বৃহস্পতিবার, ১৯ জুন, ২০২৫

ব্রিক্স ও ভারত

 


ব্রিক্স ও ভারত

ব্রিক্স সম্মেলন শেষ না হতেই নরেন্দ্র মোদী ও তার দলবল জার্মানি চলে গেছেন। ব্রিক্স সম্মেলনে যাবার আগে কানাডা ও আমেরিকা ভারতকে বেশ ঘষে দিয়েছে। এতদিন যে মোদীজী আমেরিকা, ইজরায়েল করে লাফালেন। অস্ত্রশস্ত্র আমদামি করলেন রাশিয়াকে পিছনে ফেলে, কিন্তু তাতে লাভের লাভ কি হল? ফ্রান্সের যে র‍্যাফায়েল যুদ্ধবিমান নিয়ে এত নাচানাচি, সেই বিমান কিন্তু ইউক্রেনে পাঠায়নি ফ্রান্স

আমেরিকা ডেনমার্কের মাধ্যমে বুক ফুলিয়ে F-16 বিমান পাঠিয়েছিল, তার অর্ধেক উড়ার আগেই ধ্বংস করে ফেলেছে রাশিয়া। আমেরিকার একশো মিলিয়ান ডলারের রিপার ড্রোনও কোনো কাজে আসেনি। প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ৯০% উড়িয়ে দিয়েছে রাশিয়া। ইজরায়েল এতদিন বরাক টরাক নিয়ে গর্ব করতো, ভারতকে বিক্রিও করেছে বিলিয়ান বিলিয়ান ডলার নিয়ে, সেসব ধ্বংস করে এখন ইজরায়েলের অস্ত্র ব্যাবসাতে লালবাতি জ্বালিয়ে দিয়েছে ইরান একাইফিলিস্তিন নিয়ে ভারতের এত দশকের অবস্থান এর বিপরীত অবস্থান নিয়ে আমেরিকার পদলেহন করে বাকি বিশ্বে প্রায় একঘরে হয়ে গেছে মোদীর ভারত

স্বভাবতই ব্রিক্স সম্মেলনে ভারতের গুরুত্ব ভয়ানক হ্রাস পেয়েছে। পাঁচজন প্রতিষ্ঠাতা দেশের একজন হয়েও ব্রিক্সে মোদীর ভারত তেমন পাত্তা পায়নি এইবারে, যেমন পেয়েছে ইরান বা তুর্কিয়ে। আসলে কাজান ডিক্লেরেশনে ভারত সই করেছে বটে, কিন্তু মোদীর ভারতের দুই নৌকায় পা দিয়ে চলাটা সবাই লক্ষ্য করেছে। বস্তুত চীন ও রাশিয়া ব্রিক্সে পোল পজিশনে, ভবিষ্যতে তারাই ব্রিক্সের দিক নির্দেশ করবে। এদিকে রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান, ইরান যৌথভাবে নৌ-মহড়া ভারত মহাসাগরে শুরু করছে, ভারত সেখানে দর্শক

মূল সমস্যা হল ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির তুলনামূলক অবনতি, প্রায় প্রত্যেক দেশের সাথেই বানিজ্য ঘাটতি। চীন নিয়ে মোদী প্রশাসনের এত চেঁচামেচি, সেই চীনের সাথে ভারতের বানিজ্য ভয়ানক লজ্জাজনক। চীন ভারতে রপ্তানী করে ১০০ বিলিয়ান ডলারের পণ্য আর ভার সেখানে খুব বেশ হলে ১০ বিলিয়ান ডলার ছুঁতে পেরেছে। আসলে চীন প্রায় সর্বক্ষেত্রেই ভারতের থেকে ১৫-২০ বছর এগিয়ে রয়েছে। মোবাইল প্রযুক্তির ৯৫% যন্ত্রাংশ, ওষুধের ৯০% ভাগ কাঁচামাল, কৃষি মেশিনারি, কেমিক্যালস, ব্যাটারি, সব ক্ষেত্রেই চীনের আধিপত্য। ভারতকে ৯৫% তেল আমদানি করতে হয়, কিন্তু মোদীর সাহস নেই ভেনিজুয়েলা বা ইরান থেকে সস্তায় তেল আমদানি করার। রাশিয়ার থেকে ডিসকাউন্টে যে তেল কেনে ভারত, তার বেশিটাই রিফাইন হয়ে ইরোপে যায় বলে আমেরিকা কিছু বলেনি। অথচ ইরান থেকে স্বল্প খরচে তেল আমদনি করা যেত, যা অতীতে করাও হয়েছে

ভারতের একমত্র জোরের যাগা তার আভ্যন্তরীণ বাজার, এবং প্রভুত ক্রয়ক্ষমতাসপন্ন মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়। এদেরই করের টাকা দেশের যত লম্ফঝম্ফ! অথচ ইরান, তুর্কিয়ে চমকে দেবার মত উন্নতি করেছে। অবশ্যই ভারতও করেছে, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য মাত্র। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে চীন শিক্ষা, স্বাস্থ্যে যে পরিমাণ বিনিয়োগ গত পনেরো বছরে করেছে, ভারত তার কুড়িভাগের একভাগও করেনি। এখানেই আসল সমস্যা। এক সময়ে ভারতীয় রেলের থেকে চীনের রেল খারাপ ছিল। চীন কিন্তু লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা রেলের উন্নয়নে খরচ করেছে, সেকখানে ইন্ডিয়ান রেলের এ্যাচিভমেন্ট হচ্ছে  দৈনিক দুর্ঘটনায় রেকর্ড সৃষ্টি করেলক্ষ লক্ষ রেলের চাকুরিতে পদ খালি, নতুন লাইনের কখবরই নেই। আজ রেলের গণপরিবহনে চীন পৃথিবীর সেরা।

ভারতকে বিশ্বে সম্মানের সাথে টিকে থাকতে হলে নিজের ঘরের দিকে নজর দিতে হবে। শিক্ষা, গণস্বাস্থ্য, বাসস্থান ও কর্মসংস্তথান সৃষ্টির ক্ষেত্রে বিপুল বিনিয়োগ করতে হবে। পাকিস্তান প্রতিপক্ষ নয়, কিন্তু চিনের সাথে পাল্লা দিতে হলে, অস্ত্র দিয়ে নয়- শিক্ষার উন্নতি দিয়ে করতে হবে, স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে হবে। কয়লা পেট্রোলের বদলে বিকল্প জ্বালানি, বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু হবে কি? বিজেপি থাকলে আশা কম বা নেই। বিশেষ করে অশিক্ষিত নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় থাকলে আগামীতে কোনো সম্ভাবনা নেই ভারতের

প্রস্তাবিত ব্রিক্স কারেন্সি এখনও চালু হয় নি, অদূর ভবিষ্যতে হতে চলেছে। আসলে ব্রিক্স অর্থব্যবস্থা বিভিন্ন ধাপের অন্তিম ধাপ হল, ব্রিক্স কারেন্সি। তার প্রথম ধাপ হল ব্রিক্স সেটলমেন্ট সিস্টেম, ব্রিক্সপে। এখন দুই দেশের মধ্যে বানিজ্য করতে হলে, তা করতে ডলার বা ইউরোর মাধ্যমে। এসব নিয়ন্ত্র করে SWIFT নামের একটি সংস্থা, যার নিয়ন্ত্রক হল আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমী ইরোপ।

যেমন ধরা যাক ভারত ইরান থেকে তেল আমদানি করবে। ভারতীয় টাকার সাথে ডলারের মুল্য স্থির বা ইরানের সাথে ডলারের মুল্য স্থির করে ওই সুইফট নামক সংস্থা। এর জন্য যা ইচ্ছে ট্রানজাকশন চার্জ করে সুইফট। সমস্যা শুধু সেখানেই নয়, তার ওপরে আছে নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক। এই নিষেধাজ্ঞা আগে জারি করত রাস্ট্রপুঞ্জ এবং তা সর্বতমান্য ছিল। এখন শুরু হয়েছে আমেরিকা ও পশ্চিমী ইয়োরোপের নিষেধাজ্ঞা। অর্থাৎ আমেরিকা গোঁসা করলেই যে কোন দেশের মাথায় বজ্রাঘাত। আমদানি রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা এর প্রধান বলি ইরান, রাশিয়া, গণ প্রজাতন্ত্রী কোরিয়া, ভারত, চীন সহ আরও অনেক দেশ। অর্থাৎ আমেরিকান ডলার শুধু রিজার্ভ কারেন্সিই নয়, এখন তা পশ্চিমাদের রাজনৈতিক অস্ত্র।

এটা যে কোন দেশের সার্বভৌমতা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অবমনন। এ ছাড়া আরও অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়, ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক, ইনটারন্যাশন্যাল মনিটারি ফান্ড, বিশ্ববানিজ্য নিয়ামক সংস্থার মাধ্যমে। আমেরিকা বা ডলারের বিরুদ্ধে লড়াই নয়, মূলত এসব একদেশদর্শী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, অন্য একটা কার্যকরী অর্থনীতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যই ব্রিক্সের সৃষ্টি।

অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ইউনিপোলারিটির বিপক্ষে একটি মাল্টিপোলারিটি ব্যবস্থা, যেখানে কোন দেশের আধিপত্য বা নিয়ন্ত্রণ চলবে না। কথায় কথায় কোন দেশের সম্মপত্তি বাজেয়াপ্ত করা যাবে না। নিষেধাজ্ঞার আড়ালে কোনো দেশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা যাবেনা। আপাতত পৃথিবীর নটি দেশ এখন ব্রিক্সের সদস্য, প্রাথমিক পাঁচটি সদস্য দেশ ধরে। ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন ও সাউথ আফ্রিকা। এ বছর যুক্ত হয়েছে ইরান, ইথিওপিয়া, ইজিপ্ট ও ইউনাইটেড আরব এমিরেটস। সদস্য হবার পথে তুর্কিয়ে ও সৌই আরব। এ ছাড়া আরও বত্রিশটি দেশ সদস্যপদের আবেদন জানিয়েছে। এর মধ্যে এক চীন ছাড়া সকলেই উন্নয়শীল ইকোনমি

ব্রিক্সপে আর একটা ধাপ হল, ডলারে বদলে কান্ট্রি টু কান্ট্রি বার্টার। যেমন ধরা যাক ভারত ইরান থেকে তেল আমদানি করবে, বদলে ভারত চাল, গম, মুর্গি রপ্তানি করবে। বিনিময়ের অনুপাত বা পরিমাণ একমাত্র দুই দেশই ঠিক করবে। এখনকার মত লন্ডন গ্রেন এক্সচেঞ্জ বা শিকাগো গ্রেন মার্কেট দাম ঠিক করবে না বা নিউইয়র্ক তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করবে না। এর মধ্যে দুই দেশের সম্মতি ব্যাতীত তৃতীয় কোন দেশের খবরদারীও চলবে না।

লক্ষ্য হল, এইসব লেনদেন বে মূলত ডিজিটাল কারেন্সিতে অর্থাৎ ব্রিক্স কারেন্সিতে। এতো গেলো কান্ট্রি টু কান্ট্রি ব্যবস্থা। এ ছাড়াও বিজনেস টু বিজনেস এবং বিজনেস টু পিপল ব্যবস্থার প্রশ্নও আছে এতে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এগুলির সমন্বয় করবে সিবিডিএস বা সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক ডিজিটাল সিস্টেম। দেশের ক্ষেত্রে তা করবে সে দেশের সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক। যেমন ভারতের ক্ষেত্রে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক

একটা বিকল্প অর্থনৈতি ব্যবস্থা গড়ে উঠতে অনেক সময় লাগে, ব্রিক্সেরও লাগবে। বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি, রাজনৈতিক স্থিতি, এক রকম নয়। যেমন ভারতে ক্ষেত্রে UPI বা চীনের mPay কিংবা রাশিয়ার মীর খুবই বিস্তৃত। কিন্তু বিভিন্ন দেশে তা এখনও গড়ে ওঠে নি, তার জন্য সময় লাগবে, সেটার প্রসে শুরু হয়েছে। মনে রাখা দরকার G-7 ভুক্ত দেশের মোট জিডিপি ও জনসংখ্যার থেকে ব্রিক্সের সম্মিলিত জিডিপি বেশি, জনসংখ্যাও অনেক বেশি। তাই খুব অল্পদিনেই দেখব ডলার তার মান হারাবে, একমাত্র বিনিময় মুদ্রা থাকার কারনে ডলারের যে দাদাগিরি ছিল, সেটার অবসয়ান হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র। ব্রিক্সপে এবং ব্রিক্স কারেন্সি এসে গেছে

মুশকিলটা কী জানেন, ঠিক এই সময়ে যখন একজন শিক্ষিত প্রধানমন্ত্রীর দরকার ছিল ব্রিক্সের রাশ হাতে নিয়ে বিশ্বগুরু হয়ে উঠার জন্য, সেখানে অশিক্ষিত মোদীর লাল চোখের সার্কাস- ইন্ডিয়াকে ক্রমশ মূল্যহীন একঘরে করে দেওয়ার দিকেই নির্দেশ করছে। হাতে পাওয়া সুযোগ ছেড়ে দেবার আরেক নজির আমাদের চোকখের সামনে ঘটে চলেছে। 

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...