মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২০

ভারতীয় যুদ্ধের সহিংস ইতিহাস ও মুসলমান

 


আজকের ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘দেশপ্রেমিক’ ধারনাটা হলঃ আরবজাত মুসলমানেরা আফগান, পামির অঞ্চল, কখনও মোগল রূপে বা কখনও পারস্য থেকে এসে ভারত আক্রমণ করেছিল, অতএব এই জাতিটাই একমাত্র বর্বর, রক্তপিপাসু, ক্ষমতালোভী, নিকৃষ্ট তথা জিহাদি জাতি। মুসলমানেরা ভারত আক্রমণ করার পুর্বে এই উপমহাদেশে পবিত্র ‘রামায়ণ ও মহাভারতের মত’ ধর্মযুদ্ধ থাকলেও, অধর্মজাত যুদ্ধ বিষয়টা মোটেই ছিলনা, সেটা সম্রাট অশোক করলেও নয়। সকলে নমস্কার, প্রণাম, আলিঙ্গন, চুম্মাচাটি করত আর রেগে গেলে বড়জোর শাপশাপন্ত করে ছেড়ে দিত, বাকিটা ঈশ্বরের কাজ ছিল- ভাবখানা এমনই বর্তমান ভারতীয় ইতিহাসে। এটা যে শুধু বিজেপির দান তা নয়, রাজীব গান্ধী ও তৎপরবর্তী কংগ্রেস সরকার থেকে আজকের নরেন্দ্র মোদী সরকার- সকলেই সমান অবদান রেখেছে। কংগ্রেস নরম হিন্দুত্ব তাস খেলত, বিজেপি সেটাই ন্যাংটা উদোম করে দিয়েছে, এটাই যা ফারাক।

মূলত বাবরি মসজিদ ভাঙা ও মুম্বই দাঙ্গার পরবর্তী পর্যায়ে- RSS ও তার রাজ্যওয়ারি প্রকাশ্য বা গুপ্ত রাজনৈতিক সহযোগী, অসাম্প্রদায়িকতার ভেকধারী কিছু আঞ্চলিক স্বার্থবাদী দল গুলো মিলে এই RSS এর ঘৃন্য সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষকে সমাজের মাঝে ‘মহীরুহে পরিণত করে দিয়েছে’ নিরবিচ্ছিন্নভাবে সার ও জল সিঞ্চন করে। এদেশে খারাপ কিছু মানেই সেটা মুসলমান জনগোষ্ঠী দ্বারা সম্পৃক্ত, অথবা কমিউনিস্ট; বাকিরা ভাল- কিন্তু ‘সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে ব্রাহ্মণ্যবাদ’- এমন একটা ইউটোপিও ধারণা রেডিও, টিভি সিরিয়াল, সিনেমা, ২৪ ঘন্টার খবরের চ্যানেল, বিভিন্ন টক-শো, সংবাদপত্র, সমসাময়িক সাহিত্য ইত্যাদি প্রচার মাধ্যমের দ্বারা সমাজের মাঝে সুস্পষ্ট ও পরিকল্পিতভাবে বুনে দেওয়া হয়েছে। এখান থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেওয়া অন্তত তিনটে প্রজন্ম ঠিক সেটাই শিখেছে যেমনটা ‘RSS’ এর এ্যাজেন্ডা ছিল, কে ভাল তা নিয়ে গবেষণা থাকুক বা না থাকুক- কিন্তু ‘হিংস্র ও খারাপ’ কিছু মানেই তা মুসলমান- এটা প্রতিষ্ঠিত আজকে এই ২০২০ সালে।

যদিও আজকে পর্যন্ত পাকিস্তান তথা ISI এর চর হিসাবে ধরা পরা প্রায় প্রতিটি ব্যাক্তিই- প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিজেপি বা RSS মতাদর্শের সাথে যুক্ত, এবং তারা কেউই মুসলমান বা কমিউনিস্ট নয়।

প্রাচীন ভারতের ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে রচিত প্রচুর বই রয়েছে বাজারে, সে তুলনায় তৎকালীন রাজনীতি ও যুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ক গবেষণা মূলক বই খুব কমই প্রকাশিত হয়েছে, যেগুলো হয়েছিল সেগুলোও আশ্চর্যজনকভাবে বাজার থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে অজানা কারনে। এমনই একটা বই এর নাম ‘From Hydaspes to Kargil: A History of Warfare in India from 326 BC to AD 1999’, লেখক কৌশিক বসু। এখানে সেই খ্রীষ্টপুর্ব ৩২৬ অব্দ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি যুদ্ধের ঘটনার তিনি যথোপোযুক্ত বর্ণনা করেছেন নথি সহযোগে। এমনই আরেকটা বই ‘Ancient Indian Warfare: With Special Reference to the Vedic Period’ এটার লেখক- সর্ব দমন সিং। এছাড়া বিখ্যাত তামিল ঐতিহাসিক ‘ভিষ্মাপেত রামচন্দ্রনের’ লেখা ‘War in Ancient India’ বইটি, যা একটি দুর্মুল্য নথি- এগুলো কখনও কোনো স্কুলের পাঠ্যসূচিতে আসবেনা, যদিও তিন লেখকের কেউই মুসলমান বা কমিউনিস্ট নয়, তবুও। বই তিনটিতে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতায় যুদ্ধের মতাদর্শগত বিষয়গুলো, নানান ধর্মীয় ও গোষ্ঠীজাত পক্ষগুলোর পরিচয় জ্ঞাপনা, হরেক দিশি বিদেশী ঐতিহাসিকের দলিল সহ বর্ণনামূলক ‘সহিংসতার’ ঐতিহ্যগুলো বিষয়ে অত্যন্ত বিস্তৃত ধারণার জন্ম দেয় পাঠকের মননে, যা দুর্দান্তভাবে মৌলিক বিষয়।

বিদেশী লেখকদের মধ্যে, Laurie L. Patton এর লেখা ‘Telling Stories about Harm: An Overview of Early Indian Narratives’ ও ‘John R. Hinnells and Richard King’ লেখকদ্বয় সম্পাদিত ‘Religion and Violence in South Asia: Theory and Practice’ এই বই দুটির মাঝে শুধু ভারতের ইতিহাসই নয়, বরং গোটা দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন ইতিহাসকে নতুন ভাবে জানা ও বোঝার সুযোগ পাবেন। প্রসঙ্গত, এই দুটো বই গুগুলে PDF হিসাবে উপলব্ধ।

এর পাশাপাশি গোবিন্দ নিহালানীর ‘তমশ’ জাতীয় সিনেমা বলিউডের সংস্কৃতি থেকে উধাও হয়ে গেছে, সেখানে সানি দেওলের টিউবওয়েলের পাইপ তোলা ‘গদরঃ এর প্রেম কথা’ কিম্বা ইজ্রায়েলের জাতীয় সংগীত ‘Hatikvah’ এর সুর চুরি করা (মেরা মুল্ক মেরা দেশ মেরা ইয়ে বতন) ‘দিলজ্বলের’ মত সিনেমাগুলো বিকশিত হয়েছে, শরীর সর্বস্ব সিনেমা গুলোর সাথে সাথে। ওম পুরী, অমরিশ পুরী, কুলভুষণ খারবান্দা, স্মিতা পাতিল, সাবানা আজমি, দীপ্তি নাভাল, সদাশিব অমরাপুরকার, নাশিরুদ্দিন শাহ্ প্রমুখদের মত বলিষ্ঠ অভিনেতাদের দ্বারা চিত্রায়িত সমান্তরাল সিনেমা সংস্কৃতি- যা দর্শককে ভাবতে বাধ্য করত, সেগুলো সম্পূর্ন ভাবে বিলুপ্ত করে দিয়েছে। বলিউডের এই বিবর্তন নিয়ে আগামীতে একটা প্রবন্ধ নিয়ে আসা যেতেই পারে।

না পড়লে জানা যায়না, না জানলে ভ্রম বা মিথ্যার প্রাচীরকে অতিক্রম করবেন কীভাবে? আজকের ভারতে RSS এর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, যেমন- বিজেপি, শিবসেনা সহ বিজেপির একদা সহযোগী পশ্চিমবঙ্গের তৃনমূল কংগ্রেস, গোর্খা মুক্তি মোর্চা, বিহারের নীতিশ কুমার, রামবিলাশ পাসোয়ান, মহারাষ্ট্র গোমন্তক পার্টি, তেলেঙ্গনার চন্দ্রশেখর রাও, মেঘালয়ের সাংমা, অন্ধ্রের চন্দ্রবাবু নাইডু, কর্ণাটকের দেবেগৌড়ার দল, কাশ্মীরের মেহবুবা মুফতি, উত্তরপ্রদেশের মায়াবতী, আসাম গণ পরিষদ, ঝাড়খণ্ডে শিবু সোরেন, ওড়িশার নবীন পটনায়ক, তামিলনাড়ুর করুণানিধির DMK, জয়ললিতার AIADMK, পাঞ্জাবের ধর্মী রাজনৈতিক দল ‘আকালি দল’, হরিয়ানা ওমপ্রকাশ চৌথালার দল, এছাড়া উত্তরপুর্বাঞ্চলের প্রতিটি বিচ্ছিন্নতাবাদী দল এর মত সহযোগী বহুরূপী দলগুলির মূল শত্রুই হল- কমিউনিস্ট আর মুসলমানেরা; কেউ বিষ খাইয়ে মারছে তো কেউ মধু খাইয়ে। উদ্দেশ্য একটাই- নিকেশ, সেটা যেভাবেই হোক। বাকিদের কিনে ফেলা যায় অতি সহজে।

স্বঘোষিত বিশুদ্ধ ভারতীয় সংস্কৃতির ‘ধারক ও বাহকের’ দলেরা আপনার মাঝে ‘হিটলার, মুসলিনি, গোয়েরিং’ এর মতাদর্শকে ‘গোয়েবলসের’ ফর্মুলা অনুযায়ী আপনার মাঝে কবেই ঢুকিয়ে দিয়েছে তা আপনি টেরই পাননি। ভাবছেন বুঝি আপনি প্রকৃত দেশভক্ত, ওদিকে দেশের সবকিছু বিকিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে।

তাই প্রতিটি শুভচিন্তক ভারতীয় নাগরিক- যাদের মনেপ্রাণে ও বিশ্বাসে ঢুকে গেছে যে, ‘শুধুমাত্র মুসলমানেরাই বর্বর, আর কমিউনিস্টরা বিদেশী চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ’ পাশাপাশি বাকিরা মুনিঋষি পর্যায়ের; তাদের জ্ঞানচক্ষুর উন্মেষ ঘটবে এই বই গুলো পড়লে। এগুলো পড়ার পর বিচার করুন, তার পরেও ঘৃণা বিদ্বেষ থাকলে আরো পোক্তভাবে সেগুলোর বহিঃপ্রকাশ করুন। বাকিরাও পড়ুন, কারন আমাদের কীভাবে ইতিহাস থেকে দূরে সরিয়ে রেখে ভুলভাল, অতিরঞ্জিত ও মিথ্যা বিষয়কে পরিবেশনা করা হচ্ছে ইতিহাসের নামে, সেটাও জানতে পারবেন।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ও বাপ ঠাকুর্দা চোদ্দপুরুষকে খুঁজুন গবেষণালব্ধ নথি দ্বারা; হিটলারি বিজ্ঞাপনের দেশপ্রেম দিয়ে কখনই যা আপনি জানতে পারবেননা, বা আপনাকে জানতে দেওয়া হবেনা।

ভারতীয় যুদ্ধের সহিংস ইতিহাস ও মুসলমান- শুরুর কথা



আজকের ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘দেশপ্রেমিক’ ধারনাটা হলঃ আরবজাত মুসলমানেরা আফগান, পামির অঞ্চল, কখনও মোগল রূপে বা কখনও পারস্য থেকে এসে ভারত আক্রমণ করেছিল, অতএব এই জাতিটাই একমাত্র বর্বর, রক্তপিপাসু, ক্ষমতালোভী, নিকৃষ্ট তথা জিহাদি জাতি। মুসলমানেরা ভারত আক্রমণ করার পুর্বে এই উপমহাদেশে পবিত্র ‘রামায়ণ ও মহাভারতের মত’ ধর্মযুদ্ধ থাকলেও, অধর্মজাত যুদ্ধ বিষয়টা মোটেই ছিলনা, সেটা সম্রাট অশোক করলেও নয়। সকলে নমস্কার, প্রণাম, আলিঙ্গন, চুম্মাচাটি করত আর রেগে গেলে বড়জোর শাপশাপন্ত করে ছেড়ে দিত, বাকিটা ঈশ্বরের কাজ ছিল- ভাবখানা এমনই বর্তমান ভারতীয় ইতিহাসে। এটা যে শুধু বিজেপির দান তা নয়, রাজীব গান্ধী ও তৎপরবর্তী কংগ্রেস সরকার থেকে আজকের নরেন্দ্র মোদী সরকার- সকলেই সমান অবদান রেখেছে। কংগ্রেস নরম হিন্দুত্ব তাস খেলত, বিজেপি সেটাই ন্যাংটা উদোম করে দিয়েছে, এটাই যা ফারাক।
মূলত বাবরি মসজিদ ভাঙা ও মুম্বই দাঙ্গার পরবর্তী পর্যায়ে- RSS ও তার রাজ্যওয়ারি প্রকাশ্য বা গুপ্ত রাজনৈতিক সহযোগী, অসাম্প্রদায়িকতার ভেকধারী কিছু আঞ্চলিক স্বার্থবাদী দল গুলো মিলে এই RSS এর ঘৃন্য সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষকে সমাজের মাঝে ‘মহীরুহে পরিণত করে দিয়েছে’ নিরবিচ্ছিন্নভাবে সার ও জল সিঞ্চন করে। এদেশে খারাপ কিছু মানেই সেটা মুসলমান জনগোষ্ঠী দ্বারা সম্পৃক্ত, অথবা কমিউনিস্ট; বাকিরা ভাল- কিন্তু ‘সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে ব্রাহ্মণ্যবাদ’- এমন একটা ইউটোপিও ধারণা রেডিও, টিভি সিরিয়াল, সিনেমা, ২৪ ঘন্টার খবরের চ্যানেল, বিভিন্ন টক-শো, সংবাদপত্র, সমসাময়িক সাহিত্য ইত্যাদি প্রচার মাধ্যমের দ্বারা সমাজের মাঝে সুস্পষ্ট ও পরিকল্পিতভাবে বুনে দেওয়া হয়েছে। এখান থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেওয়া অন্তত তিনটে প্রজন্ম ঠিক সেটাই শিখেছে যেমনটা ‘RSS’ এর এ্যাজেন্ডা ছিল, কে ভাল তা নিয়ে গবেষণা থাকুক বা না থাকুক- কিন্তু ‘হিংস্র ও খারাপ’ কিছু মানেই তা মুসলমান- এটা প্রতিষ্ঠিত আজকে এই ২০২০ সালে।
যদিও আজকে পর্যন্ত পাকিস্তান তথা ISI এর চর হিসাবে ধরা পরা প্রায় প্রতিটি ব্যাক্তিই- প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিজেপি বা RSS মতাদর্শের সাথে যুক্ত, এবং তারা কেউই মুসলমান বা কমিউনিস্ট নয়।
প্রাচীন ভারতের ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে রচিত প্রচুর বই রয়েছে বাজারে, সে তুলনায় তৎকালীন রাজনীতি ও যুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ক গবেষণা মূলক বই খুব কমই প্রকাশিত হয়েছে, যেগুলো হয়েছিল সেগুলোও আশ্চর্যজনকভাবে বাজার থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে অজানা কারনে। এমনই একটা বই এর নাম ‘From Hydaspes to Kargil: A History of Warfare in India from 326 BC to AD 1999’, লেখক কৌশিক বসু। এখানে সেই খ্রীষ্টপুর্ব ৩২৬ অব্দ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি যুদ্ধের ঘটনার তিনি যথোপোযুক্ত বর্ণনা করেছেন নথি সহযোগে। এমনই আরেকটা বই ‘Ancient Indian Warfare: With Special Reference to the Vedic Period’ এটার লেখক- সর্ব দমন সিং। এছাড়া বিখ্যাত তামিল ঐতিহাসিক ‘ভিষ্মাপেত রামচন্দ্রনের’ লেখা ‘War in Ancient India’ বইটি, যা একটি দুর্মুল্য নথি- এগুলো কখনও কোনো স্কুলের পাঠ্যসূচিতে আসবেনা, যদিও তিন লেখকের কেউই মুসলমান বা কমিউনিস্ট নয়, তবুও। বই তিনটিতে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতায় যুদ্ধের মতাদর্শগত বিষয়গুলো, নানান ধর্মীয় ও গোষ্ঠীজাত পক্ষগুলোর পরিচয় জ্ঞাপনা, হরেক দিশি বিদেশী ঐতিহাসিকের দলিল সহ বর্ণনামূলক ‘সহিংসতার’ ঐতিহ্যগুলো বিষয়ে অত্যন্ত বিস্তৃত ধারণার জন্ম দেয় পাঠকের মননে, যা দুর্দান্তভাবে মৌলিক বিষয়।
বিদেশী লেখকদের মধ্যে, Laurie L. Patton এর লেখা ‘Telling Stories about Harm: An Overview of Early Indian Narratives’ ও ‘John R. Hinnells and Richard King’ লেখকদ্বয় সম্পাদিত ‘Religion and Violence in South Asia: Theory and Practice’ এই বই দুটির মাঝে শুধু ভারতের ইতিহাসই নয়, বরং গোটা দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন ইতিহাসকে নতুন ভাবে জানা ও বোঝার সুযোগ পাবেন। প্রসঙ্গত, এই দুটো বই গুগুলে PDF হিসাবে উপলব্ধ।
এর পাশাপাশি গোবিন্দ নিহালানীর ‘তমশ’ জাতীয় সিনেমা বলিউডের সংস্কৃতি থেকে উধাও হয়ে গেছে, সেখানে সানি দেওলের টিউবওয়েলের পাইপ তোলা ‘গদরঃ এর প্রেম কথা’ কিম্বা ইজ্রায়েলের জাতীয় সংগীত ‘Hatikvah’ এর সুর চুরি করা (মেরা মুল্ক মেরা দেশ মেরা ইয়ে বতন) ‘দিলজ্বলের’ মত সিনেমাগুলো বিকশিত হয়েছে, শরীর সর্বস্ব সিনেমা গুলোর সাথে সাথে। ওম পুরী, অমরিশ পুরী, কুলভুষণ খারবান্দা, স্মিতা পাতিল, সাবানা আজমি, দীপ্তি নাভাল, সদাশিব অমরাপুরকার, নাশিরুদ্দিন শাহ্ প্রমুখদের মত বলিষ্ঠ অভিনেতাদের দ্বারা চিত্রায়িত সমান্তরাল সিনেমা সংস্কৃতি- যা দর্শককে ভাবতে বাধ্য করত, সেগুলো সম্পূর্ন ভাবে বিলুপ্ত করে দিয়েছে। বলিউডের এই বিবর্তন নিয়ে আগামীতে একটা প্রবন্ধ নিয়ে আসা যেতেই পারে।
না পড়লে জানা যায়না, না জানলে ভ্রম বা মিথ্যার প্রাচীরকে অতিক্রম করবেন কীভাবে? আজকের ভারতে RSS এর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, যেমন- বিজেপি, শিবসেনা সহ বিজেপির একদা সহযোগী পশ্চিমবঙ্গের তৃনমূল কংগ্রেস, গোর্খা মুক্তি মোর্চা, বিহারের নীতিশ কুমার, রামবিলাশ পাসোয়ান, মহারাষ্ট্র গোমন্তক পার্টি, তেলেঙ্গনার চন্দ্রশেখর রাও, মেঘালয়ের সাংমা, অন্ধ্রের চন্দ্রবাবু নাইডু, কর্ণাটকের দেবেগৌড়ার দল, কাশ্মীরের মেহবুবা মুফতি, উত্তরপ্রদেশের মায়াবতী, আসাম গণ পরিষদ, ঝাড়খণ্ডে শিবু সোরেন, ওড়িশার নবীন পটনায়ক, তামিলনাড়ুর করুণানিধির DMK, জয়ললিতার AIADMK, পাঞ্জাবের ধর্মী রাজনৈতিক দল ‘আকালি দল’, হরিয়ানা ওমপ্রকাশ চৌথালার দল, এছাড়া উত্তরপুর্বাঞ্চলের প্রতিটি বিচ্ছিন্নতাবাদী দল এর মত সহযোগী বহুরূপী দলগুলির মূল শত্রুই হল- কমিউনিস্ট আর মুসলমানেরা; কেউ বিষ খাইয়ে মারছে তো কেউ মধু খাইয়ে। উদ্দেশ্য একটাই- নিকেশ, সেটা যেভাবেই হোক। বাকিদের কিনে ফেলা যায় অতি সহজে।
স্বঘোষিত বিশুদ্ধ ভারতীয় সংস্কৃতির ‘ধারক ও বাহকের’ দলেরা আপনার মাঝে ‘হিটলার, মুসলিনি, গোয়েরিং’ এর মতাদর্শকে ‘গোয়েবলসের’ ফর্মুলা অনুযায়ী আপনার মাঝে কবেই ঢুকিয়ে দিয়েছে তা আপনি টেরই পাননি। ভাবছেন বুঝি আপনি প্রকৃত দেশভক্ত, ওদিকে দেশের সবকিছু বিকিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে।
তাই প্রতিটি শুভচিন্তক ভারতীয় নাগরিক- যাদের মনেপ্রাণে ও বিশ্বাসে ঢুকে গেছে যে, ‘শুধুমাত্র মুসলমানেরাই বর্বর, আর কমিউনিস্টরা বিদেশী চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ’ পাশাপাশি বাকিরা মুনিঋষি পর্যায়ের; তাদের জ্ঞানচক্ষুর উন্মেষ ঘটবে এই বই গুলো পড়লে। এগুলো পড়ার পর বিচার করুন, তার পরেও ঘৃণা বিদ্বেষ থাকলে আরো পোক্তভাবে সেগুলোর বহিঃপ্রকাশ করুন। বাকিরাও পড়ুন, কারন আমাদের কীভাবে ইতিহাস থেকে দূরে সরিয়ে রেখে ভুলভাল, অতিরঞ্জিত ও মিথ্যা বিষয়কে পরিবেশনা করা হচ্ছে ইতিহাসের নামে, সেটাও জানতে পারবেন।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ও বাপ ঠাকুর্দা চোদ্দপুরুষকে খুঁজুন গবেষণালব্ধ নথি দ্বারা; হিটলারি বিজ্ঞাপনের দেশপ্রেম দিয়ে কখনই যা আপনি জানতে পারবেননা, বা আপনাকে জানতে দেওয়া হবেনা।

বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

মোদীর ভারতে আত্মনির্ভর চীন



চীন নিয়ে চীনচিনানিটা ইদানিং বড্ড বেড়েছে, চীনা সেনা তাদের এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে আমাদের ভূমি দখল করছে। অসমর্থিত সুত্র মতে লাদাখের প্যাংগং লেকের কাছে আমাদের জোয়ানদের সাথে চীনা সেনার হাতাহাতিও হয়েছে, যার একটা ভিডিও ভাইরাল হলে আমাদের সেনা মুখপাত্র সেটাকে পত্রপাঠ নাকচ করে দেন। এর পর বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও NDTV এর খবর মতে সীমানে দুই দেশের সেনাই ভারী অস্ত্রসস্ত্র মজুত করছে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির জন্য। চীনের এমন ব্যবহার অবশ্য নতুন কিছু নয়, লাদাখ ও অরুণাচলের অনেকটা অংশকে চীন গায়ের জোরে তাদের দেশের অংশ বলে দাবী করে।
IPL এর মাঠে চার ছয় হোক বা আউট, চিয়ারলিডারের দলের নাচুনি কখনই বন্ধ হয়না, একটা না একটা নাচিয়ে দল গানের তালে ঠিক নাচবেই, অধিকাংশ দেশজ মিডিয়া চিয়ার লিডারের মতই নেচে চলেছে সরকারের পক্ষে। এদেরকে সামলে রাখা যাদের কাজ, সেই এডিটর গিল্ডও সরকারের রক্ষিতার কাজ করছে, স্বভাবতই চীন ভারতের ৮০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা দখল করে নিলেও তাদের তরফ থেকে সরকারকে কোনও প্রশ্ন করা হয়নি। লাগাতার তিন বছরে অর্থনীতি নিম্নমুখী- মিডিয়া ‘পাকিস্তান’ দেখিয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবর্ষে GDP ৫% ধসে গেছে, চূড়ান্ত বেকারত্ব, কর্মহীন মানুষের ভিড় বাড়ছে রোজ, পাল্লা দিয়ে ‘ক্ষুধা সূচকে’ অবনমন- মিডিয়ার কিন্তু যত প্রশ্ন সবটাই রাহুল গান্ধী আর কংগ্রেসের জন্য, সরকারের জন্য কেবলই স্তুতিকাব্য, যেমনটা গনিকারা তাদের বাবুদের জন্য করে থাকে।
নেহেরু ও নেহেরুর রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের ৬০ বছরে কি কি হয়েছে দেশে? আধুনিক ভারতের প্রতিটি নবরত্ন প্রতিষ্ঠানই তাদের আমলে তৈরি, যা দেশের গর্ব। যথা-
1. IIT
2. AIIMS
3. BSP
4. SAIL
5. BARC
6. ONGC
7. DRDO
8. IIM
9. NID
10. ISRO
11. BHEL
12. HAL ইত্যাদি
প্রসঙ্গত স্বাধীনতার যে আন্দোলন তা কংগ্রেসের নেতৃত্বেই ছিল, অতঃপর স্বাধীন ভারতে গণতন্ত্র তথা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, কৃষিতে আত্মনির্ভর হয়েছিল, শক্তি তথা বিদ্যুতে আত্মনির্ভর হয়েছিল, যানবাহনের দেশীয় কারখানা তৈরি ও সেই যানের জন্য রাস্তা তৈরি হয়েছিল। ছোট, মাঝারী ও বড় উত্পাদন শিল্পে জোয়ার এসেছিল। আইটি ইন্ড্রাষ্ট্রিতে ভারত মেধার অন্যতম বড় যোগান হিসাবে উঠে এসেছিল। দ্রুত উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে বিশ্বে সম্ভ্রম আদায় করতে পেরেছিল। মোদীর দল RSS স্বাধীনতার লড়াইতে ব্রিটিশদের পক্ষে চরবৃত্তি করত, যাতে ব্রিটিশেরা আত্মনির্ভর থাকে; স্বাভাবিকভাবেই তারা ও তাদের ভক্তদের হিসাবে ভারত আত্মনির্ভর ছিলনা কংগ্রেসী আমলে। তাদের কাছে আত্মনির্ভরতা মানে গোলামী বা দাসত্বের প্রতিশব্দ।
মোদীর আমলে ৬ বছরে আত্মনির্ভরতার কি কি হয়েছে?
গণতান্ত্রিক প্রতিটি সূচককে সবচেয়ে তলানিতে নামিয়ে এনেছে, অর্থনীতিকে শরশয্যায় পাঠিয়েছে, পায়ে হেঁটে ভ্রমণের যুগকে আবার ফেরত এনে আত্মনির্ভরতার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে দিয়েছে পরিযায়ী শ্রমিকদের। সরকার হাত তুলে চৈতন্য হয়ে গেছে, পারলে নিজে নিজে বেঁচে দেখা! মানুষ বুঝতে পারছে, আত্মনির্ভরতার ভক্তিমূলক ‘মন কি বাত’ হল দাসত্ব।
নোটবন্দী, জিএসটি মানুষের রোজগার ছিনিয়ে নিয়েছে। কাশ্মীর, তিনতালাক, রামমন্দির নিয়েরোজকার ফালতু বিতর্ক দিয়ে মাতিয়ে রেখেছে জনগনকে, যাতে প্রশ্ন না করে। ক্রমাগত মবলিঞ্চিং, মুসলমান- দলিত বিদ্বেষ, ও ছোটখাটো দাঙ্গাতে গোটা দেশে হিংসা আর ঘৃণার চাষ করা হয়েছে সযত্নে। মেরুকরণ চূড়ান্ত-
মোদী জামানার এই ৬ বছরের সময়কালে অন্য কিছু দেশগুলোতে কি অগ্রগতি হয়েছে-
 বাংলাদেশ তার গার্মেন্টস কারখানাগুলি চীন থেকে সরিয়ে নিজেদের দেশে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে যা দেশজ শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করেছে।
 থাইল্যান্ড জাপানের ইলেকট্রনিক্স ও রাসায়নিক কারখানাগুলি চীন থেকে সরিয়ে নিজেদের দেশে নিয়ে এসেছে।
 ভিয়েতনাম, যাদের উৎপাদন শিল্পের বৃহত্তম অংশটাই একসময় চীনে ছিল, তারা ২০২২ সালের মধ্যে ১০০% উত্পাদন নিজেদের দেশে সরিয়ে আনার পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু করেছে। মোবাইল টেকনোলজির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তারা গোটা বিশ্বে রপ্তানি করছে সাফল্যের সাথে।
 ইথিওপিয়া তাদের জুতা কারখানাগুলি চীন থেকে সরিয়ে এসেছে।
এরা ভক্তদের ভাষায় ‘আত্মনির্ভর’ হয়নি।
‘দেশপ্রেমিক’ এর ভেকধারী মোদীর ভারত কি করেছে? মেক ইন ইন্ডিয়ার লোগো বানিয়েছে বিদেশ থেকে, তার বিজ্ঞাপনের দায়িত্বও পেয়েছে মার্কিন কোম্পানি। মোদীভক্তেরা দীপাবলীর সময় চীনা ‘টুনি লাইট’ বয়কট করুন ডাক দিয়ে সোশ্যালমিডিয়াতে মিম ছেরেছে, তাতে লাইক শেয়ার করেছে, আর এখন টিক-টক আনইন্সটল করছে। মোদী ও তার দল RSS জানে, যে তাদের শাসনামলে ভারত পরাধীন হয়েছে বিদেশী শক্তি ও অর্থের কাছে, তাই আত্মনির্ভরতার গল্প আনতে হচ্ছে পিঠ বাঁচাতে।
ভারতে চীনের কি ‘বিকাশ’ হয়েছে মোদীর ৬ বছরে?
ভারতের মোবাইল ফোনের বাজারের প্রায় ৭০% দখল করেছে শাওমি, ওপ্পো, ভিভো ইত্যাদি নামের চীনা কোম্পানি গুলো। লিনভো খাঁটি চীনা কোম্পানি, যা ভারতীয় ল্যাপটপের বাজারে ২৪% স্থান দখল করে আছে। ডেল মার্কিন কোম্পানি হলেও তাদের অধিকাংশ প্রডাকশন লাইন চীনে অবস্থিত, যাদের ল্যাপটপ ভারতীয় বাজার ২০% দখল করে আছে। এছাড়া আসুস ও এসার তাইওয়ানের কোম্পানি হলেও বকলমে তা চীনজাত দ্রব্যই; এদের সম্মিলিত ল্যাপটপ কম্পিউটারের বাজার ১১ %। মোদীর শাসনে ‘আচ্ছে দিন’ তো এসেছে, কিন্তু সেটা চীনের।
Directorate General of Foreign Trade | Ministry of Commerce এর তথ্য মোতাবেক ভারতে চীনা পণ্যের আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৬১%, যেখানে ভারতের পণ্য রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে ৯%, এটা মোদী সরকারের একার কৃতিত্ব। আত্মনির্ভরতার বুলি কপচানোর উপযুক্ত সময় এসেছে বটে, কারন বিকিয়ে না গেলে কীভাবে নিজেকে মুক্ত করবে? তাই প্রথম পাঁচ বছরে বিকিয়ে দিয়েছে দেশজ অর্থনীতিকে, সাইফনিক করে রাজনৈতিক তহবিলে সেই বিকানোর দালালি স্বরূপ অর্থও এসে গেছে ‘ইলেক্টোরাল বন্ড’ নামি পোশাকের আড়ালে; এখন ‘আত্মনির্ভর’ হওয়ার গল্প বলে দায় ঝেরে ফেলার ধান্দা।
মোদীর ‘আত্মনির্ভর’ ভারতে চীনা বিনিয়োগের একটা ক্ষুদ্র তালিকাঃ-
• বিগ বাস্কেট- আলিবাবা গ্রুপ, TR ক্যাপিটাল
• বাইজু’স- Téngxùn হোল্ডিং,
• ড্রিম ইলেভেন- ফোসুন
• ডেলিভারি কুরিয়র- Téngxùn হোল্ডিং, Steadview Capital
• Xpress কুরিয়র- Téngxùn হোল্ডিং, Steadview Capital
• E Cart কুরিয়র- Téngxùn হোল্ডিং, Steadview Capital
• হাইক- CTRIP
• ফ্লিপকার্ট- Téngxùn হোল্ডিং, Steadview Capital
• FirstCry - SoftBank Vision Fund
• HomeShop18- Softbank Asia Infrastructure Fund
• মেক মাই ট্রিপ- Téngxùn হোল্ডিং
• গো আইবিবো- Téngxùn হোল্ডিং
• রেড বাস- Téngxùn হোল্ডিং
• উড়ান- Téngxùn হল্ডিং
• ওলা- সিলিং ক্যাপিটাল, Steadview Capital, ইয়েল্ড ইন্টারন্যাশানাল, ECF, চাইনা ইউরেশিয়া ক্যাপিট্যাল
• র‍্যাপিডো- ইন্ট্রিগ্রেডেড ক্যাপিটাল
• ওয়ো- দিদি চুক্সিং, চায়না লোডিং
• পেটিএম- আলিবাবা গ্রুপ, Softbank Asia Infrastructure Fund
• পেটিএম মল- আলিবাবা গ্রুপ
• পলিশি বাজার- Steadview Capital
• কুইকার- Steadview Capital
• রিভিগো- Softbank Asia Infrastructure Fund
• স্ন্যাপডিল- আলিবাবা গ্রুপ, FIM মোবাইল
• জবং- Téngxùn হোল্ডিং,
• মিন্ত্রা- Téngxùn হোল্ডিং,
• ক্লাব ফ্যাক্টারি- Jiayun Data Technology Co. Ltd
• সুইগি- মেচুয়ান দেংপিং, হিলিহাউস ক্যাপিটাল, Téngxùn হোল্ডিং, সাইফ পার্টনারস
• জোমাটো- আলিবাবা গ্রুপ, সুনেউই গ্রুও
• নাইকা- Steadview Capital
• ফার্মইজি- Softbank Asia Infrastructure Fund (একটা অংশ আছে)
• মাই ড্রমেসি- সাইবার কেরিয়ার
• জুম কার- সাইবার কেরিয়ার
• Practo- Téngxùn হোল্ডিং
• Gaana- Téngxùn হোল্ডিং
• MX Player- Téngxùn হোল্ডিং
• Khata Book- Téngxùn হোল্ডিং
মোটামুটি ভারতীয় e-commerce বা গোদাবাংলাতে অনলাইন মার্কেটের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানগুলিই চীনা পুঁজির দাসত্ব করছে। দিনের শেষে লাভের অংশটা চীনেই পৌছাচ্ছে; আর এসবের অধিকাংশের বিজ্ঞাপনী মুখ আমাদের প্রধান সেবক, চৌকিদার ‘নরেন্দ্র মোদী’ নিজে।
এছাড়া ছোটখাটো অগুন্তি চীনা লগ্নি রয়েছে। ‘স্ট্যাচু অফ ইউনিটি’র বরাতও পেয়েছিল "জিয়াংসি টোকাইন মেটাল ক্র্যাফট কর্পোরেশন" নামের চীনা কোম্পানী, তারা চীন থেকে কারিগরও এনেছিল। সস্তার মাইক্রো চিপ তৈরিতে চীনের বাজার শুধু ভারত নয়, গোটা বিশ্বেই একচেটিয়া। আগামীর যে 5G প্রযুক্তি, সেখানে খোদ মার্কিনী ও ইউরোপোয়ীদের কাছেও এর কোনো বিকল্প নেই- ভারত তো সেখানে হিসাবেও আসেনা।
একজন ভক্ত যে শাওমি/ওপ্পো/ভিভো ফোন ব্যবহার করে ফ্লিপকার্ট থেকে শপিং করে, পেটিএমের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করে, তারা সবাইকে চাইনিজ পণ্য বর্জন করতে বলছে। যার ডিপিতে ‘স্ট্যাটু অফ ইউনিটির’ ছবি সাঁটা। এই না হলে আচ্ছে দিন! মানুষ আর ভক্তের তো এখানেই ফারাক।
সোনাম ওয়াংচুকের মত দু’একটা ছুপা ভক্ত চীনা পণ্য বর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় পদপ্রাপ্তির নেশা জন্মেছে মনে, আরেকটু আত্মনির্ভর হতে যেটা ভীষণ জরুরী। চীনা পণ্য বর্জন তো করব, কিন্তু আমরা তো আর চীনে গিয়ে কেনাকাটা করিনা। ওয়াংচুক সাহেব সবাইকে নিজের মত ছাগল ভেবে নিয়েছেন, যে- ‘যা বলব তাই লোকে খাবে’, সকলে যে ভক্ত নয় সেটা ওনারা ভুলে গেছেন। উনার যদি সত্যি সদিচ্ছা থাকত, তাহলে কেন্দ্রের সরকারকে বলুক চীনা পণ্যের আমদানি বন্ধ করতে, ব্যাস হয়ে গেল। ময়ুরপুচ্ছধারী কাকেরা ততক্ষণ পর্যন্ত সুন্দর, যতক্ষননা ডেকে উঠছে, ওয়াংচুক সাহেব সেই তালিকাতে নব্য সংযোজন মাত্র।
ভারতের জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেট, যে দলের মূল স্পনসর ওপ্পো। ভক্তরা নিশ্চই ভারতীয় ক্রিকেট দলকে ব্যান করবে আগামী ৪ বছর-
‘মোদী হ্যাঁয় তো মুমকিন হ্যাঁয়’
তথ্য সহায়তায়ঃ
ইনভেষ্ট ইন্ডিয়ার সরকারী ওয়েবসাইট

মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২০

নেপাল সীমান্ত সমস্যা


পাক অধিকৃত কাশ্মীর নিয়ে মিডিয়ার যতটা আগ্রহ, চীন অধিকৃত কাশ্মীর তথা ‘আকসাই চীন’ নিয়ে এরা ততটাই নীরব। জানিনা কোন কারনে কোন মন্ত্রবলে। তবুও এটা আশ্চর্য করেনা, কারন বিগত ছ’বছরে ভারতীয় মিডিয়া নির্লজ্জতার সর্বোচ্চ সীমা পার করে গেছে; কিন্তু যেটা আশ্চর্য করছে সেটা হচ্ছে নেপালের বর্তমান রূপ, রীতিমত আগবাড়িয়ে তারা ভারতের মত দেশকে হুমকি দিচ্ছে। যারা আমাদের ভারতের চেয়ে আকারে আয়তনে ২১৩৩ গুণ ছোট, অর্থনীতি বা সেনাবাহিনী শক্তি তুলনাতেও আসেনা- তা সে তথ্য দেওয়া বৃথা।

সঙ্ঘ পরিবার, মোদী সরকারের ব্যার্থতা ঢাকতে লাল চীনের সাথে বর্তমান নেপালের বাম সরকারকে এক করে ফেলে, অতি সরলীকরণ এর মাধ্যমে নিজেদের লুকাতে চাইছে। সমস্যার যে বিষয়, তার সময়রেখা আজকে নয়; বরং আজ থেকে ২০০ বছর পিছনে। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাদের সাথে তৎকালীন ‘কিংডম অফ গোর্খা’র সেনাদের লড়াই হয়, যাকে ‘এংলো-নেপালী যুদ্ধ ১৮১৪’ বলা হয় এবং এই যুদ্ধের শেষে ১৮১৫ সালে শেষ নাগাদ ‘সুগৌলির চুক্তি’ সম্পাদিত হয়, যার দ্বারা আজকের নেপাল রাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারিত হয়েছে, যা পশ্চিমে ‘মহাকালী নদী’ বরাবর ও পূর্বে ‘মেচি নদী’ বরাবর। প্রসঙ্গত এই চুক্তি অনুযায়ী নেপালিরা দার্জিলিং ও সিকিম ব্রিটিশদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
সমস্যার সুত্রপাত হয়, পশ্চিম সীমার নির্নায়ক মহাকালী নদী বর্তমান উত্তরাখন্ডের একটা স্থানে এসে দুটো শাখানদীতে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে, যে অঞ্চলটার নাম লিপুলেখ ও কালাপানি। এই মহাকালী নদীর উৎপত্তি লিম্পিয়াধুরা নামে একটা স্থানে। ব্রিটিশ সার্ভেয়ারেরা ১৮২৭ সালে যে ম্যাপ প্রকাশিত করেছিল নেপালের সীমানার, সেখানে দেখা যাচ্ছে নদীর মোটা যে অংশ সেটাকে তারা ‘অফিশিয়ালি’ মান্যতা দিয়েছিল সীমানা হিসাবে। কিন্তু পরবর্তীতে এই অঞ্চলটি চীনের সাথে ব্যবসার জন্য একটা গুরুত্বপুর্ন অঞ্চল হিসাবে দেখা দেয়, ফলস্বরূপ ব্রিটিশরা নেপালিদের সাথে আলোচনা না করেই তাদের ম্যাপে সরু নদী ‘পানিখাদ’কে সীমানা করে নতুন ম্যাপ প্রকাশিত করে দেয় ১৮৬০ সালে প্রকাশিত একটা সার্ভে অনুযায়ী।
তৎকালীন দিনে এই অঞ্চলে কেউ বসবাস করতনা, তাই এই অঞ্চলটার কোনো গুরুত্বই ছিলনা নেপালের রাজার কাছে। একে তো দুর্গম এলাকা, দ্বিতীয়ত কেবল ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের- কৈলাসের মানস সরবোরে যাওয়ার এটা একটা সহজ রাস্তা ছিল, নতুবা সিকিম ঘুরে তাদের মানস সরবোরে যেতে হত, তাই ১৮৬০ এর সমসাময়িকালে নেপালি রাজা বিষয়টিকে একপ্রকার উপেক্ষাই করেছিল বলা যেতে পারে, কারন ১৮৫৭ সালের একটি আভ্যন্তরীণ ঘরোয়া বিদ্রোহে তৎকালীন নেপালি রাজা জঙ্গ-বাহাদুর রানা- ব্রিটিশদের সেনা সাহায্যে বিদ্রোহীদের দমন করেছিল, এর পর থেকেই নেপাল কখনও এই অংশকে তাদের নিজেদের রাজনৈতিক ম্যাপে নেপালের অংশ বলে উল্লেখ করেনি। কিন্তু চীনের কুং রাজবংশের প্রকাশিত তৎকালীন ম্যাপে অংশটিকে নেপালের বলেই উল্লেখিত রয়েছে, যেমনটা ১৮২৭ সালে ব্রিটিশদের ম্যাপে ছিল।
এই ধারাবাহিকতা সেই থেকে চলে আসছে, ব্রিটিশরা এর পর প্রায় ১০০ বছর রাজ ক্ষমতায় ছিল, কোন সমস্যা হয়নি; স্বাধীন ভারতেও ১৯৯০ সালে একবারই সামান্য উচ্চবাচ্য শোনা গিয়েছিল, যখন নেপালে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটেছিল। এছাড়া দীর্ঘ কংগ্রেসি শাসনে নেপাল একপ্রকার ভারতের স্বাধীন করদ রাজ্য হিসাবেই ছিল বলা যেতে পারে। স্বাধীন ভারতে উক্ত ‘লিপুলেখ-কালাপানি-লিম্পিয়াধুরা’ অঞ্চলটি উত্তরাখণ্ডের পিথরগড় জেলার অধীনে রয়েছে, বর্তমানে অঞ্চলটি ভারতের দিক থেকে অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে।
এদিকে নেপালিরা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যেমন চাকরি করে রোজগার করে তেমনই লক্ষ লক্ষ নেপালি ভারতে এসে বিনা পাসপোর্ট বিনা ভিসাতে ব্যবসা, বাণিজ্য, চাকরি সবই করছে একজন আম ভারতীয়ের মতই। তারা আমাদেরই খেয়ে আমাদেরই লাল চোখ দেখাচ্ছে।
বর্তমান ভারতের অকর্মন্য ও চূড়ান্ত ব্যার্থ রাষ্ট্রনেতাদের কল্যাণে নেপালের মত দেশও ভারতের সাথে সংঘাতের যেতে রাজি হয়ে যাচ্ছে, যা এক চরম কূটনৈতিক ব্যর্থতা। ভুটান ছাড়া এই মুহুর্তে প্রায় প্রতিটি প্রতিবেশী দেশের সাথেই ভারতের সম্পর্ক তলানিতে।
মোদী সরকার এক্ষেত্রেও স্বভাবগত ভাবেই নেহেরুর উপরে দোষ চাপিয়ে পালাবার বাঙ্কার খুঁড়তে ব্যস্ত হয়ে গেছে।

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২০

ভুলের নাম যখন মানচিত্র



আকার প্রকারে বৃহৎ মানেই কি- শক্তি ও ক্ষমতা প্রদর্শন করে?
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে মানচিত্র একটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম, ছোট বড় যেকোনো ভ্রমণে আমাদের যাত্রাপথ পরিচালিত হয় এই মানচিত্র দ্বারা। বিভিন্ন ভূ-রাজনীতি এবং পরিবেশ সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে একটা দ্বিমাত্রিক রূপ প্রদান করে এই মানচিত্র। মানচিত্র দেখা আসলে একটা নেশাও বটে, এটা মাননীয় সুব্রত মণ্ডল দাদার সুত্রে আমার পাওয়া, সেই মত সময় সুযোগ পেলে ম্যাপে ঘাঁটাঘাঁটি করতে ভালই লাগে। ছোটবেলায় এ্যাটলাসের মানচিত্র বই দেখতাম, পরে বাঁধানো দামি ডায়েরী গুলোর ভিতরে সুদৃশ্য রঙিন মানচিত্র আঁকা থাকত, ‘পলিটিক্যাল ম্যাপ’ ইত্যাদি যেগুলো ভীষণ কৌতূহল সৃষ্টি করত। নতুন শতকে পদার্পন করার কিছুদিনের মধ্যেই মোবাইলে মানচিত্র এসে যাওয়াতে ভীষণ সুবিধা হয়ে গিয়েছিল- পৃথিবীকে বুঝতে।
ঠিকিই চলছিল, কিন্তু গোল বাঁধল অন্যত্র। ভাইরাস ও ‘আর্টিক্টের বরফ’ শীর্ষক একটা প্রবন্ধ পড়তে গিয়ে গ্রীনল্যান্ডের আয়তন দেখছিলাম, দেখি সাড়ে একুশ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার তার আয়তন, ভারতের আয়তন সম্বন্ধে কোথাও একটা পড়েছিলাম বলে সেটাও মগজে ছিল- পৌনে ৩৩ লক্ষ বর্গকিমি। এই গণিতের হিসাবে দেড়খানা গ্রিনল্যান্ড ভারতে অনায়াসে ঢুকে যাবে, কিন্তু মানচিত্রে দেখে থ হয়ে গেলাম- দেখি ৮-১০ খানা ভারত গ্রিনল্যান্ডের মাঝে অনায়াসে ঢুকে যাবে। ঘ্যাঁটে ঘ…
তারমানে আমাদের মানচিত্র ত্রুটিপূর্ণ? আজ্ঞে হ্যাঁ- বিশ্বের সর্বাধিক স্বীকৃত যে মানচিত্র ‘মার্কেটর ম্যাপ’, আমরাও যেটা অনুসরণ করি, তাতে চিত্রিত অধিকাংশ দেশেরই আকার-আয়তণ মোটেই ততটা নয় যতটা আমাদের দেখায়, বিশেষ করে উত্তর গোলার্ধের উপরের দিকের দেশ সমূহ। এটা নিশ্চিত হাস্যকর রকমের ভুল, কিন্তু আজকেও এটাকেই বয়ে নিয়ে চলেছে সমস্ত ডিজিটাল মানচিত্র কোম্পানিগুলো।
আচ্ছা খুলেই ফেলুন গুগুল মানচিত্র, দেখুনতো গ্রিনল্যান্ডকে কত্তবড় দেখাচ্ছে। এবারে তার পা বরাবর নিচে গিয়ে দেখুন, বেচারা লাতিন আমেরিকা কেমন ছোটখাটো দেহ নিয়ে সেখানে পড়ে রয়েছে। কিন্তু তথ্য কি বলছে? গ্রিনল্যান্ডের আয়তন সাড়ে একুশ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার আগেই বলেছি, সেখানে দক্ষিণ আমেরিকা ১ কোটি ৯২ লক্ষ বর্গ কিমি- মানে প্রায় ১০টা গ্রীনল্যান্ডের সমান। শুধু তাই ই নয়, রাশিয়া, ইউরোপ, কানাডা, আমেরিকা সব’ই অনেক ছোট ম্যাপে যেমনটা দেখায় তার চেয়ে। বরং আফ্রিকা বা আমাদের ভারত অনেক বড় মানচিত্রে, তাদের তুলনায়।
কানাডার পূর্ব দিকের আলাস্কা প্রদেশ, যা আমেরিকার অংশ; ম্যাপে তার যা আকার, তাতে করে আমেরিকার নিচের দিকের দেশ মেক্সিকোর মত পাঁচ-ছটা দেশ ঢুকে যাবে। এখানেও গণিত বলছে আলাস্কার আয়তন ১৭ লক্ষ বর্গকিমির সামান্য বেশি, সেখানে মেক্সিকো অন্তত আরো আড়াই লক্ষ বর্গ কিমি বেশি।
ইংল্যান্ডের ম্যাপের দিকে তাকান, দেখে মনে হবে খান চার- পাঁচেক ওই মাপের দেশ হলেই তা ভারতের সমান আয়তন হয়ে যাবে- কিন্তু অঙ্কের হিসাবে ইংল্যান্ডের চেয়ে আমাদের ভারত ২৫ গুনের চেয়েও বেশি বড় আকারে। প্রকৃতপক্ষে, ‘গ্রেট ব্রিটেন’- জাপান, ফিলিপিন্স, মাদাগাস্কার এবং নিউজিল্যান্ড সহ বেশ কয়েকটি দেশের চেয়ে ছোট। কানাডার আকার নিয়ে আর নাইবা বললাম, যাচ্ছেতাই মাত্রার বুজরুকি সেখানে।
বস্তুত এই মানচিত্র অঙ্কনের পদ্ধতি তাকে ‘প্রজেকশন’ বা প্রক্ষেপন বলা হয়, মানে ধরে নেওয়াই হয় যে এতে ত্রুটি থাকলেও থাকতে পারে। এই মানচিত্রাঙ্কন বিদ্যাকে ইংরাজিতে বলা হয় কার্টোগ্রাফি। ‘মানচিত্র সমীক্ষা ও আন্তঃসরকারী কমিটি’ অনুসারে, মানচিত্র পাঁচ প্রকারের হয়। যথাক্রমে- জেনারাল রেফারেন্স, টপোগ্রাফিকাল, থিম্যাটিক, নেভিগেশন চার্ট এবং ‘ক্যাডাস্ট্রাল মানচিত্র ও তার রূপায়ন’।
• যে মানচিত্র গুলো আমরা নিয়মিত দেখি, পথের দুরত্ব নিরুপন করি, সেগুলো এই ‘জেনারাল রেফারেন্স’ মানচিত্র। একমাত্র এই মানচিত্র পর্বেক্ষন করে বোঝার জন্য বিশেষ নির্দিষ্ট শিক্ষার প্রয়োজন নেই, কিন্তু পরবর্তী মানচিত্রগুলো থেকে তথ্য অনুসন্ধান করতে বিশেষ জ্ঞানের প্রয়োজন হয়।
• অর্ডিন্যান্স সার্ভের ক্ষেত্রে জমির উচ্চতা গভীরতা ইত্যাদি নিরুপনে টপোগ্রাফিকাল মানচিত্র ব্যবহার করা হয়।
• তথ্যগত বিষয়ভিত্তিক টিকা সম্বলিত, যেমন জনঘনত্ব, ভূতত্ত্ব, আবহওয়া ইত্যাদি বিষয়ক মানচিত্রকে থিম্যাটিক মানচিত্র বলা হয়ে থাকে।
• জলপথে একস্থান থেকে অন্য স্থানের দুরত্ব, পথের দুপাশের ভূপ্রকৃতি, বিশেষ বিশেষ স্থানের পরিচিতি, নিমজ্জিত শিলাখন্ড ইত্যাদি বিষয়গুলোর উপরে ভিত্তি করে যে মানচিত্র, তাকে নেভিগেশন চার্ট বলা হয়। যদিও এর সাথে থিম্যাটিক মানচিত্রও জুড়ে তবেই তা নৌ পথের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠে।
• ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জমির মালিকানা সত্ত্ব সম্বলিত চৌহদ্দির বর্ননা যে মানচিত্রে প্রত্যায়িত থাকে তাকে ক্যাডাস্টাল মানচিত্র বলে। আমাদের প্রত্যেকের বাড়ির জমির যে নক্সা, তথা আমিনেরা যে মানচিত্রের সহায়তায় জরিপ করে থাকেন সেটাই এই ক্যাডেস্টাল মানচিত্র। সমস্ত ধরনের মানচিত্রের এটাই বিশদ সংস্করণ যেখানে সুক্ষাতিসুক্ষ বিবরণগুলো লিপিবদ্ধ থকে।
এবারে বিভিন্ন মহাদেশ গুলোর আকার গুলোর দিকে আমরা একটু চোখ বোলায়-
• এশিয়া- ৪ কোটি ৪৬ লাখ বর্গ কিমি
• আফ্রিকা- ৩ কোটি বর্গ কিলোমিটারের সামান্য বেশি
• উত্তর আমেরিকা- ২ কোটি ৪৭ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার
• লাতিন আমেরিকা- ১ কোটি ৯২ লাখ বর্গ কিলোমিটার
• ইউরোপ- ১ কোটি বর্গ কিমির সামান্য বেশি
• অস্ট্রেলিয়া- ৭৬ লক্ষ ৯২ হাজার বর্গ কিলোমিটার
এবারে অনান্য কিছু বড় দেশের আকার আয়তন দেখা যায়-
• রাশিয়া- ১ কোটি ৭১ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার
• কানাডা- প্রায় ১ কোটি বর্গ কিলোমিটার
• চীন- ৯৬ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার
• আমেরিকা- ৯৮ লক্ষ ৩৪ হাজার বর্গ কিলোমিটার
• ব্রাজিল- ৮৫.১১ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার
তাহলে হিসাব গুলো কেমন দাঁড়াচ্ছে! আলাস্কা ছাড়া বাকি আমেরিকা ব্রাজিলের চেয়ে ছোট, চীনের চেয়েও ছোট। অস্ট্রেলিয়া এদের থেকে সামান্যই ছোট, যদিও মাপে তেমনটা নেই। এশিয়া সবচেয়ে বড় মহাদেশ, আর রাশিয়া সবচেয়ে বড় দেশ। ম্যাপের বিশাল অংশ জুড়ে রাশিয়ার অবস্থান, যদিও সেটাও মস্ত ভুল, মানচিত্র দেখলে মনে হবে চীন বাদে ৮-৯টা ‘অবশিষ্ট এশিয়াকে’ রাশিয়ার মাঝে ভরে দেওয়া যাবে। বরং এশিয়া থেকে রাশিয়া আর চীনের আয়তন বাদ দিলে যেটা অবশিষ্ট থাকে সেটা রাশিয়ার সমতুল্য।
সবচেয়ে দৃষ্টিকটু হচ্ছে ইউরোপের অংশে, মানচিত্র দেখলে মনে হবে ইউরোপ আফ্রিকার অর্ধেক। আসলে ইউরোপ আফ্রিকার একতৃতীয়াংশের চেয়েও ছোট। বহু দেশই ‘ম্যাপের প্রজেকশনে’র তুল্যমুল্য আয়তনের চেয়ে অনেকটা ছোট, যথা- আইসল্যন্ড পাঁচ গুণ, ব্রিটেন ৩ গুণ, নরওয়ে ১০ গুণ, সুইডেন ৩ গুণ, ফিনল্যান্ড ৪ গুণ ছোট। বেলারুশ-পোল্যান্ড-কাজাকিস্থান-জার্মানি-ফ্রান্স দেশ গুলো দ্বিগুণ বড় করে দেখানো আছে। এছাড়া ইউরোপের বাকি প্রত্যেকটি দেশ সহ তুরস্ক ও ইরাণও তাদের আসল আয়তনের তুলনাতে একটু বেশি স্থান দখল করে আছে মানচিত্রে।
শুধু কি তাই? আমরা যেটাকে পৃথিবীর উপরের দিক ভাবি, সেই উত্তর দিক আসলে পায়ের দিক। নাসার মহাকাশান এ্যাপেলো-১৭ এর মহাকাশ অভিযাত্রীরা যে ছবি পাঠিয়েছিল তা আমাদের এই সনাতন মানচিত্রটিকে উল্টো করে ধরলে যেমন দেখায় ঠিক তেমন দেখতে। এছাড়া আন্টাকার্টিকা প্রদেশের ম্যাপে কোনো ভূমিরেখর নির্দেশনা নেই, সবটাই বরফাচ্ছাদিত।
প্রতিটি দেশের মানচিত্র, যেগুলো উত্তরমেরুর দিকে রয়েছে আশ্চর্যজনক ভাবে প্রতিটি দেশের আকার, মিছিমিছিই(!) উত্তরোত্তর বৃদ্ধি প্রাপ্ত আয়তনের দিক থেকে। কারন এই মানচিত্র যবে প্রথম চিত্রিত হয়েছিল, সেই ষোড়শ শতকে এই বিপুলা গোলাকার পৃথিবীর বৃহৎ ক্ষেত্রফলের দ্বিমাত্রিক মানচিত্র অঙ্কন করাটাই ছিল একটা চরমতম সাহসী ও বৈপ্লবিক গবেষনাকৃত সম্পাদনা। এই ভুলটা হয়ত তৎকালীন ততটা ত্রুটিজনক না হলেও আজকের দিনে শুধু দৃষ্টিকটু নয়, বরং এটা অপরাধ; যেখানে দুটো পরমাণুর মাঝের সঠিক দুরত্বর নিখুঁত পরিমাপ করা যায়, সেখানে ওই ত্রুটিযুক্ত মানচিত্র কেন থাকবে!
কেন এমন ত্রুটিযুক্ত মানচিত্র অঙ্কিত হয়েছিল?
এই ‘কেন’টা জানতে গেলে আমাদের চলে যেতে হবে পাঁচশ বছর অতীতে, ষোড়শ শতকে। খুব একটা বিদেশ ভ্রমণ না করেও, শুধুমাত্র বিভিন্ন পুস্তক, হরেক ভ্রমণকারী, বনিকদল, রাষ্ট্রকর্তা প্রমুখদের সাথে চিঠি চালাচালি করে, সেই সকল টুকরো টুকরো তথ্যগুলিকে নিয়ে দীর্ঘ গবেষণালব্ধ প্রচেষ্টার দরুন ১৫৬৯ খ্রীষ্টাব্দে তিনি আজকের এই মানচিত্রটির রূপদান করেন জেরার্ডাস মার্কেটর। তৎকালীন ইউরোপের নেদারল্যান্ড রাজ্যের অন্তর্গত ফ্ল্যান্ডার্স কাউন্টিতে জন্ম নেন তিনি; একধারে প্রখ্যাত ভুগোলবিদ তথা ভূ-বিবরণবিদ ও মানচিত্র-অঙ্কন বিশারদ ছিলেন; পাশাপাশি মহাকাশ গবেষণা, জামিতিতেও তিনি ভীষণ পারদর্শী ছিলেন। বর্তমান দিনে এই ফ্লান্ডার্স কাউন্টিটি বেলজিয়ামে অবস্থিত। তিনিই প্রথম দেওয়ালে ঝোলানো বিশ্ব মানচিত্র ও গ্লোব ম্যাপের আবিষ্কার করেন।
ভূগোল, দর্শন, কালানুক্রম এবং ধর্মতত্ত্ব বিষয় নিয়ে মার্কেটর বিস্তর গবেষণা করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৫৯৫ খ্রীষ্টাব্দে তিনি ১২০ পৃষ্ঠার ‘অ্যাটলাস’ নামের সচিত্র মানচিত্র প্রকাশ করেন; এখানে মহাবিশ্বের সৃষ্টির বিবরণ এবং চিত্রিত সমস্ত দেশের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করেন। খ্রিষ্টীয় ধর্মগ্রন্থ, যথা- গসপেল ও ওল্ড টেস্টামেন্ট আধারে মানচিত্র অঙ্কন করেছিলেন। এর পাশাপাশি তিনি একজন দক্ষ কালিগ্রাফার ও ভাস্কর ছিলেন, তৎকালীন প্রতিটি গ্লোব ম্যাপের সকল কিছুই নিজে হাতে বানাতেন ও অঙ্কন করতে।
পঞ্চদশ শতকের মধ্যভাগ থেকেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে কিছু সাহসী মানুষ জলপথে যাত্রা শুরু করেছিলেন নিত্যনতুন দেশ আবিষ্কার করে ভাগ্যান্বষনের জন্য, কেউ রাজার ইচ্ছায় কেউবা বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজে। মজার বিষয় হল, সে সময় খোদ ইংল্যান্ডের নিজেরই তেমন গ্রহণযোগ্য মানচিত্র ছিলনা। এমতাবস্থায় অস্ট্রিয়ার রোমান শাসক তথা স্পেনের রাজা তথা নেদারল্যান্ডের ডিউক ‘পঞ্চম চার্লসের’ একান্ত ব্যাক্তিগত পরামর্শদাতা জিন কার্ন্দোলেত এর কানে আসে এই ভূগোলবিদ জেরার্ডাস মার্কেটর এর কথা। সামুদ্রিক নৌচালন বিদ্যায় পথ নিরুপন করা ও দূরত্বের পরিমাপ করার জন্য তখন কোনো একক মানচিত্র ছিলনা ইউরোপীয় শাসকদের কাছে, যা সর্বজনগ্রাহ্য। এরই সমাধানের জন্য জিন কান্দোর্লেত পৃষ্ঠপোষকতা করলেন মার্কেটরকে, কিন্তু তার চাহিদা ছিল অতি সামান্য- দুটো মাত্র গ্লোব। এই আত্মবিশ্বাসই মার্কেটরকে পরবর্তীতে খ্যাতিমান হতে সাহায্য করেছিল।
পরবর্তীতে জার্মানির জালিচ প্রদেশের শাসক, তার পুত্রের রাজ্যাভিষেক এর প্রাক্কাল্লে একসেট নতুন ও নিখুঁত মানচিত্র তৈরির বরাত দেয় মার্কেটরের কাছে। সেই দুর্মুল্য সংগ্রহটি বর্তমানে ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে সংরক্ষণ করা রয়েছে ‘আটলাস’ নামে। এটার নিরিখেই পরবর্তী বিশ্বের মানচিত্র অঙ্কিত হয়েছিল, যা আজও গোটা পৃথিবীতে ধ্রুবক হিসাবে ববহৃত হয়ে আসছে।
লুথেরিয়ানদের ধর্ম বিশ্বাস মতে উত্তর দিক হল পবিত্র, প্রসঙ্গত মার্কেটর নিজেও একজন লুথেরিয়ান ধর্ম বিশ্বাসী ছিলেন। এজন্যই মানচিত্রে উত্তরদিন উপরের দিকে করেছিলেন তিনি জেনেবুঝেই।
মারকেটরের জীবনীকার, ‘ঘিচ’ এর ভাষ্য অনুসারে, তৎকালীন সকল ইউরোপিয়ান শাসকই চাইত- তাদের দেশগুলো যেন আকৃতিতে বড় করে দেখানো হয়, এতে করে নিজেদের ‘সুপ্রিমেসি’ বা অধিপত্যের দম্ভ দেখানো যেত। সমসাময়িক কালে মারকেটরের কোনো প্রতিদ্বন্দী ছিলনা, স্বভাবতই অধিকাংশ বরাতই তার কাছে আসত; এবং অতিরিক্ত অর্থ সমাগমের অভিপ্রায়ে মারকেটর প্রত্যেকেরটাই এমন করে ‘গোপনে’ বাড়িয়ে দিয়েছিল বলে অনুমান করেন। এছাড়া এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ছোট করে দেখিয়ে দিলে, ইউরোপিয়ানদের নিজেদের দখলীকৃত অংশগুলো আকারে অনেকটা বড় লাগত পরিমাপের এককে, ৫% অধিগ্রহণ করে- দেশে এসে জানাতো ২৫% দখল করেছি, তাতে গৌরব বাড়ত। তৎকালীন সময়ে ইউরোপের বাইরে কোন দেশেই যেহেতু মারকেটর নিজে যাননি, তাই আয়তনটা কিছুটা তারই মস্তিষ্কপ্রসুতও ছিল। এছাড়া কাগজকে শঙ্কু আকৃতির বানিয়ে, তা থেকে গোলাকার পৃথিবী বিষয়ে ধারণা করেছিলেন মারকেটর, সেখান থেকেও এমন ভুল হবার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও এগুলো সবই সম্ভাবনা মাত্র, আসলে বিষয়টা কী ছিল তা একমাত্র মারকেটরের বাইরে কেউই জানতেননা, বাকিটা পাঠকের ভাবনার উপরে ছাড়া হল।
কিন্তু এই ভুলটা জানা গেল কীভাবে!
১৮৮৫ সালে জেমস গল এবং আরনো পিটার্স নামের দুই ভূগোলবিদ সর্বপ্রথম আয়তাকার মানচিত্র ‘প্রজেকশন’ করেন, যাকে গল-পিটার্স প্রজেকশন বলা হয়ে থাকে। এটা বিষয়ে ১৮৮৬ সালে ফলাও করে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রবন্ধাকারে ছাপানোও হয়েছিল, এর পরে গোটা বিশ্বজুড়ে একটা রাজনৈতিক শোরগোল পরে যায়, ফলস্বরূপ বিশ্বমোড়লেরা বিষয়টিকে ধামাচাপা দিয়ে দেয়। এরপর হঠাৎ করেই ২০১৬ সালের একটা সম্মেলনে পুনরায় এই নিয়ে প্রস্তাব উঠলে, মার্কেটরকে বাতিল করে ‘গল-পিটার’ এর মানচিত্রকেই ইউনেস্কো মান্যতা দেয়; সেই মত আমেরিকা ও ইউরোপের অধিকাংশ দেশে এই প্রোজেকশনকেই সরকারী ভাবে ব্যবহার শুরু করে এই সেদিন, ২০১৭ সাল থেকে।
তাহলে ১৮৮৫ সালের আগে কি কোনো বিশুদ্ধ ম্যাপ ছিলনা পৃথিবীতে? অবশ্যই ছিল, কিন্তু ইউরোপিয়ানদের কাছে ছিলনা। মার্কেটরেরও প্রায় ৫০ বছর আগে ‘পিরি রেইস’ নামের একজন তুরস্কের অটোমান সাম্রাজের সেনাধ্যক্ষ ছিলেন, হরিণের চামড়ার উপরে তিনিই পৃথিবীর পূর্ণাঙ্গ ম্যাপের চিত্রাঙ্কন করেছিলেন, বর্তমানে যেটা অনেকটা বিনষ্ট হয়ে গেছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এখানে আন্টার্ক্টিকারও পূর্ণ ও রেখচিত্র নির্দেশিত রয়েছে যার দ্বারা টপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্র চিত্রণ করা সম্ভব।
পিরি রেইসের পুরো নাম ছিল আহমেদ মহিউদ্দিন পিরি। নৌ-যাত্রার উপরে তার লেখা বই ‘কিতাব-ই-বাহারাইয়ি’ গোটা বিশ্বের কাছেই এক অমুল্য নথি। ঝড়ের প্রকারভেদ সম্পর্কে তার গবেষণালব্ধ তথ্য, নৌ-কম্পাস ব্যবহার করার হরেক কৌশল; বিভিন্ন বন্দর এবং উপকূলরেখার বিষয়ে বিশদ তথ্য সহ তার তালিকা, আকাশে নক্ষত্রগুলি ব্যবহার করে দিকনির্দেশের পদ্ধতি, বিভিন্ন সাগর-মহাসাগর এবং তাদের চারপাশের জমিগুলির বৈশিষ্ট্য সমূহ একত্রিত করে সে এক দুর্মুল্য পুস্তক রচনা করেছিলেন। এই বই এর প্রথম সংস্করণ ইস্তানবুলের পাশাপাশি, ব্রিটিশ লাইব্রেরি, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি, প্যারিস, ভিয়েনা, বাল্টিমোরের মত বড় বড় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত রয়েছে।
গ্রেট আলেকজেন্ডার থেকে কলম্বাস হয়ে ভাস্কো-দা-গামা, এমন অনেকের নথি নিয়েই পিরি রেইস কাজ করেছিলেন, যা তার বইতে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর বানানো ১৫১৩ খ্রীষ্টাব্দের মানচিত্রের প্রথম টুকরো ১৯২৯ ক্রীষ্টাব্দে তুরস্কের ইস্তানমুলের এক গুদাম থেকে উদ্ধার হয়। যে মানচিত্র, আজকের দিনেও প্রায় নিখুঁত। মানচিত্রের দ্বিতীয় অংশটি ১৫২৮ খ্রীষ্টাবে অঙ্কিত, যেটি মিশরের কায়রো থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। প্রসঙ্গত, কর্মে গাফিলতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে এই কায়রো শহরেই পিরি রেইসকে মৃত্যুদণ্ডে দন্ডিত করা হয়েছিল। আজকের তুরস্ক নৌবাহিনীতে বহু জাহাজ ও নৌ-বহর পিরি রেইসের নামে রয়েছে।
তবে সভ্যতার ইতিহাসে সর্বপ্রথম চিত্রাঙ্কিত কোনো বৈশ্বিক ম্যাপের উল্লেখ পাওয়া যায় খ্রীষ্টপূর্ব ১০০ সনের কাছাকাছি সময়ে। প্রখ্যাত গ্রীক গণিতজ্ঞ, জোর্তিবিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদ ক্লৌদিয়াস ‘টলেমি’ তাঁর ‘জিওগ্রাফিয়া’ গ্রন্থে বিশ্বের মানচিত্র সম্বন্ধে একটা গ্রহণযোগ্য ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
তাহলে, এই হল মানচিত্র, তার ত্রুটি ও তার বিবর্তন সংক্রান্ত একটা ছোট প্রবন্ধ।
আপনারা এই ওয়েবসাইটে গিয়ে দেশগুলির আকার আয়তন নিয়ে একটু মজার খেলা খেলতেই পারেন-
https://thetruesize. com/
প্রাথমিক তথ্যসুত্রঃ The Daily Mail, UK. 17 Aug, 2016

বুধবার, ২৭ মে, ২০২০

Solar Minimum

 


সূর্য হল এই পৃথিবীর জীবনী শক্তির অন্যতম একক, সৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় উত্তাপ বা শক্তি আমরা সূর্য থেকেই পেয়ে থাকি। সুর্যকে কেন্দ্র করেই আমাদের পৃথিবী আবর্তিত হয়, ঋতুর পরিবর্তন ঘটে। ঝকঝকে মেঘমুক্ত আকাশের দিকে ভন্যি দুপুরে যদি চেয়ে দেখলে, দেখা যাবে দিগন্ত বিস্তৃত নীলিমার মধ্যে চিরায়ত ভাবে সূর্য আমাদের সমান ভাবে- সমান তেজে সম্বৎসর আলো প্রদান করে চলে।

আমাদের মত যারা সাধারণ মানুষ তাদের কাছে এটা সত্য হলেও, যারা কিনা জ্যোর্তিবিজ্ঞানী তাদের কাছে এ কথাটা সত্য নয় মোটেও; বরং চন্দ্রকলার মত সুর্যেরও হরেক কলা রয়েছে। সুর্যের বাইরের যে উতপ্ত পৃষ্ঠতল- তাকে বলা হয় করোনা, এই বাইরের স্তর তথা সৌর শরীর করনাতে ‘করোনাল হোল’ নামে একধরনের ক্ষত সৃষ্টি হয়; যা নাসার বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন ‘সোলার ডায়নামিক্স অবজারভেটরি’ নামের উপগ্রহের পাঠানো তথ্য মোতাবেক।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, সুর্যের পৃষ্ঠতলের উজ্জ্বল অংশগুলি মূলত উচ্চচাপে জমে থাকা ঘন গ্যাসীয় মেঘ, যেখানে উতপ্ত বিস্ফোরণ অতি সাধারণ ঘটনা, সুর্যের কেন্দ্রস্থল থেকে নির্গত হয়ে আসে ফুটন্ত লাভা, যা ক্রমাগত তাপ বিকিরন করতে থাকে। এই বিকিরনের মাঝে রঞ্জন রশ্মি থেকে অতিবেগুনী রশ্মি সবই রয়েছে। এই অঞ্চলগুলো একসময় অন্য অংশের তুলনাতে ঠান্ডা হয়ে যায় সুর্যের আপন নিয়মে, ইনফ্রারেড ক্যামেরাতে ওই অঞ্চলও গুলোকে তখন কালো ক্ষতের মত দেখায়, একেই ‘করোনাল হোল’ বা সৌর কলঙ্ক বলে। এই সৌর কলঙ্কগুলো সুর্যের বাকি অংশের তুলনায় ভিন্ন বৈশিষ্টের হয়ে থাকে, উত্তাপের তারতম্যের কারনে সৌর ঝড়ের সৃষ্টি হয়। কিন্তু সৌর কলঙ্ক অঞ্চলে তড়িৎ চুম্বকীয় প্রভাব ভীষণ ভাবে কমে যায়, যার প্রভাবে একলপ্তে বিপুল পরিমাণ- বিভিন্ন মাত্রার তরঙ্গকণা মহাকাশের বুকে ছড়িয়ে পরে ওই অঞ্চল থেকে।

এখন পৃথিবী মুখের সৌর পৃষ্ঠতলে এমন সৌর কলঙ্কের সৃষ্টি হলে সেগুলো থেকে নির্গত হওয়া তরঙ্গ কণাগুলো অনেকসময় তা পৃথিবীপানে ধাবিত হয়; এটাই জীব জগতের ক্ষেত্রে যথেষ্ট হুঁশিয়ারি স্বরূপ- যদি সেই সৌর তরঙ্গের পরিমাণ অত্যাধিক বেশি হয়। সম্প্রতিকালে জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের সৌর গবেষকেরা দাবি করেছেন, ‘দিনে দিনে শেষ দশকে সূর্যের তেজ ও উজ্জ্বলতা কমতে শুরু করেছে’। এর ফলে সূর্যের ক্রিয়াকলাপও দিনে দিনে হ্রাস পেতে শুরু করেছে, যা সাধারণ মানুষের দৃশ্যমানতার মাঝে না থাকলেও বিজ্ঞানীরা ঠিক ফারাক নিরুপন করে ফেলেছেন।

একেই বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন সোলার মিনিমাম বা ‘নূন্যতম সৌরীয়’ দশা। এটি সৌর চক্রের একটি নিয়মিত দশা, যার উল্টো দশার নাম হচ্ছে ‘পরম সৌরীয় দশা’ বা সোলার ম্যাক্সিমা। জাতিসংঘের বিশ্ব জলবায়ু শীর্ষক আলোচনায় এই বিষয়টি একটি গুরুত্বপুর্ন অংশ হিসাবে বিবেচিত হওয়া শুরু হতেই- এটি জনসমাজে যথেষ্ট কৌতুহলের সৃষ্টি করেছে, এবং সেই সুত্র ধরেই এই প্রতিবেদন সঙ্কলন।

সৌর ন্যূনতম হ’ল ‘সূর্যের হিসাবে’ ১১ বছরের ‘সৌর চক্রের’ সর্বনিম্ন সৌর ক্রিয়াকলাপ। ১৯৭৬ সাল থেকেই বিজ্ঞানীরা সুর্যের এই কার্যকলাপ নিয়ে গবেষণা করছেন, ও নানান জটিল গণনার মাধ্যম দিয়ে বিগত ৫০০০ বছরের একটা গানিতিক চিত্র তুলে ধরেছেন- সুর্য কখন কেমন ছিল। সেই মোতাবেক দেখা গেছে- পৃথিবীর হিসাবে ৪০০ বছর অন্তর অন্তর বড় ধরনের সৌর কলঙ্কের সৃষ্টি হয়। বর্তমান সৌরচক্রের আগেরটি শুরু হইয়েছিল ১৯৯৬ সালের এপ্রিল মাসে, এটি ক্রমে তার সর্বচ্চ সীমায় পৌঁছে ছিল ২০০০-২০০১ সাল নাগাদ, আগেই উল্লেখ করেছি একে পরম সৌরীয় দশা বলায় হয়। এক্ষেত্রে পরম দশা ও নূন্যতম দশা দুই ক্ষেত্রেই তেমন বড় আকারের কিছু পরিবর্তন ঘটেনি সূর্যের পৃষ্ঠতলে।

বর্তমান দশাটি শুরু হয়েছে ২০০৯ সাল নাগাদ, বিজ্ঞানীরা যার নাম দিয়েছে সৌরচক্র-২৪। যার পরম দশা অতিক্রম করে এসে এই ২০২০ সালে নূন্যতম দশা শুরু হয়েছে, যা সর্বচ্চো সীমায় পৌঁছাবে ২০২৫ সাল নাগাদ। এটি কমপক্ষে ১৩ বছর যাবৎ স্থায়ী বলে বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন। দুরবীক্ষন যন্ত্রের দ্বারা প্রাপ্ত চিত্র বিশ্লেষণ করে, এই ২৪ তম সৌরীয় দশাটিকেই ওই ৪০০ বছরের অন্তরের ‘মহা নিম্ন দশা’ হিসাবে অনুমান করছেন বিশ্বের সংখ্যাগুরু জ্যোর্তিবিজ্ঞানী।

নূন্যতম সৌরীয়’ দশার অর্থ এই নয় যে সূর্য তার শক্তি খোয়াচ্ছে, বরং এটা সূর্যের একটা আভ্যন্তরীণ বিন্যাস পদ্ধতি, আমাদের পৃথিবীর ঋতুর মতই যা পরিবর্তনশীল নিয়মিত অন্তরে। ২০২০ সালে যে সৌর কলঙ্ক গুলি দৃশ্যমান হয়েছে ও যার জন্য বিষয়টা চর্চায় এসেছে তার কারন এই কলঙ্কের চিত্রের আয়তনটা যথেষ্ট বড় মাপের। এক্ষেত্রে কোটি কোটি টন বিদ্যুতায়িত গ্যাসীয়-চৌম্বকীয় আণবিক তরঙ্গ তথা সৌরীয় কণা এক লহমায়, বেশ কিছু দিন ধরে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়বে। প্রসঙ্গত, সুর্যের হিসাবে ওই বেশ কিছু দিন আমাদের পৃথিবীর হিসাবে বেশ কিছু বছরের সমষ্টি, আর এখানেই ভয়ের পোকা বাসা বেঁধেছে কিছু বিজ্ঞানীদের মনে।

নুন্যতম সৌর দশাতে শুধু যে সুর্যের বিকিরনের ভয়ই একমাত্র তা কিন্তু নয়, বরং সুর্যের রাশ সাময়িক হালকা হলে সেই ফাঁকে অন্যান্য ‘কসমিক রে’ বা মহাকাশীয় রশ্মিও পৃথিবীতে হানা দিতে পারে, যার চরিত্র সম্বন্ধে বিজ্ঞানীরা তেমন ওয়াকিবহাল নয়। এটা ঠিক কত বড় বিপদের কারন হতে পারে বা অদৌ এমন কিছু হবেনা- ‘গোটাটাই হয়ত কষ্ট কল্পনা’, তার কোনো নিশ্চয়তা কোন বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রই দিতে পারেনি।

আধুনিক সমকালীন বিশ্বে সৌর বিকিরনের কোনও প্রভাব ঘটেনি, মার্কিন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র নাসার তথ্য মতে- বিগত ২০০ বছরের ইতিহাসে এই ‘সৌর চক্র-২৪’ নূন্যতম দশা সবচেয়ে দুর্বল দশা।

সত্যিই যদি এই ‘নূন্যতম সৌরীয় দশা’র প্রভাবে ক্ষতিকর সৌর তরঙ্গ হোক বা অজানা কোনো মহাকাশীয় তরঙ্গ, স্বাভাবিকের চেয়ে যদি অধিক পরিমাণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে আঘাত হানে, সেক্ষেত্রে গোটা বিশ্বের অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে- যেমন আসবে বাস্তুতন্ত্রে। যার সাথে সরাসরি যুক্ত বর্তমান সভ্যতার অর্থনৈতিক সুরক্ষা, খাদ্য উত্পাদন সুরক্ষা এবং অন্যান্য বিবিধ মাত্রার বিষয়, যা এক অদ্ভুত ব্যাতিক্রমী সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, নিশ্চই এটা আগামীর পৃথিবীর জন্য যথেষ্ট উদ্বেগজনক।

করোনাল গর্ত’ থেকে প্রবাহিত অতিরিক্ত সৌর তরঙ্গ প্রবাহগুলি পৃথিবীর চৌম্বকীয় অঞ্চলে আঘাত করলে, পৃথিবীর আবহাওয়ার ভীষণ কুপ্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। যার মধ্যে পৃথিবীর চৌম্বকীয় অস্থায়ী অস্থিরতা অর্থাৎ ট্যেকটনিক প্লেটের অনিয়ন্ত্রিত চলনের ফলে ভয়ানক ভূমিকম্প বা অগ্নুৎপাত হতে পারে ঘনঘন, যা সুনামির কারন হতে পারে। ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের দরুন ঋতুর বিন্যাস বদলে যেতে পারে সাময়িক, ক্ষতিকর মেরুপ্রভার দরুন মেরুপ্রদেশের বরফ গলে যেতে পারে, কিছু উষ্ণ অঞ্চলে আবার হিমযুগ ফিরে আসতে পারে ছোট সময়ের জন্য। পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নেভিগেশন সিস্টেমে গণ্ডগোল হবার মাত্রা বহুলাংশে বেড়ে যেতে পারে। বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রেও ক্ষতির সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিচ্ছেননা বিজ্ঞানীরা, যেমন টেলিযোগাযোগ বা জিপিএস সিস্টেমে চরম ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।

কেন করছেন?

আমাদের পৃথিবীর উপরের যে বায়ুমণ্ডল তা সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মির বিকিরণ দ্বারা উত্তপ্ত হয়ে যায়, যেখানে উপগ্রহেরা আবর্তন করে পৃথিবীর চতুর্দিকে। নিচের বায়ুমণ্ডলের কক্ষপথ তুলনামুলক ভারী, যার সাথে উপরের ওই বায়ুমণ্ডলের অবিরাম ঘর্ষন হয়ে চলে। এই ঘর্ষণের ফলে- সময়ের সাথে গতি হারানো উপগ্রহগুলিকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনে অভিকর্ষ বলের দরুন। সৌর ন্যূনতমের সময়, পৃথিবীর উপরের বায়ুমন্ডল প্রাকৃতিক ভাবে গরম হবার প্রক্রিয়াটি ব্যহত হয়, ফলত বায়ুমণ্ডল শীতল হয়ে যায় এবং যার দরুন উপগ্রহ গুলি তার স্বাভাবিক পরিবেশ হারিয়ে- মহাকাশীয় আবর্জনা হয়ে মহাশূন্যে হারিয়ে যেতে পারে সময়ের অনেক আগেই, কিম্বা অকাল পতন ঘটতে পারে।

সৌর ন্যূনতম’ সময়ে পৃথিবীর উপরের বায়ুমণ্ডলে গ্যালাকটিক মহাজাগতিক রশ্মির সংখ্যা বেড়ে যায়। গ্যালাকটিক মহাজাগতিক রশ্মি হ’ল উচ্চ শক্তির কণা যা সৌরজগতের দূরবর্তী দিকের সুপারনোভা বিস্ফোরণ এবং গ্যালাক্সির অন্যান্য তীব্র ঘটনাগুলির দ্বারা ত্বরান্বিত হয়। এটি মহাকাশচারী নভোশ্চরদের জন্য ভয়ানক ক্ষতির কারন হয়ে দেখা দিতে পারে, যার ফলে স্পেশস্টেশন সহ মহাকাশ গবেষণার যে পরিকাঠামো- সেটাই বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে বর্তমান সময়ের মতই সৌরকলঙ্ক তৈরি হয়েছিল সূর্যের পৃষ্ঠতলে, তখনও পৃথীবিতে ভয়ঙ্কর রকমের জলবায়ু সংক্রান্ত পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়েছিল; যা প্রায় ৩০ বছর মত স্থায়ী হয়েছিল। খৃষ্টপূর্ব ৩০০ সালেও এমনই হঠাৎ করেই আবহাওয়া পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল, বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে সেটাও এমন সৌরীয় নূন্যতম দশার কারনেই ঘটেছিল।

১৮১৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার মাউন্ট তম্বোরার আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটেছিল, যার ফলে উদ্ভূত সুনামিতে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এই ১৮১৫ সালেই সংগঠিত হয়েছিল নেপোলিয়োন ও ব্রিটিশদের মাঝে ওয়াটারলুর যুদ্ধ। এই বছরের শেষে ইউরোপের ভুখন্ডে গ্রীষ্ম বা বসন্ত কোনও ঋতুই আসেনি শীত ছাড়া। মার্কিন এক গির্জার পাদ্রির লেখা ডায়রি থেকে জানা যায়, মধ্য ১৮১৫ সালে ভয়ানক তুষারপাত হয়েছিল, যার উদাহরন সমসাময়িক কালে ছিলনা। এমনকি সমস্ত জলাশয়ের জলকে জমাট বরফে পরিণত করে দিয়েছিল কয়েক বছরের জন্য।

সে সময় যে ফসলগুলি জমিতে বোনা হয়েছিল সেগুলো সবই হিমায়নের প্রভাবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, খুব স্বল্প সংখ্যক জমির ফসলই কাটা গিয়েছিল, ফলস্বরুপ খাদ্য ও শস্যের দাম আকাশ ছোঁয়া হয়ে যায় ১৮১৫ সালের পারিপার্শ্বিক সময়কালে। আয়ারল্যান্ডের ইতিহাস মোতাবেক তাদের মুখ্য ফসল আলু মাটিতেই পচে যায় সমসাময়িক কালে, যার ফলে ব্যাপক হারে অনাহারে মৃত্যু হয়েছিল। ইংল্যান্ডে, ফ্রান্স এবং জার্মানি ইত্যাদি দেশেও পর্যাপ্ত গমের ফলন না হওয়ার দরুন রুটির ঘাটতি দেখা দেয়; খাদ্যের জন্য দাঙ্গা হাঙ্গামা এবং লুটপাট ছিল অতি স্বাভাবিক ঘটনা। এশিয়ার দিকে নজর দিলে দেখা যায়, উত্তর চীনে লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারে মারা গিয়েছিল। সে বছরই দক্ষিণ এশিয়ায়, মুষলধারে বৃষ্টিপাতের কারণে কলেরা মহামারী সৃষ্টি হয়েছিল যা আরও অনেকের প্রাণহানি ঘটিয়েছিল।

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত কমিটির কিছু বিজ্ঞানীদের মতেও, বর্তমান সৌর ক্রিয়াকলাপটি পৃথিবীর জলবায়ুতে খুবই ছোট ভূমিকা পালন করবে, বরং এর চেয়ে মানব-উত্পাদিত গ্রিনহাউস গ্যাস অনেক বেশি ক্ষতিকর আগামীর জন্য। অনিয়ন্ত্রিত কার্বন নিঃসরণের ফলে নির্গত গ্রিন হাউজ গ্যাসের প্রভাবে গত ১৫০ বছরে পৃথীবির গড় উষ্ণতা ২ ডিগ্রী বৃদ্ধি পেয়েছে বলে গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে, এটা সৌরীয় বিকিরনের চেয়ে ৫০ গুণ বেশি ক্ষতিকর।

ক্ষয়ক্ষতি বিষয়ে নাসা একদল বিজ্ঞানী জানাচ্ছেন, এই নূন্যতম সৌরদশা মোটেই ততটা ভয়ঙ্কর নয় যতটা ১৭৯০-১৮৩০ পর্যন্ত চলা নূন্যতম সৌরীয় দশাতে ছিল। সে সময় নৃশংস শীত, ব্যাপকহারে ফসলের ক্ষতির দরুন হওয়া দুর্ভিক্ষ, তাকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শক্তিশালী আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের মত ঘটনা ঘটেছিল, এবারে তেমন কোনও সম্ভাবনা নেই এখনও পর্যন্ত তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী।

তাই, অহেতুক ভয় না পেয়ে বিজ্ঞানীদের পরামর্শের উপরে ভরষা রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ, আর বিশ্বাসীদের জন্য তো ‘all-mighty’ রইলেনই- যিনি সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা ও নিয়ন্ত্রক।

সুত্রঃ

https://www.spaceweatherlive. com/

https://science.nasa. gov/

https://www.sciencedirect. com/

https://electroverse. net/


তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...