আসলে সরকারি অবরোধ আজকাল অত্যন্ত সহজ হয়ে গেছে। কয়েকজন মুর্খ মিলে শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে প্রায় লাটে তোলার যোগাড় করে দিয়েছে, যাদের আমরাই ক্ষমতায় বসিয়েছি। চোরাবালির ফাঁদে আঁটকা পড়ে গেছি আমরা, প্রতিটা মুহূর্তে একটু একটু করে ডুবে যাওয়াই নিয়তি।
এ অবস্থায় একে অন্যের হাত ধরাধরি করে না চললে আমাদের আগামী বলে আদৌ কিছু থাকবে না। সুতরাং সত্যজিতের কথা ধার করে বলাই যায়-
“না না না না
আর বিলম্ব নয়
আর বিলম্ব নয়
আর বিলম্ব না না
আর বিলম্ব নয়
এখনো মোদের শরীরে রক্ত
রয়েছে গরম, মেটেনি শখ তো
আছে যতো হাড় সবই তো শক্ত
এখনো ধকল সয়
এখনো আছে সময়
এখনো আছে সময়
আর বিলম্ব নয়
আর বিলম্ব না না
আর বিলম্ব নয়”
বাস্তব বলছে- ট্রাম্প হেরে যেতেই করোনা গায়েব, শুধু ভ্যাক্সিনের কারবারিরা জিইয়ে রেখেছে করোনা ভীতি। দেশের সমস্ত কিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছে। বাজার-হাট, শপিং মল, যানবাহন, সিনেমা হল, ধর্মস্থান, কীর্তন-জলসা, মদের ঠেক, রাজনৈতিক মিটিং-মিছিল, পিকনিক, ভ্রমণ, ক্রিকেট-ফুটবল সব হচ্ছে; সরকারি-বেসরকারি কর্মচারীরা অফিস যাচ্ছে ভিড় ঠেলে, ব্যবসায়ী সফর করছে, কৃষকেরা আন্দোলন করছে, সরকার দমন করছে, আম্বানি-আদানি দেশ কিনছে, তারা রোজ গুণিতক হারে ধনী হচ্ছে, আলু-পেঁয়াজ-সরষের তেল সহ নিত্য পণ্যের দাম আকাশ ছুঁচ্ছে, দেশ বিদেশে আমদানি-রপ্তানি হচ্ছে, সর্বত্র চুটিয়ে বিকিকিনি আনাজ হোক বা MLA, চাষীরা কাজ করছে শস্য হোক বা ঘৃণা, অটোওয়ালা ৬ জন প্যাসেঞ্জার তুলছে, পুলিস ঘুষ খাচ্ছে, থিকথিকে ভিড় বাসের খালাসি গেটের মুখ থেকে ঝুলে ঝুলে চেঁচিয়ে যাচ্ছে ‘ভিতরে ফাঁকা সেখানে যান’, সেনারা যুদ্ধ করছে সীমান্তে, উকিল দিন গুণছে, ডাক্তার ছুরিতে শান দিচ্ছে; সবই হচ্ছে গতানুগতিক ধারায় সাবলীলভাবে- শুধু ইস্কুল খোলা যাবে না।
- “ওরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে” এবং “জানার কোনো শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই”
পাঠশালা কখনই শাসকের পক্ষে সুখকর নয়, তা কল্পিত হীরক রাজ্য হোক বা বাস্তবের ভারতভূম- এ সত্য আবার প্রমাণিত। বিশ্বে অধিকাংশ দেশে স্কুলিং চালু হয়ে গেছে আর ৪-৫ মাস হতে চলল। আমাদের পড়শি দেশ সহ অনেক দেশ আছে যাদের ইস্কুল-কলেজ বন্ধই ছিল না, তারাও আমাদের মতো এমন জনবহুল রাষ্ট্র, সেখানে শিশু মড়ক লেগে গেছে? প্রতিটি উন্নত দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে, খোদ আমেরিকাতেও চালু।
তবে কোনো কোনো শিক্ষিত রাষ্ট্রপ্রধান আছে, যারা বলতে পারে-
“We cannot and will not allow our children and young people’s futures to be another victim of this disease,”
- Irish prime minister ‘Micheál Martin’
তাই এভাবে আমাদের বাচ্চাদের ইস্কুল বন্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন নাগরিক সমাজ। আজকের সরকার কাল চলে যাবে, ক্ষমতাবানেরা তাদের সময় চুটিয়ে উপভোগ করে নিয়ে তারাও হারিয়ে যাবে, মাঝখান থেকে আমার আপনার ঘরের বাচ্চাটি পড়াশোনার অভ্যাসটাই ভুলে যাবে বা গেছে। নতুন করতে আবার অভ্যাস করতে অনেকের গোটা বছর লেগে যেতে পারে, আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান গবেষকের দলের দাবী এটা। কত বাচ্চা যে ইস্কুলে ফিরবে না তার কোনো হিসেব-নিকেশ আছে আমাদের সরকারের কাছে? অর্থনৈতিক মন্দায় তারা বাধ্য হয়ে শিশুশ্রমিক হয়ে পেটের ধান্দায় লেগে পড়েছে। সুতরাং সকল খারাপ ফলাফল বাচ্চাটিকেই ভুগতে হচ্ছে ও হবে।
আমাদের সরকার ও বিরোধী দলগুলো ধর্ম, হিন্দু-মুসলমান, ভোট আর ক্ষমতা দখলের বাইরে কোনো অ্যাজেন্ডা রাখেনি তা কেন্দ্র হোক বা রাজ্যগুলো। মিডিয়াও হিন্দু-মুসলমান, পাকিস্তান, ক্রিকেট, আর সেলিব্রিটিদের কেচ্ছা-কাহিনীর বাইরে বেরোবে না বলে ঘোষিত পণ করে রয়েছে। এ অবস্থায় আমি আপনি ছাড়া কেউ বলবে না, কারণ আমার আপনার সন্তান মূর্খ থাকলে মিডিয়া বা নেতাদের কিচ্ছু যায় আসে না। নেতার কাছে শিক্ষিতর ভোটের মূল্য অশিক্ষিতের সমানই। মিডিয়া বোঝে বাজারে ‘কী খাবে’, এর সাথে শিক্ষার সংযোগ নেই।
অতএব, নিজের জন্য আওয়াজ তুলুন, এখনই।
করোনার ভয় আর সেভাবে পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। ভ্যাক্সিনের কারবারিদের ভয়ের আবহ জিইয়ে রেখে ভ্যাক্সিন বেচে মুনাফা কামাবার স্বপ্নে জল পড়ে গেছে আপাতত। ‘অক্সফোর্ড-সিরাম-গেটস’ গোষ্ঠী এখন সরাসরি মূর্খ সরকারকে টার্গেট করেছে বিনিয়োগ তুলতে। ১০০ কোটি মানুষকে টার্গেট করে ভ্যাক্সিন বিক্রির চেয়ে ডাইরেক্ট সরকারকে বেচলে একলপ্তে মুনাফা কামানো অনেক সহজ। এতে নেতাদেরও ইন্টারেস্ট আছে, তাদের পার্টি তহবিল ফুলে ওঠার পাশাপাশি অনেকের বালবাচ্চা-ভাইপো-ভাগ্নেরা কয়েক প্রজন্ম বসে খাবে কাটমানির দয়ায়। তাই ভ্যাক্সিন বাজারে এলে আপনাকে সরকারই দিয়ে দেবে, তার স্বার্থ আছে সেখানে।
এরপর লোকাল ট্রেনে দাদ-হাজার মলমের সাথে করোনা ভ্যাক্সিন ফেরি করতে দেখলেও দেখতে পারেন। খুচরো না থাকলে আজকাল শপিং মলে লজেন্স টফি দেয়- কাল হয়ত এক ড্রপ করোনার ভ্যাক্সিন দেবে খুচরোর পরিবর্তে।
আপনার বাঁচামরা আপনার দায়, আপনার শিশুর ভবিষ্যৎ আপনার দায়। করোনা আপাতত গেলেও ভ্যাক্সিনের পিছনে টাকা লাগানো পুঁজিবাদী হাঙরেরা যাবে না, তাদের অতৃপ্ত আত্মা আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখে মহামারীর গুজব ছড়াবে। তারা আবার ২০২১ এর শীতে করোনা জুজু ফিরিয়ে আনবে। কদ্দিন সন্তানকে ঘরে বসিয়ে রাখবেন?
দুটো সমান উচ্চতার লাঠিকে কীভাবে অন্যটির চেয়ে একটিকে বড় করবেন? সোজা হিসাব- একটিকে ভেঙে ছোট করে। আপনার সন্তান শিক্ষায় পিছিয়ে গেলে কিম্বা শিক্ষা ছুট হয়ে গেলে প্রতিযোগী দেশগুলোর লাভ। আমাদের অশিক্ষিত, গাম্বাট, মূর্খ ও মিথ্যুক রাজেনেতাগুলোর এটা বোঝার ক্ষমতা নেই, তারা ক্ষমতা দখলের রাজনীতি করতেই ব্যস্ত। সুতরাং, মহামারী আসার হলে সে আপনাকে ঠিক খুঁজে নেবে, বাঙ্কারের নিচেও। এক্ষেত্রে ভাইরাস আমাদের বাচ্চাদের ক্ষতি করুক বা না করুক- অশিক্ষা মহামারী হবে এভাবে চললে, তার থেকে কোন ভ্যাক্সিন বাঁচাবে?
কল্পনার হীরক রাজ্যে তবু একটা উদয়ন পন্ডিত ছিল, এই বধিরের রাজ্যে কেউ কি পন্ডিত বেঁচে নেই যিনি চেঁচিয়ে সত্য বলতে ভয় পান না? নাকি উদয়ন পন্ডিতেরই মগজধোলাই হয়ে গেছে? জানি উত্তর দেওয়ার কেউ নেই, গুন্তিতে অগুন্তি ‘Teacher’ থাকলেও তারা সিংহভাগই মেরুদন্ডহীন। কিছুজনের মুখে বুলি আছে, অবশ্য তারা ভোটের ডিউটিতে যাব না আর প্রাপ্য DA চাই আন্দোলনে ভীষণ ব্যস্ত। ইস্কুল খোলার বিষয়ে কেউ নেই, অথচ ফেসবুকে শয়ে শয়ে ‘টিচার গ্রুপ’, DA, মিউচুয়াল ট্রান্সফার, মজলিশি আড্ডা, গেট্টু প্রোগ্রাম আর শখের কাব্যচর্চার বাইরে সময় কোথায় বাকি কিছু নিয়ে ভাবার?
স্যার/ম্যাডাম আপনাকে বলি, আপনারা তো শিক্ষক, পথপ্রদর্শক। দেশের আগামী প্রজন্মকে আপনারাই তো শেখাবেন- আসুন না, আরেকবার এগিয়ে আসুন। বলুন না চেঁচিয়ে সকলকে, কোনটা সত্য কোনটা মিথ্য। দেশ-বিদেশের তত্ত্ব, তথ্য, প্রবন্ধ, প্রতিবেদন, রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, চিকিৎসা বিজ্ঞান, WHO ইত্যাদি বিষয়গুলো সম্বন্ধে তো পড়ছেন, শুনছেন, জানছেন- কতকগুলো উন্মাদের কান্ডকারখানার বাইরে অন্য কিছু মনে হয়েছে তাদের দেখে?
দুর্ভাগ্যক্রমে যদি না পড়ার সৌভাগ্য হয়ে থাকে তাহলে নিচে ইউনিসেফ সহ বেশ কিছু লিঙ্ক দিলাম, দয়া করে পড়ে নিন। খোদ ইউনিসেফ বলছে বাচ্চাদের ইস্কুলে পাঠান স্বাস্থ্যবিধি মেনে, পড়ুন সেটা। কত মেয়েবাচ্চা আর ইস্কুলে ফিরবে না সেই প্রতিবেদন পড়ুন, কেমব্রিজের গবেষকের থিসিস পড়ুন। জানুন- ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা, কানাডা, পূর্ব ও পশ্চিম এশিয়া কোথাও আর ইস্কুল বন্ধ নেই। অনলাইনে শিক্ষা ব্যবস্থা হবে না আমাদের মতো গরিবের দেশে। প্লিজ বলবেন না আবার- “ইংরাজিটা আমার ঠিক আসে না…”। ছেড়ে দিন, এক আধটা বাংলাও দিলাম ‘ট্যাঁকের জোরে’ যারা চাকরি পেয়েছেন তাদের জন্য।
পড়ার পরে বলুন- কেন এখনও আপনারা চুপ রয়েছেন?
আপনাদের যদি ভাল আর মন্দের বোধ না জন্মায় কীসের শিক্ষক আপনারা? ছাত্রদের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকুক বা না থাকুক আপনার নিজের কর্মের প্রতি দায়বদ্ধতা দেখিয়ে এখনই প্রতিবাদের সাহস না পেলে আপনাদের সাথে পুরসভার সাফাই কর্মচারি ভাই-দিদিটির পার্থক্য কী? দুজনেই পেটের দায়ে চাকরি করেন, এটাই মিল। পৃথিবীতে কোন সরকারি-বেসরকারি কর্মচারি গোষ্ঠী আজকের দিনে ঘরে বসে আছে বা নাম কা ওয়াস্তে এক আধাদিন ‘ঘরেই তো বসে আছি, যাই একটু ঘুরে আসি’ মনোভাবে হাওয়া বদল করে আসেন একঘেঁয়েমি কাটাতে।
সামাজিক স্খলন, সরকারি কর্মকর্তা সহ রাজনেতাদের দুর্নীতি বিষয়ে আপনাদের সমাজের মুখে কুলুপ কয়েক দশকের ঐতিহ্য, তাই ওই বিষয়ে আপনাদের থেকে কেউ কিছু আশা করে না। কিন্তু DA নিয়ে আন্দোলনের পাশাপাশি ইস্কুল খোলা নিয়েও দু'চার কথা বলুন, ওটাই তো আপনার কর্মস্থল স্যার/ম্যাডাম।
সরকার বদলালে DA পাবেন, হয়ত বা এই সরকারই দেবে তা আদালতের রায়ে- কিন্তু দীর্ঘদিন কিন্তু বসে মাইনের সুখ থাকবে না স্যার-ম্যাডাম। যারা DA দেয় না, দীর্ঘদিন চাকরি দেয় না- তারা যে চাকরি খেয়ে নেবে না তার গ্যারান্টি কে দিয়েছে আপনাকে? সেদিন আপনিও প্রতিবাদ করতে চাইবেন, চিৎকার করবেন যন্ত্রণায়- কেউ শুনবে না সেদিন।
তাই সময় থাকতে শুভবুদ্ধি জাগ্রত করুন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলুন- আমি শিক্ষক। আমিই তো শেখাব ভাল ও মন্দের ফারাক। দেখবেন অনেক ফুরফুরে লাগছে। আর বসে মাইনে পাওয়ার সুখে ‘ঝামেলা এড়িয়ে’ যদি শীতে পিকনিকের প্ল্যান করেন কাজ নেই বলে- জানবেন ইতিহাসের থাপ্পড় কিন্তু নির্মম।
আমরা আজও স্বপ্ন দেখি, কোনো এক উদয়ন পন্ডিত এখনই বলে উঠবে – “দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খানখান”। রাজা খানখান না হোক, তার পাঠশালা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত খানখান হয়ে আবার শ্রেণীকক্ষগুলো ভরে উঠুক কচিকাঁচা ফুলে, শিক্ষার মধু আহরণে। শিক্ষকেরা আবার গড়ে তুলুক জাতিকে, যে জাতির মাঝে মেরুদন্ড থাকবে, শতসহস্র উদয়ন পন্ডিতে ছেয়ে যাক সমাজ।
পুনশ্চঃ- আমার কথা তেতো লাগলে আমাকে মার্জনা করার দরকার নেই, আমি অসভ্যই রইলাম। ‘আমি ও আপনি’ আমরা কেউ কারো প্রত্যাশী নই- তাই আমাকে নিয়ে নাই বা ভাবলেন। বরং, আপনারা আপনাদের কর্মস্থল বা আপনার শিশুর শিক্ষাস্থল খুলিয়ে পঠন-পাঠন চালুর জন্য আন্দোলনটা করুন। হওয়া না হওয়া সরকারের হাতে, কিন্তু নিজেরা নিজেদের কাছে সৎ থাকুন, যেমন আমি আমার কাছে রইলাম এই লেখাটা লিখে।
ধন্যবাদ।
১) https://www.nytimes.com/.../europes-locked-down-but...২) https://indianexpress.com/.../coronavirus-lockdown-back.../৩) https://www.firstpost.com/.../schools-reopen-after...৪) https://www.newindianexpress.com/.../no-plan-to-close...৫) https://www.washingtonpost.com/.../9047be8c-a645-11ea...৬) https://www.timesofisrael.com/school-is-back-in-session.../৭) https://www.unicef.org/.../supporting-your-children...৮) https://www.devex.com/.../many-girls-won-t-go-back-to...৯) https://www.cambridge.org/.../back-to-school-specific.../১০) https://bengali.indianexpress.com/.../coronavirus.../১১) https://www.prothomalo.com/.../%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6...
#standwithstudents
#Reopen_school_college
#হককথন