বুধবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৪

চতুর্থ পর্ব- সেটিং তত্ত্ব ও অরাজনৈতিক




চতুর্থ পর্ব- সেটিং তত্ত্ব ও অরাজনৈতিক


সিপিএমের সদ্য গোফ গজানো, হোয়াইট কলার সোস্যালমিডিয়া বিপ্লবীরা ভীষণ ভাবে আদর্শের গল্প শোনায়। বর্তমান অযোগ্য নেতৃত্বের অধীনেই তো অবক্ষয়ের শুরু। রাজক্ষমতা চলে যেতেই ক্ষমতালোভী নেতৃত্ব একে একে তৃণমূলে ভিড়তে শুরু করে। দলে থাকাকালীন এদের অবক্ষয় ধরার মত দৃষ্টি ছিলোনা নাকি সাহস ছিলোনা? রাধিকা রঞ্জন প্রামানিক, আবু আয়েস মন্ডল, লগন দেও, আব্দুল রাজ্জাক, শওকত মোল্লা, তাপস চ্যাটার্জী- এই তালিকা লিখতে বসলে শেষ হবেনা। মোদ্দা কথা, ৩৪ বছরে একটা পোক্ত ভিত রাতারাতি ধসে যায়নি, একটু একটু করে আদর্শচ্যুতি, অন্তর্কলহ, অন্তর্ঘাত আর পাল্লা দিয়ে ‘সেটিং’ করে নিষ্কর্মা লোকগুলোর শীর্ষপদে আহরণ দলটাকে শুণ্যতে নামিয়ে এনেছে।
গান্ধীজীর তিন বাঁদরের একজনের মুখে হাত, একজনের কানে হাত, শেষের জন্যের চোখে হাত ছিল। কিছু ৩টি বাদঁরের ২ জন চোখে দেখত, ২ জন কানে শুনতো, আর ২ জন মুখে বলতেো পারত। মমতার গান্ধীবাদি আদর্শ এখন এই ফর্মুলাতে কাজ করছে। যে কু দেখছেনা, সে কু শুনছে ও কু বলছে। যে কু বলছেনা সে কু শুনছে ও দেখছে। এভাবেই গোটা সিস্টেমটা চলছে, এক চমৎকার মিথোজীবীয়তা চোর আর প্রশাসনে। এরই ধারাবাহিকতায়, ২০১৪ সালে প্রথম ভাইপোকে ইন্ট্রিডিউস করা হয়। ভাইপোর উত্থান আসলে মমতা কালেকশন এজেন্ট হিসেবে, প্রথমে অর্থনৈতিকভাবে, তারপর দলের মধ্যে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা করেছে আর আজকের দিনে প্রশাসনের উপরে বসিয়ে দিয়েছে। এই হচ্ছে ২ লাইনে ভাইপোগাথা।
আমার এক বন্ধু দাবী করেছিল, বামেরা নাকি সফট টার্গেট। ভেবে দেখলাম ঠিকিই, সফট টার্গেটই বটে। তবে সেটা শিকারীদের নয়, অবোধ বালকদের মনোরঞ্জনের পাত্র হিসাবে এরা সত্যিই সফট টার্গেট। আজ অবধি কোনো প্রখ্যাত শিকারীকে বলতে শুনেছেন- কেন্নো শিকারে যাচ্ছে, অথবা বিশ্ববিখ্যাত মুরগি শিকারীর নাম জিম করবেট? কিম্বা চালকুমড়ো কাটার মধ্যে বীরত্ব আছে? বামেরা ভাবে আন্দোলনের রাস্তা তাদের হিসাব মত চলবে, অন্য কেউ যে কোনো যুক্তি বা বুদ্ধি ধরে এটা বাম শিবির মানতেই চাইনা অন্তর থেকে। নতুবা ডাক্তার কিঞ্জলের নামে এরা কখনও খাপ বসাতে পারে?
একজন কোথায় লিখলে, বাকিরা কোরাসে সুর লাগায়। এদের নিজেদের দমে মুরোদ নেই একটা টানা আন্দোলন করার, হয় সংগঠন নেই, কিম্বা পুলিশ উদোম ক্যালাবে সেই ভয়ে যায়না, বাকিটা নিচুতলায় তৃনমূল চোরগুলোর সাথে সেটিং করে শীতঘুমে। দেড়খানা সাহসী তরুনী মুখ ছাড়া গোটা বাম শরীর পক্ষঘাতগ্রস্থ। এই হচ্ছে এ বাংলার বামধারার বিনোদান্দোলন।
বিনোদনের নানা ধারা রয়েছে, এ বাংলাতে সিনেমা সিরিয়ালের পাতি অভিনেতাটিকেও তৃণমূল দলে ভিড়িয়েছে- ফলত চলচিত্র শিল্পে মন্দা। মানুষ বিকল্প বিনোদন খুঁজে নিয়েছে, চোরের ভূমিকাতে রোজ তৃণমূলের কোনো না কোনো নেতা ধরা খাচ্ছে, পরিচালকের ভূমিকাতে বিভিন্ন বিকৃত সংবাদমাধ্যম, যারা মূলত ন্যারেটিভ রচনা করে দেয়। বিবেকের ভূমিকাতে খ্যামটা নেচে সোস্যালমিডিয়ার বাম্বাচ্চারা দায়িত্ব নিয়ে বিনোদনের ঘাটতি পুষিয়ে দিচ্ছে। নিত্যদিনের চরম খোরাক, কোনোদিন টানটান উত্তেজনা, তো কখনও গতানুগতিক মেলোড্রামা। বিজেপির সার্কাস, বামেদের বিবেক সাজা ও তৃণমূলের চুরি- সব মিলিয়ে রোজজীবনে ব্লকবাস্টার লাইভ এন্টারটেইনমেন্ট এর যোগানে ঘাটতি নেই।
এর মাঝে কি প্রতিবাদ, অবরোধ হয়না! হয় বৈকি, কিন্তু অধিকাংশই দানা বাঁধেনা, যেটা বাঁধে সেটাও পিটিয়ে তুলে দেয় পুলিশ। প্রতিবাদ করা একটা রোজকার অভ্যাস। জিমে অনুশীলন করার মতো ব্যাপার। একদিন ঢিলে দেওয়া মানেই আপোষের চর্বি জমতে দেওয়া। তখন অন্যায়ের সঙ্গে সন্ধি সহাবস্থান করে চলা অনিবার্য হয়ে পরে। আমি আমার প্রায় প্রতিটা লেখাতেই বলি, বিজেপি আর তৃনমূল আলাদা নয়, একই পরিবারের- সঙ্ঘ পরিবার। সিঙ্গুর নন্দীগ্রামে যে আন্দোলন সংগঠিত করেছিল মমতা ব্যানার্জী, তাতে RSS এর তরফে পূর্ণ সহযোগিতা ছিল, সর্বভারতীয় স্তরে প্রচারের ব্যবস্থাটা এরাই করেছিল।
বিজেপির তরফে সিঙ্গুর কান্ডে এক্সপ্রেসওয়ে ধর্ণামঞ্চে রাজনাথ সিং এর উপস্থিতি বিজেপির অবস্থানও পরিষ্কার করে দেয়। একই কোম্পানির দুটো ব্রান্ড, পশ্চিমবাংলার মুসলমান ভোট ফ্যাক্টর বলে, এখানে তৃণমুল নামের ‘হালাল’ সংস্করণ দল বানিয়ে রেখেছে উভয় দলের মালিক সঙ্ঘ পরিবার। সুতরাং এদের মাঝে যেকোনো বিবাদ বা আন্দোলন, সবটাই লোকদেখানো। মালিকের নির্দেশে অধিকাংশটাই গটাপ-ম্যাচ, বাকিটা পারিবারিক অন্তর্কলহ। সুতরাং, “খেলা হবে” এর চেয়ে আদর্শ রাজনৈতিক স্লোগান কী আর কিছু হতে পারত?
বিজ্ঞান টেনেছিলাম, ল্যামার্কের সেই সুত্রানুযায়ী- প্রতিটি জীব তার জীবনকালে অর্জিত করা সকল বৈশিষ্ট্য পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত করে। বর্তমানে এই ২০২৪ সালে এসে প্রতিটি নেতৃস্থানীয় বামেরা, কবে কোন বিপ্লবটা করেছে, যার সুবৈশিষ্ট এই যুব প্রজন্মে আসবে? যে বামেরা লড়াই এর ময়দান থেকে উঠে এসেছিলেন তারা গত হয়েছেন। বরং, বর্তমানের ষাঠোর্ধরা তাদের যুবা বয়সে ক্ষমতাসীন পার্টিকে পেয়েছিল, আন্ত-পার্টি সংগ্রামের নামে সেটিং করে দলীয় পদ পেয়েছিল, কেউ শাঁসালো সরকারী চেয়ার। এনাদের নেতৃত্বে থাকা যুব নেতৃত্ব কীভাবে সেটিং তত্ত্বের বাইরে অন্য কিছু শিখতে পারে? বরং শিখলে তা বিজ্ঞান ও প্রকৃতির নিয়মবিরুদ্ধ হতো।
ল্যামার্কই বলেছেন - ক্রমাগত কোন অঙ্গ অব্যবহারের দরুন নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়ে অবশেষে বিলুপ্ত হয়ে যায়। আত্মবিশ্বাস, সাহস, ও সংগঠন- রাজনীতির এই তিন অঙ্গের ক্রম অব্যবহারের দরুন ক্রমশ নিষ্ক্রিয় হতে হতে বিলুপ্তের পর্যায়ে চলে গেছে বামেদের। কংগ্রেসের সাথে জোট এতে আইনত সিলমোহর দিয়েছে। নতুবা এনাদের উদভ্রান্ত সোস্যালমিডিয়া সেনাদের পোষ্ট করতে হয়- “আমরাও কিন্তু রাস্তায় আছি তিলোত্তমা কান্ডে, এটা ভুলোনা”। কিম্বা ঘাটালের বন্যায় ত্রাণ শিক্ষক সংগঠনের ত্রাণ বিলির ছবিতে লিখতে হয়- এগুলো রেখে দিও যত্ন করে, কে কখন চেয়ে বসে। আসলে অভাবের সংসারে লজ্জা থাকতে নেই, এদের অবস্থাও তাই। অসহায়তা, অসুস্থতা আর গরীবির বিজ্ঞাপন দেখিয়ে রাজনৈতিক ভিক্ষাবৃত্তি করে মানুষের ভরষা আদায় করা যায়না। ভিক্ষুককে মানুষ আহা করে দুটো টাকা দেয় বড়জোর, আত্মীয় বানায়না।
বাজারে নতুন টার্ম এসেছে – অরাজনৈতিক আন্দোলন। পোল্ট্রি মুরগির চাষ যারা করেন, তারা জানেন এ ফসল ৪০ দিনের, এর পরেই এর মেয়াদ শেষ। ৪০ দিনের বেশী যদি মুর্গি রয়ে যায়- তার খোরাক যোগাতে গিয়ে চাষীকে দেউলিয়া হতে হবে। এই অরাজনৈতিক আন্দোলনও আসলে পোল্ট্রি মুগরি চাষের মতই, বিশ্বজুড়ে এর নমুনা দেখুন, কমবেশী ৪০ দিনের মধ্যেই এই আন্দোলনের আয়ু ফুরিয়ে গেছে। আর যেটা টিকে গেছে সেটা মালিককে, মানে সরকার বা কতৃপক্ষকে উচ্ছেদ করেই ছেড়েছে। তিলোত্তমা কান্ডেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। জুনিয়র ডাক্তারেরা ‘তাদের’ দাবী আদায়ে আন্দোলন করছিল, রাস্তায় ছিল ও আছে। তাদের ৯০% দাবী আদায় এর প্রতিশ্রুতি পেয়েছিল, সেটা রীতিমত কালীঘাটের গলায় গামছা দিয়ে।
সেই দফায় সল্টলেকের রাস্তা থেকে তারা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে ফিরে যায় এবং যথারীতি মমতা ব্যানার্জী ও তার সরকার প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যার্থ হতে, ঠকে যাওয়া জুনিয়ার ডাক্তারেরা আবার অনশনে। এবারেও সেই কাঁঠালের আমসত্ত্ব- অরাজনৈতিক। মাঝে এমন হয়েছিল, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে- পরিবারের কর্তা মোহন ভাগবতের নির্দেশে বিজেপি তার সহোদরার সরকারের প্রতি আন্দোলন থেকে সরে যেতেই অরাজনৈতিক আন্দোলনের কঙ্কাল বেরিয়ে পরেছিল। আন্দোলনের নামে ‘নিখোঁজ’ এর পোষ্টার পরা শুরু হয়ে গিয়েছিল যত্রতত্র। অথচ, আন্দোলনকে টেনে নিয়ে যাওয়ার একমাত্র দায় ছিল ও আছে বামেদের, কারন তারা ছাড়া আর কেউ অন্তত এ রাজ্যে ‘বিরোধী’ দল বলে কেউ নেই, শূন্য হলেও। অহেতুক ফুটেজ ও সর্বত্র স্টেকের দাবী করতে গিয়ে তারাও কোনঠাসা, স্বতস্ফুর্ত জনগণের অংশগ্রহণের চাপে। অথচ কেউ প্রশ্ন করেনি নিজেদের SFI নেতৃত্বকে- কেন এতোদিন মেডিকেল কলেজগুলোতে ভোট হয়নি, এই নিয়ে কোথাও কোন আন্দোলনের উড়ো খবর কেউ দিতে পারবেনা। এটাই বাস্তবতা অধিকাংশ গিটারবাদক বাম যুব নেতৃত্বের।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...