নির্বাচন চলাকালীন প্রতিপক্ষকে এভাবে পড়ে ফেলা- এলেম লাগে। মুসলমানেদের যে গুলি খাওয়াবার প্ল্যান করছে মমতা- সেটা আব্বাস পড়ে ফেলেছিল। সদ্য ৩০ পার করা নেতার মাঝে এটা অলীক গুণ বৈকি।
এই বয়সে যে প্রাজ্ঞতা দেখাতে পেরেছে আব্বাস- সেটা বহু লব্ধ প্রতিষ্ঠিত নেতার নেই। আব্বাস নিজের নির্বাচনী প্রচারের প্রতিটা জনসভায় একটা টিম নিয়ে যায়, আমরা হয়ত অনেকেই তাদেরকে চিনি না- কিন্তু তারা আমাদেরই মধ্যে মিশে আছে। আব্বাস নিজের বডিল্যাঙ্গুয়েজ তৈরি করতে পেরেছে, মঞ্চ বুঝে বুঝে বক্তব্যের ধারা বদলাচ্ছে, নিয়মিত নিত্যনতুন তথ্য দিচ্ছে, সর্বোপরি ভাষণে বৈচিত্র্য আনছে। আব্বাস তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য কোনোভাবেই পরিত্যাগ না করেই ভাষণ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রচন্ড উচ্চস্বরে ভাষণ চলাকালীন বক্তব্য রাখা কিংবা নিজের মোবাইল থেকে তথ্য জনগণের সামনে চোখ বুলিয়ে নিয়ে আবার ভাষণ দেওয়া। এই যে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশে থাকার প্রচেষ্টা, এটাই আব্বাসকে জনগণের মধ্যে ধরে রেখেছে।
আব্বাসকে কাদের সাথে লড়তে হচ্ছে? বিরোধী দলে তার মানের কোনো নেতা নেই, তাই ওদের কথা নাই বা আনলাম। কিন্তু সংযুক্ত মোর্চার মধ্যেই তার শরিক দলের একঝাঁক উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণী যারা প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাবড়-তাবড় ডিগ্রিধারী, এমনকি পার্টির মধ্যেও ছাত্র ও যুবফ্রন্টে ইতিমধ্যে পরীক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত- তাদের সাথে সমানে পাল্লা দিয়ে যেতে হচ্ছে।
তবে উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের অনেকেই অদ্ভুত রোগের শিকার- কেন আমি মোবাইল দেখে বলব, কেন কেউ জেনে যাবে অমুক আমাকে তথ্য সাপ্লাই দেয় ইত্যাদি ট্যাবু। আব্বাস সেই ট্যাবু থেকে মুক্ত- সে প্রকাশ্য মঞ্চে হোয়াটস অ্যাপে দেখে বক্তৃতা দিচ্ছে অনায়াসে। মানুষ তার থেকে নতুন কিছু পেতে চাইছে, সেটা সে মোবাইল থেকে দেখে বলল, না মুখস্ত বলল সেটা গৌণ। আব্বাস এখানে বাকি অনেকের চেয়ে এগিয়ে গেছে।
সত্যজিৎ রায় প্রয়াত হওয়ার পর তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার ওনার ওপর একটা বিশেষ সংখ্যা বের করেছিল। সেখানে একটা স্মৃতিচারণায় উৎপল দত্ত একটা শিক্ষনীয় গল্প শুনিয়েছিলেন। যখন 'হীরক রাজার দেশে' শুটিং হচ্ছে, উৎপল দত্তর ডায়ালগ থ্রো সত্যজিৎ বাবুর পছন্দ হয়নি। উনি উৎপলবাবুকে পরামর্শ দেন-
"উচ্চারণে একটু গ্রাম্যতা আর অশিক্ষার ছাপ আনো। ‘করেছিল’ না বলে বলো ‘কইরেছিল’।
আসলে এই জোতদার ধরনের লোক বেশ ক্রুড আর অশিক্ষিত হয়। না হলে অন্য লোকেদের oppress করবার চিন্তা এদের মাথায় আসত না। তাই এই ধরণের লোককে deem করে দাও। যাতে ভয় পাবার বদলে লোকে তোমায় দেখে হাসাহাসি করে"।
এর পর উৎপল দত্ত লিখছিলেনঃ
"আমি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। মনে পড়ছিল চেয়ারম্যান মাও-এর কাগুজে বাঘের তত্ত্ব। শত্রুকে সবসময় হাস্যকর করে খড়ের সৈনিকের স্ট্যান্ডার্ডে নামিয়ে আনতে হবে। এই তত্ত্বের এরকম প্রয়োগ যে হতে পারে আমি ভাবতে পারিনি এর আগে।"
আব্বাস কি নতুন কিছু করছেন?
আব্বাস সেই অর্থে বিজেপির বিরুদ্ধে বলছে না, ও মমতাকে ধরেছে ভীষণ তাচ্ছিল্যের সাথে- কারণ মমতাই যে বিজেপিকে স্থান দিয়েছে বাংলার মাটিতে সেটাকেই পাখির চোখ করেছে। আব্বাসকে যারা ধর্মীয় নেতা হিসেবে দিতে শুরুর দিকে সক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন, তাদের প্রায় সমস্ত অস্ত্র সুনিপুণভাবে দক্ষতার সাথে আব্বাস নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে। এই নির্বাচনে বামেদের উত্থানের পিছনে আব্বাস নামক x-factor কে অস্বীকার করা যাচ্ছে না।
খেলা হবে আর জয় শ্রীরামের বাইনারির মাঝে- "চিল্লায়া কন, ঠিক কি বেঠিক" আলাদা স্থান করে নিয়েছে।
আব্বাসের নিজস্ব রিসার্চ টিম রয়েছে, নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে- বঙ্গদর্শন, মিল্লি ইত্যাদি হরেক নামে। ফেসবুকেও এদের অবাধ বিচরণ। সাউন্ড কোয়ালিটি এদের দারুণ, ক্যামেরার এঙ্গেল দারুণ। মঞ্চের দখল যদি আব্বাস নিয়ে নেয় মুহূর্তে, মঞ্চের সামনেটার দখল কিন্তু তার টিমের অধীনে চলে যায়। প্রচার মানে কী? আমার বা আমাদের বার্তাটা বেশি বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো, টিম আব্বাস সেটাই সুনিপুণ করতে পেরেছে। দুরন্ত পোস্টার, দুরন্ত ক্যাপশন সাথে আনএডিটেড ভিডিও- চুম্বকে এটাই সাফল্য। সব মিলিয়ে প্রচার যন্ত্র তার নিজস্ব কাজটা করতে পারছে প্রতিনিয়ত, ফলত সারাদিনে ২টো সভা করলেও ২ কোটি মানুষের কাছে পরিষ্কার ভাবে পৌঁছে যাচ্ছে প্রচলিত মিডিয়া হাউজদের সাহায্য ছাড়াই।
সামনে অনেক ফাঁকা মঞ্চ, রাজনৈতিক ময়দানে অচিরেই নতুন প্রজন্মের মুখেরা দাপিয়ে বেড়াবে। সেখানে আমিত্বকে দূরে রেখে শোনার অভ্যাস বজায় রেখে, কাজের লোক আর তোষামোদের লোক চিহ্নিত করে, কারা আমার তথা আমাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষেত্রে লাভজনক সেই বোধটা আনতে পারবে- সে বা তারাই সফলকাম হবে। আব্বাস সম্ভবত সেই সফলকামদের অগ্রগণ্য প্রতিনিধি। যত উপরে উঠবে- প্রতিদ্বন্দ্বিতা তত কঠিন- এবং সেটা কাছের বন্ধু বা কলিগদের থেকেই আসবে।
প্রতিভা বহু ওঠে, কিন্তু সঠিক পদ্ধতিতে লালন-পালনের অভাবে সেগুলো অধিকাংশটাই অকালে ঝরে যায়। এই নির্বাচনেও সম্ভাবনাময় হয়ে অনেকেই দেখা দিয়েছে নানান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে, কিন্তু আব্বাস ছাড়া সেভাবে পরিকল্পিত টিম ওয়ার্ক আর কারোর মাঝে নজরে আসল না।
কি বুঝা আসছে?
চিল্লায়া কন, ঠিক কি বেঠিক?
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন