সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

রো কো


ক্রিকেটার অতীতে অনেক এসেছে, অনেক আসছে, আগামীতে অনেক আসবে, বহু জন গ্রেট হবে। কিন্তু কতজন ক্যারেক্টার হয়ে উঠতে পারবে! Sourav Ganguly গ্রেট ক্রিকেটার, তার ক্রিকেট দর্শন অনেক ঋদ্ধ, অনেক সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া আছে তার ক্রিকেট জীবনে, কিন্তু সেই অর্থে ক্যারেক্টার হয়ে উঠতে পারেনি। ক্রিকেটীয় রাজনীতির পাঁকে জড়িয়ে গিয়ে কেরিয়ার ছোট হয়ে গেছে।

Great Sachin Tendulkar আক্ষরিক করতেই গ্রেট, ক্রিকেটের ভগবান। দক্ষতা, শৈল্পিক নৈপুণ্য এবং পরিসংখ্যান - সবকিছুতে তিনি ধরা ছোঁয়ার উর্ধ্বে। সেই অর্থে বাকিদের সঙ্গে তিনি তুলনায় আসেন না। তিনি নিজে একটা ক্লাস এবং সেই ক্লাসে তিনিই একমাত্র প্রতিনিধি। সারা জীবনটা পলিটিক্যালি কারেক্ট থেকেছেন।
Rahul Dravid, ক্রিকেট যদি ধর্ম হয় তাহলে দ্রাবিড় হলো সেই ধর্মের প্রফেট। একাগ্রতা, শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা আর সাধনার সংমিশ্রণের সাথে চারিত্রিক সংযমের এক বিরল সঙ্গমের নাম রাহুল দ্রাবিড়। তারপরও দিনের শেষে তিনি নিজের সার্কিটেই সীমাবদ্ধ। বিতর্ক আর রাহুল দ্রাবিড় ছিলেন চুম্বকের দুটো আলাদা মেরু।
আজকের গিল, অভিষেক চমৎকার, কিন্তু তারা কেউ Yuvraj Singh নয়, হবেওনা। তারপরেও যুবরাজ সিং আর বৈভব এই দুটো সমর্থক হয়ে গিয়েছিল - দেখনদারির নিরিখে। এরা নিজ নিজ সময়ের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় হওয়ার সাথে সাথে দুর্দান্ত বর্ণময় ছিল। MS Dhoni অত্যন্ত সফল এবং আগ্রাসী। তারপরেও নিজের ক্যারিয়ার নিজের প্রফেশন এইটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছেন। Chris Gayle খেলোয়ার হিসেবে যোগ্যতা যেমনই হোক ক্যারেক্টার হিসাবে পারফেক্ট হয়ে উঠেছিল। এরা কেউ আম ক্রিকেট সমর্থকের নিজশ্ব আইকন হয়ে উঠতে পারেনি।
কিন্তু আমারা যাদের এই চল্লিশের আশেপাশে যাদের বয়স, যাদের শৈশব ছিল সচিনময়, সেই আমাদের যৌবনের বাগানেই তো রোহিত আর কোহলি 'যৌবনের প্রতিনিধি' হিসাবে ক্রিকেটে মাঠে ফুল হয়ে ফুটেছিলো। নেভিল কার্ডাস বলে গিয়েছিলেন - স্কোরবোর্ড গাধা। একদমই তাই-
রোহিত কোহলির স্কোরবোর্ড গাধাময় নয়, বরং হাতি ঘোড়ার ছড়াছড়ি- সেসব তথ্য একদিকে, অন্যদিকে হচ্ছে গোটা শুরুর যৌবন টাকে মাতিয়ে রাখা দুটো ক্যারেক্টার। যারা ক্রিকেট খেলতো তো বটেই, পাশাপাশি আমাদের মতন করে আমাদের ভাষায় কথা বলতো। রিলেট করতে পারতাম এমন ভাষায়। কালের নিয়ম মেনে তারা বাণপ্রস্থে চলে যাওয়ার পথে।
খেলা আজকেও হচ্ছে আগামীতেও হবে। টিম ইন্ডিয়া মাঠে নামলে উচ্ছ্বাস থাকবে, আবেগ থাকবে, উত্তেজনা থাকবে, হেরে গেলে দোষারোপ গালিগালাজ সব থাকবে। তাদের গালিগালাজ কে গ্লোরিফাই করছি না, কিন্তু এমন ক্যারেক্টার পাব কোথায়!!
miss you both very badly

রবিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

নেপো কিড ও ক্রিকেটে


 

আমার মত বহু মানুষ ক্রিকেটে বেঁচে থাকি, ক্রিকেট খায়, ক্রিকেটে শ্বাস নিই। কিন্তু ছেলেবেলার অন্ধ আবেগ আর আজকের বাস্তবতা এক নয়। আজও ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা বা প্রেমের ঘাটতি নেই, আমৃত্যু সেটা একই রয়ে যাবে অভ্যাসের কারনে। কিন্তু বর্তমান তথ্য উপাত্ত গুলো মগজে ধাক্কা দেয়, অন্ধ আবেগকে প্রশ্ন করে। বর্তমান ক্রিকেটটা আসলে কয়েকটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তি মিলে চালাচ্ছে, একান্তই নিজেদের প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি।

আমাদের ক্রিকেট বোর্ড তথা BCCI আবার একটি সমবায় সমিতি, ১৯৭৫ সালে ‘তামিলনাড়ু সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন আইনের অধীনে নিবন্ধিতএশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল (ACC) মালয়েশিয়াতেও একটি কোম্পানি হিসাবে রেজিস্টার্ডযেমন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগা ইত্যাদি গভর্নিং বডি গুলো ‘কোম্পানি’ হিসাবে রেজিস্টার্ড রয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল লিমিটেড (ICC), কর ফাঁকির স্বর্গ ‘ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস (BVI)‘কোম্পানি বডি’ হিসাবে রেজিস্টার্ড রয়েছে। অথচ সমজাতীয় অন্যান্য স্পোর্টসের বৈশ্বিক নিয়ামক সংস্থা গুলো যেমন FIFA, International Hockey Federation (FIH), International Olympic Committee (IOC) ইত্যাদি গুলো NPO/NGO হিসাবে রেজিস্টার্ড রয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সংস্থা FIFA যেখানে তাদের আইন-কানুন সবটা উন্মুক্ত স্বচ্ছ করে রেখেছে, সেখানে ICC এর অধিকাংশ নিয়ম কানুন যথেষ্ট ধোঁয়াসা যুক্ত। FIFA সুইজারল্যান্ডে নিবন্ধিত একটি নন প্রফিটেবল অর্গানাইজেশন, তাই রোজগারের উপরে TAX তাদেরও দিতে হয়না। কিন্তু টুর্নামেন্ট আয়োজন করলে সেই দেশের নিয়ম অনুসারে ফিফাকে হিসাব কষেই TAX দিতে হয়

জয় শাহ ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে আইসিসির নেতৃত্বে রয়েছে, বোর্ডের সুবাদে ২০১৯ সাল থেকে আইসিসির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। কংগ্রেসের বড় নেতা রাজীব শুক্লা আবার বোর্ডের বড় নেতা, ACC-এর নির্বাহী সদস্য। এখানে সেই অর্থে রাজনৈতিক দলাদলি ততটা নেই, ক্ষমতাসীন দলের প্রতিনিধি বেশী থাকে, এটুকুই। তার পরেও সকলে মিলেমিশে ক্ষমতা ভোগ করে এখানে।

২০২২ সালে ৪৮,৩৯০ টাকায় আইপিএল মিডিয়া স্বত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল BCCI। শুধুমাত্র আইপিএল থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫,৭৬১ কোটি টাকা আয় করেছে বোর্ড, যার গোটাটা করমুক্ত। বর্তমান আর্থিক বর্ষে BCCI-এর রোজগারের উপরে ট্যাক্সের পরিমান দাঁড়াবে ,৩৬২ কোটি টাকা, কিন্তু BCCI আদালতে গিয়েছে এই ট্যাক্স থেকে তাদের অব্যাহতির দেবার জন্য। সরকার সেটা দিয়েও দেবে। বিসিসিআইকে শুধু প্রফিট এর উপরে ইনকাম ট্যাক্স দিলে হবে না, প্রতিটি ম্যাচের টিকিটের উপরে অ্যামিউসমেন্ট ট্যাক্স দিতে কেন বাধ্য করা হবেনা, যেখানে ভারতীয় ফুটবল লীগ তথা ISL কে গুণেগুণে TAX দিতে হয়

অর্থাৎ ICC, ACC এমনকি BCCI দ্বারা আয়োজিত এই সকল বাণিজ্যিক টুর্নামেন্ট একান্তই ব্যক্তিগত কোম্পানি ভিত্তিক আয়োজন। কোনো মিউজিক্যাল শো, সার্কাস, কিম্বা থিয়েটারের সাথে এর ফারাক কোথায়? তবু তো এরা রোজগারের উপরে সরকারকে TAX দেয়, BCCI সেটাও দেয়না। ক্রিকেট বোর্ডে রাষ্ট্রের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই, দেশের ক্রীড়া আইন এদের উপরে লাগু হয়না, এদের আয় ব্যায়ের হিসাব একান্তই এদের নিজশ্ব, জনগণ চাইলেও তা জানার অধিকার রাখেনা। মোদ্দাকথা এই ক্রিকেটের সাথে ‘দেশ’ ভারতের তথা জাতির কোনো সম্পর্ক নেই, না সরকারের সাথে কোনও সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং কিসের জাতীয় সম্মান এবং আর কীভাবে জাতির গর্ব হতে পারে ক্রিকেট?

আসলে পৃথিবী জুড়ে সমস্যা হচ্ছে নেপো-কিড। কোন যোগ্যোতার বলে এই নেপো কিড গুলো ক্ষমতার চেয়ারে বসে তার পৃষ্ঠপোষকতা করছে কেউ জানেনা। BCCI এর পদে থাকা ‘সিদ্ধান্ত নেওয়া’ ব্যক্তিদের অধিকাংশই ক্রিকেটের সাথে কখনও জড়িত ছিলোনা। বাকি যারা রয়েছে তাদের প্রশাসনিক দক্ষতাও পরীক্ষীত নয়, আর এমন সব অযোগ্য ব্যাক্তিদের খুঁজে খুঁজে এনে চেয়ারে বসানো হচ্ছে পুতুল হিসাবে, যাতে অবৈধ ভাবে পর্দার পিছন থেকে তৃতীয় কেউ ছড়ি ঘোরাতে পারে

বাংলাতে একটা প্রবাদ রয়েছে- নেপোয় মারে দই। বর্তমানে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড সেই নেপো অর্থাৎ নেপো-কিড দের সংগঠনে পরিণত হয়েছে। অনুরাগ ঠাকুর, বিজেপি নেতা প্রেম মুকার ধুমলের ছেলে। অনুরাগের ছোট ভাই অরুন ঠাকুর, হিমাচল প্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। তার চেয়েও বড় পরিচয় সে IPL এর চেয়ারম্যান। মধ্যপ্রদেশে মহানারায়ণ রাও সিন্ধিয়া জ্যোতিরাদিত্যের ছেলে, অরুন জেটলির ছেলে রোহন জেটলি দিল্লি বোর্ডের মাথায়।

প্রাক্তন সচিব নিরঞ্জন শাহের ছেলে জয়দেব সৌরাষ্ট্র ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি চেন্নাই এর শ্রীনিবাসনের মেয়ে রূপা গুরুনাথ তামিলনাড়ু ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতিগোয়াতে বিনোদ ফাড়কের ছেলে বিপুল ফাড়কে চেয়ারে বসে পরেছে আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। চিরায়ু আমিনের ছেলে প্রণব আমিন বরোদা ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছিল। প্রাক্তন বিসিসিআই সভাপতি রণবীর সিং মহেন্দ্রের ছেলে, অনিরুদ্ধ চৌধুরী বিসিসিআই কোষাধ্যক্ষ ছিল। বাংলাতে অভিষেক ও বৈশাখী ডালমিয়ারাও ক্ষমতায় বসেছিলো। আসলে সবটাই বিজেপির স্বজনপ্রীতি

ই নেপো গুলো শুধু পদে বসে ক্ষমতার ওম নিচ্ছেনা, চেয়ারকে ব্যবহার করে, হোল্ড করা পজিশনের অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল হারামের অর্থ উপার্জন করেছে প্রত্যেকে। নতুবা এতো লালায়িত হতোনা পদে বসার জন্য। উদাহরণ হিসাবে জয় শাহ’কে দেখুন, গত পাঁচ বছরে এর ১৪০০ শতাংশ সম্পদ বৃদ্ধি হয়েছে এই পাপ্পুর। আজ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি সম্পত্তির মালিক। এর বাইরে বিদেশে কতটা আছে কে জানে! পৃথিবীর কোনো চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, কোনও বিজনেস ম্যানেজমেন্ট স্কুল, কোনো ব্যবসা এই অগ্রগতি দেখাতে পারবেনা এর মত গুণীজনকে ICC এর চেয়ারম্যানের মত নগণ্য পদে আঁটকে রাখা কী ভারতের মেধা বিনষ্ট করা হচ্ছেনা? দেশের অর্থমন্ত্রকের উপদেষ্টা কিম্বা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর, নিদেনপক্ষে সকল IIM মুখ্য পদ সৃষ্টি করে সেখানে কে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছেনা কেন!

এশিয়া কাপের এই ভারত পাকিস্তান ম্যাচের আয়োজন থেকে রোজগারকৃত অর্থ দ্বারা আমাদের দেশ ‘ভারত’ কীভাবে উপকৃত হবে? যারা রোজগার করবে, তারা তো TAX দেবেনা। বর্তমানে ACC এর চেয়ারম্যান পাকিস্তানের বর্তমান স্বরাষ্ট্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রী মোহসিন নকভি। জয় শাহ মোহেন নকভি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত- BCCI, ACC এবং ICC দ্বারা পরিচালিত ভারত পাকিস্তান’ ম্যাচ না হওয়ার দরুন সত্যিই যদি বিশাল ক্ষতির সম্মুখীন হয়- রাষ্ট্র হিসাবে ভারতের জনগণের বা ভারত সরকারের কী যায় আসে?

মোদী সরকারের কোন দায় ছিল BCCI এই বানিজ্যিক ধান্দাবাজিতে- দেশের মানুষের আবেগ, সেনার আত্মবলিদান, এতো গুলো লাশ ডিঙিয়ে খেলার অনুমতি দেওয়ার? আসলে ম্যাচ বন্ধ হলে বিজেপির ‘নেপো কিডস’ এর দলের পেশাদার জীবন ঝুঁকির মুখে পরততাদের মুনাফা কমে যেতো। তাই রাষ্ট্রের স্বার্থের আগে নেপোকিডদের স্বার্থকে অগ্রাধিকারের সাথে বিবেচনা করা হয়েছে। পাকিস্তানের সাথে একই সাথে রক্ত ও বল গড়াচ্ছে।

 


শুক্রবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

নিষিদ্ধ পত্র- একটি গদ্য কাব্য

 


প্রিয় প্রাক্তন,


পত্রের শুরুতেই আমার ভালোবাসা নিও। অন্তরের অন্তরস্থল থেকে পাঠানো একগুচ্ছ গন্ধরাজের শুভেচ্ছা গ্রহণ করলে আনন্দিত হবো। আজ তোমাকে লিখতে বসেছি, তুমি ভাবতেই পারো- আজ হঠাৎ কি এমন হলো! জানিনা কি হলো, তবে আমার বিচিত্র খেয়ালের কথা তো তুমি জানো, তবে আজ তোমাকেই লিখতে বসেছি। বিলাপী বৃষ্টি তান ধরছে জানালার বাইরে, বর্ষার সাথে অকৃত্রিম যুগলবন্দি। এই মুর্চ্ছনাতে আমি আজ তোমায় বিষাদের গল্প শোনাবোনা, তোমার উদ্দেশ্য কিছু কথা বলতে চেয়ে আমার এই লেখা।

আচ্ছা, আজকাল তুমি কি প্রেম কর কারো সাথে? সে করতেই পার, তবে যুগ-জামানা ভালো নয়, একটু বুঝে শুনে, একটু সাবধানী…এখন আবার কমপক্ষে খান দু’চার খানা ছাড়া নাকি চলেনা ‘আধুনিক’ সমাজে। শুধুই কী প্রেম করো? ভালোবাসোনা তাকে? ভালোবাসা ছাড়া প্রেম হয়? তার চোখের দিকে তাকাতে লজ্জা পাওয়া, চুম্বনে কঠোর নিষিদ্ধতা, আজও কী তোমার কাছে শুরুর প্রেমের এমনই মানে! তার সাথে নিয়মিত দেখা করো? কেমন লাগে তার আলিঙ্গণে নিজেকে সঁপে দিতে! তুমি নির্জনতা উপভোগ করো, নাকি তাকে? মগজে উত্তেজনা, হৃদয়ে কম্পন আর শরীরে শীতলতার সেই অসাধারণ সম্মেলন নিয়ে আসতে পারো আজকাল?
 
আজও তার সাথে একান্তে সময় কাটাও, হাতে হাত, কাঁধে মাথা রাখো! আজও কি এলোমেলো চুলগুলো ছুঁয়ে গেলে জানান দেয় তোমার হৃদয়ের আকুলতা! আজও কি কোনো নদীর ঘাটে, পার্কের কোনে, নিরিবিলি রাস্তায়, সিনেমা হলের অন্ধকারে তার ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁয়ে দেখো- তার নিঃশ্বাসে বিষ আছে কিনা! কথা বলো রাত জেগে? অজস্র খুনসুটিসৌরভ মুখরিত করে তোমার সারাদিন? আসও ভালোবাসার প্রতিটা মূহুর্ত বসন্তের বিকালের মত অনুভূত হয়? আজও তার বুকে বিলীন হতে চায় বেহায়া মন? আদিম উন্মাদনার প্রলোভনে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারো আজও? আজও কী তার পাশে বসে নিঃশব্দে ধ্রুবতারা থেকে স্বপ্ন পেড়ে আনো? 
 
আজও কি বলো ‘বহিরঙ্গের রূপ নয়, আমি গুণের প্রেমে পরেছি’, আজও কি ‘জীবনের প্রথমখুঁজে ফিরছো- যে তোমাকে ভালোবাসে! আজও আলিঙ্গনের ইঙ্গিতেই তোমার গভীর অনুভূতিরা বাঙ্ময় হয়ে উঠে? আজও কি শরীরকে উদযাপন করো? করলে কীভাবে সান্ত্বনা দাও প্রতিটা কলঙ্ককে, কীভাবে নিজেকে মানসিক সমর্থন করো? আজকে তোমার কাছে স্নেহের সংজ্ঞা কি বদলে গেছে? সুযোগ নেওয়ার পরিভাষাই বা কী? আজ কীভাবে সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করো জীবনে, আজও কি তোমার নিঃস্বার্থ বন্ধুত্ব হয়?

তাকে অনুভব রো প্রতিটা মুহুর্তে, প্রতিটা নিশ্বাসে। তার হাসির মিষ্টতা তোমার দৃষ্টিতে মিশে মায়াবী চাহনি তৈরি করে? সেই পুড়িয়ে দেওয়া দৃষ্টি দিয়ে শরীর জুড়ে ভালোবাসার উষ্ণতা ছিটিয়ে পারো? লক্ষ কোটি বছর ধরে পলকহীন চেয়ে আজও কী হৃদয়ের সবচেয়ে শীতলতম স্থানটিতে ভালোবাসার চাষাবাদ হয়। আজও কি তার চোখের দিকে তাকিয়ে দিগন্ত জোড়া সোহাগের ময়দানে অবুঝ শিশুর মত ছুটে বেড়াও! আহ্লাদে স্পর্শরা কি সকল বাঁধ ধ্বসিয়ে দিয়ে লজ্জায় মুখ নীল করে চোখ বন্ধ করে দেয়?
 
নাহ, কোনো বিস্তৃত প্রেক্ষাপটের উপরে জবাবদিহি চাইছিনা, সামগ্রিকভাবে বদলে যাওয়া সময়ে তোমার আচরণ বিবেচনা করতে সাহস সঞ্চয় করতে পারার তাগিদও দিচ্ছিনা। জানো তো, পালিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো কিছুই অপরিহার্য নয়শুধু থেকে যেতে, বহু কিছু লাগে, বহু কিছু।
 
আমি কী করছি? জানি তুমি জানতে চাইবেনা, তবুও বলি- আমি দেখি, কেবল দেখি। দেখতে দেখতে লিখি, লিখতে লিখতে দেখি।
 
দেখি, রাস্তার ধারের কোনো ছাওয়াতে বুড়ো কুকুরটা ক্লান্তিতে জিভ বের করে নিজেকে ঠান্ডা করছে। দুপুরের রোদে বিতৃষ্ণ পথিকের মুখে বিরক্তের বলিরেখা, মোছার ব্যার্থ চেষ্টা করছে জামার আস্তিন দিয়ে। উদাস এলোমেলো হাওয়া সমস্ত দুর্গন্ধ শুষে নিচ্ছে কি যেন মন্ত্রবলে। ঢেউহীন নির্ভীক নদী নিঃশব্দে বয়ে চলেছে অন্তহীন, যুগযুগান্ত ধরে নিঃস্ব, নিরাসক্তভাবে একই অভিমূখে, কখনও যার উল্টোপথে হাঁটার সাধ জাগেনা। তার বয়ে যাবার জন্য জমিকে জঞ্জালমুক্ত করতে হয়নি কখনও।  
 
শাশ্বত সভ্যতা রোজ বদলে যাচ্ছে সংস্কৃতির পথ বেয়ে, মানবতার স্বল্পায়ত জীবনসীমায় কিছু মহৎ শব্দেরা গদ্য এঁকে যায় আপন মনে। তবু ঘেঁটু, কলমি, হেলেঞ্চার মত আদুরে শিকড়ের বলে টিকে থাকা লতারা চেয়ে দেখে বাঁশবন, হিজলের ছায়া, আমবন, পুরোনো বটের শিকড়ে ঘিরে ধরা পোড়ো ভিটে, গুঁড়ি-মোটা পাকুরের ডালে গাংচিলের বাসা। কে জানে আজও কেন নিষ্ঠুর পৃথিবীটা শুধু ঘুরে চলে অক্লান্ত মোহে, কে জানে কোন উদ্দেশ্যে, কার টানে।
 
ছায়াচ্ছন্ন গুমোট প্রাণে খুঁজে ফিরি কর্মখালির বিজ্ঞাপন, প্রেমিকের কাজ জানা ‘লোক’ চাই। আমি অবসরে যাওয়া পরিত্যাক্ত প্রেমিক, যে নির্জলা ‘আদরের’ উপবাস করছি। পার্থিব হৃদয়ের পবিত্র বাসস্থানে বসে নগ্ন জীবনের ব্যর্থতাকে উপভোগ করছি চুটিয়ে। আনন্দঘণ শহরের পথে পথে নিপুনতার মুখোস, উপশিরা জুড়ে ক্রোধ আর ভাবনাতে ধর্মঘটআতঙ্কের ফাঁসি কাঠে ঝুলতে থাকা কারো কাছে, ভ্রমণের গল্পের চেয়ে বড় নির্যাতন আর হয়না। তাই মিলেমিশে চেয়ে থাকি অপেক্ষার সাথে, এক অস্থির কলহাস্যে অপেক্ষার মুখেও প্রশান্তি খেলে যায়, আবার হৃদয়ে গিঁট দিই সজোরে। মরমে আগুন জ্বালিয়ে এক দুর্বোধ্য অজুহাতে, সমস্ত লণ্ডভণ্ড হওয়ার প্রতীক্ষাতে বসে থাকা আমার হৃৎস্পন্দনেও হরতাল
 

 


বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

মোদির জন্মদিন ও Adandia




ক্ষমতায় থাকাকালীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কোনো সর্বোচ্চ নেতা, জনগনণের করের টাকায় নির্লজ্জভাবে নিজের জন্মদিবসকে রাষ্ট্রীয় উৎসবে পরিনত করেছে। গত ১১ বছরে বহু কিছু সয়েছি আমরা, এবারের জন্মদিন পালনও নাহয় সয়ে নিলাম। সমস্যা জন্মদিন পালনে নয়, আমার ব্যক্তিগত তরফ থেকেও মোদিজীর সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।


কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে থাকা দেশের প্রতিটি সংস্থায় প্রজাতন্ত্র দিবসের চেয়েও বেশী ধুমধাম করে প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনের জৌলুশ প্রদর্শিত হচ্ছে অবশ্যই জনগণের টাকায়, আর এই মোচ্ছবে হরির লুঠ করে চলেছে বিজেপির এলি-তেলি নেতা নেত্রীর দল। ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবর অর্থাৎ গান্ধী জয়ন্তী অবধি টানা দুই সপ্তাহ ধরে চলবে এই ধাষ্টামো, প্রতিটি CBSE ইস্কুলে মোদীজির জীবনী নিয়ে সিনেমা দেখানো হবে, যার পোষাকী নাম দেওয়া হয়েছে ‘সেবা পাক্ষিক’। দেশের প্রতিটি সংবাদ পত্র জুড়ে পাতার পর পাতা মোদীজির জন্মদিন পালনের বিজ্ঞাপন। দেশের তাবড় সেলেব্রিটিরা হুলিয়ে ভিডিও বার্তায় জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে-

এই ধরণের জনদিন পালন ইতিহাসে দুর্লভ হলেও নজিরবিহীন নয়। বিজেপি RSS কাদের অনুশরন করছে সেটা অতীতের দিকে তাকালেই পরিষ্কার হয়ে যায়। চলুন দেখি ওই ধরনের কিছু উদাহরণ-


আডলফ হিটলার। ২০ এপ্রিল “Hitler’s Birthday” ছিল নাৎসি ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে বড় উৎসবগুলোর একটি। জার্মানির সব স্কুল, অফিস, দোকানপাটে ছুটি থাকত। বার্লিনে বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজ, শিল্পকলা প্রদর্শনী, সংগীতানুষ্ঠান হতো। হিটলারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে যুব সংগঠন (Hitler Youth) বিশেষ মিছিল করত। ১৯৪৪ সালে হিটলারের শেষ জন্মদিনেও গোটা জার্মান রেডিওতে তাকে উদ্দেশ্য করে শুভেচ্ছা প্রচারিত হয়েছিল

বেনিতো মুসোলিনি। ২৯ জুলাই “Duce Day” নামে পরিচিত ছিল। ফ্যাসিস্ট দলের নেতারা ও নাগরিক সংগঠনগুলো বিশাল জনসমাবেশ করত। স্কুল ও সরকারি দপ্তরে বক্তৃতা, কবিতা আবৃত্তি, নাটক ইত্যাদি আয়োজন হতো। মুসোলিনিকে “রোমের পুনর্জন্মকারী” হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। শিশু ও কিশোর সংগঠন (Opera Nazionale Balilla) বিশেষ কুচকাওয়াজ করত

 

উত্তর কোরিয়ার স্বৈরশাসক কিম ইল-সুং ও কিম জং-ইল, জাপানের তোজো, এদের জন্মদিনেও বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজ, আতশবাজি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গণনৃত্য অনুষ্ঠিত হতো। রাষ্ট্রীয় ছুটি, সারা দেশে বিনামূল্যে খাবার বিতরণ


ক্রমশ যত দিন যাচ্ছে, মোদীজি মরিয়া হয়ে উঠছে আদানির হাতে দেশের সবটা তুলে দেওয়ার জন্য। মোদীজী পারলে গোটা দেশটাই আদানির নামে লিখে দেয় সংবিধান সংশোধন করে। মোদীজির প্রতিটি বিদেশ সফর ছিলো মূলত আদানির দালাল বা ভদ্র ভাষায় ‘ডিল ম্যানেজার’ হিসাবে। মোদীজীর বিদেশ সফর থেকে ফেরার পর সেই সব দেশের সর্বত্রই ব্যাবসার নামে খুঁটি গেঁড়েছিল আদানি গোষ্ঠী, অভ্যাসমত চুরিচামারি করতে গিয়ে- সবকটা দেশ থেকে লাথ খেয়ে, ব্ল্যাকলিস্ট হয়ে, মামলার সম্মুখীন হয়ে পাততাড়ি গুটিয়ে পালিয়ে এসেছে। প্রতিটা ক্ষেত্রে বিপুল লোকসানের বোঝা, মোদীজি সেই লোকসানের দায় মেটাতে ভারতের জনগণের সম্পদ তথা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মিটিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দেশের সম্পদের হরির লুঠের জন্যই, দেশজুড়ে প্রভু আদানি কর্তৃক এই জন্মদিনের লীলা সঙ্কীর্তন আয়োজন চলছে স্বমস্বরে, পারফেক্ট PR Stunt.

ওদিকে বিহারের ভাগলপুরের পীরপৈন্তিতে, মাত্র ১ টাকায় ১০৫০ একর জমি লিখিয়ে নিয়েছে ৩৩ বছরের জন্য। যে জমির বাজারমূল্য বর্তমানে কয়েক হাজার কোটি টাকা, বিহারের ডাবল ইঞ্জিন সরকার জনগণের করের ৮০০ কোটি টাকা খরচা করে সেই জমি স্থানীয়দের থেকে নানান অসদুপায় অবলম্বন করে অধিগ্রহন করেছে। সেখানে প্রায় ১০ লাখ আম লিচু জাতীয় ফলের গাছ রয়েছে, সেই জমিকে সরকারীভাবে অনুর্বর দেখিয়ে আদানির ‘পাওয়ার প্ল্যান্ট’ গড়ার জন্য মনোনীত করেছে।
“এক পের মা কে নাম”, এর আগেও অপারেশন সিঁদুরের সময়েও ফটোগ্রাফার দিয়ে শ্যুটিং করিয়ে গাছ লাগাবার সে কী বিশাল বিজ্ঞাপন। ওদিকে ১০ লাখ ‘পের’ আদানির নামে কেটে উড়িয়ে দিচ্ছে। গোটা দেশ জুড়ে কয়লা খনি, বিভিন্ন আকরিকের খনি দখল করেছে আদানি, সেই সমস্ত স্থানে- গারে পেলমা, গিধমুরি পাটুরিয়া, কেনতে এক্সটেনশন, পারসা পূর্ব ও কান্তবসন, সুলিয়ারি ব্লক, ওয়াশারী, বাইলাডিলা, কুর্মিটার অঞ্চল, সর্বত্র নির্বিচারে হেক্টরের পর হেক্টর জঙ্গল কেটে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

আদানির লুটের এখানেই শেষ নয়, বার্ষিক ১ টাকা ভাড়ার জমিতে সরকারি টাকায় গড়ে উঠবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, বিহার সরকার এর জন্য ইতিমধ্যেই ২১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। বিহারের কয়লাতে পাওয়ার প্ল্যান্ট চলবে, আর আদানি সেই প্ল্যান্টের বিদ্যুৎ বিহারের জনগণকে বিক্রি করবে ৬ টাকা ইউনিট দড়ে, শুধুমাত্র কেন্দ্রটির পরিচালনা করার বিনিময়ে। এই মুহুর্তে রাষ্ট্রীয় কয়লা প্রায় বিনামূল্যে উত্তোলন ও পরিবহণ করে দেশজুড়ে ৮টি পাওয়ার প্ল্যান্ট চালাচ্ছে আদানি গোষ্ঠী, সেগুলো থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ৬টার বেশী প্রতি ইউনিট হিসাবে বিক্রি করছে আদানি। আচ্ছা, দেশটার নাম ইন্ডিয়া বদলে দিয়ে আদানিন্ডিয়া রাখলে কী খুব বিশ্রী শোনাবে?

আগামীতে দেশে সরকার উল্টালে আদানির ১ টাকাও লোকসান নেই, আদানি বিদেশে পালাবে, সিম্পল সুত্র। কারন আদানি জনগণের সম্পত্তি দখল করে সরকারের থেকে লিজ বা দীর্ঘমেয়াদি ভাড়ায় নিয়ে। হয় সেই ভাড়া বিনামূল্যে অথবা বার্ষিক ১ টাকা বা ওই জাতীয় নাম মাত্র মুল্যে। আদানি দেশের প্রতিরক্ষা, পরিবহণ ও খনি অঞ্চলকে টার্গেট করেছে। রেলের ফ্রেট করিডর, সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর গুলো ক্রমশ গ্রাস করেছে। আদানি যে লুণ্ঠনটা করছে, সেটা কলোনিয়াল যুগের ইংল্যান্ডের ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও করতে পারেনি। দেশের মাটিতে আদানি নিজের ১ পয়সাও স্থাবর সম্পত্তিতে ইনভেষ্ট করেনি, সেই সব ইনভেষ্ট বিদেশে। মোদী সরকার উল্টালে আদানির কোন সম্পত্তিই পাবলিক দখল করতে পারবেনা, যেগুলোতে আদানি জোঁকের মত রক্ত চুষছে, সেগুলো মোদীজির কৃতিত্বে পাওয়া, ১০০% জনগণের সম্পত্তি।

জনার্দন চৌধুরী, নামটা অপরিচিত, তিনি বর্তমানে Advisor – PSP & Hydro at Adani Green Energy, এটাই তার বিগত ৯ বছরের পেশা। এই ব্যাক্তিকে মোদী সরকার ২০২৩ সালে কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রকের তরফে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ার জন্য- পরিবেশ সংক্রান্ত ছাড়পত্র দেবার কমিটিতে বিশেষজ্ঞ সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেয়। বাকি ৬ সদস্যের মধ্যে ইনিই ৪ জনের নাম সুপারিশ করেন, যথারীতি সেই সুপারিশ গৃহীত হয়। পরবর্তীতে এই কমিটি প্রায় ১৯টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ১৮টিই ‘আদানি গ্রীন এনার্জি’র হাতে তুলে দেয়।

যেমন, ৮৫০ মেগাওয়াট রাইওয়াদা প্রকল্প, ১৮০০ মেগাওয়াট পেডাকোটা, 2100 মেগাওয়াট পাটগাঁও, 2,450 মেগাওয়াট কয়না-নিভাকানে, 1500 মেগাওয়াট মালশেজ ঘাট ভোরান্দে এবং 1500 মেগাওয়াট তারালি। কি অসাধারণ দুর্নীতিমুক্ত সিস্টেম, প্রথমে আদানির বেতনভুক কর্মচারীকে সরাসরি সরকারি কমিটির মাথায় বসিয়ে দাও- যে কমিটি প্রকল্পের অনুমোদন দেবে। বাকি পদগুলোতেও পারলে নিজের লোক বসাও, নাহলে যারা আছে তাদের কিনে, একান্তই সে সব না হলে ভয় দেখিয়ে বাধ্য করো। ব্যাস, সরকারীভাবে সমস্ত টেন্ডার ‘মালিকের’ নামে লিখিয়ে নিতে আর কি চায়- বিশ্বের আর কোথাও এভাবে দিনে ডাকাতি করে সরকারি সম্পদ লুন্ঠনের ইতিহাস রয়েছে?

আদানি খাবে আর আম্বানি আঙুল চুষবে? দেশে windfall tax নামে এক ধারনের কর ব্যবস্থা চালু ছিল। উইন্ডফল ট্যাক্স হল লাভের উপর ‘উচ্চ করের হার’ যা একটি কোম্পানির আকস্মিক লাভের উপরে ধার্য হয়। রাশিয়ার সস্তা তেল কিনে আম্বানির রিলায়েন্সের এই ধরণের ‘আকস্মিক’ এলোমেলো পরিমানে লাভের অঙ্ক ফুলেফেঁপে উঠে। ব্যাস আর কি, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মোদীজি সেই ‘উইন্ডফল ট্যাক্স’ আইন বাতিল করে দেয়, শুধু তাই নয়- আকস্মিক লাভকে সম্পূর্ণ ‘করমুক্ত’ ঘোষণাও করে দেয়। পাশাপাশি মোটাভাইকে ভবিষ্যতের সুরক্ষা দিতে, নতুন আরেক আইন প্রণয়ন করা হয়। যেখানে বলা হয়েছে- এই কোম্পানির পূর্ববর্তী ‘আকস্মিক লাভের’ উপরে আগামীতে কখনও অন্য কোনো সরকার কর দাবী করতে পারবেনা।

শরদ কুমার জৈন, IIT রুরকি থেকে পাশ করা ইঞ্জিনিয়ার। কেন্দ্রীয় রিভার ভ্যালি প্রোজেক্টের মুখ্য কর্তা ছিলেন ২০১৭ সালে। এনার অধীনেই ‘কেন-বেতোয়া’ প্রকল্প ছারপত্র পায়। কেন-বেতোয়া সংযোগ প্রকল্প (KBLP) হল একটি নদী-আন্তঃসংযোগ প্রকল্প, যেটা মধ্যপ্রদেশের ‘কেন নদী’র উদ্বৃত্ত জল যমুনার উপনদী ‘বেতোয়া নদীতে’ স্থানান্তর করার জন্য তৈরি করা হয়েছিলো। ২০২১ সালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা কর্তৃক অনুমোদিত এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল খরাপ্রবণ বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলে সেচ ব্যবস্থা করা। প্রকল্পের অধীনস্ত দৌধন বাঁধ, সংযোগ খাল এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আনুমানিক ব্যয় ৪৪,৬০৫ কোটি টাকা।

এই প্রোজেক্ট সরকারিভাবে ন্যাশানাল ওয়াটার ডেভলপমেন্ট এজেন্সি কনডাক্ট করছে। বর্তমানে এই প্রোজেক্টের অধিকর্তা সেই শরদ কুমার, যিনি ছাড়পত্র দিয়েছিলেন। তার সাথে কোন প্রভু জড়িত, গুগুল করলেই পেয়ে যাবেন। একই ভাবে ‘সরিস্কা টাইগার রিজার্ভ’ এর বাউন্ডারি দেওয়ার কাজ- যিনি সরকারের হয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে অনুমতি দিয়েছিলেন, তিনিই পরবর্তীতে টেন্ডার নিয়ে কাজের সেই বরাত পান। আরো পরে সেই তিনিই আবার সরকারী ভাবে সেই টেন্ডারের অডিটের বরাত পান। মোদী সরকারের এমন ‘টেন্ডার’ চুরির উদাহরণ দিতে বসলে শেষ হবেনা। গোয়া, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, বিহার, আসাম- দেশের সর্বত্র।

সর্বত্র যখন ঘটছে, গুজরাটই বাদ যায় কেন। বরোদার কাছে দাহোদ শহর, এটি গুজরাটের সবচেয়ে দরিদ্র শহর হিসাবে পরিচিত। যেখানকার মানুষ দুবেলা রুটিরুজির জন্য উদভ্রান্ত, গুজরাত সরকার সেখানে বিমানবন্দর তৈরি করতে নোটিফিকেশন জারি করে জমি অধিগ্রহন করে। এরপর আনন্দী বেন প্যাটেলের ডাবল ইঞ্জিন সরকার উন্নয়নের নামে সেই জমি- ১ টাকা টোকেন মূল্যে আদানি এবং আম্বানিকে উপহার দিয়ে দেয়।

একই ভাবে ‘স্ট্যাচু অফ ইউনিটি’ বানানোর জন্য গুজরাত সরকার তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ের জমি নামমাত্র মূল্যে জবরদখল করে। সেই জমির বর্তমান সিংহভাগ অংশের দখল আদানি ও আম্বানিদের হাতে, ১ টাকা টোকেনেই সেই জমি ৫১ বছরের লিজে দিয়েছে বিজেপি সরকার, বর্তমানে ব্যক্তিগত রিসর্ট আর বাংলো তৈরি করেছে কর্পোরেট আর RSS বিজেপির নেতা মন্ত্রীরা। সমগ্র গুজরাত জুড়ে এমন অনেক উর্বর জমিকে অনুর্বর ঘোষণা করে সেগুলো পুঁজিপতি হাঙরদের মুখে তুলে দিয়েছে সরকার। সেখানকার স্থানীয় মানুষদের স্বানান্তরিত করেছে কচ্ছের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে চাষবাসের কিছুই নেই।

গোদি মিডিয়ার প্রায় সবটাই আদানি আম্বানিদের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন, অবশিষ্ট টুকু পমেরিয়ান অর্নব গোস্বামী বা বিজেপির সাংসদ সুভাষচন্দ্রের মত পরজীবীদের। তারপরেও এই সব দুর্নীতির খবর বাইরে প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে- ফ্রিল্যান্সার সাংবাদিক ও সোস্যালমিডিয়ায় আমার আপনার দৌলতে। তাই আদালতের কিছু ‘কিংবদন্তি’ বিচারকদের বদান্যতায় মোদী সরকার আইন করে খবর প্রকাশ দাবিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় কোনো খামতি রাখছেনা।

উত্তর-পশ্চিম দিল্লি জেলা আদালতের সিনিয়র সিভিল জজ অনুজ কুমার সিং, গত ৬ সেপ্টেম্বর আদানি এন্টারপ্রাইজেসের দায়ের করা মানহানির মামলায় ‘একতরফা’ আদেশে জারি করেছে। এই ক্ষেত্রে জড়িত কোনো সাংবাদিক বা কোনো ব্যাক্তির থেকে আদালত কিচ্ছুটি শোনেনি, আদানির পক্ষে একতরফা আদেশ জারি করে দিয়েছেন মাননীয় বিচারক। বিচারব্যবস্থা আর গণতন্ত্রের কী শোচনীয় গর্ভপাত।

আর সেই রায়ের উপরে ভিত্তি করে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেল আর সোস্যালমিডিয়া একাউন্ট হোল্ডারকে রাষ্ট্রীয় ফরমান পাঠিয়ে আদেশ করেছে, আদানি গ্রুপের নাম উল্লেখ করা ১৩৮টি ভিডিও এবং ৮৩টি ইনস্টাগ্রাম পোস্ট সরিয়ে ফেলতে হবে বিনা প্রশ্নে। দ্য ওয়্যার, নিউজলন্ড্রি, রবীশ কুমার, অজিত আঞ্জুম, ধ্রুব রাঠি, আকাশ ব্যানার্জি ওরফে দেশভক্ত, পরঞ্জয় গুহ ঠাকুরতা, রবি নায়ার, আবীর দাসগুপ্ত, অয়স্কান্ত দাস এবং আয়ুশ যোশী সহ বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের নামে কমপক্ষে ৭ টি করে মামলা দায়ের হয়েছে।

তারপরেও আমরা আদালতের উপরেই ভরষা করব, গণতন্ত্রেই আস্থা রাখব। স্বর্গীয় বিচারক লোয়া প্রাণ দিয়ে বিচারব্যবস্থার সত্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। বিনা বিচারে জেলবন্দী IPS সঞ্জীব ভাট মেরুদন্ডী আমলার সত্যতার অত্যতম প্রতীক। আদানির রায় দেওয়া বিচারক অনুজ কুমার সিং যেমন সত্য, সেই একই ‘নর্থ-ইষ্ট ডিস্ট্রিক্ট দিল্লি’ কোর্টের আরেক বিচারক মাননীয় ‘প্রবীণ সিং’ও সত্য।

২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গা মামলাতে সর্বশক্তিমান অমিত শাহ ও মিনি বিশ্বপ্রভু যোগীর পুলিশের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ এনেছেন বিচারপতি প্রবীণ সিং। দাঙ্গা সম্পর্কিত পুলিসের দায়ের করা পৃথক পৃথক ১১৬ মামলার রায় ঘোষণা করতে গিয়ে ৯৭টি মামলার অভিযুক্তদের (পড়ুন মুসলমানদের) বেকসুর খালাস করে দিয়েছেন। রায়ের কপিতে লেখা রয়েছে- পুলিশ কমপক্ষে ১২টি মিথ্যা সাক্ষী যোগার করেছিলো, এবং ৯৭টা মামলাই মিথ্যা বানোয়াট নথির ভিত্তিতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে ‘মুসলমানদের’ ফাঁসিয়েছিল যোগী-শাহ এর প্রশাসন।

“There has been an egregious padding of evidence by the IO and this has resulted in serious trampling of the rights of the accused who have been probably charge sheeted only in order to show that this case is worked out… Such instances lead to serious erosion of the faith of the people in the investigating process and the rule of law.”

সুতরাং, মোদী আদানি মিথোজীবিতা যেমন সত্য, তেমন সংবিধানকে রক্ষাকারী আদালতও সত্য, অল্প কিন্তু বেঁচে আছে। এই ঘোলাটে রকমের পরিস্থিতিতে মোদীজির জন্মদিন পালনের মত ইভেন্ট আয়োজন না করলে কীভাবে চাপা দেবে এগুলো? আগামীতে আমি বা আমার মত নগণ্য পাতি কলমচিরাও আদালতের সমন পাওয়ার জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নিয়ে রাখুন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, জাইরে বলসেনেরো আর নরেন্দ্র মোদি অর্থাৎ বর্তমান পৃথিবীর একনায়ক চতুর্ভুজের ফ্যাভ ফোরের একজন ৪৭ বছর জেলের মাধ্যমে অস্তাচলে। দ্বিতীয় জন ইরানের মার খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। বাকিরা ট্যাক্সের কর্মবৃদ্ধির খেলাতে নেমে দেশের মানুষকে তুর্কি নাচন নাচিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব ও টিকিয়ে রাখতে চাইছে

পুনশ্চঃ- এই সব দুর্নীতি নিয়ে মমতা ব্যানার্জী নিজে বা দিল্লিতে থাকা তার ৪০ জন সাংসদের কেউ কোনো ‘রা’ কেটেছে বলে বদনাম দিতে পারবেনা। এরা চোরে চোরে মাসতুতো ভাই নয়, এরা RSS তুতো আপন ভাই। আপনার কি, আপনি তো দুধেল গাই কিম্বা আগে রাম পরে বাম তত্ত্বের ‘সনাতনী’ সৈনিক।


#হককথন

ইরান যুদ্ধঃ একটা অশ্লীল পোষ্ট

 Disclaimer: অত্যন্ত অশ্লীল ভাষায় কথাবার্তা লেখা আছে এখানে, প্লিজ কেউ পড়বেন না।  মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে যারা ঘৃণা করেন, তারা কিন্তু এটা পড়ল...