বৃহস্পতিবার, ২৫ মার্চ, ২০২১

বামদলে পাত্র-মিত্র ও গুরুদেব


গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে একজন বিশিষ্ট দার্শনিক ছিলেন তা তার বহু লেখায় ছাপ রেখে গেছেন। তেমনই একটা দূরদর্শী রূপকধর্মী গল্প তোতা কাহিনী। মূর্খ রাজা, আর তার চারপাশে ঘিরে থাকা নিম্নমেধার স্তাবক কুল তথা চামচারা। এই চামচা বা স্তাবকেরা সমাজে পরিচিত- পাত্র, মিত্র, অমাত্য, পারিষদ, উমেদার, চাটুকার, ভাঁড় ও অন্বয় পুরুষের দলেরা। এখানে পণ্ডিতেরা স্থান পায় না, কারণ ভাঁড়েরা পণ্ডিতের পোশাকে কৌতুক দেখায় কুমন্ত্রণা চক্রের প্রত্যক্ষ মদতে।

এখন সেই রাজন্যদের কাল গত হয়েছে, গণতন্ত্রের পতাকা পতপত করে উড়ছে উন্নত বিশ্বসহ তৃতীয় বিশ্বের আমাদের দেশেও। গভীর জনঘনত্বের বহু ভাষাভাষী বহু ধর্মের আপাতদৃষ্টিতে সচেতন আর বুদ্ধিমান সেজে থাকা ক্রমশ পিছনের সারিতে ছুটে চলা একটি রাজ্য এই পশ্চিমবাংলা। যেহেতু রবিঠাকুরও এই মাটিরই মানুষ, তাই আমাদের ক্রোমোজোমকে তিনি এক শতাব্দী আগেই নিখুঁতভাবে ম্যাপিং করে ফেলেছিলেন।
আজও দেখুন, কেউ কেউ তারাশঙ্করের লেখা তথা সত্যজিতের চিত্রায়িত- জলসাঘরের ‘ছবি বিশ্বাস’ সেজে পুরাতন অট্টালিকার পলেস্তারা খসা বর্তমানে বিরাজমান, মোটা মোটা থামের পাশে আসক্ত শরীরে আকাশপানে ঝুলে ঢাকা ঝাড়বাতির পানে চেয়ে ‘আত্মসমীক্ষা’ করেন- যা যৌবনের বৈভবের প্রতীক। দেওয়ালে টাঙানো ক্রমশ বেরঙা হতে থাকা পূর্বসুরীদের তৈলচিত্র, মেঝেতে ফরাশ পাতা, তার উপরে ‘ক্ষমতার’ চেয়ার, তাকিয়া-বালিশ। জমিদারী চলে গেলেও, বয়সের ভারে ন্যূজ জমিদার ক্ষীয়মান পরিস্থিতিতে জমিদারসুলভ অশোভনীয় অন্তঃসারশূন্য বুর্জোয়া আস্ফালন ধরে রেখেছেন ষোলআনা।
অতঃপর ধুলোমাখা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঝুলফাঁদ সরিয়ে নিজেকে দেখার পালা জমিদারের। পিছনে সামান্য দূরে সেই প্রলেতারিয়েৎ লোকটি একটা কালি লাগা কাঁচের লন্ঠন নিয়ে দাঁড়িয়ে, জমিদারির খাদের কিনারে পৌঁছে অতীতের স্বপ্নে মশগুল, যার কথা কখনও শোনেননি রাজামশাই। পাত্র-মিত্রেরা কবেই পালিয়ে গেছে নিজের আখের গুছিয়ে। সময়ে শিক্ষা নেওয়ার ভান করা জমিদার- শুধুই নিস্তব্ধ হাহাকারের প্রতিমূর্তি। এখন সম্পদ আর আভিজাত্য ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্কে এসে দাঁড়িয়েছে। শুধু পরে আছে ব্যর্থতা, ঔদ্ধ্যত্ব, দম্ভ আর একরাশ একাকীত্বে ঠাসা শূন্যতা।
জলসা ঘর হোক বা তোতাকাহিনী, আসলে এ সবই রূপক। শূন্যে পৌঁছাবার জন্য আকাঙ্ক্ষা তীব্রতর হলে, যোগ্য পাত্র-মিত্র ঠিক জুটে যায়। এর পর শুধুই রয়ে যায় আত্মসমীক্ষা আর চণ্ডীমণ্ডপে (আধুনা ফেসবুক) জমিদারের এককালের চামচা তথা স্তাবক কুল। জমিদার তার জমিদারিত্ব হারিয়ে অট্টালিকাতে একা মৃত্যুর প্রতীক্ষাতে আয়না দেখে। একজন পারিষদ ছিলেন, যিনি বিবেকের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন- সৎ পথ দেখাবার চেষ্টাই করতেন। দীর্ঘদিন নিম্নমেধার স্তাবক, পাত্র-মিত্র-উমেদার-চাটুকারের মাঝে থাকার দরুন, ততদিনে জমিদারে মেধা, বিবেক, বোধ, চেতনা সবকিছুই অবলুপ্ত হয়ে গেছে।
গুরুদেবের তোতারা আজও শিকড়হীন শৃঙ্খলার শিকলে আঁটকা পরে, এখন খালি শেখানো পুঁথিগত বুলি আওড়ায়। যে বুলি আমজনতার বোধের বাইরে। একটা জরাজীর্ণ খাঁচাকে ‘উপযুক্ত স্থান’ নাম দিয়ে সেখানেই অবোধ্য ভাষায় আলাপচারিতা করতে করতে, মুক্তভাবে গাইতে ভুলে গেছে, মুক্তভাবে উড়তে ভুলে গেছে, মুক্তভাবে কথা বলতে ভুলে গেছে, মুক্তভাবে ভাবতেও ভুলে গেছে- তোতার মতো।
ক্রমাগত শিক্ষাহীন আত্মসমীক্ষারত নামে ধামাচাপা দেওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলে কী হয় সেটা গুরুদেবই লিখে গেছেন- “পাখি আসিল। সঙ্গে কোতোয়াল আসিল, পাইক আসিল, ঘোড়সওয়ার আসিল। রাজা পাখিটাকে টিপিলেন, সে হাঁ করিল না, হু করিল না। কেবল তার পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনো পাতা খস্‌খস্ গজ্‌গজ্ করিতে লাগিল”। সবই থাকবে, শিকল, খাঁচা, পাত্র, মিত্র, অমাত্য সব- শুধু পাখিটাই থাকবে না।
চলুন, আরেকবার তোতা কাহিনীর পাতা উল্টে নিই, জলসাঘরটাও ঘুরে আসি- বইয়ের পাতা বেয়ে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...