বৃহস্পতিবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২১

এক্সিট পোল সমীক্ষা কেন করবেন ও দেখবেন?

 


২৯শে এপ্রিল শেষ দফার নির্বাচন শেষ হতে না হতেই- সন্ধ্যা থেকে বুথ ফেরত সমীক্ষা তথা এক্সিট পোল নিয়ে বিশেষজ্ঞের দলেরা খাপ পঞ্চায়েত খুলে বসবে। কতশত বড়, মেজো, সেজো ভোট কুশলী সর্বজ্ঞ সহ- কাল্ট সব সমীক্ষা হাউজেরা নিজেদের নামিয়ে দেবে নির্দিষ্ট টিভি চ্যানেল ধরে। এর পাশাপাশি অজস্র ওয়েবমিডিয়া, যারা নিজেরাই নিজেদের ডিগ্রী প্রদান করে বিশেষজ্ঞের আসনে উন্নীত করেছে- তারাও ফেসবুকের লাইভ ও ইউটিউবে এসে সমানে শব্দবমি করতে থাকবে।
ইতিহাস বলছে- ১৯৬৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেনটাকিতে একটি স্থানীয় নির্বাচনে প্রথম এক্সিট পোল পরিচালিত হয়। একই বছরে ডাচ রাজনীতিবিদ মার্সেল-ভ্যান-দাম এই এক্সিট পোলের ব্যবহার করেছিলেন। তার পর থেকেই বিজ্ঞাপনী মিডিয়া হাউজগুলোর কাছে এটা একটা চাঁদমারি হয়ে উঠে। অকারণ হাস্যকর বিতর্কসভা, খেউর এবং বিনোদনের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমানে। অর্থবান যে কেউ তার পক্ষে পেইড প্রি-পোল সমীক্ষা প্রকাশ করে, এক্সিট পোলের ক্ষেত্রেও করে- শেয়ার বাজারের ফাটকা সহ কর্মীদের মনোবল বাঁচিয়ে রাখতে। এক্সিট পোলের কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, পদ্ধতিটাই বিতর্কিত; তাই শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যত এক্সিট পোল সমীক্ষা হয়েছে বিশ্বজুড়ে- তার ৮৭% মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত। বাকি তো লাগলে তুক, না লাগলে তাক। সে যাই হোক, এইবারের নির্বাচনে ফিরি।
এবারের ভোটটা হয়েছে মূলত- ক্ষমতাসীন দলের সীমাহীন দুর্নীতি, মূল্যবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, সরকারি চাকরি, ফসলের ন্যায্য দাম, শ্রমিকের নুন্যতম মজুরী, নাগরিকের সামাজিক সুরক্ষা, প্রশাসনের পঙ্গুত্ব ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের স্লোগানকে সামনে রেখে। বিজেপি ও সংযুক্ত মোর্চার পক্ষে ঘুরেফিরে এগুলোই মুখ্য ইস্যু ছিল। তৃনমূলের পক্ষে একটা এমন শ্লোগান ছিল- যেটার ব্যাখ্যা তারা নিজেরা কেউ জানে কিনা জানিনা। ‘খেলা হবে’- একটা নীতিহীন দুর্নীতিবাজ দলের জন্য এক্কেবারে আদর্শ শ্লোগান, যার কোনো মা-বাপ নেই। এই পরিস্থিতিতে ডান-বাম-রাম সকল সাধারণ ভোটারের নিত্য সমস্যা উপরের প্রত্যেকটি ইস্যু। এখন ভোট সাম্প্রদায়িকতার উপরে হয়েছে না জীবনের ইস্যুর উপরে তা তো EVM খুললে তবে বোঝা যাবে।
ডিসক্লেমারঃ- আমি কোন জ্যোতিষী নই যে ভবিষ্যদ্বাণী করব, না রয়েছে সমীক্ষার কোনও ইনফ্রাস্ট্রাকচার, না সেই উচ্চমানের মেধা। পাশাপাশি- না রয়েছে আমার কোন মিডিয়া ব্যবসা, না টিআরপি ধরে রাখার দায়, না প্রোফাইলের রিচ বাড়ানোর নিনজা টেকনিকের জন্য এই পোষ্ট। আমার এই প্রোফাইলটি একান্তই আমার নিজস্ব, এখানে শুধুই নিজের তথা নিজেদের কথা বলার হয়। লাইক কমেন্ট হলেইবা কী আর না হলেইবা কী, লিখি তো নিজের খুশিতে, তাই শেয়ারের কোনো অপসনও রাখিনা।
এমতাবস্থার প্রাকলগ্নে কতগুলো তথ্য দিই। আমরা শেষ ৩০ বছরে পশ্চিমবঙ্গের ভোটের হিসাব যদি দেখি, সেখানে দেখা যাবে বিজেপি আরএসএস-এর নিজস্ব ভোট ব্যাংক রয়েছে। যেটা গড়ে পাঁচ থেকে ছয় শতাংশ ছিল ২০১৩ পর্যন্ত, তার পরবর্তীতে তৃণমূলের বদান্যতায় সেটা বাড়তে বাড়তে ১০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এটাই মোটামুটি এদের পকেট ভোট। সুতারাং মোট প্রদেয় ভোট ১০০% হলে বাকি থাকে ৯০ শতাংশ।
বামেদের সবচেয়ে খারাপ রেজাল্ট বর্তমান সময়কালের মধ্যে ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে। সেখানে সিপিএম নিজে পেয়েছিল ৬.৩৪%, বাকি বামদল গুলো মিলে ওই ৭% প্রায়। অর্থাৎ এই মারীকালে টিকে থাকা এই ৭% এক্কেবারে বামেদের নিজেদের ভোট বলে ধরে নেওয়া যায়। তাহলে বাকি থাকে ৮৩% ভোট।
২০১৯ মোতাবেক কংগ্রেস পেয়েছিল ৫.৬৭% তথা ৬% প্রায়। বাকি থাকে ৭৭% ভোট।
এবারে তৃণমূল কংগ্রেসের হিসাব। এদের দলে যতই দুর্নীতি থাকুক একটা ছোট্ট অংশের মানুষ এখনও মমতা ব্যানার্জি ছাড়া কিছু বোঝেনা, তারা ফুলেই ছাপ দেবে। এর বাইরে গোটা রাজ্য জুড়ে ২০১৮ পঞ্চায়েত সিলেকশনে পাওয়া- ৩৮১১৮টি গ্রাম পঞ্চায়েত, ৮০৬২টি পঞ্চায়েত সমিতি ও ৭৯৩টি জেলাপরিষদের আসনে তৃনমূলের কুচো, মাঝারী ও কিছু বড় নেতা আসীন রয়েছে। এদের সিংহভাগ জনের এটাই পেশা, সুতরাং এদের প্রত্যেকের নিজের ‘দোকান’ বাঁচাবার তাগিদে ভোটটা তৃনমূলের পক্ষে দেবে ও করাবে। এই কয়েকলক্ষ জবরদখলী তৃণমূল প্রতিনিধি, তাদের পরিবার পরিজন, এদের উপরের উর্ধ্বতন নেতা ও তাদের পরিবার, কাটমানি-তোলাবাজির ভাগ পাওয়া চামচা-লোকলস্কর নিয়ে ভোটের অঙ্কটা মোটেই ১০% এর কম নয়।
এদের পাশাপাশি সমগ্র বাংলা জুড়ে মুসলমান অধ্যুষিত মহল্লাগুলোতে যারা ভোট প্রচার করতে গেছিল এই নির্বাচনে, তারা সকলেই জানে- একটা বড় অংশের অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ও গোঁয়ার মুসলমান সম্প্রদায়ের মনে বদ্ধমূল ধারণা- NRC থেকে বাঁচাতে বিজেপিকে রুখতে হবে, আর এই কাজে একমাত্র মসিহা মমতা ব্যানার্জী। ২০২১ নির্বাচনে যে সকল গ্রামে বিজেপি ও জোট প্রার্থীরা প্রচারেই ঢুকতে পারেনি- তার প্রায় সবকটি মুসলমান গ্রাম। এখানে কার্যত ওয়াকওভার পেয়েছে তৃনমূল, এই অংশটুকুতে তৃনমুলের তথা মমতা ব্যানার্জির একচ্ছত্র আধিপত্য। RSS এর ক্রমাগত ধর্মীয় উস্কানি ও মেরুকরণ প্রচারের পিঠে এটাকেই পুঁজি করে তৃণমূলের প্রচার কৌশলের প্রত্যক্ষ সুফল এই ট্রেন্ড। সুতরাং প্রায় ৩০% মুসলমান ভোটারের অন্তত ১০% এখনও তৃনমূলের বাক্সেই যাবে, প্রচারের সময়কার ট্রেন্ড অনুযায়ী। মানে তৃনমুলের পক্ষে যাচ্ছে ২০% ভোট। অবশিষ্ট থাকে ৫৭% ভোট
এর পর নির্দল, নোটা, অন্যান্য ছোট ছোট দল ইত্যাদি সব মিলে ২% মত গেলে- বাঁচে ৫৫%। মানুষ সকলসময় বিজয়ী দলের পক্ষে ভোটটা দিতে চায়, নতুবা ‘কেন ভোটটা অমুকদে দিয়ে নষ্ট করব’ কথাটার উৎপত্তি হতনা। এটা গণতন্ত্রের গর্ভপাত হলেও সবটা নিয়েই আমাদের নির্বাচনী পরিকাঠামো। মোটের ওপর বলা যেতে পারে টুকরো-টাকরা কিছু অশান্তি ছাড়া সপ্তম দফা অবধি মানুষ নিজের ভোট নিজে দিয়েছ। তাই এই পর্বে এসে একটা কথা পরিষ্কার, কিছু বিচ্যুতি হলেও দিনের শেষে মানুষই শেষ কথা বলবে গণতন্ত্রে।
এই অবশিষ্ট ৫৫ শতাংশ ভোট থেকে প্রচারের সময় হাওড়া, হুগলি ও দুই ২৪ পরগণাতে বিপুল জনসমাগম করা আব্বাস সিদ্দিকীর ISF একটা ভাল ভোট টেনে নেবে। এই ৫৫% এর মধ্যেই বিপুল পরিমাণে নতুন ভোটার রয়েছে, যুবক বেকার রয়েছে, শ্রমিক, কৃষক, পরিযায়ী, ভোট দিতে না পারা ভোটার, সরকারি দলের জুলুমের শিকার হওয়া ভোটার, মিথ্যা মামলার শিকার হওয়া ভোটার, আমপানে নাজেহাল হওয়া ভোটার, মধ্যবিত্ত, চাকুরীজীবী প্রমুখেরা সকলেই রয়েছে। সকলেই মারাত্বক মুল্যবৃদ্ধির শিকার, দুর্নীতিবাজ অযোগ্য প্রশাসনের অত্যাচারের শিকার। এদের ভোটটা কোথায় যাবে কে হলপ করে বলতে?
এই ৫৫% ভোটারদের অধিকাংশই সাইলেণ্ট ভোটার, কোন সমীক্ষক কোন মন্ত্রে তার মনের ভিতরে ঢুকবে? অঙ্ক বিচার তো শুধু ৪৫% এর, বাকি ৫৫% ভোটের মধ্যে যে সিংহভাগ পাবে সে ই সরকার গড়বে, ত্রিশঙ্কুও হতে পারে। যদি এই বিপুল ভোটারদের ভোটদানের প্রবনতাকে যুক্তি সহ ধরতে না পারেন, তাহলে সমীক্ষায় নামে ঢক্কানিনাদের দাম জাষ্ট শূন্য, তাতে আপনি যত বড় সমীক্ষকই হোননা কেন, আর যত বড় চ্যানেলেই আপনার সমীক্ষাকে ঘটা করে দেখানো হোক- শত বিজ্ঞাপন সহযোগে।
পশ্চিমবঙ্গের মানুষের অধিকাংশই রাজনীতির খবর গিলতে পছন্দ করেন, তারাও ২৯শে এপ্রিল পরবর্তী ৩টে দিন ধরে হরেক চর্বিত চর্বন শুনে যে যার যার মত করে সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু করবে। এনারা মূলত তিনটে দলে বিভক্ত-
প্রথম দলঃ এরা স্বয়নে স্বপনে মন্ত্রিসভা গঠন করতে থাকবে, কিন্তু হিসাব মিলবেনা- বাঘের বাচ্চা মুখ্যমন্ত্রী হবে নাকি জাত গোখরো? নাকি দাদাকেই শেষ পর্যন্ত ময়দানে নামিয়ে মাস্টারস্ট্রোক দেবেন মোটা ভাই। শেয়ালদা স্টেশনের দোতলা ফুল বুক, তাই ঘর না পেয়ে করোনাকালে ফাঁকা ফ্ল্যাট খোঁজার ধান্দা করবে আগাম বিজয় উদযাপন করতে, ইত্যাদি। দলের নাম বলার প্রয়োজন নেই, সবাই জানে।
দ্বিতীয় দলঃ আগামী কিছুদিন কোথায় পালিয়ে গা ঢাকা দেবে তার ফন্দী আটবে, যদিও আগেভাগে নগদ অর্থ যতটা পারা যায় সরিয়ে দেবে, বৌ বাচ্চা বাপের ঘর পাঠিয়ে দেবে। ভোট চলাকালীনই কেউ কেউ এমন হুমকি ধমকি বা প্যাঁদানি খেয়েছে- দলেরই অন্য গোষ্ঠী বা আধুনা ‘দলবদলু মিরজাফরেদের’ কাছ থেকে, তাতেই ভয়ে তটস্থ। ‘খেলাটা’ আসলে কী যে হয়েছে বুঝেই উঠতে পারেনি। ভোট গণনা মিটে যাওয়ার পর যদি পরিস্থিতি অনুকূল হয়, তবেই ঘরে ফিরবে নতুবা এখন অনির্দিষ্টকাল আত্মগোপন। হারামের সম্পত্তি- গেলে যাক, বাপের দেওয়া জান একটাই- গণধোলাইতে ওটা গেলে আর ফিরবেনা। এখানেও দলের নাম বলা অপ্রাসঙ্গিক।
এই দুই দলকে নিয়ে ততটা চিন্তা নেই- এরা মূলধারার মিডিয়া পর্যন্ত পৌঁছায়না, সোশ্যাল মিডিয়াতেও নিজেরা ততটা দড়ের নয়, সামান্য একটা হ্যাজও নামাতে পারেনা- কেবল কপিপেষ্ট করে আঁটিসেলের দেওয়া উচ্ছিষ্ট, আর রোমান হরফে বাংলা কমেন্ট করে। আসল খেলোয়ার তো অসংগঠিত বিপুল ‘ক্যাডেড কপেরা’। তারা হ্যাজ নামায়, চিন্তন বৈঠক করে, মিনিটস বুক আপডেট রাখে, কমেন্টে বুদ্ধিদীপ্ত ভাষার ব্যবহার করে, প্রচুর ফেসবুক গ্রুপ আর পেজের এডমিন, এ কারনে এনারা পরিচিত মহলে মিনি সেলেবের স্ট্যেটাস খোঁজে। এর চেয়েও এদের বড় চারিত্রি বৈশিষ্ট হচ্ছে, এরা সর্বদা শঙ্কাগ্রস্থ থাকে; তাই এদের বিজ্ঞানসম্মত নাম- চেকা। এরাই তৃতীয় দল, এদের দলীয় পরিচয় দেওয়া ‘কগনিজেবল অফেন্স’, অগত্যা… চলুন বিশদে জানি এদের সম্পর্কে।
তৃতীয় দলঃ এনাদের ক্লাব, মাচা, চায়ের দোকান, বদ্ধ কেবিন, পাড়ার রক, ক্লোজ গ্রুপ, মেসেঞ্জার, হোয়াটস্যাপ জুড়ে সর্বত্র ‘ভয়ের’ কচি কচি ছানাপোনাদের দৌরাত্ব্য, টেলিফোন কলে শ্মশানের নীরবতা বিরাজ করে অধিকাংশ সময়ে। কিছু কল্পিত আত্মলাপ- “আরো পাঁচ বছর পিছিয়ে গেলাম! আচ্ছা আমাদের কে মারতে পারে, যারা ছিল তারা- নাকি যারা আসবে তারা? সরকার গঠন সম্ভবত উনিই করবেন, প্রচুর টাকা যে ওদের- সারদা, নারদা, তোলাবাজি, সিন্ডিকেট, কাটমানি…। অবশ্য দিল্লি থেকে ওদেরও কম কিছু মাল্লু আসেনি, বুথ পিছু নাকি ১০ হাজার ছিল ভোটের দিন, সব ভোট কি নিজে নিলো? যদিও সব হিন্দু মোদিফায়েড হয়ে গেছে, আণ্ডার কারেন্ট, এবারে উত্তরপ্রদেশ হবে ভাই- কিচ্ছু করার নেই। কি আর হবে, এদ্দিন ওদের হাতে ক্যাল খাচ্ছিলাম, নাহয় তোদের হাতে খাবো”। মস্তিষ্কের উন্নত গোবর সারে জন্মানো ভীতি, আতঙ্ক ও ত্রাসের জমির লকলকে ফসলের গুণে- ক্রমশ পিছতে পিছতে আলাস্কা পৌঁছে যাবেন ইনারা।
এনাদের প্রত্যেকের মাঝে ১০০ জিবি করে ইনবিল্ট ‘ভয়’ ইনস্টল রয়েছে সিস্টেমে, যেখানে রোজ সামান্য জাঙ্ক ফাইল তৈরি হয়। এদের যারা সমমতাদর্শী বন্ধু, তাদেরও একই প্রসেসর। এখন এমন ২৫ জনের ক্লোজ গ্রুপে নিজেদের ভয়ের ফাইলগুলোকে অন্যের সিস্টেমে ট্র্যান্সফার করে নিজেকে হালকা করে নেয় একটু। এখন ‘ক’ বাবু যদি ২৪ জনের থেকে অল্প অল্প ভয়ের ফাইল নিজের সিস্টেমে নিয়ে আসে- সেটা ১ জিবি করে হলেও ২৪ জিবি অতিরিক্ত ভয় জমা হয় সিস্টেমে, ইনবিল্ট ছিল ১০০ জিবি, এর সাথে দৈনিক নিজস্ব জাঙ্ক। ব্যাস ওভারলোড হয়ে গিয়ে ‘ক’ বাবু তখন ভয়ের সুপার স্প্রেডারে পরিণত হয়ে যায়, যেটা ভাইরাসের মত সম্পুর্ণ কমিউনিটিতে ছোঁয়াচে হয়ে যায়। কোনো স্যানিটাইজার, মাস্ক এক্ষেত্রে কাজে আসেনা। একটাই উপায়- জাঙ্ক ক্লিন করা ও ইনফেক্টেডদের থেকে দুরত্ব মেন্টেন করা। এদের কাউন্সিলিং দরকার- ভয়ের ভাইরাস তোমাকে মেরে ফেলবেনা, শুধু একটু অঙ্ক কষো- দেখো সুস্থ লাগবে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এই তৃতীয় দলের সমীক্ষকরা ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে সমীক্ষা করে ধরতেই পারেননি- কীভাবে রাতারাতি ২০-২৫ শতাংশ ভোট উবে গেছিল। সেই তারাই আবারও আন্তঃসমীক্ষা করছেন অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে- একেই হয়ত আত্মনির্ভরতা বলে।
গোটা লকডাউনে মানুষের পাশে কার্যত বামেদের তরুণ প্রজন্মের বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়ে গুলো ছাড়া কেউ ছিলনা, পরিযায়ী শ্রমিক ও তাদের পরিবারগুলোর পাশে এরাই ছিল। এরাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে জরুরী পরিসেবার সহযোগিতা পৌঁছে দিয়েছে, বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে কমিউনিটি কিচেন তথা শ্রমজীবী ক্যান্টিন চালিয়েছে, ন্যায্যমুল্যের বাজার চালিয়েছে ইত্যাদি। এই ছাত্রযুবর দলেরাই আম্পানে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল সর্বশক্তি নিয়ে। যার উপর ভিত্তি করে বেশ কয়েকটি বড় বড় গণ-আন্দোলন- দীর্ঘদিন পরে রাজ্যের রাজধানীতে শাসক দলের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে। এরফলে সমাজের তরুণ যুবক যুবতীরা হঠাৎ করে এই ছাত্রযুবদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। সংগঠনের বহুবিধ ঘাটতি এদের দ্বারা ঢেকে গেছে। এই নির্বাচনে বামেদের রক্তক্ষরণ পুষিয়ে, ঘুরে দাঁড়িয়ে লড়াই দেবার পরিবেশ তৈরি হওয়ার অন্যতম কারণ উজ্জল একঝাঁক তরুণ তরুণী। তাহলে লকডাউনে পরিষেবা নেওয়া এই মানুষগুলো কাকে ভোট দেবে? সেই সহায়ক লড়াকু মুখ গুলোই তো এলাকাতে ভোটে দাঁড়িয়েছে যারা দুর্বিপাকের কালে রাস্তায় মানুষের পাশে ছিল। এ হিসাব কে কষেছে?
এর সাথে রয়েছে আব্বাস ফ্যাক্টর। দুই ২৪ পরগণা, হাওড়া, হুগলি ও কোলকাতার খান চারেক আসন মিলে দাঁড়ায় ১০২টি বিধানসভা, যেখানে আব্বাস একটা বিশাল ফ্যাক্টর। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য- গোটা উত্তরবঙ্গ সহ মালদা পর্যন্ত মাত্র ৫৪টা বিধানসভা আসন। সুতরাং বাকি কোথাও আব্বাস ফ্যাক্টর থাক বা না থাক- এই চার জেলার ১০২ খানা আসনে বিগ ফ্যাক্টর, যা রাজ্যের মোট আসনের এক তৃতীয়াংশের কিছুটা বেশি। গত ডিসেম্বরেও এই বিপুল সংখ্যক আসনে তৃণমূল হাসতে হাসতে ৯০টারও বেশি সিট জিতে যাবার মত অবস্থায় ছিল, কারন আরাবুল-শওকত মোল্লার ঠ্যাঙারে বাহিনী ভোট লুঠ করত চোখের সামনে। দুম করে বঙ্গ রাজনীতিতে উদয় হওয়া আব্বাস সিদ্দিকী আরাবুল-শওকত সহ ওই ১০২ খানা বিধানসভার ভোট লুঠেরাদের কার্যত পথে বসিয়ে দিয়েছে, যেটা বাংলা জুড়ে শাসকদলের দুষ্কৃতীদের কাছে কড়া বার্তা গিয়েছে, এতে করে বিরোধীরা আরো আত্মবিশ্বাসী হয়েছে- ‘এদেরও রুখে দেওয়া যায়’। ক্যানিং এ ভোটের দিন তথাকথিত দোর্দণ্ড প্রতাপশালী শওকত মোল্লা রাস্তাতেই বসে ছিল ISF অত্যাচার করছে এই অভিযোগে।
আব্বাস আর কিছু পারুক বা না পারুক, সে তৃনমূলের ঠ্যাঙারে বাহিনীর ভোট লুঠ রুখে দিয়েছে, মোটের উপরে মানুষ নিজের ভোট নিজে দিয়েছে। তাহলে কাকদ্বীপ থেকে কোচবিহার- যে ভোটারদের ১০ বছরে ভোট দিতে দেয়নি শাসকদল, তারা কোনদিকে ভোটটা দিয়েছে? এর সমীক্ষা কে করেছে?
মুসলমানেদের ১০% মত নাহয় তৃনমূলের কমিটেড ভোটার, বাকি প্রায় ২০% কাকে ভোট দেবে? এরা যে বিজেপিকে দেবেনা এতে তো কোন সন্দেহ নেই খালি চোখে, এদের মনের সমীক্ষা কে করেছে?
এমন নানান সূত্র দুমুখ থেকেই খোলা আছে, যার জন্য এখনই আনন্দিত হওয়ার মত কিছু তথ্য নেই- না হতাশ হওয়ার কিছু হয়েছে, যা খুশি হতে পারে।
এই ভোটের ফলাফল যা খুশি হতে পারে, ত্রিমুখী লড়াইতে তৃণমূল ক্ষমতায় থেকে যেতে পারে, বিজেপি আসতে পারে, সংযুক্ত মোর্চারও না আসার কোনও জটিল অঙ্ক নেই। মোদ্দা কথা, যা হওয়ার হয়ে গেছে- তা বাক্স বন্দি রয়েছে। ফলাফল একমাত্র জানা যাবে ২রা মে বেলা ২টোর পর। তাই মন্ত্রীসভা গঠন করেও লাভ নেই, পালিয়েও সমাধান হবেনা, আর ভয়ের দোকান খুলে বিপ্লব হবেনা। ধৈর্য ধরুন, অঙ্ক কষুন, যা হবার হবে, দেখা যাবে। ভোটে জিতলেও কঠিন লড়াই, না জিতলেও তাই। টিভি মিডিয়াকে ব্যাবসা করতে হবে, তাই সে সমীক্ষা দেখাবে। ওদেরটা ঠিক হবার চান্স যতটা- ভুল হবার চান্সও ততটাই। আসল কাজ মানুষের পাশে থাকা, মানুষ ঠিক করুক কাকে পাশে রাখবে- কাজের মানুষ না চোর দলবদলুদের।

তাই এখন থেকে রক্তচাপ বাড়িয়ে লাভ নেই, আপনাকে আমাকে খেটেই খেতে হবে। ঠিক আছে!

উত্তর ২রা মে বিকালে, তার আগে NO জ্যোতিষ গিরি।
কী, বুঝা আসছে?

চিল্লাইয়া কন- ঠিক কি বেঠিক!

বুধবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২১

ভ্যাক্সিনঃ বিজ্ঞান, ভয় না ভক্তি?



দেশের নিউজ মিডিয়ার লাগাতার ভয়ের প্রচার দেখে শুনে, সম্পূর্ণ হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে দেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দল সহ অধিকাংশ আমজনতা ‘ভ্যাক্সিন দাও ভ্যাক্সিন দাও’ বলে এক বিচিত্র আন্দোলন শুরু করেছে। ভ্যাক্সিন নিয়ে গত বছরের লেখাটা নিচে রইল, সেখানে আরো অনেক লেখার লিঙ্ক পাবেন। এছাড়াও এই গত মার্চে, গত এপ্রিলেও কিছু লেখা রয়েছে।
সেই ধারাবাহিকতাতেই কিছু প্রশ্ন রাখি আপনার সামনে, প্রশ্নগুলো নিজেকে করবেন, উত্তর পেলে ভ্যাক্সিনের জন্য আরো তেড়েফুঁড়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ুন।
১) COVID একটি RNA ভাইরাস। অন্যান্য RNA ভাইরাসের কী কী ভ্যাক্সিন বাজারে আছে? র্যা বিস, জিকা, সাইটোমেগাল, ডেঙ্গু এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা ইত্যাদি ভাইরাসের mRNA ভ্যাক্সিন বাজারে থাকলেও সেগুলো কোনো মেডিকেল কাউন্সিল দ্বারা স্বীকৃতি পায়নি কেন? অন্য কোনো RNA ভাইরাসের ভ্যাক্সিন যেখানে আবিষ্কৃতই হয়নি, সেখানে একই জাতের কোভিডের ভ্যাক্সিন কোন পদ্ধতিতে আবিষ্কৃত হলো?
২) যদি সত্যিই mRNA কোভিড ভ্যাক্সিন আবিষ্কার হয়েই থাকে, তাহলে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটা যুগান্তকারী আবিষ্কার। তাহলে এমন মহান কীর্তি কে আবিষ্কার করল, সেই বিজ্ঞানী বা বিজ্ঞানী দলের নাম কী? তিনি বা তাদের জন্য নোবেল পুরষ্কারের দাবী উঠেনি কেন?
৩) কোন বড় ডাক্তার সংগঠন এই ভ্যাক্সিনকে এখনও পর্যন্ত সরকারিভাবে স্বীকৃতি জানিয়েছে?
৪) রাষ্ট্রীয় বা রাজ্যোয়ারি বিজ্ঞান মঞ্চগুলো ভ্যাক্সিনের পক্ষে পরিষ্কার লিখিত বিবৃতি দিয়েছে?
৫) দুই ভ্যাক্সিন কোম্পানি বাদে- অন্য কোনো ভাইরাস বিজ্ঞানী, গবেষক, মাইক্রোবায়োলজিস্ট কিম্বা বায়োটেকনোলজিস্টদের কোনো সংগঠন এই ভারতীয় ভ্যাক্সিনগুলোকে জেনুইন বলে লিখিত ঘোষণা দিয়েছে?
৬) কোভিশিল্ড নামের ভ্যাক্সিনের ওয়েবসাইটে সিরাম ইন্সটিটিউট গোটা গোটা অক্ষরে লিখে রেখেছে এটা কেবলমাত্র ‘ইমারজেন্সী’ রোগীদের ব্যবহারের জন্য। অতএব ভ্যাক্সিন নেবার পরও মরে গেলে তারা দায় নেবেনা, নেয়ওনি।
তাহলে মারাত্বক অসুস্থ রোগী ব্যাতিরেকে সকল সুস্থ মানুষকে এই ভ্যাক্সিন কেন জোর দেওয়ার জন্য আন্দোলন হবে?
৭) ভারত বায়োটেক নামের ভ্যাক্সিন কোম্পানি তার চতুর্থ অধ্যায়ের ট্রায়াল শুরু করেছে গত সপ্তাহে। ট্যুইটার-ফেসবুক সহ সমস্ত শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রে সে খবর বেরিয়েছিল। তাহলে ভ্যাক্সিনের নামে যেগুলো বিক্রি হচ্ছে সেটাও কী ওই ট্রায়ালের অন্তর্ভুক্ত? কোম্পানি তো বিজ্ঞাপন দিয়ে খোলসা করেছে, সরকার কি খোলসা করেছে এ বিষয়ে? এটা ট্রায়াল কিনা জানতে চেয়ে- কোনো মামলা হয়েছে হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে?
৮) ভ্যাক্সিন নেবার পর এর সাইড এফেক্টে কোনো সুস্থ মানুষের মৃত্যু হলে ‘কেন্দ্র-রাজ্য’ কোনো সরকার কোন দায় নিচ্ছে না, আগে থেকেই ডিক্লিয়ারেশন ফর্মে সই করিয়ে নিচ্ছে যে স্বেচ্ছায় নিচ্ছি। তাহলে ভ্যাক্সিন নেবার এই ভয়ানক প্রচারের ফাঁদে পরে যাদের মৃত্যু হচ্ছে সে দায় কার, শুধুই ব্যাক্তির?
৯) পৃথিবীতে অন্যান্য যত ভ্যাক্সিন বাজারে বেরিয়েছিল, এগুলোর ট্রায়াল পর্বে যাদের উপর ট্রায়াল করা হতো তাদের প্রত্যেককে বিপুল অর্থের বীমা করাতে বাধ্য ছিল বায়োটেক কোম্পানিগুলো। যাতে ঘটনাচক্রে সেই ব্যক্তি মারা গেলে তার পরিবার যেন আর্থিক ক্ষতিপূরণ পায়। এবারে তো আমরা নিজেরা বলছি- স্বেচ্ছায় নিচ্ছি।
এক্ষেত্রে সারা দেশের বহু মানুষের উপর দুটো কোম্পানি ট্রায়াল দিচ্ছে সম্পূর্ণ বিনা খরচাতে। এ যেন আধুনিক নুরেমবার্গ ট্রায়াল। পড়ুন- https://breaking-news.ca/the-new-nuremberg-trials-2021.../
১০) কোনো প্রশ্নের উত্তর না জেনেই কাতারে কাতারে সুস্থ মানুষ ভ্যাক্সিনেশন করিয়েছে- প্রথম ডোজ। তার ভ্যাক্সিন পরবর্তী জীবনের সাথে অন্যের জীবন ধারার বিন্দুমাত্র ফারাক নেই, সেই মাস্ক, সেই দুরত্ব মেন্টেন, সেই ঘরবন্দি, সেই ভয়। সেই তারা উতলা হচ্ছে দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার জন্য।
প্রথম দফার ভ্যাক্সিন নেওয়ার পরেও কত মানুষ মারা গেছে সে তথ্য কার কাছে আছে? আর দ্বিতীয় দফার ভ্যাক্সিন ডোজ নেওয়ার পরেও কত মানুষ মারা গেছে? ভ্যাক্সিন নেওয়ার আগে এটা জানার চেষ্টা করবেননা না? গত এক মাসে যারা করোনাতে মারা গেছেন তাদের সকলে না হলেও বিরাট একটা অংশের মৃত- ভ্যাক্সিন নেওয়ার দলে ছিলেন। একটু খোঁজ নিয়েই দেখুননা, সবটা সব সময় অন্যের কথা কেন বিশ্বাস করবেন!
১১) কখনও ভেবে দেখেছে, আমাদের দেশে এই মুহুর্তে ভ্যাক্সিন নিতে কে বলছে? সাংবাদিক, রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতানেত্রী, আইনজীবী, অর্থনীতিবিদ, ক্রীড়াবিদ, অভিনেতা, শিল্পী সাহিত্যিক, কলা ও বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপকেরা, চায়ের দোকান বা ফেসবুকের সর্বজ্ঞ জ্যাঠামশাই প্রমুখেরা। অথচ যাদের বলার দরকার- সেই জীবাণুবিজ্ঞানীদের দল, স্বীকৃত ডাক্তার সংগঠন কিম্বা বায়োটেকনোলজিস্টরা কিছুই বলছেন না। মেরা ভারত মহান।
১২) WHO গতবছর প্যান্ডেমিক ঘোষণার শুরুর দিন থেকেই COVID বিষয়ে নিয়মিত মানুষকে বিভ্রান্ত করে এসেছে, যা আজও সফলতার সাথে করে চলেছে। কেন এটা কার স্বার্থে?
১৩) ওদিকে মার্কিন CDC গতকাল ঘোষণা করেছে যারা ভ্যাক্সিন নিয়েছে- তাদের মাস্ক লাগবে না, সামাজিক দূরত্বও মেন্টেন করার দরকার নেই। অথচ আমাদের দেশের ভ্যাক্সিন নিয়েও হাজারে হাজারে মানুষ মরেছে। https://breaking-news.ca/the-new-nuremberg-trials-2021.../
১৪) ট্রাম্প চলে যেতেই আমেরিকাতে করোনা প্রায় গায়েব হয়ে গেছে। সব লোক ভ্যাক্সিন নিয়ে নিয়েছে এমনটা মোটেও নয়, কিন্তু ভ্যাক্সিন দালালদের সাথে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্র চালনা করা সরকারি দল অশুভ আঁতাত বন্ধ হয়েছে- তাই করোনা গায়েব। আমাদের মোদীজির সাথে গেটস ফাউন্ডেশনের পিরিত মাখামাখা, যাদের অর্থ লগ্নি আছে অক্সফোর্ড এস্ট্রোজেনিকা, এদই সাবসিডিয়ারি সিরাম ইন্সটিটিউট। ভারত বায়োটেকও গেটস ফাউন্ডেশনের বাইরে নয়। আমার আগের বহু পোস্টে ভুরি ভুরি তথ্য-প্রমাণ দেওয়া আছে।
১৫) মাননীয় মোদী ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশের রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে আসীন থাকবেন। অর্থাৎ করোনার পঞ্চম ঢেউকে কেউ ঠেকাতে পারবে না। সে আপনি যত চেষ্টাই করুন- মৃত্যুমিছিল বা ভয়ের চিতা ছাড়া কিছুই দেখবেন না। নতুবা ভ্যাক্সিনের নামে ভয় বেচে দলীয় তহবিলে টাকা সাইফন কীভাবে হবে? দুটো ভ্যাক্সিন ভ্যাক্সিন কোম্পানিকে এই বছরে কত হাজার কোটি টাকার সাহায্য করেছে কেন্দ্রীয় সরকার সেটাতে চোখ বুলান- আরাম পাবেন। অথচ কেন্দ্রীয় ভাইরাস গবেষণা কেন্দ্রের জন্য বরাদ্দ তো বাড়েইনি, উল্টে কমেছে।
১৬) আগে ছিল চিনা স্ট্রেন, ইতালি স্ট্রেন, ব্রিটিশ স্ট্রেন ইত্যাদি। এখন হয়েছে কোলকাতা স্ট্রেন, উড়িষ্যা স্ট্রেন, দিল্লী স্ট্রেন, গুজরাত স্ট্রেন, বিহার স্ট্রেন ইত্যাদি। এরপর আসবে বর্ধমান স্ট্রেন, হুগলি স্ট্রেন, জলপাইগুড়ি স্ট্রেন। তারপর আসবে বিধানসভা ধরে ধরে স্ট্রেন, এভাবে পঞ্চায়েত স্ট্রেন। শেষে ব্যাক্তিগত পর্যায়ে তন্ময় স্ট্রেন, মৃন্ময় স্ট্রেন, চিন্ময় স্ট্রেন আসতেই থাকবে।
কত ভ্যাক্সিন বানাবি বানা না। আমরা সব নেব- কারণ মিডিয়াতে যে ভয়ের দোকান। দেশে ১৪০ কোটি জনগণ, পড়শী দেশগুলোও আমাদেরই ফলো করে। এরপর পার্সোনালাইজড রঙবেরঙের মাস্কের মত, পার্সোনালাইড অর্ডারি করোনা ভ্যাক্সিনও বাজারে আসবে। ‘ধান্দা চল রাহা হ্যায় ভাই’।
১৭) আজও কোনো বস্তি এলাকাতে বা গ্রামীণ এলাকাতে সেই অর্থে সচেতনতা নেই, সেখানে মড়ক লেগেছে? কতজন মুসলমান মরেছে করোনাতে? কেন মৃত্যুহার কম এই বিশেষ সম্প্রদায়ের? আপনি খোঁজেননি, কারণ মিডিয়া আপনাকে দেখায়নি, তাই মাথাতেও আসেনি।
১৮) করোনাতে মৃত রোগীর কি পোস্টমর্টেম হচ্ছে? হলে সেই সব নমুনার রিপোর্ট কী ? কতজন গবেষক তার উপরে থিসিস লিখেছেন?
১৯) করোনার প্রকোপে বিশ্বজুড়ে ছিটিয়ে থাকা আরো হাজার রোগ অন্যান্য মৃত্যু কী বন্ধ আছে? বাকি রোগেরাও কি লকডাউনের আওতাতে কোয়ারেন্টিনে আছে? যাদের স্বাভাবিক ইনফ্লুয়েঞ্জার মৃত্যু, হাপানির মৃত্যু সহ নানান ধরনের চেনা রোগের যে সব মৃত্যু হতো সেগুলো কোথায়?
২০) একটা ভ্যাক্সিন কোম্পানি কিছুদিন আগে বলেছিল চার সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ, তারপর বলল ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ, অতঃপর ১২ থেকে ১৮ সপ্তাহ, এখন বলছে ৩২ সপ্তাহ পর, এরপর হয়ত বলবে এক বছর।
এরপরও এখন আপনি ভারতীয় ভ্যাক্সিনের মধ্যে বিজ্ঞান খুঁজছেন।
বিশ্বের কোনো সরকার ভ্যাক্সিন নেওয়া বাধ্যতামূলক করেনি, তবে উন্নত বিশ্ব মৃত রোগীর দায় নিচ্ছে- আমরা আচ্ছেদিনের নাগরিক তাই আমাদের উপরে গণ ট্রায়াল চলছে। আমরাই তো আন্দোলন করছি- দিতে হবে দিতে হবে। কী কিউট তাই না!
২০২১ এর করোনা উৎসব মে মাসটা পেরোলে হয়, সে আবার বাইশে আসবে ঈদের আগে আগে। চলুন বসে না থেকে কিছু তো করতে হবে, এই বারে লাল-সবুজ-গেরুয়া সব রঙ মিশে গিয়ে হ্যাসট্যাগ আন্দোলন করি ফ্রি ভ্যাক্সিন দিতে হবে। মামলা করি- সুপ্রিম কোর্টে।
কে বাঁচাবে আমাদের? আমরা তো নিজেরাই জীবন্ত গিনিপিগ।
টেলিগ্রাম গ্রুপের মেসেজে লেখকের নামহীন একটা ভালো পেলাম, সেটাই দিয়েই লেখাটা শেষ করি-
“সরকারী ফরমান নিয়ে একজন ফাঁসির আদেশ প্রাপ্ত আসামীর উপরে একটা গবেষণা করব বলে ঠিক করল বিজ্ঞানীরা। আসামীকে বলা হল- “আপনাকে ফাঁসি দেওয়া হবে না, সাপের দংশনে মারা হবে”। নির্দিষ্ট দিনে বিজ্ঞানীরা আসামীকে একটি চেয়ারে বসিয়ে হাত পা বেধে মুখ ঢেকে দিলো। বিজ্ঞানীরা একটি বিষহীন আলপিন দিয়ে তার পায়ের আঙুলে দুটো ফুটো করে দিলো। অল্প কিছু সময়ের মধ্যে লোকটি ভীষণ ঘেমে মারা গেলো।
বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে এলো- আসামীর শরীরে ভয়ানক রকমের নেগেটিভ এনার্জি কাজ করেছে, শেষ কয়েকদিন সারাক্ষণ ‘সাপের ছোবলে মারা যাবো’ এই চিন্তাই করেছে। পায়ে আলপিন ফুটতেই সেই ভয় ও নেগেটিভ এনার্জি তার হার্ট ফেল করিয়েছে।
মিডিয়ার কল্যাণে, করোনা নিয়েও মানুষের মনে নেগেটিভ এনার্জি কাজ করছে, এটা ভয়ঙ্কর প্রবনতা যা ছোঁয়াচে। যে কোনো মানুষ এই প্রবনতার শিকার হলে, তার বাঁচা মুশকিল। পজেটিভ ভাবুন, Covid মানেই হেরে যাওয়া নয়, এটা একটা স্বাভাবিক লড়াই। আক্রান্তদের ৯৭-৯৮% মানুষ, করোনা স্বাস্থ্যবিধি মেনে সাধারন চিকিৎসা আর পুষ্টিকর খাবারেই সুস্হ হচ্ছে। তাই Covid লড়ায়ে জয়টাই সামনে থাকুক। মনে শরীরে সতেজ থাকুন, ভয় পাবেন না, কাউকে ভয় দেখাবেন না। সুস্থ থাকুন”।
___________
বিঃদ্রঃ- এই পোস্ট শিক্ষিত মানুষের জন্য। ডিগ্রীধারী মুর্খ বা ভক্তদের জন্য নয়।

মঙ্গলবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২১

আক্রান্ত পার্টিকর্মীদের পাশে দাঁড়ান

 



রাজ্যজুড়ে পার্টিকর্মীরা আক্রান্ত, পার্টি অফিসগুলি আক্রান্ত, সাধারণ কর্মী সমর্থক আক্রান্ত, খুনও হয়েছেন। এরপর শুরু হবে মিথ্যা মামলা চাপানো, এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেওয়া ও জরিমানার নামে বিপুল অঙ্কের তোলা আদায়৷
বিজেপি এই রাজনৈতিক অস্থিরতাকে পুঁজি করে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করবেই। আগামী পঞ্চায়েত বা পুরসভা ভোট অবধি এটা চালাবেই এরা। তাই আমাদের কর্মী সমর্থকদের লড়াইটা রোজ কঠিন হবে যারা মাটিতে রয়েছে।
এক্ষেত্রে "মানুষের পাশে" দাঁড়ানোর কথা যারা বলছেন তাদের বলি- সাধারণ মানুষ আক্রান্ত হয়নি, আক্রান্ত আমাদের পার্টির কর্মী সমর্থক ও নিচুস্তরীয় সংগঠনের নেতারা হচ্ছে। এখনই এদের পাশে থাকা দরকার। নতুবা আগামীতে ফেসবুকে চারটে লোক "আমরা শূন্য হলেও বাম" ইত্যাদি মার্কা আঁতলামো মারলেও, বাস্তবে পাড়ায় লাল পতাকা বাঁধার লোক মেলা দুষ্কর হবে।
২০১৬, ২০১৮, ২০১৯ সালের মতোই সর্বত্র পার্টিকর্মী সমর্থকেরা রাস্তায় হাহাকার করছে, অধিকাংশ জেলা নেতারা বেপাত্তা, কেউ কেউ এক আধজন সুন্দর ও মরমী বক্তব্য দিচ্ছেন। ওইটুকুই-
রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর ১৮ জনের মধ্যে চারজন প্রার্থী ছিলেন এই বিধানসভা নির্বাচনে, তারা রাস্তাতেই আছেন নিজ নিজ কেন্দ্রে। প্রবীন বিমান বাবু, সূর্য বাবু এবং শারিরীক ভাবে ভীষণ অসুস্থ, গৌতম দেব ছাড়াও আরও ১১ জন আছেন এই সম্পাদকমণ্ডলীতে। এনারা কোথায়? কেন আছেন পদে?
এছাড়াও রাজ্য কমিটির অবশিষ্ট ৭০ জন সদস্যের মধ্যে ১৪ জন প্রার্থী ছিলেন, তারাও অনেকে রাস্তায়, কেউ কেউ শারিরীকভাবে আক্রান্তও। কয়েকজন প্রয়াত, অবশিষ্ট প্রায় ৫০ জনের অধিক নেতারা কোথায়? তারা নিজ নিজ জেলায় জেলা কমিটির সদস্যদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন না কেন উদ্ধারে?
সব দোষ শুধুই আলিমুদ্দিনকে দিলে আপনার দায় শেষ? MLA, MP, ত্রিস্তর পঞ্চায়েত বা মিউনিসিপ্যালিটির মেম্বার হলে তো আপনারাই হতেন, বিজয়ীর মালা তো আপনাদের গলাতেই উঠত। সংগঠন কি আপনাদের চামচে করে গিলিয়ে দিতে হবে? নেতৃত্ব কি আপনাকে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে আসবে?
এই রাজ্য কমিটির সদস্যদের বাইরে- যারা প্রার্থী ছিলেন তারা আজ কোথায়? কজন নিজের কেন্দ্রে রয়ে আছে, আর কতজন বাড়িতে ঘাপটি মেরে বসে আছে? কেন আছে বাড়িতে?
গোটা প্রক্রিয়ায় যে কমরেডটি আপনার সাথে রইল, মিছিলে হাঁটল, স্লোগান দিল, ভোটের দিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বুথ রক্ষা করল, আপনি তাদের পাশে দাঁড়ানো তো দুরস্থান, ফোনটুকু রিসিভ করবেন না? আপনি কি জাস্টিফাই করছেন- মানুষ আপনার মতো পলায়নপর মানসিকতার লোককে ভোট না দিয়ে ঠিকিই করেছে! কালকে আবার ভোট আসবে, কেন কেউ আপনার হয়ে আবার খাটবে? এখন এই চরম বিপদের দিনে পাশে না দাঁড়ালে কবে দাঁড়াবেন? বাৎসরিক বিপ্লবের দুটো নির্দিষ্ট দিনে গলার শিরা ফুলিয়ে বক্তৃতা দিয়েই দায় শেষ?
আমাদের দলের কয়েকজন হাতে গোনা প্রার্থী ছাড়া অধিকাংশ জনই সামান্য সোশ্যাল মিডিয়াতে সংশ্লিষ্ট বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটারদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করার সৌজন্যবোধ টুকু দেখাবার প্রয়োজন করেননি। কী লাভ তরুণ প্রার্থী দিয়ে - ভাবনাতে যদি তারুণ্য না থাকে!
যাইহোক, আক্রান্তদের পাশে থাকতে গেলে এই মুহূর্তে টাকা দরকার, জানি না পার্টির কোথায় কী অর্থ সংস্থান আছে! একটা আশু উপায় আছে নিয়মিত অর্থ যোগানের। যতজন আমাদের প্রাক্তন এমএলএ, এমপি, কর্মাধ্যক্ষ আছেন- প্রত্যেকে আগামী এক বছরের জন্য নিজেদের সামগ্রিক পেনশনের টাকা- কর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর ফান্ডে জমা দিন৷ এর সাথে অন্যত্র থেকে যেমন অর্থ সংগ্রহ চলে, চলতে থাকুক। তাতে এই মুহূর্তে বেশ কিছুটা অর্থবল নিয়ে ঝাঁপানো যাবে, শেল্টার দেওয়া যাবে।
প্রতিটি আদালতে একটা করে আইনজীবী সেল খোলা হোক, তাদের ফোন নম্বর স্থানীয় অঞ্চলের এরিয়া কমিটির কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হোক। মামলার বিষয়ে পার্টি প্রত্যক্ষ সহযোগী করুক।
অধিকাংশ প্রাক্তন এমএলএ, এমপি ঘরে বসে বসে ফেসবুকে শোক বিবৃতির নামে সাহিত্য রচনা করছেন। রাজ্য নেতৃত্বের মিডিয়া টিম- আগামীতে বিবৃতি সাহিত্যে আনন্দ বা সাহিত্য একাডেমি পুরষ্কার পেলেও আশ্চর্যের কিছু নেই। আক্রমণ যত বাড়বে, আক্রান্ত পার্টি কর্মীর সংখ্যা বাড়বে, তত বাড়বে বিশেষ সাহিত্যধর্মী পোস্টের সংখ্যা- তাতে শোক, দুঃখ, প্রত্যয়, বাণী, সোভিয়েত, লাতিন, মার্ক্স, লেলিন, বিপ্লব ইত্যাদি সব আসবে- পোস্টের মাধ্যমে, নিয়মিত।
গতকাল জনৈক দিল্লীবাসী বাঙালি পলিটব্যুরো সদস্য ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন, কোলকাতা সন্নিহিত এক জেলার সম্পাদক লম্বা ও মোহনীয় বিষাদ সাহিত্য লিখেছেন। দলের রাজ্য পেজ থেকেও 'বিবৃতি সাহিত্য' পোস্ট হয়েছে। সেগুলোর কমেন্ট সেকশনে চলে যান, দলীয় কর্মী, সাধারণ মানুষ সীমাহীন অশ্রাব্য খিস্তি দিচ্ছে। চামড়া গন্ডারের থেকেও মোটা না হলে এসব খিস্তিখেউড় কোনো সুস্থ মানুষ সহ্য করতে পারে না।
সুতরাং, এই সাহিত্য এন্টারটেইনমেন্ট ওনারা চালাতে থাকুক, এটাই হয়ত সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সময়। আপনার আক্রান্ত- হয়েছেন বা হতে পারেন, আপনারা নিজেদের জন্য একটা ফান্ড গঠিত করুন, অর্থের যোগের বিকল্প বললাম, সেটা নিয়ে ভাবুন। পার্টির তরুণ ও মাঠে থাকা নেতাদের সাথে যোগাযোগ রাখুন। পার্টিকর্মীদের পাশে দাঁড়ান সাধ্যমতো।
বিজেপি অনেক স্থানে বাম কর্মীদের ন্যুনতম শেল্টার দেবার কথা প্রকাশ্যে বলছেন, কেউ কেউ প্রাণের দায়ে যাচ্ছেও সেখানে। এটাই নাগপুরী চাল, কালকে এই বাম কর্মীদের সকলে দলে ফিরবে তো? না ফিরলে দায় কার?
পুনশ্চঃ
__
ব্যক্তিগত আমি অর্থ দিতে পারব না সেভাবে, মামলাতেও সাহায্য করতে পারব না, আমি নিজেই ওতে জর্জরিত। তবে সাময়িকভাবে নিরাপদ আশ্রয় দিতে পারব বেশ কিছু জন পুরুষ পার্টিকর্মী সমর্থকদের- যারা সন্ত্রাসের শিকার হয়ে ঘরছাড়া। ফোন নম্বর লাগলে ইনবক্সে যোগাযোগ করুন।

শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২১

আমি, মেলোডি আর শ্রাবণের ধারা

 


“সোচেঙ্গে তুমহে প্যায়ার করে কে নেহি…”, না এতটাও ভাবাভাবির অবসর ছিল না। এ প্রেম ছিল লাভ এত ফার্স্ট সাইট, তবে তার একটা পটভূমিকা ছিল।
গ্রামের ছেলে, কোলকাতা থেকে শত কিলোমিটার দূরবর্তী গঙ্গার তীরে ছোট্ট আমাদের গ্রাম। মিশ্র সংস্কৃতির পরিবেশে বড় হওয়া, যে পরিবেশের হাওয়াতে কোনো সাম্প্রদায়িকতা-হানাহানির চিঠিপত্র লেনদেন হতো না, বরং এই চৈতন্যের মাটি শিক্ষা, সম্প্রীতি আর গঙ্গার উর্বর হাওয়া-মাটির জন্য পরিচিত। শৈশব কেটেছে খোয়া উঠা সরু পিচের আঁকাবাঁকা রাস্তা, প্রাচীন গাছেদের পঞ্চায়েত, জলা-জঙ্গল-ঝোপ, বুনো ফুলের গন্ধ, ঝড়ে আম কুড়ানো, পিটুলির গুলতিতে বাঁদর মারা, বহলের আঠা দিয়ে ঘুড়ি বানানো, ভন্যি দুপুরে জাম আর ফলসা খেয়ে নিমের উঁচু ডাল থেকে পুকুরের জলে ঝাঁপ, ক্রিকেট-ফুটবল, প্রতিবার বোনের অন্যায়ের দায় কীভাবে যেন আমার ঘাড়ে চলে আসা, গোয়ালের খুঁটিতে বেঁধে মায়ের ঠ্যাঙানি, বাবার গোল্লা পাকানো চোখ, চেঁচিয়ে নামতা আর মাস্টার টেন্স পড়া, দাদুর প্রশ্রয়, লুকিয়ে লাউ এর ডাঁটির বিড়ি টানা, আর পাখি-সাপ-খরগোশেদের সাথে। সারাদিন খেলে এসে সন্ধ্যায় পড়তে বসার সাথে ঢুলুনি, ছাদের ক্যাম্পখাটে তখন দাদু রেডিও সিলোন লাগিয়ে রেখেছে। বোনের খুনসুটি, মা-কাকিমা-পিসিদের মহিলা মহল, হ্যারিকেনের নেশাধরা হলদেটে আলো, ছাদ থেকে ভেসে আসা গানের সুর আর ক্লান্ত শরীর- সমার্থক হয়ে ঘুমের অতলে তলিয়ে যাবার আগে কান ছুঁয়ে থাকত অজানা ভাষার গানের সুর, যার কথা বুঝতাম না সেই কালে, তবে শুনতে বড় ভাল লাগত।
নথি মোতাবেক এখানে আমাদের পরিবারের বাস কমবেশি ৩০০ বছরের ঊর্ধ্বে, তখনও পূর্ববঙ্গ থেকে আসা উদ্বাস্তু মানুষেরা এই জায়গাটা এতটা মারাত্মক জনবহুল করে তোলেনি, পাড়ার মোড়ে মোড়ে কারণে-অকারণে মাইক-ডিজেবক্স অলীক কল্পনা। রাত্রের সেই রেডিওর সুর ভোরের কুয়াশা ভেদ করে খুব বেশি দূরে যেত না, লেগে থাকত বাঁশের ঝাড়ে, তেঁতুল বাগানে কিংবা আম বনে। সকালের মিঠে রোদে পাখিদের গানে যেন সেই সুরেরই মূর্ছনার রেশ রয়ে যেত। তখন কোনো গানের আসর বসা মানে সেটা লোকে মনপ্রাণ ঢেলে শুনত, উপভোগ করত, ওটাই ছিল মনোরঞ্জনের অন্যতম উত্তম মাধ্যম যা সহজলভ্য ছিল না।
শৈশবাবস্থা পেরিয়ে বালক বেলার শুরুতেই দাদুর সান্ধ্য আসরে শরিক হবার ছাড়পত্র পাওয়া গেল। ঢাউস মরফি রেডিও, ঘনঘন চা, মায়ের বকুনি আর বিভিন্ন গীতমালার হরেক সম্ভার- বিশেষত শনি-রবিবার, এই ছিল রোজনামচা। তখন এ এলাকায় বিদ্যুৎ আসেনি, ছোট দুই পিসি অবিবাহিত, এক কাকাও। মায়ের দুলাল তখন সদ্য আঁচল ছেড়ে পিসিদের অভিভাবকত্বে তাদের কাছেই দিবারাত্রে থাকার অভ্যাসে অভ্যস্ত হচ্ছে, পালক গজানোর বয়স আগত প্রায়। পিসিরাই মূলত সারাদিন কারণে-অকারণে গান গুনগুন গুনগুন করত ঘরে-বাইরে।
কতই বা আর বয়স হবে, সাত কিংবা আট- শুনেছিলাম নতুন একটা বাঙালি গায়ক উঠেছে, নাম কুমার শানু। সেকালে না জানতাম বাঙালি কী বস্তু, না বুঝতাম নতুন উঠা কাকে বলে। মায়ের শখে তখন রোজ সকালে রেওয়াজ করা নিত্যদিনের কর্ম, যদিও সে সবই সা রে গা মা পা- ব্যাস, ‘গান কই এতে’ এটা মনে পরলেই রেগে যেতাম অজান্তে। হলে-মলে, বিয়ে-শাদিতে তখন পাড়া ঘরে ভিডিও আসর বসত, যা মূলত রাত্রের দিকে। ফলত, এর অনুমতি কখনই মিলত না, তাই নিষিদ্ধ বস্তুর মতো এটার প্রতি একটা দুর্নিবার টান ছিল- অগত্যা রেডিও আর রবিবারে সেজো কাকার নতুন কেনা টেপ রেকর্ডারই ছিল তৎকালীন ভার্চুয়াল দুনিয়ার একচেটিয়া আধিপত্যে।
আজকের দিনের মতো সদ্য তাজা গান শুনতে পাওয়ার তেমন সুযোগ ছিল না, শ্রোতারাও রোজ নতুন কিছু চাইত বলেও মনে হয় না। এভাবেই জানলাম একটা হিট গানের সিনেমার নাম আশিকী, ছোট পিসি তখন প্রায় উড়ছে; একটা নতুন- অন্য ধরনের, অন্য ফ্যাশনের লম্বা চুড়িদার পরে কলেজ যেতে লাগল। অনেক পরে জেনেছিলাম সেটা নাকি অন্নু আগারওয়াল স্টাইল। মাস বেয়ে বছর যেতে লাগল, মনের হার্ডডিস্কে হিন্দি গানের একটা ছোটখাটো গ্যালারি তৈরি হয়ে গেল, যার মধ্যে পুজো ভাসানের সময় ম্যান্ডেটারি ‘প্রেম প্রতিজ্ঞা’র গান সহ- পাড়ার মিঠুন-জিতেন্দ্রদের নড়বড়ে পায়ে ড্যান্স সহ বেসুরো গান ।
সময়ের নিয়মে এরপর পিসিদের বিয়ে হয়ে গেল, আমরাও তুতো ভাইবোনেরা মিলে হাই স্কুলে গেলাম, একটু বড় হলাম। সময়টা মধ্য নব্বই এর দশক। ততদিনে উদিত নারায়াণ, সোনু নিগম, অভিজিৎ প্রমুখ গায়কেরা বাজারে চলে এসেছে, নামগুলোও ঠোঁটস্ত; মহিলা কন্ঠে অলকা ইয়াগনিক, কবিতা কৃষ্ণমূর্তি, অনুরাধা পড়োয়ালেরা ঝিমঝিমানি নেশা ধরাত রোজ। তাদের কণ্ঠে ভয়ঙ্কর রকম হিট গান সদ্য যৌবনকে প্রতিমুহূর্তে নাড়া দিয়ে যেতে লাগল, মুহুর্মুহু প্রেমের প্লাবন ডাকতে লাগল শরীর-মন জুড়ে। রফি, লতা, কিশোর, আশা এনারাও ছিলেন, সঙ্গীতে- জীবনেও; কিন্তু এনারা তো নিজ গুণেই কাল্ট, তাই এনাদের নিয়ে আলাদা করে লেখার কিছু নেই।
আজকের নিয়মে হয়ত একটু পুরাতন, কিন্তু তাতে কী! সাজান, সড়ক, দিল হ্যায় কি মানতা নেহি, হাম হে রাহি পেয়ার কে, রঙ, ফুল অউর কাঁটে, রাজা, বরসাত, জিৎ, দিওয়ানা, রাজা হিন্দুস্তানি ইত্যাদি কত কত সিনেমার গান আমাদের বুঁদ করে রেখে অজান্তেই যৌবনে ঠেলে দিল জীবনকে। মুহূর্তে রঙিন হয়ে উঠল চারিপাশ। খোঁজ শুরু হলো মনের মানুষের, খোঁজ শুরু হলো ঐসব অপার্থিব সুরের স্রষ্টাদের। সদ্য যৌবন কালেই ঘরে চলে এলো ব্যাটারিচালিত এ্যালুমিনিয়ামের এ্যান্টেনা-বুস্টার সমৃদ্ধ সাদাকালো টিভির দূরদর্শন আর ল্যান্ডলাইন ফোন। যোগাযোগ তথা তথ্যের পৃথিবী গত দিনের তুলনাতে ঠিক কতটা খুলে গেছিল তা আজকের প্রজন্ম উপলব্ধি করতে অক্ষম। চোখে দেখতে পেলাম এতদিনের পছন্দের গানগুলোকে, সব যে পছন্দ হতো তা নয়, তবে এটা ছিল অন্য ভালোলাগা।
জানলাম এই সমস্ত হিট গানের পিছনে একজন লেখক থাকেন, একজন সুরকার থাকেন, এতদিনে ক্যাসেটের রঙিন কাগজ পড়ে দেখতে লাগলাম। খোঁজ শুরু হলো সেই সব সুরকারেদের, আর-ডি, বাপ্পি লাহিড়ী, আনন্দ-মিলিন্দ, অন্নু মালিক, যতীন-ললিত... প্রেমে মাতোয়ারা গেলাম। স্কুলে বন্ধুদের সাথে গল্প জমাতাম, বান্ধবীদের ইমপ্রেস করতে সেলুনে গিয়ে লুকিয়ে ফিল্মি পত্রিকা পড়া শুরু করলাম। তবে এই পর্বে প্রেমের চেয়েও একটু বেশি যদি কিছু হয়ে থাকে, উন্মাদনার সিংহভাগটা যাদের জন্য বরাদ্দ হলো- তাদের নাম নাদিম-শ্রাবণ। জেনেছিলাম রূপ কুমার রাঠোর আর বিনোদ রাঠোর শ্রাবণেরই সহোদর।
সেই একতরফা প্রেমে পাগল হয়ে মাতোয়ারা, কী সব এক সে এক হিট গান, রোজ শুনেও যেন টাটকা তাজা রয়ে থাকত- সেই প্রেম চিরন্তন, আজও অমলিন। আজও মনের মধ্যে বিভিন্ন আবেগ-অনুভূতি, বেদনা, প্রেম-ভালোবাসা যখন শুরু বা শেষ হয়- তখন যে গানগুলো অন্তরে বেজে উঠে, চোখ বুঝলে নিজে থেকেই গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠে আমার স্বত্তা; রবীন্দ্রসংগীতের পর সেগুলোর অধিকাংশেরই স্রষ্টা নাদিম-শ্রাবণ। ব্যাস, আত্মার আত্মীয় হতে আর সময় লাগে কী! উপরওয়ালা কাকে আত্মীয় বানিয়ে পাঠায় আর আমরা কাকে আত্মীয় বানিয়ে নিই- সেই রসায়নকে কোন বিজ্ঞানী সংজ্ঞা দিতে পারে!
কালের নিয়মেই এর পর ভালর পরিমাণ কমতে লাগল ঠিকিই, কিন্তু তার মধ্যেও সির্ফ তুম, পরদেশ, ধড়কন, রাজ, তুমসে আচ্ছা কৌন হ্যাঁয়, দিল হ্যাঁয় তুমহারা- আলাদা করে মনে গভীর দাগ কেটে দিলো। নতুন করে কী দিল, কী পাচ্ছি তার চেয়েও বড়- কী পেয়েছি, কী রয়েছে ঝুলিতে পুঁজি স্বরূপ, ইত্যাদি- সেটাই কী আত্মধনী হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়! প্রশ্ন করার আগেই এমন উত্তর পেয়ে এক নির্লিপ্ত আত্মপ্রশান্তিতে ভরে উঠে মন। শরীরের অলিগলিতে বাসা বেঁধে থাকে যে সব চাহিদা- তা সে সমাজ কিংবা ধর্মের বিধি মেনে হোক, বা না-মেনেই হোক- সে সব অন্তরে গাঁথা থাকে নিভৃতে।
সে ছিল এক জাদু সময়, আজকাল তো আর সেই অর্থে আর গান তৈরিই হয় না। সবাই নাচতে চায়, প্রচুর যন্ত্রের আওয়াজ, সুর কোথায় কেউ জানে না, গানের কথা কী কেউ বোঝেনি। গান কবে আসে আর কবেই বা হারিয়ে যায় কেউ খোঁজ রাখে না। অথচ সে সময়ও যন্ত্রসঙ্গীতের ব্যবহার ছিল, যেটা অত্যাচার ছিল না। তাকে বলা হতো মেলোডি। আমাদের সেই সোনালী কৈশোর-যৌবন ছিল মেলোডিময়।
অতীত গত হয়ে গিয়ে বাস্তবের কঠোর জমিতে জীবন সংগ্রাম চলছে কর্মজীবনের। সংগীতের নামে সংঘবদ্ধ যন্ত্রের অত্যাচার 'কথা ও সুর' কে অনেক আগেই মেরে দিয়েছে। গায়কেরা অসহায়, যা পায় তাই গায়- গায়কের সংজ্ঞাও বদলে গেছে, আজকে অধিকাংশ সুরকারই গায়ক।
মেলোডির অপমৃত্যু আমরাই দেখেছি, তার ডেথ সার্টিফিকেট ছিল না। পরশু যখন শুনলাম শ্রাবণ কুমার রাঠোর আর নেই, বুঝলাম সেই প্রতীক্ষিত ডেট সার্টিফিকেট ইস্যু হয়ে গেল। একটা যুগ, একটা প্রজন্ম, একটা প্রাণে ভরপুর সাংস্কৃতিক ঘরানাকে সাথে করে নিয়ে তিনি চলে গেলেন।
শিল্প-সংস্কৃতি বহমান সময়ের প্রতিচ্ছবি আঁকে, নাদিম-শ্রাবণ জুটি তার ব্যতিক্রম নয়। আমাদের শৈশব, কৈশোর, যৌবন সহ আজ এই মাঝ বয়সে এসে উপলব্ধি করতে পারি- জীবনে মেলোডি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এ এক এমন আকর্ষণ যার কোনো বস্তুগত ব্যাখ্যা হয় না, এক অমোঘ টান যা বহু সম্পর্ককে নাৎস করে দেয়।
সঙ্গীত জগতের মেলোডির অন্যতম সম্রাট- শ্রাবণ কুমার রাঠোর চিরঘুমের দেশে। তার সৃষ্টি আমাদের ও আগামী প্রজন্মকে মেলোডিতে ডুবিয়ে রাখবে যারা মেলোডিতে ডুবে জীবনের স্বাদ পেতে চায়। আর আমার মতো কারো জীবনটাই তো শ্রাবণের ধারাতে ধোয়া।

বিদায় মেলোডি সম্রাট।
🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...