মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫

আপনি, ফেসবুক ও বাকিরা


 


(১)

কথা ছিল অকপট নিয়ে লেখার, কারণ অকপটের জন্মতিথি উদযাপনী পক্ষ চলছে। কিন্তু অকপট একটা অন্তর্জালীয় ভার্চুয়াল জগত, আমরা জোর করে গুটিকয়েক মানুষ একে একচুয়াল রূপ দিয়েছি বটে, তবে তাতে ভার্চুয়াল এসেন্সটা হারিয়ে যায়নি মোটেও। মোদ্দা কথা হোয়াটস অ্যাপ, টেলিগ্রাম হয়ে টুইটার, তারই মাঝে নানান মাধ্যমের পত্রিকা সাজলেও- আদতে আসল গ্রুপ বললে কিন্তু এই ফেসবুকীয় গ্রুপটিকেই বুঝি। তাই এই পর্যায়ে ফেসবুকে থাকা আপনি আর বাকিদের নিয়ে একটা অ-দরকারী আলাপচারিতা ভাঁজব, যার মাঝখানে রয়েছে ফেসবুক। আরও খান দুয়েক প্রবন্ধ লেখার ইচ্ছা আছে এই জন্মতিথিতে- একটা খাদ্য বিষয়ক, অন্যটা করোনা উত্তর পৃথিবী। যাই হোক বাজে না বকে, চলুন শুরু করা যায়-

আপনি চোর বা ডাকাত! নির্জীব না সিপিএম! কেপমারি করেন কিম্বা তোলামূল! হাতেনাতে ধরা পড়েছেন? জেল জরিমানা খেটে সমাজের পরিচিত বা বিখ্যাত তথা কুখ্যাত মুখ! তাহলে চিন্তা নেই, নিশ্চিন্তে ফেসবুক করুন। ধর্ষণ করেছেন? রাজনীতিও করেন! আরিব্বাস, তাহলে সোনায় সোহাগা। ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল, পিছনে হাঁড়িচাঁচার দল ভিড় জমাবে শিগগিরই, নিশ্চিন্তে ফেসবুক করুন। আরেকটু গভীরে যাওয়া যাক, ডেজিগনেশন নিয়ে। আপনি কোনো উগ্রবাদী দলের সমর্থক? বজরং দল কিম্বা বাংলাপক্ষ! গরম গরম বিস্ফোরক লাইন ঝাছেন নিজ সংগঠনের সমর্থনে? তাহলে তো কথাই নেই বস, আপনাকে যমেও ছোঁবে না। বরং যমের সহোদরা তাঁর অনুপ্রেরণা, ইয়ে জেন্ডারে গন্ডগোল হয়ে যাচ্ছে- মানে শনি মহারাজ স্বয়ং আপনার উপরে তুষ্ট হবেন নীলা রত্ন ধারণ না করেও, ফলত কিছু গুয়ে মাছি ভনভনিয়ে ভিড় জমাবে আপনাকে কেন্দ্র করে

কিন্তু, যদি আপনি দুকলম লিখে ফেলেন এই সকলের বাইরে- তাহলে আর রক্ষে নেই! কী লিখেছেন সেটা বড় কথা নয়, কেন লিখেছেন সেটাই বড় কথা। অতএব আপনিই হলেন সেই ‘বিষয়’। অবশ্য আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে প্রায় সকলেই লেখক, কমেন্টও তো লেখে রে বাবা। সুতরাং লেখকময় দুনিয়াতে আপনি যদিও একটা সংখ্যা, তবুও অনু বাবুদের ভিড়ে, ঐ যেমন- অনু সাংবাদিক, অনু ঔপন্যাসিক, অনু প্রতিবেদক, অনু কাব্যের জন্মদাতা প্রমুখরা, যারা লেখক নন- তারা পাঠক, কিন্তু ওই- অনু পাঠক। এনারা প্রথম দু'লাইনের বেশি পড়বেন না বা পড়েন না। যা বোঝার ওতেই তারা বুঝে যান।

যদিও অনু কবিদের আজকাল দেখা যায় না করোনার পরে, শুনেছি তারা নাকি আজকাল কন্টেন্ট ক্রিয়েটর হয়েছে। অনু কবিতা প্রসবের চেয়ে ক্যামেরার সামনে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করে নাচা, বা কাপল ব্লগের নামে ন্যাকামি ও ভন্ডামি করা কতটা বৈপ্লবিক না জানলেও, যুগের নিরিখে নিঃসন্দেহে কাব্যিক একটা শিল্প বটে। ইয়ে, এই ক্রিয়েটর গিরিতে অবশ্য কুণাল ঘোষ নেই; থাকলে শুধু খিস্তি খেয়ে একটা লোককে মাসে কোটি টাকা কামাতে দেখতাম। সুতরাং, এমন একটা সামাজিক অবস্থায় একটু বড় যেই না লিখবেন, ওমনি আপনি নিজেই একটা ‘সাবজেক্ট’ হয়ে যাবেন। আগেই বলেছি জেন-জি ও নেটিজেন পাঠকেরা বড় লেখা পড়েনা-

আসলে আমরা সেই অন্তিম প্রজন্ম যারা জন্মের সময় ডুলি, পালকি, ছই-গাড়ি দেখিছি, মধ্য বয়সে পৌঁছাবার পূর্বেই শব্দভেদী বিমান দেখছি। আমরাই শেষ প্রজন্ম যারা কমপক্ষে ৫টা উপন্যাসের গোটাটা পড়েছি। ১০ জন বাঙালী কবি সাহিত্যিকের নাম বলতে পারি একটানে। পোস্টবক্সকে চ্যাটবক্সে বদলিয়ে যেতে দেখলাম এই আমরাই। অসম্ভবকে সম্ভব হতে দেখেছি একটা জিনিসেরই কল্যাণে- সেটার নাম বিদ্যুৎ। বিদ্যুৎ আবিষ্কারের চেয়ে বড় আবিষ্কার আর নেই এই ধরাধামে। বিদ্যুৎ না এলে কিছুই আসত না, না ইন্টারনেট না শব্দভেদী কোনোকিছু। দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রাণশক্তিই এই বিদ্যুৎ

এবার আসি একটু অ-প্রয়োজনীয় ইতিহাসচর্চাতে

সদ্য ব্যবসাতে ঢুকেছি তখন, গোঁফের রেখা সবে স্পষ্ট হচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়া বলতে অর্কুটকেই বুঝি। তখনও ওয়াল বিষয়টা বাজারে আসেনি, ছিল স্ক্র্যাপবুক। কলেজের বন্ধু অয়ন তখনও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, গবেষণারত। কোলকাতাতে কোনো কাজে গিয়ে মেসের কথা মাথায় আসতেই পাড়ি লাগিয়েছিলাম যাদবপুরের ঝিল রোডের সেই মেসের উদ্দেশ্যে, যেখানে জীবনের ৩টি সুবর্ণ বছর কেটেছিল

ইন্টারনেট তখনও চাঁদমারি, সন্ধ্যাতে এক রেস্টুরেন্টে টিফিন খেয়ে ঢুকতাম কোনো ইন্টারনেট কাফেতে। সেদিন আমি অর্কুট খুলছি, অয়ন বলল নতুন একটা কিছু অর্কুটের মতো এসেছে, নাম ফেসবুক; সেই শুরু আজও চলছে। নাহ, আজ আর চলেনি- বাবুল সুপ্রিয়র রাজনীতি ত্যাগের মতোই ফেসবুক ত্যাগ করেছিলাম। ইয়ে, ‘এখন নিজেকে অস্বাভাবিক রকম একা লাগছে’ না- এটাই পার্থক্য। তবে গিয়ে এসেছি, না ‘এসে গিয়েছি’ এই নিয়ে ধন্দ রয়ে গেছে

আসলে কি জানেন, প্রিয় লেখকের সেই বইটাও একদিন পুরনো হয়ে বইয়ের তাকে ধুলো ধারণের মাধ্যম হিসাবে কাত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বছরের পর বছর, সবচেয়ে পছন্দের সেই লাল কাপড়টাও একদিন অলক্ষ্যে ন্যাপথালিনের সাথে সোহাগে মেতে উঠে একাকিত্বের জ্বালায়। প্রথম পাওয়া লুকানো চিঠিটা কবেই হলুদ হয়ে আধখানা হয়ে পাঁপড়ের মতো টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে গেছে। পুরাতন হয় সকল কিছুই, বদলে যায় সময়, বদলায় মানুষ, সেই সাথে বদলে যায় উপলব্ধি তাই বদলায় আবেগ ও অনুভূতি- শুধু বদলায় না প্রেম

কাঁচ কাটা পোকার মতোই একটা অলীক কিছু এই প্রেম, নিজে অবিকৃত থেকে বাকি সকলকে বদলে দেয়। কারণ পুরাতন হয়ে যায়, ক্ষণ বদলে যায়- বদলায় না অক্ষরেরা। মাঝরাত্রে যখন ভাঙা ঘুমে জেগে উঠি, সর্বাঙ্গে বিন্দু বিন্দু ঘামের সাথে খুঁজে পায় শব্দগুলোকে, প্রতিটা অক্ষর খুঁজে পাওয়া যায়, হাত বুলোতে বুলোতে মনে হয় শব্দগুলো আজও জীবন্ত। কিম্বা ওরা জীবন্ত বলেই আমিও সজীব আছি, বাক্যের অলিতেগলিতে তখন গুপ্তজালের বিমোহ গভীরভাবে লেপ্টে রয়। নিজেকে মনে হয়  ফ্রান্‌ৎস কাফকার ‘মেটামর্ফসিসের’ এর- গ্রেগর।  জীবনের ক্যানভাসে প্রেম হারায় না, একটা প্রেমের রঙ ধীরে ধীরে ফিকে হতে হতে মুছে যায়। ঘটনাচক্রে সেই ফিকে রঙে যদি ভুল করে আবারও তুলির আঁচড় পরে, সে প্রেম অক্ষয় হয়ে যায়। ও প্রেমের চিত্র আরও গভীর হয়, ছড়িয়ে সংক্রামক হয়ে বাঁচে বহু প্রেমিকের মনে

আমরা এই প্রজন্মের অর্ধশিক্ষিত উন্মাদ, না মানুষ হয়েছি না মুনিষ। তেতো বাস্তবের অঙ্গারে পা ফেলতে ভয় লাগে বলে আমরা কল্পনা বিলাসী হয়েই বেঁচে থাকি। রোজ জীবনের বেঁচে থাকার লড়াই লড়তে লড়তে, যারা জীবনের দুই তৃতীয়াংশ সময় ফুরিয়ে ফেলে ক্রমশ বুড়িয়ে যাওয়ার দিকে হাঁটা দেয়, এই চল্লিশের ঘন্টা পার করা জীবনে সুররিয়ালিজমই বেঁচে থাকার রসদ। যে বয়সে চিবুকে চর্বি জমে, জুলফির চুলে শুভ্রতার ছোঁয়া লাগে, সেই বয়সে এসে সালভাদর ডালি, ফ্রিদা, রেনে, হুগো, কাম্যু, ডিকেন্স বা চসারকে আর জানা হয়ে উঠেনা। বণলতা সেনকে প্রেমিকা নয়, বেশ্যাই মনে হয়।

শিল্প, সাংস্কৃতি, অবচেতন মন, স্বপ্ন, লুকানো চিন্তাভাবনা, সবই অনুপ্রাণিত হয় অন্তর্জাল থেকে। আমাদের যুক্তিবুদ্ধি, সচেতন চিন্তার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এই মাধ্যম থেকেই- বহমান সমাজকে আমরা সংজ্ঞায়িত করি, সোস্যালমিডিয়ার আয়নাতেই।  ২ দশক আগে যা কিছু উদ্ভট ও আশ্চর্যকর রূপকল্প মনে হতো, আজ সেগুলোই বাস্তব। আমাদের সুররিয়ালিজম বাস্তব অবাস্তব বাছবিচার না করে তাদের একত্রিত করে, শিল্প, সাহিত্য সহ সমস্ত শিল্পকলা এক অভিনব মাধ্যমের দ্বারা মুঠোযন্ত্রে উদ্ভাসিত হয়।

হয়ত এই বর্ণনাটা বেশিই কাব্যিক হয়ে গেল, কিন্তু ফেসবুকের প্রতি এই নেশাটাকে যদি প্রেম না বলি কাকে প্রেম বলব? প্রতিটি অক্ষরকে বড় আদরে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেতে হয় যে, এভাবে আর কাকেই বা ছোঁয়া যায়?

 

(২)

ফেসবুক...

দিনের অনেকটা অংশই আমাদের এই ‘মুহূর্তের’ হাত ধরে কেটে যায়। সেই ২০০৮ এর প্রায় শুরুর দিন থেকে থাকার সুবাদে গত দেড় দশকের অধিক কাল ধরে জমা অভিজ্ঞতাটা নিতান্ত কমও নয়। মাঝখানে চিংড়ির খোলস ত্যাগের মত বেশ কিছু প্রোফাইলের মায়া ত্যাগ করতে হয়েছে। কত নতুন বন্ধু, পুরাতন ইয়ার-দোস্ত, আত্মীয় পরিজন, ভাই-বন্ধু-বান্ধবী নিয়ে গোটা একটা পরিপূর্ণ সংসার, তবে ভার্চুয়াল। ভার্চুয়ালেরই আবার নানা বিভাগ- কিছু পাংচুয়াল, কিছু মিউচুয়াল, কিছু কনসেপচুয়াল, কিছু কনটেক্সচুয়াল, পারসেপচুয়াল, কনসেনসুয়াল, নন-ফাংচুয়াল, সাবটেক্সচুয়াল, কনভেঞ্চুয়াল ইত্যাদি কত দ্যোতনা। এনারা ফলত, তথাপি বস্তুত নয়।

অবশিষ্ট কিছু জনই একচুয়াল, বন্ধুত্বেও- উপস্থিতিতেও, জীবনেও। আমার মতো অনেকেই শুরুর দিকে ভীষণ ন্যালা-খ্যাপা গোছের ছিল ও থাকে। উপক্রমণিকাপাতে টানা ৩ বছর প্রায় তেমন কিছুই জানতাম না বা বুঝতাম না; বলা ভাল চেষ্টাও করিনি জানার। সেকালের অধিকাংশই অবশ্য আমারই মতন, ব্যতিক্রম বাদে। পুরাতন বহু সদস্যদেরই আমি চিনি তারা আমাকে না চিনলেও, তেমনিই আমাকেও অনেকেই স্বনামে বেনামে-চেনেন বা জানেন আমি তাদের না চিনলেও। বয়সটাও বাড়ছে, তাই কালের নিয়মেই হয়ত এখন সামান্য অল্প অল্প কিছু বুঝতে শিখেছি এই ইথারীয় জগতের অধিবিদ্যা সম্বন্ধে। তাহলে কী সেই অভিজ্ঞতা তথা উপলব্ধি!

বছর পনেরো আগেও ফেসবুক ধারণাটা তেমন জেঁকে বসেনি সমাজে, আজকের মতো। অনেকে অনেক কিছুই করত, তার সাথে ফেসবুকও। মানুষের চরিত্রই হলো পরিবেশের সাথে খাপ খেয়ে বাকিটা নিজের আয়ত্তে নিয়ে চলে আসা, ফেসবুককেও তেমনই করে নিয়েছে। বাংলাতে লিখছে, বাংলাতে পড়ছে আর কী চাই! রাজনীতি, লেঙ্গি, খেলা, সংবাদ, আবহাওয়া, জ্ঞান, ধর্মচর্চা, গান-নাচ-সিনেমা, সহ সম্পূর্ণ বিনোদন, পরনিন্দা- মনোরঞ্জনের উপাদানে আর বাকি কী রইল! টিকটক পরবর্তী নতুন যুক্ত হয়েছে রিলস। একটা টিপিক্যাল বাঙালিয়ানা সংস্কৃতির ঘরানা ফেসবুকে আনতে সক্ষম হয়েছে- বাঙালী নেটিজেনরা। মূলত তিন ধরনের চরিত্রের খোঁজ মেলে এই ফেসবুকে; এক ধরনের মানুষ যারা বিনোদন জগতের সাথে যুক্ত, ছোট হোক বা বড়, নামি হোক বা অনামী- তারা সাহিত্য বা শিল্পকর্মের সাথে যুক্ত, নিত্যাবসরে বিনোদনের পসরা সাজিয়ে বসেন

দ্বিতীয় দলটি উপরোক্ত ও তৃতীয় দল থেকে নিজ নিজ পছন্দের বিনোদন সামগ্রী চয়ন করে নিজেকে বিনোদিত করে থাকেন। এদের কারোর সাথে কোনো বিরোধ ঘটেনা সাধারণত, ঘটলে তা সংবাদ শিরোনামে যাওয়ার মতই গুরুত্বপুর্ণ কিছু ঘটে, খাপও বসে। মুশকিলটা তৃতীয় লিঙ্গদের নিয়ে থুড়ি তৃতীয় পন্থা অবলম্বনকারীদের নিয়ে

এনারা খান কম ছড়ান বেশি, শোনেন কম বকেন বেশি, এনারা পরামর্শ দানের নিমিত্তেই মূলত জন্মগ্রহণ করেছেন। সব কিছুতেই ফোঁপরদালালি মাস্ট, জীবনের সব কিছুতেই অধিকিন্তুসর্বত্র গূঢ় জুগুপ্সা, কী বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন, সেটা বড় কথা নয়, কাকে দিচ্ছেন সেটাও নয়; কীভাবে দিচ্ছেন সেটাও বিচার্য নয়- সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে তিনি বিষয়টিতে ঢুকে পরেছেন, এটিই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ। তার যা খুশি করার অধিকারটা স্বলব্ধ। অনু থেকে অনুব্রত হয়ে জ্যোর্তিবিদ্যা থেকে জ্যোতিষচর্চা সকল বিষয়েই এনাদের অবাধ যাতায়াত, গতিবেগ আলোর চেয়েও সময়ে সময়ে বেশি, তাই আমরা এদের উল্টো দিকেও হাঁটতে দেখি কখনও কখনও। খাটের তলা থেকে ঝাঁপানতলা সর্বত্র মাসরুমের মত জ্ঞানের চাষ করে চলেন

এনাদের পোষাকি নাম সমালোচক

সনাতন ধর্ম মতে বিদেহী আত্মারা পুণরায় ধরাধামে জীবদেহে জন্মগ্রহণ করেন। পাপী আত্মারা কাক, শৃগাল বা সারমেয় রূপে এলেও অতৃপ্ত আত্মারা মনুষ্যরূপেই ধরাধামে অবতীর্ন হন। এনাদের থেকেই যোগ্যতমের উদবর্তনের নিয়ম মেনে সমালোচক নামক প্রাণীটি বিকাশ লাভ করেছে বলেই বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস। এমনিতে এদের বিশেষ কোনো বিশেষত্ব নেই চরিত্রে বা রূপে। এনারা দুইটি অবস্থার সামান্যতম তারতম্যকে খুব দ্রুত অনুধাবন করতে পারে, তাই দ্রুত পাল্টি খেতে এনারা ওস্তাদ। একটি নাসিকা, যেটা মিষ্টতার আস্বাদ পেলেই সেই পানে দ্রুত ধাবিত হয়ে পরেন।

একটি জিভ, চাঁটার জন্য বিশেষভাবে অভিযোজিত। দুইটি কান থাকলেও সেগুলো অ্যাপেনডিক্সের ন্যায় নিষ্কর্মা, কারণ সমালোচকরা কারও কোনো কথা শুনেছেন বলে কেউ বদনাম দিতে পারবে না। দুটো প্রসারিত হাত রয়েছে এই প্রজাতির, একই সাথে একটি গলাতে ও অন্যটি পদযুগল স্পর্শ করার মতো বিলুপ্তপ্রায় ক্ষমতা যুক্ত। প্রয়োজন অনুসারে এনারা যে হাতটা দরকার সেটাই ব্যবহার করে থাকেন। এদের দুইটি রিকেটগ্রস্ত কিন্তু সবল পা বর্তমান, যা পলায়নে উপযুক্ত। ঝামেলা লাগিয়ে দিয়ে ভদ্রতার দোহাই দিয়ে এনাদের পালানোর কৌশল বিশ্ববন্দিত। বাকি জননাঙ্গ সম্ভবত ক্লীব শ্রেণীর, হয়তবা ক্লাউন ফিসের মতো বদলিযোগ্য। সম্ভবত বললাম এইজন্য, কারণ ব্যক্তিগতভাবে কখনও এদের সাথে মৈথুনের সুযোগ পাইনি, পেলে সেই বিষয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ চটি লেখার অগ্রিম প্রতিশ্রুতি দিলাম

রিস্তে মে তো হাম সবকে বাপ লাগতে হ্যাঁয়, নাম হ্যাঁয় সমালোচকএই প্রজাতিটির এমনই গুণ যে কঠিনপণ তপস্যাকারীকেও এনারা নির্বীজ করে দিতে সক্ষম, এনাদের জিহ্বা নামক অস্ত্র প্রয়োগে। অন্তর্জালীয় এই ভূমে থকথকে পিঁচুটির এঁটুলি ঝোলা কুতকুতে চোখের কোন থেকে লালসা ঝরে পরে যাদের, তারাই আমার এই পর্যায়ের আলোচ্য- ফেসবুকীয় সমালোচক, অতএব তাদের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক

ধরা যাক একজন বিজ্ঞানী যিনি ইসরো মঙ্গলযান প্রজেক্টের সাথে যুক্ত, কিন্তু মনের দিক থেকে ইনি কবিও বটে, ফেসবুকে কবিতা লিখতে শুরু করেছেন হালফিল। তার গুণমুগ্ধ পাঠকের সংখ্যাও নেহাত কম নেই, অতএব সমালোচকের নজর গেল, ব্যাস। বিজ্ঞান চর্চা বিষয়ে জ্ঞান থাকতেই হবে এমন মাথার দিব্যি যেহেতু কেউ দিইনি অতএব সমালোচক ‘তাঁর’ সমালোচনা শুরু করে দিলেন

তার বিশ্বস্ত সূত্রে পাওয়া ঘটনা দিয়ে রটনা স্টার্ট, বিজ্ঞানী জ্ঞানী হলেও প্যান্টের ভিতরে জাঙিয়া পরেন না, এবং বাসর রাতে ইনি নাক খুঁটে হাত ধোনি, সাথে বুড়ো আঙুলও। সমস্বরে বলুন- ম্যা গো… আর কী চাই, লাইক- কমেন্ট- শেয়ারের বন্যা। ফেসবুকে অধিকাংশ সময়ই সত্যতা প্রমাণের দায় থাকে না, তাই স্বঘোষিত অভিভাবক হতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। ‘সমালোচনা ব্যবসা’ পচা ছানার মতো ফুলে ফেঁপে উঠতে দেরি হয় না

মন্টু মাতব্বর আমাদের চেনাজানা এরকমই একজন বিশিষ্ট বিদ্বজ্জন তথা ফেসবুক সমালোচক। ইনি সম্ভবত সেই হিমু ট্রমার শিকার, যিনি বিশ্বাস করেন তালিম দিলেই মহাপুরুষ হওয়া সম্ভব

কিন্তু তেমন ইস্কুল কী আর এই পোড়া ভূ-ভারতে আছে! অগত্যা নিজে থেকেই শুরু করে দিলেন পাঠশালা, অর্থাৎ শালা শব্দ পাঠের জন্য প্রস্তুতি, যেখানে তিনিই অধ্যাপক আবার তিনিই ছাত্র। যথারীতি শোরগোলের সাথে ফেসবুকের পাড়াতে নিজের অস্তিত্ব জাহির করলেন। ইনি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, গান লেখেন, গান গান, বাজনা বাজান, নিজেই নাচেন, ছবি আঁকেন, পুতুল গড়েন, কবিতা লেখেন, গদ্য বমিও করেন- আর কবিতাটা তো এনার বাই নেচার প্রতিভা, কাব্যেই কথা বলেন। তবে এনার পছন্দের বিষয়টা হলো জীবনশৈলী। ধর্মে নাস্তিক, নাম দেখে বোঝার উপায় নেই ইনি কোন জাতের। রামের আদর্শে জীবন গড়ে তোলা এমন গোঁড়া তথা পাঁড় কমিউনিস্ট, যিনি মমতার মাঝে লেনিনের ছায়া দেখতে পান। তাই সর্ব ধর্মকে নিয়ে খিল্লি করার লাইফটাইম লাইসেন্স এনার কোঁচড়ে বাঁধা আছে। আর সেটাই করেন, ফেসবুকের দেওয়াল জুড়ে নিজস্বতার ‘বিজ্ঞাপন’এর রেতঃপাতে চুনকাম করে চলেন মুহুর্মুহ

মন্টুদা তথা ফেলেব সমালোচকদের অন্যতম বড় গুণ হচ্ছে প্রায় সর্বত্র এনাদের নীরব উপস্থিতি। অকুস্থলে এনারা কেউই কিছু বলেন না বা করেন না। এনারা সর্বঘট থেকে কাঁড়া আকাঁড়া খুদ কুঁড়ো নিয়ে বেশ গুছিয়ে নিজের পাড়ায় এসে গোছা করে কালিপটকার পেটো ফাটান। পুরাণে নানা ধরনের অস্ত্রশস্ত্রের উল্লেখ থাকলেও বর্তমান ফেসবুক সমালোচকদের অস্ত্র হচ্ছে ‘SS’ নামক মারণাস্ত্র। কপি-পেস্টে এনাদের দ মেলা ভার। তাবলে এনারা সর্বত্র মন্তব্য করেন না, তাতে নাকি ইজ্জতের হানি হয়! মেকুরের মতো মাটি যদি নরম বোঝেন তবেই সেখানে বাহ্য করেন রীতিমতো আঁচড় কেটে- নচেৎ নয়। হ্যাঁ, জ্ঞানত এনারা পাণ্ডিত্য আর রেচন পদার্থ ছাড়া কিছুই ত্যাগ করেন না

মন্টুবাবুদের মতো নমুনাগুলো নিজেকে নিম্নমেধার বলেই পরিচয় দেন স্বগর্বে। ধরুন আপনি ভবঘুরে ফেসবুকার, মেধার গভীরতা খুঁজতে গিয়ে গুগুলে মেধা পাটেকরের জীবনীতে পি.এইচ.ডি করে ফেলেছেন প্রায়, তবুও মেধার পরিভাষা রপ্ত করতে পারেননি। অগত্যা মন্টুদার দেওয়াল টপকে গ্রুপে ঢুঁ মারলেন। হ্যাঁ, গ্রুপ। কদিন আগেও সমালোচক বাবুদের একটা প্রসিদ্ধ খিল্লি করার বিষয় ছিল গ্রুপবাজি। আশ্চর্যজনক ভাবে এনারা প্রত্যেকেই নিজেরা একাধিক গ্রুপ খুলে বসেছিলেন কিম্বা পেজের এডমিন। অধিকাংশ জন হালে সেভাবে পানি না পেয়ে গণেশ উল্টিয়ে আবার পুনঃর্মূষিক ভব, পেশাদার সমালোচনা ব্যবসাতে মন দিয়েছেনস্বাদ বদলাতে বাংলাদেশী ফেসবুকারদের ‘সেমি পানু’ ব্লগ পড়ে, মোহনার প্রমাণ সাইজের স্তনের সামান্য খাঁজের তীরে ‘আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিলো…’ ভেবে বিশ্রাম করেন।

 

(৩)

ফেসবুকের সংসারে মুখ্য যে কয় ধরনের পাবলিক দেখা যায় তাদের দিকে একটু দৃষ্টিপাত করা যাক। রিলস দেখে ক্লান্ত হয়ে একদল টাইমলাইনের অন্যদিক গুলোতে দৃষ্টি দেন ‘সপ্তম ভাব’ থেকে। কিছু লোক শুধুই জোকসের ভক্ত, কেউ প্রিয়জনের মৃত্যু সংবাদ দিলেও এনারা একটা অট্টহাস্যের ইমোজি নেদে দেবেন। একদল সারাদিনই কমেন্ট করেন, এনারা মূলত কমেন্টার। জেনিভা চুক্তি থেকে হরপ্পা সভ্যতা হয়ে আমস্টারডামের ব্রথেল হোক বা তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্রতা সকল বিষয়েই এনারা চটপট কমেন্ট করে দেন, তীব্র জ্বালাময়ী সব ভাষণ দিয়েই এনারা বিখ্যাত। অন্যান্য সমমতাদর্শীরা তর্কস্থলে এদের নাম উল্লেখ করে ডেকে এনে রীতিমতো স্টারের মর্যাদাও প্রদান করে থাকেন।

সারা বছরে কালেভদ্রে এনারা মৌলিক পোস্ট বা শেয়ার করেন। কুণাল বনাম শতরূপের খেউর, ‘তমাল কেন তালিবানদের’ বিরুদ্ধে বললেন না, সৌরভের শালবনীর কারখানা বা পোশাক ব্রান্ডের কী হবে, কিম্বা দরে উঠা ‘সুপ্রিম কোর্ট ও একটি কুকুর’ শীর্ষক আলাপ, অথবা রোজকার হটকেক- শোভন বৈশাখী কিম্বা মহুয়াতে পিনাকীর বাণ, মুগরি রেসকিউ করা হাতি আম্বানিরবনতারা’ যা খুশি আসুক, কমেন্টারদের মত ঘেঁটে দেবার শক্তি অমিত মালব্যেরও এরও নেই। সিলেবাসের বাইরের যেকোনো কঠিন প্রশ্নের চটজলদি কমেন্টের জন্যই ইনারা বিখ্যাত, যাই হোক ট্র্যাকে ফিরি

একদল বোদ্ধা শুধুই কবিতা, গল্প, উপন্যাস আমাশার মতন করে ডেলিভারি করেন, নির্দিষ্ট অবকাশে। তবে ঐ, টুক করে পোস্ট করে দিয়ে ফেরারি আসামির মতো গায়েব হয়ে যান পরবর্তী পোস্টের আগে পর্যন্ত। একদল ফেসবুকার পেজ বা গ্রুপের এডমিন, এনারা সারাদিন ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর ব্রতে দীক্ষিত। এনারাই আসলে মিনি সেলিব্রিটির মর্যাদা ভোগ করে নিজ নিজ এলাকাতে। এদের আচরণ অনেকটা আমলা বা মন্ত্রীসুলভ, যাবতীয় নিত্যনতুন আইডিয়াগুলো এদেরই মস্তিষ্কপ্রসূত

একদল আছেন, যারা সারাদিন শেয়ার করেন। সেটা ধর্ষণের খবর হোক বা বর্ষণের, ডোন্ট কেয়ার। একদলের আবার গ্যালপিং চিন্তাভাবনা, তাও আবার হাই লেভেলের, এদের ছোটখাটো স্টেশন ধরে না। এদের বিষয় কূটনীতিক না হয়েও সোর্জিও গোরকে কেন ট্রাম্প ইন্ডিয়াতে রাষ্ট্রদূত করে পাঠালো, নতুবা ৫ বছর আগে রাফালের বরাত ছোট আম্বানিকে যে মোদীজি দিয়েছিলেন, তারই ঘরে CBI-ED পাঠানো কি চাট্টিখানি কথা, কিন্তু তিনি করেছেন- কারণ ঝোলা উঠিয়ে চলে যাবার সময় দ্বারপ্রান্তে। তাঁর শুভ্র শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখমণ্ডলই তো অনুপ্রেরণা (কালীঘাট নয়, কারণ সেখানে খেলা হচ্ছে আজকাল)। চীন নিয়ে জয়শঙ্করের কূটনীতি কী হওয়া উচিত! মার্কিন শুল্ক বিশ্ব বাণিজ্য মানচিত্রে কতটা এফেক্ট ফেলল ইত্যাদি। ইরাণ কী পরমানু বোবা বানিয়েই ফেলেছে, কিম্বা গাজায় আসলে কে জিতল তা নিয়ে এদের ভাবনার শেষ নেই। এর মাঝে সময় পেলে একটু ক্রিকেট, একটু মোহন ইষ্ট হয়ে রোলান্ডো-মেসী সাবড়ে নেটিজেনদের মনোরঞ্জনে ত্রুটি রাখেননা

কিছুজন সজ্জনব্যাক্তি- মুসলমানেরা কত খারাপ আর কেন তাদের তাড়ানো হবে না, এই নিয়েই দ্বিতীয় ভাবনার ফুরসতই পায় না, তাদের যোগ্য সঙ্গত দেয় কিছু আরবি নামধারী- পক্ষে হোক বা বিপক্ষে। কেউ মোদীর ভক্ত তো কেউ লেলিনীয় বীর্যে জারিত হয়ে চীনাবাজারের সস্তা রেস্তঁরাতে ফিদেল খোঁজে, বর্ষার সন্ধ্যায় জার্মান শেফার্ড বাগিয়ে- আর সেটার হ্যাংওভারই হাগে ফেসবুকের ওয়ালে। কিছু জন অতীব ইন্টালেকচুয়াল, এরা যে কার পক্ষে কেউ জানেনা, কিন্তু লম্বা লম্বা হ্যাজ নামায়। কিছু আছে নেপোকিড, ১০টা ৫টার বেসরকারি চাকরির ফাঁকে, বাপের অতীত কর্মকান্ডের দয়ায় কোনো একটা রাজনৈতিক দলের লেজুড় বৃত্তি এমন ভাবে করে, যেন দলের উত্তরাধিকার একা কুম্ভ হয়ে ওকেই বইতে হচ্ছে। এদের ভিড় ঠেলে বাকি অবশিষ্টরা হয় ‘চ্যাঁচ্যাঁই মাতা’, ‘লাল সেলাম’ কিম্বা ‘খেলা হবে’র বৈধ গর্ভপাত

আজকাল ক্রিয়েটরদের যুগ চলছে। মোদ্দাকথা পোঁদ নাচাবার যুগ, একসময় ধনীরা লুচ্চা পুরুষের দল বাইজি বাড়ি যেতো গরীবের মেয়ের শরীর নাচানো দেখতে, তাকিয়াতে আধাশোয়া হয়ে টাকা ছুঁড়ে মারত। একখন বড় লোকের মেয়েরা ক্যামেরার সামনে এসে ‘ভিউ’ বাড়াবার জন্য প্রায় খোলা বুক দুলিয়ে আধা ন্যাংটা হয়ে পোঁদ নাচাচ্ছে, আর দুনিয়ার বুভুক্ষু শ্রমিক কৃষক বেকার ভবঘুরের দল চোখ দিয়ে সেগুলো গিলছে। গোটা সোস্যাল মিডিয়াই এখন বাইজিবাড়ি। এর পরের দল ফুড ব্লগার, ফ্রি খাবারের ধান্দায় রাজুদা থেকে ঝরে ঝরে পরছে- এক অদ্ভুদ মন্তাজ সৃষ্টি করেছে। একদল সারাদিন ট্যুরের উইন্ডো শপিং করেন, অন্যদল বিজ্ঞাপন দেয়। কেউ শাড়ি বিক্রি করে, কেউ কুকুরের জন্মদিন পালনের ৭ দিন ব্যাপী সঙ্গীত অনুষ্ঠানের লাইভ দেখায়। সবচেয়ে সেরা হচ্ছে ব্যারাকপুরে AC লোকাল ট্রেনের ব্লগার হওয়া। মাইরি বলছি, কুনাল ঘোষ বা শতরূপ হওয়ার চেয়েও সোজা। এগুলোই বর্তমান ফেসবুকের ‘হট ট্রেন্ডিং’।

একদল নিজের ও নিজের পরিবারের বস্তা বস্তা ছবি শেয়ার করেই সেলিব্রিটি, কেউ কেউ ঘন্টায় ২৮টা করে নিজের ছবি দিচ্ছে নানান এ্যাঙ্গেলে। কেউ কেউ আবার ওই করেই এক আধটা পেজও খুলেছেন বলে খবর আছে। কেউ বিরহ গায়, তার সবেতেই বিরহ- পরিস্থিতি যা খুশি হোক। আরেকটা দল, যারা গ্রুপ গ্রুপে পুরস্কার বিতরণ করে রোজ, নিত্য, নিয়মিত। ফলত আপনি যদি তেমন গোটা সাতেক গ্রুপের মেম্বার থাকেন, রোজই কিছু না কিছু একটা শিরোপা জুটবেই, ধ্বজভঙ্গ বঙ্গ সিপিএমের বৃদ্ধতন্ত্রের মতই সত্য ঘটনা এটাও ট্রাম্প যদি ‘নোবেলেরলোভে যুদ্ধের পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারে, একজন সত্যকারের ফেস-‘বুকার’ কেন রোজ পুরষ্কার দাবী করতে পারবে না! যদিও প্রেরকদের কে ওই বিচারকের আসনে বসিয়েছে এ সত্য জানার কোনও উপায় নেই। শেষের দলটি ‘আমি আর ফেসবুক করব না’, ‘বিদায় বন্ধু’, ‘ফ্রেন্ডলিষ্টের আগাছা পরিষ্কার করব’, ‘ফেসবুক রিচ কমিয়ে দিয়েছে, প্লিজ স্টিকার কমেন্ট করো’, ‘আগামীকাল একটা বড় দিন…’, 'সুপ্রভাত', 'শুভরাত্রি', ‘এতো কষ্ট কেন”, এই ধরনের আঁতলামো পোস্ট করেই মানসিক তৃপ্তি লাভ করেন

বাপে বলেছে সুধীরভাই, আনন্দের আর সীমা নাই, এই একটা প্রজাতীর প্রাণী ফেসবুকের সমাজে সবর্ত্র বিরাজমান, এবং এরাই সংখ্যাধিক্য। এরা সকল কিছুতেই ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর জটিল, বাছা বাছা কঠিন অব্যয় আর বিশেষণ ব্যবহার করেন। এরাই সমালোচকদের মূল খদ্দের। কারণ বাকি সকলেই নিজ নিজ কর্মে ব্যস্ত, সুতরাং মধু আর মালতির এ এক বিচিত্র গন্ধ শোঁকাশুঁকি

বাকিরা? নাহ এখানেই শেষ নয়, শেষেরও একটা শেষ থাকে, বাকি হলে তারা...

আরে বাওয়া, এরাই তো হলেন ওই মন্টু বাবুর বাপ, বিদগ্ধ সমালোচকদেরও সমালোচক। নাম না দিয়ে কেউ যদি একটা রবি ঠাকুরের কবিতা বা সেক্সো কবির ড্রামা পোস্ট করে ফেলেছেন, এনারা নির্দ্বিধায় তার মা-মাসি উদ্ধার করে দেবেন অবলীলাক্রমে

কবি ঠাকুরের কথায় মনে এল, ইনি অনেক বই ছাপিয়েছিলেন বা প্রকাশকও এনার বই ছাপে। আজকের এই ট্যাকস্যাভি যুগে আড্ডার পরিসরটা বা চেনা পরিচিতের গণ্ডিটা ফেসবুক ভায়া হয়েই বস্তু দুনিয়ার প্রান্তে উন্মুক্ত হচ্ছে। অনামি তথা শখের লেখকেরাও একটা চটজলদি পাঠক প্রতিক্রিয়াও পাচ্ছেন, হ্যাঁ-না করতে করতে কিছু জন বইও ছাপিয়েই ফেলছেন। মুশকিল হচ্ছে, ফেসবুকে ৩ লাইনের ‘স্ট্যাটাস’ দেওয়া লোকটাও নিজেকে লেখক ভাবছে, না তার ব্যকরণ জ্ঞান রয়েছে, না আছে বাক্য গঠনের আসত্তি জ্ঞান, না রয়েছে বাংলা বিশেষণের মজুদ, না আছে অর্থপূর্ণ ভাব প্রকাশের জন্য শব্দভান্ডার, না রয়েছে বাক্যাংশ পরিস্ফুটনের অলঙ্কার, তার সাথে পদে পদে বানান ভুলে ভরা মানুষটাও নিজেকে লেখক ভেবে বই ছাপিয়ে ফেলছে, সমস্যা এটা। তার পরেও ঘটনা হচ্ছে ছাপাছাপির বিষয়টা আগের চেয়ে অনেক অনেক কমে গেছে, যেটা বই পাড়াতে যাতায়াত করলেই মালুম হয়। কিন্তু ছাপার অক্ষরে নিজেকে দেখার বাসনা কার না হয়- একটা আম জীবনে অন্নপ্রাশন, বিয়ে আর শ্রাদ্ধ ছাড়া কার নামই বা আর ছাপার কালিতে ছাপে! সুতরাং, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবাদেই ফেসবুকের মঞ্চ থেকে আরও অনেক সংগঠিত কর্মের মতো বই ছাপানোও হচ্ছে

তাহলে আর কী! হাত গুটিয়ে বসে থাকার প্রশ্নই নেই? কিছু লেখিকা (WBCS অফিসারও বটে) লেখেন- সম্পূর্ণ কাল্পনিক কিন্তু গবেষণাধর্মী ইতিহাসশ্রয়ী উপন্যাস, যা আমাদের গৌরবময় অতীতকে মনে করাবে”। পুরো পুদিচ্চেরি কেস, লেখেন বললাম, আসলে এনারা ছাগলের চেয়েও উন্নত প্রসবশীল প্রাণী, বছরে ৫-৭টা উপন্যাস স্বয়ং কবি ঠাকুরও লেখেননি, ইনারা ছাপাচ্ছেন- স্বগর্ভে থুক্কুরি স্বগর্বে। বাঁশবনে শেয়াল রাজা, নব্বই এর দশকের বাংলা সিনেমা আর আজকের বাংলা ভাষায় আধুনিক লেখকদের বেশিরভাগ অংশটা- হোল…বোল…, এরা রোজগার করে খায় এটাই সত্য। বাংলায় শিল্প যেখানে চপ, সেখানে মুদ্রাক্ষরিক পেশাতে মুনিশেরা জুটবে এটা বলাই বাহুল্য। কিন্তু ইজ্জতেরও প্রশ্ন আছে বস! সমালোচনা মাংতা হ্যাঁয়, অতএব লাগাও কাঠি

ফিরে যাই শুরুর লাইনে, আপনি যদি রাজনৈতিক নেতা হন, চোর, ডাকাত, খুনী, ধর্ষক হন আপনি অনেকটা সেফ- সমালোচকদের থেকে। কারণ কোষ বলতে এদের শুধুই অণ্ড, বাকিটা চর্বি আর জ্ঞান। সুতরাং পাল্টা আসতে পারে এমন বাক্সের ধারেকাছে এনারা যান না। আসলে ময়ূখ ঘোষ লেলিয়ে দেয়- কুসম কুসুম করে মাথার চুল ছিঁড়ে নেবে। কিন্তু যদি আপনি নিরীহ নির্বিরোধী লেখক হন! তাহলে আর আপনার রক্ষে নেই। আপনার যাবতীয় সকল কিছু ভালমন্দ বিচারের ঠিকেদারি এনারা নিজ দায়িত্বে কাঁধে তুলে নেবেন। শুরু হয়ে যাবে নিরন্তর কাঠিবাজী, কাঠির টান পড়লে হাতে পায়ে কুড়িটা আঙুল হ্যায় না...

কেউ মদের নেশা করেন, কেউ মেয়েছেলের, কেউ রেসের মাঠে যান। গাঁজা, চরস, হেরোইন তো আছেই। একটাকেও সমাজ ভাল চোখে নেয় না। কিন্তু আপনি যদি বই লেখা বা ছাপানোর মতো নিরীহ নেশা করেছেন!! অমনি সমালোচকের দল এমন ফেনাতে শুরু করে দেবে, যে আপনার খাটের তলা অবধি পৌঁছে যাবে। আপনি হয়ত বিনিদ্র রজনীতে পেটে অম্বলের দোষ করে বসে আছেন। আনন্দের বিষয় হলো আপনার পায়ুরন্ধ্রে সমালোচকের দল হয় কাঠি বা আঙুল কিছু একটা গুঁজে রেখেই দিয়েছেন। সমালোচোকরা সেটা টেনে মাঝে মাঝে বের করে শুঁকবেন, দেখবেন গন্ধটা ঠিকঠাক মনমতো ঝাঁঝালো হলো কিনা

সমালোচক সকল কিছুই করেন শুধু এটুকু বোঝেন না, আঙুল বা কাঠি করতে করতে আঙুলের ডগাতে যে হলুদ বর্ণটা শোভা বর্ধন করে ওটা তরল কাঞ্চণ নয়, পাতি নরগোবর। কিন্তু বিজ্ঞ সমালোচককে কে বোঝাবে! তিনি ওতেই মোক্ষ লভেছেন

ফেসবুক পূর্ব জীবনের এক পর্যায়ে সময় সময় মনে হতো, ছোট বেলায় কত কষ্ট করে নামতা, ব্যাকরণ ও মাস্টার টেন্সের গজগজে ভিড় ঠেলে মাতৃভাষায় নানা ধরনের গালি শিক্ষা অর্জন করে নিজেকে ঋদ্ধ করেছিলাম। কিন্তু কলেজ শেষে পেশা জগতে ঢুকে চর্চার অভাবে অধিকাংশ গালিই ভুলে যেতে বসেছিলাম। তবে, বিগত প্রায় দেড়দশক ধরে আবাল সমালোচকদের দেখলেই মনের মাঝে চু-কিত-কিত খেলে যায় সেই কৈশোরে শেখা গালিগুলো, সঠিক পরিবেশে পুনরায় চর্চিত হয় স্বস্নেহে। এই সমালোচকদের কল্যাণেই ঐতিহ্যবাহী বাংলা খিস্তিখেউর গুলো আজ বিলুপ্তির পথ থেকে ১৮০ ডিগ্রী ঘুরে স্বমহিমায় নিজের অস্তিত্বের জানান দিয়ে যায়। এভাবেই ইতিহাস সচল থাকার পথ খুঁজে নেয়। রয়ে যায় সেই ভাষা, অক্ষরের প্রেম, হারিয়ে যায় মানুষ, হারায় সময়, রয়ে যায় প্রেম

বর্তমান সমাজ- ফেসবুকীয় পরাকাষ্ঠা, স্ট্যাটাসের ভিড়ে অক্ষম রমনের প্রয়াসে নিত্যনতুন খুঁত খুঁজে ফেরা অতৃপ্ত আত্মার সাথে প্রতিষিদ্ধ স্বমৈথুন

 

 

সোমবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৫

দুনীতি, মোদী সরকার ও বিজেপি পার্টি

 

 

(১)

মহারাষ্ট্রের ৩০টা জেলার ৯০টা তালুক ভয়াবহ ভাবে বন্যা কবলিত হয়েছে শেষ ২ মাসে, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ বিদর্ভ অঞ্চল। মারাঠওয়াড়ায় বন্যায় ৭০ লক্ষ একর জমির ফসল ধ্বংস হয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষকদের ক্ষতিপূরণ, বেকারত্ব, খারাপ রাস্তা, যানজট এবং জলাবদ্ধতার বিষয়টি সমাধানের পরিবর্তে, বিজেপি নেতা মন্ত্রীরা পরে রয়েছে মুম্বই পুরসভা তথা বিএমসি নির্বাচন নিয়ে। সেই অকৃত্রিম হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের রাজনীতিতে মজে আছে বিজেপি ও সংঘ পরিবার। মুম্বাইয়ের বিজেপি প্রধান অমিত সাটম প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছে- বিজেপি হেরে গেলে মুম্বাইয়ে মুসলিম মেয়র হবে ও মুম্বই পাকিস্তান হয়ে যাবে। আরেক মন্ত্রী নীতেশ রানে প্রকাশ্যে বলছে- হিন্দুরাষ্ট্র ঘোষণা করে, তার আওতাতে ভোট হোক, কারন হিন্দুরাই দেশপ্রেমিক তারা বিজেপিকে ভোট দেয়, বাকিরা দেশদ্রোহী।

আশার কথা হচ্ছে বিজেপির এই ফাঁদে সাধারণ মারাঠা মানুষ পা দেয়নি, বিরোধী শিবসেনা, কংগ্রেস ও বামদলগুলোর লাগাতার আন্দোলনে অবশেষে জাতীয় বিপর্যয় ঘোষণা করে- জমির কর, বাচ্চাদের স্কুল ফিজ, ইলেকট্রিক বিল মকুব এর মত, মানুষকে কিছুটা নিষ্কৃতি দিয়েছে পরবর্তী ৬ মাসের জন্য। পাশাপাশি ৩১৬২৮ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ প্যাকেজের ঘোষণাও হয়েছে। এ অবধি শুনে কী মনে হচ্ছে, বিজেপি সরকার সর্বরোগহরা কল্পতরু জনদরদী হয়ে গেছে? আসল খেলাটা এখান থেকেই শুরু। নবী মুম্বই ও মাড আইল্যান্ডের জমি আম্বানিকে দিয়ে দেওয়া, আদানিকে ধারাভি বস্তি দান করে দেওয়ার জবাবদিহির জ্বলা তো ছিলোই, তার উপরে ‘লাডকি বেহেন যোজনা কেলেঙ্কারির’তে বিজেপির ফড়নবিস সরকার ল্যাজেগোবরে হয়ে বসে আছে, সেসব থেকে নজর ঘোরাতেই ক্ষতিপূরণ প্রতিশ্রুতির গল্প ফেঁদেছে।

শুরুতেই বলে রাখি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, মব লিঞ্চিং, গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব, জাতপাতের বিভেদ, মনুবাদি বর্ণভেদ মূলত দলিতের উপরে অত্যাচার, গোরক্ষার নামে গরীব মুসলিম অত্যাচার ও হত্যা, বে-রোজগারি, আম্বানি, আদানি এগুলোকে আজকের ‘দুর্নীতি’ তালিকাতে স্বতন্ত্রভাবেই রাখিনি, কারন বিজেপির পরিচয় ই এগুলো। ঘটনাক্রমে এদের কেউ এসে গেলে সেটা একান্তই বাধ্যতামূলক। এছাড়া ললিত মোদি কেলেঙ্কারি, ছত্তিশগড়ের চাল কেলেঙ্কারি, প্রিয়দর্শিনী ব্যাঙ্ক কেলেঙ্কারি, গুজরাটের SGPC কেলেঙ্কারি, বিজয় মাল্যকে দেশ থেকে সেফ প্যাসেজ কেলেঙ্কারি, গির টাইগার রিজার্ভ কেলেঙ্কারি, পাঞ্জাবে ভূমি কেলেঙ্কারি, পানামা পেপার কেলেঙ্কারি, লাভলি অ্যামনেস্টি স্কিম কেলেঙ্কারি, টেলিকম কেলেঙ্কারি, রাফালে কেলেঙ্কারি ও রানিং চলা ভোট চুরি কেলেঙ্কারি গুলো অতি জনপ্রিয় ও প্রায় সকলেই জানে, তাই এগুলোকেও বাদ রাখছি আলোচনা থেকে।

এর চেয়ে তুলনামূলক কিছু কম জনপ্রিয় কেলেঙ্কারি যেমন- Freedom 251 (2016), Birla-Sahara Diary (2016), PNB-Nirav Modi (2018), IL&FS Crisis (2018), PMC Bank (2019), DHFL Fraud (2019), Karvy Broking (2019), Yes Bank (2020), PM CARES Fund (2020), Pegasus (2021), Hindenburg (2023), Electoral Bonds (2024), NEET Leak (2024), UGC-NET Leak (2024), Digital Arrest Scams (2022-2025) ইত্যাদি দুর্নীতি গুলো প্রত্যেকটা এক একটা অন্তত ৬ ভলিউমের উপন্যাস এর সমান পৃষ্ঠা দাবী করে, তাই এগুলোর শুধু নাম নিয়েই ক্ষান্ত দিলাম। মোদীর পিছনে একটা লম্বা তালিকা যুক্ত ‘ভাইপো’ দের তালিকা আছে, যেদের আসল পরিচয় ‘নেপোকিড’ নামে, এরাও বাপের রাজনৈতিক পরিচয় ভাঙিয়ে জোঁকের মত জনগনের করের টাকা চুষে খাচ্ছে

গত ১১ বছরে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে, সাড়ে ৭ হাজার ভারতীয় কোম্পানি দেউলিয়া হওয়ার জন্য আবেদন করেছে, যার মধ্যে ১,২৭৪টি কোম্পানি পরিত্রাণ চাইতে চাইতেই অবলুপ্ত হয়ে গেছে। ২০২৫ এর মার্চ অবধি মেহুল ভাই, নীরব ভাই, বিজয় ভাই, সন্দেসারা ভাই এর মত গুজ্জু ব্যাঙ্ক জালিয়াতেরা ৯,৩৫,০০০ কোটি টাকার লুঠ করে বিদেশ পালিয়েছে। মার্চ ২০২৫ অবধি শেষ ১০ বছরে ১৬.৩৫ লক্ষ কোটি টাকার অনাদায়ী কর্পোরেট ঋণ মুছে দিয়েছে, এসব তথ্য আমাদের মুখস্ত, তাই আজকের আলাপটা একটু অন্য আঙ্গিকে অন্য দ্যোতনায় দেখার চেষ্টা করি।

মোদী সরকারের নতুন রাষ্ট্রীয় শিক্ষা পলিসি, দুর্নীতির স্বর্গ। সরকার UGC কে আগামীতে আর ফান্ডিং করবেনা। সরকার সুদী মহাজন হয়ে ছাত্রদের লোন দেবে- HEFA নামের সংস্থা কানাড়া ব্যাঙ্কের সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চারে ক্রেডিট কার্ডের মত লোন দিচ্ছে। শিক্ষাকে মুনাফাখোরি ধান্দায় পরিনত করেছে, এটাই বিকাশ। এমনিতেই দেশে মৌলিক গবেষণার তেমন সুযোগ নেই, আগামীদিনে শিক্ষকেরা কেউ পার্মানেন্ট চাকরিতে থাকবে তো? নাকি সেখানেও সিভিক প্রথা নিয়োগ হবে! ছাত্রদের স্কলারসিপ সম্পূর্ণ বন্ধ, কারন টাকা শুধু গুজ্জু কর্পোরেট ভাইদের জন্য বরাদ্দ। সামান্য হোস্টেল ফিজ মাসে ১০ হাজার বা তারও বেশী, এর সাথে সেমিস্টার ফিস, আরো অন্যান্য আনুসাঙ্গিক খরচা রয়েছে। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা থেকে ক্রমশ গরীবকে তাড়িয়ে দেবার প্ল্যান পাকা, ধনী উচ্চবর্ণের ছেলেপুলেই কেবলমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে। রাজ্যওয়ারি যে শিক্ষা প্রতিশষ্ঠান গুলো রয়েছে সেখানে নামেই কলেজ, বাকি কোনো ফেসিলিটি আধুনিক শিক্ষার আছে কি?

নিতীন গড়কড়ির দপ্তর রাস্তা তথা সড়ক দপ্তর। স্পেস ট্যেকনোলজি ব্যবহার করার ভাঁওতাবাজি বাজারে ছেড়েছিলো, দেশজুড়ে একটা রাস্তাও ৬ মাস পার হয়নি, এমনকি অয্যোধ্যার রামপথও বাকি সব সড়কের মত ফুটিফাটা হয়ে খানাখন্দে ভর্তি হয়ে গেছে। দুর্ঘটনা বাড়ছে, জানজট হচ্ছে, সময় নষ্ট হচ্ছে, গাড়ির মাইলেজ কমে যাচ্ছে; এদিকে গড়কড়িকে নাকি দুবাই এর বাদশা ডাকছে- চুরির কৌশল শিখতে বোধহয়। আসলে প্রতিটা টেন্ডারে ৪০-৫৫% টাকা ঘুরপথে বিজেপির নেতা, মন্ত্রী, পার্টি ফান্ড, স্থানীয় বাহুবলী, আমলা থেকে চাপরাশি সবাইকে খাওয়াতে হয়, নাহলে একটা গাঁইতির অবধি ছোঁয়াতে দেবেনা। বিজ্ঞানীদের গবেষণা বলছে, আমাদের ভারতীয় ট্রপিক্যাল আবহাওয়াতে যেখানে VG-40 মানের বিটুমিন ব্যবহার করা কম্পালসারি, সেখানে VG-10 মানের নিকৃষ্ট বিটুমিন ব্যবহার করা হচ্ছে সর্বত্র। এতে দুটো লাভ, এক প্রথম দফার কাটমানি, দ্বিতীয় হলো পরবর্তী মেন্টেনেন্স এর টেন্ডার থেকেও কাটমানি। রাস্তা ১০ বছরের জাইগাতে ৩ বছরেই ধুয়ে মুছে গেলে আবার নতুন করে টেন্ডার, আবার নতুন কাটমানি- এক অনন্ত বৃত্ত। শুধু নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহারের দরুন প্রতি কিলোমিটার রাস্তাতে এরা ৩ লাখেরও বেশী চুরি করেছে। গোটা দেশের নিরিখে অঙ্কটা এবারে গণনা করে নিন।

রাস্তায় মূলত চারটে লেয়ার হয়। জল চোঁয়ানো বন্ধ করতে গেলে সাব বেস লেয়ার, বেস লেয়ার ও বিটুমিন মাখা পাথরের লেয়ার কমপক্ষে ২০ সেন্টিমিটার পুরু হওয়া দরকার। সবার উপরে ৬ সেন্টিমিটারের পুরু বিটুমিনের চাদর বিছানোর টাকা বরাদ্দ হয় মন্ত্রক থেকে। সেখানে বিজেপির চোরের সাম্রাজ্য ৩টে মিলিয়েও ৩০ সেন্টিমিটার লেয়ার লাগায়না। পাতলা লেয়ারের দরুন ভারি রোলার ব্যবহার করতে পারেনা, হালকা ২-৩ টনের রোলার ঘষে দায় সারে, যেখানে অন্তত ১৫-২০ টনের রোলার আবশ্যিক- এয়ার পকেট বন্ধ করতে। ফলত কিন্তু ভারি লোডের গাড়ি সেই রাস্তায় চড়লেই রাস্তা ফেটে যায়, সেখান দিয়ে জল চুঁইয়ে গর্ত তৈরি হয়। এই লেয়ার, রোলার ভাড়া, ডিজেল, লেবার বাবদও প্রতি কিমিতে এরা ৫ লাখের বেশী চুরি করে। আগামীতে মোদী সরকারের দুর্নীতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হবে।

স্বাস্থ্যসেবা খাতে দুর্নীতিও পাহাড় প্রমাণ। বৃহৎ আকারের সরকারি প্রকল্প গুলোর উদ্দেশ্যই জালিয়াতিমূলক কার্যকলাপকে প্রমোট করার জন্য। দেশের অধিকাংশ হাসপাতালে পরিষেবা প্রদানের নুন্যতম পরিবেশ টুকু নেই, সেখানে প্রযুক্তিগত অত্যাধুনিক বিষয় তো চাঁদমারি। কর্পরেট হাঙরদের জন্য নিত্য বাড়িয়ে যাচ্ছে ওষুধের দাম। চিকিৎসা শিক্ষা দুর্নীতি আরেক বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি সিবিআই তদন্তে দেশব্যাপী ৩৯০০০ কোটি ঘুষের টাকার চক্র উন্মোচিত করেছে। কোভিড-১৯ মহামারী চলাকালীন চিকিৎসা সরঞ্জাম, ও ভ্যাকসিন ক্রয় প্রক্রিয়ায় ২৭ হাজার কোটি টাকার গুরুতর দুর্নীতি’ ধামাচাপা দিয়ে দিয়েছে। CAG রিপোর্ট অনুযায়ী ৭.৫ লক্ষ সুবিধাভোগীকে একটি মাত্র মোবাইল নম্বরের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে, যা গোটাটাই সরকারী টাকার জালিয়াতি

আয়ুষ্মান ভারত-প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা (AB-PMJAY), এটারও রন্ধ্রে রন্ধ্রে জালিয়াতি আর তহবিল তছরুপের গল্প। মার্চ, ২০২৫ অবধি, জাতীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের (NHA) জালিয়াতি বিরোধী ইউনিট, জালিয়াতিমূলক কার্যকলাপের জন্য ৩,২০০ টিরও বেশি হাসপাতালের সুপারের বিরুদ্ধে জরিমানা ও FIR করেছে। সংসদে কেউ কোনো জবাবদিহি করেনি। এদের কাজই হচ্ছে ভুয়ো বিল ‘আপকোডিং, যেখানে চিকিৎসার আসল খরচের চেয়ে বেশি, মানে ৩-১০ গুন অবধি ব্যয়বহুল দেখানো হয়।

ORG-Marg Research ও International non-governmental organisation Transparency International নামের দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সমবেত জরিপ অনুসারে, ভারতের জনগণের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে স্বাস্থ্যসেবা ভারতের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত পরিষেবা খাত। বিশ্বের ৩০টি সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে ভারতের স্থান চতুর্থ জনগণের প্রতি চারজনের একজনকে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার জন্য ঘুষ দিতে হয়। হাসপাতাল কর্মী, চিকিৎসকদের দুই-তৃতীয়াংশ ঘুষখোর, প্রত্যেকের দাবী উপরতলায় নাকি টাকা দিতে হয়। টাকা গুলো বিজেপির নেতা মন্ত্রীরা ছাড়া কে খায়?

একটা আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপের মতে দেশের সবচেয়ে বড় দুরর্নীতিগ্রস্থ সংস্থা হলো- বিচার ব্যবস্থা, যেখানে ৮০% এর বেশী কর্মকর্তা নানা ভাবে নানান ধরণের জালিয়াতি করে, সাথে বিপুল পরিমান আর্থিক দুর্নীতিতে যুক্ত এই সিস্টেমটার নিচে থেকে উপর মহল সর্বত্র। এর পর ৭৫% কোরাপ্টেড অফিসার নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছে খাদ্য দপ্তর, ফার্মাসিটিউক্যাল দপ্তর, জনস্বাস্থ্য কারিগরী দপ্তর, স্বাস্থ্য দপ্তর, ও মেট্রোলজি দপ্তর। তৃতীয় দুর্নীতিগ্রস্থ দপ্তর হলো শ্রম দপ্তর, ৬৯% অফিসারই কোরাপ্টেড। ভূমি দপ্তরে ৬৭%, GST দপ্তরে ৬২%, দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদে ৫৯%, পুরসভা ও আর্বান উন্নয়ন দপ্তরে ৫৭%, ইনকাম ট্যাক্স দপ্তরে ৪৭%, অগ্নিনির্বাপক ও বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরে ৪৫%, পুলিশে ৪৩%, পরিবহণ দপ্তরে ৪২%, বিদ্যুৎ বিভাগে ৪১%, আর আবগারি দপ্তরে ৩৮% অফিসার দুর্নীতির সাথে যুক্ত। এটাই মোদী রাজের অমৃতকাল।

মোদী সরকারের সবচেয়ে আলোচিত প্রোজেক্টের মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল ইন্ডিয়া, বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও, আয়ুষ্মান ভারত, জল জীবন মিশন। বেটি বাঁচাও প্রকল্পের ৭৯% পয়সাই গোদি মিডিয়ার পেটে গেছে। তবে গত ১০ বছরে সবথেকে বেশী বাজেট বরাদ্দ হয়েছে নমনী গঙ্গা প্রজেক্ট ও স্বচ্ছভারত অভিযান নামের দুই প্রকল্পে। প্রথমটাতে ৩০ হাাজার কোটি গঙ্গায় কীভাবে তলিয়েছে কেউ জানেনা, জেডি আগরওয়ালার নাম কেউই জানিনা হয়তবা, ইনি কোনো এলেবেলে মানুষ ছিলেননা। IIT রুরকির এই এ্যালুমনি একসময় সেন্ট্রাল পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ডের সদস্য ছিলেন। বিজ্ঞানী ও গবেষক মানুষটি গঙ্গা দূষন রোধের নামে আসা ‘নমনী গঙ্গা প্রোজেক্টের’ সরকারী টাকার নয়ছয় ও আসল কাজ না হওয়ার প্রতিবাদে আমরণ অনশনে বসেছিলেন হৃষীকেশে। ১১১ দিন ধরে লড়াই করে শহীদ হয়ে গেছেন, সরকারের তরফে কেউ সামান্যতম খোঁজ টুকু করেনি। মিডিয়াও এ খবর দেখায়নি, কারন গঙ্গা সাফাই এর বরাদ্দকৃত টাকা তো বিজ্ঞাপনের নামে তাদের পেটেই চলে গেছে, কেন দেখাবে!

স্বচ্ছভারতের নামে দেশজুড়ে ৭ লাখ টয়লেট বানিয়ে প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট খরচা হয়ে গেছে। বাকি প্রকল্পগুলোর কথা নাইবা বললাম। এই সমস্ত প্রজেক্ট গুলোর ৫৫% এর বেশী টাকা গিয়েছে দেশের মিডিয়া হাউজগুলোতে, সেটা ইলেকট্রনিক্স হক বা প্রিন্ট মিডিয়া। মোদী সরকার, মিডিয়াকে কেনার জন্য ‘সচেতনতা আর সরকারী প্রকল্পের প্রচার’ নামের আড়ালে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার এই হরির লুঠ চালিয়েছে। এমনি এমনি ভারতীয় মিডিয়া ‘গোদি মিডিয়া’ হয়ে যায়নি, বিপুল পরিমান টাকার বিনিময়ে এরা বিক্রি হয়ে সারাদিন সরকারের পক্ষে ঘেউ ঘেউ করে। চুম্বকে, মিডিয়াকে কিনতেই এই ভুয়ো প্রজেক্টগুলো লঞ্চ করা হয়েছিলো সুক্ষ পরিকল্পনা করে, যার মাধ্যমে দিনের আলোতে জনগণের করের টাকা দিয়ে মিডিয়া পোষা যায়। আপনি RTI করুন, সরকার কোনো তথ্য দেবেনা, কারন এর চেয়ে বড় দুর্নীতি আর কিছু নেই।

গোটা দেশজুড়ে বিজেপি আর দুর্নীতি আজ একশব্দে ‘সমার্থক’, তারা শুধু আদানি আম্বানিকে দেশের সম্পদ তুলে দিচ্ছে এমন একতরফা নয় বিষয়টা, করোনার পর থেকে প্রায় প্রতিটা রাষ্ট্রীয় পদে ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতা ব্যক্তিগত স্তরে কোটি কোটি টাকা চুরি করছে চোখের সামনে। গড়করি থেকে অশ্বিনী বৈষ্ণব সবকটা পেশাদার দুর্নীতিবাজ। রাজ্যওয়ারি স্থানীয় স্তরে এদের অকপর্ম নিয়ে কিছুটা হইচই হলেও দিল্লি কেন্দ্রিক ‘পোষ্য’ মিডিয়া হাউস গুলোকে দিয়ে এগুলো চেপে দেওয়া হচ্ছে, সোস্যালমিডিয়াতে ভয়াবহ ভাবে সেন্সর করা হচ্ছে। স্রোতের মত দুর্নীতির ধারা বইছে, চুরি, খুন, গুম সব রয়েছে, একটার রেশ মিটতে না মিটতেই পরবর্তী আরো অনেক বড় একটা কেচ্ছা সামনে এসে যাচ্ছে। বিজেপির আইটি সেল ও গোদি মিডিয়া হিন্দু, মুসলমান, গরু শুয়োরের অযৌক্তিক ন্যারেটিভ প্রোপ্যাগান্ডা লাগাতার প্রচার করছে, যেন ওটাই মূল সমস্যা, ফলে জনগনের ফ্ল্যাস মেমোরি থেকে সাম্প্রতিক অতীতটা দ্রুত ধামাচাপা পরে যাচ্ছে।


                                                                 (২)

‘দ্য ওয়ার’ এর একটা রিপোর্ট মোতাবেক, বিগত ১০ বছরে ২৮জন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবাদিক খুন হয়েছে বিজেপি শাসিত রাজ্যে। এটা অফিসিয়াল সত্য, এর বাইরেও ১০০ এর বেশী ছোট এলাকার সাংবাদিক, ইউটিউবার গায়েব হয়েছে, কার লাশ পাওয়া গেছে, কারো যায়নি। এগুলোকে কোনোটা পরকীয়া, কোনটা ডিপ্রেশন, কোনোটা সাংসারিক কলহ নাম দিয়ে ‘কেস ক্লোজ’ করে দেওয়া হয়েছে। এদের দোষ ছিলো একটাই, বিজেপি সরকার ও তাদের নেতা মন্ত্রীদের ভ্রষ্টাচার প্রকাশ করে দিয়েছিলো ভিডিওতে। যাদের গুম খুন করতে পারছেনা, তাদের উপরে দেশদ্রোহীতা, UAPA, মানহানী সহ এমন সব ধারা লাগাচ্ছে যে, জেল আর আদালতের চক্কর কাটতে কাটতে জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে।

পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, মোদীর ‘শিক্ষিত’ ইলেকট্রনিক্স এবং তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব, সংসদে বিল আনতে চলেছে- যেখানে কোনো নেতা বা মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিষয়ে লিখতে গেলে সরকারের থেকে অনুমতি নিতে হবে, অন্যথায় ৫০০ কোটি টাকা অবধি জড়িমানা, অনাদায়ে জেল হবে। সুতরাং, মহারাষ্ট সরকারের ৩১৬২৮ কোটি ক্ষতিপুরণ প্যাকেজ আসলে দেখতে শুনতেই ভালো, এই টাকা কার পেটে যাবে কেউ জানেনা। প্রশ্ন করলেই প্রশ্নকর্তা গায়েব হয়ে যাবে। আগামীতে এই প্রশ্ন করে আরো কতজন স্বাধীনভাবে কাজ করা সাংবাদিক প্রাণ খোয়াবে কে জানে!

রাজীব প্রতাপ, এই নামের কাউকে আপনার চেনার কথা নয়।  মাত্র ৩৬ বয়সী ছেলেটি ‘দিল্লি উত্তরাখণ্ড লাইভ নামে একটি ডিজিটাল নিউজ চ্যানেল চালাত। উত্তরাখণ্ডের বিজেপি সরকারের নানান বিষয়গুলি নিয়ে রিপোর্ট করত সম্প্রতি সে উত্তরকাশীর জেলার একটা সরকারী হাসপাতালের দুরবস্থা এবং একটি সরকারী ইস্কুলের মিডডে মিল, শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে লাগাতার টিউটিউবে পোষ্ট করে সরকারের থেকে জবাব চাইছিলো।

শুরুতে ভিডিও ডিলিট করতে বলে হুমকি ফোন, তারপর গত ১৬ সেপ্টেম্বর গাঙ্গোরি নামের একটা স্থানে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয়ে যাসন্দেহজন কয়েকজন লোকজনের পিছু করা দেখে উদ্বিগ্ন বোধ করেছিলো বেচারা, সেই রাত্রে স্ত্রীকে মেসেজও করেছিলো ছেলেটি। ফোন সিগন্যালের আওতাতে না থাকার কারনে ২ দিন পর, হঠাৎ গভীর রাতে মেসেজটি তার স্ত্রীর কাছে ঢোকে। ১৯ সেপ্টেম্বর গাঙ্গোরীর কাছে ভাগীরথী নদীতে তার গাড়িটি দোমড়ানো মোচড়ানো অবস্থায় পাওয়া যায়, জোশিয়ারা ব্যারেজ সংলগ্ন নদী থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এর পর? বিচারপতি লোয়া’র খুনের যেখানে বিচার হয়না, সেখানে কে আশা করবে যে এই অখ্যাত রাজীব প্রতাপের মৃত্যুর সত্য উদ্ধারে তদন্ত হবে!

মিডিয়া হাঙরদের কথা উঠলে আমরা শুধু গোদি মিডিয়াদের কথাই শুনি, গোদি মিডিয়া তৈরিতে মোদীজি মাস্টার হলে, উত্তরখন্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি মোদীরও গুরু। উত্তরাখণ্ড বিজেপি সরকার নিজেদের ও মোদীর ঢাক পেটানোর জন্য প্রতিদিন প্রায় ৫৫ লক্ষ টাকা খরচ করেছে শুধু টিভি মিডিয়াতে, ৫ বছরে প্রায় ১,০০১ কোটি টাকা। এ ছাড়া বুকলেট, আউটডোর এ্যাড, রেডিও, ইউটিউব, ফেসবুক, খবরের কাগজ, ফোনের SMS, ও সিনেমাতে ‘সনাতনী’ প্রযোজনা বাবদ- শেষ পাঁচ বছরে ৯২৩ কোটি টাকা খরচা করেছে, যার মধ্যে মিসলেনিয়াস খাতে ১২৮ কোটি টাকা। একটা নামহীন চ্যানেলকে ১৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকার বিজ্ঞাপন দিয়েছে, ৫ বছর আগে যাদের অস্তিত্বই ছিলোনা। ২০২১-২২ সালেই ৭ কোটির বিজ্ঞাপন পেয়েছিলো। এটা উত্তরাখন্ডেরই এক মন্ত্রীর ছেলের সংবাদ সংস্থা।

গত ৩ বছরে বিভিন্ন আর্থিক দুর্নীতির দায়ে ২০০ এর উপরে ব্যাক্তি জেলে, মূলত তোলা আদায়, ভাগা আর ঘুষ কান্ডে। এরা সকলেই বিজেপির নেতা, সরকারী চাপরাশি থেকে আমলা সব পর্যায়ের কর্মী আছে। সরকারী টাকার হরির লুঠ চলছে। রামদেব আর তার স্যাঙাৎ নেপালের বাসিন্দা আচার্য বালকৃষ্ণ মিলে যেভাবে উত্তরাখন্ডকে লুঠেছে, তাতে ব্রিটিশরাও লজ্জা পাবে। হালের ইকো ট্যুরিজমের নামে ৩০ হাজার কোটির টেন্ডার দুর্নীতি তো হিমশৈলের চুড়া মাত্র। এখানকার ফার্মা কোম্পানি গুলোর থেকে নিয়মিত তোলা আদায়ের কারনে ওষুদের দাম বেড়ে আকাশ ছুঁয়েছে, কেউ বলার নেই। আইনটা খুব সহজ, হয় টাকা খেয়ে তাদের গুনগান গাও, অথবা মুখ বন্ধ রেখে দাও- নতুবা রাজীব প্রতাপ হয়ে যাবে।

গুজরাটে কিছু নামহীন দল রয়েছে, যাদের Registered Unrecognised Political Parties (RUPPs) নামে নিবন্ধীকরণ করা আছে। এদের নাম কেউ কখনও শোনেনি- কিন্তু তারা ৪৩০০ কোটি টাকার অনুদান পেয়েছে ইলেকওরাল বণ্ডের মাধ্যমে। এই ১০টিলের মধ্যে ৮টি কখনও কোনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি, ফলত দুর্বল নির্বাচনী পারফরম্যান্সের কারণে সামান্য রাজ্য দল হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। লোকশাহী সত্তা পার্টি ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১০৪৫ কোটি টাকা পেয়েছে। নিউ ইন্ডিয়া ইউনাইটেড পার্টি ২০২২-২৩ সালে ৪০৭ কোটি টাকা পেয়েছে। সত্যবাদী রক্ষক পার্টি, ভারতীয় জনপরিষদ, সৌরাষ্ট্র জনতা পার্টি, জনমান পার্টি, মানবাধিকার জাতীয় পার্টি এবং মাতৃভূমি জাতীয় পার্টি নামের দলগুলো সকলে এমন টাকা পেয়েছেঅথচ একই বছরে বিজেপি মাত্র ৫৭৬ কোটি টাকা পেয়েছিলো

দের পেছনে কে লগ্নি করেছে? এই হাজার হাজার কোটি টাকার উৎস কোথায়? কোন উদ্দেশ্যে দিয়েছে এই টাকা? টাকা গুলো গেলো কোথায়? কারা এগুলো খরচা করেছে? নির্বাচন কমিশন তদন্ত করবে? মোটেও নয়, তারা এখানেও এখানেও হলফনামা চেয়েছে, ফলত কোনো তদন্ত হয়নি এদের উপরে। এরই মধ্যে দলগুলো তথ্য বিকৃতি বা উপাত্ত মুছে দেওয়ার বন্দোবস্ত করে ফেলেছে সময় নিয়ে, যত্নের সাথে।

নিশ্চিতভাবে দলগুলি বেনামে রেজিস্ট্রার করা হয়েছিলো, না ইলেকশন কমিশন না গুজরাত সরকার, কেউ তাদের নাম পরিচয় অবধি প্রকাশ করেনি। তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে এদের অস্তিত্ব ও অর্থপ্রাপ্তির বিষয়টা অস্বীকারও করেনি। এই দলগুলি থেকে মাত্র দুটো পার্টি তিনটি নির্বাচনে - ২০১৯ সালের লোকসভা, ২০২৪ সালের লোকসভা এবং ২০২২ সালের বিধানসভা নির্বাচন - মাত্র ৪৩ জন প্রার্থীকে দাঁড় করিয়েছিল, যারা সম্মিলিতভাবে মাত্র ৫৪,০৬৯ ভোট পেয়েছিল। তাদের নির্বাচনী হিসাবে সর্বমোট ৩৯.০২ লক্ষ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও, ২০২৫ এর আগষ্টে প্রকাশিত অডিট রিপোর্টে ৩,৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেহেতু এই নির্বাচনী বণ্ডের অনুদান গুলো ভারতীয় আয়কর আইনের 80G ধারায় করমুক্ত, সুতরাং আয়কর ফাঁকি দেওয়ার জন্যই এই হাজার হাজার কোটি টাকার জালিয়াতি করা হয়েছিল। ঘটনা হলো বিজেপি সরকার কেন চুপ?

২০১৭-২০১৮, ২০১৯-২০২০ এই দুটো অর্থবর্ষে শেষবারের মত অডিট হয়েছিল গুজরাতের ৮টি পুরসভাতে। আমেদাবাদ, গান্ধীনগর, জামনগর, রাজকোট, ভাবনগড়, জুনাগড়, সুরাট ও বরোদা- শেষ ৬-৭ বছরে কোনো অডিট হয়নি বা করতে দেওয়া হয়নি, যেখানে খরচা হওয়া ২ লক্ষ কোটি টাকা কোথায় কীভাবে খরচা হয়েছে কেউ জানেনা। কী ভাবছেন CAG কোথায় গিয়েছে? গিরীশ মুর্মুকে মনে নেই? ২০২০ থেকে ২০২৪ অবধি CAG প্রধান ছিলো, সেখান থেকে রিটায়ার্ড করে সোজা কাশ্মীরের রাজ্যপাল হয়ে গিয়েছিলো। মুর্মুর আগের জন, রাজীব মেহরিশি বর্তমানে জিও ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের বোর্ডে একজন স্বাধীন ডিরেক্টর পদে আসীন। ওই পুরসভা গুলোর অডিট করে যদি উনি অবসরে যেতেন, মোটাভাই কী ওনাকে এই শাঁসালো পদ দিতো? বর্তমান CAG অধিকর্তা K. Sanjay Murthy এর কী রাজ্যপাল হতে শখ যায়না?

ওখানে সাংবাদিকেরা কেন কিছু বলেনি! জুনেইদ খান পাঠান, কিশোর দাভে, চিরাগ প্যাটেলদের নাম আপনি আমি না জানলেও গুজরাতের বাপ মায়েরা জানে বৈকি। তাই তাদের সন্তান টোটো চালিয়ে খাক, তবুও সাংবাদিকতা বা লেখালেখি যেন কোনোভাবে না করে, সেই দিকে শ্যেন দৃষ্টি নিয়ে নজর রাখেন, কেইবা আর যুবক সন্তানের লাশ কাধে তুলতে চায় বলুন! যেখানে হরেন পান্ডিয়ার মত বিজেপির মাতব্বর নেতা খুন হয়ে যায়, বিজয় রুপানির ফ্লাইট কীভাবে ক্রাশ করল কেউ জানেনা। IPS সঞ্জীব ভাট আজও বিনা বিচারে জেলে, কালোটাকা সাদা করার যে মামলা তার কোনো নিষ্পত্তি হয়নি গত ১১ বছরে। সেখানে কে বাহুবলী সেজে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবে!

নিরঞ্জন টাকলা, যিনি জাজ লোয়া হত্যাকান্ডের উপরে প্রবন্ধ লিখেছিলো, কয়েকশো মামলাতে উনি জর্জরিত। সেখানে গুজরাতের ওই অনামী ছেলেপুলে খুনের বিচার হবে, এটা আপনি বিশ্বাস করেন? এর পর গুগুল করে চিনে নিন মহেশ লাঙ্গাকে, মিথ্যা মামলাতে জেরবার। গত ১০ বছরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে, শুধু গুজরাতের নানা আদালত ও থানায় ৮০৭টা মামলা দায়ের হয়েছে, যার কোনোটার নিষ্পত্তি হয়নি। নিত্য পুলিশি হয়রানি, ফৌজদারি মানহানি মামলা, উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের ক্যাডারদের দ্বারা সর্বক্ষণ হুমকি ধমকি, এর সাথে ফেক এনকাউন্টার এর বিপদ মাথায় নিয়ে কোন মানুষ প্রকাশ্যে মৃত্যুর ফেরিওয়ালাদের সাথে কবাডি খেলবে?

দুর্নীতির কথা আসবে আর দেশের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশ আসবেনা তা হয়! অন্ধভক্তদের কাছে দাবাং ভাবমূর্তি রক্ষা করতে যোগীকে হিংস্র অবতার বাঁচিয়ে রাখতেই হয়। ফলে নিয়মিত এই জাতীয় সহিংসতার খবরের মাধ্যমে দেশজুড়ে হেডলাইনে থাকতে- গরীব মুসলমান ও দলিতদের উপরে অত্যাচার, খুন, জখম, বাড়িতে বুলডোজার চালানো, সম্পত্তি দখলের মত ঘটনা গুলো অত্যন্ত প্ল্যানমাফিক করা হয়। উত্তরপ্রদেশে ৭৫টা জেলা, যোগী প্রতি মাসে একটা করে জেলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধালে, একটা ৫ বছরের টার্মে রাজ্যের সব জেলায় সে পৌঁছাতেই পারবেনা, আবার ৬ বছরেরও পর সেই জেলাটার পালা আসবে। লোকে ততদিনে ভুলে যায়।

 

(৩)

খুব সংক্ষেপে শুধু মূল পয়েন্ট গুলো উল্লেখ করি, নাহলে শুধু উত্তরপ্রদেশের যোগী ও তার দুর্নীতিকে নিয়েই ১০টা ফুল ভলিউম এনসাইক্লোপিডিয়ার সাইজের বই লেখা যাবে। হিন্দুত্ববাদি রাজনীতি ভেক ধরা ভণ্ড যোগী, রামমন্দিরের নামেও বিপুল টাকা নয়ছয় করেছে। রামপথ তৈরিতে অধিকৃত জমির মালিককে যে টাকা দিয়েছে, ৫ বছর পর, তার প্রায় ৮০ থেকে ২০০ গুণ অবধি বেশী দাম দেখানো হয়েছে অডিট রিপোর্টে। এরা রামকেও ছাড়েনি। সেখানে দুর্নীতি এমন লাগামছাড়া যে যোগী নিজে ৬০০ সরকারি অফিসারকে চাকরিচ্যুত করেছে, ২০০ জনকে স্বেচ্ছা অবসরে পাঠিয়েছে। ১১ জন IAS অফিসারের নামে মামলা করে তাদের সাসপেন্ড করে তদন্ত চালাচ্ছে। তার রাজ্যের বিচারপতির ঘরে কোটি কোটি কালো টাকা পাওয়া গেলেও কোনো বিচার হয়না।

বিরোধী দলের ক্রমাগত আন্দোলনের ফলে, প্রতিটি সরকারি কর্মচারী ও বিজেপির নেতা মন্ত্রীদের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমান, হলফনামা দিয়ে ঘোষণা করতে বলে, যোগী সরকার একটা আইন আনে ২০২৪ সালে। সরকার সেই সমস্ত তথ্য রাজ্যের 'মানব সম্পদ' পোর্টালে তুলে দেওয়ার ঘোষণাও দেয়। আজ অবধি ৯৫% নেতা ও সরকারী কর্মচারী কোনও তথ্য দেয়নি সরকারকে। বেতন আঁটকে দেবার ঘোষণা করেও কিচ্ছু লাভ হয়নি, অবশেষে ধামাচাপা পরে গেছে। যেমন ধামাচাপা পরে গেছে কুম্ভমেলায় পদপৃষ্ট হয়ে মৃতের সংখ্যা। গত ২৯শে জানুয়ারি ২০২৫ তারিখ মহাকুম্ভে পদপিষ্ট হয়ে মৃত প্রতিটি পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা করে দেবার ঘোষণা করেছিলো যোগী নিজে। সবচেয়ে মজার বিষয়টা হচ্ছে যাদের নাম এই ক্ষতিপূরণ তালিকায় রয়েছে, তারা প্রায় প্রত্যেকে আরএসএসের প্রচারক বা মৃত প্রচারকের স্ত্রী। কুম্ভে পদপিষ্ট হওয়ার সাথে এদের কখনও কোনো সম্পর্ক ছিলোনা। এখানে কেউ কোনো দুর্নীতি খোঁজেনি, হিন্দুত্বের বিভূতিতে সব মাফ।

দালাল রাজ- যোগী সরকারের দুর্নীতি শিল্পের মুকুট। জন্ম থেকে মৃত্যুর মাঝে যা যা কিছু আছে, সর্বত্র ঘুষ না দিয়ে, বিজেপি স্বীকৃত দালাল না ধরে, আপনার ক্ষমতা কী কোনো কাজ আদায় করবেন। মাফিয়া রাজ খতমের নামে মুসলমান ও বিরোধী নেতাদের এনকাউন্টার করাটা যোগীর অবসরকালীন শখ, অথচ তার প্রশাসনের গোটাটা নিয়ন্ত্রণ করছে ‘হোয়াইট কলার’ মাফিয়াদের দল। সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পে কমিশন আদায় কেলেঙ্কারি, ভূমি অধিগ্রহণ কেলেঙ্কারি, সেচ ও জলসম্পদ বিভাগের দুর্নীতি, EPF কেলেঙ্কারি, সরকারি চাকরিতে নিয়োগে দুর্নীতি, খনি কেলেঙ্কারির মত সরকারের প্রতিটা দপ্তরে দুর্নীতির ঘুঘুর বাসা বেঁধে রয়েছে। যোগীর অনুচ্চারিত চ্যালেঞ্জ, কার হিম্মৎ আছে আয় দেখি; বেশী বাড়াবাড়ি করতে গেলে হয় গুম খুন করে দেবে, কিম্বা ভুয়ো মামলাতে এ্যারেষ্ট করে পুলিশ দিয়ে ফেক এনকাউন্টার করে মেরে দেবে। খেল খতম।

Zipnet নামে দিল্লি পুলিশের একটা পোর্টাল, যা কেন্দ্রীয় সরকারের ডাটাবেস এর অধীনস্ত, তাদের তথ্য মতে গত দেড় বছরে শুধুমাত্র দিল্লিতে প্রায় ৮,০০০ এর বেশী ব্যক্তি নিখোঁজ। এর মধ্যে নারী পুরুষের হার প্রায় সমান সমান, অধিকাংশই দরিদ্র শ্রমজীবী সম্প্রদায়ের মানুষ। দিল্লি পুলিশের বিভিন্ন সংস্থাগুলি গোটা দেশের অন্যান্য রাজ্য গুলোতে তথ্য অনুসন্ধান করে, নিখোঁজদের তালিকা এবং অজ্ঞাত মৃতদেহগুলি সনাক্ত করেও এদের কোনো হদিস বের করতে পারেনি। দিল্লির উচ্চ-নিরাপত্তা সম্পন্ন নয়াদিল্লি এলাকা, তিলক মার্গ, চাণক্যপুরী এবং পার্লামেন্ট স্ট্রিট এর মতো এলাকা থেকে সবচেয়ে বেশী মানুষ গায়েব হয়ে গেছে। কেউ জানেনা অবৈধ অঙ্গ তথা কিডনি পাচারকারীর দল এদের গুম খুন করে, পেট থেকে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ খুলে বেচে দিয়েছে কিনা। যারা স্বজনহারা হয়েছে তারা ছাড়া কারো কোনো হেলদোল নেই। সরকারের নিখোঁজ তালিকাতে উঠেনি এমন সংখ্যার খবর কার কাছে থাকা সম্ভব ১৫০ কোটির দেশে!

এবছর মহাকুম্ভ মেলার পর ১৬১ পুলিশ অফিসার নিখোঁজ হওয়ার দাবী উঠে। যথারীতি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক খণ্ডন করা হয়েছিল। সোশ্যাল মিডিয়া এবং ইউটিউবের প্রচারকে মিথ্যা গুজব প্রমাণে কোনো কসুর করেনি যোগী সরকার। নির্বিচারে ইউটিউবার ও স্বাধীন সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, ভুয়ো মামলায় লকাপে ভরে শারীরিক অত্যাচার করে অধিকাংশ ভিডিও ও প্রতিবেদন ডিলিট করে দেওয়া হয়। আজ ৭-৮ মাস পরেও নিখোঁজ কাউকে উপস্থিত হিসাবে চিহ্নিত করতে পারেনি। উলটে অন্তত ৮০টি এমন পরিবারের সদস্যকে চাকরিতে বহাল করেছে ধামাচাপা দিতে। আজও কেউ জানেনা পদদলিত হয়ে মৃত মানুষের আসল সংখ্যা ঠিক কত ছিলো, আর এই হতভাগ্য পুলিশের দল সেই দলেই ছিলো কিনা! নাকি তারাও কিডনি চক্রের শিকার হয়ে গেছে।

মহারাষ্ট্রের বিজেপি সরকারের নির্লজ্জ দুর্নীতি রোজই কিছু না কিছু উন্মোচিত হচ্ছে, তবুও তারা নির্বিকার, ভয়ডরহীন ভাবে আরেকটা দুর্নীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। সম্প্রতি মহারাষ্ট্র সরকারের MMRDA নামের একটা সংস্থা একটা আন্ডারপাস ও একটা এলিভেটেড রোড বানাবার জন্য টেন্ডার ডাকে। সেখানে দুটো কোম্পানি অংশগ্রহন করে, একটা L&T ও অন্যটা Megha Engineering, মজা হলো সর্বোনিম্ন দর দেওয়া সত্বেও L&T এটা না পেয়ে তারা সুপ্রিম কোর্টে চলে যায়। সেখানে মহারাষ্ট্র সরকার নানান মনগড়া ট্যেকনিক্যাল গ্রাউন্ডের থিওরি দিলেও, পুনরায় টেন্ডার ডাকার পরামর্শ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। সুপ্রিম কোর্টের পুনঃটেন্ডারের পরামর্শকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সেই ‘অযোগ্য’ মেঘা ইঞ্জিয়ারিংকেই শেষমেশ বরাতটি দেওয়া হয়েছে।

কেন মেঘা ইঞ্জিয়ারিং অযোগ্য? কেন্দ্রের ন্যাশানাল হাইওয়ে অথোরিটি একে কালো তালিকাভুক্ত করেছে, মহারাষ্ট্রে অবৈধ খনি মামলাতে, দেশের খনি মন্ত্রক ৯৪ কোটি টাকা পেনাল্টি সহ এই কোম্পানিকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। CBI এই মেঘা ইঞ্জিয়ারিং এর বিরুদ্ধে ৩১৫ কোটি টাকার জালিয়াতি মামলা চালাচ্ছে। তার পরেও কীভাবে এই কোম্পানি কাজের বরাত পাচ্ছে? উত্তর খুব সহজ, ২০২৪ লোকসভা ইলেকশনে এই মেঘা ইঞ্জিয়ারিং বিজেপিকে ৫৮৪ কোটি টাকা চাঁদা দিয়েছিলো। আর কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে কি?

সাহারা ইন্ডিয়া নামের চিটফান্ডটির কথা ভুলে যাননি সম্ভবত। ২০১৬ সালে তাদের ঘোষিত সম্পত্তির পরিমান ছিলো তৎকালীন দিনে ১ লক্ষ ৮৭ হাজার কোটি টাকার। এরপর দেশে অমৃতকাল এসেছে, কতজন লগ্নিকারী তাদের রিফান্ড পেয়েছে- সাহারা নিয়ে তৈরি করা ‘সিট’ থেকে কেউ জানেনা, কিন্তু খবর হচ্ছে সাহারার সেই সকল সম্পত্তি বিক্রি হয়ে গেছে, ক্রেতা? আবার কে, আদানি গ্রুপ। ৬ই সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে, কেন্দ্র সরকারের মধ্যস্থতায় দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সাহারা গ্রুপের বিপুল সম্পত্তির ৯০%ই আদানি গ্রুপের কাছে হস্তান্তর করেছে, তিনটে মেগাসিটি প্রোজেক্ট সহ। যার মধ্যে ৫০০ একর জমি ও বিভিন্ন শহরে থাকা ৮৮টা বিল্ডিং এর দাম ধার্য্য করা হয়েছে মাত্র ১২০ কোটি টাকা। অথচ সাহারা গ্রুপের দাবী ছিলো একমাত্র সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে সম্পত্তির মূল্য ঠিক করে সেগুলো নিলামে বিক্রি করে লগ্নিকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া হোক, বলাই বাহুল্য তা মানা হয়নি। মানা হলে আদানির এতে কোন লাভ হতো?

গত ১০ বছর ধরে হরিয়ানাতে ডাবল ইঞ্জিন বিজেপি সরকার চলছে। উত্তরপ্রদেশের পর সবচেয়ে বেশী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, মব লিঞ্চিং এই রাজ্যেই ঘটেছে। বিজেপির দাঙ্গা হাঙ্গামার কথা বলবনা বললেও হরিয়ানার ক্ষেত্রে বলতে হবে, কারন এখানেই জুনেইদ নামের এক মুসলমানকে গনপিটুনিতে খুন করে দেওয়া হয়। যেখানে রামরহিম বাবার ডেরা ভায়োলেন্স হয়, যেখানে রামপাল আশ্রমের মত হিংস্র ঘটনা ঘটে, সাড়ে পাঁচ হাজার উন্মাদ গ্রেপ্তার হয়, সেখানে দাঙ্গার মত দুর্নীতিকে এড়িয়ে যাওয়া যায়না। এর পর জাঠ বিদ্রোহ আছে, এখানেও ২১০০ আলাদা আলাদা FIR করা হয়।

গোটা দেশজুড়ে সরকারী চাকরিতে যে নিয়োগ দুর্নীতি চলছে, এটা RSS এর কোনো গোপন ম্যানিফেস্তো হতে পারে। আমাদের রাজ্যে ঠিক যেমন চিত্র, হরিয়ানার গল্পেও আলাদা কিছু নেই, সেখানেও স্বজনপোষণের দায়ে গোটা রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়াকে বাতিল করে দেয় আদালত। HSSC নামের বোর্ডের কর্তারা জেলে যায় চাকরি দেবার নামে ঘুষ নিতে গিয়ে ধরা পরতে। এছারা বাস লিজ কেলেঙ্কারি, DLF কেলেঙ্কারি, ভূমি বিল কেলেঙ্কারি, কৃষক আন্দোলন কেলেঙ্কারি, জনসংবাদ কেলেঙ্কারি, মদ কেলেঙ্কারি, HPSC কেলেঙ্কারি, খনি কেলেঙ্কারি, ন্যাশানাল গ্রীন ট্রাইবুনাল কেলেঙ্কারি, পেপার লিক কেলেঙ্কারির মত অজস্র ছোট বড় আর্থিক দুর্নীতি রয়েছে।

এগুলোকে থেকে মুক্তি পেতে খাট্টারকে তাড়িয়ে সাইনিকে আসতে বাধ্য হয়েছিলো বিজেপি। হরিয়ানা সরকারের ‘রাজস্ব ও দুর্যোগ মোকাবিলা বিভাগের অধীনে’ সিট গঠন করে দুর্নীতি বিরোধী অভিযান শুরু করলে দেখা যায়- কমিশন যে ৩৭০ জন ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ কর্মকর্তাকে ধরেছে, তারা সকলেই বিজেপি ঘনিষ্ট সরকারী কর্মচারী। ১৭০ জন দালাল যাদের মাধ্যমে দুর্নীতির চক্র চলে তারাও প্রত্যেকে বিজেপির নানা মাপের নেতা।

মধ্যপ্রদেশের বিজেপি সরকার দুর্নীতির বিষয়ে সবচেয়ে নির্লজ্জ, বিজেপির ১৮ বছরের শাসনামলে ২৫০ টিরও বেশি আর্থিক ‘বড় কেলেঙ্কারি তালিকাভুক্ত রয়েছে। তালিকার শীর্ষে রয়েছে ব্যাপম, নার্সিং জালিয়াতি, সরকারী চাকরিতে নিয়োগ কেলেঙ্কারি সহ, সরকারের প্রতিটি দপ্তরে লক্ষ কোটি টাকার আর্থিক তছরুপে কোনো ক্লান্তি নেই, যার শেষ উদাহরণ হচ্ছে সরকারি দপ্তরের জন্য ৭০০ শতাংশ বেশী দামে মহেন্দ্র স্করপিও গাড়ি ক্রয়। যেকোনো সরকারী টেন্ডার পেতে গেলে দপ্তরের অফিসারদের কাটমানি রেট হচ্ছে ৪০%, যার ভাগা রাজ্য ও কেন্দ্রের বিজেপি নেতাদেরও দিতে হয়।

গোয়াতে বিজেপির প্রমোদ সাওয়ন্ত সরকারের দুর্নীতি যেন আধুনিক কবিতা। প্রাক্তন মন্ত্রী এবং প্রবীণ বিজেপি নেতা পাণ্ডুরঙ্গ মাডকাইকার দাবী করেছে, প্রতিটা মন্ত্রীকে মন্ত্রী হওয়ার জন্য বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে কোটি কোটি টাকা দিয়ে মন্ত্রীত্ব কিনতে হয়েছে। ফলত এখন সেই লগ্নির টাকা তো তুলতে হবে যেকোনো মূল্যে। গত দেড় বছরে গোয়ার মত ছোট্ট রাজ্যের বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া দুর্নীতির অর্থের পরিমান ৩০ কোটি টাকা। শুধুমাত্র ভিজিল্যান্স বিভাগে ২,৭৪১টি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এই ভিজিল্যান্স দপ্তরেরই সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, গত পাঁচ বছরে, সরকারি কর্মচারী এবং জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে প্রতিদিন গড়ে ২৭টা দুর্নীতি ও আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে, যার একটারও তদন্ত হয়নি, কেউ গ্রেপ্তার হয়নিকারন প্রত্যেকেই স্বপদে বসার জন্য দেওয়া ঘুষের লগ্নি তুলতেই হবে, তাই প্রকাশ্যেই তোলাবাজি, কাটমানি আর ঘুষের ওপেন সিক্রেট সরকার চলছে।

শুধু মাত্র ২০২৩ সালে ২৪৬৭৮টা রেল এ্যাক্সিডেন্ট রেকর্ড হয়েছে, যেখানে ২১৮০৩ জন মারা গেছে। আদানির NDTV এই রিপোর্ট প্রকাশ করেও ডিলিট করে দেয়। উইনট্রাক নামের এক কোম্পানি দেশ ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে- কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও আমলাদের তোলা আদায়ে অতিষ্ট হয়ে। তারা পালালে চেন্নাই পোর্টটা আদানির হাতে তুলে দেওয়াতে আর বাঁধা থাকেনা, দিনের শেষে উইনট্রাককে অঅত্যাচারের কারন এটাই। রাজস্থানে মাত্র ২ বছরের ভজনলাল শর্মার সরকার, সেখানেও মাত্রাহীন ঘুষ আর তোলা আদায়ে ব্যবসায়ী থেকে সরকারি অফিসে পরিষেবা নিতে যাওয়া রাজ্যবাসী প্রত্যেকে অতিষ্ট। এর সাথে আছে ‘জল জীবন’ প্রকল্পে ১৬ হাাজার কোটির দুর্নীতি, কোনো মিডিয়া কভারেজ নেই এগুলো নিয়ে। ওদিকে গোটা ছত্রিশগড় রাজ্যটাকেই আদানির হাতে তুলে দিয়েছে চৌকিদার সাহেব, সেখানে আদানিকে টপকে আলাদা করে কেউ দুর্নীতি করবে সে হিম্মৎ কার আছে?

ED, CBI কে রাজনৈতিক শোষণ যন্ত্রে পরিনত করেছে, বিরোধী নেতা এবং সমালোচনা করা মিডিয়াকে লক্ষ্যবস্তু করাই এদের একমাত্র কাজ। সেবি এখন কর্পোরেটদের পোষা কুত্তা, পরিবেশ মন্ত্রণালয় দপ্তরটা ফিকির খোঁজে কীভাবে পরিবেশকে উচ্ছুন্নে পাঠানো যায়। অন্যান্য সমস্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলিকে ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে রেখেছে। যারা বিজেপির ফান্ডে চাঁদা দিচ্ছে সেই নির্দিষ্ট ব্যবসায়ীদের উপরে একমাত্র অনুগ্রহ বর্ষিত হচ্ছে, বাকিরা ইনকাম ট্যাক্স, জিএসটি আর ইডির ফাঁসে জেরবার। 

গোটা নর্থ ইষ্ট জুড়ে লুঠপাঠ, সিকিমের বাঁধ ও অরণ্য দুর্নীতি, গোটা মনিপুরকে ২ বছর ধরে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিয়েছে বিজেপি সরকারের লাগামহীন দুর্নীতি। এরাই আপনাকে অখন্ড ভারতের গল্প শোনায়, চতুর্থ অর্থনীতির চাঁদোয়া দেখায়, আপনার ভিতরে থাকা হিন্দুরাষ্ট্রের খোয়াব বেচে, দ্রেশপ্রেমের সার্টিফিকেট বিলি করে। মানুষ কবে বুঝবে যে এরা হিন্দুত্ব আর দেশপ্রেমের চোলাই খাইয়ে আসলে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বা নাদির শাহের মত দেশকে লুন্ঠন করে যাচ্ছে দিনের আলোতে! মানুষ কী আজও এতো বোকা? সত্যিই এরা ভোট চুরি না করলে ক্ষমতায় থাকত ২০২৪ সালে?

ফেসবুকীয় সিপিএমঃ ফিউজড আইনগাইডেড কামিকাজে ড্রোন

  ফেসবুকের ‘সিপিএম’ নামক এই চুড়ান্ত আঁতেল ও প্রায় সর্বজ্ঞ গোষ্ঠীটার পূর্ণ বোধোদয় বা পূর্ণ বিনাশ না ঘটা অবধি রাজ্যের বাম নেতৃত্বের খুব বেশী ...