রাজনীতি, আমাদের জীবন
ও মৃত্যুর মাঝে যা কিছু আছে সেই সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে। এটা শেখার জন্য কোনো নির্দিষ্ট
পাঠশালা না থাকলেও, কলেজ জীবনের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলই আগামী প্রজন্মের মনে সুপ্ত রাজনীতির
অঙ্কুরকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। পরবর্তীতে যখন এই প্রজন্ম প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে
আসে, দলমত নির্বিশেষে গোটা সমাজ একটা শিক্ষিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব পায়।
গুরুকুল
ভারতীয় উপমহাদেশের আদি শিক্ষাব্যবস্থা। পুরাকালে বেদবিদ্যার সাথে জড়িত
ব্রাহ্মণরা- বৈদিক শিক্ষা বিতরণের জন্য
গুরুকুল পরিচালনা করতেন। এই ঐতিহ্য তৎকালীন বেশিরভাগ শাসকই
অব্যাহত রেখেছিলেন এবং প্রাচীন ভারতের প্রায় সর্বত্র এমন গুরুকুল পরিচালিত হওয়ার বহু শিলালিপি পাওয়া যায় প্রামান্য হিসাবে। এই ধরনের
গুরুকুলের উন্নত রূপগুলি ছিল তক্ষশীলা, নালন্দা, বিক্রমশীলা এবং ভাল্বী
বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি। ধর্মীয়, সামাজিকতা, জ্ঞান, বিজ্ঞানের সাথে সাথে রাজনৈতিক শিক্ষা প্রদানের জন্য
গুরুকুলই ছিলো বৈদিক যুগের একমাত্র ঐতিহ্য, যার মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করা হত রাজপুত্রকেও। ভারতীয় মহাকাব্য রামায়ণ এবং মহাভারতে উল্লিখিত
কিছু বিখ্যাত ঋষি বা গুরুও গুরুকুল পরিচালনা করতেন। রাম এবং
কৃষ্ণ যথাক্রমে বশিষ্ঠ এবং সন্দীপনীর কাছে গুরুকুলে শিক্ষালাভ করেছিলেন। এখানেই
তারা রাজনীতির পাঠও শিখেছিলেন।
স্বাধীনতা পরবর্তী যুগের
একদম শুরুতে- ব্রিটিশ ও মার্কিন রাজনৈতিক আদলে গড়ার প্রচেষ্টা ছিলো আমাদের খিচুড়ি রাজনৈতিক
সমাজকে। কিন্তু যে দেশে প্রতি ৫০ কিমিতে ভাষা বদলে যায়, খাদ্য সংস্কৃতি বদলে যায়, জাতপাতের
অঙ্কে সমস্যার মূল ইশ্যু বদলে যায়, সেখানে আঞ্চলিক বাধ্যবাধকতা এসেই যায়। তখন আর একে
নির্দিষ্ট কোনো কপিবুক স্টাইলে ব্যাখ্যা করা যায়না, নিজশ্ব পরিভাষা তৈরি হয়ে যায়। এই
আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে বুঝতে গেলে সেখানকার মানুষের সাথে একাত্ম হতে হয়।
সবচেয়ে ভালো হয় স্থানীয়
হাতে রাজনীতির ভারটা সমর্পিত হলে, বাইরে থেকে কাউকে এনে রাতারাতি নেতা বানিয়ে দেওয়া
যায়না। পুঁথিগত ভাবে তথাকতথিত অশিক্ষিত মানুষও রাজনীতি করতেই পারেন, কিন্তু একটা সীমানা
অবধিই তার দৌড় সীমাবদ্ধ। আর এখানেই রাজনীতিতে শিক্ষার দাবী জোড়ালো ভাবে প্রকট হয়ে উঠে।
শিক্ষিত আর অশিক্ষিত মূর্খের মাঝে একটা
মোটা দাগের জ্ঞানগত বিবেচনা, দুরদৃষ্টিতা আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বার্থানেষী
গোষ্ঠীকে উপেক্ষা করার মত কাঠিন্য দেখানোর ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েই যায়। মোদীজির চেয়ে
বড় অশিক্ষিতের জ্যান্ত উদাহরন আর কী হতে হতে পারে শিক্ষিত ভারতীয়দের সামনে!
চলে আসুন ২০২৫ সালের
পশ্চিমবঙ্গে। ছাত্র রাজনীতি প্রায় নেই হয়ে গেছে বা নেই করে দিতে
সক্ষম হয়েছে মমতা ব্যানার্জী। কারন তার
যে দল, তাকে চালাবার জন্য প্রথম শর্তই হচ্ছে অশিক্ষা, মুর্খামি
আর অসৎ মানসিকতা। তৃনমূল দলের মূল বিপদ হচ্ছে শিক্ষা আর বিবেক। সুতরাং, খুব স্বাভাবিক
কারনেই তিনি ছাত্র রাজনীতির শিকড়ে আঘাত করেছিলেন। শুরুতে নিজের দলের ছেলেপুলেদের দিয়ে
ক্লিনিক্যালি ছাত্র রাজনীতিকে আতঙ্কে রুপান্তরিত
করেছিল, যা অত্যন্ত দুরদর্শী ও কার্যকরী সিদ্ধান্ত ছিল। সংবাদপত্র
খুললেই ছাত্র সংগঠনের দাদাগিরির রগরগে কেচ্ছা, ছাত্রনেতা নাম শুনলেই কেমন যেন হিংস্র শ্বাপদের মত শোনাতো। অভিভাবকেরা
শঙ্কিত হয়ে উঠলো, সাথে সাথে ছেলেপুলেরাও। যৌনতা বা গরু-শুয়োর এর ট্যাঁবুর চেয়েও ‘ছাত্র
রাজনীতি’ শব্দটাকে প্রবল নিষিদ্ধ ও পাপগ্রস্থ বানিয়ে তুলতে সফল হলো।
রাজনীতি আসলে ‘ইজম’
ভিত্তিম একটা নান্দনিক শিল্প, যেখানে যুক্তি তর্কের ধারালো ফলা এফোঁড়ওফোঁড় করে দেয়
যাবতীয় ভণ্ডামি। রাজনীতি হলো দর্শন, শিল্পকলা,
রুজি কেন্দ্রিক সামাজিক আন্দোলন। যা নমনীয়তার সাথে সমালোচনা করতে
শেখায়, কূটনৈতিক বর্ম ব্যবহার করে সমালোচনা সইতে শেখায়। অশিক্ষা না এলে সেই সমাজে চুরিকে
ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যাবেনা বৈধতার সাথে। আদর্শ ভিত্তিক ইজমের
শিক্ষা থাকলে রন্ধ্রে রন্ধ্রে বর্বরতা, ভন্ডামি, গুন্ডামি আর আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা যাবেনা, যেখানে সরকারের সমালোচনা মানেই রাষ্ট্রদ্রোহ, প্রশ্ন
করা মানেই প্রকাশ্য গণশত্রুতে রুপান্তরিত হওয়া। এদের উদ্দেশ্য গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে
মধ্যযুগীয় সামন্ততন্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম করে চরম বিশৃঙ্খলাপূর্ণ নৈরাজ্য তৈরি করা, যেখানে শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি
নিঃশর্ত আনুগত্যই তৃণমূলীয় যোগ্যোতার একমাত্র মাপকাঠি। অতএব, শিক্ষিত রাজীনীতির সূতিকা গৃহই বন্ধ করে দাও। কলেজ বা ইউনিভার্সিটি থেকে কেবল নেকুপুষু
ছেলেমেয়েই বের হবে, যারা আজীবন দয়াভিক্ষার উপরে স্থানীয় মস্তান রাজনৈতিক নেতাদের পা
ধরে করুণার পাত্র হিসাবে বেঁচে থাকবে
অত্যন্ত মোটাভাবে নতুন
প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হলো রাজনীতি মানেই অস্পৃশ্য, অবৈধ,
এটা কোনো সভ্য ভদ্র লোকেদের ছেলেমেয়েদের কাজ নয়। সংবাদ মাধ্যম ছিলো এই অপরাধের প্রত্যক্ষ
দোসর, বিজ্ঞাপনে আরাবুল, অনুব্রতরা তখন সংবাদ পত্রের কোহিনূর। রাজনীতির ময়দানকে হিংস্র পশুর চারণভূমির সাথে তুলনা শুরু হয়ে গিয়েছিলো,
অতএব ছাত্র রাজনীতির আঁতুড় ঘরকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো মানে হয়! ক্রমশ ‘ভালো ছেলে’ রাজনীতি করেনা, শিক্ষিতেরা ইউনিয়নবাজি করেনা জাতীয়
গায়েত্রী মন্ত্রের জপ করানো হলো সমস্বরে, কর্পোরেট হাঙরদের সুবিধে করে দিতে। ফলে ক্রমশ
মূল ধারার রাজনীতির কারবারিরা, যারা দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের দায়ে অভিযুক্ত- তারাই ছাত্র রাজনীতির নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করল, ইস্কুল কলেজের সরকারি ফান্ড আত্মসাৎ করতে। ছাত্র রাজনীতির ধাত্রী ভূমি হওয়ার বদলে কলেজগুলো চোখের সামনে দুর্নীতিবাজদের আখড়া হয়ে উঠলো
এটাও সত্য যে, কংগ্রেসী
ঘরানার ছাত্র রাজনীতি মানেই পার্টির ক্ষমতা মজবুত করা, বাম আমলেও তার ব্যতিক্রমী
ছিলো না। ২০০৬ পরবর্তী বাংলাতে মমতা ব্যানার্জী এটার ন্যাংটা
রূপ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলো। ছাত্র রাজনীতি মানেই পিতার কাঁধে
সন্তানের লাশ। ছাত্র রাজনীতি মানেই চরদখলের মতো ‘হল’ দখলের মহড়া। ছাত্র রাজনীতি মানেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের লেজুরবৃত্তি, একে অন্যের পা চাঁটা। ছাত্র রাজনীতি মানেই ছাত্রীদের নিয়ে দখলদারি,
কে কাকে ভোগ করবে তার প্রতিযোগিতা। ছাত্র
রাজনীতি মানেই অপমান করে ন্যায্য প্রতিবাদের ভাষা
রোধ করে দেয়া। বোমাবাজি, লুটপাট, চাঁদাবাজি, দলবদ্ধ হয়ে গাড়ি
ভাংচুর। সাধারন মেধাবী ছাত্ররা কেন রাজনীতিতে জড়াবে বলুন তো!
আর এই ফাঁকেই জন্ম নিলো-
‘অরাজনৈতিক’ কাঁঠালের আমসত্বের। যা রামধনু যৌনতার মত বিকৃত কামের মজা দেয়, আবার প্রাণঘাতী
যৌন রোগও তৈরি করে- নতুন কিছু জন্ম না দিয়েই। এই নপুংসক প্রজাতিটাকে তৈরি করা হয়েছিলো
অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে, মমতা ব্যানার্জী যখনই নিজে কোনো মুশকিল ফাঁদে জড়িয়ে গেছে বা
যাচ্ছে, এই খোদার খাসির দল সামনে চলে গিয়ে একটা মিথ্যা প্রতিবাদের পর্দা টাঙিয়ে দেয়।
যারা Shock absorber হয়ে গণবিদ্রোহের আগুনের লেলিহান শিখাটাকে স্তিমিত ও সহনীয় করে
দেয়, এবং বেশ কিছুটা সময় পাইয়ে দেয় মমতা ব্যানার্জীকে। যেখানে রাজনৈতিক আদর্শ নেই, সেই আন্দোলন শুধুই ক্ষমতা দখলের খেলা।
এই অরাজনৈতিক বুদ্ধিজীবী
সমাজটাই প্রচার করলো- ছাত্রদের কাজ শুধুই
পড়াশোনা করা। তোতাকাহিনীর জনৈকের মত মমতা ব্যানার্জীও
নিশ্চই অলক্ষ্যে বলেছিল- “শিক্ষা যদি নাও হয়, খাঁচা
তো হইল। পাখির কী কপাল।” পড়তে গিয়ে দলবাজি করা অপরাধ অন্যায়,
যা সভ্যতার পরিপন্থী। শাঁখ ঘণ্টা ঢাক ঢোল
কাড়া নাকাড়া তুরী ভেরি দামামা কাঁসি বাঁশি কাঁসর খোল করতাল মৃদঙ্গ জগঝম্প করে রাবীন্দ্রিক অনুষঙ্গে, রোজ সন্ধ্যার টিভি খেউড়ে অভিভাবকদের টার্গেট করে খাপ
পঞ্চায়েত বসালো আনন্দ টিভি ও বিজন দেবনারায়ণের মত ‘অরাজনৈতিক’ মাষ্টারেরা। প্রশ্ন তুলে
দিলো আমাদের দেশে ছাত্ররাজনীতি জিইয়ে রাখা কি খুবই
জরুরী!
স্বাধীন সার্বভৌম গনতান্ত্রিক শাসন-ব্যবস্থার দেশে ছাত্রদের
কেনো পড়াশোনার পরিবর্তে রাজনীতি করতে হবে। এভাবেই ক্রমশ ছাত্রদের রাজনীতি থেকে সরাতে
সরাতে, রাজনীতি থেকেই শিক্ষিত সমাজকে সাবাড় করে দিলো।
অথচ সোনালী প্রজন্মের বরেণ্য নেতাদের মধ্যে মহাত্মা গান্ধী,
জহরলাল নেহেরু, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, বাবা সাহেব ভীমরাও আম্বেদকর এমনকি জ্যোতি বসু পর্যন্ত ছাত্র রাজনীতির কোষ্ঠীপাথরে নিজেদের ঘসামাজা করে
নিয়েছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা বিরুদ্ধে আন্দোলনের
নেতৃত্ব দিয়েছিলো সোসালিস্ট পার্টির জয়প্রকাশ নারায়ন। সেই আন্দোলনের সর্বাগ্রভাগে
ছিল লালু প্রসাদ যাদব, সুশীল মোদী,
নীতিশ কুমার, রামবিলাস পাশওয়ান এর মত ছাত্র নেতারাই।
সোসালিস্ট এবং দক্ষিণপন্থী রাজনীতির অন্যতম বীজতলা বেনারস হিন্দু
ইউনিভার্সিটি, যার সেরা ফসল দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রশেখর।
ভারতের
ছাত্র রাজনীতি এবং ক্লাসিক্যাল ভারতীয় রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সর্বাজ্ঞে
চলে আসবে বামপন্থীরা. বর্তমানে দেশের যে কটা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি চালু আছে, তার মধ্যে JNU
অন্যতম। আজকের কেন্দ্রীয় রাজনীতির মঞ্চে যে কয়েকজন ছেলেমেয়ে সন্ধ্যার টিভির খেউর বা
সোস্যাল মিডিয়াতে বিরোধী স্বর হিসাবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তারা প্রায় প্রত্যেকেই phd
ডিগ্রীধারি শিক্ষিত ও অধিকাংশই JNU থেকে এসেছে। এই JNU থেকেই অমিতাভ নন্দী, ডি রাজা,
শেহেলা রশিদ, ওমর খালিদেরা বেরিয়ে এসেছে।
অর্থাৎ রাজনৈতিক ঐতিহ্যবাহী একটা পরিমণ্ডলে
এরা প্রত্যেকে জন্মেছে ও লালিত হয়েছে, পুঁথিগত শিক্ষার
সাথে সাথে রাজনৈতিক শিক্ষাতেও শিক্ষিত হতে পেরেছে বলেই, আজ তারা ক্ষমতার চোখরাঙানিকে
উপেক্ষা করতে শিখেছে নিয়মিত অনুশীলনে। আজ গোদি মিডিয়ার
মত একনায়কতান্ত্রিক একটা পুঁজিবাদী সমষ্টির বিরুদ্ধে গিয়ে- নিজের ইজমের কথা রাখতে পারছে,
যুক্তি ও তথ্য দিয়ে মাত করে দিতে পারছে RSS এর মিথ্যার বেসাতিকে, ধর্ম আর জাতপাতের
ভুয়ো ন্যারেটিভকে ছিঁড়ে খানখান করে দিতে পারছে আত্মবিশ্বাসের সাথে।
তত্ত্বগত
ভাবে শ্রমিক কৃষকের মিলিত শক্তির উত্থানে প্রোলেতারিয়েত পরিবার থেকে উঠে আসবে
বামপন্থীদের নেতা। সেই নেতারা ভারতীয়
সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাবে, গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেও
বৈপ্লবিক যুগান্তকারী কোন সিদ্ধান্ত নেবে- এমনই প্রত্যাশা
থাকে বামপন্থী সমর্থকদের । কিন্তু বাস্তবটা হচ্ছে মূল কাঠামোর সর্বোচ্চ শিখর অর্থাৎ প্যালিটব্যুরো
নিয়ে যদি আলোচনা করা যায়, দেখা যাবে আজ
অবধি সিংহভাগ নেতাই এসেছে ছাত্র
রাজনীতির অন্দরমহল থেকে। দিল্লির JNU যদি ছাত্র
রাজনীতিতে বামপন্থীদের আঁতুড় ঘর হয়, তবে
দিল্লী ইউনিভার্সিটি অবশ্যই দক্ষিণপন্থীদের ধাত্রীভূমি। অরুন
জেটলি, বিজয় কুমার মালহোত্রা, বিজয়
গোয়েল, অনুরাগ ঠাকুর, অজয় মাকেন, অলোক শর্মা, অরবিন্দ সিং লাভলী প্রমুখ, নাম শেষ
হবেনা বলতে থাকলে।
আজকের বিজেপির পিতা
জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির রাজনৈতিক
জন্মও, কোলকাতা বিশ্ববিদ্যলয়ের ছাত্র রাজনীতির হাত ধরেই। সঙ্ঘচালক মোহন ভগবত, কে সুদর্শন, বিজেপির মুরলী মনোহর জোশি, সুব্রহ্মণ্যম স্বামী, অশ্বিনী কুমার চৌবে, গিরি রাজ সিং এর মত বিষাক্ত মালেরাও ছাত্র রাজনীতির
গলি থেকে এসেছিলো। আজকের উপরাষ্ট্রপতি রাধাকৃষ্ণণ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
অমিত শাহ, জেপি নাড্ডা, রাজনাথ সিং, নিতিন গডকড়ি, প্রকাশ জাভড়েকর, ধর্মেন্দ্র প্রধান, রাধা মোহন সিং এনারা তো আছেই। প্রাক্তনদের
মধ্যে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী, রাম জেঠমালানি,
প্রমোদ মহাজন, ভেঙ্কাইয়া নাইডু, কমলাপতি
ত্রিপাটি, হেমবতী নন্দন বহুগুনা তথা RSS এর মূল পাইপলাইন- ছাত্র
রাজনীতির মন্থন থেকেই উঠে এসেছে।
বামপন্থী রাজনীতির নেতৃত্ব
স্থানীয় ক্ষেত্রে ছাত্র রাজনীতির ভূমিকা প্রশ্নহীন। প্রকাশ করাত, সীতারাম ইয়েচুরি, বৃন্দা কারাত, বিমান বসু, শ্যামল চক্রবর্তী,
সুভাষ চক্রবর্তী, অনিল বিশ্বাস,
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, মোহাম্মদ সেলিম, সুজন চক্রবর্তী, গণশক্তি সম্পাদক শমিক লাহিড়ী, মইনুল হাসান বা সেদিনের বামনেতা তথা আজকের বিজেপির দিল্লি অফিস সামাল দেওয়া ব্রতীন
সেনগুপ্ত হয়ে আজকের মীনাক্ষী, শতরূপ, দীপ্সীতা, ঐশী কিম্বা তোলামূলের ঋতব্রত, দশটা বছর শুধু বসে বসে কাটিয়ে দেওয়া ব্যার্থ ছাত্র নেতৃত্বের প্রতীক- সৃজন ও প্রতীকুরও এসেছে
এই ছাত্র রাজনীতির সাপ্লাই লাইন থেকে। দেশজুড়ে হাজার হাজার এমন নাম রয়েছে।
দক্ষিণপন্থী
রাজনীতিতে প্রিয়রঞ্জন, সুব্রত, তাপস রায় থেকে অরূপ বিশ্বাস, এমনকি সোনালী গুহ
পর্যন্ত ছাত্র রাজনীতির ফসল। কেন্দ্রীয়
ভাবে পুরো অতিবাম ছাত্র রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা আজকের
দীপঙ্কর ভট্টাচার্য নিজেও ছাত্র রাজনীতির ফসল। দেশ উত্তাল
করে দেওয়া বাম ছাত্র সংগঠনের হয়ে ‘আজাদি’ স্লোগান দেওয়া, সদ্য কংগ্রেসী কানাইয়া কুমারকে
আমরা কে ভুলতে পারি! বাঙালি খেদাও আন্দোলনের
নামে গুয়াহাটি ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস থেকেই প্রফুল্ল মহন্ত, ভূগু ফুকানেরা আবিষ্কৃত হয়েচছিল। সমুজ্জ্বল ভট্টাচার্যের
মত নাম, যারা আসাম রাজ্যের ভীত নড়িয়ে দিয়েছিল, তারাও ছাত্র রাজনীতি জাত সন্তান।
শাহবানু মামলা খ্যাত আরিফ মোহাম্মদ খান, রাজস্থানের অশোক গেহলত,
এমন কত নাম বলব!
শুধু উত্তর
ভারত নয়, দক্ষিণ ভারতীয় রাজনীতি যারা নিয়ন্ত্রণ করতেন
একসময়, তাদের বড় অংশের উত্থান ছাত্রনেতা হিসেবেই। কারুনানিধি, চন্দ্রবাবু নাইডু, চন্দ্রশেখর রাও, দেবগৌড়া,
সিদ্দেমাইয়া, অনন্ত কুমার হেগড়ে প্রমুখ। সুপ্রিম কোর্টের বিখ্যাত আইনজীবীদের তালিকায় যদি
চোখ বুলানো যায়, দেখা যাবে কপিল সিবাল, অভিষেক মনু সিংভি, পি চিদাম্বরম, কিরণ রিজিজু, প্রশান্ত ভূষণ,
ইন্দিরা জয়সিং, রবিশঙ্কর প্রসাদ এমনকি দেশের চিফ
জাস্টিস রামান্না, জাস্টিস অরবিন্দ কুমার এর মত মানুষেরাও স্বমহিমাতে ছাত্র রাজনীতি
করেও নিজ নিজ পেশাতে সফল। অভিনয় জগতে সাই পল্লবী বা সুশান্ত সিং রাজপুতের নাম অনেকেই
জানে সফল ছাত্রনেতা/নেত্রী হিসাবে, এটাও জেনে রাখুন- শাহরুখ খানও নিজ কলেজ জীবনে চুটিয়ে
ক্যাম্পাস পলিটিক্স করেছেন।
পৃথিবীর
সবচেয়ে বড় গনতান্ত্রিক দেশের একটি অঙ্গরাজ্যে ছাত্র রাজনীতি বলে আজ কিছুই সেভাবে অবশিষ্ট নেই। এক কথায় বলা যেতে পারে পশ্চিমবঙ্গের ছাত্রনীতির ধারাটি আক্ষরিক
অর্থে ‘খুন’ করে, আগামী প্রজন্মের জন্য
একটি বন্ধ্যা, মূর্খ, মেরুদণ্ডহীন, দুর্নীতিগ্রস্ত, চলশক্তিহীন নেতৃত্বের পথ সুগম করে
দিয়েছে মমতা ব্যানার্জি। অথচ স্বাধীনতা আন্দোলনে এই বাংলার কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়
গুলোই সবচেয়ে বেশী স্বাধীনতা সংগ্রামী দিয়েছিলো দেশমাতৃকাকে। বর্তমান
উচ্চ শিক্ষাঙ্গন গুলো ক্রমশ শাসক দলের ছত্রছায়ায় পালিত, ছাত্র
নামধারী কিছু সন্ত্রাসীর অভয়ারন্যে পরিনত হয়েছে। চুরি
এদের মূল ভিত্তি হলেও খুন, ধর্ষন থেকে শুরু করে এমন কোন অপরাধ নেই, যা এই সন্ত্রাসীরা করে না।
শিক্ষাঙ্গনকে রাজনীতিমুক্ত
করতে গিয়ে আজ ছাত্ররাই সমাজচ্যুত একঘরে হয়ে গিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করা এই
বীর পুঙ্গবেরা যখন চাকরি বা কর্মংস্থানের দিকে তাকাচ্ছে, সেখানে
ধু ধু মরুভূমি। তাদের ন্যায্য চাকরি লক্ষ লক্ষ টাকায় বিক্রি হচ্ছে দলদাস অযোগ্যদের
কাছে, কর্মফল কাউকে ক্ষমা করেনা। এই প্রজন্মের সকল শিক্ষিত ‘অরাজনৈতিক’
আবেদন-নিবেদন, আহাজারি নিষ্ফল
হয়ে যাচ্ছে শাসকের পোশাকধারী রাষ্ট্রশক্তির নৃশংসতা, আক্রমণকারীদের বর্বরতার মুখে। শাসক তার সর্বশক্তি দিয়ে রাজনৈতিকভাবে অশিক্ষিতদের ওপর ঝাঁপিয়ে পরলে,
তারা দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে অনভিজ্ঞতার কারনে। কর্পোরেট হাঙরেরা
আজ শ্রমকোড লঙ্ঘন করে ১২ ঘন্টার গাধার খাটুনি খাটিয়ে নিচ্ছে দাসত্বের টাই বেঁধে দিয়ে।
অরাজনৈতিক বাপ-মা আক্ষেপ করে বলছে “রাজনীতি বড়ই নোংরা, সৎ মানুষেরা দূরে সরে গেছে, আর দুর্নীতিবাজরা
জায়গা করে নিয়েছে।” তাদের বলি- আপনার ছেলেটিকে রাজনৈতিক শিক্ষা দিয়েছিলেন তার
শিক্ষানবীশ কালে!
রাজনৈতিক বোধহীন এই
যুবসমাজ রাজ্যের দুর্নীতিবাজ আইনরক্ষক, চোরের সরকার ও তার পুলিশ প্রশাসনের সামনে
কীভাবে দাঁড়াবে! কোন ভাষাতে রাষ্ট্রের কাছে
জবাব চাইবে, সেটাই তো জানেনা। ছাত্রদের হাতে শুধুই বই আর কলম রয়ে গেছে, সেগুলোকে কিভাবে অস্ত্র
হিসাবে ব্যবহার করতে হয় তা তারা কখনও শেখেনি। যুক্তি আর তর্ক
যে আগ্নেয়াস্ত্রর চেয়েও শক্তিশালী, সেই
প্রকৌশল কীভাবে আর কোথায় শিখবে? পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে কেউ ছাত্র রাজনীতি করেছে
শুনলেই মনে ভেসে উঠে একজন মেধাবীর মুখ। বিজ্ঞান,
গনিত, ইতিহাস,
অর্থনীতি, সমাজবিদ্যা, আইন বিষয়ে
জ্ঞানবান, সচেতন, নিষ্ঠাবান কটা তরুণ বা তরুণী ছবি আজকে
বাংলার যুব রাজনীতিতে রয়েছে বলতে পারেন? আজকে যুব দলের কেউ মানেই-
সে নির্ঘাত গরু, শুয়োর, মন্দির মসজিদ এর পক্ষে বা বিপক্ষে বলে
জনপ্রিয়তা পেয়েছে। যার গোটা অবয়ব জুড়ে মেধাহীনতা,
পাঠশূন্যতা, তোলাবাজের সাথে আপস করার চেহারা।
নিজের মতো
করে জীবিকা খুঁজে নিতে গেলেও রাজনৈতিক বোধ প্রয়োজন। যেহেতু
ছাত্রাবস্থায় নৈতিকতা শিখছেনা, তাই আয় বাড়াতে, সংসার বাঁচাতে, সস্তার চুরি বিদ্যা শিখে
নিচ্ছে দ্রুত। সুস্থতার স্বপ্নকে হত্যা করেছে
জটিল, কুটিল ও নিষ্ঠুর শাসক দলের বর্তমান অনাদর্শের পাঁকে- চোর হলে তোমার সব কিছু মাফ।
ছাত্ররাজনীতির বদলে এই দিশাহীন আদর্শহীনতা, সমাজকে ফোকলা বানিয়ে দিয়েছে ভিতর
থেকে, প্রতিবাদের ভাষাকেই নেই করে দিয়েছে।
বর্তমান বিরোধী দলগুলোও
কম দায়ী নয়, তাদের যারা শীর্ষ নেতৃত্বে রয়েছেন তাদের প্রায় সকলেই ছাত্র রাজনীতির ফসল।
অথচ এই স্লো পয়জনিংটাকে সেভাবে ধরতেই পারেনি, তাই গুরুত্বও দেয়নি। এটা চরম ব্যার্থতা,
যার ফলে বিরোধী রাজনীতির পরিসর একটা বন্ধ্যা সমাজে পরিনত হয়েছে। যেখানে আধুনিক বিজ্ঞান,
গনিত, অর্থনীতি, আইনজ্ঞ সহ বিবিধ ধারায় শিক্ষিত নব প্রজন্মের স্রোত নেই। শাসক ক্ষমতার
গদিতে টিকে থাকতে সকল ধরণের অপচেষ্টা করবেই, বিশেষ করে ডানপন্থী ভাবধারার সেই রাজনৈতিক
দল- যারা ধর্মীয় বিভেদের মাঝে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করে। তাই, অভিভাবকদের পাশাপাশি
বিরোধীরাও সমানভাবে দোষী আজকের পরিস্থিতির জন্য।
এই শাসক দলেরও একদিন
পতন হবে। সেদিন এদের হয়ে পতাকা ধরার কেউ থাকবেনা, কারন পরবর্তী শিক্ষিত রাজনৈতিক প্রজন্মের
যে আতুঁড়ঘর, যেখানে মমতা ব্যানার্জী নিজে জন্মেছিল- সেই কলেজ রাজনীতিকে নিজে হাতে শেষ
করে দিয়েছে একদা ছাত্র রাজনীতির পরিপুষ্ট ফসল।
যতদিননা আবার নতুন করে
রাজনীতির ধাত্রীভূমিকে সংস্কার করে আবার একটা সুস্থ পরিমণ্ডল ফিরিয়ে দেওয়া যাবে, ততদিন
অশিক্ষিত চোরেদের অধীনেই শাসিত হতে হবে। ততদিন হবু শিক্ষকেরা রাস্তায় শুয়ে থাকবে, ততদিন
বর্তমান চাকুরিজীবীরা অমেরুদন্ডীদের মত চার হাতপায়ে হেঁটে DA এর জন্য মিনমিন করে ভিক্ষা
চাইবে, আর পুলিশের হাতে মার খাবে। ততদিন একটা
হিংসার ঘটনা চাপা দিতে নতুন হিংসার জন্ম দেবে। আরো একটা বড় ঘৃণা দিয়ে
পুরাতন ঘৃণার পাপকে ধামাচাপা দেবে। দুর্নীতি আর অশিক্ষার পাঁকে
জন্মানো রাজনীতির প্রজন্ম- ঘৃণার চাষ ছাড়া আর করবেই বা কী! কু-যুক্তিই অবোধের হাতিয়ার।
আন্দোলন একটা ধারাবাহিক অভ্যাস, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দাবী তারই অঙ্গ। কলেজ
রাজনীতিই প্রথম মিছিলে হাঁটতে শেখায়, স্লোগান দিতে শেখায়। বর্তমান প্রজন্মের প্রায়
কেউই তাই রাস্তায় নামাতে জানেনা। লক্ষ লক্ষ জ্বলন্ত ইস্যু থাকা
সত্বেও বিরোধীরা পঞ্জিকা দেখে তিথি নক্ষত্র মিলিয়ে রাস্তায় নামে। শাসক দলের নেত্রী
‘আমরা সবাই চোর’ প্ল্যাকার্ড লাগালে যুব অনুগামীরা সেটাই অন্ধের মত প্রশ্নহীন অনুসরন
করে, বিজেপির ছাত্ররা ‘চেঁচায় মাতা’ স্লোগান তোলে, IT সেলের লিখে দেওয়া দু লাইনে- সবাই
বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্র হয়ে যায়। এটাই তো দৈন্যতা, শিক্ষাহীন রাজনীতির দুরবস্থা। বেঁচে থাকার নাম গণতন্ত্র নয়, মানবাধিকার রক্ষার পদ্ধতিটা অবিচ্ছিন্ন
একটা অভ্যাস।
দিশাহীন GenZ আর ছাত্র
রাজনীতির মন্থনে জন্মানো কোনো ব্যাক্তি এক নয়। চেয়ার, হাঁস, ব্রা কিম্বা বন্দুক হাতে
সংসদে ঢুকে যাওয়াটা গণতন্ত্রের ছবি নয়, এটাই আজকের তথাকতথিত GenZ আর ছাত্রনেতাদের মাঝের
ফারাক। মুজরা আর শাস্ত্রীয় নৃত্যর মাঝে দৃশ্যত ফারাক থাকবেই।
যেদিন
রাজ্যে ছাত্র রাজনীতি স্বমহিমাতে ফিরবে, সেদিন রাজপথের অবরোধ আন্দোলন নতুন
পরিচয় পাবে। গত এক দশক ধরে লাখ লাখ অরাজনৈতিক শিক্ষিত ছাত্র বেরিয়েছে কলেজ ইউনিভার্সিটি
থেকে, তাতে জাতির কোন লাভটা হয়েছে? কেউ পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে ভিনরাজ্যে পরে আছে, বাকিরা
কেউ ডেলিভারি বয়, কেউ টিউশুনি খুঁজছে, আর কেউ ঘরে বসে বেকারত্ব উপভোগ করছে সোস্যালমিডিয়াতে। ইতিহাস সাক্ষী, শান্তি মিছিল কখনও শান্তি ফেরায়নি। ছাত্রদের
জঙ্গি আন্দোলন শাসকের ঘুম হারাম করে দেয়। তাই সে ছাত্র রাজনীতিকে সে ঘৃণা করে, উচ্ছেদ
করতে চায়। ছাত্রকে সত্যিই জাতির মেরুদন্ড হতে গেলে কলেজে কলেজে রাজনীতির পাঠ ফেরাতেই হবে। রাজনীতিকে
শিক্ষিত করতে হবে, নতুবা ধুর্ত শাসকের দয়ার পাত্র হয়ে আজীবন ভিক্ষাই করতে হবে।