তৃতীয় পর্ব- রাহুর গ্রাস
এই রাজ্যেও অসহায় কংগ্রেস ক্রমে ক্রমে মমতার কাছে আত্মসমর্পন করে বসে, সাথে নিয়ে যায় ৩৫% কংগ্রেসী পারিবারিক ভোটার, যারা স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে বংশানুক্রমে কংগ্রেসের সাথে ছিল। তৃনমূলের জন্মলগ্নে অজিত পাঁজা, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, পঙ্কজ ব্যানার্জী আর শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় ছাড়া আর বড় কোনো নেতা মমতার সাথে আসেনি। এবং জন্মের কয়েকমাসের মধ্যেই দ্বাদশ লোকসভাতে ২৮টা আসনে প্রার্থী দিয়ে ৭টিতে জয়লাভও করেছিল তৃনমূল। এবং যেখানে বিজেপির প্রার্থী ছিল, সেখানে তৃণমূল প্রার্থী দেয়নি। সিরিয়াসলি RSS এর সাথে প্রকাশ্য আঁতাত।
রাতারাতি এই সাফল্য এবং কেন্দ্রীয় কংগ্রেসের আভ্যন্তরীন কোন্দল ও নেতৃত্বের দৈন্যতার সুযোগে মমতাও একে একে বড় বড় নেতাদের খেতে শুরু করেছিল। ২০০৪ লোকসভাতে মমতা মাত্র ১টি আসন পায়, আর এই সময়েই মমতা সম্পূর্ণভাবে RSS এর বৃত্তের মধ্যে পরে যায় ও নিজেকে সঙ্ঘ পরিবারের মধ্যে দ্রবীভূত করে তোলে। এর পর কংগ্রেস মমতাকে বিজেপির থেকে ছিনিয়ে নেবার প্রচেষ্টাতে সম্পূর্ণভাবে মমতার পায়ে সমর্পিত হয়ে যায় ও বঙ্গীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসের সাইনবোর্ড হয়ে যাওয়ার ঢাকে কাঠি দিয়ে দেয়।
শুরুটা করেছিল কোলকাতা ভিত্তিক ওয়ার্ডের নেতাদের গ্রাস করে, যাদেরকে পরবর্তীতে রাজ্যের নেতা বানিয়েছে। অতীন ঘোষ, ববি হাকিম, জল শোভন, অরুপ বিশ্বাস, ইকবাল আহমেদ, পরেশ পাল, প্রদীপ ঘোষ, দেবাশীষ কুমার, মালা রায়, বৈশ্বান্বর চ্যাটার্জী, রঞ্জিত শীল প্রমুখ কংগ্রেসী কাউন্সিলারদের একে একে দলে টেনে নিতে সক্ষম হয়। এর পর রাজ্য জুড়ে কংগ্রেসী রাঘবোয়ালদের ধরে নিজের দলে ঢোকাতে সক্ষম হয় ‘সাম, দম, দণ্ড, ভেদ’ যার উপরে যে মন্ত্র প্রযোজ্য হয়েছিল।
একে একে সুব্রত মুখার্জী, সোমেন মিত্র, মানস ভূঁইয়া, অশোক দেব, মিহির গোস্বামী, সৌগত রায়, সুলতান আহমেদ, তাপস রায়, সাধন পান্ডে, সঞ্জয় বক্সী, পরেশ পাল, জটু লাহিড়ী, শীতল সর্দার, গোবিন্দ নস্কর, সাবিত্রী মিত্র, মৈনুল হক, শিশির অধিকারী, কাশীনাথ মিশ্র, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী, মানিক উপাধ্যায়, উজ্জ্বল চ্যাটার্জী, সবুজ দত্ত, অসিত মিত্র, শান্তিরাম মাহাতো, ভুপেন্দ্রনাথ শেঠ, তারক ব্যানার্জী, রবীন্দ্রনাথ চ্যাটার্জী, অসিত মাল, সুদীপ্ত রায়, মোহিত সেনগুপ্ত, শঙ্কর সিং, আনন্দমোহন বিশ্বাস, সত্যরঞ্জন বাপুলি, নির্মল ঘোষ, খালেক মোল্লা অজস্র নামের মাঝে কিছু জনের উল্লেখ করলাম।
মমতা কখনই হামবড়া বাম এলিটদের মত আমিই সর্বজ্ঞ ও বাকি তোমরা সকলে অশিক্ষিত নিরেট- এমনটা করেনি। সে জানে আমার দলে সকলেই চোর চামার নিরেট ইয়েসম্যান। কিন্তু বিপক্ষ দলের কূটনীতি ও রাজনীতির সাথে লড়তে গেলে মেধা চাই, যার জন্য সে পিকে-কে নিয়োগ দিয়ে রেখেছে। ২০১১ পূর্ববর্তী এই মেধাভিত্তিক কাজগুলোই করে দিত দীপক ঘোষ, দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বা উপেন বিশ্বাসের মত আমলারা। বরং বিজেপি সরকারে রেলমন্ত্রী থাকাকালীন, নানা ধরণের এঁঠো কাঁটা কমিটির মাধ্যমে বামমনষ্ক বুদ্ধিজীবী প্রজাতির বড় অংশকে দখল করে নিয়ে সক্ষম হয়েছিল। রিজওয়ানুর কান্ডের পর অবাঙালী মুসলমান ভোটব্যাঙ্কে মমতা ঢুকে যায়, এরপর ফুরফুরার পীরের ছানা গুলো আর ‘জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ’ নামের শতাব্দীপ্রাচীন সংগঠনের ধান্দাবাজ নেতা সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীকে কিনে নিতেই বঙ্গীয় দুধেলগাইদের হেঁশেলে ঢুকে পরে।
শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠিত দুধেলগাই রাজনৈতিক নেতাগুলোকে মমতা খেতে পারেনি। রাজ্যে রাজনৈতিক পালা পরিবর্তনের পর, প্রশাসন যন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে, কাউকে লোভ দেখিয়ে হোক বা ভয় দেখিয়ে, একে একে করিম চৌধুরী, হামিদুর রহমান, মহঃ সোহরাব, মোজাম্মেল হক, মান্নান হোসেনের মত জেলার নেতাদের হাতে তৃণমূলের ঝান্ডা ধরিয়ে দিয়ে সক্ষম হয় মমতা ব্যানার্জী। এরপর শুরু হয় দল ভাঙানোর নোংরা অসভ্য খেলা, যার শুরুটা হয়েছিল ধুলিয়ান পুরসভা দখলের মাধ্যমে।
২০১৪ সালের পঞ্চায়েৎ নির্বাচনে জলপাইগুড়ি জেলা পরিষদ বামেদের দখলে গিয়েছিল, কিন্তু রাজ্য সরকার ততক্ষণ অবধি জেলা পরিসদের বোর্ড গঠন করেনি- যতক্ষন অবধি বিজয়ী বাম সদস্যেরা দল পালটে তৃণমূলে যেতে বাধ্য হয়েছিল। আজকে যারা আলিমুদ্দিনের চেয়ারে, সেদিনও দলের ক্ষমতাতে এনারাই ছিলেন অধিকাংশ। বামেদের এই স্থবির নেতৃত্ব কী সেই দল বদলুদের বাড়ি বা রাস্তা ঘেরাও করতে পেরেছিল? কোন সেটিং এর জন্য এনারা সেদিন একপ্রকার বসেছিল। আজকের সেটিং তাত্ত্বের ফেরিওয়ালারা তখন বুনিয়াদি বিদ্যালয়ে বর্ণ পরিচয় পড়ত, তাই সেটিং এর ইতিহাস জানেনা।
মজার বিষয় হলো, বিশ্বজুড়ে তাবড় মিডিয়াকুল সবসময় শাসকের বিপক্ষে থাকে। এমনকি গোদী মিডিয়ার কালেও রবীশ কুমার ও এনাদের মত অনেকেই বিধোধী আওয়াজকে প্রধান্য দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের বামেরা হল সেই বিরল প্রজাতি, ১৩ বছরের বিরোধী ভূমিকা ১টি মিডিয়াকে নিজেদের ফেভারে করতে পারেনি, না নিজেরা কোনো বিকল্প মিডিয়া করতে পেরেছে কেরল বা ত্রিপুরার মত। এমনই অপদার্থ তারা।
কংগ্রেসে সফলতা পেয়ে বাম শরিক দলগুলোকে টার্গেট করে মমতা। একমাত্র সিপিএমকে মূল বিরোধী ও গণশত্রুর পর্যায়ে নিয়ে যায় প্রচার কৌশলে। ক্রমে, RSP আর ফরোয়ার্ড ব্লককে খেতে শুরু করে। পরেশ অধিকারী, চাঁদ মহম্মদ, পীযুশ তিরকে, দশরথ তিরকে, জোয়াকিম বাক্সলা, উদয়ন গুহ, হাফিজ আলম সৈরানী, মোর্তাজা হোসেনের মত নেতাদের দলে ভিড়িয়ে নেয়। কোনো ক্ষেত্রে নেতা সরাসরি না গেলেও বউ, ছেলে বা মেয়েকে পাঠিয়ে দেয় তৃণমুলের টিকিটে লড়তে। মুর্শিদাবাদের আগে অবধি সিপিএম দল সেভাবে ছিলনা উত্তরবঙ্গে, যতটা ছিল দক্ষিণবঙ্গে। সেখানে মূলত দাপট ছিল শরিক বাম দলগুলোর। শিলিগুড়ি শহর কেন্দ্রিক সিপিএমের ভালো দাপট ছিল, তার বাইরে শুধু জলপাইগুড়িতে ছাড়া। শরিক বামেদের প্রায় গোটাটাই বিজেপিতে রুপান্তরিত হয়েছে ভায়া তৃনমূল। ফলত আজও যে উত্তরবঙ্গে বামেরা দুর্বল, তার কারন সিপিএম এর দুর্বল সংগঠন।
২০১১ এর আগে যারা মমতার সাথে গিয়েছিল, তারা অবশ্যই বামশাসনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। ২০১১ থেকে ২০১৬ এর মধ্যে যারা তৃণমূলের ঝান্ডা ধরেছিল, তাদের সিংহভাগই ভয়ের তাড়নাতে গিয়েছিল অস্ত্র মামলা, গাঁজা কেস বা নানা ধরণের মিথ্যা মামলাতে ফেঁসে যাওয়ার চেয়ে তৃনমূল করা ভালো, কারন ততদিনে গুন্ডা কন্ট্রোল শুরু করে দিয়েছে তিনি। ২০১৬ এর পরে যারা দলবদল করে তৃনমূল হয়েছে, তারা শুধুমাত্র চুরি করবো বলেই গিয়েছে। কারন ধীরে ধীরে মমতার বহু কাছের লোক লাথি খেয়েছে, কেউ মরে বেঁচে গিয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন