দ্বিতীয় পর্ব- বাংলাতে RSS এর সফলতা
মানুষ তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরেই নিজেকে বিজয়ী বলে ঘোষণা করে দেয়, যতক্ষণনা উপলব্ধি করে ঠকে গেছে। এবং বুদ্ধিমান সেজে থাকার দায়ে, ঠকে যাওয়াটা লুকাতে আরো বেশি বেশি তার সেই ভুল ‘সিদ্ধান্তকে’ সঠিক প্রমানের জন্য শক্তিক্ষয় করে। এর পর অবসন্ন হয়ে গেলে, সেই ‘সিদ্ধান্ত পরবর্তী ফলাফল’ তাকে চেপে ধরে- বুকের উপরে বসে। নাভিশ্বাস উঠে গেলে যখন চেঁচাতে যায়, দেখে- যার পক্ষে সেই ‘সিদ্ধান্ত’ গিয়েছিল, সে মুখ বন্ধ করে দিয়েছে আতঙ্কের ন্যাকরা গুঁজে। অতিচালাকের দল মজন্তালি সরকারের মত ডুবে গিয়েও হাত তুলে বলে জল মাপছি। বস্তুত, মজন্তালির পরিনতি আমরা জানি।
একদিকে ৩৪ বছরের Anti-incumbency, অন্য দিকে ১০ বছরের। ২০১১ সালে আমাদের রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর, সেই মধুচন্দ্রিমা শেষ হওয়ার আগেই কেন্দ্রেও নতুন সরকার চলে আসে। তৃণমূলের সাথে “পরিবর্তন চাওয়া” বঙ্গবাসী আসলে- পাতি ঠকে যায়। এতে কেউ ভয়ে মুখে কুলুপ আঁটলো, কারো মুখে ন্যাকরা গুঁজে দেওয়া হলো, তো কেউ মজন্তালি সরকারে বদলে গেলো। যে লোকটা ঠকেনি বলে দাবী করছে, তাকে নেহাত দলটা করে পেট চালাতে হয় বলে স্বীকার করছেনা, নতুবা সত্যটা সে নিজেও সম্যকভাবে জানে। সুস্থ সমাজব্যবস্থাকে Tekken for granted নেওয়া বঙ্গবাসী যতক্ষণে বুঝতে পেরেছিল ঠকে গেছি, ততক্ষণে সারদা-নারদার মেগা পর্ব পার করে আচ্ছেদিনের চক্রব্যূহে ঢুকে পরেছে, দোনো হাত মে লাড্ডু।
৩৪ বছরের বাম সরকার ১০০% নিখুঁত ছিল তা অতিবড় বাম সমর্থকও দাবী করেনা, কিন্তু দুর্নীতিতে আকন্ঠ নিমজ্জিত এই তৃণমূল রাজত্বের চেয়ে যে উন্নত ছিল, তা মমতা ব্যানার্জীও হয়ত আয়নার সামনে স্বীকার করে। বাম আমলে সমাজে ধর্ষক ছিল, চোর ছিল, পকেটমার ছিল, গুণ্ডা ছিল, দুষ্কৃতী ছিল, পাচারকারী ছিল, তোলাবাজ ছিল, টালিগঞ্জ ফিল্ম ইন্ড্রাষ্ট্রি ছিল, বিচ্ছিন্নতাকামী ছিল, দুর্নীতিবাজ পুলিশ, আমলা ইত্যাদি ছিল- মানে একটা সমাজে যা যা ধরণের অপকর্ম থাকে সবই ছিল। পরিবর্তনের বাংলাতে মমতা ব্যানার্জী এইসবগুলোকে একছাতার তলায় আনার অসাধ্যসাধন করতে পেরেছে। আগে দুষ্কৃতী সমাজবিরোধীরা রাজনৈতিক দলের আশ্রয় খুঁজতো, এখন সেই তারা গোটা একটা রাজনৈতিক দল খুলে ফেলেছে।
কালীঘাট ও নাগপুরী এই দ্বৈত শাসনব্যবস্থার চক্করে মানুষ, চোর-চামার গুলোকে, তাদের সীমাহীন চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, লাম্পট্য, গুম, হত্যা, আইনের শাসনকে ধর্ষণ, সংবাদমাদধ্যম ও বিচারব্যবস্থাকে অসাধু উপায়ে নিয়ন্ত্রণ, নিজেদের স্বার্থের জন্য সাম্প্রদায়িক বিভাজন, এবং পাড়ায় পাড়ায় থ্রেট কালচারের মাধ্যমে গড়ে উঠা তোলাবাজি শিল্পের সাথে আপোষ করতে শুরু করল ও একসময় অভ্যস্ত হয়ে পরলো। সুশীল সেজে ভদ্রসমাজ রাজনীতিকে অচ্ছুৎ মনে করে অরাজনৈতিকতার ঘোমটা পরতেই, দুষ্কৃতীরা রাজনীতির রাশ নিয়ে নিলো, যোগ্যতমের উদবর্তন ঘটল চোরেদের সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের রাজ্যের শিক্ষা, খাদ্য, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রশাসন, সীমান্ত চোরাচালান সহ, যেকোনো দুষ্কর্ম ঘটুক, সেখানে রাজ্যের শাসক দলের কারো না কারো মুখের ছবিতে উজ্জ্বল। এরাই দলের কোনো না কোনো পদে রয়েছে বা ছিল। এর বিরুদ্ধে আইন-প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিতে গেলেই সর্বোচ্চ নেত্রী নিজে রাস্তায় ঝাপিয়ে পরেন তার সমস্ত মেসিনারি নিয়ে। এটাই দল তৃণমূল ও মমতা ব্যানার্জীর সাফল্য, যার বড় অংশীদার পরিবর্তনকামী জনগণ ও ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীর দল।
আজকে পশ্চিমবাংলার মানুষের জন্য আহাজারি করার কেউ নেই। আইনসভায় সংখ্যার নিরিকে যারা নাকি বিরোধী, তারা সিংহভাগই প্রাক্তন তৃণমূলী অথবা দীলিপ ঘোষের মত সার্কাসের বৃদ্ধ জোকার। টিভির পর্দার বাইরে যাদের না আছে সংগঠন, না জারিজুরি। তাহলে ভোট পায় কীভাবে? ছাপ্পা-রিগিং এর কবলে না পরলে, বোবা, কালা, মুখে সেলটেপ সকলেই ভোট দেয় এই বাংলায়, এমনকি মজন্তালী সরকারও ভোট দেয়- ঠকে যাওয় পাবলিক তৃণমূলের বিপক্ষে ভোটটা দেবে কাকে?
বিজেপিকে দেবে বা দেয়। কারন পেইড মিডিয়া ন্যারেটিভের দৌলতে, প্রতিটা ভোটের আগেই বিজেপি প্রবলভাবে ভোটের রাজনীতিতে বিরোধী পরিসরে মূলত সে একাই বিরাজ করে, বিগত ১২ বছরের হিসাবে। আসলে এ রাজ্যে বিরোধী নামের যে শরীরটা রয়েছে, তাতে একটা পোশাকি মাথা ঠিকিই আছে। বাইরে থেকে দেখতে সেটা মাথার মতই, কিন্তু ভেতরটা গড়ের মাঠ, ধু ধু ফাঁকা। ফাঁকা মাঠ তৃণচাষের জন্য আদর্শ, আর লকলকে কচি ঘাস খেতে বলদের দল যে ঘাঁটি গাড়বে, সেটা বলাই বাহুল্য।
কেন্দ্রে RSS এর যে সরকারটা চলছে মোদী-শাহ নেতৃত্বাধীন, এর কৃতিত্ব যত না সঙ্ঘ পরিবার ও তাদের রাজনৈতিক শাখা গুলোর, তার চেয়েও বেশী খোদ কংগ্রেসের। RSS ও বিভিন্ন দেশীবিদেশী কায়েমী গোষ্ঠী গুলোর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসাবে কংগ্রেসকে ভিতর থেকে সমূলে নির্বংশ করার কাজটা শুরু হয়েছিল ১৯৬৫ সালের ফেব্রুয়ারির কোন এক সন্ধ্যায়, কেমব্রিজের এক রেস্তোরাঁতে। তারই ধারাবাহিকতায় ইন্দিরা ও রাজীব গান্ধী প্রকাশ্য খুন হয়। সঞ্জয় গান্ধীও একই পথের যাত্রী। ইন্দিরা-রাজীব জামানার যে সকল প্রতিশ্রুত নেতারা ছিলেন, এক প্রণব মুখার্জী ছাড়া প্রায় সকলেই দুর্ঘটনার কবলে অপমৃত্যুর শিকার হয়েছে।
মাধব রাও সিন্ধিয়া, রাজেশ পাইলট, বিয়ন্ত সিং, ওয়াই এস আর রেড্ডী প্রমান ভুড়ি ভুড়ি। প্রিয়রঞ্জনের মত কেউ কেউ চির কোমাতে চলে গিয়েছিল। মোদ্দা কথা গোটা দলটা প্রতিবন্ধী হয়ে গেল ধীরে ধীরে, ধারে ভারে মগজে। ওদিকে বিজেপিতেও যে এমন ঘটনা ঘটেনি তা নয়, প্রমোদ মহাজন বা গোপিনাথ মুন্ডের কুৎসিত প্রকাশ্য মার্ডারের কোনো তদন্ত হয়েছে আজ অবধি? গত মাসে আগষ্টে, কাশ্মীরে কংগ্রেসের এক নির্বাচনী সভায়, যেখানে মল্লিকার্জুন খাড়গে থেকে রাহুল গান্ধী উভয়েই উপস্থিত ছিলেন, সেখান থেকে ফেরার পথে রাজ্য নেতৃত্ব শাদী লাল পণ্ডিত বেঘোরে মারা গেলেন গাড়ি এক্সিডেন্টে। সবটাই কাকতালীয়? আসলে আমরা সেটাই দেখি, যা আমাদেরকে দেখানো হয়।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন