প্যারাডাইস লস্ট এর করুণ নিদারুণ দৃশ্য আজকের ভক্তপিতার মাঝে দৃশ্যমান, যা শিক্ষনীয়। ক্ষমতা আঁকড়ে পড়ে থাকা এক ভীরু ও নৈতিকভাবে দেউলিয়া লোলচর্ম পলিতকেশ বৃদ্ধ; এতটাই নির্লজ্জ ও মেধা-বুদ্ধিতে দীন যে, নিজেকে খোদ রাষ্ট্রের সমার্থক হিসেবে তুলে ধরতে তার বিন্দুমাত্র চক্ষুলজ্জা নেই। অথচ এই দেশ তাকে অনেক আগেই পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে, সেই দেশের ছাত্রসমাজের কাছেই উনি ভাঁট বকে মরিয়া হয়ে প্রশংসা পেতে চাইছেন- চরম শোচনীয় একটা পরিস্থিতি। উনি ভুলে গিয়েছিলেন যে- ভাষনটা শিক্ষার্থীদের সামনে দিচ্ছেন, দলীয় গোবরভক্ত কর্মীদের কাছে নয়।
গত ১৪ বছর ধরে পোষ্য মিডিয়া যে একখানা সুপারহিরো প্রতিমূর্তি বানিয়েছিলো, এবং উনি নিজেও নিজের নন ‘বায়োলজিক্যাল’ ইমেজ তৈরি করেছিল- সেই কল্পিত ভ্রমের স্বর্গ থেকে নিজেই নিজেকে টেনে হিচড়ে নামিয়ে ফেলে রক্তমাংসের একজন কুৎসিত উদ্ভ্রান্ত বিকৃত মনস্ক স্থবির বৃদ্ধ মানুষ হিসেবে উন্মোচিত করে ফেলেছেন- যাবতীয় ব্র্যান্ডিংয়ের ধরাচুড়ো আজ খসে গেছে। ২০০২ এর দাঙ্গাবাজ মোদী, ২০১৪ এর স্বপ্নফেরি করা মার্কেটিং গুরু মোদী আর ২০২৬ এর ব্যার্থ মোদী- কোনো ফারাক নেই বয়স ছাড়া; একটাই গু, আলাদা রঙে আলাদা নক্সায়। সবচেয়ে সংবেদনহীন এবং সহানুভূতি-বর্জিত ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী, যখন দিল্লিতে বিল্ডিং ধসে পড়ার দরুন যখন ধ্বংসস্তূপের নিচে বহু শিক্ষার্থী আটকা পরেছে বা মারা গেছে, এ নিয়ে তার মুখে একটি কথাও নেই, অথচ ঠিক সেই সময় প্যারিসে মন্দির নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে তিনি উৎসব করছেন।
শিক্ষক দিবস উপলক্ষ্যে Centenary Celebrations of Shri Ram College of Commerce (SRCC) এর এক অনুষ্ঠানে মহামানব গিয়েছিলেন ভাষণ দিতে। নেহরু তার আমলে এই SRCC-তে ভাষণ দিতে এলে, তাঁর ভাষণটি কেবল বাণিজ্য শিক্ষার ওপরই নিবদ্ধ থাকত। রাজীব গান্ধী এসে ভারতের আধুনিকীকরণের কথা বলতেন। এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে মনমোহন সিং এর পুরাতন ভিডিওর অর্কাইভ ভাষণ শুনে দেখবেন, মনে হবে যেন তারা কোনো বিশ্বায়ন শিক্ষার শ্রেণিকক্ষে বসে আছে। এমনকি বাজপেয়ীও আলোচনার মাধ্যমে কথোপকথনের শিল্প শেখাতেন। আজকে এই 'গুহামানব' এর বক্তিতা শুনুন, যেন বিজেপির কোনো নির্বাচনী জনসভায় বসে অন্ধভক্তদের সামনে গোবরের প্রবচন দিচ্ছেন।
নরেন্দ্র মোদী কোনোভাবেই দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য নন বর্তমানে, প্রধানমন্ত্রীর পদের গরিমা আর মর্যাদাকে ভাঙরির দড়ে বেচে দিয়েছেন ক্ষমতা করায়ত্ব করতে গিয়ে। পোষ্য মিডিয়া এতদিন পর্যন্ত বিদেশে গিয়ে ওনার নির্বোধের মত ‘হাসি-ঠাট্টার’ শব্দই মিউট করতো, এখন শিশুদের সাথে উনিজির কথাবার্তাও ANI-কে মিউট করতে হচ্ছে, অবিশ্বাস্য হলেও এটাই সত্যি। বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে হ্যাটা করলেও উনি অন ক্যামেরা নির্বোধের মত খি-খি করে হাসেন। সেই তিনি, যুবসমাজকে আকৃষ্ট করতে গিয়ে এখন Gen-Z প্রজন্মের ব্যবহৃত স্ল্যাং ভাষা ব্যবহার করে নিজেকে উপহাসের পাত্র বানিয়ে ফেলেছেন। আসল ব্যাপার হলো, মহাপুরুষ ও তার অন্ধ ভক্তরা 'জেন-জি'ও বোঝেনা, সভ্য সমাজের ব্যঙ্গ বা শ্লেষের মর্মও বোঝেনা।
৭৬ বছর বয়সী একজন গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী, ১৫ থেকে ২০ বছর বয়সী তরুণ-তরুণী ছাত্রছাত্রীদের 'মানসিক নকশাল' (Dimagi Naxal) বলছে শুধুমাত্র প্রশ্ন করার অপরাধে। ছাত্রছাত্রীদের চাহিদা কি! তারা একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ চায়, তারা চায় গণতন্ত্র টিকে থাকুক, পাশাপাশি জনগন দ্বারা নির্বাচিত সরকার জনগণের জবাবদিহিতার আওতায় আসুক। কিন্তু বিশ্বগুরুর সেই মুরোদ নেই যে একটা সাংবাদিক সম্মেলন করেন, তিনি কেবল রেডিওতে নিজের পেটের মন্দ বায়ুর আওয়াজ শোনান ‘মন কি বাত অনুষ্ঠানে’, আর পোষ্য অভিনেতা-সাংবাদিকদের সামনে আম খাওয়ার গল্প শোনান।
দিশাহীন যুবসমাজ কোনো সন্ত্রাসী নয়, নকশাল কি জিনিস- খায় না গায়ে মাখে তাও জানেনা অধিকাংশ। চতুর্দিকে দুর্নীতির পাহাড়, লক্ষ কোটি টাকা লুন্ঠনের পাপে নিমজ্জিত একটা দল, এদিকে যুবসমাজের সামনে কোনো ভবিষ্যৎ নেই। এই সরকারেরই নীতি আয়োগের তথ্য বলছে দেশে NEET - Neither in Education, Employment nor Training এর সংখ্যা ৮ কোটি ৭০ লাখ। ২৫ বছর বয়স অবধি স্নাতক যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৪০%। মোট কর্মহীন যুবসমাজের প্রায় ৬৯% উচ্চমাধ্যমিক বা তার চেয়েও উচ্চশিক্ষিত ডিগ্রিধারী। এরা কাজ চাইছে, এরা জিজ্ঞাসা করছে প্রশ্নপত্র কেন ফাঁস হচ্ছে, গতানুগতিক শিক্ষার ভবিষ্যৎ কি! এই বিষয়গুলোর উত্তর দেওয়ার বদলে- মহারাজ যুবকদের বিরুদ্ধে 'লেবেল' বা তকমা সেঁটে একটা অসম লড়াই লড়ছেন।
SRCC এর ছাত্রছাত্রীরা আশা করেছিল তিনি চাকরি, শিক্ষা ও সংস্কারের বিষয়ে কথা বলবেন, অথচ ‘সাহেব’ 'দিমাগি নকশাল' আর 'নারাজ পিসেমশাই'-র মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব হাজির করেছেন। আসলে তরুণদের জন্য কোনো অনুপ্রেরণা বা দূরদর্শী চিন্তার কথা বলার যোগ্য উনি কোনোদিনিই ছিলেননা। টেলিপম্পটার ম্যান কি আদৌ শিক্ষক দিবসের মর্যাদা বোঝেন? যিনি সারাক্ষণ দাঙ্গা, মুসলমান, গরু, পাকিস্তান নিয়ে পরে থাকেন, তাদের বক্তব্য ঠিক এতোটাই নিম্নমানের হয়। শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার প্রবণতা এই Divider-in-Chief কে হীনম্মন্যতারই সবচেয়ে বিরক্তিকর বহিঃপ্রকাশে বাধ্য করেছে। দেশের একটি মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দেশের তরুণদের সামনে তুলে ধরার মতো কোনো সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি বা অনুপ্রেরণাদায়ক বার্তা তার নেই, তিনি বিজেপির কর্মকর্তা হিসাবে বিরোধী পক্ষকে গালিগালাজ করার পথ বেছে নিলেন। চরম ব্যর্থ ফেকুজির কাছে এখন আর কোনো নতুন ভাবনা বা সারবত্তা অবশিষ্ট নেই এবং বলার মতো অর্থবহ কোনো কথাও ফুরিয়ে গিয়েছে।
গুহামানব এখানেও ‘মাই ফ্রেন্ড দোলান্ড’কে কপি করেছে। গত ২৮শে আগস্ট মার্কিন মুলুকের হিউস্টনে আয়োজিত Congressional Space Medal of Honor এর বার্ষিক অনুষ্ঠানে গিয়ে ট্রাম্পও হেগে ছড়িয়েছে। এই অনুষ্ঠানটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ অনুসন্ধান ক্ষেত্রে প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান প্রদানের মঞ্চ ছিল। সেখানে নাসার তাবড় বিজ্ঞানী এবং মহাকাশে নানান মিশনে যাওয়া এ্যাস্ট্রোনটেরা উপবিষ্ট ছিল। ট্রাম্প নির্ধারিত সময়ের দেড় ঘন্টা দেরিতে পৌঁছায়, মোদীও যা অনুসরণ করেছে। এরপর তার প্রফেসর কাকা জন ট্রাম্পকে নিয়ে বক্তিতা দেয় যার সাথে মহাকাশ গবেষনার কোনো সম্পর্ক ছিলোনা। সকলকে আশ্চর্যকরে উন্নত জিনের কারনেই যে গবেষনার কাজে উন্নতি হয়, এই গল্পও নাসার বিজ্ঞানীদের সামনে বমি করেন। RSS ও তো উন্নত ব্রাহ্মন জিনের পক্ষেই সাওয়াল করে। এর পরেই মঞ্চটা মিডিটার্মের নির্বাচনের প্রচারসভায় পরিনত করে ফেলে- বাইডেন, ওবামা থেকে ইরান, রাশিয়া সকলকে আক্ষরিক অর্থে গালিগালাজ শুরু করে। ফ্রেন্ডের দেখানো পথেই হেঁটে মহামানব SRCC তে ছড়িয়েছেন।
অশিক্ষিত রাজনীতিবিদ ভারতের জন্য একটি বড় সমস্যা, বলাই বাহুল্য RSS-BJP এর প্রায় সকলেই অশিক্ষিত গাম্বাট। যারা খাতায় কলমে শিক্ষিত, তারা নিজ আখের গুছাতে এই দলে ভিড়ে রয়েছে। এরা কোন দিক থেকেও কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভাষণ দেওয়া উপযুক্ত? যাবতীয় অবৈজ্ঞানিক ও ভিত্তিহীন গল্পগুজব প্রচার করে, ধর্মকে বরর্ম বানায়, যা একান্তই অপ্রাসঙ্গিক ও অবান্তর। বাকী সবটাই দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা ধরে চলা বিদ্বেষপূর্ণ, উগ্রবাদী ও প্ররোচনামূলক সাজানো-গোছানো রাজনৈতিক পরাকাষ্ঠা। আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ তথা সময়ক্রমকে যাচাই করে দেখার মত বোধবুদ্ধি ও সঙ্গতি টুকুও এদের অবশিষ্ট নেই। আমি ব্যক্তিগত ভাবে মানি যে, ইনি আমার প্রধানমন্ত্রী নন। একজন মর্যাদাহীন ও সস্তা মানসিকতার নির্লজ্জ কেউ আমার নেতা হতে পারেনা। স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ইনি প্রতিবার এগুলোকেই তার রাজনৈতিক প্রোপ্যাগান্ডার মঞ্চ হিসাবে বেছে নিচ্ছেন। সাংবিধানিক পদের নিরপেক্ষতা এই লোকের থেকে কোনো সুস্থ মানুষ আর আশা করেনা।
ভারতীয় ব্যাঙ্ক গুলোর কর্মক্ষমতা বিষয়ে ভাষনের নামে দুর্গন্ধ ছড়ানো এই মস্তিষ্ক-কলুষিত মূর্খটা সংশ্লিষ্ট কলেজের শত বছরের ইতিহাসে প্রথম নন-পারফর্মিং হতাশা প্রদান করেছেন। প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালের বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকট আন্তর্জাতিক অর্থায়নের বহু বড় বড় নামকে ডুবিয়ে দিয়েছিল। উনি জানালেন ২০০৮ এর সঙ্কট নাকি ২০০০ সাল অবধি লুকিয়ে রেখেছিল মনমোহন সরকার, তা কাকা- সময়ের পিছনে যাওয়ার গাড়িটা কি আপনি চালাচ্ছিলেন সেই সময়? কতবড় নির্লজ্জ হলে এমন মিথ্যাচার কেউ করতে পারে। ২০০৮ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে, শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই ৪৮৯টি বিমাভুক্ত ব্যাঙ্ক এবং সঞ্চয়ী প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যায়। ভারতের শেয়ার বাজার, রপ্তানি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এতে, কিন্তু আমাদের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা অক্ষত ছিল, একটিও ভারতীয় বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক দেউলিয়া হয়নি। এটা তথকালীন RBI এবং ডঃ মনমোহন সিং সরকারের বিচক্ষণ নিয়ন্ত্রণ এবং দক্ষ সংকট ব্যবস্থাপনার ফসল ছিল। গুহামানব নিজের কার্যকালে কি করেছেন?
২০১৯ সালের শুরুতেই এগারোটি সরকারি ব্যাঙ্ক এবং একটি বেসরকারি ব্যাঙ্ককে RBI-এর ‘প্রম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন’ কাঠামোর অধীনে আনা হয়েছিল। সরকারকে ২.১ লক্ষ কোটি টাকার একটি পুনঃমূলধন প্যাকেজ ঘোষণা করতে হয়েছিল। ২০২০ সালে, RBI-এর বর্ণনা অনুযায়ী ইয়েস ব্যাংকের ‘দ্রুত অবনতিশীল আর্থিক অবস্থা’ এবং ‘গুরুতর প্রশাসনিক সমস্যা’-র কারণে ব্যাঙ্কটিকে একটি মোরাটোরিয়ামের অধীনে রাখা হয়। এর জন্য SBI-এর নেতৃত্বে একটি পুনর্গঠনের প্রয়োজন হয়েছিল। লক্ষ্মী বিলাস ব্যাঙ্ককে একটি মোরাটোরিয়ামের অধীনে রাখা হয়েছিল এবং এটিকে DBS ব্যাঙ্কের সাথে একত্রীভূত করতে হয়েছিল। বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম, ব্যর্থ অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং মিথ্যা প্রতিবেদন আবিষ্কার করার পর PMC ব্যাংকের আমানতকারীদের প্রাথমিকভাবে তাদের নিজেদের মাত্র ১,০০০ টাকা তোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ব্যাঙ্কটিকে অবশেষে ইউনিটি স্মল ফাইন্যান্স ব্যাংকের সাথে একীভূত করা হয়।
তিনি দেশের সবচেয়ে নামকরা বাণিজ্য কলেজে ঢুকে, বিশ্ব আর্থিক সংকটের ইতিহাসের নামে আক্ষরিক অর্থে ‘হেগে’ ছড়ালেন। হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটিতে হয়তো এটাকে অর্থনীতি বলে চালিয়ে দেওয়া যায়, SRCC-তে এটা একটা অক্ষম মূর্খের ভাঁড়ামো বই কিছু নয়। আসলে অর্থনীতি কোথায় দাঁড়িয়ে তা ঋণের দিকে চেয়ে দেখুন। এই ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বিশ্বব্যাঙ্কের সবচেয়ে বড় ঋণ গ্রীহিতার নাম জানেন? ইয়েস, আত্মনির্ভর ভারত। দু’য়ে ইন্দোনেশিয়া, তিনে পাকিস্তান আর চারে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাঙ্কের ভারতীয় ঋণের অঙ্ক- ৩ লক্ষ ৭১ হাজার কোটি টাকা। আজকের দিনে আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক হিসাব মিলিয়ে প্রত্যেক ভারতীয়ের মাথাপিছু ঋনের পরিমান ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা, ২০১৪ সালে এটা ছিলো ৪৩০০০ টাকা। সাহেবের শাসনামলের ১২ বছরে তিন গুণ ঋণ বেড়েছে, আপনার আয় কি তিন গুণ বেড়েছে? ২০১৪ সালেও ভারত এক নাম্বারেই ছিলো বিশ্বব্যাঙ্কের ঋণ নেওয়ার তালিকাতে, দ্বিতীয়ে ছিল চিন, তৃতীয় ব্রাজিল, পঞ্চমে মেক্সিকো, এরা সকলে প্রথম ১০ থেকে বেড়িয়ে গেছে। কেবল আমরা এই মহাদানবের রাজত্বে আরো ডুবে গেছি। এই হচ্ছে বিকশিত ২০৪৭ সালের গাঁজাগল্প।
গত ১২ বছরে গুহামানবের খাতায় শুধুই ব্যর্থতা আর বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। সবার শীর্ষে রয়েছে দুর্নীতি, অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থান সংকট। দুর্নীতির কথা কাগজে লিখতে গেলে সেই তালিকা চাঁদ অবধি পৌঁছে যাবে, ওটা অন্য দিন লেখা যাবে। ২০১৬ সালের নোটবন্দী ক্ষুদ্র শিল্প ও অসংগঠিত ক্ষেত্রকে ধ্বংস করে দিয়েছে। কালোটাকা আর জাল নোট ধ্বংসের গল্প দিয়েছিল, এখন তো ব্যাঙ্কের ভোল্টেই কালো টাকার পাহাড়। ত্রুটিপূর্ণ ও জটিল GSTকে তড়িঘড়ি করে চালু করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের মড়ার উপরে খাঁড়ার ঘা মেরে দিয়েছে। বেকারত্বের প্রশ্ন আসতেই তো ‘দিমাগি নকশাল’ বানীর উৎপত্তি। মার্কিন ডলারের তুলনায় ভারতীয় টাকার মূল্যের রেকর্ড পতন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ওনার মুকুটের কোহিনুর। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে সম্পদের ব্যবধান বৃদ্ধি এবং আম্বানি আদানির মত কর্পোরেট মাফিয়াদের হাতে দেশের মূল পরিকাঠামো, যেমন ব্যাঙ্কে থাকা জনগনণের গচ্ছিত অর্থ, সমুদ্র বন্দর, বিমানবন্দর, অস্ত্র উৎপাদন সেক্টর, বিদেশনীতির থিঙ্কট্যাঙ্ক, আর্মি ইস্কুল, খনি, জঙ্গল সব তুলে দিয়েছে। এমনকি আমাদের গর্ব ISRO আর DRDO কেও বেচে দিয়েছে সাম্প্রতিক অতীতে। বিতর্কিত কৃষি আইন, কৃষকদের আয় হ্রাস, ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের আইনি গ্যারান্টি না দেওয়া ওনার অনন্য কীর্তি বৈকি। আর সামাজিক ও গণতান্ত্রিক অবক্ষয়ের বিচারে উনি নোবেলের দাবীদার। CAA/NRC বিতর্ক, বিরোধী রাজনৈতিক দল, সমাজকর্মী ও সাংবাদিকদের দমনে ইডি (ED) এবং সিবিআই (CBI)-এর মতো কেন্দ্রীয় সংস্থাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার, মূলধারার গণমাধ্যমকে পোষ্য বানিয়ে আন্তর্জাতিক 'প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে' ভারতকে হাস্যস্পদ করে তোলা, চীন সীমান্ত সংকট এগুলো তো আছেই। সব কীর্তি ছাপিয়ে- মাই ফ্রেন্ড দোলান্ড টাম্পের সামনে সারেন্ডার করাটা তার বিশেষ সিদ্ধিলাভ।
এদিকে ভক্তদের নতুন ফাদারল্যান্ড দেওয়ার পরেও যখন বামাল সামলানো যায়নি, তখন বিনাশপুরুষ এই SRCC এর ভাষনে তার UPI আবিষ্কারের গল্প শোনালেন ও কৃতিত্ব নিলেন। আসলে উনি বুঝে গেছেন যে ওনার দাঁতক্যালানো থোবরা দেখিয়ে ভোট টানার মতো কোনো সাফল্য নেই, তাই তিনি UPI-এর কৃতিত্ব নিজের বলে মিথ্যা দাবি করছেন অত্যান্ত গর্বের সাথে। বস্তুত, মনমোহন সিং সরকারের আমলেই ইউপিআই-এর পরিকল্পনা, প্রস্তাবনা, অনুমোদন, নকশা ও উন্নয়ন সম্পন্ন হয়েছিল এবং আরবিআই (RBI)-এর গভর্নর হিসেবে ড. রঘুরাম রাজনের কার্যকালেই এটি চালু করা হয়েছিল। ২০০৮ সালে ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া(NPCI) তৈরি হয়, ২০১০ সালে IMPS চালু করা হয়- যা কঙ্গনা রানাউতের মতে- ভারতের প্রকৃত স্বাধীনতার আগেই। অন্যের তৈরি করা কাঠামোর ওপর নিজের নাম বসিয়ে দিলেই ইতিহাস বদলে যায় না, ভাঁড় মহাশয়। যখন কারো ডিগ্রি হয় ‘এন্টার পলিটিক্যাল হিস্ট্রি’র ওপর, তখন এমনটাই ঘটে।
ভুয়া ডিগ্রির অধিকারী মহামানব নিজের অশ্লীল কর্মকাণ্ডকে হোমিওপ্যাথির সাথে তুলনা করে, মেটাফোরের মা-মাসি এক করে দিয়েছেন। বিশ্বের সমস্ত প্রধান চিকিৎসা-সংস্থা হোমিওপ্যাথিকেই ছদ্মবিজ্ঞান হিসেবে অভিহিত করে থাকে। নন-বায়োলজিক্যাল, তাঁর বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তৃতার মাধ্যমে ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক কথা বলে ভেবেছেন- দারুন বাহাদুরির কাজ করে ফেলেছেন। রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচার এবং যৌক্তিক ও সমালোচনামূলক ভিন্নমতকে দমন করার জন্য, হাস্যকরভাবে হোমিওপ্যাথির কার্যপদ্ধতির উদাহরণটি- মগজে কার্ফিউ এবং জড়ভরত বৈশিষ্ট্য যুক্ত অক্ষম বুদ্ধিবৃত্তিক একজন উন্মাদের ঝাপসা দৃষ্টি। যিনি এক অযৌক্তিক চিন্তাধারা, অবৈজ্ঞানিক বিশ্বাস এবং আত্মমুগ্ধতা-জনিত নিরাপত্তাহীনতা ও ভঙ্গুর আত্মমর্যাদাবোধে ভুগছেন। প্রকৃত শিক্ষার সাথে যাদের দূর দুরান্তেও সম্পরর্ক নেই, তারা এই ধরনের হীন মানবিক বৈশিষ্ট্যর হয়। ইনি আক্ষরিক অর্থেই স্বতন্ত্র ভরদ্বাজের বড় ভাই।
ছাত্রদের সামনে দেওয়া ভাষনেও মহাপুরুষ তার ইমেজ নিয়ে উদ্বিগ্ন, ওনার ওই সারবত্তাহীন বক্তৃতার ছোট ছোট অংশ নাকি ভাইরাল হয়ে যেতে পারে। পরিহাসের বিষয় হলো, ২০১৪ সাল থেকে তিনি এবং তার দলদের আঁটিসেল- সমস্ত বিরোধী নেতা সহ রাহুল গান্ধীর ভিডিও এডিট করে সেগুলোকে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে নিকৃষ্ট উপস্থাপনা করেই সোস্যালমিডিয়াতে টিকে আছে ঘৃনা ছড়িয়ে। কিন্তু গুহামানবের ক্ষেত্রে ভিডিওর অংশগুলো মোটেও এডিটেড নয়। তিনি নিজেই কথা বলতে গিয়ে তোতলান ও ভুলভাল বকেন, যার ফলে তার আসল রূপ বেরিয়ে মানুষ প্রকৃত বাস্তবতা দেখতে পাচ্ছে, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক।
শ্রীরাম কলেজে গুহামানবের ভাষণ উপলক্ষে ঠিক কি কি ধরণের সুরক্ষা নিয়েছিলো ওনার সুরক্ষাতে থাকা SPG? কালো জামা, কালো প্যান্ট, কালো বেল্ট, কালো টুপি, এমনকি কালো রুমাল অব্ধি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল- SRCC এর এই অনুষ্ঠানে। আগে মুসলমান চিনতে উনি কাপড় দেখতেন, এখন বিক্ষোভের আঁচ থেকে পালাতে, আক্ষরিক অর্থে কাপড় দিয়ে পরিচয় দিতে হচ্ছে ছাত্রদেরও। যে কারণে ওই ইন্সটিটিউটের ৪০০০ ছাত্রর মধ্যে মাত্র ৬০০ জনকে অনুমতি দিয়েছিল এই সভাতে দর্শক হিসেবে অংশগ্রহণ করার। প্রত্যেকের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট, পারিবারিক রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড, সেই ছাত্রের নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শ, এই সমস্ত কিছু খুঁটিয়ে বিচার করে- তবেই এই ৬০০ জনকে অনুমতি দিয়ে ছিল। এই অনুষ্ঠান চলাকালীন দিল্লি ইউনিভার্সিটির বিভিন্ন হোস্টেলে এবং যেখানে যেখানে ছাত্ররা জটলা করে বা আড্ডা দেয় নিজেদের মধ্যে, সেই প্রত্যেকটা স্থানে দিল্লি পুলিশ রীতিমতো নাকাবন্দি করে রেখেছিল, যাতে ভুল করে একজনও কোনরকম বিরুদ্ধ মত তুলতে না পারে। ছাত্রদের মধ্যে যারা নেতৃত্ব স্থানীয়, তাদের প্রত্যেকের ফ্ল্যাটে পুলিশ পোস্টিং করে তাদের হাউস অ্যারেস্ট করে রাখা হয়েছিল।
গুহা মানব, আপনার খেলা শেষ হয়ে গেছে ফ্রান্ডস। দেশের জন্য আপনি লজ্জা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারবেন না।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন