রবিবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৫

অর্থনীতি ও যৌনতা


  

(১)

এই প্রবন্ধটিতে আমরা এমন একটি বিষয়ের আলোচনা করব, যার দ্যোতনা আমাদের দৈনন্দিন দৃষ্টিভঙ্গিতে সচরাচর এড়িয়ে যায়ভাবনাগত দৃষ্টিবিভ্রমের দরুন বিষয়টি নিয়ে সেভাবে কোনো স্পষ্ট ধারনা আমাদের মাঝে নেই। এটা এমন একটা জটিল ও বহুমুখী সাবজেক্ট যেখানে ধান ভানতে শিবের গীত’ এর মত বহুজাতীয় বিষয়গুলো আপনার থেকেই চলে আসে, নতুবা বিষয়ের ব্যাপ্তিকে এই স্বল্প পরিসরে ধরাই যাবেনা। প্রায় সকল কবি, সাহিত্যিক, সমালোচক, বুদ্ধিজীবীরা যৌনতাকে ফ্যান্টাসাইজ, রোমান্টিসাইজ করে গেছে। স্যুররিয়ালিস্টদের কলমে তুলিতে আঁকা পরাবাস্তব কল্পনার ছবি, গল্পের আড়ালে- যৌনতা ও তাকে কেন্দ্র করে চলা ফল্গুধারার অর্থনীতিকে কেউ কখনও দেখার বা ভাবার যোগ্যই মনে করেনি।

মানুষ যা নিয়ে ফ্যান্টাসাইজ করেনা তার উপরে কখনও আর্থিক লগ্নি করেনা, ফলে অর্থনীতির সাথে তার কোনো সম্পর্ক তৈরি হয়না। যৌনতার চেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তিয় কর্ম হচ্ছে পায়খানা করা বা চালু ভাষায় হাগা, যেহেতু সকলেই হাগে তাই ফ্যান্টাসিজম নেই, এর সঙ্গে কোন অর্থনীতিরও সেভাবে যোগাযোগ নেই। যা কিছু সলভ ও সস্তা, যা সকলের কাছে রয়েছে তা নিয়ে ফ্যান্টাসাইজ করিনা আমরা। রাস্তায় পরে থাকা গু দেখে আমরা বলতে পারবনা সেটা হিন্দুর না মুসলমানের, আমেরিকান নাকি চাইনিসদের। আমরা বিরিয়ানি, পোলাও খেলে সোস্যালমিডিয়াতে তার ছবি দিই, সাদা ভাতের দিইনা, কারণ সাদা ভাত সকলের খায় ও ছবিতে আলাদা ভাবে বোঝা যায়না- চালটা মিনিকেট নাকি লালস্বর্ণ চাল। ফ্যান্টাসি তৈরি না হলে ঐচ্ছিক এমন কোন বিষয়ে অর্থনীতি ঢোকে না, তা যতই প্রাণদায়ী হোকনা কেন। বাতাসকে আমরা দেখতে পাই না বলে, তাকে নিয়ে ততটা ফ্যান্টাসি পালন করি না, যতটা না চাঁদকে নিয়ে করি; অথচ চাঁদ অনেক দূরে আর বাতাসে ঘেরা অবস্থায় আমরা বেঁচে থাকি।

আমাদের ভারত উপমহাদেশে চামড়ার রং নিয়ে ফ্যান্টাসাইজ করি। অথচ ইউরোপ আমেরিকায় মত সাদা চামড়ার দেশে চামড়ার রঙ তাদের কাছে ফ্যান্টাসাইজের বিষয়ই নয়, কারণ তারা সবাই সাদা। আমাদের দেশে চামড়া সাদা জন্য ক্রিম ইন্ডাস্ট্রি, বিউটি পার্লার গড়ে উঠেছে, আপনি ইউরোপ বা আমেরিকায় ফেয়ার এন্ড লাভলী বিক্রি করতে পারবেন?  কিংবা আফ্রিকার কালো চামড়ার দেশে ফেয়ারনেস ক্রিমের কোনো বাজার আছে? পশ্চিমা সভত্যাতে যৌনতা অনেক বেশী খুল্লমখুল্লা, যেখানে যৌনতা কেন্দ্রিক বাজারের সংজ্ঞা আলাদা। আবার আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশ সহ এশিয়ার প্রায় প্রতিটা দেশই যৌনতা নিয়ে আমরা চুড়ান্ত রকমের ফ্যান্টাসাইজ করি, সেহেতু এটাকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিটাও গোপনেই গড়ে উঠে। যেহেতু এমন কোনো বিষয় কখনও পড়ানো হয়নি, তাই চোখে দেখেও দেখিনা।

প্রতিটা অর্থনীতি গড়ে উঠে নির্দিষ্ট কারনের পরিপ্রেক্ষিতে। যৌনতা নিয়ে ফ্যান্টাসাইট করার মতন আমাদের মুখ্য কারণ হচ্ছে দুটো বিপরীত আলাদা আলাদা লিঙ্গ, যা একে অন্যকে চুম্বকের মত আকর্ষণ করে। ফ্যান্টাসিজম নির্ভর করে- যা আমার কাছে নেই, অথচ অন্যের আছে, এটার উপর ভিত্তি করে। সমতলের লোক পাহাড়ে যেতে পছন্দ করে, ওদিকে পাহাড়ের বাসিন্দা সমুদ্র নিয়ে ফ্যান্টাসি করে। দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রতিটা ক্ষেত্রে আর্থিক মুনাফার যোগ আছে, সুতরাং যৌনতা শুধুই একটা জৈবিক চাহিদা বলে ‘অযৌক্তিক জুগুপ্সা’র মত উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের তৃতীয় বিশ্বে যৌনতা কেন্দ্রিক অর্থনীতি যতটা পরিসরে বিস্তৃত, পশ্চিমা দুনিয়াতে তার অর্ধেকও নেই। যৌনতা ততক্ষণ তীব্র আকর্ষনীয়, যতক্ষণ তাকে রেখেঢেকে প্রকাশ্যে আনা হয়। পশ্চিমা শৃঙ্খলাহীন খুল্লমখুল্লা যৌনতার কল্যাণে ‘আবিষ্কার’ করা কিম্বা চরম প্রাপ্তি বিষয়টাই নেই। আমাদের নিরিখে এই আগ্রহ হীনতা- তাদের সামাজিক অর্থনীতিতেও যে প্রভাব ফেলবে, সেটাতে প্রমানের কিছু নেই।

যৌন অর্থনীতি নামে কোনো সাবজেক্টের অস্তিত্ব আজকের তারিখ অবধি পৃথিবীতে নেই। কিন্তু এটা এমন একটা অদ্ভুত বিষয়, যা না থেকেও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে। আমাদের সমাজে যৌনতা হল বিবর্তনীয় এবং সামাজিক মনোবিজ্ঞানের একটি বিতর্কিত বিষয়। যৌন মিলনের আচরণকে বিশ্লেষণ করার কোনো অর্থনৈতিক মানদণ্ড নেই। ধর্ম, জাতি, স্থান ,কাল পাত্র ভেদে আমাদের সামাজ বহুধাবিভক্ত, যেখানে কোনো সুস্পষ্ট ও নির্দিষ্ট যৌন নীতি নেই। প্রত্যেকের নিজশ্ব যুক্তি রয়েছে, যার কোনটা মুক্ত যৌনতার পক্ষে সাওয়াল করে, কোনটা স্টিরিওটাইপ ঐতিহ্যবাহী আন্তঃসাংস্কৃতিক বৈধতার উপরে ভিত্তি করে বানানো।

আজকের এই ডিজিটার যুগে পুঁজিবাদ আমাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ক্ষেত্রগুলোর অন্যতম- যৌনতাকে পণ্য বানিয়ে ফেলেছে। সোশ্যাল ইনঞ্জিয়ারিং এবং বিভিন্ন সফটওয়্যার টুলকিট, কুকি ব্যবহার করে, তথ্য যোগার ও তার বিশ্লেষণের মাধ্যমে- আমাদের আবেগ, প্রেম জীবন, যৌনতাকে পুঁজি বানিয়ে নিয়েছে। অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ ব্যাতিত একে যখন সাধারণ মানুষ দেখে, খুব অদ্ভুত আর বোকা বোকা লাগে। কিন্তু আপনি যদি পুঁজিবাদকে মানদণ্ড রেখে বোঝার প্রচেষ্টা করেন, তাহলে দেখবেন এরা জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি সব জাইগা থেকে মুনাফা বের করে আনেসুতরাং যৌনতা কেন্দ্রিক প্রতিটা প্রতিষ্ঠান, যেমন প্রেম, ভালবাসা, ডেটিং, বিবাহ, গণিকালয় এমন সকল ক্ষেত্রের একটা অর্থনৈতিক মুনাফার দৃষ্টিকোন রয়েছে, বাজার আপনাকে মনে করিয়ে দেয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেমূলধারার বাজার অর্থনীতির যে সরল দৃষ্টিভঙ্গি, তার চেয়ে এটা আমূল আলাদা।

নারী পুরুষের থেকে শারীরিকভাবে দুর্বল, তাই তাকে যৌন শাসন ও শোষণ দুটোই করা যায় নারী শরীরকে ভোগ্য বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হয়, আর্থিক কারনে যে ‘পছন্দসই’ যৌনতাকে সুলভে কিনতে পারেনা, তারা অধিকাংশই ধর্ষকামী হয়ে উঠে। বর্তমানে নারীদেহ বাজারের পণ্যে রূপান্তরিত হয়েছে ফ্যাশন, বিনোদন, বিজ্ঞাপন, বা সরাসরি যৌন বাণিজ্যের মাধ্যমে। ফলে শরীরের উপর অর্থনৈতিক চাহিদা তৈরি হয়েছে, আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের হিংস্র শোষণের এটা একটা প্রতীকী ছবি মাত্র।

যৌনতা সম্পর্কিত প্রতিটা সহিংসতা ও বলপ্রয়োগ, যেমন- ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, যৌন হয়রানি, গুন্ডামি, যৌন শোষণ ও দাসত্ব, যৌন শোষণের উদ্দেশ্যে পাচার, কুমারীত্ব পরীক্ষা, অনুভূত যৌন অনুশীলন, যৌন অভিমুখীতা, লিঙ্গ পরিচয় এবং অভিব্যক্তি, পছন্দসই শারীরিক বৈচিত্র্যের অনুপস্থিতি জনিত সকল সহিংসতার প্রশ্নে, প্রায় ১০০% ক্ষেত্রে আর্থিক বিষয়টাই পরিনাম নির্ধারন করে দেয়। যারা বেহিসাবি অর্থের মালিক, অধিকাংশ অত্যাচারি তাদের মধ্যে থেকে আসে; আবার যারা দরিদ্র, আর্থিকভাবে নিম্নবৃত্তের তারা শোষিতের দলে থাকে। এখানে সামাজিক পরিচয়, সৌন্দর্য, শিক্ষা কোনো কাজে আসেনা।

কেউ যখন কোন দেশ দখল করছে, সেটা তার অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করার জন্যই করে, দখলকৃত দেশের অর্থ সম্পদ লুট করে। আগেকার দিনে যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে সোনাদানা অর্থসম্পদের প্রাপ্তির পাশাপাশি, যুবতী মহিলাদের সম্পদ হিসাবেই লুঠ করা হতো। নারীর যৌনতা না থাকলে কে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য অর্থ ও সময়ের অপচয় করত! সারা পৃথিবীর যুদ্ধ ও সংঘাতের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, নারীর শরীরকে প্রায়শই একটি প্রতীকী যুদ্ধক্ষেত্রে হিসাবে প্রতিকৃতি করা আছে। প্রতিপক্ষের ভূমি দখলের পাশাপাশি তাদের নারীদের শরীর ‘দখল’ করাকে বিজয়ের চূড়ান্ত স্মারক হিসেবে দেখা হয়। ধর্ষণ শুধুমাত্র একজন সেনা বা সেটলারের বিকৃত যৌন আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ নয়। এটি একটি বহুস্তরীয় বার্তা বহন করে- ক্ষমতার বার্তা, অপমানের বার্তা, দখলের বার্তা, এবং সবচেয়ে বড় হলো তাদের উপরে আর্থিক প্রভুত্বের বার্তা।

যৌনতা মানব জীবনের একটি কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য, যা লিঙ্গ পরিচয়, যৌন অভিমুখীতা, কামোত্তেজকতা, আনন্দ, ঘনিষ্ঠতা এবং প্রজননকে প্রবাহিত করে। মানবের চিন্তাভাবনা, কল্পনা, আকাঙ্ক্ষা, বিশ্বাস, মনোভাব, মূল্যবোধ, আচরণ, অনুশীলন এবং এগুলোর ভূমিকা- যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে স্বরূপে প্রকাশিত হয়। যৌনতা যখন আনন্দের বহিঃপ্রকাশ, মানসিক সুস্থতার অন্যতম উৎস, মানসিক ও শারীরিক পরিপূর্ণতা তৃপ্তির কারন, সেখানে অর্থনীতিকে আসতেই হবে; কারন আনন্দ, অসুস্থতা ও তৃপ্তির সাথে আর্থিক যোগ সরাসরি। যৌনতা জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, আইনি, ঐতিহাসিক, ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক, এমন প্রতিটা বিষয়গুলোর সাথে মিথস্ক্রিয়া করে সমাজে কর্তৃত্ব জাহির করে, সেখানে অর্থনৈতিক ভাবে তার প্রভাব থাকবেনা, এটা হতে পারে?

 

(২)

যৌনতা, প্রতিটা প্রাণেরই আগামীকে সৃষ্টির জন্য একে প্রয়োজন। প্রত্যেকের যৌনতার নিজ নিজ নিয়ম আছে, কিন্তু খুব কম প্রানই এমন আছে যাদের যৌনতা প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সারাবছর ধরে 24x7 যে কোনো সময় চলতে পারে। প্রাইমেট বর্গের প্রাণীদের মধ্যে বেবুন, রিলা, ম্যাকাক, শিম্পাঞ্জি, ওরাং ওটাং ও এদের মত স্বজাতীয়দের মধ্যে সারাবছর যৌনতা লক্ষ্য করা যায় বটে, এরাও যৌন সঙ্গমকে আনন্দ ও সুখ দায়ক হিসাবে নেয়, যৌনতার মাধ্যমে আত্মিক পরিতৃপ্তি বা ‘প্লেজার’ পেয়ে থাকে। গবেষকদের মতে, সিংহরা অতি অল্প সময়ের মধ্যে বহুবার সঙ্গম করে, এই কারনে সারা বছর ধরে তাদের প্রজনন, আর সন্তানকে জন্মাতে দেখার সুখেই হয় যৌনতাকে আনন্দদায়ক মনে করে।

এছাড়া পুরুষ ডলফিন, সামুদ্রিক পুরুষ ভোঁদড়, কিছু প্রজাতির ইঁদুর যেন বেঁচেই থাকে যৌন মিলনের জন্য। পুরুষ মৌমাছি নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও যৌনতায় লিপ্ত হয়। প্যাসিফিক স্যামন মাছ ও গভীর সমুদ্রের অক্টোপাস- এরা প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া থেকে মৃত্যুর আগের মুহুর্ত অবধি উন্মাদের মত, যখন তখন তাদের মত করে যৌনতাতে লিপ্ত হয়। এদের সমাজে হারেম অবধি দেখা যায়। প্রানী জগতে এদের বাইরে প্রায় সকলেই শুধুমাত্র প্রজননের তাগিদে বছরের একটা নির্দিষ্ট ঋতুতে যৌন সঙ্গম করে। পৃথিবীতে পান্ডাই সবচেয়ে কম যৌন আকাঙ্ক্ষা সম্পন্ন প্রাণী, এরা ছাড়া আর এমন কোনো প্রানী নেই যারা নির্দিষ্ট ঋতুতে বছরে কেবল মাত্র একদিন, একবারই যৌনমিলন করে। পাশাপাশি হ্যামস্টার নামের এক জীব আছে যাদের গড় আয়ু মোটামুটি ৩ বছরের আশেপাশে, এরই মধ্যেই কয়েকলক্ষ বার তারা যৌন সঙ্গম করে, মানে দিনে গড়ে ১০০ বার।

তবে যৌনতাতে সবাইকে ছাপিয়ে যায় স্ত্রী সিংহ, বিজ্ঞানীদের মতে স্ত্রী সিংহই পৃথিবীর সবচেয়ে কামুক প্রানী। শাবকদের দুধ ছাড়ার সাথে সাথেই সে আবার বুভুক্ষু যৌনতায় আগ্রহী হয়ে ওঠে, দলের প্রতিটি পুরুষ সিংহের কাছে নির্লজ্জভাবে প্রেম নিবেদন, আলিঙ্গন ও সঙ্গম করে। বেপাড়ার রসিক কোনো ‘পরপুরুষ’কে পেলে, তাকেও ছাড়েনা। এই ধরণের স্ত্রী সিংহ গুলো প্রতি ৩ দিনে ৩০০ বারেরও বেশী যৌন সঙ্গমে- আলাদা আলাদা পুরুষের সাথে মিলিত হয়। পুরুষ সিংহের উপরে শুয়ে পরা, সামনে অকারনে হেলেদুলে চলা, তীক্ষ ক্যানাইনের জান্তব হাসি সহ মন্দ মন্দ তালে নাচা ও বিচিত্র মনোরঞ্জক ক্যাটওয়াক করা, পুরুষের মুখের সামনে গিয়ে পশ্চাদদেশের ফেরোমন শোঁকানো, পুরুষের পাছায় থাবা দিয়ে চাঁটি মারা, কেশরে বিলি কেটে উত্তেজিত করা, ঘাড়ের কাছে আদুরে কামড় দেওয়া, নাক, মুখ ঠোঁট চেটে দেওয়া, মাথার চারপাশে তার লেজ জড়িয়ে রাখা, ক্রমাগত একটানা মিহি সুরে কান্নাকাটি করা, এমনকি এসবেও কাজ না হলে পুরুষ সিংহের অণ্ডকোষে কামড়ে অবধি দেয় এরা

আজকের আলাপটা প্রাণীদের যৌনতা শীর্ষক নয়, বরং মানুষের যৌনতা ও তাকে কেন্দ্র করে গড়া অর্থনীতি নিয়ে। মানুষ একমাত্র প্রাণী যারা সবচেয়ে বেশী ফ্যান্টাসাইজ ও রোমান্টিসাইজ করে যৌনতাকে। মানুষ কল্পনায় যৌন সুখ পেতে হস্তমৈথুন করে তৃপ্তি নেয়। এমনকি ধর্ম ভেদে কোথাও অপ্সরা তো কোথাও হুর প্রাপ্তিকে- ইহজগতে সর্বোচ্চ পূন্যার্জনের মাত্রা হিসাবে গন্য করা হয়। পৃথিবীর আর কোনো প্রানীর মধ্যে হস্তমৈথুন বা হুর/অপ্সরা প্রাপ্তির জন্য, ধর্মপালনের নামে ভবিষ্যতের জন্য প্লেজার বা পরিতৃপ্তি সঞ্চয়ের কোনো নজির নেই। যৌনতাকে আনুষ্ঠানিক রূপদানের জন্য ‘বিবাহ’ নামে একটা কমপ্লিট উৎসব আয়োজনের প্যাকেজ রাখা রয়েছে, প্রতিটা সমাজে নিজ নিজ স্টাইলে। কবিতা, গান, সিনেমা, সমালোচনা, হানাহানি, খুন জখম কি না হয় কাঙ্খিত যৌনতাকে ছোঁয়ার জন্য। তাই মানুষের যৌনতার অনুরূপ ও আনুষাঙ্গিক কর্মকান্ড পৃথিবীতে আর কোনো জীবসমাজে নেই।

মানুষের যৌন কল্পনা শুধুমাত্র আনন্দ অনুভব করা বা উত্তেজনা বৃদ্ধি করার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এগুলো বিভিন্ন আঙ্গিকে মনস্তাত্ত্বিক কাজ করে, অপূর্ণ চাহিদা পূরণে সহায়তা, সান্ত্বনা, অবসর বিলাস, এমনকি বিভ্রান্তি মুক্তির সহজ উৎস হিসাবে যৌনতাকে ব্যবহার করে। আমাদের সমাজে ‘কাঁচা’ গালিগালাজ গুলোও তীব্র যৌন গন্ধীময়। এখানে কোনটা অশ্লীল, যৌনতা নাকি গালিগালাজ সেই প্রশ্নের জবাবও কেউ কোনোদিন খুঁজেছে কী! সুতরাং, এই যৌনতাকে কেন্দ্র করে ব্যবসা গড়ে উঠবেনা তা কী করে হয়! শুধুমাত্র যৌনতার অনুসারী বিষয় গুলোকে কেন্দ্র করে দেশে দেশে শহরে গ্রামে, প্রতি দিন শত শত কোটি টাকার নানান ধরণের ব্যাবসা হয়।

যৌনতা হলো জীবের মৌলিক এবং সর্বজনীন অধিকার আন্তর্জাতিক পরিসরে বিশ্ব যৌনবিজ্ঞান কংগ্রেস’ নামের একটা মঞ্চে, ২০১৪ সালে একবারই আলোচনা উঠেছিলো অর্থনীতির সাথে যৌনতা কেন্দ্রিক ব্যবসার সমীকরণ সম্বন্ধীয়, এরপর অজানা কারনে এ নিয়ে কেউ উৎসাহ দেখায়নি আর। বাম মতাদর্শে যাদেরকে শ্রেনী নামে ডাকা হয়, তাদের মধ্যে যৌন শোষণ ও নিপীড়ন সবচেয়ে বেশী, তার সবচেয়ে বড় কারন আর্থিক দুরবস্থা, এদের কাছে বিনোদনের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্রই হলো বিছানা ও সহজলভ্য যৌনতা। তাই হয়ত এরিক হবসবম নামের এক ব্রিটিশ বামপন্থী লেখক, বিপ্লব ও যৌনতা’ নামের একটা লম্বা প্রবন্ধ লিখেছেন গত ষাটের দশকে। কখনও সময় সুযোগ হলে অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান জাত, মার্ক্সবাদী-ফ্রয়েডিয়ান লেখক উইলহেম রেইখ এর একটা বই পড়তে পারেন, যৌনতা বিষয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে বাধ্য। মাস সাইকোলোজি অব ফ্যাসিজম সিরিজের এক চমৎকার মনোজ্ঞ বিশ্লেষন হচ্ছে দি সেক্সুয়াল ইকোনোমি অব পলিটিক্যাল রিয়েকশন অ্যান্ড প্রলেতারিয়ান সেক্সুয়াল পলিসি’ অধ্যয়টা, এগুলো নিয়ে আমাদের সমাজে কখনও আলোচনাই করা হয়না, কারন যৌনতাকে নিষিদ্ধ হিসাবে কুলুঙ্গিতে তুলে রেখে দেওয়া হয়ে, গোপনে দুর্নীতির জন্য। যেদিন দেখতে শিখবেন ‘সর্বহারার’ যৌনতাও কেমন ভাবে নেই করে দেওয়া হয়, আর্থিক শোষণের মাধ্যমে; তখন আপনার ভাবনারা সেই ঘুরেফিরে অর্থনীতির বৃত্তেই ঢুকে পরবে।

ধরুন একটা অতি ভালো গোবেচারা ও ভদ্র পুরুষ, সেও যৌন সঙ্গম করে। একটি চাঁদপানা লক্ষীমন্ত মিষ্টি মেয়ে তারও যৌন জৈবিক চাহিদা সে নিজের স্টাইলে মিটিয়ে নেয়। প্রাকৃতিকভাবে আমাদের শরীর যন্ত্রের গঠনটাই এমন প্রোগ্রামে তৈরি, আপনার ইন্দ্রিয় আপনার কাছে তার ‘খোরাক’ দাবী করবেই। কামের প্রবৃত্তি নেশা পেয়ে বসলে তার নিবৃত্তি না করা অবধি আপনাকে মুক্তি দেবেনা আপনার রিপু। এখান থেকেই শুরু হয় যৌনতার অর্থকরী সফর। শুরুতেই যৌনকর্মীদের স্বতন্ত্র ভাবে উল্লেখ করলাম, মহিলা বেশ্যা বা পুরুষ জিগালো- সকল পেশাদার পতিতার রুটিরুটির একমাত্র উৎস যৌনতায় মোড়া শরীরকে পণ্য হিসাবে বিক্রি করা। এটা যৌনতা কেন্দ্রিক ক্রেতা বিক্রেতার প্রত্যক্ষ আর্থিক লেনদেন।

আমরা অনেকেই অর্থনীতি আর অর্থ এক মাত্রায় গুলিয়ে ফেলি। অর্থনীতি হলো সমাজের মধ্যে সম্পদের উৎপাদন, বিতরণ এবং সুষ্ঠু ব্যবহার সম্বন্ধিত বিস্তৃত অধ্যয়ন, এখানে সম্পদ বণ্টন এর সাথে সম্পর্কিত মানুষের আচরণ বিজ্ঞানের প্রেক্ষিতটাকে ধরা হয়, যার বৃত্তটা অনেক বড়। যেখানে অর্থ, (টাকা, ডলার, রুপি) হলো বিনিময়ের যন্ত্র মাত্র। অর্থনীতির বিতরণ অংশের একটি ছোট্ট ও নির্দিষ্ট হাতিয়ার, যা অর্থনৈতিক লেনদেনকে সহজতর করে। এই কারনেই, এক পেট খিদে নিয়ে বিহার উত্তরপ্রদেশের মেয়েগুলো যখন প্রায় পূর্ণ নগ্ন হয়ে সামনে গোলকরে ঘিরে বসা পুরুষগুলোর দিকে কুৎসিত ইঙ্গিত অঙ্গভঙ্গী করে, এটাকে অর্থের নিরিখে মেলাতে পারবেননা, অর্থনীতি দিয়ে প্রেক্ষিতটাকে ধরতে হবে। যে শরীরটা এখানে ২০০ টাকার বিনিময়ে যৌন উষ্ণতা বিলোচ্ছে, সে ই কোনো বড় শহরের নাইটক্লাব কিম্বা ডান্সবারে গেলে এর চেয়ে ১০ গুণ বেশী রোজগার করতে পারত। আপনি যেটাকে শালীনতা, লজ্জা, সভ্যতা বলছেন, অদ্ভুত পোশাক পরিহিতা মেয়েটির কাছে সবচেয়ে ঘৃন্য অশালীনতা হচ্ছে খিদে। এটাকে ব্যাখ্যা করতে গেলে সেই ফিরে যেতে হবে সম্পদের উৎপাদন, বিতরণ এবং সুষ্ঠু ব্যবহার, ও মানুষের আচরণ এর অধ্যয়নে।

কৈশোরের একটা পর্যায়ে আপনি রিপুর তাড়নাতে যৌন যাত্রা শুরু করবেনই করবেন। লাজুক হলে বুক ফাটলেও মুখ ফুটবেনা, সেক্ষেত্রে যতক্ষণনা ঘর থেকে এ্যারেঞ্জ ম্যারেজ করাচ্ছে, ততক্ষণ দাঁতে দাঁত চেপে অন্যের মিলনাত্মক গল্প দেখে ও শুনে, খালি বিছানাতে একাকী স্বয়ংসেবক হয়ে দিন কাটাতে হবে। যারা একটু সাহসী, তারা অন্বেষণে বেড় হয়; আর খেলুরে হলে অশ্বমেধের ঘোড়া ছোটায়। প্রেমের নিত্যতা সুত্র বলছে- প্রথমেই কয়েকজনের প্রতি ক্রাশ খেয়ে সিলেবাস শুরু হয়, তাদের মধ্যে থেকে বিশেষ কয়েক জনকে ভাললাগা শুরু হয়, এই ভাললাগা থেকেই ক্রমশ ভালবাসার জন্ম নেয়। পাড়াতে, পড়শিতে, দূরসম্পরর্কের আত্মীয়, ইস্কুলে, টিউশুনিতে, বাজারে, হাটে, পুকুরপাড়ে, পার্কে যেখানে খুশি ‘এই প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে’ আপনি ধরা খাবেনই খাবেন। এই দশায় দুটো অপসন- যাকে প্রেম নিবেদন করেছেন সে প্রত্যাখ্যান করল, সেক্ষেত্রে সকল কাহিনী আবার শুরু থেকে শুরু করতে হবে। আর সে রাজি হয়ে গেলে অর্থনীতিতে তখন দুজন মিলেই কন্ট্রিবিউট করা শুরু করে দেয়।

এই যুগে আবার অনলাইন সিস্টেমে সবচেয়ে বেশী প্রেম হয় হোয়াটশ্যাপ, ফেসবুক, টিন্ডার, ইন্সটাগ্রামের মত হরেক এ্যাপে। এই টেক জায়েন্ট কোম্পানির মালিক থেকে চাপরাশি, সকলেই করে খাচ্ছে পক্ষান্তরে ‘যৌনতা’র বাজার বসিয়ে। মোবাইল ফোন কোম্পানি গুলোর অর্ধেক ব্যবসার টার্গেট কাস্টমারই এই অল্পবয়সি ছেলেপুলের দল, যারা প্রেম করে বলে স্টাইলিস ফোন লাগে ও সেগুলো বদলাতেও হয় নিত্য নিত্য। সুতরাং, প্রেম হোক বা না হোক, অল্পবয়সী ছেলেপুলে ফোন আর ডেটা কেনেই বিপরীত লিঙ্গের ‘মাল’ খুঁজতে।

যারা সফলতা পেয়ে যায় তারা গান, কবিতা, কোটেশন পোষ্ট করে, রিল ভিডিও দেখে। যারা ছ্যাঁকা খায় বা প্রত্যাখ্যত হয়, তারাও বিষাদ সিন্ধু হয়ে বিরহের কবিতা, গান, রিল দেখে ও পোষ্ট করে। মোদ্দা কথা মোবাইল কোম্পানি গুলোর আয়ের বড় অংশ এই ‘প্রেম খোঁজার’ আড়ালে থাকা সুপ্ত যৌনতা। আজকের দিনে নাহয় ডেটা কিনলে কল ফ্রি, কিন্তু যখন টকটাইম কিনতে হতো, রাত রাত ধরে কত যে রিচার্য করতে হতো তার লেখাজোখা নেই। সারারাত এই প্রেমালাপের জন্য মোবাইল সার্ভিস প্রোভাইডার কোম্পানিগুলো কত যে সস্তার অফার বা স্কিম আনত তা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

শুরুর দিকে আমাদের প্রজন্মের লোকেরাই টাকা দিয়ে আলাদা করে SMS প্যাক কিনতাম। আজ হোয়াটস্যাপ চালাতে, ফোনে ফোনে প্রেম চালাতে, ইনকঙ্গিটো মোডে গুগুল ক্রোম চলাতে, ভিডিও কলে নিব্বা নিব্বি থেকে বুড়ো দামড়ার দলও ‘একবার দেখেই ডিলিট করে দেবো’ প্রতিশ্রুতির দায় মেটাতে- একমাত্র লাভবান এই ডেটা কোম্পানি গুলো। তারাও বিশাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার করে রেখেছে। বিপুল সংখ্যার কর্মীরা চাকরি করে এই ইন্ড্রাস্ট্রিতে, টাওয়ার মেইনটেনেন্স, কেবল বিছানো, কল সেন্টার চালানো, বিজ্ঞাপন সংস্থাকে দেওয়া টাকাতে সেই ইন্ড্রাস্ট্রিকে চালানো- এমন বহু লক্ষ কোটি মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয় ‘ফোন ও ডেটা’ জাত যৌনতার কারনে।

 

(৩)

টিকটক, রিলস আর শর্টস এর দুনিয়াতে সারাক্ষণ আধা ন্যাংটাদের নাচ দেখছে ৮ থেকে ৮০ বয়সের সকলে- এখানে যৌনতার পসরা সাজানো আছে রাশিরাশি। স্বয়ংসেবকদের জন্য হ্যামস্টারের দুনিয়াতে সানি-জনিদের হেডফোনওয়ালা ‘নিষিদ্ধ’ মুভির দৌলতে রমরমিয়ে একটা গোটা এডাল্ট ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি চলছে লক্ষ কোটি ডলারের। যার পুরো রোজগারটা আসে দৃশ্যমান রগরগে যৌনতাকে বিক্রি করেই। ডিল্ডো, পকেট স্ট্রোকার, ভাইব্রেটার সহ বিবিধ সেক্সটয় ইন্ড্রাস্ট্রিও রীতিমত লাভজনক ব্যবসা। আজকের দিনে কটা জিমে ছেলে মেয়েরা সুস্থ থাকার জন্য ওয়ার্কআউট করে! হট ও সেক্সি লুকের জন্যই অধিকাংশ ছেলেমেয়ে জিমে যায়। কতজন মহিলা চুল বা চামড়ার ট্রিটমেন্ট করাবার জন্য স্পা বা বিউটিপার্লারে যায়? যৌনতার বাজারে নিজেদের আরো আকর্ষনীয় করে তুলতেই এত আয়োজন। জিম আর বিউটিপার্লারের আয়ের অধিকাংশটাই গৌণ যৌনতা থেকে আসে।

আজকালকার প্রেম কিছুদিন গড়াতে না গড়াতেই ডেটিং এর পর্ব শুরু হয়ে যায়। ছেলে হোক বা মেয়ে, ডেটিং একটা বিশাল বড় মার্কেট গোটা দুনিয়া জুড়ে। গোপনে লুকিয়েই হোক বা প্রকাশ্যে সকলকে জানিয়ে, যৌবনকালে ডেটিং একটা পার্বণ বটে, একে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত স্তরে উত্তেজনা আর আকাঙ্ক্ষার সংমিশ্রণে- সাজসাজ রব উঠে যায়। এই পার্বণকে কেন্দ্র করে FMGC, ফ্যাশান ও পোশাক শিল্প বিপুল ভাবে নিজেদের লাভবান করে নেয়, সাথে রেস্টুরেন্ট সেক্টরেও অর্থের সঞ্চালনা বাড়ে। চকলেট, ফুলের বোকে, সফট ড্রিংক্স, সফট টয় এমন বহু মার্কেটের মুনাফাপ্রাপ্তি ঘটে। যাতায়াতকে কেন্দ্র করে ট্রান্সপোর্ট সেক্টর অবধি কামিয়ে নেয়, অথচ ওই দিন ছেলে-মেয়েটি ডেটিং এ না গিয়ে ঘরে শুয়ে ল্যাদ খেলে, এর একটা টাকাও খরচাও হতোনা। ভ্যালেন্টাইন ডে কিসের পরব! আমাদের ছোট বেলায় আমাদের দাদু-ঠাকুমা বা বাবা-মা কে কখনও বিবাহবার্ষিকী উদযাপন করতে দেখিনি, সবই কর্পোরেটের আমদানি। সবটাই গৌন যৌনতা কেন্দ্রিক ব্যাবসা।

এরপর সম্পর্ককে আরও মসলাদার ও রোমঞ্চের স্বাদ দিয়ে ‘ওয়ো’ জাতীয় হোটেলে গেলে সেই সেক্টারেও টাকার লেনদেন হয়। আরেকটু সাহসী হয়ে যদি আপনি দীঘা, মন্দারমনি বা দার্জিলিং এর দিকে হাঁটা দেন, পর্যটন শিল্পও তখন এই যৌন অর্থনীতির স্বাদ পায়। দীঘার মত পর্যটন স্থানগুলোর অধিকাংশ হোটেল টিকেই আছে ‘লুকিয়ে যৌনতা’ উদযাপন বিলাসীদের সৌজন্যে। অর্থাৎ একটা সামান্য ডেটিং অর্থনীতিতে রোজ বিপুল ভাবে আর্থিক লেনদেন ঘটাচ্ছেছেঁকা খাওয়া সন্টুমনাদের দৌলতে মদ, গাঁজা, চরস সিগারেটের শ্রীবৃদ্ধি তো টাটে গণেশ বসিয়ে দেয়। ডেটিং আসলে তো যৌনতারই নান্দীমুখ।

এরপর কামাই করে ফার্মাসিটিউক্যাল কোম্পানি গুলো। কন্ডোম থেকে শুরু করে কন্ট্রাসেপটিভ পিল, এমনকি মাথা ব্যাথার ওষুধ, ধরা খেয়ে যাওয়ার ভয় বা প্রেম সংক্রান্ত ডিপ্রেশনের কারনে হওয়া নানান রোগের ওষুধ বিক্রি হয়। ওদিকে জাপানি তেল, রকেট ক্যাপস হয়ে লুব্রিকেন্ট- কী কী না বিক্রি হয়। ঠোঁট ফোলানো, কিম্বা স্তন ও নিতম্বে সিলিকনের জেলি বসানো আজকাল আকছার হচ্ছে। এর সাথে আছে মেলানিন থেরাপি, কোলাজেন ট্রিটেমেন্ট- এগুলো সবই দিনের শেষে নিজেকে যৌন ভাবে আবেদনময় বা ময়ী দেখাবার জন্য। একেকটা থেরাপির সিটিং এ দেদার খরচা, সবই যৌনতাতে উৎসর্গ করে। মহিলারা সন্তান ধারন করলে সেটা জন্ম দেওয়ার প্রসেসে হোক বা এ্যাবোর্শন করার ঝক্কি- সর্বত্রই ডাক্তার আর নার্সিংহোম হাসপাতাল গুলোতে কাঁড়ি কাঁড়ি ঢেলে আসতে হয়। এরপর আছে অসুরক্ষিত বহুগামী যৌনতার কারনে হওয়া নানান রোগ ও তার চিকিৎসা। বিশ্বজুড়ে HIV/এইডস রোগের ফার্মা বাজেটের অঙ্ক দেখলে মাথা ঘুড়ে যাবে, এর সাথে সিফিলিস, গনোরিয়া, ক্ল্যামাইডিয়া, হারপিস, ট্রাইকোমোনিয়াসিস, জেনিটাল ওয়ার্টস জাতের মত যৌন রোগের কল্যাণে ফার্মা কোম্পানি গুলো রোজ ফুলেফেঁপে উঠছে।

বটতলার চটি হয়ে ডেবোনিয়ার পত্রিকা, কাগজের মোড়কে লুকানো নীল ছবির সিডি কি একসময় কম ব্যবসা দিয়েছে? কাঁটা লাগা গান অনেক পুরাতন, সেই গানে সেফালি জড়িওয়ালা শুধুমাত্র জিন্সের বাইরে থেকে দেখানো নীল অন্তর্বাস দেখিয়ে নেচে সেলিব্রিটি হয়ে গেলো। শিল্পকর্মে ন্যুড আর্ট সবচেয়ে বেশী দরে বিকোয়, সেটা মূর‍্যাল হো, পেইন্টিং হোক বা ভাস্কর্য। আজকের দিনে সিনেমাতে খুল্লমখুল্লা যৌনতা দেখানো মানেই হিট, হেলেন থেকে শুরু করে মালাইকা আরোরা, সানি লিওনি মল্লিকা শেরাওয়াত কিম্বা আজকের ‘সেক্স বম্ব’ তামান্না ভাটিয়ার বিপুল জনপ্রিয়তা ও অর্থের উৎস সেই এক ও অকৃত্রিম সুড়সুড়ি দেওয়া যৌনতা।

ট্রেনে, বাসে, টিভিতে, সোস্যালমিডিয়াতে, সর্বত্র বিভিন্ন যৌনতা বর্ধক ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, জড়িবুটির বিজ্ঞাপন। কেউ শিলাজিৎ বেচছে অশ্বগন্ধার আরকে চুবিয়ে, কেউ পাথর কবজ মাদুলি দিয়ে লিঙ্গ শিথিলতা, ধাতু তারল্য, ইন্দ্রিয় দুর্বলতা সারাবার প্রতিশ্রুতিপত্র বিলি করছে, কেউ কেউ নিজেই ডি কে লোধ। রাজনীতিতেও যৌনতাকে বিজ্ঞাপিত করা হয় নিজ নিজ স্বার্থে, কেউ কথাবাচক যোগীর মত নিজের যৌনতা ত্যাগ করার মত কঠিন রিপু দমন করে সে পূজনীয় হয়ে যাচ্ছে, কেউ পুকি বাবা তো রামদেব- যৌনতা ত্যাগের বিজ্ঞাপনের দৌলতেই কোটিপতি। কোনো দেশে কারো ৪০টা বালবাচ্চা, উচ্চমানের ফার্টাইল দম্পতি, সেই কারনেই তারা রাষ্ট্র ক্ষমতা পেয়েছে, বিপুল ধনসম্পদের মালিক। আজীবন অযৌনতার চর্চা করে মাদার টেরেসা সন্তে উন্নীত হচ্ছেন, তো কেউ আবার ভিকি ডোনার হয়ে কামাই করছে অধিক মাত্রায় সুস্থ বীর্য উৎপাদনের ক্ষমতা গুণে।

বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক পর্যন্ত যৌন নীতিশাস্ত্রের বিষয়ে সমাজপতিরা সামগ্রিকভাবে রক্ষণশীল ছিল। কিন্তু যবে থেকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সূচনা হলো, পশ্চিমা পুঁজিবাদী সংস্কৃতি বিশ্বময় দূষিত বায়ুর মত ছড়িয়ে পড়ল। সমাজের বুকে খুল্লমখুল্লা নতুন এক যৌন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা পেলো- ‘লিভ-ইন’ নাম দিয়ে। আর্থিক, সামাজিক, আইনি সর্বদিক থেকে দায়িত্বহীন এইজাতীয় যৌন সম্পর্কে যারা জড়ায়, তারা শুরু থেকেই জানে আমাদের সম্পর্কের কোন প্রাতিষ্ঠানিক ভবিষ্যৎ নেই শুধুমাত্র যৌনতা উদযাপন করার বিনিময়ে একে অপরের সঙ্গে থাকে। বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠান, যেখানে সামাজিক সুরক্ষা, উত্তরাধিকার পারিবারিক সম্পদের বণ্টনের মাধ্যমে মহিলাকে অর্থনৈতিকভাবে দৃঢ় অবস্থান দেয়, সেটাকে ভেঙে দেয় এই লিভ-ইন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই লিভ-ইন সহবাসকারীরা এই দুর্মূল্যের বাজারে, বিশেষত বড় শহরগুলোতে টিকে থাকতে, জীবনযাত্রার আর্থিক’ খরচা ভাগ করে নেওয়ার জন্য, রেকটু সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য ও সহজলভ্য যৌনতার সাপ্লাইলাইন ঠিক রাখতে এই ধরণের সম্পর্ককে যুক্তিসঙ্গত বানিয়ে নিয়েছে। এটাও সেই ঘুরেফিরে অর্থনীতির বৃত্তেই পাক খায়।

পুঁজিবাদী দুনিয়ার আর্থিক নীতি মূল ভিত্তি হলো উদারীকরণ ও বিরাষ্ট্রীয়করণ। এই পথেই একটা শিশু জন্মাবার আগেই মাতৃহীন হওয়ার মুচলেকাতে সই করে ফেলে ‘সরোগেসি’ প্রজনন নামে চুক্তিচাষে। এই বিষয়টাকে নিয়ন্ত্রণ করা একেবারেই অসম্ভব, ফলে একজন সারোগেট মা’কে, শারীরিক, মানসিক এবং আর্থিকভাবে চরম শোষণের মুখোমুখি হ। সারোগেসি এবং নোংরা অর্থনীতি একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গী ভাবে সম্পর্কিত কারণ, বাণিজ্যিক সারোগেসি যে ধরণের শোষণ, বৈষম্য এবং অনৈতিক লেনদেনের চোরা বাজার তৈরি করে তার সবটাই অর্থনীতি ভিত্তিকগরীবের মেয়েরা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হওয়ার কারণে এই পেশা বেছে নিতে বাধ্য হয়, তাদের শরীরের যত্ন, তার পুষ্টি, প্রসবের পরের তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের কেউ খেয়াল রাখে কি? কোনো ধনী মহিলা কখনও তার জরায়ু ভাড়া দিয়েছে বলে শুনেছেন? ধনীরা, দরিদ্র দেশ থেকে সারোগেসি পরিষেবা কেনার প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত সকল ধরনে নৈতিক ও আইনি জটিলতাকে কাঁচকলা দেখায়, এর জন্য বিপুল পরিমানে অর্থ খরচা করে গ্রহীতা। সরকারী অফিসের চাপরাশি থেকে উচ্চ স্তরের রাজনেতা, সকলেই জড়িত থাকে এই অনৈতিক লেনদেনে।

পরকিয়ার কথা নাহয় বাদই দিন, বহু মহিলার এটাই ফুল টাইম রোজগারের পথ। তার বাইরেও যারা পুরাতন বাংলা সিনেমার মত ফুলে ফুলে ঘষা খাওয়া অযৌণ সম্পর্কে লিপ্ত, তাদেরও খরচাটা কম কিছু হয়না। বাকি রইল ঘরের বৌ, বিবাহিত স্ত্রী। তাকেও খুশি করতে করতেই তো পুরুষ নিমিষে বুড়ো হয়ে যায় চোখের সামনে। নতুন শাড়ি, ব্যাগ, জুতো, বিউটিপার্লার, ক্রিম, স্নো, পাউডার আর বৎসারান্তে একবার ট্যুর, নাহলে পাশে শুতে নেবে? যাতে ছেলেমেয়েকে বুকে জড়িয়ে একপাশে শুয়ে ঘুমাবার ফাঁকে ২০ মিনিটের একটু অবসর বের করে আনে পুরুষটির জন্য, তার জন্যই তো এতো ঝকমারি। এতো রোজগারের স্বপ্ন, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, হানাহানি, উদয়াস্ত পরিশ্রম কার জন্য, ঘরের বৌ কে খুশি করতেই না! আর খুশির বারোআনাই তো নিশ্চিন্ত যৌনতার প্রাপ্তি যোগের লগ্ন ডেকে আনতে।

 

(৪)

নোবেল পুরস্কার বিজয়ী এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ গ্যারি বেকার তার গবেষণাপত্র এ থিওরি অফ ম্যারেজ’ এর তত্ত্ব মতে- অর্থ এবং বিবাহ একে অন্যের সমানুপাতিক ও পরিপূরক। সঙ্গী নির্বাচন একটি বাজার, দুজন মানুষের মধ্যে বিবাহ তখনই ঘটে যখন সেটা উভয় পক্ষের জন্য ‘আর্থিক’ লাভজনক হয়। এখানে ব্যক্তিরা স্বেচ্ছায় তাদের উপযোগিতা বাড়াতে চায় এবং প্রতিযোগিদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দিতা বাজা মূল্য নির্ধারন করে। বিবাহ অবশ্যই একটি অর্থনৈতিক বোঝাপড়া দুটো পরিবারের মধ্যে, যেটাকে অত্যন্ত সাবধানতার সাথে পবিত্র ও মহানতার মোড়ক দিয়ে অর্থনীতির অংশটাকে উপেক্ষিত করে রাখা হয়।

অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গুলোকে আমরা দেখেও দেখিনা, শ্রম ও তার অবিচ্ছিন্ন সরবরাহ করার ক্ষমতা দেখে কি আমরা মেয়েকে পাত্রস্থ করিনা? খুব বেশী আয়ের বৈষম্য থাকলে ছেলে যতই সুপুরুষ হোক আমরা সেই বাড়িতে মেয়ে দিই কী? বৌমা বা স্ত্রী ঘরে আনার আগে সৌন্দর্যের সাথে বাচ্চাকাচ্চা হবে কিনা, অর্থাৎ উর্বরতা বিচার করি, রুগ্ন কিনা মানে সে ঘরের সকল কাজ করতে পারবে কিনা সেই বিচার করি। একটা ‘কমন মিনিমাম’ অবস্থানে তখন পৌঁছায়, যখন শুরুতেই অর্থনৈতিক স্বার্থটা বাইরে থেকে গভীর ভাবে বুঝে নিই। এর পর আসে দুটো অপরিচিত, আধা পরিচিত বা পরিচিতের মাঝে এ্যারেঞ্জ ম্যারেজের দ্বারা নিজেদের মানসিক বোঝাপড়া

কোনো একটা বিদেশী লেখায় জনৈক মহিলার বয়ানে একটা চিঠি পড়েছিলাম, যার বাংলা করলে দাঁড়ায়- প্রিয় সমাজ, গত ৩৫ বছর ধরে আমি দু’ডজনেরও বেশী আলাদা আলাদা রকমের কাজ করেছি। গৃহরক্ষী, প্রহরী, রাঁধুনি, ঝাড়ুদার, জমাদার, ড্রাইভার, গৃহ সহায়িকা, গরু ছাগল হাঁস মুগরির ছোট খামারের রাখাল, কুকুর বিড়ালের মত শখের পোষ্যের পরিচর্যাকারী, ধোপা, এ্যাটেন্ডার, দর্জি, হাউজকিপিং, ইলেকট্রিসিয়ান, ছোটখাটো মেরামতকারী, বাগানের মালী, রাজমিস্ত্রী, রঙ মিস্ত্রী, ইন্টিরিয়ার ডিজাইনার, কাঠ মিস্ত্রী, বাজার সরকার, টাইপিস্ট, বিনোদনের যোগানদার হিসাবে গান গাওয়া ও নাচা, একাকিত্ব দুর করার জন্য গল্প শোনানো, বাইরের ক্লেদ ব্যার্থতা হেতু রাগ প্রকাশের জীবন্ত শোষক, টেলিফোন গ্রহণকারী, অভ্যর্থনাকারী, হিসাব রক্ষক, বাজার সরকার, মোটবাহক ও সর্বশেষে যখন খুশি বিছানাতে বেশ্যাদের মত শিৎকার সহ উদ্দাম যৌনসঙ্গমের পার্টনার- এ সব করেছি একজন বসের জন্য, সম্পর্কে নি আমার স্বামী। এর জন্য পেটের ভাত, পরিধানের কাপড়ের বাইরে সেই অর্থে মজুরী কিছুই পাইনি।

দিনের শেষে সবটাই অর্থনীতির ছাঁকনিতে ধরা পরে যায়। এই কারনেই নানা ভাবে যৌনতাকে ‘ফ্রিতে’ ভোগ করতে কোথাও গ্লোরিফাই করা হয়েছে তো কোথাও নিন্দা। প্রায় প্রতিটা ধর্মে নিজ নিজ আর্থিক লাভকে প্রতিষ্ঠা করতে এই সকল আয়োজন। বাৎসায়নের মতে কামনা হলো একটি পবিত্র মানবীয় অনুভূতি। একই ধর্মে  মনুস্মৃতিতে বলা হয়েছে- নারীদের প্রকৃতিই হল পৃথিবীতে পুরুষদের কলুষিত করা। তাই নারীদের সব সময়ে পুরুষদের তত্ত্বাবধানে রাখতে হবে। মনু বলেছেন- কোন বালিকা, যুবতী বা বৃদ্ধাদের নিজের বাড়িতেও স্বাধীনভাবে কিছু করতে দেওয়া ঠিক হবে না। বাল্যে নারী থাকবে পিতার নিয়ন্ত্রণে, যৌবনে স্বামীর, এবং স্বামী মারা গেলে পুত্রদের নিয়ন্ত্রণে। মোদ্দাকথা পেটেভাতের গৃহপরিচারিকা ও যখন মন যাবে তখনই বিনামূল্যের যৌনতা নিশ্চিত করতেই এতো আয়োজন।  

সতীদাহ মত নারকীয় প্রথা সমাজে তৈরিই হয়েছিলো বিধবার সম্পদকে অনৈতিক ভাবে ভোগ করার জন্য। কোরআনে মহিলা শিক্ষার কথা গোটা গোটা ভাবে বলা থাকলেও, সমাজপতি মোল্লারা নারীদেরকে গৃহবন্দী করে রেখে দেয় যাতে সম্পত্তিতে তাদেরকে ভাগ না দিতে হয়। ইসলামিক বিবাহে মেয়েকে কন্যাপণ বা দেনমোহর দেওয়াটা লিখিত আইন। সেই আইনের ফাঁক গলে কেউ ৫০০ টাকা দেনমোহর ধার্য্য করছে যা একান্তই মূল্যহীন, আর যারা ২-৪ কোটি টাকা ধার্য্য করছে, সেটাও কেবল খাতায় কলমেই রয়ে যায়। নারীর যৌনতাকে বিনে পয়সায় ভোগ করার এক নিকৃষ্ট পুরুষতান্ত্রিক রীতি চলে আসছে, যার গোটাটাই অর্থনৈতিক ভাবে ফাঁকি দেবার জন্য। কেরালার নাম্বুদিরিপাদের শ্রেণীর ব্রাহ্মণ পরিবারের বড় ছেলের বৌ- নায়ার নামের ছোট জাতি থেকে আসবে, এটাই নিয়ম। কিন্তু সেই মহিলা ও তার গর্ভজাত সন্তানের, পারিবারিক সম্পত্তির উপর কোন অধিকার থাকবে না। ভাবুন যৌন শোষণ ও আর্থিক শোষণের অর্থনীতিকে কীভাবে সামাজিক নীতিমালার জালে বেঁধে অবৈধ ভোগদখল করেছে সমাজপতিরা। মহাভারতের দ্রৌপদী নিয়ে কিছু শোনার মত সহনশীলতা আজকের সাম্প্রদায়িক বিভেদগ্রস্থ সমাজের নেই।

অথচ মহিলাদের হাতে অর্থ এলে সমাজ বদলে যায়, তার উদাহরণ হলো বাংলাদেশ, উদাহরণ হলো নেপাল- হলোই বা সেটা যৌনতা নির্ভর অর্থনীতি। নারীর প্রতি যৌন সহিংসতার কারণে যেসব আর্থিক ক্ষতি হয়, তা সামাল দেওয়া যেকোনো দেশের জন্যই কঠিন। বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি ক্ষেত্র পোশাক খা ০ লাখ কর্মসংস্থান দিয়েছে রাষ্ট্রকে, যাদের বেশির ভাগই নারী। এই নারীরা পোশাক শিল্পে আসার দরুন দেশজ উৎপাদনের হার একলাফে বেড়ে গিয়েছে। মা ও শিশুমৃত্যুর হার অনেকাংশে কমেছে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মেরুদণ্ড তৈরি করছে। অথচ নিজেদের যৌন বিকৃতির কারনে মোল্লাতান্ত্রিক ফতোয়া দিয়ে মেয়েদের ঘরে বন্দি করে রেখেছিল এই সমাজই। গোটা বিশ্বব্যাপী নারীরা স্বেচ্ছায় যৌনকর্মে প্রবেশ করে ও টিকে থাকে কেন? অদক্ষ কর্মীদের জন্য সুযোগের অভাব, দরিদ্র সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারনে মহিলারা যৌন পেশায় যুক্ত হয়। সমাজের অন্যান্য সকল অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকের চেয়ে বেশি পরিমাণ রোজগার করা সম্ভব, তাই অনেক মহিলা স্বেচ্ছায় পতিতাবৃত্তি করে। পতিতাবৃত্তি এমন একটা বিষয় যার সঙ্গে প্রজননের কোন সম্পর্ক নেই এখানকার সবটাই জবরদস্তি আর পাচারের গল্প নয়, বরং সামাজিক অর্থনৈতিক বৈষম্য এই আদি পেশাকে টিকিয়ে রেখেছে।

অন্যান্য সকল প্রাণীদের কাছে পেট আগে, যৌনতা দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ। মানব সমাজে, বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোতে, যেখানে যৌনতা রেখে ঢেকে, লুকিয়ে চুরিয়ে সম্পাদন করতে হয়, সেখানে একটা দ্বিতীয় সুযোগ পেতে অনেক অনেক সময় লেগে যায়। তাই আমাদের তৃতীয় বিশ্বের এই দেশগুলোতে আগে যৌনতা তারপর পেট। আলুসিদ্ধ দিয়ে দিনের পর দিন ভাত খেয়েও টাকা জমায় রূপসজ্জার বস্তু কিনতে, যাতে তাকে সুন্দর দেখায়। যৌনতার বাজারে সে যেন ভালো দড়ে বিকিয়ে যায়। কিডনি বেচে ছেলেরা আইফোন কেনে, যাতে মহিলা মহলে টুক করে কাউকে পটিয়ে ফেলতে পারে। আর পটে গেলেই তা যৌনতা দিয়ে শেষ হয়- এটাই নিয়ম।

সুতরাং আমাদের দেশের অর্থনীতি থেকে যদি যৌনতাকে আলাদা করার মত কোনো গণনা পদ্ধতি থাকত, দেখা যেত, প্রায় অর্ধেকের বেশী GDP দখল করে আছে যৌনতা ও তাকে কেন্দ্র করে চলা বিভিন্ন ব্যবসাতে হওয়া লেনদেন বাবদ আয়। তবে এটাও ঠিক যে, অর্থ জড়িয়ে আছে এমন বিষয়ক প্রতিটা ক্ষেত্রে অবৈধভাবে উন্নতির সাধনের জন্য যৌনতাকে টোপ ও ঘুষ হিসাবে ব্যবহার করা হয়, যার আর্থিক মূল্য নিরূপণ করা ভীষণ কঠিন কিম্বা অসম্ভব। স্ত্রী, বোন, বান্ধবীকে ব্যবহার করে, উন্নয়নের সোপানে চড়া মানুষ কী পৃথিবীতে কম! নারী পাচারের সঙ্গে যুক্ত আড়কাঠি পুরুষের প্রেমের অভিনয়কেও কীর্থের মাপকাঠি দিয়ে মূল্যায়ন করা যায়! প্রতিটা দেশের গুপ্তচরবৃত্তিতে ‘হানি ট্রাপ’ হিসাবে মহিলাদের দিয়ে যৌনতাকে অস্ত্র বানানো হয়, এর আর্থিক লাভক্ষতি মূল্যায়নের সাধ্য আমার অন্তত নেই।

গোটা বিশ্বজুড়ে নারীবাদী নামে এক ধরনের সংগঠন গজিয়ে উঠেছে ব্যাঙের ছাতার মতো। যাদের মধ্যে খুব অল্পদল রয়েছে যারা সত্যি করে মহিলা সমাজের মধ্যে কিছুটা কন্ট্রিবিউট করছে, বাকিরা আসলে নেড়িবাদী। এদের মূল এজেন্ডা ছিলো যৌন শোষণ এবং সমাজের মধ্যে লিঙ্গ ভেদে যে অর্থনৈতিক বৈষম্য, তার বিরুদ্ধে লড়াই করা। যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সমাজের বুকে সচেতনতা বৃদ্ধির নামে, অধিকাংশ নারীবাদী সংগঠন NGO গঠন করে চাঁদা তুলে তার দ্বারা নিজেরা ফুর্তি করে

যৌনতা যেমন অর্থনীতিকে অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করে, সেই মুদ্রার উল্টো পিঠটাও ভয়াবহরূপে সত্যি। আর্থিকভাবে পতনশীল বা দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যৌন জীবনের সুস্থতাকে ভয়ঙ্কর ভাবে প্রভাবিত করে, দারিদ্র্যের সম্মুখীন ব্যক্তিরা যৌনতার বিচারে তৃপ্ত হিসাবে প্রমানিত। বর্ধিত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা যৌনতাকে অনেক বেশী মুক্ত করে দেয়, তাই ধনী সমাজে কেচ্ছার পরিমানও সবচেয়ে বেশী। বিপরীতভাবে, যেখানে অর্থনৈতিক সুযোগ সীমিত থাকে, বিশেষত মহিলাদের- সেখানে বিবাহের বাইরে যৌনতা বিরল ব্যাপার।

যাই হোক, এই প্রতিবেদন পড়ার পর ভুলেও যেন নিজেকে পুরুষ সিংহ দাবী করে বসবেননা, বাইচান্স ঘরের লক্ষীটি এটাকে সিরিয়াসলি নিয়ে নেয়- কী অবস্থা দাঁড়াবে অনুমান করতে পারছেন!

 

 

শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৫

ভক্তঃ একটি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ

 

ভক্ত

 দেশ সদ্য স্বাধীন হয়েছে, সঙ্ঘের অফিস বাড়ির সামনে স্তুপাকৃতি চিঠিপত্রের বাঁধা ঠেলে বেড়িয়ে আসছে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী ‘বীর সাভারকর’। গুরু গোলওয়ালকার স্বয়ংসেবকদের দানকরা রক্তে খাগের পেন ডুবিয়ে সংবিধান রচনা করছে কেশব ভবনে বসে। বাঁশের খুঁটির ডগায় চড়ে দীনদয়ালজী গেরুয়া রঙের পতাকা বাঁধছে। খাকি হাফপ্যান্ট পরিহিত অটল-লালকৃষ্ণ জুটি তখন ৬০ টাকার পেনসনভোগী পলাতক গান্ধীকে ফেরত আনতে রাজমাতা এলিজাবেথের কাছে সংস্কৃতে চিঠি লিখতে ব্যস্ত, ABVP এর প্যাডে। এলাহাবাদের আনন্দভবনে নেহেড়ু আর আম্বেদকর নামের দুই দেশদ্রোহী মনুস্মৃতি পোড়ানোর দায়ে জেলবন্দি, আন্দামানে তড়িপার করার নক্সা আঁকছে স্বয়ং বালাকৃষ্ণ মুঞ্জে। ওদিকে মাননীয় হবু প্রধানমন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তার ট্রেডমার্ক ‘শ্যামা কোট’ পরিধান করে আগামীকাল দুপুরে লালকেল্লা থেকে ভাষন দেবেন বলে প্রম্পটার দেখে দেখে বলা প্রাক্টিস করছে। লাহোর থেকে চট্টগ্রাম অবধি আসুমদ্রহিমাচল ধ্বনিত হচ্ছে ‘নমস্তে সদা বৎসলে মাত্রুভূমে’।

লাহোর থেকে মানে! পাকিস্তান কই! কোথা থেকে জঙ্গি আসবে? কাটা মোল্লার বাচ্চা গুলোকে কোথায় পাঠাবো! মহান গডসে কাকে মারবে? মোদীজি কাকে দোষ দেবে নেহেড়ু প্রথম প্রধানমন্ত্রী না হলে! ধুর খেলবোনা, এ স্বপ্ন বাতিল। ধড়ফড় করে জেগে উঠলো রামশোধন মাতব্বর, উফ কী ভীষণ দেশদ্রোহী স্বপ্ন ছিলো, শাহ জী জানতে পারলে UAPA ধারা পাক্কা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কানাইয়া কুমার বলে, নিজেই নিজেকে গালি দিয়ে নিলো খানিক। সেই যবে থেকে সে স্বয়ংসেবক হয়েছে, তবে থেকে স্বপ্নদোষ হওয়া বন্ধ ছিলো, আজ আবার- নিশ্চই কোনো দেশদ্রোহীর কুনজর লেগেছে।

২০১৪ সাল থেকে দেশে অমৃতকাল এসেছে মোদীজির কল্যাণে, সনাতনীরা প্রকৃত স্বাধীনতা পেয়েছে। তখন থেকেই গলার শির ফুলিয়ে ‘মোদী, মোদী, মোদী’ করে এসেছে রামশোধন। বর্তমানে সে ১৯টা হোয়াটস্যাপ গ্রুপের এ্যাসিট্যান্ট ভাইস এডমিন পদে রয়েছে, স্থানীয় শাখায় জলসত্র দপ্তরের সহকারী অধক্ষ্যও বটে। ৩ বছর ধরে গোরক্ষপুরে রীতিমত বডি ফেলে রেখে ‘মসজিদ নৃত্য’ শিখে এসেছে। যোগীজির গেরুয়া ইজেরের দিব্যি কেটে বলা যায়, তার চেয়ে ভালো নাচ কম লোকেই নাচে। এই তো গত রাম নবমীতে আকবরপুর জামা মসজিদের সামনে ডিজে বাজিয়ে পাক্কা ৪ ঘন্টা ননস্টপ তান্ডব নৃত্য নেচেছিলো, কাটার বাচ্চা গুলো তবুও বেড় হয়নি এটাই আক্ষেপ।

বসাক পাড়ার পকাই ফটোসপে বেশ চোস্ত, তাকে দিয়ে মন্দিরে গোমাংস ফেলার ছবি, বাংলাদেশে মূর্তি ভাঙার ছবি, লাভ জিহাদ, রোহিঙ্গা, বাংলাদেশী সহ সব বিভাগে ইনোভেটিভ সংবাদ ‘তৈরি’ করাতে যে ডিস্টিংশন নিয়ে পাশ করেছে- তার স্বপ্নে কিনা পাকিস্তান গায়েব! নিশ্চই মোল্লাপাড়ার আব্দুল ব্যাটা জিন চালান করেছিলো, তারাই এই সব অপস্বপ্ন চালান করেছে তার সনাতনী হৃদয়ে। যাই হোক, শুদ্ধিকরণ জরুরি। হঠাৎ করে মিছিলের সমস্বর স্লোগানের মত ‘তুমিও গোঁয়ার আমিও গোঁয়ার, হেডগেওয়ার হেডগেওয়ার’ ধ্বনিত হলো, এটা রামশোধনের মোবাইলের স্বদেশী রিংটোন।

ফোনের ওপাড় থেকে নির্দেশ এলো ১১টার ট্রেন ধরে মুরুলীধর স্ট্রিটে যেতে হবে, বিকালে IT সেলের বিজয়া মিলনোৎসব। নাগপুরের ঐশ্বরিক খোঁয়াড় থেকে আনা ‘কসমিক গোবর’ এর বসে খাও প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে, এছাড়া বোনাস প্রাপ্তির বিষয়টাও আছে। সাংসদ পরেশ রাওয়াল স্যার তার ‘তাজ’ সিনেমার প্রচারে আসছেন, উনিই ‘বসে খাও’ এর বিচারক। প্রথম ৩ বিজয়ীকে ওনার ‘সর্বরোগহরা মুত্র’ সহস্তে পান করাবেন। রামশোধন উল্লাসে ফেটে পড়লো। কিন্তু তার আগে আব্দুলের পাঠনো ওই নিষিদ্ধ দুঃস্বপ্নের হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে গোমুত্র পান করতেই হবে, নতুবা কোনো শুভকাজে সাফল্য আসবেনা। গোয়ালে গিয়ে দেখলো গরুগুলো চড়তে নিয়ে গেছে তার বাবা, মনমড়া হয়ে জানালার দিকে চাইতেই দেখতে পেলো রাজুর চায়ের দোকানে ধর্মের ষাঁড়টা দাঁড়িয়ে আছে। খুব রগচটা, আর তেমন পালোয়ান গোছের। রামশোধন জয় বাবা গো-পিতা বলে যেই না তার অণ্ডকোষ ছুঁতে গেছে, ষাঁড় বাবাজি সার্কাসের জিমন্যাস্টের মত চকিতে পাক খেয়ে রামশোধনের ওই-কোষ লক্ষ্য করে মারলো ঢুঁসো।

জ্ঞান হারাবার আগে রামশোধন বুঝতে পারলো, গো-পিতার ঢুঁসো তারও যোগীদশা প্রাপ্তি ঘটালো, মানে আঁটকুড়ো আরকি। কী জানি ষাঁড়টার কী মনে জাগল, সে অচৈতন্য রামশোধনের মুখে প্রায় ৫ লিটার মুত্র ও কিলো দেড়েক গোবর ত্যাগ করে ওকে শুদ্ধি স্নান করিয়ে, কেমন যেন মাকুদের মত ফিচেল হাসি হাসি মুখে হেলতে দুলতে চলে গেলো। মুখে মুতের ছিটে পড়তেই খানিকটা জ্ঞান ফিরে পেয়ে রামশোধন আবার স্বপ্ন দেখলো- নেহড়ুই প্রধানমন্ত্রী, পাকিস্তানও রয়েছে, শুধু স্বাধীনতাটা ৯৯ বছরের লিজে নিয়েছে দেশদ্রোহী গান্ধী।

উফ, একে বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস, সব কিছু রিসেট হতেই বুক থেকে যেন একটা ‘মাজার’ নেমে গেলো। এটাও বুঝলো, গো-পিতার তরফে ওটা ঢুঁসো রূপে- ‘ফ্যাক্টারি রিসেট’ বাটনে চাপ দিয়ে রিস্টার্ট করার প্রক্রিয়া ছিলো। দুম করে তন্দ্রা ছুটে গিয়ে ব্যাথায় ককিয়ে উঠেও মেসেজটা হোয়াটস্যাপে ফরোয়ার্ড করে দিলো। মনে মনে গো-পিতাকে ধন্যবাদ জানালো, আব্দুলের তাবিজ কবজ থেকে তাকে মুক্ত করার জন্য। আজ এটা নিয়েই একটা সম্পূর্ণ প্রতিবেদন লিখবে ‘নন্দীর লীলা’ শিরোনামে। আজ নির্ঘাত এক্সট্রা বোনাস পাওয়া যাবে মণ্ডলীতে।

হ্যাঁ, রামশোধন। এরা একটা প্রাইমেট বর্গের মনুষ্যেতর প্রজাতি, মূল আবাসস্থল উত্তরপ্রদেশ, গুজরাত, হরিয়ানা হলেও আজকাল সারা ভারতেই এদের দেখা মেলে। বিশেষ করে মানুষের মতই আকৃতি প্রকৃতিতে, কিন্তু কিছুটা তিমি মাছের মত- জলে থাকে কিন্তু মাছ নয়। আসলে বিচার বুদ্ধিতে এরা পুরোটা অভিযোজিত হয়নি, বিশেষ করে মস্তিষ্ক এখনও হোমিনিডি বর্গেরই রয়ে গেছে। বানর থেকে মানুষ হওয়ার পর্যায়ে সবকটা বাঁদরের মানবে উত্তরন ঘটেনি, যে কটা ওই মাঝামাঝি- কী যেন বলে, হ্যাঁ ট্রান্সজেন্ডার বা বৃহন্নলা পর্যায়ে কিছু রয়ে গিয়েছিলো, তারাই রামশোধনের পুর্বপুরুষ।

প্রাইমেট কুলে রামশোধনের জাতের বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘হোমো চাড্ডিয়েন্স’, দেশীয় নাম ভক্ত। ওরাংওটাং, শিম্পাঞ্জি, গরিলাদের যেমন প্রভেদ আছে, তেমনই নৃতত্ত্ব বিজ্ঞান অনুযায়ী ভক্তদেরও নানান বর্গ ও উপবর্গ ভেদ রয়েছে। কোথাও এরা বজরং দল, কোথাও হিন্দু সংহতি, শিবসেনা, ABVP, স্বয়ংসেবক, গোরক্ষক, কর্ণি সেনা প্রভৃতি নানান পর্যায়ের বিবর্তিত জনপুঞ্জ দেখা যায়। গবেষকেরা এদের দেখা পেতে রামনবমীর দিন যেকোনো মসজিদের সামনে তাক করে বসে থাকে, বাৎসরিক মাইগ্রেসন রুটে তারা মসজিদের সামনে আসবেই আসবে, তাদের পুর্বপুরুষের দেখানো পথে।

রামশোধন তথা ভক্তদের মূল কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট রয়েছে। এরা বেদ, পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত, গীতা জাতীয় কোনো ধর্মগ্রন্থই পড়েনা, শুধু হোয়াটস্যাপ পড়ে। এদের বীজ মন্ত্র হচ্ছে ‘হিন্দু খতরেমে হ্যাঁয়’, তাই ওকে ‘হিন্দুভীর’ হয়ে ধর্ম রক্ষা করতে হবে, এটাই দায়িত্ব। সেই রক্ষার কাজে নিয়োজিত হয়ে সর্বক্ষণ চেঁচামেচি, মারামারি, খুনোখুনি, দাঙ্গা হাঙ্গামা করা এদের ডেলি রুটিনের অংশ। রা সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মগুলিতে সবচেয়ে পরিলক্ষিত হয়।

 

(২)

সমসাময়িক ভারতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভক্ত অতি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। অন্ধভক্ত শব্দটি এদের অলঙ্কার এরা মূলত নরেন্দ্র মোদীর কট্টর সমর্থক, এদের কাছে সমস্ত লৌকিক দেবদেবীর উর্ধ্বে মোদীজির অবস্থানমোদীজির যে কোনো কাজের সমালোচনা এদের কাছে অত্যন্ত নিন্দনীয়- অপবাদ ও অপরাধমূলক কাজ। একচেটিয়াভাবে মোদীজির প্রতি অন্ধভাবে আনুগত্যই ধর্মের তথা হিন্দুত্ববাদের প্রকাশ। এরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভয়াবহ পরস্পরবিরোধী অত্যন্ত বিতর্কিত, তাদের সকল রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি মোদীজির কর্মকান্ডের উপরে নির্ভরশীল।

হোয়াটস্যাপের উৎস থেকে পাওয়া তথ্যকেই এরা একমাত্র মানদণ্ড হিসাব করে, সেই সকল মিথ্য তথ্য গুরুত্ব সহকারে সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া এদের দৈনন্দিন কর্তব্যসোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ ফ্যাক্ট চেক করলে তাকে চিন, জর্জ সোরেস কিম্বা পাকিস্তানের দালাল হিসাবে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়, গ্রুপে গ্রুপে খাপ বসানো হয়। মোদী সরকারের সমালোচনার বিরুদ্ধে গলার শিরা ফুলিয়ে প্রতিবাদ করাই এদের কাছে- ধর্ম রক্ষা করার সংজ্ঞা

এদের কাছে মোদীপ্রেম মানেই দেশপ্রেম, মোদী সহ বিজেপি নেতাদের প্রতি প্রশ্নহীন সমর্থনই একমাত্র জাতীয় কাজ, এটাকেই তারা দেশভক্তি হিসাবে দেখে। সাম্প্রদায়িক ঘৃণার আবহাওয়া সৃষ্টি করে বৃহত্তর সামাজিক মেরুকরণ এদের মূল লক্ষ্য। ধর্মান্ধতার বিচারে এরা তালিবান, আইসিস, মোসাদ, নাইট টেম্পেলার, আল কায়দা বা এই জাতীয় যেকোনো আন্তর্জাতিক মৌলবাদী সংগঠনকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম, কিছু ক্ষেত্রে তাদের চেয়েও এরা অনেক বেশী এগিয়ে। মনুবাদী জাতীয়তাবাদ, গেরুয়া শাসনব্যবস্থা, উগ্র হিংসা এবং আদানি-আম্বানির প্রতি নিষ্ঠা ভরে আনুগত্য এদের নিজেদের সমাজে উত্তরণের একমাত্র পথ।

অন্ধভক্তের আরেক বড় গুণ হচ্ছে তারা নিজ চরিত্রের সমালোচনা সইতে পারেনা। প্রশ্নাতীত আনুগত্য এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা ছাড়াই এরা মোদীজি BJP কে সমর্থন করে কোনো নীতির ধার ধারেনা, এরা কখনও ব্যর্থ হয়না, প্রতিটা কাজই মাস্টারস্ট্রোক। কোনো ধরণের বিতর্কে অংশগ্রহণ করেনা। তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় এমন সব কিছুর প্রমাণকে চক্রান্ত ও কুৎসা বলে দাগিয়ে দেয়। মোদী সরকার বা বিজেপির যেকোনো নেতার কাজের সমালোচনাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে নেয়, এবং সমালোচককে জাতীয়তাবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করে তীব্র হিংস্র প্রতিক্রিয়া জানাবিজেপির নেতাদের কর্মকাণ্ডকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য যাবতীয় কুযুক্তি তথ্যহীন এঁড়ে গোঁয়ার তর্ক বানিয়ে নেয়।

ভিন্ন মতামতের প্রতিটা ব্যক্তিদের সকলকে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক আপত্তিকর কুরুচিকর ভাষায় গালিগালাজ সহ, নানান ধরণের ব্যক্তিগত পর্যায়ের আক্রমণ শুরু করে। তারা অন্তর থেকে বিশ্বাস করে, মোদীজি কোনও ভুল করতে পারেন না এবং জনসাধারণের কাছে দায়বদ্ধ নন। রাজ্য ভেদে এদের নানান প্রাদেশিক শ্রেনী থাকলেও, বিজ্ঞানসম্মত ভাবে এদের মূলত সাতটি ভাগে শ্রেনীবিভাগ করা হয়।


) শিক্ষিত ভক্তঃ এরা হোয়াইট কলার ভক্ত। এরা কখনই সরাসরি ভক্তপনাকে সমর্থন করেনা, কিন্তু এদের কথাবার্তা, কাজকর্ম সবকিছু দিয়ে এরা ভক্তগিরিকে বিজ্ঞাপিত করে। এরাই নাগপুরের গোয়াল ঘরের তরফে GI ট্যাগ প্রাপ্ত বুদ্ধিজীবি ও তাদের স্বীকৃত উচ্চবর্গীয় প্রতিনিধি। এরা সুচতুর ভাবেন্যান্য ধর্মের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে অনেকটা রেখে ঢেকে, এরা গণেশের মুন্ডু প্রতিস্থাপনকে ইতিহাসের প্রথম সার্জারি, অর্জুনের বাণকে মিশাইল বা রাবনের পুষ্পক রথকে প্রথম বিমান হিসাবে মেনে নেয়, যতই যুক্তি তর্ক করা হোক। এরা মোদী ছাড়া সরকারের অন্যান্য প্রায় সকলের নামে মৃদু সমালোচনা করে, ধর্মের নানান লৌকিক আচার নিয়েও কঠোর সমালোচনা করে। মোদী সরকারের বিরুদ্ধে উঠা যাবতীয় অভিযোগ এরা শুষে নেয় স্পঞ্জের মত, এরা মূলত যাত্রা দলের বিবেকের মত কাজ করে। নিন্মোক্ত সকল ধরণের ভক্তদের বাড়াবাড়ি দেখলে এরা খুব করে ‘বকে’ দেয়। এরা মূলত সাংবাদিক, উপদেষ্টা, সাংসদ, ফিল্মস্টার, শিক্ষায়তনের অধ্যক্ষ, বিচারপতি ও আমলা হিসাবে সমাজে বিরাজ করে।

) ধান্দাবাজ ভক্তঃ এদের কাছে ভক্তগিরি কেবল ব্যক্তিগত সুবিধা এবং রাজনৈতিক ফায়দা তোলার যন্ত্রএরা সুবক্তা হয়, ফলে উষ্কানি দিতে এদের জুড়ি মেলা ভার। এরা নিরীহ জনগণকে ভক্ত হতে উৎসাহ দেয়। অশিক্ষিত হিংস্র ভক্তদের এরা নিয়ন্ত্রন করে গ্রাউন্ড লেভেলে, এদের ভিড়কে পুঁজি করে এরা উগ্রবাদী সমাজে দ্রুত জনপ্রিয় হয় এবং সরকারী ভাবে ভোটে জিতে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে। অশান্তি বা দাঙ্গা লাগলে এরা ব্যবসায়িক ভাবে আর্থিক লাভ খুঁজে নেয়, তাই হিংস্র ভক্তদের দিয়ে এরা সর্বক্ষণ দাঙ্গা বাধাঁনোর ছক কষে। পলায়নে এরা যথেষ্ট পারঙ্গম, তাই কোনো ধরণের দাঙ্গা, হাঙ্গামা, মারামারি, হানাহানি বা কাটাকাটিতে নিজেরা সরাসরি অংশ নেয়না, তাক বুঝে ঠিক কেটে উঠেপঞ্চায়েত সদস্য থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা অবধি এই বর্গের মধ্যে পরে।

) বিদ্যার্থী ভক্তঃ দেশের প্রথম সারির কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাদের খুঁজে পাওয়া যায়না, অথচ মধ্যম ও নিম্ন মানের অধিকাংশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকে- তারাই এই শ্রেণীর ভক্ত। না বয়স না শিক্ষাদীক্ষা, কোনো দিক থেকেই এরা ছাত্র নয়, কিন্তু কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে এরা বছরের পর বছর ধরে নিযুক্ত থাকে। শুরুতে এরা কোনো শিক্ষিত ভক্তের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে কিশোর বয়স থেকেই ভক্তপনার হাতেখড়ি পেয়ে থাকেপরবর্তীতে কোনো মতে একটা ক্যাম্পাসে ‘ছাত্র’ রূপে ঢুকে, সরলমতি ছাত্রছাত্রীদের মনে সাম্প্রদায়িকতার ঢালতে থাকে, এই বিষাক্ত পরিবেশকে এরা ‘যুব দাবী’ ও ছাত্র রাজনীতির নাম দেয়।

এই কাজে এদের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো- বাম এবং সেকুলার ছাত্রছাত্রীরা। এরা অন্যান্য বাকিদের চেয়ে পড়াশোনা, বাৎসরিক রেজাল্ট, যুক্তি তর্ক, জ্ঞান বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে যেহেতু এগিয়ে থাকে, তাই এরাই ভক্তদের মুখ্য শত্রু। এদেরকে ভক্তসমাজ মাকু-সেকু নামে ডাকে। এই মাকু-সেকুদের বিরুদ্ধে কলেজ ক্যাম্পাসে অকারনে হুজ্জোতি করা এই শ্রেণীর ভক্তদের মূল কাজ, এতে করে দ্রুত সকলের নজরে আসা যায়। নানান ধরণের কুসংস্কৃতি ও অপবিজ্ঞানকে ধর্মের অংশ বলে প্রচার করে। মুসলমান, দলিত ও আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের বুলি করা, তাদের উত্যক্ত করা, তাদের পঠনপাঠনে নানা ভাবে সমস্যা সৃষ্টি করাটাকেই তাদের মূল সিলেবাস মনে করে। রক্তারক্তি করা, শিক্ষালয়ে পুজোর আয়োজন করে ডিজে সহ নাচানাচি ও মদ গাঁজার আসর বসানো, চুরিচামারি করা, শিক্ষকদের হেনস্থা করা, মেয়েদের অশ্লীল ভিডিও সোস্যালমিডিয়াতে ছেড়ে ব্ল্যাকমেল করা এদের দৈনন্দিন রুটিন।

) ছুপা ভক্তঃ এরা মূলত গিরগিটি। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে এরা বাস করে, ডান, বাম, অতিবাম, জাতীয়তাবাদী, গান্ধীবাদি, সমাজবাদী, মধ্যমপন্থী সর্বত্র এরা বিরাজ করেঅন্তর থেকে পূর্ণ সাম্প্রদায়িক, কিন্তু ভদ্রসমাজে থাকে বলে সেকুলারের মুখোশ পড়ে থাকে। এরা সমাজের বুকে সর্বদা ভালোমানুষ হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যায়। এরা ‘রাজনীতি বুঝিনা কিন্তু মোদীজিকে খুব ভালো লাগে’ মন্ত্র জপে। যেকোনো বিষয়ে এরা অরাজনৈতিক, কিন্তু মোদীর বিষয়ে সমালোচনা এরা কিছুতেই সহ্য করেনা- হাাজার হোক উনিই তো আমাদের প্রধানমন্ত্রী। রাই কথায় কথায় আউড়াতে থাকে- দেশের স্বার্থে কিছুটা কষ্ট না হয় সইলেন। তাতেও সামনের জন না বুঝলে বর্ডারে আমাদের সেনাদের কথা ভেবেছেন কখনও’ কিংবা সিয়াচেনের টেম্পারেচার জানা আছে ইত্যাদি জাতীয় মোক্ষম জবাবে সামনের জনকে ঘায়েল করে দেয়।

এরা গান্ধীর মতের অনুসারী, কিন্তু গডসেকে দোষী মানতে নারাজ। সাভারকার এদের কাছে বীর, RSS ঐতিহ্যবাহী পবিত্র দেশপ্রেমিক সংগঠন, শুধু তাদের মতাদর্শে বিশ্বাস করেনা। এরা বিশ্বাস করে ‘হিন্দু খতরেমে হ্যাঁয়’, আর চারটে বিয়ে করে গণ্ডা গণ্ডা বাচ্চা পয়দা করা মুসলমান গুলোই দেশের উন্নয়নের আসল বাঁধা। তাই মুসলমান ছাড়া বাকি সমস্ত জাতিকে এরা হিন্দু বলে মনে করে; দলিত, আদিবাসী, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, খ্রীষ্টান এমনকি ইহুদিদেরও। এরা স্বঘোষিত ধর্মনিরপেক্ষ, কিন্তু পয়লা বৈশাখে নিরামিষ খাওয়ার ফতোয়াকে সমর্থন করে, যে কোনো জঙ্গিহানাকে ‘ইসলামিক মৌলবাদ’ শব্দে ভূষিত করে। কোরবানি তথা ধর্মের নামে গোহত্যার ভয়ানকভাবে বিরোধী, কিন্তু অষ্টমীর দুপুরে কবজি ডুবিয়ে পাঁঠার মাংস খেয়ে ফেসবুকে পোষ্ট করে- পরম্পরা, প্রতিষ্ঠা, অনুশাসন

) ভার্চুয়াল ভক্তঃ  এরা বাস্তবের কোনো জীব নয়, এরা সার্কাসের জোকারের মত সারাবছর ধরে সোস্যালমিডিয়াতে ভাঁড় গিড়ি করে বেড়ায়। এদের যাবতীয় বিক্রম ফেসবুক, এক্স হ্যান্ডেল, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবের কমেন্ট সেকশনে। এরা অধিকাংশই ভাড়াটে সৈনিক, পেশাদার দিনমজুর। একজন ব্যাক্তি ২০টা আলাদা আলাদা নামে অস্তিত্ব খুলে রাখে, ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়াবার জন্য। যত বেশী কপি পেষ্ট, যত বেশী টুলকিট, যতবেশী হ্যাসট্যাগ, যত বেশি গালিগালাজ, যত বেশী শেয়ার করতে পারবে- তত বেশী রোজগার আসবে বিজেপির IT Cell নামের বিশেষ প্রোপ্যাগান্ডা মেসিনারির অফিস থেকে। এদের মূল শক্তি একতাতে, একজন কেউ আক্রান্ত হলেই শয়ে শয়ে ভক্তের দল ঝাঁপিয়ে পরে। বাম, সেকুলার ও মোদীর সমালোচোকদের এরা সর্বক্ষণ রোমান হরফে লেখা অসংখ্য বানান ভুল সমৃদ্ধ বাংলাতে- কাঁচা খিস্তি, মেয়েদের রেপ থ্রেট এমনকি মার্ডারের হুমকিও দেয়।

যেকোনো প্রোপ্যাগান্ডাকে বাতাসের গতিতে ছড়িয়ে দিতে এদের জুড়ি নেই। এরা মূলত কোনো একটা সেন্ট্রালাইজড হোয়াটস্যাপ বা ফেসবুক গ্রুপ থেকে বিষাক্ত পোষ্ট, কমেন্ট ইত্যাদি কালেক্ট করে। এরপর একেকজন গোটা পঞ্চাশ গ্রুপে সেটা পাইকারি হারে শেয়ার করে দিয়ে গায়েব হয়ে যায়। এরা সাধারনত কমেন্টের জবাব দেয়না, যুক্তি তর্কের মাঝে আসেনা। যেহেতু এরা দলবদ্ধ ভাবে ‘শিকারে’ আসে, তাই ইতিহাস বদলে দেওয়া, ভূগোল বিকৃত করা, কুসংস্কারকে প্রমোট করা, সাহিত্যকে ব্যাঙ্গ করা, ধর্মীয় রূপক বর্ণনাকে বিজ্ঞান বলে চালানো, ইত্যাদি অপকর্মে এদের সমকক্ষ মেলা ভার। কারো বাবা মারা গেছে বলে একটা জ্ঞাপনামূলক পোষ্ট করেছে, কারো হয়ত ব্রেকাপ হয়েছে বলে দুঃখের পোষ্ট করেছে, কারো সন্তান হওয়ার খুশি, কারো বিদেশ ভ্রমণ, কেউ অর্শের ব্যাথায় কাতর হয়ে পরিত্রান চেয়ে পোষ্ট করেছে- এরা সর্বত্র লিখে আসবে, “মোদী হ্যাঁয় তো মুমকিন হ্যায়’। এরা আজন্ম নির্বোধ, কিছু বোঝেনা, কিছু শোনেনা, যার দেওয়াল পায় সেখানেই গোবরের ঘুঁটে দিয়ে আসে। এরা বর্তমানে এক্সপোজ হয়ে যাওয়া প্রজাতি, সোস্যালমিডিয়াতে মূলত পিওর কমিক রিলিফে পরিনত হয়েছে।

) অশিক্ষিত ভক্তঃ এরা হনুমানকে পিতা ও গরুকে মা হিসাবে দাবী করে। এদের মগজে ঘিলুর পরিবর্তে কাঁচা গোবর থাকে। নিজেরা গু গোবর খায়, পুজো এলেই জনগণকে গরু ও বাঁদরের মত শাকপাতা খেতে বাধ্য করে, তালিবানি ফতোয়া জারি করে। যে হিন্দু ধর্ম নিয়ে সারাদিন চেঁচায় মাতা’ রবে এলাকা অতিষ্ট করে রাখে, সেই ধর্মের কোনো বই এর নূন্যতম ১ পাতাও সারাজীবনে পড়ে দেখেনা। ধর্ম নিয়ে কোনো প্রশ্ন করলে ‘পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেবার হুমকি দেয়’যেকোনো পরিস্থিতিকে এরা দাঙ্গায় পর্যবাসিত করে দিতে পারে, ধর্ম নিয়ে সুস্থ স্বাভাবিক আলোচনা হলে ১ মিনিটের মধ্যে এরা গালাগালাজে নেমে আসেমোদীজিই এদের একমাত্র বিশ্বাস ও আস্থার স্থান, উনিই সবকিছুর আধার। এরা মূলত কল কারখানায়, ট্রেনে বাসে আর চায়ের দোকানের মত নানান ভিড়ের মাঝে দলবেঁধে থাকে।

) হিংস্র ভক্তঃ এরা অশিক্ষিত ভক্তদেরই অনুরূপ, শুধু হিংস্রতা’ গুণটা এদের আলাদা করে দেয়এদের কাছেও ধর্ম=মোদী, অতএব মোদীকে কিছু বলেছে বা যোগী, কিম্বা RSS এর সমালোচনা করেছে- ব্যাস; লাঠিসোঁটা, রামদা, টাঙ্গি, তরোয়াল বা কাট্টা বন্দুক দিয়ে ‘গোলি মারো শোলোকো’ গায়েত্রী মন্ত্র জপতে জপতে খুনোখুনি শুরু করে দেয়। সনাতন ধর্ম বিষয়ে বিন্দুমাত্র জ্ঞান না থাকলেও, নিজেদের ধর্মের রক্ষক হিসাবে দাবী করে এবং খুন, জখম, রাহাজানি করাটাকে পবিত্র কর্ম মনে করে। ধর্মীয় দাঙ্গা হচ্ছে এদের তীর্থক্ষেত্র। ধর্মের নামে হত্যা করা এদের কাছে পূন্যার্জন। মুসলমান ও ছোট জাতের হিন্দুরাই এদের মূল শত্রু, এদের নিকেশ করাটাই এদের ব্রত।

আজকের চরম পুঁজিবাদী অতি দক্ষিণপন্থার অন্ধ রাজনীতির যুগে, দেশে দেশে এই ধরণের ভক্তেরা বিরাজ করছে। দেশে ভেদে তাদের নাম আলাদা আলাদা। ক্রণি ক্যাপেটালিজম তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ধর্মের মোড়কে এই জম্বি জাতকে জন্ম দেয়, ধর্মের আরক খাইয়ে তাদের লালন পালন করে। জম্বিদের দল যখন পূর্ণ রূপে ধ্বংস ক্ষমতা অর্জন করে, তাদের দ্বারা সৃষ্ট বিনাসের রক্ত পান করে পুষ্টি নেয় পুঁজিবাদ।

প্রাচীন গ্রীক, রোমান, মিশরীয় সভ্যতা থেকে বিগত শতকের হিটলার, মুসোলিনি বা তোজো- এরাও প্রত্যেকে নিজেদের ভক্ত সমাজ তৈরি করেছিলো। ইতিহাস সাক্ষী, বর্ষার ব্যাঙের ছাতার মতই এদের আয়ুষ্কাল অতি স্বল্প ইতিহাসের নিরিখে। জন্মায়, হানাহানি করে আবার ইতিহাসের অতল গহ্বরে বিলীন হয়ে যায়এই ভক্তরাও একদিন বিলীন হয়ে যাবে কালের আস্তাকুড়ে, আমাদের প্রজন্ম অনেক ভাগ্যবান যে, ভক্তদের মত ইতিহাসের দুষিত জীবানুদের সাথে লড়ে টিকে থাকার সুযোগ পেয়েছি। আমাদের উত্তরপুরুষ নিশ্চিত এ নিয়ে গর্ব করবে।

আপনার কাছে অষ্টম প্রজাতির সন্ধান থাকলে জানাবেন, আমার এই গবেষণাপত্রে জুড়ে নেবো।

বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৫

গণিতশিক্ষা

 

তখনও আমাদের এলাকাতে বিদ্যুৎ আসেনি, ওই নব্বই এর দশকের গোঁড়ার দিককার কথা। সন্ধ্যায় হ্যারিকেনের টিমটিমে আলোতে খানিক ঢুলুনির পড়া- দুলে দুলে পড়ে ছাদে চলে যাওয়া, ওখানেই দাদু ক্যাম্পখাট বিছিয়ে শুয়ে শুয়ে আকাশের তারা দেখতো। বাসু, পঞ্চানন, আল্লারাখা, নেপাল, মজনুর কেউ কেউ বা সব কজন মিলেই কেউ হাতপাখার বাতাস করত, কেউ বা হাতপা টিপে দিতে দিতে দাদুকে কোম্পানি দিতো। কখনও কালী নগরের চাষা বিষ্টু পাল, কখনও হাটের কেষ্ট ময়রা, কখনও ইস্কুল পাড়ার দুর্গা মাস্টার সঙ্গ দিতো, কিছু রেশনের মাল ফ্রিতে পাবার আশাতে। বুশ কোম্পানির একটা খাঁটি বিলাতী রেডিওতে সর্বক্ষণ বাজত, ঠুংরি, গজল, আধুনিক, লোকগীতি থেকে গজল, কীর্তন, কাওয়ালি সবই। মাঝেমাঝে সংবাদের সময় ভলিউমটা বেড়ে যেতো, তারপর আবার সেই একটানা শান্ত লয়ে ফিরে যাওয়া। বৃষ্টির দিন বাদে, মোটামুটিও সারাবছরই এই আসর জমত এক অদ্ভুত মৌতাতের সাথে।

ব্যবসায়িক মানুষের সারাদিনের উদয়াস্ত নানান কাজের শেষে এটাই ছিলো নিখাদ অবসরের সময়। যারা এই আসরে থাকত তারা অধিকাংশই ভৃত্য শ্রেনীর আর উমেদার গোছের মানুষ, তবে রোজই এক বা একাধিক সাহায্যপ্রার্থী ভদ্রজন পরিস্থিতির দায়ে কাঁচুমাচু মুখে ক্যাম্প খাটের পাশে রাখা হাতল ওয়ালা কাঠের চেয়ারে বসত, বাকিরা ফরাশ ঢালা খেজুর পাতার মাদুরে। ভৃত্যদের দল অবশ্যই ছাদের মেঝেতে বসত। পাশেই দেবনাথ স্টোভে আগ্নেয়গিরির মত সর্বদা ফুটত চায়ের দুধ, জনতা স্টোভের নবদ্বীপীয় সংস্করণ ছিলো এই দেবনাথ স্টোভ। নিজেদের রেশন দোকান হেতু কেরোসিনের কোনো অভাব ছিলোনা, না চিনির ঘাটতি ছিলো, গোয়ালে খান বিশেক দুধেল গাই- শুধু চা টা বাইরে থেকে কিনতে হতো। এর মধ্যে ‘ডাকু সমর সেন’ এর টোঙ থেকে চপের বিবিধ পসরা আসত, সাধুচরণের ঘুগনি, আর কালুর দোকান থেকে গরম গরম রসগোল্লার সাপ্লাই আসতেই থাকত। ডায়াবিটিস বা কোলেস্টেরল মত বিদেশী রোগের নাম এ অঞ্চলে তখনও আবিষ্কারই হয়নি।

ও হ্যাঁ, সমর সেন কেন ডাকু তার আলাদা গল্প আছে, রাত ১০টার মধ্যে তেলেভাজার দোকান বন্ধ করে নিয়মিত শুঁড়িখানায় গিয়ে চোলাই পান করত। সাথী ছিলো কাঞ্চনতলার বিষে মাতাল, মোল্লারবিলের অতুল, বারোয়ারীতলার কানা পটল, চাষাপাড়ার পরেশ পালের মত অনেকে। ঘন্টাখানেকের মধ্যে সকলেই মিছিল করে ভোর রাত অবধি পাকা রাস্তা জুড়ে তাদের মাতলামির পালাগান চালাতো। আমার দেখা মতে এরা কারোর কখনও ক্ষতি করেনি, রাত্রের ওই শব্দ উপদ্রব টুকু ছাড়া। প্রতিটা মাতালের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট ছিলো, ছিলো আলাদা আলাদা কাণ্ডকারখানা, সে গল্প আরেকদিন বলা যাবে। সমর সেন ছিলো দিনের বেলায় পেশাদার রাঁধুনি ঠাকুর, বিয়ে, শ্রাদ্ধ এমন অনুষ্ঠান বাড়িতে তাকে পাওয়ার জন্য রীতিমত ৩ মাস আগে বায়না করতে হতো, আর সন্ধ্যায় কালীতলা প্রাইমারি স্কুলের সামনে চপের দোকান দিতো। কিন্তু মদ পেটে গেলেই ইনি মনেপ্রাণে ডাকাত সর্দার হয়ে যেতো, বনবন করে একটা কঞ্চি বা ঢোলকলমির লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে ভোররাত অবধি এলাকার অলিগলি দিয়ে নেশার খেয়ালে ছোটাছুটি করতে করতে হাঁক পারত- হুঁশিয়ার, ডাকু সমর সিং, হুঁশিয়ার। এই এক লাইনের ডাইলোগ হাজার বার আউড়াতো, সেন বদলে যেতো সিং এ। রোজ সকালে তাকে কোনও না কোনো খাল বা নয়ানজুলিতে আবিষ্কার করত ভোরের বেলা মাছ ধরতে যাওয়া বাগদিদের দল। এই ছিলো সমর সেনের কাহিনী।

আমার দাদু, তার পাঁচ ছেলের একটাকেও তিনি মানুষ হওয়ার যোগ্য মনে করেননি আমৃত্যু, ফলত কাউকেই তিনি নাম ধরে ডাকতেননা, অমুকের বাচ্চা তমুখের ছেলে যোগে প্রত্যেকেরই একটা নাম খাস্ত করা ছিলো। জ্যেঠুর নাম বড় পাঁঠা, বাবার নাম তোতলা, সেজো কাকার নাম কানপচা, ন কাকার নাম ডোম, ছোট কাকার নাম ফেউ। পিসিদেরও এমন নাম ছিলো, এমনকি প্রতিটা জামাই এরও। জ্যেঠু প্রফেসর হয়েছিল শুনে ডুকরে কেঁদে উঠেছিল বেচারা। সেজদাদু উচ্চপদস্থ সরকারি আমলা চছিলেন বলে তিনি একপ্রকার অচ্ছুৎ নিম্নবর্গীয় ম্লেচ্ছ জাতের ছিলেন বাড়িতে। দাদুর প্রতাপের সামনে দাড়াবে সে মুরোদ কারো ছিলোনা। বাবাকেও চাকরি করতে দেননি, ছোটকাকা রীতিমত পালিয়ে গিয়ে আর্মিতে যোগ দেন। দাদুর একটাই সরল দর্শন ছিল, ব্যবসা কর, টাকা কামাও- লোকের চাকর হবি ক্যেনে হে…, ইত্যাদি।

স্বভাবতই বাবা-কাকাদের সাথে দাদুর সম্পর্ক ছিলো অহি-নকুলের, কখনও কাউকে সুস্থ স্বাভাবিকভাবে দাদুর সাথে কথোপকথন করতে দেখিনি। একবার হিন্দুও হতে চেয়েছিলেন যাতে ছেলেদের ত্যাজ্য করা যায়, কারন ইসলামে সেই সুযোগ নেই। হাল জোতার কাজ করা করিমের বামন আধপাগলা ছেলে- কইসারকে প্রায় দত্তক নিয়েই ফেলেছিলেন আরকি! শেষে বটুকেশর মোক্তার বুঝিয়ে শুনিয়ে ক্ষান্ত করেন কর্তাকে। আরেকবার রেগে গিয়ে ঝাড়খণ্ডের কোনো এক এলাকা থেকে হতদরিদ্র কুর্মি ও চৌধুরীদের আন্ডাবাচ্চা সহ প্রায় দেড় ডজন পরিবারকে হাজির করলেন, এবং তাদের থাকার জন্য জমি ও রোজগারের কাজ দিলেন ক্ষেতে আপিসে। শর্ত একটাই, ওনাকে রাজা সাহেব বলে ডাকতে হবে। কয়েক বছর মিছিল করে সকালে তারা রাজা সাহেবকে প্রদক্ষিণ করত, শুরুতে বিষয়টা হাস্যকর লাগলেও ক্রমশ সয়ে গিয়েছিলো। আজও আমাদের গুল ফ্যাক্টারির গায়ে এই প্রজাদের দল বাস করে। এই প্রজারা ওনাকে নিয়মিত নজরানা দিতো, পুঁইশাক, কলাই এর ডাল, কাঁচা ভুট্টা, লাউ, ওল, শীতের সময় নানান পিঠে, খেজুর গুড় ইত্যাদি। সন্ধ্যার আসরে তারা মাঝেমাঝেই গাঢ় ঘণ দুধ দিয়ে যেত, সাথে গুড় আর ছাতুর নাড়ু, ঘরে বানানো বোঁদে জাতীয় মিষ্টান্ন, চিনেবাদাম ভাজা- হরেক রকমের আইটেম দিয়ে তাদের ‘রাজাসাহেব’কে খুশ করে দিতো।

সান্ধ্যকালীন ওই ছাদ আসরটা ছিলো জ্ঞানের খনি, এক তো সকলে সারাদিনের কাজের বর্ননা দিতো। মুন্সী, খাজাঞ্চির, দস্তিদারের দল ওখানে এসেই তাদের সারাদিনের হিসাবের ফিরিস্তি শোনাতো অনেকদিন। আমাদের মসজিদের ছোট মৌলানা মনসুর সাহেব আসতেন ‘বড় কর্তাকে’ নসিয়ত করতে। কখনও কখনও মুসাফিরের দলের কাউকে ছাদে ডেকে নিয়ে তাদের থেকে নানান গল্প শুনতেন দেশ বিদেশের। তেমনই একজন আসতেন দস্তগীর সাহেব নামে, ইয়া লম্বা দশাসই ফর্সা চেহারা, মাথায় সবুজ সিল্কের কাপরের ফেট্টি, লম্বা কালো দাঁড়ি, গোঁফ হীন মুখেমন্ডলে দু’চোখে মোটা সুর্মার রেখা। হাতে গোনা যে দু একজনকে দাদু সামান্য শ্রদ্ধা ভক্তি করতেন তার মধ্যে ইনি ছিলেন। কেউ বলত তার বাড়ি নাকি সেই ইরাণ দেশ, কেউ বলতো আরব মুলুক, কেউ নাকি তাকে আজমীঢ়ে এমনকি পাথরচাপড়িতেও দেখেছে- জ্বীন পোষা আছে। যারা ওনাকে সহ্য করতে পারতনা, তারা বলত ব্যাটা নাকি মুর্শিদাবাদের খুনে আসামি, পুলিশের ভয়ে ভেক ধরেছে।

এই প্রসঙ্গে যে কথাটা না বললেই নয়, তা হলো দাদুর উপাস্য। আমাদের মাদ্রসার হেড মৌলানা নঈম সাহেব কবে নাকি দাদুকে একবার সাহস করে বলেছিলেন- চাচাজী, আপনার তো সব ফরজ হয়ে গেছে, তা নামাজ রোজাটা…, দাদু বাকীটা আর শোনেননি। এবং ফরজ শব্দের মানে তার নিজের অভিধান মাফিক করে নিয়েছিলো, এর পর থেকে ঈদ বকরিদের নামাজ টুকু ছাড়া আর কিছুই করতেননা ধম্মকম্মের কাজ। শুধু বলতেন, তার তো সব ফরজ হয়ে গেছে, নঈম বলেছে। দাদুর ঘরে পূবের দেওয়াল জুড়ে ইয়াব্বড় একটা মোটা কাপরের উপরে আঁকা রঙচটা ডমরুধর নটরাজের ছবি টাঙানো ছিলো। ওনার আইডল ছিলো হিটলার, তার মত মাছি গোঁফ লালন করে গেছেন সারাজীবন।

আমরা সকল ভাইবোন ও আমাদের সমবয়সী বাবার তুতো ভাইবোনেরা মিলে সর্বক্ষণ ওই ছাদের আসরে যাবার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকত, যেন তেন ভাবে পড়া শেষ করেই দে ছুট। যেতে দেরি হলে দাদুই কাউকে না কাউকে দিয়ে সমানে তাগাদা দিতেন হাজির হওয়ার জন্য। মা কাকিমারা দালান বাড়িতে চলে যেতেন হেঁসেল সামলাতে, ব্যাস আমাদের আর বাঁধে কে! আসরের প্রধান আকর্ষণ হিসাবে তেলেভাজা, ঘুগনি, গরম রসগোল্লার নৈবিদ্যি তো ছিলোই, তার সাথে ছিলো বিড়ি খাবার বিষয়টা। ওটাই ছিলো শো স্টপার। ওই আসরেই নানান ধরণের জীবনশিক্ষার ক্লাস হত, বিড়ি টানাটাও তার মধ্যেই ছিলো। স্বভাবতই প্রত্যেক বোনেরাও সে বয়সে বিড়ি টানাতে উস্তাদ হয়ে গিয়েছিলো। বাবা কাকারা এসব তুচ্ছ বিষয়ে কখনই গুরুত্ব দিতেননা, মা কাকিমারা দাদির কাছে গজগজ করে তাদের রাগের বহিঃপ্রকাশ করত আর ওছিলা পেলেই আমাদের ধরে পেটাতো। দাদুর সামনে সে কথা বলার সাহস কারোরই ছিলনা।

বেলতলার পালবাড়ির শীলা পিসি আমার কাজরী পিসির ক্লাসমেট ছিলো, সান্ধ্য আসরে আমাদের উচ্ছুন্নে যাওয়া দেখে মা কাকিমা দাদি পিসিরা মিলে শলা করে শীলা পিসিকে আমাদের টিউশনি দিদিমনি নিযুক্ত করলেন। রাত হয়ে যাওয়ার দরুন পিসিকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য দাদুর চৌধুরী প্রজাদের মধ্যে থেকে রামখিলোয়ান আর পাষাণ সিং কে পাহাড়াদার নিযুক্ত করেছিল দাদি। সেই টিউশনিও ৩ মাসের বেশী টেকেনি, দাদু জানতে পারার একমাসের মধ্যেই টিউশনি গোল্লায় গিয়েছিলো। একদিন দাদু শুধালেন, হ্যাঁরে হাফ পচা, এটাই আমার দাদুর দেওয়া নাম ছিলো। যাই হোক, দাদুর প্রশ্ন ছিলো- অধরের বেটির কাছে আমরা কী ধরণের পড়াশোনা করতাম! বললাম, গণিত, বিজ্ঞান আর সাধারণ জ্ঞান। একদিন সান্ধ্য আলাপ শেষ হওয়ার আগে মেয়েদের সকলকে নিচে পাঠিয়ে দিয়ে দাদু বললেন- বিয়ে কর, গণিত শিখে যাবি।

শুরুতেই বলেছি, বিভিন্ন বয়সি, ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক তবকার মানুষের সে এক আজব আড্ডাখানা ছিলো, রীতিমতো জ্ঞানের বিরিকণ হতো নানান অলঙ্কারের সহিত। কারো একটা এজাহারকে কেন্দ্র করে আসর শুরু হতো, এবারে চক্রাকারে আলাপ পাক খেতে খেতে জমে উঠত, উমেদার মোসায়েবের দল হৈ মেরে উঠত। দাদু বললেন, কিহে পশুপতি- এ বিষয়ে তোমার কী রায়! পশুপতির থালাবাসনের দোকান বর্ধমান শহরের কোথাও একটা, কর্তার তেজারতির ব্যবসার তামাদি হয়ে যাওয়া কাঁসা, পিতলের থালা বাটি গ্লাস কিনতে আসত মাসে এক দুই বার। তিনি বললেন, আজ্ঞে গণিতের বিষয়ে কর্তার চেয়ে আর পারদর্শী কেউ বা আছে! পরশুরাম দেবনাথ নিম্ন বুনিয়াদী পাঠশালার শিক্ষক, কন্যাদায়ের সাহায্যপ্রার্থী হেতু সদ্য মোসায়েবের দলে নাম লিখিয়েছে। কালনা কোর্টের পেসকার মনোতোষ ঘরামী, জমি মাপা আমিন সইফুল্লা উকিল, পাটের আড়ৎদার রাসু ভাদুড়ি, জমির দালাল মিহিজাম মুৎসুদ্দি, ইমারতি দ্রব্যের দোকানি পরিমল ঘটক, হোমিওপ্যাথি ডাক্তার তারাচরণ ভচ্চাজ্জ্যি সহ এমন অনেকেই নিজ নিজ উদ্দেশ্যে মণ্ডলীতে উপস্থিত হতো। সকলেই কিছু কিছু চটুল রসিকতা করলেও তার স্বর বেঁধে দিতো কর্তার সেই দিনের মেজাজ। তাই আড্ডা অবিচল থাকলেও মোসায়েব গুলো ঋতুর মতই বদলাতে থাকত।

বিপদতারণ সামন্ত ছিলো স্যাকরা, তিনিও কোনো উদ্দেশ্যে সেদিন হাজির ছিলো। সে নিক্তি মেপে ভরিতে সোনা কেনাবেচা করে অভ্যস্ত, সূক্ষ্মতা তার স্বভাব গুণ, তিনিই বিষয়টা আরো গভীরে নিয়ে গিয়ে ব্যাখ্যা করলেন। বিবাহিত পুরুষ যতই বার, তিথি, নক্ষত্র, যোগ, করণের ‘পঞ্চাঙ্গ’ মিলিয়ে পঞ্জিকা দেখে গননা করুক, ২৩ দিনের বেশী কিছুতেই হাতে পাবেনা মাসে। বাদ যাওয়া ৭ দি কালহরণ দশা, রক্তারক্তি বিষয় আরকি। দাদুর দুটো গুণ ছিলো অনন্য, যেমন সিমাহীন খিস্তিখেউর করতেন কারনে অকারনে, পাত্রমিত্রের ফারাক না করে; তেমনই অকারতে দান করতেন জাত ধর্ম বর্ণ বাছবিচার না করে। রেগে গেলে গালিগালাজ করতেন, আনন্দে ফুর্তিতে গালিগালাজ করতেন, টেনশনে গালিগালাজ করতেন, অসুস্থতাতে গালিগালাজ করতেন, শোকেও গালিগালাজই ছিলো তার যাবতীয় আবেগ প্রকাশের ভাষা।

কর্তা তোফা বলে কয়েকটা বাছা খিস্তি মেরে উঠতেই মোসাহেবের দল চাটুকারিতার জন্য তৃপ্তির সাথে পুণ্যবান হৈ মেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলো। এক্ষেত্রেও বিপদতারণ অমুখের ভাই শব্দে ভূষিত হলে সম্মানের সহিত। মধুকর হালদার কিছুটা ঠোঁটকাটা ছিলো, যেন দুধের মাছি। তার পেশা ছিলো অভাবি লোককে খুঁজে খুঁজে তাকে চড়া সুদে টাকা ধার দেওয়া, অনাদায় হলেই লেঠেল দিয়ে ভিটেমাটি দখল করাই ছিলো তার মূল কাজ। এর জন্য বড়কর্তার আশির্বাদ অত্যন্ত জরুরি, দারোগা সামাল দেওয়া থেকে শুরু করে মামলা হলে মুন্সেফ এজলাস বা মোক্তার সামল দেওয়া লাগতো। এ ছারা সারাবছর ভুষি মাল আর দাদনের অর্থের যোগানের জন্য এলাকাতে কর্তার দ্বিতীয় বিকল্প ছিলোনা।

হালদার মশাই বললেন- ওই ২৩ দিনেও কী রক্ষে আছে বিপদ ভায়া, মাগীদের নানান ছুতো আর নক্সা। কবে কবে মাথার ব্যামো, কবে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাওয়া, কবে তার তিরিক্ষি মেজাজ, কবে আবার মন খারাপ, কবে গরম লাগা, আবার কবে শীতের কাঁপুনি, বাপের বাড়ি যাওয়া, সই আসা, ছেলে কেঁদে মায়ের পাশে শুয়ে পরা, বাড়িতে অতিথি আসার দরুন পেরেসানি, মড়া বাপ মায়ের কথা মনে পরার বেদনা, তার উপরে শুয়োছো কি শোওনি হরদম পোয়াতি হয়ে যাবার ঝক্কি- এ সব বিবিধ ধরণের জটিল গণনা যুক্ত হিসাবনিকেশ হলো এই বিয়ে। পাঁজি জ্যোতিষ মিলিয়ে মাসে সাকুল্যে ৪-৫ দিন পাওয়া যায় খুব বেশি হলে। এটা সম্ভাব্যতা মাত্র, এবারে নিজেকে সেই সম্ভাব্যতা সাথে জরিপ করে কার্যসিদ্ধি করতে হয়। এর পর যদি সামান্য অশান্তি টুকুও হয়েছে কী হয়নি, অমনি মাগীরা গোসাঘরে খিল আঁটে। লগ্ন বয়ে গেলেও, হপ্তাগুলো ঝিলিক মেরে কোথাদিয়ে যে নিকেশ হয়ে যায়, টেরই পায়নামাগী মটকা মেরে এক কাতে সারারাত পাশে শুয়ে থেকে হাড় মটমটে রোগ বাঁধালেও, মুখ ফুটবেনা গয়না বা শাড়ির উৎকোচ বিনা। এটা আমার তৃতীয় পক্ষ, সব এক জাত, এক রোগ। অতএব উপবাসি জীবন রে ভায়া, পুরুষের জীবনটাই এমন কঠিন আঁক কষতে কষতে ফুরিয়ে যায়। আর এভাবেই প্রত্যেকটা মরদ মানুষ অশিক্ষিত হলেও গণিত ঠিকিই শিখে যায়।

আজকে আমি নিজেই চল্লিশের গন্ডি ছুঁয়েছি, বেঁচে থাকলে আগামী এক দশকে আমিও দাদু হয়ে যাব। পেশাদার জীবনের বাধ্যবাধকতায় বছরের অর্ধেক দিন বাইরে বাইরেই কাটে, এর মাঝে যে কটা দিন ঘরে ফিরি- ন্যাতানো জীবনে কখনই স্ত্রীর গণিতের সাথে আমার গণিত মেলাতে পারিনি। সে আপনি যতই বীজগনিত, জ্যামিতি, পরিমিতি, ক্যালকুলাস বা লগারিদম ব্যবহার করুননা কেন, কোনো রসায়ন কাজ করেনা। পুরুষ মানুষের জীবনে এসব শিক্ষা নুন্যতম কাজে লাগেনা- স্ত্রীচরিত্র গণনায়

আমাদের শিক্ষা জীবনে ইস্কুলে যা কিছু শিখেছিলাম তার প্রায় কোনো কিছুই কাজে লাগেনি দৈনন্দিন জীবনের আবর্তে। তারচেয়ে বরং দাদুর সাথে সান্ধ্য মন্ডলীর ওই খেউর আড্ডায় শেখা গণিত, ভূগোল, ইতিহাস, নীতিকথা গুলোই অনেক কার্যকরী এই পোড়ার জীবনে।

 

বুধবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৫

শুন্য পকেটের তৃপ্তি


স্কুল জীবনে বন্ধুদের সাথে কাড়াকাড়ি করে আলু কাবলি খাওয়া, আর চালসের কোঠায় ঢুকে যাওয়া হাফ বুড়ো বয়সের জীবনের আলুকাবলির স্বাদ কখনই এক নয়। শুধু স্বাদই বা কেন, উৎসাহ আর আনন্দের মাঝেও আকাশ পাতাল তফাৎ। ছোটোবেলায় কখনই হাতে টাকা থাকতনা, দিনে বড়জোড় আটআনা পাওয়া যেতো চেয়েচিন্তে, উৎসবে অথিতিদের দেওয়া উপহার দরুন টাকা আর সময় সুযোগ বুঝে মায়ের কৌটো থেকে চুরি, এটিই ছিলো সাময়িক আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের একমাত্র উৎস।

ইস্কুলের সামনে নারান ঘুগনি, বিলাতি আমড়া, টোপা কুল, কদবেল, কামরাঙ্গা এইসব বেচতো। একটু দূরে হরণ দাদু বেচতো আলুকাবলি, এদিকে মেয়েদের ভিড় তুলনামূলক কম হওয়াতে আমরা আজন্ম হা-ঘরের দল সেখানে সকলের পুঁজি যোগ করে আলুকাবলি কিনতাম। সেই পুঁজি কখনই দেড় টাকা ক্রশ করেনি, কারন আমি, গৌরাঙ্গ বা প্রদীপ গরীব ছিলাম, বাকি ৩-৪ জন ছিলো নিঃশ্ব। সেই আলুকাবলির উপরে কাঁচা ছোলা ছড়িয়ে দিতো, ছোট বকুলতলার ছায়াতে বসে আমরা কী যে পরম তৃপ্তিতে ওই টুকু পরিমান ৬-৭ জন ভাগ করে খেতাম তা আজ ভাবলে কেমন একটা মিশ্র ভাললাগার অনুভুতি কাজ করে। আমিনিয়া বা করিমসে বসে একটা ডিনারে ৬০০০ উড়িয়েও আজকাল সেই সুখকর পরিতৃপ্তি আসেনা।

আমাদের ছেলেবেলাতে ঘর থেকে টিফিন নিয়ে যাবার আয়েসি বড়লোকি আনা ছিলোনা। একান্নবর্তী সংসারে মা কাকিমারা দম ফেলার ফুরসৎ পেতোনা হেঁসেল থেকে, তার উপরে ঠাকমার চোখ এড়িয়ে আলাদা কিছু বানাবার সাহস টুকুও মায়েদের ছিলোনা। তাই দুই চার আনার পুঁজিতে ইস্কুলের বাইরের ওই ফেরিওয়ালারাই ছিলো আমাদের টিফিনবেলার আপনজন।

এক সময় কত স্বপ্ন দেখতাম, বড় হয়ে ঘুগনিওয়ালা হবো। নিজের হাঁড়ি হাঁড়ি ঘুগনি থাকবে, যা বিক্রি হবে হবে, নাহলে আমিই খেয়ে নেবো, কিছুটা বোন আর বন্ধুদের দিয়ে।

তবে সেই ঘুগনিওয়ালা না হলেও, হোটেলের ব্যবসার সুত্রে প্রায় প্রতিটা হোটেলেই ব্রেকফাস্টে লুচির সাথে সপ্তাহে ৩ দিন ঘুগনি হয় বটে, কিন্তু সেই হাঁড়ি ধরে সবটা খাওয়ার বাসনাটা আজ হারিয়ে গেছে।

আজকের আলুকাবলিটা মা বানিয়েছেন। ডায়াবিটিসের জন্য নানান বিধিনিষেধ, তবুও এই সান্ধ্য আলো আঁধারিতে আলুকাবলির পথ বেয়ে ইস্কুলের দিনগুলোতে ফিরে যেতে একটু নাহয় অনিয়মই করলাম-

বিচারব্যবস্থার প্রতি 'সনাতনী' অনাস্থা

 


দুটো ভিডিও, একটাতে সেই বৃদ্ধ, যে মাননীয় প্রধান বিচারপতির দিকে জুতো তাক করে মেরেছে। দ্বিতীয়টি তার, যে ক্রমাগত উস্কানি দিয়ে যাচ্ছিলো এমনটা করার জন্য। উস্কানি অবশ্য সে একা দেয়নি, এর মত অন্তত ১০ জন আছে, যারা প্রকাশ্যে বিচারপতির বিরুদ্ধে হামলার কথা বলেছে।
উমর খালিদ বা গুলফিজার মত এরা মুসলমান নয়, নাহলে দেশের বিচারব্যবস্থা দেখিয়ে দিত তারা কতটা ক্ষমতাবান। আগামী ৫ বছর ধরে জেলে পচলে বাকিরা বুঝে যেত জুতো ছুটলে কী পরিনাম হয়, বিনা ট্রায়ালেই ৫ বছর কাবার। এরা হয় ডাইরেক্ট সঙ্ঘ পরিবারের বা তাদের ঘনিষ্ট, তাই বিচার ব্যবস্থার চোখে ঠুলি, শরীরে বাতের বেদনা, কানে জল, মেরুদণ্ডে পুঁইশাক, আর অন্ডকোষের নিরিখে বিচিহীন খাসি।
কদিন আগেই মাননীয় প্রধান বিচারপতির মা এর RSS সভায় অতিথি হিসাবে যাবার এক চরম আলোচনা উঠেছিলো। চতুর্দিকে ছিঃ ছিঃ রব, আম্বেদকর পন্থী বলে দাবী করা পরিবারের কেউ কীভাবে মনুবাদী সংগঠনের সভাতে যেতে পারে ইত্যাদি। বেগতিক বুঝে মূল অনুষ্ঠানের দিনের দিন সকালে মাননীয় 'মা' প্রোগ্রাম ক্যান্সিল করেন। এই হচ্ছে চুম্বকে গল্প।
আজকাল মোদীর ভারতে RSS যোগ ছাড়া কোনো পদ পাওয়া যাবেনা, সে বিচারপতি হোক বা আমলা কিম্বা উপাচার্য্য। সামান্য কেরানির চাকরিতেও অগ্রাধিকার RSS. সেখানে রঞ্জন গগৈ বা চন্দ্রচূড়ের মত নিকৃষ্ট মালগুলোর সাথে RSS এর ঘনিষ্ট যোগাযোগ প্রমানিত। এখন 'মা' এর যাওয়া নিয়ে বর্তমানের উপরে সরাসরি স্বয়ংসেবকের ছাপ পরে যাবার উপক্রম হয়েছিলো।
এটাকেই ধামাচাপা দিতে, বা চাক্ষুসভাবে RSS এর সংযোগ ফারাক দেখাতে- এই জুতো ছড়ার আয়োজন ছিলো কিনা কে জানে! তবে নাথুরাম গডসের সাথে এই বৃদ্ধের কোনো ফারাক নেই, জুতোর বদলে কেউ যদি বন্দুক তুলে দিতো উনি সেটাই ছুড়ত। RSS এর প্রতিটা শাখা সংগঠনে এই জুতো ছোড়াকে সেলিব্রেট করা হচ্ছে সোৎসাহে ইভেন্ট বানিয়ে। এই কারনেই RSS বিষাক্ত।
আর বিচার ব্যবস্থাকেও একটা কথাই বলার, এতো লুকচুরি কেন, আমরা রামভক্ত গোপালকে যেমন দেখছি তেমনই সঙ্ঘ ঘনিষ্ট বিচারপতির ঘরে অবৈধ টাকার পাহাড় পাওয়া গেলেও তাকে বুক ফুলিয়ে হাকিমগিরিও করতে দেখছি। এতো ঘোমটার দরকারটা কী, খ্যামটাই তো নাচছেন, প্রকাশ্যেই নাচুন।

মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৫

বিল্বমঙ্গল

 


(১)

সেটা ২০০৮ এর শেষ নভেম্বর কী ডিসেম্বরের শুরু নাগাদ হবে। তখন রমরমিয়ে চলা রাইসমিলের সাথে চাল এক্সপোর্টের জাঁকানো ব্যবসা। আমরা মূলত দুবাই এর এজেন্ট দের LC মারফৎ CIF পশ্চিম আফ্রিকার কোনো বন্দরে মোটা চাল পাঠাতাম। কখনও কখনও আতপ চালের অর্ডারও আসত, সেই সুত্রে আমাদের হয় ছত্রিশগড় কিম্বা অন্ধ্রপ্রদেশ দৌড়াতে হতো, কোন বন্দর দিয়ে এক্সপোর্ট হবে তার উপরে নির্ভর করে। সেবারে আতপের অর্ডারটা বেশ মোটা ছিলো, তাছাড়া ভাইজাক পোর্টে নতুন এক ক্লিয়ারিং এজেন্ট নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে নিজেকে যাওয়ার প্রয়োজন দেখা দিলো।

দাক্ষিণাত্যের এই দিকটাতে এলে সর্বক্ষণ যেন ইতিহাসের পথ বেয়ে হেঁটে চলি অবচেতনে। অন্ধ্রের এই অঞ্চলগুলো কতই না সাম্রাজ্যের সাক্ষী, কখনও নন্দ ও মৌর্যদের অধীনে ছিল। কখনও সাতবাহনদের, মাথার রাজবংশ, ইক্ষ্বাকু, কাকতীয়, বিষ্ণুকুণ্ডিনদের শাসনে সেজে উঠেছিলো। চালুক্যদের পুলকেশী, বিষ্ণু বর্ধন, চোলা সাম্রাজ্য, নাম গুলো শুনলেই গায়ে কাঁটা দেয়। কত শত শাসক কত শত বার এই অঞ্চলের উপর আধিপত্য পেতে যুগে যুগে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে রাজত্ব বিস্তার করেছিলেন, সকল প্রতাপকে মিথ্যা প্রমাণ করে আবার তারা কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এলাকার প্রতিটি নদী, প্রতিটা পাহাড়, প্রতিটি ধূলিকণা সেই ইতিহাসের সাক্ষী। অতীতের উত্তরাধিকার নিয়ে আজও জনপদ গুলো সেই দিনের মতই সজীব আর প্রাণবন্ত।

অন্ধ্রের পূর্ব গোদাবরী জেলাকে চালের বাটি নামে ডাকা হয়, স্বভাবতই রাজামুন্দ্রি শহরে সেখানকার মূল চালের গদি গুলো অবস্থিত। আমাদের গন্তব্যও সেখানে, সঙ্গী আমার এক একাউন্টেন্ট কাম এ্যাটেন্ডেড জনা। জনা জাতে উড়িয়া, মিশমিসে কালো, গাঁট্টাগোট্টা ও প্রচণ্ড ধর্মভীরু। পুরো নামটা বড় বিচিত্র ‘জনাঞ্জলী ভয়’, এর কান্ড কারখানা নিয়েই একটা গোটা উপন্যাস লেখা যায় ‘ভয়’ নামে। আমাদের মিলের বিনোদ সর্দারের মজুরদের খাতা লেখার কাজে এসেছিলো। অত্যন্ত গরীবের ছেলে, বাপ মরে যাওয়াতে একাউন্টেন্সী নিয়ে আর বি-কম পাশ করা হয়ে উঠেনি। খাওয়া থাকা মাসিক ৩৫০০ টাকায় খাজাঞ্চীর চাকুরি। মিলে আসার বছর দেড়েক পর আমি তাকে কিছুটা শিখিয়ে পড়িয়ে একপ্রকার পার্সোনাল এ্যাসিস্টেন্ট বানিয়ে নিই। অনেক কাজের সাথে রান্নাটা বড় ভালো করত সে, এটা ছিলো তাকে নিয়ে সফর করার মস্ত কারন।

হাওড়া চেন্নাই মেইন লাইনের সব ট্রেনই রাজামুন্দ্রি ছুঁয়ে যায়। শেষ নভেম্বরের ঠান্ডা- অন্ধ্রকে ততটা শীতল করেনা মধ্য বাংলার মত। রাজামুন্দ্রির বিকিকিনির কাজ ২ দিনেই মিটে গেলো, যেসব মিল থেকে শিপমেন্ট যাবে তাদের কয়েকটাতে ভিজিট করে আমরা চলে গেলাম বিশাখাপত্তনম। সেখানে আমাদের কোম্পানির এক মারাঠা ফাইনান্সারও আসবে নতুন ক্লিয়ারিং এজেন্টের সাথে মিটিং এ যোগ দিতে। ব্যবসায়ী ছাড়াও তার অন্যতম পরিচয় হচ্ছে তিনি শিবসেনা দলের ক্ষমতাবান বিধায়ক ও সঙ্ঘ ঘনিষ্ট। যথারীতি তিনি পরপর ২ বার মিটিং পোস্টপোন্ড করাতে বহুবার ঘোরা ভাইজাককে আবার একবার চষে ফেললাম। অবশেষে তৃতীয় দিনে এসে তিনি পৌঁছালেএবং স্বস্ত্রীক। মহিলাটি সত্যিকারের ‘আলফা ফিমেল’, কুতকুতে চোখ বিশিষ্ট খর্বাকৃতির মানুষটি আক্ষরিক অর্থেই জীবন্ত ফুটবল, পুরো গোল। 

আমাদের ফাইনান্সার ভদ্রলোকটির নাম ধরে নিন- গাইকোয়াড় সাহেব। সৌম্যকান্তি মারাঠা সুপুরুষ সাথে রাশভারি ব্যাক্তিত্বের। স্ত্রী সাথে আসার কারনে হোক বা ব্যবসায়িক লেনদেনের গোপনীয়তা রক্ষাত্রে; সাথে তৃতীয় কোনো ব্যাক্তি ছিলোনা, দুই মানুষে মুম্বই থেকে সোজা ভাইজ্যাক এয়ারপোর্ট। কিছু মহিলাকে দেখলেই মনে হয় ভয়ানক ঝগরুটে ও সন্দেহবাতিক, মিসেস গাইকোয়াড় সেই প্রজাতির, এবং আসলেও তাই। গাইকোয়াড় সাহেব যেভাবে মেনি বিড়ালের মত মুখ করে কুঁচকে গিয়ে বউ এর সামনে খাড়া রয়েছেন, দেখলে মায়াই হয়। এয়ারপোর্টেই আমার একদফা জিজ্ঞাসাবাদ চলল, বুঝলাম আবার আমাকে ওনার ময়না তদন্তের সামনা হতে হবে। আমি নিশ্চিত, মহিলা নিজে কোনো বড় সরকারি পদ অধিকার করে আছেন, কিম্বা এনার পিতৃকুল অমিত সম্পদশালী ও তার দৌলতেই গাইকোয়াড়- আজকের গাইকোয়াড় সাহেব হয়েছেন, সবটাই অনুমান মাত্র। নতুবা যত জাঁদরেল মহিলাই হোক, এভাবে স্বামীকে কেঁচো করে রাখতে আমি অন্তত কাউকে দেখিনি, কিছু তো স্পেশাল রয়েছেই যা গাইকোয়াড় সাহেবের নেই।

ঔরাঙ্গাবাদ আম্বেদকর মারাঠওয়াড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে M.Phil করা এই মানুষটি সত্যিই বিস্ময়। ওনার আসল ব্যাবসাই নাকি এই লগ্নি করা, কিন্তু এতো টাকার উৎস কি সেটা ঠারেঠোরে বোঝার চেষ্টা করেও কোনো তল পাইনি। বললেন, ২ দিন দেরি হওয়ার কারন নাকি লঙ্কা। CIF ইন্দোনেশিয়া না থাইল্যান্ডের কোথাও একটা বন্দরে যাবে এই শুকনো লঙ্কা, দুবাই এর এক ইজিপ্সীয় শেঠ তাকে এই ট্রান্সসিপমেন্ট অর্ডারটা দিয়েছেন। আমি যেন মাত্র ১০ কন্টেনারের এই ‘ছোট্ট’ শিপমেন্টটা উৎরে দিই। ওনার ভাষায়- জানোই তো আমার হাতে সময় কত কম। নতুন সুযোগ হাতছাড়া করার দলে আমি কখনই ছিলামনা, আর উদ্যমেও সদাই ফুর্তি। ঠিক হলো গুন্টুর যাব।

পরের দিন ভোরের ট্রেনে রওনা দিলাম, আমার ও গাইকোয়াড় সাহেব দুজনেরই কন্টাক্ট কাজে লাগিয়ে পরবর্তী দেড় দিনে গুন্টুরের লঙ্কা-কান্ড শেষ করলাম, বাকীটা ফোনে ফোনেই হয়ে যাবে। অর্ডারের ২৫ দিন পর লোডিং, তখন QC সার্টিফিকেটিং এর সময় আবার আসতে হবে। স্বভাবতই রাত্রের ট্রেনে হাওড়া ফেরার টিকিট কেটে নিলাম। সন্ধ্যায় গাইকোয়াড় সাহেব হোটেলের লবিতে চা খেতে ডাকলেন। বললেন ম্যাডাম পুজো দিতে যেতে চাইছেন, এতো কাছে এসে জ্যোতির্লিঙ্গটা মিস করতে চাইছে না। তাছাড়া গুরু প্রদোষ ব্রত পালনটাও করে নেবেন, মানত রয়েছে। আমিও ওনাকে দারুন উৎসাহ দিলাম, ততক্ষণে ম্যাডামও এসে গেছেন। হঠাৎ গাইকোয়াড় সাহেব প্রশ্ন করলেন, তন্ময় তুমি কী এ দিকটা ঘুরেছো! আমি ক্যাজুয়ালি মাথা নেড়ে না বললাম, কে জানত এটাই ছিলো ফাঁদ! ম্যাডাম সমানে তার কুতকুতে চোখে আমাকে জরিপ করে চলেছেন, এমন সময় গাইকোয়াড় সাহেব বলে উঠলেন- তুমিও কাল চলো না আমাদের সাথে। এটা অনুরোধ না আদেশ বুঝলামনা। শ্রীমতী গাইকোয়াড় সাহেবা নির্বিকার, ওনাকে মিছিমিছি বোঝার চেষ্টা করে আর অসুস্থ হতে চাইলামনা ।

আমি খেই হারিয়ে কিছু বলতে গিয়ে দেখলাম সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে। আমার ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকা দেখে গাইকোয়াড় সাহেব বললেন- আমরা একটা প্যাকেজ বুক করেছি দর্শনের, অনেকের সাথে একটা ট্রাভেলারে করে যাব গুন্টুর থেকে। তোমারা একটা গাড়ি করে নাও বরং, রিসেপসন থেকে, ওতে সুবিধা হবে। বুঝলাম আমার ইচ্ছা অনিচ্ছা সম্পূর্ণ মূল্যহীন, পরে বুঝেছিলাম গাইকোয়াড় সাহেব আমাকে কোম্পানি হিসাবে নিয়ে গিয়েছিলেন। ডিনারের টেবিলে বুকে সাহস সঞ্চয় করে, ম্যাডামের দিকে চেয়ে বললাম- গুন্টুর প্রাচীন শহর, অগস্ত্যেশ্বরি শিবালয়ম্‌ নামে অতি প্রাচীন একটি শিবমন্দির রয়েছে এখানেরিসেপশনের মেয়েটির থেকে তথ্যটা যোগার করেছিলাম, আবার ভয়ে ভয়েই বললাম, ম্যাডাম এখানে সারা যায়না পুজোটা! তাতে তিনি যে দৃষ্টি হানলেন- সত্য যুগ হলে নির্ঘাত ভষ্ম হয়ে যেতাম।

যেতে যখন হবেই, রাত্রেই রেল স্টেশন থেকে একটা ভ্রমণ গাইড বই কিনে নিলাম। তখন কী আর ইন্টারনেট এমন সহজলভ্য ছিলো! পড়লাম কৃষ্ণা নদীর উপর নির্মিত শ্রীশৈলম বাঁধ দক্ষিণ ভারতের বৃহত্তম বাঁধগুলির মধ্যে একটি, এটা দর্শনীয় স্থান সন্দেহ নেই। এছাড়া ভারতের বৃহত্তম বাঘ সংরক্ষণাগার ‘নাগার্জুনসাগর-শ্রীশৈলম টাইগার রিজার্ভ’টি ৩৫০০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। স্থানীয় নাল্লামালা জঙ্গলও দেখার জাইগা বটে। পাহাড়, জঙ্গল নদী আমার চিরকালের প্রিয়, তাই মন থেকে হতাশার ভাবটা ঝেড়ে ফেললাম

রাত্রের দিকে গাইকোয়াড় সাহেব ফোন করে আবার একবার মনে করিয়ে দিতে ভুললেন না- তন্ময় মিস কোরোনা, এখানে মন্দির ছাড়াও বেড়াতে মন্দ লাগবেনা। পুঁজি লগ্নিকারক ব্যক্তিকে না বলা যায়না, অগত্যা নিমরাজি হয়েই গেলাম। হোটেলের রিসেপশনে শ্রীশৈলম যাতাযাতের জন্য একটা ছোট গাড়ির কথা বলে দিলাম পরদিন ভোরের জন্য। রাত সাড়ে তিনটের সময় দেখি এক ব্যাটা ফোন করে হাঁকডাক করছে, বুঝলাম গাড়ির ড্রাইভার। স্যান্ট্রো নিয়ে একটা ১৭-১৮ বছরের ছেলে হাাজির। ঘুম চোখে লটবহর গুছিয়ে ‘ভয়’কে সাথে নিয়ে রওনা দিলাম।

ড্রাইভারটা তিলে খচ্চর টাইপের সবজান্তা, শুরুতে সারাক্ষণ উচ্চস্বরে তেলেগু গান চালিয়ে মাথা ধরিয়ে রেখেছিলো, সেটা বন্ধ করতেই- জনার সাথে তার ১০% হিন্দি পুঁজি করে সে কী গভীর আলোচনা, যা আরো ভয়াবহ মাথাব্যাথার কারন হয়ে দাঁড়ালো। এর মাঝে কখন ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম জানিনা, জনার ডাকে ঘুম ভাঙলো। অকারন বকবক করতে করতে কখন যে ব্যাটা রাস্তা ভুলে যে অন্য পথ ধরেছে তা জনার জ্ঞানের বাইরে। যতদূর চোখ যায় ধু ধু জনহীন অরণ্য, জনার দিকে চাইতে সে বলল- শেষ ২ ঘন্টা ধরে এমন জঙ্গল পেরিয়েই এসেছি। অগত্যা সামনে এগোনই স্থির করলাম। গুন্টুর থেকে শ্রীশৈলম মেরেকেটে ২২০ কিলোমিটারের মত রাস্তা, চার ঘন্টায় স্বচ্ছন্দ্যে পৌঁছে যাওয়া উচিৎ, সেখানে ইতিমধ্যেই ৬ ঘন্টা পার হয়ে গেছে, ঘড়িতে বেলা ১১টা।

আত্মাকুর থেকে শ্রীশৈলম অবধি পায়ে হেঁটে অনেক ভক্ত আসে, যারা মানত করে। ঘণ জঙ্গলের মাঝে কোনো দোকানপাট নেই, না বসতি রয়েছে। পথটি সম্পূর্ণরূপে নল্লামালা পাহাড়ের ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যায়। তেমনই একটা ভক্তের দল রাস্তার ধারে বসে আহারাদি করছিলো। তাদের সামনে গিয়ে গাড়িটা দাঁড় করাল ড্রাইভার। আমাদের ওই দিশেহারা দশা দেখে তাদের একজন এগিয়ে আসতে, ড্রাইভার স্থানীয় ভাষায় বিষয়টা বলে বোঝালো যে আমরা রাস্তা ভুল করেছি। ভয়ের চোটে এতক্ষণ খিদে না পেলেও, এবারে সেটা যেন চিৎকার করে হাঁক ছাড়লো পেট থেকে। ভক্তেরা সাথে করে নিজস্ব খাবার এবং পানীয় সামগ্রী নিয়ে এসেছে, তাদের দয়ায় সে যাত্রায় খিদের হাত থেকে রেহাই পেলাম। ওদের বাতলে দেওয়া পথ ধরে ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই শ্রীশৈলম পৌঁছে গেলাম।

 

(২)

শিবা রেসিডেন্সী নামের একটা মধ্যম মানের হোটেলে ঢোকার পর ফ্রেস হয়ে আমি গাইকোয়াড় সাহেবকে ধরার জন্য রওনা দিতে, জনা আমার দিকে জুলুজুলু চোখে চেয়ে রইতে শুধালাম- কিছু বলবি! সে অস্ফুট উড়িয়াতে বলল- ‘মু সে সক্কালেরু জগ্রত রহিছি, এবে কি সইবারি পারিবু!’, বুঝলাম ঘুমাতে চাইছে। আমি আর কথা না বাড়িয়ে একাই বেড়িয়ে গেলাম। ফোনে জানলাম ম্যাডামের সাথে সাহেব আপাতত হটকেশ্বরমের পথে।

মল্লিকার্জুন অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীশৈলম শহরে কৃষ্ণা নদীর তীরে একটি টিলা পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। জ্যোতির্লিঙ্গটি একটি অতি প্রাচীন মন্দির যা দ্রাবিড় শৈলীতে নির্মিত, এখানে বিজয়নগর স্থাপত্যের নমুনা দেখা যায়ম্যাডাম গাইকোয়াড়ের তালিকা অনেক লম্বা, সাক্ষী গণপতি, হটকেশ্বরম, শিখরেশ্বরম, ফলধারা পঞ্চধারা এমন অনেক কিছুকে দেখে তারপর নাকি মল্লিকার্জুন দর্শন করতে হয়। এসব একদিনে শেষ হলে হয়।

হটকেশ্বরম পৌঁছাতেই দেখলাম পাঞ্জাবি পায়জামা শোভিত গাইকোয়াড় সাহেব একটা গুমটির আড়ালে ধুম্র সহযোগে চা-পান করছেন। আমার জন্যই প্রতীক্ষা করছিলেন, দেরির কারন জানতে পেরে তিনি হো হো করে হেসে উঠলেন। তবে এটাও বুঝলাম, স্ত্রীর সামনে ধূমপানের অনুমতি নেই। আমাদের বয়সের ফারাক দেড় গুণ, উনি ৫৩- তাই আমি শুধু চায়ে যোগ দিলাম। কথায় কথায় শুধালাম এতোগুলো মন্দির ঘুরলেন, আপনার মাথায় চন্দন বা তিলক কই! তিনি যা বললেন তাতে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম, ধর্মে নাকি তার তেমন ভক্তিই নেই, কখনই ছিলোনা- তিনি নাকি ঘোরতর নাস্তিক। রাজনীতির দায় ও সামাজিক স্বার্থে যেটুকুতে না গেলেই নয়, ব্যাস অতটুকুই। অথচ মিডিয়াতে উনি চরম হিন্দুত্ববাদী, বক্তব্য শুনলে মনে হবে ক্ষতস্থানে কেউ বাঁটা লঙ্কা ডলে দিয়েছে। একটা মানুষের মধ্যে এমন পরস্পর বিরোধী দ্বৈত্ব স্বত্বা কীভাবে থাকতে পারে! এই কারনেই কী স্ত্রী অমন চড়ে থাকে!

আমার ভ্যাবাচ্যাকা ভাব দেখে গাইকোয়াড় সাহেব হেসে বললেন, বড় হও তন্ময়- সব বুঝবে। এর পর তিনি মল্লিকার্জুন এর লোককথা শোনাতে লাগলেন। কথিত আছে প্রতি অমাবস্যায় স্বয়ং মহাদেব, পুত্র কার্তিককে এখানে খুঁজতে আসেন। আবার পূর্নিমাতে নাকি দেবী মহামায়াও মর্ত্যের এই এলাকাতেই বিরাজ করেন। পুরাণমতে দক্ষযজ্ঞে সতীর দেহত্যাগের সময় ‘উপরোষ্ঠ’ এই মল্লিকার্জুনে পড়েছিল, তাই এটা ১৮টি মহাশক্তিপীঠের একটি- অগত্যা। বুঝলাম লোকটি পণ্ডিত মানুষ বটে, তারপরে নাস্তিক, আর সবার উপরে উগ্র হিন্দুত্ববাদ রাজনীতিতে সফল ব্যাক্তি- আজব সঙ্গম।

দিনটা সোমবার, রীতিমত গলদঘর্ম হয়ে আজই বেলা থাকতে থাকতে মল্লিকার্জুন পৌঁছাতেই হবে যেভাবেই হোক, সুতরাং শ্রীমতী গাইকোয়াড়ের তাড়ার শেষ নেই। দুপুরে লাঞ্চ করলাম ভাকরি-পিঠলা সাথে ভাজি নামক পদ দিয়ে, মোটা মোটা জোয়ার বা বাজরার রুটি আর পেঁয়াজ রসুনে ঠাসা এক জাতীয় তীব্র মসলাদার সব্জির ঘন্ট। খিদের পেটে ওই খেলাম সাঁটিয়ে। দুচোখ মেলে প্রকৃতি উপভোগ করতে করতে যখন মল্লিকার্জুন এসে পৌঁছালাম, তখন সূর্য ঢলে গেছে।

গাড়ি থেকে নেমেই ম্যাডাম সটান মন্দিরে ঢোকার লাইনে দাঁড়িয়ে গেলেন, প্রথম দফায় কবার নাকি প্রদক্ষিণ করে আবার ঢুকবেন পুজো দিতে, সাহেবকে নির্দেশ দিলেন ততক্ষণে পুজোর উপাচার যোগার করে আনতে। গোল বাঁধল ফুলের দোকানে গিয়ে, ঘ্যেটুর মত বিজাতীয় ফুল সহ আকন্দের ফুল পাতাও পাওয়া গেলো। স্থানীয় নানা জাতের অচেনা ফুলের মালার সাথে বেলফুলের মালাটিকেও চিনতে পারলাম। জবা, রজনীগন্ধারও অভাব ছিলোনা, নেই শুধু বেলপাতা এই বস্তুটি অবশ্য এতো গুলো মন্দিরের কোথাও সেভাবে দেখিনি, হয়ত সেভাবে চল নেই কিম্বা আমিই ভাল করে নজর করিনি। তবে সজনে পাতার মত এক ধরণের পাতা এরা ঘট সাজিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

লাইনে দাঁড়ানো ম্যাডামের কানে সে কথা তুলতেই তার মুখ রক্তবর্ণ ধারন করল, গাইকোয়াড় সাহেব প্রমাদ গুণলেন। আমার দিকে জুলজুল করে তাকাতে আমি প্রায় স্প্রিন্টারের মত দৌড় লাগালাম ওই এলাকার সকল ফুলমালার দোকান গুলোতে ঢুঁ মেরে বিল্বপত্রের অন্বেষণে। প্রায় সবটা চষে যখন ব্যর্থ মনোরথে ফিরছি, একটা গলির শেষের গুমটিতে বিশাল রেশন দোকানের মত লাইন দেখে সামনেটাতে গিয়ে উঁকি মেরে দেখি- রয়েছে। আর কী, আমিও ওই লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। করোনাকালে যদি এমন জমাটি লাইন কোনো বিজ্ঞানী বা ডাক্তার দেখতেন, নিশ্চিত তারা নিজেরাই আতঙ্কে অক্কা পেতেন। মিনিট দশেক পর যতক্ষণে গুমটির সামনে সৌভাগ্যক্রমে পৌঁছালাম, ততক্ষনে আমার মাথার ঘাম মেরুদণ্ড বেয়ে অকুস্থলের উপত্যকা, খাঁজ সর্বত্র লোনা জলময় করে তুলেছে। পাতা তখন অতি সামান্যি অবশিষ্ট রয়েছে, শেষ অবধি আমার ভাগ্যে জুটবে তো! উত্তেজনা আর আশঙ্কাতে এমন দোদুল্যমান অবস্থা যে শরীরের সমস্ত রক্ত মাথায় এসে ফেটে পরতে চাইছে, শেষে চ্যাংদোলা করে হাসপাতালে না নিয়ে যেতে হয়।

সমানে জপে যাচ্ছি- মেরা নাম্বার কব আয়েগা। ওমা, দোকানি অবধি পৌঁছাবার ২ জন আগেই খেল খতম। বিনা নোটিসে ঝাঁপ বন্ধ। বেলপাতা ছাড়া স্বয়ং মহাদেব সন্তুষ্ট হলেও হতে পারেন, কিন্তু ম্যাডাম গাইকোয়াড়কে কীভাবে সন্তুষ্ট করব! পিছন থেকে তেলেগুতে অনেকেই নানা পরামর্শ দিলো, সে সব শুনে আমার পিছনে থাকা জনা পঞ্চাশেক ভক্ত উলটো পথ ধরেলো। সে ভাষা বোঝা কী আর আমার কম্ম, আমার পা যেন ২০০ মন ভারি হয়ে গেলো, উঠাতেই পারিনা এমন দশা। সামনে রণচণ্ডী রূপে ম্যাডামের মুখ ভেসে উঠতেই, ধড়ফড় করে আমিও স্ববেগে সেই পথে পা বাড়ালাম, দেরি করে পৌঁছালেও কি আর কম বিপদ!

ফিরে গিয়ে গাইকোয়াড় সাহেবকে জানাতে তিনি আরো কাকুতিমিনতি করে বললেন, ড্রাইভারকে নিয়ে আশেপাশের মন্দিরগুলোতে গিয়ে দেখোনা ভাইটি। অগত্যা দৌড়ালাম গাড়ির দিকে। ড্রাইভার ঘুমাচ্ছিলো, তেতো মুখে ব্যাজার ভাবে চেয়ে দেখে গাড়িতে স্টার্ট লাগালো। ওদিকে দিনের আলো ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে, সন্ধ্যার পর সাধারানত ছোট মন্দিরের এলাকা গুলোতে আর কেউ থাকেনা, টিমটিমে আলো আর ভুতুরে পরিবেশ। আশেপাশের ৩-৪ কিমির মধ্যে অধিকাংশ দোকানই বন্ধ, এক আধটা যেগুলো খোলা তার কোনোটাতেই বেলপাতা খুঁজে পেলামনা। হতাশ হয়ে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেটে মন দিয়েছি, পশ্চিমাকাশে তখনও রক্তাভ একটা নিশান ঝুলে আছে লেজ কাটা ঘুরির মত।

হঠাৎ, সেই আলো আঁধারিতে মনে হলো, ওই দূরে একটা ঝুঁকে পরা বেল গাছ না? ইউরেকা বলে দৌড় লাগালাম, নির্ঘাত বেলই বটে, ডাবল শিওর হওয়ার জন্য ড্রারভারকেও ডাকলাম, সে যেন অনিচ্ছুক ঘোড়া, বিকারহীন মুখে বলল- এটা বেলগাছই বটে। ‘দুটো পাতা পেরে দে না ভাই’- অনুরোধ করতে সটান মুখের উপরে না বলে হাঁটা দিলো। যেতে যেতে তার তেলেগু সর্বস্ব হিন্দিতে যেটা বললো, তার বাংলা মানে দাঁড়ায়- মন্দিরের ড্রেনে প্রচুর বেল পাতা পরে রয়েছে, সেখান থেকে কুড়িয়ে দিলে অসুবিধা কোথায়, কে দেখতে পাবে! কথাটা আমারও মনে ধরলো, পরক্ষনেই মনুষ্যত্ব বিবেক জেগে উঠলো। বেলপাতাতে আমার ধর্ম বিশ্বাস জুড়ে না থাকলেও, যিনি আমাকে বিশ্বাস করে বেলপাতা আনতে পাঠিয়েছেন, তার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখাটা আমার কর্তব্য, ওটাই তো ধর্ম। তৎক্ষণাৎ ড্রেনের প্ল্যান ক্যান্সিল করে দিলাম।

একটা ছোট মত নালা কিম্বা খাল, রাস্তা থেকে ৩০-৪০ ফুট দূরে। তারই পাড়ে গাছটা প্রায় ৫০ ডিগ্রি কোনে হেলে রয়েছে। গুঁড়িটা বেশ মোটাসোটা শক্তপোক্ত হলেও সেখানটা বেশ অন্ধকার ও উঁচু ঘাসের ঝোপ জঙ্গল রয়েছে, সমস্যা হলো হাতের নাগালে কোনো পাতা নেই। গাইকোয়াড় সাহেবকে বিষয়টা জানাতে ফোনেই শুনলাম ম্যাডামের তীক্ষ্ণ বাক্যবাণের সামনে তিনি ঢালহীন জবুথবু অবস্থায় সহ্য করছেন। শুধু বললেন- প্লিজ তন্ময়, বুঝে গেলাম বেগতিক। এ দিকে দিনের অবশিষ্ট আলো উড়ন্ত ফড়িং এর ডানার উপরে মুছে যাওয়ার শোকে কিম্বা পরের দিনের প্রতীক্ষাতে তিরতির করে কাপঁছে। আরেকবার সাহায্যের জন্য ড্রাইভারের সামনে গেলাম, আমাকে আসতে দেখেই বোধহয় মুখে রুমাল দিয়ে শুয়ে পড়ল, ওদিকে মিউজিক সিস্টেমে তারস্বরে তেলেগু গান চলছে।

সদ্য কেনা মোবাইলের টর্চটা জ্বালিয়ে একটু দেখে নিলাম, পাথুরে নালাটা ঘাস লতাপাতায় ঢাকা। পায়ে উডল্যান্ডস এর জব্বর বুট রয়েছে সমস্যা নেই, সাপখোপের ভয় থেকে অন্তত মুক্ত। গাছের উপরের দিকটা ঝাঁকড়া গোছের হলেও, নিচের দিকে শুধুই ডালপালার কঙ্কাল, অথচ সব ডালেই এক হওয়া উচিৎ ছিলো। এটা বেলের মরসুম নয়, হয়ত বেলের পাতা ঝরে যায় এই সময়ে। তার উপরে রোজ রোজ পাতা পেড়ে নিয়ে যাওয়ার কারনে যতদূর হাত যায় সবটাই ন্যাড়া, বেশ খানিকটা উপরে চড়ে তবে অবশিষ্ট পাতার নাগাল পেতে হবে। একটা লগা বানাবো তেমন জুতসই একটা লাঠিও পেলামনা, এদিকে দ্রুত সময় পেড়িয়ে যাচ্ছে। দোনামনা করতে করতে ছেলেবেলার পুরাতন অভ্যাস স্মরণ করে গাছে চড়ে যাওয়াটাই ধার্য্য করলাম। তাতে কী আর সমস্যা মেটে, কিশোর বেলায় ছিলাম রোগা প্যাঁকাটি মার্কা, আর এখন প্রায় সাত মাসের গাভিনের মত থলথলে চর্বির একটা আড়াই মণের নধর লাশ। এদিকে যতবার মনে পড়ছিলো এনারা ফাইনান্সার, উদ্দীপনা সপ্তমে চড়ে যাচ্ছিলো। অগত্যা, সুভানাল্লা বলে গাছে চড়ে বসলাম।

গুঁড়িটা যেখানে দুটো ভাগ হয়ে গেছে সেই অবধি পৌঁছাতে কোনো সমস্যা হলোনা, মাটি থেকে ফুট চারেক মাত্র, খাল থেকে ফুট ছয়েক বটে। এর পর হলো আসল সমস্যা, শুধু জুতো পিছলে যায়। অথচ বেল গাছে কাঁটা থাকা উচিৎ ছিলো, বছরের পর বছর ধরে ‘পত্রশিকারীদের’ দৌড়াত্বে সে সব মসৃণ ‘কান্ড’ হয়ে গেছে। বুকে পেটে হিঁচড়ে আরো ২-৩ ফুট উঁচুতে অপেক্ষাকৃত সরু ডালে উঠলাম, তাতেও পাতার নাগাল নেই। ওদিকে জিন্সের পকেটে তখন সমানে বেজে চলেছেন গাইকোয়াড় সাহেব, ফোন ধরব সে উপায় নেই। শুঁয়োপোকার মত আবার খানিক বুকে হেঁটে চলার চেষ্টা করতে গিয়ে, একটা ভাঙা বেল কাঁটার উদ্ধত অংশে লেগে জামাটা আর্তনাদ করে ছিঁড়ে গেলো। ক্ষণিকের জন্য বোধহয় মাথাটাও সামান্য টলে গেলো। খানিক ধাতস্ত হতে এবারে শরীরে যেন অদ্ভুত বল পেলাম।

পৃথিবীর বুকে তখন আলো আঁধারের দড়ি টানাটানি চলছে, আমিও বেলপাতার ঝাড়ের অন্ধকারে পাতা ধরে টান পাড়াপাড়ি করছি, তবুও পাতা আর হাতে আসেনা। এবারে বাইকে বসার মত করে ডালের আসনে বসে যতটা সম্ভব জোড়ে টান দিতেই একটা ময়লা মত কাপড় এসে হাতে ঠেকলো। যাব্বাবা, এ আবার কি কেলো! আচমকা দেখি আমারই মত আরেকটা ভুঁড়িওয়ালা টাকমাথা লোক পাতা পাড়তে উঠেছে, ওরই ধুতি আমার হাতে। হতচ্ছাড়া আমি শেষ ১০ মিনিট ধরে কী লঙ্কাকান্ডটাই না করছি, আর ব্যাটাচ্ছেলে বেল্লিক গাছে চড়ে উপর থেকে আমার অসহায়তার মজা নিচ্ছিলো! ইচ্ছে হলো দিই খানকতক বাছাবাছা খিস্তি, কিন্তু দ্বিগুণ মন খারাপ করে থেমে গেলাম। তেলেগুভাষী মানুষ, সুললিত বাংলা গালির মর্ম এ ব্যাটা বুঝবে কীভাবে! মিছে পন্ডশ্রম।

আশ্চর্য হওয়ার আরো বাকি ছিলো, লোকটা পরিষ্কার বাংলাতে বলে উঠলো- কটা পাতা চাই খোকা। মানে কী, আমি কোন এ্যাঙ্গেল থেকে খোকা! কিন্তু আচমকা ওই বাংলা উচ্চারন খোকা ডাকের অপমান ভুলিয়ে দিলো। মুখ থেকে আপনা হতেই বেড়িয়ে এলো- আপনি বাংলা জানেন! জবাব এলো- জানি বৈকি, এবারে হাতে কটা পাতা নিয়ে তিনিও কাঠবেড়ালির মত সরু ডাল বেয়ে নেমে আমার প্রায় মুখোমুখি চলে এলো। বয়স্ক লোক, খোঁচা খোঁচা দাড়ি আর ইয়া মোটা ঝাঁটার মত অপরিচ্চছন্ন গোঁফ। আমাদের কালীনগরের ষষ্টি গোয়ালার এমন বিচ্ছিরি গোঁফ আছে।

বললাম- চটপট পাতা গুলো দিন, তাড়াতাড়ি যেতে হবে, গাইকোয়াড় ম্যাডাম অপেক্ষা করছে। বৃদ্ধ খানিক হাই তোলার মত ভঙ্গি করে পিঠ চুলকে বললো- পারিশ্রমিক দাও। মনে মনে খুব রাগ হলো, নিশ্চিত এই বুড়ো ব্যাটাই নিচের সব ডাল ফাঁকা করে রেখেছে, আবার গালি দেওয়ার বাসনাটা জাগার আগেই সংবরণ করে নিলাম। শুধালাম, এ কী তোমার গাছ! বুড়ো বললো- কাগজে কলমে আমার নয় বটে, তবে দখল স্বত্বের দিক দিয়ে যদি হিসাব করা হয় তাহলে আমিই এর মালিক। আমি আর কথা না বাড়িয়ে পকেটে হাতটা চালান করলাম, একটা ৫ টাকার কয়েন খুঁজে আনার লক্ষ্যে। ওমা কোথায় কি, পকেট তো গড়ের মাঠ; অথচ আমি মানি ব্যাগ কোনোকালেই ব্যবহার করিনা, ডান পকেটেই আমার যাবতীয় টাকাপয়সা থাকে। পড়ে গেলো নাকি নিচে! বৃদ্ধ একটা অশ্লীল হাসি হেসে বললো- নেই বুঝি! আমি কিছুটা কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে খেই হারিয়ে জবাব দিলাম- নেই মানে, থাকতেই হবে, যাবে কোথায়!

পরিষ্কার মনে আছে আমি জিন্স পরে এসেছিলাম, অন্ধকারে কেন যে ঠিক ঠাউর করতে পারছিনা- মাথায় ঢুকলনা। আমার রীতিমতো কাঁচুমাচু অবস্থা, হা হতোস্মি করতে করতে দ্রুত বিষয়টা ধামাচাপা দিতে চাইলাম। ওদিকে ফোন আসা আচমকাই থেমে গেছে, আঁধারটাও বেশ গাঢ় হতে বুড়োকে আরো ভালভাবে যেন দেখতে পেলাম। বুড়ো শুধালো- বেল খাবে! বললাম- ইয়ে, কাঁচা বেলে আঠা থাকে, জিভ ঠোঁট কয়েসে জ্বালা করে বড়। একটু শরবৎ করার ব্যবস্থা হলে ভালো হতো। বুড়ো বলল, এ আর এমন বড় কথা কি, তুমি আব্দার করেছো যখন আলবাৎ হবে, হতেই হবে।

আমি শুধালাম- তা কর্তা, আপনার ঘর কোথায়! বুড়ো খানিকটা উদাস গলায় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, এই দশাতে এসে পড়লে বাবা কার ঘর, আর কিসের ঘর! বুঝলাম, ছেলেপুলে নেই বা তারা খেতে পরতে দেয়না হয়ত। আহা রে, এই বুড়ো বয়সে বেলপাতা বেচে পেট চালায়, একটু মায়াই হলো। কিছুটা আর্থিক সাহায্য করতে মন চেয়ে শূন্য পকেটের দিকে হাতটা যেতেই আবার বুকটা হু হু করে উঠলো- অনেকগুলো টাকাই খোয়া গেছে। মাঝখান থেকে অন্ধকারে হাতড়ানোর দরুন হাতের কব্জিতে একটা কাঁটা ফুটে সেই জ্বালা করতে লাগল।

তা বাপু তুমি এ লাইনে কদ্দিন? আমি হো হো করে হেসে বললাম- আরে কাকা, আমার এক বন্ধুর স্ত্রী পুজো দেবেন, বেলপাতা নেই তাই তার জন্য বেলপাতা আনতে এসেছিলাম। বুড়ো যারপর নাই আশ্চর্য হয়ে আমাকে বলল- পুজো আর তুমি! বলো কী খোকা! এবারে আমি বেশ চটেই গেলাম, হতেই পারি আমি মুসলমান, তা বলে কোনো হিন্দু বন্ধু থাকতে নেই, নাকি সেই বন্ধুর যদি কিছু দরকার হয় সেটা আমি করবনা, হলোই বা সেটা বেলপাতার মত তুচ্ছ কিছু। বলতে গিয়েও চেপে গেলাম। বললাম, কাকা পাতা কটা দাও, আমাকে এগোতে হবে, গাইকোয়াড় সাহেব অপেক্ষা করছে। বুড়ো খেঁকিয়ে উঠে বলল- মস্করা হচ্ছেটেনে এক থাপ্পড় মারব যে হাড়েহাড়ে গিঁট পেকে যাবে। তবে রে হারামজাদা বুড়ো, দরকার নেই তোর বেলপাতার, আমিও দাঁত খিঁচিয়ে বললাম- সাইড দাও দেখি, আমার তাড়া আছে, যত্তসব জোটেও মাইরি।

বুড়ো সরে যাবার কোনও উদ্যোগই নিলোনা, উলটে বললো- চটছো কেন ভায়া, একটু পরে চাঁদ উটবে, চাঁদ দেখতে আমার বড় ভালো লাগে। আমি বললাম- তুমি একা একা এই নিশুতি রাত্রে চাঁদ দেখ আর বেলের আচার, মোরব্বা, শরবৎ খাও, পারলে কিছুটা শুঁট বানিয়েও খেয়ো, সকালে হাগা ভালো হবে। বুড়ো আমার কথা অগ্রাহ্য করে এবারে শুধালো, তা বাপু তোমার প্রকার কী, কুল কী? আমি বললাম, এই তো খানিক আগেই জাত তুলে খোঁটা দিলে, আবার শুধানো কেন! এবারে কেমন যেন সন্দেহ হলো, ব্যাটা চোর নয়ত! পকেটে টাকা না থাকলেও, সদ্য কেনা আইফোন রয়েছে। হাতে খান দুই আঙটি আছে, একটাতে হিরে বসানো। বুড়ো কথা না বাড়িয়ে আমার দিকে একটা শরবতের গ্লাস বাড়িয়ে দিতে, সন্দেহ আমার তিনগুণ হয়ে গেলো। নিশ্চই এতে অজ্ঞান করার ট্যাবলেট বা বিষ মেসানো আছে, নতুবা শরবৎ এর বোতল নিয়ে গাছে কে উঠে! আমি অচৈতন্য হলেই ব্যাটা সব লুঠ করবে।

তবে রে ঠ্যাঁটা বুড়ো, আমি খানিকটা তেড়ে যেতেই, আমার চোখের সামনে গিরগিটির মতো সরসর করে মগ ডালের দিকে গিয়ে কন্টকাকীর্ণ সরু ডালে চড়ে বসল। আমি তখন এক হাতে তার ধুতির খুঁট ধরে টানছি, আর সেই বুড়ো আমার দিকে বেলের শরবৎ ছেটাচ্ছে। রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ঘেমে উঠলাম, শরীর দিয়ে আগুন আর ঘাম পাল্লা দিয়ে বের হচ্ছে। এবারে আবার একটা হ্যাঁচকা টান দিতে ধুতিটা খুলে হাতে এলো ঠিকিই, তার সাথে দেখলাম বুড়ো একটা সাদা বক হয়ে মিলিয়ে যেতে যেতে কেমন করে যেন গাইকোয়াড় সাহেব হয়ে গেলেন, আমার হাতে ওনার পাঞ্জাবির একটা ছেঁড়া অংশ। দূর আকাশের গোল থালার মত চাঁদটা ক্রমশ একটা নার্স এর মুখ হয়ে গেলো, যিনি আমার মুখে জলের ছিটে দিচ্ছিলেন। যাব্বাবা, কেমন যেন সব গুলিয়ে গুবলেট গেলো আবার।

আমার চোখ মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেলো, চারপাশে চেয়ে দেখলাম- একটা হাসপাতালের বেডে আমি শুয়ে। হাতের কব্জিতে বেল কাঁটার বদলে স্যালাইনের সিরিঞ্জ গাঁথা রয়েছে। জনা দেখলাম খুশি চেপে রাখতে না পেরে- ‘চেতনা অসি যাইছি’ বলে চেঁচিয়ে উঠলো উল্লাসে। এতক্ষণে গাইকোয়াড় ম্যাডামের মমতাময়ী আওয়াজ পেলাম, কী দরকার ছিলো বাবা ওই সন্ধ্যাবেলায় বেলগাছে চড়ার! গাইকোয়াড় সাহেব বললেন, চোট তেমন মারাত্বক নয়, ভাগ্যিস ঘাসের গাদার উপরে পরেছিলে। পাথরে পড়োনি বলে রক্ষে, তবে হাড় ভাঙেনি এটাও তোমার তোমার গুরুজনের আশির্বাদ, ইত্যাদি। তা বাবা, ওই ভাবে পাঞ্জাবি ধরে টানাটানি করছিলে কেন! তোমার ভুল বকা দেখে আমার খানিক ভয় ভয়ই লাগছিলো।

সকলে নানা কথাবার্তা বলা কওয়া করতে লাগল, গায়ে ধুম জ্বর ঘাম দিয়ে ছাড়ছে বলে মাথা শরীর ভিজে গেছে। এর মাঝে যে কথা কটা কাউকে বলতে পারলামনা- সেই বুড়োর কাহিনীটা। ওটা স্বপ্ন ছিলো নাকি সত্যিকারের ভুত দর্শন করেছিলাম তাও মনে পরছেনা! কে জানে কখন পা ফসকে নালায় পড়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম, ওই কাঁটায় বিঁধে যখন জামাটা ছিঁড়েছিল তখনই বোধহয়। যাই হোক, ২ দিন পর ছাড়া পেয়েছিলাম হাসপাতাল থেকে, গাইকোয়াড় সাহেব ব্যস্ত মানুষ, প্রায় জোর করেই ওনাদের ফেরত পাঠিয়ে দিলাম। জনা থাকলে আমার কোনো অসুবিধা নেই, সে হোটেলে থাকাতেই তো আমার এই বিপত্তি।

এর পর থেকে আজও, যখনই বেল গাছ দেখি, সেই বৃদ্ধ বক ভুতকে দেখার বা খোঁজার চেষ্টা করি, কে জানে কোন অন্ধকারে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে কার মুখে শরবৎ ছেটাচ্ছে!

 

ফেসবুকীয় সিপিএমঃ ফিউজড আইনগাইডেড কামিকাজে ড্রোন

  ফেসবুকের ‘সিপিএম’ নামক এই চুড়ান্ত আঁতেল ও প্রায় সর্বজ্ঞ গোষ্ঠীটার পূর্ণ বোধোদয় বা পূর্ণ বিনাশ না ঘটা অবধি রাজ্যের বাম নেতৃত্বের খুব বেশী ...