শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২১

আমি, মেলোডি আর শ্রাবণের ধারা

 


“সোচেঙ্গে তুমহে প্যায়ার করে কে নেহি…”, না এতটাও ভাবাভাবির অবসর ছিল না। এ প্রেম ছিল লাভ এত ফার্স্ট সাইট, তবে তার একটা পটভূমিকা ছিল।
গ্রামের ছেলে, কোলকাতা থেকে শত কিলোমিটার দূরবর্তী গঙ্গার তীরে ছোট্ট আমাদের গ্রাম। মিশ্র সংস্কৃতির পরিবেশে বড় হওয়া, যে পরিবেশের হাওয়াতে কোনো সাম্প্রদায়িকতা-হানাহানির চিঠিপত্র লেনদেন হতো না, বরং এই চৈতন্যের মাটি শিক্ষা, সম্প্রীতি আর গঙ্গার উর্বর হাওয়া-মাটির জন্য পরিচিত। শৈশব কেটেছে খোয়া উঠা সরু পিচের আঁকাবাঁকা রাস্তা, প্রাচীন গাছেদের পঞ্চায়েত, জলা-জঙ্গল-ঝোপ, বুনো ফুলের গন্ধ, ঝড়ে আম কুড়ানো, পিটুলির গুলতিতে বাঁদর মারা, বহলের আঠা দিয়ে ঘুড়ি বানানো, ভন্যি দুপুরে জাম আর ফলসা খেয়ে নিমের উঁচু ডাল থেকে পুকুরের জলে ঝাঁপ, ক্রিকেট-ফুটবল, প্রতিবার বোনের অন্যায়ের দায় কীভাবে যেন আমার ঘাড়ে চলে আসা, গোয়ালের খুঁটিতে বেঁধে মায়ের ঠ্যাঙানি, বাবার গোল্লা পাকানো চোখ, চেঁচিয়ে নামতা আর মাস্টার টেন্স পড়া, দাদুর প্রশ্রয়, লুকিয়ে লাউ এর ডাঁটির বিড়ি টানা, আর পাখি-সাপ-খরগোশেদের সাথে। সারাদিন খেলে এসে সন্ধ্যায় পড়তে বসার সাথে ঢুলুনি, ছাদের ক্যাম্পখাটে তখন দাদু রেডিও সিলোন লাগিয়ে রেখেছে। বোনের খুনসুটি, মা-কাকিমা-পিসিদের মহিলা মহল, হ্যারিকেনের নেশাধরা হলদেটে আলো, ছাদ থেকে ভেসে আসা গানের সুর আর ক্লান্ত শরীর- সমার্থক হয়ে ঘুমের অতলে তলিয়ে যাবার আগে কান ছুঁয়ে থাকত অজানা ভাষার গানের সুর, যার কথা বুঝতাম না সেই কালে, তবে শুনতে বড় ভাল লাগত।
নথি মোতাবেক এখানে আমাদের পরিবারের বাস কমবেশি ৩০০ বছরের ঊর্ধ্বে, তখনও পূর্ববঙ্গ থেকে আসা উদ্বাস্তু মানুষেরা এই জায়গাটা এতটা মারাত্মক জনবহুল করে তোলেনি, পাড়ার মোড়ে মোড়ে কারণে-অকারণে মাইক-ডিজেবক্স অলীক কল্পনা। রাত্রের সেই রেডিওর সুর ভোরের কুয়াশা ভেদ করে খুব বেশি দূরে যেত না, লেগে থাকত বাঁশের ঝাড়ে, তেঁতুল বাগানে কিংবা আম বনে। সকালের মিঠে রোদে পাখিদের গানে যেন সেই সুরেরই মূর্ছনার রেশ রয়ে যেত। তখন কোনো গানের আসর বসা মানে সেটা লোকে মনপ্রাণ ঢেলে শুনত, উপভোগ করত, ওটাই ছিল মনোরঞ্জনের অন্যতম উত্তম মাধ্যম যা সহজলভ্য ছিল না।
শৈশবাবস্থা পেরিয়ে বালক বেলার শুরুতেই দাদুর সান্ধ্য আসরে শরিক হবার ছাড়পত্র পাওয়া গেল। ঢাউস মরফি রেডিও, ঘনঘন চা, মায়ের বকুনি আর বিভিন্ন গীতমালার হরেক সম্ভার- বিশেষত শনি-রবিবার, এই ছিল রোজনামচা। তখন এ এলাকায় বিদ্যুৎ আসেনি, ছোট দুই পিসি অবিবাহিত, এক কাকাও। মায়ের দুলাল তখন সদ্য আঁচল ছেড়ে পিসিদের অভিভাবকত্বে তাদের কাছেই দিবারাত্রে থাকার অভ্যাসে অভ্যস্ত হচ্ছে, পালক গজানোর বয়স আগত প্রায়। পিসিরাই মূলত সারাদিন কারণে-অকারণে গান গুনগুন গুনগুন করত ঘরে-বাইরে।
কতই বা আর বয়স হবে, সাত কিংবা আট- শুনেছিলাম নতুন একটা বাঙালি গায়ক উঠেছে, নাম কুমার শানু। সেকালে না জানতাম বাঙালি কী বস্তু, না বুঝতাম নতুন উঠা কাকে বলে। মায়ের শখে তখন রোজ সকালে রেওয়াজ করা নিত্যদিনের কর্ম, যদিও সে সবই সা রে গা মা পা- ব্যাস, ‘গান কই এতে’ এটা মনে পরলেই রেগে যেতাম অজান্তে। হলে-মলে, বিয়ে-শাদিতে তখন পাড়া ঘরে ভিডিও আসর বসত, যা মূলত রাত্রের দিকে। ফলত, এর অনুমতি কখনই মিলত না, তাই নিষিদ্ধ বস্তুর মতো এটার প্রতি একটা দুর্নিবার টান ছিল- অগত্যা রেডিও আর রবিবারে সেজো কাকার নতুন কেনা টেপ রেকর্ডারই ছিল তৎকালীন ভার্চুয়াল দুনিয়ার একচেটিয়া আধিপত্যে।
আজকের দিনের মতো সদ্য তাজা গান শুনতে পাওয়ার তেমন সুযোগ ছিল না, শ্রোতারাও রোজ নতুন কিছু চাইত বলেও মনে হয় না। এভাবেই জানলাম একটা হিট গানের সিনেমার নাম আশিকী, ছোট পিসি তখন প্রায় উড়ছে; একটা নতুন- অন্য ধরনের, অন্য ফ্যাশনের লম্বা চুড়িদার পরে কলেজ যেতে লাগল। অনেক পরে জেনেছিলাম সেটা নাকি অন্নু আগারওয়াল স্টাইল। মাস বেয়ে বছর যেতে লাগল, মনের হার্ডডিস্কে হিন্দি গানের একটা ছোটখাটো গ্যালারি তৈরি হয়ে গেল, যার মধ্যে পুজো ভাসানের সময় ম্যান্ডেটারি ‘প্রেম প্রতিজ্ঞা’র গান সহ- পাড়ার মিঠুন-জিতেন্দ্রদের নড়বড়ে পায়ে ড্যান্স সহ বেসুরো গান ।
সময়ের নিয়মে এরপর পিসিদের বিয়ে হয়ে গেল, আমরাও তুতো ভাইবোনেরা মিলে হাই স্কুলে গেলাম, একটু বড় হলাম। সময়টা মধ্য নব্বই এর দশক। ততদিনে উদিত নারায়াণ, সোনু নিগম, অভিজিৎ প্রমুখ গায়কেরা বাজারে চলে এসেছে, নামগুলোও ঠোঁটস্ত; মহিলা কন্ঠে অলকা ইয়াগনিক, কবিতা কৃষ্ণমূর্তি, অনুরাধা পড়োয়ালেরা ঝিমঝিমানি নেশা ধরাত রোজ। তাদের কণ্ঠে ভয়ঙ্কর রকম হিট গান সদ্য যৌবনকে প্রতিমুহূর্তে নাড়া দিয়ে যেতে লাগল, মুহুর্মুহু প্রেমের প্লাবন ডাকতে লাগল শরীর-মন জুড়ে। রফি, লতা, কিশোর, আশা এনারাও ছিলেন, সঙ্গীতে- জীবনেও; কিন্তু এনারা তো নিজ গুণেই কাল্ট, তাই এনাদের নিয়ে আলাদা করে লেখার কিছু নেই।
আজকের নিয়মে হয়ত একটু পুরাতন, কিন্তু তাতে কী! সাজান, সড়ক, দিল হ্যায় কি মানতা নেহি, হাম হে রাহি পেয়ার কে, রঙ, ফুল অউর কাঁটে, রাজা, বরসাত, জিৎ, দিওয়ানা, রাজা হিন্দুস্তানি ইত্যাদি কত কত সিনেমার গান আমাদের বুঁদ করে রেখে অজান্তেই যৌবনে ঠেলে দিল জীবনকে। মুহূর্তে রঙিন হয়ে উঠল চারিপাশ। খোঁজ শুরু হলো মনের মানুষের, খোঁজ শুরু হলো ঐসব অপার্থিব সুরের স্রষ্টাদের। সদ্য যৌবন কালেই ঘরে চলে এলো ব্যাটারিচালিত এ্যালুমিনিয়ামের এ্যান্টেনা-বুস্টার সমৃদ্ধ সাদাকালো টিভির দূরদর্শন আর ল্যান্ডলাইন ফোন। যোগাযোগ তথা তথ্যের পৃথিবী গত দিনের তুলনাতে ঠিক কতটা খুলে গেছিল তা আজকের প্রজন্ম উপলব্ধি করতে অক্ষম। চোখে দেখতে পেলাম এতদিনের পছন্দের গানগুলোকে, সব যে পছন্দ হতো তা নয়, তবে এটা ছিল অন্য ভালোলাগা।
জানলাম এই সমস্ত হিট গানের পিছনে একজন লেখক থাকেন, একজন সুরকার থাকেন, এতদিনে ক্যাসেটের রঙিন কাগজ পড়ে দেখতে লাগলাম। খোঁজ শুরু হলো সেই সব সুরকারেদের, আর-ডি, বাপ্পি লাহিড়ী, আনন্দ-মিলিন্দ, অন্নু মালিক, যতীন-ললিত... প্রেমে মাতোয়ারা গেলাম। স্কুলে বন্ধুদের সাথে গল্প জমাতাম, বান্ধবীদের ইমপ্রেস করতে সেলুনে গিয়ে লুকিয়ে ফিল্মি পত্রিকা পড়া শুরু করলাম। তবে এই পর্বে প্রেমের চেয়েও একটু বেশি যদি কিছু হয়ে থাকে, উন্মাদনার সিংহভাগটা যাদের জন্য বরাদ্দ হলো- তাদের নাম নাদিম-শ্রাবণ। জেনেছিলাম রূপ কুমার রাঠোর আর বিনোদ রাঠোর শ্রাবণেরই সহোদর।
সেই একতরফা প্রেমে পাগল হয়ে মাতোয়ারা, কী সব এক সে এক হিট গান, রোজ শুনেও যেন টাটকা তাজা রয়ে থাকত- সেই প্রেম চিরন্তন, আজও অমলিন। আজও মনের মধ্যে বিভিন্ন আবেগ-অনুভূতি, বেদনা, প্রেম-ভালোবাসা যখন শুরু বা শেষ হয়- তখন যে গানগুলো অন্তরে বেজে উঠে, চোখ বুঝলে নিজে থেকেই গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠে আমার স্বত্তা; রবীন্দ্রসংগীতের পর সেগুলোর অধিকাংশেরই স্রষ্টা নাদিম-শ্রাবণ। ব্যাস, আত্মার আত্মীয় হতে আর সময় লাগে কী! উপরওয়ালা কাকে আত্মীয় বানিয়ে পাঠায় আর আমরা কাকে আত্মীয় বানিয়ে নিই- সেই রসায়নকে কোন বিজ্ঞানী সংজ্ঞা দিতে পারে!
কালের নিয়মেই এর পর ভালর পরিমাণ কমতে লাগল ঠিকিই, কিন্তু তার মধ্যেও সির্ফ তুম, পরদেশ, ধড়কন, রাজ, তুমসে আচ্ছা কৌন হ্যাঁয়, দিল হ্যাঁয় তুমহারা- আলাদা করে মনে গভীর দাগ কেটে দিলো। নতুন করে কী দিল, কী পাচ্ছি তার চেয়েও বড়- কী পেয়েছি, কী রয়েছে ঝুলিতে পুঁজি স্বরূপ, ইত্যাদি- সেটাই কী আত্মধনী হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়! প্রশ্ন করার আগেই এমন উত্তর পেয়ে এক নির্লিপ্ত আত্মপ্রশান্তিতে ভরে উঠে মন। শরীরের অলিগলিতে বাসা বেঁধে থাকে যে সব চাহিদা- তা সে সমাজ কিংবা ধর্মের বিধি মেনে হোক, বা না-মেনেই হোক- সে সব অন্তরে গাঁথা থাকে নিভৃতে।
সে ছিল এক জাদু সময়, আজকাল তো আর সেই অর্থে আর গান তৈরিই হয় না। সবাই নাচতে চায়, প্রচুর যন্ত্রের আওয়াজ, সুর কোথায় কেউ জানে না, গানের কথা কী কেউ বোঝেনি। গান কবে আসে আর কবেই বা হারিয়ে যায় কেউ খোঁজ রাখে না। অথচ সে সময়ও যন্ত্রসঙ্গীতের ব্যবহার ছিল, যেটা অত্যাচার ছিল না। তাকে বলা হতো মেলোডি। আমাদের সেই সোনালী কৈশোর-যৌবন ছিল মেলোডিময়।
অতীত গত হয়ে গিয়ে বাস্তবের কঠোর জমিতে জীবন সংগ্রাম চলছে কর্মজীবনের। সংগীতের নামে সংঘবদ্ধ যন্ত্রের অত্যাচার 'কথা ও সুর' কে অনেক আগেই মেরে দিয়েছে। গায়কেরা অসহায়, যা পায় তাই গায়- গায়কের সংজ্ঞাও বদলে গেছে, আজকে অধিকাংশ সুরকারই গায়ক।
মেলোডির অপমৃত্যু আমরাই দেখেছি, তার ডেথ সার্টিফিকেট ছিল না। পরশু যখন শুনলাম শ্রাবণ কুমার রাঠোর আর নেই, বুঝলাম সেই প্রতীক্ষিত ডেট সার্টিফিকেট ইস্যু হয়ে গেল। একটা যুগ, একটা প্রজন্ম, একটা প্রাণে ভরপুর সাংস্কৃতিক ঘরানাকে সাথে করে নিয়ে তিনি চলে গেলেন।
শিল্প-সংস্কৃতি বহমান সময়ের প্রতিচ্ছবি আঁকে, নাদিম-শ্রাবণ জুটি তার ব্যতিক্রম নয়। আমাদের শৈশব, কৈশোর, যৌবন সহ আজ এই মাঝ বয়সে এসে উপলব্ধি করতে পারি- জীবনে মেলোডি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এ এক এমন আকর্ষণ যার কোনো বস্তুগত ব্যাখ্যা হয় না, এক অমোঘ টান যা বহু সম্পর্ককে নাৎস করে দেয়।
সঙ্গীত জগতের মেলোডির অন্যতম সম্রাট- শ্রাবণ কুমার রাঠোর চিরঘুমের দেশে। তার সৃষ্টি আমাদের ও আগামী প্রজন্মকে মেলোডিতে ডুবিয়ে রাখবে যারা মেলোডিতে ডুবে জীবনের স্বাদ পেতে চায়। আর আমার মতো কারো জীবনটাই তো শ্রাবণের ধারাতে ধোয়া।

বিদায় মেলোডি সম্রাট।
🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...