শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২০

RSS এর প্রতি ঘৃণা প্রদর্শনই প্রকৃত দেশপ্রেম



সেদিনের দালালেরা যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তাদের বীর্যে জন্মানো সন্তানেরা আজকে দেশপ্রেমের ঠিকে নিয়ে ছদ্ম দেশপ্রেমের হুজুক তুলে পুঁজিপতিদের কাছে আবার পরাধীন করে দেওয়ার পথে অনেকটা এগিয়ে গেছে।


এর পর সরকারের বেসরকারী করনটা করে দিলেই উন্নত পরিষেবা সম্পূর্ণ হবে, হবে ব্রিট্রিশদের প্রতি তাদের জুতো চাঁটা ভৃত্যদের উপহার।

আজকের স্বাধীনতা দিনে তাদের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শনই আপনার দেশপ্রেমের প্রকৃত নমুনা।


নিচের অংশটাঃ গণদাবী থেকে

আমাদের দেশ ভারত যখন ব্রিটিশের উপনিবেশ ছিল, যখন দেশের তরুণেরা মুক্তির মন্দির সোপান তলে আত্ম বলিদান দিয়েছে, তখন কী ভূমিকা নিয়েছিল আরএসএস?

আরএসএস–এর প্রতিষ্ঠা ১৯২৫ সালে৷ প্রতিষ্ঠাতা ডঃ হেডগেওয়ারের পরে এম এস গোলওয়ালকর আরএসএস–এর পরিচালক হন৷ স্বাধীনতা আন্দোলন সম্পর্কে আর এস এস–এর দৃষ্টিভঙ্গি প্রসঙ্গে গোলওয়ালকর বলেছিলেন, ‘‘ব্রিটিশ বিরোধিতাকে ভাবা হচ্ছে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের সমার্থক৷ এই প্রতিক্রিয়াশীল দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সমগ্র স্বাধীনতা আন্দোলন, তার নেতৃবর্গ ও সাধারণ মানুষের উপর বিনাশকারী প্রভাব ফেলেছিল’’ (চিন্তাচয়ন, ১ম খণ্ড, পৃ: ১২৫)৷ অর্থাৎ আর এস এস–এর কাছে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন ছিল একটি ‘প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলন’৷ ফলে এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলা আর এস এস যে সর্বদাই জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রাখবে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই৷ বাস্তবে স্বাধীনতা আন্দোলনে সশস্ত্র বা শান্তিপূর্ণ কোনও সংগ্রামেই আর এস এস অংশগ্রহণ করেনি৷ এহেন আর এস এসকে কি দেশপ্রেমিক বলা যায়?

আর এস এস ভারতীয় জাতীয়তাবাদকেই স্বীকার করে না৷ হিন্দু–মুসলিম–বৌদ্ধ ইত্যাদি বিভিন্ন ধর্মের মানুষের শত–সহস্র বছরের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে এবং পরিশেষে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের অধীনে একই শোষণ–যন্ত্রণা, একই অত্যাচার–বঞ্চনার শিকার হওয়ার কারণে ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসাবে ভারতের গড়ে ওঠাকেই তারা অস্বীকার করে৷ তাদের মতে, ‘‘আমাদের দেশের হাজার হাজার বছরের ইতিহাস এই কথাই বলে যে, সব কিছু করেছে একমাত্র হিন্দুরা৷ এর অর্থ কেবল হিন্দুরাই এই মাটির সন্তান হিসেবে এখানে বসবাস করেছে’’ (গোলওয়ালকর, চিন্তাচয়ন, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১২৩–২৪)৷ আর এস এস–এর এই বক্তব্য বিবেকানন্দের চিন্তার, রবীন্দ্রনাথের চিন্তার বিরোধী৷ বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘কোনও সভ্যতা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে গড়িয়া উঠিয়াছে, এরূপ দৃষ্টান্ত একটিও পাওয়া যায় না৷ একটি সুসভ্য জাতি আসিয়া কোনও জাতির সহিত মিশিয়া যাওয়া ছাড়াই যে জাতি সভ্য হইয়া উঠিয়াছে–এরূপ একটি জাতিও জগতে নাই৷’’ (বিবেকানন্দ রচনাবলি, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ৩৪২)৷ রবীন্দ্রনাথও বলেছেন, ‘‘ভারতবর্ষের কেবল হিন্দু চিত্তকে স্বীকার করলে চলবে না৷ ভারতবর্ষের সাহিত্য, শিল্পকলা, স্থপতিবিজ্ঞান প্রভৃতিতেও হিন্দু–মুসলমানের সংমিশ্রণে বিচিত্র সৃষ্টি জেগে উঠেছে৷ তারই পরিচয়ে ভারতবর্ষীয়ের পূর্ণ পরিচয়’’ (রবীন্দ্র রচনাবলি, ১৪ শ খণ্ড, পৃঃ ২৫৯, বিশ্বভারতী সংস্ক্রণ)৷

জাতি গঠনের বৈজ্ঞানিক নিয়মকে তথাকথিত হিন্দুত্ববাদীরা কখনওই স্বীকার করেনি৷ তারা সর্বদাই হিন্দুরাষ্ট্রের দাবি করেছে৷ পরাধীন ভারতে তাদের শত্রু ব্রিটিশরা ছিল না, ছিল মুসলমানরা৷ এখনও তারা শোষক পুঁজিপতিদের নয়, শত্রু মনে করে মুসলিমদের৷ হায় রে দেশপ্রেম!

হিন্দু মহাসভাই প্রথম দেশভাগের দাবি তুলেছিল

সংঘ পরিবারের দেশ সেবকরা (!) দেশভাগের জন্য একতরফা ভাবে মুসলিম লিগ ও মুসলিম মৌলবাদী শক্তিগুলিকেই দায়ী করে৷ ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় মুসলিম লিগের প্রতিষ্ঠা হয়৷ ৩৪ বছর পর ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে লিগের ওয়ার্কিং কমিটির মিটিংয়েই তারা প্রথম পৃথক দেশের দাবি তোলে৷ কিন্তু তার ঢের আগে ১৯২৩ সালেই হিন্দু মহাসভার নেতা বি ডি সাভারকার ধর্মভিত্তিক পৃথক দেশের ধারণা উপস্থিত করেছিলেন৷ তিনি ‘হিন্দুত্ব’ নামক গ্রন্থে ভারতবর্ষে হিন্দু এবং মুসলিম দুটি পৃথক জাতির তত্ত্ব পেশ করেন৷ ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার তাই বলেছেন, ‘‘সাম্প্রদায়িক পথে ভারত বিভাগের ধারণাটির উদ্ভাবনের জন্য বিপুল পরিমাণে দায়ী হল হিন্দু মহাসভা’’৷ তিনি আরও বলেছেন, ‘‘মুসলিম লিগ সাভারকারের ওই বক্তব্যকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে হৃদয়ঙ্গম করেছিল’’৷ ফলে এটা পরিষ্কার, ভারতভাগের জন্য হিন্দু মৌলবাদ ও মুসলিম মৌলবাদ উভয়ই দায়ী৷

ধর্মভিত্তিক জাতি বাস্তবে দাঁড়ায় না৷ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে খ্রিস্টানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও, ধর্মের ভিত্তিতে তারা কিন্তু ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারেনি৷ সেখানে কয়েক ডজন পৃথক দেশ রয়েছে৷ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে ইসলাম ধর্মও একটি ঐক্যবদ্ধ দেশ গঠন করতে পারেনি৷ যদি মুসলিমরা ধর্মের ভিত্তিতে একটি জাতি হত তাহলে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ সৃষ্টি হত না৷ এ দেশে হিন্দুর সঙ্গে ‘জাতির’ বিষয়টিকে অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে হিন্দুত্ববাদীরা৷ কিন্তু তাদের এই প্রশ্নটির তো উত্তর দিতে হবে, হিন্দুমাত্রেই যদি এক জাতি হয়, তা হলে নেপালের হিন্দুরা কোন জাতি?

আর এস এস–এর দৃষ্টিতে অসহযোগ আন্দোলন ছিল অশুভশক্তির জাগরণ

ব্রিটিশ বিরোধী অসহযোগ আন্দোলন গোটা দেশে ১৯২১–২২ সালে তীব্র রূপে ফেটে পড়েছিল৷ ধর্ম–বর্ণ–সম্প্রদায়গত পার্থক্য গৌণ করে হাজার হাজার মানুষ এক হয়ে আন্দোলনে নেমেছিলেন৷ অবিভক্ত বাংলাতেও এই আন্দোলন প্রবলভাবে আছড়ে পড়েছিল৷ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু প্রমুখ নেতা সহ হাজার হাজার সত্যাগ্রহীকে ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেপ্তার করে৷ আর এই গণসংগ্রামের মধ্যে আর এস এস প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ হেডগেওয়ার দেখতে পেলেন ‘অশুভ শক্তির জাগরণ’৷ তাঁর কথায়, ‘‘মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের ফলে দেশে উৎসাহ (জাতীয়তাবাদের জন্য) ক্রমে শীতল হয়ে যাচ্ছিল এবং এই আন্দোলন সৃষ্ট অশুভ শক্তিগুলি সমাজজীবনে বিপজ্জনকভাবে মাথা চাড়া দিচ্ছিল৷ …অসহযোগের দুগ্ধ পান করে বেড়ে ওঠা যবন–সর্প তার বিষাক্ত নিঃশ্বাস নিয়ে দেশে দাঙ্গার প্ররোচনা দিচ্ছিল’’ (ভিশিকার–১৯৭৯, পৃঃ ৭)৷ এই ছিল অসহযোগ আন্দোলন সম্পর্কে হেডগেওয়ার–এর বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি৷

স্বাধীনতা আন্দোলনকে দেশের পক্ষে ক্ষতিকারক এবং প্রতিক্রিয়াশীল ভাবার কারণেই বিজেপির পূর্বসূরি আর এস এস দেশকে স্বাধীন করার কোনও কর্মসূচিতেই ছিল না৷ ১৯২৮ সালে সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলন থেকে তারা নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখে৷ ১৯২৯ সালে ভগৎ সিং এবং বটুকেশ্বর দত্ত দিল্লি অ্যাসেম্বলিতে বোমা নিক্ষেপ করলেন, উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদে আলফ্রেড পার্কে (১৯৩১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি) পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হলেন বিপ্লবী নেতা চন্দ্রশেখর আজাদ, ১৯৩১ সালে ২৩ মার্চ ভগৎ সিং, শুকদেব, রাজগুরুকে ফাঁসি দিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ৷ ব্রিটিশের বিরুদ্ধে গোটা দেশ যখন উত্তাল সে সময়, আর এস এস তার শরিক হল না৷ ১৯৩০ সালে কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং–এ বিনয়–বাদল–দীনেশ ঐতিহাসিক অলিন্দ যুদ্ধ, ১৯৩০–৩২ সালে চট্টগ্রামে মাস্টারদা সূর্য সেনের বীরত্বপূর্ণ লড়াই, প্রীতিলতার শহিদ হওয়া– কোনও ক্ষেত্রেই আর এস এস দেশের কল্যাণ দেখেনি৷ ১৯৪২–এর ভারত ছাড়ো আন্দোলন, ১৯৪৫ সালে আজাদ হিন্দ ফৌজের অফিসারদের বিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৪৬ সালে নৌ–বিদ্রোহ, ওই বছরের ২৯ জুলাই দেশব্যাপী ধর্মঘট – এসবেও আর এস এস–এর নিষ্ক্রিয় ভূমিকা ইংরেজ প্রভুদের খুশি করেছে৷

১৯৪০–এর দশকে আর এস এস–এর ভূমিকা প্রসঙ্গে আন্ডারসন এবং ডামলে বলেছেন, ‘‘গোলওয়ালকর বিশ্বাস করতেন, আর এস এস–কে নিষিদ্ধ করার কোনও রকম অজুহাত ব্রিটিশ শাসকদের দেওয়া চলবে না’’৷ ১৯৪৩ সালের ২৯ এপ্রিল গোলওয়ালকর আর এস এস–এর সদস্যদের উদ্দেশ্যে একটি নির্দেশ জারি করে আর এস এস–এর সমস্ত বিভাগগুলি বন্ধ করে দেন৷ এই আনুগত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ আর এস এস সম্পর্কে ব্রিটিশ সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘‘আর এস এস আইন–শৃঙ্খলার পক্ষে এখনই বিপজ্জনক–এ কথা বলার যুক্তি নেই’’৷ অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসকের পক্ষ থেকে ‘দেশপ্রেমিক’ আর এস এসের কাছে এর চেয়ে বড় সার্টিফিকেট আর কী হতে পারে? ভারত ছাড় আন্দোলন সম্পর্কে গোলওয়ালকর এও পর্যন্ত বলেছিলেন– ‘‘এই সংগ্রামের খারাপ ফল হতে বাধ্য৷’’ এহেন আর এস এস–এর চিন্তাকে পরাধীন ভারতের জনগণ গ্রহণ করলে দেশ স্বাধীনতা অর্জন করতে পারত না৷ এর পরেও আর এস এসকে দেশপ্রেমিক বলা যায়? না বলা উচিত দেশদ্রোহী?

হেডগেওয়ারের জেলে যাওয়ার নেপথ্যে

স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতা করে জনগণের কাছে চূড়ান্ত ধিক্কৃত আর এস এস ডাঃ হেডগেওয়ারের জেলে যাওয়ার কাহিনী পরিবেশন করে থাকে৷ এই কলঙ্ক ঢাকতে ধূর্ত আরএসএস প্রচার করে, ১৯৩০ সালে গান্ধীজির লবণ সত্যাগ্রহের সময় হেডগেওয়ার জেলে গিয়েছিলেন৷ আরএসএস প্রকাশিত তাঁর এক জীবনী গ্রন্থে বলা হয়েছে– ‘‘১৯৩০ সালে মহাত্মা গান্ধী আইন অমান্যের ডাক দিয়েছিলেন৷ …ডাক্তার সাহেব (ডাঃ হেডগেওয়ার) সব জায়গায় খবর পাঠালেন সংঘ এই সত্যাগ্রহে অংশগ্রহণ করবে না৷ সে যাই হোক ব্যক্তিগত ভাবে যারা অংশগ্রহণ করতে চাইবে তাদের বাধা দেওয়া হবে না৷ এর অর্থ হল সংঘের কোনও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এতে অংশগ্রহণ করতে পারবে না’’ (সিপি ভিশিকর, সংঘবিকাশ কে বীজ, ডাঃ কেশব রাও হেডগেওয়ার, নিউ দিল্লি, পৃ: ২০)৷

তাহলে ডাঃ হেডগেওয়ার নিজে ব্রিটিশ কারাগারে গিয়েছিলেন কেন? এর উত্তর পাওয়া যাবে আর এস এস প্রকাশিত হেডগেওয়ারের জীবনী গ্রন্থেই৷ ‘‘ডাক্তার সাহেবের এই প্রত্যয় ছিল জেলের ভিতর তিনি একদল স্বদেশপ্রেমী, অগ্রগামী, নামজাদা লোক পাবেন৷ তাঁদের সাথে তিনি সংঘ নিয়ে আলোচনা করতে পারবেন এবং সংঘের কাজে তাঁদের টেনে আনতে পারবেন’’ (ঐ)৷

অর্থাৎ, স্বাধীনতা আন্দোলনের সমর্থনে হেডগেওয়ার জেলে যাননি, তিনি জেলে গিয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামীদের যেভাবেই হোক স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে সরাতে৷

হিন্দু মহাসভা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকেই সমর্থন করেছিল

স্বাধীনতা আন্দোলনে হিন্দু মহাসভার ভূমিকা কী ছিল? যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকারের প্রতি দেশবাসীর দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে সেই প্রসঙ্গে বিনায়ক দামোদর সাভারকর ১৯৪১ সালে ভাগলপুরে হিন্দু মহাসভার ২৩তম অধিবেশনে বলেন, ‘‘ভারতের প্রতিরক্ষার কথা বলতে গেলে, ভারত সরকারের সমস্ত যুদ্ধ প্রস্তুতিকে হিন্দুদের অবশ্যই দ্বিধাহীন চিত্তে সমর্থন করতে হবে৷ …হিন্দুদের বৃহৎ সংখ্যায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীতে যোগ দিতে হবে’’ (সাভারকর সমগ্র, খণ্ড–৬, মহারাষ্ট্র প্রান্তিক হিন্দু সভা, পুণা, ১৯৬৩, পৃ: ৪৬০)৷

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকার তার সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্য পূরণের জন্য যখন নতুন সশস্ত্র ব্যাটেলিয়ান তৈরির সিদ্ধান্ত নিল তখন সাভারকরের নেতৃত্বে হিন্দু মহাসভা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, এই প্রচেষ্টাকে সফল করতে একটা বড় সংখ্যক হিন্দু যুবকের নাম নথিভুক্ত করাতে হবে৷ সেদিন হিন্দু মহাসভা ব্রিটিশের যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে সাহায্য করার জন্য দেশের নানা প্রান্তে সহায়ক কেন্দ্র খুলেছিল যাতে হিন্দু যুবকেরা সহজেই ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে পারে৷ এই বাহিনীকেই ব্রিটিশ পাঠিয়েছিল আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাদের হত্যা করতে৷ সাভারকর সেই কাজে ব্রিটিশদের পাশে ছিলেন৷ দেশপ্রেমের নামে কি নির্লজ্জ গোলামি!

এই গোলামির পুরস্কারস্বরূপ ভাইসরয়ের জাতীয় প্রতিরক্ষা কাউন্সিলে সাভারকরের পছন্দমতো লোক মনোনীত করা হল৷ সে জন্য টেলিগ্রামে ভাইসরয়কে ধন্যবাদ দিলেন সাভারকর৷ টেলিগ্রামটি এই রকম, ‘‘ইওর এক্সেলেন্সিজ অ্যানাউন্সমেন্ট ডিফেন্স কমিটি উইথ ইটস পারসোনেল ইজ ওয়েলকাম হিন্দু মহাসভা ভিউজ উইথ স্পেশাল স্যাটিসফেকশন অ্যাপয়েন্টমেন্ট অফ মেসার্স কালিকর অ্যান্ড জমনদাস মেহতা’’ (বিনায়ক দামোদর সাভারকর হোয়্যার্ল উইন্ড প্রোপাগান্ডা– এ এস বিন্দে, পৃঃ ৪৫১)৷ এমনই ছিল হিন্দু মহাসভার নেতা সাভারকারের সঙ্গে ব্রিটিশের সম্পর্ক বীর স্বাধীনতা সংগ্রামীই বটে!

মুচলেকা দিয়ে ব্রিটিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন সাভারকর

সাভারকর প্রথম জীবনে স্বদেশি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন৷ ১৯০৭–১৯০৯, এই ক’বছর তিনি নানা বিপ্লবী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন৷ ১৯১০ সালের মার্চে প্যারিসে তিনি গ্রেপ্তার হন৷ কিন্তু বহু অনামী বিপ্লবীরাও যে কাজ করতে ঘৃণা বোধ করতেন, সেই কাজটিই করলেন ‘বীর’ সাভারকর৷ ১৯১১ সালের ৩০ আগস্ট তিনি ক্ষমাভিক্ষার আবেদন করলেন৷ সে চিঠি খারিজ হয়ে যায়৷ ১৯১৪ সালের ১৪ নভেম্বর সাভারকর আবার ক্ষমাভিক্ষার আবেদন করলেন৷ সাভারকর লিখেছিলেন, ‘‘ …সরকার যদি তাদের বহুমুখী দয়ার দানে আমাকে একটু মুক্ত করে দেন তবে আমি আর কিছু পারি বা না পারি চিরদিন সাংবিধানিক প্রগতি এবং ব্রিটিশ সরকারের আনুগত্যের অবিচলিত প্রচারক হয়ে থাকব৷ …সরকার আমাকে যত কাজ করতে বলবে, সেই মতো প্রায় সব কাজ আমি করতে প্রস্তুত৷ কেন না আমার আজকের পরিবর্তন যেহেতু বিবেকের দ্বারা পরিচালিত, তাই আমার ভবিষ্যতের আচরণও সেই রকমই হবে৷ অন্যভাবে যা পাওয়া যেতে পারে সে তুলনায় আমাকে জেলে আটকে রাখলে কিছুই পাওয়া যাবে না৷ শক্তিশালীর পক্ষেই একমাত্র ক্ষমাশীল হওয়া সম্ভব৷ কাজেই অনুতপ্ত সন্তান পিতৃতুল্য সরকারের দরজায় ছাড়া আর কোথায় ফিরে যাবে? মহামান্য হুজুর অনুগ্রহ করে বিষয়গুলি বিবেচনা করবেন এই আশা রইল’’ (পেনাল সেটলমেন্টস ইন আন্দামানস, আর সি মজুমদার, পৃ: ২১১–১৩)৷

ক্ষমার জন্য কোনও ভিক্ষা, কোনও আবেদন, এর চেয়ে বেশি নীচ, বেশি হীন হতে পারে না৷ ক্ষমাভিক্ষার আবেদনের ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে একজন আত্মমর্যাদাহীন ব্যক্তির আত্মসমর্পণ৷ যে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা হাসতে হাসতে ফাঁসির দড়িকে চুম্বন করেছেন, সেই দেশের একজন ‘স্বাধীনতা সংগ্রামী’ হয়ে সাভারকর জেল থেকে বাইরে আসার জন্য নীতি–আদর্শ–মর্যাদা– সবই হেলায় বিসর্জন দিয়েছেন৷ এই হল হিন্দুত্ববাদী নেতা সাভারকরের দেশপ্রেমের নমুনা৷

হিন্দুত্ববাদী এই সব সংগঠনের যেমন ব্রিটিশপ্রীতি ছিল অফুরান, তেমনি ছিল মুসলিম লিগেরও৷ হিন্দু মহাসভা মুসলিম লিগের সাথে বাংলা, সিন্ধু ও উত্তর–পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা পরিচালনা করছিল৷ এর পিছনে যে ব্রিটিশ সরকারের মদত ছিল তাতে সন্দেহ নেই৷ ওই সময় সম্পর্কে হিন্দু মহাসভার কানপুর অধিবেশনে (১৯৪২) সাভারকর বলেছিলেন, ‘‘বাস্তব রাজনীতির ক্ষেত্রে হিন্দু মহাসভা জানে যুক্তিসঙ্গত আপসের দ্বারাই আমাদের এগোতে হবে৷ এই যুক্তিসঙ্গত আপসের প্রমাণ হল সম্প্রতি সিন্ধু প্রদেশে একত্রে সরকার চালানোর জন্য হিন্দু মহাসভা মুসলিম লিগের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছে৷ … ফজলুল হকের প্রধানমন্ত্রীত্বে এবং আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর পরিচালনায় কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা সাফল্যের সাথেই চলছে’’ (সাভারকর সমগ্র– খণ্ড ৬, পৃ: ৭৯–৮০)৷

এই কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা ব্রিটিশ বিরোধিতার জন্য তৈরি হয়নি৷ সাভারকরের ‘পরম শ্রদ্ধেয়’ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী বলেছিলেন, ‘‘এখন যুদ্ধকালীন অবস্থায় জাতীয় গভর্নমেন্ট এমনভাবে গঠিত হবে যাতে মিত্রপক্ষের সঙ্গে নিবিড় সহযোগিতায় যুদ্ধ করা সম্ভব হয়’’ (রাষ্ট্র সংগ্রামের এক অধ্যায়, শ্যামাপ্রসাদ, পৃঃ ১১৬)৷ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ’৪২–এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনেরও বিরোধিতা করেছিলেন৷ তিনি বলেছিলেন, ‘‘আমি মনে করি না, গত তিন মাসের মধ্যে যেসব অর্থহীন উচ্ছৃঙ্খলতা ও নাশকতামূলক কাজ করা হয়েছে, তার দ্বারা আমাদের দেশের স্বাধীনতা লাভের সহায়তা হবে’’ (রাষ্ট্র সংগ্রামের এক অধ্যায় শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী, পৃঃ ৬১)৷ ভারত ছাড়ো আন্দোলন শ্যামাপ্রসাদের কাছে ‘অর্থহীন উচ্ছৃঙ্খলতা’ ও ‘নাশকতামূলক’ কাজকর্ম৷ তাই তিনি মনে করেছেন, এই আন্দোলন দমন করা উচিত এবং কীভাবে এই আন্দোলন দমন করা যায় তার একটা তালিকাও তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছে পেশ করেছেন৷ ব্রিটিশের কী নির্লজ্জ দালালি!

শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর কীর্তি এখানেই শেষ নয়৷ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে যখন আজাদ হিন্দ ফৌজ বীরত্বের সাথে লড়াই করছিল, সেই সময় শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদকে সহায়তা করার জন্য আগ বাড়িয়ে বললেন, ‘‘বঙ্গদেশকে রক্ষা করিবার জন্য একটা গৃহবাহিনী গঠনের অধিকার আমাদের দেওয়া হউক’’ (রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখিত ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লিখিত শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর পত্র থেকে উদ্ধৃত)৷ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী সুভাষচন্দ্রের পক্ষে না থেকে ব্রিটিশের পক্ষে ছিলেন৷ এর পরেও কেউ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে স্বাধীনতা সংগ্রামী বলতে পারেন?

বিজেপি–আর এস এসের বর্তমান ভূমিকাও অশুভ

হিন্দু মহাসভা থেকে ‘জনসংঘ’ গড়ে তুলেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী, আর সেই ‘জনসংঘ’ থেকেই জন্ম আজকের ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’ বা ‘বিজেপি’–র৷ সেই বিজেপিই আজ দেশপ্রেমের ধ্বনি তুলছে৷ যে নেতাজির আজাদ হিন্দ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে হিন্দুদের আহ্বান জানিয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী, তাদেরই উত্তরসূরি বিজেপি আজ আজাদ হিন্দ বাহিনীর ৭৫ বছর উদ্যাপন করছে৷ এটা ভণ্ডামি ছাড়া আর কী?

শুধু পরাধীন ভারতেই নয়, স্বাধীনতার পরও বিজেপির ভূমিকা সমাজ প্রগতির বিরুদ্ধে৷ বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে যেভাবে উগ্র হিন্দুত্ববাদী তৎপরতা চলছে, ধর্মনিরপেক্ষতার উপর, সংখ্যালঘু জনগণের উপর আক্রমণ নামিয়ে আনা হচ্ছে তা খুবই বিপজ্জনক৷ একই সাথে দেশি–বিদেশি পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থে জনগণের উপর নানা অন্যায় জুলুম চলছে৷ হরণ করা হচ্ছে শ্রমিক কর্মচারীদের অধিকার৷ এই অপশক্তিকে সমূলে উৎপাটন করা আজ সমাজ প্রগতির স্বার্থে অত্যন্ত প্রয়োজন৷


বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২০

সামাজিক বেশ্যাবৃত্তিঃ আন্না হাজারের আন্দোলন


সামাজিক বেশ্যা শুধু মহিলাই হয় না, পুরুষও হয়।


আচ্ছা, আন্না হাজারের কেউ খবর জানেন? মালটাকে করোনা এখনও গ্রাস করেছে নাকি অন্ধত্ব আর জরাগ্রস্ত হয়ে কয়েক শতাব্দী যন্ত্রণা ভোগের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সে! কংগ্রেস সরকারের আমলে দুর্নীতি ছাড়া কিছুই খুঁজে পায় নি সে, তাই #india_against_corruption ধুয়ো তুলে দেশপ্রেমিকদের সরকার চেয়েছিল। তা সে সরকার এলো ক্ষমতায়, যুগপুরুষ মোদীজির নের্তৃত্বে, এসেই মোদীজি বুঝলেন- আসলে দুর্নীতি তো সরকারি সম্পত্তিতে হয়, বেসরকারি হলে তার জন্য তো আর কেউ আন্দোলন করেনা, আন্না হাজারের সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে বর্তমান মোদী সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিই সব নিলামে উঠে গেছে বা যাচ্ছে, এর পর যদি কোনো বেসরকারি সরকারও আসে তাদের পক্ষে আর দুর্নীতি করার কোনো সুযোগই রইল না, কারণ সরকারি বলেই যে আর কিছু থাকবে না; অসম্ভব দুরদর্শীতা সম্পন্ন সামাজিক বেশ্যা ছিলেন আন্না হাজারে, থুড়ি আছেন।

সরকারী দুর্নীতি, পুলিশ দুর্নীতি, বিচারক দুর্নীতি, কর্পোরেট দুর্নীতি, কেল্পটোক্রেশি, নির্বাচনী জালিয়াতি, রেড টেপ, রাজনীতিবিদদের সর্বত্র নাক গলানো, কালো টাকা সব ইস্যুই রাসভ গুহ্যপথে প্রবেশ করেছে, বর্তমানে দেশে একটাই মডেল- “হয় বিক্রি হও না হলে জাস্টিস লোয়া”। লোকপাল এখন তাপস পালের ছেলে হয়ে ঘরে ঢুকে গেছে নিশ্চিত, কিন্তু আন্নার সাথে থাকা প্রতিটি ধান্দাবাজ মালামাল হয়ে গেছে- কেজরীওয়াল দ্বিতীয় টার্মে মুখ্যমন্ত্রী মর্যাদাসীন হয়েই দিল্লি দাঙ্গা করে RSS এর নয়নের মণি, প্রশান্ত ভূষণ আবার বিপ্লবী- মূলত চরের ভূমিকাতে, রামদেব হাজার কোটির সাম্রাজ্যের বেতাজ ন্যাংটা, কিরণ বেদী রাজ্যপাল আর কিই বা চাই! বিজেপির হয়ে ক্ষেপ খেটে সকলেই প্রতিষ্ঠিত, আন্না হাজারেও তাই।

কেউ খোঁজ পেলে তাকে জানিয়ে দিয়েন-

মোদী সরকারের সম্পূর্ণ ব্যর্থতার ফলে আজ দেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ২৫ লক্ষ ছোঁবে দু'এক দিনেই, মৃত্যু ৪৫ হাজার পেরিয়ে দ্রুত হাজারের হাফ সেঞ্চুরি স্পর্শ করবে; অথচ দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী নির্লজ্জ হর্ষবর্ধন মুখবর্মের আড়ালে দাবী করছে “কোভিড সঙ্কটে দেশ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে”। কী আশ্চর্য! কোনো রকম অহঙ্কার ছাড়াই কেমন দাবী করে ভক্তদের খুশি করে দিচ্ছে, যদিও ভক্তপিতা মোদীর মতো কেউ সাংবাদিক সম্মেলন আর করে না, পাছে জবাবদিহি করতে গিয়ে পাকস্থলীর মল দেখা যায়।

এদিকে খোদ ‘ঠোকদো’স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করোনার প্রভাবে, পরিষেবা ভাল তাই। আসলে নির্লজ্জতাই এদের অহঙ্কার, আর এদের ভক্তরা এই সুখেই রামরাজ্যের ছায়া খুঁজে পেয়েছে, তা পাক- যারা বিজেপিকে ক্ষমতায় এনেছিল তাদের এটুকু আত্মত্যাগ তো করতেই হবে, রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েক লক্ষ প্রাণের বলি কি রামজী চাইতে পারেন না? আর সেই আহূতি অবশ্যই রামভক্তদের মাঝখান থেকেই হওয়া চাই, বাকিরা হয় মুসলমান, নাহলে কমিউনিস্ট না হয় আর্বান নক্সাল কিম্বা ঘোষিত দেশদ্রোহী। মোদীজির এটাই হলো দূরদর্শিতা, তিনি কেমন হিন্দুদেরকে আত্মবলিদানের সুযোগ করে দিলেন, এমন ঘটনা তো স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে ইতিহাসের আস্তাকূড়ে। যেমন লেখা থাকবে নিজামুদ্দিনের জামাতিদের করোনা জিহাদ কেমন অযোধ্যার সেবায়েৎ বা তিরুমালার সেবায়েৎরা আপন দেহে ধারণ করেছেন। ভাবিজী পাঁপড়, করোনীল, গোমূত্র, গঙ্গাজল কি কেউ খেয়েছে? না খায় নি, কারণ তারাও তো আহূতি দেবেন বলেই শরীরে করোনা ধারণ করেছেন, রামনাম সত্যের বিষয়টা স্বয়ং রামজীর উপরে- তার দলা হলে ডেকে নেবেন নাহলে আবার এই মর্ত্যধামে থেকে যেতে হবে কিছু দিনের জন্য।

যদিও কিছু মুর্খ বলছে পার্সি-জৈন অমিত শাহ্ হিন্দু নয় বলে রাম মন্দির উদ্বোধনে ডাক না পেয়ে করোনার ভান করে মুখ লুকিয়েছে হাসপাতালে, সেটাই যেন হয় ঠাকুর (রীনা); কারণ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনেক কাজ করতে হবে- দেশে যে এতো দেশদ্রোহী শুধু তাদের খুঁজে খুঁজে তাড়তে হবে তাই নয়, বিক্রির জন্য যে গোটা দেশটাই পরে আছে। তাছাড়া জয় শাহের বয়সটাই বা আর কত, ICC প্রেসিডেন্ট কি সে হবে না?

মোদী সরকার জাতীয় ব্যর্থতাকে রাজনৈতিকভাবে লাভের জন্য ব্যবহার করছে ভক্ত, গদি মিডিয়া, আটিসেলের মাধ্যমে নতুন হুজুক ‘রামরাজ্য’ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। ছদ্ম জাতীয়তাবাদ জাগ্রত করার মিশন ফেল মেরে গেছে। প্রধান মিথ্যুক বলছে ‘চঙ্গা সি’, GDP ক্রমনিন্মমুখী থাকা সত্ত্বেও অর্থনীতি নাকি দারুণ অবস্থায় রয়েছে, আসলে সবই তো রামরাজ্যের বিষয় তাই আধুনিক অর্থনীতিবিদ বা চিকিৎসকেরা এই “চঙ্গা সি” এর ব্যাখ্যা খুঁজে পাবে না এটা স্বাভাবিক। বিক্রি করার জন্য যতটুকু বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি মেহনতের যুক্তিই বা কি? রামমন্দিরের ধুনো দিয়েই ২১ সালের মাঝ পর্যন্ত টেনে দেওয়া যাবে, তারপর ইউনিভার্সাল সিভিল কোড আছে (মুসলমানের বাচ্চারা যে নিয়মে চাট্টে বিয়ে করে সেইটা), NRC তো আছেই; সাথে অমিতাভের করোনা বা একটা আধটা সুশান্ত মার্ডারের মতো কেস এলে জমে ক্ষীর। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের প্রশ্ন তোলার সময় কোথায়? অবশ্য দেশপ্রেমিকেরা উন্নত পরিষেবার জন্য সব বেচে দিয়ে আপনাকে একটা বাটি হাতে মন্দিরের সামনে বসিয়ে দেবে, সেটা আদানী কোম্পানির বাটি, দিনের শেষে ভিক্ষালব্ধ রোজগারের একটা অংশ বাটি ভাড়া বাবদ দিতে হবে।

রাজনাথ সিং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভতার জন্য ১০১টি অস্ত্র আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করায় ভক্তকূল গোদা বাঁদরের মতো টুইটার ফেসবুক চষে ফেলছে বার্নলের ছবি হাতে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সংস্থা হ্যাল এর পরিবর্তে রাফেল মেন্টেনেন্সের ৩০ হাজার কোটির দায়িত্ব দেউলিয়া অনিল আম্বানীকে দেওয়া, কাকে আত্মনির্ভর বানাবার জন্য এটা শুধালেই- আপনার খিস্তির স্টক রিনিউ করে নিতে পারবেন ভক্তদের থেকে, সাথে লাল আঁখ। যেটা চীনকে দেখাতে গিয়ে সেনার নথি গায়েব হয়ে মোদীর মুখের বাল মানে দাড়িটাই বেড়ে গেল মাঝখানে।

নতুন করে আর ধোকা খায় না সাধারণ জনগণ, কিন্তু ভক্তেরা তো মানুষ নয়- মানুষ রূপী নির্বোধ মর্কট; ধোকাই তাদের একমাত্র খাদ্য। ভক্ত হওয়ার জন্য নিরেট মূর্খ হলেই যথেষ্ট, বাকিটা হোয়াটসএ্যাপ ইউনিভার্সিটি থেকে শিখে যাবে।

জইস-ই-রাম (RSS এর পাক অধিকৃত কাশ্মীরের স্বদেশী শাখা)

সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২০

দেশ জুড়ে বন্যা ২০২০



১ কোটি মানুষ বন্যায় আক্রান্ত বাংলা, আসাম, বিহার, কেরালা ও কর্ণাটক জুড়ে।

৬ লক্ষ সামান্য ভাতাপ্রাপ্ত আশা কর্মী স্ট্রাইক করছে তাদের স্থায়ী বেতনের জন্য।

পৃথিবীর মধ্যে এক দিনে সর্বোচ্চ করোনাক্রান্তের সন্ধান (৬৫০০০)

এদিকে গোবলয় মিডিয়া, বচ্চনের করোনার পরে আছে সুশান্ত মৃত্যু নিয়ে, কোথাকার কোন রিয়া আর তাদের লোমের খবর নিয়ে।

এরাই সম্মিলিত ভাবে নিজামুদ্দিনের করোনা খুঁজে ফিরেছিল, আজ তাদের চোখ একে অন্যের পায়ুপথে সেঁধিয়ে রেখে তাই তিরুমালায় ৭৭৬ জন সেবায়েৎ এর করোনাক্রান্তের খবর কানে পৌছায়নি, আসলে পায়ু থেকে মুখ বের করলে তবে না কান শুনবে বা চোখ দেখবে। সেগুলো একমাত্র নাগপুরের আদেশ ও নির্দেশেই খোলে বাকি সময় পরস্পরের পায়ুতেই সেঁধিয়ে থাকে। এটাই আসলে নমুনা আসন্ন ওই _ রাজ্যের।

ওয়াক থুঃ

সূচনা হিসাবে রামরাজ্য খারাপ কিছু নয়।

আসলে ভারত দেশ বিক্রির জন্য ক্যামোফ্লেজে এই ধরনের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দিয়ে রাখলে সুবিধে হয়।

একটা বেসরকারী সরকারও হয়ত শীঘ্রই আসবে উন্নত পরিসেবা নিয়ে

শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২০

জইস-ই-রাম- RSS এর পাকিস্তানি শাখা

 


নিন্মোক্ত মধ্যমনি ভদ্রলোক GC Murmu, ভারতের নতুন CAG. কাশ্মীরের গভর্নর হিসাবে ছড়িয়ে এই পদে বহাল হয়েছেন।

CAG এর কাজ হল সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের নানান ভুলত্রুটি ধরা

প্রসঙ্গত ইনি গুজরাত ক্যাডারের ১৯৮৫ ব্যাচের IAS অফিসার, যিনি ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গা ও ইসরাত জাহান ভুয়ো এনকাউন্টার কেস এর পক্ষে মোদী-শাহ এর পক্ষে বই এর উন্মোচন করেছিলেন

আসলে এভাবেও হয়ত রামরাজ্যের সূচনা হয়!

বিজেপির সম্পদ ও সাংসদ অনন্ত কুমার হেগড়ে BSNL কর্মীদের এ্যান্টিন্যাশানাল তথা দেশদ্রোহিদের তকমা দিয়ে বক্তিমে দিলো, সে ঘোষণা করেছে যে অতি দ্রুত BSNL কে বিক্রি করে এটিও কর্পোরেট মাফিয়াদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। আসলে দেশপ্রেমের তেল বেচার একমাত্র স্বঘোষিত ঠিকাদার তো এরাই তাই যাকে যখন অপছন্দ হয় দেশদ্রোহী বলে দিলেই চুকে যায়, কাবি থাকে পাকিস্তান পাঠানো শুধু।

মাননীয় হেগড়ে, আপনার পিতা থুড়ি নেতা- মিথ্যাদাস মোদী এর আগেই BSNL কে কোমায় পাঠিয়ে দিয়েছিল 4G স্পেকট্রাম বরাদ্দ না করে, কারন তাদের মোদী যার চৌকিদার সেই আম্বানী প্রভুর জিওর স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে।

BSNL বর্তমানে প্রায় বিস্মৃত, থাকার মধ্যে আছে তার বিপুল ভূসম্পত্তি, সেগুলোকে বেচে দেবার জন্য এই ভৌ ডাক, সেটা ভক্ত ব্যাতিরেকে সকলেই বোঝে

এই সরকারী কর্মচারীরাই মুসলমানের টাইট করার জন্য বিজেপিকে ঢেলে ভোট দিয়েছিল, যা প্রায় ৯০%। তাই জাতীয় সম্পদ বিক্রির জন্য কষ্ট যন্ত্রণা থাকলে এই "দেশদ্রোহীদের" জন্য বিন্দুমাত্র সহমর্মিতা নেই, কারন এরাই মূলত BJP-RSS এর প্রচারক ও ভক্ত। কাঠ খেলে ফার্নিচার হাগতেই হবে

যাই হোক রামরাজ্যে সবই হয়ত বেসরকারী ছিল

জইস-ই-রাম (RSS এর পাকিস্তানি শাখা)

 

বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২০

রাজনীতি বিমুখ একটা ইতর সমাজ ও আসন্ন পরিণতি

 


এ লেখা ঠিক সকলের জন্য নয়, তাই যারা মজার নেওয়ার জন্য পড়েন- তারা এখানে না ঢুকলেই ভালো হবে, কারণ এখানে আসলে কিছুটা প্রলাপ বকা হয়েছে। লাইক-কমেন্ট যদি একটাও না নয়, সেখানে আমার আক্ষেপ তো নেই ই বরং ভাবনাটা প্রতিষ্ঠা পাবে।

আমাদের আগের কয়েকটা প্রজন্ম কখনও এমন ভয়াবহতার সম্মুখীন হয়নি, যেটা আমরা দেখছি। অনাসৃষ্টির বিপর্যয়, সুতো ছেঁড়া পুঁতির মালার মতো যেন হঠাৎ করেই সবটা খুলে হাত শূন্য করে দিচ্ছে। আজ গোটা বিশ্বজুড়ে প্রায় প্রতিটি দেশেই নানা ধরনের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে একটা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে- কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সকলে শুধুই যাচ্ছে, নীরব নিশ্চুপ ভাবে যাচ্ছে।

উৎসব আর মনোরঞ্জনের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা সভ্যতার ‘সভ্য’ জাতি আমরা, তাই আমাদেরকে কোনও কিছুই আর সেভাবে প্রভাবিত করে না, করলে তার মেয়াদ ওই ভার্চুয়াল যোগাযোগ মাধ্যমের মাপকাঠি মেনে একটা কি দুটো বেলা৷ তবে রাষ্ট্রের গোলামি করা তথাকথিত মিডিয়ার উৎসাহের খামতি নেই রাষ্ট্রকে জনগণের সামনে থেকে লুকাতে, সেই প্রচেষ্টাতেই কেবল তারা ব্রতী, যেমন তারা তাদের ইয়েস ম্যানেদের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য যাকে খুশি যা খুশি বলি প্রদত্ত করে দিতে পারে, আমাদের কিন্তু এই নিরুত্তাপতাই আমাদের সৌন্দর্য।

দেশে দেশে অর্থনৈতিক দুরাস্থা চরম আকার ধারণ করেছে, বাজারে চাকরি নেই, রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রি হয়ে যাচ্ছে বেনিয়াদের কাছে, প্রদেশে প্রদেশে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বাড়বাড়ন্ত, সংবাদমাধ্যম জুড়ে নিকৃষ্ট তোষামোদ আর ঘৃণার চাষ, সমাজের সর্বত্র নিন্মমেধার মানুষদের উত্থান ঘটছে ব্যাঙের ছাতার মতো, দ্রব্যমূল্য আকাশ ছুঁয়েছে, ধনী আরও বিত্তশালী হয়ে উঠছে- গরীব সর্বস্বহারা হয়েছে, বিভেদকামী শক্তির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাপ্রাপ্তি ঘটেছে উচ্ছ্বাসের সাথে, চোর ধাপ্পাবাজেরা বুদ্ধিজীবীতে উন্নীত হয়েছে, সুশীলেরা উমেদার হয়ে গেছে, সাহিত্যিকেরা সরকার পোষিত, কবিরা রাজনীতি করছে- এমতাবস্থায় গোটা পৃথিবীতে ধর্মকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ভ্যান্ডালিজমের উত্থান আমাদের চোখের সামনে ঘটলেও আমরা তা থেকে প্রায় অন্ধ হয়ে বসে আছি। ধর্ম যে আগে ছিলনা তা বলছিনা, কিন্তু আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় ধর্মকে তো দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক করেই রাখার কথা হয়েছিল, আসলে আমরা আত্মায় বিশ্বাস করা প্রজন্ম, প্রেতাত্মায় নয়।

রোজগারের সঙ্কট, পুঁজিবাদের ফাঁসে আটকা পড়া সমাজ, আহাম্মক নেতার ছবি তোলার ভাঁড়ামি নিয়ে প্রচারের বাগড়াম্বনা, বিবস্ত্র চিকিৎসা ব্যবস্থার মাঝে জীবন যেখানে ঘোর অমানিশায়, সেখানে 'রাজনীতি নিয়ে আলোচনা অশালীন ও ‘ওটা আমার জন্য নয়’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মতো ইতরেরা সমাজে ভরে গেছে বলেই আজকের সমাজ ব্যবস্থা এমন জড়ধী অনবগতের দিকে দৌড়ে চলেছে- কোনটা আসলে ইস্যু, কোনটা বৈশ্বিক সংকট এ সবের তোয়াক্কা না করেই স্থানীয় ভাবে ‘আমি তো নিরাপদ’ ধরে নিয়ে দিনের পর দিন নির্বিকার থাকাটা মজ্জাগত করে নিতে পেরেছি৷

কিন্তু চাইলেই যে আমরা প্রতিরোধ করতে পারি সেটার কিছুটা এই করোনার ক্রান্তিকাল আমাদের সামনে প্রমাণ করে দিয়েছে। আমরা এমন এক বিপদের সাথে যুঝে চলেছি যা আমাদের সবাইকে এক কাতারে নিয়ে এসেছে, কী সুন্দর সরকারের সকল অত্যাচার মেনে নিচ্ছি তার ভালমন্দ বিচার বিবেচনা না করেই, এক্কেবারে আজ্ঞাবহ ভৃত্য৷ বিশ্বজুড়ে এখন মানবজাতির কাছে অজানা শত্রু তথা ত্রাসের নাম- নভেল করোনা ভাইরাস; যেহেতু এট আমাদেরকে প্রচারের বাহুল্যতায় বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে তাই আমরা বিনা বাক্য ব্যয়ে সব মেনে নিয়েছি৷

কিন্তু এর মোকাবিলাতেও আমরা আমাদের স্বভাবসুলভ হিংসা-দ্বেষ-স্বার্থপরতা থেকে বের হয়ে আসতে পারি নি৷ আমরা ভুলে গেছি যে ভাইরাস যেমন কোনো ধর্ম চেনে না, দল চেনে না- খিদেও তাই; সে আসলে ভাইরাসের চেয়েও অনেক বড় মহামারী৷ আসলে যারা মিডিয়ার মালিক, যারা বিজ্ঞাপন দেয়- তারাই তো শোষণ যন্ত্রের চালক, তাই তারা খিদের বিষয়টাকে সর্বদা এড়িয়ে গেছে, ভুলিয়ে দিয়েছে প্রতিটি মৌলিক অধিকারের গুরুত্বকে। তাই আশঙ্কাটা ভাইরাসের জন্য নয়, বরঞ্চ আমাদের সমাজের গণ উদাসীনতা অনেক বেশি আতঙ্কময়৷

প্রিয় ইতরেরা,

কেউ মানুক আর না-ই মানুক, আমি জানি এই যুদ্ধে আপনারা জয়ী হয়েই গেছি; সেটা আপনাদের গালভরা আত্মনির্ভরতা দিয়ে নয়- বরং আপনাদের উপেক্ষা করার আশ্চর্য ক্ষমতাগুণে৷ এই বিজয়ে আপনাদের নায়ক আমাদের ‘বিকৃত বিবেক’৷ এ এক এমন বিজয়, যেখানে আপনারা এগিয়ে চলেছেন ঠিকই কিন্তু সেটা কবরের দিকে; বিজ্ঞাপনের চাকচিক্যে আসল নকলের ফারাক ভুলে আপনি কেবলই নির্জীব প্রাণী আজ, যে জুলুলুজু চোখে অথর্বের মতো শুধু চেয়ে থাকে- আপনাদের সকলকে অভিনন্দন ও আমার পক্ষ থেকে স্যালুট রইল৷ যেভাবে গোটা বিশ্বজুড়ে নিজের ও নিজের পরিবারের প্রাণকে বিপন্ন করে আপনারা লক্ষ কোটি মানুষেরা এই সমাজকে পচিয়ে তুলেছেন আধুনিকতার নামে, আসলে একা করে দিয়ে নিজে একা হয়ে গেছেন- যদি আগামী বলে কিছু অবশিষ্ট থাকে, তারা চিরকৃতজ্ঞ থাকবে আপনাদের প্রতি; কারণ কয়েক'শ কোটি মানুষ নিজেদেরকে ‘দাঁত ক্যালাতে ক্যালাতে’ যেভাবে আত্মহুতি দিচ্ছেন- তা তাদের জন্য হাজার বছরের সেরা শিক্ষা হয়ে থাকবে।

যুদ্ধের নিয়ম হলো মাথা লক্ষ্য করে অস্ত্রচালনা, তীর-বল্লম-অসিচালনার যুগ পেরিয়ে এসে আমরা এখন ‘১ ও ০’ এর ঘরে বন্দি। হয় অড বা ইভিন- মাঝামাঝি বলে কিছু নেই। না আছে আভিজাত্য, না সংস্কৃতি- স্পন্দনহীন অসমীক্ষ্য চোখের নির্বাক যন্ত্র করে রেখে দেওয়ার যে অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে সভ্যতার কাণ্ডারিরা- কোথায় লাগে অতীতের সব মারণ অস্ত্র! লক্ষ্য আজও সেই মাথা, সেটাকে ভুলভুলাইয়ার মাঝে বুঁদ করে দিতে পারলেই আর কী চাই? প্রহসনের লকডাউনে দেশের রেল ব্যবস্থা যেখানে আজও স্তব্ধ, সেখানে IPL আর সুশান্ত সিং আত্মহত্যার চেয়ে জরুরী কোনো আলোচনা আর নেই। একটা জাতিকে লুটেপুটে খেয়ে ছিবড়ে করে দেওয়ার জন্য দরকার অন্ধ উন্মাদনা, আর তার জন্য চায় নেশাদ্রব্য, রাষ্ট্রযন্ত্রের সহযোগীতায় ক্ষমতাসীনেরা স্তোভের পানীয় গিলিয়ে যাচ্ছে অমৃতের নামে, আমারা সেই জ্ঞান থেকে অনেক এগিয়ে চলে এসেছি অগ্রগতির নামে- যার দ্বারা পূর্বজেরা ভালো ও মন্দের প্রভেদ করতে পারতেন।

একজন জীবিত বিবেকের, নাগরিক হিসেবে মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াই ও সত্য প্রতিষ্ঠার একটা বিশাল দায় যে রয়ে যায়, সেটার অনুভব ক্ষমতাটাই ‘অ্যাপেন্ডিক্স’ হয়ে গেছে৷ সিনেমাতে মিথ্যা VFX এসেছে, বিবেকেরা হারিয়ে গেছে আক্ষরিক অর্থেই। গবেষণা লব্ধ ফলাফল নয়, অনুমান ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেছে সর্বত্র- যা দ্রুত সমাধান করে দিচ্ছে; লাগলে তুক আর না লাগলে তাক। গোটা বৈশ্বিক সমাজ জুড়েই মত প্রকাশ ও ‘সংবাদ’ প্রকাশের ওপর খড়গ নেমে এসেছে, প্রতিটা মানুষের বেঁচে থাকাটাই যেন বিলাসিতা। আজকের দিনে সকলেই সাংবাদিক, সকলেই বুদ্ধিজীবী আর সকলেই তার্কিক, সকলেই শিক্ষিত- তাই সকলেই বলতে চায় অথচ কেউ শুনতে চাই না। কারও মাঝে জ্ঞানের দীপন নেই, শিক্ষাদান আজ পেশা, রোগীরা খদ্দের যেখানে - আত্মিয়তা সেখানে বোঝা হবে এটাই তো স্বাভাবিক। এ সময় মনে হয় সাধারণ হয়ে যারা যাপন করতে পারছে তারাই বোধহয় বেঁচে আছে, আসলে বাঁচাই তো সম্পর্ক- অনেকগুলো সফল সম্পর্কই তো বেঁধে রাখে মানুষকে অদৃশ্য বন্ধনে।

ইটালি, স্পেন, চীন, ব্রিটেন, ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশ নিজেদের সামলে নিয়েছে, সেখানে শিক্ষিত সরকার আছে কিনা সেটা বিবেচ্য নয়- কিন্তু সেখানে কিছু শিক্ষিত নাগরিকের বাস আছে- তাই তারা পেরেছে আপাতভাবে। আমরা ক্যাজুয়ালি নিয়েছি, আর নিজেদের ক্রমেই জরুরি অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছি। ক্রমশ সবটাই আমাদের অদৃষ্টের হাতে বন্দি হয়ে যাচ্ছে, এমতাবস্থায় কে যে নিরাপদ আর কে অসুরক্ষিত তার কোনো গাইডলাইন নেই।

ফার্মেসি, সুপারমার্কেট, পোস্ট অফিস, ব্যাঙ্কের মতো কিছু পরিষেবা ছাড়া যে বিষয় দুটো খোলা আছে তা হলো সংবাদমাধ্যম আর রাজনীতি। এই ফাঁকে সবচেয়ে বড় দুর্যোগটা ছড়াচ্ছে সংবাদ মাধ্যম নিজেই। দুর্যোগের সময় যা চালু থাকে তা যে নিত্যপ্রয়োজনীয় সেটা সুশীল ইতরেরা কবে বুঝবে? রাজনীতি- যা আমাদের বাঁচা মরার মাঝে রেফারির ভুমিকায় অভিনয় করছে সেটা যে ভীষণ একটা সিরিয়াস বিষয় এটা নিয়ে ভাবনা ভাবার মতো সময়ই নেই সমাজের। কিছু অকর্মন্য যারা নিজেদের পেশায় লাথ খেয়েছে তারা রাজনীতিতে মৌরিসপাট্টা গাড়ছে, আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছেলেখেলা করছে তারা।

সরকারি যন্ত্র- গুজবে কান দেবেন না বলে কিছু বর্বরকে সাদা কাপড়ে সাজিয়ে সমাজবিজ্ঞানী সাজিয়ে গোটা সমাজকে বিষিয়ে তুলেছে রাজনীতি সচেতনতা থেকে, মাঝখান থেকে লুটেপুটে খাচ্ছে নক্তচরের বংশবদেরা। এরাই আজ বিজ্ঞানী, এরাই ডাক্তার, এরাই হাকিম। রাজনীতিটাও পেশাদারিত্বের বিষয়, এটারও যে নিত্য অনুশীলন দরকার সেটা আমাদের মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে উঠিয়ে দিয়েছে এই সুশীলেরাই, আজকের এই রাজনীতি বিমুখ যুবসমাজ যে নপুংশক খোজাদের প্রতিনিধি সেটা বোঝার মতো সমর্থ্যই অবশিষ্ট নেই।

সভ্যতার উন্নতির নামে ক্রমশ নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা ও চূড়ান্ত নিরুদ্বেগ থাকার যে অভিযান- অজান্তেই আমরা সেই সেনাবাহিনীর সক্রিয় সদস্যে পরিণত হয়েছি৷ আলাদা করে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সত্যিই কি প্রয়োজন আছে? কাল যদি জায়নবাদীরা আমেরিকা মহাদেশের বিনাশ ডেকে আনে ভূমিকম্প, উল্কা হামলা বা ওই জাতীয় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মতো- তাতেও আমরা কিন্তু নির্লিপ্তই থাকব, আমরা সুউচ্চ বিল্ডিং বানাচ্ছি, চারিদিক খোলা ঘর বানাচ্ছি মজবুত ছাদের নিচে- কিন্তু আমরা আমাদের মনুষত্বকে বাঙ্কারে নিয়ে গেছি মার্কিন ধনকুবের এলিটদের মতো, আমাদের মনের জানালার কব্জাতে জং ধরে গেছে শিক্ষার অনুশীলনের অভাবে; আমরা ভুলে গেছি- ‘জানার নাম জ্ঞান নয়, মানার নাম জ্ঞান’ এই সহজ সত্যটা।

আমরা ভ্যাকসিনের জন্য উদগ্রীব হয়ে বসে আছি, কিন্তু এটা জানি না যে আমদের রাষ্ট্র- ভ্যাকসিন উৎপাদক বিশ্বমারণ কর্পোরেট কুমিরগুলোর কোন ফাঁদে পা দিতে বাধ্য করছে, হতেই পারে আমাদের আগামীর প্রতিটি মুভমেন্টের জন্য এমন কোনো মাইক্রচিপস আমাদের দেহে ইন্সটল করে দেবে ভ্যাকনিসের ছুতোয়, যেখানে আমরাই আসলে একেক জন আসল যন্ত্রমানবে পরিণত হবো। এমনিতেই আমাদের মাঝে বোধবুদ্ধির পরিমাণ লোপ পেয়েছে, যেটুকু মানবীয় গুণ অবশিষ্ট আছে সেটাও কর্পরেটদের দাক্ষিণ্য ও আমাদের লাগামহীন উদাসীনতায়- আমরা গণ দাসত্বের স্বীকার হয়ে যাব। আজকে একটা হোয়াটস অ্যাপ, একটা ফেসবুক বা একটা টুইটারের মেসেজ যদি আমাদের এভাবে বুঁদ করে রেখে দিতে পারে- যখন খেলাটা প্রকাশ্য ময়দানে হবে, তখন যে তা একতরফা ভাবেই হবে সেটা বলাই বাহুল্য।
গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা, বাস্তবিক এই ব্যবস্থার মেয়াদ আর কতদিন থাকবে এই পৃথিবীতে সেটা নিয়ে আমরা কখনও ভেবেছি? যেদিন সভ্যতার সূচনা হয়েছিল, তার পর পরই আইন প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, আর আইন ভঙ্গকারীদের জন্য তৈরি হয়েছিল জেল। প্রকৃতির তৈরি যে আইন, যে নিয়মমালা- তাকে অবলীলায় অস্বীকার করে যাচ্ছি। তাহলে এই আইনভঙ্গের জন্য কি আমরা অচিরেই গণ জেলখানাতে দাখিল হয়ে যাব না? আমাদেরই মূর্খতার সুযোগ নিয়ে একটা ক্ষুদ্র দল আমাদের উপরে প্রভুত্বের চাবুক নিয়ে নতুন সমাজব্যবস্থা এনে হাজির করবেই।

ঐতিহ্যের নামে ধর্মকে ঢাল করে একশ্রেনীর নিকৃষ্ট ব্যবসায়ীরা নেতার ছদ্মবেশে গোটা বিশ্বজুড়ে বিবসনা এক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে, যেখানে মেকি দেশপ্রেমের সত্তার জাগরণের নামে কিছু মুষ্টিমেয় ব্যতিরেকে- যেই ক্ষমতার সায়ে সায় দিচ্ছে না তারাই দেশদ্রোহী হয়ে যাচ্ছে; আর এই ভয়েই সমাজ ‘প্রশ্ন করা’ ভুলে গিয়ে ক্রমশ বধিরতার দিকে এতটাই এগিয়ে গেছে, যেখান থেকে আর ফেরা যায় না। আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম যেটার সূচনা করেছিল আমরা সেই ব্যটনটা আমাদের উত্তরসূরীদের কাছে আরও অনাবৃত একটা সমাজ তুলে দিয়েছি, যেখানে কুক্ষিগত ব্যক্তি স্বার্থের বাইরে সমাজ বলে কিছু অবশিষ্ট নেই। পশ্চিমা সভ্যতা, পরিবারগত ঐতিহ্য সংস্কৃতি আগেই বিসর্জন দিয়ে আধুনিক হয়েছিল, এখন সেই ধারা এশিয়া আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়েছে যা করোনার চেয়েও মারাত্বক।

আমাদের লক্ষ্য কী? অর্থ, খ্যাতি, যশ, ঐশ্বর্য নাকি সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে বেঁচে থাকা? আমাদের এই নীল পৃথিবীর গোটা অর্থ ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছে, কতদিন আর- বড়জোর ২০২১ এর মার্চ এপ্রিল; এর পর যারা মাটির সাথে যুক্ত তারা ছাড়া বাকিরা যদি একে অন্যকে খেতে শুরু করে তাতে কি আশ্চর্য হবেন? পেট্রো ডলারের ফাঁপানো অর্থনীতি কবেই দেউলিয়া হয়ে গেছে, এখন শুধু পচা গাবের মতো ঝড়ে পড়ার অপেক্ষায় আছে; আমাদের এই স্বার্থপর আধুনিকতা, তা তো এই অর্থ ব্যবস্থারই যে দান, সুতরাং সে যাবার সময় আপনার থেকে কিছু না নিয়ে এক্কেবারে যে খালি হাতে যাবে না- সে কথা ভাবার মতো ইচ্ছা বা ক্ষমতা কোনোটাই যে আপনার নেই।

সুতরাং কোথায় রাখবেন এত প্রাইভেসি, এত এলিটপনা- যদি পাশের মানুষটাই না বাঁচে! অর্থের অভাবে লাল্লি মারা যাচ্ছে, স্পেসএক্স মঙ্গল অভিযান করছে, হাজার কোটির মূর্তি তৈরি হচ্ছে, আর এগুলোই হচ্ছে- কারণ আমরাই আসলে এগুলোর অনুমতি দিয়ে রেখেছি, এরপর খেলার নিয়মে যখন নিজের টার্ন আসছে তখন মুমূর্ষুতা এমন অবস্থায় পৌঁছাচ্ছে যে গলা দিয়ে আর আওয়াজ বেরোচ্ছে না। অবশ্য বের করলেই বা শুনছেটা কে, সে কি তার সুসময়ে অন্যের কথা শুনেছিল? এই মুহূর্তে আমাদের বহু কিছু না হলেও চলবে, মেগা প্রজেক্ট পিছিয়ে গেলেও ক্ষতি নেই- কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধানেরা কীভাবে নির্বাচনকে পিছিয়ে দিয়ে ক্ষমতার মেয়াদ বাড়াতে পারে সেই নীল নক্সায় ব্যস্ত। একটা সময় মানবকে সম্পদ বলে মনে করা হতো, এখন মানব আর সম্পদ নয়, দায়- তাই মন্ত্রকও আর নেই। গুরুত্ব শুধুমাত্র ভোটের গুণতিতে, এরা ভুলে গেছে ঠাটবাটের সাথে শাসন করার জন্য মানুষ প্রয়োজন, নতুবা অপেক্ষাকৃত শক্তিশালীরা কানে মোলা দিয়ে ক্ষমতা কেড়ে নেবে।

সমাজতন্ত্র আর একনায়ক তন্ত্রকে আজ গুলিয়ে ফেলেছে কমিউনিস্টদের অনেকে, গণতন্ত্রের ধ্বজাধারীরা পুঁজিবাদের আফিম খেয়ে বুঁদ হয়ে রয়েছে, তাই আদর্শ আজ কিলো দরে পাওয়া যায় ফুটপাতে। ধর্মভীরুতা আর ধর্মব্যবসা- প্রোপাগান্ডার ছদ্মবেশে এমন ‘চালে মুসুরে’ ঘেঁটে গেছে যে আর আলাদা করা যায় না তাদের।

এমতাবস্থায় আপনার মৃতপ্রায় বিবেকের জাগরণই একমাত্র 'হক ও বাতিলের' মাঝে সঠিকটাকে বেছে- সঞ্জীবনী সুধা হিসাবে কিছুটা অক্সিজেন সরবরাহ করে পচে যাওয়া সভ্যতার ধ্বংসকে কিছুটা বিলম্বিত করতে পারে, নতুবা আগামীর 5G গতির সাথে তাল মিলিয়ে এই ফ্যাব্রিকেডেট সমাজব্যবস্থা যদি ২০৩০শেই ওলট-পালট হয়ে যায়, আশ্চর্য হবেন না; আর এর টেরটা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পাওয়া শুরু হয়ে যাবে।

ধর্মভিত্তিক রাজনীতি গোটা বিশ্বকে দ্রুত গ্রাস করল বলে, কারণ আপনি কতটা প্রস্তুত তার জন্য ধ্বংস প্রতীক্ষা করে না।

রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২০

মরবিড জেলাসি বা ওথেলো সিনড্রোম



সাংস্কৃতিক, সামাজিক, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞান সহ মরবিড জেলাসি মনস্তাত্ত্বিক জটিল সম্পর্কের প্রায় প্রতিটি সূক্ষ্ম অংশগুলোকে স্পর্শ করে যায়, এ কারণেই ‘মরবিড জেলাসি’ গল্পকার, ঔপন্যাসিক এবং নাট্যকারদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি বিষয়।

সন্দেহ, কথাটি আমরা সকলেই শুনেছি; এবং প্রতিটি বোধসম্পন্ন মানুষই সন্দেহ করেনি এমন দিন আসেনি, তা সে যে বিষয়ের উপরেই হোক না কেন। যাবতীয় আবিষ্কারের মূলে কিন্তু এই সন্দেহবাতিক মনই দায়ী, এই সন্দেহই প্রশ্নদের জন্ম দেয়- কী ও কেন!

সন্দেহ মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য হলেও কিছু কিছু মানুষ এটাকে অসুস্থতার পর্যায়ে নিয়ে চলে যায়, যাদের সন্দেহবাতিক বলে চিহ্নিত করা হয়, মাত্রাধিক সন্দেহ প্রবণতাই আবার বহু অপরাধের জন্ম দেয়। মানুষের মন ও ভাবনার জটিল বিচিত্র মনস্তত্ত্বকে বিচার বিশ্লেষণ করার কোনো যন্ত্র নেই। তার পরেও বিভিন্ন মনোবিদ তথা মনোবিজ্ঞানীরা কিছু কিছু ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছে যার দ্বারা ঘটে চলা এই জাতীয় মানসিক দশার একটা যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দেওয়া হয়ত বা সম্ভব।

মরবিড জেলাসি হলো সেই যুক্তিসূত্র যার দ্বারা সন্দেহবাতিক মনকে ব্যাখ্যা করা যায়। সমাজে নারীদের মাঝে এই ‘মরবিড জেলাসি’ উপসর্গ প্রবণতা ৮৭% ক্ষেত্রে ও পুরুষের ক্ষেত্রে ৩৪% ক্ষেত্র বলে দেখা গেছে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায়।

দু’জন মানুষের মাঝে থাকা সুস্থ ও স্বাভাবিক সম্পর্ককে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দেওয়ার জন্য সন্দেহের একটা স্ফুলিঙ্গই যথেষ্ট। মাত্রাধিতিরিক্ত রাগ বা অভিমানই আসলে সন্দেহের সূচনা করে, বিশেষত সম্পর্কে। ভালোবাসার সাথে সন্দেহ ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সন্দেহের সিঁড়ি পেরিয়ে তবেই তা বিশ্বাসের মজবুত স্থায়িত্বে পৌঁছায়, যেহেতু সন্দেহ একটি স্বতঃস্ফূর্ত ক্রিয়া তাই অনেকে যেমন এটাকে বাড়াবাড়ির পর্যায়ে নিয়ে চলে যান; তেমনই অনেকে আবার বুঝতেই পারে না যে আসলে তারা তাদের সম্পর্কের সন্দেহ পিরিয়ডটা পেরিয়ে চলে এসেছে ইতিমধ্যে, কারণ সেখানে ব্যাক্তিদ্বয়ের মাঝের শারীরিক ও মানসিক দুরত্বটা খুবই কম থাকার দরুন একে অপরের সহচর্যের উষ্ণতাতে সন্দেহকে তার বিস্তার লাভের সামান্যতম সুযোগ দেয়নি। এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার, কখনই কোনো সন্দেহ নিজে থেকে জন্ম নেয় না, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও চারিত্রিক আচারের প্রকাশের দরুনই সন্দেহরা জন্ম নেয়।

সম্পর্কের শুরুতে বিশ্বাসবোধটা উন্নত ও মজবুত পর্যায়ে থাকেনা, ‘রুচি ও সংস্কৃতি’ এই দুই প্রাথমিক শর্ত মিলে গেলে সম্পর্কের প্রাথমিক পর্যায় হল পারস্পরিক সম্মানজ্ঞাপনা বোধের স্ফুরণ। এটাই দুটো আলাদা আলাদা মানুষকে কাছাকাছি আসতে সাহায্য করে, আত্মিক বোধ গড়ে তোলে। এই পর্যায়ে শালীনতার ঘেরাটোপে কৌতূহল মিশ্রিত সান্দ্র মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা থাকে, যেখানে আবেগ বেশি যুক্তি কম থাকে। প্রচ্ছন্ন ‘অস্বস্তি ও বিব্রত’ বোধগুলো সময়ের সাথে সাথে অবলুপ্ত হয়ে, পলির মতোন বিশ্বাসের পরত জমিয়ে তোলে মনের গভীরে, এর পরেই নামহীন সম্পর্কগুলো সামাজিক বন্ধনের দ্বারা পরিচিতি পায়।

মানুষ বৈচিত্র্য পছন্দ করে, স্বীকৃত সম্পর্কের মাঝে বিষণ্ণতা, কষ্ট আর অভিমানের ভাগ অধিক মাত্রায় থাকলে হতাশার জন্ম দেয়। হতাশা জন্ম দেয় ক্লান্তি, আর ক্লান্তি নিয়ে আসে বৈরিতা। একসময় একঘেঁয়ে জীবনধারায় পারস্পরিক বোঝাপড়াটা কমতে কমতে- পারস্পরিক সম্মানবোধের স্থানটা আঘাতপ্রাপ্ত হয়, বিলুপ্ত হয় সহজাত সমঝোতার মন্ত্রগুপ্তি। দুজন আলাদা আলাদা ব্যাক্তির শৈশবকালীন অভিজ্ঞতা, অর্থনৈতিক অবস্থান, নিরাপত্তাহীনতা, অপ্রত্যাশতা, পরস্পর নির্ভরতা এবং নির্দিষ্ট সম্পর্কের অতীতের হরেক অভিজ্ঞতার মতো স্বতন্ত্র উপাদানগুলিও তখন বিচার্যের বিষয় হয়ে উঠে। দায়িত্ববোধের চেয়ে অধিকার বোধকে গুরুত্ব প্রদান করে একে অন্যের উপরে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে মানসিক স্থিতিশীলতাকে দুরমুশ করে সম্পর্কের গভীরে ক্ষতের সৃষ্টি করে আর এই ক্ষতস্থানেই বাসা বাঁধে সন্দেহের জীবাণু যা ক্রমেই সূক্ষ্ম অনুভুতিগুলোকে হত্যা করে মানসিক সুখশান্তিকে চূড়ান্তভাবে ব্যাহত করে বিচ্ছেদের পরিণতি এনে দেয়।

সাধারণভাবে সন্দেহকে ইংরাজিতে ‘সাসপিশাসনেস’ বলে, কিছু মনোবিজ্ঞানীদের মতে সন্দেহপ্রবণতা হলো একধরনের মানসিক অবস্থা- যার নাম ‘ডিলিউশন প্যারানয়েড সাইকোসিস’। সোজা বাংলায় কিন্তু এটা কোনো মানসিক রোগ তথা মনোব্যাধি নয়, বরং এ হলো জটিল মানসিক ব্যাধির পূর্বলক্ষণগত অসুস্থতা। একই সাথে সুখ, আনন্দ, রাগ, অপ্রাপ্তি ও অধিকারবোধের এক জটিল সংমিশ্রণ। এই ধরনের চারিত্রিক উপসর্গের পেছনে কোনো বাস্তব ভিত্তি থাকে না, কিছু আধা যৌক্তিক কারণের উপরেই গোটা বিষয়টাই স্থাপিত। এই জাতীয় উপসর্গ যেহেতু ব্যাক্তির মানসিক একটা পর্যায়, তাই বাকি আর পাঁচটা স্বাভাবিক কাজকর্মের কাজে এই সন্দেহপনাও দিব্যি বহাল তবিয়তে বেঁচে থাকে বছরের পর বছর, অটলভাবে।

একে অনেক সময় ‘ওথেলো সিনড্রোম’ নামেও অভিহিত করা হয়ে থাকে কারণ, শেক্সপিয়ারের অমর সৃষ্টি ওথেলো নাটকে দেখা যায়- নায়ক ওথেলো এই ‘সন্দেহে ভূতে’ আক্রান্ত হয়েই তার সুন্দরী প্রিয়তমা স্ত্রী ডেসডিমোনাকে হত্যা করেছিল। মাত্রাধিরিক্ত ভালোবাসা তথা চাহিদা থেকেই খুঁতখুঁতে মনোভাব জন্ম নেয়, আর এ থেকেই সমস্যার জন্ম হয় বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করে থাকে। বিখ্যাত তামিল লেখক কালকি’র ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে লেখা দুটো উপন্যাস ‘পার্থিবান কানাভু’ ও ‘পন্নিইন সেলভান’ মূলত এই মরবিড জেলাসির উপরে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। আবার উল্টোদিকে পৌরাণিক আখ্যান অহল্যার ক্ষেত্রে দেখা যায়, সে ইন্দ্রদেবকে চিনতে পেরেও তার সাথে স্বেচ্ছায় যৌনতায় মত্ত হয়েছিল, এগুলোও একধরনের মানসিক অপূর্ণতার ফসল- যাকে আমরা চালু ভাষায় বলি ‘অতৃপ্ত আত্মা’। পাশাপাশি মহাভারতের চরিত্র সত্যবতী তার পুত্রবধূদের জন্য বা পান্ডু তার দুই স্ত্রীদের জন্য স্বেচ্ছায় পরপুরুষের কামনা ও তার বন্দোবস্ত করেছিল- এগুলোও একধরনের ব্যতিক্রমী মানসিক বিকার। কবিগুরুর ‘মালঞ্চ’ উপন্যাসে নিরজার চরিত্রে সুখ, আনন্দ, বিষাদ, উপেক্ষা, হিংসার এক বিশেষ ধরনের মরবিড জেলাসি লক্ষ্য করা যায়।

এই মরবিড জেলাসি সিনড্রোম মূলত দুই ধরনের-

ক) সিম্পটনিক জেলাসিঃ কিছুটা বংশগত ক্ষেত্রে কলহপ্রিয় পরিবারের সন্তানদের মাঝে এই উপসর্গ দেখা যায়। চরিত্রগতভাবেই এরা সন্দেহপরায়ণ হয় যা সাধারণভাবে বাইরে থেকেই পরিলক্ষিত হয়।

খ) রিয়্যাক্টিভ জেলাসিঃ এটি ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে সঙ্গীর সাথে মানসিক সম্পর্কের সূচকের উপরে নির্ভর করে, যা পারস্পরিক বিশ্বাসের তুল্যমূল্য বিচারের উপরে নির্ধারিত হয়। দুর্বল আত্মসম্মানবোধ, অধিক সংবেদনশীলতা, নিম্ন আত্মবিশ্বাস, অপর্যাপ্ত মর্যাদা, অত্যাধিক চাহিদা, প্রতারণা, প্রতিশ্রুতিভঙ্গ, নিরন্তর বিষাদযাপন, অতিরঞ্জিতকরণের লিপ্সা, অতৃপ্ত যৌনতা এবং নিম্ন আচরণবোধ সম্পন্ন ভুল সঙ্গী নির্বাচনের কারণে জটিল মনস্তাত্ত্বিক সিনড্রোম দেখা দেয়।

মূলকথা, বিভিন্ন কারণে এই সিনড্রোমের লক্ষণ দেখা যায়, অতিরিক্ত নেশা, ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বৈকল্য, যৌনসমস্যা, মানসিক অবসাদ ইত্যাদির মতো হরেক কারণ থাকলেও ‘উপেক্ষা’ সবচেয়ে বড় কারণ।

উভয়ের সমবেত সিদ্ধান্তকে যখন একজন তার প্রতিশ্রুতিময় সময়কে হেলায় হারিয়ে নিজের সিদ্ধান্তের উপরে যেকোনো মূল্যে পৌঁছাবার দায়ে- অপরজনের চাহিদাকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে নিজের স্বার্থ হাসিল করে, তখনই সঙ্গীর সম্বন্ধে অত্যন্ত শঙ্কিত হয়ে পরে অপর ব্যক্তিটি। এই ধরণের ব্যক্তিরাই পরবর্তী সময়ে আত্মবিশ্বাসহীন হয়ে পড়ে তার সাথী সম্বন্ধে, যা তাদের ভাবনাতে তীব্র উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করে। পূর্ব প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দায়ে সেই সঙ্গীর বিরুদ্ধে কোনো প্রকারের প্রতিষ্ঠিত প্রমাণ ছাড়াই ব্যক্তির অজান্তেই তার মনে বদ্ধমূল ধারণাপুঞ্জ জন্মাতে শুরু করে হরেক মাত্রায়, এ এক মানবীয় জটিল মনস্তাতাত্ত্বিক পর্যায়ের বহুমাত্রিক ত্রুটি হিসাবেই বিবেচনা করা হয়।

প্রতিশ্রুতিমূল ভিত্তির উপরে গড়ে ওঠা অধিকাংশ ‘ডিস্টেন্স রিলেসনসিপে’ এই জাতীয় সন্দেহ প্রবণতার মাত্রা পরিলক্ষিত করা যায়। তখন আরও বেশি বেশি করে সঙ্গীকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, নিজের জোর খাটাতে চায়, যা এক পর্যায়ে মারাত্মক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। একে অনেক বিজ্ঞানী ‘ডিলিউশনাল জেলাশি’ বা ‘প্যাথোলজিক্যাল জেলাসি’ নামেও অভিহিত করে থাকেন, যা এক ধরনের মানসিক রোগের প্রাথমিক পর্যায়। তবে শুরুতেই কেউ প্যাথোলজিক্যাল বা ডিলিউশনাল জেলাসি রোগে আক্রান্ত হয় না। এর পূর্বে কমপক্ষে দুটি পর্যায় রয়েছে যেগুলো অতিক্রম করে তবে এই পর্যায়ে পৌঁছায় আক্রান্ত ব্যাক্তি। সর্বপ্রথম যেটা দেখা যায় তার নাম ‘হাইপারস্টেথিক জেলাসি সিনড্রোমে’, এর পরের পর্যায়ে ব্যক্তির আরও মানসিক পরিস্থিতির অবনতি হলে তখন তাকে বলে ‘মোনোম্যানিয়াক জেলাসি সিনড্রোমে’, এবং শেষ দশাটি হলো প্যাথোলজিক্যাল জেলাসি।

সম্পর্কের দায়বদ্ধতা এক্ষেত্রে গৌণ হয়ে দাঁড়ায়, যা ব্যক্তির অবচেতন মনে সারাক্ষণ সন্দেহ নামের একজাতীয় বিকারের সৃষ্টি করে সর্বদা চিত্তবিভ্রম ঘটিয়ে রাখে। তখন ‘আমিই একমাত্র মুরুব্বি’, সুতরাং একমাত্র আমার কথা অনুযায়ীই সম্পর্কের দিনযাপন হবে এই পর্যায় শুরু হয়ে যায়, যা ঘটে আক্রান্ত ব্যক্তির অজান্তেই। কারণ আক্রান্ত ব্যক্তির সর্বদা মনে হয় ‘আমার’ সাথে প্রবঞ্চনা করা হয়েছে, যেহেতু সম্পর্কের শুরুটাই শর্ত সাপেক্ষ ছিল। ক্রমে এটাকে বিশ্বাসঘাতকতার রূপ দিয়ে হিংস্র প্রতিশোধের স্পৃহা জেগে উঠলে তখনই ভয়াবহ অপরাধগুলো ঘটে যায়, বহুলাংশেই অসুস্থ ব্যক্তি আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে ওঠে। যারা সন্দেহবাতিকতাজনিত ব্যক্তিত্ব জটিলতায় ভুগছেন তারা সর্বদাই আশপাশের লোকজনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে রাখেন এবং সমাজকে তার সঙ্গীর জন্য একটি ভয়ানক স্থান হিসাবে দেখতে পছন্দ করেন।

এই সিন্ড্রোমের ক্ষেত্রে যেগুলো দেখা যায়-

১) সঙ্গী/সঙ্গীনির প্রতি অস্বাভাবিক আচরণ।
২) সারাক্ষণ হুমকি প্রদান, সেটা নিজের প্রতি হোক বা অপর পক্ষের।
৩) সঙ্গী/সঙ্গীনিকে তার পরিবার ও নিকটাত্মীয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া।
৪) ফোনের কললিস্ট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা।
৫) মানসিক ও শারীরিক সহিংসতা প্রদর্শন।
৬) সঙ্গী/সঙ্গীনি কোথায় রয়েছে এ বিষয়ে সর্বক্ষণ খোঁজ নেওয়া

এর সাথে বিপথগামী চরিত্রের আদর্শ প্রতিভূ হিসাবে তাকে দাঁড় করিয়ে পরক্ষণেই আবার অস্থির আচরণ শুরু করে যা পূর্বের সম্পূর্ণ বিপরীত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে সঙ্গীর অধিক বিষাদময়তার মাত্রাতিরিক্ত প্রভাবে ব্যক্তির মানসিক জগতে এক অদ্ভুত ধরনের পরিবর্তন সাধিত হয় এবং তা আক্রান্ত ব্যক্তির অজান্তেই, ফলস্বরূপ সে সঙ্গীকে শোধরাতে গিয়ে নিজেই এমন কিছু আচরণ করে ফেলে যেগুলো সুস্থ স্বাভাবিক সমাজের পরিপন্থী। দাম্পত্য কলহের ক্ষেত্রে এ এক অতিসাধারণ ঘটনা, যাদের দাম্পত্য শেষ হয়েছে বিচ্ছেদের পরিণতিতে। কিন্তু প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে বিচ্ছেদও সেই সিনড্রোমের সমাধান করেনি; সামাজিক হেনস্থা, শারীরিক নিগ্রহ, জখম এমনকি খুনোখুনির মতো পর্যায়েও পৌঁছে যায় অনিয়ন্ত্রিত সন্দেহজনক রাগের পরিণাম হিসাবে।

এই উপসর্গই যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তখন একে ‘প্যারানয়েড পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার’ বলা হয়ে থাকে। জার্মানির মিউনিখ ইউনিভার্সিটির গবেষণা অনুযায়ী বর্তমান বিশ্বের প্রায় ৭% মানুষ এই ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত, যা মানসিক ব্যাধির পর্যায়ে চূড়ান্ত। শুরুর দিকে মৃদু মাত্রার প্যারানয়েড ডিসঅর্ডার রোগীর ক্ষেত্রে আবেগজনিত প্রকাশ বিপুল মাত্রায় কমে যায়, একে ‘ডিলিউশন অব পারসিফিউশন’ বলে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির কর্মক্ষেত্রে তার কর্মদক্ষতা কমে যায় বিপুল ভাবে, বিচিত্র কারণজনিত ভ্রান্ত বিশ্বাসে ভোগার দরুন আপনা থেকেই নানা ধরনের দুরারোগ্য শারীরিক ব্যাধির শিকার হয়ে যান। বিশেষ ক্ষেত্রের ওই বিশ্বাস ক্ষেত্র ব্যতীত আক্রান্তদের চিন্তা-ভাবনার ধরণ বাকি অনেকের চেয়ে উৎকৃষ্ট মাত্রায় পরিষ্কার ও স্বাচ্ছন্দ্য ধারণা থাকে, যা অনেকের কাছে ঈর্ষনীয়। স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে গেলেও এরা সারাক্ষণ দ্বিধান্বিত অবস্থায় ভোগে, যদিও এদের মজবুত আবেগজনিত চারিত্রিক আচরণ ও তার প্রকাশ দিয়ে এরা সমাজের যেকোনো অংশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার অদ্ভুত দক্ষতা হাসিল করে নেয়।

প্যারানয়েড পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অতিমাত্রায় সতর্ক এবং সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। তখন নিজস্ব সঙ্গীর গন্ডি ছাড়িয়ে অপর কোনো ব্যাক্তিকে অন্য আরেকজন কেউ সন্দেহ করলে বা কেউ কারো বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করলে সংশ্লিষ্ট অসুস্থ ব্যক্তিটি ভীষণ রকমের প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠেন, কখনও কখনও তা কাউকে আক্রমণ করার পর্যায়েও নিয়ে যেতে পারে। এমনিই কেউ তার দিকে তাকালে সে মনে করে “নিশ্চয়ই ব্যাটার কোনো কুমতলব আছে”, যদিও এটা প্রতিটি মায়েরই স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য তার সন্তানের সুরক্ষার বিষয়ে।

সাধারণত বহুমুখী চিন্তাশীল ব্যক্তির ক্ষেত্রে, মাত্রাতিরিক্ত অহেতুক যুক্তিহীন কু-তর্কে জড়িয়ে অতিরিক্ত আবেগ প্রকাশের দরুন ও উচ্চমাত্রার আবেগের ধরনের পরিবর্তনের জন্য একটা সময়ের পর এরা নিজেরাই সমাজ থেকে ক্রমশ নিজেকে গুটিয়ে ফেলে। এদের মানসিক ‘অত্যাচারে’ বিরক্ত হয়ে প্রায় প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে এদের যারা নিকটাত্মীয়- তারা বিরক্ত হয়ে দূরে সরে যান, এতে করে আক্রান্ত ব্যক্তির সন্দেহবাতিক মন প্রত্যেকটি মানুষকেই উদ্দেশ্যমূলক চিন্তাধারার অধিকারী বলে সন্দেহ করা শুরু করে আর বেশি বেশি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

এই পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোনোপ্রকার সমঝোতা বা মীমাংসায় আসতে চায় না, এবং দীর্ঘদিন এই অবস্থা চলতে থাকলে এদের ‘প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিয়া’ নামের এক জটিল ব্যাধি গ্রাস করে, যেখানে ব্যক্তির স্বাভাবিক বোধবুদ্ধি লোপ পেয়ে অনেকটা জড়বুদ্ধি সম্পন্ন হয়ে যায়, যাকে সাধারণভাবে ‘পাগল’ বলা হয়। এই সময় ব্যক্তিটিকে মানসিক হাসপাতালে পাঠিয়ে আবাসিক চিকিৎসা করানোটাই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ পন্থা সমাজের পক্ষে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুরুতেই যত্ন নিলে এই সিনড্রোমের সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। সঙ্গীর সাথে দৃষ্টিভঙ্গির ফারাকের কারণেই যেহেতু এই সন্দেহ উপসর্গের সূত্রপাত হয়, তাই ঠিক সে সময় থেকে এমন সমস্যার সূত্রপাত, তার মূলে গিয়ে এর প্রকৃত কারণ নিরুপণ করে সেই ‘সময়ের চাহিদা না মেটার’ ক্ষতকে- নিরাময় রা বাঞ্ছনীয় উপযুক্ত প্রতিস্থাপক দিয়ে। এই উপসর্গের চিকিৎসা হিসাবে কোনো মনোবিদের সাথে কাউন্সেলিং করলে তা এক্কেবারে প্রাথমিক স্তরের উপশম হিসাবে নির্বাচিত হয়, এক্ষেত্রে উপসর্গকে রোগে পর্যবাসিত করা থেকে তাৎক্ষনিকভাবে রোধ করা সম্ভব হয়। এর সাথে চিকিৎকের পরামর্শে আধুনিক চিকিৎসা বিদ্যার নির্দিষ্ট ধরনের মানসিক রোগের ঔষধ সেবন করলে ধীরে ধীরে বিষাদগ্রস্থতা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। পাশাপাশি, পারিবারিক ভাবে তার সঙ্গীটি যদি স্ত্রী বা পরিবারের অতি ঘনিষ্ট কেউ হয়, তাহলে তার জন্যও কাউন্সেলিং সমভাবে প্রযোজ্য; কারণ এই ধরনের সমস্যার সূত্রপাতই হয়েছিল তার ‘ব্যবহারিক আচরণগত’ সমস্যার কারণেই। যদিও ‘মন-বিশ্লেষনের’ মাধ্যমে এই ডাক্তারি চিকিৎসা এক ‘জটিল, ব্যায়সমৃদ্ধ ও সময়সাপেক্ষ’ বিষয়, তবুও পরিবারের সমর্থন ও সঠিক সহচর্য পেলে উপসর্গাক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ জীবনে দ্রুত ফিরে আসতে সক্ষম।

এর সাথে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতি বিশেষভাবে সামাজিক যত্ন নেওয়াটাও ভীষণ জরুরী। উপসর্গাক্রান্ত ব্যক্তি ও তার সঙ্গী একত্রে বসবাস করলে তাদের মাঝে সাময়িক বিচ্ছেদ এই সমস্যার নিরাময় করে তুলতে পারে উপরোক্ত চিকিৎসা প্রণালীর সাহায্যে। উল্টোদিকে তারা যদি একে অপরের থেকে দূরে থাকে তাহলে তাহলে তাদের কমপক্ষে বেশ কয়েকমাস একত্রে থাকা বাঞ্ছনীয় তবেই উপরোক্ত চিকিৎসা কাজে আসবে।

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...