শুক্রবার, ২০ মে, ২০১৬

রূপচর্চা

 


রূপচর্চা

ইহার পর সুজি দি পায়েস রন্ধন করিয়া রোগীনির খাবার পরিবেশন করিবার জন্য প্রস্তুত হইতে লাগিলাম। রোগীনি আমার গৃহিনী, তাহার রুগ্ন হইবার যথাযথ কারণ রহিয়াছে। কয়েক দিবস যাবত আটা-ময়দা-সুজি না মাখিতে পারিয়া, আমার উপর অভিমান করিয়া সে খানা- পিনা ছাড়িয়া দিয়াছিল। না খাইবার সেই তুমুল প্রচেষ্টা ইস্তক ক্রমশ সে অসুস্থ হইতে থাকে। আমি মরিয়া যাই অভাবের তাড়নায়, আটা-ময়দা- সুজিও না খাইয়া; আর সে মরিতে চায় সেই সকল অন্নদ্রব্যাদি না মাখিতে পারিয়া। তাহার মুখব্যাদানে জাবনার প্রতি আমার আপত্তি নাই; কিন্তু সেই খাদ্যদ্রব্য বিলেপনের প্রতি আপত্তি রহিয়াছে, এবং ঘোরতর আপত্তি।

পয়সার অভাবে যখন তাহার রূপচর্চার নিমিত্তে আটা-ময়দা-সুজি খরিদ করিতে পারিলামনা; তখন সে অভিমান করিয়া, না খাইয়া, ঝগড়া-ঝাঁটি করিয়া দিনাতিপাত করিতে লাগিলএমতাবস্থায় আমার শ্বশুরকুল্যের বোধোদয় ঘটিয়া নিজের কন্যাকে বাপের বাড়িতে লইয়া গেলেন। সর্বসাকুল্যে আমার দোষ নির্ধারন করিয়া কর্ণ মলিয়া দিতে চান। শ্বশুর আমার কৃষক, তাহার উপরে অতিশয় কৃপণ, স্বভাবতই তাহার অবস্থা আমা অপেক্ষাও অতি দীনতাই তাহার তুলনায় অবস্থাপন্ন আমাকেই তিনি তাহার পঞ্চম কন্যাকে পাত্রস্থ করিয়াছিলেন। সুতরাং ধনী স্বামীর নিকটে রূপচর্চার আবদার করাটা মৌলিক অধিকারের অন্তর্গত, কিন্তু সেটা পূরণ করা আমার বুনিয়াদী কর্তব্যের মধ্যে পরেনা।

আমার গৃহিণীর প্রতি আমার অনুরাগ প্রশ্নাতীত, তথাপি স্ত্রী বিয়োগের অভাব জনিত কারনে অন্তরে অন্তরে কাঁদিয়া বেড়াইতাম। তাহাকে পিতৃগৃহ হইতে প্রত্যার্পনের নিমিত্ত পৌঁছাইয়া ভেউভেউ করিয়া ক্রন্দন করলে পর- তৎক্ষণাৎ সে আমাকে ঘেউঘেউ করিয়া বিতারণ করিয়া দিত। তবুও অবস্থার বেগতিক দেখিয়া আমি বুদ্ধি আঁটিলাম যে, পুরাতন ফেসওয়াসের টিউবে আমার সমস্ত ক্রন্দনের জল আর তরল নাকের সর্দি জমা রাখিব, তাহাই করিলাম। টিউবটি পূর্ণ হইলে ফেসওয়াসের লোভ দেখাইয়া তাহাকে আনিয়া লইলাম বটে; তবে কথা লইয়াছিল তাহার আটা- ময়দা-সুজির অভাব অপূর্ণ রাখা যাইবেনা।

তৎক্ষণাৎ মনে মনে ভাবিলাম, প্রয়োজনে দশ টাকা দিয়া এক প্যাকেট চক(খড়ি) কিনিয়া তাহা পিষিয়া পাউডার বলিয়া চালাইয়া লইব। কারন পোড়া মুখে খড়ি হউক বা ল্যকমে, ফলাফল সেই একই। তদহেতু, বৌ এর রোগটাও যখন মানসিক, তখন এটাই যথেষ্ট।

অতএব, আমি বলিলাম, আচ্ছা-তাহাই হইবে। যাহাই হোউক, বাড়িতে ফিরিয়া ফেসওয়াস পাইয়া অতি খুশিতে বউ আমার লক্ষী হইয়া উঠিল, নিত্যদিন মনের আনন্দে বউটি সেই ফেসওয়াস মাখিয়া চলিল; আমি কেবলই অতি ক্লেশে দিনের খাবার দিনে যোগাড় করিয়া যাই। পায়ের ঘাম মাথায় তুলিয়া সারাদিনে যাহা রোজগার করি, তাহাতে সুজির লোনা পায়েস আর আটা-ময়দার পোড়া রুটিই কেবল গলাধঃকরণ করার জন্য জুটিতে পারে। তবুও ঠিক মতো যোগাড় করিতে পারিনা- দাম অতি চড়া, রোজগার অতি সামান্য। ওদিকে রুটি পুড়িয়া যায় কারন আমার বউয়ের বারবার আয়না দেখিবার জন্য সময়ের বেঘা ঘটে ।

আটা-ময়দা-সুজি, হলুদ আর মুসুরির ডালের দাম কেবলই বাড়িয়া চলিয়াছে। যার অন্যতম কারন বোধহয় আমার বউয়ের মতো বউ সকলই এসব দিয়া রূপচর্চা করিয়া বাড়তি অপচয় করিয়া থাকেন; ফলস্বরূপ দ্রব্য সীমিত হইয়া যাওয়ায় দরুন দাম বাড়িয়া গিয়াছে। আমাদের মতো পতির পক্ষে রূপচর্চা তো দূরে থাউক; খাইবার জন্যও তাহা কিনিবার সামর্থ্য হারাইতেছি। তাছাড়া খাইবার জন্য যখন এইসমস্ত দ্রব্য কিনিয়া আনি, তখন আমার বউ আর আমার সহদোরা তাহা হইতে অধিকাংশ টাই ঠাইয়া আলাদা করিয়া রাখিয়া দেন, আর তাহাতে পোড়া বেগুনের মত ক্ষত ভরা মুখমন্ডলের রূপচর্চা হইয়া থাকে- তাহা সত্বেও বারবারই কম পড়িয়া যায় প্রসাধনে। প্রথমে মাখিবার জন্য ও পরে খাইবার জন্য

আমি যখন বিষয়টা বুঝিতে পারিলাম, বোনকে মৃদু ভর্তসনা করিলাম ও তাহাকে যথাসাধ্য বোঝাইলাম যে সে কেন এই সকল খাদ্য দ্রব্যের অপচয় করা থেকে বিরত থাকিবেনা। ইহাতে সে ক্রুদ্ধ হইল, এবং স্বদর্পে তাহার বৌদির সহিত সেই ফেসওয়াস তৈরির গোপন ফর্মুলা ফাঁস করিয়া দিল। ব্যাস ভুকম্পের আর অবশিষ্ট রহিল না। সেই যাবৎ না খাইয়া, ঝগড়া-ঝাটি করিয়া আমার স্ত্রী রত্নটি অসুস্থ রহিয়াছে। ভাবিয়াছি- আগামী কাল্য হইতে আমার রুটি- পায়েসের ভাগে যে আটা-ময়দা-সুজি ব্যয় হয়, সেসমস্ত তাহাদের রূপচর্চার তরে ব্যয় করিব।

তাহাদিগকে খুশি রাখিতে, প্রয়োজনে আমি না খাইয়া থাকিব, যদি তাহাদের কিছু অবশিষ্ট থাকে তাহাই আমি ভক্ষন করিব। কোন কূলবধু হয়তো বলিবেন, স্বামীর সুস্থ থাকার জন্য ইহার অতি প্রয়োজন রহিয়াছে, কারন বেশি খাইলে মেদ বাড়িয়া যাইবার ঝুঁকি প্রবল, সুতরাং কম খাইবার দরুন খে না থাকায় শ্রেয়। এক্ষনে কেহ বলিবে স্বামীর মনে শান্তি না রাখিয়া শুধু রূপ দেখাইয়া সুখ দিতে যাওয়া অতি নিম্ন কর্ম, কিন্তু আমি বলি প্রথমে পেটে শান্তি প্রয়োজন, মানসিক শান্তি তো পরবর্তী পরিচ্ছদের পাঠ্য। বউ আমাকে ছাড়িয়া বাপের বাড়িতে যাইয়া থাকিতে পারিবেন; কিন্তু আটা-ময়দা-সুজি ছাড়িয়া রহিতে পারিবেন না, এ সত্য প্রমানিত। পাশাপাশি আমিও বউ বিনা রহিতে পারিব না।

একেক সময় ভাবি, কোনটা স্ত্রীজাতির অঙ্গ। শুভ্র সজ্জা বিশিষ্ট বহিরাঙ্গ? নাকি জন্মগত সুত্র প্রাপ্ত চর্ম সম্বলিত একটি কোমল স্ত্রী হৃদয়

যে যাহাই হউক, পেটে ও মন দুটোই অভুক্ত। কারন ঘরে ও মনে কোথাও আপাতত স্ত্রী নাই, আছে শুধু অনেক অনেক বেশী রোজগারের প্রয়াস। তাহাতে প্রান বাঁচুক আর নাই বা বাঁচুক

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...