শুক্রবার, ১২ মার্চ, ২০২১

শিক্ষকদের স্বার্থে সরকার ও নাগরিক সমাজ

 


মেধার অপচয় চলবেনাঃ পর্ব- ১

গোটা দেশের পাশাপাশি এই পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে করোনা নামের মহামারী গ্রাস করে রেখেছে। প্রায় অধিকাংশ মানুষই জীবন-জীবিকার জন্য সংগ্রাম করছে। কিছু মানুষ আছেন যারা আরো নিরুপায়, তেনারা পেশাগতভাবে সরকারী কর্মচারী। তারা কেউ স্কুল শিক্ষক, কেউ রেল কর্মচারী, কেউ বা অন্য দপ্তরের যারা সরকারের ৫০% হাজিরার ফরমানে ঘরে বসে আছেন, মরমে মরে।
শিক্ষকেরা কার্যত ঘরে বসে রয়েছে দীর্ঘ এক বছর প্রায়, হায়ারসেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষককুল মাঝের এক দু’মাস কর্মস্থলে ফেরার সুযোগ পেলেও অন্য শিক্ষকেরা সেই সুযোগটুকুও পাননি। মাসে ২-৩ দিন মিড-ডে মিলের বিলিবন্টন- তারপরে এক বিরাট শূন্যতা তাদের স্বাভাবিক জীবনকে তছনছ করে দিয়েছে পাহাড় থেকে সাগর। রেলও বন্ধ ছিল দীর্ঘদিন, পরে খুললেও তা অর্ধেক মাত্রার ছিল, নতুন করে আবার তা বন্ধ হয়েছে। অন্যান্য সরকারি অফিস, আদালত বহু ক্ষেত্রেই কর্মচারীদের জোর করে ছুটিতে রাখা হয়েছে। অথচ এনাদের অধিকাংশ জনই মনে প্রাণে কাজ করার জন্য মুখিয়ে আছেন, কিন্তু যেহেতু স্কুল বন্ধ বাচ্চাদের স্বাস্থ্যের প্রশ্নে, অফিস বন্ধ করোনার বিস্তার রোধ রুখতে- তাই তারা গুমরে কাঁদছেন, কর্মস্থলে আসতে না পেরে।
‘শিক্ষক সহ ঘরে বসে থাকা সরকারী কর্মচারীদের মাস মাহিনা বন্ধ করে দেওয়া হোক অথবা মাহিনা অর্ধেক করে দেওয়া হোক’ জাতীয় যে অযৌক্তিক দাবিগুলো উঠছে, আমরা তার তীব্র বিরোধিতা করছি এই পর্যায়ে। তাদেরও প্রত্যেকের সংসার রয়েছে, তাদেরও বিকল্প কোনো রোজগার নেই, তারাও অধিকাংশ জন যোগ্যতার নিরিখে চাকরিতে বহাল হয়েছেন। সুতরাং, অশালীন কিছু ভাবনা ভাবার পরিবর্তে আমরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছি ‘বিকল্প’ ভাবনার প্রেক্ষিতে। সমাজের শিক্ষিত শ্রেণী, যাদের মধ্যে মেধা, বিদ্যা, বুদ্ধি ও কর্মদক্ষতা রয়েছে তারা সরকারি কর্মচারী। এনাদের মধ্যে শিক্ষক সম্প্রদায় ফলিত জ্ঞানের আধার, তাই এই সকল সরকারি কর্মীদের গুণ কুশলতাকে বিভিন্ন বিকল্প ক্ষেত্রে কাজে লাগিয়ে সমাজকে আরও সুন্দরভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বার্থে কিছু অনন্য পরিকল্পনা করা উচিৎ। ভারতবর্ষ এতো বড় দেশ, থোরিই প্রতিটি দপ্তরে পর্যাপ্ত পরিমাণে কর্মী রয়েছে?
প্রতিজন ঘরে বসে থাকা কর্মীকে তার যোগ্যতা অনুযায়ী টেম্পোরারি অন্যদপ্তরে নিয়োগ করা হোক, সংশ্লিষ্ট সেই দপ্তরের কোন সিনিয়র অফিসারদের অধীনে। শিক্ষকেরা স্পেশাল, তাদের কোনো স্পর্শকাতর কাজে নিয়োগ করা যাবেনা। বেশিরভাগ শিক্ষক যারা কমপক্ষে স্নাতক, তারা যেহেতু পেন ধরে অথবা কম্পিউটারের কাজ করতে অভ্যস্ত তাই তাদের ঐ জাতের কাজে আগে নিয়োগ করা হোক। প্রত্যেকটি কাজের সাথে তারিখসহ স্বাক্ষর বাঞ্ছনীয়, নতুবা দুর্নীতির সৃষ্টি হবে।
প্রত্যেককে কোভিড প্রোটোকল মেনে পর্যাপ্ত সুরক্ষা গ্যাজেট ও ওষুধপথ্যের পাশাপাশি একটা বিমা করিয়ে তবে নতুন টেম্পোরারি কর্মস্থলে পাঠানো হোক। ঠিক যেভাবে স্বাস্থ্যকর্মী ও ডাক্তারেরা আমাদের সেবা দিয়ে চলেছেন। শিক্ষকেরাও কী কোনো অংশে দেশ তথা জাতির সেবার জন্য ডাক্তার- স্বাস্থ্যকর্মীদের চেয়ে কম যান! সুযোগ পেলে তারা ছাপিয়ে যাবার ক্ষমতা রাখেন।
তেমনই কিছু বিকল্প পরিকল্পনা রইল- আপনাদের ভাবনাতেও কোনো চমৎকার ভাবনা থাকলে শেয়ার করতে পারেন।
খাদ্য এবং গণবণ্টন ব্যবস্থায় নিয়োগ
~~~~~~~~~~~~~~~~~
এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর হলেও কেন্দ্র বা রাজ্যের তরফে এই দপ্তরে বিপুল কর্মী ঘাটতি রয়েছে। প্রতিবছর টেন্ডার ডেকে বহু নষ্ট হয়ে যাওয়া খাদ্যশস্য ফেলে দিতে হয়। প্রোক্রিয়োর কিম্বা গণবন্টন ব্যাবস্থা দুটতেই অনেক অনিয়ম আর দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, এই সকল শিক্ষিত মানুষদের বহাল করে এই অতিমারী কালে দপ্তরের খোলনাচল বদলে দেওয়া যেতে পারে। এখানে দারোয়ান থেকে রসায়নবিদ হয়ে অর্থনীতিবিদ সকলের জন্য স্বল্প সময়ের জন্য কাজের স্কোপ রয়েছে। সিনিয়র পুরুষ শিক্ষকদের এখানে নিয়োগ করার বন্দোবস্ত করা হোক।
স্বাস্থ্য বিভাগ
~~~~~~~~~~
স্বাস্থ্যবিভাগের ব্যাকআপ অফিসে, যেমন মেডিসিন এন্ট্রি, মেডিসিন পারচেজ এন্ড সেলস, হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে রোগী ভর্তি সহ অসংখ্য মানুষের প্রয়োজন সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট সব কাজে ঘরে বসে যেমন কাজ হয়- এমন বহু শূন্যস্থান আছে- সেগুলি মহিলা শিক্ষক ও অন্যান্য শিক্ষিত কর্মচারি দিয়ে দিয়ে পূরণ করা যেতে পারে।
নারী ও শিশু কল্যাণ বিভাগের জন্য গ্রামীণ অঞ্চলে অল্প কিছু আশা এবং স্বাস্থ্য কর্মী রয়েছে। জনসংখ্যা পিছু পর্যাপ্ত কর্মীর ভীষণ অভাব রয়েছে। এই অতিমারিকালে মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন, এর সাথে প্রসূতি ও শিশুদের বিশেষ পরিচর্যা প্রয়োজন। আপার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষাকর্মীদের ওই স্বাস্থ্যকর্মীদের সাথে জুড়ে দেয়া হোক।
এই মুহুর্তে সমাজের বুকে এক ধরনের আতঙ্ক ত্রাস করছে, মানুষ ভয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছেনা। দেশের অধিকাংশ মানুষের পড়াশোনার সাথে প্রতক্ষ্য যোগাযোগ নেই- তাদের মাঝে নানান কুসংস্কার ছড়াচ্ছে। সরকারের কাছে বিভিন্ন জরুরী পরিষেবা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত কর্মী নেই। প্রাথমিক স্কুল শিক্ষকদের তার স্কুল সংলগ্ন স্থানে অঞ্চলে সোশ্যাল ভলেন্টিয়ার এর কাজ দেয়া হোক। যারা গরীব, অসহায়, অক্ষম ব্যক্তিদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নানা ধরনের পরিষেবা দিতে সরকারের পক্ষ থেকে। সুবিধা অসুবিধাতে তাদের ফোন করবে, যাতে তারা বিপদে আপদে মানুষে পাশে থাকতে পারে সরকারের পক্ষ থেকে।
পথে ঘাটে গণসচেতনতা
~~~~~~~~~~~~~~~~~
সাধারনভাবে মানুষ মাস্ক পরছে না হাটেবাজারে, গণসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তাদের থেকে ফাইন সংগ্রহ করা হচ্ছে। কিন্তু সেটা খুবই মুষ্টিমেয় কিছু স্থানে। এই কাজে যুবক পুরুষ শিক্ষকদের নিয়োগ করা যেতে পারে, উনারা স্কুলে ছড়ি হাতে নিয়ে কাজ করতে অভ্যস্ত৷ দেশের স্বার্থে তারা রাস্তায় দাঁড়াতে মোটেই কুন্ঠাবোধ করবেননা। তাদের সাথে অবশ্যই পুলিশ থাকবে যারা শিক্ষকদের সুরক্ষা দেবে। মানুষকে মাস্কের প্রয়োজনীয়তা বোঝানো ও ফাইনের রসিদ শিক্ষকেরা কাটবে, এতে পুলিসের নামে দুর্নীতির দাগও মুছবে- কারন শিক্ষকেরা সৎ।
আইন ও আদালত
~~~~~~~~~~~~~
বিভিন্ন মহকুমা দেওয়ানি আদালত এবং ক্রেতা সুরক্ষা দপ্তরে- শুধুমাত্র অফিশিয়াল কাজকর্ম করার লোকের অভাবে বহু মামলা দীর্ঘায়িত হচ্ছে, সাধারণ মানুষ বিচার পাচ্ছেনা দিনের পর দিন। সেখানে কিছু শিক্ষকদের পাঠানো হোক, তারা কোর্ট অফিসারদের সহযোগিতা করে দেশের বিচারব্যবস্থাকে কিছুটা গতি দিতেই পারেন।
ভূমি ও রাজস্ব দপ্তর
~~~~~~~~~~~
এই দপ্তরের দীর্ঘ সুত্রিতার লাল ফাঁসের গেরোর শিকার আমরা সকলেই। ভূগোল ও অর্থনীতির শিক্ষকদের স্পেশালি এই দপ্তরে নিয়োগ করা হোক।
পর্যটন
~~~~~
রাজ্যের পর্যটনশিল্প একেবারে তলানিতে পৌঁছেছে। ভ্রমনপিপাসু কিছু শিক্ষকদের ছোট ছোট দল গঠন করিয়ে বিভিন্ন পর্যটন সম্ভাবনাময় জায়গা গুলোতে পাঠানো হোক। সেখানকার ইনফ্রাস্ট্রাকচার খতিয়ে দেখুন এবং গোটা বিষয়টার উপরে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দিক, পরামর্শ দিক- টুরিষ্টের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করে, কীভাবে সরকারের আয় বাড়তে পারে এই খাত থেকে।
লাইব্রেরী
~~~~~~
রাজ্যের প্রায় সকল লাইব্রেরীতে কর্মীর অভাব রয়েছে, নিয়মিত সংস্কারের অভাবে বই এর তাকে ধুলো জমছে। এখানে কিছু শিক্ষককে দায়িত্ব নিয়ে টেম্পোরারি নিয়োগ দেওয়া হোক। তারা গ্রামে গ্রামে লাইব্রেরীর গুরুত্ব বোঝাক, এই লকডাউনে বাড়িতে বসে বই পড়ার অভ্যাস বাড়াতে প্রচার করুক, পাশাপাশি লাইব্রেরীগুলোকে সাফাই করে আবার তার শ্রী ফিরিয়ে আনুক- প্রয়োজনে রোজের শ্রমিক করে সাফাই করে লাইব্রেরীগুলোকে আবার আবাদ করে তুলুক।
পরিযায়ী শ্রমিক এ্যাসিষ্ট
~~~~~~~~~~~~~~~~
বিভিন্ন রাজ্যে বা ভিন জেলাতে কর্মরত পরিযায়ী শ্রমিকরা ঘরে ফিরছে, অধিকাংশ শহরে ঘোষিত বা অঘোষিত লকডাউন চলছে। নানা ধরনের সমস্যা ও কষ্টের সম্মুখীন হচ্ছে সেই শ্রমিক ও তাদের পরিবারকে। শ্রম দপ্তরের অধীনে থেকে এই হতভাগ্য শ্রমিকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে সুস্থ ভাবে তাদের ঘরে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের পরিবহণ ও অন্যান্য জরুরী দপ্তরের সাথে লিয়াজো মেন্টেন করার কাজে শিক্ষিত সরকারি কর্মচারী তথা শিক্ষকদের নিয়োগ করা হোক রাজ্যের প্রতিটি প্রশাসনিক ব্লক ধরে।
বনদপ্তর
~~~~~~
বহু শিক্ষক ও সরকারী কর্মী শখের বাগান করতে খুব ভালবাসেন, তাদের বনদপ্তরের বিভিন্ন কাজে নিয়োগ করা হোক। সবুজায়ন ও বনসৃজন প্রকল্পে শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো হোক। এতে বনদপ্তরও কিছুটা অক্সিজেন পাবে, ঘরে বসে থাকা শিক্ষকেরাও কটাদিন হাঁফ ছেড়ে বাঁচবেন মুক্ত পরিবেশে।
তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর
~~~~~~~~~~~~~
এই দপ্তরেও কর্মী অপ্রতুল। রাজ্যের বিভিন্ন বিষয়ে সংগৃহীত তথ্য পঞ্জীকরনের এই এক অব্যর্থ সুযোগ, শিক্ষকের এই কাজে নিয়োগ করা হোক।
ভার্চুয়াল প্রচার
~~~~~~~~~
সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রায় প্রতিজন শিক্ষকই ভীষণভাবে অ্যাক্টিভ, তাদের নিয়ম করে সরকারি সচেতনতা প্রচার করানো হোক একটা নির্দিষ্ট দল দিয়ে। এটা স্কুল পরিদর্শকেরা মনিটর করুক।
বিবিধ সরকারি দপ্তর
~~~~~~~~~~~~~
পুরসভা, পঞ্চায়েত, জেলা পরিষদ, কর্পোরেশন, সেচ দপ্তর, দমকল দপ্তর, উদ্বাস্তু ত্রান ও পুনঃর্বাসন দপ্তর, মৎস দপ্তর, প্রাণী সম্পদ উন্নন দপ্তর, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প দপ্তর, বস্ত্র দপ্তর, প্ল্যানিং, স্ট্যাটিসটিক্স ও প্রোগ্র্যাম মনিটরিং দপ্তর সহ বহু ইমারজেন্সি দপ্তরে পর্যাপ্ত কর্মীর অভাব রয়েছে- সেখানেও শিক্ষকদের দায়িত্ব দেয়া হোক, কারন মাস্টারেরা দায়িত্ববান ও সৎ- তারাই দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলে। শিক্ষকদের হাতে এই দপ্তরের কিছু দায়িত্ব গেলে আমার বিশ্বাস এনারা একটা মসৃণ প্রশাসন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবেন।
আপনি সহমত পোষণ করলে পোষ্টটিকে শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...