বৃহস্পতিবার, ২৫ মার্চ, ২০২১

বামদলে পাত্র-মিত্র ও গুরুদেব


গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে একজন বিশিষ্ট দার্শনিক ছিলেন তা তার বহু লেখায় ছাপ রেখে গেছেন। তেমনই একটা দূরদর্শী রূপকধর্মী গল্প তোতা কাহিনী। মূর্খ রাজা, আর তার চারপাশে ঘিরে থাকা নিম্নমেধার স্তাবক কুল তথা চামচারা। এই চামচা বা স্তাবকেরা সমাজে পরিচিত- পাত্র, মিত্র, অমাত্য, পারিষদ, উমেদার, চাটুকার, ভাঁড় ও অন্বয় পুরুষের দলেরা। এখানে পণ্ডিতেরা স্থান পায় না, কারণ ভাঁড়েরা পণ্ডিতের পোশাকে কৌতুক দেখায় কুমন্ত্রণা চক্রের প্রত্যক্ষ মদতে।

এখন সেই রাজন্যদের কাল গত হয়েছে, গণতন্ত্রের পতাকা পতপত করে উড়ছে উন্নত বিশ্বসহ তৃতীয় বিশ্বের আমাদের দেশেও। গভীর জনঘনত্বের বহু ভাষাভাষী বহু ধর্মের আপাতদৃষ্টিতে সচেতন আর বুদ্ধিমান সেজে থাকা ক্রমশ পিছনের সারিতে ছুটে চলা একটি রাজ্য এই পশ্চিমবাংলা। যেহেতু রবিঠাকুরও এই মাটিরই মানুষ, তাই আমাদের ক্রোমোজোমকে তিনি এক শতাব্দী আগেই নিখুঁতভাবে ম্যাপিং করে ফেলেছিলেন।
আজও দেখুন, কেউ কেউ তারাশঙ্করের লেখা তথা সত্যজিতের চিত্রায়িত- জলসাঘরের ‘ছবি বিশ্বাস’ সেজে পুরাতন অট্টালিকার পলেস্তারা খসা বর্তমানে বিরাজমান, মোটা মোটা থামের পাশে আসক্ত শরীরে আকাশপানে ঝুলে ঢাকা ঝাড়বাতির পানে চেয়ে ‘আত্মসমীক্ষা’ করেন- যা যৌবনের বৈভবের প্রতীক। দেওয়ালে টাঙানো ক্রমশ বেরঙা হতে থাকা পূর্বসুরীদের তৈলচিত্র, মেঝেতে ফরাশ পাতা, তার উপরে ‘ক্ষমতার’ চেয়ার, তাকিয়া-বালিশ। জমিদারী চলে গেলেও, বয়সের ভারে ন্যূজ জমিদার ক্ষীয়মান পরিস্থিতিতে জমিদারসুলভ অশোভনীয় অন্তঃসারশূন্য বুর্জোয়া আস্ফালন ধরে রেখেছেন ষোলআনা।
অতঃপর ধুলোমাখা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঝুলফাঁদ সরিয়ে নিজেকে দেখার পালা জমিদারের। পিছনে সামান্য দূরে সেই প্রলেতারিয়েৎ লোকটি একটা কালি লাগা কাঁচের লন্ঠন নিয়ে দাঁড়িয়ে, জমিদারির খাদের কিনারে পৌঁছে অতীতের স্বপ্নে মশগুল, যার কথা কখনও শোনেননি রাজামশাই। পাত্র-মিত্রেরা কবেই পালিয়ে গেছে নিজের আখের গুছিয়ে। সময়ে শিক্ষা নেওয়ার ভান করা জমিদার- শুধুই নিস্তব্ধ হাহাকারের প্রতিমূর্তি। এখন সম্পদ আর আভিজাত্য ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্কে এসে দাঁড়িয়েছে। শুধু পরে আছে ব্যর্থতা, ঔদ্ধ্যত্ব, দম্ভ আর একরাশ একাকীত্বে ঠাসা শূন্যতা।
জলসা ঘর হোক বা তোতাকাহিনী, আসলে এ সবই রূপক। শূন্যে পৌঁছাবার জন্য আকাঙ্ক্ষা তীব্রতর হলে, যোগ্য পাত্র-মিত্র ঠিক জুটে যায়। এর পর শুধুই রয়ে যায় আত্মসমীক্ষা আর চণ্ডীমণ্ডপে (আধুনা ফেসবুক) জমিদারের এককালের চামচা তথা স্তাবক কুল। জমিদার তার জমিদারিত্ব হারিয়ে অট্টালিকাতে একা মৃত্যুর প্রতীক্ষাতে আয়না দেখে। একজন পারিষদ ছিলেন, যিনি বিবেকের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন- সৎ পথ দেখাবার চেষ্টাই করতেন। দীর্ঘদিন নিম্নমেধার স্তাবক, পাত্র-মিত্র-উমেদার-চাটুকারের মাঝে থাকার দরুন, ততদিনে জমিদারে মেধা, বিবেক, বোধ, চেতনা সবকিছুই অবলুপ্ত হয়ে গেছে।
গুরুদেবের তোতারা আজও শিকড়হীন শৃঙ্খলার শিকলে আঁটকা পরে, এখন খালি শেখানো পুঁথিগত বুলি আওড়ায়। যে বুলি আমজনতার বোধের বাইরে। একটা জরাজীর্ণ খাঁচাকে ‘উপযুক্ত স্থান’ নাম দিয়ে সেখানেই অবোধ্য ভাষায় আলাপচারিতা করতে করতে, মুক্তভাবে গাইতে ভুলে গেছে, মুক্তভাবে উড়তে ভুলে গেছে, মুক্তভাবে কথা বলতে ভুলে গেছে, মুক্তভাবে ভাবতেও ভুলে গেছে- তোতার মতো।
ক্রমাগত শিক্ষাহীন আত্মসমীক্ষারত নামে ধামাচাপা দেওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলে কী হয় সেটা গুরুদেবই লিখে গেছেন- “পাখি আসিল। সঙ্গে কোতোয়াল আসিল, পাইক আসিল, ঘোড়সওয়ার আসিল। রাজা পাখিটাকে টিপিলেন, সে হাঁ করিল না, হু করিল না। কেবল তার পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনো পাতা খস্‌খস্ গজ্‌গজ্ করিতে লাগিল”। সবই থাকবে, শিকল, খাঁচা, পাত্র, মিত্র, অমাত্য সব- শুধু পাখিটাই থাকবে না।
চলুন, আরেকবার তোতা কাহিনীর পাতা উল্টে নিই, জলসাঘরটাও ঘুরে আসি- বইয়ের পাতা বেয়ে।

করোনা ও প্রোটোকল




করোনার নতুন ঢেউ নাকি আছড়ে পড়েছে দেশে, যদিও পুরনো ঢেউ কখন কীভাবে চলে গেছিল সে বিষয়ে কেউ কোনো ধারণা দিতে পারেনি। কেন গেছিল, কোথায় গেছিল তাও কেউ জানে না। নতুন ঢেউ কোথা থেকে এলো সে বিষয়েও কেউ খুব একটা বেশি জ্ঞান রেখেছে বলে এ পর্যায় পর্যন্ত মনে হয়নি। আসলে করোনা নিয়ে কে বলছে না, ডাক্তার বলছে, সরকার বলছে, নেতা-নেত্রী বলছে, WHO বলছে, আমার মতো ফেসবুকের জ্ঞানগর্ধবেরা বলছে, মাই চায়ের দোকানের বীর বিপ্লবী বিশ্লেষকরাও যেমন ভাবে পারছে বলছেন এবং নিজ নিজ মতবাদ রাখছেন বলিষ্ঠভাবে।
কিন্তু যাদের বলার দরকার সেই বায়োটেকনোলজিস্টরা কী বলছেন কেউ সে বিষয়ে জানতে ন্যূনতম আগ্রহী নই। তারাও যে কিছু বলতে চায়, বা বলতে দেওয়া উচিত কিংবা যেটা তারা বলেছেন সেটাকে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত- এ বিষয়টা আমাদের কারোর ধর্তব্যের মধ্যেই নেই। না সরকার তাদেরকে বলতে দিচ্ছে, না কোনো বেসরকারি সংগঠন - সুতরাং সেই না বলা সমাধানের আঁধারে যা ক্ষতি হওয়ার তাই হচ্ছে।
করোনা কতটা মানুষের রোগ তথা প্যান্ডেমিক আর কতটা দেউলিয়া পুঁজিবাদী অর্থনীতির মারণ রোগের জড়িবুটি এ বিষয়ে তর্ক চলতেই থাকবে, কারণ করোনাকালের লকডাউনে আমার আপনার হাত থেকে কাজটি চলে গিয়ে অভাবের বাটি ধরিয়ে দিয়েছিল সরকার। কিন্তু আদানি-আম্বানি সহ গোটা বিশ্ব জুড়ে ধনীরা আরও আরও বেশি ধনী হয়েছে লকডাউনকে কেন্দ্র করে।
সুতরাং আপনার পবিত্র বিশ্বাসে আপনি করোনাকে দেব জ্ঞানে থুরি প্যান্ডেমিক জ্ঞানে পূজা করতেই পারেন, আমি করবো না। কারণ আমি পরিষ্কার উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম গত লকডাউনের কিছুদিনের মধ্যেই- যে করোনা একটা ষড়যন্ত্রের নাম, যে ষড়যন্ত্রে গরিব আরও গরিব হয়েছে, ধনী আরও ধনী হয়েছে মনোপলি লুঠ চালিয়ে।
করোনা যদি ছোঁয়াচেই হতো তাহলে ভোটকে কেন্দ্র করে এত এত মিটিং-মিছিলের পরে গোটা বাংলা জুড়ে কিংবা যে সমস্ত রাজ্যের ভোট হচ্ছে সেই সমস্ত রাজ্য জুড়ে মড়ক লাগত। যদিও সে সব কিছুই হয়নি, কিন্তু স্কুল বন্ধ আছে আজ ১ বছর। অনলাইনে পড়াশোনার নামে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী লুটেপুটে খাচ্ছে। একটা প্রজন্মের বাচ্চাদের পড়ার অভ্যাস, স্কুলে যাওয়ার অভ্যাস সমস্ত কিছুকে নিপুণভাবে নষ্ট করে দিয়েছে।
তাহলে এবার লক্ষ্য কী? লক্ষ্য অবশ্যই ভ্যাক্সিন বেচা, কারণ যে পরিমাণ টাকা রোজগার করার সামর্থ্য ষড়যন্ত্রীদের ছিল, তারা যে স্বপ্ন দেখেছিল- ২০২০ এর পরিকল্পিত করোনা সন্ত্রাস সেই লক্ষ্যে নিয়ে যেতে পারেনি ভ্যাক্সিনের ব্যবসায়ীদের। তারা কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে মরিয়া, তাদের লগ্নি তুলতে হবে সুদসহ, তাই নতুন এক পদ্ধতিতে আগামী তিন থেকে চার মাসের জন্য এই করোনা-করোনা নতুন জিগিরটা বাজারে এনেছে। নতুন স্ট্রেন, নতুন আতঙ্ক। এরা এটাকে চালাবে, মিডিয়া এদের সাথ দেবে পয়সা খেয়ে- যাতে জনমানসে একটা তীব্র ভীতি সঞ্চার হয়। যতটা পারা যায় পাবলিকের টাকা লুটে নেওয়ার একটা ব্যর্থ প্রয়াস।
পুঁজিবাদী হাঙরেরা ভ্যাক্সিন বিক্রির জন্য ষড়যন্ত্র করবে সেটাতো খুব স্বাভাবিক কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য আমাদের অপোগণ্ড রাষ্ট্রযন্ত্র তথা সরকার সহ আমলাদের একটা অংশ তারা এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ; আর এই যোগসাজশের প্রাতিষ্ঠানিক নাম হচ্ছে প্রোটোকল।
কেমন এই প্রোটোকল সিস্টেম!
১) একটা বছর কুড়ির তরুণী প্রথম বার মা হওয়ার জন্য একটা জেলা হাসপাতালে গেছে, তারপর সেখানে তার কিছু টেস্ট করা হলো, কেউ জানে না কেন সেই টেস্টটা করানো হলো, ব্যাস- তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো কোভিড রোগীদের জন্য স্পেশ্যাল হাসপাতালে। যেখানে প্রেগন্যান্সি বিষয়ক ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নেই, করোনাতে মরবে কিনা জানা না থাকলেও- লেবার পেইন উঠলে তাকে যে বাঁচানো দায় সেটা বলাই বাহুল্য।
২) একজন ছাত্র ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি ডায়ালাইসিস করার জন্য গেছেন একটি হাসপাতালে, সেখানে তার অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করা হলো এবং সাথে সাথে পাঠিয়ে দেওয়া হলো কোভিড স্পেশ্যাল হাসপাতাল- যেখানে ডায়ালিসিসের ড নেই। ২ দিন পর এ লোক এমনিতেই মরে যাবে।
৩) একজন অ্যাক্সিডেন্টে পায়ের হাড় ভাঙা নিয়ে গেছে হাসপাতালে হাড় ভাঙার চিকিৎসা করাতে। তাকে রেফার করে পাঠিয়ে দেয়া হলো কোভিড স্পেশ্যাল হসপিটালে। এরকম অসংখ্য ডায়রিয়া পেশেন্ট, কলেরার পেশেন্ট সহ নানা ধরনের স্বাভাবিক রোগীদের পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে কোভিড হাসপাতালে। মাত্র ৭ দিনে সমস্ত কোভিড স্পেশ্যাল হাসপাতালগুলোকে এভাবে ভরে ফেলা হয়েছে, কার নির্দেশে এগুলো হচ্ছে কেউ জানে না।
এরা যে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসেছিল সেই চিকিৎসাই হচ্ছে না দিনের পর দিন, আর কোভিডের নাম করে তাদের আঁটকে রেখেছে। ছাড়া না পেলে এমনিতেই এরা মরে যাবে যে রোগে এসেছিল সেই রোগে- তখন সরকারের খাতায় নাম উঠবে নতুন করে করোনাতে আক্রান্ত হয়ে এত জনের মৃত্যু অমুক কোভিড হাসপাতালে। ভাবুন তো আমার আপনার ঘরের কেউ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেছে আর তাকে কোভিড হাসপাতালে রেফার করে দিল!!
এ ও কি এক ধরনের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প নয়? কার স্বার্থে রোগীর সাথে আলাপচারিতা না করে, সঠিক টেস্ট না করে অনুমানের ভিত্তিতে গরু ছাগলকে খোঁয়ারে পাঠাবার মতো করে সাধারণ রোগগ্রস্থ রোগীকে কোভিড হাসপাতালে ঠেলে দিচ্ছে! আমরা সচেতন হবো না? ডাক্তারেরা পর্যন্ত গণহারে পদত্যাগ করেছিল কোলকাতা সন্নিহিত এক শহরতলীর কোভিড হাসপাতালে, ভোটের প্রচারের ঢক্কানিনাদে সে খবর চার দেওয়ালের মধ্যেই হারিয়ে গেছে।
অতএব, ১ দিনে ১ লাখ সংক্রমণ কীভাবে হলো বুঝে নিন, বুঝে নিন - মৃত্যুর হিসাব কিভাবে হবে। যেটা বুঝতে পারবেননা সেটা হচ্ছে- ভ্যাক্সিন উৎসব করে কার লাভ? রাত্রে লকডাউন করে কোন পাহাড় ডিঙানো হবে। কখনও বুঝবেননা- মাস্ক পড়লে ২ গজের দুরত্ব কেন, দুগজের দুরত্ব সঠিক হলে ভ্যাক্সিন কেন, ভ্যাক্সিন সঠিক হলে আবার মাস্ক ও ২ গজের দুরত্ব কেন!! প্রশ্ন অনেক- উত্তর দেওয়ার কেউ নেই।
সতর্ক হোন, প্রতিবাদ করুন। সরকারের অসভ্যতামির বিরুদ্ধে যেমন ভাবে পারেন প্রতিবাদ করুন- কিন্তু করুন। যে করোনা রোগী তাকে নিয়ে যাক কোভিড স্পেশ্যাল হাসপাতালে- কিন্তু অন্যেরা কেন?
মানুষের মধ্যে যত আতঙ্ক ছড়াবে তত ভ্যাক্সিন বিক্রি হবে। কোন ভ্যাক্সিন? যে ভ্যাক্সিনের রিপোর্ট আজ পর্যন্ত কেউ দেখেনি সেই ভ্যাক্সিন। কেন আপনি নেবেন! কারণ সরকার আপনাকে নিতে বাধ্য করছে। আপনি বলবেন- পয়সা তো আর দিচ্ছি না, সরকার দিচ্ছে। আপনাকে শুধাই- সরকারের কি বাপের টাকশাল আছে? সরকার তো আমার আপনার ট্যাক্সের টাকাই ঘুরপথে ভ্যাক্সিন হাঙরদের গিফট করছে। বিনিময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর তহবিলে কাটমানি জমা হচ্ছে।
গোটা তৃতীয় বিশ্ব জুড়ে এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের খেলা চলছে। যারা ভ্যাক্সিন নিয়েছে তারাও সুরক্ষিত নয়, মাস্ক ও সামাজিক দুরত্ব তাদের জন্যও ম্যাণ্ডেটারি। তার মধ্যে এই নতুন স্ট্রেনের খেলা এসে উপস্থিত। আমরা তো মেতে রয়েছি ভোট নিয়ে, এরপর আইপিএল, তারপর আবার নতুন কিছু এসে যাবে- কবে আমাদের বোধ হবে কে জানে!
কিন্তু তত দিনে কত প্রসূতি মা, কত ডায়ালাইসিসের রোগী, কত আমাশা আন্ত্রিকের রোগী বিনা চিকিৎসায় মরে গিয়ে করোনায় মৃত্যুর লিস্টে উঠে বসে থাকবে তার হিসেব হবে না। হিসাব হবেনা কোভিড স্পেশাল হাসপাতালে কতজন সত্যিকারের কোভিডাক্রান্ত, আর কতজন প্রোটোকলের শিকার। লিস্ট যত লম্বা হবে, তত ভয় বাড়বে, যত ভয় বাড়বে তত ভ্যাক্সিন বিক্রি।
আসলে রাষ্ট্রযন্ত্র যখন দুর্বৃত্তদের সাথে হাত মিলিয়ে ফেলে জনগণ তখন খেলার পুতুল হয়ে যায়।

সোমবার, ২২ মার্চ, ২০২১

অকপট সম্পর্ক

 


একটি পরিবার কিম্বা সমাজ কতটা সুস্থ তা নির্ধারণ করা যায় সেই পরিবার তথা সমাজের আভ্যন্তরীণ পারস্পারিক সম্পর্কগুলোকে বিচার করে। এই সম্পর্কের সূচকগুলো যতটা গভীর, সেখানে সুখের পারদ ততটা উঁচুতে বিচরণ করে। তাই প্রতিটি সম্পর্কের প্রতি আমাদের মূল্যবোধ এবং দায়বদ্ধতা রয়ে যায়, যেখানে এগুলোর অনুশীলন সর্বোচ্চ - সেখানে সুসম্পর্ক বিরাজ করে। ক্রমে ক্রমে এই মূল্যবোধ বা দায়বদ্ধতা- শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, অধিকারে পর্যবসিত হয়। এই পর্যায়ে প্রতিটি ক্ষুদ্র শিষ্টাচার, বাহ্য লৌকিকতা, শাস্ত্রীয় ক্রিয়াদি বা সম্মানজ্ঞাপক প্রবর্তনা একটা পরম আঙ্গিকে প্রকাশ পায়, তা যদি প্রেম হয় তখন তার রূপ চরমাকার ধারণ করে।
সম্পর্ক মানে কী?
শুধুই কী লেনদেন, দেনা পাওনা- যা বস্তুগত মাধ্যমের মাঝে সীমাবদ্ধ! সম্পর্ক আসলে তা নয়, কিছু জিনিস যা চোখে দেখা যায় না, অনুভব করতে হয়, উপলব্ধি করতে হয়, আত্মস্থ করতে হয়- সেটাই হলো সম্পর্ক।
সম্পর্কের কোনো প্রথাগত সংজ্ঞা হয় না, রক্তের আত্মীয়তার সীমানা ছাড়িয়ে সবচেয়ে বেশি মূল্যবান মানবিক বোধ। সম্পর্ক হলো একটা অভ্যাস, যাকে লালন করতে হয় যত্নে; যেখানে নিয়মিত মানবিক আবেগের লেনদেন হয়, কখনও তা আলাপে, কখনও বিলাপে, কখনও জ্ঞানের বিনিময়ে, কখনও শিক্ষার্থী হয়ে, কখনও দাদা, ভাই, বোন সম্পর্কের নাম নিয়ে তো কখনও নামহীন হয়ে। সম্পর্ক মানে শুধুই প্রেম নয়, ভালোবাসা নয়, ঘৃণা বা নিত্য যোগাযোগ নয় বরং এ সবকিছুর ঊর্ধ্বে একটা পরিস্থিতির নাম সম্পর্ক- যেটা দুটো বস্তুকে বেঁধে রাখে।
অতীতকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা মানুষ একাকীত্বের শামিয়ানাতে ঢাকা পড়ে যায়। অবিরাম আশেপাশে ঘটতে থাকা ঘটনাক্রমগুলোকে ভাগ করে নেওয়ার জন্য কিছু জীবন্ত প্রাণের প্রয়োজন হয়, যারা অনুভূতিতে প্রতিক্রিয়াশীল হয়। এমতাবস্থায় অধিকাংশ মানুষ - অন্য একটি বা একাধিক মানুষকে বেছে নেয়, অবলম্বন করে, দুঃখ-সুখের সাথী হয়- ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতি সহ রিপুগত বিভিন্ন কার্যকলাপের ভাগীদার করতে। একেই বলে সম্পর্ক। সততা, ক্ষমা, বোঝাপড়া, বিশ্বাস, বন্ধুত্ব, ধৈর্য, ভালোবাসা, অধিকারবোধ, ঈর্ষা, ঘৃণা ইত্যাদি সবটা নিয়েই সম্পর্কের বুনন।
আমরা তো সজীব, আমাদের মাঝে ইন্দ্রিয় আছে, তাই সম্পর্ককে আমরা অনুভব করতে পারি, যারা একটু বেশি প্রতিক্রিয়াশীল তারা প্রতিপালন করি এই সম্পর্কগুলোকে। প্রতিটি বন্ধন- বিশ্বাস, সম্মান ও যত্নের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। কিছু মনোমালিন্য, খুচরো দ্বন্দ্ব-বিবাদ, মান-অভিমান সম্পর্কের শিকড়কে দৃঢ়তা প্রদান করে।
আমরা প্রতিনিয়ত হরেক ধরনের সম্পর্কের মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে চলেছি, কখনও বুঝে কখনও না বুঝে, কখনও প্রয়োজনে কখনও নিরর্থক। সম্পর্কের সৃষ্টি হয়ে চলেছে অবিরাম ও নিরবচ্ছিন্ন ধারাতে। অনেক সম্পর্ক প্রাথমিকভাবে সুন্দর কিন্তু নষ্ট হয়ে যায়, কিছু সম্পর্ক আপাত রুক্ষ যদিও তার শিকড় অনেক গভীরে। কিছু সম্পর্ককে শিকল দিয়েও ধরে রাখা যায় না, কিছু সম্পর্ক ছিন্ন করা দুষ্কর। সম্পর্কের ভুলভুলাইয়াতে কে যে কখন কাছে আসে আর কে যে কখন দূরে যায় তার নির্দিষ্ট কোনও নিয়ম নেই, কিন্তু এই সকল কিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে কিছু মানুষ রয়ে যায় ছায়ার মতো- সম্পর্ক তখন আর শুধুই সম্পর্ক নয় বরং সেখানে স্পেশাল কিছু উপাদান থাকে যা বাকি অন্যদের চেয়ে স্বতন্ত্র।
আমাদের অনেকেরই জীবন এখন ভার্চুয়াল আর বস্তু জগতের একটা ককটেল। এখানে সম্পর্কগুলো কি-প্যাডে তৈরি হয়, বিচ্ছেদও। টেলি যোগাযোগ, অন্তর্জাল ও সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে ঘরে বসেই অনেক সভার সভ্য হয়ে ওঠা যায়, সম্পর্ক তৈরি হয়। তেমনই আমার ‘অকপট’ পরিবার, আমার টাইমলাইনের একটা ক্ষুদ্র অংশের সাথে নিত্য ভাবের লেনদেন। তাদের সাথে অনুদিন মানসিক বেসাতি। সেই পরিসর থেকে যখন প্রামাণিক এজহারের শংসাপত্রের প্রাপ্তি ঘটে, যা শব্দের অভিঘাতে পুষ্ট, মননে প্রশান্তির কারক- তখন সার্থক হয় এই সৌহার্দময় সন্নিধান।
আমার সকল ভাই, দাদা, বন্ধু, গুরুজন, অভিভাবক সহ সকল আপনজনকে জানাই অকপট শুভকামনা।
একটি সামান্য দিন তোমাদের/আপনাদের শুভেচ্ছা, শুভকামনা, আর্শীবাদ, আদরে- অসামান্য একটা দিনে পর্যবাসিত হয়েছে। এ পরম সৌভাগ্যের, যা স্নেহ সোহাগের রঙে রাঙা হয়ে উঠেছে আন্তরিকতার লালচে ছোঁয়াতে।

সকলকে আমার তরফ থেকে আবার অনেক শুভেচ্ছা।

রবিবার, ১৪ মার্চ, ২০২১

সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়



২০২০ সালের নভেম্বর মাসের ছবি, অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ আধিকারিক সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমুলে যোগ দিলেন। সে দিতেই পারেন, কিন্তু কে এই সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়? তার জন্য ১৪ বছর পিছিয়ে যেতে হবে।


নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহন হবেনা ঘোষণা করেছিল বাম সরকার। প্রমাদ গোনে বিরোধী তৃণমুল, যাদের পেছনে পুর্ণ সহযোগিতা করছিল সঙ্ঘ পরিবার। সরকারের ঘোষনায় বিক্ষোভ রদ হয়ে গেলে বামকে হটানোর পুরো পরিকল্পনাই তো জলে যাবে। তাই লাশ চাই , লাশ। তাপসী মালিক , রিজওয়ানুরের মতই লাশ প্রয়োজন হয়েছিল। অতঃপর গুলি চললো ১৪ই মার্চ , গুলি চালনায় অভিযুক্ত হন এই সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। 

মৃত্যু হলো ১৪ জনের, যদিও তৃণমুল শহীদ বেদিতে ১৩ জনের নাম লেখে, এক হতভাগ্যের পরিচয় গোপন করে। সেই লাশের উপর ভিত্তি করে ২০১১ য় ক্ষমতায় আসেন RSS র দুর্গা। অতঃপর অবসর গ্রহনের পর সেই ১৪ ই মার্চের পুরস্কার স্বরূপ তৃণমুলে ঠাঁই পেলেন সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। আর শহিদদের পরিবারগুলির কি হলো ? কেমন আছেন তারা? নন্দীগ্রামে ভোট প্রচারে একই মঞ্চে সেই শহীদ পরিবারের সদস্যদের ও সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে "খেলা হবে" স্লোগান তুলতে পারবে কি তৃণমুল কংগ্রেস ?

শুক্রবার, ১২ মার্চ, ২০২১

শিক্ষকদের স্বার্থে সরকার ও নাগরিক সমাজ

 


মেধার অপচয় চলবেনাঃ পর্ব- ১

গোটা দেশের পাশাপাশি এই পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে করোনা নামের মহামারী গ্রাস করে রেখেছে। প্রায় অধিকাংশ মানুষই জীবন-জীবিকার জন্য সংগ্রাম করছে। কিছু মানুষ আছেন যারা আরো নিরুপায়, তেনারা পেশাগতভাবে সরকারী কর্মচারী। তারা কেউ স্কুল শিক্ষক, কেউ রেল কর্মচারী, কেউ বা অন্য দপ্তরের যারা সরকারের ৫০% হাজিরার ফরমানে ঘরে বসে আছেন, মরমে মরে।
শিক্ষকেরা কার্যত ঘরে বসে রয়েছে দীর্ঘ এক বছর প্রায়, হায়ারসেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষককুল মাঝের এক দু’মাস কর্মস্থলে ফেরার সুযোগ পেলেও অন্য শিক্ষকেরা সেই সুযোগটুকুও পাননি। মাসে ২-৩ দিন মিড-ডে মিলের বিলিবন্টন- তারপরে এক বিরাট শূন্যতা তাদের স্বাভাবিক জীবনকে তছনছ করে দিয়েছে পাহাড় থেকে সাগর। রেলও বন্ধ ছিল দীর্ঘদিন, পরে খুললেও তা অর্ধেক মাত্রার ছিল, নতুন করে আবার তা বন্ধ হয়েছে। অন্যান্য সরকারি অফিস, আদালত বহু ক্ষেত্রেই কর্মচারীদের জোর করে ছুটিতে রাখা হয়েছে। অথচ এনাদের অধিকাংশ জনই মনে প্রাণে কাজ করার জন্য মুখিয়ে আছেন, কিন্তু যেহেতু স্কুল বন্ধ বাচ্চাদের স্বাস্থ্যের প্রশ্নে, অফিস বন্ধ করোনার বিস্তার রোধ রুখতে- তাই তারা গুমরে কাঁদছেন, কর্মস্থলে আসতে না পেরে।
‘শিক্ষক সহ ঘরে বসে থাকা সরকারী কর্মচারীদের মাস মাহিনা বন্ধ করে দেওয়া হোক অথবা মাহিনা অর্ধেক করে দেওয়া হোক’ জাতীয় যে অযৌক্তিক দাবিগুলো উঠছে, আমরা তার তীব্র বিরোধিতা করছি এই পর্যায়ে। তাদেরও প্রত্যেকের সংসার রয়েছে, তাদেরও বিকল্প কোনো রোজগার নেই, তারাও অধিকাংশ জন যোগ্যতার নিরিখে চাকরিতে বহাল হয়েছেন। সুতরাং, অশালীন কিছু ভাবনা ভাবার পরিবর্তে আমরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছি ‘বিকল্প’ ভাবনার প্রেক্ষিতে। সমাজের শিক্ষিত শ্রেণী, যাদের মধ্যে মেধা, বিদ্যা, বুদ্ধি ও কর্মদক্ষতা রয়েছে তারা সরকারি কর্মচারী। এনাদের মধ্যে শিক্ষক সম্প্রদায় ফলিত জ্ঞানের আধার, তাই এই সকল সরকারি কর্মীদের গুণ কুশলতাকে বিভিন্ন বিকল্প ক্ষেত্রে কাজে লাগিয়ে সমাজকে আরও সুন্দরভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বার্থে কিছু অনন্য পরিকল্পনা করা উচিৎ। ভারতবর্ষ এতো বড় দেশ, থোরিই প্রতিটি দপ্তরে পর্যাপ্ত পরিমাণে কর্মী রয়েছে?
প্রতিজন ঘরে বসে থাকা কর্মীকে তার যোগ্যতা অনুযায়ী টেম্পোরারি অন্যদপ্তরে নিয়োগ করা হোক, সংশ্লিষ্ট সেই দপ্তরের কোন সিনিয়র অফিসারদের অধীনে। শিক্ষকেরা স্পেশাল, তাদের কোনো স্পর্শকাতর কাজে নিয়োগ করা যাবেনা। বেশিরভাগ শিক্ষক যারা কমপক্ষে স্নাতক, তারা যেহেতু পেন ধরে অথবা কম্পিউটারের কাজ করতে অভ্যস্ত তাই তাদের ঐ জাতের কাজে আগে নিয়োগ করা হোক। প্রত্যেকটি কাজের সাথে তারিখসহ স্বাক্ষর বাঞ্ছনীয়, নতুবা দুর্নীতির সৃষ্টি হবে।
প্রত্যেককে কোভিড প্রোটোকল মেনে পর্যাপ্ত সুরক্ষা গ্যাজেট ও ওষুধপথ্যের পাশাপাশি একটা বিমা করিয়ে তবে নতুন টেম্পোরারি কর্মস্থলে পাঠানো হোক। ঠিক যেভাবে স্বাস্থ্যকর্মী ও ডাক্তারেরা আমাদের সেবা দিয়ে চলেছেন। শিক্ষকেরাও কী কোনো অংশে দেশ তথা জাতির সেবার জন্য ডাক্তার- স্বাস্থ্যকর্মীদের চেয়ে কম যান! সুযোগ পেলে তারা ছাপিয়ে যাবার ক্ষমতা রাখেন।
তেমনই কিছু বিকল্প পরিকল্পনা রইল- আপনাদের ভাবনাতেও কোনো চমৎকার ভাবনা থাকলে শেয়ার করতে পারেন।
খাদ্য এবং গণবণ্টন ব্যবস্থায় নিয়োগ
~~~~~~~~~~~~~~~~~
এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর হলেও কেন্দ্র বা রাজ্যের তরফে এই দপ্তরে বিপুল কর্মী ঘাটতি রয়েছে। প্রতিবছর টেন্ডার ডেকে বহু নষ্ট হয়ে যাওয়া খাদ্যশস্য ফেলে দিতে হয়। প্রোক্রিয়োর কিম্বা গণবন্টন ব্যাবস্থা দুটতেই অনেক অনিয়ম আর দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, এই সকল শিক্ষিত মানুষদের বহাল করে এই অতিমারী কালে দপ্তরের খোলনাচল বদলে দেওয়া যেতে পারে। এখানে দারোয়ান থেকে রসায়নবিদ হয়ে অর্থনীতিবিদ সকলের জন্য স্বল্প সময়ের জন্য কাজের স্কোপ রয়েছে। সিনিয়র পুরুষ শিক্ষকদের এখানে নিয়োগ করার বন্দোবস্ত করা হোক।
স্বাস্থ্য বিভাগ
~~~~~~~~~~
স্বাস্থ্যবিভাগের ব্যাকআপ অফিসে, যেমন মেডিসিন এন্ট্রি, মেডিসিন পারচেজ এন্ড সেলস, হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে রোগী ভর্তি সহ অসংখ্য মানুষের প্রয়োজন সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট সব কাজে ঘরে বসে যেমন কাজ হয়- এমন বহু শূন্যস্থান আছে- সেগুলি মহিলা শিক্ষক ও অন্যান্য শিক্ষিত কর্মচারি দিয়ে দিয়ে পূরণ করা যেতে পারে।
নারী ও শিশু কল্যাণ বিভাগের জন্য গ্রামীণ অঞ্চলে অল্প কিছু আশা এবং স্বাস্থ্য কর্মী রয়েছে। জনসংখ্যা পিছু পর্যাপ্ত কর্মীর ভীষণ অভাব রয়েছে। এই অতিমারিকালে মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন, এর সাথে প্রসূতি ও শিশুদের বিশেষ পরিচর্যা প্রয়োজন। আপার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষাকর্মীদের ওই স্বাস্থ্যকর্মীদের সাথে জুড়ে দেয়া হোক।
এই মুহুর্তে সমাজের বুকে এক ধরনের আতঙ্ক ত্রাস করছে, মানুষ ভয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছেনা। দেশের অধিকাংশ মানুষের পড়াশোনার সাথে প্রতক্ষ্য যোগাযোগ নেই- তাদের মাঝে নানান কুসংস্কার ছড়াচ্ছে। সরকারের কাছে বিভিন্ন জরুরী পরিষেবা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত কর্মী নেই। প্রাথমিক স্কুল শিক্ষকদের তার স্কুল সংলগ্ন স্থানে অঞ্চলে সোশ্যাল ভলেন্টিয়ার এর কাজ দেয়া হোক। যারা গরীব, অসহায়, অক্ষম ব্যক্তিদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নানা ধরনের পরিষেবা দিতে সরকারের পক্ষ থেকে। সুবিধা অসুবিধাতে তাদের ফোন করবে, যাতে তারা বিপদে আপদে মানুষে পাশে থাকতে পারে সরকারের পক্ষ থেকে।
পথে ঘাটে গণসচেতনতা
~~~~~~~~~~~~~~~~~
সাধারনভাবে মানুষ মাস্ক পরছে না হাটেবাজারে, গণসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তাদের থেকে ফাইন সংগ্রহ করা হচ্ছে। কিন্তু সেটা খুবই মুষ্টিমেয় কিছু স্থানে। এই কাজে যুবক পুরুষ শিক্ষকদের নিয়োগ করা যেতে পারে, উনারা স্কুলে ছড়ি হাতে নিয়ে কাজ করতে অভ্যস্ত৷ দেশের স্বার্থে তারা রাস্তায় দাঁড়াতে মোটেই কুন্ঠাবোধ করবেননা। তাদের সাথে অবশ্যই পুলিশ থাকবে যারা শিক্ষকদের সুরক্ষা দেবে। মানুষকে মাস্কের প্রয়োজনীয়তা বোঝানো ও ফাইনের রসিদ শিক্ষকেরা কাটবে, এতে পুলিসের নামে দুর্নীতির দাগও মুছবে- কারন শিক্ষকেরা সৎ।
আইন ও আদালত
~~~~~~~~~~~~~
বিভিন্ন মহকুমা দেওয়ানি আদালত এবং ক্রেতা সুরক্ষা দপ্তরে- শুধুমাত্র অফিশিয়াল কাজকর্ম করার লোকের অভাবে বহু মামলা দীর্ঘায়িত হচ্ছে, সাধারণ মানুষ বিচার পাচ্ছেনা দিনের পর দিন। সেখানে কিছু শিক্ষকদের পাঠানো হোক, তারা কোর্ট অফিসারদের সহযোগিতা করে দেশের বিচারব্যবস্থাকে কিছুটা গতি দিতেই পারেন।
ভূমি ও রাজস্ব দপ্তর
~~~~~~~~~~~
এই দপ্তরের দীর্ঘ সুত্রিতার লাল ফাঁসের গেরোর শিকার আমরা সকলেই। ভূগোল ও অর্থনীতির শিক্ষকদের স্পেশালি এই দপ্তরে নিয়োগ করা হোক।
পর্যটন
~~~~~
রাজ্যের পর্যটনশিল্প একেবারে তলানিতে পৌঁছেছে। ভ্রমনপিপাসু কিছু শিক্ষকদের ছোট ছোট দল গঠন করিয়ে বিভিন্ন পর্যটন সম্ভাবনাময় জায়গা গুলোতে পাঠানো হোক। সেখানকার ইনফ্রাস্ট্রাকচার খতিয়ে দেখুন এবং গোটা বিষয়টার উপরে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দিক, পরামর্শ দিক- টুরিষ্টের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করে, কীভাবে সরকারের আয় বাড়তে পারে এই খাত থেকে।
লাইব্রেরী
~~~~~~
রাজ্যের প্রায় সকল লাইব্রেরীতে কর্মীর অভাব রয়েছে, নিয়মিত সংস্কারের অভাবে বই এর তাকে ধুলো জমছে। এখানে কিছু শিক্ষককে দায়িত্ব নিয়ে টেম্পোরারি নিয়োগ দেওয়া হোক। তারা গ্রামে গ্রামে লাইব্রেরীর গুরুত্ব বোঝাক, এই লকডাউনে বাড়িতে বসে বই পড়ার অভ্যাস বাড়াতে প্রচার করুক, পাশাপাশি লাইব্রেরীগুলোকে সাফাই করে আবার তার শ্রী ফিরিয়ে আনুক- প্রয়োজনে রোজের শ্রমিক করে সাফাই করে লাইব্রেরীগুলোকে আবার আবাদ করে তুলুক।
পরিযায়ী শ্রমিক এ্যাসিষ্ট
~~~~~~~~~~~~~~~~
বিভিন্ন রাজ্যে বা ভিন জেলাতে কর্মরত পরিযায়ী শ্রমিকরা ঘরে ফিরছে, অধিকাংশ শহরে ঘোষিত বা অঘোষিত লকডাউন চলছে। নানা ধরনের সমস্যা ও কষ্টের সম্মুখীন হচ্ছে সেই শ্রমিক ও তাদের পরিবারকে। শ্রম দপ্তরের অধীনে থেকে এই হতভাগ্য শ্রমিকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে সুস্থ ভাবে তাদের ঘরে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের পরিবহণ ও অন্যান্য জরুরী দপ্তরের সাথে লিয়াজো মেন্টেন করার কাজে শিক্ষিত সরকারি কর্মচারী তথা শিক্ষকদের নিয়োগ করা হোক রাজ্যের প্রতিটি প্রশাসনিক ব্লক ধরে।
বনদপ্তর
~~~~~~
বহু শিক্ষক ও সরকারী কর্মী শখের বাগান করতে খুব ভালবাসেন, তাদের বনদপ্তরের বিভিন্ন কাজে নিয়োগ করা হোক। সবুজায়ন ও বনসৃজন প্রকল্পে শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো হোক। এতে বনদপ্তরও কিছুটা অক্সিজেন পাবে, ঘরে বসে থাকা শিক্ষকেরাও কটাদিন হাঁফ ছেড়ে বাঁচবেন মুক্ত পরিবেশে।
তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর
~~~~~~~~~~~~~
এই দপ্তরেও কর্মী অপ্রতুল। রাজ্যের বিভিন্ন বিষয়ে সংগৃহীত তথ্য পঞ্জীকরনের এই এক অব্যর্থ সুযোগ, শিক্ষকের এই কাজে নিয়োগ করা হোক।
ভার্চুয়াল প্রচার
~~~~~~~~~
সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রায় প্রতিজন শিক্ষকই ভীষণভাবে অ্যাক্টিভ, তাদের নিয়ম করে সরকারি সচেতনতা প্রচার করানো হোক একটা নির্দিষ্ট দল দিয়ে। এটা স্কুল পরিদর্শকেরা মনিটর করুক।
বিবিধ সরকারি দপ্তর
~~~~~~~~~~~~~
পুরসভা, পঞ্চায়েত, জেলা পরিষদ, কর্পোরেশন, সেচ দপ্তর, দমকল দপ্তর, উদ্বাস্তু ত্রান ও পুনঃর্বাসন দপ্তর, মৎস দপ্তর, প্রাণী সম্পদ উন্নন দপ্তর, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প দপ্তর, বস্ত্র দপ্তর, প্ল্যানিং, স্ট্যাটিসটিক্স ও প্রোগ্র্যাম মনিটরিং দপ্তর সহ বহু ইমারজেন্সি দপ্তরে পর্যাপ্ত কর্মীর অভাব রয়েছে- সেখানেও শিক্ষকদের দায়িত্ব দেয়া হোক, কারন মাস্টারেরা দায়িত্ববান ও সৎ- তারাই দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলে। শিক্ষকদের হাতে এই দপ্তরের কিছু দায়িত্ব গেলে আমার বিশ্বাস এনারা একটা মসৃণ প্রশাসন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবেন।
আপনি সহমত পোষণ করলে পোষ্টটিকে শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন।

মঙ্গলবার, ৯ মার্চ, ২০২১

হিন্দু গোত্র

 


গোত্রমানব জীবনের একটি অপরিহার্য উপাদান কারণ এটি মানবের সনাতনী পরিচয় সনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়। মরা সবাই প্রপিতামহ ব্রহ্মা থেকে এসেছি, যদিও আমাদের আদি পিতা-মাতা যথাক্রমে মনু ও শতরূপা। গোত্র, যা গরুর পালকে বোঝায়, ঋগ্বেদে উল্লেখ অনুযায়ী যা একটি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত পূর্বপুরুষকে নির্দেশ করেএকটি নির্দিষ্ট গোত্রের সদস্যদের বৈশিষ্ট্যগুলি ভাগ করে নেওয়া হয়, তা সে কাজের মাধ্যমে অর্জিত হোক বা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্য

হিন্দু ঐতিহ্য অনুসারে, গোত্র হল একটি আত্মীয় গোষ্ঠীর পরিচয় যা বংশ বা বংশানুক্রমের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে মনে করা হয়। গোত্র এবং উপাধি তার পরিবারের সদস্যদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। বিস্তৃত অর্থে, এটি একক পিতৃতান্ত্রিক বা সাধারণ পুরুষ পূর্বপুরুষের বংশধরদের বোঝায়। হিন্দু ঐতিহ্যে, গোত্র বিবাহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং একই গোত্রের কাউকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ।

আমাদের প্রদত্ত নামগুলি গোত্রের পরিবর্তে ঐতিহ্যবাহী পেশা, বসবাসের স্থান বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত করে। গোত্র শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় বৈশ্যদেরই থাকে। অন্তজ্য বর্ণের গোত্র থাকেনা কারণ ঐতিহাসিকভাবে তাদের শিক্ষা অর্জনের অনুমতি ছিল না। আজ, সমস্ত বর্ণ তাদের গোত্রের স্ব-ঘোষিত নাম ব্যবহার করেগোত্র পদ্ধতি মূলত আপনার পরিবারে পৈতৃক জিন সনাক্ত করার জন্য একটি হাতিয়ার এক কথায় Y ক্রোমোজোম সনাক্তকরণতাই রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় না হলেও তাদের ভাইবোন হিসেবে গণ্য করা হ

বৈদিক শাস্ত্র অনুসারে, একটি বংশের রক্ত প্রবাহিত হয় পুরুষ পরম্পরায়। সুতরাং বংশের রক্তের ধারক ও বাহক হলো পুরুষ। সনাতন ধর্মের বংশ রক্ষার ধারায় ছিলেন প্রথম সত্য যুগের শুরুতে ব্রহ্মার মানস সন্তানদের মধ্যে অন্যতম ঋষিগণ। পরবর্তীকালে অন্যান্য ঋষির বংশ পরম্পরাও পরিলক্ষত হয়। ব্রহ্মার মানস পুত্রগণের থেকে আগত প্রতিটি বংশ এক একটি গোত্র বা রক্তের ধারায় প্রবাহিত।

বৈদিক তত্ত্ব অনুসারে, ব্রাহ্মণরা হলেন সাত ঋষির নিকটাত্মীয়, যারা ব্রহ্মার সন্তান বলে স্বীকৃত এবং যোগশক্তির মাধ্যমে গর্ভধারণ করেছিলেনমহর্ষি গৌতম, শাণ্ডিল্য, ভরদ্বাজ, বিশ্বামিত্র, জমদগ্নি, বশিষ্ট, কশ্যপ এবং অত্রিএই আটজন ঋষি থেকেই যাবতীয় ১০৮ গোত্র বিবর্তিত হয়েছে, বিশেষ করে ব্রাহ্মণদেররবার্ট ভেন রাসেলের মতে, অসংখ্য হিন্দু গোত্রের নামকরণ করা হয়েছিল উদ্ভিদ, প্রাণী এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক বস্তুর নামে এবং তাদের উৎপত্তি ছিল উপজাতীয়উদাহরণস্বরূপ, ভরদ্বাজ একটি লার্ক অর্থাৎ একটি ছোট গান গাওয়া পাখি থেকে আগত, কৌশিক কুশ থেকে, অগস্ত্য অগস্তি ফুল থেকে, কশ্যপ কচ্ছপ থেকে এবং তৈত্তিরী তিতিরকে নির্দেশ করেন।

একই গোত্রের লোকদের আত্মীয় হিসাবে গণ্য করা হয়। ফলে হিন্দু ঐতিহ্যের চর্চা অনুযায়ী  তাদের মধ্যে বিবাহ হয়না, কিছু অনুযায়ী এই ধরনের বিবাহের ফলে সন্তান বংশগত অসুস্থতা লাভ করে একই গোত্রের হওয়ায়, পিতৃতুল্য তুতো ভাইবোনদের বিবাহ করা নিষিদ্ধসংস্কৃত শব্দ সাহা উদরা, যার অর্থ সহ-জরায়ু বা একই গর্ভে জন্মগ্রহণ করা, তৎসম শব্দের উৎস হল সহোদর (ভাই) এবং সহোদারি (বোন)

 

হিন্দুদের প্রধান গোত্র তালিকাঃ

কৌশিকা, কাউন্দিন্য, মারিচি, মীন, ভৃগু, সিওয়াল, বৃহদবালা, চন্দ্রত্রে, প্রতিরোধ, কদম, অত্রি, অগস্ত্য, আলম্যান/আলম্ব্যয়ন, আত্রেয়, কাশ্যপ, মৌদ্গল্য, ভরদ্বাজ, বশিষ্ট, বৃহস্পতি, বিশ্বামিত্র, জামদগ্ন্য, শিব, ভার্গব, শান্ডিল্য, ব্যাসঋষি, ধন্বন্তরি, পরাশর, সাবর্ণ, কাত্যায়নী, গৌতম, ঘৃতকৌশিক, নাগঋষি, চান্দ্রায়ণ, বাঘ্রঋষি, হোবি ঋষি, বাতস্য, বৃদ্ধি, কৌন্ডল্য, শুনক, কৃষ্ণাত্রেয়, জাতুকর্ণ, কাণ্ব, কুশিক, আঙ্গিরস, গর্গ, বিষ্ণু, শক্তি

 

অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তামিলনাড়ুর মুদিরাজাদের ২৬০০টি গোত্র আছেজা এবং রাজপুতদের ৩০০০টি গোত্র আছেবেশিরভাগ হিন্দুদের কাছে, গোত্র সর্বদা পিতা থেকে সন্তানের কাছে চলে আসে। অন্যদিকে, মালয়ালি এবং তুলু সম্প্রদায়ের লোকেরা এটি মা থেকে সন্তানের কাছে চলে আসে

একই গোত্রে চারটি বর্ণে থাকতে দেখা যায়। কারণ, একই ঋষির সন্তানরা একেক সময়ে একেক কাজে মনোযোগী হয়ে থাকে। যে শাস্ত্র অধ্যয়ণ বা বুদ্ধিভিত্তিক জীবিকা অবলম্বন করে সে ব্রাহ্মণ হিসেবে, রাজধর্ম পালনকারী ক্ষত্রিয়, ব্যবসা-বাণিজ্যে মনোযোগী হলে সে বৈশ্য এসব পেশাগত লোকদের সেবা করেই সন্তুষ্ট অর্জনে আগ্রহীরা শূদ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে থাকে। এ গুণাবলীসমূহ কেউ জন্মে প্রাপ্ত হয় না, অর্জন করতে হয়। তাই বর্নাশ্রম সঠিক সটঠিক হলেও বর্ণপ্রথা ভুল ও মিথ্যা


সোমবার, ৮ মার্চ, ২০২১

যারা আজকের তৃনমূল তারা প্রত্যেকেই আগামীর বিজেপি

 

আজকে মালদহে কার্যত গোটা তৃনমূল দলটাই বিজেপিতে রুপান্তরিত হয়ে গেল। আজ আরো একবার প্রমাণিত হয়ে গেল- যারা আজকের তৃনমূল তারা প্রত্যেকেই আগামীর বিজেপি।
তৃনমূল দলের জন্মলগ্ন থেকেই মমতা ব্যানার্জী বহু যত্ন করে কংগ্রেস ত্যাগী মমতাপন্থীদের বিজেপির ঝাণ্ডা ধরতে শিখিয়েছিলেন অনেক সময় নিয়ে। অগ্নিকন্যা, সততার প্রতীক, অনুপ্রেরণা, মা-মাটি-মানুষ, দিদিকে বলো ও শেষমেশ ‘বাংলার নিজের মেয়ে’- বিক্রিত মিডিয়ার প্রত্যক্ষ মদতে নিজেকে নানা ব্র্যান্ডে বিকোতে মমতার জুড়ি মেলা ভার; আর এতে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছিল RSS, যার জন্য তৃনমূলের ২০২১ প্রার্থী তালিকাতে ১৪ জন সঙ্ঘের নেতাকে রাখতে বাধ্য হয়েছে। এই সঙ্ঘ ঘনিষ্টতা আগেও ছিল, কিন্তু ‘দিদি’ আবেগের বিস্ফোরণে এগুলোকে কেউ দেখতেই চাইনি।
হুগলীর চাঁপদানি বিধানসভা থেকে ২০১১ সালে মুজাফফর খানকে MLA করে এনেছিল মমতা ব্যানার্জী। তারও আগে ২০০১ সালে বেহালা পুর্ব কেন্দ্র থেকে পরশ দত্তকে বিধানসভাতে স্থান দিয়েছিল মমতা ব্যানার্জী, ২০১১ ও ২০১৬ সালে এই পরশ দত্তই তৃনমূলের টিকিটে জিতেছিল জগদ্দল বিধানসভা কেন্দ্র থেকে। এই দুজনের পরিচয় জানেন? এরা দুজনেই ঘোষিত RSS কর্মী। পশ্চিমবঙ্গ থেকে যে করসেবকের দল বাবরি মসজিদ ভাঙ্গতে গিয়েছিল, সেই দলে এই দুজনেই ছিল ঘোষিত ভাবে। সুতরাং মমতা ব্যানার্জি অত্যন্ত সুক্ষ ভাবে দলের মাঝে গেরুয়া চাষ করেছিলেন। আজ রাতারাতি কেউ বিজেপিতে যাচ্ছেনা, এদের মাঝে গেরুয়ার বীজ বহু আগে থেকেই রোপন করেছিলেন ‘হিজাবধারী’ মমতা। খোদ শুভেন্দু বা দীনেশ ত্রিবেদীর আজকের স্বীকারোক্তি এ বিষয়ে প্রামাণ্য দৃষ্টান্ত স্বরূপ।
এভাবেই ক্রমে ক্রমে যারা তৃণমূলের নিচুস্থরের নেতা কর্মী ছিল তারা গেরুয়াতে নিজেকে আর অচ্ছুৎ মনে করেনি, এভাবেই গোটা তৃনমূলটাকে RSS আদর্শে দীক্ষিত করার কর্মসূচী চালিয়ে এসেছে বিগত দুটো দশক ধরে। আজকে যারা দেখছেন সকালে তৃনমূল আর বিকালে বিজেপি- আসলেই এরা RSS এর প্রোডাক্ট, মানুক বা না মানুক- সত্য বদলাবেনা। একারনেই বিজেপিতে যেতে তৃণমূল নেতাদের সামান্যতম চক্ষুলজ্জার প্রয়োজন হচ্ছেনা, নীতি আদর্শের মতো জটিল বিষয়ে নাইবা গেলেন। এই একটা বিষয়ে অতিবড় বাম সমর্থক বা বাম নেতাও মানবেন যে, এটা কেবলই তাঁর একান্ত অনুপ্রারণার ফসল। লাগাতার পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটু একটু করে RSS এর চাষ করেছে, কোথাও শাখা খুলতে দিয়ে তো কথাও সরস্বতী বিদ্যামন্দিরের নামে। মজা হল, গোটা তৃণমূল দলটাই আসলে আজকের বিজেপি আঁতুড়ঘর সেটা আজ প্রমাণিত। বিজেপিকে আজকে আর আলাদা করতে পারবেননা, প্রাক্তন তৃণমূলী বাদ দিলে বাংলাতে বিজেপি বলে কেউ নেই করেক পিস জোকার ছাড়া।
আজকের দিনে দাড়িয়েও যে সকল চটিচাঁটা গাম্বাট ‘আদর্শ-নীতি’ ইত্যাদির বুলি কপচায়, তাদের মুখে অনুপ্রেরণার চটি ছুঁড়ে মারুন, আর প্রশ্ন করুন- গান্ধীবাদী দলের ভেকধারী তৃণমূল নেতা মন্ত্রী সান্ত্রীরা কোন আদর্শে দীক্ষিত হয়ে- টিকিট পেয়ে অথবা না পেয়ে এই ভোটের মুখে গান্ধীর খুনী গডসের দলে নাম লেখায়?
আপনার ভোটটি নিশ্চিত গুরুত্বপূর্ণ। আপনি বিজেপি সমর্থক হতেই পারেন, ভারতীয় সংবিধানে আপনি রাষ্ট্র স্বীকৃত দল বুক ফুলিয়ে করুন। কিন্তু যারা নাকি বিজেপির বিরুদ্ধে, কিন্তু বিশ্বাস করেন ‘বিজেপিকে’ রুখতে তৃণমূলকেই ভোট দেবেন- জেনে নিন, আপনি নিজেও একজন বিশুদ্ধ প্রো বিজেপি। কারন আপনার ভোট পাওয়া তৃণমূল জনপ্রতিনিধিটা কালকেই যখন বিজেপিতে চলে যাবে- তখন আপনার সন্তানকে ১০০০ টাকা সিলিন্ডার রান্নার গ্যাস আর ১০০ টাকা লিটার পেট্রলের দামের জবাবদিহি করতে হবে। লক্ষবার জয় শ্রী রাম বললেও- এসবের দাম কমবেনা বা আপনার আয় বাড়বেনা। আপনাকেই জবাবদিহি করতে হবে- কোন কারনে নোটবন্দি করে দেশকে খাদের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল? কেন প্রতিদিন দেশের সম্পত্তি বেনিয়াদের কাছে বেচে দেওয়া হচ্ছে, কেন পরিযায়ীরা হেঁটে ফিরেছিল? পাকিস্তান জুজু, মুসলমান জুজু আর রামনামে আপনার কি লাভ হয়েছে?
আপনাকেই জবাব দিতে হবে, কেন মেলা খেলার নামে রাজ্যের দেনা আজ এই পরিমাণে, কেন আজ চতুর্দিকে চালচর আর কাটমানি খোরেদের মেলা? কেন আজ রাজ্যে শিল্প নেই, কেন আজ রাজ্যে পুলিস দলদাস, কেন রাজ্যে চাকরি নেই, কেন রাজ্যের শ্রমিকেরা পরিযায়ী হয়ে অন্য রাজ্যে যায়?
পারবেন আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জবাব দিতে? পারলে তৃণমূল কেন- সরাসরি বিজেপিকেই ভোট দিন, ঘোমটার আড়ালে খ্যামটা না নেচে হিম্মৎ জুটিয়ে বিজেপির ঝাণ্ডা ধরুন। ডবল ইঞ্জিন সরকার ত্রিপুরাতেও এসেছিল- ফলাফল নেট ঘেঁটে দেখে নিন। আসামের ডিটেনশন ক্যাম্পে হিন্দুরাই বেশি সংখ্যাতে ছিল, দেশের বিজেপি শাসিত রাজ্য গুলোতে সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার গরীব হিন্দুরাই। আপনি দেশপ্রেমের কাজল পরে স্বপ্নে রয়েছেন, কাল স্বপ্নদোষ হবেই- আর তখন নিজের পরিবারেই মুখ দেখাতে পারবেননা, লিখে নিন।
আর আপনি যদি মুসলমান হন তাহলে তো সোনায় সোহাগা। NRC ক্যাম্পে বসে ভাবার অনেক সুযোগ পাবেন। প্রসঙ্গত, মান্নীয়াই সংসদে বাংলাতে সর্বপ্রথম NRC এর দাবী উত্থাপন করেছিলেন। এখানেও RSS এর এজ্যেন্ডার সফল প্রয়োগ হয়েছিল, আপনি মুসলমানের ত্রাতা ভেবেছিলেন মমতাকে, আজ আপনি ভুগবেননা তো কে ভুগবে? হাজার হোক আপনার একটা গালভরা পরিচয় যে আছে- ‘দুধেল গাই’। আর কিছু না হোক, বিজেপির ষাঁড় আপনাকে পাল দিয়ে যাবে গোয়ালে নিয়ে গিয়ে। এটাই আপনার প্রাপ্তি।
তাই আজকেই ভাবুন, এখনি, এই মুহুর্তে- আপনি সত্যিই কি বিজেপি বিরোধী?
যদি তাই ই হয়, তাহলে আপনি ও আপনার পরিবার এবার জোটে ভোট দেওয়ার দৃঢ় সংকল্প নিন। জোটই অন্ন-বস্ত্র-কর্মসংস্থান ও সুপ্রশাসনের জন্য আপনার হয়ে লড়াই এর জন্য দায়বদ্ধ।

প্রতিবারের ভুলের ক্ষমা হয়না, এবারে কাঠ খেলে আপনাকেই ফার্নিচার হাগতে হবে- এটা মাথায় রাখবেন, ব্যাস।

বুধবার, ৩ মার্চ, ২০২১

বিরিয়ানি ও বাঙালির খাদ্য বিবর্তন

 

 

(১)

অকপট নিয়ে যখনই কেউ কিছু বলে তার সাথে বিবিধ বিষয় জড়িয়ে থাকে। ব্যক্তি আমরা, সাহিত্য পত্রিকা, ভ্রমণ, নিজেদের মাঝের বন্ধুত্ব, আড্ডা, রাজনৈতিক খেউর ইত্যাদি; কিন্তু সব কিছুকে ছাড়িয়ে গিয়ে যেটা একান্ত পরিচয়বাহক হয়ে উঠেছে সেটার নাম রকমারি বাহারি খাদ্যসম্ভার। নির্দিষ্ট করে বললে, তা হলো বিরিয়ানি। বিরিয়ানি আর অকপট কোথাও যেন একটা সমার্থক হয়ে উঠেছে, অথচ গ্রুপের সদস্যসংখ্যার বিচারে খাদ্য গ্রুপগুলোতে, সাহিত্য গ্রুপ কিম্বা ভ্রমণ গ্রুপে বিরিয়ানি নিয়ে অনেক বেশি পোস্ট হয় অকপটের তুলনাতে, মনোজ্ঞ লেখাও আসে সেসব গ্রুপে- কিন্তু গ্রুপের সাথে বিরিয়ানির এতটা আত্মীকরণ, অকপট ছাড়া কারও সাথে এতটা ঘটেছে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে

বিরিয়ানি আমাদের জীবনের সাথে এমন ভাবে মিশে গেছে যে, কোনো কিছু বিশেষ দিন হোক বা না হোক বিরিয়ানির আগমনই যেন সেই দিনটিকে বিশেষ করে তোলে। প্রথমে ছিল শুধুই বিরিয়ানি, এখন তার কতইনা ঘরানা। কোলকাতা, দিল্লী, হায়দ্রাবাদি, লক্ষ্ণৌ, কাশ্মীরি, অওয়ধি, লাহোরি, বোম্বাই কত্তো কি। আবার আলু থাকা না থাকা, ডিম থাকা না থাকা, মাংসের সাইজ, চালের সুগন্ধ ও টেক্সচার, মশলার ভিন্নতা ইত্যাদি ভেদে বিরিয়ানি নানা গোত্রের হয়ে থাকে, এদের কৌলিন্য নির্ভর করে স্থানীয় ঐতিহ্যের উপরে। বিরিয়ানির হাঁড়ি আসলে স্বাদের আস্ত উৎকৃষ্ট রাসায়নিক ফলিত প্রয়োগশালা। এতে শিল্প আছে, সাহিত্য আছে, অঙ্ক আছে, বিজ্ঞান আছে, ভূগোল, ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি- সব সব সব আছে। বিরিয়ানি নবীন প্রেমিকার মতো মাতাল করা উচ্ছল আস্বাদের, তবে যখন ওটা পুরাতন গৃহিণীর মতোই উষ্ণ থাকে তখন। বিরিয়ানির আঘ্রাণেই মুখে এত পরিমাণ লালার উদ্রেগ হয় তাতে অনায়াসে ডিঙি ভাসিয়ে দেওয়া যায়। মিঠা আতরের সুবাসে ফুসফুসের আয়ুবৃদ্ধি ঘটে। একদৃষ্টে বিরিয়ানির দিকে চেয়ে থাকলে প্রবৃত্তির নিবৃত্তি ঘটে। একপ্লেট বিরিয়ানি শুধুই খাদ্যবস্তু নয়, একটা তীর্থস্থল- যাকে চুম্বনের দ্বারা ছুঁলে পূণ্যার্জন হয়। এগুলো সবই আমার দর্শন।

বন্ধুবর ইন্দ্রর এক অমোঘ উক্তি আছে এই বিষয়ে, “বিরিয়ানি মানেই একটা অনিশ্চয়তার দোলাচল। অতি বড় বাবুর্চিও জানে না দম থেকে নামাবার পর শুকিয়ে যাওয়া আটার চাঙড় খুঁটে ভিতর থেকে কী বের হবে। প্রতিবার একই উপকরণ, একই মশলা, একই স্থান, একই পাতিল, একই ব্যক্তির রন্ধনশৈলী- তবুও প্রতিদিনের স্বাদ পৃথক হয়ে যায়, দুটো হাঁড়ির স্বাদেও ফারাক এসে যায়। এই কারণেই বিরিয়ানি এত সুস্বাদু”। বিরিয়ানি মানে অদ্ভুত সুগন্ধের মাঝে গোটা গোটা মশলায় সেজে ওঠা, সরু লম্বা শুভ্র সুগন্ধি মেদহীন ঘি মাখা ভাতে- জাফরানের সোহাগ মাখা হলুদ রঙের উপরে তুলতুলে মাংসের কুটুম্বিতাই শুধু নয়; বিরিয়ানির অর্থই হলো ধৈর্য, অধ্যাবসায়, মনোঃসংযোগ আর একরাশ অনিশ্চয়তা- এটাই বিরিয়ানির আসল স্বাদের রহস্য

জনসংখ্যাতাত্ত্বিক অঞ্চল ভেদের বাইরেও বিরিয়ানির একাধিক উপবিভাগ রয়েছে। যেমন কোলকাতার রয়্যালের স্বাদের সাথে আমিনিয়া বা আরসালানের স্বাদের অনেক ফারাক। তবে কোলকাতা বিরিয়ানি মানে শুধুই উপরের তিনটে নয়, কলেজ স্ট্রিটের সুফী, দমদম-নাগের বাজার ও বেহালার হাজী, নিউ মার্কেটের মস্তান, সল্টলেকের চাচাজান আর গলৌট, সেলিমপুরের তন্দুর, রিপন স্ট্রিটের হাণ্ডি, রাজাবাজারের তাজ, রুবির মনজিলাত কিম্বা বেনেপুকুরের জমজম- প্রতিটির স্বাদ ইউনিক। এর বাইরেও স্বাদের এমন জীবন্ত প্রতিষ্ঠান কম কিছু নেই, সে সবের তালিকা দিলে একটা গোটা উপন্যাস হয়ে যাবে

রাজ্যের বাইরে বলতে গেলে দিল্লীর করিমসের বিরিয়ানির স্বাদ ৫ বছর পরেও জিভে লেগে থাকে। হায়দ্রাবাদ গেলে সকলেই প্যারাডাইস খোঁজে, কিন্তু চারমিনারের কাছে সাদাবের বিরিয়ানির স্বাদ যে অমৃত কুম্ভের সন্ধান। বোম্বের লোখান্ডওয়ালার চাচার বিরিয়ানি হাসতে হাসতে দু'প্লেট শেষ করে দেওয়াই যায়, এতটাই সুস্বাদু। মহীশূরের আন্ধা ঘরানার নবাবি বিরিয়ানিতে পুদিনা পাতার ব্যবহার যেন জীবন্ত এক শিল্পকলা। সেবার সুব্রতদার সাথে লক্ষ্ণৌ গিয়ে আমরা সারা শহর জুড়ে তারিয়ে তারিয়ে হরেক ধরনের বিরিয়ানির স্বাদ নিয়েছিলাম সপরিবারে। প্রতিটাই অনবদ্য, স্বাদে-গন্ধে-বর্ণে।

জীবনের একটা অধ্যায়ে রপ্তানি বাণিজ্যের সাথে যুক্ত থাকার সুবাদে বিদেশ গমনের সুযোগ ঘটেছিল। বর্তমানে পর্যটন ও হোটেল ব্যবসার সাথে যুক্ত, আমাদের রেস্টুরেন্টেও বিরিয়ানি বানানো হয়। সেই সুবাদে ইরানি বিরিয়ানি, কাবুলি বিরিয়ানি, মদিনা বিরিয়ানি, বাগদাদি বিরিয়ানি, পাখতুনি বিরিয়ানি, তুর্কি বিরিয়ানি, মিশরি বিরিয়ানি, লেবাননি বিরিয়ানি, ইয়েমেনি বিরিয়ানি, নেপালি বিরিয়ানি সহ নানা স্বাদের পরখ করার সুযোগ পেয়েছি জীবনে। এগুলোতে ভাল বা মন্দের বিচার করা যায় না, কারণ প্রত্যেক দেশের নিজস্ব রন্ধনশৈলীতে নিজস্ব মশলা ও পাকপ্রণালীর বিশেষত্ব থাকে, সেটা বিদেশী জিভে ভাল না লাগতেও পারে। পশ্চিম ইরাক, কুর্দ, জর্ডন ও জেরুজালেম শহরের বিরিয়ানিতে কচি বেগুন দেয়, যেমন আমরা আলু দিই। খেতে বেশ লাগে। তবে বিদেশী বিরিয়ানির স্বাদের বিচারে ঢাকার কাচ্চি বিরিয়ানির তুলনা নেই

একগ্লাস বাদাম শরবতের স্টার্টার দিয়ে শুরু করে, কম তৈলাক্ত চিনিগুঁড়া চালের সাথে ছোট্ট ছোট্ট নরম ঢোলা মাংস, যা মুখে দিলেই হাড় থেকে খুলে আসে, সাথে বুরহানি আর ফিরনি- শুধু এই পদটা খেতেই বারেবারে ঢাকা যাতায়াত করা যায়। তবে সব ভালর চেয়েও ভাল আমার ঘরণী রুমির হাতের নিজস্ব ঘরানার বিরিয়ানি, সাথে পাতলা কাচুম্বর বা ঘন রায়তা। কিছুটা কোলকাত্তাইয়া, কিছুটা কাশ্মীরি, কিছুটা হায়দ্রাবাদি- বাকিটা রান্নার প্রতি অসীম প্রেম, যার দরুন যেকোনো ছুতোনাতায় “আজ না হয় বিরিয়ানিই হয়ে যাক” হরদম লেগেই আছে আমাদের সংসারে। এই জন্যই বলে, উপরওয়ালা জুড়ি মিলিয়েই পাঠায়

উইকিপিডিয়াতে পড়েছিলাম, দ্বাদশ শতকের ‘নৈষধ চরিত’, চতুর্দশ শতকের ‘প্রাকৃত পৈঙ্গল’ এবং বৌদ্ধ সহজিয়া গান ‘চর্যাপদ’, মধ্যযুগীয় মনসামঙ্গল, অন্নদামঙ্গল, চৈতন্যচরিতামৃত হয়ে খনার বচন- সর্বত্রই বাঙালির রন্ধনশৈলীর কিছু কিছু বিবরণ রয়েছে। অর্থাৎ খাদ্য নিয়ে আজকের প্রজন্মই যে লিখছে তা নয়, সেকেলের একচুয়াল লেখনীচর্চা গ্রুপগুলোতেও খাদ্যচর্চা জমিয়েই হতো, নতুবা তা কখনও লেখনী শিল্পে আসত না। ধরে নেওয়া যেতেই পারে, সেযুগেও যদি বিরিয়ানি থাকত- নিশ্চিত চর্যাপদে এমন কিছু লাইন থাকতই-

রান্ধি বিরিয়ানি ব্যঞ্জন পরাণ হরষিত,

ছাগমৃগ মাংসে কাবাব অকপট সচকিত”

আধুনিক যুগে ব্যাঞ্জনসাহিত্যের ইতিহাস মাত্র দুশো বছরের কুলীন। খাদ্যপ্রনালী ও রন্ধনচর্চার উপরে আধুনিক বাঙালি সেভাবে কিন্তু লেখেনি। ‘ইতিহাস’ নামের একটা অনলাইন ব্লগ থেকে যেটা পেলাম, হুবহু তুলে দিলাম- ‘১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বেশ্বর তর্কালঙ্কার ভট্টাচার্যের ‘পাক্‌ রাজেশ্বর’, ১৮৫৮ সালে গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশের ‘ব্যঞ্জন রত্নাকর’। তবে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করছিল বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়ের ‘পাক-প্রণালী’। পুরুষদের পাশাপাশি বাঙালি ‘ভদ্রমহিলা’রাও রান্নার বই লিখতে শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী তথা ‘পুণ্য’ পত্রিকার সম্পাদিকা লেখেন ‘আমিষ ও নিরামিষ’ নামে একটি বই। কিরণরেখা রায় লেখেন ‘বরেন্দ্র রন্ধন’। রেনুকাদেবী চৌধুরানী লিখেছিলেন ‘রকমারি নিরামিষ রান্না’ আর ‘আমিষ খণ্ড’

 (২)

আমাদের ছোটবেলা মানে নব্বই এর দশক বা এই নতুন শতকের প্রথম দশকটাতেও বিরিয়ানির এমন একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল না বঙ্গজীবনে। বিরিয়ানি যে আগে ছিল না তা নয়, চিৎপুরের রয়্যাল কিম্বা কোলকাতা পুরসভার কাছে আমিনিয়া তো তীর্থস্থানে মতো ছিল- বছরে এক-দুবার যেতে পারলেই নিশ্চিত মোক্ষলাভ। এখন হলে-মলে তো ছাড়, যে কোনো বাহানাতেই বিরিয়ানি ঢাকে কাঠি পাহাড় থেকে সাগর। পাড়ায় মোড়েতে লাল সালুতে ঢাকা পেতলা বা ডেকচি, এলাকা ভুরভুর করে মিঠা আতরের গন্ধে। মূলত বিরিয়ানির হাত ধরেই তুর্কি, ফার্সি তথা মধ্য এশিয়ার খাদ্যশৈলীতে ছেয়ে গেছে মাছে ভাতে বাঙালির খাদ্যতালিকা। বিরিয়ানির সাথে সাথেই হেঁসেলে ঢুকেছে কিমা, কাবাব, চাপ, রেজালা, ভুনা, হালিম, ভর্তা, কোর্মা, কালিয়া, নিহারি, পায়া, পসিন্দা, রোগান জোশ, রেশমি বোটি, কোফতা, টিকিয়া, মুসল্লম, ফালুদা, বরফি, ফিরনি, শিরখুর্মা, আরও কত কী! সনাতনী বাঙালিয়ানার বাইরে- থুড়ি, এখানেই প্রশ্ন উঠবে সনাতনী বাঙালিয়ানা কী!

আমরা অনেকেই বলব, ডাল, আলুপোস্ত আর চারটি গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত, এই তো আমাদের বাঙালি ঐতিহ্য। কিন্তু পঞ্চদশ শতকের আগে পোস্তর নামটারই অস্তিত্ব ছিল না বঙ্গজীবনে, মুঘলরা মশলা হিসাবে পোস্ত এনেছিল এদেশে। আলু এসেছিল পর্তুগীজদের সাথে আর ডাল এসেছে মধ্য ভারত থেকে মূলত বর্গিদের হাত ধরে। তাহলে হাতে রইল পেনসিল। মাছ-ভাত, বলতে গেলে এই দুটোই আদি তথা অকৃত্রিম বাঙালি খাদ্য, বাকি সবই বদলেছে সময়ের সাথে। মাছের রন্ধনশৈলীও বদলে ৩৬০ ডিগ্রী কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করেছে সময়সারণি জুড়ে। বর্ণপ্রথায় জর্জরিত সংখ্যাগরিষ্ঠ বঙ্গ হিন্দুসমাজে প্রাক মধ্যযুগীয় বঙ্গনারীর হেঁসেলে খুব বেশি বিকল্প ছিল না। আইনের সবকিছুই উচ্চবংশীয় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়দের জন্য সীমাবদ্ধ ছিলতারাই মূলত অর্থবান হতো, তাই ধর্মীয় অনুশাসন তাদের সাজত। এক পেট খিদে নিয়ে ধর্মের গানে ঘুম আসে না, তাই নিম্নবর্গীয় কায়স্ত হোক বা শূদ্র তথা দরিদ্র নিম্নবিত্ত কৌম সমাজে ধর্মীয় বেড়াজালের বাইরে একাধিক খাদ্যের বিকল্প ছিল। সমস্যা ছিল আর্ত আর বিধবাদের, যা আজও কিছুটা আছে বৈকি গ্রাম্য হিন্দুসমাজে

খ্রীস্টপূর্ব ময়ূর সাম্রাজ্য থেকে, শক, হুন, কুষাণ হয়ে গুপ্তযুগ পর্যন্ত বাঙালির কী যে খাদ্যাভ্যাস ছিল সেটা বড় গোলেমেলে একটা বিষয়, গোলেমেলে এই জন্য- কারণ তখন আজকের ফর্মের এই বাঙালি জাতিটারই অস্তিত্ব ছিল কিনা কে জানে! বারেবারে হানাদারেদের আক্রমণ ঘটেছে সিন্ধু-গাঙ্গেয় অঞ্চলে, নিশ্চয় সেই সময়েও খাদ্যের পরিবর্তনও এসেছিল প্রতিবার। কিন্তু তা লিপিবদ্ধ নেই, তাই জানার সুযোগ নেই। এক্কেবারে শুরুর যুগে যা ছিল তা মূলত আর্য-অনার্যের দ্বন্দ্ব- সেই দ্বন্দ্ব যে খাদ্যাভাসেও থাকবে তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। প্রথমে মুসলমান ও পরে ইউরোপীয় নানা হানাদার জাতির প্রাদুর্ভাবে বাঙালির রান্নাঘর ক্রমশ সম্পৃক্ত হয়েছে, বিকল্পের দ্বারা সমৃদ্ধ হয়েছে- লিখিত ইতিহাসের দরুন এটা জানা যায়।

এই খাদ্য সম্প্রীতিকে আপন করতে অবশ্য দণ্ড কিছু কম দিতে হয়নি ইতিহাসের এই দীর্ঘপথকে, আজও গোমাংস ভক্ষণের শাস্তি গণপিটুনিতে মৃত্যু, কিম্বা হালাল মাংস বিনা একটা বড় জনগোষ্ঠী- মাংস ছোঁয় না অবধি। প্রাচীন বঙ্গীয় সমাজে সকালে হবিষ্যান্ন সেবন করে গঙ্গাজল দিয়ে আচমন করে তিনবার ‘তৈলাধার পাত্র কিম্বা পাত্রাধার তৈল' মন্ত্র উচ্চারণ করা সমাজপতিরা মহা অধ্যাত্মতেজে মুনি ঋষিদের মতো টেলিস্কোপিক নজর দিয়ে গোটা সমাজের খাদ্যাভ্যাসের প্রতি কড়া নজর রাখত, বিশেষ করে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের উপরে। স্মার্তরা কখনই অন্ত্যজ শ্রেণীর রোজনামচার উপরে দৃষ্টিক্ষেপ করতে ততটা উৎসাহী ছিলেন না। আজ এই অনুপরিবার কাঠামোতে অন্তর্জালময় ইথারীয় জীবনে কে যে কী খাচ্ছে তা পাশের মানুষটি অবধি জানতে পারে না- সোস্যালমিডিয়াতে ছবি পোষ্ট করে নিজে জানান না দিলে

অনার্য তথা শুদ্ধ ভারতীয় আদিবাসী খাদ্যশৈলীতে ভাতের গুরুত্ব ছিল সর্বাধিক, তা গরম হোক বা গেঁজানো। এর বাইরে নানান ফলমূল, কন্দ, বাঁশ, শাকপাতা, বুনো মাশরুম, দুগ্ধজাত সামগ্রীর সাথে সাথে শিকারকৃত মাছ ও প্রাণীজ মাংসের একটা বিস্তৃত বিকল্প ছিল। গেঁড়ি, গুগলি, সাপখোপ, পাখি, বাদুড় কিছুই বাদ দিত না সস্তার আমিষে নিজেকে পুষ্টি দান করতে। স্বভাবতই নিজেদের উচ্চ জাতি ভাবা আর্যরা- অনার্যদের প্রতিটি খাবারকে বর্জন করেছিল স্মৃতিশাস্ত্রে, যা আজও বহমান। এদের চিকিৎসা ব্যবস্থাটার গোটাটাই দাঁড়িয়েছিল বা আছে ভেষজ খাদ্যাভ্যাসের উপরে। খুব ভুল না হলে যাযাবর আর্যদের আয়ুর্বেদের হাতেখড়ি অনার্যদের ভেষজ খাদ্যচর্চা থেকেই। আজও আদিবাসী সংস্কৃতিতে খাদ্যাভ্যাসের তেমন কিছুই পরিবর্তন সংগঠিত হয়নি, প্রায় আদি অকৃত্রিম রয়েছে। আমাদের ভারতীয় বাঙালি সমাজ আদিবাসীদের অবশ্য বাঙালি বলে স্বীকৃতিই দেয় না। সেই অর্থে বলতে গেলে আদিবাসীরা সংখ্যাতে সত্যিই অনেক কম, দুই পার মিলিয়ে বাঙালিদের মধ্যে মুসলমানেদের সংখ্যাই ৭০% এর বেশি- অথচ পশ্চিমবঙ্গীয় হিন্দুসমাজে কমিউনিস্ট বাদে প্রায় সকলেই ‘বাঙালি মানে’ শুধুই হিন্দু ধর্মীয় সম্প্রদায়কেই বোঝে- নতুবা শুনতে হতো না “ওহ, আপনি মুসলমান, আমি ভেবেছিলাম বাঙালি”।

 ()

আহার কয় প্রকার, এটা জানতে হবে। কারন আমরা খাদ্য গ্রহনই করি আহার তথা জঠরাগ্নি নিবৃত্তির জন্য। শাস্ত্র বলছে- গঠনগতভাবে আহার দুই প্রকারের- স্থুল আহার ও সূক্ষ্ম আহার। স্থুল আহার ক্ষুন্নিবৃত্তি করে, এ থেকে মলমুত্র সহ ৩২ প্রকারের অশুচি উৎপাদিত হয়। আর সূক্ষ্ম আহার জঠরাগ্নিকে প্রজ্বলিত রাখে ও দেহ গঠিত করতে সাহায্য করে, এ থেকে তেজ বা শক্তি উৎপন্ন হয়। আহারে যে নিবৃত্তি লাভ হয় তা মূলত চার প্রকারের- প্রথম- ইন্দ্রিয় দ্বারা ভক্ষণ, যা অন্তরে সুখবেদনার সঞ্চার ঘটিয়ে মনকে উজ্জীবিত করে তোলে, চিত্ত বিশুদ্ধ হয়। দ্বিতীয়টি স্পর্শভক্ষণ, এতে হাতে করে খাদ্যদ্রব্য ছোঁয়া থেকে শুরু করে দাঁত দিয়ে চূর্ণ করে মলাশয় অবধি পৌঁছানো অবধি এই প্রক্রিয়া চলে। তৃতীয়ত- কবলীকার ভক্ষণ, তুমুল ক্ষুধাতৃষ্ণাক্রান্ত ব্যাক্তি হিতাহিত শূন্য হয়ে যখন গোগ্রাসে খাদ্য গ্রহণ করে তখন তার বৌদ্ধিক জ্ঞান লুপ্ত হয়, একেই কবলীকার আহার প্রণালী বলে। চতুর্থত হচ্ছে সুষম বা বিজ্ঞান আহার, যার মাঝে উপরোক্ত তিন ধরনের আহারের সুষম বন্টন থাকে।

যদি বলে খাদ্যের মূল বিভাগ কি! উত্তরে একটাই শব্দ আসবে- রুচি। যার যেমন রুচি সে তেমন খায়, আর এই রুচি তৈরিতে অনেকটা ভূমিকা থাকে পারিপার্শ্বিক সমাজ ও ধর্মীয় বিশ্বাসের। বাঙালির মাঝে ইসলামায়নের পূর্বে ধরে নেওয়া যায় তারা সকলেই হিন্দু ছিল, সুতরাং সেই সমাজ আজ হিন্দু-মুসলমানে আড়াআড়ি ভাগ হলেও জিনগত রুচির বিলোপ ঘটেনি। শুধুমাত্র মুসলমান বলেই কেউ খুব বেশিদিন উত্তরপ্রদেশের আলিগড় কিম্বা আরবের মক্কার কোনো ঘরে দুদিনের বেশি তাদের স্থানীয় খাবার নিতে পারবেনা। সমস্ত স্বত্বা তখন ভাত ভাত করে আকুল হয়ে যাবে। বসিরহাটের হিন্দু ভাইটি ওপাড় বাংলার হানিফ শেখের বাড়িতে চাট্টি ভাত খেয়ে যতটা শান্তি পাবে, রাজস্থানের স্বজাতীয় কোনো হিন্দু বাড়িতে মোটেই সেই তৃপ্তি আসবেনা। তবে ধর্মীয় কারনে কারো রুচিতে গোমাংস পাপ, তো কারো রুচিতে গেঁড়ি গুগুলি সাপ- এভাবেই ধর্ম রুচিকে নিয়ন্ত্রণ করে সংক্ষিপ্ত করে দেয়।

আজকের ট্যেকস্যাভি প্রজন্মের কিশোর-কিশোরীরা যাদের জন্ম নতুন শতকে, ইন্টারনেটের কল্যাণে তারা বিশ্বনাগরিক। জনপ্রিয় কার্টুন আর বিজ্ঞাপনের দৌলতে তাদের নিজস্ব কোনো খাদ্যরূচিই নেই। তারা সপ্তাহে একবেলা ‘রাইস’ খায়, সকাল ১০টায় ব্রেকফার্ষ্টে কর্নফ্লেক্স কিম্বা মুসলি, দুপুরে নুডলস। বিকালের নাস্তায় পিৎজা পাস্তা, রাত্রে সুসি, ফো, হুমুস, বার্গার কিম্বা বাস্যান্ডুইচ। আউটিং বা গেটটুগেদারে ফ্রায়েড রাইস বা বিরিয়ানি- তাও সস দিয়ে। এরা কেউই ‘ফিস’ ছোঁয়না, বিষয়টাই নাকি ভীষণ ফিসি। মাংস বললে কেবল পোল্ট্রি মুরগিই বোঝে। এরা না বাঙালী না ভারতীয় না বিদেশী, এক আজব জগাখিচুড়ি। অথচ ইংরেজরা আসার আগে ভারতীয় সমাজে ছিল তিনবেলা খাবার অভ্যাস, কিন্তু তার কোনো নাম ছিলনা, না ছিল ধরাবাঁধা কোনো সময়জ্ঞান। ইংরেজ চলে গেছে, রেখে গেছে তাদের খাদ্যাভাসের বিভক্তির লেগাসি, এক্সট্রা লেজের মত। তারপরেও US টাইমধরে চলা বঙ্গপুঙ্গবেরা দুপুরে ব্রেকফার্ষ্ট করে আর ভোরে ডিনার। এখন তো আবার ‘ব্রাঞ্চ’ চলে এসেছে, উঁহু শাখাপ্রশাখা ওয়ালা ব্রাঞ্চ নয়- ব্রেকফার্ষ্ট ও লাঞ্চের ধরেমুড়ো সন্ধি- যা লাঞ্চও আবার ব্রেকফার্স্টও বটে। হয়ত এটা কোনো একটা যুগসন্ধিক্ষণ, ভেঙে গড়ে নতুন একটা রুচিধারার জন্ম হবে, তাই আমরা যারা সাবেক প্রজন্মের শেষ সলতে তাদের এগুলোতে মেনে নিতে এতোটা অসুবিধা হয়।

সনাতন বাঙালি খাবারে দুটো মুখ্য বিভাগ ছিল, যথা তামসিক ও রাজসিক। রাজসিক অবশ্যই রাজা ও তৎবর্গীয়দের জন্য, তামসিক ছিল সন্ন্যাসী ও অসহায় গরিবদের জন্য। এদেশে খ্রিস্টীয় খাবারের তেমন প্রচলন ঘটেনি যেমনটা লাতিনভূমে ঘটেছিল স্পেনীয়-পর্তুগীজ নামে। তবে ইসলাম পূর্ব যূগে ভারতভূমে হিন্দু ধর্মের চেয়েও বৌদ্ধ ধর্ম বেশি প্রচলিত ছিল, সেই বৌদ্ধ সমাজে দেব স্থানীয়দের জন্য যে খাদ্য প্রস্তুত হতো তার নাম ‘ওজ’। এই ওজ হচ্ছে অত্যন্ত পুষ্টিকর ভিটামিনযুক্ত খাবার যা সাধারণ মানুষের হজমের অনুপযুক্ত বলে প্রচারিত ছিল- বলাই বাহুল্য এই অতিরিক্ত পুষ্টি প্রাণীজ মাংস ও চর্বি থেকেই আসত। এখানে দেবতা মানে ঈশ্বর নয়, দেবতা কোনো সিদ্ধপুরুষ- যিনি নির্বাণ লাভ করেছেন। বৌদ্ধ বিশ্বাসে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই

প্রভু বুদ্ধের অন্তিম ভোজে ‘শূকরমাদ্ধব’ নামের একটি শুঁটকি মাংসের পদ ছিল, যা নাকি পচা ছিল। সেই খেয়ে বুদ্ধের আমাশয় রোগ হয় ও তাঁর পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটে। কেউ কেউ সেটাকে শূকরের মাংস না মানলেও অধিকাংশ বৌদ্ধ পণ্ডিত শূকরমাদ্ধবকে- শূকরের মাংসের শুঁটকি বলেই মত দিয়েছেন, কেউ কেউ মাশরুম বলে অবিহিত করেছেন। স্রোতাপন্ন আর্যশ্রাবকরা ভীষণ চালাক ছিলেন, তারা নিজেরা প্রাণীহত্যা করতেন না। কিন্তু সাধারণ লোকে প্রাণী হত্যা করে ভিক্ষুসংঘের জন্য খাদ্য তৈরি করে স্রোতাপন্ন আর্যশ্রাবকে পরিবেশন করলে তিনি চোব্য-চোষ্য-লেহ্য করে উদরস্থ করে নিতেন। আমার বলার উদ্দেশ্য, ‘জীব হত্যা মহাপাপ’ বলা স্বয়ং বুদ্ধদেব নিজেই মাংস খেতেন ও আজকের বৌদ্ধ ভিক্ষুরা অধিকাংশই মাছ-মাংস তথা প্রাণীজ প্রোটিন খান। মাংস খাওয়ার চল থাকলে বিবিধ প্রকারের রন্ধনশৈলীও ছিল নিশ্চিত। প্রামাণ্য দলিল না থাকার কারণে সে বিষয়ে বিশদে জানার উপায় নেই

ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে ইসলামের প্রবর্তকেরা তথা আব্রাহামীয় ধর্মের সকল শাখাগুলিই মধ্যপ্রাচ্যের বেদুঈন-যাযাবরদের দ্বারা তৈরি ধর্মবিশ্বাস। যাদের বসবাস শুষ্ক মরু অঞ্চলে, মাংস আর দুধ ছাড়া খাদ্যের তেমন বিকল্প নেই। মশলার ভিন্নতা ও পরিমাণের তারতম্য হলেও সেখানেও মাংসের রন্ধনশৈলীর অভাব ছিল না। আজও আমাদের অধিকাংশ মাংস রন্ধনশৈলী সেই মধ্যপ্রাচ্যেরই, তবে তাতে ভারতীয় মশলা ও শিল্পী বাবুর্চিদের উদ্ভাবনী শিল্প মিশে আছে

বেদ-পুরাণে সাধারণ মানুষদের জন্য যব, তণ্ডুল ইত্যাদি শস্যের উল্লেখ রয়েছে। আর্যদের প্রধান খাদ্যই ছিল মাংস, বনজ ফলমূল, তিল, সুটিডাল আর দুধ, কারণ তারাও পশুপালক যাযাবর জাতিই ছিল। অথর্ববেদের ৪/১৪০/২ সূক্তে এটারই উল্লেখ রয়েছে।

ব্রীহী মত্তং যবমত্তোমথ তিলং

এষ বাং ভাগো নিহিতো রত্নম ধেয়ায় দন্তৌ মা হিংসিষ্টং পিতরং মাতরং চ”।

পরবর্তীতে আর্যরা বর্ষাকালে অস্থায়ী চাষাবাদ শিখলে যব ও গমজাতীয় দানা শস্য উৎপাদন করতে শিখলেও সবজি উৎপাদন শেখে অনেক পরে। ধান যেহেতু আদিবাসীদের শস্য ছিল তাই আর্যরা বহুদিন সেটা ছুঁয়েই দেখেনি। তাই বেদের এক্কেবারে শেষের দিকে ধানের কথা এসেছে। চাল সেই অর্থে বঙ্গ সমাজে আজও দেবতাদের ভোগে ভাত হিসাবে স্বীকৃতি পায়নি, তাকে প্রসাদ নামে ডাকা হয়, আজও ভোজসভার আয়োজন করা হলে সেখানে লুচি খাওয়ানোটাই সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত কাজ, ভাত আসে শেষে কারণ তা নিকৃষ্ট। বৈদিক সমাজে মাংসের ব্যবহার যথেচ্ছভাবে ছিল, কিন্তু তা ব্রাহ্মণদের জন্য উপলব্ধ ছিল না প্রকাশ্যে।

ব্রাহ্মণেরা সারা বছর ফলমূল, দুধ, ঘি খেতেন, প্রাণীজ আমিষ ভক্ষণের জন্য যজ্ঞানুষ্ঠানের আয়োজন করতেন বা বলা ভাল রাজাদের দ্বারা আয়োজন করাতেন ধর্মের নামে। সেই যজ্ঞের আগুনে ষাঁড়, বন্ধ্যা গাভী, মহিষ, পুরুষ ছাগল বা অজ মাংস ও বৃদ্ধ অশ্বের মাংসের রোস্ট তথা কাবাব বানান হতো বিশুদ্ধ ঘি সহযোগে। শাস্ত্রে একে ‘বলি প্রথা’ বলা হয়েছে। কোরবানি হোক বা বলি, খায় তো সেই মানুষই- সবই আসলে ধর্ম বাঁচিয়ে সস্তায় প্রাণীজ প্রোটিনের যোগাড় দেওয়ার ফিকির। তাছাড়া ঋষি-মুনি ও দেবতাদের দৈনন্দিন সান্ধ্য আসরে যে সোমলতার রস পান করা হতো- তার চাট বা চাখনা হিসাবে মাংসই থাকত। নতুবা ঋষি যাজ্ঞবাল্ক্য বলতেন না,অশ্নামি প্রবামহমংসলং চেৎভবতি”, অর্থাৎ গোমাংস যদি কোমল হয়; তবে এনে ভোজন করব। ঋগ্বেদ- ৩/২/২১

আমরা বাংলা দেশের লোক, যতই আজ দেশ ভাগ হয়ে যাক- দীর্ঘ বর্ষাকাল যুক্ত আবহাওয়ার গাঙ্গেয় অববাহিকার শতশত নদনদী, তাদের শাখানদী, উপনদীতে পুষ্ট। এই পলিপুষ্ট অঞ্চলে উর্বর জমির চেয়ে চাষের উপযুক্ত আর কিছু হয় না, স্বভাবতই এখানে বর্তমান আধুনিক সভ্যতায় যে চাষযোগ্য নিরামিষ সবজি-ফসল খাওয়ার বিস্তার ঘটবে তাতে আর আশ্চর্য কী! তাছাড়া আমাদের এই স্যাঁতস্যাঁতে ঘর্মাক্ত আবহাওয়াতে পরপর দু'দিন পশুর মাংস খেলে তৃতীয় দিন আর কাজেকর্মে যেতে হবে না, টয়লেট এক প্রেম কথার নতুন পর্ব রচিত হবে। বঙ্গভূমের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নদনদী, খাল, বিল, বাঁওর, হাঁওরের মাছ আজও সহজলভ্য সাধারণ গরিব মানুষের কাছে, আর তার সাথে সমতল জমিতে সুলভে চাষের ধান- সুতরাং মাছে-ভাতে বাঙালি শব্দটাই একমাত্র যথাযথ বাঙালির জন্য। তবে সে মাছ রান্নাতে অবশ্যই পেঁয়াজ-রসুন ব্রাত্য ছিল

তা সত্ত্বেও আজকের বাঙালি হেঁসেলের জনপ্রিয় সবজি বেগুন, ঢেঁড়স, টম্যাটো, লঙ্কা, পেঁপে, আনারস, পেয়ারা, ভুট্টা, চিনেবাদাম কোনো কিছুই ছিল না অষ্টাদশ শতক অবধি, যেমন ছিল না আলু। ইউরোপীয় সাহেবরা এদেশের লাউ, ওল, কচু, মুলোর একঘেয়েমি থেকে নিস্তার পেতে ওই সবজিগুলোর আমদানি করে। এই ভাবেই মটরশুঁটি, গাজর, কুল জাতীয় ফলগুলো খাঁটি বাঙালির নিজস্ব খাবারে পরিণত হয়ে গেছে। এমনকি ছানা ও দই তৈরির কৌশলটিও বাঙালি শিখেছিল ফরাসডাঙার পর্তুগীজ সাহেবদের থেকে। সুতরাং, নিরামিষ রান্নাতে ছানা বা পনিরের ব্যবহারও কয়েকশো বছরের বেশি পুরাতন নয়। তবে হ্যাঁ, বাঙালির ইতিহাসের শুরু থেকেই তেঁতুল কিন্তু খাস বাঙালি খাবার, তাতে সে যতই এখন দক্ষিণ ভারতের খাবারের প্লেটের কোহিনুর হোক না কেন

১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের আকালের সময় গম ছড়িয়ে পরে দেশব্যাপি, তার আগে অপ্রতুলতার কারনে বাঙালির কাছে গম মানে ছিলো ‘বড়লোকি’ ব্যাপার স্যাপার। বিয়ে, শ্রাদ্ধ বা যেকোনো অনুষ্ঠানে লুচি খাওয়াটাকে ঐতিহ্য ও আভিজাত্যর প্রতীক হিসাবে দেখা হতো। তাই খুব সম্পন্ন পরিবার ছাড়া বাঙালি কখনই রুটিতে অভ্যস্ত ছিল না, কারণ আমাদের যে প্রাচীন সাহিত্য সেখানে তাওয়ার উল্লেখ প্রায় নেই বললেই চলে। সর্বত্রই হাঁড়ির উপস্থিতি, বাসনকোসনের শুরুতেই হাঁড়িকুঁড়ি অর্থাৎ হাঁড়ি ও কড়াই আসবে, তারপর থালা, বাসন, বাটি, হাতা, খুন্তি ইত্যাদি। যেখানে ভাত খাওয়া হয় সেই সমাজেই একমাত্র হাঁড়ির দেখা মেলে, যেখানে ভাত নেই সেখানে আর যা কিছু থাকুক, হাঁড়ি পাওয়া যাবে না।

বেদে মাসকলাই ডালের উল্লেখ থাকলেও মধ্যযুগীয় সাহিত্য বা প্রাথমিক পর্যায়ের ইংরেজ আমলের লেখালেখিতে ডালের উল্লেখ পাওয়া যায় না। বস্তুত ইংরেজদের হাত ধরেই ‘লেন্টিলস ও বিনস’ এর বিস্তারে ডাল এসে ঢোকে বাঙালির হেঁসেলে, পরে বর্গিদের আক্রমণ নিত্য ঘটনা হয়ে গেলে তাদের শক্তির উৎস ‘ডাল’কে আপন করে নেয় বাঙালি, তাদেরই প্রতিরোধ করার জন্য। মধ্যযুগে বাংলার চিরাচরিত খাদ্যাভাসে যখন ঠিক বদলের রঙ ধরতে শুরু করেছে, ওদিকে ঢাকাকে কেন্দ্র করে মুসলমান সুলতান-নবাবেরা ক্ষমতার কেন্দ্র পত্তন করেছেন, এদিকে সেই তালে রয়েছে গৌড়- ঠিক সেই সময় শ্রী চৈতন্যের নেতৃত্বে বৈষ্ণব জীবনধারার প্রবর্তন ঘটে। এই বৈষ্ণবদের ধারাটা গোটাটাই কঠিন নিরামিষাশী হয়ে যায়।

প্রাণীজ আমিষের ঘাটতি ও একঘেঁয়ে নিরামিষ রান্নার মাঝে বৈচিত্র্যৈ আনতে বৈষ্ণব হিন্দু সমাজে এক বিপ্লব সংগঠিত হয়। ফল ও সবজির খোসা থেকে গাছ-লতা-গুল্মের ডগা, কাণ্ড, শিকড়, ফুল, পাতা সব কিছু দিয়ে বিবিধ ব্যঞ্জন বানানো শুরু করে। রন্ধনশৈলীতেও আসে আমুল পরিবর্তন। নিজেদের সনাতন পদ্ধতির সাথে বিজাতীয় যবনধারার মিশ্রণ ঘটায় প্রণালীতে। রাঁধতে শেখে- ভাজা, সিদ্ধ, পোড়া, শুক্তো, ঘণ্ট, ছ্যাঁচড়া, ছেঁচকি, চচ্চড়ি, ছক্কা, ছোকা, ঘ্যাঁট, লাবড়া, ঝাল, ঝোল, ভাপা, ডালনা, দোলমা, অম্বল, টক... এ দীর্ঘ অভিধান। খাদ্য সংস্কৃতি হলো জাতির আত্মপরিচিতি, আজ কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে জাতিতে খণ্ডিত করে দেওয়া হলেও স্বাদে আজও দুই বাংলা এক পাতেই রয়ে গেছে। ইলিশের মুড়ো দিয়ে কচুর শাক হোক বা ডুমোডুমো লাউ দিয়ে জিড়ের ফোঁড়নের সোনা মুগের ডাল- হাপুস হুপুস শব্দে দুই পাড়ের মানুষেরই তৃপ্তির ভাত পেটে ঢুকে যায়

শাসক যেহেতু মুসলমান, তাই সাধারণ অবৈষ্ণব ও অব্রাহ্মণ হিন্দুদের খাদ্যচর্চাতে মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুনের প্রচলন ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। হিং ও আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, কিন্তু বৈষ্ণবরা সেটাকে গ্রহণ করে নিরামিষ হিসাবে। স্মৃতিশাস্ত্রকে উপেক্ষা করে আজও দুর্গা পুজোয় মাংস রান্না হয়, তবে পেঁয়াজ-রসুন না দিয়ে। শাস্ত্রের মান রক্ষা করা হয়। জাত একবারই যায়, দ্বিতীয়বার নয়। সেই সূত্র মেনেই বাঙালি বাবু তথা মধ্যবিত্ত সমাজ অতি সহজেই বিদেশী চপ, কাটলেট, ফ্রাই, স্টু এর সংস্কৃতিতে নিজেকে জারিত করে নেয় যখন ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসকের দলেরা এদেশে আসে।

বলা যেতে পারে, মুসলমানেরা বঙ্গদেশে এসেই মাছ খাওয়া শিখেছিল বাঙালির কাছে। ব্রিটিশদেরও মাছ-মাংস রান্নাতে তেমন বেশি পদের বিকল্প ছিল না। মাছ মানেই ফ্রাই তথা ভেজে খাওয়া, আর মাংস হয় শুঁটকি করে খাওয়া বা সেঁকে কাবাব বানিয়ে খেতো। ভারতীয় মশলার কল্যাণেই তাদের কারি অতটা সুস্বাদু হয়, সাধে কি আর ভাস্ক-দ্য-গামা মশলার জন্য অজানা সমুদ্রে পাড়ি দিয়েছিল অচেনা ভারতের সন্ধানে। রসনা তৃপ্তির চেয়ে তৃপ্তি জীবনে আর কীসেই বা আসে। কবিকঙ্কন বড় দর্শনতত্ত্ব দিয়ে লিখে গেছেন- যে মহিলা তৃপ্তিদায়ী ব্যঞ্জন রাঁধতে জানল না, সে সংসারের কিছুই জানল না

তেতো, নোনতা, ঝাল, টক, ও মিষ্টি- এই পঞ্চ স্বাদের খাদ্য সামগ্রী আমাদের বাঙালি খাবারের মূল বৈশিষ্ট্য। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে একটা আম বাঙালি পরিবারে সবজি ও মাছ রান্না প্রায় সমগোত্রীয়, কেবল হিন্দুদের রান্নার ফোঁড়ন বৈচিত্র্য বেশি। সেই তুলনাতে মাংস রান্নাতে মুসলমান পরিবারগুলো বেশ কয়েক যোজন এগিয়ে থাকে মশলার ব্যবহার কৌশল ও বিবিধ বিকল্প প্রণালীর দৌলতে। আজকাল মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তের ঘরে দক্ষিণ ভারতীয় পোহা, উপমা, ইডলি, ধোসা সহ চাইনিস নুডলস, ইতালিয়ান পাস্তা সহ কত রকমারি খাবারেরই না সমাবেশ ঘটেছে। আসলে খাদ্যাভ্যাস একটা প্রবাহিত নদীর মতো, যত বেশি পথ চলবে তত শাখা-প্রশাখারা এসে মিলিত হবে ও মিলেমিশে নিজস্ব ধারা তৈরি হবে। যেমন ধরুন- কোলকাতার ফুটপাতের ওই অপুর্ব স্বাদওয়ালা চাউমিন- দুনিয়ার কোথাও পাবেন না। খোদ চিনা-জাপানিরাও এভাবে ভেজে ডিম-মাংস-ফুলকপি-গাজর দিয়ে নুডুলস খায় নাকোলকাতায় চাইনিস স্ট্রিট ফুডের নামে যে পদ গুলো বিক্রি হয়, আসল চিনারা জানতে পারলে নিশ্চিত মানহানির মামলা করতো।

সভ্যতার শুরুতে যখন দেশ ছিল না তখন মানুষ কাঁচা খেতো। তারপর আগুনে ব্যবহার শিখলে পুড়িয়ে খেতে শিখল, ক্রমান্বয়ে শিখল সিদ্ধ করে খেতে। সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে ভেজে খাওয়া। লিখিত সভ্যতার ১০ হাজার বছরের বিবর্তনে মূলত এই চারটেই মূল খাদ্যধারা। বাঙালি এই চারটেতেই রয়েছে। এক খঞ্চা আদর্শ বিরিয়ানিতেও এই চারটিই রয়েছে। সিদ্ধ চালের উপরে ভাজা পেঁয়াজ বেরেস্তা তার উপরে কাঁচা স্যালাড- আর একপ্লেট পোড়া মাংস অর্থাৎ কাবাব। ব্যাস আর কী চাই! এই কারণেই ইতিহাস, ভূগোল, বাঙালি সবকিছু মিশে গেছে বিরিয়ানিতে

বিরিয়ানি জন্দাবাদ

অকপট জিন্দাবাদ

 

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...