রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২০

মরবিড জেলাসি বা ওথেলো সিনড্রোম



সাংস্কৃতিক, সামাজিক, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞান সহ মরবিড জেলাসি মনস্তাত্ত্বিক জটিল সম্পর্কের প্রায় প্রতিটি সূক্ষ্ম অংশগুলোকে স্পর্শ করে যায়, এ কারণেই ‘মরবিড জেলাসি’ গল্পকার, ঔপন্যাসিক এবং নাট্যকারদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি বিষয়।

সন্দেহ, কথাটি আমরা সকলেই শুনেছি; এবং প্রতিটি বোধসম্পন্ন মানুষই সন্দেহ করেনি এমন দিন আসেনি, তা সে যে বিষয়ের উপরেই হোক না কেন। যাবতীয় আবিষ্কারের মূলে কিন্তু এই সন্দেহবাতিক মনই দায়ী, এই সন্দেহই প্রশ্নদের জন্ম দেয়- কী ও কেন!

সন্দেহ মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য হলেও কিছু কিছু মানুষ এটাকে অসুস্থতার পর্যায়ে নিয়ে চলে যায়, যাদের সন্দেহবাতিক বলে চিহ্নিত করা হয়, মাত্রাধিক সন্দেহ প্রবণতাই আবার বহু অপরাধের জন্ম দেয়। মানুষের মন ও ভাবনার জটিল বিচিত্র মনস্তত্ত্বকে বিচার বিশ্লেষণ করার কোনো যন্ত্র নেই। তার পরেও বিভিন্ন মনোবিদ তথা মনোবিজ্ঞানীরা কিছু কিছু ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছে যার দ্বারা ঘটে চলা এই জাতীয় মানসিক দশার একটা যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দেওয়া হয়ত বা সম্ভব।

মরবিড জেলাসি হলো সেই যুক্তিসূত্র যার দ্বারা সন্দেহবাতিক মনকে ব্যাখ্যা করা যায়। সমাজে নারীদের মাঝে এই ‘মরবিড জেলাসি’ উপসর্গ প্রবণতা ৮৭% ক্ষেত্রে ও পুরুষের ক্ষেত্রে ৩৪% ক্ষেত্র বলে দেখা গেছে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায়।

দু’জন মানুষের মাঝে থাকা সুস্থ ও স্বাভাবিক সম্পর্ককে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দেওয়ার জন্য সন্দেহের একটা স্ফুলিঙ্গই যথেষ্ট। মাত্রাধিতিরিক্ত রাগ বা অভিমানই আসলে সন্দেহের সূচনা করে, বিশেষত সম্পর্কে। ভালোবাসার সাথে সন্দেহ ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সন্দেহের সিঁড়ি পেরিয়ে তবেই তা বিশ্বাসের মজবুত স্থায়িত্বে পৌঁছায়, যেহেতু সন্দেহ একটি স্বতঃস্ফূর্ত ক্রিয়া তাই অনেকে যেমন এটাকে বাড়াবাড়ির পর্যায়ে নিয়ে চলে যান; তেমনই অনেকে আবার বুঝতেই পারে না যে আসলে তারা তাদের সম্পর্কের সন্দেহ পিরিয়ডটা পেরিয়ে চলে এসেছে ইতিমধ্যে, কারণ সেখানে ব্যাক্তিদ্বয়ের মাঝের শারীরিক ও মানসিক দুরত্বটা খুবই কম থাকার দরুন একে অপরের সহচর্যের উষ্ণতাতে সন্দেহকে তার বিস্তার লাভের সামান্যতম সুযোগ দেয়নি। এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার, কখনই কোনো সন্দেহ নিজে থেকে জন্ম নেয় না, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও চারিত্রিক আচারের প্রকাশের দরুনই সন্দেহরা জন্ম নেয়।

সম্পর্কের শুরুতে বিশ্বাসবোধটা উন্নত ও মজবুত পর্যায়ে থাকেনা, ‘রুচি ও সংস্কৃতি’ এই দুই প্রাথমিক শর্ত মিলে গেলে সম্পর্কের প্রাথমিক পর্যায় হল পারস্পরিক সম্মানজ্ঞাপনা বোধের স্ফুরণ। এটাই দুটো আলাদা আলাদা মানুষকে কাছাকাছি আসতে সাহায্য করে, আত্মিক বোধ গড়ে তোলে। এই পর্যায়ে শালীনতার ঘেরাটোপে কৌতূহল মিশ্রিত সান্দ্র মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা থাকে, যেখানে আবেগ বেশি যুক্তি কম থাকে। প্রচ্ছন্ন ‘অস্বস্তি ও বিব্রত’ বোধগুলো সময়ের সাথে সাথে অবলুপ্ত হয়ে, পলির মতোন বিশ্বাসের পরত জমিয়ে তোলে মনের গভীরে, এর পরেই নামহীন সম্পর্কগুলো সামাজিক বন্ধনের দ্বারা পরিচিতি পায়।

মানুষ বৈচিত্র্য পছন্দ করে, স্বীকৃত সম্পর্কের মাঝে বিষণ্ণতা, কষ্ট আর অভিমানের ভাগ অধিক মাত্রায় থাকলে হতাশার জন্ম দেয়। হতাশা জন্ম দেয় ক্লান্তি, আর ক্লান্তি নিয়ে আসে বৈরিতা। একসময় একঘেঁয়ে জীবনধারায় পারস্পরিক বোঝাপড়াটা কমতে কমতে- পারস্পরিক সম্মানবোধের স্থানটা আঘাতপ্রাপ্ত হয়, বিলুপ্ত হয় সহজাত সমঝোতার মন্ত্রগুপ্তি। দুজন আলাদা আলাদা ব্যাক্তির শৈশবকালীন অভিজ্ঞতা, অর্থনৈতিক অবস্থান, নিরাপত্তাহীনতা, অপ্রত্যাশতা, পরস্পর নির্ভরতা এবং নির্দিষ্ট সম্পর্কের অতীতের হরেক অভিজ্ঞতার মতো স্বতন্ত্র উপাদানগুলিও তখন বিচার্যের বিষয় হয়ে উঠে। দায়িত্ববোধের চেয়ে অধিকার বোধকে গুরুত্ব প্রদান করে একে অন্যের উপরে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে মানসিক স্থিতিশীলতাকে দুরমুশ করে সম্পর্কের গভীরে ক্ষতের সৃষ্টি করে আর এই ক্ষতস্থানেই বাসা বাঁধে সন্দেহের জীবাণু যা ক্রমেই সূক্ষ্ম অনুভুতিগুলোকে হত্যা করে মানসিক সুখশান্তিকে চূড়ান্তভাবে ব্যাহত করে বিচ্ছেদের পরিণতি এনে দেয়।

সাধারণভাবে সন্দেহকে ইংরাজিতে ‘সাসপিশাসনেস’ বলে, কিছু মনোবিজ্ঞানীদের মতে সন্দেহপ্রবণতা হলো একধরনের মানসিক অবস্থা- যার নাম ‘ডিলিউশন প্যারানয়েড সাইকোসিস’। সোজা বাংলায় কিন্তু এটা কোনো মানসিক রোগ তথা মনোব্যাধি নয়, বরং এ হলো জটিল মানসিক ব্যাধির পূর্বলক্ষণগত অসুস্থতা। একই সাথে সুখ, আনন্দ, রাগ, অপ্রাপ্তি ও অধিকারবোধের এক জটিল সংমিশ্রণ। এই ধরনের চারিত্রিক উপসর্গের পেছনে কোনো বাস্তব ভিত্তি থাকে না, কিছু আধা যৌক্তিক কারণের উপরেই গোটা বিষয়টাই স্থাপিত। এই জাতীয় উপসর্গ যেহেতু ব্যাক্তির মানসিক একটা পর্যায়, তাই বাকি আর পাঁচটা স্বাভাবিক কাজকর্মের কাজে এই সন্দেহপনাও দিব্যি বহাল তবিয়তে বেঁচে থাকে বছরের পর বছর, অটলভাবে।

একে অনেক সময় ‘ওথেলো সিনড্রোম’ নামেও অভিহিত করা হয়ে থাকে কারণ, শেক্সপিয়ারের অমর সৃষ্টি ওথেলো নাটকে দেখা যায়- নায়ক ওথেলো এই ‘সন্দেহে ভূতে’ আক্রান্ত হয়েই তার সুন্দরী প্রিয়তমা স্ত্রী ডেসডিমোনাকে হত্যা করেছিল। মাত্রাধিরিক্ত ভালোবাসা তথা চাহিদা থেকেই খুঁতখুঁতে মনোভাব জন্ম নেয়, আর এ থেকেই সমস্যার জন্ম হয় বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করে থাকে। বিখ্যাত তামিল লেখক কালকি’র ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে লেখা দুটো উপন্যাস ‘পার্থিবান কানাভু’ ও ‘পন্নিইন সেলভান’ মূলত এই মরবিড জেলাসির উপরে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। আবার উল্টোদিকে পৌরাণিক আখ্যান অহল্যার ক্ষেত্রে দেখা যায়, সে ইন্দ্রদেবকে চিনতে পেরেও তার সাথে স্বেচ্ছায় যৌনতায় মত্ত হয়েছিল, এগুলোও একধরনের মানসিক অপূর্ণতার ফসল- যাকে আমরা চালু ভাষায় বলি ‘অতৃপ্ত আত্মা’। পাশাপাশি মহাভারতের চরিত্র সত্যবতী তার পুত্রবধূদের জন্য বা পান্ডু তার দুই স্ত্রীদের জন্য স্বেচ্ছায় পরপুরুষের কামনা ও তার বন্দোবস্ত করেছিল- এগুলোও একধরনের ব্যতিক্রমী মানসিক বিকার। কবিগুরুর ‘মালঞ্চ’ উপন্যাসে নিরজার চরিত্রে সুখ, আনন্দ, বিষাদ, উপেক্ষা, হিংসার এক বিশেষ ধরনের মরবিড জেলাসি লক্ষ্য করা যায়।

এই মরবিড জেলাসি সিনড্রোম মূলত দুই ধরনের-

ক) সিম্পটনিক জেলাসিঃ কিছুটা বংশগত ক্ষেত্রে কলহপ্রিয় পরিবারের সন্তানদের মাঝে এই উপসর্গ দেখা যায়। চরিত্রগতভাবেই এরা সন্দেহপরায়ণ হয় যা সাধারণভাবে বাইরে থেকেই পরিলক্ষিত হয়।

খ) রিয়্যাক্টিভ জেলাসিঃ এটি ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে সঙ্গীর সাথে মানসিক সম্পর্কের সূচকের উপরে নির্ভর করে, যা পারস্পরিক বিশ্বাসের তুল্যমূল্য বিচারের উপরে নির্ধারিত হয়। দুর্বল আত্মসম্মানবোধ, অধিক সংবেদনশীলতা, নিম্ন আত্মবিশ্বাস, অপর্যাপ্ত মর্যাদা, অত্যাধিক চাহিদা, প্রতারণা, প্রতিশ্রুতিভঙ্গ, নিরন্তর বিষাদযাপন, অতিরঞ্জিতকরণের লিপ্সা, অতৃপ্ত যৌনতা এবং নিম্ন আচরণবোধ সম্পন্ন ভুল সঙ্গী নির্বাচনের কারণে জটিল মনস্তাত্ত্বিক সিনড্রোম দেখা দেয়।

মূলকথা, বিভিন্ন কারণে এই সিনড্রোমের লক্ষণ দেখা যায়, অতিরিক্ত নেশা, ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বৈকল্য, যৌনসমস্যা, মানসিক অবসাদ ইত্যাদির মতো হরেক কারণ থাকলেও ‘উপেক্ষা’ সবচেয়ে বড় কারণ।

উভয়ের সমবেত সিদ্ধান্তকে যখন একজন তার প্রতিশ্রুতিময় সময়কে হেলায় হারিয়ে নিজের সিদ্ধান্তের উপরে যেকোনো মূল্যে পৌঁছাবার দায়ে- অপরজনের চাহিদাকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে নিজের স্বার্থ হাসিল করে, তখনই সঙ্গীর সম্বন্ধে অত্যন্ত শঙ্কিত হয়ে পরে অপর ব্যক্তিটি। এই ধরণের ব্যক্তিরাই পরবর্তী সময়ে আত্মবিশ্বাসহীন হয়ে পড়ে তার সাথী সম্বন্ধে, যা তাদের ভাবনাতে তীব্র উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করে। পূর্ব প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দায়ে সেই সঙ্গীর বিরুদ্ধে কোনো প্রকারের প্রতিষ্ঠিত প্রমাণ ছাড়াই ব্যক্তির অজান্তেই তার মনে বদ্ধমূল ধারণাপুঞ্জ জন্মাতে শুরু করে হরেক মাত্রায়, এ এক মানবীয় জটিল মনস্তাতাত্ত্বিক পর্যায়ের বহুমাত্রিক ত্রুটি হিসাবেই বিবেচনা করা হয়।

প্রতিশ্রুতিমূল ভিত্তির উপরে গড়ে ওঠা অধিকাংশ ‘ডিস্টেন্স রিলেসনসিপে’ এই জাতীয় সন্দেহ প্রবণতার মাত্রা পরিলক্ষিত করা যায়। তখন আরও বেশি বেশি করে সঙ্গীকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, নিজের জোর খাটাতে চায়, যা এক পর্যায়ে মারাত্মক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। একে অনেক বিজ্ঞানী ‘ডিলিউশনাল জেলাশি’ বা ‘প্যাথোলজিক্যাল জেলাসি’ নামেও অভিহিত করে থাকেন, যা এক ধরনের মানসিক রোগের প্রাথমিক পর্যায়। তবে শুরুতেই কেউ প্যাথোলজিক্যাল বা ডিলিউশনাল জেলাসি রোগে আক্রান্ত হয় না। এর পূর্বে কমপক্ষে দুটি পর্যায় রয়েছে যেগুলো অতিক্রম করে তবে এই পর্যায়ে পৌঁছায় আক্রান্ত ব্যাক্তি। সর্বপ্রথম যেটা দেখা যায় তার নাম ‘হাইপারস্টেথিক জেলাসি সিনড্রোমে’, এর পরের পর্যায়ে ব্যক্তির আরও মানসিক পরিস্থিতির অবনতি হলে তখন তাকে বলে ‘মোনোম্যানিয়াক জেলাসি সিনড্রোমে’, এবং শেষ দশাটি হলো প্যাথোলজিক্যাল জেলাসি।

সম্পর্কের দায়বদ্ধতা এক্ষেত্রে গৌণ হয়ে দাঁড়ায়, যা ব্যক্তির অবচেতন মনে সারাক্ষণ সন্দেহ নামের একজাতীয় বিকারের সৃষ্টি করে সর্বদা চিত্তবিভ্রম ঘটিয়ে রাখে। তখন ‘আমিই একমাত্র মুরুব্বি’, সুতরাং একমাত্র আমার কথা অনুযায়ীই সম্পর্কের দিনযাপন হবে এই পর্যায় শুরু হয়ে যায়, যা ঘটে আক্রান্ত ব্যক্তির অজান্তেই। কারণ আক্রান্ত ব্যক্তির সর্বদা মনে হয় ‘আমার’ সাথে প্রবঞ্চনা করা হয়েছে, যেহেতু সম্পর্কের শুরুটাই শর্ত সাপেক্ষ ছিল। ক্রমে এটাকে বিশ্বাসঘাতকতার রূপ দিয়ে হিংস্র প্রতিশোধের স্পৃহা জেগে উঠলে তখনই ভয়াবহ অপরাধগুলো ঘটে যায়, বহুলাংশেই অসুস্থ ব্যক্তি আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে ওঠে। যারা সন্দেহবাতিকতাজনিত ব্যক্তিত্ব জটিলতায় ভুগছেন তারা সর্বদাই আশপাশের লোকজনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে রাখেন এবং সমাজকে তার সঙ্গীর জন্য একটি ভয়ানক স্থান হিসাবে দেখতে পছন্দ করেন।

এই সিন্ড্রোমের ক্ষেত্রে যেগুলো দেখা যায়-

১) সঙ্গী/সঙ্গীনির প্রতি অস্বাভাবিক আচরণ।
২) সারাক্ষণ হুমকি প্রদান, সেটা নিজের প্রতি হোক বা অপর পক্ষের।
৩) সঙ্গী/সঙ্গীনিকে তার পরিবার ও নিকটাত্মীয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া।
৪) ফোনের কললিস্ট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা।
৫) মানসিক ও শারীরিক সহিংসতা প্রদর্শন।
৬) সঙ্গী/সঙ্গীনি কোথায় রয়েছে এ বিষয়ে সর্বক্ষণ খোঁজ নেওয়া

এর সাথে বিপথগামী চরিত্রের আদর্শ প্রতিভূ হিসাবে তাকে দাঁড় করিয়ে পরক্ষণেই আবার অস্থির আচরণ শুরু করে যা পূর্বের সম্পূর্ণ বিপরীত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে সঙ্গীর অধিক বিষাদময়তার মাত্রাতিরিক্ত প্রভাবে ব্যক্তির মানসিক জগতে এক অদ্ভুত ধরনের পরিবর্তন সাধিত হয় এবং তা আক্রান্ত ব্যক্তির অজান্তেই, ফলস্বরূপ সে সঙ্গীকে শোধরাতে গিয়ে নিজেই এমন কিছু আচরণ করে ফেলে যেগুলো সুস্থ স্বাভাবিক সমাজের পরিপন্থী। দাম্পত্য কলহের ক্ষেত্রে এ এক অতিসাধারণ ঘটনা, যাদের দাম্পত্য শেষ হয়েছে বিচ্ছেদের পরিণতিতে। কিন্তু প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে বিচ্ছেদও সেই সিনড্রোমের সমাধান করেনি; সামাজিক হেনস্থা, শারীরিক নিগ্রহ, জখম এমনকি খুনোখুনির মতো পর্যায়েও পৌঁছে যায় অনিয়ন্ত্রিত সন্দেহজনক রাগের পরিণাম হিসাবে।

এই উপসর্গই যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তখন একে ‘প্যারানয়েড পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার’ বলা হয়ে থাকে। জার্মানির মিউনিখ ইউনিভার্সিটির গবেষণা অনুযায়ী বর্তমান বিশ্বের প্রায় ৭% মানুষ এই ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত, যা মানসিক ব্যাধির পর্যায়ে চূড়ান্ত। শুরুর দিকে মৃদু মাত্রার প্যারানয়েড ডিসঅর্ডার রোগীর ক্ষেত্রে আবেগজনিত প্রকাশ বিপুল মাত্রায় কমে যায়, একে ‘ডিলিউশন অব পারসিফিউশন’ বলে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির কর্মক্ষেত্রে তার কর্মদক্ষতা কমে যায় বিপুল ভাবে, বিচিত্র কারণজনিত ভ্রান্ত বিশ্বাসে ভোগার দরুন আপনা থেকেই নানা ধরনের দুরারোগ্য শারীরিক ব্যাধির শিকার হয়ে যান। বিশেষ ক্ষেত্রের ওই বিশ্বাস ক্ষেত্র ব্যতীত আক্রান্তদের চিন্তা-ভাবনার ধরণ বাকি অনেকের চেয়ে উৎকৃষ্ট মাত্রায় পরিষ্কার ও স্বাচ্ছন্দ্য ধারণা থাকে, যা অনেকের কাছে ঈর্ষনীয়। স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে গেলেও এরা সারাক্ষণ দ্বিধান্বিত অবস্থায় ভোগে, যদিও এদের মজবুত আবেগজনিত চারিত্রিক আচরণ ও তার প্রকাশ দিয়ে এরা সমাজের যেকোনো অংশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার অদ্ভুত দক্ষতা হাসিল করে নেয়।

প্যারানয়েড পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অতিমাত্রায় সতর্ক এবং সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। তখন নিজস্ব সঙ্গীর গন্ডি ছাড়িয়ে অপর কোনো ব্যাক্তিকে অন্য আরেকজন কেউ সন্দেহ করলে বা কেউ কারো বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করলে সংশ্লিষ্ট অসুস্থ ব্যক্তিটি ভীষণ রকমের প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠেন, কখনও কখনও তা কাউকে আক্রমণ করার পর্যায়েও নিয়ে যেতে পারে। এমনিই কেউ তার দিকে তাকালে সে মনে করে “নিশ্চয়ই ব্যাটার কোনো কুমতলব আছে”, যদিও এটা প্রতিটি মায়েরই স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য তার সন্তানের সুরক্ষার বিষয়ে।

সাধারণত বহুমুখী চিন্তাশীল ব্যক্তির ক্ষেত্রে, মাত্রাতিরিক্ত অহেতুক যুক্তিহীন কু-তর্কে জড়িয়ে অতিরিক্ত আবেগ প্রকাশের দরুন ও উচ্চমাত্রার আবেগের ধরনের পরিবর্তনের জন্য একটা সময়ের পর এরা নিজেরাই সমাজ থেকে ক্রমশ নিজেকে গুটিয়ে ফেলে। এদের মানসিক ‘অত্যাচারে’ বিরক্ত হয়ে প্রায় প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে এদের যারা নিকটাত্মীয়- তারা বিরক্ত হয়ে দূরে সরে যান, এতে করে আক্রান্ত ব্যক্তির সন্দেহবাতিক মন প্রত্যেকটি মানুষকেই উদ্দেশ্যমূলক চিন্তাধারার অধিকারী বলে সন্দেহ করা শুরু করে আর বেশি বেশি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

এই পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোনোপ্রকার সমঝোতা বা মীমাংসায় আসতে চায় না, এবং দীর্ঘদিন এই অবস্থা চলতে থাকলে এদের ‘প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিয়া’ নামের এক জটিল ব্যাধি গ্রাস করে, যেখানে ব্যক্তির স্বাভাবিক বোধবুদ্ধি লোপ পেয়ে অনেকটা জড়বুদ্ধি সম্পন্ন হয়ে যায়, যাকে সাধারণভাবে ‘পাগল’ বলা হয়। এই সময় ব্যক্তিটিকে মানসিক হাসপাতালে পাঠিয়ে আবাসিক চিকিৎসা করানোটাই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ পন্থা সমাজের পক্ষে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুরুতেই যত্ন নিলে এই সিনড্রোমের সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। সঙ্গীর সাথে দৃষ্টিভঙ্গির ফারাকের কারণেই যেহেতু এই সন্দেহ উপসর্গের সূত্রপাত হয়, তাই ঠিক সে সময় থেকে এমন সমস্যার সূত্রপাত, তার মূলে গিয়ে এর প্রকৃত কারণ নিরুপণ করে সেই ‘সময়ের চাহিদা না মেটার’ ক্ষতকে- নিরাময় রা বাঞ্ছনীয় উপযুক্ত প্রতিস্থাপক দিয়ে। এই উপসর্গের চিকিৎসা হিসাবে কোনো মনোবিদের সাথে কাউন্সেলিং করলে তা এক্কেবারে প্রাথমিক স্তরের উপশম হিসাবে নির্বাচিত হয়, এক্ষেত্রে উপসর্গকে রোগে পর্যবাসিত করা থেকে তাৎক্ষনিকভাবে রোধ করা সম্ভব হয়। এর সাথে চিকিৎকের পরামর্শে আধুনিক চিকিৎসা বিদ্যার নির্দিষ্ট ধরনের মানসিক রোগের ঔষধ সেবন করলে ধীরে ধীরে বিষাদগ্রস্থতা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। পাশাপাশি, পারিবারিক ভাবে তার সঙ্গীটি যদি স্ত্রী বা পরিবারের অতি ঘনিষ্ট কেউ হয়, তাহলে তার জন্যও কাউন্সেলিং সমভাবে প্রযোজ্য; কারণ এই ধরনের সমস্যার সূত্রপাতই হয়েছিল তার ‘ব্যবহারিক আচরণগত’ সমস্যার কারণেই। যদিও ‘মন-বিশ্লেষনের’ মাধ্যমে এই ডাক্তারি চিকিৎসা এক ‘জটিল, ব্যায়সমৃদ্ধ ও সময়সাপেক্ষ’ বিষয়, তবুও পরিবারের সমর্থন ও সঠিক সহচর্য পেলে উপসর্গাক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ জীবনে দ্রুত ফিরে আসতে সক্ষম।

এর সাথে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতি বিশেষভাবে সামাজিক যত্ন নেওয়াটাও ভীষণ জরুরী। উপসর্গাক্রান্ত ব্যক্তি ও তার সঙ্গী একত্রে বসবাস করলে তাদের মাঝে সাময়িক বিচ্ছেদ এই সমস্যার নিরাময় করে তুলতে পারে উপরোক্ত চিকিৎসা প্রণালীর সাহায্যে। উল্টোদিকে তারা যদি একে অপরের থেকে দূরে থাকে তাহলে তাহলে তাদের কমপক্ষে বেশ কয়েকমাস একত্রে থাকা বাঞ্ছনীয় তবেই উপরোক্ত চিকিৎসা কাজে আসবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...