ভারতীয় হিমালয়ান পার্বত্য রেঞ্জের এক অতি পরিচিত পর্যটন গন্তব্য। নৈনিতাল, দেরাদুন, মুসৌরি, আউলি- যেকোনো পাহাড়প্রেমীদের কাছে যেন এক স্বর্গের সমান। গাড়োয়াল আর কুমায়ুন এই দুই রেঞ্জ জুড়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিচিত্রতা ও বিবিধতা সমতলের মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধের মত আকৃষ্ট করে আসছে যুগের পর যুগ ধরে।
২০১৪ সালের পর যখন দেশে অমৃতকাল এলো, কিছু গেরুয়া ভেকধারী ভণ্ড তাদের আয়ুর্বেদ ব্যবসাতে সুনামি নিয়ে এলো। পতঞ্জলি সহ রাতারাতি গজিয়ে উঠা এমন বহু কোম্পানি তখন হরিদ্বার ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকা জুড়ে জমি অধিগ্রহন করতে লাগল স্বদেশী, দেশপ্রেম ও আয়ুর্বেদের নামে। এমনিতেই উত্তরাখণ্ড দেবভূমি নামে পরিচিত, সারা বছর বিপুল পরিমান পূণ্যার্থী যায়- পরিসংখ্যান পরে নিয়ে আসছি। আয়ুর্বেদের নামে শুরু করে পতঞ্জলি মাঝখানে কন্ডোম অবধি বানাতো, এর মাঝে মুদিদ্রব্য ও ভোগ্যপন্যের তথা FMGC বাজারে ‘সহি হিন্দু’ ও জাতীয়তাবাদী ট্যাগলাইন দিয়ে রীতিমত ফুলেফেঁপে উঠল, মানে আচ্ছে দিন এসে গেলো আরকি।
কিন্তু জমির যা দাম, তাতে কীভাবে এতো বেশী দাম দিয়ে জমি কেনা সম্ভব! ততদিনে ২০১৩ সালের কেদারনাথের মেঘভাঙা বৃষ্টির দরুন ভূমিধ্বস ও বন্যার ভয়াবহতা দেখে নিয়েছে পৃথিবী, গোটা রাজ্যটা একঅর্থে ছারখার হয়ে গিয়েছিল। মানুষ পেটের দায়ে জলের দরে ঘটি, বাটি জমি বিক্রি করে দিয়েছে। হাঙরেরা বুঝলো, বাহ- এই তো সুযোগ। আচ্ছেদিনের ফেরিওয়ালাদের সাথে মিলে একটা স্কিম চালু করল ওই জমি মাফিয়ারা, যেকোনো মুল্যে উত্তরাখণ্ডের পর্যটনশিল্পে ভাঁটা আনতে হবে, তাহলে হোটেল হোমস্টে নতুন করে হবেনা, পুরাতন গুলো বন্ধ হয়ে যাবে, লোকাল লোক সস্তায় জমি বেঁচে দিতে বাধ্য হবে। ২০১৬ সালে হরিশ সরকার চলে যেতে , RSS এর সরকার আসে ত্রিবেন্দ্র সিং এর নেতৃত্বে, এবং মাত্র ৩ বছরের মধ্যে শুধু পতঞ্জলী যোগপীঠ তাদের আশ্রমের নামে প্রায় ৪০০ একর জমি অধিগ্রহন করে নেয় একলপ্তে। রহস্যজনকভাবে তাদের আয়ুর্বেদ ব্যবসাতে সুনামি এল। আজকে ২০২৫ এর তারিখে শুধু পতঞ্জলী ও তার আনুষাঙ্গিক কোম্পানি গুলো মিলে প্রায় ১৩ হাজার একর জমি গ্রাস করে রেখেছে। বেনামে কত আছে কে জানে! অন্য আরো এমন আচ্ছে দিনের শকুনেরা মিলে কমবেশী জমিতে ইনভেষ্ট করা শুরু করে। ৩৭০ বিলোপের পর যেটা নিয়ে কাশ্মীরেও হইচই শুরু হয়েছিল, ওখানে জমির মালিক হবো ইত্যাদি।
চারধাম যাত্রা ধর্মপ্রাণ হিন্দুদের কাছে অতি পবিত্র, জীবনে একবার হলেও যেন যেতে পারি এই আকাঙ্খা অধিকাংশেরই থাকে। এটার উপরে হাত দেওয়া যাবেনা, তাছাড়া ভেক গেরুয়াধারী জমি হাঙরেরা- ধর্ম বেচেই ক্ষুন্নিবৃত্তি করে, অতএব তীর্থস্থান কেন্দ্রিক পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে ছোঁয়া যাবেনা। বাকি স্থান গুলোকে অদ্ভুত এক উপায়ে স্লো পয়জেনিং শুরু করে দিলো । বিখ্যাত বিখ্যাত যে সব ট্রেকিং রুট ছিল, সেখানে পর্যটকের চরম আকাল।
আমি নিজে পর্যটন শিল্পের সাথে যুক্ত, আমার ফেসবুক টাইমলাইনে অন্তত ২ ডজন এমন মানুষ আছেন যারা সমপেশায় যুক্ত। আপনারা শেষ কবে নৈনিতাল, আলমোড়া বা আউলির প্যাকেজ বিক্রি করেছেন? আমার বন্ধু তালিকাতে ১ জনও কেউ আছেন যিনি নৈনিতাল, দেরাদুন, মুসৌরি, আউলিতে হোটেল হোমস্টে চালান? যারা এই লেখা পড়ছেন তারা শেষ কবে এই স্থানগুলোতে বেড়াতে গিয়েছিলেন? কেউ চারধামের কোনো একটা স্থানে গেছেন, যাওয়া বা ফেরার পথে বুড়ি ছুঁয়ে যান বড়জোর। এই অবধি সব ঠিকিই ছিল।
এবার আসি
পরিসংখ্যানে, আপনি যদি উত্তরাখণ্ডের সরকারি তথ্য দেখেন- দেখবেন সেখানে গতবছরে মানে
২০২৪ সালে পর্যটক গেছে প্রায় সাড়ে সাত কোটি মানুষ। ২০২৩ সালের ঘোষিত ডেটা অনুযায়ী 59636601, 2000-2023 Yearly Statics.xlsx,
ঘটনা হচ্ছে এটা পরিমাপ করার পদ্ধতি বিষয়ে কিছু জানা নেই। আমরা যারা সিকিমে ব্যবসা করি তারা জানি যে রংপো, রংলি বা জোরথাং চেকপোষ্ট দিয়ে সিকিমে ঢুকলেই একটা footfall নথিবদ্ধ হয়, দার্জিলিং এর হোটেলেও থানাতে গিয়ে দৈনিক আগের দিনের রেজিস্টার খাতার ডেটা কপি জমা করতে হয়। গত ২০২৪ সালে যেমন ১৪ লক্ষ পর্যটক সিকিমে ঢুকেছিল। কাশ্মীরেও এভাবেই পর্যটক গোনা হয়, ২০২৪ সালে সেখানে এই সংখ্যাটা ছিল ২৬ লক্ষ।
গতবছর সরকারী তথ্য মতে শুধু কেদরনাথ দর্শনে গিয়েছিলেন সাড়ে ১৬ লক্ষের কাছাকাছি কিছু পূণ্যার্থী, বদ্রীনাথে ১৪ লাখ মত। দার্জিলিং এ বছরে গড়ে ৬ লাখের মত পর্যটক আসেন, তাতেই ‘পিক সিজেনে’ পা রাখার জাইগা থাকেনা। সেখানে উত্তরাখণ্ডে নাকি সাড়ে ৭ কোটি পর্যটক গেছে ২০২৪ সালে। পিডিএফের চার্ট দেখুন, একই পর্যটককে বারে বারে গুনে সংখ্যা বাড়ি্যে গেছে। পরিসংখ্যান বলছে ৬০% কেদার যাত্রী- বদ্রি ধামেও যান। কিন্তু এনারা দেখিয়েছেন কেদার বদি মিলিয়ে গেছেন ৩০ লাখ যাত্রী। বাকি ৭ কোটি কোথায় কোন হোটেলে হোমস্টেতে ছিল?
এদিকে পতঞ্জলির আয়ুর্বেদ আর মেডিসিন ব্যবসা পাতালমুখী, “স্বদেশী’ ভোগ্যপন্য আর প্যাকেজড খাদ্যপন্য বিক্রি করে কোম্পানি চলছে, তাও ২১ অর্থবর্ষে যেখানে আয় ছিল ১০৭০০ কোটির, সেখানে গত অর্থ বর্ষে এতো নতুন নতুন ব্যবসা, ইস্কুল, ইউনিভার্সিটি খুলেও ২৪% আয় কমেছে, এই অর্থ বর্ষে সেই আয় ৫০০০ কোটিরও নিচে চলে যাবে বলে পূর্বাভাষ। সাধে কী আর ইসলামি জেহাদী রুহ আফজার পরিবর্তে পতঞ্জলী সরবত খেয়ে মোক্ষ লাভের বিজ্ঞাপন নিয়ে আসতে হচ্ছে।
মোদ্দা কথা হলো যে ভাঁওতা দিয়ে জমি নিয়েছিল পর্যটনকে খোঁজা করে দিয়ে, তাদের মুখোস খুলে গেছে। কোনো কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি বা এরা করেনি, শুধু নিজেদের আখের গুছিয়েছে। ধর্ম বেচে রামদেব লক্ষকোটির শিল্পপতি হয়েছে, সাধারণ গ্রামের মানুষটা কী পেয়েছে, ৮২% হিন্দু অধ্যুষিত রাজ্যে- দেখো আমি সহি হিন্দু বললে কী তাকে কেউ খেতে দেবে? সত্যিই তো ‘হিন্দু খতরেমে হ্যায়’ অমৃত কালে। অতএব এখন যেকোনো উপায়ে কর্মসংস্থান প্রয়োজন। ২০১০ এর আগের ডেটা অনুযায়ী রাজ্যের মোট আয়ের ৬০% ই আসত পর্যটন থেকে, এখন মিথ্যা ৭ কোটির গল্প সাজিয়েও সেটাকে ৪৩%তে এনে নামিয়েছে। ৭ কটি না হলেও ৭০ লাখ তো করাতে হবে, কিন্তু কীভাবে? এখানে সম্ভবত আসল কুমিরের গল্পটা রয়েছে।
এই বছরে কাশ্মীরে টুরিষ্ট ফুটফলের সম্ভাবনা ছিল ৪০ লাখ, আমার অনুমান নয়- যারা ৩৭০ বিলোপে মিষ্টি মিলিয়েছিল, এটা তাদের ডেটা, গুগুলে পেয়ে যাবেন। পেহেলগামে টুরিস্ট খুন হলো, সরি হিন্দু টুরিস্ট লিখতে হবে নাহলে দেশপ্রেমের ঘাটতি প্রমানিত হবে। যাই হোক, কাশ্মীরে আগামী অন্তত ২ বছর যাবেনা পর্যটক, কিন্তু মানুষ তো ঘুরতে যাবে। মধ্য ও উত্তর ভারতের মানুষ নর্থ ইষ্টে আসাতে ততটা সড়গড় নন। হিমাচল এমনিতেই ওভারলোড থাকে।
সুতরাং, কিছু একটা মাস্টারস্ট্রোকের দরকার ছিল ‘হিন্দু’ উত্তরাখণ্ডকে পর্যটনের ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনতে, ‘জিহাদি’ কাশ্মীরে জঙ্গি হানা তো স্বাভাবিক ব্যাপার – তাই না! অনেক সম্ভাবনার মাঝে এটা এক সম্ভাবনা মাত্র, কারন আমরা বোরখা রামদেবকেও দেখেছি।
কে
বলে জঙ্গিদের ধর্ম হয়না, আলবাত হয়। ইসলামিক মৌলবাদ তো সত্যি বিশ্বজুড়ে, যেমন স্বাধ্বী
প্রজ্ঞার হিন্দু জঙ্গিবাদ সত্যি। গ্রাহাম স্টেইন সত্য ছিল, জাত দেখে মেরেছিল। যেমন
মনিপুরে মেইতেই জঙ্গিবাদ সত্যি। যে দেশের ২-৩টে বাদে প্রতিটা সরকারী ছুটি হয় ধর্মীয়
অনুষ্ঠান অনুযায়ী, সেখানে জঙ্গিদের ধর্ম হবেনা? প্রশ্ন একটাই, এই 'হিন্দু' হত্যার লাভ
কী কাশ্মীরীদের পক্ষে গেলো? নাকি
অবশিষ্ট ভারতের ১ জন মুসলমানও এই নারকীয় হত্যাকান্ড থেকে কোনো প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ফায়দা পাবে?
ফায়দা শুধু একটা দল ও তাদের
বংশবদ মিডিয়া চ্যানেল গুলোই পায়। এই কারনেই হিন্দু হৃদয়সম্রাট সৌদি থেকে ফিরে কাশ্মীয় যাননি,
না গেছেন শহীদদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে, না সর্বদলীয় মিটিং এ গেছেন, হামলার
পরেই সফর কাটছাঁট করে দেশে ফিরেই তিনি বিহারে ভোট প্রচারে চলে গেছেন, লাভের গুড় ঘরে তুলতে হবে যে।
যাই হোক, উত্তরাখণ্ড ভ্রমণে যাবেন নাকি?
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন