শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২৬

অশান্ত ইরাণঃ অর্থনীতির কানাগলি


 অর্থনীতির কানাগলিতে অবরুদ্ধ ইরাণ ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন কালেকশন এজেন্ট ইসরাইল”

                                                 (1)

প্রতি আক্রমণ করা ছাড়া ইরাণের আর কোনো পথ খোলা রয়েছে কি? আর সেই আক্রমণ বোমা বারুদের যুদ্ধ হলে, সেটা পরমাণু যুদ্ধের দিকে গড়াবে না, সেই নিশ্চয়তা দেওয়ারও কেউ নেই। যে যতই ধর্মের জিগির তুলুক, গণতন্ত্র বা মোল্লাতন্ত্রের চশমাতে দেখার চেষ্টা করুক- অর্থনৈতিক বিপর্যয়ই মূল সমস্যা, সেখান থেকেই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক-সামাজিক সংকট জন্ম নিয়েছে। তথ্যগত ভিত্তি অনুযায়ী চুম্বকে এটাই দৃশ্যমান কারণ।

মাৎস্যন্যায় শুরু হলে ঐতিহ্য পথের ধুলোয় গড়াগড়ি খায়। হাজার বছরের পারস্য ঐতিহ্যের ইতিহাস এখন হাজার হাজার মানুষের লাশের স্তুপ এর নিচে চাপা পড়ে যাবার প্রস্তুতি নিয়েছে। ধর্ম, রাজরোষ আর বিপ্লব- এই তিনটে শব্দবন্ধে পুরো সমস্যাকে খাটো করে দেওয়ার উপায় নেই। পশ্চিমা বিশ্বের মোড়লদের অবরোধ না থাকলে অর্থনীতি এতটা ভাঙত না, ফলে মানুষের বেতন আটকে যেত না ও বিক্ষোভের মাত্রা এইরকম হতো না। অবরোধের প্রভাব সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্র ও প্রশাসন, সামরিক খাতে অগ্রাধিকার বজায় রেখেও স্বচ্ছতার সাথে দুর্নীতি মুক্ত ও দক্ষ হাতে সামাজিক সুরক্ষার ন্যূনতম দিকগুলি উপেক্ষা না করে পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছে সেদিকে আলোকপাত করা প্রয়োজন।

ইরাণের উপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে তেল রপ্তানি সীমিত হয়ে গিয়েছিলো আগেই, ফলত রাষ্ট্রীয় আয় কমে যায়। পাশাপাশি ইরাণ পশ্চিমা বানিজ্য ব্যবস্থা SWIFT থেকে বিচ্ছিন্ন, তাই বিদেশী লেনদেন রুদ্ধ, আমদানি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগও বন্ধ, ফল স্বরূপ ইরাণী মুদ্রা রিয়াল ভয়াবহভাবে পড়তে শুরু করেছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ভয়াবহ হয়ে ওঠাটাও এটারই ফলাফল। আমরা ইরাণ সংক্রান্ত যে খবরগুলো শুনি বা দেখি সেগুলো সবই পশ্চিমা মিডিয়ার তৈরি খোরাক, তারা যেভাবে উপস্থাপনা করে আমরা সেই চশমাতেই দেখি। আমাদের মধ্যে যাবতীয় ধারণা তৈরি হয় পশ্চিমাদের তৈরি করা বাইনারিতে, তাই আসল সত্য জানতে গেলে পশ্চিমা মিডিয়ার বাইরে ও তাদের করায়ত্বের বাইরে থাকা সংবাদ খুঁজে নিতে হয় কষ্ট করে।

একে তো ইরাণের এই অবরুদ্ধি, তার ওপর যুদ্ধ মানেই ঝুঁকি। আর যে সে দেশের সাথে যুদ্ধ নয়, একেবারে ইজরাইলের সাথে- মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার নিজস্ব কালেকশনে এজেন্ট কিম্বা বলা ভালো ঘুর পথে আমেরিকার সাথেই যুদ্ধ। নতুন শিল্প বিনিয়োগ আগেই ছিল না, এরপর যুদ্ধের বাইপ্রোডাক্ট হিসাবে নতুন অবকাঠামো শিল্প কারখানা সম্প্রসারণ বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষ করে অটোমোবাইল, পেট্রোকেমিক্যাল ও কনজিউমার গুডস শিল্পে কর্মসংস্থান একেবারে তলানিতে চলে গেছে। পাশাপাশি CIA ও তাদের মধ্যপ্রাচ্যের জারজ শাখা মোসাদের লাগাতার ষড়যন্ত্র, উস্কানি এবং তাদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে ইরাণকে অশান্ত করে রাখাতে কোনো খামতি রাখেনি। কারণ, শক্তিশালী ইরাণ দখলদার ইজরায়েলের অস্তিত্বের জন্য সবসময়ের জন্য ঝুঁকি।

ইহুদি নিয়ন্ত্রিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যুদ্ধের ঝুঁকি ও প্রোপ্যাগান্ডা যত বেড়েছে, ততই ইরাণের মানুষ সম্পদ/সোনা কিনে রিয়াল বাজারে ছেড়ে দিয়েছে, স্বভাবতই শেয়ার মার্কেট থেকে আম জনতার ঘর অবধি আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এভাবেই ইরাণী রিয়াল প্রত্যেকদিন দুর্বল হয়েছে আর যেসব দ্রব্য আমদানি পণ্য করতে হয় যেমন- খাবার ওষুধ কিংবা বিভিন্ন রকম স্পেয়ার পার্টস ইত্যাদির দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। যুদ্ধে আমেরিকা ও ইজরায়েল লেজে গোবরে হয়েছে, ফলে তাদের তরফে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরো বেড়েছে। অসভ্য ট্রাম্পের মাতলামি, নিত্য নতুন স্যাংশন, কড়াকড়ি আর আর্থিক নজরদারিতে ইরাণ একেবারেই এক ঘরে হয়ে গেছে। চীন, ভারত সমেত মধ্যপ্রাচ্যের ক্রেতারা ইরাণের সঙ্গে লেনদেনের বিষয়ে আগের থেকে আরও অনেক বেশী সতর্ক। ইরাণের তেল বিক্রি হয়ত স্তব্ধ হয়নি কিন্তু দামদড়ে ছাড় বাড়াতে হয়েছে, পেমেন্ট পেতে দেরি হচ্ছে, আর সেটাও রুবেল, ইউয়ান বা সেই প্রাচীন বার্টার পদ্ধতি অবলম্বন করতে হচ্ছে। ফলত দেশের বর্তমান অর্থনীতির নিরিখে অনেক কিছুই আজ অপ্রয়োজনীয়। অর্থনীতির সহজ ভাষায় Cost of Doing Business বেড়েছে। তারই ধাক্কায় ইরাণের এই ভয়ংকর মুদ্রাস্ফীতি, ক্ষোভ বিক্ষোভ আর রাষ্ট্র ক্ষমতায় বর্তমান শাসকের টিকে থাকা নিয়ে এই অরাজকতা।

একটি রাষ্ট্রের হাতে নগদ অর্থ না থাকলে অর্থনীতির নিয়মে যা যা হওয়ার ছিল, ইরাণে সেটাই হচ্ছে। সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং শিল্প-শ্রমিক সমেত প্রায় সবার ক্ষেত্রেই বেতন দেরিতে হচ্ছে অথবা আংশিক দেওয়া হচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর প্রভাবে বাজারে মানি সারকুলেশন ভয়ঙ্কর ভাবে প্রভাবিত হয়েছে, এই পথ ধরে সিঁড়ি ভাঙ্গা অংকের মতো করে একটি সমাজব্যবস্থায় যা যা বিশৃঙ্খলা হবার সেগুলোই হয়ে চলেছে। কাজ আছে, আয় নেই, মাসের পর মাস বেতন নেই, শিক্ষিত যুবক বেকার আর অল্প শিক্ষিত যুব ও ছাত্র কর্মহীনতার সাগরে ডুবে আছে, দেশের বিপুল পরিমাণ নারীশক্তি সামাজিকভাবে অবরুদ্ধ।

দ্রব্যমূল্য এমনভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেছে যে, মানুষ শিক্ষা-দীক্ষা কৃষ্টি সংস্কৃতি রুচি ঐতিহ্য ইত্যাদি সবকিছু ভুলে গিয়ে শুধু দুবেলা দুটো অন্নের চিন্তায় দ্বিতীয় কোন কিছু নিয়ে মাথা ঘামিয়ে সময় নষ্ট করতে রাজি নয়। যায়নবাদী আমেরিকা, আর দখলদার ইজরায়েলের সেটাই মোক্ষ ছিল। এই পরিস্থিতিতে প্রাচীন পশ্চিমা গ্রীক সমাজবিজ্ঞানের যে টেমপ্লেট, ইরাণেও সেই পালাগানই মঞ্চস্থ হচ্ছে। মানুষের মধ্যে জন্ম নেওয়া ক্ষোভ, প্রতিবাদ হয়ে নামে রাস্তায় নেমে এসেছে। দেশের প্রায় প্রত্যেকটি সংস্থায় ধর্মঘট শুরু হয়েছে, কিন্তু সেই পথেও সমাধানের কোন সূত্র খুঁজে না পেয়ে শেষে রাজনৈতিক বিক্ষোভ শুধু দেশের বড় বড় শহরে সীমাবদ্ধ নেই, একেবারে প্রকাশ্যে ছোট বড় একশটি শহরকে মানুষ ঘিরে ফেলেছে। বিগত ৫ দশক ধরে এমন পরিস্থিতি তৈরির যে স্বপ্ন আমেরিকা দেখেছিল, তাতে তারা অনেকটাই সফল হয়েছে ২০২৫ এর শেষে এসে।

অবরুদ্ধ অর্থনীতিতে বৈধ আমদানি রপ্তানি কমে যায়, ফলে সত্যিই বাধ্য হয়ে সরকারকে গোপন বা ঘুরপথে লেনদেন করতে হয়; তাই খুব স্বাভাবিক নিয়মে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা গুটিকয় ব্যবসায়ী ও সামরিক গোষ্ঠী লাইসেন্স দেওয়া-নেওয়া, তেল রপ্তানি, ডলার লেনদেন জাতীয় কাজগুলি নিজেদের হাতে কুক্ষিগত করে রেখেছে, ফলস্বরূপ রাষ্ট্রের টাকা জনগণের কাছে পৌঁছাচ্ছে না এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। এটাই একটা black parallel economy তৈরি করেছে।

অবরুদ্ধ সরকার সবার আগে কী করে? প্রথম সিদ্ধান্ত নেয়, ‘রাষ্ট্র আগে বাঁচুক, মানুষ পরে’, এর হাতে-কলমে ফল হয়- সেনা, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র এবং রেভল্যুশনারি গার্ড খাতে বাজেট বৃদ্ধি। স্বভাবতই শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও শ্রমিক বেতনে কাটছাঁট হয় ব্যাপক ভাবে। বাস্তবে সামরিক খাত কোনো কর্ম সৃষ্টি করে না, উল্টে অর্থনীতির উৎপাদনশীল অংশ শুষে নেয় এবং যুবকের কর্মহীনতার কারণে বেকারত্ব ও ক্ষোভ বৃদ্ধি পায়। যুদ্ধ অর্থনীতি রাষ্ট্রকে হয়ত ভৌগোলিক সীমানার গরিমায় টিকিয়ে রাখে কিন্তু সেই রাষ্ট্রের সমাজব্যবস্থাকে নিচে থেকে উপর অবধি ভেতরে ভেতরে ঘুণ পোকার মতো ঝাঁঝরা করে দেয়। একই সাথে জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে তথ্য গোপন করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, ফলে প্রকৃত রাষ্ট্রীয় আয়, কোন খাতে কত ব্যায় আর বাস্তব ঘাটতি- সবকিছুই জনগণের কাছে অজানা অস্পষ্ট হয়ে যায়।

ইজরাইলের ওপর হামলা ইরাণের অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে দেবে তা ইরাণ জানত। তাদের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে আর জনগণের উপর চাপ বাড়বে না, এটা কি তাদের দেশে অর্থনীতিবিদরা জানতেন না? কিন্তু আঞ্চলিক শক্তির ভাবমূর্তি ধরে রাখতে হলে, মার্কিন শোষণ যন্ত্রে দেশের সম্পদ লুন্ঠন থেকে রক্ষা পেতে গেলে নিজেদের ‘দুর্বল দেখালে’ শাসক এর আসন টিকবে না। সুতরাং মেনে নিতেই হবে পেজেস্কিয়ান তথা খামেইনি সরকার জেনেশুনেই এই ক্ষতি মেনে নিয়েছে। এছাড়া শুধু কি ইজরায়েলের সাথে সরাসরি ১২ দিনের যুদ্ধ! মোটেই নয়, ওই যুদ্ধ ছাড়াও আছে ৩৫৬ দিন ধরে চলা নানা ফ্রন্টের প্রক্সি যুদ্ধ, হিজবুল্লাহ, হামাস, মিলিশিয়া, হুথি, ইত্যাদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠীগুলোকে সারাবছর পোষার খরচ- হাতি পোষার থেকে কোনো অংশে কম নয়। যুদ্ধ আমেরিকাও করে, তারাও প্রক্সি পোষে, কিন্তু তারা যুদ্ধের মাধ্যমে সেই দেশ থেকে নানান ছলে সম্পদ লুঠ করে নিয়ে যায়, যুদ্ধাস্ত্র বিক্রি করে; যুদ্ধই আমেরিকার মুখ্য ব্যবসা। এদিকে যুদ্ধ থেকে ইরাণের কোনো ব্যবসা বা লাভ নেই। যুদ্ধ থেকে ইরাণের অর্থনৈতিক রিটার্ন নেই কিন্তু রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থেকে দিনের পর দিন ধরে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ কুয়োতে ঢেলে যাওয়া, অর্থনীতির আদর্শ ব্ল্যাক হোল।

 

(২)

যেহেতু আমেরিকান ড্রিম আপনাকে বিক্রি করতে হবে, আপনাকে গেলাতে হবে তাদের নগ্ন সভ্যতাই আসলে আধুনিকতা~ তাই আমেরিকা বা ইজরায়েলের সাধারণ নাগরিকের সমস্যা ও সেখানকার প্রতিবাদ আন্দোলন কিছুই আপনাকে দেখানো হবেনা। কিন্তু ইরাণের আন্দোলন, আমার আপনার তৃতীয় বিশ্বের আন্দোলন প্রতিমুহূর্তে বারংবার আপনাকে আমাকে দেখানো হবে যাতে মনে হয় পশ্চিমা সভ্যতা ছাড়া বাকি সকল রাষ্ট্র বর্বর ইত্যাদি।

সমস্যা কি শুধু একা ইরাণের? মোটেই তা নয়, ইজরায়েলেও সমানে বিক্ষোভ হচ্ছে। এই শতকে ইরাণের সাথে সত্যিকারের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া ছাড়া ইসরাইলকে কোনো রকম সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়নি এতদিন, উল্টে ইজরাইল রীতিমতো বিপুল ভাতা প্রাপ্ত মার্কিন মদতপুষ্ট দেশ, কারণ মার্কিন কালেকশন এজেন্ট হিসেবে ইজরায়েলের পারফরম্যান্স রীতিমতো সন্তোষজনক। এর আগে ইজরায়েল শেষ যুদ্ধ করেছিল ১৯৭৩ সালে ইয়ুম কিপুরের যুদ্ধে। দুর্বল ফিলিস্তিনের সাথে একতরফা আক্রমণ আর নানান মিলিশিয়া প্রক্সি যোদ্ধাদের সাথে নিয়মিত সংঘর্ষের বাইরে, এতদিনে ইজরায়েল সত্যিকারের লড়াই করতে গিয়ে প্যান্টে হেগে ফেলেছে ইরাণের বিপক্ষে। এখানেই ইজরাইলের জনগণও দেশব্যাপী ভয়ঙ্কর বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। কিন্তু কেন?

ইজরায়েলেদের দাবী তাদের দেশের বর্তমান বিক্ষোভ ‘বামপন্থী ষড়যন্ত্র’, এটা আর নতুন করে হাসির উদ্রেগ করে না, কারণ মার্কিনী ও তাদের মিত্রদের কমিউনিজমের ভূত তাড়া করে ফিরবে এটাই স্বাভাবিক। আসলে এটা নিজের জনগণের সরকারের উপরে আস্থা হারানোর ফল, এটা সরাসরি যায়োনবাদীদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা। ইজরায়েল অবরুদ্ধ নয়, কিন্তু যুদ্ধকেন্দ্রিক ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নিজেই নিজের অর্থনীতির কবর খুঁড়ে ফেলেছে। যুদ্ধের সাথে জুড়ে আছে রাজনৈতিক ব্যর্থতা, যা ভেঙে দিয়েছে বহুল আলোচিত ‘আইরন ডোম’ আর মোসাদের ফানুস, সেই মিথ আর আক্ষরিক ধ্বংসস্তূপের দাঁড়িয়ে চলছে- পৃথিবীর ব্যাংকার রাষ্ট্রের স্থপতিদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিক্ষোভ।

ইজরাইলের ‘ভাতাখোর’ অপুষ্যি মানুষের দল বুঝতে পেরেছে- ভূমধ্যসাগরের তীরে বন্ধুর প্রকৃতির মধ্যে আতঙ্ককে সঙ্গী করে নেওয়া মানুষের প্রতি ‘পশ্চিমা সমর্থন আছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ নেই’। ঠিক অপর পারে ভূমধ্যসাগরের পশ্চিম প্রান্তে ইউক্রেনের জনগণ বুঝতে না পারলেও, ইজরাইলের সেয়ানা জনগণ ইরাণ কর্তৃক আক্রান্ত হবার পর হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে- আমেরিকা অস্ত্র দেবে কিন্তু সন্তান মরেছে তাদের। ফিলিস্তিনে ঢুকে অন্যের নিরস্ত্র সন্তান মেরে আসা আর তেল আভিভের বুকে, ক্ষেপনাস্ত্র যুদ্ধের মাঝে সাইরেন শুনে বাঙ্কারের মধ্যে ছেলের লাশ আগলে থেকে কবরের জন্য অপেক্ষা করা- এক নয়। স্বভাবতই প্রতি মুহূর্তে ইসরাইলি সমাজ দ্বিখণ্ডিত হচ্ছে আর তাদের অর্থনীতি ভাঙছে। তাদেরও প্রাপ্তি বলতে শুধুই ধ্বংস। ইজরায়েল এর জনগণ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে- যায়োনিস্ট সরকার যুদ্ধ চালাচ্ছে তাদের দেশের জন্য নয়, নিজেদের পেটোয়া গুটিকয় লোকের আখের গোছানোর জন্য এতো আয়োজন। তাদের দেশের মানুষ জানতে চাইছে- গাজা যুদ্ধ আর কতদিন চলবে? হামাসের হাতে বন্দিদের মুক্তি কবে? আর কতদিন ৪০০০ বছর আগের ধর্মীয় আরক মাখানো ‘মাসায়া’র গল্প শুনিয়ে ইহুদিদের অর্ধচন্দ্র বানানো হবে? এই নিরিবচ্ছিন্ন অশান্তির শেষটা কী?

যথারীতি যায়নিস্ট শাসকের কাছে কোনো প্রশ্নের উত্তর নেই। মিডিয়া সবচেয়ে বেশি অবরুদ্ধ যদি উত্তর কোরিয়াতে হয়, ইজরায়েল অবশ্যই দ্বিতীয় স্থানে আসবে সেন্সরের নিরিখে, ইরাণের চেয়েও ইজরায়েলের মিডিয়া বেশি সেন্সরড; তাই তাদের আন্দোলনের ছবি খবর ইহুদি নিয়ন্ত্রিত কোনো সোশ্যালমিডিয়া, ইলেকট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়াতে আসছেই না।

ইজরায়েলের মার্কিন সাহায্য আসে মূলত সামরিক খাতে। অস্ত্র কেনায় লোন দেওয়া আর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজিয়ে তোলার কাজ আমেরিকা করে। এবারে যুদ্ধটা একবার যদি লাগিয়ে দেওয়া যায়, তবে দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধকালীন লজিস্টিক সাপোর্ট হিসাবে অর্থের যোগান দেওয়া আর একটা দেশের সাধারণ অর্থনীতি চালনা এক নয়। যুদ্ধের জন্য টাকা এলে সেগুলো অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, কর্মসংস্থান, পর্যটন, প্রযুক্তি কোনো শিল্পে লগ্নি হয়না, ফলত সেই টাকা থেকে দেশ ও জনগণ লাভবান হয়না। শেষমেষ যুদ্ধ ছাড়া কোনো শিল্পই বাঁচে না।

ঠিক এই ফর্মুলা অনুসরণ করে ইজরায়েলের অর্থনীতির উপরে একবার আলো ফেলা যাক।

ইসলামিক মিলিশিয়া গোষ্ঠীদের সাথে লাগাতার প্রক্সি যুদ্ধ ও সংঘর্ষ বিরতি মাঝে দম নিয়ে নূতন করে মোকাবিলা করার জন্য রসদ সংগ্রহ করে নেওয়া- এটাই চুম্বকে শেষ সাড়ে তিন দশকের ইজরায়েল। লাভ বলতে গরীব ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ, জবরদখল করে প্রতিটা প্রতিবেশীর জমি হাতিয়ে নেওয়া, এটাই ইজরায়েলের একমাত্র সফলতা। ইজরায়েলের পশ্চিমের জলসীমা প্রাকৃতিক কারণেই সুরক্ষিত, মিশরের হোসেন-ই-মোবারক আর সিরিয়ার আসাদের পতনের পর ইজরায়েলের সীমানা যেমন বেড়েছে, উল্টো দিক থেকে আক্রমণের তীব্রতা ততই কমেছে। লেবানন বলে একটা সুপ্রাচীন বাজারের কথা শুধুমাত্র ম্যাপ বইয়ের পাতা ছাড়া মানুষ ভুলতে বসেছে। একতরফা ভাবে গাজাতে বর্বর আক্রমণ আর দিনশেষে উল্লাস এটুকুই প্রাপ্তি। তবুও তার মধ্যে বোড়ে খোয়ানো বা অন্য শিবিরে বন্দী হওয়া জাতীয় ছোটখাটো ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাচ্ছিল এতদিন; কিন্তু ইরাণের মতো এরকম সর্বগ্রাসী ঘোষিত আক্রমণের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা অতীতে ইজরাইলের কখনও ছিল না, এমনকি আরব ইসরাইল যুদ্ধেও না।

ইজরায়েলের জনসংখ্যা বলতে ওখানে জন্মানো নাগরিক ছাড়া পৃথিবীর যেকোন প্রান্তের ধর্মীয়ভাবে ইহুদির একটা লিংক থাকলেই হয়। অনেকটা আমাদের SIR প্রক্রিয়ায় লিংক দিয়ে জুড়ে নাগরিকত্ব প্রমাণ করার মতো। রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের শপথ মানে- আগামী দিনে কোনো ভক্ত যদি এই ফাঁদে পা দেয় তার পথ খুলে রাখা। বাস্তবে ইহুদি নাগরিক বলতে আশকেনাজি, সেফার্দি, মিজরাহি এবং রাশিয়া, ইউক্রেন, ইথিওপিয়া ইত্যাদি থেকে আসা মানুষেরা মোট জনসংখ্যার ৭৩–৭৪%। দ্রুজ, চের্কেস ও অন্যান্য বিদেশি বংশোদ্ভূত কিন্তু নাগরিকত্ব প্রাপ্ত- এমন সব মিলিয়ে ৫-৬ %। এদের অধিকাংশই ভবঘুরে, কুঁড়ে, দাগী অপরাধী বা ভাতা পেয়ে বসে খাবো মানসিকতার। ইজরায়েল আসলেই ইউরোপ ও আমেরিকার পাতাখোর বা ড্রাগের নেশা করা রাষ্ট্রের জঞ্জাল ইহুদিগুলোকে রিহ্যাব করার ওপেন হাসপাতাল।

ইজরাইল নিজেকে "Jewish State" বললেও তাদের নাগরিকদের সবাই ধর্মীয়ভাবে ইহুদি নয়- এদের জেনটাইল নামে ডাকা হয়। যারা ধর্মে ইহুদি, সে পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক সে ইজরায়েলের নাগরিক। কিন্তু যারা ওই দেশের মাটিতে ঐতিহাসিকভাবে ছিল ও আছে- তারা নাগরিক কিনা সেটা ঠিক করে তাদের যায়োনিস্ট সরকার। ক্রমবর্ধমান ভূখণ্ডের মধ্যে আরব জাতির ২০–২১%, এরা ইজরাইলি নাগরিক কিন্তু এদের ধর্ম মুসলিম, খ্রিস্টান, দ্রুজ। এদের মাতৃ ভাষা আরবি, যাদের সকলেই ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্র প্রক্রিয়া শুরুর সময় ঐ ভৌগোলিক সীমার ভেতরে থাকা ফিলিস্তিনি পরিবার। এরা নাগরিক হলেও জমি, চাকরি, রাজনৈতিক অধিকার সব ক্ষেত্রে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক।

অবৈধ খাজনা আদায় করতে গেলে পেয়াদা দলের ক্ষতি হবেই। এই বাস্তব সত্য স্বীকার করে নিয়ে ইজরাইলে ১৮ বছর বয়স হলে সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক, মানে গোটা দেশের সব নাগরিককে ছলে বলে কৌশলে সামরিক বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়। আর সমস্যা এখানেই সবচেয়ে বেশি। বাস্তবে ইজরায়েল রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে পুরাতন বস্তাপচা আব্রাহামীয় ধর্মীয় বিশ্বাস, হিটলারের গণহত্যার ভয়, অবৈধ দখলদারি আর পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে। তাই সামরিক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে ভাগাভাগি আছে, যেমন ইহুদী হলে পুরুষ নারী উভয়েই বাধ্যতামূলক, দ্রুজ আর চের্কেস এর মধ্যে পুরুষরা বাধ্যতামূলক। ২০% জেনটাইল আরব নাগরিক প্রশিক্ষণের তালিকা থেকে বাদ অবিশ্বাসের কারণে। এর বাইরেও বিরাট ধার্মিকের ছাড় পাওয়ার জন্য একটা গোঁজামিল পদ্ধতি আছে, যারা ধর্মীয় নেতা রাব্যাই এর দল- মূলত যারা ইজরায়েল এর সমাজ ও সরকার নিয়ন্ত্রণ করে তারাও সামরিক প্রশিক্ষণের বাইরে থাকে। ইজরাইলে প্রতিমুহূর্তে NRC চালু করা রয়েছে। ফলে, গোলান উপত্যকার বড় অংশ ইজরায়েলের দখলে এসে গেলেও, দ্রুজদের অধিকাংশই সিরিয়ান নাগরিকত্ব ছাড়েনি। ফলে যুদ্ধের মুখোমুখি হতেই, অলঙ্ঘনীয় আইরন ডোমের কার্যকারিতার মতোই- সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সুদক্ষ নাগরিকের দেশপ্রেম উধাও হয়ে গেছে। বিশ্ব নাগরিকের অবশ্য মাথাব্যথা নেই এইসব বেকার ঝুট ঝামেলা নিয়ে, তাদের দ্বৈত্ব নাগরিকত্ব আছে, ঝামেলা বাঁধলেই পালিয়ে যায় তারা।

এই যুদ্ধ বিধ্বস্ত পরিস্থিতি দেখার পর- প্রাণ হাতে করে কোনো পর্যটক আসছে না, ফলে ইজরায়েলের পর্যটন শিল্প প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। পরিস্থিতির বিপাকে মেধার সাথে সাথে, প্রতিনিয়ত দেশ ছাড়ছে টেক স্টার্ট-আপ এর ইনভেস্টমেন্ট, সেটা সাময়িক হলেও সরছেই। শুধু ল্যান্ড আর ক্যাপিটাল থাকলেই তো শিল্প হবে না, উৎপাদনের অন্যতম বড় শর্তই হলো শ্রমিক তথা লেবার। বর্বর অত্যাচারের ফলে স্বল্পমূল্যের ফিলিস্তিনি ‘জেনটাইল’ কমছে রোজই, যে কারণে অবকাঠামো ও নির্মাণ শিল্প প্রায় থমকে গেছে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত অংশের পুনঃনির্মাণের জন্য পৃথিবীর অন্য অংশ থেকে লেবার আনতে গিয়ে ঢাকের দায়ে মনসা বিকিয়ে যাচ্ছে, চুকাতে হচ্ছে তিনগুণ চার গুণ অর্থ। অর্থনীতির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি ছোট ব্যবসা গতি হারিয়েছে, কারণ চাহিদা নেই, মানুষ যুদ্ধের ভয়ে টাকা/সম্পদ জমাতে আগ্রহী, খরচ করছে না।

২০২৩–২০২৫ সময় কালেই লক্ষ লক্ষ ইজরায়েলি জনগণকে রিজার্ভ সেনা হিসেবে যোগ দেবার জন্য নোটিশ জারি করে ডাকা হয়েছে, ফলে উৎপাদনশীল বয়সী পুরুষ জাতীয় কর্মক্ষেত্রের বাইরে চলে গেছে। একই সাথে বহু ব্যবসা, স্টার্ট-আপ ও ফ্যাক্টরি আংশিক বা পুরো বন্ধ, ফলত বিপুল মেধা দেশ ছেড়েছে। অবরুদ্ধ ইরাণ ফাটা বাঁশে আটকে গিয়ে অর্থনীতিকে কার্যত ‘মিলিটারাইজড’ করে ফেলেছে বলে পশ্চিমে দুনিয়া অভিযোগ করছে, কিন্তু মুক্ত হওয়াতে বাস করেও ইজরাইলের অর্থনীতি যে কার্যত ‘মিলিটারাইজড’ হয়ে গেছে এটা স্বীকার করতে তারা লজ্জা পাচ্ছে। তাই লুকাচ্ছে। ইরাণের সাথে তুলনা করলে- ইজরাইলের সাথে প্রায় সবার সাথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালু আছে, ডলার ও ইউরো প্রবাহ আছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারছে। তবুও ইজরাইলের প্রায় সব সেক্টর ভেঙে পড়েছে। ইম্মিডিয়েড পড়শী দেশ থেকে কিছু স্থায়ী লুঠপাঠের বন্দোবস্ত না করলে তাদের অর্থনীতিও পাতালে চলে যাবে।

দেশের বেকারত্বের হার লুকাতে গিয়ে সরকারকে মিথ্যা সংখ্যাতত্ত্ব প্রকাশ করতে হচ্ছে। ভয়ংকর বেকারত্ব একমাত্র বাস্তব সত্য আর আমাদের দেশের মতো পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে কোনোমতে নিজেকে টিকিয়ে রাখার মতো কোন অবস্থা ঐ দেশে নেই। ফলে কর্মক্ষম মানুষ ভয়ংকর ভাবে কর্মহীনতায় ভুগছে। এখনো কর্মক্ষম অংশের যেটুকু নিজেদের সামরিক বাহিনীর বাইরে রাখতে পেরেছে, তারা বাস্তবেই কর্মহীন। এই পরিস্থিতিতে ইজরায়েলের শেকেল, ইরাণের রিয়ালের মতো হুড়মুড় করে ভেঙে পডার কথা কিন্তু দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেও শেকেল কোনমতে টিকে আছে কিভাবে? ইজরাইল ৩.৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক অনুদান পেয়েছে আমেরিকার কাছ থেকে, সঙ্গে যুদ্ধের সময় অতিরিক্ত সহায়তা। এভাবেই ভেন্টিলেশনে চলে যাওয়া অর্থনীতিতে শুধুমাত্র বাইরে থেকে পাম্প করে টিকিয়ে রাখা হয়েছে।

ইউক্রেন বা ইজরাইল নয়, যুদ্ধকালীন এরকম অনুদান পাওয়ার তালিকাটি সুদীর্ঘ। নাইজেরিয়া, লাউস, কম্বোডিয়া, দক্ষিণ সুদান, সিরিয়া, ইথিওপিয়া ও সাম্প্রতিককালে তালিকায় যুক্ত হওয়া প্রতিবেশী বাংলাদেশ। আর এই অনুদান বাজেটের চাপ প্রশমিত করার করার তাগিদেই ভেনেজুয়েলা সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নিত্য নতুন তেল তথা সম্পদ ভান্ডারে আক্রমণ বাড়বে বই কমবে না। ভবিষ্যতে মাদুরোর নামের পাশে আরো এমন অনেক নাম যে যুক্ত হবে, সে কথা এখনই বলে দেওয়া যেতে পারে।

অতীতে স্প্যানিস সাম্রাজ্য, ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ ও সোভিয়েত সাম্রাজ্যের পতন এভাবেই হয়েছিলো। স্পেন সময় নিয়েছিলও ১০ বছর, ইংল্যান্ড ৫ বছর আর সোভিয়েত মাত্র দেশ বছরের একটু বেশী। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের একই নীল নক্সাতে তৈরি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদও উপরোক্ত ৩ ধরনের আগ্রাশনের বাইরে কিছু নয়, স্থান ও কালভেদে মোড়কটা শুধু আলাদা। ক্রণোলজি মেনে চললে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ দুম করে কয়েক মাসের মধ্যে ধ্বসে পড়লে আশ্চর্য হবেন না। আমেরিকার এখন চাই বিপুল টাকা, তার জন্য বিপুল লুঠের সুযোগ, সুযোগ না পেলেই যুদ্ধ অবধারিত। আমেরিকা নিজেদের তৈরি বৈশ্বিক যে বন্দোবস্ত বানিয়েছিলো, সেই UN, WMF, WHO জাতীয় সমস্ত প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেই বিলিয়ে যাবার মুখে। পেট্রো ডলার অর্থনীতি অতীত, ৯ই জানুয়ারি পেট্রো ডলার চুক্তি শেষ হয়েছে সৌদির সাথে। তাই হুমকি ধমকি দিয়ে নতুন ভাবে মধ্যযুগীয় উপনিবেশ প্রথা চালুর চেষ্টা চলছে। কিন্তু চেষ্টা করা আর সফল হওয়া এক নয়। বর্তমান পৃথিবী আর একমেরু নেই, বন্ধুর সমস্যাতে চীন হিজড়ের মতো আচরণ করলেও শক্তিধর সন্দেহ নেই, রাশিয়া, আমাদের ভারত সকলে রয়েছে। এই সকল রাষ্ট্র মেনে নেবে কী? পরমাণু অস্ত্র যে অনেকেই রাখে আজকের দিনে।

আমাদের রাজ্যে একটা চালু কথা আছে- যার মাথায় ‘ওনার’ হাত, তিনি খাবেন জেলের ভাত। এই বাক্যটির আন্তর্জাতিকরণ করলে দাঁড়ায়- “পশ্চিমা সমর্থন আছে মানেই অর্থনীতি মায়ের ভোগে যাবে” এই ধারণাটা মিথ হয়ে গেছে। ইউক্রেন, ইজরাইল হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে এবং অতীতের আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, মিশর এমনকি লতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা, ইউরোপের ঐতিহ্যশালী দেশ স্পেন ও গ্রীস, সর্বশক্তিমান ন্যাটো ও গোটা ইউরোপের সীমানা মুছে ‘এক মহাদেশ এক মুদ্রার’ মতো যুগান্তকারী ব্যবস্থা নেওয়ার মতো সাহস দেখানো ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী; আর হাতের কাছে সবচেয়ে বড় উদাহরণ পাকিস্তান তো আছেই। সুতরাং, মস্তিষ্কের ঝুল ফাঁদগুলো সরিয়ে ‘আমেরিকান ড্রিম’ এর কাজল মুছে বোঝার চেষ্টা না করলে এই ইম্পিরিয়াল পতনের পদধ্বনি শুনতে পাবেন না।

তাই আজকে ইরাণের মুদ্রার মান প্রায় শূন্য করে দেওয়ার পর, তাদের কী হচ্ছে তার উপরে বিশ্বের স্থিতিশীলতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ন্যাটো লেজে গোবরে, তাদের লুন্ঠনের রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে ট্রাওরের আফ্রিকা। ইরাণ যদি আজকের পর ৬ মাসও টিকে যায়, ডলারের হাল শুরুর ৯০ এর দশকের রুবেলের চেয়ে খারাপ হবে সেটা লিখে রাখুন। সেক্ষেত্রেও আমেরিকা ভাঙবে, আবার যুদ্ধ বাঁধিয়েও যে বেঁচে যাবে তারও নিশ্চয়তা নেই, সেখানেও রসদে ঘাটতি হবে এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন দাদাগিরির অস্ত্র- সেনাঘাঁটি গুলো গায়েব হয়ে যাবে। ১৪ই জানুয়ারির আগে অবধি ট্রাম্প রোজ হাড়হিম করা ধমকি দিচ্ছিলো, যেন কালই খামেইনিকে ছিপে তুলে নেবে। ওদিকে মার্কিন সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম আর শাহি কট পড়ে রাজ মুকুটের স্বপ্নে বিভোর রেজা পল্লব রোজই মিটিনং করছিলো কীভাবে ইরাণকে ‘দিশা’ দেখাবে।

১৪ই জানুয়ারি রাত্রে অন্যান্য সমস্ত দেশ ইরাণ থেকে তাদের দেশের নাগরিকদের ডেকে নেয়। কাতারের সেনা ঘাঁটি খালি- এই আক্রমণ হয় তো সেই আক্রমণ হয়। পরদিন সকালে ফুস…, মোসাদ, MI-6, CIA সকলের সমস্ত কিছু ব্যর্থ হয়েছে, গাঁড়ল ট্রাম্পের মুখে পরাজয়ের ছাপ স্পষ্ট। এর আগে যায়নিষ্ট ‘গোদি মিডিয়া’ কী তাদের তরফে প্রোপ্যাগান্ডা চালাতে কসুর কম করেছে? BBC, Fox, ABC, হারেৎজ, টাইমস, রয়টার্স সহ সবাই মিলে ১০ হাজার লোকের মৃত্যুর গল্প ফেঁদে একটা হেজিমনি খাড়া করতে গিয়েছিল। পরে নিজেরাই ‘সরি বাবু’ বলে সেটাকে ৬৬৭ তে এনে থামিয়েছে, যার মধ্যে ইরাণের সেনাবাহির সদস্যই ৭০% এর অধিক, এই হল চুম্বকে সংবাদ।

সমস্ত ধরনের অতীতের নির্লজ্জতাকে এরা ছাপিয়ে গিয়েছে এবারে, কানাডার এক মেয়ের ছবিকে ইরাণের বলে ভাইরাল করেছিলো সোস্যাল মিডিয়াতে; যেখানে খামেইনির ছবি পুড়িয়ে মেয়েটিকে সিগারেট জ্বালাতে দেখা যাচ্ছিলো। খামেইনি ভালো না খারাপ সেই বিচারে যাচ্ছিনা, কিন্তু যে লোকটা আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়ছে, সে যে খুশি হোক, আমি তার পক্ষে।

মিডল ইস্টের ১৯টা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে ইরান প্রাথমিক লক্ষ্য বানিয়ে ছিলো তো বটেই, আর এগুলো মুছে গেলে দেশ হিসাবে ইজরায়েলের আয়ু আর আধাঘন্টা বড় জোর। তাছাড়া পরমানু অস্ত্রের ভয় থেকে আঙ্কেল শ্যাম নিজেও কি মুক্ত? সবচেয়ে বড় কথা বিশ্বের একটা রাষ্ট্রও তার বন্ধু নয়, সামান্য দুর্বল হলে পাশের প্রতিটা জনই টিপে ধরবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে শ্বাসরোধ করার জন্য। নতুন করে অর্থের একমাত্র সংস্থান তো লুণ্ঠন, সেই লুঠ না করতে পারলেও আমেরিকা ভাঙবে। দেখা যাক সেটা কত তাড়াতাড়ি হয় আর কোন পথ ধরে হয়!

 

#হককথন

রবিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০২৫

অনুপ্রবেশের নেপথ্যে- ২

 


পর্ব~ ২

চলুন বিস্তারিতভাবে দেখে নিই কেন বাংলাদেশী বা নেপালিরা এদেশে ঢুকে আসে। 

১) ভারতের মতো “SC/OBC রিজার্ভেশন সিস্টেম” বাংলাদেশে/নেপালে কোথাও নেই। এই কোটা সিস্টেমে একবার ঢুকে যাওয়া মানেই দেশের ৬০% জনগণকে টুপি দিয়ে বঞ্চিত করে টপকে, নিজেদের আগামী প্রজন্মকে শিক্ষা, চাকরি সহ প্রায় সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে রেখে দেওয়া গেলো। এই কারনে শেষ ৩০ বছরে এদেশে আসা ৯৯% বাংলাদেশী ও নেপালী হিন্দুরা SC/OBC এই দুটোর একটাতে ঢুকে রয়েছে। শুধু আমাদের দেশের অর্থনীতি, সমাজনীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, কাজের গুণগত মান এবং সংখ্যা সুযোগ বেশি বলে লোক আসছে না। ওই সার্টিফিকেটের লোভেও বহু লোক ঢুকেছে। নব্য বাঙাল আর সে জেনারেল কাস্ট- এমন উদাহরণ বিরল। এদেশে বাঙাল কেন আসবেনা?

২) বিনামূল্যে চিকিৎসাঃ নেপালে এমন কিছুই নেই। বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারদের জন্য সরকারী ও বিশেষায়িত হাসপাতালে ফ্রি বা প্রায় ফ্রি চিকিৎসা দেওয়ার আলাদা সরকারি ব্যবস্থা আছে। এর বাইরে নির্দিষ্ট কিছু সরকারী হাসপাতালে স্বল্পমূল্যে আউটডোর টিকিট ও খুব অল্প ফি এর বিনিময়ে ডাক্তার দেখানোর পরিষেবা আছে, কিন্তু তার মান যে ঠিক কতটা নিকৃষ্ট, সেটা আমাদের কোলকাতার বাইপাসের ধারে বেসরকারী হাসপাতাল গুলোতে গেলেই বুঝে যাবেন বাংলাদেশী রোগীদের ভিড় দেখে। কোনো মৌলিক ওষুধ বা খুব সাধারণ ল্যাব টেস্টও বাংলাদেশে সরকারীভাবে দেওয়া হয়না, কোথাও কখনো শিবির করে পরিষেবা দিলেও তার যা মান, তাতে রোগ সারার বদলে বেড়ে যায়। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সেভাবে কোনো সামগ্রিক টিকাকরণ কর্মসূচী নেই তাদের। এদিকে আমাদের ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, গ্রামীণ, মহকুমা, জেলা সদর হাসপাতাল হয়ে কোলকাতার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসা সিস্টেমে নানান দুর্নীতির পরেও, বাংলাদেশের তুলনাতে ধ্বন্বন্তরী চিকিৎসা বলাই যায়। এর সাথে ভেলোর, পুত্তাপুত্তির মত দাতব্য হাসপাতাল গুলোতে পৌঁছে যেতে পারলে তো সান্ধ্য টিফিনের খরচাতে মহাব্যাধির চিকিৎসা হয়ে যায়। এদেশে নেপালি-বাঙাল অনুপ্রেবশকারী আসবেনা তো কোথায় যাবে?

৩) ফ্রি শিক্ষাঃ বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষা ফ্রি ও বাধ্যতামূলক, কিন্তু বাস্তবে খরচ পুরোপুরি শূন্য থাকে না। সেখানে ভারতে উচ্চমাধ্যমিক অবধি সেই অর্থে কোনো টিউশন ফি’ই নেই সরকারি স্কুলে। সামান্য ভর্তি ফি, পরীক্ষার ফি, ব্যাস। প্রাইমারিতে ইউনিফর্ম অবধি দেওয়া হয়, যাতায়াতের জন্য সাইকেল, বই, খাতা–কলম, সবই ফ্রি। এর পর আছে মিড-ডে মিল। দিনের সবচেয়ে বড় খাবারটা ইস্কুলেই মিটে যায় বাচ্চাদের, বাপমা এটুকু দুশ্চিন্তা মুক্ত যে, তাদের সন্তান ইস্কুলে গেলে অপুষ্টিতে ভুগে না খেতে পেয়ে মরবেনা। এরপর কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এ পড়াশোনার খরচা। সরকারি কলেজগুলোতে টিউশন ফি বাৎসরিক মোবাইল রিচার্যের চেয়েও কম, কিছু ক্ষেত্রে টিউশন ফি মকুব হয়ে যায় নানান বৃত্তিতে। ভারতীয় ইঞ্জিয়ারিং কলেজ থেকে পাশ করা ছেলেপুলেদের দাম বিশ্ব IT বাজারে বিপুল, বাংলাদেশী হলেই আর জাতে উঠবেনা। ভারতীয় পাসপোর্টও বাংলাদেশীদের চেয়ে বেশী গ্রহণযোগ্য। তাই তাদের শিক্ষিত প্রজন্মের ধান্দাই হচ্ছে যেকোনো মূল্যে উচ্চশিক্ষার পড়াশোনাটা ভারতে এসে করা, এবং ভারতীয় পাসপোর্ট হাতানো। SC-OBC হলে তো রীতিমত জামাই আদর, কেন বাংলাদেশীরা এদেশে কাঁটাতার গলে ঢুকবেনা?

৪) ফ্রি রেশনঃ বাংলাদেশে দরিদ্র ও দুর্যোগ কবলিত জনগোষ্ঠীর জন্য বিনামূল্যে খাদ্যশস্য বিতরণের সরকারী প্রকল্প রয়েছে কাগজে কলমে। নতুবা এই খাতে বিদেশী অনুদান কীভাবে আসবে? এই কর্মসূচিগুলো Vulnerable Group Feeding এর আওতাধীন, যেখানে কেবলমাত্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে দরিদ্র পরিবারগুলোকে বিনামূল্যে চাল, গম বিতরণ করা হয়। বাস্তবে, দুটো ঈদের আগে ছাড়া এই সহায়তা কেউ পেয়েছে বলে এমন অভিযোগ নেই কারো। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অন্যান্য দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সকলকে বিনামূল্যে ত্রাণটুকু পৌঁছে দিতে পারেনা বাংলাদেশ সরকার, আজও। সেখানে আমাদের রাজ্যে দুর্যোগের জন্য বরাদ্দ চাল আর ত্রিপল ঝেঁপে অট্টালিকা বানাবার লোভেই একটা গোটা রাজনৈতিক দল রমরমিয়ে চলছে। 

এদিকে ভারত সরকারের খাদ্য ও গণবন্টন বিভাগের প্রকল্পের অভাব নেই দেশের মানুষের মুখে প্রায় বিনামূল্যে, সারা বছর ধরে অন্ন তুলে দেওয়ার বন্দোবস্তে। অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনা (Antyodaya Anna Yojana - AAY), অন্নপূর্ণা যোজনা (Annapurna Yojana - APY),  অগ্রাধিকার পরিবার প্রকল্প (Priority Household - PHH), প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনা (PMGKAY), সমন্বিত শিশু বিকাশ পরিষেবা (ICDS)-এর মতো অন্যান্য পুষ্টি-সম্পর্কিত প্রকল্পগুলি রমরমিয়ে চলছে। এদেশে ঢঙের কিছু কাজ জুটুক বা না জুটুক, রেশনের চাল খেয়ে পেটের জ্বালাটা অন্তত মিটবেই মিটবে। কেন বাংলাদেশীরা এদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশকারি হবেনা?

৫) বাংলাদেশের আয় মূলত পোশাক শিল্প ও কামলাখাটা শ্রমিকদের পাঠানো প্রবাসী আয়ের (Remittances) উপর নিরর্ভরশীল। এর বাইরে কৃষি খাত, মৎসচাষ ও পশুপালন, এই সবগুলো দিয়ে গ্রামীণ অঞ্চলে দারিদ্র্য হ্রাস করা যেতে পারে, উন্নত বৈচিত্র্যপূর্ণ ও কিছুটা বিলাসী জীবনযাপন করা যায়না। বাংলাদেশ থেকে ভারত আর মিয়ানমার ব্যাতিরেকে যেখানেই যাক, বিমানে যাতায়াত হয়, যা বিপুল খরচা সাপেক্ষ। সেখানে ভারতে আসার জন্য পকেটে ১০০ টাকা থাকলেই যথেষ্ট। আর কোলকাতা থেকে গোটা ভারত জুড়ে কাজ খুঁজে ফিরতে খুব বেশী খরচাকর নয়। বহু বাংলাদেশী রীতিমত শুক্রবার ওদেশে ফিরে ২ রাত কাটিয়ে আবার সোমবার সকালে কোলকাতায় নিজের কাজে ফেরে অফিস টাইমে। এরা অনুপ্রবেশ করবেনা তো কে বা কারা করবে?

৬) ভারতের উন্নত টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্র বাংলাদেশের চেয়ে যোজন কিলোমিটার এগিয়ে। সহজলভ্য ইন্টারনেট পরিষেবা, ডিজিটাল অবকাঠামো ও বিস্তৃত মোবাইল নেটওয়ার্ক ভয়াবহ লোভনীয়। স্পিডটেস্ট গ্লোবাল ইনডেক্সের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের মোবাইল ও ফিক্সড ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গড় গতি বাংলাদেশের চেয়ে ঢের বেশি। ২০২৫ সালে সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯০ কোটি বা ৬২%, সেখানে প্রতি তিনমাসে একবার রিচার্যের হিসাবে মাত্র ২৭% মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে বাংলাদেশে। ১ জিবি ডেটার দাম ভারতে গড়ে ৯ টাকা, সেটাই বাংলাদেশে ৩২ টাকা গড়ে। তাই ওই দেশের ওদের শিক্ষিত প্রজন্ম একবার ঢুকলে আর বার হতে চায় না।

৭) পরিকাঠামো ও সুযোগঃ বাংলাদেশের আয়তন ১৪৮০০০ বর্গ কিমি, সেখানে ভারতের আয়তন ৩২ লক্ষ ৮৭ হাজার বর্গ কিমি, মানে ২২ গুনের চেয়েও বেশী বড় দেশ। গোটা ইউরোপের চেয়ে ৩ গুন বড় আয়তনের দেশ আমাদের ভারত। ইউরোপ মানে অনেকগুলো দেশের সমষ্টি, ভারতের প্রত্যেকটা রাজ্যকে একটা দেশ ধরে নিলে- কতগুলো দেশ হয়? আমাদের বিপুল জনসংখ্যা আন্তঃদেশীয় ভাবেই বিপুল বাজার সৃষ্টি করেছে। দেশে বিপুল মাত্রার নানা মাপের শিল্প কলকারখানা রয়েছে। এ প্রান্তে কাজ না জুটলে আরেক প্রান্তে চলে যেতে রেলপথে মাত্র কয়েকশো টাকাতে বিনা ভিসা, বিনা প্রশ্নে চলে যাওয়া যায়, যা গোটা পৃথিবীতে কোথাও সম্ভব নয়। উপরন্তু ভারতের একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর আছে, সেই সুবিধার লোভে এখানে অনুপ্রবেশ ঘটে চলেছে।

অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো পরিবহন ব্যবস্থা, যা পণ্য ও মানুষের চলাচল সহজ করে। মহাসড়ক, সেতু, কালভার্ট বা সেতু, উন্নত গ্রামীণ রাস্তাঘাট। দেশজোড়া বিস্তৃত রেললাইন, আধুনিক রেলস্টেশন, উন্নত ট্রেন পরিষেবা। বন্দর, জেটি, ফেরিঘাট, নৌ-চলাচল উপযোগী নদীপথ। পর্যাপ্ত বিমানবন্দর, নিয়মিত সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ হলো আধুনিক ভারতের প্রাণশক্তি। ভারতীয় রেলকে দেশের ‘লাইফলাইন’ বলা হয়। বার্ষিক যাত্রী ধারন সংখ্যা, গুণগত রেলপথ ও দেশ জুড়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এর নিরিখে ভারতের স্থান গোটা বিশ্বে দ্বিতীয়, সেখানে বাংলাদেশ তালিকার প্রথম ১০০ এর মধ্যেও আসেনা। বাংলাদেশে সড়ক যোগাযোগ ভালো, কিন্তু সেটা ভারতের তুলনাতে নেহাতই বালখিল্য। আজও নদী পরিবেষ্টিত বাংলাদেশের বিবিধ স্থানে নদীপথই একমাত্র বিকল্প, কোনো ব্রিজ বা পাকা সড়ক নেই। বাংলাদেশে বেসরকারী পরিবহণনই মূল ভরষা, কারন অনুন্নত সরকারী বাস পরিষেবা, যার সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত এবং প্রতিটা ক্ষেত্রে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সময়ানুবর্তিতা রক্ষিত হয়না, ফলে সাধারণ মানুষ সরকারী পরিষেবা এড়িয়েই চলে। গণ পরিবহণ ব্যবস্থাতে ভারত অবশ্যই ইউরোপের তুলনাতে অনেক পিছিয়ে, কিন্তু বাংলাদেশের তুলনাতে যেকোনো পরিস্থিতিতে ভারত অন্তত ৫০ বছর এগিয়ে। 

এর সাথে  বিদ্যুৎ ও শক্তি খাত হলো- শিল্পায়ন এবং দৈনন্দিন জীবনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অপরিহার্য। সেখানে বাংলাদেশের তুলনাতে ভারত স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রায় প্রতিক্ষেত্রেই। বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যেমন কয়লা, গ্যাস, জলবিদ্যুৎ, পারমাণবিক এবং নবায়নযোগ্য শক্তিতে একপ্রকার স্বয়ংসম্পূর্ণ। এর সাথে সরবরাহ ব্যবস্থাতেও অনেক অনেক এগিয়ে,  ট্রান্সমিশন লাইন এবং ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক স্থাপনে এতো বিশাল বড় দেশে একটা নজির। এরপর রয়েছে পরিশুদ্ধ জল সরবরাহ, স্যানিটেশন, কৃষিতে পর্যাপ্ত সেচ ব্যবস্থা, উন্নত মানের সার ও আধুনিক কৃষিজ যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতা। এ সবের লাভ তো কেবল ভারতীয়েরাই পায়। কেন কেউ অবৈধ ভাবে ভারতীয় হতে চাইবেনা?

৮) মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অনুভূতি এবং চুরি বা হামলার ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া জননিরাপত্তা সূচকে ভারত অনেক এগিয়ে। অপরাধ, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাজনিত আইন শৃঙ্খলার নিজস্ব সমস্যা দুই দেশেই রয়েছে। নিরাপত্তা ও শান্তিশৃঙ্খলার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে, ওয়াশিংটন ভিত্তিক বিশ্লেষণ সংস্থা গ্যালপ (Gallup) দ্বারা প্রকাশিত 'ল অ্যান্ড অর্ডার ইনডেক্স' (Law and Order Index) অনুযায়ী, ভারতীয়েরা ব্যক্তিগতভাবে নিজেদেরকে বাংলাদেশীদের চেয়ে বেশি নিরাপদ মনে করে।
 
৯) আর্থিক বৈষম্য আরো একটা বড় কারন এই অনুপ্রবেশের। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (SBI)-এর ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে চরম দারিদ্র্যের হার ৫ শতাংশেরও কম। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২২-২৩ সালে ভারতে চরম দারিদ্র্যের হার- প্রতিদিন ২.১৫ মার্কিন ডলারের কম আয় কমে ২.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) সর্বশেষ গৃহস্থালী আয় ও ব্যয় জরিপ (HIES) ২০২২ অনুযায়ী, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে ১৮.৭ শতাংশ। এর মধ্যে চরম দারিদ্র্যের হার হলো ৫.৬ শতাংশ।

বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত ২০%, সেখানে ভারতে ৩১% এরও বেশী। ক্রয়ক্ষমতার সমতা (PPP) বিবেচনা করলে, ভারতের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের তুলনায় বেশি। এর ফলে ভারতীয় মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই বেশি। ভারতের বিশাল শিল্প ও পরিষেবা খাত, বিশেষ করে আইটি সেক্টর শহরাঞ্চলে উচ্চ বেতনের চাকরির সুযোগ তৈরি করে, যা মধ্যবিত্তের আয় বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিলাসবহুল জীবনযাত্রা এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পণ্য ও পরিষেবার প্রতি বেশি আগ্রহী, যা ভারতের বড় অর্থনীতির কারণে সহজলভ্য। অন্যদিকে, বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত মূলত মৌলিক চাহিদা পূরণের পর সঞ্চয়ের দিকে নজর দেয়। ফলত, ঢাকা ও মুম্বাইয়ের মধ্যে বাড়ি ভাড়া, মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার খচরে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। ২০১৪ সালের পর থেকে ভারতে মধ্যবিত্তের সংখ্যা কমার পাশাপাশি গরিবের সংখ্যা বেড়েছে, তবুও ভারতের বহু অংশের গরিব এখনো বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের সঙ্গে তুল্যমূল্য বিচারে লড়াই দিতে পারে।

মালদা মুর্শিদাবাদের নদী ভাঙ্গনের বিপর্যস্ত মানুষের কথা আগে চিন্তা করা হবে, নাকি হিন্দুত্ত্বের দোহায় দিয়ে এসব অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের কথা চিন্তা করা হবে- রোহিত শর্মা চুর, আর সূর্যকুমার যাদবের পা বাউন্ডারির বাইরে খুঁজতে প্রানাতিপাত করে দেয়, তাদের? যে দেশে কামলা খাটতে যাওয়াটা সমাজের মূল ধারার সবচেয়ে বড় পেশা, সেখানে এগুলো কী যথেষ্ট কারন নয় এই গণহারে অনুপ্রবেশের? 

সুতরাং, কৃত্রিম ভেকধারী উদবাস্তু মানেই আমার ভাই, বাংলাদেশী হিন্দু মানেই ছিন্নমূল, বাংলাদেশী হিন্দু মানেই সে মোল্লাদের দ্বারা অত্যাচারিত, এই সব গণহারে খেয়ালি পোলাও পাকাবার আগে উপরের তথ্য গুলো মিলিয়ে নেবেন আশাকরি। হয় আমি অনুপ্রবেশকে সমর্থন করব, বা বিপক্ষে থাকব। এখানে আমি যদি তোলামুল হই, আমার ধান্দাবাজ হতে সমস্যা নেই, এটাই আমার রুটিরুজি। আমি বিজেপি হলে মুসলমাদের প্রতি ঘৃনা ও হিন্দুত্বই আমার একমাত্র হাতিয়ার। কিন্তু যখন আমি বাম, আমি কেন জাতের বিচার করব? আমি তো গোটা বিশ্বজুড়ে যেখানে বঞ্চনা হচ্ছে, যাদের উপরে অত্যাচার হচ্ছে, আমি তাদের পক্ষে। মুসলমান বাংলাদেশী হলে সে রোহিঙ্গা, সে অবৈধ, আর হিন্দু বাংলাদেশী হলে এদেশের নাগরিকত্ব নাকি তার প্রাপ্য অধিকার? দেয় কে আপনাদের? আপনার সাথে RSS এর ভাষার ফারাক কোথায়? এমনি এমনি দলটা শূন্যে পৌঁছে যায়নি, আপনি ও আপনার মত ভন্ড মানুষদের মেহেনতে এটা সম্ভব হয়েছে। 


আপনি কী ভাবে দেখেন এই গণহারে অনুপ্রবেশকে?


অনুপ্রবেশের নেপথ্যে- ১


পর্ব~১

ডাঙ্কি সিনেমাটা দেখে ছিলেন?


আপনি যদি অবৈধ পথে পৌঁছে আমেরিকাতে নাগরিকত্ব চান, সেখানকার আইন অনুযায়ী- একজন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ব্যক্তি হিসাবেই রাজনৈতিক আশ্রয় দাবি করতে হবে মার্কিন ফেডারাল সরকারের কাছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিকে আদালতে প্রমাণ করতে হয় যে, তার নিজ দেশে বর্ণ, ধর্ম, জাতীয়তা, নির্দিষ্ট কোনো সামাজিক গোষ্ঠীর সদস্যপদ বা রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে নির্যাতনের শিকার হওয়ার কিম্বা প্রাণনাশের গুরুতর ঝুঁকি রয়েছে। 

কীভাবে এসব প্রমাণ যোগার হয়? সব বন্দোবস্ত আছে, শুধু ফেলো কড়ি মাখো তেল সিস্টেম। ২০২৪ সালে ৮৯২,৯০৪টি রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন জমা পড়েছিলো মার্কিন আদালত গুলিতে, যেখানে ৭০% এর বেশী আবেদনকারী নাগরিকত্ব পেয়েছে নানান শর্তের বিনিময়ে। ওবামা, ট্রাম্পের প্রথম দফা ও বাইডেনের আমল মিলিয়ে শেষ ১২ বছরে ৭৬% আবেদনকারী নাগরিকত্ব পেয়েছে, ট্রাম্পের আমলে এটা কমলেও সেটা ২০২৫ এ ইতিমধ্যেই ৪৭% পাড় করে ফেলেছে। ইউরোপের অধিকাংশ দেশেও এই একই আইন কিছু রকম ফেরে।

২০২৪ সালে ৪৯,৭০০ জন ভারতীয় মার্কিন নাগরিকত্ব পেয়েছে এই ভাবে, যাদের মধ্যে মাত্র ২৮২ জন অ-হিন্দু। এবারে আপনি বলুন, হিন্দু হৃদয় সম্রাট মোদি শোভিত RSS শাসিত ভারত রাষ্ট্রে এরা কোন ধর্মীয়/রাজনৈতিক অত্যাচারের শিকার হয়েছিলো? এদের জীবন কোথায় কীভাবে গুরুতর ঝুঁকিতে ছিলো? আপনি জানেন সবটা মিথ্যা, আপনি জানেন উন্নত জীবনের খোঁজে তারা জালি কাগজ বানিয়ে সে দেশের আদালতকে বোকা বানিয়েছে। কিন্তু খাতায় কলমে ওরা সকলেই ধর্মীয় ও রাজনৈতিক হিংসার শিকার, দস্তুর মত ‘খাঁটি’ প্রমাণ পেয়েছে বলেই আদালত তাদেরকে নাগরিকত্ব মঞ্জুর করতে কসুর করেনি। এটা শুধু আমেরিকার তথ্য দিলাম, এমন করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ সর্বত্র দলে দলে ভারতীয় হিন্দুরা পাড়ি জমাচ্ছে একই উদ্দেশ্যে, একই অজুহাত খাঁড়া করে। 

২০১৪ থেকে এদেশে অত্যাচারের শিকার মুসলমান আর দলিতেরা, তাদের কতজন এই অজুহাতে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে? ২০২০ এর দিল্লি দাঙ্গায় কতজন মুসলমান দেশ ছেড়ে পালিয়েছে? নব্য আমেরিকান ৪৯৭০০ জন ভারতীয়র মধ্যে সবচেয়ে বেশী মানুষ গুজরাত থেকে গেছে, দ্বিতীয় পাঞ্জাব থেকে, তৃতীয় মহারাষ্ট্র থেকে। গুজরাত মডেল, RSS এর আরেক ছানা APP ও মহারাষ্ট্রের ডবল ইঞ্জিন সরকারের রাজ্য গণতান্ত্রিক কাঠামোটা পরখ করে নিতে পারবেন এখানে। মোল্লা শাসিত গণতন্ত্রহীন মধ্যপ্রাচ্যে ভারতে অসুরক্ষিত ‘অত্যাচারিত’ হিন্দুরা কিসের আশায় আশ্রয় নিতে গেছে? এই ব্যাখ্যাটা যদি নাগপুর করে দেয় তো বড় ভালো হয়।

পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে কোনো হিন্দু চুরির পথে এদেশে এলে, সে সত্যিকারের ‘মোল্লাদের অত্যাচারের’ শিকার হয়ে যায়। তার আর কোনো ধান্দা আছে কল্পনা করাও যেন মহাপাপ। যুধিষ্টিরের পর সত্যবাদীতাতে একমাত্র মানদণ্ড হচ্ছে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী অবৈধ হিন্দুটি। এদের হয়ে রুদালি গাইতে ডান, বাম, রাম সব দলের একই নীতি, বিশেষ করে ব্যাক্তিটি যদি পঞ্চম প্রজন্মেরও বাঙাল হয়, সে ও ফুঁপিয়ে উঠছে রীতিমত। বস্তুত, যে ১৯৪৭ সালে এসেছে এবং যে ২০২৪ সালে এসেছে উভয়ের মধ্যে বক্তব্যের কোন পার্থক্য নেই। ধর্মীয়ভাবে হিন্দুর ক্ষেত্রে- আমি একবার ঢুকে পড়েছি অতএব এই দেশ আমার বাপের দেশ, আমি ফিরে যাব না। বাঙালদের পূর্ববর্তী, বর্তমান বা পরবর্তী প্রজন্মের ৯৯%কে দেখবেননা তারা দেশ রক্ষার কাজে নিয়োজিত হতে চেয়েছে বা চাইছে। দু একটা ব্যাতিক্রম ছাড়া কেউ ভারতীয় সেনাবাহিনী, বিএসএফ বা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হয়ে কাজ করেনা।

কদিন আগেও একটা প্রতিবেদন লিখেছিলাম এই বিষয়ে- কেন বাংলাদেশীরা এদেশে আসে! আচ্ছা, ধর্মীয় অত্যাচারের কারনে পালিয়ে এসেছে বলে যারা দাবী করে, তাদেরই বাবা, মা, বোন, মাসি, পিসি, মামা, কাকা, জ্যাঠা সহ অধিকাংশ আত্মীয়স্বজন গুলোকে কোন মোল্লার ভরষাতে ও দেশে রেখে আসে? কীভাবে তাদের পেট চলে বছরের পর বছর? কোন ইউনিয়নের কোন থানাতে গিয়ে তাদের উপরে হওয়া অত্যাচারের বর্ননা নথিবদ্ধ করে আসে? এদেশে একবার স্থায়ী হয়ে গেলেই, প্রতি বছর যে নিত্য দু-দেশের মাঝে যাতায়াত, সেখানে কেন কোনও সমস্যা হয়না ধর্ম নিয়ে? এত শয়ে শয়ে অবৈধ মুসলমান অনুপ্রবেশকারী দেখা যাচ্ছে উত্তর ২৪ পরগণার হাকিমপুর, নদীয়ার হাঁসখালি, সুন্দরবনের ফ্রেজারগঞ্জ সহ নানান বর্ডারে, এদের উপরে কোন ধর্মীয় অত্যাচার হয়েছিলো? 


আসলে ধর্মীয় মোড়ক হলো বুজরুকি, ভণ্ডামি, এবং ৯৯% মিথ্যাচার। ধর্মকে হাতিয়ার এদেশে ঢুকে পরাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য, যেমন ইউরোপ আমেরিকায় করে। আমেরিকা যেতে গেলে লক্ষ কোটির গল্প, ভাষার সমস্যা, চামড়ার রঙের সমস্যা। ভারতে সে সব বালাই নেই, উপরন্তু ২০০ টাকার খরচাতে ঢুকে পরা যায়। এই কারনে এরা ভারতে এসেছে, এর মধ্যে কোনো হিন্দু প্রেম নেই, কোনো হিন্দুরাষ্ট্রের গল্প নেই। একবার নিজের পা জমে গেলে তখন একে একে আত্মীয় পরিজনকে নিয়ে এসে স্থায়ী হয়। এদিকে ১৯৯৭ সালে কলকাতার পিজি হসপিটালে জন্মেছিল যে বাবুটি, যে জীবনে বাংলাদেশের বর্ডার চোখে দেখেনি, সে অবধি ফেসবুকে আড়াই লাইনের হ্যাজ লিখছে- মোল্লাদের অত্যাচারে ও দেশের লোক ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে।

মেদিনীপুর শহরের একটা ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে একটা প্রান্তে পুরো একটা ছোটখাটো গ্রাম গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের ভোলা জেলার মানুষদের দিয়ে। তাদের দাবী, আমফান ঝড়ে সর্বহারা হয়ে এদেশে চলে এসেছে। আইতে শাল যাইতে শাল, তার নাম বরিশাল; এই দেশে এসে গল্প শোনানো সেই লড়াকু বরিশালীদের ভোলার বুকে শুধু আইলা আমফান ঝড় আছড়ে পড়েনি, আমাদের দেশের অন্ধ্রপ্রদেশ, উড়িষ্যা, পূর্ব মেদিনীপুর কিম্বা দক্ষিণ ২৪ পরগনার মানুষেরা দগদগে ঘা নিয়ে নিয়মিত লড়াই করে টিকে আছে। নদী ভাঙ্গনে সর্বস্ব হারানো মালদা মুর্শিদাবাদের মোল্লারা কেউ আরব দুনিয়ায় ‘ভীর’ সেজে ছুটে পালিয়ে যায়নি। শুধুই মেদিনীপুর শহর নয়, হুগলি জেলার ডানকুনি, গোবরা, রিড়ষা, বাঁশবেড়িয়া, হাওড়া জেলার বাঁকড়া, রামরাজাতলা, বালি, বেলুড়, উত্তর ২৪ পরগনার বিধাননগর, নিউটাউন, গোপালপুর, সেক্টর ফাইভ সমেত বেশিরভাগ অঞ্চলে যা খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে তার সবগুলোই মূলত অবৈধ বাংলাদেশীদের দ্বারা গঠিত হিন্দু বস্তি।

বনগাঁ ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকা, নদীয়া, পূর্ব বর্ধমানের কথা আলাদা করে বললামনা, এখানে ঠগ বাছতে গাঁ উজার হয়ে যাবে। মেদিনীপুরের এই বাংলাদেশী লোকগুলো অবলীলায় বলছে আমাদের কার্ড থাকুক না থাকুক আমরা এদেশেই থাকবো, অর্থাৎ মধুটা ধর্মে নয়- কাজের সুযোগের গল্পে এমন মরিয়া হয়ে উঠেছে এদেশে থেকে যেতে। সুতরাং, মুখে স্বীকার করুক বা না করুক, তারা মোল্লার অত্যাচারে নয়, পাতি না খেতে পেয়ে চোরের মত রাতের আঁধারে দালাল ধরে সীমান্ত টপকে এসে এখন ‘হিন্দু’ সাজছে। এদেশে একবার পা জমে গেলেই এরা আমাকে আপনাকে দেশদ্রোহী বলে দাগিয়ে দেবে আর আরএসএস শিবিরে নাম লিখিয়ে পাকিস্তানের হয়ে গুপ্তচর বৃত্তির ইতিহাসে নাম লিখে অমর হয়ে যাবে।

২০১৬ পরবর্তী এ রাজ্যের যেকোনো সাল থেকে যেকোনো নির্বাচন মিলিয়ে দেখলে বুঝবেন, উদ্বাস্তু কলোনী গুলিতে সিপিআইএম তথা বামফ্রন্টের ভোট - তৃণমূল বা বিজেপির পেছনে তৃতীয় স্থানে দাঁড়িয়ে আছে। কোথায় গেল সেইসব বাঁশবেড়িয়া, কাটোয়া, দমদম, টিটাগড়, নোয়াপাড়া, বিজয়গড়, যাদবপুর, বেহালার লেলিন কলোনির আন্দোলনের ইতিহাস? পাথরের মত জমাট বাঁধা ভোট? ইতিহাসের কোন গহ্বরে লুকিয়ে গেল প্রশান্ত শূর জামানার পরবর্তী প্রজন্ম !

সেইকালে এরা সিপিএমকে ব্যবহার করেছিলো, রক্তে বেইমানি, তাই সিপিএমকে ল্যাঙ মেরে এদের উত্তর পুরুষেরাই আজ বলে কমিউনিস্ট মানেই দেশের শত্রু। স্বাভাবিকভাবেই আজকে যারা সদ্য সদ্য ভিখারিপনা করে এখন এদেশের নাগরিকত্ব দাবী নিয়ে হাহাকার করছে, পা জমে গেলেই এরা আমাকে আপনাকে দেশদ্রোহী হিসাবে দাগিয়ে দেবে, এদের জিনে রয়েছে হারামিপনা, বেইমানি, পলায়নপর ধান্দাবাজি।


আপনি এদের জন্য আহা ভেবে আকুল হয়ে যাচ্ছেন, প্রতিটা দলের আঁটি সেলের হ্যাজ আর ফরোয়ার্ডেড হোয়াটস্যাপ মেসেজের ভিড়ে আবেগের সিকনিতে বুক ভিজিয়ে ফেলছেন। কতগুলো ধান্দাবাজ, চিটিংবাজ, মিথ্যেবাদী, পলায়নপর মানসিকতা যুক্ত লোকের জন্য দরদ উথলে পড়লে বুঝে নিতে হবে, আপনার শরীরেও দিনের শেষে সেই একই জিন দৌড়াচ্ছে।। আবেগটা শুধু মাত্র সঠিক ব্যাক্তিদের জন্যই নাহয় সংরক্ষিত থাকুক, যারা সত্যি সত্যি বাধ্য হয়েছেন ছিন্নমূল হয়ে। প্রতিটি অবকাঠামোগত বিষয়ে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, খাদ্য, প্রযুক্তি, রেলপথ, সড়কপথ এবং বিমান পরিবহণে ভারত- বাংলাদেশ বা নেপালের তুলনায় বিপুল বড় এবং উন্নত নেটওয়ার্ক যুক্ত। ভারতের বিশাল অর্থনীতি এবং শিল্পায়নের কারণে এখানে উন্নত জীবনযাত্রা জনিত সুযোগ-সুবিধা ও বিলাসবহুল পণ্যের সহজলভ্যতা বেশি। উচ্চতর মাথাপিছু অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাধ্যমে জীবনযাত্রার উন্নত মান বজায় রাখা ভারতে তুলনামূলক সহজ। আর এটাই এই অনুপ্রবেশের একমাত্র কারন, এখানে ধর্মের ভাঁওতাবাজি স্রেফ মুখোশ।

একটা মিম বাজারে ঘুরছে, ‘বিবাহিত মহিলারা সাবধান হয়ে যাও। বহু পীড়িত স্বামী নাকি ইচ্ছাকৃত ভুলভাল SIR ফর্ম ফিলাপ করে দজ্জাল বৌকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিতে চাইছে ভায়া ডিটেনশন ক্যাম্প”। সন্দেহ নেই, বিষয়টা নিছক মজার জন্য বানানো, কিন্তু সত্যিই যাদের বাংলাদেশ বা ডিটেনশন ক্যাম্পে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাদের মাঝে ঠিক কতটা আতঙ্ক কাজ করছে তা আমরা কল্পনা করতে পারবনা কোনোভাবেই। ধান্দাবাজদের অবশ্য ততটা সমস্যা নেই, ওপাড় বাংলাতে তাদের সকলের বাবা, মা, আত্মীয় স্বজনেরা আছে। ছিন্নমূলদের পাশাপাশি সমস্যা হচ্ছে সেয়ানাদের, যারা উত্তরবঙ্গের সিতাই, হেমকুমারী, দক্ষিণবঙ্গের সন্দেশখালি, ধামাখালি, বয়রা, ঘোজাডাঙ্গা ও বনগাঁর আশপাশ দিয়ে দালাল ধরে রাতের আঁধারে এ দেশে ঢুকে ভেবে নিয়েছিলো- এটাই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, মোক্ষ লাভ হয়ে গেছে। ওপাড়ের সব ধীরে সুস্থে বেচে দিয়ে এপাড়ে এসে ‘ভিরাট’ হিন্দুবীর হয়ে বসে গেছেন- সমস্যা মূলত এনাদের।

সমস্যা আরেকটা গোষ্ঠীর আছে। গতবছর বাংলাদেশের পালাবদলের পর আওয়ামী লীগের বড় অংশের লোক ভারতে ঢুকে পড়েছিলো। এদেরকে হয়তবা খানিকটা ছাড় দিয়েই বর্ডার পেরোতে সাহায্য করেছিলো ভারত সরকার, সেই ফাঁকে আওয়ামীলীগের ছদ্মবেশে বহু ধান্দাবাজও ঢুকে পরেছিলো। তাই এখন, এমন মুসলমানও ধরা পড়বে, যারা আদব কায়দাতে একটু ভদ্রলোকও বটে, এরা কেউ কিন্তু স্থায়ীভাবে থাকতে আসেনি, প্রাণের ভয়ে পালিয়ে এসেছিলো। এতোদিন উভয়েই বেশ সানন্দ্যে ও সাচ্ছন্দ্যেই ছিলো, এখন মুসলমান গুলো ফিরে যাচ্ছে। ফলত, যাদের বর্ডারে দেখা যাচ্ছে এরা প্রায় সকলেই মুসলমান, কিন্তু যেগুলো হিন্দু আওয়ামিলীগ, তারা কিন্তু কোনোমতেই এ দেশ থেকে আর যেতে চাইছে না। 

সীমান্তের বিভিন্ন ভিডিওতে স্পষ্ট করে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশী মুসলমান মূলত কর্মসূত্রে এদেশে এসেছিল অবৈধ উপায়ে। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তারা ওই দেশের কোন জেলা, কোন ইউনিয়নে বাড়ি স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছে। পরিস্থিতি ও গন্ডগোলের কারনে ফিরে যেতে হচ্ছে বলে মনে কোন দ্বিধা দুঃখ নেই। কিন্তু হিন্দুরা কোনো শর্তে যেতে রাজি নয়। দালালের মাধ্যমে ভারতে ঢুকে এসে, তিন দিন পরে এরাই বলবে রক্ত দিয়ে কেনামাটি, ইত্যাদি। সুতরাং, বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী হিন্দু মানেই সে মুসলমানের অত্যাচারের শিকার ব্যাপারটা তেমন নয়। এতদিন এদেশের জলহাওয়া খেয়ে, বিজেপি-RSS এর সাথে থাকতে থাকতে একটা বুলি শিখে গেছে- আমাকে মোল্লারা মেরছে। এটাই তার কাছে এদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার গায়েত্রী মন্ত্র।


এই মুহুর্তে আমাদের সমাজের মূল সমস্যা তিনটে। প্রথম হচ্ছে বেকারত্ব, মানুষের হাতে কাজ নেই। দ্বিতীয়ত, ঘরে একটা গৃহসহায়ক, ড্রাইভার, মালি কিম্বা ভালো একটা কর্মচারীর সন্ধান করুন, দেখবেন লোক খুঁজে পাবেননা। অর্থাৎ কাজের মানুষ নেই। তৃতীয়, আমাদের আশেপাশে যে সকল লোকজন কাজ করছে, তাদের দিকে চেয়ে দেখুন; সেটা আমার আপনার ঘরে, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হোক, সর্বত্র একটাই সমস্যা- এরা কোনো কাজের নয়, পুরো বেকার লোকজন। বিশেষ করে সরকারী দপ্তরগুলোতে, দুটো লোকও সঠিক কাজের কাজী এমন পাবেননা খুঁজে। এটাই হচ্ছে দেশের মূল সমস্যা। সুলভ হলো শুধু সময়, সকলের হাতে বিপুল সময়। সুতরাং, জনগণ হুলিয়ে সারা সারা দিনরাত কূটকচালি, কলতলার ঝগড়া, খাপ বসানো, বিশেষজ্ঞ, আঁতেলপনা, ফুট কাটা ফুটো মস্তান, নীরব দর্শক, বিপ্লবী ইত্যাদির সাথে অকারন নিন্দাচর্চার জন্য সময়ই সময়। সোস্যাল মিডিয়াই আজকের মনোরঞ্জনের মূখ্য মাধ্যম, তাই SIR কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা ‘টপিক’ এর ঘাটতি নেই দেশে।

এপার ওপার বলে কিছু হয় না, হিন্দু মুসলমান বলেও নেই। দেশ ভাগ বাঙালির বুকে একটা দগদগে ঘা। কিন্তু দেশভাগের ছিন্নমূল হওয়ার ইতিহাস আর ধান্দাবাজির পলায়ন বৃত্তি দুটোকে এক সুতো দিয়ে বাঁধা যাবে না।


...ক্রমশ

শুক্রবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৫

SIR- একটি মানবিক বিপর্যয়


বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় সমস্যার প্রায় গোটাটাই হচ্ছে SIR এর কারনে, অন্তত রাজ্যের শাসক শিবিরের মতে সেটাই। প্রায় লক্ষাধিক BLO গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে কাজ করছেন নৈপুন্যতার সাথেই; তবে, প্রত্যেকের অতীতে শারীরিক অসুস্থতা হয়েছিলো, আগামীতেও হবে। কিন্তু এই মুহুর্তে অসুস্থ হওয়া মানেই সেটা ‘কাজের প্রেসার’। আচ্ছা, এই SIR এর সাথে যুক্ত না হলে এই ১ লক্ষ মানুষের কারো কোনো রোগজ্বালা হতোনা এই সমসাময়িক কালে? হাঁচি, কাশি, গ্যাস, অম্বল, আমাশা, মাথাব্যাথা, দাম্পত্য কলহ, পথ দুর্ঘটনা- যে কারো যখন খুশি মৃত্যুও তো হতেই পারত বা পারে! কিন্তু না, যেহেতু কালিঘাট অফিসিয়ালি SIR এর বিরোধী, তাই সব দোষ একা SIR এর।

SIR বিষয়টা ঠিক না ভুল, প্রসেসটা সঠিক নাকি বেঠিক, উদ্দেশ্য সাধু না অসাধু তা আলাদা ও বিষদ আলোচনার বিষয়, আজ আমরা সেখানে ঢুকবোনা। আজ একটু অন্য দিকটা দেখি।

একটা পোলিং বুথ মানে এলাকাটা একটা পাড়ার একটু বেশী। আজকাল একটা বুথে সর্বোচ্চ ভোটার সংখ্যা ১০০০ এর নিচে, ব্যাতিক্রমী ছাড়া, কমবেশী ২৫০টি পরিবার। ৮ ঘন্টা কর্ম দিবসের মধ্যে ৬ ঘন্টা করেও যদি ফর্ম বিলি ও জমা নেওয়ার প্রসেস চলে, সব মিলিয়ে সেটা ১৪ দিনও লাগেনা। ফর্ম ফিলাপের দায় BLO এর নয়, না সেখানে ভুল আছে কিনা তা অরিজিনাল নথির সাথে মিলিয়ে দেখার দায় রয়েছে। এরপর রইল এই ১০০০ ফর্ম অনলাইনে তুলে দেওয়া ঘরে বসে। আমাদের মত যাদের কোনও এ্যাকাডেমিক ডিগ্রি নেই কম্পিউটার বিষয়ে বা ডেটা এন্ট্রিতে, তারাও দিনে ৮০/১০০টা ফর্ম আপলোড করেই দেবো সারাদিনে- যখন এটাই আমার একমাত্র পেশাজনিত ডিউটি। এই কাজের মধ্যে সেই মহামারী ‘প্রেসার’টা কোথায়?

আমরা যারা ব্যবসা করি তারা সকাল ৭টার আশেপাশে দোকান খুলি, কেউ দুপুরে বন্ধ করি, কেউ করিনা। আবার রাত ৯টা অদধি ঝাঁপ খুলে প্রতীক্ষা করতে থাকি খরিদ্দারের। যারা গতরে খাটি, তাদেরও সামান্য অবসর বাদে বাকি কর্মদিবসের সময়টা শরীরের ঘাম রক্ত নিংড়ে নেয়। আমার নিজের বর্তমান পেশা ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলসের, হোটেলে থাকলে সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা অবধি সমানে টহল মারতে হয় যখন যে লোকেশনে থাকি। এর সাথে মার্কেটিং এর জন্য ৩টে ফোনে ৫টা সিম, একটা ট্যাব একটা ল্যাপটপে সমানে কল-মেসেজের জবাব, রেট দেওয়া, বার্গেনিং, আইটিনিনারি বানানো সবটাই একপ্রকার নিজেকে করতে হয়। যতই ম্যানেজারেরা থাকুক, রানিং টুরিষ্টদের নানান সুবিধা অসুবিধার একটা অংশ আমাকেই সামলাতে হয়।

তাতে রাত ১২টা না ভোর ৫টা বাজে সেই গণনা করার সুযোগই নেই! কাস্টমারকে রেট/আইটিনিনারি দিতে লেট করলে সে অন্যত্র পালাবে, আমার ভাগে ফক্কা। ভোটের ট্রেনে নেমে ড্রাইভারকে খুঁজে না পেলে ফোনটা আমাকেই রিসিভ করতে হয়। এরপর যেদিন যে কর্মচারী আসেনি, নিজেকে সেই পদে বহাল হতে হয়। ধোপা, কুক, হাউজ কিপিং, সুইপার, রিসেপসনিষ্ট, ক্যাশিয়ার, বাজার সরকার, দারোয়ান সব পদে স্বনিয়োজিত হতে হয়, কারন আমি জানি আমি গাফিলতি করলে লোকসান একমাত্র আমার। লোকের অভাবে পরিষেবায় ঘাটতি হলে টুরিস্ট সেটা বুঝবেনা, গুগুলে নেগেটিভ রিভিউ খেলে আমারই ব্যবসা ঝাড় খাবে। এরপর ব্যাঙ্ক, GST সহ অন্যান্য সরকারী অফিসিয়াল কাজ রয়েছে, সব কাজ এক সমান্তরালে চলতে থাকে, এবং বিষয়টাকে দারুন এঞ্জয়ও করি। অভিযোগ কিছু থাকলেও শুনছেটা কে?

আমি আমার তথ্যটা দিলাম, প্রতিটা বেসরকারি চাকুরে, ক্ষুদ্র বা মাঝারি ব্যবসাদার, শ্রমিক, কৃষকের একই হাল। প্রত্যেককে একই সাথে একাধিক ঝক্কি এক সমান্তরালে পোয়াতে হয়, এটাই জীবন, জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ জানতে বাধ্য হতে হয়। যেহেতু আমাদের মাসিক মাইনের সুরক্ষা নেই, PF নেই, DA নেই, গ্রাচুইটি নেই, পেনশান নেই- তাই আমাদের কখনই প্রচণ্ড ‘প্রেসার’ সেভাবে অনুভূত হয়না জীবনযুদ্ধের লড়াইয়ে। আসলে BLO লেভেলের কর্মীদের ‘আসল’ কাজের দায়িত্ব কতটুকু থাকে? হয় তাঁরা প্রাথমিক শিক্ষক/শিক্ষিকা বা গ্রুপ ডি কর্মী। তাদের কাজকে সম্মান জানিয়েই বলছি, তাদের চেয়ে একজন প্রাইভেট টিউটরকে অনেক বেশী শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম করতে হয়, অনেক বেশী দায়িত্ব আর অনেক বেশী জবাবদিহিতা করতে হয়, আর এটা রোজকার বিষয়। অনেক বেশী অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত হয় যেকোনো বেসরকারী কর্মী বা ব্যবসায়ীদের। তাই SIR এর ১ মাসের প্রেসারে যে কর্মীরা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছেন, তাদের সরকারী চাকরি থেকেও অব্যাহতি দেওয়ার ঘোষণা হোক। শরীরের সমস্ত ব্যাথা বেদনা পর মুহুর্তে গায়েব হয়ে গিয়ে আরবি ঘোড়ার মত মাঝরাত্রেও দেখবেন দৌড়াবে। এনারা বাস্তবিকিই আনফিট অকর্মন্য। ভাবুন একজন যেকোনো পদের আমলা, একজন পুলিশকর্মী, একজন ডাক্তার তাহলে কী পরিমান প্রেশার নেন রোজ!

কখনও ভেবে দেখেছেন যারা দিনমজুর, যারা পরিযায়ী তাদের কথা? যারা বৈধ হয়েও SIR এর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে তাদের কথা? যারা তথাকথিত ‘অবৈধ’- এদের না আছে কোন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, না আছে কোন সেভিংস, না আছে কোন পিছুটান। মরলে কোথায় কি নামে পোড়ানো হবে, নাকি কবর দেওয়া হবে কেউ কিছু জানে না। এবেলা কামিয়ে না আনলে ওবেলা কি খাবে তার কোন হিসাব নেই। সেখানে পরের দিন কি খাবে সেই ভাবনা তো বাহুল্যতা। তবুও স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে আগলে রাখে, তাদের সন্তানকে আগলে রাখে। যাদের বাবা-মা আছে, তাদেরকেও নিজেদের পাশে পাশে রাখে।

গরীব যে সকল মানুষ সামনের মাসে ‘অবৈধ নাগরিক’ হয়ে যাবে, সেই লোকটা কোথায় জন্মেছিল তার কোন ঠিক ঠিকানা রইবেনা। কোথায় কার সাথে কি ভাবে বিয়ে হইয়েছি তার কোন লেখাজোখা নেই, আদৌ কে তার নাম রেখেছিল, কি কারণে নাম রেখেছিল, কি ধর্ম, কি করেই বা তার ধর্ম ঠিক হয়েছিল তার কোন হদিশ পাওয়া যাবে না। কার সন্তান কার গর্ভে কবে জন্মগ্রহণ করছে, কি তাদের বয়স, কোথায় শিক্ষা হবে, কিভাবে শিক্ষা হবে, কি তাদের মাতৃভাষা হবে, কি তাদের শিক্ষার মাধ্যম হবে- কারোর কাছে কোন কিছুর হদিস থাকবে কী? পুঁজিবাদের কাছে শুধু এদের একটাই পরিচয়- কম পয়সায় লেবার। এদের কতজনের স্ট্রোক হয়েছে? কতজনের ‘প্রচন্ড প্রেসার’ নিয়ে মিডিয়া সরগরম হয়েছে? কেউ কি তার খবর রেখেছে?

কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে যখন নাৎসিরা ইহুদিদের ধরে এনেছিল তখনও তাদের একটা নাম ছিল, সংখ্যা ছিল, একটা অস্তিত্ব ছিল, আজকে যারা বাংলাদেশের বিভিন্ন বর্ডারের ধারে ভিড় জমিয়েছে তাদের অধিকাংশের সেটুকুও নেই। আপনি হয়ত মিডিয়ার পড়ানো চসমাতে দেখে ওদের মুসলমান বা হিন্দু হিসাবে দেখছেন, আসলে তো তারা আমার আপনার মত রক্তমাংসের মত মানুষ। অথচ কী নির্লিপ্ত। একজন অবলীলায় বলে চলেছে- আমাকে আবার মায়ানমারের ওই রিফিউজি ক্যাম্পে ফেরত যেতে হবে। সাথের মহিলাটা অনেক বেশি সজাগ, সে বলছে- ওখানে যাওয়া যাবে কিনা সেটাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। পৃথিবীর ইতিহাসে যারা ঘোষিত যাযাবর জাতি তাদেরও একটা চলার ছন্দ ছিলো বা আছে, এদের ক্ষেত্রে সেটুকু খুঁজে পাওয়া গেল না, এটাই চরম আফসোস।

আগামীতে SIR কেন্দ্রিক শয়ে শয়ে মহাকাব্য লিখবেন সাহিত্যিকেরা, কিন্তু আমরা চোখের সামনে যেগুলো দেখছি দু-একটা, যদি সেখান থেকে কিছু তুলে রাখা যেত আগামী প্রজন্মের জন্য, তাহলে তারা সিনেমা উপন্যাস কিংবা অন্য কোন মাধ্যমের কাছে আদান-প্রদানের জন্য গবেষণার কাজে ব্যবহার করতে পারত। এই ‘নেই’ মানুষদের মধ্যে যৌন উত্তেজনা স্বাভাবিক, শুধু সেই কামনার বসেই হয়তো অনেক মানুষের জন্ম হয়ে গেছে- সেই দোষের দোষী এই নব প্রজন্মটা, সে জানেইনা কোন দোষে তার কোনো দেশ নেই। পাল ছিঁড়ে যাওয়া নৌকাটা কোনদিকে যাবে সে জানেনা, কিন্তু এটুকু অন্তত জানে যে আমি নদীর বাইরে যাব না। এর ক্ষেত্রে সেইটুকু নিশ্চয়তাও নেই।

আমাদের মত স্থায়ী বাসিন্দা হবার সৌভাগ্য যাদের জুটেছে, তাদের সবচেয়ে গরিব যে মানুষটা দিন আনে দিন খায়- তারও কিন্তু একটা নিজের ঠিকানা রয়েছে। খেয়াল করে দেখবেন, আপনার হয়ত শরীর চলছে না, হয়তো ব্যবসা বা পেশা আপনাকে সেভাবে সহায়তা করছে না, কিন্তু আপনি জানেন যে আমার একফালি জমি আছে গাঁয়ে, যেখান থেকে ফসল ফলিয়ে অন্তত বেঁচে যাব, কিম্বা দিনমজুরি করে খাবো। দুর্ঘটনাতে বা অপঘাতে মৃত্যু হলেও শব যাত্রায় অন্তত চারটে লোক যাবেই, যদিনা দূর বিদেশ বিভূঁইতে বেওয়ারিস হয়ে মারা যায়। এখানে যারা ‘অবৈধ’, তার জাত যা খুশি হোক, সেই লোকটা মরলে তার হয়ে কাঁদার মত কেউ থাকছে না। একটা দল এগিয়ে চলেছে অজানার দিকে, এতদিনের চেনা পরিচিত পরিবেশ, পাশের লোককে ফেলে দিয়ে। তার জন্য অনুশোচনা করার সময়টুকু অবধি কারো নেই। ছিন্নমূল শব্দটা শুনেছিলাম, এভাবে চোখে দেখার জন্য প্রস্তুত ছিলামনা মোটেও।

কটাদিন ধরে আমি কিছুই লিখতে পারছি না, মানে কিরকম একটা করছে শরীরের ভেতরটা। পলায়নরত মানুষের ইন্টারভিউ গুলো দেখছি আর শুনছি, ভাবলেশহীন শূন্য চোখ গুলো দেখে বুকের ভেতরটা কি রকম কেঁপে কেঁপে উঠছে। এই পরিবেশ পরিস্থিতিতে কে তৃণমূল কে বিজেপি কে সিপিএম, এই সব ছাপিয়ে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টা বড় হয়ে উঠেছে। ৩০ বছর পর যারা আজকের দিনকে পিছন ফিরে দেখবে, তারা আজকের এই অসহায় পরিস্থিতি নিয়ে, মানবিক বিপর্যয় নিয়ে আলোচনা করবে। তৃণমূল বা বিজেপি কেউ কোথাও থাকবেনা সেদিন। তৃণমূল নামটারই অস্তিত্বই হয়ত মুছে যাবে। সেদিন আলোচনার বিষয়বস্তু থাকবে শুধু কম পয়সার লেবার, অর্থনীতি, মানবিক বিপর্যয় এবং মানুষের অসহায়ত্ব।


হিন্দু, মুসলমান, বিজেপি, তৃনমূলের বাইরে গিয়ে আপনি কীভাবে দেখছেন গোটা প্রক্রিয়াটাকে?

বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৫

দাম্পত্য কলহঃ নেপথ্যে

 

কলহ

আমদের ব্যাক্তি জীবনে প্রত্যেকের নিজ নিজ নীতি ও আদর্শ রয়েছে। সৎ মানুষের সৎ নীতি, সৎ আদর্শ; অসৎ এর তার নিজের মত করে, নীতিহীনের আদর্শ দুর্নীতি- ক্ষ্যাপা ছাড়া প্রত্যেকে আমরা আদর্শের উপরে মোটামুটি অটল থাকি। এরপর রোজ জীবনে বহু ঝড়ঝাপটা আসে, রোজকার লড়াই নিজের নিজের মত করে নিজ নিজ পরিসরে লড়তে হয়। বহু ভাবে আমরা আদর্শচ্যুত হই রোজ, আপস করি, দ্বন্দে ও ধন্দে পরে নিজেকে দুমড়ে মুচরে নিত্য ভাঙাগড়া করে নিই- বেঁচে থাকার প্রয়োজনে। জীবন খরস্রোতা নদীর মত, পরিকল্পনার ধার ধারে না। তাই দৈনিক কিছু সমস্যা অযাচিতভাবে উদয় হয়। তবে মনের অন্দরে ‘আমি একলা’ অনুভূতি ঢুকে গেলে, যাবতীয় সম্পর্কের চেনা পরিসরটাও অচেনা লাগা শুরু হয়। ক্রমশ চির চেনা ‘আমি’র সাথেই দুরত্ব বাড়তে থাকে

বাচ্চা বয়সে যত দ্রুত শিখি আমরা, ভুলেও যায় তত দ্রুতই। সাইকেল চালানো বা সাঁতারের মত কিছু অভ্যাস ব্যাতিরেকে বাকি সমস্ত শিক্ষাকে নিয়মিত অনুশীলন না করলে ভুলতে বেশী সময় নেয়না আমাদের মস্তিষ্ক। সামাজিক ও সম্পর্কের জটিল বিষয়গুলো উন্মত্ত যৌবনে আমাদের মাথার উপর দিয়ে বয়ে যায়, কিন্তু আমাদের এই চল্লিশের কোটার বয়সটা বড্ড দুর্বোধ্য, কে ঠকাচ্ছে, কোনটা রহস্যময়, কোনটা ছলনা, কোনটা অস্পষ্ট, কোনটা ইচ্ছাকৃত পর্দাটানা হয়েছে, এই সকল নিগূঢ় বিষয় গুলো মস্তিষ্ক ধরে ফেলে। ধরে ফেলার পর বিশ্লেষণ করে একটা সিদ্ধান্তেও এসে পৌঁছে যায়, সমস্যা হলো স্পষ্টভাবে মনের সেই ভাবকে প্রকাশ করতে পারিনা। একটা সামাজিক সংশয়, চক্ষুলজ্জা জনিত কুন্ঠা, সম্ভাব্য অস্থিরসঙ্কল্পতা, মানসিক অনিশ্চয়তা- স্পষ্টবাদী হতে নিবৃত্ত করে আমাদের।

তাই চোখের সামনে গোটাগোটা মিথ্যাচার, মোটাদাগের ছলনাময় মৈত্রী বা অনুরক্তি, কৌশলগত কথোপকথন, এর সাথে নির্লজ্জ ও বেহায়ার মত একটা ব্যবধানের সীমারেখা টেনে নেওয়াকে আমরা কেবল সহ্য করে নিই। অসহনীয় হয়েছো মানেই ধরণী পপাত চ। সমস্যা তার বেশী হয়, যে নিজে থেকে আগ্রহী হয়ে সম্পর্কের ছিঁড়ে যাওয়া তন্ত্রীটিকে আবার গিঁট বেঁধেছিল। সে না পারে কইতে, না পারে সইতে। এক দমবন্ধ প্রেসারকুকার পরিস্থিতি জীবনের স্বাভাবিক স্বস্তি কেড়ে নেয়

কেন হয় এই অশান্তি?

মনোবিজ্ঞানের গবেষণা বলে, প্রায় ৭০% দাম্পত্য কলহের পেছনে সরাসরি দায়ী ভুল যোগাযোগ বা যোগাযোগের অভাব। কী বলছি, কী বলতে চাইছি তার মধ্যে আকাশ পাতালের ফারাক। মন দিয়ে শুনতেই চায়না কে কী বলছে, ফলত অধিকাংশটাই অনুমান করে নিতে হয়। বহু দাম্পত্যে যখন তারা একত্রে বসার সময় ও সুযোগ পায় পৃথিবীর সমস্ত কাজ ও দায় মিটিয়ে, তখন সেই মুহুর্তেও কেউ অফিসের কাজে, ফোন ঘাঁটতে বা বই পড়তে ব্যস্ত হয়ে যায়, কেউ কেউ আবার ঘুমিয়ে যায় অদ্ভুতভাবে। এরপর যখন সোহাগ ভালবাসার প্রশ্ন আসে, কথা মন দিয়ে শোনা তো অনেক দূর- সম্ভাষণেই রাগে ফেটে পড়ি। সামান্য ভুলগুলো, যেগুলো আসলেই পাতি গুরুত্বহীন, সেই বিষয় গুলোর ব্যাখ্যা নিয়ে দিন রাত ঝগড়া অশান্তি নিত্যকার চিত্র হয়ে উঠে। আমাদের দম্ভ, জেদ, অহংকার ভুলিয়ে দেয় যে- স্পষ্ট, সরল ও সময়োপযোগী যোগাযোগই ভুল বোঝাবুঝির প্রাথমিক প্রতিষেধক

এর সাথে থাকে অতীতের আঘাত ও অবিশ্বাস, যে ক্ষত পুরোপুরি শুকায় না, ফলত বারবার ফিরে আসে। নতুন প্রতিটি ঘটনাকে পুরাতন চশমা দিয়ে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়, সামান্য নির্বিরোধী নির্দোষ আচরণও সন্দেহের চোখে দেখা হয়। অবিশ্বাসের পরিবেশে অশান্তির ছত্রাক নিজের স্বাধীনতায় কলেবরে বৃদ্ধি পায়। এই দুরত্ব ক্রমশ একে অপরের কাছে অভিব্যক্তি প্রকাশে অনীহা প্রকাশ করে, কিম্বা প্রকাশ করলেও সেটা ভুল পদ্ধতিতেই করে। ফলত নিজের কষ্ট, অভিমান, চাহিদাগুলো জমতে জমতে হঠাৎ কোনও তুচ্ছ ঘটনার মাধ্যমে বিস্ফোরিত হয়। এই রাগ বা কষ্ট প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে চিৎকার, খিস্তিখেউর জন্ম দেয়

বাজারে সামান্য বেগুন কিনতে গেলে টিপেটাপে দেখে বুঝে কিনি, কিন্তু যখন প্রেমের সম্পর্কের মাধ্যমে আমরা জীবন সঙ্গী নির্বাচন করি, যার সাথে গোটা জীবন কাটায় আমরা- সেখানে তেমন বাছবিচার করিইনা একপ্রকার। অথচ জীবনের সবচেয়ে কাঠিন ও জটিল এই অধ্যায়ে প্রবেশ করার জন্য ভাবা উচিৎ ছিলো। বরং বলতে পারা যায় যে আমরা ঝাঁপ দিই- কিছু না শিখে, না জেনে এবং না বুঝে একেবারে অপ্রস্তুত অবস্থায়। ফলত, সর্বপ্রথম মন ভেঙে যায়, এই পথ বেয়ে অর্ধেকের ঘর ভেঙ্গে যায়, বাকিদের ঘর হয়ত টিকে যায়, কিন্তু শান্তি নেই হয়ে যায়। এই কারণেই সংসারে থেকেও অনেকেই একাকিত্বে ভুগতে থাকেন। এটা এমন একটা সমস্যার ফাঁদ, না কাউকে বলা যায় আবার সহ্যও করা যায়না

জীবন রুটিন মেনে চলেনা, সে তার নিজস্ব ছন্দে চলে। যেখানে দুটো আলাদা আলাদা মানুষকে উভয়ের সাথে তাল মিলিয়ে একটা ‘কমন’ ছন্দ বানাতে হয়, সেখানে উভয়কেই কিছু ছাড়তে হয়, কিছু ধরতে হয়। পরিস্থিতি কখনো কখনো এমন হয়ে দাঁড়ায় যে, এই সম্পর্কের কুম্ভীপাকে আর সব বাস্তবতাই মনে হয় তুচ্ছ। সর্বক্ষণ এক অদৃশ্য পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের মোকাবিলা করাই তখন জীবনের বড় চ্যালেঞ্জ। এখানে উত্তরপত্রে নির্দিষ্ট জবাব লিখলে সফলতা মেলেনা, লিখতে লিখতে বারবার সময়ের পাতা উল্টে অতীতের সাথে বর্তমানকে মিলিয়ে, ভবিষ্যৎ কল্পনা করে করে উত্তর লিখে যেতে হয়। সময় প্রতি মুহুর্তে বদলে যাচ্ছে, তার সাথে বদলাচ্ছে বাস্তবতা, সেই মত একই প্রশ্নের শত সহস্র উত্তর তৈরি হয়ে যাচ্ছে। সেই জবাবকে সময়মত ধরতে না পারলেই ব্যর্থতা চিরসঙ্গী। এভাবেই একসময় সময় পেরিয়ে যায়, সব প্রশ্নের উত্তর জানা থাকা সত্ত্বেও ঠিকভাবে লিখতে না পারার ব্যার্থতা- জীবনকে কঠিন করে তোলে

আসলে আমরা সুস্থ থাকার লোভের ফাঁদে পরে, স্থিতিশীল জীবনকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলি। একা থাকার নানা অসুবিধা আছে, কিন্তু সুবিধা হচ্ছে দায় নিতে হয়না, জবাবদিহি নেই, বাধ্যবাধকতা নেই। এখানে এসেই স্বেচ্ছাচার আর স্বাধীনতার সুক্ষ ফারাক টুকু ঘুঁচে যায়। ভেতরে জমে রয়ে যায় কঠিন নীরবতা। ছোট্ট একটি কথার জের, কাজের বাহানাতে উপেক্ষা করা একটি ফোনকল বা মেসেজ, অজান্তে বা অনিচ্ছাকৃত করা কোনও মন্তব্য– এগুলোই সমস্যা তৈরি করে দুজনের মাঝখানে। প্রতিটি জীবনের নিজস্ব গতির ছন্দ রয়েছে, কিন্তু একটা নিভৃত পরিবারেরও রয়েছে নানা প্রত্যাশার চাহিদা। এই তাল মেলাতে গিয়েই অশান্তি আমাদের নিত্যসঙ্গী। এতে সম্পর্কের ভিতটা যেমন টলমল হয়ে যায়, তেমনই উষ্ণতাও ক্রমশ মিইয়ে যায়। তখন পরে থাকে কিছু তাত্ত্বিক কচকচি, আর বাস্তব জীবনে প্রয়োগের অনুপযোগী কিছু হারানো স্নিগ্ধতা

জীবনের এই বাঁকে এসে দাম্পত্য বিষয়টি সমস্যার পর্যায়ে চলে যায়, অকারনে আমাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা এবং হতাশার উপসর্গ দেখা দেয়। অস্থিরতা বোধ নিত্য সঙ্গী হয়ে যায়, দুশ্চিন্তার মুহূর্তে হাত-পা ঘামতে থাকা, বুক ধড়ফড় করা আমাদের ভয়াবহ হতাশায় ডুবিয়ে দিয়ে বিষণ্ন করে তোলে। আমাদের খাবারে রুচি কমে যায়, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, বহুলাংশে নিজেকে বন্দি বানিয়ে ফেলি, অসামাজিক হয়ে যায়, ফলত নানা ধরণের ক্রনিক অসুস্থতার উপসর্গ দেখা দেয়। যা সত্যিকারের অসুস্থ করে তোলে

এক্ষেত্রে কোনো স্থায়ী আদর্শলিপি মানা সমাধান নেই। হয় ভোগ করে যেতে হবে, মন্থনে একদিন অমৃত উঠবে- এই আশাতে নীলকণ্ঠ হয়ে অবেগ অনুভূতি বিসর্জন দিয়ে পদ্মপাতার মত পাঁকে থেকেও জলস্পর্শ না করে টিকে থাকতে হয়। অথবা সর্বত্যাগী হয়ে একা-বোকা ঋষি সুলভ সন্ন্যাস জীবনে জ্ঞানার্জনের পিছনে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া। দুটোই কঠিন, কিন্তু তৃতীয় কোনো উইন-উইন সমাধান কিছু নেই

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...