হয়ে উঠে সভ্যতা। চাষীর ঘরে খুশির বান ডাকে, কচি ধানের সুগন্ধমাখা ঘ্রাণে আগামীর নবান্নের প্রতীক্ষায় আঙিনাতে সান্ধ্য আলপনার সাথে মঙ্গলশঙ্খের সুরে মেশে আজানের ধ্বনি, ডুরেকাটা শাড়িতে চাষীর বৌ’এর হেঁশেল থেকে আসে পায়েসের সুঘ্রাণ- উৎসবের দিনের প্রতীক্ষাতে দিন গোনা শুরু হয়।

কিন্তু হায়, গোটা সভ্যতাই আজ এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবানুর আক্রমণে অবরুদ্ধ বা গৃহবন্দী। কর্ম নেই, তাই রোজগারও নেই, দিনে দিনে কমেই চলছে ক্রয়ক্ষমতা। গোটা বিশ্বের পাশাপাশি আমাদের দেশও লকডাউনের ফাঁসে দমবন্ধ প্রায়, রাস্তার ধারের লাইন হোটেল বন্ধ, ট্রাকচালকেরা খাবার পাচ্ছেনা- স্বভাবতই পরিবহন ব্যবস্থা মারাত্বক রকমের ক্ষতিগ্রস্থ। চাষীর ফসল হয় মাঠেই শুকাচ্ছে বা পচছে, কিম্বা জলের দরে বেচে দিতে বাধ্য হচ্ছে ‘যা পাওয়া যায়’ তার আশায়সরকারের তরফে কোনো বিকল্প পরিকল্পনা নেই কীভাবে চাষি ও তার ফসলকে বাঁচানো যায়।

হাজার আলাপ-আলোচনার মাঝে যাদের বিষয়টা এখনও সেভাবে উঠে আসেনি- তারা হল কৃষক। বৃহৎ পুঁজির সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্রপিতারা রয়েছে, ক্ষুদ্র পুঁজির সংগঠন রয়েছে, সরকারী চাকুরীজীবীর বেতনের সুরক্ষা রয়েছে, শ্রমিকেরা ভোটব্যাঙ্ক- তাদের কষ্ট দৃশ্যত অবর্ননীয় তবুও তাদের শ্রমের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে রয়েছে। এনাদের কথা সর্বত্র আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু যাদের ছাড়া সভ্যতার রথের চাকা ‘খিদের মহা সমুদ্রে’ ডুবে মরবে- তারাই আজ চরম উপেক্ষিত। ক্রমাগত অন্তর্মূখী রক্তক্ষরণে গোটা কৃষি সিস্টেমটা ক্রমশ অতলে তলিয়ে যাবার প্রতীক্ষাতে

অর্থশাস্ত্র বলে- দ্রব্যমুল্য ‘বাড়লে চাহিদা কমে, আর কমলে চাহিদা বাড়ে’। কিন্তু শহরে আর গ্রামে ফসল-আনাজের উৎপাদন আর চাহিদার সাথে অসামঞ্জস্য দ্রব্যমূল্যের অসাম্যটা বর্তমানে গর্হিত অপরাধের পর্যায়ে নিয়ে চলে গেছে অদক্ষ প্রশাসন ব্যবস্থা। একটা লকডাউন মুর্খদের দ্বারা পরিচালিত স্থানীয় রাজনীতির কুম্ভিপাকে জর্জরিত কঙ্কালসার আমলাতন্ত্রটাকে ন্যাংটা করে দিয়েছে। একদিকে মুল্যবৃদ্ধির চোটে শহুরে মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস, অন্যদিকে ফসলের জলের দড়ের জন্য নতুন করে চাষে অনিহা- এক অদ্ভুত চরমাবস্থার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে

এই হারে উৎপাদন কমলে, অচিরেই খাদ্যপণ্যের দাম ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে দেশের অধিকাংশ মানুষের। এমনিতেই গাঁয়ে গাঁয়ে শ্রমিকেরা ফিরে এসেছে, তাদের পাঠানো অর্থের যোগান বন্ধ, বন্ধ্যা গেয়ে গেছে গ্রামীণ অর্থনীতি। চাষীর রোজগারে ভাটা পরা মানে দেশে বেকারত্বের হার যে চূড়ান্ত আকার ধারন করবে তা বলাই বাহুল্য। দ্রুত পরিস্থিতির সংশোধন না হলে, এক ভয়ঙ্কর অরাজক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে চলেছি আমরা, যেখানে একটা রুটির জন্য খুন জখম অতি সাধারণ ঘটনা হয়ে যাবে, বিংশ শতকের শুরুর দিকের মত আবার না ভাতের ফ্যান চেয়ে একদল ‘মানুষ’কে পাড়ায় পাড়ায় বের হতে দেখি!

আজকের দিনে প্রতিটি ছোটবড় শহরে, মফঃস্বলে সব্জির দাম আকাশছোঁয়া, যারা আমরা শহরের বাসিন্দা তারা সকলেই ভুক্তভোগী। ঠাকুর্দার অন্ত্যেষ্টিতে গ্রামে গিয়ে চোখে দেখে ও চাষীর নিজ মুখে তাদের দুরবস্থার কথা শোনার পর থেকে আমি আতঙ্কের মাঝে রয়েছি। অধিকাংশ গ্রামেই সব্জির কোনও দাম নেই, ৫-১০ টাকা কেজি বিকোচ্ছে অধিকাংশ আনাজ। গায়ে-গতরে শ্রমের মূল্য তো অনেক দূর, চাষের সার-নাঙলের খরচা টুকুও উঠছেনা, ঋণের বোঝা বেড়ে চলেছে। চাহিদা ও যোগানের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য।

অর্থনৈতিক অবরোধের কারনে এমনিতেই মানুষ নুন্যতম কেনাকাটা করছে, তার উপরে পরিবহণ সমস্যা- ফসলের দামটা পাবে কোত্থেকে? অথচ সরকার চাইলেই ফসলের পরিবহণে একটা এ্যাকশন প্ল্যান নিতে পারত, তাতে কৃষকের পাশাপাশি মধ্যবিত্তও অর্থনৈতিক লাভ পেত। এখনই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথোচিত পরিকল্পনা মাফিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ধনীকেও একবেলা খেয়ে বাঁচতে হবে, কারন কয়েন বা কাগজের নোট চিবিয়ে খেলে পেট ভরেনা

আসলে কৃষিতে কোন সরাসরি কর ব্যবস্থা নেই মদের মত, তাই মদ নিয়ে সরকার যতটা আগ্রহী, কৃষি নিয়ে তার ছিটেফোঁটাও নেই। কয়েকটি হাতে গোনা শস্যে সরকারী নুন্যতম সহায়ক মূল্যের সুবিধা থাকলেও সেখানেও ক্ষমতার পোষা দালালদের, অসীম লোভমাখা সর্বগ্রাসী হিংস্র লোলুপতার কাছে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হচ্ছে দুর্বল কৃষক। তাই এবারের আসন্ন আষাঢ় চাষীর জন্য কোনো সুখের বার্তা নিয়ে আসছেনা, নিয়ে আসছে এক আকাশ স্যাঁতস্যাঁতে গাঢ় অন্ধকার

পর্যাপ্ত উৎপাদন নিশ্চিত করতেই হবে রাষ্ট্রকে, কেননা বাজার অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে প্রতিটা জীবন। বিশ্বায়নের ফলে আজ ৭০০ কোটি জনসংখ্যাই আমরা পড়শী, একজনের ঘরে আগুন জ্বললে সে আগুন রাষ্ট্র হতে সময় লাগবেনা। প্রতিটা নিত্য প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য জরুরি, তাই শিল্পে জোর থাকুক, কিন্তু আমাদের শিকড় সেই মাটিতে- যেখানে চাষীর বাস। মাটি না পেলে শিকড় শুকাতে সময় লাগবেনা; গ্রাম, গ্রাম্য সভ্যতা, কৃষিপ্রধান জীবিকা না বাঁচলে শহরের অট্টালিকায় শ্মশানের নীরবতা বিরাজ করতে সময় লাগবেনা। “কৃষি আমাদের ভিত্তি” এটা কোনো রাজনৈতিক শ্লোগান নয়, এটা আমাদের অস্তিত্ব- এই বুঝটা আসা জরুরী প্রশাসনের শীর্ষমহলে

ধান কাটা হয়ে খামারে গুটিয়েছে, এবারে বর্ষার চাষ শুরু হবে। মুসুরি, ছোলা বা মুগডাল চাষ, সূর্যমুখী, সরষে, পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা, টম্যাটো, শশা সব চাষই শুয়ে পরেছে। পাটের কি হবে কেউ জানেনা, তিল ও ভুষিমালের অবস্থাও তথৈবচ। মাচার সব্জি অর্থাৎ ঝিঙে, চিচিঙ্গে, বরবটি, করলা, লাউ, কুমড়ো, মাচাতেই ঝুলছে। এই রোহিণী জাতীয় উদ্ভিদ গুলোই মুলত আমাদের দৈনন্দিন সব্জির চাহিদা মেটায়। বীজ তো নিচের মাটিতেই রোপিত হয়, বড় হতে শুরু করলে- লাঠি বা বাঁশের টুকরোর অবলম্বনে কচি-নরম শাখা প্রশাখা গুলোকে মাচায় উঠিয়ে দেয় চাষী; পরম মমত্ব আর অসীম ধৈর্য দিয়ে আগলিয়ে লালন করার জন্য দেওয়া হয় রৌদ্রের খোরাক, ওষুধের পরিচর্যা, আর তৃণভোজী প্রাণীদের বিনষ্ট থেকে সুরক্ষা। এর পরে তবে না ফুলে ফলে ভরে উঠে মাঠকে মাঠ। অবলম্বন বিনা দুর্বল কেউ কীভাবে দাঁড়াতে পারে! চাষী নামের দুর্বল প্রাণীগুলোকে ফুলে ফলে ভরিয়ে দেওয়ার জন্য সরকার নামের পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকা মোটেই একজন দায়িত্বশীল চাষীর মত নয়, বরং তা ন্যাক্করজনক ও ক্রোধের উন্মেষ ঘটায়।

প্রানিসম্পদ ও মৎস চাষীদেরও অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। দারিদ্রতার গাঢ় কুয়াশার মাঝে স্বর্বস্বহারা হওয়া এখন শুধুই সময়ের অপেক্ষা, কারনে তাদের সঞ্চয় বলে কিছু হয়না- দিনআনি দিনখাই পরিস্থিতিতে শরীরটা ছাড়া বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষাটাই তাদের একমাত্র সম্বল। আসলে তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রব্যবস্থা কখনই চায়নি দেশের কৃষক শিক্ষিত হোক; তাই প্রথাগত শিক্ষার অভাবে, মাঝখান থেকে মুনাফার সবটাই লোপাট করে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী মহাজনেরা

আমাদের দেশে চাষী শুধুই ভোট ব্যাঙ্ক, তাই তারা হিন্দু-মুসলমানের বেশি কিছু হতে পারেনা। চাষী কখনও আইন সভায় যায়না তাই তারা যে তিমিরে সেই তিমিরেই পরে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম, ব্যাতিক্রম বাদে। এদেশে কৃষক দুর্বল নয়, দুর্বল আমাদের সংবিধান ব্যবস্থার প্রয়োগে- যা সেই উপনিবেশিক ধারাকে বয়ে নিয়ে চলেছে আজও

বর্ষা সম্মুখে, চাষী কদর্পশূন্য। শাসকে দলের নেতারা রেশনের চাল চুরি করছে, এমনটাই অভিযোগ বিরোধীদের; আবালবৃদ্ধবনিতা সকলেই এই পালা গানে মত্ত, কেউ ভাবছেনা- যদি পরের মরশুমে চাষই না হয়, চালটা আসবে কোত্থেকে, চুরিটাই বা কি করবে, আর এই অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের রাজনীতিই বা আসবে কোত্থেকে? রাজ্য হোক বা কেন্দ্র, কঠিন নীরবতা পালন করছে সকলে; বুদ্ধিজীবীরাও মৌনব্রত পালনে ব্যস্ত। শিল্পপতিরা ব্যাস্ত নিজেদের আখের গোছাতে, মধ্যবিত্ত ব্যাস্ত সোশ্যাল মিডিয়াতে, টেলিভিশনের দৈনন্দিন তরজাতে, শ্রমিকেরা রাস্তায় হাঁটতে ব্যাস্ত

শাসকের দল রোজই ঘটা করে প্রেস কনফারেন্স এর নামে বিশাল বিশাল প্রতিশ্রুতি আর ‘দেখ আমি কত মহান’ সাজার প্রচেষ্টা করতে ব্যাস্ত, মূল সমস্যা যে তিমিরে সেই তিমিরেই। এদের চাষ কেবল বেঁচে আছে মিথ্যায়-ঘৃণাতে, তথ্য গোপনের নির্লজ্জতায়। আমলাদের হাতের পুতুল বানিয়ে তাদের দিয়ে মিথ্যের বীজ বপন করছে রোজ, সমাজের জমিতে; আর এই মিথ্যাই দাঙ্গা নামের ফল দিচ্ছে নির্দিষ্ট সময়ের অন্তর

ত্রাণ নয়, ভিক্ষা বা অনুদানও নয়- তাদেরকে সুবিধা পৌঁছে দিন; যা তাদের ন্যায্য অধিকার। তাদের স্বার্থে না হোক, দেশের স্বার্থে, নিজের স্বার্থে। যে অবলম্বন ধরে জীবন বাঁচে, তেমন একটা লাঠি চাই, যাকে আঁকড়ে ধরে চললে মাথা তুলতে পারে কৃষকেরা।

বিনামুল্যে উন্নত মিনিকিট বীজের যোগান, করমুক্ত রাসায়নিক-জৈব সারের সরবরাহ করন, বিনা সুদে অগ্রিম ঋণ প্রদান, আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা পৌঁছে দেওয়া, উৎপাদিত পণ্যের সুলভে বাজারজাত করার সুবিধা, সহায়ক মুল্য পাইয়ে দেবার নামে চাষীর থেকে ফসলের তোলা আদায় বন্ধ করা, রাষ্ট্রীয় জুলুম অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি সহ- মধ্যসত্ত্বভোগী লুঠেরা মহাজনেদের দমন করে চাষীর ঘরে যদি না সুফল পৌঁছে দেওয়া যায়- আগামীতে সবচেয়ে বিপদে পড়বে মধ্যবিত্ত।

ধনী কিনে খাবে, চাষী নিজেরটা উৎপাদন করে নেবে যেভাবে হোক। যাদের না আছে বেশি দামে কিনে খাবার পয়সা না আছে ঘাম ঝড়ানোর দম- সেই মধ্যবিত্তের পেটে লাথি পবেই। ভাবনাটা বর্তমানের নয়, বরং ভবিষ্যতের। অতীত সাক্ষী, যারা শিক্ষা নেয়না তাদের ধ্বংস অনিবার্য

 

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২০

তোমার মাঝে বসত করে কয়জনাঃ করোনা ভাইরাস (৪)

 


চতুর্থ পর্ব

তিন ঘন্টায় টিকা আবিষ্কারঃ টাকার লোভ

মনে করুন, মাঝরাত্রে আপনার পেটে ভীষণ ব্যাথা, যন্ত্রণায় আছার-কাছার করছেন; আশেপাশে ডাক্তারও নেই। এমন সময় বাড়ির সামনের গ্যারেজ মালিক ত্রাতা হিসাবে উপস্থিত হলেন, না তিনি তার গাড়ি নিয়ে আপনাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্য আসেননি- তার গ্যারেজ ব্যবসার বুদ্ধিতে আবিষ্কৃত ওষুধ সে আপনাকে খাওয়াবে বলে এসেছে।

কি, গাঁজাখুরি বলে মনে হল তাইনা? হওয়ারই কথা, আমি গরীব ভেতো বাঙালী, তাই অজ পাড়াগাঁয়ে বাস- আমার বা আমাদের মতন লোকেদের কথা ফেলে দেওয়াটাই দস্তুর। কিন্তু ওই গ্যারেজওয়ালাটা যদি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মানুষটি হন, আর আপনার আমার স্থানে একটা দেশ বা গোটা মহাদেশ বা ধরুন গোটা পৃথিবী রোগাক্রান্ত হয়?

আপনি আবার প্রমান ছাড়া মানবেননা, তথ্য-যুক্তি সবকিছু আচ্ছন্ন করে ফেললেও- পবিত্র যে বিশ্বাস সেখানে পৌছানো খুবই শক্ত, তাই তো আমাদের মাঝেই ভক্ত জন্মায়। ভ্যানতারা না বলে সোজা কাজের কথায় আসি-

ঘটনা পরম্পরাঃ করোনা ভাইরাস উৎপত্তি হল চীনে, মানুষ মরছে বেশি আমেরিকা ইউরোপে, বিজ্ঞানীরা দিশাহারা, ওষুধ কোম্পানি গুলো মাথার চুল ছিঁড়ছে- এমতাবস্থায় সর্বপ্রথম “করোনা-ভাইরাসের ভ্যাকসিন বা টিকা রয়েছ আমাদের কাছে” বলে দাবী কে করেছিল সেটা কি জানেন? আসলে সমবেত কন্ঠস্বরও পুঁজির কাছে অসহায়, সত্যকে ‘বিশ্বাসের’ বুদ্বুদে ঢেকে- প্রহেলিকাময় করে দিয়েছে।

কথা হচ্ছে বিশ্বের ধনীতম ব্যাক্তি, বিল গেটস এর বিষয়ে। তিনি বিশ্বখ্যাত কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার তথা বিজ্ঞানী, চূড়ান্ত সফল ব্যবসাদার, সমাজসেবী ইত্যাদি। মুশকিল হল এই ‘ইত্যাদি’তেই, তিনি ডাক্তার নন, তার হাসপাতালের ব্যবসা নেই, তিনি জীববিদ্যার ছাত্রও ছিলেননা, তার ওষুধ কোম্পানীও নেই। তিনি কম্পিউটার তৈরি করেন, তার হরেক যন্ত্রাংশ বেচেন। এহেন তিনি সবকিছু ছেড়ে তিনি বেশ কয়েকবছর ভ্যাক্সিনের পিছনে আঠার রয়ে রয়েছেন। তাদের কি আছে? তাদের আছে টাকা, বিপুল পুঁজি- যা আমি আপনার কল্পনার অতীত; আর এই পুঁজি নিয়ে তারা ‘স্বামী-স্ত্রী’ সমবেতভাবে একটা দাতব্যসংস্থার মাধ্যমে ‘সমাজসেবা(!)’ করে চলেছেন।

করোনা ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের পিছনেও তারা আড়াই হাজার কোটি টাকার উপর লগ্নি তথা দান করেছে, এটা প্রকাশিত- অপ্রকাশিত কত রয়েছে তা কে জানে! আপনি বলবেন, টুইটারের কর্নধার জ্যাক ডরসি, উইপ্রোর আজিম প্রেমজি, সোরের ফান্ডের জর্জ সোরেস, ফোর্টেক্সি মেটালসের এন্ড্রু ফরেস্ট, স্কল ফাউন্ডেশনের জেফ স্কল, আমাজনের জেফ বোজেস, ডেলের মাইকেল ডেল সহ পৃথিবী প্রথমশ্রেনীর সকল ব্যবসাদারই তো করোনা গবেষণা খাতে টাকা দান করেছে, বিল গেটসের ক্ষেত্রে প্রশ্ন কেন? কারন বাকিরা কেউ ভ্যাকসিন বিলোয়না।

ভ্যাকসিন নিয়ে বিল গেটসের মোহ এক বিচিত্র পর্যায়ের, বহু ভ্যাক্সিনের প্যাটেন্ট নিয়ে বসে আছেন চিকিৎসা বিদ্যার মানুষ না হয়েও। না, তবে সরাসরি নিজেদের নামে কোনো পেটেন্ট এদের নেই, কিন্তু এমন পেটেন্ট যাদের রয়েছে সবই গেটস ফাউন্ডেশনের অর্থে পুষ্ট। যেমন, ইংল্যান্ডের The Pirbright Institute নামের একটা বায়োলজিক্যাল রিসার্চ সেন্টার; এদের কাছে বেশ কিছু করোনা ভাইরাসের পেটেন্ট রয়েছে, যদিও The Pirbright Institute দাবী করেছে তাদের কাছে নোভেল করোনা ভাইরাসের স্টেইনের পেটেন্ট নেই। প্রসঙ্গত, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি যে করোনা প্রতিষেধক ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা করছে ও বানিজ্যিক ভাবে টিকা উৎপাদনের জন্য প্রায় প্রস্তুত- তাদের সবচেয়ে মুখ্য সদস্য এই The Pirbright Institute।

এই দাবী আমার নয়, “Humans Are Free” নামের একটি মানবাধিকার সংগঠন, ২৯শে জানুয়ারি, ২০২০ তারিখে- বিশাল এক আর্টিকেলে, তথ্য ও তত্ত্ব দিয়ে এই বিষয়টা লিখেছে যে- নোভেল করোনা ভাইরাস বিল গেটসের আর্থিক সহায়তায় এই The Pirbright Institute রয়াসনাগারে তৈরি করেছে। সন্দেহের কারন হল, The Pirbright Institute সামান্য একটা প্রেসবিজ্ঞপ্তি করে Humans Are Free এর এই দাবীকে শুধুই নাৎস করে দিয়েই সমাপ্তি দিয়েছে। কোনো মামলা মোকদ্দমা কিছুই করেনি বিগত ৩ মাস কালে, না The Pirbright Institute এর তরফে, না Bill and Melinda Gates Foundation এর তরফে।

বর্তমানে, আমেরিকা তো বটেই, দক্ষিণ কোরিয়া সব বিশ্বের বহু দেশে দুরদুরিয়ে ‘Human Trial’ চলছে যে DNA ভ্যাকসিনটি- তার নাম INO-4800, এটা ডেভলপ করেছে যে মার্কিন কোম্পানী তার নাম Inovio Pharmaceuticals, প্রসঙ্গত এরাই সর্বপ্রথম ফার্মা কোম্পানি, যারা মার্কিন FDA দ্বারা ছাড়পত্র পেয়েছিল মানবশরীরে প্রয়োগের ক্ষেত্রে- সেই মার্চের শেষ সপ্তাহে। অথচ পশুর শরীরে সাফল্যের সাথে উৎরে গিয়েছে এমন অনেক ফার্মা কোম্পানিই এই ছাড়পত্রের জন্য হত্যে দিয়ে পরে রয়েছে, শিকে ছেড়েনি। দৃশ্যত ইনোভিও অতি ক্ষুদ্র একটা ফার্মা কোম্পানি। এখানেই মূল পালা গানটা লুকিয়ে রয়েছে, এই ইনোভিওর ইনভেস্টর(১) হচ্ছে ‘Bill and Melinda Gates Foundation’।

FDA এর যুক্তি ছিল ‘Bill and Melinda Gates Foundation’ এর সাহায্য প্রাপ্ত সংস্থাগুলো ২০০৩ সাল থেকে শ্বাস সম্বন্ধীয় SARS বা MARS জাতীয় রোগের বিষয়ে নিয়মিত গবেষণা করছে, তাই তাদের করোনা ভাইরাসের হিউম্যান ট্রায়ালের জন্য অনুমতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাকিদের কোন গ্রাউন্ডে ঝুলিয়ে রখেছে সে বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছে।

এপ্রিলের ৩০ তারিখে তো এই ইনোভিও কোম্পানি- জার্মানির Richter-Helm BioLogics কোম্পানির সাথে মিলে বিপুল আকারে ভ্যাকসিনের বানিজ্যিক উৎপাদনের ঘোষণা করে দিয়েছে। অবশ্যই আনন্দে ফেটে পরার মতই ঘটানা, তাইনা!

তাহলে এই লিঙ্কে গিয়ে ইনোভিওর দাবিটা(২) দেখে আসুন। ১০ই জানুয়ারি, ২০২০ তারিখে চীন প্রথম প্রকাশ করে SARS-CoV2/Covid-19 ভাইরাসের কথা, ইনোভিও বলছে তারা নাকি মাত্র ৩ ঘন্টার মধ্যে ঐ দিনই করোনার ভ্যাক্সিন ডিজাইন করে ফেলেছিল, যেটা অজানা এই নোভেল করোনার DNA এর সাথে হুববু মিলে গেছে কাকতালীয়ভাবে। পিসি সরকারের ম্যাজিক এই আবিষ্কারের কাছে দুগ্ধপোষ্য শিশু। শুধু তাই নয়, এই ইনোভিও কোম্পানি মার্কিন কংগ্রেস থেকে ৭০ কোটির অনুদানও লাভ করে রাতারাতি।

ইনোভিও ৩ ঘন্টায় ‘ভ্যাক্সিন’ রেডি দাবী করলে- ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ভীষণ ভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে সেই প্রচারনা মূলধারার সংবাদ পত্র থেকে কর্পুরের মত উবে যায়। কয়েকজন ত্যাদোর নাছোড়বান্দা ওই “৩ ঘন্টার মিরাকেল” দ্রুত ব্যবহার করার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তারা জানায়– সেটা আগষ্টের আগে সম্ভব নয়। প্রশ্ন উঠা কি সঙ্গত নয় যে, বিনা টেস্টিং, বিনা জিন কোডিং, বহু কিছু ছাড়াই কিকরে মাত্র ৩ ঘন্টায় ভ্যাক্সিন তৈরি করতে পারে? মার্কিন সরকারই বা কেন শুধুই এদেরই অনুমতি দেয়? উত্তর দেবার কেউ নেই, তাই প্রশ্নেরা বোবা হয়েই রয়ে যায়।

গোটা পৃথিবীর অর্থব্যবস্থা না ধসা পর্যন্ত, যতক্ষননা গোটা পৃথিবীতে কোনায় কোনায় না ছড়িয়ে পড়ছে রোগটি, কয়েক কোটি গরীব ও বুড়ো হাবড়া না মরছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এটা বাজারে ছাড়া যাবেনা- এটাই তো মোদ্দা কথা দাঁড়ায়। সম্ভবত পুঁজিবাদের ল্যাবটারিতে তৈরি একটা পুঁজের নাম নোভেল করোনা ভাইরাস- এমনটা হওয়া কি খুব আশ্চর্যের?

প্রাকৃতিকভাবেই করোনা ছড়িয়েছে- এই পবিত্র বিশ্বাসে যারা স্থির রয়েছেন তাদের জন্য একবালতি করুনা রইল। সারা পৃথিবী রিসার্চ করে যা করতে পারছেনা, কেউ মাত্র ৩ ঘন্টাতেই সেটা করে দিয়েও নিশ্চুপ এই ‘মে,২০২০’ এর দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত। খদ্দের বাড়ার অপেক্ষা করছে নাকি আরো অনেক বড় কোনো ষড়যন্ত্র রচিত রয়েছে এর পিছনে- কে জানে কি এর জবাব। ইনোভিওর ওয়েবসাইটে দেখে আসুন- ‘৩ ঘন্টার মিরাকেল’ জ্বলজ্বল করছে। ৩ ঘন্টায় অদৌ কীভাবে ভ্যাক্সিন তৈরি হতে পারে সেটা নিশ্চই যা জীববিদ্যার ছাত্র তারা বিশ্লেষণ করবে।

নাহ, এই দাবিও আমি করছিনা- প্রশ্ন তুলেছেন একজন মার্কিনি এটর্নি, নাম- রবার্ট ফ্রান্সিস কেনেডি জুনিয়র। ইনি কোনো এলি তেলি কেউ নন, সাবেন ফেডারাল এটর্নি জেনারেলের পুত্র ও সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডির ভাইপো। তার ভাষ্য মতে(৩), বিল গেটস গোটা পৃথিবীর স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, গোটা পৃথিবীতে ভাইরাস ছড়ানোর ক্ষেত্রে তার ঘৃন্য ভূমিকা রয়েছে। দক্ষিণ পশ্চিম এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশে গেটস ফাউন্ডেশনের ভ্যাকসিনের প্রভাবে পোলিও, মার্স, ইয়োলো ফিভারের মত রোগ ছড়িয়ে পরেছে, যেগুলো একসময় নির্মুল হয়ে গেছিল। এছাড়া নিত্যনতুন ভাইরাসের প্রকোপ লেগেই আছে, যার কৃতিত্ব এই Bill and Melinda Gates Foundation এর; আর এই পরিকল্পনা এরা WHO কে সাথে করেই করছে, কারন হু এর অনুদানের অনেকটা অংশ গেটস ফাউন্ডেশন থেকে আসে।

আপনি গেটস ফাউন্ডেশনের(৪) সাইটে চলে যান, সেখানেই পাবেন MICROCHIPS BIOTECH(৫) এর উল্লেখ। এরা ভ্যাকসিনেশনের সময় লক্ষ লক্ষ রোগীর হাতের শিরায় একটা অতি ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক চিপস ঢুকিয়ে দেয়, যার দ্বারা সেই মানুষগুলিকে এরা যন্ত্রের মত ২৪x৩৬৫ ঘন্টা পর্যবেক্ষনে রাখে চিকিৎসার নামে। Crypto mining system based sensors(৮) নামক প্রযুক্তির দ্বারা মানুষের শারীরবৃত্তীয় গতিবিধির সাথে সাথে সাইকোলজিক্যাল বা মানসিক গতিবিধির উপরেও নজরদারি চালাচ্ছে। লিঙ্কের প্রবন্ধটা পড়ুন, বাকিটা নিজেই বুঝে যাবেন।

আসলে ব্যাক্তির ব্যাক্তিগত পরিসরের সকল কিছু গতিবিধিই এর দ্বারা মনিটর করা হচ্ছে। এদের একমাত্র লক্ষ্য মানব শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি সিস্টেমের উপরে জাহিরি করা। অস্কার বিজয়ী চিত্রপরিচালক নিকিতা মিখালকভ, Crypto mining system based sensors এর উপরে একটি পূর্ণদৈঘ্যের তথ্যচিত্র প্রকাশ করেছেন, যেখানে গেটস ফাউন্ডেশনের ‘কুকর্ম’ কার্যকলাপ বিষয়ে খুলমখুল্লা যুক্তি ও তথ্য সামনে এনেছেন। প্রাক্তন বিখ্যাত টেনিস খেলোয়ার মারাট সাফিনের মত বহু বিশিষ্ট ব্যাক্তিত্ব নিকিতাকে সমর্থন জানিয়েছে। কিন্তু মূলধারার মিডিয়া চলে পুঁজিতে, আর এই পুঁজির তালিকায় বিলগেটসের উপরে আর কে আছে এই বিশ্বে? তাই সকলেই চুপ রয়েছে। এই MICROCHIPS BIOTECH এর লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত কয়েকশো কোটি মানুষের শরীরে এই চিপ ইমপ্ল্যান্ট করে দেওয়া।

গোটা বিশ্বজুড়েই এই গেটস ফাউন্ডেশনের জাল বিছিয়েছে ২০১৪ সাল থেকে সমাজসেবার মোড়কে। ২০১৫ সালের শেষের দিকে, আমেরিকার সিয়াটেলে এক প্রযুক্তি সম্মেলনে ভাষণ দিতে গিয়ে বিল গেটস নিজেই ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, “আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যে আসন্ন মহামারী সম্পর্কে সতর্ক করেছি সকলকে, এটি আমাদের সভ্যতাটিকে দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দেবে”। ইউটিউবে এটা আজও উপলব্ধ। বাকিটা নিজেই অনুমান করে নিন।

নিকিতা দেখিয়েছেন, গেটস তার কম্পিটারের ট্রোজান ভাইরাসের হ্যাক করার ক্ষমতা থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে মানবদেহের ভাইরাসে আগ্রহী হয়ে উঠেছিল ২০০৪ সালে, একটি বক্তিতায় সেটাও বিল গেটস নিজেই সেটা জানিয়েছিল, যে ভিডিওটা পৃথিবীর সকল মাধ্যম থেকেই মুছে দেওয়া হয়েছে এর পর। নিকিতার মতে, আসন্ন করোনা ভাইরাসে টিকা আসলে বিশ্বদাসত্ব ব্যবস্থার, ইলেকট্রনিক্স বা তারচেয়েও কোনো উন্নত কোডিং সংস্করণ।

এ এক বেসরকারী বৃহত্তম ডেটাবেস যা দিয়ে বহুকিছুই করা সম্ভব- ভাল খারাপ উভয়ই। এদের কি উদ্দেশ্য, তা এরাই একমাত্র জানে। চিপ ইমপ্ল্যান্টের ভয়াবহতা বিষয়ে এই প্রতিবেদনটা পড়ে দেখতে পারেন, লিঙ্ক- (৬)। গেটস, এই ভ্যাকসিন সেক্টরে তার আগামীর ব্যবসা সম্প্রসারনের জন্য সম্ভবত এখন লগ্নি করে যাচ্ছে, ভবিষ্যতে যা সুদে আসলে তুলে নেবে। এই করোনা প্যন্ডেমিকিই সেই ভবিষ্যৎ কিনা সময় জবাব দেবে।

ক্রিপ্টো কথাটার সাথেই চলে আসে ক্রিপ্টোকারেন্সির কথা। মানে ওই বিটকয়েন বা ঐ জাতীয় সাঙ্কেতিক মুদ্রা ব্যবস্থা। করোনা কি তাহলে আগামীর অর্থব্যবস্থাকে কুক্ষিগত করার প্রচেষ্টা? যেখানে ব্যাঙ্ক নেই, ক্রেডিট কার্ড নেই, একাউন্ট নাম্বার নেই, সবটাই একটাই পরিচয়- ওই Crypto mining system based sensors, সেখানেই ব্যাক্তির যাবতীয় তথ্য রয়েছে। এটা আমার ব্যাক্তিগত কল্পনা, সত্যটা আগামীর গর্ভে।

আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে সম্প্রতি এই গেটস ফাউন্ডেশন আমার ভারত সরকারের স্বাস্থ মন্ত্রকের অধীনে থাকা Public Health Foundation of India (PHFI) সংস্থার সাথে গাটছড়া বেঁধেছে। তার আগে অবশ্য তোষামোদ স্বরূপ, Bill and Melinda Gates Foundation আমাদের প্রধান সেবককে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেন(৭)। এই গাঁটছড়া Immunisation Technical Support Unit (ITSU) নামের একটা কর্মসূচী চালাচ্ছে সেই ২০১৭ সাল থেকে।

গোটা বিশ্বজুড়ে করোনা আজ মহামারী, তাহলে কি এদের ‘করোনা প্যান্ডেমিক’ কাহিনী প্রিপ্ল্যানড! আলাদা আলাদা দেশের অর্থব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়ে একটা ছাতা ‘New World Order’ এর আওতায় সকলকে আনার জন্য কি এই নিখুঁত পরিকল্পনা? পুঁজিবাদ আর গুপ্ত সংগঠনগুলোর রমণ নতুন কিছু নয়, জায়োনিজমের অন্যতম লক্ষ পৃথিবীর জনসংখ্যা অর্ধেক করে দেওয়া। জায়োনিজম হল তারা- যারা ঘোষিত শয়তানের পূজারী। কে না জানে The number of beast বা শয়তানের নাম্বার হল- ৬৬৬; এটা নিউ টেস্টামেন্টে রয়েছে। আর ইনোভিওর ৩ ঘন্টায় তৈরি ভ্যাক্সিনের পেটেন্টের নামার কত? নিজেই নেটে সার্চ করে দেখে নিন। পাঠকের ভাবনা ও বিচারের উপরে বিশ্বাস রেখে, আগামীর জন্যই ‘সবটা’ মুলতুবি থাকুক নাহয়।

1. https://www.businessinsider.in/.../articleshow/75013340.cms

2. http://ir.inovio.com/.../Inovio-Accelerates.../default.aspx

3. https://www.irishcentral.com/.../robert-kennedy-jr-bill...

4. https://www.gatesfoundation.org/.../2014/01/opp1068198

5. https://darebioscience.com/microchips-biotech/

6. https://www.govtech.com/.../chip-implants-the-next-big...

7. https://economictimes.indiatimes.com/.../71164934.cms...

8. https://www.independent.co.uk/.../microsoft...

সোমবার, ১১ মে, ২০২০

লকডাউন ও লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক


প্রতিদিন আমরা দেখতে পারছি লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক শ'য়ে শ'য়ে কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে বা সাইকেল চালিয়ে নিজের দেশে পৌঁছনোর চেষ্টা করছে শহরগুলো থেকে। অনেকে শেষ অবধি পৌঁছতে পারছে না, রাস্তাতেই হার স্বীকার করে নিচ্ছে। মৃত শ্রমিকের সংখ্যা করোনায় মৃতের সংখ্যার মত গোনা হচ্ছে না, কোনো ওয়েবসাইট মৃত শ্রমিকের সংখ্যার "ইউনিফর্ম" বা "লগারিদমিক" - কোনো স্কেলেই "কার্ভ" তৈরি করে দেখাচ্ছে না। হাতে গোনা কিছু খবর আসছে যেমন ট্রাকের ধাক্কায় গুজরাটে ৫ জনের মৃত্যু বা অরঙ্গাবাদে ট্রেনের তলায় ১৫ জন অথবা আম বোঝাই ট্রাক উল্টে ৫ জন। এর বাইরেও যে অনেক বড় সংখ্যক শ্রমিক মাঝরাস্তায় হারিয়ে যাচ্ছে সেই নিয়ে সন্দেহ নেই।

তবে করোনায় মৃত্যুর সঙ্গে শ্রমিকের মৃত্যুর একটা তফাৎ রয়েছে। করোনায় মৃত্যু ভাইরাসে, আর শ্রমিকের মৃত্যু রাষ্ট্রের জন্য। করোনায় মৃত্যুগুলো রোখা সম্ভব ছিল না, শ্রমিকদের মৃত্যুগুলো রোখা যেত। রাষ্ট্র যদি এদের থাকার-খাওয়ার ব্যবস্থা করতো, অথবা প্রত্যেকের হাতে এক মাসের রোজগার পৌঁছে দিত তাহলে এই পরিণতি হতো না। কিছু কিছু বিজ্ঞ দেখছি বলছে যে সরকারের কী দোষ, সরকার কী করবে ইত্যাদি। তাদেরকে শুধু একটাই কথা বলব যে অপেক্ষা করুন, যে অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে চলেছে দেশ এবং বিশ্ব তাতে সরকারি চাকুরেদেরও মাইনে এবং চাকরিতে কাট ছাঁট হতে চলেছে, বেসরকারি চাকরি... হেঁ হেঁ। আপনি আইটিতে কাজ করেন? ভাবছেন আইটিতে ওয়ার্ক ফ্রম হোম হয়, চাকরিতে টান পড়বে না? কে নেবে আপনার সার্ভিস? কে হবে আপনার ক্লায়েন্ট? আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান - যে দেশগুলোয় ভারতের সবচেয়ে বেশি আইটি রফতানি সেখানকার সব থেকে বড় বড় কোম্পানিগুলোও চরম অর্থনৈতিক সংকটে। ২০০৮-এর মত এখনো লেম্যান ব্রাদার্স বা এআইজি দেখতে পাননি তার কারণ এদের ব্যালেন্স শিট এবং ব্যাংকগুলোর কাছে প্রকৃত বকেয়া ঋণের হিসেব এখনো করে ওঠা হয়নি। লকডাউন ওঠার পরেই আসল চিত্র দেখতে পাবেন। আমেরিকায় বেকারত্ব ১৫%-এ পৌঁছেছে যা ঐতিহাসিক। সেখানকার সরকারও আউটসোর্সিংয়ের ওপর বিধিনিষেধ চাপাবে। মার্কিনী বিশেষজ্ঞরা সকলেই এক মত যে এই ক্রাইসিস ২০০৮-এর গ্রেট রিসেশনের থেকেও অনেক গ্রেটার। তাই আইটি ভাই বোনেরা একটু ধৈর্য ধরুন, আমি নিশ্চিত যারা এখনো পরিযায়ী শ্রমিকদের সাথে সমব্যথী হতে পারছেন না তারা কয়েক মাস পরেই হতে পারবেন।
তবে শুধু কয়েক কোটি পরিযায়ী শ্রমিকই এতে বিপর্যস্ত এটা খুব ভুল ধারণা। তাদের কষ্টটা হয়ত সর্বাধিক এবং তারা শ'য়ে শ'য়ে কিলোমিটার হাঁটছে বলে সেটা সামনে আসছে, কিন্তু অর্থনৈতিক বিপর্যয় চিত্রটা যে অনেক বিপুল বুঝতে পারবেন যখন আপনি নিজের পাড়ায় খোঁজ নেবেন। ছোট কারখানা, রেস্তোরাঁ, দোকান, ট্যাক্সি বা অটোচালক, রিকশাচালক, হকার - এই বিপুল সংখ্যক মানুষ, যারা ছোট ব্যবসা বা অস্থায়ী চাকরি করে পেট চালান তাদের রেশনের চাল আর আটা ছাড়া বাকি কোনো কিছু কেনার আর পয়সা নেই। শুধু এরাই নন, টিউশন করে পেট চালানো, অথবা স্কুল বা কলেজের অস্থায়ী শিক্ষক/শিক্ষিকা, যারা আপাত মধ্যবিত্ব তাদেরও অনেকের অবস্থা এরকম, আত্মীয় স্বজনের থেকে ধার চাইতে হচ্ছে বিদ্যুতের বা টেলিফোনের বিল দিতে। যাঁরা ত্রাণ দিচ্ছে পাড়ায় পাড়ায়, অথবা কমিউনিটি কিচেন চালাচ্ছেন তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন, কত মধ্যবিত্ব বাড়ির লোকজনকেও খাবার দিতে হচ্ছে কারণ তাদের বাড়িতে গ্যাস কেনার টাকা নেই।
অথচ এই অর্থনৈতিক সংকট আটকানো না গেলেও কিছুটা সুরাহা মানুষকে হয়ত দেওয়া যেত। আমেরিকা ও ইউরোপের অধিকাংশ দেশের সরকার নিঃশর্তে প্রত্যেকটা মানুষের একাউন্টে বেশ কিছু টাকা দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উচ্চবিত্ত বাদ দিয়ে বাকি প্রতিটা মানুষের একাউন্টে ১,২০০ ডলার দিয়েছে, ৯০,০০০ টাকা। জার্মান সরকার প্রত্যেকের একাউন্টে দিয়েছে ৮০০ ইউরো, তা ছাড়া ছোট ব্যবসায়ীদের দিয়েছে ৫০০০ ইউরো করে যাতে তারা কর্মচারীদের মাইনে দিতে পারে। উন্নত দেশ বাদ দিন, অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশও ভারত সরকারের চেয়ে বেশি ত্রাণ দিয়েছে। নীচে একটি গ্রাফ রয়েছে (চিত্র-১)। ইউরোপের সেন্টার ফর ইকোনোমিক পলিসি রিসার্চ বিশ্বের অর্থনৈতিক গবেষণার একটি অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। তারা প্রতি সপ্তাহে কোভিড-১৯-এর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে কিছু গবেষণাপত্র প্রকাশ করছে। এই গ্রাফটি সেখানকারই একটি গবেষণাপত্র থেকে নেওয়া যার লিংক শেষে পাবেন (লিংক-১)। এই গ্রাফে এক একটা নীল বিন্দু হলো এক একটি দেশ। এই গ্রাফে এক একটি দেশের অর্থাৎ বিন্দুর অবস্থান নির্ভর করছে দুটো সংখ্যার ওপর - এক, সে দেশের সরকার কতটা কঠোর লকডাউন ঘোষণা করেছে এবং দুই, সে দেশের সরকার কতটা ইকোনোমিক রিলিফ দিয়েছে জাতীয় আয়ের শতাংশের হিসেবে। যে দেশের সরকার যত বেশি কঠোর লকডাউন ঘোষণা করবে তত বেশি সেই দেশের মানুষ অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এবং তাই মানবতার খাতিরে ধরে নেওয়া যায় যে সেই দেশের সরকার তত বেশি অর্থনৈতিক ত্রাণ দেবে। ওই চিত্রটিতে দেখা যাচ্ছে যে অধিকাংশ রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই সেটা সত্যি - যত কঠিন লকডাউন তত বেশি ত্রাণ, একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কখনো দেশের নাগরিকদের আধ পেটা খেয়ে থাকতে বাধ্য করতে পারে না। কিন্তু দেখুন, একমাত্র ব্যতিক্রম কে? ভারতবর্ষ! এই দেশ লকডাউনের দিক দিয়ে প্রায় কঠোরতম অথচ অর্থনৈতিক ত্রাণের দিক দিয়ে প্রায় কৃপণতম। ভুল বুঝবেন না, এখানে কিন্তু ত্রাণের হিসেবটা জাতীয় আয়ের শতাংশে করা হচ্ছে তাই আমাদের দেশ গরিব সেই যুক্তি খাটবে না। ও হ্যাঁ, এই গ্রাফ তৈরির জন্য সমস্ত তথ্যই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কোভিড ডেটাবেস থেকে জোগাড় করা। এই ডেটাবেসের হিসেবেই ভারতের লকডাউনকে বিশ্বের মধ্যে কঠিনতম বলা হয়েছিল, যা দেখিয়ে ভারতের সরকারপন্থী মিডিয়া মোদির গুনগান গেয়েছিল। তখন বোধয় তারা জানতো না যে সেই ডেটাবেসে অর্থনৈতিক ত্রাণেরও হিসেবও দেওয়া থাকে।
অর্থাৎ ভারতের রাষ্ট্র বিশ্বের সমস্ত দেশের তুলনায় সব থেকে শ্রমিক বিরোধী অবস্থান নিয়েছে করোনাযুদ্ধে। কিন্তু প্রশ্ন হলো - কেন? এই কোটি কোটি মানুষের তো ভোটাধিকার আছে, ভারত এখনো গণতন্ত্র, এখনো ভোট হয়, তাহলে কী এমন দায় পড়লো সরকারের যে তারা এই কোটি কোটি মানুষের চরম বিপর্যয়ে একটু সাহায্যের হাতও বাড়াতে চাইছে না? কার স্বার্থ কোটি কোটি শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষের চেয়েও বেশি? এর উত্তর আছে দ্বিতীয় চিত্রে। দ্বিতীয় চিত্রে ফের এক একটি বিন্দু হলো এক একটি দেশ এবং এই গ্রাফে এক একটি দেশের অবস্থার নির্ধারিত হয়েছে ফের দুটি সংখ্যামানের দ্বারা যার একটি আগের মতোই অর্থনৈতিক ত্রাণ কিন্তু অপরটি হলো "সভরেন ক্রেডিট রেটিং"। সভরেন ক্রেডিট রেটিং কী? এটি হলো একটা মাপকাঠি যা নির্ধারণ করে কোন দেশের বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে কতটা আকর্ষণীয় হওয়া উচিত। সভরেন ক্রেডিট রেটিং যদি খারাপ হয়ে যায় কোনো দেশের তাহলে সে দেশের শেয়ার বাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পয়সা তুলে নেবে, সে দেশের কোম্পানিগুলোর বিদেশ থেকে ঋণ পাওয়া মুশকিল হবে বা সুদের হার বেশি দিতে হবে, সে দেশের সরকারকেও বিদেশ থেকে ধার করলে সুদের হার বেশি দিতে হবে। এই গ্রাফটিতে দেখতে পাচ্ছেন যে যেসব দেশগুলির ক্রেডিট রেটিং খারাপ সেই দেশগুলো করোনার জন্য অর্থনৈতিক ত্রাণও কম দিয়েছে এবং ভারতও সেই দেশগুলির মধ্যে একটা। এর কারণ হলো সরকারি খরচ বাড়ালে ক্রেডিট রেটিং কমার সম্ভাবনা থাকে, তাই যাদের ক্রেডিট রেটিং আগের থেকেই খারাপ তারা ত্রাণও কম দেবে এই ভয়ে যে রেটিং তাতে আরো খারাপ হয়ে যেতে পারে।
তাহলে এটা বোঝা গেল যে ভারত সরকার শ্রমিক বিরোধী অবস্থান নিচ্ছে, ত্রাণ দিচ্ছে না তার কারণ ক্রেডিট রেটিংয়ের ভয়। কিন্তু ক্রেডিট রেটিং খারাপ হলেই বা কী? অসুবিধে কোথায়? আগেই বলেছি যে তাতে শেয়ার বাজার ধাক্কা খাবে কারণ বিদেশি বিনিয়োগ বেরিয়ে যাবে। শেয়ার বাজারে এই বিদেশি বিনিয়োগটা মূলত ফাটকা পুঁজি। কিন্তু তা বেরিয়ে গেলেই বা কী? অনেকেরই ভুল ধারণা থাকে যে শেয়ার বাজারের ওপর অর্থনীতির স্বাস্থ্য নির্ভর করে, কিন্তু আসলে বিষয়টা উল্টো - অর্থনীতির স্বাস্থ্যর ওপর শেয়ার বাজার নির্ভর করে (যদিও সেটাও সবসময় হয় না)। তাই শেয়ার বাজার পড়লে অর্থনীতির আলাদা করে বড় ক্ষতি হবে না, বিশেষ করে যেখানে আমাদের দেশে খুব কম সংখ্যক মানুষ শেয়ার বাজারে অনেক টাকা বিনিয়োগ করে। তাহলে? শেয়ার বাজারে বড় বিনিয়োগকারীদের অনেকের সাথে বিজেপি আরএসএস-এর দহরম মহরম কোনো গোপন তথ্য নয়, তাদের স্বার্থ রক্ষা করাটা হয়ত একটা উদ্দেশ্য হতে পারে। অপর একটা যুক্তি হতে পারে যে বিদেশি ফাটকা পুঁজি বেরিয়ে চলে গেলে টাকার দাম পড়বে। সেটার একটা সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এ কথাও সত্যি যে ভারতের বিদেশি মুদ্রার ভান্ডার বিশ্বের মধ্যে অন্য বৃহত্তম, তা ছাড়া তেলের ও সোনার দাম তলানিতে। এই দুটো দ্রব্য ভারতের সবচেয়ে বড় আমদানি, তাই এদের দাম কমলে/বাড়লে টাকার দামও বাড়ে/কমে। সেই দিক দিয়ে তাই এক্ষুনি টাকার ওপর চাপ আসার তেমন কারণ নেই। সম্প্রতি, আইএমএফ উন্নয়নশীল দেশগুলোর মুদ্রার দাম করোনা সংকটের জন্য যাতে হঠাৎ করে পড়ে না যায়, আর তাদের বিদেশি মুদ্রার কোষাগার যাতে ফাঁকা না হয়ে যায়, তার জন্য সব উন্নয়নশীল দেশকে ব্যাপক বিদেশি মুদ্রা ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব দেয় (স্পেশ্যাল ড্রয়িং রাইটসের লিমিট বাড়িয়ে), কিন্তু ভারত একমাত্র উন্নয়নশীল দেশ যে এটার বিরোধিতা করেছে। তাই ধরে নেওয়া যায় যে ভারত সরকার টাকার মূল্য পড়া নিয়ে ভাবিত নয়।
তাহলে ক্রেডিট রেটিং খারাপ হলে আর কী কী ক্ষতি হতে পারে যার জন্য সরকার এত ভাবিত? ভারত সরকার বিদেশ থেকে ঋণ নিতে চাইলে সুদ বেশি দিতে হতে পারে। কিন্তু ভারত সরকারের বিদেশ থেকে ঋণ খুবই সামান্য, আর যেটুকু সেগুলোও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের মত সংস্থা থেকে স্পেশ্যাল ডেভেলপমেন্টাল লোন যাতে সুদ নামমাত্র। তাহলে? দেখুন আরো একটা কারণ ওপরে লেখা রয়েছে। দেখছেন? - ভারতীয় "কোম্পানিগুলোর বিদেশ থেকে ঋণ পাওয়া মুশকিল হবে বা সুদের হার বেশি দিতে হবে"। এই, এইটেই হলো সেই গোপন কথাটি যেটা সরকার কোনোদিন উচ্চারণ করবে না। ব্যাংক অফ ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্ট জানাচ্ছে যে ভারতের কর্পোরেট সেক্টরের মোট বিদেশী ব্যাংকগুলো থেকে বিদেশী মুদ্রার ঋণ হলো ৫৯০০ কোটি ডলার, ৩ লক্ষ ৭৫ হাজার কোটি টাকা (লিংক-২)। এটা শুধুই কিন্তু বিদেশী ব্যাংক থেকে। অন্য জায়গা থেকে বিদেশী মুদ্রার ঋণ ধরলে সংখ্যাটা আরো বেশি। শুধু ২০-টা বৃহত্তম কর্পোরেট সংস্থার বিদেশী ঋণই ১৮০০ কোটি ডলার, ১ লক্ষ ৩০ হাজার কোটি টাকা। তার মধ্যে রিলায়েন্স, টাটা, বিড়লা - সবই আছে (কোম্পানিগুলির ব্যালেন্স শিট থেকে এই তথ্য পেয়ে যাবেন।) সভরেন রেটিং খারাপ হলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে এদের ওপরেই। এই ঋণের ওপর সুদ বেড়ে যাবে, নতুন ঋণ পেতে অসুবিধে হবে, লাভ কমবে।
তাহলে বোঝা গেল যে ভারতের কোটি কোটি শ্রমিক, ছোট ব্যবসায়ী, দিন আনি দিন খাই মানুষের প্রতি সরকারের অমানবিক আচরণ এবং পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক ত্রাণ দেওয়ায় অনীহার পেছনে কারণ হলো যে এই সরকার বৃহৎ পুঁজিপতি ও শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে বেশি ব্যস্ত। শ্রমিকদের ট্রেনের টিকিটের টাকা না দেওয়ার অমানবিক সিদ্ধান্তের পেছনেও রয়েছে টাটা আম্বানি - যারা বিজেপির ইলেক্টরাল বন্ডে হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়েছে - সেই তাদের স্বার্থ রক্ষার তাগিদ। ভারতের শ্রেণী সংঘাত বোধয় এতটা সরাসরি এবং এতটা ক্ষিপ্র আকার ইদানিংকালে নেয়নি। কিন্তু অধিকংশ মানুষ জানবে না যে লক্ষ লক্ষ মানুষ হাজার হাজার কিলোমিটার হাঁটছে আসলে শ্রেণী সংঘাতের কারণে, তারা জানবে না যে তাদের ওপর শ্রেনিযুদ্ধর ঘোষণা হয়েছে। ভাববার সময় হয়েছে যে এই বৃহৎ পুঁজিপতিরা কতটুকু সম্পদ ও চাকরি তৈরি করে দেশের জন্য যার জন্য এরকম কোটি কোটি মানুষ আধপেটা খাবে? যারা এখনও পুঁজিপতিদের পক্ষ নেবে তাদের সাথে এখনই কোনো তর্ক করবো না, তিন মাস পর করবো কারণ আমি নিশ্চিত যে তিন মাসের মধ্যে এর আঁচ কর্পোরেট চাকরি করা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গায়ও লাগবে। তখন না হয় তাদের মতামত শুনতে চাইবো।

পুরন্দর

ফেসবুকীয় সিপিএমঃ ফিউজড আইনগাইডেড কামিকাজে ড্রোন

  ফেসবুকের ‘সিপিএম’ নামক এই চুড়ান্ত আঁতেল ও প্রায় সর্বজ্ঞ গোষ্ঠীটার পূর্ণ বোধোদয় বা পূর্ণ বিনাশ না ঘটা অবধি রাজ্যের বাম নেতৃত্বের খুব বেশী ...