গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে একজন বিশিষ্ট দার্শনিক ছিলেন তা তার বহু লেখায় ছাপ রেখে গেছেন। তেমনই একটা দূরদর্শী রূপকধর্মী গল্প তোতা কাহিনী। মূর্খ রাজা, আর তার চারপাশে ঘিরে থাকা নিম্নমেধার স্তাবক কুল তথা চামচারা। এই চামচা বা স্তাবকেরা সমাজে পরিচিত- পাত্র, মিত্র, অমাত্য, পারিষদ, উমেদার, চাটুকার, ভাঁড় ও অন্বয় পুরুষের দলেরা। এখানে পণ্ডিতেরা স্থান পায় না, কারণ ভাঁড়েরা পণ্ডিতের পোশাকে কৌতুক দেখায় কুমন্ত্রণা চক্রের প্রত্যক্ষ মদতে।
কোনো এক অজানা কারনে হঠাৎ করে ভাবনাস্থল গর্ভবতী হওয়ার কারনে অক্ষরের রূপে প্রসবিত কিছু প্রলাপের সংকলন এই ঠেক। গুনী লেখকের সমৃদ্ধশালী লেখনি পড়তে পড়তে, অক্ষমের প্রয়াসে কম্পিউটারের কিবোর্ডে হাত চলে যায়। ফল স্বরূপ, ঘটে চলা রাজনীতি, সমকাল, মানবিক বিকার, সময়চর্চা, ছ্যাঁচোর এর মত রিকেটগ্রস্থ লেখনীর জন্ম হয়। এরই রেশ ধরে সময়চর্চা, রবিবাসরীয়, সমকাল সহ রম্য, রচনা, গল্প ইত্যাদি ভুলভাল গুলোকে সংরক্ষিত করা হয়েছে এই টোলে। এটা সমমনষ্ক মানুষদের ভাব বিনিময়ের স্থান। উন্মাদের টোলে সকলকে স্বাগতম জানাই।
বৃহস্পতিবার, ২৫ মার্চ, ২০২১
বামদলে পাত্র-মিত্র ও গুরুদেব
গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে একজন বিশিষ্ট দার্শনিক ছিলেন তা তার বহু লেখায় ছাপ রেখে গেছেন। তেমনই একটা দূরদর্শী রূপকধর্মী গল্প তোতা কাহিনী। মূর্খ রাজা, আর তার চারপাশে ঘিরে থাকা নিম্নমেধার স্তাবক কুল তথা চামচারা। এই চামচা বা স্তাবকেরা সমাজে পরিচিত- পাত্র, মিত্র, অমাত্য, পারিষদ, উমেদার, চাটুকার, ভাঁড় ও অন্বয় পুরুষের দলেরা। এখানে পণ্ডিতেরা স্থান পায় না, কারণ ভাঁড়েরা পণ্ডিতের পোশাকে কৌতুক দেখায় কুমন্ত্রণা চক্রের প্রত্যক্ষ মদতে।
করোনা ও প্রোটোকল
সোমবার, ২২ মার্চ, ২০২১
অকপট সম্পর্ক
রবিবার, ১৪ মার্চ, ২০২১
সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
২০২০ সালের নভেম্বর মাসের ছবি, অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ আধিকারিক সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমুলে যোগ দিলেন। সে দিতেই পারেন, কিন্তু কে এই সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়? তার জন্য ১৪ বছর পিছিয়ে যেতে হবে।
শুক্রবার, ১২ মার্চ, ২০২১
শিক্ষকদের স্বার্থে সরকার ও নাগরিক সমাজ
মঙ্গলবার, ৯ মার্চ, ২০২১
হিন্দু গোত্র
‘গোত্র’ মানব জীবনের একটি অপরিহার্য উপাদান কারণ এটি মানবের সনাতনী পরিচয় সনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়। আমরা সবাই প্রপিতামহ ব্রহ্মা থেকে এসেছি, যদিও আমাদের আদি পিতা-মাতা যথাক্রমে মনু ও শতরূপা। গোত্র, যা গরুর পালকে বোঝায়, ঋগ্বেদে উল্লেখ অনুযায়ী যা একটি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত পূর্বপুরুষকে নির্দেশ করে। একটি নির্দিষ্ট গোত্রের সদস্যদের বৈশিষ্ট্যগুলি ভাগ করে নেওয়া হয়, তা সে কাজের মাধ্যমে অর্জিত হোক বা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্য।
হিন্দু ঐতিহ্য অনুসারে, গোত্র হল একটি আত্মীয় গোষ্ঠীর পরিচয় যা বংশ বা বংশানুক্রমের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে মনে করা হয়। গোত্র এবং উপাধি তার পরিবারের সদস্যদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। বিস্তৃত অর্থে, এটি একক পিতৃতান্ত্রিক বা সাধারণ পুরুষ পূর্বপুরুষের বংশধরদের বোঝায়। হিন্দু ঐতিহ্যে, গোত্র বিবাহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং একই গোত্রের কাউকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ।
আমাদের প্রদত্ত নামগুলি গোত্রের পরিবর্তে ঐতিহ্যবাহী পেশা, বসবাসের স্থান বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত করে। গোত্র শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যদেরই থাকে। অন্তজ্য বর্ণের গোত্র থাকেনা কারণ ঐতিহাসিকভাবে তাদের শিক্ষা অর্জনের অনুমতি ছিল না। আজ, সমস্ত বর্ণ তাদের গোত্রের স্ব-ঘোষিত নাম ব্যবহার করে। গোত্র পদ্ধতি মূলত আপনার পরিবারে পৈতৃক জিন সনাক্ত করার জন্য একটি হাতিয়ার। এক কথায় Y ক্রোমোজোম সনাক্তকরণ। তাই রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় না হলেও তাদের ভাইবোন হিসেবে গণ্য করা হয়।
বৈদিক শাস্ত্র অনুসারে, একটি বংশের রক্ত প্রবাহিত হয় পুরুষ পরম্পরায়। সুতরাং বংশের রক্তের ধারক ও বাহক হলো পুরুষ। সনাতন ধর্মের বংশ রক্ষার ধারায় ছিলেন প্রথম সত্য যুগের শুরুতে ব্রহ্মার মানস সন্তানদের মধ্যে অন্যতম ঋষিগণ। পরবর্তীকালে অন্যান্য ঋষির বংশ পরম্পরাও পরিলক্ষত হয়। ব্রহ্মার মানস পুত্রগণের থেকে আগত প্রতিটি বংশ এক একটি গোত্র বা রক্তের ধারায় প্রবাহিত।
বৈদিক তত্ত্ব অনুসারে, ব্রাহ্মণরা হলেন সাত ঋষির নিকটাত্মীয়, যারা ব্রহ্মার সন্তান বলে স্বীকৃত এবং যোগশক্তির মাধ্যমে গর্ভধারণ করেছিলেন। মহর্ষি গৌতম, শাণ্ডিল্য, ভরদ্বাজ, বিশ্বামিত্র, জমদগ্নি, বশিষ্ট, কশ্যপ এবং অত্রি। এই আটজন ঋষি থেকেই যাবতীয় ১০৮ গোত্র বিবর্তিত হয়েছে, বিশেষ করে ব্রাহ্মণদের। রবার্ট ভেন রাসেলের মতে, অসংখ্য হিন্দু গোত্রের নামকরণ করা হয়েছিল উদ্ভিদ, প্রাণী এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক বস্তুর নামে এবং তাদের উৎপত্তি ছিল উপজাতীয়। উদাহরণস্বরূপ, ভরদ্বাজ একটি লার্ক অর্থাৎ একটি ছোট গান গাওয়া পাখি থেকে আগত, কৌশিক কুশ থেকে, অগস্ত্য অগস্তি ফুল থেকে, কশ্যপ কচ্ছপ থেকে এবং তৈত্তিরী তিতিরকে নির্দেশ করেন।
একই গোত্রের লোকদের আত্মীয় হিসাবে গণ্য করা হয়। ফলে হিন্দু ঐতিহ্যের
চর্চা অনুযায়ী তাদের মধ্যে বিবাহ হয়না, কিছু অনুযায়ী এই ধরনের বিবাহের ফলে সন্তান
বংশগত অসুস্থতা লাভ করে। একই গোত্রের হওয়ায়, পিতৃতুল্য তুতো ভাইবোনদের
বিবাহ করা নিষিদ্ধ। সংস্কৃত শব্দ সাহা উদরা, যার অর্থ সহ-জরায়ু বা একই গর্ভে জন্মগ্রহণ করা, তৎসম শব্দের উৎস হল সহোদর (ভাই) এবং সহোদারি (বোন)।
হিন্দুদের প্রধান গোত্র তালিকাঃ
কৌশিকা, কাউন্দিন্য, মারিচি, মীন, ভৃগু,
সিওয়াল, বৃহদবালা, চন্দ্রত্রে, প্রতিরোধ, কদম, অত্রি, অগস্ত্য, আলম্যান/আলম্ব্যয়ন,
আত্রেয়, কাশ্যপ, মৌদ্গল্য,
ভরদ্বাজ, বশিষ্ট, বৃহস্পতি,
বিশ্বামিত্র, জামদগ্ন্য, শিব, ভার্গব, শান্ডিল্য,
ব্যাসঋষি, ধন্বন্তরি, পরাশর,
সাবর্ণ, কাত্যায়নী, গৌতম,
ঘৃতকৌশিক, নাগঋষি, চান্দ্রায়ণ,
বাঘ্রঋষি, হোবি ঋষি, বাতস্য,
বৃদ্ধি, কৌন্ডল্য, শুনক,
কৃষ্ণাত্রেয়, জাতুকর্ণ, কাণ্ব, কুশিক, আঙ্গিরস,
গর্গ, বিষ্ণু, শক্তি।
অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তামিলনাড়ুর মুদিরাজাদের ২৬০০টি গোত্র আছে। জাঠ এবং রাজপুতদের ৩০০০টি গোত্র আছে। বেশিরভাগ হিন্দুদের কাছে, গোত্র সর্বদা পিতা থেকে সন্তানের কাছে চলে আসে। অন্যদিকে, মালয়ালি এবং তুলু সম্প্রদায়ের লোকেরা এটি মা থেকে সন্তানের কাছে চলে আসে।
একই গোত্রে
চারটি বর্ণে থাকতে দেখা যায়। কারণ, একই ঋষির সন্তানরা একেক সময়ে একেক কাজে মনোযোগী হয়ে থাকে। যে শাস্ত্র
অধ্যয়ণ বা বুদ্ধিভিত্তিক জীবিকা অবলম্বন করে সে ব্রাহ্মণ হিসেবে, রাজধর্ম পালনকারী ক্ষত্রিয়, ব্যবসা-বাণিজ্যে মনোযোগী হলে সে বৈশ্য। এসব
পেশাগত লোকদের সেবা করেই সন্তুষ্ট অর্জনে আগ্রহীরা শূদ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে
থাকে। এ গুণাবলীসমূহ কেউ জন্মে প্রাপ্ত হয় না, অর্জন করতে হয়। তাই বর্নাশ্রম সঠিক সটঠিক হলেও বর্ণপ্রথা ভুল ও মিথ্যা।
সোমবার, ৮ মার্চ, ২০২১
যারা আজকের তৃনমূল তারা প্রত্যেকেই আগামীর বিজেপি
বুধবার, ৩ মার্চ, ২০২১
বিরিয়ানি ও বাঙালির খাদ্য বিবর্তন
(১)
অকপট নিয়ে যখনই কেউ কিছু বলে তার সাথে বিবিধ বিষয় জড়িয়ে থাকে। ব্যক্তি আমরা, সাহিত্য পত্রিকা, ভ্রমণ, নিজেদের মাঝের বন্ধুত্ব, আড্ডা, রাজনৈতিক খেউর
ইত্যাদি;
কিন্তু সব কিছুকে ছাড়িয়ে গিয়ে যেটা একান্ত
পরিচয়বাহক হয়ে উঠেছে সেটার নাম রকমারি বাহারি খাদ্যসম্ভার। নির্দিষ্ট করে বললে, তা হলো বিরিয়ানি। বিরিয়ানি আর অকপট কোথাও যেন একটা
সমার্থক হয়ে উঠেছে, অথচ গ্রুপের
সদস্যসংখ্যার বিচারে খাদ্য গ্রুপগুলোতে, সাহিত্য গ্রুপ কিম্বা ভ্রমণ
গ্রুপে বিরিয়ানি নিয়ে অনেক বেশি পোস্ট হয় অকপটের তুলনাতে, মনোজ্ঞ লেখাও আসে সেসব গ্রুপে- কিন্তু গ্রুপের সাথে
বিরিয়ানির এতটা আত্মীকরণ, অকপট ছাড়া কারও
সাথে এতটা ঘটেছে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
বিরিয়ানি আমাদের জীবনের সাথে এমন ভাবে মিশে গেছে যে, কোনো কিছু বিশেষ দিন হোক বা না হোক বিরিয়ানির আগমনই যেন
সেই দিনটিকে বিশেষ করে তোলে। প্রথমে ছিল শুধুই বিরিয়ানি, এখন তার কতইনা ঘরানা। কোলকাতা, দিল্লী, হায়দ্রাবাদি, লক্ষ্ণৌ, কাশ্মীরি, অওয়ধি, লাহোরি, বোম্বাই কত্তো
কি। আবার আলু থাকা না থাকা, ডিম থাকা না
থাকা,
মাংসের সাইজ, চালের সুগন্ধ ও টেক্সচার, মশলার ভিন্নতা
ইত্যাদি ভেদে বিরিয়ানি নানা গোত্রের হয়ে থাকে, এদের কৌলিন্য নির্ভর করে স্থানীয় ঐতিহ্যের উপরে। বিরিয়ানির হাঁড়ি আসলে
স্বাদের আস্ত উৎকৃষ্ট রাসায়নিক ফলিত প্রয়োগশালা। এতে শিল্প আছে, সাহিত্য আছে, অঙ্ক আছে, বিজ্ঞান আছে, ভূগোল, ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি- সব সব সব আছে। বিরিয়ানি নবীন প্রেমিকার মতো মাতাল করা উচ্ছল
আস্বাদের,
তবে যখন ওটা পুরাতন গৃহিণীর মতোই উষ্ণ থাকে
তখন। বিরিয়ানির আঘ্রাণেই মুখে এত পরিমাণ লালার উদ্রেগ হয় তাতে অনায়াসে ডিঙি ভাসিয়ে
দেওয়া যায়। মিঠা আতরের সুবাসে ফুসফুসের আয়ুবৃদ্ধি ঘটে। একদৃষ্টে বিরিয়ানির দিকে
চেয়ে থাকলে প্রবৃত্তির নিবৃত্তি ঘটে। একপ্লেট বিরিয়ানি শুধুই খাদ্যবস্তু নয়, একটা তীর্থস্থল- যাকে চুম্বনের দ্বারা ছুঁলে পূণ্যার্জন
হয়। এগুলো সবই আমার দর্শন।
বন্ধুবর ইন্দ্রর এক অমোঘ উক্তি আছে এই বিষয়ে, “বিরিয়ানি মানেই একটা অনিশ্চয়তার দোলাচল। অতি বড় বাবুর্চিও জানে না দম থেকে
নামাবার পর শুকিয়ে যাওয়া আটার চাঙড় খুঁটে ভিতর থেকে কী বের হবে। প্রতিবার একই
উপকরণ,
একই মশলা, একই স্থান, একই পাতিল, একই ব্যক্তির রন্ধনশৈলী- তবুও প্রতিদিনের স্বাদ পৃথক হয়ে
যায়,
দুটো হাঁড়ির স্বাদেও ফারাক এসে যায়। এই কারণেই
বিরিয়ানি এত সুস্বাদু”। বিরিয়ানি মানে অদ্ভুত সুগন্ধের মাঝে গোটা গোটা মশলায় সেজে
ওঠা,
সরু লম্বা শুভ্র সুগন্ধি মেদহীন ঘি মাখা ভাতে-
জাফরানের সোহাগ মাখা হলুদ রঙের উপরে তুলতুলে মাংসের কুটুম্বিতাই শুধু নয়; বিরিয়ানির অর্থই হলো ধৈর্য, অধ্যাবসায়, মনোঃসংযোগ আর একরাশ অনিশ্চয়তা- এটাই বিরিয়ানির আসল স্বাদের রহস্য।
জনসংখ্যাতাত্ত্বিক অঞ্চল ভেদের বাইরেও বিরিয়ানির একাধিক উপবিভাগ রয়েছে।
যেমন কোলকাতার রয়্যালের স্বাদের সাথে আমিনিয়া বা আরসালানের স্বাদের অনেক ফারাক।
তবে কোলকাতা বিরিয়ানি মানে শুধুই উপরের তিনটে নয়, কলেজ স্ট্রিটের সুফী, দমদম-নাগের
বাজার ও বেহালার হাজী, নিউ মার্কেটের
মস্তান,
সল্টলেকের চাচাজান আর গলৌট, সেলিমপুরের তন্দুর, রিপন স্ট্রিটের হাণ্ডি, রাজাবাজারের তাজ, রুবির মনজিলাত কিম্বা বেনেপুকুরের জমজম- প্রতিটির স্বাদ
ইউনিক। এর বাইরেও স্বাদের এমন জীবন্ত প্রতিষ্ঠান কম কিছু নেই, সে সবের তালিকা দিলে একটা গোটা উপন্যাস হয়ে যাবে।
রাজ্যের বাইরে বলতে গেলে দিল্লীর করিমসের বিরিয়ানির স্বাদ ৫ বছর পরেও জিভে
লেগে থাকে। হায়দ্রাবাদ গেলে সকলেই প্যারাডাইস খোঁজে, কিন্তু চারমিনারের কাছে সাদাবের বিরিয়ানির স্বাদ যে অমৃত কুম্ভের সন্ধান।
বোম্বের লোখান্ডওয়ালার চাচার বিরিয়ানি হাসতে হাসতে দু'প্লেট শেষ করে দেওয়াই যায়, এতটাই সুস্বাদু। মহীশূরের আন্ধা ঘরানার নবাবি বিরিয়ানিতে পুদিনা পাতার
ব্যবহার যেন জীবন্ত এক শিল্পকলা। সেবার সুব্রতদার সাথে লক্ষ্ণৌ গিয়ে আমরা সারা শহর জুড়ে তারিয়ে তারিয়ে হরেক ধরনের বিরিয়ানির
স্বাদ নিয়েছিলাম সপরিবারে। প্রতিটাই অনবদ্য, স্বাদে-গন্ধে-বর্ণে।
জীবনের একটা অধ্যায়ে রপ্তানি বাণিজ্যের সাথে যুক্ত থাকার সুবাদে বিদেশ
গমনের সুযোগ ঘটেছিল। বর্তমানে পর্যটন ও হোটেল ব্যবসার সাথে
যুক্ত, আমাদের রেস্টুরেন্টেও বিরিয়ানি বানানো হয়। সেই সুবাদে
ইরানি বিরিয়ানি, কাবুলি বিরিয়ানি, মদিনা বিরিয়ানি, বাগদাদি বিরিয়ানি, পাখতুনি
বিরিয়ানি,
তুর্কি বিরিয়ানি, মিশরি বিরিয়ানি, লেবাননি বিরিয়ানি, ইয়েমেনি
বিরিয়ানি, নেপালি বিরিয়ানি সহ নানা স্বাদের পরখ
করার সুযোগ পেয়েছি জীবনে। এগুলোতে ভাল বা মন্দের বিচার
করা যায় না, কারণ প্রত্যেক
দেশের নিজস্ব রন্ধনশৈলীতে নিজস্ব মশলা ও পাকপ্রণালীর বিশেষত্ব থাকে, সেটা বিদেশী জিভে ভাল না লাগতেও পারে। পশ্চিম ইরাক, কুর্দ, জর্ডন ও
জেরুজালেম শহরের বিরিয়ানিতে কচি বেগুন দেয়, যেমন আমরা আলু দিই। খেতে বেশ লাগে। তবে বিদেশী বিরিয়ানির স্বাদের বিচারে
ঢাকার কাচ্চি বিরিয়ানির তুলনা নেই।
একগ্লাস বাদাম শরবতের স্টার্টার দিয়ে শুরু করে, কম তৈলাক্ত চিনিগুঁড়া চালের সাথে ছোট্ট ছোট্ট নরম ঢোলা
মাংস,
যা মুখে দিলেই হাড় থেকে খুলে আসে, সাথে বুরহানি আর ফিরনি- শুধু এই পদটা খেতেই বারেবারে
ঢাকা যাতায়াত করা যায়। তবে সব ভালর চেয়েও ভাল আমার ঘরণী রুমির হাতের নিজস্ব ঘরানার
বিরিয়ানি,
সাথে পাতলা কাচুম্বর বা ঘন রায়তা। কিছুটা
কোলকাত্তাইয়া, কিছুটা কাশ্মীরি, কিছুটা হায়দ্রাবাদি- বাকিটা রান্নার প্রতি অসীম প্রেম, যার দরুন যেকোনো ছুতোনাতায় “আজ না হয় বিরিয়ানিই হয়ে
যাক” হরদম লেগেই আছে আমাদের সংসারে। এই জন্যই বলে, উপরওয়ালা জুড়ি মিলিয়েই পাঠায়।
উইকিপিডিয়াতে পড়েছিলাম, দ্বাদশ শতকের ‘নৈষধ চরিত’, চতুর্দশ শতকের ‘প্রাকৃত পৈঙ্গল’ এবং বৌদ্ধ সহজিয়া গান ‘চর্যাপদ’, মধ্যযুগীয় মনসামঙ্গল, অন্নদামঙ্গল, চৈতন্যচরিতামৃত
হয়ে খনার বচন- সর্বত্রই বাঙালির রন্ধনশৈলীর কিছু কিছু বিবরণ রয়েছে। অর্থাৎ খাদ্য
নিয়ে আজকের প্রজন্মই যে লিখছে তা নয়, সেকেলের একচুয়াল লেখনীচর্চা গ্রুপগুলোতেও খাদ্যচর্চা জমিয়েই হতো, নতুবা তা কখনও লেখনী শিল্পে আসত না। ধরে নেওয়া যেতেই
পারে,
সেযুগেও যদি বিরিয়ানি থাকত- নিশ্চিত চর্যাপদে
এমন কিছু লাইন থাকতই-
“রান্ধি বিরিয়ানি ব্যঞ্জন পরাণ হরষিত,
ছাগমৃগ মাংসে কাবাব অকপট সচকিত”।
আধুনিক যুগে ব্যাঞ্জনসাহিত্যের ইতিহাস মাত্র দুশো বছরের কুলীন।
খাদ্যপ্রনালী ও রন্ধনচর্চার উপরে আধুনিক বাঙালি সেভাবে কিন্তু লেখেনি। ‘ইতিহাস’ নামের একটা অনলাইন ব্লগ থেকে যেটা পেলাম, হুবহু তুলে দিলাম- ‘১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বেশ্বর
তর্কালঙ্কার ভট্টাচার্যের ‘পাক্ রাজেশ্বর’, ১৮৫৮ সালে গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশের ‘ব্যঞ্জন রত্নাকর’। তবে বেশ জনপ্রিয়তা
অর্জন করছিল বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়ের ‘পাক-প্রণালী’। পুরুষদের পাশাপাশি বাঙালি
‘ভদ্রমহিলা’রাও রান্নার বই লিখতে শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী
প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী তথা ‘পুণ্য’ পত্রিকার সম্পাদিকা লেখেন ‘আমিষ ও নিরামিষ’ নামে
একটি বই। কিরণরেখা রায় লেখেন ‘বরেন্দ্র রন্ধন’। রেনুকাদেবী চৌধুরানী লিখেছিলেন
‘রকমারি নিরামিষ রান্না’ আর ‘আমিষ খণ্ড’।
আমাদের ছোটবেলা মানে নব্বই এর দশক বা এই নতুন শতকের প্রথম দশকটাতেও
বিরিয়ানির এমন একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল না বঙ্গজীবনে। বিরিয়ানি যে আগে ছিল না তা নয়, চিৎপুরের রয়্যাল কিম্বা কোলকাতা পুরসভার কাছে আমিনিয়া তো
তীর্থস্থানে মতো ছিল- বছরে এক-দুবার যেতে পারলেই নিশ্চিত মোক্ষলাভ। এখন হলে-মলে তো ছাড়, যে কোনো বাহানাতেই বিরিয়ানি ঢাকে কাঠি পাহাড় থেকে সাগর। পাড়ায় মোড়েতে লাল সালুতে ঢাকা পেতলা বা ডেকচি, এলাকা ভুরভুর করে মিঠা আতরের গন্ধে। মূলত বিরিয়ানির হাত
ধরেই তুর্কি, ফার্সি তথা মধ্য এশিয়ার
খাদ্যশৈলীতে ছেয়ে গেছে মাছে ভাতে বাঙালির খাদ্যতালিকা। বিরিয়ানির সাথে সাথেই
হেঁসেলে ঢুকেছে কিমা, কাবাব, চাপ, রেজালা, ভুনা, হালিম, ভর্তা, কোর্মা, কালিয়া, নিহারি, পায়া, পসিন্দা, রোগান জোশ, রেশমি বোটি, কোফতা, টিকিয়া, মুসল্লম, ফালুদা, বরফি, ফিরনি, শিরখুর্মা, আরও কত কী! সনাতনী বাঙালিয়ানার বাইরে- থুড়ি, এখানেই প্রশ্ন উঠবে সনাতনী বাঙালিয়ানা কী!
আমরা অনেকেই বলব, ডাল, আলুপোস্ত আর চারটি গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত, এই তো আমাদের বাঙালি ঐতিহ্য। কিন্তু পঞ্চদশ শতকের আগে
পোস্তর নামটারই অস্তিত্ব ছিল না বঙ্গজীবনে, মুঘলরা মশলা হিসাবে পোস্ত এনেছিল এদেশে। আলু এসেছিল পর্তুগীজদের সাথে আর
ডাল এসেছে মধ্য ভারত থেকে মূলত বর্গিদের হাত ধরে। তাহলে হাতে রইল পেনসিল। মাছ-ভাত, বলতে গেলে এই দুটোই আদি তথা অকৃত্রিম বাঙালি খাদ্য, বাকি সবই বদলেছে সময়ের সাথে। মাছের রন্ধনশৈলীও বদলে ৩৬০
ডিগ্রী কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করেছে সময়সারণি জুড়ে। বর্ণপ্রথায় জর্জরিত সংখ্যাগরিষ্ঠ
বঙ্গ হিন্দুসমাজে প্রাক মধ্যযুগীয় বঙ্গনারীর হেঁসেলে খুব বেশি বিকল্প ছিল না।
আইনের সবকিছুই উচ্চবংশীয় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়দের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল। তারাই মূলত অর্থবান হতো, তাই ধর্মীয়
অনুশাসন তাদের সাজত। এক পেট খিদে নিয়ে ধর্মের গানে ঘুম আসে না, তাই নিম্নবর্গীয় কায়স্ত হোক বা শূদ্র তথা দরিদ্র
নিম্নবিত্ত কৌম সমাজে ধর্মীয় বেড়াজালের বাইরে একাধিক খাদ্যের বিকল্প ছিল। সমস্যা
ছিল আর্ত আর বিধবাদের, যা আজও কিছুটা
আছে বৈকি গ্রাম্য হিন্দুসমাজে।
খ্রীস্টপূর্ব ময়ূর সাম্রাজ্য থেকে, শক, হুন, কুষাণ হয়ে গুপ্তযুগ পর্যন্ত বাঙালির কী যে খাদ্যাভ্যাস
ছিল সেটা বড় গোলেমেলে একটা বিষয়, গোলেমেলে এই
জন্য- কারণ তখন আজকের ফর্মের এই বাঙালি জাতিটারই অস্তিত্ব ছিল কিনা কে জানে!
বারেবারে হানাদারেদের আক্রমণ ঘটেছে সিন্ধু-গাঙ্গেয় অঞ্চলে, নিশ্চয় সেই সময়েও খাদ্যের পরিবর্তনও এসেছিল প্রতিবার।
কিন্তু তা লিপিবদ্ধ নেই, তাই জানার
সুযোগ নেই। এক্কেবারে শুরুর যুগে যা ছিল তা মূলত আর্য-অনার্যের দ্বন্দ্ব- সেই
দ্বন্দ্ব যে খাদ্যাভাসেও থাকবে তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। প্রথমে মুসলমান ও পরে
ইউরোপীয় নানা হানাদার জাতির প্রাদুর্ভাবে বাঙালির রান্নাঘর ক্রমশ সম্পৃক্ত হয়েছে, বিকল্পের দ্বারা সমৃদ্ধ হয়েছে- লিখিত ইতিহাসের দরুন এটা
জানা যায়।
এই খাদ্য সম্প্রীতিকে আপন করতে অবশ্য দণ্ড কিছু কম দিতে হয়নি ইতিহাসের এই
দীর্ঘপথকে, আজও গোমাংস ভক্ষণের শাস্তি
গণপিটুনিতে মৃত্যু, কিম্বা হালাল
মাংস বিনা একটা বড় জনগোষ্ঠী- মাংস ছোঁয় না অবধি। প্রাচীন বঙ্গীয় সমাজে সকালে
হবিষ্যান্ন সেবন করে গঙ্গাজল দিয়ে আচমন করে তিনবার ‘তৈলাধার পাত্র কিম্বা
পাত্রাধার তৈল' মন্ত্র উচ্চারণ করা সমাজপতিরা মহা
অধ্যাত্মতেজে মুনি ঋষিদের মতো টেলিস্কোপিক নজর দিয়ে গোটা সমাজের খাদ্যাভ্যাসের
প্রতি কড়া নজর রাখত, বিশেষ করে
ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের উপরে। স্মার্তরা কখনই অন্ত্যজ শ্রেণীর রোজনামচার উপরে
দৃষ্টিক্ষেপ করতে ততটা উৎসাহী ছিলেন না। আজ এই অনুপরিবার কাঠামোতে অন্তর্জালময়
ইথারীয় জীবনে কে যে কী খাচ্ছে তা পাশের মানুষটি অবধি জানতে পারে না- সোস্যালমিডিয়াতে ছবি পোষ্ট করে নিজে জানান না দিলে।
অনার্য তথা শুদ্ধ ভারতীয় আদিবাসী খাদ্যশৈলীতে ভাতের গুরুত্ব ছিল সর্বাধিক, তা গরম হোক বা গেঁজানো। এর বাইরে নানান ফলমূল, কন্দ, বাঁশ, শাকপাতা, বুনো মাশরুম, দুগ্ধজাত
সামগ্রীর সাথে সাথে শিকারকৃত মাছ ও প্রাণীজ মাংসের একটা বিস্তৃত বিকল্প ছিল। গেঁড়ি, গুগলি, সাপখোপ, পাখি, বাদুড় কিছুই বাদ
দিত না সস্তার আমিষে নিজেকে পুষ্টি দান করতে। স্বভাবতই নিজেদের উচ্চ জাতি ভাবা
আর্যরা- অনার্যদের প্রতিটি খাবারকে বর্জন করেছিল স্মৃতিশাস্ত্রে, যা আজও বহমান। এদের চিকিৎসা ব্যবস্থাটার গোটাটাই
দাঁড়িয়েছিল বা আছে ভেষজ খাদ্যাভ্যাসের উপরে। খুব ভুল না হলে যাযাবর আর্যদের
আয়ুর্বেদের হাতেখড়ি অনার্যদের ভেষজ খাদ্যচর্চা থেকেই। আজও আদিবাসী সংস্কৃতিতে
খাদ্যাভ্যাসের তেমন কিছুই পরিবর্তন সংগঠিত হয়নি, প্রায় আদি অকৃত্রিম রয়েছে। আমাদের ভারতীয় বাঙালি সমাজ আদিবাসীদের অবশ্য
বাঙালি বলে স্বীকৃতিই দেয় না। সেই অর্থে বলতে গেলে আদিবাসীরা সংখ্যাতে সত্যিই অনেক
কম,
দুই পার মিলিয়ে বাঙালিদের মধ্যে মুসলমানেদের
সংখ্যাই ৭০% এর বেশি- অথচ পশ্চিমবঙ্গীয় হিন্দুসমাজে কমিউনিস্ট বাদে প্রায় সকলেই
‘বাঙালি মানে’ শুধুই হিন্দু ধর্মীয় সম্প্রদায়কেই বোঝে- নতুবা শুনতে হতো না “ওহ, আপনি মুসলমান, আমি ভেবেছিলাম বাঙালি”।
আহার কয় প্রকার, এটা জানতে হবে।
কারন আমরা খাদ্য গ্রহনই করি আহার তথা জঠরাগ্নি নিবৃত্তির জন্য। শাস্ত্র বলছে-
গঠনগতভাবে আহার দুই প্রকারের- স্থুল আহার ও সূক্ষ্ম আহার। স্থুল আহার
ক্ষুন্নিবৃত্তি করে, এ থেকে মলমুত্র
সহ ৩২ প্রকারের অশুচি উৎপাদিত হয়। আর সূক্ষ্ম আহার জঠরাগ্নিকে প্রজ্বলিত রাখে ও
দেহ গঠিত করতে সাহায্য করে, এ থেকে তেজ বা
শক্তি উৎপন্ন হয়। আহারে যে নিবৃত্তি লাভ হয় তা মূলত চার প্রকারের- প্রথম- ইন্দ্রিয়
দ্বারা ভক্ষণ, যা অন্তরে সুখবেদনার সঞ্চার ঘটিয়ে
মনকে উজ্জীবিত করে তোলে, চিত্ত বিশুদ্ধ
হয়। দ্বিতীয়টি স্পর্শভক্ষণ, এতে হাতে করে
খাদ্যদ্রব্য ছোঁয়া থেকে শুরু করে দাঁত দিয়ে চূর্ণ করে মলাশয় অবধি পৌঁছানো অবধি এই
প্রক্রিয়া চলে। তৃতীয়ত- কবলীকার ভক্ষণ, তুমুল ক্ষুধাতৃষ্ণাক্রান্ত ব্যাক্তি হিতাহিত শূন্য হয়ে যখন গোগ্রাসে খাদ্য
গ্রহণ করে তখন তার বৌদ্ধিক জ্ঞান লুপ্ত হয়, একেই কবলীকার আহার প্রণালী বলে। চতুর্থত হচ্ছে সুষম বা বিজ্ঞান আহার, যার মাঝে উপরোক্ত তিন ধরনের আহারের সুষম বন্টন থাকে।
যদি বলে খাদ্যের মূল বিভাগ কি! উত্তরে একটাই শব্দ আসবে- রুচি। যার যেমন
রুচি সে তেমন খায়, আর এই রুচি
তৈরিতে অনেকটা ভূমিকা থাকে পারিপার্শ্বিক সমাজ ও ধর্মীয় বিশ্বাসের। বাঙালির মাঝে
ইসলামায়নের পূর্বে ধরে নেওয়া যায় তারা সকলেই হিন্দু ছিল, সুতরাং সেই সমাজ আজ হিন্দু-মুসলমানে আড়াআড়ি ভাগ হলেও
জিনগত রুচির বিলোপ ঘটেনি। শুধুমাত্র মুসলমান বলেই কেউ খুব বেশিদিন উত্তরপ্রদেশের
আলিগড় কিম্বা আরবের মক্কার কোনো ঘরে দু’দিনের বেশি তাদের স্থানীয় খাবার নিতে পারবেনা। সমস্ত স্বত্বা তখন ভাত
ভাত করে আকুল হয়ে যাবে। বসিরহাটের হিন্দু ভাইটি ওপাড় বাংলার হানিফ শেখের বাড়িতে
চাট্টি ভাত খেয়ে যতটা শান্তি পাবে, রাজস্থানের স্বজাতীয় কোনো হিন্দু বাড়িতে মোটেই সেই তৃপ্তি আসবেনা। তবে
ধর্মীয় কারনে কারো রুচিতে গোমাংস পাপ, তো কারো রুচিতে গেঁড়ি গুগুলি সাপ- এভাবেই ধর্ম রুচিকে নিয়ন্ত্রণ করে
সংক্ষিপ্ত করে দেয়।
আজকের ট্যেকস্যাভি প্রজন্মের কিশোর-কিশোরীরা যাদের জন্ম নতুন শতকে, ইন্টারনেটের কল্যাণে তারা বিশ্বনাগরিক। জনপ্রিয় কার্টুন
আর বিজ্ঞাপনের দৌলতে তাদের নিজস্ব কোনো খাদ্যরূচিই নেই। তারা সপ্তাহে একবেলা
‘রাইস’ খায়, সকাল ১০টায় ব্রেকফার্ষ্টে
কর্নফ্লেক্স কিম্বা মুসলি, দুপুরে নুডলস।
বিকালের নাস্তায় পিৎজা পাস্তা, রাত্রে সুসি, ফো, হুমুস, বার্গার কিম্বা বাস্যান্ডুইচ। আউটিং বা গেটটুগেদারে ফ্রায়েড রাইস বা
বিরিয়ানি- তাও সস দিয়ে। এরা কেউই ‘ফিস’ ছোঁয়না, বিষয়টাই নাকি ভীষণ ফিসি। মাংস বললে কেবল পোল্ট্রি মুরগিই বোঝে। এরা না বাঙালী না ভারতীয় না বিদেশী, এক আজব
জগাখিচুড়ি। অথচ ইংরেজরা আসার আগে ভারতীয় সমাজে ছিল তিনবেলা খাবার অভ্যাস, কিন্তু তার কোনো নাম ছিলনা, না ছিল ধরাবাঁধা কোনো সময়জ্ঞান। ইংরেজ চলে গেছে, রেখে গেছে তাদের খাদ্যাভাসের বিভক্তির লেগাসি, এক্সট্রা লেজের মত। তারপরেও US টাইমধরে চলা বঙ্গপুঙ্গবেরা দুপুরে ব্রেকফার্ষ্ট করে আর
ভোরে ডিনার। এখন তো আবার ‘ব্রাঞ্চ’ চলে এসেছে, উঁহু শাখাপ্রশাখা ওয়ালা ব্রাঞ্চ নয়- ব্রেকফার্ষ্ট ও লাঞ্চের ধরেমুড়ো সন্ধি-
যা লাঞ্চও আবার ব্রেকফার্স্টও বটে। হয়ত এটা কোনো একটা যুগসন্ধিক্ষণ, ভেঙে গড়ে নতুন একটা রুচিধারার জন্ম হবে, তাই আমরা যারা সাবেক প্রজন্মের শেষ সলতে তাদের এগুলোতে
মেনে নিতে এতোটা অসুবিধা হয়।
সনাতন বাঙালি খাবারে দুটো মুখ্য বিভাগ ছিল, যথা তামসিক ও রাজসিক। রাজসিক অবশ্যই রাজা ও তৎবর্গীয়দের জন্য, তামসিক ছিল সন্ন্যাসী ও অসহায় গরিবদের জন্য। এদেশে
খ্রিস্টীয় খাবারের তেমন প্রচলন ঘটেনি যেমনটা লাতিনভূমে ঘটেছিল স্পেনীয়-পর্তুগীজ
নামে। তবে ইসলাম পূর্ব যূগে ভারতভূমে হিন্দু ধর্মের চেয়েও বৌদ্ধ ধর্ম বেশি প্রচলিত
ছিল,
সেই বৌদ্ধ সমাজে দেব স্থানীয়দের জন্য যে খাদ্য
প্রস্তুত হতো তার নাম ‘ওজ’। এই ওজ হচ্ছে অত্যন্ত পুষ্টিকর ভিটামিনযুক্ত খাবার যা
সাধারণ মানুষের হজমের অনুপযুক্ত বলে প্রচারিত ছিল- বলাই বাহুল্য এই অতিরিক্ত পুষ্টি
প্রাণীজ মাংস ও চর্বি থেকেই আসত। এখানে দেবতা মানে ঈশ্বর নয়, দেবতা কোনো সিদ্ধপুরুষ- যিনি নির্বাণ লাভ করেছেন। বৌদ্ধ
বিশ্বাসে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই।
প্রভু বুদ্ধের অন্তিম ভোজে ‘শূকরমাদ্ধব’ নামের একটি শুঁটকি মাংসের পদ ছিল, যা নাকি পচা ছিল। সেই খেয়ে বুদ্ধের আমাশয় রোগ হয় ও তাঁর
পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটে। কেউ কেউ সেটাকে শূকরের মাংস না মানলেও অধিকাংশ বৌদ্ধ পণ্ডিত
শূকরমাদ্ধবকে- শূকরের মাংসের শুঁটকি বলেই মত দিয়েছেন, কেউ কেউ মাশরুম বলে অবিহিত করেছেন। স্রোতাপন্ন
আর্যশ্রাবকরা ভীষণ চালাক ছিলেন, তারা নিজেরা প্রাণীহত্যা করতেন না। কিন্তু সাধারণ লোকে প্রাণী হত্যা করে
ভিক্ষুসংঘের জন্য খাদ্য তৈরি করে স্রোতাপন্ন আর্যশ্রাবকে পরিবেশন করলে তিনি
চোব্য-চোষ্য-লেহ্য করে উদরস্থ করে নিতেন। আমার বলার উদ্দেশ্য, ‘জীব হত্যা মহাপাপ’ বলা স্বয়ং বুদ্ধদেব নিজেই মাংস খেতেন
ও আজকের বৌদ্ধ ভিক্ষুরা অধিকাংশই মাছ-মাংস তথা প্রাণীজ প্রোটিন খান। মাংস খাওয়ার
চল থাকলে বিবিধ প্রকারের রন্ধনশৈলীও ছিল নিশ্চিত। প্রামাণ্য দলিল না থাকার কারণে
সে বিষয়ে বিশদে জানার উপায় নেই।
ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে ইসলামের প্রবর্তকেরা তথা
আব্রাহামীয় ধর্মের সকল শাখাগুলিই মধ্যপ্রাচ্যের বেদুঈন-যাযাবরদের দ্বারা তৈরি
ধর্মবিশ্বাস। যাদের বসবাস শুষ্ক মরু অঞ্চলে, মাংস আর দুধ ছাড়া খাদ্যের তেমন বিকল্প নেই। মশলার ভিন্নতা ও পরিমাণের
তারতম্য হলেও সেখানেও মাংসের রন্ধনশৈলীর অভাব ছিল না। আজও আমাদের অধিকাংশ মাংস
রন্ধনশৈলী সেই মধ্যপ্রাচ্যেরই, তবে তাতে ভারতীয়
মশলা ও শিল্পী বাবুর্চিদের উদ্ভাবনী শিল্প মিশে আছে।
বেদ-পুরাণে সাধারণ মানুষদের জন্য যব, তণ্ডুল ইত্যাদি শস্যের উল্লেখ রয়েছে। আর্যদের প্রধান খাদ্যই ছিল মাংস, বনজ ফলমূল, তিল, সুটিডাল আর দুধ, কারণ তারাও পশুপালক যাযাবর জাতিই ছিল। অথর্ববেদের
৪/১৪০/২ সূক্তে এটারই উল্লেখ রয়েছে।
“ব্রীহী মত্তং যবমত্তোমথ তিলং
এষ বাং ভাগো নিহিতো রত্নম ধেয়ায় দন্তৌ মা হিংসিষ্টং
পিতরং মাতরং চ”।।
পরবর্তীতে আর্যরা বর্ষাকালে অস্থায়ী চাষাবাদ শিখলে যব ও গমজাতীয় দানা শস্য
উৎপাদন করতে শিখলেও সবজি উৎপাদন শেখে অনেক পরে। ধান যেহেতু আদিবাসীদের শস্য ছিল
তাই আর্যরা বহুদিন সেটা ছুঁয়েই দেখেনি। তাই বেদের এক্কেবারে শেষের দিকে ধানের কথা
এসেছে। চাল সেই অর্থে বঙ্গ সমাজে আজও দেবতাদের ভোগে ভাত হিসাবে স্বীকৃতি পায়নি, তাকে প্রসাদ নামে ডাকা হয়, আজও ভোজসভার আয়োজন করা হলে সেখানে লুচি খাওয়ানোটাই সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত কাজ, ভাত আসে শেষে কারণ তা নিকৃষ্ট। বৈদিক সমাজে মাংসের
ব্যবহার যথেচ্ছভাবে ছিল, কিন্তু তা
ব্রাহ্মণদের জন্য উপলব্ধ ছিল না প্রকাশ্যে।
ব্রাহ্মণেরা সারা বছর ফলমূল, দুধ, ঘি খেতেন, প্রাণীজ আমিষ ভক্ষণের জন্য যজ্ঞানুষ্ঠানের আয়োজন করতেন
বা বলা ভাল রাজাদের দ্বারা আয়োজন করাতেন ধর্মের নামে। সেই যজ্ঞের আগুনে ষাঁড়, বন্ধ্যা গাভী, মহিষ, পুরুষ ছাগল বা অজ মাংস ও বৃদ্ধ
অশ্বের মাংসের রোস্ট তথা কাবাব বানান হতো বিশুদ্ধ ঘি সহযোগে। শাস্ত্রে একে ‘বলি
প্রথা’ বলা হয়েছে। কোরবানি হোক বা বলি, খায় তো সেই মানুষই- সবই আসলে ধর্ম বাঁচিয়ে সস্তায় প্রাণীজ প্রোটিনের যোগাড়
দেওয়ার ফিকির। তাছাড়া ঋষি-মুনি ও দেবতাদের দৈনন্দিন সান্ধ্য আসরে যে সোমলতার রস
পান করা হতো- তার চাট বা চাখনা হিসাবে মাংসই থাকত। নতুবা ঋষি যাজ্ঞবাল্ক্য বলতেন
না,
“অশ্নামি প্রবামহমংসলং চেৎভবতি”, অর্থাৎ গোমাংস যদি কোমল হয়; তবে এনে ভোজন করব। ঋগ্বেদ- ৩/২/২১
আমরা বাংলা দেশের লোক, যতই আজ দেশ ভাগ
হয়ে যাক- দীর্ঘ বর্ষাকাল যুক্ত আবহাওয়ার গাঙ্গেয় অববাহিকার শতশত নদনদী, তাদের শাখানদী, উপনদীতে পুষ্ট। এই পলিপুষ্ট অঞ্চলে উর্বর জমির চেয়ে চাষের উপযুক্ত আর কিছু
হয় না,
স্বভাবতই এখানে বর্তমান আধুনিক সভ্যতায় যে
চাষযোগ্য নিরামিষ সবজি-ফসল খাওয়ার বিস্তার ঘটবে তাতে আর আশ্চর্য কী! তাছাড়া আমাদের
এই স্যাঁতস্যাঁতে ঘর্মাক্ত আবহাওয়াতে পরপর দু'দিন পশুর মাংস খেলে তৃতীয় দিন আর কাজেকর্মে যেতে হবে না, টয়লেট এক প্রেম কথার নতুন পর্ব রচিত হবে। বঙ্গভূমের
বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নদনদী, খাল, বিল, বাঁওর, হাঁওরের মাছ আজও সহজলভ্য সাধারণ গরিব মানুষের কাছে, আর তার সাথে সমতল জমিতে সুলভে চাষের ধান- সুতরাং
মাছে-ভাতে বাঙালি শব্দটাই একমাত্র যথাযথ বাঙালির জন্য। তবে সে মাছ রান্নাতে অবশ্যই
পেঁয়াজ-রসুন ব্রাত্য ছিল।
তা সত্ত্বেও আজকের বাঙালি হেঁসেলের জনপ্রিয় সবজি বেগুন, ঢেঁড়স, টম্যাটো, লঙ্কা, পেঁপে, আনারস, পেয়ারা, ভুট্টা, চিনেবাদাম কোনো
কিছুই ছিল না অষ্টাদশ শতক অবধি, যেমন ছিল না
আলু। ইউরোপীয় সাহেবরা এদেশের লাউ, ওল, কচু, মুলোর একঘেয়েমি
থেকে নিস্তার পেতে ওই সবজিগুলোর আমদানি করে। এই ভাবেই মটরশুঁটি, গাজর, কুল জাতীয়
ফলগুলো খাঁটি বাঙালির নিজস্ব খাবারে পরিণত হয়ে গেছে। এমনকি ছানা ও দই তৈরির
কৌশলটিও বাঙালি শিখেছিল ফরাসডাঙার পর্তুগীজ সাহেবদের থেকে। সুতরাং, নিরামিষ রান্নাতে ছানা বা পনিরের ব্যবহারও কয়েকশো বছরের
বেশি পুরাতন নয়। তবে হ্যাঁ, বাঙালির
ইতিহাসের শুরু থেকেই তেঁতুল কিন্তু খাস বাঙালি খাবার, তাতে সে যতই এখন দক্ষিণ ভারতের খাবারের প্লেটের কোহিনুর
হোক না কেন।
১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের
আকালের সময় গম ছড়িয়ে পরে দেশব্যাপি, তার আগে অপ্রতুলতার কারনে বাঙালির কাছে গম মানে
ছিলো ‘বড়লোকি’ ব্যাপার স্যাপার। বিয়ে, শ্রাদ্ধ বা যেকোনো অনুষ্ঠানে লুচি খাওয়াটাকে
ঐতিহ্য ও আভিজাত্যর প্রতীক হিসাবে দেখা
হতো। তাই খুব সম্পন্ন পরিবার ছাড়া বাঙালি কখনই রুটিতে অভ্যস্ত ছিল না, কারণ আমাদের যে প্রাচীন সাহিত্য সেখানে তাওয়ার উল্লেখ
প্রায় নেই বললেই চলে। সর্বত্রই হাঁড়ির উপস্থিতি, বাসনকোসনের শুরুতেই হাঁড়িকুঁড়ি অর্থাৎ হাঁড়ি ও কড়াই আসবে, তারপর থালা, বাসন, বাটি, হাতা, খুন্তি ইত্যাদি।
যেখানে ভাত খাওয়া হয় সেই সমাজেই একমাত্র হাঁড়ির দেখা মেলে, যেখানে ভাত নেই সেখানে আর যা কিছু থাকুক, হাঁড়ি পাওয়া যাবে না।
বেদে মাসকলাই ডালের উল্লেখ থাকলেও মধ্যযুগীয় সাহিত্য বা প্রাথমিক পর্যায়ের
ইংরেজ আমলের লেখালেখিতে ডালের উল্লেখ পাওয়া যায় না। বস্তুত ইংরেজদের হাত ধরেই
‘লেন্টিলস ও বিনস’ এর বিস্তারে ডাল এসে ঢোকে বাঙালির হেঁসেলে, পরে বর্গিদের আক্রমণ নিত্য ঘটনা হয়ে গেলে তাদের শক্তির
উৎস ‘ডাল’কে আপন করে নেয় বাঙালি, তাদেরই প্রতিরোধ
করার জন্য। মধ্যযুগে বাংলার চিরাচরিত খাদ্যাভাসে যখন ঠিক বদলের রঙ ধরতে শুরু করেছে, ওদিকে ঢাকাকে কেন্দ্র করে মুসলমান সুলতান-নবাবেরা
ক্ষমতার কেন্দ্র পত্তন করেছেন, এদিকে সেই তালে
রয়েছে গৌড়- ঠিক সেই সময় শ্রী চৈতন্যের নেতৃত্বে বৈষ্ণব জীবনধারার প্রবর্তন ঘটে। এই
বৈষ্ণবদের ধারাটা গোটাটাই কঠিন নিরামিষাশী হয়ে যায়।
প্রাণীজ আমিষের ঘাটতি ও একঘেঁয়ে নিরামিষ রান্নার মাঝে বৈচিত্র্যৈ আনতে
বৈষ্ণব হিন্দু সমাজে এক বিপ্লব সংগঠিত হয়। ফল ও সবজির খোসা থেকে গাছ-লতা-গুল্মের
ডগা,
কাণ্ড, শিকড়, ফুল, পাতা সব কিছু দিয়ে বিবিধ ব্যঞ্জন বানানো শুরু করে।
রন্ধনশৈলীতেও আসে আমুল পরিবর্তন। নিজেদের সনাতন পদ্ধতির সাথে বিজাতীয় যবনধারার
মিশ্রণ ঘটায় প্রণালীতে। রাঁধতে শেখে- ভাজা, সিদ্ধ, পোড়া, শুক্তো, ঘণ্ট, ছ্যাঁচড়া, ছেঁচকি, চচ্চড়ি, ছক্কা, ছোকা, ঘ্যাঁট, লাবড়া, ঝাল, ঝোল, ভাপা, ডালনা, দোলমা, অম্বল, টক... এ দীর্ঘ অভিধান। খাদ্য সংস্কৃতি হলো জাতির
আত্মপরিচিতি, আজ কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে জাতিতে
খণ্ডিত করে দেওয়া হলেও স্বাদে আজও দুই বাংলা এক পাতেই রয়ে গেছে। ইলিশের মুড়ো দিয়ে
কচুর শাক হোক বা ডুমোডুমো লাউ দিয়ে জিড়ের ফোঁড়নের সোনা মুগের ডাল- হাপুস হুপুস শব্দে দুই পাড়ের মানুষেরই তৃপ্তির ভাত পেটে ঢুকে যায়।
শাসক যেহেতু মুসলমান, তাই সাধারণ
অবৈষ্ণব ও অব্রাহ্মণ হিন্দুদের খাদ্যচর্চাতে মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুনের প্রচলন ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। হিং ও আসে
মধ্যপ্রাচ্য থেকে, কিন্তু বৈষ্ণবরা
সেটাকে গ্রহণ করে নিরামিষ হিসাবে। স্মৃতিশাস্ত্রকে উপেক্ষা করে আজও দুর্গা পুজোয়
মাংস রান্না হয়, তবে পেঁয়াজ-রসুন না দিয়ে।
শাস্ত্রের মান রক্ষা করা হয়। জাত একবারই যায়, দ্বিতীয়বার নয়। সেই সূত্র মেনেই বাঙালি বাবু তথা মধ্যবিত্ত সমাজ অতি সহজেই
বিদেশী চপ, কাটলেট, ফ্রাই, স্টু এর
সংস্কৃতিতে নিজেকে জারিত করে নেয় যখন ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসকের দলেরা এদেশে আসে।
বলা যেতে পারে, মুসলমানেরা
বঙ্গদেশে এসেই মাছ খাওয়া শিখেছিল বাঙালির কাছে। ব্রিটিশদেরও মাছ-মাংস রান্নাতে
তেমন বেশি পদের বিকল্প ছিল না। মাছ মানেই ফ্রাই তথা ভেজে খাওয়া, আর মাংস হয় শুঁটকি করে খাওয়া বা সেঁকে কাবাব বানিয়ে
খেতো। ভারতীয় মশলার কল্যাণেই তাদের কারি অতটা সুস্বাদু হয়, সাধে কি আর ভাস্ক-দ্য-গামা মশলার জন্য অজানা সমুদ্রে
পাড়ি দিয়েছিল অচেনা ভারতের সন্ধানে। রসনা তৃপ্তির চেয়ে তৃপ্তি জীবনে আর কীসেই বা
আসে। কবিকঙ্কন বড় দর্শনতত্ত্ব দিয়ে লিখে গেছেন- যে মহিলা তৃপ্তিদায়ী ব্যঞ্জন
রাঁধতে জানল না, সে সংসারের কিছুই জানল না।
তেতো, নোনতা, ঝাল, টক, ও মিষ্টি- এই পঞ্চ স্বাদের খাদ্য সামগ্রী আমাদের বাঙালি
খাবারের মূল বৈশিষ্ট্য। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে একটা আম বাঙালি পরিবারে সবজি ও
মাছ রান্না প্রায় সমগোত্রীয়, কেবল হিন্দুদের
রান্নার ফোঁড়ন বৈচিত্র্য বেশি। সেই তুলনাতে মাংস রান্নাতে মুসলমান পরিবারগুলো বেশ
কয়েক যোজন এগিয়ে থাকে মশলার ব্যবহার কৌশল ও বিবিধ বিকল্প প্রণালীর দৌলতে। আজকাল
মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তের ঘরে দক্ষিণ ভারতীয় পোহা, উপমা, ইডলি, ধোসা সহ চাইনিস নুডলস, ইতালিয়ান পাস্তা সহ কত রকমারি খাবারেরই না সমাবেশ ঘটেছে। আসলে খাদ্যাভ্যাস
একটা প্রবাহিত নদীর মতো, যত বেশি পথ চলবে
তত শাখা-প্রশাখারা এসে মিলিত হবে ও মিলেমিশে নিজস্ব ধারা তৈরি হবে। যেমন ধরুন-
কোলকাতার ফুটপাতের ওই অপুর্ব স্বাদওয়ালা চাউমিন- দুনিয়ার কোথাও পাবেন না। খোদ
চিনা-জাপানিরাও এভাবে ভেজে ডিম-মাংস-ফুলকপি-গাজর দিয়ে নুডুলস খায় না। কোলকাতায় চাইনিস স্ট্রিট ফুডের নামে যে
পদ গুলো বিক্রি হয়, আসল চিনারা জানতে পারলে নিশ্চিত মানহানির মামলা করতো।
সভ্যতার শুরুতে যখন দেশ ছিল না তখন মানুষ কাঁচা খেতো। তারপর আগুনে ব্যবহার
শিখলে পুড়িয়ে খেতে শিখল, ক্রমান্বয়ে শিখল
সিদ্ধ করে খেতে। সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে ভেজে খাওয়া। লিখিত সভ্যতার ১০ হাজার বছরের
বিবর্তনে মূলত এই চারটেই মূল খাদ্যধারা। বাঙালি এই চারটেতেই রয়েছে। এক খঞ্চা আদর্শ
বিরিয়ানিতেও এই চারটিই রয়েছে। সিদ্ধ চালের উপরে ভাজা পেঁয়াজ বেরেস্তা তার উপরে
কাঁচা স্যালাড- আর একপ্লেট পোড়া মাংস অর্থাৎ কাবাব। ব্যাস আর কী চাই! এই কারণেই
ইতিহাস,
ভূগোল, বাঙালি সবকিছু মিশে গেছে বিরিয়ানিতে।
বিরিয়ানি জন্দাবাদ
অকপট জিন্দাবাদ।
তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না
⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...
-
ছোটবেলায় বাবা বলতেন "শাগ খেলে বাঘের বল"। যদিও তিনি ওটাকে শাকই বলতেন আমরা কচি কানে বাঘের সাথে মিলিয়ে শাগ শুনতাম। এহেন পরিস্থ...
-
(১) জাতীয় ডিম্ভাত দিবস ১৯৯৩ সালের ২১শে জুলাই এর জমায়েত কী উদ্দেশ্যে হয়েছিলো জানেন? তোলামূলের রাজ্যে না জানাটাই আপনার অধিকার। ভোটার তাল...

