মিডিয়া খুললেই এখন সর্বত্র সনাতনী নিদান বা বিধানের রিলস বা লেখা চোখে পরছে, সদ্য গজানো বাবা বা সনাতনী সদ্য গজানো ধর্মগুরুর দল রীতিমত দোকান খুলে বসেছে। আর নিশ্চিতভাবেই এই প্রতিটা ধর্মগুরুদের একটাই মূল সংগঠন, যার নাম RSS, এই আর.এস.এস পশ্চিমবঙ্গের সাড়ে ৬ কোটি হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ এর দীর্ঘদিনের আচার, সংস্কৃতি, পদ্ধতিগত ও আবহমান চিরায়ত কৃষ্টিগত রুচি বদলে যাক, যার সাথে বাকী ভারতের হিন্দুদের পার্থক্যটা বেশ মোটাদাগের। কোনো অঞ্চলের খাদ্যাভ্যাস এবং সংস্কৃতি- নানান উপাদানের ভিত্তিতে ক্রম অনুশীলনের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। মানুষ তার বেঁচে থাকার তাগিদে এবং চারপাশের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে নিতেই এই অভ্যাসগুলো স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে তৈরি করে ফেলে।
সংস্কৃতির সবচেয়ে প্রধান ভিত্তি হচ্ছে ভৌগোলিক অবস্থান ও এলাকার জলবায়ু, আমাদের বাংলা নদীমাতৃক ও উর্বর পলিমাটির দেশ হওয়ায় প্রধান খাদ্য মাছ-ভাত, স্বভাবতই বঙ্গবাসী মানুষের ধর্মীয় অনুশাসন ও বিশ্বাস তাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসকে গভীরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। দুর্গাপূজার মহোৎসব সেই খাদ্য সংস্কৃতিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাঙালী হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণ ৪%, বৈশ্যও সম শতাংশের বা কিছু কম, বাকীরা ক্ষত্রিয় ও শুদ্র বা দলিত সম্প্রদায়ের, নাগপুরের ব্রাহ্মন্যবাদীদের ভাষায় ‘ছোটজাতের’, যারা মোট বাঙালী হিন্দু জনসংখ্যার ৯২%। এরা আমিষ খাবেনা তো কারা খাবে? বাঙালী ব্রাহ্মনদেরও আমিষ নিয়ে কোনো ছুৎমার্গ নেই আজও। নৃতত্ববিজ্ঞানকে আপনি কীভাবে উপেক্ষা করবেন বা ভুলিয়ে দেবেন নাগপুরি হিন্দুত্বের আরক গিলিয়ে?
হিন্দু ধর্মের যে মূল গ্রন্থ, চার বেদ, উপনিষদ, গীতা রামায়ণ, মহাভারত এবং সমস্ত স্মৃতি গ্রন্থের কোথাও বৈশ্য, ক্ষত্রিয় ও শুদ্রদের আমিষে মানা করা নেই। এমনকি RSS এর প্রস্তাবিত সংবিধান ‘মনুস্মৃতির’ ৫ম অধ্যায়ের ৩২ ও ৩৩ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে, যজ্ঞের উদ্দেশ্যে কিংবা শাস্ত্রীয় বিধি মেনে মাংস খাওয়া কোনো অপরাধ নয়। এছাড়া যুদ্ধবিদ্যা বা শিকারের মাধ্যমে অর্জিত মাংস ভক্ষণ ক্ষত্রিয়দের পূণ্যের কাজ। শূদ্রদেরও কঠোর শারীরিক পরিশ্রম ও কৃষিকাজের সাথে যুক্ত থাকতে হতো, যার কারণে তাদের খাদ্যাভ্যাসে মাংসের ওপর কোনো কঠোর ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়নি কোনো শাস্ত্রেই। দেবতার উদ্দেশ্যে যজ্ঞ মানেই তো ছিলো বলি, সেই মাংস কি ফেলে দিতো পুরাকালে?
এর পর আসে মানুষ জীবিকা। আমাদের কৃষিপ্রধান সমাজ, ফলত ঘরে ঘরে পশুপালনের চল রয়েছে। অতএব, আমাদের খাদ্যাভ্যাস্যে মাংস থাকাটা কোনো ইউরোপীয় বা আরবি সংস্কৃতি থেকে আসেনি। কঠোর পরিশ্রমী কৃষক বা শ্রমজীবী মানুষের খাদ্য তালিকায় কার্বোহাইড্রেট তথা পেটপুরে ভাত খাওয়াটাই থাকে, যা তাৎক্ষণিক শক্তি দেয়। সুতরাং, এই সমাজে প্রতিটা লোকৎসব তা দুর্গোৎসব হোক বা অন্য উৎসব- সবই এই বঙ্গীয় খাদ্য সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠেছে কালের পরিক্রমায়।
বর্তমানে বিশ্বায়নের যুগেও বিজ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তির সাথে তাল মেলানো আধুনিক বাঙালি হিন্দু, শরীর সচেতন হয়ে স্বাস্থ্যের জন্য হানিকর খাবার এড়িয়ে গেলেও, জলবায়ু তথা প্রকৃতিকে কীভাবে অস্বীকার করবে? বাঙালি কি গণহারে বার্গার, পিৎজা, সুসি কিম্বা থাই খাবারে অভ্যস্ত হতে পেরেছে আজও? বাংলার এই প্রকৃতিতে জন্ম নেওয়া কৃষ্টি সংস্কৃতিকে কীভাবে রাতারাতি ছুঁড়ে ফেলে দেবে?
ইতিহাসের পরিভ্রমণে, অভিবাসন আর বিশ্বায়নের নানান পর্যায়ে মানুষ যখন অন্য দেশে প্রব্রাজন বা দেশান্তরী হয়েছে, কিম্বা অন্য দেশ বা অঞ্চল থেকে আমাদের ভূমিতে অন্যেরা এসে স্থায়ী হয়েছে- তখন ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি নিজেদের মিথস্ক্রিয়া ও আদান-প্রদানের মাধ্যমে, একটা দীর্ঘ সময়ের আবর্তে বৈচিত্র ঘটিয়েছে। এভাবেই আমরা আলু, টমেটো, ও লঙ্কা খেতে শিখেছি, বিরিয়ানি, মোগলাই কিম্বা শুক্তো খেতে শিখেছি। বাঙালী মেয়েরা শাড়ির বদলে সালোয়ার, নাইটি, জিন্স; পুরুষেরা কামিজ ধুতির বদলে ট্রাউজার শর্টস আর শার্টে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আর এগুলোর কোনোটার ফতোয়া বা ধর্মীয় বিধানের ফাঁসজালে বেঁধে রেখে ঘটেনি।
বড়পুজোতে বাঙালি হিন্দুর নস্টালজিক আবহ ছিল নিতান্তই ঘরোয়া, আন্তরিক এবং মানবীয় অনুভূতির মেলবন্ধন। আজকের কর্পোরেট জাঁকজমক আর সোশ্যাল মিডিয়ার রিল বানানোর হুজুগও সেই আবেগ কেড়ে নিতে পারেনি। এই সময় ছুটি যেহেতু সার্বজনীনভাবেই পরে সরকারী ভাবে, স্বভাবতই বাঙালির ঘরগুলোতে উচ্ছাসে ভরা অদ্ভুত শান্ত, স্নিগ্ধ এবং আবেগে ভরা উৎসবমন্ডিত পরিবেশ থাকে। এই ছুটির আবহে জীবনকে শুষে নেয় প্রত্যেকে তার নিজের মত করে। কেউ পুজোবার্ষিকী ও নানান ধরণের গল্পের বই পড়ে ফেলে, কেউ এই অবসরে বেড়াতে যায়, নতুন জামার গন্ধ ও আলমারি বন্দি সুখ সারা শরীর ও মনে রোমাঞ্চ তৈরি করে আজও। পাড়ার বয়োঃজ্যেষ্ঠদের আড্ডা, সন্ধিপুজোতে পাঁঠাবলি ও যৌথ পাত পেড়ে খাওয়া, সব শেষে বিজয়ার শুভেচ্ছা। আজকের আমিষ ফতোয়ার ফরমানে এই টুকরো টুকরো মূল্যবান আবেগ গুলোকে একটা নির্দিষ্ট গণ্ডিতে বেঁধে ফেলা সম্ভব?
বিজেপির সাংস্কৃতিক ফরমান পুরো ভারতীয় ঐতিহ্যকে কলুষিত করছে এই ‘হিন্দি অগ্রাসন’ চাপিয়ে দিয়ে। বিজেপি তার রাজনৈতিক ফায়দার জন্য মানুষকে একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয়ে জবরদস্তি বেঁধে ফেলতে খড়গহস্ত হয়ে উঠেছে। ভারতের মত সুবিশাল দেশের সংস্কৃতিতে বিবিধতা বা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য হাজার বছরের পরম্পরা; প্রতিটা সমাজ, অঞ্চল থাকা ভিন্ন ভিন্ন জাতি, ধর্ম, ভাষা, লিঙ্গ, খাদ্যাভ্যাস ও ভিন্ন জীবনযাত্রার মানুষেরা স্বচ্ছন্দ্যে সহাবস্থান করে তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ ধরে রেখেছে। এটাই জীবনের বহুরূপতা বা রকমারি ভাব। বিজেপি এখানে কোনো হিন্দি বলয়ের হিন্দুত্ববাদকে শ্রেষ্ঠ হিসাবে ধার্য করে, প্রতিটা দ্বিতীয় সংস্কৃতিকে গোবলয়ের হিন্দুত্ব সংস্কৃতির চেয়ে নিকৃষ্ট হিসাবে দাগিয়ে দিয়ে নির্দিষ্টভাবে RSS এর ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি জবরদস্তি করে চাপিয়ে দিচ্ছে। বিগত দুই বা তিন শতাব্দী ধরে বাঙালি হিন্দু যে সংস্কৃতিকে নিজস্ব রূপ, নিজের সম্মান ও নিজেদের মর্যাদা হিসাবে দেখে এসেছে, আজ তাকে শেখানো হচ্ছে তুমি পাপ করেছো। এতে বাঙালি জাতির নুন্যতম কোনো বৌদ্ধিক, সামাজিক কিম্বা অর্থনৈতিক উন্নতি হবে কি? যা হবে সেটা বিজেপির রাজনৈতিক এজেন্ডার বাস্তবায়ন। এটা ধর্ম নয়, এটা শাস্ত্রীয় বিধান নয়, এটা রাজনৈতিক ভণ্ডামি আর দ্বিচারিতা।
নিজ নিজ আচার-অনুষ্ঠান পালন, ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী মানুষের পোশাক ও খাবারের ভিন্নতা, ভিন্ন অঞ্চলের নাচ, গান, স্থাপত্য এবং লোকশিল্প, একটি বিশাল দেশে একঘেয়ে সংস্কৃতির মাঝে বৈচিত্র্য নিয়ে আসে। সমাজকে অনেক বেশি প্রাণবন্ত ও দৃষ্টিনন্দন করে তোলে। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সাথে মেলামেশা, মানুষকে উন্নত করে তোলে, মন উদার হয় এবং অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়ে। বিজেপি-RSS এর লক্ষ্য শুধুমাত্র ভোটে জিতে ক্ষমতায় জেতা, তাই বৈচিত্র্যকে যেকোনো মূল্যে খুন না করলে বৈপরীত্য চলে আসবে। দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতা পেতে অচলায়তন সৃষ্টি করা জরুরী বা প্রাথমিক লক্ষ্য। অচলায়তন-এর মূল ভিত্তিই হলো স্থবিরতা, অন্ধ সংস্কার, প্রাচীর দিয়ে ঘেরা এক কৃত্রিম জগত যা পরিবর্তনকে রুখে দেয়। ক্ষমতা চলে যাবার প্রতি প্রতি চরম ভয় থেকে এই ধর্মীয় কুনাট্যের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে নাগপুর, যাতে বৈচিত্র্য এবং বৈপরীত্য পাশাপাশি অবস্থান না করতে পারে, যা জড়তাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় এবং ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। বিজেপি এই কারনে ধর্মকে হাতিয়ার করে সমাজ বদলে দিতে চাইছে একটা সমসত্ব ভোটব্যাঙ্ক তৈরি করতে। ভুয়ো আদর্শিক রূপকল্প- ‘এক দেশ, এক আদর্শ’, ফাঁপা দেশপ্রেমের বুলি দিয়ে একটা মেকি দর্শন বানাতে চাইছে, যেখানে সমগ্র রাষ্ট্রকে একটা নির্দিষ্ট স্থান থেকে ‘একক কমান্ড’ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় খুব সহজে।
মহারাষ্ট্র ছত্রপতি শিবাজীর ভূমি, সেখানে নাগপঞ্চমী দিয়ে যে অশ্লীলতা শুরু হয়েছিল, এখন ‘দহি হান্ডি’র মাধ্যমে তা আরও এক ধাপ এগিয়েছে। গোবলয়ের কুরুচিকর ছামিয়া নাচের দৃশ্য আমরা সকলেই কাঁওয়ার যাত্রার সময় দেখেছি, এটাকেই নতুন হিন্দু সংস্কৃতির একক বানিয়ে দিয়েছে নাগপুরের RSS কর্তৃপক্ষ, উগ্র ধর্মীয় আচারের সাথে মদ গাঁজা, অশ্লীল নৃত্য পরিবেশনা আর অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষমূলক ঘৃণাসূচক মন্তব্য- এটাই বিজেপির রাজনৈতিক হিন্দুত্বের প্রতীক। একটা সময় দূর্গাপুজো মানে ছিলো বাংলা আধুনিক গান, বিজেপি গোবলয়ের ঐ ছামিয়া নাচকেও বাংলাতে প্রতিষ্ঠা করতে চাইবে দূর্গাপুজোতে, নাহলে সবাই কীভাবে লেজকাটা শেয়াল হবে!
আজকে পশ্চিমবাংলার পুরো মন্ত্রীসভা মধ্যপ্রদেশের হিন্দি বলয়ের ‘ভন্ড বাবা’ ধীরেন্দ্র গর্গকে নিয়ে এসে ‘মেদনীপুরী’ মুখ্যমন্ত্রীর পাশে বসে দুর্গাপুজোর খাদ্যাভাস্যের নিয়ম ঠিক করে দিচ্ছে। যে বাংলা সন্ন্যাসী হিসাবে স্বামী বিবেকানন্দ, শ্রী রামকৃষ্ণ, ঋষি অরবিন্দ, স্বামী প্রণবানন্দ বা অভয়চরণ দে এর মত বিশ্বমানের মনীষীর জন্ম দিয়েছে, সেই বাঙলি হিন্দুর উপরে বিজেপির হিন্দি ও RSS এর হিন্দুত্ব চাপিয়ে দিচ্ছে- একটা উদ্ধত, দাম্ভিক, বিনয়হীন দেড় পয়সার বাগাড়ম্বরকারী অসারবাগী কপট ভন্ড ধর্ম ব্যবসায়ী। এটা আজকের বাঙালী হিন্দু সমাজের জন্য লজ্জা আর কলঙ্কের দিন বৈকি। বাঙালী হিন্দুসমাজ যদি কাপুরুষ না হয়, অবশ্যই আসন্ন দুর্গাপুজোতে সমুচিত জবাব দেবে, মুখে নয়- কাজে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন