বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২০

রাজনীতি বিমুখ একটা ইতর সমাজ ও আসন্ন পরিণতি

 


এ লেখা ঠিক সকলের জন্য নয়, তাই যারা মজার নেওয়ার জন্য পড়েন- তারা এখানে না ঢুকলেই ভালো হবে, কারণ এখানে আসলে কিছুটা প্রলাপ বকা হয়েছে। লাইক-কমেন্ট যদি একটাও না নয়, সেখানে আমার আক্ষেপ তো নেই ই বরং ভাবনাটা প্রতিষ্ঠা পাবে।

আমাদের আগের কয়েকটা প্রজন্ম কখনও এমন ভয়াবহতার সম্মুখীন হয়নি, যেটা আমরা দেখছি। অনাসৃষ্টির বিপর্যয়, সুতো ছেঁড়া পুঁতির মালার মতো যেন হঠাৎ করেই সবটা খুলে হাত শূন্য করে দিচ্ছে। আজ গোটা বিশ্বজুড়ে প্রায় প্রতিটি দেশেই নানা ধরনের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে একটা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে- কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সকলে শুধুই যাচ্ছে, নীরব নিশ্চুপ ভাবে যাচ্ছে।

উৎসব আর মনোরঞ্জনের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা সভ্যতার ‘সভ্য’ জাতি আমরা, তাই আমাদেরকে কোনও কিছুই আর সেভাবে প্রভাবিত করে না, করলে তার মেয়াদ ওই ভার্চুয়াল যোগাযোগ মাধ্যমের মাপকাঠি মেনে একটা কি দুটো বেলা৷ তবে রাষ্ট্রের গোলামি করা তথাকথিত মিডিয়ার উৎসাহের খামতি নেই রাষ্ট্রকে জনগণের সামনে থেকে লুকাতে, সেই প্রচেষ্টাতেই কেবল তারা ব্রতী, যেমন তারা তাদের ইয়েস ম্যানেদের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য যাকে খুশি যা খুশি বলি প্রদত্ত করে দিতে পারে, আমাদের কিন্তু এই নিরুত্তাপতাই আমাদের সৌন্দর্য।

দেশে দেশে অর্থনৈতিক দুরাস্থা চরম আকার ধারণ করেছে, বাজারে চাকরি নেই, রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রি হয়ে যাচ্ছে বেনিয়াদের কাছে, প্রদেশে প্রদেশে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বাড়বাড়ন্ত, সংবাদমাধ্যম জুড়ে নিকৃষ্ট তোষামোদ আর ঘৃণার চাষ, সমাজের সর্বত্র নিন্মমেধার মানুষদের উত্থান ঘটছে ব্যাঙের ছাতার মতো, দ্রব্যমূল্য আকাশ ছুঁয়েছে, ধনী আরও বিত্তশালী হয়ে উঠছে- গরীব সর্বস্বহারা হয়েছে, বিভেদকামী শক্তির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাপ্রাপ্তি ঘটেছে উচ্ছ্বাসের সাথে, চোর ধাপ্পাবাজেরা বুদ্ধিজীবীতে উন্নীত হয়েছে, সুশীলেরা উমেদার হয়ে গেছে, সাহিত্যিকেরা সরকার পোষিত, কবিরা রাজনীতি করছে- এমতাবস্থায় গোটা পৃথিবীতে ধর্মকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ভ্যান্ডালিজমের উত্থান আমাদের চোখের সামনে ঘটলেও আমরা তা থেকে প্রায় অন্ধ হয়ে বসে আছি। ধর্ম যে আগে ছিলনা তা বলছিনা, কিন্তু আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় ধর্মকে তো দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক করেই রাখার কথা হয়েছিল, আসলে আমরা আত্মায় বিশ্বাস করা প্রজন্ম, প্রেতাত্মায় নয়।

রোজগারের সঙ্কট, পুঁজিবাদের ফাঁসে আটকা পড়া সমাজ, আহাম্মক নেতার ছবি তোলার ভাঁড়ামি নিয়ে প্রচারের বাগড়াম্বনা, বিবস্ত্র চিকিৎসা ব্যবস্থার মাঝে জীবন যেখানে ঘোর অমানিশায়, সেখানে 'রাজনীতি নিয়ে আলোচনা অশালীন ও ‘ওটা আমার জন্য নয়’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মতো ইতরেরা সমাজে ভরে গেছে বলেই আজকের সমাজ ব্যবস্থা এমন জড়ধী অনবগতের দিকে দৌড়ে চলেছে- কোনটা আসলে ইস্যু, কোনটা বৈশ্বিক সংকট এ সবের তোয়াক্কা না করেই স্থানীয় ভাবে ‘আমি তো নিরাপদ’ ধরে নিয়ে দিনের পর দিন নির্বিকার থাকাটা মজ্জাগত করে নিতে পেরেছি৷

কিন্তু চাইলেই যে আমরা প্রতিরোধ করতে পারি সেটার কিছুটা এই করোনার ক্রান্তিকাল আমাদের সামনে প্রমাণ করে দিয়েছে। আমরা এমন এক বিপদের সাথে যুঝে চলেছি যা আমাদের সবাইকে এক কাতারে নিয়ে এসেছে, কী সুন্দর সরকারের সকল অত্যাচার মেনে নিচ্ছি তার ভালমন্দ বিচার বিবেচনা না করেই, এক্কেবারে আজ্ঞাবহ ভৃত্য৷ বিশ্বজুড়ে এখন মানবজাতির কাছে অজানা শত্রু তথা ত্রাসের নাম- নভেল করোনা ভাইরাস; যেহেতু এট আমাদেরকে প্রচারের বাহুল্যতায় বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে তাই আমরা বিনা বাক্য ব্যয়ে সব মেনে নিয়েছি৷

কিন্তু এর মোকাবিলাতেও আমরা আমাদের স্বভাবসুলভ হিংসা-দ্বেষ-স্বার্থপরতা থেকে বের হয়ে আসতে পারি নি৷ আমরা ভুলে গেছি যে ভাইরাস যেমন কোনো ধর্ম চেনে না, দল চেনে না- খিদেও তাই; সে আসলে ভাইরাসের চেয়েও অনেক বড় মহামারী৷ আসলে যারা মিডিয়ার মালিক, যারা বিজ্ঞাপন দেয়- তারাই তো শোষণ যন্ত্রের চালক, তাই তারা খিদের বিষয়টাকে সর্বদা এড়িয়ে গেছে, ভুলিয়ে দিয়েছে প্রতিটি মৌলিক অধিকারের গুরুত্বকে। তাই আশঙ্কাটা ভাইরাসের জন্য নয়, বরঞ্চ আমাদের সমাজের গণ উদাসীনতা অনেক বেশি আতঙ্কময়৷

প্রিয় ইতরেরা,

কেউ মানুক আর না-ই মানুক, আমি জানি এই যুদ্ধে আপনারা জয়ী হয়েই গেছি; সেটা আপনাদের গালভরা আত্মনির্ভরতা দিয়ে নয়- বরং আপনাদের উপেক্ষা করার আশ্চর্য ক্ষমতাগুণে৷ এই বিজয়ে আপনাদের নায়ক আমাদের ‘বিকৃত বিবেক’৷ এ এক এমন বিজয়, যেখানে আপনারা এগিয়ে চলেছেন ঠিকই কিন্তু সেটা কবরের দিকে; বিজ্ঞাপনের চাকচিক্যে আসল নকলের ফারাক ভুলে আপনি কেবলই নির্জীব প্রাণী আজ, যে জুলুলুজু চোখে অথর্বের মতো শুধু চেয়ে থাকে- আপনাদের সকলকে অভিনন্দন ও আমার পক্ষ থেকে স্যালুট রইল৷ যেভাবে গোটা বিশ্বজুড়ে নিজের ও নিজের পরিবারের প্রাণকে বিপন্ন করে আপনারা লক্ষ কোটি মানুষেরা এই সমাজকে পচিয়ে তুলেছেন আধুনিকতার নামে, আসলে একা করে দিয়ে নিজে একা হয়ে গেছেন- যদি আগামী বলে কিছু অবশিষ্ট থাকে, তারা চিরকৃতজ্ঞ থাকবে আপনাদের প্রতি; কারণ কয়েক'শ কোটি মানুষ নিজেদেরকে ‘দাঁত ক্যালাতে ক্যালাতে’ যেভাবে আত্মহুতি দিচ্ছেন- তা তাদের জন্য হাজার বছরের সেরা শিক্ষা হয়ে থাকবে।

যুদ্ধের নিয়ম হলো মাথা লক্ষ্য করে অস্ত্রচালনা, তীর-বল্লম-অসিচালনার যুগ পেরিয়ে এসে আমরা এখন ‘১ ও ০’ এর ঘরে বন্দি। হয় অড বা ইভিন- মাঝামাঝি বলে কিছু নেই। না আছে আভিজাত্য, না সংস্কৃতি- স্পন্দনহীন অসমীক্ষ্য চোখের নির্বাক যন্ত্র করে রেখে দেওয়ার যে অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে সভ্যতার কাণ্ডারিরা- কোথায় লাগে অতীতের সব মারণ অস্ত্র! লক্ষ্য আজও সেই মাথা, সেটাকে ভুলভুলাইয়ার মাঝে বুঁদ করে দিতে পারলেই আর কী চাই? প্রহসনের লকডাউনে দেশের রেল ব্যবস্থা যেখানে আজও স্তব্ধ, সেখানে IPL আর সুশান্ত সিং আত্মহত্যার চেয়ে জরুরী কোনো আলোচনা আর নেই। একটা জাতিকে লুটেপুটে খেয়ে ছিবড়ে করে দেওয়ার জন্য দরকার অন্ধ উন্মাদনা, আর তার জন্য চায় নেশাদ্রব্য, রাষ্ট্রযন্ত্রের সহযোগীতায় ক্ষমতাসীনেরা স্তোভের পানীয় গিলিয়ে যাচ্ছে অমৃতের নামে, আমারা সেই জ্ঞান থেকে অনেক এগিয়ে চলে এসেছি অগ্রগতির নামে- যার দ্বারা পূর্বজেরা ভালো ও মন্দের প্রভেদ করতে পারতেন।

একজন জীবিত বিবেকের, নাগরিক হিসেবে মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াই ও সত্য প্রতিষ্ঠার একটা বিশাল দায় যে রয়ে যায়, সেটার অনুভব ক্ষমতাটাই ‘অ্যাপেন্ডিক্স’ হয়ে গেছে৷ সিনেমাতে মিথ্যা VFX এসেছে, বিবেকেরা হারিয়ে গেছে আক্ষরিক অর্থেই। গবেষণা লব্ধ ফলাফল নয়, অনুমান ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেছে সর্বত্র- যা দ্রুত সমাধান করে দিচ্ছে; লাগলে তুক আর না লাগলে তাক। গোটা বৈশ্বিক সমাজ জুড়েই মত প্রকাশ ও ‘সংবাদ’ প্রকাশের ওপর খড়গ নেমে এসেছে, প্রতিটা মানুষের বেঁচে থাকাটাই যেন বিলাসিতা। আজকের দিনে সকলেই সাংবাদিক, সকলেই বুদ্ধিজীবী আর সকলেই তার্কিক, সকলেই শিক্ষিত- তাই সকলেই বলতে চায় অথচ কেউ শুনতে চাই না। কারও মাঝে জ্ঞানের দীপন নেই, শিক্ষাদান আজ পেশা, রোগীরা খদ্দের যেখানে - আত্মিয়তা সেখানে বোঝা হবে এটাই তো স্বাভাবিক। এ সময় মনে হয় সাধারণ হয়ে যারা যাপন করতে পারছে তারাই বোধহয় বেঁচে আছে, আসলে বাঁচাই তো সম্পর্ক- অনেকগুলো সফল সম্পর্কই তো বেঁধে রাখে মানুষকে অদৃশ্য বন্ধনে।

ইটালি, স্পেন, চীন, ব্রিটেন, ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশ নিজেদের সামলে নিয়েছে, সেখানে শিক্ষিত সরকার আছে কিনা সেটা বিবেচ্য নয়- কিন্তু সেখানে কিছু শিক্ষিত নাগরিকের বাস আছে- তাই তারা পেরেছে আপাতভাবে। আমরা ক্যাজুয়ালি নিয়েছি, আর নিজেদের ক্রমেই জরুরি অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছি। ক্রমশ সবটাই আমাদের অদৃষ্টের হাতে বন্দি হয়ে যাচ্ছে, এমতাবস্থায় কে যে নিরাপদ আর কে অসুরক্ষিত তার কোনো গাইডলাইন নেই।

ফার্মেসি, সুপারমার্কেট, পোস্ট অফিস, ব্যাঙ্কের মতো কিছু পরিষেবা ছাড়া যে বিষয় দুটো খোলা আছে তা হলো সংবাদমাধ্যম আর রাজনীতি। এই ফাঁকে সবচেয়ে বড় দুর্যোগটা ছড়াচ্ছে সংবাদ মাধ্যম নিজেই। দুর্যোগের সময় যা চালু থাকে তা যে নিত্যপ্রয়োজনীয় সেটা সুশীল ইতরেরা কবে বুঝবে? রাজনীতি- যা আমাদের বাঁচা মরার মাঝে রেফারির ভুমিকায় অভিনয় করছে সেটা যে ভীষণ একটা সিরিয়াস বিষয় এটা নিয়ে ভাবনা ভাবার মতো সময়ই নেই সমাজের। কিছু অকর্মন্য যারা নিজেদের পেশায় লাথ খেয়েছে তারা রাজনীতিতে মৌরিসপাট্টা গাড়ছে, আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছেলেখেলা করছে তারা।

সরকারি যন্ত্র- গুজবে কান দেবেন না বলে কিছু বর্বরকে সাদা কাপড়ে সাজিয়ে সমাজবিজ্ঞানী সাজিয়ে গোটা সমাজকে বিষিয়ে তুলেছে রাজনীতি সচেতনতা থেকে, মাঝখান থেকে লুটেপুটে খাচ্ছে নক্তচরের বংশবদেরা। এরাই আজ বিজ্ঞানী, এরাই ডাক্তার, এরাই হাকিম। রাজনীতিটাও পেশাদারিত্বের বিষয়, এটারও যে নিত্য অনুশীলন দরকার সেটা আমাদের মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে উঠিয়ে দিয়েছে এই সুশীলেরাই, আজকের এই রাজনীতি বিমুখ যুবসমাজ যে নপুংশক খোজাদের প্রতিনিধি সেটা বোঝার মতো সমর্থ্যই অবশিষ্ট নেই।

সভ্যতার উন্নতির নামে ক্রমশ নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা ও চূড়ান্ত নিরুদ্বেগ থাকার যে অভিযান- অজান্তেই আমরা সেই সেনাবাহিনীর সক্রিয় সদস্যে পরিণত হয়েছি৷ আলাদা করে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সত্যিই কি প্রয়োজন আছে? কাল যদি জায়নবাদীরা আমেরিকা মহাদেশের বিনাশ ডেকে আনে ভূমিকম্প, উল্কা হামলা বা ওই জাতীয় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মতো- তাতেও আমরা কিন্তু নির্লিপ্তই থাকব, আমরা সুউচ্চ বিল্ডিং বানাচ্ছি, চারিদিক খোলা ঘর বানাচ্ছি মজবুত ছাদের নিচে- কিন্তু আমরা আমাদের মনুষত্বকে বাঙ্কারে নিয়ে গেছি মার্কিন ধনকুবের এলিটদের মতো, আমাদের মনের জানালার কব্জাতে জং ধরে গেছে শিক্ষার অনুশীলনের অভাবে; আমরা ভুলে গেছি- ‘জানার নাম জ্ঞান নয়, মানার নাম জ্ঞান’ এই সহজ সত্যটা।

আমরা ভ্যাকসিনের জন্য উদগ্রীব হয়ে বসে আছি, কিন্তু এটা জানি না যে আমদের রাষ্ট্র- ভ্যাকসিন উৎপাদক বিশ্বমারণ কর্পোরেট কুমিরগুলোর কোন ফাঁদে পা দিতে বাধ্য করছে, হতেই পারে আমাদের আগামীর প্রতিটি মুভমেন্টের জন্য এমন কোনো মাইক্রচিপস আমাদের দেহে ইন্সটল করে দেবে ভ্যাকনিসের ছুতোয়, যেখানে আমরাই আসলে একেক জন আসল যন্ত্রমানবে পরিণত হবো। এমনিতেই আমাদের মাঝে বোধবুদ্ধির পরিমাণ লোপ পেয়েছে, যেটুকু মানবীয় গুণ অবশিষ্ট আছে সেটাও কর্পরেটদের দাক্ষিণ্য ও আমাদের লাগামহীন উদাসীনতায়- আমরা গণ দাসত্বের স্বীকার হয়ে যাব। আজকে একটা হোয়াটস অ্যাপ, একটা ফেসবুক বা একটা টুইটারের মেসেজ যদি আমাদের এভাবে বুঁদ করে রেখে দিতে পারে- যখন খেলাটা প্রকাশ্য ময়দানে হবে, তখন যে তা একতরফা ভাবেই হবে সেটা বলাই বাহুল্য।
গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা, বাস্তবিক এই ব্যবস্থার মেয়াদ আর কতদিন থাকবে এই পৃথিবীতে সেটা নিয়ে আমরা কখনও ভেবেছি? যেদিন সভ্যতার সূচনা হয়েছিল, তার পর পরই আইন প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, আর আইন ভঙ্গকারীদের জন্য তৈরি হয়েছিল জেল। প্রকৃতির তৈরি যে আইন, যে নিয়মমালা- তাকে অবলীলায় অস্বীকার করে যাচ্ছি। তাহলে এই আইনভঙ্গের জন্য কি আমরা অচিরেই গণ জেলখানাতে দাখিল হয়ে যাব না? আমাদেরই মূর্খতার সুযোগ নিয়ে একটা ক্ষুদ্র দল আমাদের উপরে প্রভুত্বের চাবুক নিয়ে নতুন সমাজব্যবস্থা এনে হাজির করবেই।

ঐতিহ্যের নামে ধর্মকে ঢাল করে একশ্রেনীর নিকৃষ্ট ব্যবসায়ীরা নেতার ছদ্মবেশে গোটা বিশ্বজুড়ে বিবসনা এক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে, যেখানে মেকি দেশপ্রেমের সত্তার জাগরণের নামে কিছু মুষ্টিমেয় ব্যতিরেকে- যেই ক্ষমতার সায়ে সায় দিচ্ছে না তারাই দেশদ্রোহী হয়ে যাচ্ছে; আর এই ভয়েই সমাজ ‘প্রশ্ন করা’ ভুলে গিয়ে ক্রমশ বধিরতার দিকে এতটাই এগিয়ে গেছে, যেখান থেকে আর ফেরা যায় না। আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম যেটার সূচনা করেছিল আমরা সেই ব্যটনটা আমাদের উত্তরসূরীদের কাছে আরও অনাবৃত একটা সমাজ তুলে দিয়েছি, যেখানে কুক্ষিগত ব্যক্তি স্বার্থের বাইরে সমাজ বলে কিছু অবশিষ্ট নেই। পশ্চিমা সভ্যতা, পরিবারগত ঐতিহ্য সংস্কৃতি আগেই বিসর্জন দিয়ে আধুনিক হয়েছিল, এখন সেই ধারা এশিয়া আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়েছে যা করোনার চেয়েও মারাত্বক।

আমাদের লক্ষ্য কী? অর্থ, খ্যাতি, যশ, ঐশ্বর্য নাকি সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে বেঁচে থাকা? আমাদের এই নীল পৃথিবীর গোটা অর্থ ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছে, কতদিন আর- বড়জোর ২০২১ এর মার্চ এপ্রিল; এর পর যারা মাটির সাথে যুক্ত তারা ছাড়া বাকিরা যদি একে অন্যকে খেতে শুরু করে তাতে কি আশ্চর্য হবেন? পেট্রো ডলারের ফাঁপানো অর্থনীতি কবেই দেউলিয়া হয়ে গেছে, এখন শুধু পচা গাবের মতো ঝড়ে পড়ার অপেক্ষায় আছে; আমাদের এই স্বার্থপর আধুনিকতা, তা তো এই অর্থ ব্যবস্থারই যে দান, সুতরাং সে যাবার সময় আপনার থেকে কিছু না নিয়ে এক্কেবারে যে খালি হাতে যাবে না- সে কথা ভাবার মতো ইচ্ছা বা ক্ষমতা কোনোটাই যে আপনার নেই।

সুতরাং কোথায় রাখবেন এত প্রাইভেসি, এত এলিটপনা- যদি পাশের মানুষটাই না বাঁচে! অর্থের অভাবে লাল্লি মারা যাচ্ছে, স্পেসএক্স মঙ্গল অভিযান করছে, হাজার কোটির মূর্তি তৈরি হচ্ছে, আর এগুলোই হচ্ছে- কারণ আমরাই আসলে এগুলোর অনুমতি দিয়ে রেখেছি, এরপর খেলার নিয়মে যখন নিজের টার্ন আসছে তখন মুমূর্ষুতা এমন অবস্থায় পৌঁছাচ্ছে যে গলা দিয়ে আর আওয়াজ বেরোচ্ছে না। অবশ্য বের করলেই বা শুনছেটা কে, সে কি তার সুসময়ে অন্যের কথা শুনেছিল? এই মুহূর্তে আমাদের বহু কিছু না হলেও চলবে, মেগা প্রজেক্ট পিছিয়ে গেলেও ক্ষতি নেই- কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধানেরা কীভাবে নির্বাচনকে পিছিয়ে দিয়ে ক্ষমতার মেয়াদ বাড়াতে পারে সেই নীল নক্সায় ব্যস্ত। একটা সময় মানবকে সম্পদ বলে মনে করা হতো, এখন মানব আর সম্পদ নয়, দায়- তাই মন্ত্রকও আর নেই। গুরুত্ব শুধুমাত্র ভোটের গুণতিতে, এরা ভুলে গেছে ঠাটবাটের সাথে শাসন করার জন্য মানুষ প্রয়োজন, নতুবা অপেক্ষাকৃত শক্তিশালীরা কানে মোলা দিয়ে ক্ষমতা কেড়ে নেবে।

সমাজতন্ত্র আর একনায়ক তন্ত্রকে আজ গুলিয়ে ফেলেছে কমিউনিস্টদের অনেকে, গণতন্ত্রের ধ্বজাধারীরা পুঁজিবাদের আফিম খেয়ে বুঁদ হয়ে রয়েছে, তাই আদর্শ আজ কিলো দরে পাওয়া যায় ফুটপাতে। ধর্মভীরুতা আর ধর্মব্যবসা- প্রোপাগান্ডার ছদ্মবেশে এমন ‘চালে মুসুরে’ ঘেঁটে গেছে যে আর আলাদা করা যায় না তাদের।

এমতাবস্থায় আপনার মৃতপ্রায় বিবেকের জাগরণই একমাত্র 'হক ও বাতিলের' মাঝে সঠিকটাকে বেছে- সঞ্জীবনী সুধা হিসাবে কিছুটা অক্সিজেন সরবরাহ করে পচে যাওয়া সভ্যতার ধ্বংসকে কিছুটা বিলম্বিত করতে পারে, নতুবা আগামীর 5G গতির সাথে তাল মিলিয়ে এই ফ্যাব্রিকেডেট সমাজব্যবস্থা যদি ২০৩০শেই ওলট-পালট হয়ে যায়, আশ্চর্য হবেন না; আর এর টেরটা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পাওয়া শুরু হয়ে যাবে।

ধর্মভিত্তিক রাজনীতি গোটা বিশ্বকে দ্রুত গ্রাস করল বলে, কারণ আপনি কতটা প্রস্তুত তার জন্য ধ্বংস প্রতীক্ষা করে না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...