সোমবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৫

উত্তরবঙ্গের বন্যাঃ ম্যান মেড ডিজাস্টার

 

উত্তরবঙ্গের বন্যাঃ ম্যান মেড ডিজাস্টার।

কিন্তু সেই ‘ম্যান’ গুলোর সামাজিক পরিচয় কী? তারা কোন রাজনৈতিক দলের? প্রসাশনিক ভাবে কারা তাদের সেল্টার দেয়? ৭০-৩০ ভাগের আড়ালে আসলেই তো এগুলো ম্যানমেড ডিজস্টার। সরি, ওম্যান মেড

দুই মাসের বাচ্চা ভেসে চলে যাচ্ছে, মান্নীয়া তার স্বরচিত গানের ছন্দে দোলা ডোনা গাঙ্গুলির নাচে মনোনিবেশ করে ছিলেন, হাত দুলিয়ে নাচছিলেন। দক্ষিণ কোলকাতায় ব্যাঙে মুতলে কোচবিহারের ইস্কুলে ছুটি ঘোষণার বিষয় গুলো আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে, তাই সে প্রশ্নে নতুন করে কারো কোনো হেলদোল হয়না। উনি হাম্বা রাম্বা চোপ শব্দে ধমকে চমকে দেন, তারপর কিছু টাকা ছুঁড়ে মারেন বুভুক্ষু মুখের উপরে, সব শান্ত হয়ে যায়। ভারতে প্রতি মিনিটে ৪৫ জন নতুন শিশু জন্ম নিচ্ছে সরকারি হিসাবে, সেখানে গত ১৫ দিনে কোলকাতা ও উত্তরবঙ্গ বন্যা মিলিয়ে মোট ৪৫ জনও মরেনি, তাহলে সরকার কেন মিছিমিছি উতলা হবে! মিনিটে যে পরিমান আগামীর ভোটার বাড়ছে, সেখানে বিপর্যয়ের নামে বছরে দু-দশ হাজার মরলে ‘সেটা কোনো বড় কথা নয়’।

বাইরের রাজ্য সিকিম, বিহার ও পড়শি দেশ নেপাল ভুটান থেকে এই প্রথমবার জল পশ্চিমবঙ্গে এলো? লক্ষ লক্ষ বছর থেকেই তো আসে, যখন মানুষ ছিলোনা তখন থেকেই আসে। বাম আমলেও আসত, আজও আসে, হাজার বছর পরেও আসবে। মান্নীয়া মানুষকে বোকা নয়, বোকাচো'দা ভাবে তাই এই আলবাল যুক্তি দেয়। একটা সাংবাদিকের বুকের পাটা নেই যে- এই কথা গুলো বলে। বিজেপি উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক শাসক, তাই মুখে কুলপ। কিন্তু বামেরা? তাদের মুখ ও পিছনে কে মুলো গুঁজে রেখেছে যে এই প্রশ্ন গুলো তুলতে পারছেনা? দলের পক্ষ থেকে অফিসিয়ালি কোনো কড়া, যুক্তি ও তথ্য সহ ছিঁড়ে খাওয়া বিবৃতি নেই। এক অদ্ভুত নরম মোলায়েম দায়সারা বক্তব্য- ইতি

পাহাড়ে বৃষ্টি হলে ডুয়ার্সের সমতল ভাসবেই, নদীতে নাব্যতা নেই, দু'কুল ভাসানোই দস্তুর। মূর্তি, কুর্তি, নেওরা, মাল, জলঢাকা, তোর্সা, সংকোশ, জয়ন্তী, শিশামারা, ডায়না, করতোয়া, রায়ডাক, কালজানি সব নদীর এক হাল। ভুটানের পাহাড় কেটে রোজ কতশত রেক ভর্তি করে মালগাড়ি চলে যাচ্ছে সিমেন্ট ফ্যাক্টারিতে, জয়গাঁও ফুন্টশোলিং অঞ্চলে গেলেই এর প্রমাণ পেয়ে যাবেন। সেই খাদান ধোয়া ‘সাদা’ মাটি ডুয়ার্সের নদীখাত বুজিয়ে দিচ্ছে। সাপটানা, মুজনাই এর মত নদী গুলো নর্দমাতে পরিনত হয়েছে।

অর্থ আসছে সরকারি কোষাগারে- তার মূল্য নিশ্চই আসানসোল বাসি দেবেনা। সিকিমে প্রো-বিজেপি সরকার, তারাও ‘বিকাশ’ এ মন দিয়েছে। ২০২৩ এ চুংথাং বাঁধ ভাসিয়ে নিয়েছিলো, সরকার শিক্ষা তো নেয়ইনি, উল্টে আরো জোরকদমে ধ্বংসলীলা চালাচ্ছে উন্নয়নের নামে। আজও যারা নর্থ সিকিম ভ্রমণ করেন তাদের চোখের দুপাশে ধ্বংসস্তুপ ছড়িয়ে ছিটিয়ে। আজও লাচেন লাচুং এর রাস্তা সারাই হয়নি, ডিক-চু ড্যাম আজও নড়বড়ে। মানুষ মরে মরুক, তাতে পুঁজিপতি ও তাদের রক্ষাকর্তা দক্ষিণপন্থী সরকার গুলোর কীইবা যায় আসে! অবশ্যই এগুলো ম্যান মেড ডিজাস্টার।

৩ দিনের সাইটসিয়িং এ যারা পাহাড়ে বেড়াতে আসেন, তাদের অন্য কোনো খারাপ কিছুতে নজর যাবেই না- পাহাড়ের এমনই মোহনীয় রূপ। কিন্তু আমাদের মত যারা সারাবছরই প্রায় পাহাড়ে থাকি, তাদের চোখে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ছাপিয়ে স্থানীয় মানুষদের লোভের কুৎসিত রূপটাও ধরা পরে। নদীর পাড় কেটে বালি নিয়ে যাওয়া, যথেচ্ছ বোল্ডার উত্তোলন, যেখানে বাড়ি বানাবার পার্মিশন নেই সেখানে ৩ তলা পাকা কন্সট্রাক্সন এখন এলেবেলে ব্যাপার। এর সাথে রয়েছে সীমাহীন দুষণ। চিপস এর প্যাকেজ সহ নানান প্লাস্টিক প্যাকেজ, সিঙ্গেল ইউজড পাস্টিকের বোতল, ব্যবহৃত কন্ডম সহ, যতভাবে পাহাড়কে ধর্ষণ করা সম্ভব, সমতলের লোকেরা সেটা করে আসছে রোজ, বছরে ৩৬৫ দিন। এ বিষয়ে পাহাড়ের স্থানীয়েদের কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই, প্রশাসন নির্বিকার, বিশেষ করে আমাদের পশ্চিমবঙ্গ ও নেপালের বিস্তীর্ন অঞ্চলের স্থানীয়দের। এর দায় কী বীরভূমের শিউড়ির লোক মেটাবে?

দার্জিলিং জেলাতে কটা নদী আছে আমরা কেউ কখনও খোঁজ করিনি। রাম্মাম নদী, সিরিখোলা নদী (শ্রীখোলা), লোধমা নদী, রিয়াং নদী, ছোট রঙ্গীত নদী, রঙ্গীত নদী, বড়ো রঙ্গীত নদী, পম্পা নদী, রঙ্গিও নদী, রঙ্গু নদী, রাঙ্গাং নদী, মাণ্ডিং নদী, রংবি নদী, রঙ্গিয়াক নদী, রতু নদী, রিলিং নদী, কাহিল নদী, রিংরিয়াৎ নদী, কলোক নদী, মেচী নদী, রংবং নদী, পাইয়াংডং নদী, পোসাম নদী, বালাসন নদী, পাচিম নদী, সুলিয়াসি নদী, দুধিয়া নদী, মারমা নদী, মতুয়া নদী, রকতি নদী, রুহমি নদী, সেবক নদী, মহানন্দা নদী, মামঝা নদী, চেঙ্গা নদী, মুলিয়া নদী, পঙ্খাবাড়ি নদী, পঞ্চাই নদী, লাচিও নদী, কুরুনডাক নদী, তপু নদী, চৈয়াটি নদী, দুমারিয়া নদী, দুল দুল নদী, কুয়ের্চি নদী, রিংচিটং নদী, জোড়াপানি নদী, ফুলেশ্বরী নদী, তিস্তা নদী ও চিঙা নদী প্রতিটার এক দশা, যা ভয়াবহ ও বিপদসীমার উপরে চলে গেছে। এই ছোট ছোট নদী, উপনদী গুলো প্রতিটা ভয়াবহ দূষনে আক্রান্ত সাথে বালি মাফিয়াদের দৌরাত্মে পঙ্গু। পাহাড়ি নদী খাতের বড় বড় বোল্ডার গুলোই তো খরস্রোতা নদীর তীব্র জলস্রোতকে নিষ্ক্রিয় করে, সেগুলোই হাঙরের দল তুলে নিয়ে চলে গেছে। এগুলো ম্যান মেড ডিজাস্টার না হলে কোনটা হবে?

সিকিমেও পাইকারি হারে স্বাভাবিক পরিবেশের মা মাসি করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বানানো হয়েছে। শুধু তিস্তা নদীর উপর ৪৭টি প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে তিস্তা-৩ বাঁধ, পূর্ব ভারতের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, যেটা ২০২৩ সালে বন্যায় ধ্বংস হয়ে যাবার পর আরও শক্তিশালী কংক্রিট কাঠামো দিয়ে পুনর্নির্মাণ করা চলছে। এছাড়া তিস্তা-৫ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, রঙ্গিত-৩ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, রঙ্গপো বাঁধ, রঙ্গলি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, চুজাচেন এইচইপি প্রকল্প সহ এমন বহু প্রোজেক্ট গড়ে উঠেছে। এই বাঁধ প্রোজেক্ট গুলো অতি বৃষ্টির জল একসাথে প্রায় একই মুহুর্তে ছাড়ে সবগুলো মিলে, যার সবচেয়ে বেশী প্রতিঘাত পরে নদী ঠিক যেখানে মুক্ত গতি পায়, সমতল ছোঁয়ার ঠিক আগের অঞ্চলটাতে- কালীঝোরা থেকে সেবকের মধ্যে NH 10 এ নিত্য ভূমিধ্বস তাই অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে। তিস্তা ছাড়াও রঙ্গিত, লাচুং চু, লাচেন চু রংপো চু, জেমু চু, রানীখোলা, ডিক-চু, রংয়ং চু সহ কটা উপনদীর একই হাল।

নেপালের ইলম ড্যাম বিপুল জল ছেড়েছে, কোশী প্রভিন্সে সব তছনছ, ৩৭ জন মৃত, অসংখ্য নিঁখোজ। মেচি নদী চুড়মার করতে করতে সব ভাসিয়ে সমতলে নামছে। ভুটান আরেক কাঠি সরেস,পরিবেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে হ্যাজ নামানোতে খিলারি, ওদিকে তোর্সার রিভারবেডে 'আমো চু টাউনশিপ' বানিয়ে উন্নয়নের নামে প্রকৃতির মাকে ১০৮ বার নিচ্ছে। সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে দুর্নীতির অমৃতকাল চলছে, এই জাতিদের কে বাঁচাবে? ম্যান মেড ডিজাস্টার এর বাইরে আর কোনো জুতসই বাক্য খাপ খায় কি?

এর সাথে রয়েছে ন্যাশনাল হাইওয়ে অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড (NHIDCL) এর পাহাড়ের পেট ফুটো করে ট্রেনের জন্য টানেল বানানোর প্রকল্প। হিমালয়ের এই ভঙ্গুর অঞ্চলে আপনি যদি এই লেভেলের বিকাশ করেন, তার মূল্য দিতে হবেনা? পশ্চিমবঙ্গের জোরপোখরি, সেঞ্চেল, মহানন্দা, চাপরামারি, জলদাপাড়া, গরুমারা, হাতিপোতা; ওদিকে সিকিমের ফামবং, কংশলা, বার্সে, মায়নাম, প্যাঙ্গোখোলা, সিংবু, কিতাম, স্লিংডং সহ প্রতি অভয়ারণ্য সরকারি মদতপুষ্ট রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা চোরাচালানকারি ও স্থানীয় নেতাদের ডাকাতির অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে।

হিমাচল প্রদেশের বিপাসা নদীতে বা উত্তরাখণ্ডের ক্ষীরগঙ্গা নদীর বন্যাতে ঠিক যেমনটা দেখা গিয়েছিলো- হাজারে হাজারে গাছের গুঁড়ি ভেসে আসছে প্রবল জলের তোড়ে, গতকাল তোর্ষা নদীতে একই দৃশ্য দেখা গেছে। এগুলো নিশ্চই ক্যানিং বা ঘাটালের লোক কাটেনি, ন্যাওড়া ভ্যালি উদ্যান, সিঙ্গালিলা জাতীয় উদ্যান সহ কাঞ্চনজঙ্ঘা জাতীয় উদ্যানের বনভূমির জঙ্গল কেটে সাফাই করে পাচারের জন্য রাখা ছিলো, এগুলো থেকেই যে এসেছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। অবশ্যই ম্যান মেড ডিজাস্টার

ঘরছাড়া কমরেডদের জন্য এভাবে কখনও ত্রাণ গেছে? যারা তোলামুলের অত্যাচারে ভিটেমাটি ছাড়া হয়ে পরিযায়ী হয়ে গেছে তাদের খবর কে রেখেছে? রাস্তাঘাট সব খোলা, কেন্দ্র রাজ্য দুটো সরকারই ত্রাণ নিয়ে পৌঁছাচ্ছে। অবশ্যই তেলা মাথায় তেল দিতে হয়, কথায় আছে ব্যাহেতি গঙ্গা মে হাত ধোনা হ্যায়- সেটাই চলছে। সমস্যা শুদধু উত্তরবঙ্গে নয়, উত্তর বিহারেও একই অবস্থা। হাসপাতালে অবধি জল ঢুকে গেছে, সোস্যালমিডিয়াতে ভাইরাল সেই ছবি। নেপালের বাগমতী, ইলম, কোশি, মদেশ অঞ্চল অতি বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত। বাগমতি, হনুমন্তে, মনোহরা, ধোবিখোলা, বিষ্ণুমতি, নখু, বলখু ইত্যাদি নদীগুলো হরপার জলে গর্জাতে গর্জাতে বিহারে ঢুকছে। নেপাল জুড়ে মৃত্যু মিছিল, সরকারি ভাবে ১০০ ছাড়িয়েছেসুনসারি, উদয়পুর, সাপ্তারি, সিরাহা, ধনুশা, মহোত্তরি, সরলাহি, রাউতাহাট, বড়, পারসা, সিন্ধুলি, দোলাখা, রামেছাপ, সিন্ধুপালচোক, কাভ্রেপালচোক, কাঠমান্ডু, ললিতপুর, ভক্তপুরা- জুড়ে অসংখ্য মানুষ নিখোঁজ, বিপুল ধ্বসহরপা বানের ভোগান্তি বিহারের মানুষও ভুগছে

হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত ডুয়ার্সের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসাধারণ। বন্যপ্রাণী সমৃদ্ধ গ্রীষ্মমন্ডলীয় বন, চা বাগানের সবুজ গালিচা এবং ঢেউ খেলানো সমভূমি জুড়ে অসংখ্য পাহাড়ি ঝর্ণা, নদী থেকে উঠে আসা নিচু পাহাড়। ডুয়ার্সের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে চা, পর্যটন এবং কাঠের ব্যবসার উপরে। কিন্তু শেষ ১৫ বছরে এই এলাকার জন্য মমতা সরকার কোন এমন একটা কাজ করেছে যার জন্য এই তিনের একটারও উন্নতি হয়েছে, কিম্বা চতুর্থ কোনো দিশা দেখাতে পেরেছে?

সোস্যালমিডিয়া জুড়ে দেখা যাচ্ছে বিপন্ন বন্য জন্তুর দল জলের তোরে ভেসে যাচ্ছে, কেউ কেউ ক্লান্ত শরীরে নিজেকে ছেড়ে দিয়েছে, কেউ জলের সাথে অসম যুদ্ধে হেরে মৃত লাশ হয়ে সমতলের দিকে ভেসে যাচ্ছে। লক্ষ্য লক্ষ্য গাছের গুড়ি নদী দিয়ে ভেসে যাচ্ছে, যা চর্ম চক্ষে বিশ্বাস করা মুশকিল। আবার কিছু অঞ্চলের মানুষ বন্যার জলের তোর থেকে ভেসে আসা সেই গাছের গুঁড়ি সংগ্রহ করছে, জীবন সংগ্রামের এ এক আলাদাই উপজীব্য

মহানন্দা, কালিন্দি, পূর্ণভবা, টাঙ্গন, পাগলা, কুলিক, করতোয়া, আত্রেয়ী, পুনর্ভবা, ব্রাহ্মণী, গামারী, জলঙ্গী, ভৈরব, ময়ূরাক্ষী, ফুলহার, চুর্নী, বিদ্যাধরী, মাঠভাঙা, চুমরি, মুড়িগঙ্গা, অঞ্জনা, ইত্যাদি নদী গুলো দিয়ে নেপাল, ভুটান সহ সিকিম, দার্জিলিং ও কালিম্পং পাহাড়ের জল নামছে, তাই দুই দিনাজপুর জেলা, মালদা সহ নদীয়ার নিম্ন অববাহিকা অঞ্চল গুলো নতুন করে প্লাবিত হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। উত্তরবঙ্গে ভারি এফেক্ট পরেছে কমবেশী সর্বত্র, কিন্তু ঢালু ভূমি রূপের দরুন অধিকাংশ জল খুব অল্প সময়ে নিম্নবঙ্গ তথা বাংলাদেশ ও মধ্য বঙ্গের দিকে নেমে যাবে। সুতরাং মালদার ভুতনির চরের মত এলাকাগুলো আবার নতুন করে জল যন্ত্রনা ভোগের মধ্যে পরে যেতে পারে

শেষ ৫-৭ বছরের বেশী সময় ধরে উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের শাসক বিজেপি। এগুলো সবই আগে রাম পরে বাম প্রকল্পের অধীনস্ত ফসল। পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি তো বটেই তার সাথে প্রায় সব MLA, MP ই বিজেপির। দেবী দুর্গা যখন কালীঘাটের দেবীকে গার্ড অফ অনার দিতে দিতে কার্নিভ্যালে হাঁটছিলেন- কালীঘাটের দেবী সেখানে ছক কষছিলেন কার ঘাড়ে দোষ ফেলা যায়। ম্যান মেড বলার আগে এটা ভুলে গিয়েছিলো যে সেই ম্যান গুলো তার দলেরই একেকটা রত্ন। আর সেই সব ম্যানকে কন্ট্রোল করা উনি সুপার ‘উম্যান’

সরকার যখনই বিপদে পরে বামেদের রেড ভলেন্টিয়ার সরকারের বিরুদ্ধে উঠা যাবতীয় ক্ষোভ ও রাগ স্পঞ্জের মত শুষে নেয়। কালচিনি থেকে কাকদ্বীপ- যাবতীয় অভিযোগের যথাসাধ্য প্রশমন ঘটাতে ত্রুটি রাখেনা তারা। আলিমুদ্দিনের তেমনই হুকুম অঘোষিত ভাবে, সাধ করতে তোলামুলের বিমান ব্যানার্জী- ২৯ বছর ধরে থাকা ফ্রন্টের চ্যেয়ারম্যানকে ‘সৌজন্যের’ জন্য ডাকেন! এক অদ্ভুত মিথোজীবীয়তা, সরকারের ব্যার্থতা পুষিয়ে দিতে এদের পন করা রয়েছে- পালটা যুক্তিও রয়েছে, “একটা বাম দলের কাজটা কী”? এই ধরণের। হ্যাঁ, পারলে পোঁদটাও চেটে দেবেন, তৃনমূল বলে কী গু ঘেঁটে ছোঁচাতে তাদের ঘেন্না লাগেনা!

মূল বিপর্যয়ের এলাকা কোন গুলো? দার্জিলিং এর মিরিক মহকুমা সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ, এছাড়া বিজনবাড়ি, পালবাজার ও সুখিয়াপোখরি ব্লক এই অতিবৃষ্টি জনিত হরপা বাণের শিকার হয়েছে। ২৪ ঘন্টায় ২৮৮ মিলিমিটারের কাছাকাছি বৃষ্টিপাত হওয়াতে এখানেই সবচেয়ে বেশী মানুষের মৃত্যু হয়েছে, ২৮ জন। জলপাইগুড়ি, আলুপুরদুয়ার ও কোচবিহার জেলাতেও ২০০ থেকে ৩০০ মিলিমিটারের মত বৃষ্টি হয়েছে। আলিপুরদুয়ারের কালচিনি ও আলিপুরদুয়ার-১ ব্লক, কোচবিহার জেলার মেখলিগঞ্জ, কোচবিহার ১, কোচবিহার ২ এবং হলদিবাড়ি ব্লকগুলির মধ্যে, পারমেখলিগঞ্জ, হেমকুমারী, বকশিগঞ্জ, নেহেরু নগর কলোনি, পাটলখাওয়া, পুটিমারি, সাতসিংমারী হরিণচৌড়া, এবং পুন্ডিবাড়ির বাঁশদহ-নটিবাড়ি অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

জলপাইগুড়ির বানারহাট আর নাগড়াকাটা অঞ্চলে মূল বিপর্যয় হয়েছে। শিলিগুড়ির পোড়াঝাড় অঞ্চলে লোকে হাহাকার করছে, আপনি ১টা ছবি দেখান সেখানে কোনো রেড ভলেন্টিয়ার রয়েছে। মারাত্বক সংকটাপন্ন স্থানে মালগুলো যায়নি, বা সেখানে অস্তিত্ব নেই। শিলিগুড়ি শহরতলী, জলপাইগুড়ির শহরাঞ্চলে হাঁটুজলে গিয়ে কুমিরডাঙা খেলছে। যাদবপুরের শ্রমজীবি ক্যান্টনের তো উচিৎ ছিলো নাগরাকাটা, বিজনবাড়ি, কালচিনি বা মেখলিগঞ্জে গিয়ে ‘জনসেবার দোকান’ খোলা, উঁহু সেসবে তারা নেই। যাদবপুরের গোঁড়ালি ডোবা ড্রেনের জলে তাদের যাবতীয় বিপ্লব। বিস্তীর্ণ উত্তরবঙ্গ জুড়ে রেড ভলেন্টিয়ার, ক্যান্টিন করুননা প্রগতিশীল পদ্ধতিতে, নাকি খগেনের ক্যালানি দেখেই প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে গেছে ভক্ত বাম্বাচ্চাদের দল!

বাকি রইল খগেন মূর্মু ও শঙ্কর ঘোষ। তারা ক্যালান খেয়েছে এ নিয়ে দুঃখও যেমন নেই, উল্লাসও নেই। দূর্গা প্যারেডের সময়েই গতকাল এই স্ক্রিপ্ট লেখা হয়ে গিয়েছিলো। বন্যা নিয়ে, ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে, বিপর্যয় নিয়ে, ২৫ জনের উপরে মৃত্যু নিয়ে কোনো আলাপ আলোচনা সমালোচনা নেই। মিডিয়া জুড়ে শুধুই রক্তাক্ত খগেন।

কিন্তু প্রশ্ন তোলা যাবেনা, মালদার খগেন কেন? এলাকার বিধায়ক পুনা ভেঙরা বা সাংসদ মনোজ টিজ্ঞা কোথায়? এর জবাব আলিমুদ্দিন থেকে এসেছে- ওরা প্রাক্তন বাম, তাই মানুষের দুঃখ সইতে না পেরে দুর্গত এলাকাতে ছুটে গেছে। উফ, বামপন্থার গেরুয়া পরাকাষ্ঠা, বাজাও তালি। আচ্ছা- খগেনের সাথে থাকা CRPF জোয়ানেরা কী ‘বসে ক্যালাও’ অনুষ্ঠান দেখতে গিয়েছিলো? তারা কেন কেউ কিছু বলেনি? একটা ব্লাঙ্ক ফায়ারও তো করতে পারত! শঙ্কর ঘোষ হেঁটে যাচ্ছে এমন একটা ভিডিওতে- ১৫ থেকে ২৫ বছরে ছেলেপুলের দল ছেঁকে ধরে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে, এরা যখন এলাকা পরিদর্শনে গেছে, এদের দলের সমর্থকেরা কোথায়? অপদার্থ বামেদের সৌজন্যে রাজ্যে বিজেপির ভোট আছে, ভোটার নেই

কারা খগেনকে ক্যেলিয়েছে? স্বতস্ফুর্ত? উঁহু, অবশ্যই তোলামুলের মদতপুষ্ট লোকজন। বিরোধী তৃণমুলের এটাই তো চারিত্রিক বৈশিষ্ট, গোটা উত্তরবঙ্গে তোলামুল বিরোধীর আসনেই বসে আছে। তারা সর্বজ্ঞ বামেদের মত ৭২ ঘন্টার চিন্তনের পর একটা বিবৃতির চোদনামো করেনা, না গ্রীন ভলেন্টিয়ার নামায়। সোজা শাসককে ক্যালায়, যেমন বাম আমলে সিপিএম ক্যালাতো। তারা অসভ্য, তারা চোর, তারা দুষ্কৃতী, তারা ধর্ষক কিন্তু ওদের দিয়েই ওদের নেত্রী রাজনীতিটা করিয়ে নেয়। সুধীজন সেজে থাকার চুতিয়াগিরিটা করেনা।

যেকোনো অঞ্চলের লোকের সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ বর্ষণ হয় পঞ্চায়েত সদস্যের উপরে, কারণ তাকে সবসময় হাতের কাছে পাওয়া যায়। তাহলে উত্তরবঙ্গের ওই সব অঞ্চল, যেখানে তৃণমূলের পঞ্চায়েত রয়েছে সেখানে তৃণমূলের সদস্য বা প্রধানের বিরুদ্ধে লোকের ক্ষোভ নেই, এটাকে মানতে হবে? পাতি কার্ণিভালের খেমটা নাচ আর সেটাকে কেন্দ্র করে মদের আসরের বেলেল্লা নিয়ে পাবলিক ছি ছি করতেই চটজলদি এই সমাধান- আলোচনার নজর ঘুরিয়ে দাও, অতএব উত্তরবঙ্গে বিজেপির কোনো একটা আবাল মালকে কেলিয়ে দাও। ফলও হয়েছে হাতেনাতে, দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে টুইট করছে, পাব্লিক এখন ক্যালানের আলোচনা নিয়েই ব্যস্ত, গতকাল কার্ণিভালের বেলেল্লাপনা মার্কেট থেকে গায়েব

এটাই ফারাক, একদল আইপ্যাক নিয়ে ঘুঁটি সাজাচ্ছে, আরেক দল প্যাক-মানি নিয়ে ভলেন্টিয়ার ভলেন্টিয়ার খেলছে মার্ক্সের দিব্যি খেয়ে, অন্য দল ক্যালানি খাওয়াকে USP করে ভোটের বাজারে সহানুভুতি কেনার ফিকিরে জিকির করছে। দাঙ্গা লাগানোর অজুহাত খুঁজছে। এর ফাঁকে প্রত্যেকে ফটোশ্যুট করে সোস্যাল মিডিয়া গরম করতে ত্রুটি রাখছেনা, শুধু যার হারাচ্ছে সে সর্বহারা হচ্ছে

আজকাল কোনো দুর্ঘটনা মানেই সোস্যালমিডিয়া জুড়ে যেন একটা ইভেন্ট শুরু হয়ে যায়। কেউ পক্ষে হ্যাজ নামাচ্ছে, কেউ বিপক্ষে, কেউ কেউ সব দিকে তাল মেলাচ্ছে। যে যার মনগড়া কাহিনী বানিয়ে ভয় ধরাচ্ছে। বাস্তব গল্পটা অন্য, অবশ্যই দার্জিলিনিং শিলিগুড়ি রুটের রোহিনী রোড মিরিকের রাস্তাও ধ্বসের কবলে। তার মানে এই নয় যে পাহাড়ে পর্যটকেরা আটঁকে থাকবে বা রয়েছে। পাঙ্খাবাড়ির রাস্তা খোলা, তিনধারিয়ার রাস্তা খোলা. শিটং থেকে মংপু লোহাপুল, রাম্বি হয়ে রাস্তা খোলা, লাটপাঞ্চার হয়ে চম্পাসারি হয়ে শালুগাড়া পৌঁছানো সম্ভব। NH 10 খোলা, লাভা গরুবাথাং রোড খোলা। মূল সমস্যা সোস্যালমিডিয়াতে, মিথ্যা প্রচারে। যেখানে সমস্যা সেখানকার খবর নেই, ভুয়ো অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে মেতে আছে সকলে

এই আবহে কিছু ফুটেজখোরের দল উত্তরবঙ্গ অভিযানে চলেছে, অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় থেকেই তো উত্তরের পর্যটন মরসুম শুরু হয়। অতএব কারন যা খুশি হোক- যাওয়া নিয়ে ব্যাপার। কোলকাতা থেকে যারা যাচ্ছে, তারা কাকে সাহায্য করতে যাচ্ছে? নিজেদের ব্যাক্তিগত ইমেজ, নিজেদের রাজনৈতিক দলের ইমেজ রঙিন করতে? কেন্দ্র ও রাজ্য দুই প্রশাসনই ইতিমধ্যেই উপদ্রুত অঞ্চলে পৌঁছে গেছে ত্রাণ নিয়ে। PM Care কবে কাজে আসবে? যে ভুটানের জলে তোর্ষা নদীতে বন্যা, সেই ভুটানে ডিজেল ৬৪ টাকা। তারা ডিজেল ভারত থেকেই কেনে, তারাও ডিজেল বেচে লাভ করে। আর আমরা ৪০ টাকার ডিজেলে ৬০ টাকা কর দিই।

সেই বিপুল করের টাকায় সরকার ত্রাণ দিক, নাহলে এই উদ্বৃত্ত টাকা বিজয় মালিয়া, মেহুল চোক্সীর মত-রা নিয়ে পালাবে, কিম্বা আম্বানি আদানি লুটঠে করে নেবে। তাই 'সবাই মিলে' অর্থ আর খাদ্য সামগ্রী ঝাঁপিয়ে পরতে হবে কেন? সরকার আছে, FCI আছে, কর্পোরেট আছে- তারা দিকআমি কাল খেতে না পেলে আমাকে কে দেখবে! আমারও পাহাড়ে ব্যবসা, আমিও পর্যটন শিল্পের সাথে যুক্ত। আমারও ব্যবসা নেই হয়ে গেছে, আমাকে কে ত্রান দেবে? আমাকেও ৪০ জনের বেতন দিতে হয়, কে দেবে আমাকে ভর্তুকি? আমাকে কোন সরকার, কোন NGO, কোন সঙ্ঘ, কোন রেড ভলেন্টিয়ার, কোন জমিয়ত উলামা সহযোগিতা করে পুনঃর্বাসন দেবে?

 

মানুষ যে তিমিরে ছিলো সেখানেই রয়েছে দুই ফুলের চক্করে। অসহায়, আর্ত জনগণ- ভগবানের ভরষাতে থাকা ছাড়া আপাতত উপায় কী তাদের- বিশুদ্ধ ‘ওম্যান মেড’ হরপা বাণের চক্করে

 

শনিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৫

নাস্তিক পণ্ডিতের ভ্রমণ

(১)

ভ্রমণের নেশা সর্বনাশা, আর সেই সুত্রেই দেশে বিদেশের নানান ধর্মস্থানে যাবার সৌভাগ্য হয়েছে, সেটা মসজিদ, মাজার, গুরদুয়ারা, বৌদ্ধ স্তুপা ও মনেষ্ট্রি, দেরাসর বা বসডি, চার্চ, সিনাগগ, এমনকি শাক্ত, পার্শি, আদিবাসী, বাহাই, বৈষ্ণব মঠ, টাও, কনফুসিয়ানিজম, শিন্তো, রাস্টাফি, জেন, হোয়া, কাও এর মত ছোট ছোট জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় উপাসনালয় সহ আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনেক ছোট ছোট স্বতন্ত্র নৃ-গোষ্ঠীর থান তথা উপাসনালয়েও যাবার সৌভাগ্য হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশী গেছি হিন্দু মন্দিরে।

আজকের গল্পটা ধর্মস্থান গননার নয়, না কোনো ভক্তি বা আস্থার। এটা পাতি জীবনের রোজনামচা আর ভ্রমণের গল্প।

বহু হিন্দু পূন্যার্থীর স্বপ্ন থাকে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের সবকটা স্থান দর্শনের। আমি তথাকথিত ম্লেচ্ছ হয়েও ১০টা জ্যোতির্লিঙ্গ ঘুরে দেখেছি। কেদারনাথ, বৈদ্যনাথ, বিশ্বনাথ মন্দিরে তো বেশ কয়েকবার যাওয়া হয়েছে। এছাড়া অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীশৈলমে মল্লিকার্জুন, মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে মহাকালেশ্বর, মধ্যপ্রদেশের নর্মদা নদীর তীরে ওমকারেশ্বর, তামিলনাড়ুরামেশ্বরম, গুজরাটের সোমনাথে ১ বার করে গিয়েছিলাম। নাসিকের ত্রিম্বকেশ্বর আর ঔরঙ্গাবাদে গ্রীষ্ণেশ্বরে এই তো গত বছর ২০২৪ এর জুলাই মাসে- আমি আর সুব্রতদা মহারাষ্ট্র সফরে ঢুঁ মেরে এসেছি। বাকি রয়েছে কেবল পুণের ভীমাশঙ্কর, গুজরাটের দ্বারকানাগেশ্বর মন্দির। সেগুলোও কোনো দিন ঠিক পৌঁছে যাব ঘুড়তে ঘুড়তে।

আমি এমনিতেই নবদ্বীপের মানুষ, মঠ মন্দির আর কীর্তনের আবহাওয়াতেই বড় হয়ে উঠা। তার পরও গোটা ভারতজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েকশো মন্দির সহ দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ গুলোর অধিকাংশেই উপস্থিত হয়েছিলাম নানান উদ্ভুত পরিস্থিতিতে। একবার লৌক্ষৌ ভ্রমণ করছিলাম ২০১৮ সালে আমি ও সুব্রত মন্ডল দাদা, উভয়েই স্বপরিবারে। লৌক্ষৌ জুড়ে বিরিয়ানি, তন্দুরি, ফিরনি আর গালৌটি কাবাব ধ্বংসের সাথে সাথে, গোটা বেনারস জুড়ে ২টো দিন পেঁড়া, কচুরি, লাড্ডু আর স্বাত্তিক আহারের ফাঁকে বৌদির কল্যাণে এলাকার বহু ঘাট ও মন্দিরের দর্শন আমার হয়ে গিয়েছিলো।

এদিকে সুব্রতদা কঠোর নাস্তিক ও পন্ডিত মানুষ, শুধু ভাবনাতে নয়- ব্যাক্তিজীবনের আচার বিচারেও তাই। তবে ধর্মবিশ্বাসীদের সাথে তার কোনো বিরোধ নেই, কাউকে মানাও করেননা। সুতরাং, তিনি কোনোভাবেই ভক্তির কারনে মন্দির মসজিদ চার্চে ঢুকতে নারাজ, বাইচান্স ঢুকলেও স্থাপত্য দেখতে বা তার সাথে জুড়ে থাকা ইতিহাসকে ছুঁতে, প্রণাম বা নমস্কারের ধার ধারেন না। ওদিকে বৌদিকে একা ছাড়াও যায়না ওই ভিড়ে, অগত্যা আমিই দোসর। আমি আস্তিক মানুষ, মুর্তি পুজাতে বিশ্বাস না থাকলেও ভুত-ভগবান- দৈববাণীতে আস্থার ঘাটতি নেই, তাই বিসমিল্লাহ্‌ বলে সর্বত্র ঢুকে যেতে পারি সহজে। বড়জোর মালাউন মুনাফেক ডাকে খিস্তি খাবো, তাও ফেসবুকে, ব্যাস। তাতে কী আর আমার ভিতরের ইসলাম বিশ্বাস বদলে যাবে! যাই হোক-

একটা মজার ঘটনা ঘটে লৌক্ষৌ থেকে বেনারস ফেরার পথে। কোলকাতা থেকে নিজেরা SUV গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম, যাতে যেখানে খুশি দাঁড়াতে পারি, আর সময়ের যেন কোনো বাঁধন না থাকে। সুব্রতদা মির্জাপুর যাবে বলে শুরু থেকেই পণ করে বসে ছিলেন। এই মির্জাপুর শুধু ‘কাট্টা’ বন্দুক আর ওয়েব সিরিজের জন্য বিখ্যাত নয়, আমাদের সমগ্র দেশের যে ধ্রুবক সময় +5.30 GMT, সেটাও এই মির্জাপুরেরই। আদত ৮২°৩০' পূর্ব দ্রাঘিমাংশ এই মির্জাপুরের উপর দিয়েই গেছে। আমাদের মির্জাপুর যাত্রায় খুব স্বাভাবিকভাবেই মেয়েদের কোনো আগ্রহ ছিলোনা, সুতরাং সেই সুযোগে রত্না বৌদির ভক্তি জেগে উঠল প্রয়াগের ত্রিবেণী সঙ্গমে পুজো দেওয়ার।

যাবার সময় আমরা বিহারের সাসারামে শেরশাহ সুরির সমাধি দেখার প্ল্যান করেছিলাম। দিনের বেলায় যাবার সময় এই অঞ্চলে দেখেছিলাম বিপুল সংখ্যায় রাইস মিল তৈরি হচ্ছিলো প্রায় সার বেঁধে, পশ্চিমবাংলার চাল শিল্পের অস্তাচলে যাওয়ার উপন্যাস সেই আমলেই লেখা হয়েছিলো। সেদিন বিজয়া দশমী, মোড়ে মোড়ে রামলীলার মেলা চলছে, সর্বত্র জনস্রোত। তাছাড়া রাস্তা জুড়ে বিশাল বিশাল শোভাযাত্রা চলছে প্রতিমা নিয়ে, তাসা ঢাক ঢোল কাঁসি সহযোগে ডিজে বক্সে উৎকট ভোজপুরী গান আর গেরুয়া আবীরের ভিড়ে গাড়ি এগোনোই দায়। স্থানীয় মানুষের দশেরা পালনের রীতিনীতি দেখতে দেখতে, তাদের আলুর বোন্দা, চাটনি, আচার আর গজা জাতীয় মিষ্টি খেতে খেতে- দীর্ঘ সময় রাস্তার যানজটে আঁটকে তখন মাঝরাত ছুইঁছুঁই।

রাস্তার ধারে কোনো দিক নির্দেশনার বোর্ড নেই, গুগুল ম্যাপে নির্দেশিত রাস্তায় সারারাত শোভাযাত্রার মিছিল চলবে। সেই বিচিত্র পরিস্থিতিতে এক পুলিশ গাড়ি দেখতে পেয়ে তাদেরকে রাস্তা শুধাতে, অদ্ভুতভাবে তারা উৎসবের আনন্দ নিতে বললো। বারকয়েক শুধাতে তারা রাস্তার বাতলানোর বদলে যথারীতি দশেরার বখশিস চেয়ে বসলো। সুব্রতদা ট্যাঁরে গিয়ে সেটাকে পাত্তা না দেওয়াতে এক কনস্টেবল তাচ্ছিল্যের একটা রাস্তা দেখিয়ে দেওয়াতে বিপদের মূল সূত্রপাত। ভোরবেলা যখন ক্লান্ত বিধ্বস্ত শরীরে একটা হোটেলে গিয়ে পৌঁছালাম, তারা সব দেখে ও শুনে একই সাথে আতঙ্কিত ও হতবাক হয়ে গেলো।

আমরা যে অঞ্চলটাতে আঁটকা পড়ে সারারাত গোলগোল ঘুরে মরেছি, সেটা নাকি স্থানীয় বাহুবলী কুখ্যাত রাজা ভাইয়ার অঞ্চল। বিপদের গভীরতা অনুমান না করতে পারার দরুন আমরা ততটা ভয় না পেলেও, রিসেপশনের মেয়েটির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। চেক-ইন ফর্মালিটি পূরণ করতে করতে বললো- বাল বাল বাঁচ গ্যায়া আপলোগ। গাড়িতে ৩টে বাচ্চা, ৩ জন মহিলা, দুজন আনফিট ‘হাই ট্রাইগ্লিসারাইড’ পুরুষ- পুলিশের ভুলের মাশুল শুধুমাত্র সারারাত গোলকধাঁধার উপর দিয়েই সে যাত্রায় ফাঁড়া কেটেছিলো বরাতজোরে।

অজানা রাস্তা দিয়ে আনাড়ির মত গাড়ি চালিয়ে গাজিপুর, আজমগড়, সুলতানপুর রুটে লৌক্ষৌ পৌঁছেছিলাম, তাই ফেরার পথে বৌদির প্রয়াগ দর্শন পূর্ণ করতে এলাহাবাদ না যাওয়ার কোনো কারন ছিলনা। আমরা মুঘলসরাইতেও গিয়েছিলাম ‘দীনদয়াল পরোটা’ পাওয়া যায় কিনা খুঁজতে, সেই দিনই স্টেশনের বাইরের বোর্ডে ‘দীনদয়াল’ নাম লেখা হচ্ছিলো, কাকতালীয় ভাবে সেই কুৎসিত ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলাম। শেষ অবধি শেরশাহ সুরির সমাধি দর্শনও আর সে যাত্রায় হয়ে উঠেনি।


(২)

যাই হোক, লৌক্ষৌ থেকে ফেরার পথে শেষ বিকালের দিকে আমরা এলাহাবাদে গঙ্গা যমুনার সঙ্গমে গিয়ে পৌঁছালাম, সুব্রতদা যথারীতি গাড়িতেই বসে ঘুমাবার তাল ফেঁদে রেখেছে। ওদিকে এ যাত্রায় বৌদিরও এক গোঁ, দাদাকে যেতেই হবে নতুবা বেণীদান সম্পাদন করা যাবেনা। ওনাদের এই ক্যাঁচালের ফাঁকে আমি ঘাটে গিয়ে একটা নৌকার সাথে দড়দাম করে প্রাথমিকভাবে বিষয়টা কিছুটা এগিয়ে রাখলাম। এখানে নৌকার মাঝি ও পুরুত ঠাকুরের কম্বো প্যাকেজ, সাথে যাবতীয় পুজো ও তর্পনের রেডিমেড আয়োজনের কোনো ত্রুটি নেই নৌকাতে। অবশেষে সুব্রতদাকে আসতে দেখলাম, গাই দোয়ানোর সময় এঁড়ে বাছুর গুলোকে যেমন টেনে হিঁচড়ে দূরের খুঁটিতে নিয়ে বাঁধা হয়, ওনাকে তেমনই জবরদস্তি করে পাড়ে এনে হাজির করানো হলো।

এসে আরেক ক্যাঁচাল, মাঝিকে সটান তার বলা রেটের অর্ধেক বলে মাঝির সাথে জানপ্রাণ লাগিয়ে দর কষাকষি করতে লেগে গেলো। বিষয়টা বৌদি তৎক্ষণাৎ ধরতে না পারলেও, আমি প্রমাদ গুনলাম- নির্ঘাৎ এটা সময় নষ্টের ফন্দি, কোনো মতে সন্ধ্যা হয়ে গেলেই কেল্লাফতে, আর যেতে হবেনা। কিন্তু উনি শেয়ানা হলেও ছোকরা পুরুত ঠাকুরটি সেয়ানার বাপ, তারা রোজ এমন ভক্তের দল দেখছে, সে বেশী কথা না বাড়িয়ে দুপক্ষের মাঝে মধ্যস্থতা করিয়ে প্রায় দাদার রেটেই রাজি হয়ে গেলো। নৌকায় চড়া ইস্তক সুব্রতদা পুরুত ঠাকুরের দিকে না তাকিয়ে মাঝির দিকে ফিরে বসে দূরে আলোআঁধারির বালুচর দেখছিলো, গোল বাঁধল সঙ্গমে পৌঁছে।

পুরুত ঠাকুরের নিদান, আচারের সাথে মন্ত্রোচ্চারণও করতে হবে, সুব্রতদার মেদিনীপুরিয়ান গোঁ- তিনি কিছুই করবেনা। অনেক বোঝালাম, মহামতি মার্ক্স বা কমরেড লেনিনের আত্মার জন্য অন্তত তর্পন করুন। ভারতে এসে কী এতো দিনে ওনাদের আত্মাও কী সনাতনী হয়ে যাননি! ওনাদেরকে আপনার পিতৃপুরুষ ভেবে নিয়েই নাহয় তাঁদের আত্মার উদ্দেশ্যে পিন্ডদান করুন। শুধু মন্ত্রের শুরুতে কমরেড আর শেষে ইনকিলাব জিন্দাবাদ জুড়ে নিলেই বিষয়টা ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ দোষ মুক্ত হয়ে যাবে। নাহ, সমস্ত জোরাজুরি ভেস্তে যাওয়ার সাথে সাথে দিনের আলোও ক্রমশ ফুরিয়ে যাবার পথে, অগত্যা আমিই বৌদি সাথে সাথে মন্ত্রোচ্চারণের ভার কাঁধে তুলে নিলাম। নবদ্বীপের মাটির সন্তান আমি, ক্লাস সিক্স থেকে মাধ্যমিক অবধি সংস্কৃত পড়েছি ইস্কুলে, ও ভাষা জিভে আঁটকায়না, তাই মনে মনে সুভানাল্লা বলে শুরু করে দিলাম- যা আছে কপালে।

কালো তিল, যব, কুশ ঘাস, গঙ্গা জল এবং সাদা ফুল সহ তর্পণ মন্ত্র উচ্চারণ করে পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি ও তৃপ্তি কামনা করে সেই জলই নদীতে অর্পণ- এই ছিলো মূল বিষয়টা। পূর্বপুরুষদের আত্মার উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান, পিতৃদোষ মুক্তি আশীর্বাদ চাওয়া, ও শুদ্ধাচারে আত্মাকে পবিত্র করে নিজের আধ্যাত্মিক উন্নতি করা। এই প্রক্রিয়া গুলো আমি এই দফায় শিখেছিলাম। পুরুত বেটা শুরুতে কম টাকায় রাজি হয়ে গেলেও, প্রতিবার নতুন আচারের মন্ত্র পড়ার সময় ফুল, বেলপাতা, নারকেল সব আলাদা আলাদা করে ১০ গুণ দামে বিক্রি করছিলো, বৌদি তখন ভক্তিতে চূড়, তিনি বিনা বাক্যব্যায়ে হ্যাঁ এ হ্যাঁ মিলিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি এই সব তর্পনের সিস্টেম জানিনা, তাই এ যাত্রায় চুপ চেয়ে থাকা ছাড়া বিশেষ কিছু করার ছিলোনা। এর পর ব্রাহ্মণ ভোজন করানোর জন্য- ‘আপকো যো আচ্ছা লাগতা হ্যায় দিজিয়ে’ বলে যতক্ষণে তর্পনের অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করলেন, ততক্ষণে নৌকাতে একটা ব্যাটারির LED বাল্ব টিমটিম করে জ্বলে উঠেছে।  

এবারে শুরু হলো মূল খেলা। পুরুত ঠাকুর যত বলে এটাই তিনটে নদীর সঙ্গম স্থান, সুব্রতদার সেই গোঁ- খাঁটি বাংলাচ্চোরণের কিম্ভূত হিন্দিতে বলতে শুরু করলেন- গঙ্গা যমুনা তো দেখতা পায়া, সরস্বতী কিধোর গয়া? তুম ছাগল বলির মন্ত্র পড়া হ্যায়, সব জিনিসে বেশী বেশী দাম ধরা হ্যাঁয়, তুমারা নারকেল অনেক পুরানো, ঝুনো হ্যায়। ফুল বেলপাতা সব বাসি হ্যায়, সব নদী থেকে তুলে ডাবল ট্রিপিল বার ব্যবহার করতা হ্যায়- ইত্যাদি, লেগে সেই তর্ক। এরপর পুরুত ঠাকুরের এক্সট্রা যোগ করা অতিরিক্ত বাজেটের প্রায় ৮০% কেটে পেমেন্ট করে যতক্ষণে নৌকা থেকে নামলাম তৎক্ষণে রাত্রি নেমে গেছে প্রয়াগের তীরে।

ব্রাহ্মণ ভোজনের দরুণ- আপকা মর্জি সেগমেন্টে, সুব্রতদা ৫১ টাকা দিয়ে পুরুত ঠাকুরকেই অনেক আশির্বাদ দান করলেন- চলো আশির্বাদ কর দিয়া, ও ভি বিনা পয়সা মে। ফেরার পথে আধাঁরে চেয়ে দেখলাম, বেচারা পুরুত বিহ্বল হতবুদ্ধি হয়ে চেয়ে রয়েছে, জীবনে প্রথমবার হয়ত নিজেকে এমন মুরগি হতে দেখেলো।

 

বুধবার, ১ অক্টোবর, ২০২৫

খুঁজে চলেছি একটা ভাঙ্গা হৃদয়


আমি প্রতিবার ভেঙ্গে যাওয়া একটা হৃদয় খুঁজেছি। যতবার পেয়েছি ততবার নুঁড়ি পাথরের মতো বহু যত্নে আদরে ভালোবাসায় ধূলি মাখা ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়টাকে কুড়িয়ে এনে আমার হৃদয়ের ঝুড়িতে জায়গা দিয়েছি। আমি জানি ভেঙ্গে যাওয়া একটা হৃদয়ের বিধ্বস্ততা কতটুকু, কতটুকু অপূর্ণতায় ঘিরে থাকে সকল কিছু। কিভাবে নিঃশব্দে বুকের পাজরগুলো ভেঙ্গে পড়ে অদৃশ্য মায়া জালে আটকে থেকে কিভাবে রাতের আঁধারে চোখের অশ্রু ঝরায়। কিভাবে সমস্ত বিষক্রিয়া হৃদয়ে ধারণ করে হাসি মুখে নিজের অভিনয়টা চালিয়ে যায় প্রতিনিয়ত

প্রতিদিনের ভিজে থাকা কান্না মাখা জীবন পাতার ডায়েরিটা স্নেহ মমতা ভালোবাসা দিয়ে একটু একটু করে জুড়েছি রোজ। ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়টা প্রতিনিয়ত শুকিয়ে দিয়েছি পরম ঘেন্নায় কিন্ত যত্নের সাথে। ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে থাকা জীবন আরশির গল্পটা নিয়ে কখনো কবিতা কখনো গান অথবা আস্ত একটি উপন্যাস রচনা করেছি। পরিপূর্ণ ভাবে একটা জীবন্ত জীবন সাজিয়ে দেব তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি নিজেকে। সম্পূর্ণ একটি গল্প রচনা হবার পর একে একে সবাই আমাকে ছেড়ে গিয়েছিল, তাই আজও সম্পর্কের হিসেব মিলাতে গিয়ে যগে ভুল করি প্রতি লাইনে।

জীবনের প্রতি একটা অলস নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে বন্ধুর মতো পাশে থাকার অঙ্গীকার অনেকেই করেছে, বিনিময়ে কেউ কথা রাখতে পারেনি। আমার নমনীয়তায় এতোটাই মুগ্ধ হয়েছে যে বন্ধুত্বের পোশাকে থেকে ভালোবাসার নতুন রূপে আঁকড়ে থাকতে চেয়েছে। কিন্তু সময়ের স্রোতের বাঁকে সম্মান আর বিশ্বাস ধরে রাখতে যতটুকু ত্যাগ প্রয়োজন তা না করে নীরবে হারিয়ে গেছে তারা

আমরা সবাই সফররত অবস্থায় রয়েছি, প্রত্যেকের গন্তব্য আলাদা কিন্তু জীবনের চলচিত্রে কার কারো উপস্থিতি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ, নিজের অস্তিত্বের মতই সমান্তরালেএটাই আসল জীবন যাত্রা শৈশব থেকে শুরু করে বয়স্ক লজ্জ্বরে বৃদ্ধদশা অবধি ক্রমাগত বিচ্ছেদকে গুণে যাওয়া ও তাদেরকে ভুলে যাওয়া সহ্য করাই এই যাত্রার মূল প্রতিপাদ্য, যাকে কোনোভাবে উপেক্ষা করার উপায় নেই।

আমি দেখেছি মুখে মিথ্যে হাসি নিয়ে ভালো থাকার অভিনয় করা মানুষের মিছিল, অজস্র সহস্র মানুষ এই শহরে মুখোশের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে। মুখোশ খুলে গেলে এক নিমিষেই হারিয়ে যেতে পারে, হারিয়ে যাবে তাকে ঘিরে গড়ে উঠা শত সহস্র স্বপ্ন, মিথ্যে আশার বহর। নিরাশার বালিচরে অযত্নে গড়াগড়ি খাওয়া কত মৃত স্বপ্নেরা স্থির চোখে ঝিকমিক করা তারার আলোর দিকে চেয়ে থাকে, যে তারাটা কত শত আলোকবর্ষ দূরে মৃত হয়ে হারিয়ে গেছে কোনো কৃষ্ণগহ্বরে। বিশ্রী অন্ধকার কুপে মিথ্যাই কেবল শান্তি, একটু বেঁচে থাকার সুখ পেতে। চলমান নাটকের ভিড়ে হারিয়ে লুকাবো নাকি লুকিয়ে হারাবো– সারাক্ষণ এরই দ্বন্দ্ব।

অতীত নিয়ে গর্ব নেই, অনুশোচনা আছে, প্রগাঢ় রয়েছে। তারপরেও আমি নিজেকে দেখি, আমি কীভাবে এগিয়ে যাচ্ছি কঠোর পরিশ্রমে কাকে পেতে কে জানে! কোনও যাত্রাই দর্পহীন হয়না, প্রতিটিথেই স্পর্ধার বাঁধা অতিক্রম করতে হয় কখনও বুঝে করি, অধিকাংশ সময় করে বুঝি। হাল ছেড়ে দেওয়ার প্রাক মুহুর্তে আবার অভ্যাসে ফিরে আসি অধ্যবসায়ের গুণে।

কেউ বা দুটো হাত এক করে সারজীবন পাশাপাশি থেকে আগামীর পথ চলার অঙ্গীকার করতে চেয়েছে। আবার কেউ নষ্টামি করতে না পারায়- মিথ্যে অপবাদ দিয়ে দূরে সরে গিয়েছেঅথচ আমি ভালোবাসাময় একটা পরিপূর্ণ পৃথিবী সাজাতে চেয়েছিলাম। যেখানে হৃদয় ভাঙ্গার আর্ত চিৎকার থাকবেনা, থাকবেনা আকাশে বাতাসে অভিশাপের দীর্ঘশ্বাস। থাকবে না কোন একাকিত্ব আর নিঃসঙ্গতা, শুধুই পূর্ণতায় ঘিরে হৃদয়ের মেলা বসবে

কিন্তু তা হয়নি, সবাই শুধু স্বার্থের টানে ভালোবেসে কাছে পেতে চেয়েছে নিজেদের মতো করেআসলে কারো হৃদয়ের টান ছিলো না, তারা শুধু অভিনয় করে গেছে ভাঙ্গা-গড়ার মিথ্যা খেলায়কেউ কখনো জানতে চায়নি- আমি কেমন আছি! আমি কী চায়! আমার হৃদয়ের কোনো পাড় ভেঙ্গে পরেছে, কোন পাড় কষ্টের আঘাতে জীর্ণ? কেউ জানতে চাইনি আমি কখনো রাতের আঁধারে হারিয়ে যায় কিনা একাকিত্বের নীরব কোনো অভিশাপে! কেউ আমার প্রাণের, আমার শ্বাসের খোঁজ রাখেনি যা নিঃশব্দে ধুঁকে চলেছে

এটা অনিবার্য সত্য আমি সারাজীবন ধরে কেবল খারাপ সিদ্ধান্ত নিয়েছিনিশ্চিত তাতে অনেকের ক্ষতিও করে থাকতে পারি, প্রতিটি সিদ্ধান্তই এমন একটি বোবা প্রান্তে গিয়ে শেষ হয়েছিল, যেখান থেকে আর ফেরা যায়না, শুধু আমরা শিখতে পারি। প্রতিটি সিদ্ধান্তই অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে আপেক্ষিক, যদি ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতাম- আমি কী ভিন্ন ব্যক্তি হয়ে যেতাম? আজ আমি যা কিছু সমস্তটাই সেই অতীতের সিদ্ধান্তের জন্য, এর জন্য গর্বিত হতে বাঁধা থাকলেও লজ্জিত হবার উপায় নেই। ওগুলোই মাকে আজকের ব্যক্তিতে পরিণত করেছে।

তবুও আমি সর্বময় খুঁজেছি একটা ভাঙ্গা হৃদয়, যে আমারি মতো করে আমাকে নিজে বাঁচবে শুধু আমাকে একটু একটু করে আবিষ্কারর করবে আমার চোখের ভাষায়,  আমার ভালবাসা মেপে নেবে রাগের উষ্ণতাতে, নিজেকে বেঁধে নেবে আমার শাসনের ব্যাঞ্জনায়। না পাওয়ার অতৃপ্তি গুলোকে ঢেকে দেবে সোহাগে আবদারে, হাসি মুখে মিটিয়ে দিবে আমার সকল অপূর্তাগুলো। দুটো প্রাণের একটা সংসার হবে, নিভৃতে- শত কোলাহল, শত অভিযোগ, শত দূরত্বের ব্যবধানে থেকেও জুড়ে থাকবে সর্বক্ষণ আলাদা অস্তিত্ব নিয়ে সপ্রতিভ ভাবে।

নিশ্চিত প্রতিটি চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, প্রতিবার নিজেকে উন্নত করেছি। চুপচাপ বসে অঙ্ক মেলাতে থাকি, দূরে মানুষগুলো আমাকে ঠকায়নি, বাইরের কেউ প্রতারিত করেনি। তারপরেও আমি আপন খুঁজে ফিরছি ইতিবাচক গর্বের সাথে। কারো চোখে এটা আবার ভুল, কারো ভাবনাতে বিতর্কিত- কিন্তু কোটোটাই কী যুক্তিসঙ্গত? আমার যে যাত্রা, সেখানে নানা জনের নানান ভূমিকা, কিন্তু আমার ডুবে ডুবে ভেসে চলা নোৌকার হাল কী ধরবে সেই সমালোচকেরা, সকলের ভূমিকাই যে নির্দিষ্ট।

আজকাল কষ্টের পরিভাষা বদলে গেছে, দৈন্য দুর্দশা কিম্বা অসচ্ছলতা মুখোমুখি হলে গর্বিত হই- এগুলো ততটাও সংগ্রামময় নয় যতটা বিচ্ছেদের পাঁজর ভাঙা যন্ত্রণা। জীবনের কঠিন সময়গুলোর সীমারেখাও ক্রমশ সীমানা বদলে ফেলেছে, আজকাল আর পরাজিত হতে ভয় পায়না, না মরে আজ বেঁচে থাকাটাই আসল চ্যালেঞ্জ

 

তাই আমি-

প্রতিনিয়ত খুঁজে চলেছি একটা ভাঙ্গা হৃদয়।

যে শুধু আমার হবে আমার মতো করে ।

২০২৬ এ সিপিএম অষ্টম বামফ্রন্ট সরকার গড়বে

 



“২০২৬ এ সিপিএম অষ্টম বামফ্রন্ট সরকার গড়বে- দেখা মাত্র শেয়ার করুন

ই মেসেজটি ১১ জনকে শেয়ার করুন আগামি ৭২ ঘন্টার মধ্যেই একটা সুসংবাদ পাবেন, ২৯ বছর ধরে ফ্রন্টের চেয়ারম্যান থাকা কমরেড বোসের গ্যারান্টি।

মেদনীপুরের জনৈক সৌরভ নন্দী নামের একজন শিক্ষক, এটা মিথ্যাপ্রচার মনে করেছিল, গতকাল সন্ধ্যায় হঠাৎ শিরদাঁড়ার নিচে ব্যাথা অনুভব হওয়াতে, তার পরিবারের লোকজন ডাঃ নির্মল মাজির কাছে গেলে ডাক্তারবাবু বলেন - সৌরভের লেজ গজিয়েছেগোবরডাঙার জনৈক চক্রবর্তী বাবু এক মহিলার দেওয়া প্যান্ডেলের ছবিতে কমেন্ট করতে গিয়ে- বুর্জ খলিফার স্থানে ‘মিয়া খলিফার মত লাগছে’ লিখে ফেলায়, গত ২ দিনে ৩ বার খাপ বসেছে।

আরেক জন হুগলি জেলার নয়ন কাকু বলে এক ব্যাক্তিও এটা মিথ্যা মনে করেছিল। স্যান্ডি সাহা ওনাকে ক্রমাগত প্রেমের প্রস্তাব পাঠাচ্ছেউনি বর্তমানে করণ জোহরের ঠিকানা খুঁজছেন প্রতিকারের আশাতে। উত্তরপাড়া নিবাসী ইন্দ্রনীল মন্ডল নামের এক কায়স্ত পুরুষ বিষয়টা নিয়ে স্ত্রীর সাথে ঠাট্টা করেছিলো রাত্রে। পরদিন শ্বশুরবাড়ির যাত্রা কালে লোকল ট্রেনে চড়তেই তার এমন জোরে প্রকৃতির ডাক আসে যে, পান্ডুয়া গামী ট্রেন তালান্ডুতে থামার আগেই প্রায় চলন্ত ট্রেন থেকে হুমড়ি খেয়ে নেমে, দৌড়ে ‘বড় বাইরে’ করে মানে বেঁচেছে।

মুর্শিদাবাদের মোমিন নামের এক দুধেল গাই, হো হো করে হেসে ধুপের ধোয়ার সাথে বিষয়টিকে উড়িয়ে দিয়েছিলো। সকালে ঘুম থেকে উঠা ইস্তক হেঁচকির সাথে শুধু ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি বের হচ্ছে, ডাক্তারে বলেছে সেলাইনের পাইপ দিয়ে শরীরে গো-চোনা না পাঠালে কোনো আশা নেই। ক্যানিং এর এক অন্ধ দিদিভক্ত আব্দুল এটাকে নিয়ে ফেসবুকে মিম ছেড়েছিলো, সে নাকি কুমির হয়ে নদীতে ভেসে বেড়াচ্ছে, কয়েকটা ইউটিউবার সাংবাদিক ও ট্রাভেল ব্লগারের ক্যামেরাতে সেই অলীক দৃশ্য ধরাও পরেছে। যদিও নিন্দুকে তাকে টাকার কুমির বলত পিঠপিছে।   

ঠাকুরপুকুরের নাস্তিক সরকারি চাকুরে সুব্রত মণ্ডল নামের এক অবিশ্বাসীর জীবনের ঘটনা আরো বড় করুণ, তিনিও অবিশ্বাস করেছিলেন, ব্যাস- প্রাক্তন কলেজ লাইফের প্রেমিকা, তার একগন্ডা আন্ডাবাচ্চা সহ সেই পুরাতন প্রেমিক সুব্রত বাবুর বাড়ির নিচতলায় এসে ধর্ণা জুড়েছে- প্রেম আমার ফিরিয়ে দাও প্ল্যাকার্ড সহ

শামিম নামের এক কবি, সুবোধ কবির মত দারুন কবিতা লিখত। আজ সেই কবিতাই শাপগ্রস্থ হয়ে, রঞ্জন বাঁড়ুজ্জের মত রানুর প্রেমের রক্ত ও ভানুশীর্ষক- সেমি পানু চটি-লেখা লিখেই ক্ষান্ত হয়নি, ফেসবুকে পোষ্ট করে ফেলেছে। বলাই বাহুল্য, সে ও চুরান্ত অবিশ্বাসীর দলেই ছিল

বিখ্যাত কমিউনিস্ট ষাঠোর্ধ হালদার মশাই, এর বিপক্ষে প্রচার করার দরুন- কেশবভবন থেকে তার ডাক পেয়েছে দেশপ্রেমিক কোঠায়, এছাড়া বাজারে গুঞ্জন- রাজন্যা নামে তার একটি নাতনি জন্মেছে। দিকে বর্ধমান জেলার বর্ধিষ্ণু স্বাস্থের অধিকারী তন্ময় হক নামের এক অত্যন্ত আস্তিক ও স্বাত্বিক মানুষ, ভীষন নিষ্ঠা ভরে ১১ জনকে শেয়ার করতেই, শবনম তালুকদার নাম্নী এক অতি কৃপণ মহিলা- হক বাবুকে বাড়িতে বিরিয়ানির নিমন্ত্রণ দিয়েছে। আরেক বর্ধমান নিবাসি জমিদার- ‘তা’ বাবুও তাচ্ছিল্যের সাথে এটাকে অবিশ্বাস করেছিলো, পরদিন সকালে তাকে খুঁজে না পাওয়া গেলে, তার স্ত্রী নিকটবর্তী পুলিশ স্টেশনে নিখোঁজের বিজ্ঞপ্তি দায়ের করেন। শেষে মায়াপুরের এক মঠে তিলক কাটা বৈষ্ণব রূপে একটা গোশালায়- একটা নৃত্যরত গরুর পিঠে হাত বুলিয়ে উচ্চরক্তচাপের নিরাময় করতে দেখা গেছে তা-কে।

মারাঠা প্রদেশ নিবাসী এক ব্রাহ্মণ সন্তান প্রদীপ তুলশীতলা, বিষয়টিকে তাচ্ছিল্য করাতে সদ্য খেয়ে উঠা বিরিয়ানি দুদু বার বমি করে ফেলে, গত রাত্রের এক বিয়ে বাড়িতে খাওয়া খাসির চর্বিও উঠিয়ে ফেলাতে বিষয়টা লোকসানের খাতে চলে যায়। তৎক্ষনাৎ সদবুদ্ধির উদয় হওয়াতে, মেসেজ করব বলে শুধু মনস্থির করেছিল। দুঘন্টার মধ্যে চারটে বিয়েবাড়ির নিমন্ত্রণ এসেছে, যেখানে বুফে সিস্টেমে খাওয়া দাওয়া হবে

 

তাই দয়া করে কেউ ম্যাসেজ সেন্ড না করে, আমেন/জয় বাংলা না লিখে এড়িয়ে যাবেন না!

 

প্রচারেঃ ‘ভক্ত’ ছাপ বাম্বাচ্চার দল।

সহযোগিতাতেঃ আমার মত বঞ্চিত বাঞ্চোতের দল

 

 



ইরান যুদ্ধঃ একটা অশ্লীল পোষ্ট

 Disclaimer: অত্যন্ত অশ্লীল ভাষায় কথাবার্তা লেখা আছে এখানে, প্লিজ কেউ পড়বেন না।  মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে যারা ঘৃণা করেন, তারা কিন্তু এটা পড়ল...