আবার এক অপরিকল্পিত লকডাউন এসে গেছে, গতছরের মত এবছরও এক ভয়াল অর্থনৈতিক সঙ্কট আসতে চলেছে গরীবের ঘরে ঘরে। ট্রাম্পের মত একটা মাথামোটা অপদার্থ শাসকও গত অক্টোবরের ১২ তারিখের একটা টুইটে স্বীকার করেছিল- “Lockdowns are killing countries all over the world. The cure cannot be worse than the problem itself.”। ট্রাম্প গেছে, সেদেশে করোনাও গেছে। আমাদের দেশের মিনিয়েচার ট্রাম্প গুলো যায়নি, ১ বছর সময় পেয়েও কোনো পরিকল্পনা করতে পারেনি এরা, ফলত আবার আমরা লকডাউনের অভিশাপের শিকার।
যিনি মারা যাচ্ছেন, তিনি নাহয় মরে বাঁচছেন। কিন্তু তাকে বাঁচাতে গিয়ে সরকারি পরিষেবা না পেয়ে যদি বেসরকারি-কর্পোরেট হাসপাতাল নামের ফাঁসজালে ফেঁসে যাচ্ছে, তাহলে পরিবারটিও সর্বশ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। একই নিয়ম যিনি বেঁচে ফিরলেন সেই পরিবারটির জন্যও। অবশ্য গরীবের দল সিপিএম তার ক্ষুদ্র সামর্থ্য নিয়ে গরীবের জন্য তাদের পাশে আছে সাধ্যমত।
যারা বলে ‘ফেসবুকে লিখে কাজ হয় না’, তাদের জন্য ‘শূন্য’ সেকেন্ডের নীরবতা পালন করে আজকের লেখা শুরু করলাম।
৭ই মে তারিখে রেড ভলেন্টিয়ার্সদের কার্যপদ্ধতি নিয়ে কিছু প্রশ্ন তুলেছিলাম। নেতৃত্বকে ধন্যবাদ, বিষয়টিতে গুরুত্বসহ নজর দেওয়ার জন্য। যারা আমার ‘রেড ভলেন্টিয়ার, পার্ট- ১’ প্রতিবেদনের বিরোধিতা করেছিল, তাদেরও স্বাগত জানাই। কিছু নাবালক, যুক্তিহীন আবেগে বলছে- রেড ভলেন্টিয়ার্স একটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, তাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রশ্ন- এর মাঝে রাজনীতিটা কোথায় আছে? অবশ্যই সাধারণ মানুষ আর রাজ্য সরকার লাভবান হচ্ছে, পার্টি কী পেয়েছে আজ অবধি? যেকোনো রাজনৈতিক লড়াই দীর্ঘমেয়াদি, সেই সাপেক্ষে চলুন কিছু রাজনৈতিক লাভের স্বপক্ষে দিশা দিই।
গত পোস্টে আমি নির্দিষ্ট করে পাঁচটি পয়েন্ট উল্লেখ করেছিলাম।
প্রথমঃ- অনভিজ্ঞ ছাত্রযুব, যারা রেড ভলেন্টিয়ার্সের তরফে রাস্তায় আছে, তাদের প্রশিক্ষণের জন্য কর্মশালা করতে হবে, সেটার সফল সূচনা হয়েছে।
গত ৯ই মে তারিখে AIIMS এর অধ্যাপক ডাঃ অরুন সিং ও ডাঃ অংশুমান বসু এর তত্ত্বাবধানে সিপিআই(এম) দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা কমিটির উদ্যোগে রেড ভলান্টিয়ারদের কর্মশালা হয়। এমন কর্মশালা ভীষণ প্রয়োজন, প্রতিটি জেলার প্রতিটি মহকুমায় এমন কর্মশালার আয়োজন করতে হবে অভিজ্ঞ ডাক্তার ও ভলেন্টিয়ার সার্ভিসে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের দ্বারা। এবং সেগুলো লাইভে এভাবেই প্রচার করে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
দ্বিতীয়ঃ কোভিড বিধি মেনে সুরক্ষা পোশাক।
৭ তারিখের পোস্টের আগে যেখানে ১০০ ছবির মাঝে একটা আধটা ppe পরিহিত রেড ভলেন্টিয়ার দেখা যেত, আজকে ১ সপ্তাহের ব্যবধানে ১০০ ছবির মধ্যে একটা আধটা ppe ছাড়া ভলেন্টিয়ার দেখা যাচ্ছে, যদিও অফিসিয়ালি ১৫ ই এপ্রিলের আশাপাশ থেকে এই বছরের স্বেচ্ছাসেবা শুরু হয়েছিল। অনেক মানুষ এগিয়ে আসছেন PPE, উন্নত মাস্ক, গ্লাভস, ফেসশিল্ড দান করতে, বা এগুলো কিনতে অর্থ সাহায্য করতে। এটা ভীষণ প্রয়োজনীয় ছিল।
কিন্তু বাকি তিন দফা দাবী নিয়ে এখনও কোনো সদর্থক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সেগুলো সহ আরও কয়েকটি বিষয় উত্থাপন করলাম।
১) ভলেন্টিয়াররা অসুস্থ হয়ে গেলে তাদের চিকিৎসা কীভাবে হবে? তার অর্থনৈতিক দায় কে বহন করবে?
ভলেন্টিয়াররা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে, তারা যেকোনো সময় অসুস্থ হতেই পারে। প্রতিটি মহকুমা হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল, কোলকাতা, তৎসংলগ্ন শহরতলীর বড় হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে কমপক্ষে ২-৫টা পর্যন্ত বেড- ভলেন্টিয়ারদের জন্যই সংরক্ষিত করতে হবে।
কোনো অসুস্থ ভলেন্টিয়ারের অবস্থার অবনতি হলে, প্রয়োজনে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে সরকারি উদ্যোগে, যার সম্পূর্ণ খরচা সরকারকেই বহন করতে হবে। এছাড়াও কোনো ভলেন্টিয়ারের জীবনহানী হলে সরকার থেকে কমপক্ষে কুড়ি লক্ষ টাকা তার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং সম্ভব হলে তার পরিবারের একজন সদস্যকে যেকোনো সরকারি দফতরে চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে হবে।
যদি সরকার এই সব দাবী মানতে রাজি না হয় তখন আন্দোলনের মাধ্যমে পার্টির নেতাকর্মীদের এটা আদায় করতে হবে। স্বাস্থ্য দফতরে ডেপুটেশন দিক, ধর্ণায় বসুক, প্রয়োজনে আদালতে যাক, কারণ রাস্তায় পার্টির ছেলেরাই বড় লড়াইটা লড়ছে মানুষের জন্য।
২) ভলেন্টিয়ার্সদের স্বাস্থ্যবিমা।
ইউনিসেফ, রেড ক্রশের স্বীকৃত ভলেন্টিয়ারি সার্ভিসে থাকা প্রতিটি ফিল্ড মেম্বারদের মোটা অঙ্কের ইনসুরেন্স করানো থাকে, যদি তারা আক্রান্ত হয় সেক্ষেত্রে ইনসুরেন্স কাজে আসে। প্রতিটি রেড ভলেন্টিয়ার্স “যারা শুধুমাত্র রাস্তায় আছে” পার্টি নির্দিষ্টভাবে তাদেরকে সিরিয়াল নম্বর যুক্ত ‘আইডেন্টি কার্ড’ দিয়ে আগে অফিশিয়ালি স্বীকৃতি দিক। সেই আইডেন্টি কার্ড ধরে পার্টি নিজের উদ্যোগে হোক, অন্য কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের থেকে সহযোগিতা নিয়ে হোক কিম্বা সরকারকে চাপ দিয়ে জনস্বাস্থ্য দপ্তর কিম্বা বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের অধীনে এই সকল রেড ভলেন্টিয়ারদের প্রত্যেকের জন্য স্বাস্থ্যবিমা করানো হোক।
সংখ্যা যত বাড়ে, বেনো জলও ঢুকে যায় খানিকটা। বদনাম করার জন্য বিপক্ষ পার্টি যে ফন্দি আটবেনা তার নিশ্চয়তা কোথায়? আইডেন্টি কার্ড থাকলে কোনো চোর ছ্যাঁচোর ‘রেড ভলেন্টিয়ারের নাম ভাঁড়িয়ে’ অবৈধ ভাবে টাকা তুলতে পারবেনা, দুর্নীতি হবার সুযোগ কমে যাবে।
সরকার সিভিক পুলিস নিয়োগ করতে পারলে, সিভিক রেড ভলেন্টিয়ার্সের স্বীকৃতি কেন দেবে না রেড ভলেন্টিয়ার্সদের?
সরকার না মানলে জেলায় জেলায় ডিএম অফিসে, মন্ত্রীর দপ্তরে দপ্তরে নেতারা ধর্ণায় বসুক, রাজভবনের গেটে ধর্ণায় বসুক, মোদ্দা কথা নেতারা মাস্ক পিপিই পরে রাস্তায় নেমে জঙ্গি আন্দোলন গড়ে তুলুক। সেবার জায়গাতে সেবা হলো, আবার রাজনীতিও হলো চুটিয়ে।
৩) কোনো সন্দেহ নেই, অপদার্থ সরকারের যে কাজ করার ছিল সেটা রেড ভলেন্টিয়ার্স করেছে তাও বিনামূল্যে। অর্থাৎ গোটা বিষয়টা অর্থনীতির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করলে দেখা যাবে- এত বড় একটা স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক কর্মযজ্ঞ চলছে অথচ এর জন্য সরকারের রেভিনিউ এর উপরে ন্যুনতম চাপ পরছে না। আরও আশ্চর্যের বিষয় এ নিয়ে বামেদের সামান্যতম উচ্চবাচ্যটুকু নেই, যারা দাবী করে দেশের মধ্যে অর্থনীতিটা সামান্য হলেও বোঝে। ঠিক এই কারণে সরকার স্বাস্থ্য বাজেটে সামান্য পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করে ‘স্বাস্থ্যসাথী'র মতো জনমোহনী প্রকল্প চালু করে দিতে পারে, কারণ মানুষের অপ্রাপ্তিজনিত ক্ষোভের সবটাই প্রায় রেড ভলেন্টিয়ার্সরা শুষে নিচ্ছে।
গত ১৩ তারিখের আনন্দবাজার একটি রিপোর্টে লিখছে- সরকারি হেল্পলাইনগুলো অবধি রাত্রের দিকে ফোন ডাইভার্ড করে দিচ্ছে রেড ভলেন্টিয়ারদের নম্বরে। শুরু থেকেই আমাদের বক্তব্যের যেটা মুখ্য উপজীব্য ছিল সেটাই কিন্তু ঘুরে ফিরে প্রমাণিত হতে চলেছে, সরকারই সবচেয়ে লাভবান হয়েছে রেড ভলেন্টিয়ারদের কাজে। সরকারি ব্যর্থতা ঢাকার জন্য প্রশাসন এবং শাসক দল রেড ভলেন্টিয়ারদের নির্মমভাবে ব্যবহার করছে এবং আমাদের একশ্রেণীর নেতৃত্ব ঘরের ছেলেদের এইভাবে ব্যবহার করতে দিয়ে চরম আত্মশ্লাঘা অনুভব করছে৷
তাহলে- সরকার কেন প্রতিটি রেড ভলেন্টিয়ারকে ‘সার্টিফিকেট’ ইস্যু করবে না! আদতে রেড ভলেন্টিয়াররা সরকারি ব্যর্থতার ঘায়ের উপরেই মলম দিচ্ছে। দল নিরবচ্ছিন্নভাবে এটার জন্য সরকারকে অতিষ্ট করে দিক।
অধিকাংশ রেড ভলেন্টিয়ারই ছাত্রযুব, এরা প্রতিযোগিতামূলক সরকারি চাকরির পরীক্ষাতে বসে। অধিকাংশ পরীক্ষার ইন্টারভিউতে ‘extracurricular activities’ উপরে একটা নম্বর থাকে। এই কোভিড মহামারীকালে রাস্তায় থেকে মানুষের পাশে থাকার চেয়ে বড় extracurricular activities আর কি হতে পারে? সরকার সার্টিফিকেট ইস্যু করুক।
৩রা ফেব্রুয়ারী ফ্রাঙ্ক ওরেল’ডে ও ১৬ই আগস্ট ফুটবল প্রেমী দিবসে নিয়মিত রক্তদান দিবস পালন হয়। সেখানে কোনো বিশিষ্ট স্বনামধন্য প্রথিতযশা ব্যক্তি রক্তদাতাদের সার্টিফিকেট প্রদান করেন, যা সারাজীবনের জন্য একটা বিরাট স্বীকৃতি। স্বাধীনতা সংগ্রামীরাও তো তাম্রফলক পদক পেতেন, সাম্মানিক পেতেন। রেড ভলেন্টিয়ার্সদের জন্যও এমন কিছু চালু হোক। দল নিজে হোক বা সরকারকে চাপ দিয়ে এটা করাবার ব্যবস্থা করুক, আগামীর জন্য এটা অমূল্য সম্পদ যা আগামী প্রজন্মকে উজ্জীবিত করবে।
৪) এখনও পর্যন্ত এই রেড ভলেন্টিয়ার কর্মকাণ্ড মূলত কোলকাতা, জেলা সদর ও তার সন্নিহিত অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। লিস্টে গ্রামাঞ্চলের ভলেন্টিয়ারদের নাম থাকলেও, সেই অর্থে কোনো পরিষেবা নেই- কারণ তাদের কোনো ইনফ্রাস্ট্রাকচার নেই, না রয়েছে প্রশিক্ষণ, যার জন্য ইচ্ছা থাকলেও শুরু করতে পারছে না। এটা ইম্মিডিয়েট চালু করতে হবে, যা শুধুই কোভিড কালে নয়, কোভিড পরবর্তীকালেও নিয়মিত চালু রাখতে হবে। রাজ্যের ৭০% জনগণই গ্রামের বাসিন্দা, সেখানে শহর ও শহরতলীর ছবি দেখিয়ে- না সংগঠন বাড়ানো যাবে বা না ভোটে কোনো লাভ পাওয়া যাবে।
৫) ডক্টরস ফোরাম নামের সংগঠনের কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের অবিলম্বে প্রশিক্ষণের কাজে নামানো হোক। দলের নার্সিং সংগঠনের সকল শ্রেণীর কর্মীদেরও হুইপ জারি করে তাদের প্রশিক্ষণের জন্য নিয়োগ দেওয়া হোক।
৬) রাজ্যের সকল স্কুলে ছুটি, সপ্তাহে এক-আধাদিন চাল-আলু বিলি ছাড়া এদের কোনো কাজ নেই। পার্টি ABTA নামক শিক্ষক সংগঠন আছে, পার্টির তরফে তাদের জন্য হুইপ জারি করে ডেটা কালেকশনের কাজে নিয়োগ করা হোক। ABTA পার্টির সবচেয়ে বিশ্বস্ত সংগঠন, অন্তত প্রার্থী তালিকায় ৪৩ জন প্রার্থীর নাম দেখে এটা সহজে অনুমান করাই যায়। যদিও ৪৩ জন প্রার্থীর সকলেই দলের ডাকা বন্ধে নিয়মিত স্কুলে অনুপস্থিত থেকে পার্টির দাবীকে সমর্থন করেছিলেন, এমন তালিকা এখনও আমার হাতে নেই।
রেড ভলেন্টিয়ার্স কর্মযজ্ঞে আজ পর্যন্ত কতটা ডেটা কালেক্ট করা হয়েছে জানি না, কিন্তু যারা ফোন করছেন তাদের ফোন নম্বর সেভ করে সেটা এরিয়া কমিটির অফিসে পাঠিয়ে দেওয়া হোক। প্রতিটি এরিয়া কমিটির অফিসে ABTA সদস্যদের বসিয়ে দেওয়া হোক। এরিয়া কমিটির সদস্যেরা এলাকা ধরে ধরে অফিস থেকেই, তাদের স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিক- যারা সাহায্য চেয়ে ফোন করেছিল। এতে করে এরিয়া কমিটির সাথে স্থানীয় স্তরে এমন অনেক মানুষের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ গড়ে উঠবে- যারা সিপিএমের নাম শুনলেই নাক সিঁটকাতো বা যারা আমাদের পার্টি অফিসকে শত্রুপক্ষের শিবির ভাবত।
এই ফোন নম্বরের সাথে যুক্ত ব্যক্তির ঠিকানার পূর্ণ তথ্য, তাদের পেশা, বয়স, লিঙ্গ, ধর্ম, পরিবারে সদস্যের সংখ্যা ইত্যাদি সেন্ট্রালি ডেটা স্টোরেজে সেভ করে রাখা হোক। আগামীতে নানা সমীক্ষাতে সরাসরি ফোন করা যাবে, সে না করতেও পারবে না- যদি আবার কাল তার বা তার পরিবারের কারও ভলেন্টিয়ারদের দরকার লাগে!।
৭) টোল-ফ্রি ফোন চালু।
কেন্দ্রীয় ভাবে ‘রেড ভলেন্টিয়ার্স’ এর নামে একটা টোল-ফ্রি নম্বর চালু করুক দল, তেমন বিশেষ কিছু খরচা নয়। সেখানে কিছু কমরেডদের রাখা হোক পালা করে, ABTA এর সদস্যেরা তো আছেনই। কিছু তৃণমূল-বিজেপির ক্যাডারেরা গালিগালাজও করে সমস্যা করতে পারে শুরুতে, কিন্তু তাদেরও নম্বর সেভ হয়ে যাবে। আগামীতে তাদেরও ফোন বা হোয়াটসএ্যাপেও মেসেজ পাঠানো যাবে দলীয় প্রচারের বক্তব্য। জানা যাবে কে কাকে কী গালি দিচ্ছে, কী তাদের ক্ষোভ, কাদের উপরে ক্ষোভ ইত্যাদি। ঘরে বসে ডেটা কালেক্ট করার জন্য টোল-ফ্রি নম্বরের বিকল্প নেই।
৮) সচেতনতা শিবির।
গ্রাম ও মফঃস্বলের বাজারের মোড়ে মোড়ে যেখানে বেশি মানুষের জনসমাগম হয়, সেখানে কোভিড বিধি মেনে, দুটো চেয়ার আর মাথায় বড় লাল ছাতা লাগিয়ে, দলীয় পতাকা ও ভলেন্টিয়ারের ব্যানার সহ দিনে কয়েক ঘন্টা করোনা ও অন্যান্য যেকোনো জরুরি বিষয়ে সারাক্ষণ একটা মাইক বা হ্যান্ড মাইক দিয়ে সচেতনতা প্রচার চালানো হোক। মহিলা সমিতির কমরেডরা গিয়ে সেখানে নিয়মিত বসুক, এটাই তো জনসংযোগ। মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়ানো হোক, সেখান থেকে মাস্ক বিলি করার সমর্থ থাকলে সেটা বিলি করা হোক।
যারা ফেসবুক করে না, তেমন লোকেরাও বাজারে আসে। ‘আমরা রেড ভলেন্টিয়ার্স, আপনি আমাদের এখানে নাম নথিভুক্ত করুন, স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়লে আমাদের ডাকবেন’ এইভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ২ গজের দূরত্ব বজায় রেখে মানুষের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলুন, সাথে ফ্রি ডেটা চলে আসবে, মানুষ নিজ স্বার্থে ডেটা শেয়ার করবে।
স্বাস্থ্য পরিষেবা মানুষের মৌলিক অধিকার আমাদের দেশে, এটা কারও অনুকম্পা নয়- এ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করুন। অতিরিক্ত পয়সা খরচা করে বেসরকারি-কর্পোরেট হাসপাতালে না গিয়ে, কিম্বা স্থানীয় অঞ্চলের অতি নিম্নমানের নার্সিংহোমে গিয়ে সর্বশ্রান্ত না হয়ে, মানুষ যেন স্বাস্থ্যসাথী কার্ড নিয়ে যেকোনো সরকারি হাসপাতাল, ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে সুপারস্পেশালিটি হাসপাতাল হয়ে মেডিকেল কলেজ পর্যন্তই যেন যায়- সেই বিষয়ে মানুষকে মনে করিয়ে দিন বারে বারে।
হাসপাতাল থেকেই বিনামূল্যে প্রায় সব ওষুধ পাওয়া যায়, অধিকাংশ প্যাথোলজি টেস্টও হয়- এই সুযোগ-সুবিধা বুঝে নিতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। অনেকের নানা কারণে জনপ্রতিনিধিদের সার্টিফিকেট দরকার হয়, রেড ভলেন্টিয়ারেরা সে বিষয়ে সচেতন করুক। জনপ্রতিনিধিরা অসহযোগিতা করলে পার্টি আন্দোলনের মাধ্যমে দাবী ছিনিয়ে আনুক। স্থানীয় হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মেডিক্যাল ইকুইপমেন্টসের দোকানের ফোন নম্বর, নার্সিং পরিষেবার নম্বর, একাধিক প্যাথোলজি সেন্টারের নম্বর, এম্বুলেন্সের ফোন নম্বর, একাধিক ওষুধের দোকানের ফোন নম্বরগুলো ওই শিবির থেকে মানুষকে বিলি করুক। সরকারি পরিষেবা নিতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়িয়ে দিক পার্টির সংগঠন, সরকার ব্যতিব্যস্ত হতে থাকবে।
৯) প্রি-প্রাইমারি ও প্রাইমারির ছাত্রছাত্রীরা চাল, আলু, সয়াবিন, ডাল ও ছোলা পায়। ভোটের ঠিক আগে সেটা নিয়মিত থাকলেও, ভোট ও ভোট পরবর্তী সময়ে তা অনিয়মিত বা গায়েব গয়ে গেছে। এদিকে লকডাউন। স্কুল বন্ধ থাকলেও যে শিশুটি ২০১৯শে চার বছরের ছিল, সে ২০২১শে ছয় বছরের হয়ে গেছে, কিন্তু তার প্রাথমিক শিক্ষাই শুরু হয়নি। সে চাল আলুও পায়না, আবার বইও নেই। অথচ ধনীর সন্তান অনলাইনে ক্লাস করছে, সে দু বছর এগিয়ে গেছে, গরীবের অক্ষরজ্ঞানই শুরু হয়নি। গত ৩৪ বছরে শহর গ্রামের শিক্ষার ভেদাভেদ যতটা কমাতে পেরেছিল বামফ্রন্ট সরকার, তা আবার ভয়ানকভাবে প্রকট হয়ে উল্টোপথে হাঁটা শুরু করেছে। শিক্ষায় চূড়ান্ত অবহেলার শিকার পিছিয়ে পরা শ্রেনী, যা আগামীতে আর ভয়ঙ্কর ইঙ্গিত করছে। দক্ষিনপন্থী ছাত্র সংগঠন এ বিষয়ে আন্দোলন করবে সেই বোধবুদ্ধি তাদের নেই, কিন্তু SFI কেন নিশ্চুপ?
SFI গত বছর কিছু বই-খাতা বিলি করেছিল বটে, কিন্তু তাদের কাজ কি বই বিলি করা, নাকি আন্দোলন করে সরকারকে বই দিতে বাধ্য করা? মহিলা সমিতির কমরেডরা পাড়ায় পাড়ায় খোঁজ নিয়ে সেই ছাত্রছাত্রীদের তথ্য জানাক, রেড ভলেন্টিয়ারদের। রেড ভলেন্টিয়ারেরা পার্টিকে জানাক। পার্টি SFI কে এনগেজ করে শিশু শিক্ষার জন্য আন্দোলন লড়াই করুক বই এর দাবীতে, মহিলা সমিতি আন্দোলন করুক সঠিক সময়ে চাল-আলুর বন্টনের দাবীতে। সরকারী ডাল-সয়াবিনের পুষ্টি না পেলে কীভাবে লকডাউনের অর্থকষ্টে গরীবের বাচ্চা পুষ্টি পাবে, কীভাবে তার ইমিউনিটি গড়ে উঠবে, কীভাবে করোনার সাথে লড়বে সেই গরীবের বাচ্চা?
১০) পিরামিডের চূড়া থেকে পাদদেশ- নেতা সহ তাদের ছেলেপুলেদের অধিকাংশ আজও রাস্তায় নামেনি। এতে করে রেড ভলেন্টিয়ার্স সহ সাধারণ মানুষের কাছে ভুল বার্তা যাচ্ছে। কেউ কেউ দাবী করছে- নেতার সন্তানেরা কাজ করছে বলে, থাকলেও তারা কেউ রাস্তায় নেই, সব ঠাণ্ডা ঘরে ফোনের ওপারে আর ফেসবুকে বিপ্লব করছে। অবিলম্বে তারা রাস্তায় নেমে সাধারণ ছাত্রযুবদের পাশে দাঁড়াক সুরক্ষা বিধি মেনে। এদের সকলকে সচেতনতা শিবিরগুলোতে বসিয়ে দেওয়া হোক মহিলা সমিতির কমরেডদের সাথে। এরা রোজ পালা করে শিবিরে বসে এরিয়া কমিটি, রেড ভলেন্টিয়ার্স ও জনগণের সাথে সমন্বয় সাধন করুক।
দেশের প্রধান দুটো বামপন্থী দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। এই করোনাকালে ভয়ংকর ক্ষতিগ্রস্ত দুজনেরই ব্যক্তিজীবন। প্রথম জন সিপিআইএমের সাধারণ সম্পাদক কমরেড সীতারাম ইয়েচুরি, করোনায় তার পরমপ্রিয় পুত্র আশীষকে হারিয়েছেন। দ্বিতীয় জন সিপিআইয়ের সাধারণ সম্পাদক কমরেড ডি রাজা। গত তিন সপ্তাহে হারিয়েছেন তাঁর বড় ভাই, ছোট ভাই এবং ছোট বোনকে।
কিন্তু স্বজন হারানোর বিয়োগযন্ত্রণা বুকে নিয়েও তাঁরা নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আছেন। আমাদের রাজ্য, আসাম, কেরল, তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনের সাথে সম্পৃক্ত থেকেছেন, নিয়মিত দপ্তরে গিয়েছেন। এঁরা দুজনেই সর্বভারতীয় নেতা, পদ এবং দায়িত্বের গুরুত্ব যথার্থভাবে বোঝেন। তাই নন্দলালের মতো নিরাপদ জীবন আর পদ ও দায়িত্ব আঁকড়ে না রেখে মানুষের জন্য নিয়োজিত করুন।
ফিলিস্তিনের কমিউনিস্ট নেতারা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে রাস্তায় নামতে পারলে আমাদের সকল নেতারা কেন রাস্তায় থাকবে না? যখন ‘রাস্তা ছাড়া রাস্তা কী’, এই ভাবনা এসেছে, তখন সকলকেই রাস্তায় নামতে হবে এটাও বুঝুন। ভাষণটাও রাস্তা থেকে হোক, ঘর থেকে নয়।
১১) দেশের প্রথম সরকার হিসাবে কেরালার বাম সরকার- মাস্ক, পিপিই কিট, গ্লাভস ইত্যাদি চিকিৎসা সামগ্রীর দাম সস্তা করে তা নির্দিষ্ট দামে বেঁধে দিয়েছে। করোনার বিরুদ্ধে লড়াই এর জন্য মানুষকে অর্থনৈতিক ভাবে সুরক্ষা দিতে পেরেছে। যেখানে আমাদের রাজ্য সরকার করোনাকালে সকল ধরনের কালবাজারি রুখতে ব্যর্থ, মানুষ চূড়ান্ত হেনস্থার শিকার। এ নিয়ে #keralamodel হ্যাশট্যাগ দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে আন্দোলনের ঝড় উঠুক। রাস্তাতেও মানুষকে বোঝানো হোক।
সঠিক ‘ডোজ’প্রসঙ্গে বনফুলের উপন্যাসের নায়ক ডাক্তার অগ্নীশ্বর মুখার্জীর একটা চরম ঔদ্ধত্বপূর্ণ কিন্তু অমোঘ সংলাপ ছিল, সিনেমাতে উত্তমকুমার স্ক্রিন কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন এটা বলে- “আপনার গালে যদি ঠাস ঠাস করে তিনটি চড় মারার দরকার হয়, তাহলে একটি চড় মেরে কোনও লাভ হবে কি? আপনাকে তিনটি চড়ই মারতে হবে”।
আব্রাহাম লিঙ্কনের একটা চমৎকার উক্তি আছে- “মানুষ যতটা সুখী হতে চায়, সে ততটাই হতে পারে। সুখের কোনো পরিসীমা নেই। ইচ্ছে করলেই সুখকে আমরা আকাশ অভিসারী করে তুলতে পারি”। জনসেবার সাথে সাথে রাজনৈতিক লাভ ঘরে তোলার সুখটাও সর্বোচ্চ লেভেলে পৌঁছাতে পারে, যদি আমরা তা চাই।
সুতরাং কে লিখছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, কী লিখছে সেটা বিষয়।
আশা রাখি, বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে অসংখ্য ছাত্রযুব, যারা অতিমানবিক কাজ করছে, তাদের জন্য দল প্রাণপণ লড়াই-আন্দোলন করে বিমা, স্বীকৃতি ও সার্টিফিকেট আদায় করুক- ঠিক যেভাবে ভলেন্টিয়াররা রাস্তায় লড়াই দিচ্ছে, সেভাবেই ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন