দুর্গাপুজো বাঙালির আবেগ, বর্ণিল উৎসব। উৎসবের ভঙ্গিতে দেবী আগমণ করেন নতুন স্বপ্ন নিয়ে, বাচ্চাদের নতুন পোশাক নিয়ে, প্রবাসীদের আত্মীয়স্বজনের সাথে একাত্ম করতে, বয়স্কদের পুনর্মিলনীর স্বাদ হয়ে, পরিবারে খুশির পুঁটুলি হয়ে, সুস্বাদু খাবারের জাদু হয়ে, মন্ডপের দর্শনার্থী হয়ে, আলোর জাদুতে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে। ডাকের সাজ, ঢাকের বোল আর আরতির ধোঁয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে, ভক্তের প্রাণে মধুর স্মৃতি হতে মর্ত্যে নেমে আসেন দেবী। সময়ের পায়ে পায়ে দুর্গা পুজোর ইতিহাসও নানান ভাবে আবর্তিত হয়েছে কালের কক্ষপথে। চলুন আজকে সেই সংক্রান্ত একটা অগোছালো এলোমেলো আলাপ করি।
অতুলনীয় উৎসাহ ও ভক্তির সাথে, বিশ্বজুড়ে সনাতনী মানুষ দেবীকে সম্মান জানাতে একত্রিত হয়, তাঁর বিজয় এবং ঐশ্বরিক শক্তি উদযাপন করে মহা সমারোহে। মহিষাসুরের উপর দেবীর বিজয়, মন্দের উপর ভালোর জয়ের প্রতীক। দেবী ঐশ্বরিক নারীশক্তির মূর্ত প্রতীক, যিনি একধারে যেমন উগ্র তেমনই মাতৃরূপী করুণাময়ী। এই কারনেই দুর্গাপুজো একটি প্রাথমিক ধর্মীয় আচার থেকে, ক্রমে বিশাল সামাজিক-সাংস্কৃতিক জমকালো অনুষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে।
দেবীর শক্তি, স্থিতিস্থাপকতা এবং প্রতিরক্ষামূলক প্রকৃতির পুজা করা হয়। একই সাথে শান্তি, সমৃদ্ধি এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সুরক্ষার জন্য আশীর্বাদও আহ্বান করা হয়। তাঁর ধারণ করা প্রতিটি অস্ত্র শক্তির প্রতীকী প্রতিনিধিত্ব করে। ভয়, অজ্ঞতা, অহংকার এবং অন্যায়ের মতো অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক মন্দকে পরাজিত করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়। রূপকভাবে, মহিষাসুরের সাথে দেবীর যুদ্ধ, সমাজের মধ্যে ভাল এবং মন্দের মধ্যে চলমান সংগ্রামের প্রতিফলন।
দেবী দুর্গা নারী ক্ষমতায়নের বার্তা প্রদান করেন, অপ্রতিরোধ্য প্রতিকূলতার মুখে, অনৈতিকতার উপর ন্যায় এর বিজয়। দেবী নিজে সুরক্ষার মূর্ত প্রতীক, হিংস্রতা এবং লালনের মধ্যে ভারসাম্যের প্রতিরূপ। কর্ম এবং ধৈর্য, ধ্বংস এবং সৃষ্টি, শক্তি এবং সহানুভূতির মধ্যে ভারসাম্যের প্রতীক হলে দেবী দুর্গা। ভারত জুড়ে দেবী দুর্গার বিভিন্ন রূপ রয়েছে, বিশেষ করে নবদুর্গা, নবরাত্রির সময় তাঁর নয়টি অবতারের পূজা করা হয়। পশ্চিম ও মধ্য ভারতের কিছু অংশে দুর্গা নানা ভাবে, নানা রূপে পূজিত হন।
নন্দীর উপরে শৈলপুত্রী, সিংহের উপরে কুষ্মাণ্ডা, স্কন্দমাতা এবং কাত্যায়নী, বাঘের উপরে চন্দ্রঘণ্টা, গাধার উপরে কালরাত্রি, ষাঁড়ের উপরে মহাগৌরী, ঘোড়ার উপরে ব্রহ্মচারিণী, সিদ্ধিধাত্রী, ইত্যাদি দেবীর নানার রূপ। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রূপগুলির মধ্যে রয়েছে দশটি জ্ঞান দেবীর সমষ্টি, দশটি মহাবিদ্যা, যেমন কালী এবং তারা, এবং আঞ্চলিক প্রকাশ যেমন পূর্ব ভারতে চণ্ডিকা এবং দক্ষিণ ভারতে মারিয়াম্মান, যা তাঁর সর্বোচ্চ নারীশক্তির বিভিন্ন দিককে মূর্ত করে।
বাংলায় দেবীকে মহিষাসুর মর্দিনী রূপে পূজিত করা হয়। দেবী তাঁর স্বর্গীয় আবাস কৈলাস পর্বত থেকে পিত্রালয়ে বেড়াতে আসেন কন্যা বেশে। ভক্তরা দেবীর আশীর্বাদ প্রার্থনা করে পুষ্পাঞ্জলি এবং আরতি এর মতো বিস্তৃত আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন। উৎসবের প্রধান দিন অষ্টমীর সন্ধি পুজো, যা অষ্টমী থেকে নবমীতে রূপান্তরের প্রতীক।
মার্কণ্ডেয় পুরাণ মতে, কিংবদন্তি রাজা সুরথ সভাসদদের ষড়যন্ত্রে রাজ্যহারা হলে, তা পুনরুদ্ধারে ঋষি মেধাসের পরামর্শে তিনি দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করেন। প্রার্থনায় সন্তুষ্ট দেবী রাজ্য ফিরিয়ে দিলে, রাজা প্রতি বছর বসন্তকালে এই পুজোর প্রচলন করেন, যেটি বাসন্তী পুজো নামেও পরিচিত।
বর্তমান বাংলায় প্রচলিত দুর্গাপুজো রাজা সুরথের পুজো নয়। আজ যে উৎসব দেখা যায় তা রাজসিক পুরাণের ছায়ায় কৃত্তিবাস রচিত, ১৫ শতকের বাংলা রামায়ণ অনুযায়ী। এখানে রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার আগে শ্রীরাম কর্তৃক দুর্গার উপাসনার ঘটনা রয়েছে, যেটা আশ্বিন মাসে ঘটেছিল। কথ্য ইতিহাস অনুযায়ী নদীয়া জেলার তাহেরপুরের জমিদার কংস নারায়ণই বাংলায় প্রথম শারদীয় দুর্গাপুজোর আয়োজন করেছিলেন, বসন্তকালে প্রচলিত দুর্গাপুজোর পরিবর্তে।
লিখিত ইতিহাসে আমাদের বঙ্গদেশে দেবীর আরাধনার প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ৫৫০ খ্রিস্টাব্দে বীরভূমের মাটিতে। পরবর্তীতে ১৬০৬ খ্রিস্টাব্দে কৃষ্ণনগরের ভবানন্দ মজুমদার দ্বারা পুজোর উল্লেখ ইতিহাসে পাওয়া যায়, যিনি রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের পূর্বপুরুষ ছিলেন। ১৬১০ খ্রিস্টাব্দেই সম্ভবত কলকাতায় প্রথম দুর্গোৎসবের আয়োজন হয়েছিলো জমিদার সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারে।
সপ্তদশ শতাব্দীর শেষের দিকেও, দুর্গাপুজো জনসাধারণের উৎসব ছিল না। দুর্গাপুজো মূলত ধনী ও ক্ষমতাবানদের একটি উদযাপন ছিল, তাই এটা রাজা-জমিদারদের বাড়িতেই সীমাবদ্ধ ছিল, খুব সীমিতভাবে নির্বাচিত কিছু সাধারণ মানুষ আমন্ত্রণের মাধ্যমে পুজোয় প্রবেশাধিকার পেতো শুধু দর্শনার্থী হিসেবে। এর মূল কারণ- দুর্গা পুজো একটি ব্যয়বহুল বিষয়। চার দিন ধরে চলা বিবিধ আচার-অনুষ্ঠান, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে আর্থিকভাবে বহন করা একপ্রকার অসম্ভব ছিল। শতশত বছর ধরে পুজো পর্যায়ক্রমে রূপান্তরিত হয়েছে। হুগলির গুপ্তিপাড়া পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেয় ১৭৯০ সালে, ‘বারোয়ারী দুর্গোৎসব’ ভাবনাটাই এই প্রিয় উৎসবের দুয়ার খুলে দেয় আম মানুষের জন্য। সত্যিকার অর্থে জনসাধারণের উৎসবে পরিণত হয়।
আজও গ্রাম বাংলার পুজো কলকাতার পুজোর থেকে সূক্ষ্মভাবে আলাদা। গ্রাম্য জীবনে পুজো চার দিনের নয়, গুণে গুণে দশ দিনের উৎসব। মফঃস্বলের পুজো, শহুরে বিলাসী বৈভবের বাইরে গিয়ে একটা মেঠো সোঁদা গন্ধ বহন করে। শ্রেণী এবং মর্যাদার এক অদম্য আধিপত্য গ্রামীণ মানুষকে বেঁধে রাখে, যা নগর জগতে শিথিল হয়ে যায়। এখানে জীবন কিছুটা ধীর, তাড়াহুড়ো হীন প্রশান্ত। মেঠো পথ আর ভেজা কাদা যেমন মাখামাখি করে থাকে, তেমনই আবেগের সাথে ঐতিহ্য ধরা দেয় গ্রামজীবনে- এই অনন্য আনন্দ জীবনের কঠিনতাকেও রাঙিয়ে দেয় অদ্ভুত প্রসন্নতায়।
আবেগ প্রকাশে অক্ষমতা থাকলেও, অনুভবে তাকে রোখা যায়না। স্মৃতির রোমন্থনসুখ অভূতপূর্ব সুখানুভূতি, যেন দূষণমুক্ত বাতাসে প্রাণভরে শ্বাস নেওয়ার মতই ফুরফুরে। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া মূল ফটকের ভেতরে একটা উঁচু মঞ্চের উপরে শামিয়ানা, তার নিচে সপরিবারে মা দুর্গা। ম্যারাপের অদূরে একটা বাতাবি লেবুর গাছ, পূর্ণ প্রস্ফুটিত শিউলি গাছটার পাশে ফলন্ত আতা গাছ। ইতিহাসের সাথে মাখামাখি করে থাকা ভগ্নপ্রায় পুরাতন প্রাসাদসম দালান থেকে ঝোলা আইভি লতা, শ্যাওলা ধরা ভাঙা ক্ষয়াটে দেওয়াল, তার মাঝে ইতিউতি কিছু জড়াজীর্ণ মুখের সারি।
একটা বদ্ধ ঘর, পুরানো মরচে পড়া বইয়ের সারি, তার গন্ধ যেগুলি স্পর্শ ধরা যায়না, সেই বাতাসে যাপন করলে তবে মেলে। প্রবীনদের মুখে শোনা পারিবারিক ইতিহাস, এখানেই উৎসবের সার্থকতা। অপ্রত্যাশিত আপেক্ষিকতার সমাবেশ ঘটে গ্রামের এই জাতীয় পুজোতে। বার্ষিক প্রত্যাবর্তন উদযাপন করতে মিলিত হওয়া শহুরে প্রাণ, গ্রাম্য প্রতিবেশীদের সাথে প্রাঙ্গণ জুড়ে আলাপি বৈঠকে মেতে উঠে, প্রসাদ বন্টনের অছিলায় আনন্দের বন্টনও হয় বৈকি।
পুজোর আচার-অনুষ্ঠানেরও নগরায়ন হয়েছে বৈকি, অনেক থিমের পুজো আজকাল প্রাচীন এবং আধুনিকের নিখুঁত মিশ্রণ হয়ে উঠছে। প্যান্ডেলের থিম, প্রতিমা উদ্ভাবন ও আলোক সজ্জার ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটে গেছে। স্বাধীনতা-উত্তর যুগে, কলকাতার দুর্গাপুজো ক্রমশ শৈল্পিক স্বত্তা প্রকাশের একটি জীবন্ত ক্যানভাসে রূপান্তরিত হয়েছে। সৃজনশীল ধারণা নিয়ে আয়োজকদের ক্রমাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, উৎসবটিকে শিল্প ও সংস্কৃতির বার্ষিক প্রদর্শনীতে পরিণত করেছে।
আজকের মন্ডপ গুলো জলবায়ু পরিবর্তনের গল্প বলে, লিঙ্গ অসমতাকে সামাজিক সমস্যা হিসাবে তুলে ধরে। প্রতিটি প্যান্ডেল যেন একেকটা ছোট গল্প, যার রেশ শেষ হয়েও শেষ হয়না। ধর্মীয় গন্ডির বাইরে গিয়ে আজকের দুর্গাপুজো একটি অর্থনৈতিক উদপানের উৎসব। বিপুল সংখ্যার শ্রমজীবী মানুষের কাছে এটা রুটিরুজি আমদানির কারনে উচ্ছ্বাসের। পোশাক শিল্পের উত্থান ঘটে, ছুটির দিনগুলো পর্যটন শিল্পে বিকাশ ঘটায়, পরিবহণ শিল্পে নতুন রক্ত সঞ্চালন করে। কলকাতায় বিপুল জনসমাগম শহরের অর্থনীতিতেও জ্বালানির যোগান দেয়। ফলত রাষ্ট্রের জন্যও এটা অর্থনৈতিক শক্তিদায়ক।
পুজো যতক্ষণ ধর্মীয়ভাবে সীমাবদ্ধ ছিল, ততক্ষণ এটি শুধুই ভক্তের উৎসব ছিল। আজকে যখন পরিধি বাড়িয়ে বাংলার দুর্গাপুজো বিস্তৃতি লাভ করেছে গণ উৎসবে, থিমের প্যান্ডেল, বহুজাতিক খাদ্যোৎসবে, থিয়েটার, চলচ্চিত্র, হর্ষে, আনন্দ-উল্লাসে পরিপূর্ণ সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তিতে, তখন বৈশ্বিক স্বীকৃতি এসেছে UNESCO থেকে। কোলকাতার ঐতিহ্য হিসেবে ‘দুর্গাপুজো’ নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
অনেকে কলকাতায় গিয়ে দূর্গাপুজো দেখার স্বপ্ন দেখেন। কোলকাতার বিখ্যাত কিছু দুর্গাপুজোর জনপ্রিয় স্থান- শোভাবাজার রাজবাড়ী, মোঃ আলী পার্ক, কলেজ স্কোয়ার, বাগবাজর সর্বজনীন, কুমোরটুলি সর্বজনীন, আহিরীটোলা সর্বজনীন, কাশী বোস লেন, তেলেঙ্গাবাগান, চালতাবাগান, ম্যাডক্স স্কোয়ার, আদি বালিগঞ্জে সর্বজনীন, একডালিয়া এভারগ্রিন, সিংঘি পার্ক, হিন্দুস্তান পার্ক, দেশপ্রিয় পার্ক, সুরুচি সংঘ, মুদিয়ালি, শিব মন্দির, বাদামতলা আষাঢ় সংঘ, চেতলা অগ্রণী ক্লাব, লাটুবাবু ছাতুবাবুর বাড়ির পুজো, দাঁ ভবন, জানবাজার রাজবাড়ী, ঠনঠনিয়া দত্ত বাড়ি, মল্লিক বাড়ির পুজো উল্লেখযোগ্য।
আজকের দিনে দুর্গাপুজো বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করে, সামাজিক সংহতি বৃদ্ধি করে, জাতি হিসাবে
সূক্ষ্মভাবে নিজেদের সংগঠিত হওয়ার মঞ্চ দেয়। আধুনিকতা আর সাবেকের মিশেলে আসলে আমরা আগামীর ঐতিহ্যকে লালল করে চলেছি। কুমোরদের ঐতিহ্যবাহী কারিগরি দক্ষতা, ডাকের সাজ, ঢাকের বাদ্যি, মন্ডপ সজ্জার
সৃজনশীলতা, দেবীর আরাধনার
জন্য তৈরি করা বিস্তৃত আচার-অনুষ্ঠানই আসলে আদর্শ বনেদিয়ানার
প্রতীক। আগামী যাকে উদযাপন করবে অহংকার আর গর্ব হিসাবে।
- - বিলাতের ‘মনিহার’ পত্রিকার পুজোবার্ষিকীতে প্রকাশিত

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন