শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬

SIR- হেয়ারিং এর আতঙ্ক



(১)

 

জাতীয় ডিম্ভাত দিবস ১৯৯৩ সালের ২১শে জুলাই এর জমায়েত কী উদ্দেশ্যে হয়েছিলো জানেন? তোলামূলের রাজ্যে না জানাটাই আপনার অধিকার। ভোটার তালিকা সংশোধন ও ভোটার কার্ডকে ভোটিং এর জন্য একমাত্র পরিচয়পত্র করতে হবে- এই দাবিতে কোলকাতার রাজপথে মান্নীয়ার নেতৃত্বে সেই গুন্ডামি মারদাঙ্গা হয়েছিল। যা আজকের ভাষায় SIR এর পূর্বপুরুষ, ২১শে জুলাই সেই দাবিতেই হয়েছিলো। সেখানে ১৩ জনের লাশ পাওয়া গিয়েছিলো লাভ হিসাবে, যা তোলামূল সুপ্রিমোর রাজনীতির জমি তৈরি করেছিলো। শহীদ দিবসের চাহিদা ছিলো এই SIR.।

২০০৫ সালে সংসদে উনি বলেছিলেন- “বাংলায় অনুপ্রবেশ এখন এক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে, আমার কাছে বাংলাদেশি এবং ভারতীয় উভয়ের ভোটার তালিকা আছে। এটি খুবই গুরুতর বিষয়। আমি জানতে চাই কখন সংসদে এটি নিয়ে আলোচনা হবে?” স্পিকার সোমনাথ চ্যাটার্জি যখন প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন, তখন তৎকালীন অগ্নিকন্যা- পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে, ডেপুটি স্পিকার চরণজিৎ সিং আটওয়ালের দিকে কাগজপত্রের একটি গুচ্ছ ছুঁড়ে মারেন এবং তার আসন থেকে পদত্যাগ করার চেষ্টা করেন। দেশে SIR বা NRC এর লাগু পক্ষে সংসদে বিদ্রোহ করা ব্যাক্তিটির নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

ইতিহাস শেষ।


এবার আজকের বাস্তবে ফিরি চলুন। SIR নিয়ে বাজারে একটাই দাবী- AI দিয়ে নাকি নির্যাতন কমিশন শয়তানিটা করছে। চলুন দুটো দ্রুত দুটো ইতিহাস দেখে নিয়ে আলোচনাটা শুরু করি।

হক কথা সন্দেহ নেই, অবশ্যই নির্যাতন কমিশন হারামি; কিন্তু সেই বৃহত্তর হারামির ছায়াতলে খুচরো হারামি গুলো, যারা গোপনাঙ্গের লোমফোঁড়ার মত আমাদের জীবন অতিষ্ট করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত, তাদেরকে কেন অদেখা বা উপেক্ষা করে যাচ্ছেন! নির্যাতন কমিশন দিল্লিতে বসে চারটে অবাঙালি গুজ্জু অফিসার দিয়ে কলকাঠি নেড়ে আমার বা আমার বাপের নামের বানান ভুল করেনি, না আমার বা আমার বাপের ৬টা সন্তান তারা বানিয়ে দিয়েছে! তাহলে এগুলো কে বা কারা করেছে নির্যাতন কমিশনের পক্ষে?

সোজা উত্তর, সাদা খাতা জমা দেওয়া ৩২ হাাজার সেই প্রাইমারি শিক্ষক রূপী তোলামূলের ক্যাডার বাহিনী- যারা BLO ছিলো, এদের যোগ্য সঙ্গত দিয়েছে ডেটা এন্ট্রি অপারেটরেরা, যারা সারা বছর তোলামূল সরকারের পে-রোলে পঞ্চায়েত লেভেলে নানা সরকারী কাজের সাথে যুক্ত। সমস্যা হলো, এই অবধি শোনার পরেই আমার মা মাসি তুলে খিস্তি করবেন আপনি, ছুপা চাড্ডি স্পটেড কিম্বা রামরেড বলাটাই দস্তুর; কারন আপনাকে যে ন্যারেটিভ জানানো হয়েছিলো, কিম্বা সোশ্যাল মিডিয়া সহ নানান সংবাদমাধ্যম দেখে যে ন্যারেটিভ আপনার ভাবনাতে তৈরি হয়ে রয়েছে, তার সাথে খাপ খাচ্ছেনা আমার ভাবনা। তা সে আপনি আপনি গালি খিস্তি করতেই পারেন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বাধীন নাগরিক হিসাবে, তাতে আপনিও যে বিশ্লেষণের বাইরে গিয়ে একজন উৎকৃষ্ট ভক্ত, সেটাও প্রমাণ হয়ে যায়। চলুন দেখে নিন, এই আতঙ্ক কেন ও কারা কীভাবে তৈরি করেছে!

রাজ্যের পশুপালন মন্ত্রী ‘যাত্রাপালা’ দেবনাথ মহাশয় SIR সহায়তা কেন্দ্রের সামনে নিজের বীরত্ব দেখাতে গিয়ে একটা বাচ্চা ছেলের হাত থেকে মাইক কেড়ে নিয়েছেন খবরে প্রকাশ। জেল ফেরত আসামী ‘গরুচোর’ অনুব্রতকে চোর বলাতে দৌড়ে গিয়ে মাইক কেড়ে নিয়েছে, যেটা আসলে ওনার ব্যক্তিগত হতাশার বহিঃপ্রকাশ। যেই মাত্র শুনেছেন ২০২৬ সালে ভাইপো তাকে টিকিট দেবেনা, সেই মুহুর্তে এমন কিছু একটা করতে চেয়েছেন, যাতে তিনি খবরের শিরোনামে ফিরে আসেন। এভাবেই এরা খবরে থাকে, আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করে।

যে সুস্থ আছে তাকে ভয় দেখাও, যে ভয়ে আছে তাকে আতঙ্কিত করো, যে আতঙ্কে আছে তাকে চরম পথ বেছে নেওয়ার জন্য উত্তেজিত করো। লাশের রাজনীতি করা শকুনের দল অধীর আগ্রহে ‘একটি লাশের জন্য’ হা-পিত্যেস করে বসে রয়েছে। ২১শে জুলাই গুলি খাওয়া লাশের রাশি, রিজওয়ানুরের লাশ থেকে তাপসী মালিকের লাশ হয়ে, নন্দীগ্রামের অগণিত লাশ- মান্নিয়ার ক্ষমতা দখলের সিঁড়িই হলো লাশ। দুর্গন্ধ বাজার, হাগো বাংলা, মর্তমান কিম্বা সংবাদ অতিদীন খুললেই এখন SIR এর কারনে আতঙ্কে মৃত্যুর কলামে গোটা কাগজ ভর্তি, তা অনলাইন হোক বা অফলাইন। প্রতিটা ঘটনার নেপথ্যে একটা মোটিভ থাকে, আর এটা যখন রাজনীতির ময়দান, সেখানে লাভ ক্ষতির হিসাব থাকবেই। সুতরাং, এখানে আপনি আমি ভয় পেলে লাভ কার?

আমাকে নিজেকেও ডাকা হয়েছিলো কমিশনের তরফে, আধার কার্ডের সাথে ভোটার কার্ডে থাকা নামে মিস ম্যাচ। পাশাপাশি আমার বাবার নাকি আমি বাদেও একাধিক পুত্র সন্তান রয়েছে। দুটো অপশন ছিলো, আমি মুসলমান বলেই দিল্লির বিজেপি সরকার আর নির্যাতন কমিশন মিলে আমার বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্র করেছে; সুতরাং সবার আগে সোস্যাল মিডিয়া গরম করে তবে হেয়ারিং এর লাইনে দাঁড়ানো, দ্বিতীয়ত চুপচাপ লাইনে দাঁড়ানো ও সমস্যার শিকড় খোঁজা। আমি দ্বিতীয়টা করেছিলাম, কারন আমি জানি আমাদের এই বুথ লেভেলের নাম তোলার কাজটা দিল্লি থেকে এসে কেউ করেনি, বিজেপির পার্টি অফিস থেকেও কেউ করেনি; এটা আমার BLO কিম্বা ডেটা এন্ট্রি যারা করেছে- তাদের কারো কীর্তি। সুতরাং এই পরিস্থিতিতে ‘ইশ বিষ ধানের শিষ’ পদ্ধতিতে আমার পিতার ৬ সন্তানের যে কাউকে বাদ দিতে গেলে, আমার বাদ চলে যাওয়ার সম্ভাবনাও ছিলো। আবার মোটেই কাউকে বাদ না দিলে, বা আমি রয়ে গেলাম পরিচিত মুখ হওয়ার কারনে, পাশাপাশি অন্য ভুয়ো ৫ জনের ১ জনেরও নাম যদি রয়ে যায়, পরের মাসেই আমার বাড়ি সম্পত্তির দখল নিতে চলে আসবে সে। উভয় সঙ্কটের কারনে আমি গিয়ে যা বুঝলাম, মূলত বানান ভুল এবং ইচ্ছাকৃত ভাবে আমার বাবার সাথে অন্য কোনো অসাধু ব্যাক্তি প্রজনি ম্যাপিং করার কারনে মানুষের এই হয়রানি।

এই নামের ভুলটা কে করেছে? AI? AI নিজে থেকে নাম গুলো তুলেছিলো? নাকি BLO/ডেটা এন্ট্রি অপারেটরেরা নাম তুলেছিলো? AI ভুল ধরছে, সেটা মানুষের করা ভুল। যখন বাড়ি বাড়ি গিয়ে SIR এর প্রাথমিক প্রক্রিয়া চলছিলো, তখন BLO রা অসুস্থ হয়ে পরছিলো, তাদের উপরে অমানুষিক চাপ ইত্যাদি বলে একটা ভয়ানক প্রোপ্যাগান্ডা চালিয়ে- শুধু মাত্র মৃত আর স্থায়ী ভাবে স্থানান্তারিত বাদে প্রতিটা নাম ড্রাফট লিষ্টে তুলে দেওয়া হয়েছিলো। সেখানে, যে যার সাথে খুশি প্রজনি ম্যাপিং করেছিলো, খুব অল্প সংখ্যক আবার ম্যাপিং অংশটা ‘ব্ল্যাঙ্ক’ রেখেই নাম তুলে দিয়েছিলো। বামেরা সহ কোনো রাজনৈতিক দল চায়নি- এ রাজ্যে কোনো অবৈধ ‘হিন্দু’ নাম বাদ যাক। এটা ছিলো একটা অলিখিত মেমোরান্ডাম যা প্রতিটা রাজনৈতিক দলের মধ্যে কাজ করেছে। ফলে শুরুতেই যে স্ক্রুটিনি হওয়ার ছিলো, সেটা হয়নি। তার জন্য আজকে এসে এই হয়রানি।

পশ্চিমবাংলা ছাড়া আরো ১১টা রাজ্যে একই SIR প্রক্রিয়া চলছে, উত্তরপ্রদেশে সবচেয়ে বেশী নাম বাদ গেছে- কারন অবৈধ নেপালি ও দ্বিতীয়ত পরিযায়ী শ্রমিক। সেখানে এত গেল গেল রব নেই, তামিলনাড়ু, গুজরাত, রাজস্থান সর্বত্র বাংলার চেয়ে বেশী হারে নাম বাদ গেছে একদম প্রাথমিক পর্যায়েই। অথচ পশ্চিমবাংলাতে বাংলাদেশী, নেপালি, ভুটানি, কামতাপুরি, রাজবংশী অনুপ্রবেশ সমস্যা রয়েছে। এছাড়াও কলকাতা ভারতের রাজধানী থাকার সুবাদে, এক সময় উন্নত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সুবিধা নেওয়ার জন্য- আসাম, উড়িষ্যা, আজকের ঝাড়খন্ড, বিহার, পূর্ব উত্তর প্রদেশ সমেত স্বাধীন ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের লোক এসে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অংশে ঘাঁটি গেড়েছিলো, যাদের পিতৃপুরুষের গ্রামের সাথে সংযোগটা একেবারে ছিন্ন হয়ে যায়নিতবুও বাকি সকল রাজ্যের নিরিখে শতাংশের বিচারে প্রথমিক পর্যায়ে সবচেয়ে কম নাম বাদ গেছে। এ রাজ্যের প্রতিটা রাজনৈতিক দল মিলে ভোটের রাজনীতির দিকে তাকিয়ে একটা নামও বাদ দিতে নারাজ, কারন যেন-তেন ভাবে তার পরিবারের ভোটটা যেন আমরা পায়- এই দেউলিয়া রাজনীতি চলছে।

ভয়টা কে দেখাচ্ছে? দেখাচ্ছে তোলামুল কংগ্রেস। শুরু থেকেই তারা এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটাকে রাজনৈতিক এ্যাজেন্ডা বানিয়ে নিয়েছে। তলে তলে SIR করার জন্য লোক লস্কর ও বাজেট বরাদ্দ রেখে, জনগণ ক্ষ্যাপাবার জন্য SIR হতে দেবোনা বলে প্রোপ্যাগান্ডা করে গেছে। যখন পাড়ায় পাড়ায় এই BLO গুলো যাওয়া শুরু করেছিলো, তখনও চুড়ান্ত অসহযোগিতা শুরু করেছিলো এই তোলামুলের লোকজনেরাই। তার পর পর্যায়ক্রমে নানান অশান্তির পর ‘কোনো নাম’ বাদ দিতে দেবোনা- গোঁ ধরে বসে ছিলো, এর পর শুরু করেছিলো BLO রা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে, ইত্যাদি। ক্রণোলজি মেনে একটার পর একটা রিল মঞ্চস্থ হয়ে চলেছে। কিন্তু কেন?

হেয়ারিং শুরু হবার আগে খসড়া তালিকার ৫৮ লাখ বাতিল ভোটের বিশ্লেষণ করে আইপ্যাক দেখতে পেয়ে গেছে, গতবারের জেতা ৭০ টি আসনের জয়ের ব্যবধানের থেকে কাটা যাওয়া ভোটের সংখ্যা বেশি। হেয়ারিংয়ের পর কত সংখ্যক ভোট আরো কাটা যাবে সেই ব্যাপারে কোন স্থির সিদ্ধান্তে আসা যাচ্ছে না। অর্থাৎ রাজ্যের ২৫-৩০ হাজার ভোটে জেতা প্রায় সব বিধানসভা আসন। এখন হয় ক্লোজ কন্টেস্ট হবে অথবা ফলাফল যা খুশি হয়ে যেতে পারে। এতেই তোলামূলের মাথা ঘুরে গেছে। দুরবীন দিয়েও বিজেপিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা R Bangla এর বাইরে, মতুয়া অঞ্চলে বিজেপি যে গাড্ডায় পড়েছে তথাপি SIR নিয়ে তাদের নাচন কোদন যে বাঙাল অঞ্চলে ব্যাকফায়ার করেছে, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু বিজেপি জুজু না থাকলে তোলামুলের ঝাঁপ বন্ধ, তাই তারা নির্যাতন কমিশন মানেই বিজেপি- এই লাইনে ব্যাটিং করছে।

মুসলমানদের ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে ‘ইজতেমা’ কেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রোপ্যাগান্ডা থেকে তোলামুলের কোনও রাজনৈতিক লাভ হয়নি। মন্ত্রী, সান্ত্রী, আমলা, গামলার এক বিপুল বাহিনী নামিয়েও পুরো ফ্লপ শো হয়েছে তোলামুলের তরফে। ইজতেমায় আসা কোটি কোটি মানুষ- সকলে কার পাড়ায় কোন ওয়াকফ সম্পত্তি তুলতে পারেনি, হুমায়ূনের বাবরি মসজিদ, আর RSS এর দুর্গার ‘দুর্গা অঙ্গন’ ও মহাকাল মন্দির সংক্রান্ত আলোচনাতেই সময় কাটিয়েছে ধর্মীয় অংশের বাইরে। উন্নয়ণের কাণ্ডারি যিনি মুসলমানদের মসিহা, তিনিই যদি ‘হিন্দু তোষণে’ এতো মন্দির বানান সরকারি কোষাগার থেকে, RSS এর কি বিজেপিকে খুব দরকার! ধর্মীয় অংশের বাইরে এই ছিলো ইজতেমার মূল সাংসারিক আলাপ চারিতা। এরপর নীপা ভাইরাসকে বাজারজাত করার কম চেষ্টা হয়নি মিডিয়া মেশিনারি দিয়ে; কিন্তু সে গুড়ে বালি নয়, পিঠে পড়েছে। মানুষ গুছিয়ে নলেণ গুড় খেয়েছে বাঁদুরের আতঙ্ক উড়িয়ে।

 

(২)


সিদ্দিকুল্লাহ নাকি মঙ্গলবার রাজভবন অভিযান করবে! রাজভবনে কোন নির্বাচন কমিশনার বসেন? কোন সমাধানের জন্য রাস্তায় নেমে এই উৎপাত? আসল উদ্দেশ্য জমিয়তের নামে ফের মুসলমানকে ভয় দেখানো, মুসলমান আতঙ্কে না থাকলে তোলামুল ফিনিশ, তাই হাতের সব তাস খুলে ফেলেছেন ঘুগনিকন্যা।

আতঙ্কের ফেরিওয়ালারা সমস্বরে মৃত্যুর বিজ্ঞাপন করে যাচ্ছে। তেলাপিয়া নন্দী থেকে ডেটওভার ঘোষালদের মত গৃহপালিত পোষ্যদের নামিয়ে দিয়েছে কালীঘাট, এরই পরম্পরায় ‘শুক্রবারে বেলডাঙায় ২৪ ঘন্টা আক্রান্ত’ হালে পানি পায়নি। নন্দীগ্রাম কান্ডের সময় থেকে বাজারে নেমে পড়া ছুপা রুস্তম নকশাল, অতিবাম, তোলামূলী বুদ্ধিজীবী, কিছু লাথখোর ব্যক্তি, সাংবাদিকের নামে ইউটিউবে হাত পেতে খাওয়ার জন্য তোলামূলের চটি চাঁটা সারমেয়র দল- এরা এই প্রোপাগান্ডাটা শুধু হাতে ফ্রিতে করছে, এটা কোন মতেই সম্ভব নয়; এদের কারো কোনো নীতি ও আদর্শ রয়েছে বলেও কেউ বদনাম দিতে পারবেনা। সবটাই তোলা আদায়ের অর্থের বিনিময়ে চলছে। এরাই জিম নাওয়াজের মত দালালটাকে নামিয়ে দিয়েছে। এর মাঝখান থেকে গর্গের ‘পক্ষী’ ময়দান থেকে আউট হয়ে গেছে, যখন ইউসুফ পাঠান, শত্রুঘ্ন সিনহা আর কীর্তি আজাদ বাংলা থেকে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছে। বাকি রইল আনন্দ বাজারের মেয়াদ উত্তীর্ণ কয়েক পিস ফসিল সাংবাদিক আর একদল সর্বজ্ঞ জ্ঞান চূড়ামণি বামেদের ছানা, যাদের যাবতীয় বিপ্লব সোস্যাল মিডিয়াতেই সীমাবদ্ধ।

মুসলমান ভয় পাচ্ছেনা, এটাই তোলামুলের আতঙ্কের কারন। শান্তিনিকেতনের শান্তি বিঘ্নিত হচ্ছে এসকেলাটরে চড়ে। প্রাক্তন ‘সততার প্রোকিত’ আতঙ্কে আছে বলেই আবার নতুন করে মুসলমানকে আতঙ্কিত করার চেষ্টা করছে, যাতে ‘তোলামুল গেলে বিজেপি চলে আসবে’ সেই আতঙ্কে বেঁধে রাখা যায় মুসলমানকে। অগ্নিকন্যার আগুন নিভে এখন পাঁশুটে ধোঁয়া আর লাশ পোড়া দুর্গন্ধ চতুর্দিকে। তিনি আর ভোটে লড়ার মত মানসিক অবস্থাতেও নেই, আগুন জ্বলার মত তেল শেষ। রাজনৈতিক শহীদ হওয়ার মত ইমেজও আর অবশিষ্ট নেই, আমার হিসাব অনুযায়ী ২০২৬ নির্বাচনে তিনি নিজে লড়বেননা।

রাজ্যে থাকা ৮৮ হাজার BLO এর মধ্যে ৩২ হাজার সাদা খাতা আর কয়েকলক্ষ টাকা দিয়ে যারা চাকরিটা করছে, তারা নিজের নামটুকুও সই করতে গেলে কলম ভেঙে যায়। ডিসেম্বরে এই BLO গুলোই মূলত অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিলো, এর পর যখন ডেটা এন্ট্রির সময় এসেছে, এই মালগুলোই তো আমার আপনার নাম তুলেছে অনলাইনে। সেখানে ভুল হবেনা কি তারা সেক্সপিয়ার বা স্বরচিত রবীন্দ্র রচনাবলী লিখবে? প্রসঙ্গত না বিজেপি না আলিমুদ্দিন, কেউ এই বিষয়ে একবারও কোনো বিবৃতি দেয়নি, যে- ভুলের বড় অংশটা তো বুথ লেভেলেই হয়ে রয়েছে বলে AI সেই ভুলটা ধরছে, AI তো যন্ত্র, সে তো বিজেপির হিন্দুত্ব আর তোলামুলের হিন্দুত্বের ফারাক করতে পারেনা। তাহলে কেন ও কোন উদ্দেশ্যে বুথ লেভেলের এন্ট্রি পয়েন্টে এই ভুলগুলো হলো, কেউ প্রশ্ন তুলেছে কি?

নির্যাতন কমিশন হারামি সন্দেহ নেই, বিজেপি আরো বড় বিপদ এটাও প্রমানিত সত্য। আপনার বাবার নামে ৬/৭টা সন্তান অতিরিক্ত মিথ্যা তথ্য থাকলে সেই ভুলের দায় কার? মানে কমিশনের পক্ষে সেই কাজটা কে করেছে? আধার কার্ডের সাথে ভোটার কার্ডে নিজের বা বাবার নামে নামে ভুল অধিকাংশের আছে, এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই। তাহলে AI যদি সেই ভুল গুলো শোধরাতে যায়, আমাকে আপনাকে ডাকবেনা কী আমেরিকা আফ্রিকা থেকে কাউকে ডাকবে? নতুবা যে ভুল রয়েছে তা রয়েই যাবে, আর টস করে নাম বাদ দিলে যার খুশি নাম বাদ যেতেই পারে।

SIR প্রক্রিয়া মাঝামাঝি সময় থেকেই তোলামুল তথা আইপ্যাক খুব কৌশলে উন্নয়নের পাঁচালির প্রচারের বাহানাতে, ৬/৭টা বুথ মিলিয়ে, একটা করে টোটো সারাদিন ধরে পাড়ায় পাড়ায় ঘোরাচ্ছে গোটা বাংলা জুড়ে। সেই হিসাবে ৮৮ হাজার বুথে অন্তত ১০ হাজার টোটো সক্রিয় আছে গত এক মাস ধরে, সকাল সন্ধ্যা অন্তত ২ বার করে তারা একটা পাড়াতে ঢুকছে। এই গাড়িতে অন্তত ২ জন তোলামুলের ক্যাডার রয়েছে, যাদের কাজই হচ্ছে মূলত অশিক্ষিত, অল্পশিক্ষিত, শ্রমিক, কৃষক তথা শ্রমজীবী শ্রেনীকে ভয় দেখানো। মতুয়া পাড়ায় তাদের মত করে ভয় দেখাচ্ছে, মুসলমান পাড়ায় তাদের ভাষায়, মানে যেখানে যে ভয়টা খাবে সেখানে সেই টেমপ্লেট কাজে লাগাচ্ছে, তার সাথে আছে ফেসবুক ইউটিউবে পেইড প্রোপ্যাগান্ডা। আর স্বঘোষিত বাম্বাচ্চার দল লেজ তুলে এঁড়ে না বকন- বাছবিচার না করেই, সেই সব কিছু হুলিয়ে শেয়ার করে বিপ্লবের মাকে গর্ভবতী করে দিচ্ছে, ভাবছে বিজেপি ও নির্যাতন কমিশনকে আচ্ছা করে দিলাম- ফুল অর্গাজম।

নাহলে বালীর ‘PhD ধরের’ মত শিক্ষিত বাম নেত্রী কীভাবে হাস্যকর পোষ্ট করতে পারে হেয়ারিং এ ডাক পাওয়াকে কে কেন্দ্র করে! সে কী একবারও তার স্থানীয় BLO বা ডেটা এন্ট্রি অপারেটরের নামে কিছু বলেছে? শুভেন্দু খারাপ সন্দেহ নেই, কিন্তু শুভেন্দু নিজে বা তার কোনো লোক এসে কী নেত্রীর বাবার নামের ভুলটা করে দিয়ে গিয়েছিলো? নাকি AI নিজে, অথবা দিল্লির কোনো অফিসার ইচ্ছাকৃত এই অপকর্মটি করেছিলো উনি সিপিএম করেন বলে? যেটা পূর্বস্থলীর কৌশিক প্রকাশ্যে বলতে পারছে, সেটা বামেদের মধ্যে মীনাক্ষী আর শতরূপের মত হাতে গোনা একআধা জন ছাড়া বাকিরা বলতে পারছেনা কেন?

SIR কে কেন্দ্র করে শীর্ষ স্থানীয় বাম নেতৃত্বেরা তোলামূলের বিরুদ্ধে বলতে ভয় পাচ্ছে কেন? কেন আলিমুদ্দিন কোনো স্পষ্ট বিবৃতি দিচ্ছেনা সাংবাদিক সম্মেলন করে? “একটাও বৈধ ভোটার যেন বাদ না যায়” জাতীয় গোঁজামিল একটা লাইন আউড়ে যাচ্ছে। আরে, সমস্যাটা কে বা কারা তৈরি করেছে, কারা এই মিথ্যা হয়রানিটা করাচ্ছে, সেটা মানুষের কাছে বামেরা তুলে ধরবে, এটাই তো শিক্ষিত মানুষ আশা করে, তারাই যদি গোলগোল জবাব দেয়, মানুষ আতঙ্কিত হবেই। বরং সারাদিন সর্বত্র বিজেপির ভুত দেখে এরাই বিজেপিকে বাঁচিয়ে রেখেছে সংবাদে।

শুভেন্দুর ২ কোটি রোহিঙ্গার ত্বত্ত প্রকাশের দিনেই সে মহা মুর্খ হিসাবে হল অফ ফেমে জাইগা করে নিয়েছিল। গোটা বিশ্বে রোহিঙ্গার সংখ্যা মাত্র ১৫ লাখ, তারমধ্যে মুসলমানের সংখ্যা বেশী, তবে বৌদ্ধ খ্রিষ্টান রোহিঙ্গাও রয়েছে, এমনকি কিছু হিন্দু রোহিঙ্গারও খোঁজ পাওয়া গিয়েছে। তাই সব রোহিঙ্গাই যদি বাংলাতে ঢুকে রয়েছে ধরে নিই তর্কের খাতিরে, তাহলেও তা ১৫ লাখের বেশী হবেনা। সুতরাং মিথ্যাবাদী শুভেন্দুর কথা যে- চোঁয়া বদ ঢেকুরের মতই অপ্রয়োজনীয় অস্বস্তিকর সেটা বিজেপিও জানে। কিন্তু বাম শিবিরে এতো যে নিম্নমেধার ছাগলেরা ঢুকে রয়েছে, তা হজম করা কষ্টকর। এই সোশ্যাল বাম্বাচ্চা গুলো সারাদিন ধরে এই ২ কোটি রোহিঙ্গার দোহা দিয়ে চোলাই শুভেন্দুর কথাকে মাপকাঠি ধরে- ট্রোল করে যাচ্ছে।  আসলে রাই শুভেন্দু ও বিজেপির নেগেটিভ প্রচারটা করে যাচ্ছে।

যে ৩ লাখ নন ম্যাপিং ভোটার শুনানিতেই আসেনি, অথচ ড্রাফট লিষ্টে নাম ছিলো, বামেরা সেই তালিকা প্রকাশ করে সেই BLO/BLA দের নাম ও তালিকা কী প্রকাশ করতে পারবে? সেই সৎ সাহস বা মুরোদ কী রয়েছে আলিমুদ্দিনের বাঙাল নেতৃত্বের? নাকি সেখানকার বাম BLA গুলোও এই জালিয়াতিতে যুক্ত? আর সেই পাপকে ধামাচাপা দিতে আলফাল ট্রোল করে যাচ্ছে। তবে যা খুশি করুক, এরা তোলামুলকে কিছু বলতে নারাজ, অনন্ত ভয়ের সমুদ্রে শয্যা পেতে এরা নাকি বিপ্লবী কমিউনিস্ট দল করে!! ডুবে মরুন আপনারা ঘটির জলে।

এবার আসি পাব্লিকের কথায়। গত ২৩ বছর ধরে নির্বাচন কমিশন আপনাকে লাইনে দাঁড় করায়নি, আপনি প্রশ্ন তোলেননি – যে ভোটের দ্বারা স্থানীয় পঞ্চায়েত থেকে দিল্লির সরকার নির্বাচিত হয়, যেখানে কেন প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সংশোধন হবেনা! এত কোটি কোটি ভুলে ভরা ভোটার লিষ্ট দ্বারা নির্বাচিত সরকার কোন আইনের বলে ক্ষমতায় থাকে? কেন সংবিধান সংশোধিত হবেনা?

RSS এর সরকার যে কোনো ছুতোতে ত ১২ বছর ধরে পাব্লিককে লাইনে দাঁড় করানোটাই গুড গভর্নেন্স এর অঙ্গ বানিয়ে দিয়েছেতাই হেয়ারিং এ কোন ডকুমেন্টস নিচ্ছে আর কী নিচ্ছেনা- সেগুলো বাস্তবিকই একটা পর্যায়ের পর মূল্যহীন হয়ে যাচ্ছে। লাইনে দাড়ানোটা অবশ্যই নির্যাতন, কিন্তু গড্ডালিকা প্রবাহে গা না ভাসিয়ে তলিয়ে দেখুন, এই হয়রানির পিছনের আসল কুশিলব কারা? তোলামুল এই আতঙ্ক তৈরি করতে চাইছে। মুসলমান যদি তোলামুলকে ভোট না দেয়, সরকারের হাতে হ্যারিকেন, তাই নির্যাতন কমিশনের নামে বিজেপির জুজুটাকে বড় বড় করে চোখের সামনে বারেবারে দেখাচ্ছে।

তোলামুল যেহেতু ন্যারেটিভ সেট করেছে যে মানুষ কেন হয়রান হচ্ছে লাইনে দাঁড়িয়ে, পাবলিক তাই লাইনে দাঁড়ানোকেই সবচেয়ে বড় সমস্যা মনে করছে। আমি লাইনে দাঁড়ানো বিষয়টাকে জাস্টিফাই করছিনা, কিন্তু আমাদের জীবনই কেটে যায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। আরে জন্ম থেকে মৃত্য অবধি আজীবন কাল আপনি লাইনেই দাড়িয়ে চলেছেন, অতীতে দাঁড়িয়ে ছিলেন, আজও দাঁড়াচ্ছেন, আগামীতেও দাঁড়াবেন। রেশনের দোকানে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন, ট্রেন বাস ফ্লাইট ধরতে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন, পার্কে প্রেমিক/প্রেমিকার জন্য দাঁড়িয়ে অপেক্ষা, ইস্কুলে বাচ্চাকে আনতে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন, মন্দিরে মসজিদে গির্জাতে লাইন দিচ্ছেন, রাত ২টোর সময় প্যান্ডেলের বাইরে লাইন দিচ্ছেন, আইফোন কিনতে লাইন দিচ্ছেন। মদের দোকান থেকে শ্রীলেদার্স- কোথায় আপনি স্বেচ্ছায় লাইনে দাঁড়াচ্ছেন না? একবার সরকারী ব্যাঙ্ক বা যেকোনো সরকারী অফিসে গেলে লাইন থেকে কখন বের হবেন কেউ জানেনা। জন্মের সার্টিফিকেট থেকে শ্মশান- সর্বত্র লাইন আর লাইন। অথচ ২৩ বছর পর দেশের সরকার নির্ধারনের প্রক্রিয়াতে অংশ গ্রহন করার লাইনে দাঁড়াতে গিয়ে সকলের সে কী বিপ্লব!

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেখানে প্রতিটা ভোটের মূল্য সমান, যেখানে একজন আব্দুল শেখ কিম্বা ছিদাম বাগদির সাথে অমর্ত্য সেন কিংবা শঙ্খ ঘোষের ফারাক কোনখানে? যার ভুল হবে তাকেই ডাকবে, এটাই তো রাষ্ট্রের আইন। বুদ্ধিজীবী এলিট কোটায় কি কোনো সাত খুন মাপের আইন রয়েছে দেশে? তাদের ভুল থাকলে ডাকা যাবেনা, ডাকলেই তারা অবৈধ বিদেশী? তাঁরা বিশিষ্টজন বলে আইনের উর্ধ্বে- এই এলিটিজম আমাদের সংস্কৃতিতে কবে থেকে ঢুকেছে? শুধু নোবেল লরিয়েট নয়, এলিতেলি টিভির দেড় পয়সা সিরিয়ালের অভিনেত্রী বলছে আমাকে স্পেশাল ব্যবস্থা করে দিতে হবে, ভাবুন অবস্থা

আসলে এই প্রতিবাদের কতটা স্বতঃস্ফুর্ত আর কতটা ব্রেন হ্যাকিং বা জ্যাম করে করা! আবারও বলছি, SIR এর প্রথম ধাপে মুসলমানকে ভয় দেখাতে পারেনি তোলামূল, তাই এই পর্যায়ে এসে তুমুল একটা ভীতিজনক পরিস্থিতিতে ফেলতে চাইছে তাদের প্রচার যন্ত্রের মাধ্যমে। উন্নয়নের পাঁচালির টোটো থেকে ছড়ানো ভয় তো রয়েছেই, তার পাশাপাশি ইচ্ছাকৃত মারদাঙ্গা সৃষ্টি করে জনগণের মধ্যে গেল গেল রব তুলেছে। রাজ্যের বিভিন্ন অংশে তোলামূলের দুষ্কৃতীরা বিডিও অফিস থেকে এসডি অফিস আক্রমণ করছে পুরো প্রক্রিয়াকে ভন্ডুল করে দেওয়ার জন্য। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তোলামূলের এমএলএ ডকুমেন্ট লুটপাট করে নিয়ে চলে যাচ্ছে, অথচ তার বিরুদ্ধে একটা এফআইআর পর্যন্ত করার ক্ষমতা নেই মেরুদণ্ডহীন পুলিশ প্রশাসনের।

অবোধ বাম্বাচ্চাগুলো যদি, তোলামুলের এই প্রপাগান্ডার ফাঁদে পরে ফেসবুক আর ইউটিউবে প্রচারের কাজটা না করত, সমাজের মধ্যবিত্ত অংশে এই আতঙ্ক অনেকাংশেই কম হতো নিশ্চিত ভাবে বলা যায়। একজন এমন মানুষের ঠিকানা দিন যাকে হেয়ারিং এ ডাকা হয়েছে, অথচ তার কোন অংশে কোন ভুল ছিল না- আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, আমি নিজের খরচে কমিশনের নামে হয়রানির জন্য ক্ষতিপূরণের মামলা করব ও লড়ব শেষ অবধি।

BLO যখন বাড়ি বাড়ি গিয়েছিলো, তখন ভাবখানা এমন ছিলো যে- হেয়ারিং এ গিয়ে দেখে নেব। এখন সেই দেখে নেওয়ার সময়ে এসে চেঁচিয়ে গাঁ মাথায় করে আসলে কাকে ডিভিডেন্ট দিচ্ছেন আপনি? এই ভুলের দায় হিসাবে BLA হিসাবে কাজ করা কংগ্রেস, বিজেপি এমনকি বামেদের পক্ষে থেকে যুক্ত থাকা BLA রাও কি নিজেদের সাধু দাবী করতে পারেন?

একটা প্রসেস যখন শুরু হয়েছে সেটাকে শেষ করতে হবে। কিন্তু তোলামূল ও তাদের সবরকম বাহিনীর একটাই লক্ষ্য- ঘেঁটে দাও, যাতে মুসলমান ভয় পায়, আতঙ্কে থাকে আর তাদের দুধেল গাই ভোট ব্যাঙ্ক অটুট থাকে। নতুবা RSS এর গাইডলাইন মেনে তোলামুল সরকার সেই সব কটা নির্দেশ ফলো করেছে, যেগুলো অন্য ১১টা SIR হওয়া রাজ্যও করেছে তোলামুলের উদ্দেশ্য সমাধান করা নয়, মানুষকে সহযোগিতা করাও নয়, তাদের উদ্দেশ্য আতঙ্কিত করা।

পাশাপাশি মিডিয়া জুড়ে বাইনারিটা যেন তৃণমূল আর বিজেপির মাঝেই থাকে, অর্থাৎ RSS এর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে বিষয়টা। মুসলমান জানে সবই, কিন্তু বামেদের শীর্ষ নেতৃত্বের অপদার্থতার কারনে তাদের বিকল্প হিসাবে গ্রহণ করেনা। তাই মুসলমান জেনে বুঝে তোলামুল নামের বিষ খাচ্ছে। বস্তুত দুটো দলেরই বাপ এক- নাগপুরের গোয়ালঘর, একই প্রোডাক্ট দুটো আলাদা আলাদা দোকান। যতদিন বাংলার মুসলমান এটা না অন্তর থেকে মানবে, তাদের এই নিত্য আতঙ্ক থেকে মুক্তি নেই

 

আপনার শুভ বুদ্ধি কী বলে?


শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২৬

অশান্ত ইরাণঃ অর্থনীতির কানাগলি


 অর্থনীতির কানাগলিতে অবরুদ্ধ ইরাণ ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন কালেকশন এজেন্ট ইসরাইল”

                                                 (1)

প্রতি আক্রমণ করা ছাড়া ইরাণের আর কোনো পথ খোলা রয়েছে কি? আর সেই আক্রমণ বোমা বারুদের যুদ্ধ হলে, সেটা পরমাণু যুদ্ধের দিকে গড়াবে না, সেই নিশ্চয়তা দেওয়ারও কেউ নেই। যে যতই ধর্মের জিগির তুলুক, গণতন্ত্র বা মোল্লাতন্ত্রের চশমাতে দেখার চেষ্টা করুক- অর্থনৈতিক বিপর্যয়ই মূল সমস্যা, সেখান থেকেই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক-সামাজিক সংকট জন্ম নিয়েছে। তথ্যগত ভিত্তি অনুযায়ী চুম্বকে এটাই দৃশ্যমান কারণ।

মাৎস্যন্যায় শুরু হলে ঐতিহ্য পথের ধুলোয় গড়াগড়ি খায়। হাজার বছরের পারস্য ঐতিহ্যের ইতিহাস এখন হাজার হাজার মানুষের লাশের স্তুপ এর নিচে চাপা পড়ে যাবার প্রস্তুতি নিয়েছে। ধর্ম, রাজরোষ আর বিপ্লব- এই তিনটে শব্দবন্ধে পুরো সমস্যাকে খাটো করে দেওয়ার উপায় নেই। পশ্চিমা বিশ্বের মোড়লদের অবরোধ না থাকলে অর্থনীতি এতটা ভাঙত না, ফলে মানুষের বেতন আটকে যেত না ও বিক্ষোভের মাত্রা এইরকম হতো না। অবরোধের প্রভাব সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্র ও প্রশাসন, সামরিক খাতে অগ্রাধিকার বজায় রেখেও স্বচ্ছতার সাথে দুর্নীতি মুক্ত ও দক্ষ হাতে সামাজিক সুরক্ষার ন্যূনতম দিকগুলি উপেক্ষা না করে পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছে সেদিকে আলোকপাত করা প্রয়োজন।

ইরাণের উপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে তেল রপ্তানি সীমিত হয়ে গিয়েছিলো আগেই, ফলত রাষ্ট্রীয় আয় কমে যায়। পাশাপাশি ইরাণ পশ্চিমা বানিজ্য ব্যবস্থা SWIFT থেকে বিচ্ছিন্ন, তাই বিদেশী লেনদেন রুদ্ধ, আমদানি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগও বন্ধ, ফল স্বরূপ ইরাণী মুদ্রা রিয়াল ভয়াবহভাবে পড়তে শুরু করেছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ভয়াবহ হয়ে ওঠাটাও এটারই ফলাফল। আমরা ইরাণ সংক্রান্ত যে খবরগুলো শুনি বা দেখি সেগুলো সবই পশ্চিমা মিডিয়ার তৈরি খোরাক, তারা যেভাবে উপস্থাপনা করে আমরা সেই চশমাতেই দেখি। আমাদের মধ্যে যাবতীয় ধারণা তৈরি হয় পশ্চিমাদের তৈরি করা বাইনারিতে, তাই আসল সত্য জানতে গেলে পশ্চিমা মিডিয়ার বাইরে ও তাদের করায়ত্বের বাইরে থাকা সংবাদ খুঁজে নিতে হয় কষ্ট করে।

একে তো ইরাণের এই অবরুদ্ধি, তার ওপর যুদ্ধ মানেই ঝুঁকি। আর যে সে দেশের সাথে যুদ্ধ নয়, একেবারে ইজরাইলের সাথে- মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার নিজস্ব কালেকশনে এজেন্ট কিম্বা বলা ভালো ঘুর পথে আমেরিকার সাথেই যুদ্ধ। নতুন শিল্প বিনিয়োগ আগেই ছিল না, এরপর যুদ্ধের বাইপ্রোডাক্ট হিসাবে নতুন অবকাঠামো শিল্প কারখানা সম্প্রসারণ বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষ করে অটোমোবাইল, পেট্রোকেমিক্যাল ও কনজিউমার গুডস শিল্পে কর্মসংস্থান একেবারে তলানিতে চলে গেছে। পাশাপাশি CIA ও তাদের মধ্যপ্রাচ্যের জারজ শাখা মোসাদের লাগাতার ষড়যন্ত্র, উস্কানি এবং তাদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে ইরাণকে অশান্ত করে রাখাতে কোনো খামতি রাখেনি। কারণ, শক্তিশালী ইরাণ দখলদার ইজরায়েলের অস্তিত্বের জন্য সবসময়ের জন্য ঝুঁকি।

ইহুদি নিয়ন্ত্রিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যুদ্ধের ঝুঁকি ও প্রোপ্যাগান্ডা যত বেড়েছে, ততই ইরাণের মানুষ সম্পদ/সোনা কিনে রিয়াল বাজারে ছেড়ে দিয়েছে, স্বভাবতই শেয়ার মার্কেট থেকে আম জনতার ঘর অবধি আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এভাবেই ইরাণী রিয়াল প্রত্যেকদিন দুর্বল হয়েছে আর যেসব দ্রব্য আমদানি পণ্য করতে হয় যেমন- খাবার ওষুধ কিংবা বিভিন্ন রকম স্পেয়ার পার্টস ইত্যাদির দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। যুদ্ধে আমেরিকা ও ইজরায়েল লেজে গোবরে হয়েছে, ফলে তাদের তরফে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরো বেড়েছে। অসভ্য ট্রাম্পের মাতলামি, নিত্য নতুন স্যাংশন, কড়াকড়ি আর আর্থিক নজরদারিতে ইরাণ একেবারেই এক ঘরে হয়ে গেছে। চীন, ভারত সমেত মধ্যপ্রাচ্যের ক্রেতারা ইরাণের সঙ্গে লেনদেনের বিষয়ে আগের থেকে আরও অনেক বেশী সতর্ক। ইরাণের তেল বিক্রি হয়ত স্তব্ধ হয়নি কিন্তু দামদড়ে ছাড় বাড়াতে হয়েছে, পেমেন্ট পেতে দেরি হচ্ছে, আর সেটাও রুবেল, ইউয়ান বা সেই প্রাচীন বার্টার পদ্ধতি অবলম্বন করতে হচ্ছে। ফলত দেশের বর্তমান অর্থনীতির নিরিখে অনেক কিছুই আজ অপ্রয়োজনীয়। অর্থনীতির সহজ ভাষায় Cost of Doing Business বেড়েছে। তারই ধাক্কায় ইরাণের এই ভয়ংকর মুদ্রাস্ফীতি, ক্ষোভ বিক্ষোভ আর রাষ্ট্র ক্ষমতায় বর্তমান শাসকের টিকে থাকা নিয়ে এই অরাজকতা।

একটি রাষ্ট্রের হাতে নগদ অর্থ না থাকলে অর্থনীতির নিয়মে যা যা হওয়ার ছিল, ইরাণে সেটাই হচ্ছে। সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং শিল্প-শ্রমিক সমেত প্রায় সবার ক্ষেত্রেই বেতন দেরিতে হচ্ছে অথবা আংশিক দেওয়া হচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর প্রভাবে বাজারে মানি সারকুলেশন ভয়ঙ্কর ভাবে প্রভাবিত হয়েছে, এই পথ ধরে সিঁড়ি ভাঙ্গা অংকের মতো করে একটি সমাজব্যবস্থায় যা যা বিশৃঙ্খলা হবার সেগুলোই হয়ে চলেছে। কাজ আছে, আয় নেই, মাসের পর মাস বেতন নেই, শিক্ষিত যুবক বেকার আর অল্প শিক্ষিত যুব ও ছাত্র কর্মহীনতার সাগরে ডুবে আছে, দেশের বিপুল পরিমাণ নারীশক্তি সামাজিকভাবে অবরুদ্ধ।

দ্রব্যমূল্য এমনভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেছে যে, মানুষ শিক্ষা-দীক্ষা কৃষ্টি সংস্কৃতি রুচি ঐতিহ্য ইত্যাদি সবকিছু ভুলে গিয়ে শুধু দুবেলা দুটো অন্নের চিন্তায় দ্বিতীয় কোন কিছু নিয়ে মাথা ঘামিয়ে সময় নষ্ট করতে রাজি নয়। যায়নবাদী আমেরিকা, আর দখলদার ইজরায়েলের সেটাই মোক্ষ ছিল। এই পরিস্থিতিতে প্রাচীন পশ্চিমা গ্রীক সমাজবিজ্ঞানের যে টেমপ্লেট, ইরাণেও সেই পালাগানই মঞ্চস্থ হচ্ছে। মানুষের মধ্যে জন্ম নেওয়া ক্ষোভ, প্রতিবাদ হয়ে নামে রাস্তায় নেমে এসেছে। দেশের প্রায় প্রত্যেকটি সংস্থায় ধর্মঘট শুরু হয়েছে, কিন্তু সেই পথেও সমাধানের কোন সূত্র খুঁজে না পেয়ে শেষে রাজনৈতিক বিক্ষোভ শুধু দেশের বড় বড় শহরে সীমাবদ্ধ নেই, একেবারে প্রকাশ্যে ছোট বড় একশটি শহরকে মানুষ ঘিরে ফেলেছে। বিগত ৫ দশক ধরে এমন পরিস্থিতি তৈরির যে স্বপ্ন আমেরিকা দেখেছিল, তাতে তারা অনেকটাই সফল হয়েছে ২০২৫ এর শেষে এসে।

অবরুদ্ধ অর্থনীতিতে বৈধ আমদানি রপ্তানি কমে যায়, ফলে সত্যিই বাধ্য হয়ে সরকারকে গোপন বা ঘুরপথে লেনদেন করতে হয়; তাই খুব স্বাভাবিক নিয়মে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা গুটিকয় ব্যবসায়ী ও সামরিক গোষ্ঠী লাইসেন্স দেওয়া-নেওয়া, তেল রপ্তানি, ডলার লেনদেন জাতীয় কাজগুলি নিজেদের হাতে কুক্ষিগত করে রেখেছে, ফলস্বরূপ রাষ্ট্রের টাকা জনগণের কাছে পৌঁছাচ্ছে না এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। এটাই একটা black parallel economy তৈরি করেছে।

অবরুদ্ধ সরকার সবার আগে কী করে? প্রথম সিদ্ধান্ত নেয়, ‘রাষ্ট্র আগে বাঁচুক, মানুষ পরে’, এর হাতে-কলমে ফল হয়- সেনা, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র এবং রেভল্যুশনারি গার্ড খাতে বাজেট বৃদ্ধি। স্বভাবতই শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও শ্রমিক বেতনে কাটছাঁট হয় ব্যাপক ভাবে। বাস্তবে সামরিক খাত কোনো কর্ম সৃষ্টি করে না, উল্টে অর্থনীতির উৎপাদনশীল অংশ শুষে নেয় এবং যুবকের কর্মহীনতার কারণে বেকারত্ব ও ক্ষোভ বৃদ্ধি পায়। যুদ্ধ অর্থনীতি রাষ্ট্রকে হয়ত ভৌগোলিক সীমানার গরিমায় টিকিয়ে রাখে কিন্তু সেই রাষ্ট্রের সমাজব্যবস্থাকে নিচে থেকে উপর অবধি ভেতরে ভেতরে ঘুণ পোকার মতো ঝাঁঝরা করে দেয়। একই সাথে জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে তথ্য গোপন করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, ফলে প্রকৃত রাষ্ট্রীয় আয়, কোন খাতে কত ব্যায় আর বাস্তব ঘাটতি- সবকিছুই জনগণের কাছে অজানা অস্পষ্ট হয়ে যায়।

ইজরাইলের ওপর হামলা ইরাণের অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে দেবে তা ইরাণ জানত। তাদের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে আর জনগণের উপর চাপ বাড়বে না, এটা কি তাদের দেশে অর্থনীতিবিদরা জানতেন না? কিন্তু আঞ্চলিক শক্তির ভাবমূর্তি ধরে রাখতে হলে, মার্কিন শোষণ যন্ত্রে দেশের সম্পদ লুন্ঠন থেকে রক্ষা পেতে গেলে নিজেদের ‘দুর্বল দেখালে’ শাসক এর আসন টিকবে না। সুতরাং মেনে নিতেই হবে পেজেস্কিয়ান তথা খামেইনি সরকার জেনেশুনেই এই ক্ষতি মেনে নিয়েছে। এছাড়া শুধু কি ইজরায়েলের সাথে সরাসরি ১২ দিনের যুদ্ধ! মোটেই নয়, ওই যুদ্ধ ছাড়াও আছে ৩৫৬ দিন ধরে চলা নানা ফ্রন্টের প্রক্সি যুদ্ধ, হিজবুল্লাহ, হামাস, মিলিশিয়া, হুথি, ইত্যাদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠীগুলোকে সারাবছর পোষার খরচ- হাতি পোষার থেকে কোনো অংশে কম নয়। যুদ্ধ আমেরিকাও করে, তারাও প্রক্সি পোষে, কিন্তু তারা যুদ্ধের মাধ্যমে সেই দেশ থেকে নানান ছলে সম্পদ লুঠ করে নিয়ে যায়, যুদ্ধাস্ত্র বিক্রি করে; যুদ্ধই আমেরিকার মুখ্য ব্যবসা। এদিকে যুদ্ধ থেকে ইরাণের কোনো ব্যবসা বা লাভ নেই। যুদ্ধ থেকে ইরাণের অর্থনৈতিক রিটার্ন নেই কিন্তু রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থেকে দিনের পর দিন ধরে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ কুয়োতে ঢেলে যাওয়া, অর্থনীতির আদর্শ ব্ল্যাক হোল।

 

(২)

যেহেতু আমেরিকান ড্রিম আপনাকে বিক্রি করতে হবে, আপনাকে গেলাতে হবে তাদের নগ্ন সভ্যতাই আসলে আধুনিকতা~ তাই আমেরিকা বা ইজরায়েলের সাধারণ নাগরিকের সমস্যা ও সেখানকার প্রতিবাদ আন্দোলন কিছুই আপনাকে দেখানো হবেনা। কিন্তু ইরাণের আন্দোলন, আমার আপনার তৃতীয় বিশ্বের আন্দোলন প্রতিমুহূর্তে বারংবার আপনাকে আমাকে দেখানো হবে যাতে মনে হয় পশ্চিমা সভ্যতা ছাড়া বাকি সকল রাষ্ট্র বর্বর ইত্যাদি।

সমস্যা কি শুধু একা ইরাণের? মোটেই তা নয়, ইজরায়েলেও সমানে বিক্ষোভ হচ্ছে। এই শতকে ইরাণের সাথে সত্যিকারের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া ছাড়া ইসরাইলকে কোনো রকম সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়নি এতদিন, উল্টে ইজরাইল রীতিমতো বিপুল ভাতা প্রাপ্ত মার্কিন মদতপুষ্ট দেশ, কারণ মার্কিন কালেকশন এজেন্ট হিসেবে ইজরায়েলের পারফরম্যান্স রীতিমতো সন্তোষজনক। এর আগে ইজরায়েল শেষ যুদ্ধ করেছিল ১৯৭৩ সালে ইয়ুম কিপুরের যুদ্ধে। দুর্বল ফিলিস্তিনের সাথে একতরফা আক্রমণ আর নানান মিলিশিয়া প্রক্সি যোদ্ধাদের সাথে নিয়মিত সংঘর্ষের বাইরে, এতদিনে ইজরায়েল সত্যিকারের লড়াই করতে গিয়ে প্যান্টে হেগে ফেলেছে ইরাণের বিপক্ষে। এখানেই ইজরাইলের জনগণও দেশব্যাপী ভয়ঙ্কর বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। কিন্তু কেন?

ইজরায়েলেদের দাবী তাদের দেশের বর্তমান বিক্ষোভ ‘বামপন্থী ষড়যন্ত্র’, এটা আর নতুন করে হাসির উদ্রেগ করে না, কারণ মার্কিনী ও তাদের মিত্রদের কমিউনিজমের ভূত তাড়া করে ফিরবে এটাই স্বাভাবিক। আসলে এটা নিজের জনগণের সরকারের উপরে আস্থা হারানোর ফল, এটা সরাসরি যায়োনবাদীদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা। ইজরায়েল অবরুদ্ধ নয়, কিন্তু যুদ্ধকেন্দ্রিক ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নিজেই নিজের অর্থনীতির কবর খুঁড়ে ফেলেছে। যুদ্ধের সাথে জুড়ে আছে রাজনৈতিক ব্যর্থতা, যা ভেঙে দিয়েছে বহুল আলোচিত ‘আইরন ডোম’ আর মোসাদের ফানুস, সেই মিথ আর আক্ষরিক ধ্বংসস্তূপের দাঁড়িয়ে চলছে- পৃথিবীর ব্যাংকার রাষ্ট্রের স্থপতিদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিক্ষোভ।

ইজরাইলের ‘ভাতাখোর’ অপুষ্যি মানুষের দল বুঝতে পেরেছে- ভূমধ্যসাগরের তীরে বন্ধুর প্রকৃতির মধ্যে আতঙ্ককে সঙ্গী করে নেওয়া মানুষের প্রতি ‘পশ্চিমা সমর্থন আছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ নেই’। ঠিক অপর পারে ভূমধ্যসাগরের পশ্চিম প্রান্তে ইউক্রেনের জনগণ বুঝতে না পারলেও, ইজরাইলের সেয়ানা জনগণ ইরাণ কর্তৃক আক্রান্ত হবার পর হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে- আমেরিকা অস্ত্র দেবে কিন্তু সন্তান মরেছে তাদের। ফিলিস্তিনে ঢুকে অন্যের নিরস্ত্র সন্তান মেরে আসা আর তেল আভিভের বুকে, ক্ষেপনাস্ত্র যুদ্ধের মাঝে সাইরেন শুনে বাঙ্কারের মধ্যে ছেলের লাশ আগলে থেকে কবরের জন্য অপেক্ষা করা- এক নয়। স্বভাবতই প্রতি মুহূর্তে ইসরাইলি সমাজ দ্বিখণ্ডিত হচ্ছে আর তাদের অর্থনীতি ভাঙছে। তাদেরও প্রাপ্তি বলতে শুধুই ধ্বংস। ইজরায়েল এর জনগণ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে- যায়োনিস্ট সরকার যুদ্ধ চালাচ্ছে তাদের দেশের জন্য নয়, নিজেদের পেটোয়া গুটিকয় লোকের আখের গোছানোর জন্য এতো আয়োজন। তাদের দেশের মানুষ জানতে চাইছে- গাজা যুদ্ধ আর কতদিন চলবে? হামাসের হাতে বন্দিদের মুক্তি কবে? আর কতদিন ৪০০০ বছর আগের ধর্মীয় আরক মাখানো ‘মাসায়া’র গল্প শুনিয়ে ইহুদিদের অর্ধচন্দ্র বানানো হবে? এই নিরিবচ্ছিন্ন অশান্তির শেষটা কী?

যথারীতি যায়নিস্ট শাসকের কাছে কোনো প্রশ্নের উত্তর নেই। মিডিয়া সবচেয়ে বেশি অবরুদ্ধ যদি উত্তর কোরিয়াতে হয়, ইজরায়েল অবশ্যই দ্বিতীয় স্থানে আসবে সেন্সরের নিরিখে, ইরাণের চেয়েও ইজরায়েলের মিডিয়া বেশি সেন্সরড; তাই তাদের আন্দোলনের ছবি খবর ইহুদি নিয়ন্ত্রিত কোনো সোশ্যালমিডিয়া, ইলেকট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়াতে আসছেই না।

ইজরায়েলের মার্কিন সাহায্য আসে মূলত সামরিক খাতে। অস্ত্র কেনায় লোন দেওয়া আর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজিয়ে তোলার কাজ আমেরিকা করে। এবারে যুদ্ধটা একবার যদি লাগিয়ে দেওয়া যায়, তবে দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধকালীন লজিস্টিক সাপোর্ট হিসাবে অর্থের যোগান দেওয়া আর একটা দেশের সাধারণ অর্থনীতি চালনা এক নয়। যুদ্ধের জন্য টাকা এলে সেগুলো অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, কর্মসংস্থান, পর্যটন, প্রযুক্তি কোনো শিল্পে লগ্নি হয়না, ফলত সেই টাকা থেকে দেশ ও জনগণ লাভবান হয়না। শেষমেষ যুদ্ধ ছাড়া কোনো শিল্পই বাঁচে না।

ঠিক এই ফর্মুলা অনুসরণ করে ইজরায়েলের অর্থনীতির উপরে একবার আলো ফেলা যাক।

ইসলামিক মিলিশিয়া গোষ্ঠীদের সাথে লাগাতার প্রক্সি যুদ্ধ ও সংঘর্ষ বিরতি মাঝে দম নিয়ে নূতন করে মোকাবিলা করার জন্য রসদ সংগ্রহ করে নেওয়া- এটাই চুম্বকে শেষ সাড়ে তিন দশকের ইজরায়েল। লাভ বলতে গরীব ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ, জবরদখল করে প্রতিটা প্রতিবেশীর জমি হাতিয়ে নেওয়া, এটাই ইজরায়েলের একমাত্র সফলতা। ইজরায়েলের পশ্চিমের জলসীমা প্রাকৃতিক কারণেই সুরক্ষিত, মিশরের হোসেন-ই-মোবারক আর সিরিয়ার আসাদের পতনের পর ইজরায়েলের সীমানা যেমন বেড়েছে, উল্টো দিক থেকে আক্রমণের তীব্রতা ততই কমেছে। লেবানন বলে একটা সুপ্রাচীন বাজারের কথা শুধুমাত্র ম্যাপ বইয়ের পাতা ছাড়া মানুষ ভুলতে বসেছে। একতরফা ভাবে গাজাতে বর্বর আক্রমণ আর দিনশেষে উল্লাস এটুকুই প্রাপ্তি। তবুও তার মধ্যে বোড়ে খোয়ানো বা অন্য শিবিরে বন্দী হওয়া জাতীয় ছোটখাটো ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাচ্ছিল এতদিন; কিন্তু ইরাণের মতো এরকম সর্বগ্রাসী ঘোষিত আক্রমণের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা অতীতে ইজরাইলের কখনও ছিল না, এমনকি আরব ইসরাইল যুদ্ধেও না।

ইজরায়েলের জনসংখ্যা বলতে ওখানে জন্মানো নাগরিক ছাড়া পৃথিবীর যেকোন প্রান্তের ধর্মীয়ভাবে ইহুদির একটা লিংক থাকলেই হয়। অনেকটা আমাদের SIR প্রক্রিয়ায় লিংক দিয়ে জুড়ে নাগরিকত্ব প্রমাণ করার মতো। রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের শপথ মানে- আগামী দিনে কোনো ভক্ত যদি এই ফাঁদে পা দেয় তার পথ খুলে রাখা। বাস্তবে ইহুদি নাগরিক বলতে আশকেনাজি, সেফার্দি, মিজরাহি এবং রাশিয়া, ইউক্রেন, ইথিওপিয়া ইত্যাদি থেকে আসা মানুষেরা মোট জনসংখ্যার ৭৩–৭৪%। দ্রুজ, চের্কেস ও অন্যান্য বিদেশি বংশোদ্ভূত কিন্তু নাগরিকত্ব প্রাপ্ত- এমন সব মিলিয়ে ৫-৬ %। এদের অধিকাংশই ভবঘুরে, কুঁড়ে, দাগী অপরাধী বা ভাতা পেয়ে বসে খাবো মানসিকতার। ইজরায়েল আসলেই ইউরোপ ও আমেরিকার পাতাখোর বা ড্রাগের নেশা করা রাষ্ট্রের জঞ্জাল ইহুদিগুলোকে রিহ্যাব করার ওপেন হাসপাতাল।

ইজরাইল নিজেকে "Jewish State" বললেও তাদের নাগরিকদের সবাই ধর্মীয়ভাবে ইহুদি নয়- এদের জেনটাইল নামে ডাকা হয়। যারা ধর্মে ইহুদি, সে পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক সে ইজরায়েলের নাগরিক। কিন্তু যারা ওই দেশের মাটিতে ঐতিহাসিকভাবে ছিল ও আছে- তারা নাগরিক কিনা সেটা ঠিক করে তাদের যায়োনিস্ট সরকার। ক্রমবর্ধমান ভূখণ্ডের মধ্যে আরব জাতির ২০–২১%, এরা ইজরাইলি নাগরিক কিন্তু এদের ধর্ম মুসলিম, খ্রিস্টান, দ্রুজ। এদের মাতৃ ভাষা আরবি, যাদের সকলেই ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্র প্রক্রিয়া শুরুর সময় ঐ ভৌগোলিক সীমার ভেতরে থাকা ফিলিস্তিনি পরিবার। এরা নাগরিক হলেও জমি, চাকরি, রাজনৈতিক অধিকার সব ক্ষেত্রে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক।

অবৈধ খাজনা আদায় করতে গেলে পেয়াদা দলের ক্ষতি হবেই। এই বাস্তব সত্য স্বীকার করে নিয়ে ইজরাইলে ১৮ বছর বয়স হলে সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক, মানে গোটা দেশের সব নাগরিককে ছলে বলে কৌশলে সামরিক বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়। আর সমস্যা এখানেই সবচেয়ে বেশি। বাস্তবে ইজরায়েল রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে পুরাতন বস্তাপচা আব্রাহামীয় ধর্মীয় বিশ্বাস, হিটলারের গণহত্যার ভয়, অবৈধ দখলদারি আর পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে। তাই সামরিক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে ভাগাভাগি আছে, যেমন ইহুদী হলে পুরুষ নারী উভয়েই বাধ্যতামূলক, দ্রুজ আর চের্কেস এর মধ্যে পুরুষরা বাধ্যতামূলক। ২০% জেনটাইল আরব নাগরিক প্রশিক্ষণের তালিকা থেকে বাদ অবিশ্বাসের কারণে। এর বাইরেও বিরাট ধার্মিকের ছাড় পাওয়ার জন্য একটা গোঁজামিল পদ্ধতি আছে, যারা ধর্মীয় নেতা রাব্যাই এর দল- মূলত যারা ইজরায়েল এর সমাজ ও সরকার নিয়ন্ত্রণ করে তারাও সামরিক প্রশিক্ষণের বাইরে থাকে। ইজরাইলে প্রতিমুহূর্তে NRC চালু করা রয়েছে। ফলে, গোলান উপত্যকার বড় অংশ ইজরায়েলের দখলে এসে গেলেও, দ্রুজদের অধিকাংশই সিরিয়ান নাগরিকত্ব ছাড়েনি। ফলে যুদ্ধের মুখোমুখি হতেই, অলঙ্ঘনীয় আইরন ডোমের কার্যকারিতার মতোই- সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সুদক্ষ নাগরিকের দেশপ্রেম উধাও হয়ে গেছে। বিশ্ব নাগরিকের অবশ্য মাথাব্যথা নেই এইসব বেকার ঝুট ঝামেলা নিয়ে, তাদের দ্বৈত্ব নাগরিকত্ব আছে, ঝামেলা বাঁধলেই পালিয়ে যায় তারা।

এই যুদ্ধ বিধ্বস্ত পরিস্থিতি দেখার পর- প্রাণ হাতে করে কোনো পর্যটক আসছে না, ফলে ইজরায়েলের পর্যটন শিল্প প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। পরিস্থিতির বিপাকে মেধার সাথে সাথে, প্রতিনিয়ত দেশ ছাড়ছে টেক স্টার্ট-আপ এর ইনভেস্টমেন্ট, সেটা সাময়িক হলেও সরছেই। শুধু ল্যান্ড আর ক্যাপিটাল থাকলেই তো শিল্প হবে না, উৎপাদনের অন্যতম বড় শর্তই হলো শ্রমিক তথা লেবার। বর্বর অত্যাচারের ফলে স্বল্পমূল্যের ফিলিস্তিনি ‘জেনটাইল’ কমছে রোজই, যে কারণে অবকাঠামো ও নির্মাণ শিল্প প্রায় থমকে গেছে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত অংশের পুনঃনির্মাণের জন্য পৃথিবীর অন্য অংশ থেকে লেবার আনতে গিয়ে ঢাকের দায়ে মনসা বিকিয়ে যাচ্ছে, চুকাতে হচ্ছে তিনগুণ চার গুণ অর্থ। অর্থনীতির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি ছোট ব্যবসা গতি হারিয়েছে, কারণ চাহিদা নেই, মানুষ যুদ্ধের ভয়ে টাকা/সম্পদ জমাতে আগ্রহী, খরচ করছে না।

২০২৩–২০২৫ সময় কালেই লক্ষ লক্ষ ইজরায়েলি জনগণকে রিজার্ভ সেনা হিসেবে যোগ দেবার জন্য নোটিশ জারি করে ডাকা হয়েছে, ফলে উৎপাদনশীল বয়সী পুরুষ জাতীয় কর্মক্ষেত্রের বাইরে চলে গেছে। একই সাথে বহু ব্যবসা, স্টার্ট-আপ ও ফ্যাক্টরি আংশিক বা পুরো বন্ধ, ফলত বিপুল মেধা দেশ ছেড়েছে। অবরুদ্ধ ইরাণ ফাটা বাঁশে আটকে গিয়ে অর্থনীতিকে কার্যত ‘মিলিটারাইজড’ করে ফেলেছে বলে পশ্চিমে দুনিয়া অভিযোগ করছে, কিন্তু মুক্ত হওয়াতে বাস করেও ইজরাইলের অর্থনীতি যে কার্যত ‘মিলিটারাইজড’ হয়ে গেছে এটা স্বীকার করতে তারা লজ্জা পাচ্ছে। তাই লুকাচ্ছে। ইরাণের সাথে তুলনা করলে- ইজরাইলের সাথে প্রায় সবার সাথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালু আছে, ডলার ও ইউরো প্রবাহ আছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারছে। তবুও ইজরাইলের প্রায় সব সেক্টর ভেঙে পড়েছে। ইম্মিডিয়েড পড়শী দেশ থেকে কিছু স্থায়ী লুঠপাঠের বন্দোবস্ত না করলে তাদের অর্থনীতিও পাতালে চলে যাবে।

দেশের বেকারত্বের হার লুকাতে গিয়ে সরকারকে মিথ্যা সংখ্যাতত্ত্ব প্রকাশ করতে হচ্ছে। ভয়ংকর বেকারত্ব একমাত্র বাস্তব সত্য আর আমাদের দেশের মতো পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে কোনোমতে নিজেকে টিকিয়ে রাখার মতো কোন অবস্থা ঐ দেশে নেই। ফলে কর্মক্ষম মানুষ ভয়ংকর ভাবে কর্মহীনতায় ভুগছে। এখনো কর্মক্ষম অংশের যেটুকু নিজেদের সামরিক বাহিনীর বাইরে রাখতে পেরেছে, তারা বাস্তবেই কর্মহীন। এই পরিস্থিতিতে ইজরায়েলের শেকেল, ইরাণের রিয়ালের মতো হুড়মুড় করে ভেঙে পডার কথা কিন্তু দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেও শেকেল কোনমতে টিকে আছে কিভাবে? ইজরাইল ৩.৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক অনুদান পেয়েছে আমেরিকার কাছ থেকে, সঙ্গে যুদ্ধের সময় অতিরিক্ত সহায়তা। এভাবেই ভেন্টিলেশনে চলে যাওয়া অর্থনীতিতে শুধুমাত্র বাইরে থেকে পাম্প করে টিকিয়ে রাখা হয়েছে।

ইউক্রেন বা ইজরাইল নয়, যুদ্ধকালীন এরকম অনুদান পাওয়ার তালিকাটি সুদীর্ঘ। নাইজেরিয়া, লাউস, কম্বোডিয়া, দক্ষিণ সুদান, সিরিয়া, ইথিওপিয়া ও সাম্প্রতিককালে তালিকায় যুক্ত হওয়া প্রতিবেশী বাংলাদেশ। আর এই অনুদান বাজেটের চাপ প্রশমিত করার করার তাগিদেই ভেনেজুয়েলা সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নিত্য নতুন তেল তথা সম্পদ ভান্ডারে আক্রমণ বাড়বে বই কমবে না। ভবিষ্যতে মাদুরোর নামের পাশে আরো এমন অনেক নাম যে যুক্ত হবে, সে কথা এখনই বলে দেওয়া যেতে পারে।

অতীতে স্প্যানিস সাম্রাজ্য, ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ ও সোভিয়েত সাম্রাজ্যের পতন এভাবেই হয়েছিলো। স্পেন সময় নিয়েছিলও ১০ বছর, ইংল্যান্ড ৫ বছর আর সোভিয়েত মাত্র দেশ বছরের একটু বেশী। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের একই নীল নক্সাতে তৈরি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদও উপরোক্ত ৩ ধরনের আগ্রাশনের বাইরে কিছু নয়, স্থান ও কালভেদে মোড়কটা শুধু আলাদা। ক্রণোলজি মেনে চললে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ দুম করে কয়েক মাসের মধ্যে ধ্বসে পড়লে আশ্চর্য হবেন না। আমেরিকার এখন চাই বিপুল টাকা, তার জন্য বিপুল লুঠের সুযোগ, সুযোগ না পেলেই যুদ্ধ অবধারিত। আমেরিকা নিজেদের তৈরি বৈশ্বিক যে বন্দোবস্ত বানিয়েছিলো, সেই UN, WMF, WHO জাতীয় সমস্ত প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেই বিলিয়ে যাবার মুখে। পেট্রো ডলার অর্থনীতি অতীত, ৯ই জানুয়ারি পেট্রো ডলার চুক্তি শেষ হয়েছে সৌদির সাথে। তাই হুমকি ধমকি দিয়ে নতুন ভাবে মধ্যযুগীয় উপনিবেশ প্রথা চালুর চেষ্টা চলছে। কিন্তু চেষ্টা করা আর সফল হওয়া এক নয়। বর্তমান পৃথিবী আর একমেরু নেই, বন্ধুর সমস্যাতে চীন হিজড়ের মতো আচরণ করলেও শক্তিধর সন্দেহ নেই, রাশিয়া, আমাদের ভারত সকলে রয়েছে। এই সকল রাষ্ট্র মেনে নেবে কী? পরমাণু অস্ত্র যে অনেকেই রাখে আজকের দিনে।

আমাদের রাজ্যে একটা চালু কথা আছে- যার মাথায় ‘ওনার’ হাত, তিনি খাবেন জেলের ভাত। এই বাক্যটির আন্তর্জাতিকরণ করলে দাঁড়ায়- “পশ্চিমা সমর্থন আছে মানেই অর্থনীতি মায়ের ভোগে যাবে” এই ধারণাটা মিথ হয়ে গেছে। ইউক্রেন, ইজরাইল হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে এবং অতীতের আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, মিশর এমনকি লতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা, ইউরোপের ঐতিহ্যশালী দেশ স্পেন ও গ্রীস, সর্বশক্তিমান ন্যাটো ও গোটা ইউরোপের সীমানা মুছে ‘এক মহাদেশ এক মুদ্রার’ মতো যুগান্তকারী ব্যবস্থা নেওয়ার মতো সাহস দেখানো ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী; আর হাতের কাছে সবচেয়ে বড় উদাহরণ পাকিস্তান তো আছেই। সুতরাং, মস্তিষ্কের ঝুল ফাঁদগুলো সরিয়ে ‘আমেরিকান ড্রিম’ এর কাজল মুছে বোঝার চেষ্টা না করলে এই ইম্পিরিয়াল পতনের পদধ্বনি শুনতে পাবেন না।

তাই আজকে ইরাণের মুদ্রার মান প্রায় শূন্য করে দেওয়ার পর, তাদের কী হচ্ছে তার উপরে বিশ্বের স্থিতিশীলতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ন্যাটো লেজে গোবরে, তাদের লুন্ঠনের রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে ট্রাওরের আফ্রিকা। ইরাণ যদি আজকের পর ৬ মাসও টিকে যায়, ডলারের হাল শুরুর ৯০ এর দশকের রুবেলের চেয়ে খারাপ হবে সেটা লিখে রাখুন। সেক্ষেত্রেও আমেরিকা ভাঙবে, আবার যুদ্ধ বাঁধিয়েও যে বেঁচে যাবে তারও নিশ্চয়তা নেই, সেখানেও রসদে ঘাটতি হবে এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন দাদাগিরির অস্ত্র- সেনাঘাঁটি গুলো গায়েব হয়ে যাবে। ১৪ই জানুয়ারির আগে অবধি ট্রাম্প রোজ হাড়হিম করা ধমকি দিচ্ছিলো, যেন কালই খামেইনিকে ছিপে তুলে নেবে। ওদিকে মার্কিন সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম আর শাহি কট পড়ে রাজ মুকুটের স্বপ্নে বিভোর রেজা পল্লব রোজই মিটিনং করছিলো কীভাবে ইরাণকে ‘দিশা’ দেখাবে।

১৪ই জানুয়ারি রাত্রে অন্যান্য সমস্ত দেশ ইরাণ থেকে তাদের দেশের নাগরিকদের ডেকে নেয়। কাতারের সেনা ঘাঁটি খালি- এই আক্রমণ হয় তো সেই আক্রমণ হয়। পরদিন সকালে ফুস…, মোসাদ, MI-6, CIA সকলের সমস্ত কিছু ব্যর্থ হয়েছে, গাঁড়ল ট্রাম্পের মুখে পরাজয়ের ছাপ স্পষ্ট। এর আগে যায়নিষ্ট ‘গোদি মিডিয়া’ কী তাদের তরফে প্রোপ্যাগান্ডা চালাতে কসুর কম করেছে? BBC, Fox, ABC, হারেৎজ, টাইমস, রয়টার্স সহ সবাই মিলে ১০ হাজার লোকের মৃত্যুর গল্প ফেঁদে একটা হেজিমনি খাড়া করতে গিয়েছিল। পরে নিজেরাই ‘সরি বাবু’ বলে সেটাকে ৬৬৭ তে এনে থামিয়েছে, যার মধ্যে ইরাণের সেনাবাহির সদস্যই ৭০% এর অধিক, এই হল চুম্বকে সংবাদ।

সমস্ত ধরনের অতীতের নির্লজ্জতাকে এরা ছাপিয়ে গিয়েছে এবারে, কানাডার এক মেয়ের ছবিকে ইরাণের বলে ভাইরাল করেছিলো সোস্যাল মিডিয়াতে; যেখানে খামেইনির ছবি পুড়িয়ে মেয়েটিকে সিগারেট জ্বালাতে দেখা যাচ্ছিলো। খামেইনি ভালো না খারাপ সেই বিচারে যাচ্ছিনা, কিন্তু যে লোকটা আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়ছে, সে যে খুশি হোক, আমি তার পক্ষে।

মিডল ইস্টের ১৯টা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে ইরান প্রাথমিক লক্ষ্য বানিয়ে ছিলো তো বটেই, আর এগুলো মুছে গেলে দেশ হিসাবে ইজরায়েলের আয়ু আর আধাঘন্টা বড় জোর। তাছাড়া পরমানু অস্ত্রের ভয় থেকে আঙ্কেল শ্যাম নিজেও কি মুক্ত? সবচেয়ে বড় কথা বিশ্বের একটা রাষ্ট্রও তার বন্ধু নয়, সামান্য দুর্বল হলে পাশের প্রতিটা জনই টিপে ধরবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে শ্বাসরোধ করার জন্য। নতুন করে অর্থের একমাত্র সংস্থান তো লুণ্ঠন, সেই লুঠ না করতে পারলেও আমেরিকা ভাঙবে। দেখা যাক সেটা কত তাড়াতাড়ি হয় আর কোন পথ ধরে হয়!

 

#হককথন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...