আমাদের পূর্বপুরুষরা কৃষক ছিলেন, শ্রমিক ছিলেন। থাকতেন মাটির কাঁচা ঘরে। অর্থাভাবে-অন্নাভাবে কখনও-সখনও উপোসও করতেন এক আধা বেলা। পরতেন মলিন পোশাকপরিচ্ছদ। আমাদের বাবারা চাইলেন আমরাও যেন পূর্বসূরিদের মতো শ্রমিক না হই, আমাদেরকেও যেন মাটির ঘরে থাকতে না হয়, আমরা যেন পাকা ঘরে থাকি, যেন পেট পুরে তিনবেলা খেতে পাই। বাবারা আমাদেরকে নিয়ে বাসে-ট্রেনে-লঞ্চে করে গ্রাম ছাড়লেন, মফস্বলে এনে পড়াশোনা করালেন, টিনশেড ঘরে রাখলেন।
আমরা পড়াশোনা করলাম, মফস্বল ছাড়লাম, উচ্চশিক্ষার্থে মহানগরে এলাম, স্নাতক হলাম, স্নাতকোত্তর হলাম; পূর্বপুরুষদের বিশাল বাড়ি ছেড়ে অ্যাপার্টমেন্ট নামক কংক্রিটের বস্তিতে উঠলাম, কায়িক পরিশ্রম থেকে মুক্ত হলাম, বুদ্ধিবৃত্তিক কাজকর্ম (আসলে কেরানিগিরি) করে জীবিকা নির্বাহ করা শুরু করলাম, পোশাকে-আশাকে ফিরিঙ্গিদের মতো ফিটফাট হলাম, শরীরে-মনে আভিজাত্য এল।
আমাদের পা আক্ষরিক অর্থেই আর মাটিতে পড়ল না, গা আর বৃষ্টিতে ভিজল না। আমরা মাটির ঊর্ধ্বে উঠে গেলাম, বৃষ্টির ঊর্ধ্বে চলে গেলাম। সর্বোচ্চ স্মৃতিশক্তি প্রয়োগ করেও আমরা মনে করতে পারি না— আমরা সর্বশেষ কবে মাটিতে হেঁটেছিলাম, বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম বা ঘাসের ছোঁয়া পেয়েছিলাম। এমনকি, নিজের কেনা অ্যাপার্টমেন্টের ছাদের চাবিও আমাদের কাছে থাকছে না, আমাদের মিলছে না নিজের মালিকানাধীন ভবনেরও ছাদে যাওয়ার অবাধ সুযোগ। অন্য দেশে মানুষ চাঁদে যাচ্ছে, আমরা সামান্য ছাদে যাবার জন্য আকুল।
আমাদের দাদুরা ছিলেন আব্দুল খাঁন, রমজান আলি কিংবা মৈনুদ্দিন। আমরা হলাম ফাহাদ ফারাজ অনন্য, ইফতেখার ইশমাম ইশতি কিংবা আহনাফ মুনতাসির উচ্ছ্বাস। আমাদের ঠাকুমারা ছিলেন ফতেমা বিবি, কিসমত বেওয়া কিংবা মাহফুজা খাতুন। আমরা হয়েছি আনিকা আজিজ অর্নি, মালিহা তাবাসসুম অবন্তী কিংবা শাগুফতা শেহরিন মাহিয়া। আমাদের কারো-কারো নামের আগে-পিছে-মাঝে যুক্ত হতে লাগল এসএম, কেএম, এবিএম, আ ক ম, আ ন ম, আ আ ম স।
আমাদের নাম ক্রমশ শক্ত হতে লাগল, কাটখোট্টা হতে লাগল, দুর্বোধ্য হতে লাগল। অথচ আমাদের পূর্বপুরুষরা সোজাসাপটা নাম ধারণ করেই একটা বর্ণময় জীবন কাটিয়ে দিয়ে গেছেন, তাতে তাদের বেঁচে থাকতে সবিশেষ অসুবিধে হয়নি। আমরা আলুভর্তার নাম দিয়েছি ম্যাশড পটেটো উইথ গ্রিন চিলি, পুদিনা পাতা দেওয়া লেবুর শরবতের নাম দিয়েছি মিন্ট লেমনেড, ভাতের মাড়ে সিদ্ধ মুরগির ছেঁড়া টুকরো ফেলে তার নাম দিয়েছি চিকেন থাই সুপ। নতুন নামের খাদ্যের দাম শতগুণ হলেও পুরোনো সেই স্বাদ আমরা আর পাচ্ছি না।
আমরা গায়ে হলুদকে বানিয়েছি মাহেন্দি নাইট, কনে নাওয়ানোর নাম দিয়েছি ব্রাইডাল শাওয়ার, বউভাতকে বিদায় করে আমদানি করেছি রিসিপশন। আমাদের নামাজ, রোজা, রমজান, সেহরি, জিলাপি হয়ে গেছে যথাক্রমে সালাত, সাওম, রামাদান, সুহুর, জালেবি; কিন্তু হারিয়ে গেছে আমাদের ভাবগাম্ভীর্য, হারিয়েছে আধ্যাত্মিকতা, হারিয়েছে সহজিয়া জীবনবোধ; বিনিময়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে জেঁকে বসেছে উত্তুঙ্গ উগ্রবাদ (জাতীয় ও ধর্মীয় দুটোই) আর পৌনঃপুনিক প্রদর্শনবাদ।
কায়িক পরিশ্রম না-করতে করতে আমাদের দেহে পুরু চর্বি জমল, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও থাইরয়েডের মত সার্বক্ষণিক রোগবালাই হানা দিলো এবং বাসা বাঁধল। চিকিৎসকরা আমাদের খাবারের পরিমাণ বেঁধে দিলেন- দিনে চার কাপ ভাত, চারটা রুটি, তিন কাপ শবজি, একটা শশা, দেড়টা গাজর, আড়াইটা আঙুর। চিকিৎসকরা আমাদেরকে প্রতিদিন দৌড়াতে বলে দিলেন। আমরা স্টপওয়াচ চালু করে হাফপ্যান্ট পরে ভুঁড়ি নাচিয়ে রাজপথে দৌড়াতে লাগলাম, জিমে গিয়ে বাঁদরের মতো এ-ডাল ও-ডাল ঝুলতে লাগলাম, বুকডনের নামে নাকে খত দিতে লাগলাম; আমরা সে সবের গালভরা নাম দিলাম— ‘ওয়ার্ক আউট’, ‘ক্যালরি বার্ন’।
শহরে থাকতে-থাকতে ক্লান্ত হয়ে আমরা দু-তিন মাস পরপর ছুটতে লাগলাম রিসর্টে। একটু গাছপালা আছে, ডোবার মতো একটা হাজামজা পুকুর বা পচা-গলা সুইমিংপুল আছে, ছাদ বা বেড়া খড়কুটোর তৈরি যাতে ফড়িং বসে, সন্ধ্যার পর গোটা দশেক জোনাকির দেখা পাওয়া যায়, বৃষ্টি হলে চার-পাঁচটা ব্যাঙ ডাকে— বেছে-বেছে আমরা এমন রিসোর্টে যাওয়া শুরু করলাম, ভাড়া গুনতে লাগলাম রাতপ্রতি পাঁচ-দশ হাজার টাকা। রিসর্টে লালশাক, পালংশাক, পুঁইশাক দিয়ে ভাত খেয়ে বিল দেওয়া শুরু করলাম বেলাপ্রতি মাথাপিছু পাঁচশো-হাজার; বারবিকিউ নামক মাংসপোড়ার পেছনে ঢালতে লাগলাম আরো হাজার-হাজার।
বারবিকিউর সাথে আমরা খাই তেল-ছাড়া পরোটা, অথচ আমাদের পূর্বপুরুষদের স্বপ্ন ছিল বড়লোক হয়ে একদিন তারা তরকারিতে ইচ্ছেমতো তেল খাবেন। আমরা উত্তরসূরিরা তরকারিতে তেল খাওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা অর্জন করেছি, কিন্তু পাকস্থলী মোটেও তেল সইতে পারে না। খাওয়ার জন্য আমরা বড়লোক হলাম, বড়লোক হওয়ার পর আমাদের কারো-কারো ক্ষুধাই লাগছে না, ক্ষুধা লাগানোর জন্য চিকিৎসকদের পেছনে আমরা ঢালছি কাঁড়ি-কাঁড়ি টাকা।
যে-পেট পুরে খাওয়ার জন্য আমরা শহরে এসেছিলাম বা বড়লোক হয়েছিলাম, আমাদের সেই পেটে এখন আর সবরকমের খাবারই সয় না। প্রকৃতি আমাদের জিহ্বার স্বাদ কেড়ে নিয়েছে, মুখ থেকে খাবার কেড়ে নিয়েছে, এখন খাবার আমাদের খেতে হয় কাপ মেপে। আমাদের বাবা-মায়েদের পাতে মাংস জুটত না, বড়জোর সপ্তাহান্তে রোববার বাজার থেকে একখামচি পিলে মুরগি বা এক পোয়া রেডমিট কিনে এনে এক কেজি আলু মিশিয়ে রেঁধে দশ সদস্যের পুরো পরিবার একবেলা মেতে উঠতাম মাংস-উৎসবে। এখন আমরা মাংস খেতে পারি না, বহু সময় রেফ্রিজারেটরেই পচে যায়, হাই কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইড, পাত জুড়ে শুধু হার্ট অ্যাটাকের আতঙ্ক।
আমরা শারীরিক পরিশ্রম থেকে বাঁচার জন্য পড়াশোনা করেছিলাম; কিন্তু প্রকৃতি আমাদেরকে বাধ্য করছে কুকুরের মতো জিভ বের করে নোংরা রাস্তায় দৌড়াতে, জিমনেশিয়ামে ঝুলতে, বাটখারা তুলতে, বস্তা কিলাতে। কুলিরা চাউলের আড়তে যা যা করেন; জিমনেশিয়ামে আমরা তা-ই করছি, করে গর্বের সঙ্গে সেসবের ভিডিও দিয়ে রিল বানাচ্ছি, বানিয়ে দেখাচ্ছি- আমরা কে কত স্বাস্থ্যসচেতন, কে কত অভিজাত, কে কত আলাদা। যার জিমের মাসিক চাঁদা যত বেশি, সে তত বেশি অভিজাত। শ্রমিকদের মতো দৌড়াব না বলে আমরা সুট-বুট পরে দালানে ঢুকেছিলাম, আমরা এখন ট্রেডমিল কিনে সেই একই দালানের ভেতরই দৌড়াচ্ছি। আমরা দৌড় ছাড়তে চেয়েছিলাম, দৌড় আমাদেরকে ছাড়েনি, দৌড় আমাদেরকে দৌড়ানি করাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
কুঁড়েঘরে থাকব না বিধায় আমরা গ্রাম ছেড়েছিলাম, এখন আমরা কিছুদিন পরপরই পর্যটনকেন্দ্রের গলা-কাটা কৃত্রিম কুঁড়েঘরে যাই স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে। কাচঘেরা বায়ুরোধী ভবন বানিয়ে শ্বাসকষ্ট বাঁধিয়ে, বুকভরা বাতাস নিতে লাখ টাকা খরচ করে আমরা পাহাড়ে যাচ্ছি, সমুদ্রসৈকতে ছুটছি। গায়ে মাটি লাগাব না বলে আমরা গ্রাম ছেড়েছিলাম, একটু মাটির স্পর্শের আশায় এখন আমরা পার্কে-পার্কে ছুটছি কিংবা ছাদবাগান করছি। ‘চাষাভুষা’ শব্দটাকে আমরা গালি বানিয়েছিলাম, এখন ছাদবাগানে এক ডজন টমেটো ফলাতে পারলে গর্বিত ‘নগরচাষি’ হিসাবে বুক ফুলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রচার করছি।
মাছধরা মানুষদের জেলে বলে তাচ্ছিল্য করা আমরাই লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে বড়শি পেতে বসে থাকছি সরকারি দিঘিতে সেই মাছই ধরার জন্য। শব্জি খাব না বলে আমরা বড়লোক হয়েছিলাম; এখন বাজারে শবজির দামই সবচেয়ে বেশি, রেস্টুরেন্টে অধিক দামে সব্জিই খাই, এটাই এখন বড়লোকদেরই খাবার স্ট্যাটাস। পূর্বপুরুষরা যে শব্জি খেতেনই না, যে শব্জি বেড়ে উঠত বাড়ির পেছনের ঝোপঝাড়ে অনাদরে-অবহেলায়; শহরে আমরা এখন সেই অনাহুত শবজিই কিনে খাচ্ছি কেজিপ্রতি শত-শত টাকা খরচ করে।
আমাদের পূর্বপুরুষরা ছেঁড়া কাপড় পরতেন অর্থাভাবে, এখন আমরা চড়া দামে ছেঁড়া-ফাটা জিন্স কিনে পরি। তারা পান্তাভাত খেতেন তিনবেলা রান্নার মতো জ্বালানি ছিল না বলে; আজ আমরা সেই পান্তাভাতই খাই হুজুকে মেতে। গরম ভাতে জোরপূর্বক জল ঢেলে, হাজার-হাজার টাকার শ্রাদ্ধ করে। মহানগরের সেসব রেস্টুরেন্টের খাবারের দামই এখন সবচেয়ে বেশি; যেসব প্রতিটা রেস্টুরেন্টের সাজগোজ গ্রামের থিম কেন্দ্রিক, যেসব রেস্টুরেন্টে মেঝেতে বিছানো জাজিমে বসে খেতে হয়, যেসব রেস্টুরেন্টের আবহসংগীত হিসাবে বাজে গাঁও-গেরামের গান। আমরা বাসায় রাঁধি না সময় বাঁচানোর জন্য, অনলাইনে অর্ডার করে রেস্টুরেন্টের খাবার বাসায় আনিয়ে খেয়ে দিনাতিপাত করি, সেই বেঁচে যাওয়া সময়ে আমরা পয়সা উপার্জন করি; এর পর আমরা লিভার সিরোরিস বাঁধাই, শেষে সেই পয়সা খরচ করি লিভার সিরোসিসের চিকিৎসায়।
আমরা পরিবারের সবাই মিলে চাকরি নিয়েছিলাম স্বাবলম্বী হব বলে; স্বাবলম্বী আমরা হয়েছি, স্বাবলম্বী হতে-হতে কেউ বা ধনকুবেরও হয়েছি, কিন্তু আমাদের সন্তানরা বড় হচ্ছে গৃহকর্মীদের হাতে। আমরা এতটাই স্বাবলম্বী হয়েছি যে, আমাদের সন্তানরা জাগ্রত অবস্থায় দেখছে আমরা ল্যাপটপে অফিসের কাজ করছি, ঘুম থেকে জেগে দেখছে আমরা অফিসে চলে গেছি। স্বাবলম্বনের দাপটে আমাদের মা-বাবারা বার্ধক্য কাটাচ্ছেন বৃদ্ধাশ্রমে, সন্তানরা শৈশব কাটাচ্ছে চাইল্ড কেয়ারে, আমরা যৌবন কাটাচ্ছি ডেস্কটপে। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত বিয়ে করব না ভেবে আমরা কেউ-কেউ পঁয়ত্রিশেও বিয়ে করছি না, চল্লিশেও বিয়ে করছি না; করছি এরও পরে অথবা করছিই না। অথচ পূর্বপুরুষরা শেষ চল্লিশে দিব্বি নাতি-নাতনির মুখ দেখতেন। কিসের জন্য যেন অপেক্ষা করতে-করতে আমরা যৌবনেই বুড়িয়ে যাচ্ছি, আর বুড়ো বয়সে যুবকের ভূমিকায় অভিনয় করছি জোর করে। কোনোকিছুই শুরু বা শেষ করছি না তার সঠিক সময়ে, ফলত অবদমিরত যৌনাচারের তাড়নাতে সুগার ড্যাডি বা সুগার মম হচ্ছি।
সূর্যের আলো গায়ে লাগিয়ে ক্ষেতখামারে কাজ করব না বলে আমরা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত প্রাসাদে ঢুকেছিলাম। ঢুকে দেখলাম- শরীরে সূর্যের আলোর অভাবে আমাদের ঘুম আসে না। রাতের ঘুম ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা ওষুধ খাওয়া শুরু করলাম, তাতেও কাজ না হওয়ায় সূর্যের আলো গায়ে লাগানোর জন্য আমরা ‘ওয়াক’ শুরু করলাম। শীতাতপনিয়ন্ত্রক যন্ত্র ওদিকে আমাদের শরীরে ডেকে আনল নিউমোনিয়া-অ্যাজমা-হুপিংকাশি। প্রযুক্তি আমাদের চোখ খেল, কান খেল, নাক খেল; আমাদের চোখে ধরিয়ে দিল চশমা, কানে বসিয়ে দিল হিয়ারিং এইড, নাকে নেবুলাইজার। পূর্বপুরুষদের যা যা আমরা করতে চাইনি, আমরা- উত্তরপুরুষরা এর সবকিছু করতে বাধ্য হচ্ছি। বড়লোক হতে-হতে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। টাকা খেয়ে আমরা কুলাতে পারছি না। টাকা রাখারও জায়গা হচ্ছে না আমাদের। টাকা ব্যাংকে রাখলে ক'দিন পরে ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যায়, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করলে শেয়ারবাজার লুট হয়ে যায়। এখন আমাদের গরিব হতে ইচ্ছে করে, কিন্তু পারি না। গরিবরা বড়লোক হতে পারে, কিন্তু বড়লোকরা একবার বড়লোক হয়ে যাওয়ার পর আর গরিব হতে পারে না।
আমরা পাঠ্যবহির্ভূত বই পড়তাম। খবরের কাগজ পড়তাম। প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখতাম, টিভিতে শিশুতোষ সিরিয়ালের মেলা বসত তখন। রবিবার দেখতাম পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি। এর মধ্যে খবরের কাগজ বাদে বাকি সবগুলোকেই আমাদের পূর্বসূরিরা অন্যায় বলে মনে করতেন। পাঠ্যবইয়ের ভাঁজে কমিকের বই পেলে প্রহার করতেন, প্রেক্ষাগৃহে যাওয়ার খবর পেলে প্রহার করতেন, প্রহার করতেন এমনকি প্রতিবেশীদের বাড়িতে শুক্রবারের ছায়াছবিটিও দেখতে গেলে। আমরা ভাবতাম বড় হয়ে বড়লোক হলে আমাদেরকে কেউ ঠেকাতে পারবে না- আমরা ইচ্ছেমতো বই পড়ব, চলচ্চিত্র দেখব, গান শুনব।
আমরা বড় হলাম, বড়লোকও হলাম। ততদিনে দেশ থেকে প্রেক্ষাগৃহ উধাও হয়ে গেছে, চলচ্চিত্র জগৎই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে, চলে গেছে আমাদের পাঠাভ্যাস। আমাদের ফোনে এখন হাজার-হাজার বইয়ের পিডিএফ, ওটিটি-ইউটিউবে অগণিত চলচ্চিত্র। বই পড়ার জন্য এখন গ্রন্থাগারে যেতে হয় না, চলচ্চিত্র দেখার জন্য প্রেক্ষাগৃহে যেতে হয় না, গান শোনার জন্য কিনতে বা ভাড়া করতে হয় না ক্যাসেট-সিডি-ডিভিডি। কিন্তু আমাদের এখন কিছুই দেখা হয় না, কিছুই শোনা হয় না, কিছুই পড়া হয় না। আমাদের সবকিছু জমা হয়ে আছে, আমাদের সবকিছু জমে গেছে- উত্তর মেরুর বরফের মতো। সবকিছু হাতের মুঠোয় চলে আসায় আমরা এখন আর কিছুই দেখি না, শুনি না, পড়ি না। আমাদের ভেতরকার পাঠকের মৃত্যু হয়েছে, শ্রোতার মৃত্যু হয়েছে, দর্শকের মৃত্যু হয়েছে।
আমাদের পূর্বসূরিরা ভ্রমণকাহিনী পড়তেন, পড়ে কল্পনায় ওসব জায়গা দেখে নিতেন, পরে পয়সা জমলে সেসব জায়গায় ভ্রমণে যেতেন। এখন আমরা ভিডিওতেই সব দেখে ফেলছি, আমাদের আর কল্পনা করতে হচ্ছে না, ফলে আমাদের কল্পনাশক্তিও ‘নেই’ হয়ে গেছে। ফলত আমরা এখন আর কল্পনা করি না। কোথাও বেড়াতে গেলে সেই জায়গাটা দেখি না, শুধু ভিডিও করি, জায়গাটাকে ব্যাকগ্রাউন্ড বানিয়ে সহস্র ছবি তুলি; পরবর্তীকালে সেসব ছবি আমরা আর একবারও খুলে দেখি না। ফলে মরে গেছে আমাদের দর্শনেন্দ্রিয়ও। আমাদের সর্বাঙ্গে মরিচা ধরেছে, সব ইন্দ্রিয়ে জং ধরেছে। যখন সবকিছু দুর্লভ ছিল, তখন ঠিকই আমরা মূল্যবান বস্তুর মূল্য দিতাম।
সময় বাঁচানোর জন্য আমরা ফোন কিনেছিলাম। পরে, দেখলাম- ফোনই আমাদের জীবনের সিংহভাগ সময় খেয়ে ফেলেছে। যখন দু-টাকার খামে করে চিঠি লিখে উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে হতো এক মাস, তখনও আমরা নিঃসঙ্গ ছিলাম না। কিন্তু এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের অযুত-নিযুত অনুসারী, মেসেঞ্জারে কড়া নাড়লে এখন উত্তর পাওয়া যায় সেকেন্ডের মধ্যে, কথা বলার জন্য এখন সবুজ বাতি জ্বালিয়ে রাখে শত-সহস্র অনুরাগী; কিন্তু মন খুলে কথা বলার মতো এখন আমরা কাউকেই খুঁজে পাই না, মানুষ খুঁজে পেলেও কথা খুঁজে পাই না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা আমাদের প্রাত্যহিক গল্প এত বেশি বলে ফেলি এবং দৈনন্দিন জীবনের ছবি-ভিডিও এত বেশি দেখিয়ে ফেলি যে, এখন আমরা সবার সবকিছু জানি, মুখোমুখি সাক্ষাতে বলার মতো কোনো গল্পই এখন আর আমাদের অবশিষ্ট থাকে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলতে-বলতে আমরা আমাদের সব গল্প শেষ করে ফেলেছি, দেখিয়ে শেষ করে ফেলেছি সমস্ত ছবি। দু-টাকার হলুদ খামের যুগেও আমরা নিঃসঙ্গ ছিলাম না, কিন্তু দু-সেকেন্ডের সবুজ মেসেঞ্জারের যুগে আমরা নিঃসঙ্গ। এখন আমরা নিঃস্ব, নিঃসঙ্গ এবং গল্পশূন্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের ব্যক্তিগত গল্পগুলো আমরা এমন ব্যক্তিদেরকে বলে ফেলেছি, ব্যক্তিগত ছবিগুলো এমন ব্যক্তিদেরকে দেখিয়ে ফেলেছি; যারা আমাদের ব্যক্তিজীবনের অংশই না, যাদের সাথে কখনোই দেখা বা কথা হবে না। ভূগর্ভস্থ জল বেশি তুলে ফেললে নলকূপ আর জল দেয় না, জীবনের গল্প বেশি বলে ফেললে জীবনও নলকূপের মতো আচরণ করে। আমরা প্রত্যেকে একেকজন পরিত্যক্ত নলকূপ।
আমাদের পূর্বপুরুষদের বাড়িতে ছিল বিশাল পুকুর, সারি-সারি ফলগাছ, শব্জির ক্ষেত, গোয়ালঘর। বড়লোক হয়ে আমরা পুকুরের পরিবর্তে দেড় হাত চওড়া বাথটাব বানিয়েছি, ছাদে গাছ নাম নামক কিছু প্রহসন লাগিয়েছি, খাঁচায় পালছি কুকুর-বেড়াল-খরগোশ। গাঁয়ের বিঘা-বিঘা জমি বেচে শহরে এসে আমরা ফ্ল্যাট নামক সাড়ে সাতশো বর্গফুটের খোপ কিনছি। খোপের ড্রয়িংরুমে সাজিয়ে রাখছি বনসাই। একেকটা বনসাইয়ের দাম মূল গাছের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। আমরা স্বপ্ন দেখি- শহরে কামানো টাকা দিয়ে শেষ বয়সে গ্রামে গিয়ে বাগানবাড়ি করব। অথচ আমাদের পূর্বপুরুষরা বাগানবাড়িতেই জন্মেছেন, বাগানবাড়িতেই দিনাতিপাত করেছেন, বাগানবাড়িতেই মরেছেন। অর্থাৎ শেষ বয়সে যে জীবন যাপন করব বলে শহরে বসে আমরা খেটে মরছি বা স্বপ্ন দেখছি, প্রাচীন আমলের অশিক্ষিত লোকজন বিনা আধুনিক পড়াশোনায়ই সেই জীবন আজীবন যাপন করে গিয়েছেন।
শিক্ষিত বড়লোক হয়ে শহরে বসে আমরা যা যা করছি বা করার চেষ্টা করছি, আমাদের অশিক্ষিত গরিব পূর্বপুরুষরা ওগুলোই করতেন। রাত আটটার মধ্যে তারা ঘুমিয়ে পড়তে পারতেন, তাদের চোখে ঘুম ছিল। এদিকে আমাদের ঘুমের ওষুধ খেয়ে রাত তিনটেতেও ঘুম আসে না। পূর্বপুরুষদের যা যা আমরা এড়াতে চেয়েছিলাম, এর সবকিছু আমরা উচ্চমূল্যে করতে বাধ্য হচ্ছি। বরং তাদের বাড়ি ছিল আমাদের ফ্ল্যাটের চেয়ে বহুগুণ বড়, তাদের খাবার ছিল বিশুদ্ধ, তাদের শরীর ছিল সুঠাম। অথচ আমরা ভেবে বসে আছি শিক্ষিত ও বড়লোক হয়ে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের চেয়ে ভালো আছি।
তা হলে? আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের চেয়ে কতটুকু এগোলাম? তাদের চেয়ে আমরা কতটা ভালো আছি? প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে শেষ পর্যন্ত আমরা কি বিজয়ী হয়েছি? নাকি গো-হারা হেরে বসে আছি? আমরা কি আমাদের পরাজয় টের পাচ্ছি?
______________________________
মূল রচনা- আখতারুজ্জামান আজাদ