ষষ্ঠ তথা অন্তিম পর্বঃ দুধেল গাই ও পরিত্রাণ
এবারে আসি দুধেল গাই প্রজাতিতে। একটা জাতি কখন পিছিয়ে পরে, যখন মা হয় অশিক্ষিত বা অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী। এই রাজ্যের দুধেল গাই সমাজের ৯৮% মহিলা বাচ্চা পয়দা করার বাইরে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেনি। বড়জোর কেউ কেউ গৃহপরিচারিকার কাজ বা বিড়ি বাঁধার কাজ করেন, এই হচ্ছে দুধেল গাই সম্প্রদায় মহিলাদের পেশা। এ রাজ্যের সরকারী চাকরিতে দুধেল গাই মাত্র ৫% চাকরি করে, মহিলার সংখ্যা শতাংশের বিচারে আসেনা। অথচ জনসংখ্যার শতকরা ২৭ জন দুধেল গাই। মূল তো গরীবি আর শিক্ষাহীনতা, তাহলে কেন এরা দুধেল গাই হয়ে থাকবেনা, সেই বিজ্ঞান- যোগ্যতমের উদবর্তন। SNAP, Guidance Guild and Pratichi Trust সংস্থার জরিপ মতে, এ রাজ্যের মাত্র ৩ শতাংশ দুধেল গাই পরিবারের মাসিক আয় ১৫ হাাজার টাকা বা তার উপরে। প্রায় ৪০ শতাংশ দুধেল গাই পরিবারের মাসিক আয় ২৫০০ টাকা বা তারও নিচে। বাকি ৪০ শতাংশ মেরেকেটে মাসে ৫০০০ টাকা রোজগার করে। স্বভাবতই, মাসে মাসে যদি লক্ষীর ভাণ্ডারের নামে ফোকেটে ৫০০/১০০০ টাকা একাউন্টে ঢোকে, সেই পরিবারের কাছে মমতা ব্যানার্জী তো ফেরেস্তা।
সেটিং, চোর, স্বৈরাচার এই ধরণের এলিট শব্দের কোনো অর্থ আছে এই দুধেল গাই পরিবারগুলোর কাছে? অথচ সংখ্যার বিচারে, এদের ভোটেই তৃনমূল সরকার ক্ষমতায়। ভোট লুঠ, ধমকানি, চমকানি, যাবতীয় অপকর্ম দুধেল গাইদের দিয়ে করিয়ে নেওয়া যায় সামান্য কয়েক হাজারের বিনিময়ে। ফলত মারেও এরা, মরেও এরা। উপর তলার নেতারা লক্ষ কোটি কামাই করে চুরি চামারি করে, এই দুধেল গাই নামের আধুনিক দধীচির হাড়ের তৈরি সাম্রাজ্যে।
বিজেপির কাছে অবশ্য এরা দুধেল গাই নয়, এরা প্রত্যেকে পাকিস্তানি এজেন্ট, টুকরে টুকরে গ্যাং, দেশদ্রোহী, উগ্রপন্থী, কাটুয়া ও শান্তির ধর্মের ছেলে। উল্টোদিকের নজরে বিজেপি শব্দটাই হারাম, শয়তানের দোসর। ভোট বাক্সে দুধেল গাই আর যাকে খুশি ছাপ দিক, বিজেপিকে দেবেনা। তুলনামূলক শিক্ষিত দুধেল গাই গুলোর কাছে আজও তৃনমূল সেই ‘সাচার কমিটির রিপোর্ট’ দেখায় কুমির ছানার মত। তৃণমুল আমলে দুধেল গাইদের হাল - পরিসংখ্যানগত ভাবেই আরো তলানিতে গেছে, তার খোঁজই রাখেনা বামেরা, তারা পণ করেছে সেটিং তত্ত্বের বাইরে যাবেনা।
তারও পরে, দুধেল গাই দের পক্ষ নিয়ে কিছু বেশী বললে সুশীলেরা ‘বামৈশ্লামিক’ শব্দের যোগার করে রেখেছে, এর ছোঁয়াচ না বাঁচাতে পারলে এলিটত্ব প্রগতিশীল তকমা খসে যাবে। বাস্তবিক উভয়সঙ্কট, ফলত দুধেল গাই সম্প্রদায়ের কাছেই যায়না তাদের হিতার্থে। ধান্দাজীবী পীরের নেপোকিড গুলোকে সেকুলার পরিচয় দিয়ে বকলমে ‘দুধেল গাই’ সম্প্রদায়কে লাভ লেটার পাঠায়। দুধেল গাই সম্প্রদায়ের আধুনিক শিক্ষা কম থাকতে পারে, তার মানে তো নির্বোধ নয়, এরা বুঝে যায়, সেটিং তত্ত্বজীবীরা পরকিয়ার সম্পর্ক চাইছে। মাঝখান থেকে ক্ষীর খেয়ে যায় ভাইপো সিদ্দিকি। মোদ্দাকথা, দুধেল গাই সম্প্রদায় বামেদের আপন ভাবেনা, এদিকে তস্য গরীব দুধেল গাই দের কাছে মমতা ফেরেস্তা। কারন এরাজ্যে দুধেল গাই দের ভোটই মূল ফ্যাক্টর, ফলত, বামেরা জিরো।
অরাজনৈতিক আন্দোলন দিয়ে মমতা ব্যানার্জীকে টলানো যাবেনা, কারন সাম্প্রদায়িক রাজনীতির গুরুঠাকুরেরা তার উপাস্য। সেই নাগপুরী আশির্বাদ সদা সর্বদা তার বিপদে আপদে পাশে থাকে, রণে বনে জলে জঙ্গলে। তবে, সবেরই একটা শেষ হয়, কালের নিয়মেই। অধিক স্থুলতা মৃত্যুর কারন। লাগামহীন দুর্নীতি, চুরিচামারি ও স্বৈরাচারী শাসনের ভারে ভেতর থেকে এই সরকার ফাঁপা হয়ে গেছে, ভেন্টিলেশনে চলে গেছে। তৃনমূল দলটা চলছে তোলাবাজ সংগঠনের কর্তৃত্বে। যেখানে একটা কেষ্টা জেলে গেলে, ঠিক আরেকটা সমমানের দাগী কাজল তোলামূলকে এগিয়ে নিয়ে যাবার ভার নিয়ে নেয়।
যার কেউ নেই, সে ভাগ্যের হাতে সঁপে দেয় নিজেকে। পশ্চিমবঙ্গবাসীও নিজেদের সঁপে দিয়েছে নিয়তির হাতে। নিয়তির পরিহাস অতি রুক্ষ। জাল গুটানো হচ্ছে একটু একটু করে। লক্ষ্য মাথা। আমরা গোয়েন্দা গল্পের ভক্ত, কিন্তু গোয়েন্দা গল্পে একটা মারাকাটারি রোমহর্ষক প্লটের শেষে সাফল্য হচ্ছে অপরাধীকে শনাক্ত করা। এখানেই গোয়েন্দার বীরত্ব। গল্পে কখনও দেখায়না সেই অপরাধীর কি শাস্তি হলো, কারন শাস্তি দেবার বিধান গোয়েন্দাদের হাতে থাকেনা, সেটা আদালতের কাজ। বাস্তবের গোয়েন্দারাও কিন্তু অপরাধী সনাক্তকরনের কাজটুকুই করে, এবং শাস্তির জন্য আদালতে তুলে দেয়। আর আমাদের গণতন্ত্রের বড় প্রহসনই হল বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসুত্রীতা, এরই ফাঁক গলে বেরিয়ে আসে মানিক-কেষ্টা-কুণাল ঘোষেরা।
আরো দ্বিচারিতা আছে, যে অপরাধে উমর খালিদ বিনা বিচারে জেলে, সেই মামলাতেই কানাইহা কুমার বেলে। যে সুপ্রিম কোর্ট অর্ণব গোস্বামীর মামলাতে রায় দেয় – বিনা বিচারে ১ দিন কাউকে জেলে রাখা গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর অপমান, সেই সুপ্রিম কোর্টই শার্জিল ইমামকে কারাগারে রেখে দেয় বছরের পর বছর- বিনা বিচারে। দ্রুত বিচার করো, নির্দোষ হলে মুক্ত করো, দোষী প্রমান হলে যাবজ্জীবন বা ফাঁসি যেটা উত্তম সেটা করো। কিন্তু তা করলে তো রাজনীতি হবেনা।
আজ অবধি যে যে তৃনমূল নেতারা জেলে গিয়েছিল, কুণাল ঘোষ বাদে কেউ কী আর স্বমুর্তিতে ফিরতে পেরেছে? সুদীপ ব্যানার্জী ঢোঁড়া সাপ, মদন মিত্র জোকার। এরা নিজেরাও জানে তারা কী অপরাধ করেছে, পরিবারের সদস্য তাই কখনও দিদি তো কখনও দাদা- আপাতভাবে এদের মুক্তি দিয়েছে। কিন্তু যেদিনিই আবার পালাবদল হোক, বেঁচে বর্তে থাকলে পুনরায় জেলযাত্রা অবধারিত। লালুপ্রসাদ সবচেয়ে বড় উদাহরণ, দেরি হয়েছিল, কিন্তু জেলের ঘানি আজও টানছে এই সিবিআই এর তদন্তেই। এভাবেই একদিন তৃনমূল দলটা বিলুপ্ত হবে নিজের দূর্নীতির ভার বইতে না পেরে। অগত্যা এটাই আশার আলো, নতুবা ফেসবুকের meme পার্টির মত সফট টার্গেট এলিট দের দিয়ে আর কিছু হবেনা, গূঢ় সেটিং তত্ত্বের ‘কালচার’ ছাড়া।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবাজ বিজেপি আসলে সম্পর্কে তৃণমূলের ভাসুর। মমতা খানিকটা রাখাঢাকা দিয়ে সম্পর্কটাকে মেন্টেন করে। কিন্তু উভয় ঘরের ছেলেপুলেরা মাঝেমধ্যেই নিজেদের মাঝে ঘর অদলবদল এর খেলা খেলে স্বাদ পরিবর্তন করে। আন্দোলন বা বিপ্লবের সংজ্ঞা হচ্ছে- সাভারকরের আদর্শে ‘মুচলেকা’ ক্ষমা ভিক্ষা করা, এ কে ফজলুল হকের মন্ত্রী সভার শ্যামাপোকার ধান্ধাবাজি কিম্বা গডসের মত আগ্নেয়াস্ত্রের প্রয়োগ। কোনোটাই সভ্যভব্য নয়, বরং কাপুরুষতা, স্বার্থপরতা এবং ইতরতার সঠিক মিশ্রনে মানব সদৃশ মানবেতর যে সকল প্রাণী গুলো জন্ম নেয়- তারাই আসলে বিজেপি। আপনি বলুন বিজেপি- RSS এর কোনো বিপ্লবের ইতিহাস আছে, গাদ্দারের মত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ব্রিটিশ প্রভুদের কাছে ধরিয়ে দেওয়া ছাড়া?
সুতরাং বিজেপি পিছন থেকে ছুড়ি মারতে পারে, কিন্তু সম্মুখ সমরের অউকাত এদের নেই।
কংগ্রেস তার দত্তক পুত্রের অবৈধ উপপত্নীর সৎ ছেলের মাঝে বংশধর রক্ষার ব্রতে মগ্ন হয়ে রয়েছে। গ্যালন গ্যালন জাপানী তেলেরও ক্ষমতা নেই কংগ্রেসকে দাঁড় করায়, বিপ্লব বা আন্দোলন তো অন্য গ্যালাক্সির বিষয়াদি। নাগপুরি শাসন যন্ত্রের কলে পরে কেন্দ্রে মোটা ভাই আর রাজ্যে চটি পিসি - এই ঘানিতেই পিসে তেল বের করে দিচ্ছে রাজ্যের জনগণের।
ব্যার্থ হলেও প্রতিবাদটা জরুরী, বিরোধী পরিসরে শত দল বা উপদল থাকুক, নানা মত থাকবেই তাদের সমন্বয়টা জরুরী। ঠিক বা ভুলের উর্ধ্বে গিয়ে প্রতিবাদ আন্দোলনের নিরবিচ্ছিন্ন ধারাটা বহমান রাখাটাই একমাত্র কাজ। আন্দোলনেরও একটা রুচি থাকতে ও রাখতে হবে, অরুচিকর অস্বাস্থ্যকর তৃণমূল অপসংস্কৃতি তাড়াতেই তো আন্দোলন বা বিপ্লব। সুতরাং আন্দোলনকারীদের ভাষা যদি তৃণমূলের মুখপত্রের সাথে একই ধারায় হয়- তাহলেই এই আন্দোলন তার কৌলিন্য হারাবে।
যারা ভাবছেন, কী দরকার বাবা ঝামেলাতে যাবার, বেশ তো গা বাঁচিয়ে রয়েছি। ভুলে যাবেননা, আপনাদের প্রতিটি বিষয়ের সিদ্ধান্ত কিন্তু এই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতা নেত্রীরাই নিয়ে থাকেন। তাছাড়া, যে সমাজ বারোয়ারি ভাবে বিনষ্ট হয়ে যায়, তাদের সাজা ভোগের বিষয়টাও বারোয়ারী ভাবেই হয়। এখানে কে শিক্ষিত আর কে ভক্ত, কে পক্ষে, কে বিপক্ষে, কে বিপ্লবী আর কে তোলামূল- তার বিচার হয়না
রাস্তায় মানুষ আছে, রাস্তায় সিপিএম ই আছে। ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে সিপিএম মানে অস্পৃশ্য, তেমনি তৃনমূল মানেই জনগণের গণশত্রু। সুতরাং, আন্দোলন তুতো সম্পর্কের জালে জনগণ এবং সিপিএম আত্মীয়তায় জড়িয়েছে। এখন পারস্পারিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে একে অন্যের হাত শক্ত করে না ধরলে কারোরই পরিত্রাণ নেই।