নখগুলোর প্রান্ত ঘষে নিয়ে হালকা নেলপালিশ দিয়েই, বৌদিকে হাঁক।
- কিরে, চেল্লাছিস কেন!
- দাও না বৌদি, ভ্রুটা একটু সাইজ করে। এখন পার্লারে গেলে, বাবা, দাদা কেও পুজোর সময় পয়সা দেবেনা।
- তা, যাওয়াটা কোথায় হবে শুনি?
- প্লিজ বৌদি, একটু বোঝার
চেষ্টা করো, আর দাদা বা বাবা কে কিছু বোলোনা
লক্ষ্মীটি । আমার সোনা বৌদি...
- হয়েছে হয়েছে, তার তেল মারতে
হবেনা,
বোস শান্ত হয়ে।
মাধ্যমিক পরিক্ষার সময়েও এতো তারাতারি কোনোদিন স্নান করেনি সে। তার উপরে
আবার বেশ করে স্যাম্পু ডলে কন্ডিসনার লাগিয়েছে। ভিজে গায়ে আচ্ছা করে , প্রায় আধা বোতল রেভলনের ম্যাডলি র্যরদেভুর বোতল উড়িয়ে, হুটোপাটা করে একটু ফাউন্ডেসন দিয়ে ব্রনের ক্ষতে প্রলেপ
ঢেকে,
হালকা মেবিলাইন কম্প্যাক্ট বুলিয়ে, ঠোটের প্রতি নজর দিল। যেমন করেই হোক কাঁটায় কাঁটায়
এগারটায় গোলপার্ক CCD পৌছাতেই হবে।
লিপস্টিক লাগালে সুন্দর করেই লাগাতে হবে, তাই জাষ্ট লিপলাইনার আর একটু স্মুজলেস কাজলের আলতো টান, ব্যাস। মনে মনে ভাবল, যা রুপচর্চা হয়েছে এতেই অস্থির।
আনারকলি স্যুটটা গায়ে গলাতে গলাতেই, ঘরের প্রশস্ত আয়নাতে বার কয়েক নিজেই নিজেকে জড়িপ করে নিল। কোনমতে জুতোটা
পায়ে গলিয়েই, ব্যাগটা বগলদাবা করে দে ছুট। পিছন
থেকে বৌদি হেঁকেই চললেন...
- বলি যাচ্ছিসটা কোথায়! গরম ভাত নেমে গেছে, খেয়ে গেলেই তো পারতিস, এক্ষুনি বাবার
কানে গেলে, আমাকেই আবার ক্যাঁচক্যাঁচ করবে
ইত্যাদি ইত্যাদি।
- উফ... বৌদি, যাওয়ার সময় না
টুকলেই নয়, তোমরা আর শোধরাবেনা...
- উঁ...... কি আমার মহারানি এলো রে, দেশোদ্ধারে যাচ্ছেন, ঢং দেখলে
বাঁচিনা। আমাদের কি আর ও বয়েস এসেছিল... বলি আসবি কখন...
কে কোথায় শোনার জন্য!! ততক্ষনে ম্যাডাম, তিন তিরিক্ষে জোড়া গির্জার বাসস্ট্যান্ডে হাজির।
এমনিতে স্বচ্ছল পরিবারের একলা মাতৃহারা কন্যা, বাবা সদ্য রিটায়ার্ড করেছেন। নিঃসন্তান রোজগেরে দাদার
একমাত্র প্রিন্সেস ছোট বোন, বৌদির ননদ কম , মেয়ে বেশি। সবে কলেজে উঠেছে। বেশ একটা প্রেম প্রেম ভাব
মনে। পাইকারি হারে কাওকে খুজছে, মনের মাপে
হচ্ছেনা একটাও।
“প্রিয়জন” বলে একটা গ্রুপে মাস খানেক হল জয়েন করেছে “ধানি লঙ্কা”। শুরু
থেকেই দেখছে “অলীক মানুষ” নামের প্রোফাইলটা গ্রুপটাকে প্রায় একাই মাতিয়ে রেখেছে।
দারুন দারুন সব হিউমারে ঠাসা চটজলদি কমেন্ট, আর অবলীলায় লিখেফেলা ভারী ভারী বিষয়ের উপর লম্বা লম্বা প্রবন্ধ। গ্রুপের
সকলেই ধন্য ধন্য করে। গ্রুপের সিনিয়র মেম্বার পরেশ ঘটক, বা এডমিন সুরঞ্জন হালদার থেকে শুরু করে হেডমিষ্ট্রেস
জয়ীতা দি,
আরেক এডমিন NRI রিমা বৌদি পর্যন্ত “অলীক মানুষকে” নিয়ে গদগদ। তার উপরে সপ্তর্ষী আর
প্রশান্ত তো রীতিমত গুরু গুরু করে অস্থির।
গ্রুপে প্রথম প্রথম ধানি লঙ্কার কেমন একা একা লাগলেও, প্রিয়জনেরা ওকে আপন করে নিতে সময় নিলেন না। তার উপরে
সাহিত্য প্রীতি আর নিজে লিখতে না পারার দরুন, লেখক মানুষদের প্রতি ধানি লঙ্কার এক্সট্রা ক্রাশ ছিল। তাই অলীক মানুষের
বন্ধু হতে সময় লাগলনা।
হপ্তাদুয়েক যাওয়ার পর, অলীক মানুষকে
ঘিরে ক্রমেই আগ্রহ বাড়তে লাগল ধানি লঙ্কার। শেষে গেল রোববার রাত্রে “করব কি করব
না” ভাবতে ভাবতে, সাহস জমিয়ে
ইনবক্সে ম্যাসেজটা করেই ফেল্লো।
- আচ্ছা আপনার নামটা বলতে পারবেন?
- অবশ্যই পারব, কিন্তু বলব কেন?
- এমনিই। আমার ইচ্ছা জেগেছে তাই
- উদ্দেশ্যহীন যেকোন ধরনের কাজকর্ম, শরীর স্বাস্থের জন্য খারাপ। আর ইচ্ছেকে একটু বশে রাখুন।
- থাক আর জ্ঞান বিলি করতে হবেনা, নাম বললে বলেন, থাকলে থাক, অতো ঘ্যাম নিতে হবেনা।
- ঘ্যাম আর আমি!! ঘ্যাম নেওয়ার হলে কি আর “অলীক মানুষ” সাজতাম ম্যাডাম..
- আমি কি সাজতে বলিছি...
এইভাবে পাক্কা আট দিন অনেক চ্যাটের পর অবশেষে অলীক মানুষের মনের বেশ
কাছাকাছি চলে এসেছে বলে আবিষ্কার করল ধানি লঙ্কা। মনের কাছাকাছি যখন এসেছে, তখন তো আর সেই প্রাচীন কালের মেয়েদের মত, লজ্জা পেয়ে, গান গেয়ে বা কবিতা লিখে “জো” নষ্ট হতে দেওয়া যায়না। সুতরাং নিজে থেকেই অলীক
মানুষের সাথে একটা এ্যাপো ফিক্স করে ফেললো।
এক্কেবারে ব্লাইন্ড ডেটিং, কেওই প্রায়
কিচ্ছুটি জানেনা একে অপরের সম্বন্ধে। কেও কারোর ছবিটুকুও দেখেনি। ধানি লঙ্কার
প্রোফাইলে একটা হার্ট সাইন, আর অলীক মানুষের
প্রোফাইল পিকচার তো বিশিষ্ট ঘটনার লাইভ টেলিকাষ্টের সাথে সাথেই পরিবর্তন হয়, প্রায় প্রতিদিনিই। গতকাল রাতেই অবশ্য মোবাইল নাম্বার
বিনিময় ঘটে গেছে, সুতরাং অকুস্থলে
আগে পৌছানো যাক, তারপরে দেখা যাবে, এমনটাই দুজনেরই ভাব।
ম্যাসেঞ্জারের নীল বোতাম জ্বলজ্বল করেই আছে ধানি লঙ্কার। ধানি লঙ্কা CCD তে ঢুকে একটা চেয়ার টেনে বসতেই ফোন এলো অলীক মানুষের।
সেও ওখানেই উপস্থিত, নুন্যতম রিস্ক
না নিয়ে,
শুধু দেখে নিল কোন মেয়েটা। সাজলে খারাপ লাগেনা
ধানি লঙ্কাকে, তার উপরে হলুদ জমিতে সবুজ জড়ির
কাজকরা আনারকলি চুড়িদার, গাঢ় সবুজ
লেগিন্স,
সাজের কথা তো আগেই বলেছি, মারাকাটারি রূপসী না লাগলেও বেশ ঝকঝকে মাজা সুন্দরী
লাগছে। দীর্ধাঙ্গী, নির্মেদ শরীর, টানাটানা মায়াভরা চোখ, নির্দিষ্ট মাপজোখের নাক ঠোঁট চিবুক। শুধু গায়েরং টা সামান্য দাবা। তবে
ওটাকে উহ্য করাই যায়।
- হাই, আমি অলীক মানুষ।
একমনে ফেসবুকের টাইমলাইন ঘাটতে ঘাটতে হঠাৎ ডাকে চমকিয়ে মুখটা উপরে তুলে
হাতটা ঈষৎ বাড়িয়ে কোনরকমে হাতের তর্জনী আর মধ্যমাটা ছুঁয়ে, একটু থতমত খেয়ে সত্যি নামটাই বলে ফেলল...
- হাই, আমি রঞ্জু
- রঞ্জু? ছেলেদের নাম?
- (মনে মনে বাবা মায়ের উপর ভীষন রাগ করে) আমার নাম রঞ্জাবতী।
- শুধু রঞ্জাবতী!
- (এবার একটু রাগই হল রঞ্জুর) আচ্ছা বাবা, আগে জানলে কোষ্ঠীটা সাথে করে আনতাম, আমার নাম রঞ্জাবতী গড়গড়ি, বাবার নাম
নকুলেশ্বর গড়গড়ি, মায়ের নাম
আশালতা দেবী... আর কিছু??
কথা কটা এক নিশ্বাসে বলেই থামল রঞ্জু। যে দুঃখে ধানি লঙ্কা নাম নিয়েছিল, ঠিক সেই ব্যাথা স্থানেই আঘাত!! বড় মনে লাগল রঞ্জুর।
ওদিকে অলীক মানুষ মুখে “গড়গড়ি গড়গড়ি” বিড়বিড় করতে করতে সানগ্লাস পড়া চোখে একমনে
নিরিক্ষন করছিল রঞ্জুকে।
এতোক্ষনে রঞ্জুর হুশ হল, সে এবার চেয়ে
দেখল সামনের অলীক মানুষটাকে! এটা কে? চোখ মুখ হাঁ হয়ে গেল।
মাথা থেকে দেখা শুরু করল, চাঁদিতে চুলের
অবশিষ্টাংশ টুকু বর্তমান, মুখে গোঁফদাড়ির
জঙ্গল,
বোধহয় বিড়ি সিগারেটে ছ্যাকায় পোড়া, পুরু কালো ঠোঁট। ঘাড়ে গর্দানে সমান। এটুকু তবুও ঠিকিই
ছিল,
বেশ স্মার্ট। এর পরেরটুকু যে কোন কাওকে রীতিমত
অসুস্থ করে দেবার পক্ষে যথেষ্ট । বাঁহাতে ঘড়ি, ডান হাতের কড়ে আঙুলে একটা সবুজ পান্না সোনায় বাধানো। চোখে মোটা কালো
ফ্রেমের ফ্যাসন চসমা। এক্কেবারে গোলগাল রবিঠাকুরের দামোদর শেঠ মার্কা চেহারা, ধুতির বদলে হাফ শার্ট আর জিন্স পরে আছে। ভুঁড়িটা মনে
হচ্ছে এক্সট্রা একটা জুড়ে রাখা লাগেজ।
- তুমিই অলীক মানুষ?
- হ্যাঁ, কোন সন্দেহ!
- না মানে, একটা জামার ভিতর তো জনা চারেককে
ভরে এনেছো মনে হচ্ছে?
- কি আর করব বলো!
- এতো মোটা কোন মানুষে হয়!! কত ওজন?
- দূর সাধ করে কি কেও এমন হয়, এই আপাতত ১১৩ কেজি
এভাবেই কথাবার্তা এগিয়ে চলল। উৎসাহ আর নানা প্রগলভতার ভীরে রঞ্জু অলীক
মানুষের আসল নামটাই শুধাতে ভুলে গেছে। মানুষটি মোটা কদাকার কাদাখোঁচা মার্কা ঠিকিই, কিন্তু ওই দশাশই চেহারাটার আড়ালে থাকা একটা নরম প্রেমিক
মনের মানুষের সন্ধান পেল রঞ্জু। ওয়েটার ওর্ডার নিতে এসে শুধালো- অর্ডার প্লিজ, দুজনেই নিজের নিজের পছন্দের অর্ডার করে আবার গল্পে মেতে
উঠল,
মাঝে একবার আসল নাম শুধালেও, অলীক সযত্নে বিষয়টা এড়িয়ে গেল।
ঘন্টা খানেক পর বিল মেটানোর জন্য ওয়েটার একটা চামড়ার মলাটওয়ালা ফাইল আনলে, অলীক মানুষ তার মানিপার্স থেকে একটা ডেবিট বা ক্রেডিট
কার্ড গুজে দিয়ে এবার উঠার প্রস্তুতি করতে লাগল।
দুজনেরই ফোন এতক্ষন সাইলেন্ট মোডে ছিল, অলীক মানুষ ফোনটা খুলতেই কোন জরুরী ফোন নাম্বারের মিসকল চোখে পড়াতে , চোখে চোখেই রঞ্জুর কাছে একটা এক্সকিউজ মি- চেয়ে নিয়ে একটু দূরে কথা বলতে গেল। এরই মাঝে ওয়েটার বিল
সমেত ডেবিট কার্ডটি ফিরিৎ দিয়ে গেছে। অলীক মানুষ আসতে লেট করছে দেখেই রঞ্জু চামড়ার
ফাইলটা নিয়ে নাড়াচারা শুরু করে দিল। হঠাৎই কিছু একটা দেখে প্রায় অক্কা পাবার দশা
রঞ্জুর।
এ যে টকের জ্বালায় দেশ ছেরে তেঁতুল তলায় বাস। এক গড়গড়ির অত্যাচারে রঞ্জাবতী
ধানি লঙ্কা হয়েছে। আজ নতুন স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল এখানে। টাকলু, মোটা, গোঁফ দাড়ির
জঙ্গল পর্যন্ত সবটা মেনে নিয়েছিল। কিন্তু এটাকে মানিবে কি করে!
কার্ডের উপরে বড় বড় হরফে লেখা ছিল “BIPAD TARAN GUCHAIT”
শুভ, অর্ঘ্য, আদিত্য না হোক একটা চলনসই তো হতে হবে!! রঞ্জু যত ভাবে
ততই মুষড়ে পরে। আগামীতে যে মাথায় বিপদ আর পিছনে গু, বাকিটা জীবন ওকেই তারিয়ে নিয়ে বেরাবে !! রঞ্জু আর কিছু ভাবতে পারছে না, মাথা ভোঁ ভোঁ করছে।





