বুধবার, ৩ এপ্রিল, ২০১৩

উন্মাদ নামা ~ ১১

ফেসবুকে, এই ভার্চুয়াল বিশ্বে, আমরা পরস্পরকে সামনা সামনি চিনি না। কিন্তু আমরা চিনতে চাই। কিন্তু সে কাজটা সোজা নয়।

কাজটা সোজা করতে আমরা প্রত্যেকটা লোককে দাগিয়ে দি। এ লাল, এ নীল, এ সবুজ, এ হলুদ।
কিন্তু পরিবারে, যেখানে আমরা সবাই সবাইকে চিনি, দেখবেন ওই দাগানোটা নেই। আমরা নাম জানি, লোকটার বহুমাত্রিকতা জানি।


একটা মানুষ অনেক কিছু দিয়ে তৈরী। শুধু তার রাজনীতি নয়। তার প্রেম আছে, ভালবাসা আছে, কাজ আছে, আড্ডা আছে, সব আছে। কিন্তু শুধু রাজনীতি দিয়ে দাগিয়ে দেওয়াটা ঠিক? তাহলে কি সেই মানুষটাকে বোঝা যায়?


কিন্তু এখানে আমরা সেই ভুলটাই করি। সমানে।

ফলে শত্রুতা তৈরী হয়। সবথেকে ভদ্র মানুষটাও, হঠাৎ রেগে, জাত তুলে, বুদ্ধির উৎকর্ষ তুলে কথা বলে ফেলেন।


পুরোটা দেখুন, আধখানা নয়, শুধু একটা অংশ নয়। নইলে কিন্তু অন্ধের হস্তীদর্শন হবে। চিনতে হয়ত একটু সময় লাগবে, কিন্তু ভালভাবে চিনবেন। ভেবে দেখবেন।


শনিবার, ১৬ মার্চ, ২০১৩

উন্মাদ নামা ~ ১০



কিছু জিনিসের জীবনমুখি মানে


*******************************

প্রশংসা- নিঃস্বার্থ ভাবে সব্বার জন্যে করেও আপনি যেটা কোনোদিনও আশা করেননি


নিঃস্বার্থ- যে গুনটার জন্যে আপনাকে বারবার ঘা খেতে হয়


ঘা- যেটা অসুখ হওয়া সত্ত্বেও প্রেমিকাকে বলে বেশি আদর খাওয়ার সুযোগ থাকেনা


প্রেমিকা- যে স্বেচ্ছায় প্রাক্তন হলে সবচাইতে বেশি ভালোবাসা পায়


প্রাক্তন- জয় গোস্বামীর অন্যতম সেরা কবিতা


কবিতা- ইয়ে নাম্বার ওয়ানের প্রতিযোগীরা যেটা বলার মত করে গান গেয়ে থাকেন


গান- যেটার আদান প্রদান দিয়ে শতকরা নিরেনব্বুই ভাগ সম্পর্কের সুচনা ঘটে


সম্পর্ক- যেটা মেয়ে বন্ধুদের সামনে আপনার এখনও হয়নি আর ছেলে বন্ধুদের সামনে ইচ্ছেমত হারে বেড়ে চলেছে


ইচ্ছেমত- সিনেমার নায়করা মাধ্যকর্ষন নিয়ে যেভাবে খেলাধুলো করে থাকেন


খেলাধুলো- যেটায় আপনি চিরকাল ভালো


চিরকাল- যেই সময়টাই সেই শেষে আপনাকেই সবটা সামাল দিতে হয়


শেষে- যখন আপনার কথাই সত্যি বলে প্রমানিত হয়


প্রমানিত- নিজের বাড়ির পায়েস আর সিন্নির স্বাদই যে সবচাইতে বেশি ভালো


সিন্নি- যে খাবার জিভের আগে মাথায় ঠেকাতে হয়


মাথা- যেটা আপনার অকারনে কোনোদিনও গরম হয়নি


গরম- যেটা এবারের মত আর কোনোবার নাজেহাল করেনি


নাজেহাল- শুধু একটু ভালো থাকতে চেয়ে আপনাকে যা রোজ্ হতে হয়


ভালো- নিজের যেটা আপনি ছাড়া আর সবাই বোঝে


নিজের- যার পায়ের ওপর দাঁড়াতেই এত্ত স্ট্রাগল


স্ট্রাগল - যেটা করতে আপনি কক্ষনও ঘাবড়ে যান না


ঘাবড়ে- কল্পনায় মাস্তানদের আপনি যা দিয়ে থাকেন


মাস্তান- কলেজের যেটা ছিলাম বলে বউয়ের কাছে গল্প করতে হয়


গল্প- যেটার ছোট ফর্মের প্রতি আমি ভয়ংকর ভাবে বায়াসড


বায়াসড- নবনীতা দেবসেনের ব্যাপারে আমার মনের অবস্থান


মন- যেটা আছে বলেই কাদার থেকে বৃষ্টি টা আলাদা করে নেওয়া যায়


বৃহস্পতিবার, ১৪ মার্চ, ২০১৩

উন্মাদোভিভাষন



শিক্ষক দিবস 
অষ্টমশ্রেনির এক ছাত্রের ভাবনায়


পাঠরতা শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ও শিক্ষিকা মহাশয় গন, সম্মানীয় অন্যান্য পেশার বিশিষ্ট বিশিষ্টবর্গ, শিক্ষাবন্ধু ও শিক্ষানুরাগী ব্যাক্তিগন সহ আমার প্রিয় সহপাঠী (যারা একই সাথে ফেসবুক পড়ি) দের , প্রণাম ও শুভেচ্ছা জানিয়ে ও কাঠ বেকারদের কষ্টে যষ্ঠিমধু হয়ে, আজকের এই মহান দিবসে, আমার ছোট্ট বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ জ্ঞাপন।

আজকের এই স্বপ্রতিভ চমৎকার উপস্থিতি ও সমাবেশের কারণ সম্বন্ধে আমরা সকলেই অবগত। আজ মহান শিক্ষক দিবস। সেটার সফল উদযাপন উপলক্ষে এবং আমাদের তথা জাতির ভবিষ্যত তৈরীর ভারাপন যাদের হস্তে অর্পিত, তাদের কঠোর প্রচেষ্টার প্রতি যথাযোগ্য সম্মান ও মর্যাদা জ্ঞাপন করার জন্য, তাঁদের প্রতি আমাদের কায়মনোবাক্যে সম্পূর্ন কৃতিত্ব প্রদানের উপলক্ষে এই আয়োজন।

প্রতি বছর সারা ভারতে ৫ ই সেপ্টেম্বর দিনটিকে শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ভারত প্রজাতন্ত্রের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি তথা বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রখ্যাত কূটনীতিবিদ, ডাঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন এর জন্মদিনের দিনটি তাঁর ইচ্ছানুসারে জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসাবে পালিত হয়।

শিক্ষার প্রসারে তীব্র আগ্রহী এই ক্ষনজন্মা মনীষী, যখন ১৯৬২ ভারতবর্ষের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, তখন তাঁর ছাত্র, বন্ধু বান্ধব সহ নিকট আত্মীয়েরা, তাঁর জন্মদিবস ঘটা করে উদযাপন করার বায়না করলে-, তিনি বলেছিলেন, এই দিনটিকে তাঁর জন্মদিন হিসাবে পালন না করে “শিক্ষক দিবস” হিসাবে পালন করলে তিনি বেশী খুশী ও গর্বিত হবেন। সেই থেকেই ডাঃ রাধাকৃষ্ণনের জন্মদিনটিকেই “জাতীয় শিক্ষক দিবস” হিসাবে সারাদেশে পালন করা হয়।

আজ সমস্ত দেশ জুড়ে শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকদের সম্মান দিতে এই দিনটি স্মরণ বিভিন্নভাবে স্মরণ করে থাকেন। শিক্ষাবিনা জীবন অসম্পূর্ন ও পঙ্গু। তাই শিক্ষক আমাদের সমাজের মেরুদন্ড । তাঁরা শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠন সহ সামাজিকতার প্রতিটি ধাপ কে, ছাত্র মননের অভ্যন্তরে এক ঠাস বুনট নির্মাণের সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে একটা গোটা জাতিকে গঠন করে তোলেন। দেশের একজন আদর্শ নাগরিক হয়ে উঠতে সহায়তা করেন।

আমাদের প্রথম শিক্ষক নিশ্চই আমাদের প্রনম্য অবিভাবকগন। কিন্তু বৃহত্তর ধরিত্রির চারণ ভূমিতে সফলকাম একজন “মান ও হুশ” যুক্ত মানুষ হয়ে উঠতে গেলে বিদ্যালয়ের ভুমিকা অনস্বিকার্য। সেখান থেকেই শিক্ষকেরা তাঁদের জীবনব্রততে নতুন নতুন শিক্ষার্থীদের স্থান করে দেন। শুধু মাত্র নমষ্য শিক্ষকেরাই নন, বিদ্যালয়ের ঝাড়ুদার কাকুটির কাছ থেকেও আমরা পরিচ্ছন্নতার পাঠ রোজ শিখে চলি, তিনিও পক্ষান্তরে আমাদের সামাজিক শিক্ষক, তাঁদের জন্যও আমাদের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাও সম্মান রইলো।

শিক্ষকেরা নিজ ছাত্রদের খুবই আন্তরিকতার সাথে সন্তানস্নেহে শিক্ষাপ্রদান করে থাকেন। অত্যান্ত যত্নসহকারে সাবধানে প্রতিটা বিষয়কে শুধুমাত্র মুখস্ত না করিয়ে, অন্তরে প্রেথিত করার জন্য বারংবার প্রচেষ্টাতেও কোন কুণ্ঠাবোধ করেন না। অনেক মনীষীই শিক্ষকদের জৈবিক পিতামাতাদের থেকে এগিয়ে রাখেন, কারন জৈবিক পিতামাতা শুধু জন্মদান করেন। আর শিক্ষকগন সেই শিশুদের সমাজ তথা পৃথিবীতে জীবনধারণ করার বিদ্যা রপ্ত করিয়ে, ব্যাক্তিত্ব গঠন তথা উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট রূপদানকরে, ভবিষ্যত কে সু-শিক্ষার আলোকে আলোকিত করে তোলেন। সুতরাং একজনও শিক্ষক ভুলে যাওয়া তো দুরস্থান, সামান্যতম উপেক্ষাও সুশীল সমাজের পক্ষে ভয়াবহ।

আমাদের সর্বক্ষন ও সর্বক্ষেত্রে শিক্ষকদের নিঃশর্ত তথা সার্বভৌম ভাবে আকুন্ঠ সম্মান প্রদর্শন করা উচিৎ। আমাদের পাশাপাশি, আমাদের অবিভাবকগন দের পক্ষ থেকেও শিক্ষকদের পুর্ন সম্মান দেখানো উচিৎ। কারন শিক্ষকেরা তাদের সম্পূর্ন জীবন কে, অপত্য বাৎসল্যে, ভালবাসার মোড়কে, অন্যের বাচ্চাদের শিক্ষাদানের মাধ্যমে, ভালো মন্দের পার্থক্য নিরুপনের মাধ্যমে, সৎ প্রচেষ্টা কে দীর্ঘায়িত করার ক্রমঅনুপ্রেরনা যোগানের মাধ্যমে, ব্যার্থতার সময় পাসে থেকে উৎসাহ প্রদান করে, সাফল্যের অংশীদার হয়ে পরবর্তী সঠিক পদক্ষেপের সুপরামর্শ দান করে, ভবিষ্যৎ সমাজ কে সামাজিক ও আর্থিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষে, সর্বপরি আমাদের জীবনের গুরুত্ব, সহজ ভাষায় আমাদেরই বোঝাতে, তাঁরা তাঁদের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন।

শিক্ষকেরা, শিক্ষার্থীর প্রয়োজনে, তার সকল রকম মুসকিলে পাসে থেকে, একজন প্রকৃত বন্ধুর ভুমিকা পালন করেন, আবার তিনিই এই ধাঁধায় পরিপুর্ন জটিল পৃথিবীতে সঠিক পথের দিশা বাতলে দেন, বিভিন্ন মনিষীদের জীবনের নানা ঘটনাবলীর সু বিশ্লেষণ করে ও নিরন্তর ঘটে চলা দৈনন্দিন গুরুত্বপুর্ন ঘটনাবলীর ব্যাখ্যা করে আমাদের পথপ্রদর্শন করে থাকেন। যারদ্বারা আমাদের অপরিমিত জ্ঞানের ভান্ডারকে প্রজ্ঞাপূর্ণ ভাবে পরিপুর্ন করে তুলতে পারি।

আজকের এই বিশেষ দিনটি একটি উপলক্ষ্য মাত্র। তাই আমাদের প্রত্যেকেরই উচিৎ শুধু মাত্র আজকের দিন নয়, সারা জীবন ধরে শিক্ষকদের প্রতি পুর্ন আস্থাসহ তাঁদের সম্মানপ্রদর্শন করা, তাঁদের দেখানো পথ কে অনুসরণ করে চলে, সর্বপোরি তাঁদের আদেশ কে সসম্মানে গ্রহন করে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা।
জয় হিন্দ।

(জন্মাষ্টমীর তালের বড়া খেতে খেতে)

উন্মাদীয় ভাষাতে দুষ্ট 

মঙ্গলবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও বন্ধুপ্রীতিঃ পরিণাম

 

শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও বন্ধুপ্রীতিঃ পরিণাম

 (১)

জীবনে সব মানুষেরই কিছুনা কিছু অপূর্ণতা রয়ে যায়। অনেকের তা নিয়ে আক্ষেপের শেষ থাকেনা যে কেন ‘ওটা’ পেলামনা বা পারলামনা, এক্ষেত্রে আমার কোনো আক্ষেপ নেই। বিষয়টা হল শিক্ষকতা। মাসের শেষে ‘সরকারী’ টিচার বা টোলের পন্ডিতমশাই নয়, পাতি গৃহশিক্ষক হওয়ার একবার বাসনা জেগেছিল বন্ধুদের দেখে ও অভাবের মরুভূমিতে মরুদ্যানের খোঁজে। মাধ্যমিকের পর থেকে উপমহাদেশের বহু ছাত্রই চাকুরিজীবী বা পেশাদার হয়ে যাওয়ার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত, ‘হাতখরচার টাকা তো আসবে’ নূন্যতম এই অজুহাতে ‘প্রাইভেট টিউশনি’ শুরু করে দেয়

তখন গড়িয়ার মেসে থাকি, সস্তার মেস ও এক বন্ধুর- বন্ধুর দাক্ষিণ্যে সেখানে উঠেছি। শ্রীনগর রোডে বেশ কিছুটা উত্তরে হেঁটে একটা বাড়ির তেতলায় আমার নিবাস। ১৮ জনের বাড়ির পাঁচজন ছাত্র, বাকিরা অন্য পেশার মানুষ। পাঁচ জন ছাত্রের আমি বাদে বাকি চারজনই মাসে দু-আড়াই হাজার টাকা করে কামাই করে মূল কোলকাতায় টিউশনি পড়িয়ে। ওদিকে আমার তখন সম্বল বলতে প্রাণটুকু, বাকি সবই অন্যের। কিন্তু পরাণটুকু বাঁচাবার জন্যও খাওয়া দরকার, যার জন্য চাই টাকা। এই মেসে যার সাথে এসে উঠেছিলাম, সে একসাথে অনেকগুলো কোর্স করতো, নাম কুবের। হুগলীর গুপ্তিপাড়াতে বাড়ি। সে ঠিক আমার বন্ধু ছিলনা, বলা ভাল বন্ধুর রেকমেন্ডেড বন্ধু। আমার বন্ধুটিকে কুবের ‘না’ করতে না পারার দরুন, আমি তার গলার গাব হয়েছিলাম। সম্যক জানতাম, একআধ মাসের বেশি সেখানে টেকা মুশকিল। আমার কিছু পুরাতন বন্ধুরা যাদবপুরে থাকে, কিন্তু সেখানে থাকার রেঁস্তো অনেকটা

অগত্যা টিউশনির বন্দোবস্ত করার জন্য স্মরণাপন্ন হলাম যাদবপুরের মেসের সিনিয়র দাদা, বহরমপুরের মানুষ সীতাদার। অমায়িক মানুটি অঙ্কের ছাত্র, তাও মাস্টার্স শেষে গবেষণা করছেন। বহুদিন কোলকাতায় থাকার সুবাদে পরিচিত মহল থেকে নিজেদের বালবাচ্চাদের অঙ্ক শেখাবার জন্য ওনার কাছে মিছিলের মত ছেলেপুলেদের বাবা মায়েরা আসতো। এনাদের মাঝে মাধ্যমিক থেকে সদ্য ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হওয়া ছেলেপুলের গার্জেনরাই বেশি। কিছু জন তাদের কিন্ডারগার্ডেনের বাচ্চাদের নামতা শেখানোর আব্দার নিয়ে আসতো। সীতাদাকে বললাম- “আমাকে তোর ওই কিন্ডারগার্ডেনের এক আধটা সূর্যমুখী জোগাড় করে দে বাপ, আমার যে আর চলছেনা। “

সিজনের মাঝেও সীতাদার কল্যাণে একটা বাড়িতে নিযুক্ত হলাম, তাদের সন্তানকে পড়ালেখা শেখাতে। প্রথমদিন রীতিমত একটা গোটা রজনীগন্ধার বোতলের প্রায় পাঁচভাগের একভাগ সারা গায়ে ঢেলেছিলাম, যেটা ক্যানিং লোকাল থেকে নগদ ১৫ টাকা দিয়ে কিনেছিলাম, হকার বলেছিল ইমপোর্টেড পারফিউম

তা সে যাই হোক, পৌঁছালাম রাসবিহারী পোস্টঅফিস অঞ্চলের একটা বহুতলের চতুর্থ তলে, সীতাদার লিখে দেওয়া ঠিকানা মিলিয়ে। বেশ সাজানো গোছানো ফ্ল্যাট। ভেবেছিলাম, একটা মিনি সম্বর্ধনা পাবো। ওমা কোথায় কী, বাড়ির পরিচারিকা- আপনি ক্যা! বলে পরিচয় শুধালেন। আমি শিক্ষক পরিচয় দিতে সে আমোদের সাথে চেঁচিয়ে উঠে অন্তঃপুরের উদ্দেশ্যে- বৌদি, ম্যাস্টোর এয়েচে হাঁক দিতেই আমার যাবতীয় উত্তেজনায় ঠান্ডা জল পড়ে গেল

একটা হাত পাঁচেক লম্বা গ্রীল ঘেরা বারান্দা চওড়াতে দুহাত, একটা মানুষ বসার পর সামান্য কয়েক ইঞ্চি জমি ফাঁকা থাকে। তার উপরের দিকে অসংখ্য দড়িতে বাড়ির জামা কাপড় শুকাবার স্থান, পিছনে তোলাবাসি জুতো রাখার র‍্যাক, কিছু পলিথনের গুচ্ছ, ভাঁজ করা কাগজের পেটি, পুরাতন খবরের কাগজ, একটা বাচ্চাদের সাইকেল, ঝুলঝাড়ন ও ফুলঝাড়ু। পোষা কুত্তার থালা ও খেলার একটা ছোট কাঠের ব্যাটও দেখলাম ওই জুতোর র‍্যাকের ফাঁসে রয়েছে।

একটা চট নিয়ে বসতেই, একজন বৃদ্ধ আমার সামনে এসে বসলেন। কী মুশকিল, ইনিই ছাত্রী নাকি, চোখে কী গন্ডগোল হলো আমার! বুঝলাম ইনি অভিভাবকের অভিভাবক। তিনি আমার ঠিকুজি কোষ্ঠী নিতে শুরু করলেন, সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে যেতে এবারে ওনার স্ত্রী এলেন। তিনি অবশ্য কড়াভাবে বলে গেলেন যে, এই বারান্দার বাইরে, ফ্ল্যাটের ভিতরে যেন কখনও না যাই। গ্রাউন্ড ফ্লোরে পায়খানা বাথরুম আছে ওটাই যেন ব্যবহার করি ইত্যাদি। সেদিন থেকে আজ, একটা জিনিস যেটা আমি উপলব্ধি করেছি- অন্ত্যজ শ্রেনীদের সাথে খাওয়া শোয়া সব করা গেলেও হাগার স্থান শেয়ার করা যায়না, এটাই অলিখিত নিয়ম। খেয়াল করবেন, বাড়ির কাজের লোকেরা সকল সময়েই আলাদা টয়লেটেই যায়।

অতঃপর সেই ভদ্রলোক এলেন, যার ঠিকানাতে এসেছি। বেটেখাটো হলেও ফর্সা ও সুপুরুষ। ইনিই আমার ছাত্র/ছাত্রীর বাবা। প্রথমে তিনি নিজের পরিচয় দিলেন, পেশা কর্পোরেশনের স্বীকৃত কন্ট্রাক্টার। তিনি এও বললেন যে ওনার মা একটু শুচিবায়গ্রস্থ, তাই বাইরের লোকের বাড়িতে আসা নিয়ে তিনি অসন্তুষ্ট; আমি যেন ওনার কোনো কথাতে কিছু মনে না করি ও বারান্দার পেরিয়ে কখনও ঘরে না ঢুকি। বলে সীতাদার বলে দেওয়া কথা মতো আমাকে এক মাসের অগ্রিম ৪০০ টাকা ধরিয়ে দিয়ে অন্তঃপুরে বিলীন হলেন

খানিক পরে একজন এলোমেলো রকমের মোটা, চাপা গাত্রবর্ণের কুতকুতে চোখবিশিষ্ট ভদ্রমহিলা, ঠিক ওনারই একটা মিনি ভার্সনকে হিড়হিড় করে টানতে টানতে হাজির করলেন। আমার বয়স একুশ, সেই ‘বাল গনপতির’ পাঁচ, কিন্তু আমাদের দুজনেরই কবজি সমান। চর্বি যদি আলাদা করে মাপার সিস্টেম থাকতো, নির্ঘাত ওইটুকু বিটলের শরীরে আমার দ্বিগুন পরিমাণে চর্বি ছিল। দুঁদে দারোগা যেমন দাগী আসামীকে দেখে, সে মাল এসেই আমাকে ওইভাবে দেখতে লাগলো। আমি নিজেকে যতটা কোমল স্বভাব করা যায়, ততটা আদর করে ডেকে পড়তে বসালাম।

আধা ঘন্টা সব ঠিকঠাক ছিল, এবারে ছড়া পড়ানোর পালা। আমি শুরু করলাম – ‘পাঁচ পেয়ালি প্যাঁচার মা, কচি কাঁচা পাঁচটা ছা’।

- কাকু কাকু পেঁচা কী?

- এক ধরনের পাখি বাবা

- আমি দেখবো

- সে তো রাত্রে দেখা যায়

- না আমি এখনই দেখবো

অচিরেই সাইলেন্ট আবহাওয়াকে বদলে দিয়ে আমার ছাত্র ভায়োলেন্ট হয়ে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেই ছোট্ট ব্যাট দিয়ে আমার উপরে দুমাদুম প্রহার শুরু হয়ে গেল। পরের ছেলে, তার উপরে ছাত্র, তাই প্রথমটা সয়ে যাচ্ছিলাম। আমি যত কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম, তার কাঠের ব্যাটের বর্ষণ তত তরান্বিত হচ্ছিল। অগত্যা প্রাণ নিয়ে সোজা অন্তঃপুরে, কারণ সদরে তালা। আর যায় কোথায়, সেই বুড়িকে যেন ফুটন্ত তেলে কেউ ছেড়ে দিয়েছে, এমন চিল চিৎকার শুরু করে দিল। ছাত্রের মা মহিলাটি এসে ছেলেকে বাগে আনতে, আমি বারান্দার সেই এক চিলতে স্থানে খানিকটা দম নিতেই মূর্তিমান বজরঙ্গবলি ফের হাজির। ব্যাট চালানোটা সে এটা একটা খেলা পেয়েছে। আমিও রেডি এবারে, এলেই কষে কান মুলে দেব ব্যাটা নচ্ছারের। আমাকে ব্যাটানো শুরু করার সাথে সাথেই তার মা এসে হাজির, আমার কানমোলা প্রোগ্রাম স্থগিত হলেও ব্যাটানো চলতেই থাকলো।

মাঠে খেলার সময় ফুটবলের ডিফেন্ডারদের অত্যাচারে আমার সিনবোন তখন রোমের কলোজিয়ামের মত ভঙ্গুর, ওর উপর পলকা ব্যাটের বাড়িই আত্মারাম খাঁচা করে দিচ্ছিল। অগত্যা ওই মোটা মহিলার পিছনে লুকাবার ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। উৎফুল্লিত মহিলা ছেলেকে আটকাবার নূন্যতম চেষ্টা না করে চরম হাসিতে ফেটে পড়লো, ছেলের খেলা দেখতে দেখতে বলতে থাকলেন- ও একটু এমনই, রেগে গেলে মারু মারু করে। এক আধটা ব্যাট এবারে মহিলার গায়েও লাগছিল। তবে ওই ১২ ইঞ্চি চর্বির স্তর ভেদ করে মর্মস্থলে ব্যথা-বেদনা কীভাবে পৌঁছাবে সেই অঙ্ক না কষে ভাবলাম, না পালালে আমাকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ছাড়া কোনো গতি নেই, সেখানেও ইঞ্জেকশনের বিভীষিকা

প্রাণভয়ে চিৎকার করে বললাম, ‘হিসি করবো। ওষুধে কাজ হলো। বৃদ্ধা ততোধিক চিল চিৎকার করে নির্দেশ দিল- সুলতা সদরের তালা খুলে দে, নাহলে অচ্ছুতটা স্নানঘরে ঢুকে পড়বে। সুলতা দরজার তালা খুলতেই, প্রায় উড়ে গিয়ে মেন রাস্তায় পৌঁছে, খেয়াল হলো পায়ে জুতো নেই। নিকুচি করেছে জুতোর। পকেটে তখনও ওই বিষ বাচ্চার বাপের দেওয়া ৪০০ টাকা

একবার ওটা ফেরত দেবার সতীত্ব মাথায় এসেছিল বটে, কিন্তু ঐ ক্যালানির দাম অন্তত ৪ হাজার টাকা হওয়া উচিত ভেবে ও পথে পা মাড়াইনি আর। তোকে নিয়ে চারজন হল, ওখানে আর যেতে হবে না। এবারে বুঝলাম কেন সীতাদা এডভান্স বেতন নিতে বলেছিল। সিনবোন টনটন করে উঠলো সীতাদার আঙুলের চাপে, বললো- যা শালা দু প্লেট বিরিয়ানি নিয়ে আয়, একটা শান্ত শিষ্ট মেয়ে সন্তানের খোঁজ করছি। পাক্কা তিন সপ্তাহ লেগেছিল সেই ব্যাথা সারতে। পরে আরো দু’দুবার চেষ্টা করেছিলাম শিক্ষক হওয়ার, একবার ৯ দিন, অন্যটি ১৭ দিনের মাথায় শেষ হয়ে আমার শিক্ষক জীবনের অকাল রিটায়ারমেন্টে পার্মানেন্ট সিলমোহর মেরে দিয়েছিল 

(২)

মেস জীবনের শেষ লগ্নটা ছিল আমার কাছে অনেকটা ঊনিশ শতকের জমিদারদের মতো। শুয়ে-বসে-খেয়ে টাকা রোজগার হতো তখন। ‘জগৎগৌড়ি ভাতের হোটেলে’ আমারই মতো নিয়মিত এক মাসকাবারে খরিদ্দারের সাথে সখ্যতাটা দিনে দিনে, নিজ নিজ জীবনের ব্যথা-বেদনা শেয়ার করার পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তিনি ছিলেন কোলকাতা পুলিসের রিজার্ভ ফোর্সে কর্মরত, বেতন ও ডিউটি দুটোই পাতে দেওয়ার মতো ছিলনা। সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী, বাড়ির এক ভাড়াটের সাথে ভালভা হওয়ার দরুণ, ভাড়াটেদের উপর থেকে বিশ্বাসই উবে গেছিল ওনার।

বাড়ির দোতলার একটা অংশ ও নীচ তলাটা ওনার ভাগে ছিল। তেতলাটা ও বাকি দোতলাটা ছোট ভাইয়ের অংশ, বৃদ্ধা মা ছোটোর কাছেই থাকতো। সিঁড়ি সেপারেট ছিল। আমার ছিল পয়সার প্রয়োজন, যেটা জন্ম দিত নানান তিলে খচ্চড় মার্কা হিরফুতি বুদ্ধি, আর ওই পুলিস দাদার ছিল বাড়ি। এর পর যেটা হয়েছিল, বহু আলাপ আলোচনার পর মেস খুলে ফেলেছিলাম। দাদাকে মাসিক একটা থোক টাকা, ফ্রিতে দুবেলা ঘরের খাবার ও মন চাইলেই রাত্রে টিভিতে ‘ভক্তিমূলক’ সিনেমা দেখার দেদার ফুর্তির বিনিময়ে। নিজের ঘরে টিভি থাকলেও ‘ঐসব’ ক্যাসেট কে এনে দেবে? বয়স্ক মানুষ তাই লজ্জা লাগতো লোকালের দোকানে ক্যাসেট চাইতে। খরচাও একটা ব্যাপার ছিল বৈকি, সুতরাং আমার কপাল খুলে গেল।

তিনটি ঘর ও একটি বারান্দাতে, মোট ১২ জনের থাকার ব্যবস্থা হলো। কিচেন ও কমন টয়লেট। কেন আমাদের মেসে ছেলেপুলে আসবে! এর জবাবে- দাদার থেকেই সুলভে কিছু নগদ ধার নিয়ে একটা সিডি সমেত টিভি সেট, ও সেকেন্ড হ্যান্ড একটা ফ্রিজ কেনা হলো। ঠান্ডা জল, ফূর্তির দিনে ঠান্ডা দারু আর ফি ছুটির দিন রাত্রে- সমবেত ‘নিঃশব্দ’ সিনেমা দেখতে পাওয়ার সুখ। ১২ জনের কোটা ভর্তি হতে গুণে গুণে মাত্র ২৫ দিন লেগেছিল। এর পর ওয়েটিং এ চছিলো আরো কমপক্ষে ১ ডজন। খাইয়ে দাইয়ে ও নিজে থেকে খেয়ে, মাসে ৩-৪ হাজার টাকা থাকত হেসেখেলে। আমি ও দাদা দুজনেই খুশি

শুভঙ্কর এ্যনিমেশন নিয়ে পড়তো, অয়ন অঙ্কে অনার্স, প্রদীপ বাঁকুড়ার ছেলে আমার সহপাঠী, পার্থ নদীয়ার বেথুয়াডহরীর, সকলেই জয়েন্টে কোচিং নিত। বাকি সীতাদা, পরিতোষ, বাবাই, শীর্ষেন্দু প্রমুখেরা থাকতো। পারিবারিক ও ব্যক্তিগত অশান্তির জন্য আমার একবছর গ্যাপ হয়ে গেছিল ইতিমধ্যে, তাছাড়া মেসের ব্যাবসার জন্য বহু কাঠখড় পুড়িয়ে, আমি ডে কলেজ থেকে নাইট কলেজে সিফট হওয়ার মতো অসাধ্য সাধন করেছিলাম। সারাদিন অফুরন্ত সময়, শখের বশে নানা ধরনের আগামীর পেশা ট্রাই করছি। একটা সিরিয়াস প্রেম, সদ্য তার নটেগাছটি মুড়িয়েছে, তাই প্রেমের বাসনা ছিলনা। পড়াশোনা আর ঘোরাঘুরি।

এরই মাঝে শুনলাম শুভঙ্কর এক মহিলার প্রেমে পড়েছে। দুজনেই দমদম মতিঝিল কলেজে সাইন্স পাশকোর্সে পড়ে। মেয়েটি নাকি দারুণ দেখতে, দোষের মধ্যে বয়সটা একটু বেশি। শুধাতে শুভঙ্কর বললো- ওই ২৩-২৪ হবে আর কী! শুভঙ্কর তখন সবে ১৯ ছুঁয়েছে। পিছন থেকে টিপ্পনি কেটে সমীরণ দা বললেন- প্রেমে পড়ার আগে মেপেছিলি না পরে? পরে হলে এগোস না, নির্ঘাত ও তোর মাসির বয়সী, প্রেমের কানা চোখে কোনো দোষই ধরা পড়ে না

এরপর সে বেশ কিছুদিন আর উচ্চবাচ্য করেনি, কিন্তু মাসখানেক যেতে না যেতেই ওর রাঙা প্রেমের রস চোঁয়াতে শুরু করলো। ছুতোনাতায় সারাক্ষণ শুধুই মল্লিকার গল্প, গুণগুণ করে গান গাইছে, নাচছে। পার্থ আমাকে দাদা বলতো, সে বললো- ওর কিছু একটা করো গুরু, পুরো হাবুডুবু খাচ্ছে, এবারে পাশ করলে হয়! মেসের প্রত্যেকেই কোনো না কোনো পরিচিতের লিঙ্ক ধরে এসেছে, তাই পারিবারিক হিষ্ট্রি নেওয়ার চল ছিলনা। শুভঙ্করের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল, কিন্তু এবারে সব ঠিকুজি কোষ্ঠী চাইতেই হলো। তাতে যা জানা গেল, ওদের বেশ সম্পন্ন পরিবার। মা স্কুল টিচার, গ্রামে বিস্তর জমিজামাও আছে, বাবা চাষাবাদ করে। সে সবেধন নীলমণি, তাই ও যা করবে, বাড়িতে সেটাই নাকি মেনে নেবে। এটার মৌখিক সম্মতি নাকি তার রয়েছে।

দিনে দিন সেই মেয়ে নিয়ে ওর পাগলামি বেড়েই চললো, বললো ওকে না পেলে নাকি আর সে বাঁচবেই না। আমরা এড়িয়ে গেলেও, বাড়িওয়ালা দাদার তখন নতুন সাথী হয়েছে সে। বাড়িওয়ালা দাদার স্ত্রী বিরহ এই শেষ যৌবনে ছোকছুকানিতে পৌঁছেছে। শুভঙ্করের পড়াশোনা শিকেয় উঠেছিল তাতে আমাদের সমস্যা ছিলনা, কিন্তু যখন নাওয়া খাওয়া লাটে উঠার যোগাড় তখন আমাদের টনক নড়লো

বাড়িওয়ালা দাদা আমাদের অনেক সিনিয়র, ৫০ ছুঁইছুঁই হলেও নিজেকে আমাদের সমবয়সীই মনে করতেন। ওনার সাথে আমরা চার পাঁচ জন সিনিয়র ‘হনু’ রামটেবিল বৈঠকের শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো যে, কলেজে গিয়ে মেয়েটিকে দেখে আসা ও তার সম্বন্ধে যতবেশি সম্ভব তথ্য যোগাড় করা। যথারীতি বাবাই, প্রদীপ ও দাদা নিজে দেখতে গেলেন। ফিরে, দুজন বিপরীতধর্মী মন্তব্য করল। বাঁকুড়ার প্রদীপ ট্রেডমার্ক স্থানীয় ভাষাতে বলল, সে নাকি নায়িকাদের মতো দেখতে! যদিও পৃথিবীর সকল মেয়েমানুষকেই সে ঈশ্বরের অপূর্ব সৃষ্টি বলে মনে করতো। বাবাই অনেকটা বাস্তববাদী, বললো- মোটেই সুন্দর নয় ও বয়স্কা।

এদিকে মতিঝিল কলেজ থেকে ফেরা ইস্তক, দাদা সব ভুলে শুধু তার পালিয়ে যাওয়া স্ত্রীকে নিয়ে বিলাপ শুরু করে দিল। মল্লিকাকে দেখে নাকি সাধনার কথা মনে পড়ে গেছে ওনার, যথারীতি ২২ বছর আগের দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা চাগার দিয়ে উঠেছে। আমরা ওনার ওষুধ জানতাম, হালকা মাল খাইয়ে একটু ওই ভক্তিমূলক সিনেমার প্রদর্শনী, ব্যাস। চাঙ্গা হয়ে যাবেন। ইউনিভার্সিটির ৪ নং গেটের পাশের একটা গুমটিতে ‘ছবি হবে, কথা হবেনা’ সিনেমার ক্যাসেট পাওয়া যেত, দৈনিক ৭ টাকা ভাড়া টাকা হিসাবে। ৩০ টাকায় কনসেশন করে ৫টা দিত। তাতে করে মাঝরাত্রে আসর শুরু হলে, সকলে ক্লান্ত ও ভোর এক সাথে হয়ে যেত

আমরা অঙ্কের নিয়মে সিদ্ধান্তে পৌঁছালাম, শুভঙ্কর ও প্রদীপ দুজনের মতে সুন্দরী। দাদার নিজের বৌয়ের কথা মনে পড়েছে, অতএব আগে যাওয়া যাক। গোল বাঁধলো এর পরে, যখন শুধালাম- মেয়েটির সাথে কী কী কথা হলো, তার সম্বন্ধে বাদবাকি তথ্য কই? প্রদীপ বাবাই দুজনেই আমতা আমতা করে সিলিঙের ঝুলের কারুকার্য দেখতে দেখতে তন্ময় হয়ে গেল। জোরালো কয়েকটা খিস্তির পর, শুভঙ্কর বিষয়টা ক্লিয়ার করলো। মল্লিকার সাথে শুধু হান্ডশেক করেই ওরা বিরিয়ানি ট্রিট চেয়েছিল, সেটা খেয়ে ফিরে আসা পর্যন্ত মল্লিকা কলেজ ছেড়ে চলে গেছিল। তেএঁটের দল; তেড়ে খিস্তি দিয়েই বা লাভ কি এখন, আবার কে যাবে দেখা করতে। তখন কি আর জানতাম, তথ্যের অভাব আমাদের কপালে কী পরিমাণ শনি সাজিয়ে রেখেছিল! উফ...

আগামী আরো মাস খানিক ওই একই কীর্তন চললো। দাদাও বিলাপ করেন, বাঁয়া শুভঙ্কর। নিপাতনের শুরুটা হলো এই ভাবে, দাদা শুভঙ্করের কথায় বাড় খেয়ে মালের ঘোরে শপথ নিয়ে ফেললো- যে করেই হোক শুভঙ্করের সাথে সাধনা মানে ওনার বৌয়ের মত দেখতে মেয়েটির মিলন ঘটিয়েই ছাড়বে। প্রয়োজনে মেয়েটিকে তুলে এনে বিয়ে দেবে, ভদ্রসন্তানের এক কথা।

যেমন ভাবনা তেমন কাজ, এক রাত্রে ঠিক হলো সেই মেয়েকে তুলে আনতে হবে। আমাদের সকলেই নিমরাজি থাকলেও, আমার মেস ব্যাবসা বাঁচাতে ও সিনেমা-পানাহারের যতেচ্ছ সুখের বাড়ি বজায় রাখতে দাদার কথায় রাজি হয়ে যেতেই হলো। ভাবলাম, সাথে তো শুধু যাওয়া, যা করার দাদা আর শুভঙ্কর করুক। বিপদ দেখলে সময় বুঝে পিঠটান দেওয়া যাবে। এর সাথে ছিল দাদার অভয়বাণী- “আহ, তোরা না সদ্য যুবক। তোদের বয়সে আমার রক্তে বারুদ জ্বলতো, নকশাল করতাম....” ইত্যাদি ইত্যাদি। “তাছাড়া এটা ভুলছিস কেন, আমিও কিন্তু পুলিস।” এই শেষের লাইনটাতে বেশি ভরষা পেয়েছিলাম

যথারীতি প্ল্যান প্রোগ্রাম সব ঠিক হয়েও বার তিনেক, দিনের দিন ভেস্তে যাওয়ার পর গান্ধী জয়ন্তীর দিন যাওয়া ঠিক হলো। আমরা ৭ জন মিলে যাবো এমনটাই নির্ধারিত ছিল। দাদার পেট খারাপ ও অয়ন সময় মতো এসে না পৌঁছানোর দরুণ আমরা ৫ জনই রওনা দিলাম। ঝমঝম করে সেদিন সমানে বৃষ্টি, ঢাকুরিয়া স্টেশনে জল জমে ট্রেন স্তব্ধ, হেঁটেই চলে এলাম শেয়ালদা লাইন বরাবর আরো অনেক যাত্রীর সাথে। সেখান থেকে বারাসাত লাইনের দুর্গানগর ষ্টেশন। বিশ্বনাথ মন্দির এলাকাতে মল্লিকাদের বাড়ি, উত্তেজিত শুভঙ্কর পথ দেখিয়ে নিয়ে চললো

সদ্য যৌবনের উচ্ছ্বাসে ভাসছি আমরা, মানে আমি, পার্থ, প্রদীপ আর বাবাই চারজনেই তখন অকুতোভয়, বন্ধুর জন্য নিবেদিত প্রাণ। নির্ভিক উদ্দীপনাতে লোহা চিবিয়ে হজম করে নেবো এমন প্রত্যয়। যথারীতি বাড়ির সামনে পৌঁছালাম, এবারে কেমন যেন আমাদের একটু আশঙ্কা হলো। একটা বাড়ি থেকে তাদের মেয়েকে কিডন্যাপ করতে এসেছি, অজানা একটা বিপদাশঙ্কার বলয়ে ঢেকে যেতে লাগলাম। পাড়ার মাঝখানে বাড়ি, সঠিক ভাবে প্ল্যানমতো পালাতে না পারলে প্রহারেণ ধনঞ্জয় করে ছাড়বে

পরিচারিকা শ্রেনীর এক মহিলা দরজা খুলতে ভিতরে ঢুকে এলাম। একতলা, কিন্তু অনেকটা জায়গা নিয়ে বাড়িটা। মধ্যিখানে খোলা উঠোনকে রেখে তার চারি ভিতে ঘরগুলো। খানিকক্ষণ পর একজন টাকমাথা, পুরু গোঁফ বিশিষ্ট বেঁটে মত গাঁট্টাগোট্টা মানুষ এসে বললেন- কী চাই? শুভঙ্কর কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই লম্বু বাবাই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে, ইউনিয়ন রুমে বক্তৃতার ঢঙে শুরু করলো- “আমরা আসলে মল্লিকার ক্লাসমেট, ওর সাথে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা ছিল। ওকে একটু ডেকে নিয়ে আসুন কাকু, আপনাকে বললে সমস্যা মিটবেনা।” ভদ্রলোককে দেখে মনে হচ্ছিল ভিতরে ভিতরে তিনি ফুঁসছেন, শুধালেন- “শুভঙ্কর কার নাম?” শুভঙ্কর কিছু বলে ওঠার আগেই প্রদীপ আঙুল দিয়ে ইশারা করে দেখালো – , শুভঙ্কর আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল। গৃহস্বামী বুঝলো আমিই শুভঙ্কর। তিনি ক্ষনিকের জন্য ভিতরে চলে গেলেন।

বাড়ির ভিতর ও পড়শি মহিলারাদের কৌতূহলের শেষ নেই, উঁকিঝুঁকি মারছে এদিক ওদিক থেকে। বাবাই বললো- “এটা ওর বাবা।” শুভঙ্কর বললো- “মনে হয়, আমি দেখিনি আগে।” এতক্ষণে একজন মুস্কো মতন লোক ওদের চারজনকে ভিতরে ডেকে নিয়ে গেল। আমি মনে ভাবছি মল্লিকা বাবাকে রাজি করিয়ে ফেলেছে বোধহয়, তাই ওদের আলাদা খাতির, আমার আলাদা জলোযোগ পানাহারের ব্যবস্থা প্রদীপের ভুল ইশারাতে। ভালমন্দ খাওয়া হবে ভেবেই মনটা প্রশান্তিতে ছেয়ে রইলো, সাথে বন্ধুকে সাহায্য করতে পারার সুখ -আহা! খানিক পর সেই বাবা ভদ্রলোক সহ আরো চারজন সটান ঘরে ঢুকে খিল দিয়ে শুরু করলো বেদম মার। সাথে খিস্তির গোটা অভিধান মন্ত্রের মতো পড়ে যেতে লাগলো। গন্ডগোল কিছু হতে পারে শুরুতেই আন্দাজ করেছিলাম, কিন্তু বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত এমন ধোলাই শুরু হয়ে যাবে ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি

ভদ্রলোকের কথার সাথে তাল রেখে, “আমি প্রাণপণ চিল্লিয়ে বলে যাচ্ছি আমি আপনার স্ত্রীকে চিনিনা। এই দেখুন কলেজের আইকার্ড, আমার নাম শুভঙ্কর নয়।” যত বেশি বলি তত বেশী মার, লাথি চড় ঘুসির বৃষ্টি আসে। ওনারা যতক্ষণে হাঁফালেন ততক্ষণে আমি কথা বলার পরিস্থিতিতে নেই, মুস্কোদের একজন বললো- “স্যার ছেড়ে দিন, মরে যেতে পারে।” ক্রুদ্ধ ভদ্রলোক তখনও বলে চলেছে- “গুলি করে মেরে দেব, সব কটাকে। আগে এটাকে তারপর ওই মহিলাটিকে। “

ক্যান্টনমেন্ট হাসপাতালের ওয়ার্ডে যখন নিজেকে আবিষ্কার করি, নার্সকে শুধাতে জানালো আমি পুলিসের ভ্যানে করে এখানে এসে পৌঁছেছি, খানিক পর বাকি চারজনেরও সন্ধান মিললো সেই ওয়ার্ডেই। সবচেয়ে বেশি ঠ্যাঙানি খেয়েছে প্রদীপ, হামানদিস্তায় আদা ছেঁচা করেছে। যদিও এক্স-রে র রিপোর্ট সেটাকে প্রত্যাখ্যান করে বাবাই এর পক্ষ নিল, ওর গোটা তিনেক হাড়ে ফ্রাকচার। সকলেরই সারা গায়ে কালশিটের চাকাচাকা দাগ, চোখের নীচে পুরু কালি। তারপর প্রায় দেড় দিন বেঘোরে জ্বরযাত্রা শেষে তৃতীয় দিন সকালে ছুটি পেলাম সকলে। একটা হলুদ ট্যাক্সি করে মেসের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম, সমগ্র পথ জুড়ে আশ্চর্য নীরবতা।

ফিরে আসতে দাদা ভীষণ উৎকণ্ঠিত ও যারপরনাই আশ্চর্যান্বিত হয়ে শুধালো- “কোথায় ছিলি এ তিনদিন, কোনো খোঁজখবর টুকু নেই। আর এ দশা কী করে হলো? এক্সিডেন্ট হয়েছিল নাকি?” প্রদীপ হাউমাউ করে কঁকিয়ে বললো- “হারামি বুড়ো তোমারও আমাদের সাথে থাকা দরকার ছিল।” আমি বললাম- “তোমরা কলেজে গিয়ে বিরিয়ানি খেয়েছিলে, ধোলাই খেলাম আমরা।”

দাদা বললেন- “আরে, আরে হয়েছে কী সেটা বলবি তো?” পার্থ আমাদের মাঝে সবচেয়ে ছোটো, সে কেঁদে বললো- “আমি কিছু জানিনা। আমরা চারজনে ভিতরে গিয়ে মাঝবয়সি ভদ্রলোকের সামনে দাঁড়াতে প্রদীপদা বললেন, শুভঙ্কর মল্লিকাকে ভালোবাসে, পাক্কা সাড়ে তিনমাসের ‘রিয়েল’ প্রেম। আপনাকে আজ কথা দিতে হবে আপনি মল্লিকাকে শুভঙ্করের হাতে তুলে দেবেন, নতুবা আমরা ওকে তুলে নিয়ে যাবো। এর পর কোত্থেকে যেন কয়েকটা লোক ডান্ডা নিয়ে এসে আমাদের আলাদা আলাদা ঘরে বেঁধে, গরুর মত মেরে অজ্ঞান করে দিল।” আমি বুঝলাম, এরাও সত্যটা জানে না

শুভঙ্কর এতক্ষণ চুপ মেরেছিল, সে বললো- “আমি কিন্তু এর শেষ দেখে ছাড়বো।” দাদাও ওর সাথে সাথ লাগাচ্ছিলেন, কিন্তু আমি শুভঙ্করের উপরে ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো গলা টিপে ধরার চেষ্টা করতে সকলে মিলে আমাকে নিরস্ত্র করলো। রাগত স্বরেই বললাম- “হ্যাঁরে চার অক্ষরের বোকা। প্রেম মারিয়েছো, ভিক্টোরিয়া গেছো, নলবনের ঘাসের আড়ালে মুচুমুচু করেছো- সবটা না জেনেই?”

বাবাই বললো, “সবটা জানার আগে আবার কী! লোকের মেয়েকে তুলতে গেলে এমন হতেই পারে, তবে চরম শিক্ষা হয়েছে আর নয়।” বাকিরাও হাঁ হাঁ কর ওকে সাপোর্ট করলো। এবার আমার মাথা ঠোকার পালা। এতো মার খেয়েও ব্যাটাচ্ছেলেরা কিচ্ছু জানলো না? এ কাদের সাথে বাস করি আমি?

আমি ভীষ্মলোচনের মত ক্রুদ্ধিত হয়ে চিৎকার করে বললাম- “ওরে হতভাগার দল, তোদের পিটিয়ে মেরে ফেলা উচিত ছিল। পুলিসের বৌ হাইজ্যাক করতে গিয়ে আমরা গনধোলাই খেয়ে বেঁচে ফিরেছি, এটুকুও খোঁজ রাখো না। মল্লিকা বুড়োর মেয়ে নয় বউ...”

পিন পড়লে শোনা যাবে, ঘরে এমন নিস্তব্ধতা। আমি বলে চললাম- “আমাদের সকলকেই পুলিসের টাটাসুমো হাসপাতালে পৌঁছে দেয়। সেখানেই কনস্টেবলদের মুখে শোনা কথাগুলো সাজালে এমন হয়ঃ- নকুলদেব মল্লিক পুলিস; মল্লিকার স্বামী। বয়স দাদার চেয়েও বেশি। বাচ্চা হয়নি বলে দ্বিতীয় পক্ষ ঘরে আনেন। স্ত্রীর নাম সাগরিকা মল্লিক, বর্তমানে ত্রিশোর্ধো। গরীব বাবা চাকুরিজীবী দোজবেঁড়ের সাথে মেয়ের বিয়ে দিলেও, বয়সে অর্ধেক সাগরিকা বুড়ো বর মেনে নিতে পারেনি। বিয়ের বছর পরেও সন্তানাদি না হওয়ায়, সাগরিকার একাকিত্ব দূর করতে আবার কলেজে পাঠায় পড়াশোনা করতে। কচি শুভঙ্করের প্রেমে পড়ে যায় অতৃপ্ত সাগর, আসল নাম বললে যদি ধরা পরে যায় তাই মল্লিক পদবীকে মল্লিকা বানিয়ে নেয়। সে নিজেও ওই বুড়োর হাত থেকে হয়তো বাঁচতে চেয়েছিল, সাগরিকা ধোঁকা দিয়েছে নিজের পরিচয় লুকিয়ে।” এদিকে সদ্য নাভিকুন্তল গজানো শুভঙ্কর, মল্লিকার মধ্যে শুধু মেয়েছেলে দেখেছিল, বাকি আর কিছুই খোঁজেনি

এবার দৃষ্টি দাদার দিকে, বললাম- “তোমার পরিকল্পনাতেই পুলিসের ঘরে ঢুকে, পুলিশের বউ কিডন্যাপ করতে গিয়ে, বাছা বাছা মুস্কো কনস্টেবলদের হাতে গণপিটুনি খেয়ে মরতে মরতে বেঁচে ফিরেছি। তোমারও...

কথা শেষ হলনা, দাদা বেগতিক বুঝে বললেন- “আমার না পায়খানা পেয়েছে, আসছি।” বলেই, দোতলাতে অদৃশ্য হওয়ার আগে করুণ বিলাপ কানে এলো- “সাধনার শোকে উন্মাদ না হয়ে ওদিন, আমিও যদি নকুলবাবুর মত, ভাড়াটেটাকে রামধোলাই দিতাম, আজ আমাকে একা থাকতে হতো না। “

বাকিরা থ...

 


শনিবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

সুখে থেকো...

তোমাকে ভালোবাসার কথা বলে
কোন লাভ নেই জানি।
তবুও দিনের পর দিন, মাসের পর মাস,
প্রতিটি সময়ে তোমাকে ভালবেসে
যেতে ইচ্ছে করে.....


উপেক্ষাকে উপভোগ করতে পারলে, আর
একাকিত্বকে সাথী বানাতে পারলে,
তার মতন সুখী আর কে!!
তোমায় সুখে থাকতে দেখেই আমার সুখ,
আমার কাছে ভালবাসা একমাত্রিক ও নিঃশর্ত।
সে তুমি আমায় যা ই ভাবো,
কুছ পরোয়া, এভাবেই রয়ে যাবো।


মাটির ঘষা লেগে পাথরও ক্ষয়,
তুমিও নিশ্চিত ক্ষয়বে,
আমি সেই দিনের অপেক্ষায়।
সুখে থেকো......

বৃহস্পতিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০১৩

উন্মাদ নামা ~ ৯

অনেক নারীই শুধুমাত্র দুটো পেটের ভাত আর লজ্জা নিবারণের কাপরের জন্য শয্যা সঙ্গীনি হতে রাজী হয়ে যায়।

এদের কেউ কেউ বারবনিতা হলেও, বাকিরা কিন্তু গৃহবধু।

শনিবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৩

উন্মাদনামা ~ ০৮

যবে থেকে আমি রামায়ন মহাভারত বেদ কোরান বাইবেল ত্রিপিটক পড়া শুরু করেছিলাম, সেদিন থেকেই সাম্প্রদায়িক হয়ে গেছিলাম। আমার শিক্ষার মৌলবাদী করন ঘটেছিল ও ধর্মের রঙে রাঙা হয়ে গেছিল। এবার ভাবছি লাদেন, দাউদ, জর্জ বুস, হিটলার, কেশব বলিরাম, গোলওয়ালকর বা কাসভদের জীবনি পড়ে ধর্মনিরপেক্ষ হব। কেইবা চাইনা হোয়াইট কলারের জীবনযাত্রা? আপনিই বলুন..

কে কে সহপাঠী হতে ইছুক??

মঙ্গলবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০১২

ধর্ম দর্শন



ধর্ম-দর্শন


গোঁড়া ধার্মিকদের নিয়ে কোন কালেই সমস্যাটা ছিল না। তারা ধর্ম সাধনাতেই নিমজ্জিত থাকে। প্রতিটা ধর্মেরই নিজস্ব আচার বিচার ব্যাপ্তি ও গরিমা এতোটাই বিশাল যে, প্রকৃত ধার্মিকের অন্য গৃহে উঁকি দেবার সময় বার করা প্রায় অসম্ভব।
সমস্যা অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী দের নিয়ে। বক ধার্মিকদের নিয়ে। অপব্যাখ্যাদ্বারা জারিত ধার্মিকদের নিয়ে। যারা যুক্তির থেকে আবেগকে প্রাধান্য দেয় বেশী। যে সমাজে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বেশী, পাতি কথায় বেকার, সেই সমাজে ধর্মাচার নিয়ে মাতামাতি অত্যন্ত বেশী। কারন তাদের হাতে খরচ করবার মত সময় অগাধ। উল্টোটাও সত্য, যাদের হাতে অগাধ ধনসম্পত্তি রয়েছে, তারাও ধর্মের মত মুচমুচে বিষয় নিয়ে গবেষণা শুরু করে। জীবনের সাথে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে চলা আম জনগনের পেটের চিন্তায় রাতে যেখানে ঘুম হয়না, সেখানে ধর্ম নিয়ে আদিখ্যেতা করার সময় কোথায়?
একটা উদাহরন, বেসরকারী ব্যাঙ্কে বা বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত কোন কর্মচারিকে কখনো কোথাও ধর্ম নিয়ে মাতামাতি করতে দেখেছেন? দেখবেন না। কাজের চাপের চোটে তাদের চিড়েচ্যাপ্টা জীবনে এমনিতেই ত্রাহি ত্রাহি রব। ক্যাচালি করার সময় কোথায়?
ধর্ম মানে যাহাকে ধারন করা যায়। যারা ধর্মকে অস্বিকার করে, তাঁরা আসলে নিজের বর্তমানকে নিয়ে অস্তিত্বসঙ্কটে ভুগছেন, নতুবা অযোগ্যোতার দরুন অকৃতকার্য হতে হতে, একমাত্র বিক্ষোভের ব্যাক্তি(!) ঈশ্বরের প্রতি ক্ষোভের হেতু ধর্মের বিরুদ্ধাচারন শুরু করেছেন। এরা দীশাহিন জীবনযাপনের হেতু, নিজেরাই নিজেদের সবচেয়ে বড় শত্রু। ধর্মকে অস্বিকার করা, আসলে হাঁটুতে বুদ্ধি রেখে বিজ্ঞানচর্চার সামিল। জ্ঞান না থাকলে বিজ্ঞান হয়না। তেমনই ধারন ক্ষমতা না থাকলে ধর্ম হয় না। ধর্ম কখনই বিজ্ঞানকে অস্বিকার করেনি। ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের কোন বিরোধ নেই। ভন্ডরা বিভেদ সৃষ্টি করেছে আর করেছে ধর্ম ব্যাবসায়িরা। ধর্ম কে বাদ দিয়ে বিজ্ঞানের অস্তিত্ব নেই। ধর্ম বিনা রাষ্ট্রব্যাবস্থা টিকতে পারে না। সকল হানাহানিই ভোগের জন্য। ধর্ম ত্যাগ শেখায়, তাই প্রকৃত ধার্মিক কখনই হানাহানি করবে না। যারা করেন, তারা আর যাই হোক ধার্মিক হতে পারেন না।
ব্যাক্তি স্বাধীন অনেক ব্যাক্তিই নিজেকে নাস্তিক বলে থাকেন। অথচ ধর্মের সাথে জড়িত যাবতীয় আমোদের মজা নেন তারিয়ে তারিয়ে। এ এক অদ্ভুত মানসিক বিকার। যাকে আমি স্বিকার করিনা, যা আমার বিশ্বাসের পরিপন্থী, যে ঘটনা পরম্পরা আমার জীবনধারর সাতে খাপ খায় না।, সেখানে আমার যেকোন ধরনের উপস্থিতিই স্ববিরোধিতার সামিল। আর এটাও এক ধরনের স্বাধিকার ভঙ্গ। এই প্রজাতির মানুষবর্গ দেখতে আপাত নিরিহবাদী হলেও, এদের মানসিক স্থিরতা খুবই ভঙ্গুর, যে কোন মুহুর্তে যে কোন দিকে বাঁক নিতে পারে। কারন নীতিহিততা হয়ে জীবনধারন মৃত্যুরই সামিল। ধর্মীয় মৌলবাদীদের থেকে এনাদের ফারাক খুবই কম। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নাস্তিকের দল উৎসেচকের ভুমিকা পালক করে, খুচিয়ে ঘা করে এনারা মজা লোটেন।
ধর্মের উৎপত্তি মানব সভ্যতার বিকাশের জন্য। মানব সংহতিকে একটি গঠনমূলক রুপ দিতে। ভিন্ন ভিন্ন মানসিকতার, ভিন্ন চরিত্রের মানুষদের মানুষদের এক সুত্রে বাঁধিতে ধর্মের উৎপত্তি। ধ্রুবক জীবনধারাকে সর্বত্র সমান ভাবে ছরিয়ে দিতে ধর্মের উৎপত্তি। ভালো আর মন্দের ফারকটা বোঝানোর পন্থাকে সার্বজনীন রুপ দিতে ধর্মের উৎপত্তি।
অনেকের মতে সংগঠিত ধর্ম ব্যাবস্থা মানব সভ্যতার বিচারে এক্কেবারে আধুনিক ঘটনা, মাত্র ৩ হাজার বছরের পুরাতন। তাহলে তার আগের মানুষেরা কিভাবে বিনা ধর্মে জীবনিপাত করতেন?
আসলে এটা একটা গোড়ায় গলদ প্রশ্ন। প্রথম পালটা প্রশ্ন, আপনি কবে এই প্রশ্নটা তুলছেন? ২০১৬ সালে দাঁড়িয়ে। ৩০০০ বছর আছে পৃথিবীতে মানব সভ্যতার ধারনাটা কেমন ছিল? সেই আমলে লড়াই টা ছিল মূলত মানবদের সাথে পশুদের। কারন একএকটি ছোট জনগোষ্ঠী জঙ্গলে থাকতো জংলী জানোয়ারদের সাথে। খাদ্য বলতে গাছপালা বা কাঁচা মাংস, আর থাকার স্থান বড় গাছ বা তার কোটোর বা গুহা। যেগুলো পশুরাও ব্যাবহার করতো। তাই তখনকার মূল যুদ্ধটা ছিল খাদ্য আর বাসস্থানের, আর বাসস্থানের। সেই পরিসরটা ছিল বিশাল, আর মানুষের সংখ্যা টা ছিল অত্যান্ত মুষ্টিমেয়।
আজকের পৃথিবীতে এই জনবিষ্ফোরনে মানুষের সবথেকে বড় শত্রু মানুষই। সেখানে অনুশাষনের জন্য ধর্ম ভিন্ন কোন উপাই নেই। আজকের যুগে মানুষ দু ধরনের রোজগার করে, এক গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য, দ্বিতীয় বাহুল্য বিলাশিতার জন্য। দ্বিতীয় শ্রেণী তাদের মনরঞ্জনের জন্য নিরন্তর রোজগারের সাপ্লাই লাইনটা চালু রাখতে যে কোন কিছু পন্থা অবলম্বন করতে পারে। মানুষকে পন্য বানিয়ে মানুষের কাছেই বিক্রি করে তারা। তাই এদের প্রলভোন থেকে ও হানাহানি থেকে রক্ষা করতে ও মানুষজাতিকে একতার সুত্রে বাঁধতে ধর্ম নামক পৃথক পৃথক সমাজের উতপত্তি হয়েছিল বোধহয়।
ধর্ম আর ধর্মান্ধতাকে একই ছাঁচে ফেললে হবে না। যুদ্ধ বাজেরা ধর্মের দোহায় দিয়ে কাজ হাসিল করে। কারন ধর্ম বিষয়টা সকল সময় শান্তির কথা বলে ও আদর্শ জীবনযাত্রার কথা বলে। তাতেই সাধারণ মানুষ তাতে আকৃষ্ট হয়।বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই কোন না কোন ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তার মধ্যে কতজন ধার্মিক সেটা প্রশ্ন যোগ্য নিশ্চই। আর এই আকৃষ্টতার সুযোগটা ব্যাবসাদারেরা নেয়। কারো বিশেষ অপছন্দতার বিষয়গুলো প্রকট করে , বার বার তাতে সুরুসুরি দিয়ে বিরুদ্ধমতকে খুচিয়ে জাগিয়ে, গনমাধ্যমে সেই ঘটনার বারংবার সম্প্রচারের মাধ্যমে, অপপ্রচারকে সত্যির মোড়কে বাজারজাত করে, ফায়দা লোটে অধিকাংশ রাষ্ট্রনেতারা। সাথে থাকে স্বার্থান্বেশি কিছু চামচা শ্রেনির ভেকধারী ধর্মগুরুর দল।
প্রায় সমস্ত ধর্মের গ্রন্থ গুলো সহস্র বছর প্রাচীন ভাষায় মুদ্রিত, তাই কোন নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্বী, বেশিরভাগ মানুষের কাছে ধর্মের মূল প্রতিপাদ্য গুলো অধরা থেকে যায়। ব্যাবসারেরা মেকি ধর্গুরুদের দ্বারা নিজেদের স্বার্থের অনুকুলে মিথ্যা বিশ্লেষণ করে সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের কাম্য বিভেদ সৃষ্টি করে। অর্থের শক্তির কাছে দূর্বৃত্তের কখনো অভাব হয় না। দুর্বৃত্তের সাথে আসল ধার্মিকেরা কখনই পেরে ওঠে না, কারন ধার্মিক কখনই ছল চাতুরি মিথ্যার আশ্রই নেবেন না, নিতান্ত জীবন সংশয় ব্যাতিরেকে। ধর্মের আড়ম্বর দীর্ঘায়িত হয় ধর্মের মূল মন্ত্র থেকে। এখন ধর্মকে যারা মানেন না, বিশেষত নাস্তিকেরা। তারা অবুঝ, তাতে ধর্মের কি দোষ?
গুহামানবের বুদ্ধির থেকে আজকের মানুষের বুদ্ধি মেধা একতা চাহিদা লক্ষ্যগুন বেশী, তাই প্রতিযোগিইতাও বেশী। ধর্মের আস্তরন উঠে গেলে মানুষ পশুর থেকে বেশী ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে। ধর্ম তো একটা পোষাক স্বরূপ।
তাই প্রকৃত ধার্মিকের প্রকটতা অত্যন্ত প্রয়োজন। আর দরকার কিছু যোগ্য নেতার। যিনি ব্যাক্তি স্বার্থের উর্ধে গিয়ে মানব ধর্মের প্রচার করবেন, হানাহানি বন্ধ করতে পারবেন। সেটা যে আঙ্গিকেই হোক না কেন!

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...