২৯শে এপ্রিল শেষ দফার নির্বাচন শেষ হতে না হতেই- সন্ধ্যা থেকে বুথ ফেরত সমীক্ষা তথা এক্সিট পোল নিয়ে বিশেষজ্ঞের দলেরা খাপ পঞ্চায়েত খুলে বসবে। কতশত বড়, মেজো, সেজো ভোট কুশলী সর্বজ্ঞ সহ- কাল্ট সব সমীক্ষা হাউজেরা নিজেদের নামিয়ে দেবে নির্দিষ্ট টিভি চ্যানেল ধরে। এর পাশাপাশি অজস্র ওয়েবমিডিয়া, যারা নিজেরাই নিজেদের ডিগ্রী প্রদান করে বিশেষজ্ঞের আসনে উন্নীত করেছে- তারাও ফেসবুকের লাইভ ও ইউটিউবে এসে সমানে শব্দবমি করতে থাকবে।
ইতিহাস বলছে- ১৯৬৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেনটাকিতে একটি স্থানীয় নির্বাচনে প্রথম এক্সিট পোল পরিচালিত হয়। একই বছরে ডাচ রাজনীতিবিদ মার্সেল-ভ্যান-দাম এই এক্সিট পোলের ব্যবহার করেছিলেন। তার পর থেকেই বিজ্ঞাপনী মিডিয়া হাউজগুলোর কাছে এটা একটা চাঁদমারি হয়ে উঠে। অকারণ হাস্যকর বিতর্কসভা, খেউর এবং বিনোদনের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমানে। অর্থবান যে কেউ তার পক্ষে পেইড প্রি-পোল সমীক্ষা প্রকাশ করে, এক্সিট পোলের ক্ষেত্রেও করে- শেয়ার বাজারের ফাটকা সহ কর্মীদের মনোবল বাঁচিয়ে রাখতে। এক্সিট পোলের কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, পদ্ধতিটাই বিতর্কিত; তাই শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যত এক্সিট পোল সমীক্ষা হয়েছে বিশ্বজুড়ে- তার ৮৭% মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত। বাকি তো লাগলে তুক, না লাগলে তাক। সে যাই হোক, এইবারের নির্বাচনে ফিরি।
এবারের ভোটটা হয়েছে মূলত- ক্ষমতাসীন দলের সীমাহীন দুর্নীতি, মূল্যবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, সরকারি চাকরি, ফসলের ন্যায্য দাম, শ্রমিকের নুন্যতম মজুরী, নাগরিকের সামাজিক সুরক্ষা, প্রশাসনের পঙ্গুত্ব ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের স্লোগানকে সামনে রেখে। বিজেপি ও সংযুক্ত মোর্চার পক্ষে ঘুরেফিরে এগুলোই মুখ্য ইস্যু ছিল। তৃনমূলের পক্ষে একটা এমন শ্লোগান ছিল- যেটার ব্যাখ্যা তারা নিজেরা কেউ জানে কিনা জানিনা। ‘খেলা হবে’- একটা নীতিহীন দুর্নীতিবাজ দলের জন্য এক্কেবারে আদর্শ শ্লোগান, যার কোনো মা-বাপ নেই। এই পরিস্থিতিতে ডান-বাম-রাম সকল সাধারণ ভোটারের নিত্য সমস্যা উপরের প্রত্যেকটি ইস্যু। এখন ভোট সাম্প্রদায়িকতার উপরে হয়েছে না জীবনের ইস্যুর উপরে তা তো EVM খুললে তবে বোঝা যাবে।
ডিসক্লেমারঃ- আমি কোন জ্যোতিষী নই যে ভবিষ্যদ্বাণী করব, না রয়েছে সমীক্ষার কোনও ইনফ্রাস্ট্রাকচার, না সেই উচ্চমানের মেধা। পাশাপাশি- না রয়েছে আমার কোন মিডিয়া ব্যবসা, না টিআরপি ধরে রাখার দায়, না প্রোফাইলের রিচ বাড়ানোর নিনজা টেকনিকের জন্য এই পোষ্ট। আমার এই প্রোফাইলটি একান্তই আমার নিজস্ব, এখানে শুধুই নিজের তথা নিজেদের কথা বলার হয়। লাইক কমেন্ট হলেইবা কী আর না হলেইবা কী, লিখি তো নিজের খুশিতে, তাই শেয়ারের কোনো অপসনও রাখিনা।
এমতাবস্থার প্রাকলগ্নে কতগুলো তথ্য দিই। আমরা শেষ ৩০ বছরে পশ্চিমবঙ্গের ভোটের হিসাব যদি দেখি, সেখানে দেখা যাবে বিজেপি আরএসএস-এর নিজস্ব ভোট ব্যাংক রয়েছে। যেটা গড়ে পাঁচ থেকে ছয় শতাংশ ছিল ২০১৩ পর্যন্ত, তার পরবর্তীতে তৃণমূলের বদান্যতায় সেটা বাড়তে বাড়তে ১০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এটাই মোটামুটি এদের পকেট ভোট। সুতারাং মোট প্রদেয় ভোট ১০০% হলে বাকি থাকে ৯০ শতাংশ।
বামেদের সবচেয়ে খারাপ রেজাল্ট বর্তমান সময়কালের মধ্যে ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে। সেখানে সিপিএম নিজে পেয়েছিল ৬.৩৪%, বাকি বামদল গুলো মিলে ওই ৭% প্রায়। অর্থাৎ এই মারীকালে টিকে থাকা এই ৭% এক্কেবারে বামেদের নিজেদের ভোট বলে ধরে নেওয়া যায়। তাহলে বাকি থাকে ৮৩% ভোট।
২০১৯ মোতাবেক কংগ্রেস পেয়েছিল ৫.৬৭% তথা ৬% প্রায়। বাকি থাকে ৭৭% ভোট।
এবারে তৃণমূল কংগ্রেসের হিসাব। এদের দলে যতই দুর্নীতি থাকুক একটা ছোট্ট অংশের মানুষ এখনও মমতা ব্যানার্জি ছাড়া কিছু বোঝেনা, তারা ফুলেই ছাপ দেবে। এর বাইরে গোটা রাজ্য জুড়ে ২০১৮ পঞ্চায়েত সিলেকশনে পাওয়া- ৩৮১১৮টি গ্রাম পঞ্চায়েত, ৮০৬২টি পঞ্চায়েত সমিতি ও ৭৯৩টি জেলাপরিষদের আসনে তৃনমূলের কুচো, মাঝারী ও কিছু বড় নেতা আসীন রয়েছে। এদের সিংহভাগ জনের এটাই পেশা, সুতরাং এদের প্রত্যেকের নিজের ‘দোকান’ বাঁচাবার তাগিদে ভোটটা তৃনমূলের পক্ষে দেবে ও করাবে। এই কয়েকলক্ষ জবরদখলী তৃণমূল প্রতিনিধি, তাদের পরিবার পরিজন, এদের উপরের উর্ধ্বতন নেতা ও তাদের পরিবার, কাটমানি-তোলাবাজির ভাগ পাওয়া চামচা-লোকলস্কর নিয়ে ভোটের অঙ্কটা মোটেই ১০% এর কম নয়।
এদের পাশাপাশি সমগ্র বাংলা জুড়ে মুসলমান অধ্যুষিত মহল্লাগুলোতে যারা ভোট প্রচার করতে গেছিল এই নির্বাচনে, তারা সকলেই জানে- একটা বড় অংশের অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ও গোঁয়ার মুসলমান সম্প্রদায়ের মনে বদ্ধমূল ধারণা- NRC থেকে বাঁচাতে বিজেপিকে রুখতে হবে, আর এই কাজে একমাত্র মসিহা মমতা ব্যানার্জী। ২০২১ নির্বাচনে যে সকল গ্রামে বিজেপি ও জোট প্রার্থীরা প্রচারেই ঢুকতে পারেনি- তার প্রায় সবকটি মুসলমান গ্রাম। এখানে কার্যত ওয়াকওভার পেয়েছে তৃনমূল, এই অংশটুকুতে তৃনমুলের তথা মমতা ব্যানার্জির একচ্ছত্র আধিপত্য। RSS এর ক্রমাগত ধর্মীয় উস্কানি ও মেরুকরণ প্রচারের পিঠে এটাকেই পুঁজি করে তৃণমূলের প্রচার কৌশলের প্রত্যক্ষ সুফল এই ট্রেন্ড। সুতরাং প্রায় ৩০% মুসলমান ভোটারের অন্তত ১০% এখনও তৃনমূলের বাক্সেই যাবে, প্রচারের সময়কার ট্রেন্ড অনুযায়ী। মানে তৃনমুলের পক্ষে যাচ্ছে ২০% ভোট। অবশিষ্ট থাকে ৫৭% ভোট
এর পর নির্দল, নোটা, অন্যান্য ছোট ছোট দল ইত্যাদি সব মিলে ২% মত গেলে- বাঁচে ৫৫%। মানুষ সকলসময় বিজয়ী দলের পক্ষে ভোটটা দিতে চায়, নতুবা ‘কেন ভোটটা অমুকদে দিয়ে নষ্ট করব’ কথাটার উৎপত্তি হতনা। এটা গণতন্ত্রের গর্ভপাত হলেও সবটা নিয়েই আমাদের নির্বাচনী পরিকাঠামো। মোটের ওপর বলা যেতে পারে টুকরো-টাকরা কিছু অশান্তি ছাড়া সপ্তম দফা অবধি মানুষ নিজের ভোট নিজে দিয়েছ। তাই এই পর্বে এসে একটা কথা পরিষ্কার, কিছু বিচ্যুতি হলেও দিনের শেষে মানুষই শেষ কথা বলবে গণতন্ত্রে।
এই অবশিষ্ট ৫৫ শতাংশ ভোট থেকে প্রচারের সময় হাওড়া, হুগলি ও দুই ২৪ পরগণাতে বিপুল জনসমাগম করা আব্বাস সিদ্দিকীর ISF একটা ভাল ভোট টেনে নেবে। এই ৫৫% এর মধ্যেই বিপুল পরিমাণে নতুন ভোটার রয়েছে, যুবক বেকার রয়েছে, শ্রমিক, কৃষক, পরিযায়ী, ভোট দিতে না পারা ভোটার, সরকারি দলের জুলুমের শিকার হওয়া ভোটার, মিথ্যা মামলার শিকার হওয়া ভোটার, আমপানে নাজেহাল হওয়া ভোটার, মধ্যবিত্ত, চাকুরীজীবী প্রমুখেরা সকলেই রয়েছে। সকলেই মারাত্বক মুল্যবৃদ্ধির শিকার, দুর্নীতিবাজ অযোগ্য প্রশাসনের অত্যাচারের শিকার। এদের ভোটটা কোথায় যাবে কে হলপ করে বলতে?
এই ৫৫% ভোটারদের অধিকাংশই সাইলেণ্ট ভোটার, কোন সমীক্ষক কোন মন্ত্রে তার মনের ভিতরে ঢুকবে? অঙ্ক বিচার তো শুধু ৪৫% এর, বাকি ৫৫% ভোটের মধ্যে যে সিংহভাগ পাবে সে ই সরকার গড়বে, ত্রিশঙ্কুও হতে পারে। যদি এই বিপুল ভোটারদের ভোটদানের প্রবনতাকে যুক্তি সহ ধরতে না পারেন, তাহলে সমীক্ষায় নামে ঢক্কানিনাদের দাম জাষ্ট শূন্য, তাতে আপনি যত বড় সমীক্ষকই হোননা কেন, আর যত বড় চ্যানেলেই আপনার সমীক্ষাকে ঘটা করে দেখানো হোক- শত বিজ্ঞাপন সহযোগে।
পশ্চিমবঙ্গের মানুষের অধিকাংশই রাজনীতির খবর গিলতে পছন্দ করেন, তারাও ২৯শে এপ্রিল পরবর্তী ৩টে দিন ধরে হরেক চর্বিত চর্বন শুনে যে যার যার মত করে সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু করবে। এনারা মূলত তিনটে দলে বিভক্ত-
প্রথম দলঃ এরা স্বয়নে স্বপনে মন্ত্রিসভা গঠন করতে থাকবে, কিন্তু হিসাব মিলবেনা- বাঘের বাচ্চা মুখ্যমন্ত্রী হবে নাকি জাত গোখরো? নাকি দাদাকেই শেষ পর্যন্ত ময়দানে নামিয়ে মাস্টারস্ট্রোক দেবেন মোটা ভাই। শেয়ালদা স্টেশনের দোতলা ফুল বুক, তাই ঘর না পেয়ে করোনাকালে ফাঁকা ফ্ল্যাট খোঁজার ধান্দা করবে আগাম বিজয় উদযাপন করতে, ইত্যাদি। দলের নাম বলার প্রয়োজন নেই, সবাই জানে।
দ্বিতীয় দলঃ আগামী কিছুদিন কোথায় পালিয়ে গা ঢাকা দেবে তার ফন্দী আটবে, যদিও আগেভাগে নগদ অর্থ যতটা পারা যায় সরিয়ে দেবে, বৌ বাচ্চা বাপের ঘর পাঠিয়ে দেবে। ভোট চলাকালীনই কেউ কেউ এমন হুমকি ধমকি বা প্যাঁদানি খেয়েছে- দলেরই অন্য গোষ্ঠী বা আধুনা ‘দলবদলু মিরজাফরেদের’ কাছ থেকে, তাতেই ভয়ে তটস্থ। ‘খেলাটা’ আসলে কী যে হয়েছে বুঝেই উঠতে পারেনি। ভোট গণনা মিটে যাওয়ার পর যদি পরিস্থিতি অনুকূল হয়, তবেই ঘরে ফিরবে নতুবা এখন অনির্দিষ্টকাল আত্মগোপন। হারামের সম্পত্তি- গেলে যাক, বাপের দেওয়া জান একটাই- গণধোলাইতে ওটা গেলে আর ফিরবেনা। এখানেও দলের নাম বলা অপ্রাসঙ্গিক।
এই দুই দলকে নিয়ে ততটা চিন্তা নেই- এরা মূলধারার মিডিয়া পর্যন্ত পৌঁছায়না, সোশ্যাল মিডিয়াতেও নিজেরা ততটা দড়ের নয়, সামান্য একটা হ্যাজও নামাতে পারেনা- কেবল কপিপেষ্ট করে আঁটিসেলের দেওয়া উচ্ছিষ্ট, আর রোমান হরফে বাংলা কমেন্ট করে। আসল খেলোয়ার তো অসংগঠিত বিপুল ‘ক্যাডেড কপেরা’। তারা হ্যাজ নামায়, চিন্তন বৈঠক করে, মিনিটস বুক আপডেট রাখে, কমেন্টে বুদ্ধিদীপ্ত ভাষার ব্যবহার করে, প্রচুর ফেসবুক গ্রুপ আর পেজের এডমিন, এ কারনে এনারা পরিচিত মহলে মিনি সেলেবের স্ট্যেটাস খোঁজে। এর চেয়েও এদের বড় চারিত্রি বৈশিষ্ট হচ্ছে, এরা সর্বদা শঙ্কাগ্রস্থ থাকে; তাই এদের বিজ্ঞানসম্মত নাম- চেকা। এরাই তৃতীয় দল, এদের দলীয় পরিচয় দেওয়া ‘কগনিজেবল অফেন্স’, অগত্যা… চলুন বিশদে জানি এদের সম্পর্কে।
তৃতীয় দলঃ এনাদের ক্লাব, মাচা, চায়ের দোকান, বদ্ধ কেবিন, পাড়ার রক, ক্লোজ গ্রুপ, মেসেঞ্জার, হোয়াটস্যাপ জুড়ে সর্বত্র ‘ভয়ের’ কচি কচি ছানাপোনাদের দৌরাত্ব্য, টেলিফোন কলে শ্মশানের নীরবতা বিরাজ করে অধিকাংশ সময়ে। কিছু কল্পিত আত্মলাপ- “আরো পাঁচ বছর পিছিয়ে গেলাম! আচ্ছা আমাদের কে মারতে পারে, যারা ছিল তারা- নাকি যারা আসবে তারা? সরকার গঠন সম্ভবত উনিই করবেন, প্রচুর টাকা যে ওদের- সারদা, নারদা, তোলাবাজি, সিন্ডিকেট, কাটমানি…। অবশ্য দিল্লি থেকে ওদেরও কম কিছু মাল্লু আসেনি, বুথ পিছু নাকি ১০ হাজার ছিল ভোটের দিন, সব ভোট কি নিজে নিলো? যদিও সব হিন্দু মোদিফায়েড হয়ে গেছে, আণ্ডার কারেন্ট, এবারে উত্তরপ্রদেশ হবে ভাই- কিচ্ছু করার নেই। কি আর হবে, এদ্দিন ওদের হাতে ক্যাল খাচ্ছিলাম, নাহয় তোদের হাতে খাবো”। মস্তিষ্কের উন্নত গোবর সারে জন্মানো ভীতি, আতঙ্ক ও ত্রাসের জমির লকলকে ফসলের গুণে- ক্রমশ পিছতে পিছতে আলাস্কা পৌঁছে যাবেন ইনারা।
এনাদের প্রত্যেকের মাঝে ১০০ জিবি করে ইনবিল্ট ‘ভয়’ ইনস্টল রয়েছে সিস্টেমে, যেখানে রোজ সামান্য জাঙ্ক ফাইল তৈরি হয়। এদের যারা সমমতাদর্শী বন্ধু, তাদেরও একই প্রসেসর। এখন এমন ২৫ জনের ক্লোজ গ্রুপে নিজেদের ভয়ের ফাইলগুলোকে অন্যের সিস্টেমে ট্র্যান্সফার করে নিজেকে হালকা করে নেয় একটু। এখন ‘ক’ বাবু যদি ২৪ জনের থেকে অল্প অল্প ভয়ের ফাইল নিজের সিস্টেমে নিয়ে আসে- সেটা ১ জিবি করে হলেও ২৪ জিবি অতিরিক্ত ভয় জমা হয় সিস্টেমে, ইনবিল্ট ছিল ১০০ জিবি, এর সাথে দৈনিক নিজস্ব জাঙ্ক। ব্যাস ওভারলোড হয়ে গিয়ে ‘ক’ বাবু তখন ভয়ের সুপার স্প্রেডারে পরিণত হয়ে যায়, যেটা ভাইরাসের মত সম্পুর্ণ কমিউনিটিতে ছোঁয়াচে হয়ে যায়। কোনো স্যানিটাইজার, মাস্ক এক্ষেত্রে কাজে আসেনা। একটাই উপায়- জাঙ্ক ক্লিন করা ও ইনফেক্টেডদের থেকে দুরত্ব মেন্টেন করা। এদের কাউন্সিলিং দরকার- ভয়ের ভাইরাস তোমাকে মেরে ফেলবেনা, শুধু একটু অঙ্ক কষো- দেখো সুস্থ লাগবে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এই তৃতীয় দলের সমীক্ষকরা ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে সমীক্ষা করে ধরতেই পারেননি- কীভাবে রাতারাতি ২০-২৫ শতাংশ ভোট উবে গেছিল। সেই তারাই আবারও আন্তঃসমীক্ষা করছেন অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে- একেই হয়ত আত্মনির্ভরতা বলে।
গোটা লকডাউনে মানুষের পাশে কার্যত বামেদের তরুণ প্রজন্মের বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়ে গুলো ছাড়া কেউ ছিলনা, পরিযায়ী শ্রমিক ও তাদের পরিবারগুলোর পাশে এরাই ছিল। এরাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে জরুরী পরিসেবার সহযোগিতা পৌঁছে দিয়েছে, বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে কমিউনিটি কিচেন তথা শ্রমজীবী ক্যান্টিন চালিয়েছে, ন্যায্যমুল্যের বাজার চালিয়েছে ইত্যাদি। এই ছাত্রযুবর দলেরাই আম্পানে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল সর্বশক্তি নিয়ে। যার উপর ভিত্তি করে বেশ কয়েকটি বড় বড় গণ-আন্দোলন- দীর্ঘদিন পরে রাজ্যের রাজধানীতে শাসক দলের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে। এরফলে সমাজের তরুণ যুবক যুবতীরা হঠাৎ করে এই ছাত্রযুবদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। সংগঠনের বহুবিধ ঘাটতি এদের দ্বারা ঢেকে গেছে। এই নির্বাচনে বামেদের রক্তক্ষরণ পুষিয়ে, ঘুরে দাঁড়িয়ে লড়াই দেবার পরিবেশ তৈরি হওয়ার অন্যতম কারণ উজ্জল একঝাঁক তরুণ তরুণী। তাহলে লকডাউনে পরিষেবা নেওয়া এই মানুষগুলো কাকে ভোট দেবে? সেই সহায়ক লড়াকু মুখ গুলোই তো এলাকাতে ভোটে দাঁড়িয়েছে যারা দুর্বিপাকের কালে রাস্তায় মানুষের পাশে ছিল। এ হিসাব কে কষেছে?
এর সাথে রয়েছে আব্বাস ফ্যাক্টর। দুই ২৪ পরগণা, হাওড়া, হুগলি ও কোলকাতার খান চারেক আসন মিলে দাঁড়ায় ১০২টি বিধানসভা, যেখানে আব্বাস একটা বিশাল ফ্যাক্টর। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য- গোটা উত্তরবঙ্গ সহ মালদা পর্যন্ত মাত্র ৫৪টা বিধানসভা আসন। সুতরাং বাকি কোথাও আব্বাস ফ্যাক্টর থাক বা না থাক- এই চার জেলার ১০২ খানা আসনে বিগ ফ্যাক্টর, যা রাজ্যের মোট আসনের এক তৃতীয়াংশের কিছুটা বেশি। গত ডিসেম্বরেও এই বিপুল সংখ্যক আসনে তৃণমূল হাসতে হাসতে ৯০টারও বেশি সিট জিতে যাবার মত অবস্থায় ছিল, কারন আরাবুল-শওকত মোল্লার ঠ্যাঙারে বাহিনী ভোট লুঠ করত চোখের সামনে। দুম করে বঙ্গ রাজনীতিতে উদয় হওয়া আব্বাস সিদ্দিকী আরাবুল-শওকত সহ ওই ১০২ খানা বিধানসভার ভোট লুঠেরাদের কার্যত পথে বসিয়ে দিয়েছে, যেটা বাংলা জুড়ে শাসকদলের দুষ্কৃতীদের কাছে কড়া বার্তা গিয়েছে, এতে করে বিরোধীরা আরো আত্মবিশ্বাসী হয়েছে- ‘এদেরও রুখে দেওয়া যায়’। ক্যানিং এ ভোটের দিন তথাকথিত দোর্দণ্ড প্রতাপশালী শওকত মোল্লা রাস্তাতেই বসে ছিল ISF অত্যাচার করছে এই অভিযোগে।
আব্বাস আর কিছু পারুক বা না পারুক, সে তৃনমূলের ঠ্যাঙারে বাহিনীর ভোট লুঠ রুখে দিয়েছে, মোটের উপরে মানুষ নিজের ভোট নিজে দিয়েছে। তাহলে কাকদ্বীপ থেকে কোচবিহার- যে ভোটারদের ১০ বছরে ভোট দিতে দেয়নি শাসকদল, তারা কোনদিকে ভোটটা দিয়েছে? এর সমীক্ষা কে করেছে?
মুসলমানেদের ১০% মত নাহয় তৃনমূলের কমিটেড ভোটার, বাকি প্রায় ২০% কাকে ভোট দেবে? এরা যে বিজেপিকে দেবেনা এতে তো কোন সন্দেহ নেই খালি চোখে, এদের মনের সমীক্ষা কে করেছে?
এমন নানান সূত্র দুমুখ থেকেই খোলা আছে, যার জন্য এখনই আনন্দিত হওয়ার মত কিছু তথ্য নেই- না হতাশ হওয়ার কিছু হয়েছে, যা খুশি হতে পারে।
এই ভোটের ফলাফল যা খুশি হতে পারে, ত্রিমুখী লড়াইতে তৃণমূল ক্ষমতায় থেকে যেতে পারে, বিজেপি আসতে পারে, সংযুক্ত মোর্চারও না আসার কোনও জটিল অঙ্ক নেই। মোদ্দা কথা, যা হওয়ার হয়ে গেছে- তা বাক্স বন্দি রয়েছে। ফলাফল একমাত্র জানা যাবে ২রা মে বেলা ২টোর পর। তাই মন্ত্রীসভা গঠন করেও লাভ নেই, পালিয়েও সমাধান হবেনা, আর ভয়ের দোকান খুলে বিপ্লব হবেনা। ধৈর্য ধরুন, অঙ্ক কষুন, যা হবার হবে, দেখা যাবে। ভোটে জিতলেও কঠিন লড়াই, না জিতলেও তাই। টিভি মিডিয়াকে ব্যাবসা করতে হবে, তাই সে সমীক্ষা দেখাবে। ওদেরটা ঠিক হবার চান্স যতটা- ভুল হবার চান্সও ততটাই। আসল কাজ মানুষের পাশে থাকা, মানুষ ঠিক করুক কাকে পাশে রাখবে- কাজের মানুষ না চোর দলবদলুদের।
তাই এখন থেকে রক্তচাপ বাড়িয়ে লাভ নেই, আপনাকে আমাকে খেটেই খেতে হবে। ঠিক আছে!
উত্তর ২রা মে বিকালে, তার আগে NO জ্যোতিষ গিরি।
কী, বুঝা আসছে?
চিল্লাইয়া কন- ঠিক কি বেঠিক!