শুক্রবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২০

বিহার নির্বাচনঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ১০

দশম পর্ব

তৃণমূল আজ বিজেপি জুজুর ভয় দেখাচ্ছে ক্ষমতায় থাকতেই, কিন্তু বিজেপি কতটা নিকৃষ্ট তৃণমূলের চেয়ে? পরিসংখ্যান বলছে তৃণমূলের ২১১টা MLA এর মাঝে ৩২ জন মুসলমান, যেখানে জনসংখ্যার জনপ্রতিনিধি হিসাবে ৫৭ জন মুসলমানের প্রতিনিধিত্ব করা উচিত ছিল, সেখানে প্রায় অর্ধেক জনকে সুযোগ দিয়েছে তৃনমূল। অথচ ৪% ব্রাহ্মণ, কিন্তু ৪৭% জনপ্রতিনিধি তারাই। মন্ত্রীসভায় পূর্ণমন্ত্রী ২৮ জন, মুসলমান মাত্র ৩ জন মাত্র, মাত্র ১০%। তাও তাদের একজন রেজ্জাক মোল্লা, মন্ত্রীত্বের টোপেই তাকে দল ভাঙালো হয়েছিল, অন্যজন ফিরহাদ হাকিম যে দক্ষিন কোলকাতা ও তল্পিবাহক কোটায়। প্রসঙ্গত দক্ষিণ কোলকাতা লোকসভা কেন্দ্রের প্রতিটা বিধায়কই পূর্ন মন্ত্রী। কিন্তু মন্ত্রী সভাতে ব্রাহ্মণ মন্ত্রী ১২ জন, ৪৩%!


খান চারেককে রাষ্ট্রমন্ত্রীর ললিপপ দিয়ে রেখেছে জেলা কোটায়, ব্যাস। সবচেয়ে প্রহসনের হচ্ছে সংখ্যালঘু মন্ত্রীও খোদ মমতা ব্যানার্জী। তৃণমূল পূজা কার্নিভাল ১টা করেছে, বিজেপি এলে ২০টা করবে। ওয়াকফের ইমামভাতার পিঠে সরকারি করের টাকায় পুরোহিত ভাতা দিয়েছে। পীর নামের মিসকিন গুলোকে কিছু ফকিরি অর্থ দেওয়ার পাশে- ইস্কন, রামকৃষ্ণ মঠ, মতুয়াদের শয়ে শয়ে কোটি টাকা ও জমি বিলিয়েছে। তৃনমূল ক্লাবের নামে টাকা বিলিয়েছে, বিজেপি গরুর নামে টাকা বিলোবে।

জেলখানাগুলোতে রাজনৈতিক বন্দির ৭৩%ই মুসলমান, বিজেপি শাসিত রাজ্যের চেয়েও বেশি। সুতরাং মুসলমান কী হারাবে যা তৃনমূল দিয়ে রেখেছিল? বিজেপি শাসিত রাজ্যে কি মুসলমানেরা হলোকাষ্টে নেই হয়ে গেছে? এখানে তৃণমূল বিপদে আছে মুসলমান নয়, আর হিন্দুও বিপদে নেই- বিজেপির ক্ষমতা লিপ্সা আছে।

এমতাবস্থায় বিজেপির মেরুকরণ রাজনীতির এজেন্ডার দৌলতে মিমকে তারা অর্থ ও অন্যান্য সুরক্ষা দিয়ে প্রতিষ্ঠা করে দিলে মুসলমানেদের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যে ভাল বই খারাপ কিছু নেই। হায়দ্রাবাদের পুর নির্বাচনই দেখুন, আদ্যোপান্ত সাম্প্রদায়িক এজেন্ডা সম্বলিত ভাষনের উপরে ভর দিয়ে ভোটপর্ব শেষ হলো। মিডিয়া থেকে জনগণ সকলেই এটাকে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছে, আমাদের পশ্চিমবঙ্গের মানুষও আগামী ৪-৫ মাসে অভ্যস্ত হয়ে যাবে সাম্প্রদায়িক কথাবার্তায়। হায়দ্রাবাদের সামান্য পুর নির্বাচনে বিজেপি তার পূর্ণ শক্তি নামিয়ে দিয়েছিল, অমিত শাহ থেকে জেপি নাড্ডা আদিত্যনাথ থেকে কে ছিলনা যে যায়নি! কিন্তু সেটা তেমন কোনও বড় ঘটনা নয়, ঘটনা হচ্ছে নিজেদের জন্মস্থলেই ১৫০ আসনের মধ্যে মাত্র ৫১টা কেন্দ্রে প্রতিযোগিতা করেছে মিম; কারন সেখানে বিজেপির থেকে কোনও সহযোগিতা পায়নি তারা।

হায়দ্রাবাদ পুরসভার ফলাফল বলছে সেখানে মিম কনটেষ্ট করা ৫১টার মধ্যে ৪৪টা জিতেছে, কিন্তু বিজেপি ৪৮টা আসনে জিতেছে চন্দ্রশেখর রাও এর TRS কে ধরাশায়ী করে। মিম ও কংগ্রেস যে যেখানে ছিল সেখানেই আছে TRS এর ৪৪টা এবার বিজেপির ঝুলতে চলে গেছে। অঙ্কটা সোজা, এই চন্দ্রশেখর রাও, চন্দ্রবাবু নাইডু, প্রফুল্ল মোহান্ত, সুখবীর সিং বাদল, মেহবুবা মুফতি, নবীন পট্টনায়ক, জয়ললিতা, নীতিশ কুমার, মমতা ব্যানার্জী, এরা সবকটা সংখ্যালঘু মুসলমান প্রেমীর ভেকধরা RSS এর দালাল, যারা বিজেপির ভূমি তৈরি করেছিল নিজ নিজ রাজ্যে সঙ্ঘের সংগঠন ব্যবহার করে।

কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে থাকতে ভুলেই গেছিল যে RSS এর নিজস্ব রাজনৈতিক দলের নাম BJP, সুতরাং জো ধরা জমিতে দালালদের কাজ কি, তাই হায়দ্রাবাদ পুরসভায় দালাল TRS কে খেয়ে নিয়েছে সঙ্ঘ, ফুটেছে পদ্ম। কাল তৃণমূলেরও এই দশাই হবে এটাকে আগাম অনুধাবন করে মমতা ব্যানার্জী কিছু তৃণমূলপন্থী মুসলমান ভক্তকে বাজারে ছেড়ে রেখে ‘BJP খারাপ তৃনমূল ভালো’র সাথে ‘মিম সাম্প্রদায়িক’ বলে উদোম চেঁচাচ্ছে। মিম নিশ্চিত সাম্প্রদায়িক এতে কারো সন্দেহ নেই, কিন্তু তৃণমূল যে ২১ বছর ধরে বিজেপিকে লালন করে গেল কখনও মন্ত্রীসভায় থেকে কখনও RSS এর দালাল হিসাবে, সে কি তাহলে? আসলে পাব্লিক জেনে গেছে ‘বিজেমূল’ জুটি আসলে RSS এর গোয়ালে এক গোঁজেই বাঁধা। মিম অন্তত RSS এর দালাল গুলোর মতো মেকি সেকুলার পোশাক পরে নেই; স্বভাবতই, মিম এরাজ্যে জন্মাবার আগেই তৃণমুলীদের রাত্রের ঘুম হারাম করে রেখেছে TRS এর দশা হবার ভয়।

পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে বড় প্রশ্ন, বিজেপি কি পারবে ২০১৯ সালে পাওয়া ৪০% ভোট ধরে রাখতে? ভুলে গেলে চলবেনা বৈষ্ণবনগরের মতো ৭৩% মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলে বিজেপি জিতেছিল। কীভাবে জিতেছিল! আসলে মমতা ব্যানার্জী আগুন নিয়ে খেলেছিল, নিজেদের পকেট ভোট বিজেপিতে ট্র্যান্সফার করে ‘সওদা’ করেছিল কোনো ফায়দার। এমন আসনের সংখ্যা নেহাত কম কিছু ছিলনা বাংলায়, যেখানে বিজেপির হয়ে তৃনমূল সরাসরি ভোট করেছিল, তাই বিজেপির চ্যালেঞ্জটাও সবচেয়ে বেশি। অধিকাংশ ভক্ত অঙ্ক না কষেই ‘ঘোষ মন্ত্রীসভা’ বানিয়ে ফেলেছে, আসলে তারা তো ভক্ত- নির্বুদ্ধিতা ভক্তের অলঙ্কার; এদেরই কেউ কেউ ভোট পরবর্তী সময়ে আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে পারে।

গণতন্ত্র মানেই বহুমত, কিন্তু মুসলমান ও দলিত সমাজের মতকে কে কবে মান্যতা দিয়েছে! নিজেদের রাজনৈতিক সাফল্যের সিঁড়ি বানিয়েছে এই দুই সম্প্রদায়কে। দলিতেরা পড়ে মার খেলেও তাদের চোখ খুলবেনা, তারা দিনের শেষে সেই মনুবাদকেই সত্য ধরে নিয়তি মেনে নেবে। কিন্তু মুসলমানেরা কেন আজও ভিক্ষা চাইবে? সমস্যা শুধু মুসলমানে নয়, বরং গরীব মুসলমানে। ধনী তবুও নিজেকে কিছুটা সুরক্ষিত করতে পারে অর্থের ক্ষমতায়, গরীবের শুধু উপরওয়ালা ভরষা।

জন্মভূমি ভালবেসে বাপের ভিটেতে রয়ে যাওয়া মুসলমানেরা “আমরা বঞ্চিত, আমরা অত্যাচারিত” এই চিৎকারই করে গেছে গত ৭০ বছর ধরে, কি লাভ হয়েছে? কেন সুফল মেলেনি নিজেদের জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করেনি। বরং সহানুভূতি আদায়ের জন্য উচ্চবর্ণের মনুবাদী শাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে নিজেদের শান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কখনও নিজেরা জোটবদ্ধ হবার প্রয়োজন বা সাহস করে উঠতে পারেনি, আত্মসমালোচনা করে এই অবস্থা থেকে বেরোনোর রাস্তা খোঁজার চেষ্টা করেনি। বরঞ্চ সিদ্দিকুল্লার মতো কিছু নেতা(!) সুলভে বিক্রি হয়ে গেছে নিজের বালবাচ্চার স্বার্থ সুরক্ষিত করতে।

মুসলমান ও দলিতদের উপরে আমহারে অত্যাচার করা যেত একটাই কারনে, সেটা হল তারা ছিল অশিক্ষিত ও গরীব। বিভিন্ন বেসরকারী মিশনের কল্যাণে এখন মুসলমান লেখাপড়া শিখছে, জ্ঞান বাড়ছে, বুঝতে শিখছে। মুসলমানদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন হয়েছে। চাইলেই আর মুসলমানকে দলদাস বানিয়ে রাখা যাচ্ছেনা। অনেক মুসলমানই তাদের সাংবিধানিক অধিকার বুঝে নেওয়ার জন্য আওয়াজ তুলছে। মনুবাদীরা এটাকে জিহাদী সাম্প্রদায়িকতার উন্মেষ বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় ত্রুটি না রাখলেও আসলে এতে লাভ কিছু হবেনা। গেরুয়া সন্ত্রাসের উল্টোপিঠে জিহাদেরই জন্ম হয়, দুটোই গুয়েই এপিঠ ওপিঠ। আরএসএস গোটা সমাজকে আড়াআড়ি বিভাজন করে সাম্প্রদায়িকতার উন্মেষ ঘটিয়েই রেখেছে, সুতরাং তাদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হবে তাদেরই দেখানো পথে। মিম তো একটা উপলক্ষ্য মাত্র।

গঠনমূলক ভাবনা ছাড়া সমানে সমানে লড়াই দেওয়া যায়না। ধর্মান্ধতাকে সেকুলারিজম দিয়ে রোখার চেষ্টা শেষ ৪০ বছর ধরেই চলছে, সুতরাং তা দিয়ে যে ধর্মীয় উন্মাদদের মোকাবেলা করা যায় না- এই বোধটা আর কবে আসবে! এবারে অন্য পথ অনুসরণ করবেই অত্যাচারিত দলিত-মুসলমান, যে পথে বিজেপি-RSS সমাজের বুকে ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। তাতে সমাজ আরো বেশি অশান্ত হবে আগামীতে, সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আবার নতুন মানচিত্র লেখা হতে পারে ৪৭ এর মত।

দেশের সামাজিক সম্প্রীতি ও অখন্ডতা রক্ষার দায় কি শুধুই সংখ্যালঘু মুসলমানদের?

....ক্রমশ

বৃহস্পতিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২০

বিহার নির্বাচনঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ৯


নবম পর্ব

সাম্প্রতিক ইতিহাস বলছে RSS ব্যাকগ্রাউন্ড না থাকলে বিজেপি করে তেমন কিছু পাওয়া চরম কঠিন। সেই নিয়ম মেনে মুকুল রায়ের কপালে একটা রাজ্যসভার পদও জটেনি, তার ছেলে তো রাজনীতিই ছেড়ে দেওয়ার গল্প শুনিয়েছে। দিলীপ ঘোষ আর জগদীশ ধনখোর দুজনই- নিজেরাও জানে তাদের কেন আনা হয়েছিল বিজেপির নের্তৃত্বস্থানীয় পদে। এদের সকলের উদ্দেশ্য একজনই- কবি, দার্শনিক, চিত্রশিল্পী, বাণীশিল্পী, চলচ্চিত্র বিশারদ, সর্প বিশারদ, মাওবাদী বিশারদ, ঘেউঘেউ, ফেউফেউ, ফটাফট ইত্যাদি মাল্টি প্রতিভার অধিকারিণী।


যিনি রোজ নিউজের শিরোনামে থাকতেন অপ্রয়োজনীয় উদ্ভট আলফাল মন্তব্য করে। তাঁর শিরোনামে থাকাটাকে নিয়ন্ত্রণ করতেই বিজেপির ওই দুই ভাঁড়ের আগমন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দী তথাগত রায়, দিলীপ-ধনখোরের জুটির ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে, নিয়মিত অসভ্য আলপটকা মন্তব্য করে। ‘অপমানদা’, ‘বাঘের বাচ্চা’, ‘সোনা আবিষ্কার’ শব্দ গুলো বললেই আপনি বুঝে যাবেন কার কথা হচ্ছে, এভাবেই রোজ লাগাতার হরেক তামাশা করে মমতা ব্যানার্জীর জনপ্রিয়তাতে মারাত্বক ভাগ বসিয়েছে এনারা ‘সাফল্যের সাথে’। কোনো শিক্ষিত রুচিশীল মানুষের পক্ষেই এই ধরনের আধা উন্মাদ কাজকর্ম শোভনীয় নয়, কিন্তু লড়াই আর ভালোবাসায় সব কিছুই যে শোভন।

লকেট, অগ্নিমিত্রা, বেগুনী বর্ণের রঞ্জিত ‘কারিয়াকর্তা’ সহ বাকি ১৭টা নমুনা থুড়ি সাংসদকে দিয়ে যে বিধানসভা ভোট হবে না- সেটা মোক্ষম জানে RSS; আর জানে বলেই শুভেন্দুদের দরকার তাদের, ভুলে গেলে হবেনা যে RSS/বিজেপি মনিরুলকেও দলে নিয়েছিল ভোটের রাজনীতির তাগিদে। তবে বিজেপি'র মার্কেটিং স্ট্রাটেজির সামনে বাকিরা অনেক পিছিয়ে। ওদের হোমওয়ার্ক RSS সম্বৎসর করে চলে আন্ডার কারেন্ট। সাথে সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট স্পনসর্ড বৈধানিক সংস্থা গুলো, বিপুল অর্থ আর লজিস্টিক সাপোর্ট দেয় বড় আর মাঝারী ব্যবসায়িক ঘরানা।

RSS-BJP এটাও জানে ১৮টা আসন যত না বিজেপির পক্ষে ছিল তার চেয়েও আপাদমস্তক (৭০-৩০ ভাগে) চোরেদের দলটিকে হারাবার প্রয়াস ছিল মানুষের। বামেরা নিজেরাই নিজেদের উপরে ভরষা করে উঠতে পারেনি, কংগ্রেস তো রবি ঠাকুরের- ‘তুমি কি কেবলই ছবি…’ কবিতার বস্তুরুপ। এখানেই মিমের শুভ গৃহপ্রবেশ- বঙ্গীয় রাজনীতিতে।

মিমের ভোট মূলত মুসলমানেরা, জেলা ভিত্তিক যদি দেখা যায়, ২০২০ এর নিরিখে সেই হিসাবটা দাঁড়ায় -

মুর্শিদাবাদ জেলা- ৭১%
উত্তর দিনাজপুর জেলা- ৫৪%
মালদহ জেলা- ৫১%
বীরভূম জেলা- ৩৯%
উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলা- ৩৬%
নদিয়া জেলা- ২৯%
কোচবিহার জেলা- ২৮%
হাওড়া জেলা- ২৮%
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা- ২৭%
দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলা- ২৬%
কোলকাতা জেলা- ২২%
বর্ধমান জেলা- ২১%
হুগলী জেলা- ১৯ %
পূর্ব মেদিনীপুর জেলা- ১৫%
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা- ১২%
পুরুলিয়া জেলা- ৮%
বাঁকুড়া জেলা- ৮%
দার্জিলিং জেলা- ৬%
জলপাইগুড়ি জেলা- ২%

২৯৪টি আসন বিশিষ্ট পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায়, কমপক্ষে ১১৫টা এমন কেন্দ্র আছে যেগুলো মুসলমান অধ্যুষিত, ১৫টি জেলা জুড়ে। এগুলোকে পাখীর চোখ করে মিম যদি ঝাঁপায়, সেক্ষেত্রে কার কপাল পুড়বে, কে লাভবান হবে! প্রসঙ্গত এখানে বলে রাখা দরকার যে, বিজেপির ভোটার ও মিমের ভোটার সম্পূর্ণ আলাদা, দুটো বিপরীতধর্মী সাম্প্রদায়িক রাজনীতি আড়াআড়ি ভাগ করে দেবে হিন্দু-মুসলমানে। অতএব বেঁচে থাকে জাতীয় কংগ্রেস, তৃনমূল ও বামেরা। কংগ্রেস ও বামেরা গত লোকসভাতেই দেওয়ালে সেঁটে গেছে, তাহলে বাকি রইল কে?

মমতা ব্যানার্জী সাচার কমিশনের রিপোর্ট দেখিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, তারপর রাজ্যের মুসলমানেদের অবস্থা আরো খারাপ থেকে খারাপতর হয়েছে দিনকে দিন। কিন্তু এমন কোনও সরকারি পরিসংখ্যানও নেই যে আপনি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবেন। তা সত্বেও শুধুমাত্র সরকারি চাকরির দিকেই যদি নজর দিন, দেখবেন তৃণমূল জামানায় মুসলমানেরা কতজন চাকরি পেয়েছে! সেভাবে কোনো চাকরিই দেয়নি মমতা সরকার, সুতরাং কেউ না পেলে মুসলমানেরাই বা কোত্থেকে পাবে! মিথ্যা ঢপের বাইরে আর কিছুই দেয়নি, দুধেল গরু বলে অপমান ছাড়া। বলার মতো একটা মুসলমান নেতা পর্যন্ত রাখেনি তাদের দলে, যারা আছে সবই তল্পিবাহক ও কোটার উমেদার, বাকিরা জেলাস্তরে সীমিত।

পাশাপাশি থাকা দুটো মুসলমান ও অমুসলমান গাঁয়ে গিয়ে দেখুন, উন্নয়ন বুঝে যাবেন। আজও ভোটের ময়দানে মরে মুসলমান, মারেও মুসলমান। মুসলমানকে ভোটের স্বার্থে ব্যবহারের ট্রাডিশন প্রতিষ্ঠানিকতা পেয়েছে তৃনমূল জামানায়। মমতা ব্যানার্জী তার রাজত্বকালে মুসলমানেদের মতো প্রবঞ্চনা আর কারো সাথে করেনি, যেটা অনেকটাই বিশ্বাসঘাতকতার সামিল। পঞ্চায়েত স্তরে যে সকল মুসলমান নেতারা আছে তারাও ঠুঁটো জগন্নাথ, গোটা রাজ্য প্রশাসন চলছে BDO দের দিয়ে। তৃনমূল দলটা চালাচ্ছে থানার বড়বাবু, মেজবাবুরা, কারন এদেরকে সরাসরি নবান্ন থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এই বিডিও ও থানার কর্তাবাবুদের মাঝে কতজন মুসলমানকে উচ্চপদে পদে বসিয়েছে মুসলমান দরদী ‘হিজাবে’ সাজা মমতার সরকার?

সীমাহীন তোলাবাজি, তার জন্য এলাকার দখলদারি, প্রচারসর্বস্ব মিথ্যাচার ও অশ্লীল দলবাজি করতে গিয়ে গোটা ‘পঞ্চায়েতী সরকার’ ব্যবস্থা ভেঙে পরেছে নিকৃষ্ট প্রশাসনিক ব্যর্থতায়, আর বাজারি পত্রিকায় এটারই বিজ্ঞাপন দিচ্ছে রোজ ‘মরার আগে হরিনাম’ করার মতো। মমতা ব্যানার্জী জানে সরকারি সুফল তৃনমূলের ক্যাডারগুলোর বাইরে কারো ঘরে পৌঁছায়নি, পিকেকে এনেছিল যাতে শেষ মুহুর্তে কিছুটা শোধরানো যায় তৃনমূলের তস্করসমাজকে, কিন্তু তারা হাতের বাইরে এটা আজ গভীর ভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে নেত্রী। তাই পাতাজোড়া বাজারি বিজ্ঞাপন দিয়ে মরিয়া চেষ্টা চালাতে হচ্ছে ‘দুয়ারে সরকার’। পঞ্চায়েত ভোট করতে না দিয়ে গায়েরজোরে ‘পুলিস আর গুণ্ডা’ দিয়ে ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা দখল করেছিল তার উন্নয়ন বাহিনী। স্বভাবতই গোটা পঞ্চায়েত ব্যবস্থাটাই সরকারি প্রকল্পের টাকা চুরির আখারার বাইরে আর কিছুই নয় আজকের দিনে।

মমতা ব্যানার্জী তার জীবনের সর্বোচ্চ ক্ষমতা পেয়ে গেছে, দুর্নীতিতে ডুবে থাকা বৃদ্ধা বয়সে আর কিই বা আশা করেন তিনি! ভাইপো বিদেশী বউ নিয়ে থাইল্যান্ড চলে যাবে, বাকি নেতারা বিজেপিতে। কিন্তু মুসলমানেরা বিজেপির সাথে লড়বে NRC মাথায় করে, যা মমতা ব্যানার্জীরই আমদানি। এর পরেও মুসলমান সামান্য বেচাল করলেই NIA কে দিয়ে জঙ্গি সন্দেহে জেলে ভরে দেবে, বিনা বিচারে জীবন শেষ। অন্ধ মমতা প্রেমী মুসলমানগুলো যখন বুঝবে মমতার এই ষড়যন্ত্র, দেখবে পায়ের নিচে আর জমি নেই।

.....ক্রমশ

মঙ্গলবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২০

বিহার নির্বাচনঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ৮

 


অষ্টম পর্ব


শ্রমজীবী ক্যান্টিন বা সুলভ মূল্যের সবজি বাজারের মতো মহতি কাজ দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার একটা অংশে কিছু প্রচারণা করে নিজেদেরকে আশ্বস্ত করা যায় যে- ‘হ্যাঁ আমরা আছি বাজারে’; কিন্তু ক্ষমতায়নের জন্য ভোটের রাজনীতিতে তা যথেষ্ট নয়। মিছিলের ভিড় জেতার জন্য যথেষ্ট নয়, তাহলে বিহারে তেজস্বী জিতত আর নীতিশ কুমার হারত। শুধুমাত্র সৎ বলে, বৃদ্ধ নেতাদের চেয়ারে রেখে বিপ্লবও হয় না। তাঁরা নমস্য, ওঁনাদের নিয়ে স্মৃতি রোমন্থন করতে ভাল লাগে, লড়াই এর সেনাপতি হিসাবে তাঁরা যে অচল এটা না বুঝলে ভোটের বাক্সে কোনো সুফল অন্তত পাবে না এই নভেম্বর, ২০২০ এর পরিস্থিতিতে।

লেনিন, স্ত্যালিন, মাও, চে, ফিদেল, হো-চি-মিন প্রমুখ এনারা কেউ বৃদ্ধতন্ত্রের প্রতীক ছিলেন না। এবারে দেশের দিকে একটু নজর দিন- ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ ৪৮ বছর বয়সে দেশের প্রথম বামপন্থী মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। জ্যোতি বসু ৫৩ বছর বয়সে রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ৩৩ বছর বয়সে রাজ্যের পুর্ণ মন্ত্রী হয়েছিলেন। সূর্যকান্ত মিশ্র ২৮ বছর বয়সে অবিভক্ত মেদনীপুর জেলার সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েছিলেন। অনিল বিশ্বাস ২১ বছর বয়সে পার্টি মেম্বার হয়েছিল, ৫৪ বছর বয়সে রাজ্য সম্পাদক। বিমান বসু ৩১ বছর বয়সে রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হয়েছিলেন। হরেকৃষ্ণ কোনার ২৩ বছর বয়েসে পার্টি মেম্বার হয়েছিলেন, ৫৪ বছর বয়েসে রাজ্যের মন্ত্রী। মহঃ সেলিম ৩৩ বছর বয়সে রাজ্যসভার মেম্বার হয়েছিলেন, সৈফুদ্দিন চৌধুরী ৩২ বছর বয়সে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হয়েছিলেন। ভি এস অচ্যুতানন্দ ১৭ বছর বয়সে পার্টি মেম্বার হয়েছিলেন। আর কত উদাহরণ চাই!

এই তাজা রক্ত ছিল বলে বামেরা দেশে একটা শক্তি হিসাবে উঠে এসে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল, এখনকার পার্টি নেতৃত্বে আছে এমন তাজা রক্ত? ভক্ত কমরেডরা বলবেন- সায়নদীপ, ময়ূখ, মীনাক্ষী, সৃজন বা প্রতিকুর কি নেই রাজ্য কমিটিতে! সত্য হলো এরা কেউ রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নয় যাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। নতুনদের সুযোগ না দিলে তাদের থেকে কীভাবে আরেকটা অনিল বিশ্বাস, জ্যোতি বসু, সৈফুদ্দিন চৌধুরিরা জন্মাবে! হাস্যকর হলো এই তালিকাতে ফুয়াদ হালিমই নেই, অথচ দেশে বামপন্থী মুসলমান মুখের মধ্যে তিনি সুপরিচিত। তাই আগে ঘরে বিপ্লব করে নের্তৃত্বে বিপুল তাজা রক্ত আনতে হবে বঙ্গ বামেদের, তার পরে না হয় সাম্প্রদায়িক ও ফ্যাসিস্টদের সাথে লড়াই করবে।

কারা বিজেপিতে বা অন্য দলে যাচ্ছে ও কেন যাচ্ছে, সেই খবরের আগাম সন্ধান লাগিয়ে যাবার আগেই বহিষ্কার করার সংগঠনটুকু নেই বামেদের। কোথাও একটা পার্টি অফিস দখল করার সংবাদে আনন্দ থাকুক, প্রত্যয় থাকুক, আত্মবিশ্বাস বাড়ুক, কিন্তু সেটাকে পাবার যোগ্যতা কতটা নিজেদের শক্তিবলে আর কতটা চালচোরেদের গোষ্ঠী কোন্দলের ফলে ‘পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা’ সেটুকু বোঝার ক্ষমতা ফিরলে তবে সেই আনন্দের সার্থকতা।

তৃণমূল কংগ্রেস পরিস্থিতি আবার ভিন্ন ধরনের, মমতা ব্যানার্জী নিজেও জানেন না কে আমার দলে আর কে বিজেপিতে গেছে। ভোটের দিন ঘোষণার পর যদি বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থীর নাম মমতা ব্যানার্জী হয় তাতেও কিছু আশ্চর্যের নয়। গোটা তৃণমূল দলটাই ১০ বছর ধরে লাগামহীন দুর্নীতিতে ডুবে ছিল। তাদের কুচো, মেজো, বড় সব নেতাগুলো CBI, ED, IT দপ্তরের হাতে বন্দী হওয়ার ভয়ে বিজেপির ঘরে রোজ হাজিরা দিয়ে আসে। কিছুজন আবার লেজেন্ড, যেমন শুভেন্দু, রাজীব ব্যানার্জীরা; ‘ঠিকঠাক দর পেলেই যাইব’ মোডে আছে। অবশিষ্টগুলো আম্বানি আদানির থেকে কামানো বিজেপির টাকার থলির দিকে চেয়ে দিন গুণছে- “মেরা নাম্বার কাব আয়েগা!”

প্রশান্ত কিশোর- চোরেদের মাঝে ‘কম্বলের লোম বাছার’ কাজ ছিল তার। সে ভাবছে আমার ৫০০ কোটির শেষ কিস্তি পাই না পাই, তার আগেরটা পেয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরতে পারলেই জান বাঁচে, মান হারালেও সেটা অন্যত্র ম্যানেজ করে নেবে আগামীতে। তবে তারাও মিডিয়া সেল তৈরি করেছে, বিজেপিকে টক্কর দেবে। এ দিক থেকেও বামেরা ১০ বছর পিছিয়ে, ভারতবর্ষের অন্যতম ধনী রাজনৈতিক ক্যাডারভিত্তিক দল হয়েও পেশাদার IT Cell নেই। অতি উৎসাহী কিছু বাম সমর্থক নিজেরা ঘরের খেয়ে সমানে বিজেপি আর তৃণমূলের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে লড়ে যায়। ফেসবুক-টুইটারের মতো প্রো-বিজেপি সংস্থার বিরুদ্ধেই এদের লড়তে বাম-কংগ্রেসী সমর্থকদের, নিত্যদিন ব্লক ও ‘প্রোফাইল উড়িয়ে দেওয়া’র মতো এক অসম লড়াই। তবু তারা লড়ছে বলেই সোশ্যাল মিডিয়াতে বামেদের অস্তিত্ব টুকু আছে।

বাম বা কংগ্রেসের IT সেলের নামে যারা আছে এক আধাজন, তারা প্যারালাল ঘোঁট পাকাতে ব্যস্ত। দুদিন কয়েকটা বড় নেতার সাথে ছবি তোলা হলেই নিজেদের কক্সিসে এক্সট্রা লেজের উপস্থিতি টের পেয়ে যায়। ব্যাস, তখন তাদের জ্ঞানের নমুনা, ঔদ্ধত্য ও আঁতলামো দেখলে মনে হবে তারাই প্রশান্ত কিশোর বা অমিত মালব্যের শিক্ষাগুরু। আগেই বলেছি, বামেদের দ্বাপরযুগের নের্তৃত্ব আজও পুষ্পকরথে বিশ্বাসী, সুপারসনিক জেট প্লেনে তাদের কি যায় আসে! চেয়ারে বসে থাকার জন্য কি আর রথ লাগে না জেট প্লেন লাগে! প্রয়াত সোমেন মিত্র বা প্রদীপ ভট্টাচার্যরা অদৌ জানেন যে IT cell খায় না মাথায় মাখে!

বিজেপি অমিত মালব্য সহ বাকি প্রোপ্যাগান্ডা টিমকে কোলকাতায় পাঠিয়ে দিয়েছে। আশার কথা হলো প্রশান্ত কিশোর ফেল মেরেছে বাংলাতে, তার কোনও প্রজেক্টই চলেনি। মালব্যদের গুরুর এই হাল হলে মালব্য-আঁখিদাস কতটা সফল হবে তা যথেষ্ট সন্দেহের।

.....ক্রমশ

সোমবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০২০

বিহার নির্বাচনঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ৭



সপ্তম পর্ব


দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেসী বা বামেদের পক্ষে থাকা জনগণ যারা ২০১৯ সালে তৃণমূলের বিপক্ষে পদ্ম চিহ্নে ভোট দিয়েছিল, তারা কেউ বিজেপির আদর্শে অন্ধ ভক্ত হয়ে যায়নি। এরা শ্রেনীগতভাবে বিজেপির ভোটারই ছিলনা, তৃণমূলের অত্যাচারের হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে ‘সিপিএম-কংগ্রেস’ সম্পূর্ন ব্যর্থ হওয়াতে এরা পদ্মে ছাপ পেরেছিল, বাঁচতে। সুতরাং এরা বিজেপি ছাড়া অন্যকে কখনও ভোট দেবে না এটা ভাবা মুর্খামি। যদিও বিজেপির পয়সা খেয়ে সংবাদের চ্যানেলগুলো বিজেপির পক্ষে আপনাকে এই হিসাবই কিন্তু দেখাচ্ছে ও দেখাবে।

কখনও ভেবেছেন- মুসলমান অধ্যুষিত রায়গঞ্জ, মেদনীপুর, মালদা ও বর্ধমান-দুর্গাপুর উত্তর কেন্দ্রে বিজেপি জিতেছিল কীভাবে? এছাড়া বর্ধমান পুর্ব, কুচবিহার, মালদা দক্ষিণ, জঙ্গিপুর, বসিরহাট, উলুবেড়িয়া, আরামবাগ, যাদবপুর, জয়নগর, তমলুক, ঘাটাল, বোলপুর, বীরভূম কেন্দ্র গুলোতেও বিপুল পরিমাণে মুসলমান ভোটার রয়েছে, এখানে বিজেপির দ্বিতীয় স্থানে থাকাটা আসলে বিজেপির জয় নয়- তৃণমূলের বিরুদ্ধে অনাস্থা। এই সব অঞ্চলের অন্তত ২০% মুসলমান বিজেপিকে ভোট দিয়েছিল, নতুবা ভোটটা বিজেপিকে দিয়েছিলো কে?

তৃণমূলও বিজেপির ওই চূড়ান্ত হিন্দুত্ববাদী হাওয়াতে ৪৩-৪৪% ভোট ধরে রেখে দিয়েছে মূলত মুসলমান ও সেকুলার ভোটের উপরে ভর করেই, যারা এক সময় বামেদের খাস ছিল। বামেদের আর হারাবার কিছু নেই, এখন সামনে সবটাই প্রাপ্তিযোগ- যদি সদিচ্ছা থাকে। গ্রহণযোগ্য নতুন মুখকে সুযোগ দিলে বামেরা যে জমি ফেরাতে পারবে না এমনটা মোটেও নয়। ওদিকে অধীর চৌধুরীর নের্তৃত্বে কংগ্রেস কিছুটা হলেও সোমেন মিত্র বা প্রদীপ ভট্টাচার্যের আমলের চেয়ে যে চাঙ্গা হবে সেটাও সহজে অনুমেয়, আর যাই হোক অধীর অন্তত বিকিয়ে যাবেনা এই বিশ্বাস মানুষের আছে।

রাজ্যের CPIM তথা রাজ্য বাম নের্তৃত্ব এখনও ২০১১ এর হারের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সিপিএমই মূল দল, বাকিদের অবস্থা ততোধিক খারাপ।
সিপিএমের বুদ্ধদেববাবু আনুষ্ঠানিক ভাবে অবসর ঘোষণা করেছিলেন, বাকিরা ‘না তাড়াইলে যাব না’ মোডে রয়ে গেছেন পদ আঁকড়ে। দলে কিছু যুবকেরা যারা উঠে এসেছে স্বচেষ্টায়, তাদের চেষ্টার খামতি নেই স্বল্প পরিসরে, কিন্তু পার্টির প্রতিটি উচ্চপদে সেই মুখগুলোই রয়ে গেছে যাদের নের্তৃত্বে বামেরা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল।

শেষ ১০ বছর যাবৎ এই বৃদ্ধতন্ত্রেরই কঠোর অনুশীলনে ক্রমক্ষয়ে প্রান্তিক শক্তিতে এসে দাঁড়িয়েছে রাজ্য বামশক্তি। এই মুখগুলো যতদিন থাকবে ততদিন বামেদের ভাল হওয়ার জো নেই, এই বোধটা আসতেই হবে বাম সমর্থকদের মাঝে; তাতে যে যা খুশি যুক্তি দিক। খোদ মমতা ব্যানার্জীও চায় এই অথর্বেরাই থাকুক, তাতে তার পক্ষে সুবিধাজনক ক্ষমতায় টিকে থাকা। তথ্য বলছে, বামেদের নের্তৃত্বের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপনের জন্যই ১০% শক্তির বিজেপিকে রাতারাতি ৪০% তে পৌঁছে দিয়েছিল বামেদের পক্ষে থাকা ১৯% জনগণ, এদের অনুসরণ করেছিল কংগ্রেসের ৮% ভোটার।

বঙ্গ বামেরা আজও নভেম্বর বিপ্লব নিয়েই নভেম্বরের প্রথম দুটো সপ্তাহ ব্যস্ত ছিল। পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে USSR বললে যে শব্দের মানে ৯৯% মানুষ বুঝতেই পারবে ‘কিসের’ কথা বলছে। সেই ‘নেই রাষ্ট্রের’ প্রয়াত রাষ্ট্রপ্রধান যিনি পার্টি ক্লাসে নব্য কমরেডদের জন্য মূল্য রাখলেও, উনি আজকের সাম্প্রদায়িক শক্তির শাসানিযুক্ত বাংলা তথা ভারতের জনসমাজে কতটা যুক্তিযুক্ত- সেটা উপলব্ধি করতে শেখেনি। তাই আজও আসমানি পোলাও রেঁধে চলে কমরেডদের অধিকাংশ জন, অতএব লেনিন নামের ঘি ঢালতে কার্পণ্যের প্রশ্নই থাকে না। যোগ্য নের্তৃত্বের অভাবে ভোগা একটা দলে এমন পথভ্রষ্টতা অত্যন্ত সাধারণ বিষয়, আর লাগাতার এমন ‘কৃষ্টির চর্চা’ করার ফলস্বরূপ দিনে দিনে নিজেদের ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছে তথাকথিত খেটেখাওয়া মানুষের কাছে।

আজকের বদলে যাওয়া ডিজিটাল পৃথিবীর একটা ক্ষুদ্র গন্ডীর মাঝেই নিজেদের বেঁধে নিয়েছে কমরেডদের ‘অধিকাংশ’ বাহিনী। এই গন্ডীতে নিজেরাই একে অন্যের পিঠ চুলকায়, গা শোঁকাশুঁকি করে, পিঠ চাপড়ে দেয়, যে পৃথিবীতে তারা ভিন্ন আর অন্য কেউ নেই।

এমনিতেই মেইনস্ট্রিম ভারতীয় মিডিয়া বামেদের পক্ষে কোনো গঠনমূলক সমালোচনা করেনা, যেখানে বামেদের নেতা-কর্মীরা আয়নায় নিজেদের মুখ দেখতে পাবে।
বামমনস্ক কেউ বামেদের সমালোচনা করলেই বামাতি আঁতেল গোষ্ঠী (পড়ুন ভক্ত) তাকে সর্বপ্রথমেই ‘স্বল্পজ্ঞানী’, ‘নির্বোধ’, ‘নিরক্ষর’ ও বামাদর্শ থেকে বিচ্যুত মনে করে ও করায়। সমালোচক যদি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বিশ্বাস রাখে, তাকে এরা সরাসরি বিরোধী শত্রু ভাবে। অতিবাম হলে তাকে শ্রেনিশত্রু বলে দায়িয়ে দেয়। আসলে সেই পিঠ চুলকানোর গল্প; সবাই বলতে চায়, কেউ শুনতে চায়না।

বস্তুত নিজেদের আয়নায় দেখতে এরা ভয় পায়, আসলে ময়দানে লড়াই না করেই তো নেতা হয়ে গেছে ‘কোটা’ সিস্টেমে, আতরের গন্ধ যাবে কীভাবে! কেউ মানুক বা না মানুক তাতে সত্য বা বাস্তব পরিস্থিতি বদলাবে না। বহু বাম সমর্থকের এই প্যারাগ্রাফ পড়ে আমাকে গালি দিতে পারেন, আসলে ভক্ত তো তারাই যারা বাস্তব ও তথ্য না বুঝে শেখানো কাগুজে বুলি আওড়ে যায় অন্ধবিশ্বাসে, আর বামেদের মাঝে কিছু শতাংশ ভক্ত নেই এমনটা দাবী পলিটব্যুরোও করে না।

...ক্রমশ

রবিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২০

হায়দ্রাবাদ, মিম ও বাস্তবতা



হায়দ্রাবাদ পুরসভার ফলাফল বলছে সেখানে মিম কনটেষ্ট করা ৫১টার মধ্যে ৪৪টা জিতেছে, কিন্তু বিজেপি ৪৮টা আসনে জিতেছে চন্দ্রশেখর রাও এর TRS কে ধরাশায়ী করে। মিম ও কংগ্রেস যে যেখানে ছিল সেখানেই আছে TRS এর ৪৪টা এবার বিজেপির ঝুলতে চলে গেছে।

অঙ্কটা সোজা, এই চন্দ্রশেখর রাও, চন্দ্রবাবু নাইডু, প্রফুল্ল মোহান্ত, সুখবীর সিং বাদল, মেহবুবা মুফতি, নবীন পট্টনায়ক, জয়ললিতা, নীতিশ কুমার, মমতা ব্যানার্জী, এরা সবকটা সংখ্যালঘু মুসলমান প্রেমীর ভেকধরা RSS এর দালাল, যারা বিজেপির ভূমি তৈরি করেছিল নিজ নিজ রাজ্যে সঙ্ঘের সংগঠন ব্যবহার করে।

কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে থাকতে ভুলেই গেছিল যে RSS এর নিজস্ব রাজনৈতিক দলের নাম BJP, সুতরাং জো ধরা জমিতে দালালদের কাজ কি, তাই হায়দ্রাবাদ পুরসভায় দালাল TRS কে খেয়ে নিয়েছে সঙ্ঘ, ফুটেছে পদ্ম। কাল তৃণমূলেরও এই দশাই হবে এটাকে আগাম অনুধাবন করে মমতা ব্যানার্জী কিছু তৃণমূলপন্থী মুসলমান ভক্তকে বাজারে ছেড়ে রেখে ‘BJP খারাপ তৃনমূল ভালো’র সাথে ‘মিম সাম্প্রদায়িক’ বলে উদোম চেঁচাচ্ছে।

মিম নিশ্চিত সাম্প্রদায়িক এতে কারো সন্দেহ নেই, কিন্তু তৃণমূল যে ২১ বছর ধরে বিজেপিকে লালন করে গেল কখনও মন্ত্রীসভায় থেকে কখনও RSS এর দালাল হিসাবে, সে কি তাহলে? আসলে পাব্লিক জেনে গেছে ‘বিজেমূল’ জুটি আসলে RSS এর গোয়ালে এক গোঁজেই বাঁধা। মিম অন্তত RSS এর দালাল গুলোর মতো মেকি সেকুলার পোশাক পরে নেই; স্বভাবতই, মিম এরাজ্যে জন্মাবার আগেই তৃণমুলীদের রাত্রের ঘুম হারাম করে রেখেছে TRS এর দশা হবার ভয়

শনিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২০

কবে খুলবে ইস্কুল?



আসলে সরকারি অবরোধ আজকাল অত্যন্ত সহজ হয়ে গেছে। কয়েকজন মুর্খ মিলে শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে প্রায় লাটে তোলার যোগাড় করে দিয়েছে, যাদের আমরাই ক্ষমতায় বসিয়েছি। চোরাবালির ফাঁদে আঁটকা পড়ে গেছি আমরা, প্রতিটা মুহূর্তে একটু একটু করে ডুবে যাওয়াই নিয়তি।


এ অবস্থায় একে অন্যের হাত ধরাধরি করে না চললে আমাদের আগামী বলে আদৌ কিছু থাকবে না। সুতরাং সত্যজিতের কথা ধার করে বলাই যায়-

“না না না না
আর বিলম্ব নয়
আর বিলম্ব নয়
আর বিলম্ব না না
আর বিলম্ব নয়
এখনো মোদের শরীরে রক্ত
রয়েছে গরম, মেটেনি শখ তো
আছে যতো হাড় সবই তো শক্ত
এখনো ধকল সয়
এখনো আছে সময়
এখনো আছে সময়
আর বিলম্ব নয়
আর বিলম্ব না না
আর বিলম্ব নয়”

বাস্তব বলছে- ট্রাম্প হেরে যেতেই করোনা গায়েব, শুধু ভ্যাক্সিনের কারবারিরা জিইয়ে রেখেছে করোনা ভীতি। দেশের সমস্ত কিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছে। বাজার-হাট, শপিং মল, যানবাহন, সিনেমা হল, ধর্মস্থান, কীর্তন-জলসা, মদের ঠেক, রাজনৈতিক মিটিং-মিছিল, পিকনিক, ভ্রমণ, ক্রিকেট-ফুটবল সব হচ্ছে; সরকারি-বেসরকারি কর্মচারীরা অফিস যাচ্ছে ভিড় ঠেলে, ব্যবসায়ী সফর করছে, কৃষকেরা আন্দোলন করছে, সরকার দমন করছে, আম্বানি-আদানি দেশ কিনছে, তারা রোজ গুণিতক হারে ধনী হচ্ছে, আলু-পেঁয়াজ-সরষের তেল সহ নিত্য পণ্যের দাম আকাশ ছুঁচ্ছে, দেশ বিদেশে আমদানি-রপ্তানি হচ্ছে, সর্বত্র চুটিয়ে বিকিকিনি আনাজ হোক বা MLA, চাষীরা কাজ করছে শস্য হোক বা ঘৃণা, অটোওয়ালা ৬ জন প্যাসেঞ্জার তুলছে, পুলিস ঘুষ খাচ্ছে, থিকথিকে ভিড় বাসের খালাসি গেটের মুখ থেকে ঝুলে ঝুলে চেঁচিয়ে যাচ্ছে ‘ভিতরে ফাঁকা সেখানে যান’, সেনারা যুদ্ধ করছে সীমান্তে, উকিল দিন গুণছে, ডাক্তার ছুরিতে শান দিচ্ছে; সবই হচ্ছে গতানুগতিক ধারায় সাবলীলভাবে- শুধু ইস্কুল খোলা যাবে না।

- “ওরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে” এবং “জানার কোনো শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই”

পাঠশালা কখনই শাসকের পক্ষে সুখকর নয়, তা কল্পিত হীরক রাজ্য হোক বা বাস্তবের ভারতভূম- এ সত্য আবার প্রমাণিত। বিশ্বে অধিকাংশ দেশে স্কুলিং চালু হয়ে গেছে আর ৪-৫ মাস হতে চলল। আমাদের পড়শি দেশ সহ অনেক দেশ আছে যাদের ইস্কুল-কলেজ বন্ধই ছিল না, তারাও আমাদের মতো এমন জনবহুল রাষ্ট্র, সেখানে শিশু মড়ক লেগে গেছে? প্রতিটি উন্নত দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে, খোদ আমেরিকাতেও চালু।

তবে কোনো কোনো শিক্ষিত রাষ্ট্রপ্রধান আছে, যারা বলতে পারে-
“We cannot and will not allow our children and young people’s futures to be another victim of this disease,”
- Irish prime minister ‘Micheál Martin’

তাই এভাবে আমাদের বাচ্চাদের ইস্কুল বন্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন নাগরিক সমাজ। আজকের সরকার কাল চলে যাবে, ক্ষমতাবানেরা তাদের সময় চুটিয়ে উপভোগ করে নিয়ে তারাও হারিয়ে যাবে, মাঝখান থেকে আমার আপনার ঘরের বাচ্চাটি পড়াশোনার অভ্যাসটাই ভুলে যাবে বা গেছে। নতুন করতে আবার অভ্যাস করতে অনেকের গোটা বছর লেগে যেতে পারে, আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান গবেষকের দলের দাবী এটা। কত বাচ্চা যে ইস্কুলে ফিরবে না তার কোনো হিসেব-নিকেশ আছে আমাদের সরকারের কাছে? অর্থনৈতিক মন্দায় তারা বাধ্য হয়ে শিশুশ্রমিক হয়ে পেটের ধান্দায় লেগে পড়েছে। সুতরাং সকল খারাপ ফলাফল বাচ্চাটিকেই ভুগতে হচ্ছে ও হবে।

আমাদের সরকার ও বিরোধী দলগুলো ধর্ম, হিন্দু-মুসলমান, ভোট আর ক্ষমতা দখলের বাইরে কোনো অ্যাজেন্ডা রাখেনি তা কেন্দ্র হোক বা রাজ্যগুলো। মিডিয়াও হিন্দু-মুসলমান, পাকিস্তান, ক্রিকেট, আর সেলিব্রিটিদের কেচ্ছা-কাহিনীর বাইরে বেরোবে না বলে ঘোষিত পণ করে রয়েছে। এ অবস্থায় আমি আপনি ছাড়া কেউ বলবে না, কারণ আমার আপনার সন্তান মূর্খ থাকলে মিডিয়া বা নেতাদের কিচ্ছু যায় আসে না। নেতার কাছে শিক্ষিতর ভোটের মূল্য অশিক্ষিতের সমানই। মিডিয়া বোঝে বাজারে ‘কী খাবে’, এর সাথে শিক্ষার সংযোগ নেই।

অতএব, নিজের জন্য আওয়াজ তুলুন, এখনই।

করোনার ভয় আর সেভাবে পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। ভ্যাক্সিনের কারবারিদের ভয়ের আবহ জিইয়ে রেখে ভ্যাক্সিন বেচে মুনাফা কামাবার স্বপ্নে জল পড়ে গেছে আপাতত। ‘অক্সফোর্ড-সিরাম-গেটস’ গোষ্ঠী এখন সরাসরি মূর্খ সরকারকে টার্গেট করেছে বিনিয়োগ তুলতে। ১০০ কোটি মানুষকে টার্গেট করে ভ্যাক্সিন বিক্রির চেয়ে ডাইরেক্ট সরকারকে বেচলে একলপ্তে মুনাফা কামানো অনেক সহজ। এতে নেতাদেরও ইন্টারেস্ট আছে, তাদের পার্টি তহবিল ফুলে ওঠার পাশাপাশি অনেকের বালবাচ্চা-ভাইপো-ভাগ্নেরা কয়েক প্রজন্ম বসে খাবে কাটমানির দয়ায়। তাই ভ্যাক্সিন বাজারে এলে আপনাকে সরকারই দিয়ে দেবে, তার স্বার্থ আছে সেখানে।

এরপর লোকাল ট্রেনে দাদ-হাজার মলমের সাথে করোনা ভ্যাক্সিন ফেরি করতে দেখলেও দেখতে পারেন। খুচরো না থাকলে আজকাল শপিং মলে লজেন্স টফি দেয়- কাল হয়ত এক ড্রপ করোনার ভ্যাক্সিন দেবে খুচরোর পরিবর্তে।

আপনার বাঁচামরা আপনার দায়, আপনার শিশুর ভবিষ্যৎ আপনার দায়। করোনা আপাতত গেলেও ভ্যাক্সিনের পিছনে টাকা লাগানো পুঁজিবাদী হাঙরেরা যাবে না, তাদের অতৃপ্ত আত্মা আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখে মহামারীর গুজব ছড়াবে। তারা আবার ২০২১ এর শীতে করোনা জুজু ফিরিয়ে আনবে। কদ্দিন সন্তানকে ঘরে বসিয়ে রাখবেন?

দুটো সমান উচ্চতার লাঠিকে কীভাবে অন্যটির চেয়ে একটিকে বড় করবেন? সোজা হিসাব- একটিকে ভেঙে ছোট করে। আপনার সন্তান শিক্ষায় পিছিয়ে গেলে কিম্বা শিক্ষা ছুট হয়ে গেলে প্রতিযোগী দেশগুলোর লাভ। আমাদের অশিক্ষিত, গাম্বাট, মূর্খ ও মিথ্যুক রাজেনেতাগুলোর এটা বোঝার ক্ষমতা নেই, তারা ক্ষমতা দখলের রাজনীতি করতেই ব্যস্ত। সুতরাং, মহামারী আসার হলে সে আপনাকে ঠিক খুঁজে নেবে, বাঙ্কারের নিচেও। এক্ষেত্রে ভাইরাস আমাদের বাচ্চাদের ক্ষতি করুক বা না করুক- অশিক্ষা মহামারী হবে এভাবে চললে, তার থেকে কোন ভ্যাক্সিন বাঁচাবে?

কল্পনার হীরক রাজ্যে তবু একটা উদয়ন পন্ডিত ছিল, এই বধিরের রাজ্যে কেউ কি পন্ডিত বেঁচে নেই যিনি চেঁচিয়ে সত্য বলতে ভয় পান না? নাকি উদয়ন পন্ডিতেরই মগজধোলাই হয়ে গেছে? জানি উত্তর দেওয়ার কেউ নেই, গুন্তিতে অগুন্তি ‘Teacher’ থাকলেও তারা সিংহভাগই মেরুদন্ডহীন। কিছুজনের মুখে বুলি আছে, অবশ্য তারা ভোটের ডিউটিতে যাব না আর প্রাপ্য DA চাই আন্দোলনে ভীষণ ব্যস্ত। ইস্কুল খোলার বিষয়ে কেউ নেই, অথচ ফেসবুকে শয়ে শয়ে ‘টিচার গ্রুপ’, DA, মিউচুয়াল ট্রান্সফার, মজলিশি আড্ডা, গেট্টু প্রোগ্রাম আর শখের কাব্যচর্চার বাইরে সময় কোথায় বাকি কিছু নিয়ে ভাবার?

স্যার/ম্যাডাম আপনাকে বলি, আপনারা তো শিক্ষক, পথপ্রদর্শক। দেশের আগামী প্রজন্মকে আপনারাই তো শেখাবেন- আসুন না, আরেকবার এগিয়ে আসুন। বলুন না চেঁচিয়ে সকলকে, কোনটা সত্য কোনটা মিথ্য। দেশ-বিদেশের তত্ত্ব, তথ্য, প্রবন্ধ, প্রতিবেদন, রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, চিকিৎসা বিজ্ঞান, WHO ইত্যাদি বিষয়গুলো সম্বন্ধে তো পড়ছেন, শুনছেন, জানছেন- কতকগুলো উন্মাদের কান্ডকারখানার বাইরে অন্য কিছু মনে হয়েছে তাদের দেখে?

দুর্ভাগ্যক্রমে যদি না পড়ার সৌভাগ্য হয়ে থাকে তাহলে নিচে ইউনিসেফ সহ বেশ কিছু লিঙ্ক দিলাম, দয়া করে পড়ে নিন। খোদ ইউনিসেফ বলছে বাচ্চাদের ইস্কুলে পাঠান স্বাস্থ্যবিধি মেনে, পড়ুন সেটা। কত মেয়েবাচ্চা আর ইস্কুলে ফিরবে না সেই প্রতিবেদন পড়ুন, কেমব্রিজের গবেষকের থিসিস পড়ুন। জানুন- ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা, কানাডা, পূর্ব ও পশ্চিম এশিয়া কোথাও আর ইস্কুল বন্ধ নেই। অনলাইনে শিক্ষা ব্যবস্থা হবে না আমাদের মতো গরিবের দেশে। প্লিজ বলবেন না আবার- “ইংরাজিটা আমার ঠিক আসে না…”। ছেড়ে দিন, এক আধটা বাংলাও দিলাম ‘ট্যাঁকের জোরে’ যারা চাকরি পেয়েছেন তাদের জন্য।

পড়ার পরে বলুন- কেন এখনও আপনারা চুপ রয়েছেন?

আপনাদের যদি ভাল আর মন্দের বোধ না জন্মায় কীসের শিক্ষক আপনারা? ছাত্রদের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকুক বা না থাকুক আপনার নিজের কর্মের প্রতি দায়বদ্ধতা দেখিয়ে এখনই প্রতিবাদের সাহস না পেলে আপনাদের সাথে পুরসভার সাফাই কর্মচারি ভাই-দিদিটির পার্থক্য কী? দুজনেই পেটের দায়ে চাকরি করেন, এটাই মিল। পৃথিবীতে কোন সরকারি-বেসরকারি কর্মচারি গোষ্ঠী আজকের দিনে ঘরে বসে আছে বা নাম কা ওয়াস্তে এক আধাদিন ‘ঘরেই তো বসে আছি, যাই একটু ঘুরে আসি’ মনোভাবে হাওয়া বদল করে আসেন একঘেঁয়েমি কাটাতে।

সামাজিক স্খলন, সরকারি কর্মকর্তা সহ রাজনেতাদের দুর্নীতি বিষয়ে আপনাদের সমাজের মুখে কুলুপ কয়েক দশকের ঐতিহ্য, তাই ওই বিষয়ে আপনাদের থেকে কেউ কিছু আশা করে না। কিন্তু DA নিয়ে আন্দোলনের পাশাপাশি ইস্কুল খোলা নিয়েও দু'চার কথা বলুন, ওটাই তো আপনার কর্মস্থল স্যার/ম্যাডাম।

সরকার বদলালে DA পাবেন, হয়ত বা এই সরকারই দেবে তা আদালতের রায়ে- কিন্তু দীর্ঘদিন কিন্তু বসে মাইনের সুখ থাকবে না স্যার-ম্যাডাম। যারা DA দেয় না, দীর্ঘদিন চাকরি দেয় না- তারা যে চাকরি খেয়ে নেবে না তার গ্যারান্টি কে দিয়েছে আপনাকে? সেদিন আপনিও প্রতিবাদ করতে চাইবেন, চিৎকার করবেন যন্ত্রণায়- কেউ শুনবে না সেদিন।

তাই সময় থাকতে শুভবুদ্ধি জাগ্রত করুন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলুন- আমি শিক্ষক। আমিই তো শেখাব ভাল ও মন্দের ফারাক। দেখবেন অনেক ফুরফুরে লাগছে। আর বসে মাইনে পাওয়ার সুখে ‘ঝামেলা এড়িয়ে’ যদি শীতে পিকনিকের প্ল্যান করেন কাজ নেই বলে- জানবেন ইতিহাসের থাপ্পড় কিন্তু নির্মম।

আমরা আজও স্বপ্ন দেখি, কোনো এক উদয়ন পন্ডিত এখনই বলে উঠবে – “দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খানখান”। রাজা খানখান না হোক, তার পাঠশালা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত খানখান হয়ে আবার শ্রেণীকক্ষগুলো ভরে উঠুক কচিকাঁচা ফুলে, শিক্ষার মধু আহরণে। শিক্ষকেরা আবার গড়ে তুলুক জাতিকে, যে জাতির মাঝে মেরুদন্ড থাকবে, শতসহস্র উদয়ন পন্ডিতে ছেয়ে যাক সমাজ।

পুনশ্চঃ- আমার কথা তেতো লাগলে আমাকে মার্জনা করার দরকার নেই, আমি অসভ্যই রইলাম। ‘আমি ও আপনি’ আমরা কেউ কারো প্রত্যাশী নই- তাই আমাকে নিয়ে নাই বা ভাবলেন। বরং, আপনারা আপনাদের কর্মস্থল বা আপনার শিশুর শিক্ষাস্থল খুলিয়ে পঠন-পাঠন চালুর জন্য আন্দোলনটা করুন। হওয়া না হওয়া সরকারের হাতে, কিন্তু নিজেরা নিজেদের কাছে সৎ থাকুন, যেমন আমি আমার কাছে রইলাম এই লেখাটা লিখে।

ধন্যবাদ।

১) https://www.nytimes.com/.../europes-locked-down-but...
২) https://indianexpress.com/.../coronavirus-lockdown-back.../
৩) https://www.firstpost.com/.../schools-reopen-after...
৪) https://www.newindianexpress.com/.../no-plan-to-close...
৫) https://www.washingtonpost.com/.../9047be8c-a645-11ea...
৬) https://www.timesofisrael.com/school-is-back-in-session.../
৭) https://www.unicef.org/.../supporting-your-children...
৮) https://www.devex.com/.../many-girls-won-t-go-back-to...
৯) https://www.cambridge.org/.../back-to-school-specific.../
১০) https://bengali.indianexpress.com/.../coronavirus.../
১১) https://www.prothomalo.com/.../%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6... 

 #standwithstudents

#Reopen_school_college
#হককথন

ফেসবুকীয় সিপিএমঃ ফিউজড আইনগাইডেড কামিকাজে ড্রোন

  ফেসবুকের ‘সিপিএম’ নামক এই চুড়ান্ত আঁতেল ও প্রায় সর্বজ্ঞ গোষ্ঠীটার পূর্ণ বোধোদয় বা পূর্ণ বিনাশ না ঘটা অবধি রাজ্যের বাম নেতৃত্বের খুব বেশী ...